বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

এই সুতোর পাতাগুলি [1] [2] [3]     এই পাতায় আছে45--75


           বিষয় : দেশভাগঃ ফিরে দেখা(দ্বিতীয় পর্ব)
          বিভাগ : অন্যান্য
          শুরু করেছেন :I
          IP Address : 57.15.9.41 (*)          Date:26 Oct 2017 -- 10:02 PM




Name:  I          

IP Address : 57.15.9.106 (*)          Date:04 Dec 2017 -- 12:14 AM

গান্ধি পরে বলবেন, তাঁর এই 'নীরবতা' কেবলমাত্র 'জাতীয় স্বার্থ'র কথা ভেবে। [1] সুখদেব একটি চিঠিতে তাঁকে অনুরোধ করেন, তিনি যেন ব্রিটিশ আমলাদের মত বিপ্লবীদের সম্বন্ধে খবরের কাগজে বিবৃতি না দিয়ে জেলখানায় এসে সরাসরি তাঁদের সঙ্গে কথা বলেন।তার উত্তরে গান্ধি বলেন, বিপ্লবীদের কার্যকলাপও গোপনীয়তায় মোড়া।বিপ্লবীরা যখন তাঁর বিরুদ্ধে ব্রিটিশ সরকার ও ভারতীয় পুঁজিবাদীদের সঙ্গে আপোস করবার অভিযোগ আনেন, তখন তিনি তাঁদের অভিযোগের সরাসরি উত্তর না দিয়ে বিপ্লবীদের হিংসার রাজনীতির নিন্দা করেন।[2]

যতীন দাশের মৃত্যু ও বন্দীদের শ্রেণীবিভাজনের নীতি খতিয়ে দেখার সরকারী প্রতিশ্রুতি পাওয়ার পরে বাকী বন্দীরা অনশন প্রত্যাহার করেন। কিন্তু সরকার তার প্রতিশ্রুতি পূরণের কোনো সদিচ্ছাই না দেখানোয় বন্দীরা পুনরায় অনশনের হুমকি দেন। নিমরাজি হয়ে সরকার রাজবন্দীদের স্পেশাল ক্লাস-এর মর্যাদা মঞ্জুর করে, কিন্তু স্থানীয় ম্যাজিস্ট্রেটের ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপরে সেই মর্যাদা-দানের বিষয়টি ন্যস্ত করা হয়।

লাহোর ষড়যন্ত্র মামলার শুনানি শুরু হলে কোর্টরুমের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ বন্দী প্রেম দত্ত ভার্মা রাজসাক্ষী জয় গোপালের দিকে চপ্পল ছুঁড়ে মারেন। এই ঘটনার পর ম্যাজিস্ট্রেট বন্দীদের হাতকড়া পরিয়ে আদালতে হাজির করবার নির্দেশ দেন। বন্দীরা হাতকড়া পরতে নারাজ হলে ভগৎ সিং সহ অন্যান্য বন্দীদের নির্মম ভাবে পেটানো হয়। বন্দীরা আদালতে হাজির হতে অস্বীকার করেন। ম্যাজিস্ট্রেট বন্দীদের অনুপস্থিতিতেই মামলার শুনানি চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন। মামলা তাড়াতাড়ি শেষ করবার উদ্দেশ্যে ভাইসরয় একটি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করেন; যদিও ট্রাইব্যুনাল গঠনের এই অর্ডিন্যান্সটি কখনোই ব্রিটিশ পার্লামেন্টে পাশ হয় নি। এই বিশেষ ক্ষমতাসম্পন্ন ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে একমাত্র ইংল্যান্ডের প্রিভি কাউন্সিলেই আবেদন করা যেতে পারে।

৭ই অক্টোবর, ১৯৩০ সালে ট্রাইব্যুনাল তার রায় দেয়। ২১ জন অভিযুক্তর মধ্যে ভগৎ সিং, সুখদেব ও রাজগুরুর ফাঁসির আদেশ হয়। ডিফেন্স কমিটি প্রিভি কাউন্সিলে আপীল করবার প্রস্তুতি নেয়। ভগৎ সিং শুরুতে এই আপীলের ব্যাপারে রাজী ছিলেন না; কিন্তু পরে তাঁর মনে হয় আপীল করলে ব্রিটেনে HSRA-র পক্ষে জনমত গঠিত হতে পারে। প্রিভি কাউন্সিলে অবশ্য আপীলটি খারিজ হয়ে যায়। শেষ চেষ্টা হিসেবে কংগ্রেস সভাপতি মদন মোহন মালব্য ভাইসরয়ের কাছে একটি মার্সি পিটিশন দাখিল করেন। সেটিও যথারীতি খারিজ হয়। কিছু বিপ্লবী গান্ধীকে হস্তক্ষেপ করতে বলেন। নীরবতা ভেঙে ১৯শে মার্চ, ১৯৩১ সালে ভাইসরয়ের সঙ্গে তাঁর নির্ধারিত মিটিংয়ে এই বিষয় নিয়ে গান্ধি কথা বলতে চেয়েছিলেন, কিন্তু ভাইসরয় ব্যাপারটি উড়িয়ে দেন; পরে ভাইসরয় লর্ড আরউইন বলেন -"I explained to him that I had given a very careful thought to it but I did not find any basis to convince myself to commute the sentence. It appeared he found my reasoning weighty."[3] তার চারদিন পরে ২৩শে মার্চ সন্ধে সাড়ে সাতটার সময় লাহোর জেলে ভগৎ সিং, সুখদেব ও রাজগুরুর ফাঁসি হয়ে যায়।

জেলখানা থেকে তাঁর লেখা শেষদিককার চিঠিগুলিতে ভগৎ সিং বলেন-"ম্যায়ঁ আতংকারি নহিঁ হুঁ, ম্যায়ঁ এক ক্রান্তিকারি হুঁ। "বলেন, বিপ্লবী জীবনের শুরুর দিককার কিছুদিন বাদ দিলে তিনি কখনো সন্ত্রাসবাদে আগ্রহ দেখান নি। এ-ও বলেন- "বম ফেঁকনা না সির্ফ বেকার, বলকি নুকসানদায়ক হ্যায়।"[4]বোমা-বন্দুক কেবলমাত্র কিছু বিশেষ ক্ষেত্রেই ব্যবহার করবার দরকার হতে পারে, কিন্তু আসল কাজ কৃষক-শ্রমিকদের নিয়ে আন্দোলন গড়ে তোলা। ভবিষ্যতের কমিউনিস্ট পার্টিতে সামরিক বিভাগের প্রয়োজনীয়তা তিনি স্বীকার করেন, কিন্তু তা যেন সর্বদাই পার্টির অধীনস্থ থাকে। সিং ততদিনে বাকুনিন পেরিয়ে মার্ক্স, লেনিন ও ট্রটস্কি আত্মস্থ করেছেন। তাঁর অনুরাগীদের তিনি মনে করিয়ে দেন, উদ্দেশ্যসাধনের জন্য মৃত্যুবরণ করাই একমাত্র জরুরি কাজ নয়, বেঁচে থেকে লড়াই চালিয়ে যাওয়াও জরুরি। পাঞ্জাব স্টুডেন্ট্স কনফারেন্সের সদস্যদের তিনি বলেন বোমা-পিস্তল ছেড়ে গান্ধীবাদীদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে কাজ করতে। যখন জিজ্ঞাসা করা হয় তাঁর শেষ ইচ্ছা কী, তিনি বলেন- লেনিনের জীবনী পড়তে শুরু করেছেন,ফাঁসির আগে তিনি সেটি শেষ করে যেতে চান। [5]

২৩শে মার্চ সন্ধ্যাবেলা তিন বিপ্লবীর ফাঁসির সময় নিয়মমাফিক কোনো ম্যাজিস্ট্রেট লাহোর জেলে উপস্থিত ছিলেন না। জেল কর্তৃপক্ষ জেলের পেছন দিককার দেওয়াল ভেঙে শহীদদের দেহ গোপনে বের করে নিয়ে শেষকৃত্য সম্পন্ন করেন। শবদেহের আধপোড়া ছাই শতদ্রু নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়।

দেশের নানান জায়গায় হরতাল আর শোকসভার আয়োজন করা হয়। করাচিতে কংগ্রেসের বাৎসরিক সম্মেলনের আগে শোকাহত,ক্রুদ্ধ যুবকরা গান্ধিকে কালো পতাকা দেখান। সম্প্রদায়নির্বিশেষে মানুষ তিন বিপ্লবীর প্রতি দেশজুড়ে শ্রদ্ধা জানান। জীবিত ভগৎ সিং সাম্প্রদায়িকতার বিষ দূর করতে পারেন নি; মৃত ভগৎ সিং তা করলেন। অন্ততঃ কিছুদিনের জন্য হলেও।

স্বাধীনতা আন্দোলন জুড়ে হিন্দু -মুসলিম-শিখ সাম্প্রদায়িক চেতনা অদ্ভুত পেন্ডুলামের মত দুলেছে। কখনো সম্প্রদায়্গুলি কাছে এসেছে, কখনো বিদ্বেষে দূরে সরে গেছে। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির কথা ভাবলে ত্রিশের দশক খুব সুখের সময় ছিল না। তবু তারই মধ্যে ভগৎ সিং ও তাঁর কমরেডদের বীরত্ব আর আত্মাহুতি এক ঝলক তাজা হাওয়া বয়ে এনেছিল। জীবনের শেষদিনগুলিতে ভগৎ সিংয়ের রাজনৈতিক চেতনার এক উত্তরণ ঘটছিল- গান্ধীবাদী অনশন-সত্যাগ্রহ'র [6]মধ্য দিয়ে (যদিও গান্ধি কখনো তা স্বীকার করেন নি), বামপন্থী বিপ্লবী চিন্তাধারা গড়ে তোলার মধ্য দিয়ে।কিন্তু ব্রিটিশ সরকারী ছাপ্পা-মারা "সন্ত্রাসবাদী" তকমা তাঁর জীবন থেকে যায় নি।

ভগৎ সিংয়ের অবশ্য তাতে কিছু এসে যায় না। তিনি জানতেন - "It is easy to kill individuals but you cannot kill the ideas. Great empires crumbled, while the ideas survived."[7]

Notes:
1. M.K .Gandhi ,"My Silence", Young India, 17th October, 1929.
2.Nair,Neeti: Changing Homelands-Hindu Politics and the Partition of India. Permanent Black,2011,p.126.
3.Rana, Bhawan Singh (2005a), Bhagat Singh, Diamond Pocket Books (P) Ltd., ISBN 978-81-288-0827-2, archived from the original on 1 October 2015.
4. Bhagat Singh, "Krantikari karyakram ka masauda",2 Feb 1931,in Bhagat Singh aur unke sathiyon ke dastavez, ed. Jagmohan Singh and Chamanlal (Delhi[1987],2005), p. 397.
5. Chinmohan Sehanavis. "Impact of Lenin on Bhagat Singh's Life". Mainstream Weekly. Archived from the original on 30 September 2015. Retrieved 2011-10-28.
6.Nair,Neeti: Changing Homelands-Hindu Politics and the Partition of India. Permanent Black,2011,p.125.
7."Leaflet thrown in the Central Assembly Hall, New Delhi at the time of the throwing bombs". Letters, Writings and Statements of Shaheed Bhagat Singh and his Copatriots. Shahid Bhagat Singh Research Committee, Ludhiana. Archived from the original on 30 September 2015. Retrieved 2011-10-11.







Name:  এলেবেলে          

IP Address : 212.142.96.33 (*)          Date:04 Dec 2017 -- 10:35 PM

লেখাটা ভালো লাগছে ।
আজাদ লিখেছেন “When in July 1944, I read the report that Gandhiji was corresponding with Mr Jinnah and going to Bombay to meet him, I told my colleagues that Gandhiji was making a great mistake. His action would not help to solve, but on the contrary aggravate the Indian political situation. Later events proved that my apprehensions were correct. Mr Jinnah exploited the situation fully and built up his own position but did not say or do anything which could in any way help the cause of Indian freedom”.

আসল ঘটনা হল ১৯৪৪ সালের ৮ই এপ্রিল গান্ধীর অনুমতি নিয়ে চক্রবর্তী রাজাগোপালাচারী জিন্নার কাছে একটি প্রস্তাব পেশ করেন । কিন্তু গান্ধী এই প্রস্তাব নিয়ে নিজে হাজির হননি এই অজুহাত দেখিয়ে জিন্না জুলাই মাসে ওই ফর্মুলা নাকচ করে দেন । ২৪শে সেপ্টেম্বর গান্ধী মুসলিম লিগের লাহোর প্রস্তাব অনুযায়ী ভারতের মুসলিম প্রধান অঞ্চলগুলির বিচ্ছিন্নতার অধিকার মেনে নিয়ে জিন্নার কাছে ফের প্রস্তাব পাঠান । সে হিসেবে পাকিস্তান সৃষ্টির ক্ষেত্রে গান্ধীর ‘অবদান’ খুব কম নয় !



Name:  I          

IP Address : 57.15.5.35 (*)          Date:05 Dec 2017 -- 08:44 PM

এলেবেলে,
আরো লিখুন।সকলেই লিখুন।


Name:  এলেবেলে          

IP Address : 212.142.80.55 (*)          Date:06 Dec 2017 -- 11:55 PM

গান্ধী জিন্নার সাথে এই ন্যাকামিটা ১৯৪৪এই সেরে ফেলে ৩১.০৩.৪৭ এ মৌলানা আজাদকে লিখছেন – “If the Congress wishes to accept partition, it will be only on my dead body. So long as I am alive, I will never agree to the partition of India. Nor will I, if I can help it, allow Congress to accept it.”

ঠিক এর দু'মাস পরে ৩ জুন, ১৯৪৭ কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটি দেশবিভাগের প্রস্তাব গ্রহণ করে । কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটি দেশভাগের প্রস্তাব মেনে নিলেও তা ছিল এআইসিসি-র অনুমোদনসাপেক্ষ । ১৬ জুন এআইসিসি-র অধিবেশন ডাকা হয় । সেখানে গান্ধী ১৮০ ডিগ্রি পাল্টি খেয়ে বলেন ‘… Although the House had the right to accept or reject the Working Committee’s decision, they must remember that the Working Committee as their representative had accepted the plan and it was the duty of the AICC to stand by them…’ [My Days with Gandhi, নির্মল কুমার বসু, পৃ.২৪৫].


Name:  I          

IP Address : 57.15.12.136 (*)          Date:11 Dec 2017 -- 11:55 PM

যে কথা বলতে ভুলে গেছিলাম
--------------------------------
শুধু গান্ধিই নন, আরো কেউ কেউ ভগৎ সিংদের নিয়ে সম্পূর্ণ নীরব থেকেছেন। নির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে একটি বিশেষ সংগঠন। রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ। আর এস এসের তৃতীয় সরসঙ্ঘচালক বালাসাহেব দেওরসের জবানীতেই শোনা যাক -

"... কলেজে পড়বার সময় (আমরা)যুবকরা স্বাভাবিকভাবেই ভগৎ সিংয়ের মত বিপ্লবীদের আদর্শে অনুপ্রাণিত হই।প্রায়ই মনে হয়, ভগৎ সিংয়ের মত দুঃসাহসিক কিছু একটা করি।আমাদের তখন সঙ্ঘের(আর এস এস) দিকে টান কম, কেননা সেসময়কার রাজনীতি, বিপ্লব ইত্যাদি যা যা চিন্তা তরুণমনকে আকৃষ্ট করে, সেসবের আলোচনা সঙ্ঘে তেমন একটা হত না। যখন ভ্গৎ সিং ও তাঁর সাথীদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হল, তখন আমরা এতই উত্তেজিত যে কয়েক বন্ধু মিলে ঠিক করলাম সাঙ্ঘাতিক একটা কিছু করে ফেলব; কিন্তু তার জন্য আগে বাড়ি থেকে পালাতে হবে। এদিকে ডক্টরজিকে না জানিয়েও বাড়ি থেকে পালানো ঠিক হবে না। বন্ধুরা আমাকেই এগিয়ে দিল। আমরা সবাই মিলে ডক্টরজির কাছে গেলাম;অনেক সাহসটাহস করে আমি ডক্টরজিকে আমাদের মনের কথা খুলে বলেই ফেললাম। আমাদের কথা শুনে ডক্টরজি আমাদের নিয়ে মিটিংয়ে বসলেন; বোঝালেন আমাদের প্ল্যানটা কতদূর বোকাবোকা; আর বোঝালেন সঙ্ঘের কাজের কী মাহাত্ম্য । সাতদিন ধরে প্রতি রাত দশটা থেকে তিনটে অবধি এই মিটিং চলেছিল। ডক্টরজি'র অসাধারণ ভাবনাচিন্তা আর তাঁর মহৎ নেতৃত্ব আমাদের চিন্তাধারায় আমূল পরিবর্তন এনে দিল। সেই দিন থেকে আমরা মূর্খের মত চিন্তা- ভাবনা করা ছাড়লাম; জীবনে নতুন দিশা এল, সঙ্ঘের কাজে পুরো মনোনিবেশ করলাম..."[1]

শুধু বালাসাহেবই নন, গোলওয়ালকরও রাখঢাক না করেই বিপ্লবীদের সম্বন্ধে তাঁর মূল্যায়ন রেখে গেছেন লিখিতভাবে-"We have not looked upon their martyrdom as the highest point of greatness to which men should aspire. For, after all, they failed in achieving their ideal, and failure implies some fatal flaw in them."[2].

এবং উদ্ধৃত করা যাক ডক্টরজি হেডগেওয়ারের জীবনী-‘Patriotism is not only going to prison. It is not correct to be carried away by such superficial patriotism.
[3]

দেশের দুর্ভাগ্য, ভগৎ সিং-রাজগুরু-সুখদেব-বটুকেশ্বর-আসফাকউল্লা'র মত superficial patriot ডক্টরজির সংস্পর্শে আসেন নি।

Notes:
1.H.V. Pingle (ed.), Smritikan-Param Pujiye Dr Hedgewar Ke Jeewan Kee Vibhin Gahtnaon Ka Sankalan (a collection of memoirs of persons close to Hedgewar in Hindi) (Nagpur: RSS Prakashan Vibhag, 1962), pp. 47–48.
2.Golwalkar, Bunch of Thoughts, p. 283.
3.Bhishikar, Sangh-viraksh Ke Beej, p. 21.


