বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

এই সুতোর পাতাগুলি [1] [2] [3] [4] [5] [6] [7]     এই পাতায় আছে163--193


           বিষয় : দেশভাগঃ ফিরে দেখা(দ্বিতীয় পর্ব)
          বিভাগ : অন্যান্য
          শুরু করেছেন :I
          IP Address : 57.15.9.41 (*)          Date:26 Oct 2017 -- 10:02 PM




Name:   সিকি           

IP Address : 670112.215.1245.234 (*)          Date:18 Oct 2018 -- 11:32 AM

অতি অল্প হইল তো! আরো আসছে তো?


Name:  I          

IP Address : 7845.15.234523.101 (*)          Date:20 Oct 2018 -- 01:12 AM

১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের মতই '৪২ এর আন্দোলনও গোটা ভারত জুড়ে সমান তীব্র ছিল না। পাঞ্জাব ও উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ ছিল প্রায় শান্ত। যুদ্ধের সময় পাঞ্জাবের কৃষক পরিবারগুলি থেকে প্রচুর পরিমাণ সেনা নিয়োগ আর কৃষ্যিপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় চাষীর অখুশী হওয়ার কারণ ছিল না।চাষীদের মধ্যে তৈরী হয়ে উঠছিল এক সমৃদ্ধ কুলাক-সম্প্রদায়, যারা পাঞ্জাবের ক্যানাল -কলোনির সুবিধা নিয়েছিল দুহাত ভরে। মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সিও ছিল অপেক্ষাকৃত শান্ত; সম্ভবতঃ রাজাজী আন্দোলন থেকে দূরে থাকার ফলে। কেরল কংগ্রেস কমিউনিস্টদের অধীনে থাকার ফলে সেখানেও কর্মীরা ছিলেন নিষ্ক্রিয়।কলকাতা ও বোম্বাইয়ের শ্রমিকদের মধ্যেও ততদিনে কমিউনিস্ট-প্রতিপত্তি গড়ে উঠার ফলে এই দুই শহরে শ্রমিকরা খুব একটা আন্দোলনে যোগ দেন নি। দেশীয় রাজাদের এলাকাগুলির মধ্যে মাইসোরেই আন্দোলন সবচেয়ে বড় আকার নেয়।

মুসলিম লীগ শুরু থেকেই এই আন্দোলনের বিরোধী ছিল।বস্তুতঃ আন্দোলনে যোগ দিয়ে কংগ্রেস নেতা ও কর্মীরা ব্যাপকহারে জেল চলে যাওয়ার ফলে মুসলিম লীগ ভারত জুড়ে খোলা ময়দান পেয়ে যায়। সেই সুবিধা তারা ছাড়ে নি। পরবর্তী কয়েক বছর প্রচারে ও প্রভাবে তারা অনেকখানি এগিয়ে যায়। সংগঠন দ্রুত বাড়তে থাকে। কংগ্রেস মন্ত্রীসভাগুলি পদত্যাগ করায় বেশ কয়েকটি প্রদেশে মুসলিম লীগ সরকারে যোগদান করার অপ্রত্যাশিত সুযোগ পায়,যেমন সিন্ধ ও উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ। দুটি প্রদেশেই লীগ সরকার তৈরী হয় রাজনীতিতে তাদের সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে থাকা হিন্দু মহাসভার সঙ্গে হাত মিলিয়ে। এ ব্যাপারে দুই বিরোধী সাম্প্রদায়িক দলের কারোরই কোনো ছুৎমার্গ ছিল না। সিন্ধ প্রদেশের এই মিলিজুলি সরকার এমন কি ১৯৪৩ সালে প্রাদেশিক আইনসভায় 'পাকিস্তান প্রস্তাব' পাশ করে (ভারতে সর্বপ্রথম); তা সত্ত্বেও হিন্দু মহাসভার তিন মন্ত্রী পদত্যাগ না করে স্বচ্ছন্দে মন্ত্রীত্ব করে যান ( যদিও প্রস্তাব পাশের দিন তাঁরা লোক-দেখানো বিরোধিতা'র মধ্য দিয়ে শ্যাম ও কূল দু-ই বজায় রেখেছিলেন ) (1)।