Name:  amit          

IP Address : 213.0.3.2 (*)          Date:12 Dec 2017 -- 05:36 AM

সন্ত্রাসী বা বিপ্লবীদের মূল্যায়ন সব সময়েই নানা পক্ষের কাছে আলাদা হবে, সব দেশেই তাই । আজকে কাশ্মীর এ যারা পাথর ছুড়ছে, হয়তো ভারত সরকারের বা আমাদের অনেকের কাছে কাছে তারা সন্ত্রাসী, কিন্তু কে জানে 30-৫০ বছর পরে কাশ্মীর আলাদা দেশ হলে তারাই তাদের কাছে স্বাধীনতা সংগ্রামী হবে। মুক্তি যোদ্ধা রা পাকিস্তানের কাছে সন্ত্রাসী, কিন্তু বাংলাদেশ এ শহীদ। সে রকম ক্ষুদিরাম কে আমরা বিপ্লবী ভাবলেও তার ছোড়া বোমাতে দুজন নিরীহ মহিলা প্রাণ হারিয়েছিলেন। সুতরাং ব্রিটিশরা তাকে সন্ত্রাসী ভাবলে তাদের দিক থেকে তারাও একদম ঠিক।

এটা গান্ধী বা আরএসএস কে ডিফেন্ড করার জন্য লিখছিনা। কিন্তু সেই সময় সবাইকে ভগৎ সিং-রাজগুরু-সুখদেব- ক্ষুদিরাম সবার কাজ পছন্দ হতে হবে বা তাদের কে সমর্থন করে বিবৃতি দিতে হবে এটা হয়তো একটু এক পেশে চিন্তা ধারা। আর 1920-৩০ এ কারোর পক্ষে চিন্তা করা বোধহয় অবাস্তব ছিল যে ১৯৩৯ এ বিশ্বযুদ্ধ বাধবে, পুরো দুনিয়া ওলোট পালট হবে আর ১৯৪৭ এ ইন্ডিয়া স্বাধীন হবে দু টুকরো হয়ে । সবাই যার যার মতো রাজনৈতিক ঘুটি সাজাতে ব্যস্ত ছিলেন বা সশস্ত্র সন্ত্রাসের খেলার নেশায় মেতেছিলেন।

লেখা চলুক, খুব ভালো হচ্ছে।


Name:   Indranil Ghosh Dastidar           

IP Address : 160.129.133.218 (*)          Date:18 Mar 2018 -- 10:00 AM

১৯৩০ সালে গান্ধির নেতৃত্বে জাতীয় কংগ্রেস লবণ আইন অমান্য শুরু করে। ১২ই মার্চ ৭৯ জন সহযাত্রীকে নিয়ে গান্ধি সবরমতি আশ্রম থেকে আরব সাগর উপকূলে ডান্ডির দিকে পদযাত্রা শুরু করেন। তাঁরা ডান্ডি এসে পৌঁছন ৬ই এপ্রিল। সেদিন সকালের ভজন শেষে গান্ধি ও তাঁর অনুগামীরা সমুদ্রতীরে এসে জমায়েত হলেন। বেলাভূমি থেকে একমুঠো নুন তুলে নিয়ে গান্ধি ঘোষণা করলেন -এই একমুষ্টি লবণ উত্তোলনের সাথে সাথে ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিদায়ের সূচনা করা হল।

ভারতবর্ষে লবণ করের ইতিহাস অনেক পুরনো; মৌর্যযুগ থেকে এই কর চলে আসছে। কিন্তু ব্রিটিশ ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানি এসে লবণ করকে এক দুঃসহ জায়গায় নিয়ে যায়। পলাশীর যুদ্ধজয়ের দু'বছর পর থেকে ক্লাইভ কোম্পানির লবণ কর চালু করেন। কোম্পানির উচ্চপদস্থ কর্মচারীদের লবণ বিক্রির একচেটিয়া অধিকার দেওয়া হয়।খোদ ইংল্যান্ডে এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ শুরু হয়। এতটাই, যে ১৭৬৮ সালে কোম্পানি বাধ্য হয় "সল্ট মনোপলি" প্রত্যাহার করতে। কিন্তু ১৭৭২ সালে বড়লাট ওয়ারেন হেস্টিংস লবণব্যবসাকে আবার কোম্পানির দখলে নিয়ে আসেন। পশ্চিম উপকূলের কচ্ছের রণ ও পূর্ব উপকূলের ওড়িশা ছিল লবণ তৈরীর দুই কেন্দ্র। কিন্তু প্রায়শঃই কোম্পানির লাভের গুড় চোরাচালানকারী পিঁপড়ে এসে খেয়ে যেত। চোরাচালান বন্ধ করতে ১৮৪০ সাল নাগাদ বেঙ্গল প্রভিন্সের পশ্চিম সীমান্ত বরাবর এক লম্বা কাঁটাঝোপের বেড়া লাগানোর কাজ শুরু হয়। (কাঁটাঝোপের বেড়ার এই অদ্ভুত আইডিয়াটির জনক হলেন জাতীয় কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠাতা অ্যালান অক্টাভিয়ান হিউম।[1] হিউম ছিলেন তত্কালীন উত্তর-পশ্চিম প্রদেশের কাস্টমস কমিশনার; ফলতঃ তাঁকেই দেওয়া হয়েছিল ইনল্যান্ড কাস্টমস লাইনের প্রতিরক্ষার দায়িত্ব। যথেষ্ট পরিমাণ পাথরের অভাবে দেওয়াল বানানোর কাজ যখন পণ্ড হতে বসেছে, তখনই বটানিস্ট হিউমের মাথায় এই আইডিয়া আসে। তিনি লক্ষ করেছিলেন ঐ লাইনের জায়গায় জায়গায় আগে থেকেই একধরণের কাঁটা ঝোপের বাড়বাড়ন্ত।তাদেরই নানাভাবে বাড়িয়ে এই সবুজ দেওয়াল খাড়া করা হয়। ইতিহাসের এও এক পরিহাস যে তাঁরই অপর এক আইডিয়া ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস ভবিষ্যতে লবণ আইন ভাঙতে এক মরীয়া আন্দোলনের ডাক দেবে।)১৮৫৭-র মহাবিদ্রোহের পর এই কাঁটাঝোপের বেড়াকে বাড়িয়ে লম্বায় প্রায় ২৫০০ মাইলে গিয়ে দাঁড় করানো হয়। ভারতের এক বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে ("সিন্ধুনদ থেকে মাদ্রাজের মহানদী অবধি"[2]) গজানো ১২ ফিট উঁচু এই কাঁটাঝোপ পাহারা দিতেন ১২০০০ কর্মী। স্ট্রাচি ভ্রাতৃদ্বয়ের (প্রশাসক সার জন ও সার রিচার্ড) লেখা থেকে উদ্ধৃত করলাম - "... it consisted principally of an immense impenetrable hedge of thorny trees and bushes, supplemented by stone wall and ditches, across which no human being or beast of burden or vehicle could pass without being subject to detention or search" . (উৎসাহীরা রয় মক্সহ্যামের লেখা "The Great Hedge of India" পড়ে নিতে পারেন; প্রকাশক হার্পার কলিন্স। বাংলায় একটি উপন্যাস রয়েছে অনিরুদ্ধ দেবের লেখা- "হিম্মতরাম";প্রকাশক অনুষা।)

১৮৭৮ সালে ভারত জুড়ে ব্রিটিশ সরকার একটি অভিন্ন লবণ কর চালু করে। প্রত্যক্ষ ব্রিটিশ শাসনাধীন অঞ্চলগুলির সঙ্গে ভারতের করদ রাজ্যগুলিকেও এর আওতায় আনা হয়। ব্রিটিশ-শাসিত অঞ্চলে লবণের ব্যবসায় সরকারের একচেটিয়া অধিকার আগে থেকেই ছিল। অন্য কেউ লবণ তৈরী বা বিক্রি করলে জরিমানা ও ৬ মাস অবধি জেলের বিধান ছিল। এবার করদ রাজ্যগুলিতেও এই আইন লাগু হয়। ভারতে তৈরী লবণের উপর চড়া হারে কর চাপানোয় ভারতীয় লবণের দাম বেড়ে প্রায় তিনগুণ হয়ে যায় ; গরীবের পক্ষে নুন কিনে খাওয়া একরকম দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে। সরকার সস্তা দরের চেশায়ার লবণ ভারতে আমদানী ও ভারতীয় লবণ বিদেশে রপ্তানি শুরু করে। কিন্তু চেশায়ার নুন ছিল ভারতীয় নুনের তুলনায় অনেক নিম্নমানের। নুনের অভাবে অজস্র গরীব ও প্রান্তিক ভারতীয়র শরীরে লবণ ও আয়োডিনের স্বল্পতাজনিত রোগ দেখা দিতে থাকে। ভারতে এই লবণকরের বিরুদ্ধে নানা সময় বিক্ষিপ্তভাবে নানা প্রতিবাদ উঠতে থাকে। কিন্তু প্রয়োজন ছিল এইসব বিক্ষিপ্ত প্রতিবাদগুলিকে এক সঙ্ঘবদ্ধ রূপ দেওয়ার। গান্ধি সেটাই করেন।

লবণ আইন অমান্য আন্দোলনে অভুতপূর্ব সাড়া পড়ে; সম্ভবতঃ তা দেশের গরীব-গুর্বো মানুষের হৃদয়কে ছুঁয়ে গিয়েছিল বলে। গান্ধি এমনকি এও ঘোষণা করেন, আন্দোলন হিংসাত্মক হয়ে উঠলেও (যেমনটা ঘটেছিলে চৌরিচৌরায়), তিনি এবার আর তা প্রত্যাহার করবেন না[3]। দেশের ৫০০০ মাইল ব্যাপী সমুদ্রতট জুড়ে হাজার হাজার মানুষ লবণ সত্যাগ্রহে যোগ দেন। সরকার গান্ধী-নেহরু সমেত কংগ্রেসের প্রথম সারির নেতাদের গ্রেপ্তার করে। প্রায় ২৫০০০ কংগ্রেস নেতা ও কর্মী গ্রেপ্তার হ'ন। এর প্রতিবাদে বম্বে শহরে এক লাখ মানুষের জমায়েত হয়। সরোজিনী নাইডুর ওপর ভার পড়ে আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার। লবণ সত্যাগ্রহের খবর বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে উল্লেখযোগ্য মার্কিন সাংবাদিক ওয়েব মিলারের অবদান; তিনি এই আন্দোলনের প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ আমেরিকা তথা বিশ্বে ছড়িয়ে দিতে থাকেন। ব্রিটিশ পুলিশ-প্রশাসনের চোখে ধুলো দিয়ে মিলার বম্বেতে সরোজিনী নাইডু ও গান্ধিপুত্র মণিলালের নেতৃত্বে লবণ আইন অমান্যকারীদের আন্দোলন সামনে থেকে দেখেছিলেন। সাদা খদ্দরের পোষাক -পরিহিত প্রায় ২৫০০ সত্যাগ্রহী পুলিশের বাধা আমান্য করে সমুদ্রতটের দিকে এগিয়ে যেতে থাকলে পুলিশ লাঠিচার্জ শুরু করে। "Not one of the marchers even raised an arm to fend off the blow"- মিলার লিখছেন।শ'য়ে শ'য়ে আহত শরীরের স্তূপ জমা হতে থাকে; ভাঙা হাড়, ছিন্ন মাংসপেশী, রক্তে ভেজা খদ্দরের পোষাক। কিন্তু একজন সত্যাগ্রহীও পাল্টা মার দেওয়ার চেষ্টা করেন নি। সেই অপরাহ্ণে মিলারের হিসেব মত ৩২০ জন আহত হন; দু'জন মারা যান।

সে বছরের শেষের দিকে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী র‌্যামসে ম্যাকডোনাল্ড ভারতের ভবিষ্যত রাজনৈতিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করবার জন্য লন্ডনে প্রথম গোল টেবিল বৈঠকের ডাক দেন। ভারতের বিভিন্ন জাতি-ধর্ম-সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের আহ্বান করা হয় এই বৈঠকে। জাতীয় কংগ্রেস অবশ্য এই বৈঠক বয়কট করে।

১২ই নভেম্বর রাশি রাশি প্রতিনিধির উপস্থিতিতে প্রভূত উদ্দীপনার মধ্যে প্রথম গোল টেবিল বৈঠক শুরু হয়।ম্যাকডোনাল্ড অবশ্য শিগগিরই হতাশ হবেন। ১৮ই ডিসেম্বর তাঁর ডায়েরির এন্ট্রিতে তিনি লেখেন-" Hindu-Moslem not coming together. They have no mutual confidence & Hindu too nimble for Mosl: brethern."[4]

নোটঃ
1.https://inews.co.uk/opinion/britain-built-wall-great-hedge-india.
2.Strachey and Strachey: The Finances and Public Works of India (1882), p. 219-20.
3. Nehru, An Autobiography, p85.
4.MacDonald's diary , 18 December 1930. Cited in Marquand, Ramsay Macdonald, p.581.




Name:   Indranil Ghosh Dastidar           

IP Address : 160.129.133.218 (*)          Date:18 Mar 2018 -- 10:18 PM

1931 er jaanuyaari maase gaandhi-neharu sah ka`mgres netaader jel theke mukti deoyaa hay. shaantisthaapaner uddeshye barhalaaT larD aarauin gaandhike bhaaisaray-pyaalese aalochanaay aamantraN jaanaan. gaandhi sekhaane nijer byabahaarer janya nijer toiree nun niye Jaan; aarauin taa dekheo naa-dekhaar bhaan karen. Jadio lanDane chaarchil ei ghaTanaa niye prachur shoragol tolen; ek "ardhanagna siDishaas phakir" bhaaisaray praasaader si`nrhi beye uThachhe - e dRishyake chaarchil "bibamishhaa-udrekakaaree" bale barNanaa karen. aaraiun abashya chaarchilake paattaa den ni.

15i phebruyaari theke 5i maarch abadhi aalochanaara par gaandhi-aarauin chukti swaaxarit hay.Thik hay ka`mgres taader ahi`msa satyaagraha aandolan o briTish paNyabarjan pratyaahaar karabe eba`m dwiteey golaTebil boiThake pratinidhi paaThaabe. paribarte sarakaar raajanoitik bandeeder mukti debe, "swadeshee" aandolane baadhaa debe naa eba`m upakoolabartee bhaarateeyader opar theke labaN toireer nishhedhaaj`Naa pratyaahaar karabe. neharu abashya ei chuktike bishwaasaghaatakataa mane karechhilen. upakool a`Nchale labaN toiree anumodit haleo bikrir opar nishhedhaaj`Naa bahaal rail; satyaagraheeder opar pulishi atyaachaarer kono tadante sarakaar sammat hala naa. kRishhakader opare chaapaano charhaa khaajanaa pratyaahRit hala naa. Dominiyan sTyaaTaas niyeo kono uchchabaachya karaa hal naa.

k`mgreser ekamaatra pratinidhi hisebe gaandhi lanDan pou`nchhalen.chaarli chyaapalin takhan laNDane chhilen.gaandhir sa`Mge taa`nr saaxaa`t hay. chyaapalin jaanaan , tini bhaarater swaadheenataa aandolaner prati sahaanubhutisheel; sei saaxaate gaandhi aadhunik Jantrasabhyataar prati taa`nr biraag prakaash karen. er paa`ncha bachhar baade chyaapalin "marDaan Taaimas" toiree karaben. gaandhir sa`Mge saaxaater kono prabhaab taa`nr ei chalachchitra toirir opare parhechhil kinaa, taa abashya balaa kaThin.

baaki`mhaam pyaalese abashya gaandhir kapaale teman samaadar joTe ni.. raajaa pa`Ncham jarja deshajorhaa ashaantir janya gaandhike abhiJukt karen. aswastikar boiThakasheshhe gaandhi Jakhan beriye aasachhen, takhano raajaa balate chhaarhen ni-"Remember Mr. Gandhi, I won't have any attacks on my empire." গান্ধি সবিনয়ে উত্তর দেন-" I must not be drawn into political argument in Your Majesty's Palace after receiving Your Majesty's hospitality."[1]

বৈঠক থেকে কংগ্রেসের খুব একটা কিছু পাওয়ার আশা ছিল না। শুরু থেকেই গান্ধিকে অন্যান্য প্রতিনিধিদের বিরোধিতার মুখে পড়তে হয়। বাকি প্রতিনিধিদের প্রবল বিরুদ্ধতার মধ্যে গান্ধি দাবী করেন জাতীয় কংগ্রেসই ভারতের একমাত্র প্রতিনিধিত্বকারী দল। এই বৈঠকে গান্ধি ও আম্বেদকরের মধ্যে মতপার্থক্য প্রকটভাবে দেখা দেয়। প্রথম গোল টেবিল বৈঠকের সময় থেকেই আম্বেদকর দলিত ও অস্পৃশ্যদের জন্য পৃথক ইলেকটোরেটের দাবী করে আসছিলেন। গান্ধি এই দাবীর প্রবল বিরোধিতা করেন। তিনি বলেন, দলিতরা হিন্দুধর্মেরই অংশ; তাঁরা কোনোভাবেই সংখ্যালঘু নন।

ব্যর্থ বৈঠক শেষে শূন্যহাতে ফিরে এলেন গান্ধি। দেশেও তাঁর জন্য অপেক্ষা করছিল বিরোধিতা। বম্বে পৌঁছে তাঁকে শ'দুয়েক দলিত বিক্ষোভকারীর কালো পতাকার সামনে পড়তে হয়।[2]

এর কয়েক মাস পর ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী র‌্যামসে ম্যাকডোনাল্ড ভারতবর্ষের জন্য কমিউনাল অ্যাওয়ার্ড ঘোষণা করলেন। উচ্চবর্ণ হিন্দু, তপশিলী উপজাতি, দলিত, হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, শিখ, ভারতীয় খ্রীস্টান, ইউরোপীয়, অ্যাংলো-ইণ্ডিয়ান প্রভৃতি গোষ্ঠীর জন্য পৃথক ইলেকটোরেটের ব্যবস্থা করা হয়। আম্বেদকর একে স্বাগত জানান। কিন্তু দলিত ও অস্পৃশ্যদের জন্য পৃথক ইলেকটোরেটের তীব্র বিরোধিতা করেন গান্ধি। পুনার ইয়েরওয়াদা জেলে তিনি আমরণ অনশন শুরু করেন। সেখান থেকে তিনি সেক্রেটারি অফ স্টেট ফর ইণ্ডিয়া সার স্যামুয়েল হোরকে লেখেন-" For me religion is one in essence, but it has many branches and if I, the Hindu branch, fail in my duty to the parent trunk, I am an unworthy follower of that one indivisible, visible religion…. My nationalism and my religion are not exclusive, but inclusive and they must be so consistently with the welfare of life.[3]"


অনশনরত গান্ধির স্বাস্থ্য যত খারাপ হতে থাকে, আম্বেদকরের ওপর চাপ ততই বাড়তে থাকে। অনশনে গান্ধির মৃত্যু হলে সারা দেশজুড়ে দলিতদের ওপর আক্রমণ নেমে আসতে পারে, এই আশঙ্কায় তিনি সমঝোতায় রাজী হন। কারাগারে তাঁর সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা শেষে গান্ধি একটি আপোষপ্রস্তাবে সম্মতি দেন। এই পুনা-চুক্তি অনুযায়ী আম্বেদকর দলিতদের জন্য পৃথক ইলেকটোরেটের দাবী থেকে সরে আসেন; একটিই অভিন্ন হিন্দু ইলেকটোরেটের ব্যবস্থা হয়, তবে তার মধ্যে দলিতদের জন্য আসন সংরক্ষণের বন্দোবস্ত হয়। বেশ কিছুকাল পরে আম্বেদকর লিখবেন-"..The Fast was not for the benefit of the Untouchables. It was against them and was the worst form of coercion against a helpless people to give up the constitutional safeguards [which had been awarded to them]."

ম্যাকডোনাল্ডের এই কমিউন্যাল অ্যাওয়ার্ড ভারতের দুই প্রান্তের দুটি প্রদেশ- বাংলা ও পাঞ্জাবের রাজনীতিতে মেরুকরণের প্রক্রিয়াটি ত্বরাণ্বিত করে, যার অনিবার্য ফল হিসেবে আরো ১৫ বছর পরে ভারতের স্বাধীনতার লগ্নে এই দুটি প্রদেশ দু-টুকরো হয়ে যাবে। জাতীয় রাজনীতির মূলস্রোত থেকে কিছুসময়ের জন্য সরে এসে এই দুই প্রদেশের রাজনীতির চেহারা এবার একটু দেখে নেওয়া যেতে পারে।

নোটঃ
1.Kenneth Rose, King George V, p. 353.
2.Malcom Muggeridge:The Thirties in Great Britain, p.75.
3. https://www.thequint.com/news/politics/fast-unto-vote-gandhi-ambedkar-
and-separate-electorates-for-dalits






Name:   Indranil Ghosh Dastidar           

IP Address : 160.129.133.218 (*)          Date:18 Mar 2018 -- 10:19 PM

এঃ, গোলমাল হয়ে গেছে। ঠিক করছি।


Name:   Indranil Ghosh Dastidar           

IP Address : 160.129.133.218 (*)          Date:18 Mar 2018 -- 10:22 PM

১৯৩১ এর জানুয়ারি মাসে গান্ধি-নেহরু সহ কংগ্রেস নেতাদের জেল থেকে মুক্তি দেওয়া হয়। শান্তিস্থাপনের উদ্দেশ্যে বড়লাট লর্ড আরউইন গান্ধিকে ভাইসরয়-প্যালেসে আলোচনায় আমন্ত্রণ জানান। গান্ধি সেখানে নিজের ব্যবহারের জন্য নিজের তৈরী নুন নিয়ে যান; আরউইন তা দেখেও না-দেখার ভান করেন। যদিও লন্ডনে চার্চিল এই ঘটনা নিয়ে প্রচুর শোরগোল তোলেন; এক "অর্ধনগ্ন সিডিশাস ফকির" ভাইসরয় প্রাসাদের সিঁড়ি বেয়ে উঠছে - এ দৃশ্যকে চার্চিল "বিবমিষা-উদ্রেককারী" বলে বর্ণনা করেন। আরইউন অবশ্য চার্চিলকে পাত্তা দেন নি।

১৫ই ফেব্রুয়ারি থেকে ৫ই মার্চ অবধি আলোচনার পর গান্ধি-আরউইন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।ঠিক হয় কংগ্রেস তাদের অহিংস সত্যাগ্রহ আন্দোলন ও ব্রিটিশ পণ্যবর্জন প্রত্যাহার করবে এবং দ্বিতীয় গোলটেবিল বৈঠকে প্রতিনিধি পাঠাবে। পরিবর্তে সরকার রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তি দেবে, "স্বদেশী" আন্দোলনে বাধা দেবে না এবং উপকূলবর্তী ভারতীয়দের ওপর থেকে লবণ তৈরীর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করবে। নেহরু অবশ্য এই চুক্তিকে বিশ্বাসঘাতকতা মনে করেছিলেন। উপকূল অঞ্চলে লবণ তৈরী অনুমোদিত হলেও বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা বহাল রইল; সত্যাগ্রহীদের ওপর পুলিশি অত্যাচারের কোনো তদন্তে সরকার সম্মত হল না। কৃষকদের ওপরে চাপানো চড়া খাজনা প্রত্যাহৃত হল না। ডোমিনিয়ন স্ট্যাটাস নিয়েও কোনো উচ্চবাচ্য করা হল না।

কংগ্রেসের একমাত্র প্রতিনিধি হিসেবে গান্ধি লন্ডন পৌঁছলেন।চার্লি চ্যাপলিন তখন লণ্ডনে ছিলেন।গান্ধির সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়। চ্যাপলিন জানান , তিনি ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রতি সহানুভুতিশীল; সেই সাক্ষাতে গান্ধি আধুনিক যন্ত্রসভ্যতার প্রতি তাঁর বিরাগ প্রকাশ করেন। এর পাঁচ বছর বাদে চ্যাপলিন "মর্ডান টাইমস" তৈরী করবেন। গান্ধির সঙ্গে সাক্ষাতের কোনো প্রভাব তাঁর এই চলচ্চিত্র তৈরির ওপরে পড়েছিল কিনা, তা অবশ্য বলা কঠিন।

বাকিংহাম প্যালেসে অবশ্য গান্ধির কপালে তেমন সমাদর জোটে নি।। রাজা পঞ্চম জর্জ দেশজোড়া অশান্তির জন্য গান্ধিকে অভিযুক্ত করেন। অস্বস্তিকর বৈঠকশেষে গান্ধি যখন বেরিয়ে আসছেন, তখনো রাজা বলতে ছাড়েন নি-"Remember Mr. Gandhi, I won't have any attacks on my empire." গান্ধি সবিনয়ে উত্তর দেন-" I must not be drawn into political argument in Your Majesty's Palace after receiving Your Majesty's hospitality."[1]

বৈঠক থেকে কংগ্রেসের খুব একটা কিছু পাওয়ার আশা ছিল না। শুরু থেকেই গান্ধিকে অন্যান্য প্রতিনিধিদের বিরোধিতার মুখে পড়তে হয়। বাকি প্রতিনিধিদের প্রবল বিরুদ্ধতার মধ্যে গান্ধি দাবী করেন জাতীয় কংগ্রেসই ভারতের একমাত্র প্রতিনিধিত্বকারী দল। এই বৈঠকে গান্ধি ও আম্বেদকরের মধ্যে মতপার্থক্য প্রকটভাবে দেখা দেয়। প্রথম গোল টেবিল বৈঠকের সময় থেকেই আম্বেদকর দলিত ও অস্পৃশ্যদের জন্য পৃথক ইলেকটোরেটের দাবী করে আসছিলেন। গান্ধি এই দাবীর প্রবল বিরোধিতা করেন। তিনি বলেন, দলিতরা হিন্দুধর্মেরই অংশ; তাঁরা কোনোভাবেই সংখ্যালঘু নন।

ব্যর্থ বৈঠক শেষে শূন্যহাতে ফিরে এলেন গান্ধি। দেশেও তাঁর জন্য অপেক্ষা করছিল বিরোধিতা। বম্বে পৌঁছে তাঁকে শ'দুয়েক দলিত বিক্ষোভকারীর কালো পতাকার সামনে পড়তে হয়।[2]

এর কয়েক মাস পর ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী র‌্যামসে ম্যাকডোনাল্ড ভারতবর্ষের জন্য কমিউনাল অ্যাওয়ার্ড ঘোষণা করলেন। উচ্চবর্ণ হিন্দু, তপশিলী উপজাতি, দলিত, হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, শিখ, ভারতীয় খ্রীস্টান, ইউরোপীয়, অ্যাংলো-ইণ্ডিয়ান প্রভৃতি গোষ্ঠীর জন্য পৃথক ইলেকটোরেটের ব্যবস্থা করা হয়। আম্বেদকর একে স্বাগত জানান। কিন্তু দলিত ও অস্পৃশ্যদের জন্য পৃথক ইলেকটোরেটের তীব্র বিরোধিতা করেন গান্ধি। পুনার ইয়েরওয়াদা জেলে তিনি আমরণ অনশন শুরু করেন। সেখান থেকে তিনি সেক্রেটারি অফ স্টেট ফর ইণ্ডিয়া সার স্যামুয়েল হোরকে লেখেন-" For me religion is one in essence, but it has many branches and if I, the Hindu branch, fail in my duty to the parent trunk, I am an unworthy follower of that one indivisible, visible religion…. My nationalism and my religion are not exclusive, but inclusive and they must be so consistently with the welfare of life.[3]"


অনশনরত গান্ধির স্বাস্থ্য যত খারাপ হতে থাকে, আম্বেদকরের ওপর চাপ ততই বাড়তে থাকে। অনশনে গান্ধির মৃত্যু হলে সারা দেশজুড়ে দলিতদের ওপর আক্রমণ নেমে আসতে পারে, এই আশঙ্কায় তিনি সমঝোতায় রাজী হন। কারাগারে তাঁর সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা শেষে গান্ধি একটি আপোষপ্রস্তাবে সম্মতি দেন। এই পুনা-চুক্তি অনুযায়ী আম্বেদকর দলিতদের জন্য পৃথক ইলেকটোরেটের দাবী থেকে সরে আসেন; একটিই অভিন্ন হিন্দু ইলেকটোরেটের ব্যবস্থা হয়, তবে তার মধ্যে দলিতদের জন্য আসন সংরক্ষণের বন্দোবস্ত হয়। বেশ কিছুকাল পরে আম্বেদকর লিখবেন-"..The Fast was not for the benefit of the Untouchables. It was against them and was the worst form of coercion against a helpless people to give up the constitutional safeguards [which had been awarded to them]."

ম্যাকডোনাল্ডের এই কমিউন্যাল অ্যাওয়ার্ড ভারতের দুই প্রান্তের দুটি প্রদেশ- বাংলা ও পাঞ্জাবের রাজনীতিতে মেরুকরণের প্রক্রিয়াটি ত্বরাণ্বিত করে, যার অনিবার্য ফল হিসেবে আরো ১৫ বছর পরে ভারতের স্বাধীনতার লগ্নে এই দুটি প্রদেশ দু-টুকরো হয়ে যাবে। জাতীয় রাজনীতির মূলস্রোত থেকে কিছুসময়ের জন্য সরে এসে এই দুই প্রদেশের রাজনীতির চেহারা এবার একটু দেখে নেওয়া যেতে পারে।

নোটঃ
1.Kenneth Rose, King George V, p. 353.
2.Malcom Muggeridge:The Thirties in Great Britain, p.75.
3. https://www.thequint.com/news/politics/fast-unto-vote-gandhi-ambedkar-
and-separate-electorates-for-dalits


Name:   সিকি           

IP Address : 233.185.219.154 (*)          Date:19 Mar 2018 -- 07:05 AM

বাঃ, অনেকদিন পর।

পড়ছি।


Name:  dd          

IP Address : 59.205.217.195 (*)          Date:19 Mar 2018 -- 09:09 AM

আচ্ছা, আবার লিখতে শুরু করেছেন দেখছি। যদিও ঈকটুখানি মাত্র।

ভালো ভালো।


Name:  গবু          

IP Address : 57.15.60.227 (*)          Date:19 Mar 2018 -- 10:37 AM

পড়ছি। অনেক ডিটেল জানছি, ধন্যবাদ


Name:  I          

IP Address : 160.129.133.218 (*)          Date:25 Mar 2018 -- 01:48 AM

ভাবলে আশ্চর্য লাগে যে, ১৯০৫ সালের প্রথম বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী আন্দোলনের বর্শামুখ যাঁরা ছিলেন, সেই হিন্দু বাঙালী "ভদ্রলোক" শ্রেণী তার ৪২ বছর পরে দ্বিতীয় বঙ্গভঙ্গের মুখে দাঁড়িয়ে কিভাবে আগের অবস্থান থেকে ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে গিয়েছিলেন। বিরোধিতা তো দূরের কথা, তাঁরা প্রবলভাবে( কিছু ব্যতিক্রম বাদ দিলে) ধর্মের ভিত্তিতে বাংলাভাগের দাবীতে সোচ্চার হয়ে ওঠেন। এভাবেই বৃত্তটি সম্পূর্ণ হয়, ১৯০৫ সালের জাতীয়তাবাদী আন্দোলন ১৯৪৭ সালে এসে পরিণত হয় একটি প্রাদেশিক, জাতীয়তাবিরোধী, সাম্প্রদায়িক আন্দোলনে। গবেষক জয়া চ্যাটার্জী তাঁর "Bengal Divided: Hindu Communalism and Partition, 1932-1947" বইটিতে হিন্দু "ভদ্রলোক" বাঙালীর এই উলটপুরাণের খুঁটিনাটি বর্ণনা দিয়েছেন। যদিও এ কথা বলার অর্থ এই নয় যে বাঙালী মুসলমান সম্প্রদায় দেশভাগ ও তজ্জনিত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাহাঙ্গামায় সম্পূর্ণ নির্দোষ ও অসহায় প্রতিপক্ষের ভূমিকা পালন করেছিলেন।

আগেও বলা হয়েছে, ভারতীয় জাতীয়তাবাদী আন্দোলন ও সাম্প্রদায়িকতার মধ্যেকার সম্পর্ক চিরকালই বেশ জটিল থেকে গিয়েছে; কখনো তা বিরোধী, কখনো একে অন্যের পরিপূরক। কিন্তু একটা কথা সম্ভবতঃ নির্দ্বিধায় বলে ফেলা যায়, ভারতীয় জাতীয়তাবাদ কখনোই সাম্প্রদায়িকতার "অপর" হিসেবে নির্মিত হয় নি।[1] জাতীয়তাবাদের সেকুলার আদর্শ হল "সর্বধর্মসম্ভব" [2] ; কিন্তু জাতীয়তাবাদী নেতাদের অধিকাংশই জাতীয় আন্দোলনকে ধর্মীয় অনুষঙ্গে ভাবতে অভ্যস্ত ছিলেন এবং ভারতীয়ত্বকে তাঁরা হিন্দুত্বের সঙ্গে এক করে দেখতেন, সচেতনে অথবা অবচেতনে। বাংলার ক্ষেত্রে কথাটি আরো বেশী সত্যি। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, অরবিন্দ ঘোষ বা স্বামী বিবেকানন্দ'র লেখালিখি, চরমপন্থী বিপ্লবী আন্দোলনের হিন্দু রিচ্যুয়ালসমূহের কথা মনে করুন।[3]

অবশ্য এ কথা খুব সত্যি, জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের এই মূল ধারা যদি সেকুলার না-ও হয়, তবুও তা সর্বার্থে সাম্প্রদায়িক কখনোই ছিল না। অন্য সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ জাগিয়ে তোলা এই আন্দোলনের সচেতন লক্ষ ছিল না; নেতারা ধর্মকে ব্যবহার করেছিলেন সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আন্দোলনকে তীব্র করতে, ধর্মীয় হানাহানির উদ্দেশ্যে নয়। উল্টোদিকে সাম্প্রদায়িক দলগুলির উদ্দেশ্যই ছিল ধর্মীয় বিভেদের জিগির তুলে রাজনৈতিক মাইলেজ যোগাড় করা। এই জায়গায় তারা শাসক ইংরেজের মতই বিশ্বাস করত -ভারত একটি নানান বিরুদ্ধ-মতাবলম্বী সম্প্রদায়ের সমাহার, যাদের মধ্যে কোনোদিনই মিলন সম্ভব নয়। ব্রিটিশ এই ভাবধারায় পুষ্ট এই দলগুলি স্বভাবতঃ কোনোকালেই উগ্র ব্রিটিশ-বিরোধিতার অবস্থানে যায় নি, তা সে হিন্দু মহাসভাই হোক কি মুসলিম লিগ। পরিবর্তে ব্রিটিশ সরকারও নিজের সুবিধামত তার স্নেহহাত বরাবরই এই দলগুলির মাথায় রেখেছে ( যেমন জাতীয় রাজনীতিতে মুসলিম লিগকে তার প্রাপ্যের তুলনায় বেশী মর্যাদা দেওয়া, অবিভক্ত বঙ্গে কংগ্রেস অথবা কৃষক প্রজা পার্টি'র বদলে হিন্দু মহাসভা অথবা মুসলিম লিগের সঙ্গে আলোচনায় অধিকতর আগ্রহ প্রকাশ)।

বাঙালী হিন্দু "ভদ্রলোক" শ্রেণী বলতে কী বোঝায়, সে বিষয়ে নানা ইতিহাসবিদ ও সমাজতাত্বিক নানা মত পোষণ করেছেন; সম্ভবতঃ কেউই একমত হতে পারেন নি। তবে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের উপজাত এই ভদ্রলোক শ্রেণীর সম্পদের আসল উৎস ছিল জমি, সে বিষয়ে কেউ দ্বিমত নন। এবং জমিজমার পরিমাণের হিসেব ধরলে ভদ্রলোক শ্রেণীর সর্বোচ্চ অংশ জমিদার থেকে সর্বনিম্ন অংশ তালুকদার অবধি বিভিন্ন স্তরে এঁদের আয়ের পার্থক্য ছিল অনেক। কিন্তু মিল ছিল এক জায়গায়-জমির খাজনা ছিল এঁদের সকলেরি মূল আয়ের উৎস। আয়ের জন্য এঁরা সাধারণতঃ শিল্প-বাণিজ্যের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন না; বরং ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রতি এঁরা কিছুটা বিরূপ মনোভাবই পোষণ করতেন। ভদ্রলোকদের একটি অংশ ইংরেজী শিক্ষা ও সভ্যতাকে সাগ্রহে বরণ করে নিয়েছিলেন, যেমন করে একদা তাঁদের পুর্বপুরুষেরা মুঘ্ল ও নবাবী জমানায় ফারসি শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে প্রশাসনিক পদে নাম লিখিয়েছিলেন। অপর একটি অংশ অবশ্য ইংরেজী শিক্ষাকে বেশ বাঁকা চোখে দেখতেন, যদিও কালের ফেরে তাঁদের সে প্রতিরোধ টেঁকে নি। "বাবু" শব্দটি বঙ্কিমী গদ্যে নানাবিধ অর্থ নিয়ে উপস্থিত হলেও উনিশ শতকে বাবু বলতে জমিজমার মালিক হিন্দু উচ্চবর্ণ(অধিকাংশ ক্ষেত্রে), ইংরেজী-শিক্ষিত, ইংরেজ-ঘেঁষা মানুষজনকেই বোঝাতো।[4]

১৮৮৫ সালের বেঙ্গল টেন্যান্সি অ্যাক্টের দৌলতে জমিদারী থেকে প্রাপ্ত খাজনার পরিমাণ যথেষ্ট কমে আসে; খাজনা আদায় করাও দুষ্কর হয়ে ওঠে। জমিমালিকেরা আয় বজায় রাখতে আরো বেশী করে ইংরেজীশিক্ষাকে আঁকড়ে ধরেন। রাজা রামমোহন রায় যতই Practical training ও "Useful science"-এর কথা বলুন না কেন, মেহনতে অনভ্যস্ত বাবু সম্প্রদায়ের ছাত্রদের মধ্যে সাহিত্য ও হিউম্যানিটিজ-এর কদর ছিল সবচেয়ে বেশী। পেশাদারী শিক্ষার মধ্যে শুধু চিকিৎসাবিদ্যা ও আইনের প্রতি তাঁদের আগ্রহ ছিল; কিন্তু উভয় পেশাতেই আর্থিক সচ্ছলতা লাভ এখনকার মতই তখনো ছিল সময়্সাপেক্ষ ব্যাপার। কেবলমাত্র বিত্তশালী পরিবারের পক্ষেই সম্ভব হত দীর্ঘকাল ধরে ডাক্তারী ও আইনের ছাত্রদের আর্থিক সহায়তা যুগিয়ে যাওয়া। স্বভাবতঃই এইসব পেশাতে উচ্চবিত্ত হিন্দুরাই টিকে থাকতে পারতেন। এইভাবে জমিদারী প্রথার অস্তাচলের কালেও ইংরেজী শিক্ষার হাত ধরে হিন্দু ভদ্রলোক সম্প্রদায় সমাজে তাঁদের প্রাধান্য ধরে রাখতে সক্ষম হবেন। বঙ্গীয় রেনেসাঁসের উত্তরাধিকারী হিসেবে এঁরা প্রগতি ও আধুনিকতার মশাল-বাহক হিসেবে নিজেদের চিনতে শিখবেন ও সেই সুবাদে বাঙ্গালী সমাজে নিজেদের পুরনো প্রাধান্য বজায় রাখতে অভ্যস্ত হয়ে উঠবেন।

আলোকপ্রাপ্ত আধুনিক "শিক্ষিত সম্প্রদায়" বা "শিক্ষিত মধ্যবিত্ত" এই বহিরঙ্গের ভেতরে যদিও থেকে যাবে গ্রামীণ Landed Elite-এর মর্যাদা, জাতিভেদ প্রথার উচ্চতর ধাপে অবস্থানের সুবিধা,ঔপনিবেশিক ব্যবস্থায় কর্তৃত্বের সুযোগ- ইত্যকার নানাবিধ দ্বন্দ্ব। হিন্দু ভদ্রলোকদের প্রতিষ্ঠিত শুরুর দিককার রাজনৈতিক সংগঠনগুলির একটি ছিল "Landholder's Society"। দুধ ও তামাক কোনোটাই না ছাড়ার এই ভদ্রলোকীয় প্রবৃত্তির প্রতিফলন পড়বে তার রাজনীতিতেও। ঠিক যেমন ভদ্রলোকের এক পা ছিল শহরের "বাসা"য় ও অন্য পা গ্রামের "বাড়ি"তে, তেমনি তার রাজনীতির রেটোরিক কলকাতা-কেন্দ্রিক ও নাগরিক হলেও জমিদারী ও খাজনা-আদায় সংক্রান্ত ইস্যুতে তার দায়বদ্ধতা ছিল দর্শনীয়। এই টানাপোড়েনের ধারাবাহিকতায় পাশ্চাত্য শিক্ষা-সভ্যতা ও আধুনিকতার ঝলমলে আলোর পেছনে অলক্ষে গজিয়ে উঠবে হিন্দু পুনর্জাগরণবাদী আদর্শের খড়-কাঠামো।[5] কেম্ব্রিজ-শিক্ষিত অরবিন্দ ঘোষ প্রচার করবেন "রাজনৈতিক বেদান্ত", ব্রাহ্ম বিপিন চন্দ্র পাল ও সরলা দেবী স্বাধীনতা-আন্দোলনে অন্তর্ভুক্ত করবেন কালীপূজা ও শিবাজি-উৎসবকে।[6] সশস্ত্র বিপ্লবী সমিতিগুলির ভেতরে কাজ করে চলবে শাক্ত দর্শন।[7].

নোটঃ
1. Gyanendra Pandey, The Construction of Communalism in Colonial North India, New Delhi, 1990, pp. 2, 241.

2. Prakash Chandra Upadhyaya, 'The Politics of Indian Secularism', Modern Asian Studies, vol. 26,4, 1992, pp. 815-853.

3. Partha Chatterjee, 'Transferring a Political Theory: Early Nationalist Thought in India',Economic and Political Weekly, vol. 21, 3, 18 January 1986; Barbara Southard, 'The Political Strategy of Aurobindo Ghosh'; Swami Vivekananda (edited by Eknath Ranade), Utthishtat! Jagrat! Hindu Rashtra ha Amar Sandesh, ('Arise! Awaken! The Immortal
Message of the Hindu Nation'), Lucknow, 1972.

4. S. N. Mukherjee notes that the word 'babu', of Persian origin, was 'always used as a term
of respect for Bengali Hindus of the higher orders'. 'Bhadralok in Bengali Language and
Literature. An Essay on the Language of Caste and Status', Bengal Past and Present, vol.
181, 1976, p. 233.

5.Tapan Raychaudhuri, Europe Reconsidered. Perceptions of the West in Nineteenth Century Bengal, New Delhi, 1988, pp. 8-9.

6.Barbara Southard, 'The Political Strategy of Aurobindo Ghosh', p. 366; Sumit Sarkar,
The Swadeshi Movement, pp. 304-305.

7.Rajat Kanta Ray, Social Conflict and Political Unrest in Bengal, p. 177.




Name:  I          

IP Address : 160.129.133.218 (*)          Date:25 Mar 2018 -- 11:51 PM


বিশ শতকের শুরুতে গোটা বাংলার হিসেব ধরলে মুসলিমরা ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ (হিন্দুদের তুলনায় সামান্যই বেশী, কিন্তু তাও সংখ্যাগরিষ্ঠ); পূর্ববাংলায় অবশ্য তাদের সংখ্যা ছিল অনেকই বেশী। সংখ্যার হিসেবে পিছিয়ে থাকলেও হিন্দু ভদ্রলোক তার "কালচারাল" তথা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রাধান্য বজায় রেখেছিল। মন্টেগু-চেমসফোর্ড রিফর্মের ডায়ার্কি বন্দোবস্ত তাতে কিছুটা ধাক্কা মারলেও অবস্থা বিশেষ একটা পাল্টায় নি। বেঙ্গল কাউন্সিলে তখনো মুসলিমদের তুলনায় হিন্দুদের পরিষ্কার সংখ্যাধিক্য (৩৯ বনাম ৪৬)।[1] কিন্তু ম্যাকডোনাল্ডের কমিউন্যাল অ্যাওয়ার্ড এসে পাশার দান সম্পূর্ণই উল্টে দিল। এর পরপরই গান্ধি-আম্বেদকরের পুনা চুক্তি বর্ণহিন্দুদের রাজনৈতিক আকাঙ্খার গোড়ায় ছাই ঢেলে দেয়। এত কিছুর পরেও হিন্দু ভদ্রলোক বাঙ্গালী হয়তো চালিয়ে নিতে পারতো, কিন্তু ১৯৩০-এর মহামন্দা তাদের অবস্থা খারাপ করে দেয়। কৃষিপণ্যের দাম ও গ্রামীণ সুদ হঠাৎই চড়চড় করে নেমে আসে। খাজনা ও পাওনা আদায় করা বেশ কঠিন হয়ে পড়ে- অথচ এসবই ছিল ভদ্রলোকদের আয়ের মূল উৎস। পাওনা আদায়কারীদের ক্ষমতা কমে আসার সাথে সাথে বর্ধিষ্ণু রায়তদের ক্ষমতাও ক্রমেই বাড়তে থাকে। এইসব বর্ধিষ্ণু রায়তদের অধিকাংশ ছিল মুসলিম। বিশৃঙ্খলার সুযোগ নিয়ে তারা ক্রমেই জমিদারদের অমান্য করে গ্রামীণ সমাজে নিজেদের আর্থিক-সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রতিপত্তি বাড়িয়ে চলে। ১৯৩৫-এর ভারত শাসন আইন বর্ধিষ্ণু কৃষকদের ভোটাধিকার দিলে আইনসভাতেও তারা তাদের উপস্থিতি জানান দিতে শুরু করে। এদের সমানে উৎসাহ যুগিয়ে যেতে থাকে একটি ছোট কিন্তু ক্রমবর্ধমান মুসলিম বুদ্ধিজীবী গোষ্ঠী।

ম্যাকডোনাল্ডের কমিউন্যাল অ্যাওয়ার্ড আসন বন্টনের ক্ষেত্রে গোষ্ঠীগুলির জনসংখ্যার অনুপাতের পরিবর্তে তাদের "গুরুত্ব"-র (বকলমে ব্রিটিশ শাসনের প্রতি আনুগত্য) ওপরে বেশী প্রাধান্য দিয়েছিল। ফলতঃ বাংলার জনসংখ্যার এক শতাংশেরও কম হওয়া সত্বেও ইউরোপীয়ান জনগোষ্ঠীর জন্য ১০ শতাংশ আসনের বরাদ্দ করা হয়; অনুন্নত জাতিসহ হিন্দুরা পায় ৮০ টি আসন (অর্থাৎ ৩২ শতাংশ), যদিও ১৯৩১এর জনগণনা অনুযায়ী তাদের জনসংখ্যার অনুপাত ছিল ৪৪ শতাংশ। মুসলিমরাও তাদের প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে অবমূল্যায়নের শিকার হয়, যদিও তাদের অবস্থা ছিল হিন্দুদের তুলনায় ভালো। জনসংখ্যার ৫৪ শতাংশ হওয়া সত্বেও তারা পায় ১১৯ টি (মোট আসনের ৪৭.৮ শতাংশ) আসন।[2]পুনা চুক্তির সৌজন্যে হিন্দুদের এই ৮০ টি আসনের মধ্যে আবার ১০টি আসন বরাদ্দ ছিল অনুন্নত শ্রেণীর জন্য। ফলতঃ ২৫০ আসন বিশিষ্ট বঙ্গীয় আইনসভায় বর্ণহিন্দুদের ভাগে জুটল ৭০ টি আসন। মুসলিমরা এই প্রথম আইনসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করল। বাংলার তৎকালীন গভর্নর জেটল্যান্ড এর ফলে সাম্প্রদায়িক অশান্তিবৃদ্ধি হতে পারে, এই আশঙ্কা করে দিল্লিকে জরুরী চিঠি পাঠান; বলা বাহুল্য, দিল্লি সে চিঠি অগ্রাহ্য করে।

কিন্তু জেটল্যান্ডের আশঙ্কার যথাযথ কারণ ছিল। হিন্দু ভদ্রলোকদের মধ্যে এর প্রতিক্রিয়া হল মারাত্মক। চিত্তরঞ্জন দাশের মৃত্যুর পর তাঁর তখত দখল করা নিয়ে বাংলার কংগ্রেস (বেঙ্গল প্রভিন্সিয়াল কংগ্রেস কমিটি) দুটি প্রতিদ্বন্দী শিবিরে বিভক্ত ছিল-দুই শিবিরের নেতা ছিলেন যথাক্রমে যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্ত ও সুভাষ চন্দ্র বসু। গান্ধির আইন অমান্য আন্দোলনের ডাকেও দুই শিবির এক হয় নি, যে যার মত করে কর্মসূচী পালন করেছিল। কিন্তু কমিউন্যাল অ্যাওয়ার্ড এই দুই শিবিরকে এক করল। সেনগুপ্ত শিবিরের মুখপত্র আদ্ভে পত্রিকায় লেখা হল-'.... the claims of the Hindus have been ignored completely and perhaps deliberately'. সরকারকে সতর্ক করে আরো লেখা হল-...( the Hindus) would not 'submit to such a sweeping, almost revolutionary change'. বসু শিবিরের পত্রিকা Liberty তে লেখা হল-....The Hindus are rendered politically impotent, and the reaction of this process on the cultural, economic and political life of the province will be disastrous.[3].

প্রতিক্রিয়ার এই ধরণটা ছিল বিপজ্জনক। ভারত সরকারের ডিভাইড অ্যান্ড রুল নীতি, ইউরোপীয়দের অন্যায্যভাবে বেশী আসন পাইয়ে দেওয়া, গভর্নরের ডিসক্রিশনারী পাওয়ার -এসবের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার বদলে হিন্দু ভদ্রলোক (কংগ্রেস-অকংগ্রেস নির্বিশেষে) তাঁদের ক্রোধের অভিমুখটি ঘুরিয়ে দিলেন মুসলিমদের দিকে। কমিউন্যাল অ্যাওয়ার্ড যে আসলে মুসলিমদেরই চক্রান্ত (ব্রিটিশদের নয়) এমন ধারণা তৈরী হতে থাকল। হিন্দু সভার বি। সি চ্যাটার্জি একে বর্ণনা করলেন বাঙ্গালী হিন্দু "জিনিয়াস"-এর প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে। বললেন, মুসলমানকে গদিতে ফিরিয়ে আনার অর্থ হবে পলাশীর যুদ্ধের আগেকার অন্ধকার যুগে ফিরে যাওয়া।[4] ব্রিটিশ শাসনকে মুসলিম শাসনের তুলনায় কাঙ্খিত বলে প্রচার করা শুরু হল। কমিউন্যাল অ্যাওয়ার্ড-পরবর্তী পরিস্থিতিতে বাঙ্গালী হিন্দুদের কী করণীয়, এই বিষয়ে একটি সভা আহুত হল অ্যালবার্ট হলে। তাতে যেমন উপস্থিত ছিলেন কংগ্রেসের শরৎ চন্দ্র বসু, তেমনি ছিলেন হিন্দু সভার ডঃ রাধাকুমুদ মুখার্জি, এমনকি কট্টর ব্রিটিশভক্ত ব্যবসায়ী সার বিজয় প্রসাদ সিংহ রায়। উপস্থিত মান্যগণ্যদের অনেকেই "Bengal Anti-communal Award Movement" এর পদাধিকারী হলেন। এক্ষেত্রে কোনো দলীয় বা মতাদর্শগত ভেদাভেদ ছিল না।

অ্যাওয়ার্ড-বিরোধী প্রচারে বলা হল হিন্দু সমাজ একটি সুসংবদ্ধ , ঐক্যবদ্ধ মনোলিথিক সমাজ। কমিউন্যাল অ্যাওয়ার্ড এই মহান সম্প্রদায়কে চিরকালের জন্য সাংস্কৃতিক ও বৌদ্ধিকভাবে অনুন্নত মুসলমানদের দাসে পরিণত করবে। যে কথা বলা হল না , তা হল তথাকথিত এই "সংস্কৃতি" মূলত হিন্দু ভদ্রলোকের সংস্কৃতি। তার সঙ্গে হিন্দু সমাজের গরিষ্ঠ অংশ রাজবংশী, মাহিষ্য, কৈবর্ত, সদগোপ কিংবা অস্পৃশ্য হাঁড়ি-ডোম-বাগদি-বাউরির সংস্কৃতির কোনো মিল নেই।

সেই সময়কার একটি প্রভূত-পঠিত মেমোরিয়ালে বাংলার গভর্নরকে লেখা হল -
"...the enormously predominant part [the Hindus of Bengal] ... have played under the British in the intellectual, the cultural, the political, the professional, and the commercial life of the province ... The Hindus of Bengal, though numerically a
minority, are overwhelmingly superior culturally, constituting as much as 64 percent of the literate population ... while their economic preponderance is equally manifest in the spheres of the independent professions.[5]
এই মেমোরিয়ালের স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে অনেকেই ছিলেন ভদ্রলোক বাঙ্গালীর সাংস্কৃতিক জগতের উজ্জ্বলতম নক্ষত্র; যথা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শরৎ চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, ব্রজেন্দ্র নাথ সীল, ডঃ প্রফুল্ল চন্দ্র রায়, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী প্রমুখ।

নোট;
1.Parliamentary Papers on the Montagu-Chelmsford Reforms, Command 812, pp. 295-299.
2. Census of India 1931, Bengal and Sikkim, vol. V, part 1. Report by A. E. Porter, pp. 381-388.
3. Advance, 17 August 1932, Liberty, 17 August 1932.
4.The Betrayal of Britain and Bengal, by B. C. Chatterjee, undated. Zetland Collection, IOLR MSS Eur D/609/21/(h)b.
5. Memorial by Hindu leaders, forwarded by the Maharaja of Burdwan to Lord Zetland, 4 June 1936. Zetland Collection, IOLR MSS Eur 207/6.33.


Name:   I           

IP Address : 57.15.104.66 (*)          Date:14 Apr 2018 -- 09:25 PM

বাঙালী মুসলিমদের প্রতিক্রিয়া অবশ্য বাঙালি হিন্দু ভদ্রলোকদের মত এমন একবগ্গা ছিল না।বিশের দশকের শেষদিক থেকেই বাঙালী মুসলিমদের মধ্যে কংগ্রেসের প্রভাব ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে আসছিল। চিত্তরঞ্জন দাস তাঁর জীবৎকালে মুসলিমদের কংগ্রেসে ধরে রাখার জন্য একটি চুক্তি করেছিলেন। এই চুক্তিতে পৃথক ইলেকটোরেটকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল এবং ঠিক হয়েছিল, যে জেলায় যে সম্প্রদায় সংখ্যাগরিষ্ঠ তারা সেই জেলার স্থানীয় নির্বাচনে ৬০ % আসন দখলে রাখতে পারবে। সেই হিসেব ধরলে অবিভক্ত বাংলার ১৬টি জেলায় মুসলিমরা এবং ৯টি জেলায় হিন্দুরা ৬০% আসনের দখলদার হয়; কিন্তু কংগ্রেসের হিন্দুপ্রধান নেতৃত্ব এর প্রবল বিরোধিতা করে, সেটিকে কার্যকরী হতে দেয় না; অবশেষে চিত্তরঞ্জন দাসের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে দাস-চুক্তিরও চিরতরে অবসান ঘটে।[1] অনেক মুসলিম কংগ্রেসীই এতে আহত , অপমানিত বোধ করেন ও কংগ্রেস ছেড়ে দেন। সত্যাগ্রহ ও খিলাফৎ আন্দোলনের সময় গড়ে ওঠা সাম্প্রদায়িক মৈত্রীও আন্দোলন- অবসানের সঙ্গে সঙ্গে ফুরিয়ে আসে। কংগ্রেস যে মূলতঃ একটি হিন্দুদের সংগঠন, সে ধারণা ক্রমেই বাঙালী মুসলিম জনমানসে বদ্ধমূল হতে শুরু করে। ১৯২৮ সালে বেঙ্গল টেন্যান্সি অ্যামেন্ডমেন্ট বিল আনা হলে কংগ্রেস/স্বরাজ্যপার্টির সবস্তরের নেতারা রায়তের বিরুদ্ধে জমিদারের স্বার্থরক্ষার জন্য বিলের বিরোধিতায় হই হই করে নেমে পড়েন। স্বভাবতই রায়তরা, যাঁদের অধিকাংশই মুসলিম, বড়লোক হিন্দু জমিদারদের জন্য কংগ্রেসের এই প্রীতি ভালো চোখে দেখেন নি।

কংগ্রেস ছেড়ে বেরিয়ে এলেও বাঙালী মুসলিমরা তখনো একটি নির্দিষ্ট দল বা সংগঠনের ছত্রছায়ায় এসে দাঁড়াতে পারেন নি। অন্ততঃ ১৯৩২ সালে ম্যাকডোনাল্ড অ্যাওয়ার্ড ঘোষণা হওয়ার সময়ে তো নয়। বিভিন্ন মুসলিম নেতা বিভিন্ন রকমের প্রতিক্রিয়া জানান। জাতীয়তাবাদী মুসলিম নেতারা, যেমন ফজলুল হক এই অ্যাওয়ার্ডের তীব্র বিরোধিতা করেন; তাঁর মনে হয়েছিল এই অ্যাওয়ার্ড সাম্প্রদায়িক বিভেদ বাড়িয়ে তুলবে( যদিও ঠিক তার পরদিনই তিনি তাঁর সুর নরম করে ফেলবেন)। অনেক মুসলিম নেতা আবার মনে করছিলেন পৃথক ইলেকটোরেটের সাহায্য ছাড়াই তাঁরা তাঁদের প্রতিনিধিদের জিতিয়ে আনতে পারবেন( বস্তুতঃ পূব বাংলার বিস্তীর্ণ মফস্বঃলের স্থানীয় নির্বাচনগুলিতে এমন ঘটনা সত্যিই ঘটছিল)। তাঁরা বরং চেয়েছিলেন শিক্ষা ও জমি-মালিকানা নির্বিশেষে সর্বসাধারণের ভোটাধিকার ( সেসময় একুশ বছর-বয়স্ক বা তদুর্ধ পুরুষ, ন্যুনতম ম্যট্রিকুলেশন পাশ জমিমালিক, যাঁরা কমপক্ষে ৮ আনা সেস অথবা ৬ আনা চৌকিদারী কর দিতেন, তাঁদেরই ভোট দেওয়ার অধিকার স্বীকৃত ছিল)[2]; সেক্ষেত্রে তাঁদের রাজনৈতিক ক্ষমতা আরো জোরদার হত।

কিন্তু অ্যাওয়ার্ডের বিরোধিতায় হিন্দু নেতাদের এককাট্টা হতে দেখে মুসলিম নেতৃত্বর সুরবদল ঘটে। তাঁরাও ঐক্যবদ্ধভাবে অ্যাওয়ার্ডকে সমর্থন করতে শুরু করেন। ফজলুল হক পর্যন্ত বলে বসেন- 'I am prepared to be hanged if I cannot demonstrate to the satisfaction of any judge that the Hindus of Bengal constitute the very personification of communalism based on intense selfishness'. [3] সাম্প্রদায়িক ঘৃণার বিষবাষ্পে ছেয়ে যায় বঙ্গীয় রাজনীতির আকাশ।

ম্যাকডোনাল্ডের অ্যাওয়ার্ডের থেকেও গান্ধি-আম্বেদকরের পুনা চুক্তি বর্ণহিন্দু বাঙালীর পক্ষে বেশী বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। এক তো এর ফলে বঙ্গীয় আইনসভায় বর্ণহিন্দু বাঙালীর আসনসংখ্যা ৩২% থেকে কমে দাঁড়ায় ২০ শতাংশে। কিন্তু তার চেয়েও বড় বিপদ ঘটে মতাদর্শগত স্তরে। বর্ণহিন্দু নেতারা সম্প্রদায় হিসেবে হিন্দু বাঙ্গালীর যে একটি মনোলিথিক ধারণা তুলে ধরছিলেন, যারা শিক্ষা-সংস্কৃতি-সভ্যতায় মুসলিম বাঙালীদের তুলনায় অনেক উন্নত এবং সেকারণেই বাংলার রাজনৈতিক/অর্থনৈতিক/সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে নেতৃত্বদানের যোগ্য, সে ধারণাটিতে বড়সড় আঘাত হানে এই পুনা চুক্তি। এই চুক্তির হিসেবে বাঙালী হিন্দুর ৫০ শতাংশই "নীচ জাতি", যারা অচ্ছ্যুত যদি নাও হয়, অন্ততঃ "সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে অনগ্রসর"।[4] বাঙালী হিন্দু নেতারা দাবী করেন , বাংলায় জাতিভেদ প্রথার বাড়াবাড়ি নেই; অচ্ছ্যুতের সংখ্যা যৎসামান্য। গোটা ভারতবর্ষের প্রেক্ষিত মনে রাখলে তাঁদের বক্তব্যে কিছুটা সারবত্তা ছিল বলেই মনে হয়; তবে তাঁরা যতখানি দাবী করেছিলেন, ছবিটা মোটেও তত ভ্রাতৃত্বমূলক ছিল না। সেন্সাস কমিশনারের হিসেবমত ১৯৩১ সালে বাংলায় ৬০ লক্ষের বেশী মানুষ অচ্ছ্যুত বলে চিহ্নিত হতেন। এঁদের মধ্যে মেথরের কাজ-করা ডোম, ভুঁইমালি, হাঁড়ি, ক্যাওড়া ছাড়াও ছিলেন আরো অন্ততঃ ৪০ টি গোষ্ঠী- চামার, মুচি, শুঁড়ি, পাটনি,বাগদি, বাউড়ি, হাজং প্রভৃতি। এঁরা ছাড়াও ছিলেন আরো ১৮টি আদিবাসী গোষ্ঠী ও আরো ৪০ টি নীচু জাত, যাঁরা সরাসরি অচ্ছ্যুত না হলেও , কমিশনারের ভাষায়- 'whose social, economic and other circumstances are such that [they] will be unable to secure adequate representation of [their] political views or adequate protection of [their] interests without some form of franchise concession'.[5]

দেশ জুড়েই বর্ণহিন্দুর এই বিপন্নতা প্রশাসক ইংরেজরা লক্ষ করেছিলেন। ফ্র্যানচাইজি কমিশনার লোথিয়ান লিখছেন-'... caste Hindus who are desperately afraid that the great mass of Hindu society is going to be split by the breaking away of the depressed classes into a separate political entity, thereby endangering their majority in India as a whole . . . and producing a situation in which the Moslems,depressed classes and other minorities may be able to combine to make a majority against them'. [6] এই প্রবণতাকে রোধ করতেই গান্ধি অনশনে বসেন ও পুনা চুক্তি স্বাক্ষর করেন, যদিও বাংলার বর্ণহিন্দুদের ক্ষেত্রে তা 'উল্টা বুঝলি রাম' হয়ে দাঁড়ায়।

নোটঃ
1.Ujjwalkanti Das, 'The Bengal Pact of 1923 and its Reactions', Bengal Past and Present, vol. 99, I, 188, 1980, pp. 29-45.
2.Bengal Village Self-Government Act of 1919, Union Board Manual, vol. I, Alipore 1937.
3.Kenneth MacPherson, The Muslim Microcosm, p.126.
4. Joya Chatterjee, Bengal Divided : Hindu Communalism and Partition, 1932-47, Cambridge University Press (2002), p.36.
5. Census of India, vol. V, p. 499.
6. Lothian to Anderson, 4 May 1932. John Anderson Collection, IOLR MSS Eur F/207/3.






Name:  গবু          

IP Address : 52.110.133.247 (*)          Date:15 Apr 2018 -- 11:20 PM

শুভ নববর্ষ! পড়ছি।


Name:  I          

IP Address : 57.15.174.167 (*)          Date:18 Apr 2018 -- 11:38 PM

সাধারণভাবে নিচু জাতের হিন্দুরা ছিলেন অর্থনৈতিকভাবেও অনগ্রসর। তবে এই নিয়মের কিছু ব্যতিক্রম ছিল। যথা, পূর্ব ও মধ্যবঙ্গের নমঃশুদ্র ও উত্তরবঙ্গের রাজবংশী গোষ্ঠী। পাটচাষে লাভের সুবাদে আর্থিক সচ্ছ্লতার মুখ দেখা এই গোষ্ঠী দুটি পুনা চুক্তির সুবিধা দুহাত ভরে গ্রহণ করে। ভদ্রলোক হিন্দুরা এইসব 'ছোটলোক'দের বাড়বাড়ন্ত মোটেও ভালো চোখে দেখেন নি। কোথাও কোথাও তো 'ছোটলোক' হিন্দুরা মুসলিম বর্গাদারদের সঙ্গে জোট বেঁধে হিন্দু জমিদারের বিরুদ্ধে মজুরি-বৃদ্ধির লড়াইয়ে অবধি সামিল হচ্ছিল।[1]এ সবই বর্ণহিন্দুদের শিরঃপীড়ার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কিছু গান্ধীবাদী নেতা 'শুদ্ধি'করণের মাধ্যমে আদিবাসী ও অচ্ছ্যুতদের হিন্দুধর্মের মূলস্রোতে ফিরিয়ে আনবার চেষ্টা করলেও মোটের ওপর হিন্দু ভদ্রলোকেরা ছোটলোকদের প্রতি যথেষ্ট বিরূপ ছিলেন।[2]১৯৩৩ সালে দলিত নেতা এম সি রাজা কেন্দ্রীয় আইন সভায় Untouchability Abolition Bill আনার চেষ্টা করলে তাঁকে বাঙালী বর্ণহিন্দু নেতাদের কাছ থেকে সবচেয়ে বেশী বিরোধিতার মুখোমুখি হতে হয়। অমর নাথ দত্ত বলেনঃ 'Let these people be more clean, more pure and cherish better ideals of life and . . . then I shall associate with them ..,' [3]. রাজা বিদ্রূপ করে বলেন-"অবাক কান্ড... সবচেয়ে বেশী বিরোধিতা এল বাংলা থেকে, যেখানে নাকি, ওঁরা বলেন, কোনো অচ্ছ্যুত নেই।"[4].

বাংলার হিন্দু কংগ্রেস নেতারা পুনা চুক্তির জন্য গান্ধিকে কোনোদিন ক্ষমা করেন নি। একেই বহুকাল ধরে বাংলার কংগ্রেস রাজনীতিতে গান্ধি-বিরোধিতার একটি স্রোত বহমান ছিল। চিত্তরঞ্জন দাস ছিলেন খোলাখুলি গান্ধি-বিরোধী; তাঁর মৃত্যুর পর সুভাষ বোসকে বঞ্ছিত করে যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্তকে প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি তথা কলকাতার মেয়র-পদে নির্বাচিত করায় বাঙালী কংগ্রেস নেতা-কর্মীরা আরো ক্ষুব্ধ হন। সবশেষে এল এই পুনা চুক্তির ঘা। যে বাঙালী ভদ্রলোক একদা ভারতবর্ষের কংগ্রেসী রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করতেন, তাঁদেরই কিনা অন্ধকারে রেখে সেই জাতীয় কংগ্রেস এমন একটি সিদ্ধান্ত নিল, যা সরাসরি তাঁদের ভাগ্যবিপর্যয়ের জন্য দায়ী। বঙ্গীয় নেতারা-কংগ্রেসী/অকংগ্রেসী নির্বিশেষে একে বিশ্বাসঘাতকতা মনে করেছিলেন।[5]

বলা বাহুল্য,এই সময় থেকেই কংগ্রেসী রাজনীতিতে কেন্দ্র-রাজ্য সংঘাত আগের তুলনায় অনেক বেশি ঘোরালো হয়ে ওঠে। জাতীয়তাবাদী মুসলিমদের সমর্থন পেতে কংগ্রেসের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব কম্যুন্যাল অ্যাওয়ার্ড নিয়ে একটি না ঘরকা- না ঘাটকা সিদ্ধান্ত নেন। মদন মোহন মালব্যর মত কট্টর অ্যাওয়ার্ড-বিরোধী রাজনীতিবিদ এর প্রতিবাদে কংগ্রেস ছেড়ে বেরিয়ে এসে ন্যাশনালিস্ট পার্টি স্থাপন করেন। সুভাষ বসু ও তাঁর অনুগামীরা সাথে সাথে এই নতুন দলে যোগ দেন। অবশ্য এঁরা পুরোপুরি কংগ্রেস-সঙ্গ ত্যাগ না করে স্বরাজ্য পার্টির মতই একটি প্রেসার গ্রুপ হিসেবে কংগ্রেসের মধ্যে থাকতে চেয়েছিলেন।

যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্ত'র মৃত্যুর পরে বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেস কমিটির দায়িত্বভার যায় ডাঃ বিধান চন্দ্র রায়ের। অভিজাত বিধানবাবু সেই অর্থে ঠিক জনতার নেতা ছিলেন না; না ছিল তাঁর নিচুতলার কংগ্রেস কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ , না যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্তর মত সাংগঠনিক ক্ষমতা । গান্ধির সঙ্গে অন্তরঙ্গতার সুবাদে তিনি প্রদেশ কংগ্রেসের সভাপতি মনোনীত হন, যদিও সেসময় এই পদটি লোভনীয় ছিল বললে সত্যের অপলাপ করা হবে। কংগ্রেসের দীনহীন অবস্থার উন্নতির জন্য তিনি বসু-শিবিরের পেশ করা 'অ্যাওয়ার্ড-বিরোধী বিক্ষোভ'এর একটি কর্মসূচীকে সমর্থন করে হাইকম্যান্ডের কাছে প্রস্তাব পেশ করেন। মুসলিম -মন পেতে মরিয়া হাইকম্যান্ড অবশ্য এই প্রস্তাবটিকে একবাক্যে নাকচ করে দেয়। বিধান বাবুও আর কথা না বাড়িয়ে মাথা নত করে বাধ্য ছাত্রের মত হাইকম্যান্ডের লাইনে ফিরে যান।

নোটঃ
1.Tanika Sarkar, Bengal 1928-1934, pp. 39-40.
2.Tanika Sarkar, 'Jitu Santal's Movement in Malda, 1924-1932: A Study in Tribal Protest', in Ranajit Guha (ed.), Subaltern Studies IV, p. 136
3.Legislative Assembly Debates on the Untouchability Abolition Bill, in Government of India, Home Political Files 50/7/33 and 50/11/34
4.ibid.
5.Joya Chatterjee, Bengal Divided : Hindu Communalism and Partition, 1932-47, Cambridge University Press (2002), p.43.


Name:  I          

IP Address : 57.15.174.167 (*)          Date:18 Apr 2018 -- 11:40 PM

গবু, শুভ নববর্ষ।


Name:   I           

IP Address : 57.15.145.97 (*)          Date:21 Apr 2018 -- 11:26 PM

ত্রিশের দশকের আগে থেকেই বাংলায় জমিদারী-প্রথার ওপর চাপ বাড়ছিল। অনুপস্থিত জমিদারদের (absentee Landlord) এস্টেট প্রায়শঃই বারো ভুতে (নায়েব-গোমস্তার দুর্নীতি, দিনের-পর দিন চলতে থাকা গাদা গাদা নিষ্ফলা মামলা ও অন্যান্য অপ্রয়োজনীয় খরচা ইত্যাদি) লুটে-পুটে খাচ্ছিল। যে সব জমিদার গ্রামে থেকে নিজেদের এস্টেট তদারক করতেন , তাঁরা অবশ্য এই চাপ সামলেও লাভের মুখ দেখতেন। জমিদারদের এই প্রতিপত্তি-হ্রাসের সময়ে দ্রুত উঠে আসেন পাটের চাষে লাভ -করা সম্পন্ন কৃষক তথা জোতদারেরা।এঁদের দেখাদেখি ছোট চাষীরাও দাদনী মহাজনদের কাছ থেকে ধার নিয়ে পাট্চাষ শুরু করেন; কিন্তু এইসব চাষীর জমির পরিমাণ ও কৃষিতে বিনিয়োগের সামর্থ্য ছিল অল্প। অল্পসময়ের মধ্যেই এঁরা লাভের মুখ দেখা তো দূরের কথা, উল্টে ক্রমবর্ধমান ঋণজালে জড়িয়ে পড়ে ঘটি-বাটি বিক্রি করতে বাধ্য হন। জোতদারদের উত্থানে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হন তালুকদার/ছোট জমিদারেরা। ভদ্রলোক শ্রেণীর অধিকাংশই এই গোষ্ঠী থেকে উঠে আসা। গ্রামীণ অর্থনীতিতে তেমন সুবিধা করতে না পারায় এঁরা অনেকেই শহর-মফঃস্বলে চাকরীর সন্ধানে ছড়িয়ে পড়েন। কিন্তু প্রশাসনিক চাকরির সংখ্যা স্বল্প; প্রতিযোগিতা প্রবল। ভালো চাকরী পাওয়ার জন্য যে পরিমাণ যোগাযোগ থাকা দরকার, তা এঁদের অনেকেরই ছিল না। বাধ্য হয়ে এঁদের অনেকেই ছোটখাট কেরাণী কিম্বা শিক্ষকের চাকরী নিতেন। কিন্তু শহরে থাকা-খাওয়ার খরচা ক্রমেই বেড়ে চলছিল। অধিকাংশ নীচুতলার ভদ্রলোকের প্রায়শঃ ডাইনে আনতে বাঁয়ে কুলোতো না। এই শ্রেণী সম্বন্ধে ১৯১৫ সালে J. C. Jack লিখেছেনঃ
'Upon this class the rise in prices which has been constant for half a century and always increasing in intensity has had such a disastrous effect that too many live on the margin of starvation ... it is known that the number of unemployed among the bhadralok is large and the circumstances of many families are pitiful and their sufferings very great. [1] মনে করে দেখুন জীবনানন্দ দাশের ডায়েরির পাতাগুলি, বরিশালের সর্বানন্দ-ভবনের তুলনামূলক স্বাচ্ছন্দ্য থেকে যখন এসে পড়ছেন 'লিবিয়ার জঙ্গলের মত' দয়াহীন শহর কলকাতায়। [2]

জমির খাজনার আদায়-উশুল কমে আসার ধাক্কা সামলাতে বেশ কিছু সমর্থ জমিদার মহাজনী ব্যবসা শুরু করেন। ছোট জমিদার কিম্বা তালুকদারদের সে ক্ষমতাও ছিল না। ত্রিশের মহামন্দা শুরু হতেই গ্রামবাংলার এই নড়বড়ে আর্থিক ব্যবস্থা পুরো ভেঙে পড়ে। পাটের দাম মুখ থুবড়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে পাট-রপ্তানীকারী শিল্পপতি ও দাদনী মহাজনরা পাটে বিনিয়োগ পুরো বন্ধ করে দেয়। বাধ্য হয়ে ক্ষুদ্র চাষী গ্রামীণ মহাজনের দিকে মুখ ফেরায়। কিন্তু মহামন্দার দিনে তাদের অবস্থাও সঙ্গীন। বাজার থেকে ধারের টাকা উদ্ধার করতে না পারায় তারাও নতুন করে ধার দেওয়ার মত অব্স্থায় ছিল না। শুরু হয়ে যায় এক বিষচক্র। ধার দেওয়ার কেউ নেই, ফলে নতুন করে কৃষিতে বিনিয়োগ করার অবস্থা নেই, অগত্যা চাষবাস বন্ধ।চাষবাস বন্ধ, তাই গরীব চাষী দিনদিন আরো গরীব হয়; বাজারে তার ধার আরো বাড়ে,জমিদারী খাজনাও জমতে জমতে পাহাড় হয়। চাষী-জমিদার সংঘাত চরমে ওঠে। অনেক জমিদার আদালতে যান; চাষীরাও এই দুর্দিনে জমিদারী খাজনা ও মহাজনের সুদ দিতে স্রেফ অস্বীকার করে। জমিদারেরা সন্দেহ করতে শুরু করেন, এ সবই স্থানীয় নেতাদের উস্কানির ফল। টিপেরার মত মুসলিম-প্রধান জেলায় হিন্দু জমিদারেরা "শান্তিরক্ষিণী সমিতি" নামে একটি সংগঠন তৈরী করেন। সংগঠনটি নালিশ করে- "Rank Bolshevism is being spread by a number of persons......peasants and cultivators, specially Muhammadans are asked to make a common cause against money-lenders, traders and landlords." [3]

মহামন্দার দিনগুলিতে অজস্র ছোট চাষী শেষ সম্বল জমিটুকুও বেচে দিয়ে ভাগচাষীতে পরিণত হন। কিন্তু মন্দা এক শ্রেণীর মানুষের কাছে অযাচিত সুযোগ নিয়ে উপস্থিত হয়। এঁরা হলেন সম্পন্ন কৃষক ও জোতদার শ্রেণী। মন্দার সুযোগ নিয়ে এঁরা উদ্বৃত্ত শস্য চড়া দামে বেচতে থাকেন; গরীব প্রতিবেশীদের খাদ্যশস্য ধার দেন এবং যথাসময়ে ধার শোধ না হলে তাঁদের জমিজমা দখল করে নেন। চাষী-জমিদার সংঘাতের সুযোগ নিয়ে এঁরাও জমিদারের খাজনা দিতে অস্বীকার করেন। বাংলার গ্রামাঞ্চলে ক্ষয়িষ্ণু জমিদার ও মৃতপ্রায় ছোট চাষীর সম্পদের বিনিময়ে এঁরা ফুলে-ফেঁপে ওঠেন।[4 ]এঁদের এই আর্থিক প্রতিপত্তি এবার রাজনৈতিক প্রতিপত্তিতে বদলে যাওয়ার পালা।

১৯৩৫ সালের গভর্নমেন্ট অফ ইন্ডিয়া অ্যাক্ট চালু হওয়ার সাথে সাথে কলকাতা শহর বাংলার রাজনীতির সিংহাসন থেকে চ্যুত হয়; গ্রামবাংলা এসে দাঁড়ায় রাজনীতির কেন্দ্রে, এই প্রথমবার। বঙ্গীয় আইনসভায় হিন্দুদের জন্য বরাদ্দ ৭৮টি আসনের মধ্যে মাত্র ১২টি বণ্টিত হয় শহরে, বাকিগুলি গ্রামে। মুসলিম আসনগুলির মধ্যে এই সংখ্যাটি গিয়ে দাঁড়ায় ১১৭ তে ৬টি। কলকাতা-কেন্দ্রিক কংগ্রেস দলের মাথায় হাত পড়ে। এতকাল তার যাবতীয় আন্দোলন, যাবতীয় কাজকর্ম পরিচালিত হয়ে এসেছে শহুরে নেতাদের নির্দেশে, শহুরে কর্মীদলের কাঁধে ভর দিয়ে। গ্রামে তার গণভিত্তি কোনোকালেই ছিল না। শুধু কংগ্রেস কেন, কোনো দলেরই ছিল না।[5]

পরিবর্তিত পরিস্থিতির সুযোগ সবার আগে নেন মুসলিম নেতারা। ফজলুল হক, আক্রম খান, তমিজুদ্দিন খানের মত আতরফ নেতারা নিখিল বঙ্গ প্রজা সমিতি নামে একটি কৃষক সংগঠনের জন্ম দেন। অবশ্য খুব শিগগিরই এর কর্তৃত্ব নিয়ে দ্বন্দ্ব শুরু হবে; ফজলুল হক সংখ্যাগরিষ্ঠ উদ্যমী নেতা-কর্মীদের নিয়ে সংগঠন ছেড়ে বেরিয়ে গিয়ে কৃষক প্রজা পার্টি নামের রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠা করবেন। আক্রম খান অবশিষ্ট অংশ নিয়ে পুরনো দলের নেতা হিসেবে থেকে যাবেন। কয়েক মাসের মধ্যেই তাঁর দলটি মুসলিম লিগে মিশে যাবে।

মুসলিম লিগ নেতৃত্বের বিপরীতে কৃষক প্রজা পার্টির নেতারা অধিকাংশই ছিলেন সাধারন, অসম্ভ্রান্ত আতরফ মুসলমান,যদিও এঁদের কেউ কেউ ছিলেন স্বপ্রতিষ্ঠিত সফল ব্যারিষ্টার অথবা প্রশাসনিক কর্তা। কিন্তু সফলতা তাঁদের গ্রামবাংলা থেকে বিচ্ছিন্ন করেনি। এবং সেটিই ছিল তাঁদের জনপ্রিয়তার ভিত্তি। নামে কৃষক প্রজা পার্টি হলেও দলটি ছিল একান্তভাবেই জোতদারদের দ্বারা পরিচালিত জোতদারদের স্বার্থরক্ষাকারী পার্টি। সাধারণ কৃষকদের খুশী করবার জন্য এঁদের ম্যানিফেস্টোতে খাজনা ও ঋণ মকুবের কথার উল্লেখ থাকলেও এঁদের আসল শ্লোগান ছিল 'জমিদারী হটাও'। জমিদার ও মহাজনেরা ছিলেন এঁদের আক্রমণের মূল লক্ষ, যাঁরা আবার কিছু ব্যতিক্রম বাদ দিলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই হিন্দু। ফলতঃ গরীব মুসলিম চাষীদের সঙ্গে এঁরা একটি ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক আত্মীয়তা গড়ে তুলতে সক্ষম হন। অবশ্য তাই বলে এঁদের গোঁড়া মৌলবাদী বলে দাগিয়ে দেওয়াও ভুল হবে। পরবর্তী সময়ে আমরা দেখতে পাবো, মুসলিম জমিদারদের বিরুদ্ধেও কৃষক প্রজা পার্টি কিভাবে সমান সোচ্চার হয়ে উঠেছিল। ১৯৩৬ সালে কুমিল্লার এক জনসভায় ৪০০০ মানুষের সামনে সুবক্তা ফজলুল হক সম্ভ্রান্ত জমিদার সার মহিউদ্দিন ফারুকি ও সার নাজিমুদ্দিনের বিরুদ্ধে প্রবল বিষোদ্গার করেন।

১৯৩৬ সালে ধর্মীয় লাইনে মুসলিমদের ঐক্যবদ্ধ করার উদ্দেশ্যে (যদিও আসলে তা ছিল সম্ভ্রান্ত ও বিত্তশালী মুসলিমদের স্বার্থরক্ষার কৌশল) ঢাকার নবাব হাবিবুল্লার নেতৃত্বে একটি নতুন রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠিত হয়, নাম দেওয়া হয় 'ইউনাইটেড মুসলিম পার্টি'।[6] প্রসঙ্গতঃ, বাংলার প্রাদেশিক মুসলিম লিগ দলটি ততদিনে সাইন বোর্ডে পরিণত হয়েছে। নতুন দলের সভাপতি হন নবাব স্বয়ং, সম্পাদক হন হুসেন শহিদ সুরাবর্দি। সুরাবর্দি ছিলেন বাংলার অন্যতম খানদানী আসরাফ মুসলিম বংশের সদস্য। খিলাফৎ আন্দোলনে যোগদান করে সুরাবর্দির রাজনীতিতে হাতেখড়ি হয়; খিলাফৎ আন্দোলন শেষ হলে ইনি স্বরাজ্য পার্টির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। ১৯২৬ সালে কলকাতার দাঙ্গার পরে সুরাবর্দি স্বরাজ্য পার্টির সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনে যোগ দেন। নিজের স্মৃতিকথায় তিনি লিখেছেন-'at one time I had as many as 36 trade unions as members of a Chamber of Labour I had founded to oppose the Communist labour organisations'."[6] এই সময়েই তিনি বেশ কিছু মুসলিম গুন্ডা-দাঙ্গাবাজদের আশ্রয় দিতে শুরু করেন (এঁদের একজন হলেন কুখ্যাত গুন্ডা মীনা পেশোয়ারী); কলকাতার অন্ধকার জগতের সঙ্গে এইভাবে তাঁর যোগাযোগের সূত্রপাত।[7]

নোটঃ
1.J. C. Jack, Bakarganj SSR (1900-08), Calcutta, 1915, pp. 87-88.
2.ভূমেন্দ্র গুহ'র লেখা 'জীবনানন্দ ও সঞ্জয় ভট্টাচার্য' বইটি থেকে উদ্ধৃত করছি-"...টিউশনি তো করেছেন সারা-জীবন-ভর প্রায়... বড়োলোকের প্রাইভেট সেক্রেটারির চাকরিতে মনোনীত হবার জন্য চেষ্টার কসুর করেন নি... কর্পোরেশনের বাড়িতে ঘুরে বেড়িয়েছেন, যদি একটা ভেকান্সির সন্ধান পান সুভাষ বোসকে গিয়ে বলবেন, সেই ফাঁকটায় যদি তাঁকে গলিয়ে দিতে পারেন; কালীঘাট-পলতা লাইট রেলওয়ের টিকিটচেকার 'এর অথবা গার্ড'এর চাকরির ধান্দা করেছেন... খবরের-কাগজের রিপোর্টার'এর চাকরির জন্য স্টেটসম্যান কাগজে ধর্না দিয়েছেন, সবিস্ময়ে আবিষ্কার করেছেন যে, তাঁর ইন্টারভিউ'র আগেই বিজ্ঞাপিত শূন্য পদ ভরাট হয়ে গিয়েছে... এমন-কী খবরের-কাগজের-ফেরিওয়ালার কাজও কাম্য ব'লে মনে হয়েছে... জ্ঞানবাবুর চায়ের-দোকানের মতো একটা চায়ের দোকান অথবা কুষ্ঠরোগিণীর পানের-দোকানের মতো একটা পানের-দোকান করতে পারলে হত।।।সে সম্ভাবনা বাস্তবায়িত করা চেষ্টাও করেছেন..." (ভূমেন্দ্র গুহ, জীবনানন্দ ও সঞ্জয় ভট্টাচার্য,পৃ ২৯৭)

3.A. B. Dutta to the Political Secretary, 4 December 1931, GB HCPB File No. 849/31 (1-9).
4. Saugata Mukherji, 'Agrarian Class Formation', p. PE-17.
5.Joya Chatterjee, Bengal Divided : Hindu Communalism and Partition, 1932-47, Cambridge University Press (2002), p.68
6.ibid p.79.
7.M. H. R. Talukdar (ed.), The Memoirs of Huseyn Shaheed Suhrawardy, pp. 106-107.
8.Kazi Ahmed Kamal. Politicians and Inside Stories, p. 54.






Name:   I           

IP Address : 57.15.170.151 (*)          Date:26 Apr 2018 -- 10:54 PM

কিন্তু সদ্য-গজিয়ে ওঠা এই মুসলিম দলটির সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা ছিল তার শহর-কেন্দ্রিকতা। গ্রামবাংলা দখল করতে না পারলে বাংলার রাজনীতিতে আর প্রাসঙ্গিক থাকা যাবে না, সে কথা তাঁরা বিলক্ষণ জানতেন। সেই উদ্দেশ্যে তাঁরা প্রজা সমিতিগুলির সঙ্গে যোগাযোগ করতে শুরু করেন; কিছুটা সফলও হন। আক্রম খানের নেতৃত্বাধীন নিখিল বঙ্গ প্রজা সমিতির অবশিষ্টাংশ তাঁদের দলে যোগ দেন। কিন্তু আক্রম খান নেহাতই প্রান্তিক শক্তি। গ্রাম বাংলার মুকুটহীন রাজা তখন ফজলুল হক। অনেক সাধ্যসাধনা করেও ফজলুল হককে দলে টেনে আনা গেল না। হক নিজের শক্তি ও আসন্ন ক্ষমতাপ্রাপ্তির সম্ভাবনা সম্বন্ধে সচেতন ছিলেন। সেই ক্ষমতা তিনি অন্য কারো সঙ্গে ভাগ-বাটোয়ারা করে নিতে চান নি।

উপায়ান্তর না দেখে ইউনাইটেড মুসলিম পার্টির নেতারা জিন্নার শরণাপন্ন হলেন। জিন্না তখন সারা ভারত জুড়ে মুসলিম লিগকে গড়েপিটে তুলছিলেন; বাংলার মাটিতে পা রাখবার এই সুযোগ তিনি ছাড়লেন না। ১৯৩৬ সালের অগাস্ট মাসে জিন্না কলকাতা এলেন; নবাবের পার্টিকে বুঝিয়েসুঝিয়ে মুসলিম লিগে টেনে আনা তাঁর পক্ষে শক্ত কাজ হল না। কিন্তু তিনি ধাক্কা খেলেন অন্যত্র। বাংলার কৃষকের অবিসংবাদী নেতা শের-ই- বাংলা ফজলুল হক কায়েদ-ই-আজমের প্রস্তাবে সম্মত হলেন না। হকের এই ঔদ্ধত্যে জিন্না বেশ বিরক্ত হয়েছিলেন সন্দেহ নেই ; এর পর থেকে তিনি সবসময় ফজলুল হককে ডাকবেন "That impossible man" বলে। এবং ফজলুল হকও চিরকাল জিন্নাকে নাম ধরেই সম্বোধন করবেন, কস্মিনকালেও 'কায়েদ-ই-আজম' বলে ডাকবেন না [1]

ফল দাঁড়াল এই যে হিন্দু মহাসভা বা কংগ্রেস নয়, দুটি মুসলিম-প্রধান দল- কৃষক প্রজা পার্টি ও মুসলিম লিগ আসন্ন নির্বাচনে একে অন্যকে তার প্রতিপক্ষ হিসেবে বেছে নিল। মুসলিম আসনগুলির একটিতেও কংগ্রেস কোনো প্রার্থী দিল না। ফজলুল হকের কৃষক প্রজা পার্টিও হিন্দু আসনগুলিতে কোনো প্রার্থী দিল না, যদিও তাদের দলে বর্ণহিন্দু ও নমঃশুদ্র জোতদারের অভাব ছিল না। হক আপাতভাবে কংগ্রেসের সঙ্গে নির্বাচন-পরবর্তী সমঝোতার পথ খোলা রাখলেন, কিন্তু নির্বাচনের আগে তিনি কোথাও কংগ্রেসের সঙ্গে কোনো যৌথ কর্মসূচীতে গেলেন না। প্রজা পার্টির নির্বাচনী লাইন ছিল মোটের ওপর সেকুলার; ধর্মীয় ইস্যুর পরিবর্তে তাঁরা ডাল-ভাতের ওপরে জোর দিলেন।

উল্টোদিকে মুসলিম লিগের শ্লোগান হল মুসলিম সম্প্রদায়ের একতা ও উন্নয়ন। সম্ভ্রান্ত উচ্চবংশীয় নেতাদের সঙ্গে সাধারন গরীব মুসলিম চাষির অসেতুসম্ভব অর্থনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক ব্যবধান তাঁরা ঢাকা দেওয়ার চেষ্টা করলেন 'ইসলাম' এর নামে। (যদিও লিগ নেতা সুরাবর্দি, তাঁর সর্বোচ্চ নেতা জিন্নার মতই , ইসলামিক রীতি-অনুশাসন কিছুই মানতেন না। হ্যাম খেতেন, স্কচ পান করতেন, পশ্চিমী নাচ, সুরা ও নারীসঙ্গ পছন্দ করতেন, পশ্চিমী সঙ্গীত শুনতে ভালোবাসতেন; তাঁর কাছে পশ্চিমী সঙ্গীতের হাজারের ওপর রেকর্ডের ঈর্ষণীয় সংগ্রহ ছিল। জনৈক রুশ অভিনেত্রীকে তিনি বিবাহও করেছিলেন।) [2] জোতদার-জমিদার বিরুদ্ধতাকে ভোঁতা করবার জন্য তাঁদের অস্ত্র হল মুসলিম সাম্প্রদায়িক রেটোরিক।

লড়াই বেশ তিক্ত হয়ে উঠল। প্রচার-পর্বের তুঙ্গ মুহূর্তে ফজলুল হক নাটকীয়ভাবে (নাটকীয়তা ছিল তাঁর স্টাইল) খাজা নাজিমুদ্দিনকে ( বিশিষ্ট মুসলিম লিগ নেতা ও ঢাকার নবাবের জ্ঞাতিভাই) আহ্বান জানালেন যে কোনো আসন বেছে নিয়ে তাঁর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দিতা করতে। নাজিমুদ্দিন পটুয়াখালি নর্থ আসনটি বেছে নিলেন। এর পেছনে অনেক হিসেবনিকেশ ছিল। প্রথমতঃ, আসনটি নবাবের এস্টেটের অংশ, সেখানে নবাবের ব্যক্তিগত প্রতিপত্তি কাজে লাগানো যাবে। দ্বিতীয়তঃ এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল ১৯২৭ সালে এই এলাকাটি কুৎসিত হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গার সাক্ষী হয়েছে। ইসলামের নাম কাজে লাগিয়ে ও দাঙ্গার স্মৃতি উসকে দিয়ে ভোটে জেতা সেখানে সহজ হবে। নবাববাড়ির সবরকম প্রভাব-প্রতিপত্তি কাজে লাগানো হল আসনটিতে জেতার জন্য। এমন কি গভর্নর সার জন অ্যান্ডারসনকে পর্যন্ত নিয়ে আসা হল নাজিমুদ্দিনের হয়ে প্রচার করবার জন্য।[3]

এতদসত্বেও নাজিমুদ্দিন হারলেন। বেশ শোচনীয়্ভাবে হারলেন। ফজলুল হকের প্রাপ্ত ভোটের অর্ধেকেরও কম ভোট পেলেন তিনি। পটুয়াখালি নর্থ সম্প্রদায় হিসেবে বাংলার মুসলিমদের সমসত্ব মানসিকতা ও তথাকথিত "কৃষক-সাম্প্রদায়িক চেতনা"(Peasant-communal consciousness) নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন তুলে দিল।[4] গ্রামবাংলার অধিকাংশ আসনেই একই ছবি দেখা গেল। শহর এবং শহর-ঘেঁষা এলাকায় অবশ্য মুসলিম লিগ ভালো ফল করল। ভোটের শতাংশ কম হওয়া সত্বেও লিগ, কৃষক প্রজা পার্টির থেকে তিনটি বেশী আসন দখল করল।
অপর একটি কৃষক সংগঠন "টিপেরা কৃষক সমিতি" (পরবর্তীকালে এর নাম হবে "কৃষক ও শ্রমিক সমিতি") টিপেরা জেলায় বেশ ভালো ফল করল। জেলার সাতটি আসনের মধ্যে পাঁচটি তারা দখল করল। এই দলটির নেতৃত্বে ছিলেন বামপন্থী নেতা ইয়াকুব আলি ও ওয়াসিমুদ্দিন আহমেদ। টিপেরা কৃষক সমিতি ও কৃষক প্রজা পার্টির এই সাফল্য চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল সাধারণ মুসলিম জনতা, অন্ততঃ ১৯৩৬-৩৭ সালে, সাম্প্রদায়িক চেতনায় ভেসে যায় নি; অনেকক্ষেত্রেই তারা মনে রেখেছে-ধর্ম নয়, সমস্যা জমির। [5]

গ্রামবাংলার এই রাজনৈতিক ডিসকোর্সের মধ্যে কংগ্রেস খুব দিশাহীন অবস্থায় পড়ে গেল। জমিদার-মহাজনের দল কংগ্রেস ১৯২৮এর Bengal tenancy Ammendment Bill-এর যাঁতাকলে পড়েই বেশ হাঁপিয়ে উঠেছিল। জমিদারী বিলোপ আন্দোলন, জোতদার শ্রেণীর উত্থান, মহামন্দার ফলে সাধারণ চাষীদের খাজনা ও ঋণ শোধ না করা-এই সবই জমিদারদের ক্ষিপ্ত করে তুলছিল। জমিদার-কৃষক সমিতির ময়দানের লড়াই জায়গায় জায়গায় বেশ হিংসাত্মক হয়ে উঠছিল।সাধারণ কৃষকদের প্রতিবাদকে জমিদারবাহিনীর পক্ষ থেকে দাগিয়ে দেওয়া হচ্ছিল 'সাম্প্রদায়িক' বলে। দল হিসেবে কংগ্রেসকে এর দায় বহন করতে হচ্ছিল। এদিকে নির্বাচনী রাজনীতিতে টিকে থাকতে হলে গ্রামবাংলার এই সাধারণ কৃষকদের ফেলে দিলেও চলবে না। কংগ্রেস পড়ে গেল এক উভয়সংকটে।

সশস্ত্র বিপ্লবী দলের অনেক সদস্য আন্দামান-দেউলিতে নির্বাসনদণ্ড কাটিয়ে তখন ফিরে আসছেন। এঁদের অনেকেই নির্বাসনে থাকাকালীন মার্ক্সবাদী রাজনীতির পাঠ নিয়েছেন। এঁরা কংগ্রেসে যোগ দিয়ে তাঁদের রাজনৈতিক অ্যাজেন্ডা মেটানোর কাজে নেমে পড়লেন। ১৯৩৫ সালে কমিউনিস্ট পার্টি 'যুক্তফ্রন্ট'এর তত্ব প্রচার করে সদস্যদের বললেন কংগ্রেসের ভেতরে থেকে কৃষকদের কাছে বিপ্লবী রাজনৈতিক মতাদর্শ পৌঁছে দিতে। এইসব কমিউনিস্ট বিপ্লবীরা কংগ্রেসের হয়ে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের নিয়ে জেলায় জেলায় কৃষক সমিতি গড়ে তুলতে শুরু করলেন।

কংগ্রেসের জমিদার-প্রধান নেতৃত্ব স্বভাবতঃই তরুণ তুর্কীদের এই বৈপ্লবিক কাজকর্ম সমর্থন করেন নি। জায়গায় জায়গায় দুটি উপদলের মধ্যে কোন্দল শুরু হয়ে গেল। প্রার্থীতালিকা থেকে র‌্যাডিক্যালদের নির্মমভাবে ছেঁটে ফেলা হল। বিত্তশালীদের প্রার্থী না করে কংগ্রেসের তখন উপায়ও কিছু ছিল না, কেননা প্রদেশ কংগ্রেসের তহবিল পুরো ফাঁকা। ভোটের কাজে খরচা করবার মত পয়সা নেই, প্রার্থীরা নিজেদের খরচা নিজেরাই যোগাড় করে নিতে পারলেই ভালো।

নোট -
1.Kazi Ahmed Kamal, Politicians and Inside Stories, p. 18.
2.জয়া চ্যাটার্জির সঙ্গে নিখিল চক্রবর্তীর সাক্ষাৎকার। নিখিলবাবু মুসলিম লিগ নেতা আবুল হাসিমের সেক্রেটারি হিসাবে কাজ করতেন ও সেই সুবাদে সুরাবর্দিকে কাছ থেকে চিনতেন। এছাড়াও পড়ুন- S.Rahmatullah Memoirs, IOLR MSS Eur F/180/14 a.
3.Kazi Ahmed Kamal, Politicians and Inside Stories, pp. 118-120.
4.Partha Chatterjee argues that 'the very nature of peasant consciousness . . . is religious'.
See his 'Agrarian Relations and Communalism', pp. 11, 31.
5.Joya Chatterjee, Bengal Divided : Hindu Communalism and Partition, 1932-47, Cambridge University Press (2002), p.88.




Name:   I           

IP Address : 57.15.170.151 (*)          Date:26 Apr 2018 -- 11:02 PM

ফেসবুকে কোথাও একটা দেখলাম ইশান এই সময়টাকে নিয়ে লিখছে। ইন ফ্যাক্ট দুজনে দুজায়গায় মোটামুটি একই কথা লিখছি। পাই দেখলাম অনেক প্রশ্ন-টশ্নও করছে।

কিন্তু এখন আর ফেসবুক চিরুনি দিয়ে খুঁজেও লেখাটা খুঁজে পাচ্ছি না। আছেন, কেউ সাহায্যকারী?


Name:   সিকি           

IP Address : 132.173.82.156 (*)          Date:26 Apr 2018 -- 11:18 PM

ঈশানের লেখা তো পড়ি নি! কোথায় লিখছে?

এটা পড়ছি। একদম থ্রিলার।


Name:  dd          

IP Address : 59.205.218.108 (*)          Date:27 Apr 2018 -- 07:53 AM

লাস্ট কিস্তিটা খুব ইন্টেরেস্টিং হয়েছে।


Name:  pinaki          

IP Address : 90.254.154.99 (*)          Date:27 Apr 2018 -- 03:32 PM

কমরেড ইন্দোদা, ফেসবুকে চিরুনি দিয়ে খুঁজলে হবে না। সৈকত নাম দিয়ে খুঁজতে হবে। :-P

"দেশভাগ এবং সাম্প্রদায়িকতা নিয়ে কথা হচ্ছিল। সেই প্রসঙ্গেই এই লেখাটি। বলাবাহুল্য, এই বিষয়টিতে আমি কোনোভাবেই বিশেষজ্ঞ নই। অন্যের কিছু লেখা পড়েছি মাত্র। তার উপর এই লেখাটি মূলত স্মৃতি থেকে লেখা। সামান্য দু-একটা রেফারেন্স চেক করেছি শুধু। মোটা দাগে ঘটনাবলী ঠিকই আছে, কিন্তু এর মধ্যেও নানা বাঁক, দলবদ্ল, স্বার্থের সংঘাত, এইসব ছিল। যেগুলো এই লেখায় নেই। সেই সময়ের ইতিহাস এক গণবিস্মৃতির শিকার মনে হচ্ছিল, তাই এইটি লেখা। ভারত ছাড়ো আন্দোলন, আজাদ হিন্দ ফৌজ এইসব ইশকুল পাঠ্য বস্তুর নিচে যা যা ঘটেছিল, সেটাই এর উপজীব্য। মোটাদাগের ব্যাপারটা এরকমই ঘটেছিল। তবে সূক্ষ্মতর বিষয়গুলিতে কেউ আগ্রহ পেলে অবশ্যই নিজে নিজে বইপত্র পড়বেন।
---
অবিভক্ত ভারতবর্ষকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে গণতন্ত্র এবং সাম্প্রদায়িকতার স্বাদ ব্যাপকভাবে বৃটিশরা প্রথম দেয় ১৯৩২ সালে। কয়েকদফা গোলটেবিল বৈঠক ব্যর্থ হবার পর, যখন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ভারতীয়দের ভোটে নির্বাচিত আইনসভার কথা ঘোষণা করেন, যে ঘোষণা 'সাম্প্রদায়িক বাঁটোয়ারা' বা 'কমিউনাল অ্যাওয়ার্ড' হিসেবে পরিচিত। পরে ৩৫ সালে সেটা আইন হয়। অবশ্য গণতন্ত্র বা সাম্প্রদায়িক, কোনো শব্দটিই তখন আজকের অর্থে ব্যবহৃত হয়নি। 'সাম্প্রদায়িক' শব্দটির গায়ে তখনও নিন্দাসূচক তকমা পড়েনি। আর ভোট মানেও আজকের সার্বজনীন গণতন্ত্র নয়। প্রস্তাবানুসারে ভোটদানের অধিকার নির্ধারণের কিছু মাপকাঠি ছিল, যা আজকের যুগে অদ্ভুত লাগবে। যেমন, একটি নির্দিষ্ট পরিমানে কর দিলে, অথবা বিশ্ববিদ্যালয় গ্র‌্যাজুয়েট হলে, কিংবা উকিল বা ডাক্তার হলে ভোটাধিকার পাওয়া যাবে, এইরকম (হুবহু নয়, হুবহু জানতে গেলে বইপত্র কনসাল্ট করুন, আমার মনে নেই)। যদিও ভোটদাতাদের সংখ্যা এতেও অব্শ্য আগের চেয়ে অনেক বাড়ে, কিন্তু তার পরেও সংখ্যাটা গোটা জনসমষ্টির ১৫% এর নিচে ছিল। আজকের চোখে আরও অদ্ভুত যেটা লাগবে, সেটা হল ভোটদানের পদ্ধতি। হিন্দু, মুসলমান, খ্রিশ্চান, ইত্যাদি সম্প্রদায়ের ভিত্তিতে আসন সংখ্যা নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়। এবং আরও কৌতুহলোদ্দীপক হল, হিন্দুরা কেবল হিন্দুদেরই ভোট দেবে, মুসলমানরা মুসলমানদের, জমিদাররা জমিদারদের। কোনো সন্দেহ নেই, ডিভাইড অ্যান্ড রুল নীতির এ একদম কপিবুক প্রয়োগ।

বাংলায় এর ফলে ব্যাপারটা খুবই গোলমেলে হয়ে দাঁড়ায়। হিন্দু মুসলমানের অনুপাত তখন বাংলায় ছিল ৪৫%-৫৫% এর মতো। কিন্তু ২৫০ আসনের আইনসভায় মুসলমান দের আসন ছিল ১২০ র মতো, হিন্দুদের ৭০ (১/৪ এর একটু বেশি)। হিন্দুদের আসনের মধ্যে আবার ছিল অনুন্নত শ্রেণীর জন্য সংরক্ষণ। পরে গান্ধী-আম্বেদকর পুনা চুক্তির পরে সংরক্ষিত আসনের সংখ্যা আরও বাড়ে। ভদ্রলোক হিন্দু বাঙালির আসন সংখ্যা কমে আসে ৪০ এ। অর্থাৎ ১/৫ এরও কম। প্রসঙ্গত গান্ধী-আম্বেদকরের চুক্তির সময় কোনো বাঙালি নেতা উপস্থিত ছিলেননা, তাঁদের মত নেওয়া হয়েছিল বলেও জানা যায়না। এর ফলে যা হবার তাইই হয়। বাংলার কংগ্রেস জন্মলগ্ন থেকেই অঘোষিতভাবে ছিল হিন্দু এবং জমিদারদের দল। চাকরি বাকরি এবং অন্যান্য 'ভদ্র' কারবারে মুসলমানদের উপস্থিতি খুবই কম ছিল। ফলে বাংলার কংগ্রেস এবং ভদ্রলোক ও জমিদাররা প্রতিবাদে ফেটে পড়েন। প্রতিবাদটা একেবারে অন্যায্য ছিলনা, কারণ জনসংখ্যার অনুপাতে আসন ভাগ একেবারেই হয়নি। এবং সেটা হবার কথা ছিল বৃটিশের ভাগ করার নীতির বিরুদ্ধে। কিন্তু তা না হয়ে বৃটিশের পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রতিবাদ একেবারেই সাম্প্রদায়িক খাতে বয়ে যায়। হিন্দু মহাসভা থেকে অমৃতবাজার, রবীন্দ্রনাথ থেকে শরৎচন্দ্র, সবাই এই একই লাইনে বক্তব্য রাখেন বা সমর্থন করেন। উল্টোদিকে মুসলমান সমাজে প্রাথমিকভাবে প্রতিক্রিয়া কিছুটা মিশ্র ছিল। দীর্ঘ 'অবিচার' এর থেকে মুক্তির একটা উল্লাস ছিল, কিন্তু অনেকেই নানা কারণে সংরক্ষণহীন বা সার্বজনীন ভোটের পক্ষে ছিলেন। তার একটা কারণ হল, মুসলমানদেরও ৫০% এর কম আসন দেওয়া হয়েছিল। অবাধ নির্বাচন হলে তার থেকে অনেক বেশি আসনই পাওয়া যাবে, এটা অনেকেই ভেবেছিলেন। পরের দিকে মুসলমান সমাজেও সাম্প্রদায়িক প্রবণতা বৃদ্ধির একটা লক্ষণ দেখা যায়।

এর থেকে মনে হতে পারে, ১৯০৫ সালের যে অর্জন, সেটা ১৯৩২ সালে এক ধাক্কায় বাঙালি হারিয়ে ফেলেছিল। কিন্তু মজা হল, বিষয়টা সেরকম দাঁড়ায়নি। আইন ১৯৩৫ এর, আর নির্বাচন ১৯৩৭ সালে। তার আগে থেকেই সামাজিক মেরুকরণ অদ্ভুত ভাবে বদলে যেতে শুরু করে। এর মূল কান্ডারি ছিলেন ফজলুল হক। সে সময় মুসলিম লিগ বাংলায় একবারেই শক্তিশালী ছিলনা। ঢাকর নবাব নাজিমুদ্দিন বা অভিজাত ও শিক্ষিত সুরাবর্দী -- এরকম কিছু উচ্চশ্রেণীর মুসলিম মাতব্বর অবশ্যই ছিলেন, কিন্তু তাঁদের জনভিত্তি তেমন ছিলনা। উল্টো দিকে ছিলেন তুলনায় সাধারণ ঘর থেকে উঠে আসা ফজলুল হক। তিনি অভিজাত না হওয়ায় ব্যাপারটা শাপে বর হয়েছিল। রাজনীতির সহজাত ক্ষমতা দিয়ে ফজলুল বোঝেন, যে, অভিজাতদের সঙ্গে লড়তে গেলে, ধর্ম নয়, অন্যান্য বিষয়কে আলোচনার কেন্দ্রে আনতে হবে। অতএব তিনি তৈরি করেন কৃষক প্রজা পার্টি। সেই পার্টির লক্ষ্য ছিল জমিদাররাজকে আক্রমণ করা। এবং সাধারণ রায়ত, বা মতান্তরে সম্পন্ন কৃষক এবং জোতদারদের স্বার্থরক্ষা করা। ধর্ম একেবারেই ছিলনা। উল্টোদিকে, নাজিমুদ্দিন বা সুরাবর্দী সরাসরি মুসলিম লিগের হয়ে নির্বাচনী মঞ্চে নামেন। তাঁদের অস্ত্র ছিল ধর্ম। মুসলমান আসনগুলিতে এই দুই দলই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। সুস্পষ্টভাবে নিজেকে হিন্দুদের দল হিসেবে চিহ্নিত করে মুসলিম আসনে কংগ্রেস একটিও প্রার্থী দেয়নি। সেটাতেও শাপে বর হয়। বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের কাছে এটা আর হিন্দু বনাম মুসলমান লড়াই ছিলনা। ছিল ধর্ম বনাম জমিদারতন্ত্রবিরোধিতার লড়াই। ফজলুল হকও বেছে বেছে মুসলমান জমিদারদেরই আক্রমণ করতে থাকেন। এবং ধর্মের বিরুদ্ধে শেষ হাসি তিনিই হাসেন। ঢাকার নবাবের খাস তালুকে তিনি নবাবকে বিপুল ভোটে হারিয়ে জয়লাভ করেন।

হিন্দু আসনগুলিতে সবচেয়ে বেশি জেতে কংগ্রেস। যেহেতু সেখানেও হিন্দু মুসলমান বিরোধের কোনো ব্যাপার ছিলনা, তাই সাম্প্রদায়িকতা ছড়ায়নি। এর মধ্যে নির্বাচনের ঠিক আগে প্রদেশ কংগ্রেসের শীর্ষস্থানে আসেন সুভাষ বসুর দাদা শরৎ বসু। হক নির্বাচনের পরে কংগ্রেসের সঙ্গে জোট সরকার গড়ার দিকেই ঝুঁকেছিলেন। আজীবন অসাম্প্রদায়িক শরৎ বসু তাঁর সঙ্গে একটি সমঝোতাসূত্রও তৈরি করেন। কিন্তু বঙ্গ কংগ্রেসের বিরোধী গোষ্ঠী আর কংগ্রেস হাইকম্যান্ডের যৌথ নীতিতে যদিও সেটা বাস্তবায়িত করা যায়নি, কিন্তু মুসলমান সমাজের কাছে নিঃসন্দেহে কংগ্রেস তথা শরৎ বসুর গ্রহণযোগ্যতা বাড়ে। ফলে জোট না হওয়াতেও সম্প্রীতি ব্যাহত হয়েছিল বলা যাবেনা।
এই ১৯৩৭ সাল থেকেই বাংলা এবং ভারতে নানা নাটকীয় ঘটনা ঘটতে থাকে। বাংলার ক্ষেত্রে সেটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফজলুল হক বাংলার প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। এবং পরবর্তীকালে প্রতিশ্রুতি মাফিক একের পর এক বিল আনতে শুরু করেন। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দুটি ছিল, ১। জমিদারদের বিরুদ্ধে রায়তদের স্বার্থরক্ষার জন্য প্রজাসত্ব আইন ২। সুদ ব্যবসায়ী দের বিরুদ্ধে মানিলেন্ডার্স অ্যাক্ট (বিলের নাম ইত্যাদি বিশদ মনে নেই)। মুসলিম লিগের কায়েমি স্বার্থের বিরুদ্ধে গেলেও নির্বাচক জনসমষ্টির দিকে তাকিয়ে লিগকেও এগুলো মেনে নিতে হয়। রাজনীতিতে ধর্মের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক ইস্যুর জয় হয়। বাংলায় আর কমিউনিস্টদের দরকার নেই, ফজলুল হকই সাড়ে সব্বোনাশ ডেকে আনবে এরকম শোনা যেতে শুরু করে। অন্যদিকে ১৯৩৮ সালে প্রজাসত্ব আইন পাশ হয়। হরিপুরায় র‌্যাডিকাল সুভাষ চন্দ্র বসু কংগ্রেস সভাপতি হন। এবং তাঁর দাদা শরৎ বসু বাংলার কংগ্রেসের একটা অংশে প্রভাব বিস্তার করেন। বাংলার কংগ্রেস আবার মোটামুটি আড়াআড়ি ভাবে ভেঙে যায়। একদিকে জমিদার ও ব্যবসায়ী গোষ্ঠী। ভাবাদর্শে মুসলিম লিগ অনুসারী, কেবল ধর্মটা আলাদা। অন্যদিকে বসু গোষ্ঠী। তাঁরা স্রেফ জমিদার নয়, গ্রামাঞ্চলে চাষীদের মধ্যে সংগঠন বিস্তারের প্রয়োজন্ বুঝিছিলেন। এবং শুধু হিন্দু কৃষক নয়। তাঁরা বামপন্থী ঘরানা অনুসরণ করতে শুরু করেন। কৃষক সমিতিতে জোর দেওয়া হয়। আন্দামান ফেরত বিপ্লবীরা, তাঁদের অনেকেই তখন কমিউনিস্ট, বসু গোষ্ঠীর সংগঠক হন। কমিউনিস্ট পার্টিও কংগ্রেসের মধ্যে বসু গোষ্ঠীর হয়ে কাজ শুরু করে। ফলে, একদিকে যেমন মুসলিম লিগ বনাম কৃষক প্রজা পার্টি, অন্যদিকে কংগ্রেসের দুটি গোষ্ঠী দুটি দক্ষিণ ও বাম, এই দুই বিপরীত মতাদর্শের প্রতিনিধিত্ব করতে থাকে। সাম্প্রদায়িক বাঁটোয়ারা তিরিশের দশকের শেষ দিক পর্যন্ত রাজনৈতিক পরিমন্ডলকে সাম্প্রদায়িক করতে সক্ষম হয়না। বরং অন্য একটি মেরুকরণই ক্রমশ সুস্পষ্ট হয়। তখনও বাংলা ভাগের কথা কোনো পক্ষের কোনো মানুষের মাথায় আসেনি। বস্তুত পাকিস্তান নামটাই তখনও অজানা।

কিন্তু ১৯৩৯ সাল থেকে পট পরিবর্তন শুরু হয়। সে পরিবর্তন আর নাটকীয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়। ১৯৩৯ সালের জানুয়ারি মাসে গান্ধীজির ইচ্ছা এবং প্রার্থীর বিরুদ্ধে সর্বভারতীয় কংগ্রেস সভাপতির পদে বাম ঘেঁষা র‌্যাডিকাল সুভাষ বসু প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এবং জয়ী হন। বাংলায় ওই বছরই ফজলুল হক নিয়ে আসেন মানিলেন্ডার্স বিল। গ্রামের জমিদার এবং শহরের ব্যবসায়ী সম্প্রদায়, উভয়েরই তুমুল স্বার্থহানির সম্ভাবনা দেখা দেয়। শরৎ বসুর নেতৃত্বে দ্বিধাবিভক্ত কংগ্রেস ওই বিলের সর্বাত্মক বিরোধিতা থেকে বিরত থাকে। তার বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলতে উল্টোপক্ষে এই প্রথম বাংলার রাজনীতিতে সরাসরিতে নেতৃত্ব দিতে শুরু করেন কিছু অবাঙালি ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর মালিক। নেতৃত্ব দেন দেবীপ্রসাদ খৈতান্ নামক্ এক মারোয়াড়ি ব্যবসায়ী। সঙ্গে ছিলেন আরেক প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব, নলিনীরঞ্জন সরকার। প্রভাব্শালী হিন্দু জমিদার, ব্যবসায়ী মহল, এবং গণমাধ্যম এই বিলের বিরুদ্ধে প্রবল বিক্ষোভ প্রকাশ করে। মার্চ মাসে ত্রিপুরী কংগ্রেসে নির্বাচিত সভাপতি সুভাষের বিরুদ্ধে তীব্র চাপ তৈরি করেন গান্ধী সহ তৎকালীন গোটা নেতৃবৃন্দ। গান্ধীর কূটকৌশলের কাছে নতিস্বীকার করে পরের মাসে সুভাষ পদত্যাগ করেন। কালবিলম্ব না করে অচিরেই তাঁকে এবং তাঁর দাদাকে কংগ্রেস দরজা দেখিয়ে দেয়। মে মাসে কলকাতায় তৈরি হয় ফরোয়ার্ড ব্লক। কংগ্রেসের মধ্যে বাম ও দক্ষিণের যে ভারসাম্য ছিল, গান্ধীর ব্যক্তিগত উদ্যোগে তা নির্মূল করে কংগ্রেসকে কেবলমাত্র হিন্দু জমিদার ও ব্যবসায়ীদের পার্টিতে পরিণত করার পথ প্রশস্ত হয়। কিন্তু এইটুকুতেই ব্যবসায়ী গোষ্ঠী খুশি হয়নি। ওই বছরেরই ডিসেম্বর মাসে সাভারকর হিন্দু মহাসভার পুনর্জাগরণের জন্য কলকাতায় একটি সভা করেন। কংগ্রেসের উপর বিরক্ত ব্যবসায়ী গোষ্ঠী মহাসভাকে অকাতরে সাহায্য করতে শুরু করে। জালান, গোয়েঙ্কা, খৈতান, কানোরিয়ারা সবাই ছিলেন এই দলে। পর্দার আড়ালে কী হয়েছিল জানা নেই। তবে কংগ্রেসকে পথে ফিরিয়ে আনার জন্য ক্রমশ হিন্দু মহাসভার লাইনই গ্রহণ করতে হয়। বিশ্বযুদ্ধ এবং ভারত ছাড়োর ডামাডোলের বাজারে সেটা সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান না হলেও, যুদ্ধের শেষে স্পষ্ট বোঝা যায়। বস্তুত হিন্দু মহাসভার অস্তিত্ব বাংলায় সম্পূর্ণ বিপন্ন হয়ে পড়ে ১৯৪৫ এর পর। শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি নির্বাচনে জিতেছিলেন ঠিকই, কিন্তু সেটা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্র থেকে। বাকি সর্বত্রই কংগ্রেস। ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর আনুকূল্যে কংগ্রেসই উদ্যোগ নিয়ে 'হিন্দু' জনসমাজের প্রতিনিধি হয়ে ওঠে। এবং সারা বাংলা জুড়ে ৪৫ সালের পর দেশবিভাগের পক্ষে প্রচারান্দোলন সংগঠিত করে। 'জাতীয়' সংবাদপত্রগুলি কংগ্রেসের সঙ্গ দেয়। বাধা দেবার বিশেষ কেউ ছিলনা। যিনি দিতে পারতেন, সেই সুভাষ বসু ৪১ সালে দেশ পরিত্যাগ করে জার্মানি চলে যান। ফরোয়ার্ড ব্লক খন্ডবিখন্ড হয়ে পড়ে। শৎ বসুর সমস্ত গোষ্ঠীর কাছে গ্রহণযোগ্যতা ছিলনা। অন্য বিকল্প ছিল কমিউনিস্টরা। নৌবিদ্রোহ বা আজাদ হিন্দ ফৌজের বিচারের সময় গণ আন্দোলনের ঢল নেমেছিল, কিন্তু কমিউনিস্টদের গোটা আন্দোলনকে চালিত করার ক্ষমতা ছিলনা। এবং তারাও নীতিগতভাবে দেশভাগ মেনে নেয়। ফলে একতরফা ভাবে হিন্দু সাম্প্রদায়িক লাইনই বাংলার কংগ্রেসের লাইন হিসেবে পরিচিত হয়। বাংলা কংগ্রেস বিধান চন্দ্র রায়ের নেতৃত্বে হাইকম্যান্ডের বশংবদ একটি গোষ্ঠীতে পরিণত হয়। উল্টোদিকে তোলার মতো শক্ত কোনো গলা ছিলনা। প্যাটেল এবং নেহেরু অবাধ্যতা সহ্য করতে রাজি ছিলেননা। তোলার মতো হিম্মতও কোনো 'জাতীয় ব্যক্তিত্ব'এর ছিলনা। একমাত্র সম্ভাব্য বিরোধী যিনি হতে পারতেন, তিনি তখন লেজেন্ড, আজাদ হিন্দ ফৌজের সর্বাধিনায়ক, মৃত কিংবা বন্দী কিংবা নিখোঁজ। তিনি বেঁচে ছিলেন না মারা গিয়েছিলেন, এই লেখায় সে নিয়ে কোনো বক্তব্য নেই, থাকার মানেও নেই। কিন্তু বেঁচে থাকলেও তাঁকে দেশে ফিরতে না দেবার মতো যথেষ্ট কারণ মজুদ ছিল, এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।

এতো গেল হিন্দু সাম্প্রদায়িকতার গল্প। উল্টোদিকের গল্পটাও বলে নেওয়া যাক। ১৯৩৭ সালে ফজলুল হক যে সরকার গঠন করেন, সেটা ছিল সংখ্যালঘু সরকার। মুসলিম লিগের সঙ্গে তাকে জোট বাঁধতে হয়। এবং প্রাথমিক অ্যাজেন্ডার প্রশ্নে, আগেই বলা হয়েছে, প্রজাদের (যাদের বেশিরভাগই ছিল মুসলমান) রুটিরুজির প্রশ্নে তিনি গোঁড়া কট্টরপন্থার বিরুদ্ধে জয়লাভ করেন। কিন্তু সংখ্যালঘু দলের যা সমস্যা, এই সরকারেও তা দেখা দেয়। ক্ষমতালাভের পরেই অন্তর্দ্বন্দ্বে কৃষক প্রজা পার্টি দুভাগ হয়ে পড়ে। ফজলুল হক জোটসঙ্গী খোঁজার আপ্রাণ চেষ্টা সরকারের শেষদিন পর্যন্ত করে যান। কিন্তু কংগ্রেসের কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত কখনই সমর্থন যোগাতে রাজি ছিলনা, তাদের ঝোঁকটা, আগেই বলা হয়েছি, হিন্দু মহাসভার অ্যাজেন্ডা পুনর্দখল করায় নিয়োজিত ছিল। বসু গোষ্ঠীও কখনই সমর্থন জোগানোর মতো দানা বাঁধতে পারেনি। অতএব সরকার টেকাতে ফজলুল হককে শেষমেশ মুসলিম লিগের অ্যাজেন্ডার দিকে ঝুঁকতে হয়। জিন্না ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবে সর্বপ্রথম মুসলমানদের আত্মনিয়ন্ত্রণের কথা পেশ করেন। তার আগে তিনি বাংলা এবং পাঞ্জাবের মুসলিম নেতাদের সমর্থন নিশ্চিত করেন। ফজলুল হকের ক্ষেত্রে সরকার টেকানোর দাম ছিল লাহোর প্রস্তাব সমর্থন। বস্তুত লাহোর শহরে প্রস্তাবটির উত্থাপক তাঁকেই হতে হয়। বাংলায় তাঁর জমিদারবিরোধী নীতিতে কংগ্রেসের মতই সাবেক মুসলিম লিগ নেতা সুরাবর্দী বা নাজিমুদ্দিন কারোঅই সমর্থন ছিলনা, তাঁরা ছিলেন জমিদার বা ব্যবসায়ী শ্রেণীভুক্তই। কিন্তু জিন্নার কাছে এটা ছিল বৃহত্তর লক্ষ্যের জন্য ছোট্টো আপোস। বৃহত্তর লক্ষ্য, অর্থাৎ মুসলমান আত্মনিয়ন্ত্রণের দাবী। সেজন্য ফজলুল হক ব্যবহৃত হন। পরবর্তীকালের পাকিস্তানের দাবী বৈধতা পায়। এত কিছুর পরেও সরকার অব্শ্য টেকেনি। মুসলিম লিগ ফজলুলের পায়ের তলা থেকে মই ঠিকই কেড়ে নেয়। ফজলুল নানা ভাবে টিকে থাকার চেষ্টা করেন, এমনকি শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গেও একবার জোট করেন। কিন্তু বৃহত্তর খেলায় জিতে যাবার পর, মুসলিম লিগের কাছে বাকিটা ছিল সময়ের অপেক্ষা। ১৯৪১ সালে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে ফজলুলকে সরিয়ে তারা ক্ষমতা দখল করে। নতুন প্রধানমন্ত্রী হন সুরাবর্দী। বাংলায় 'সেকুলার'দের মূলত জায়গা ছাড়তে হয় কংগ্রেস এবং মুসলিম লিগ নামক দুই 'কেন্দ্রীয়' শক্তির কারণে। বাংলার জনতার সাম্প্রদায়িকতার কারণে নয়। দুই দলের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা দুরকম হলেও মূল পদ্ধতিটি একই ছিল। 'বাম ঘেঁষা' বিকল্পকে যেকোনো মূল্যে ছেঁটে ফেল।

এর পর বাকিটা স্রেফ গতিজাড্য। সুরাবর্দী প্রশাসক হিসেবে অপ্দার্থ এবং দুর্নীতিতে প্রশ্রয়দানকারী ছিলেন বলে বাকি কাজটা আরও সহজ হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় দুর্ভিক্ষে বহু মানুষের মৃত্যু হয়, গুজব ছড়ায়, তিনিও তা থেকে পয়সা কামিয়েছেন। মুসলমানদের অধিক পরিমানে চাকরিতে নিয়োগ করতে শুরু করেন তিনি। ফজলুল হকের সময়েও সেটা হয়েছিল, কিন্তু নীতি মেনে। তাই তাঁর দিকে কেউ আঙুল তোলেনি। সুরাবর্দীর আমলে নিয়োগে দুর্নীতি তীব্র হয়। সর্বস্তরে ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃত অপদার্থতাও প্রকট ছিল। এমনকি ১৯৪৬ সালে জিন্নার ডায়রেক্ট অ্যাকশন ঘোষণার পর কলকাতায় যে ভয়াবহ দাঙ্গা হয়, সেটাও সুরাবর্দীরই জন্য। তিনি পুলিশকে দিনকতকের জন্য নিষ্ক্রিয় রেখেছিলেন। তাতে যে মুসলমানদের বিশেষ লাভ হয়েছিল তা নয়। তারা হিন্দুদের চেয়ে অনেক বেশি সংখ্যায় মারা গিয়েছিল এই দাঙ্গায়। হিন্দুদের সংখ্যাধিক্য ছিল এই এলাকায়। তদুপরি প্রস্তুতিও ছিল দীর্ঘদিনের। হিন্দু মহাসভার অ্যাজেন্ডা বস্তুত হাইজ্যাক্ অকরে নিয়েছিল কংগ্রেস। পাড়ায় পাড়ায় চালু হয়েছিল 'হিন্দু'দের অস্ত্রচর্চা। তৈরি হয়েছিল নানা হিন্দু সংগঠন, ব্যায়াম সমিতি, এবং তৈরি করা হয়েছিল রক্ষাকারী দাদাদের। পুরোমাত্রায় অর্থ সাহায্য যুগিয়েছিলেন পূর্বোক্ত ব্যবসায়ীরা। একদিকে সুরাবর্দীর শাসনকালকে 'মুসলমান শাসন' বলে দাগিয়ে দেওয়া, বাংলা জুড়ে দেশভাগের পক্ষে প্রচার, বৃহৎ সংবাদপত্র গোষ্ঠীর সমর্থন, এবং দাঙ্গায় মেরুকরণ তৈরি, পুরোটাই সর্বভারতীয় কংগ্রেসের দেশভাগের অ্যাজেন্ডার পক্ষে যায়। কলকাতার পরে দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে অন্যত্রও। নোয়াখালিতে আরেকদফা নরমেধ যজ্ঞ হয়। মেরুকরণ তীব্র হয়। এমন একটা আবহাওয়া তৈরি করা হয়, যেন এই মেরুকরণের পরিবেশে সহাবস্থান অসম্ভব। হিন্দু ভদ্রলোক এবং মুসলমান বড়লোকদের একটা বড় অংশ এই প্রচারে সাড়া দিয়েছিলেন নিঃসন্দেহে। কিন্তু ফজলুল-সুভাষ যে জনগোষ্ঠীর ইসুকে রাজনীতির মূখ্য বিষয় করতে চেয়েছিলেন, তাদের মতামত কেউ জানতে চায়নি। কোনো পক্ষ থেকেই। অবশ্য সত্যের খাতিরে এও বলা উচিত, যে, মুসলিম লিগ বিভাজনের প্রশ্নে তুলনামূলকভাবে নমনীয় ছিল। ক্যাবিনেট কমিশন একটি আলগা ফেডারেশন হিসেবে অবিভক্ত ভারতের যে প্রস্তাব দিয়েছিলেন, তাতে জিন্না অরাজি ছিলেননা, কিন্তু কংগ্রেস রাজি হয়নি। শেষ চেষ্টা হিসেবে সুরাবর্দী, শরৎ বসু, কিরণ্শঙ্কর রায় অবিভক্ত স্বাধীন বাংলার একটি প্রস্তাব দিয়েছিলেন। শরৎ বসু তখন গুরুত্বহীন, ভাইয়ের ক্যারিশমা তাঁর ছিলনা। কিরণশংকরকে হাইকম্যান্ড এক ধমকেই থামিয়ে দেয়। ফলে বাংলা বিভক্ত হয় প্রায় বিনা প্রতিবাদে। একটি জাতি বিভক্ত হয়। লাখে লাখে মানুষ ঘটিবাটি হারিয়ে প্রাণ দেন, বা প্রাণ হাতে করে সীমান্ত পার করেন, ভাগ করার সময় যাঁদের সম্মতি নেওয়া হয়নি। ১৯৪০ থেকেই বাংলার কংগ্রেসকে কেন্দ্রের জো হুজুর বানিয়ে ফেলা হয়েছিল, ১৯৪৭ এর পর তার নতুন অধ্যায় শুরু হয়। পশ্চিমবাংলার তথাক্থিত রূপকার বিধান চন্দ্র রায় অবশ্য বহুকাল থেকেই ব্যাপারটায় অভ্যস্ত ছিলেন।"


Name:  pinaki          

IP Address : 90.254.154.99 (*)          Date:27 Apr 2018 -- 03:35 PM

যাই হোক, এবারে জাস্ট একটু ভালো বিরিয়ানি খাওয়ালেই চলবে। বেশি কিছু দাবীদাওয়া নেই। পরেরবার একটু বেশি চার্জ করব। ;-)


Name:  I          

IP Address : 57.15.196.180 (*)          Date:27 Apr 2018 -- 10:18 PM

হ্যাঁ চলো খেয়ে আসি।আর্সালান যাবে? আমার বাড়ির কাছে চিনার পার্কে আছে।


Name:  I          

IP Address : 57.15.196.180 (*)          Date:27 Apr 2018 -- 10:22 PM

মামু হেব্বি লিখেছে,তবে একটা ছোট ভুল করেছে।ফজলুল হক হারিয়েছিলেন খাজা নাজিমুদ্দিনকে।তিনি ঢাকার নবাব ছিলেন না,নবাবের কাজিন ছিলেন।ঢাকার তখনকার নবাব ছিলেন হবিবুল্লা। এঁর বাবা সলিমুল্লা মুসলিম লিগ পত্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন।এঁরা আদতে বাঙ্গালী ছিলেন না;ছিলেন কাশ্মীরী। বড়লোক চামড়া ব্যবসায়ী।পরে জমি জিরেত কিনে নবাব হন।


Name:   সিকি           

IP Address : 116.211.28.62 (*)          Date:09 May 2018 -- 02:16 PM

আচ্ছা, লেখাটা নিশ্চয়ই শেষ হয়ে যায় নি?


Name:  গবু          

IP Address : 52.110.149.79 (*)          Date:09 May 2018 -- 07:07 PM

কি প্রশ্ন!! না না, অপেক্ষা করছি i দাদা


Name:  সিকি          

IP Address : 894512.168.0145.123 (*)          Date:19 Jul 2018 -- 03:39 PM

লেখাটা কি শেষ?

এই সুতোর পাতাগুলি [1] [2] [3]     এই পাতায় আছে45--75