শ্যাম ও কূল বজায় রাখবার আরেকটি আদর্শ উদাহরণ হল বাংলায় শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন হিন্দু মহাসভার ফজলুল হকের সঙ্গে হাত মিলিয়ে মন্ত্রীসভা গঠন করা (ব্যঙ্গ করে লোকে যাকে 'শ্যামা-হক' সরকার বলে ডাকত)। ফজলুল হকের 'তথাকথিত' হিন্দুবিরোধী নীতির কট্টর সমালোচক শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি ১৯৪১ সালে অদ্ভুত ডিগ্‌বাজি খেয়ে দ্বিতীয় হক- মন্ত্রীসভায় যোগদান করলেন; ফজলুল হক তার আগেই নিজের তৈরী কৃষকপ্রজা পার্টি ছেড়ে মুসলিম লীগে যোগদান করেছিলেন; ৪১ সালে আবার তিনি লীগ থেকেও বেরিয়ে এলেন।শ্যামা-হক মন্ত্রীসভার প্রধানমন্ত্রী হলেন দলহীন ফজলুল হক, দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী হিন্দু মহাসভার শ্যামাপ্রসাদ। এই সমঝোতার প্রশংসা করে '৪২ সালের হিন্দু মহাসভার কানপুর অধিবেশনে হিন্দু মহাসভার প্রেসিডেন্ট সাভারকর বললেন - "... মিনমিনে কংগ্রেস যাদের পোষ মানাতে পারে নি, সেইসব গোঁড়া লীগপন্থীরা দিব্যি সুন্দর প্রধানমন্ত্রী ফজলুল হক ও আমাদের শ্রদ্ধেয় হিন্দু মহাসভা নেতা ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির সক্ষম নেতৃত্বে তৈরী জোট সরকারের অধীনে আপোষরফা করে মানিয়েগুছিয়ে চলছে ...""(2)।

উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে কংগ্রেসের ডাকে ১৯৩৯ সালে কংগ্রেসেরই শাখা সংগঠন ফ্রন্টিয়ার ন্যাশনাল কংগ্রেস নেতা খান আব্দুল জব্বর খানের সরকার পদত্যাগ করে। সরকারে আসে মুসলিম লীগ, হিন্দু মহাসভা ও অকালি দলের জোট সরকার। এমন কি পাঞ্জাবেও মুসলিম লীগ ও হিন্দু মহাসভার মধ্যে সরকার গঠন নিয়ে জোর আলোচনা শুরু হয়, যদিও তা শেষমেশ বাস্তবায়িত হয় নি। সাভারকর ও মুঞ্জে উভয়েই এ ব্যাপারে আগ্রহী ছিলেন। জিন্না শিয়ালকোটে তাঁর এক ভাষণে বলেন- লীগকে যদি হিন্দু মহাসভার সঙ্গে সরকার গড়তেই হয় তো হবে! (3)

কাজেই বোঝাই যাচ্ছে মুসলিম লীগের মতই হিন্দু মহাসভাও অগাস্ট আন্দোলনের বিরুদ্ধে ছিল। সাভারকর এমনকি হিন্দু মহাসভার কর্মী-নেতাদের একটি চিঠি পাঠান-'কেউ পদ ছাড়বেন না' এই শিরোনামে। তাতে বলা হয় দেশের বিভিন্ন এলাকায় যে সব হিন্দু মহাসভা সদস্য আইনসভা/মিউনিসিপ্যালিটি/ স্থানীয় বোর্ড ইত্যাদির পদাধিকারী আছেন, তাঁরা কেউ 'ভারত ছাড়ো আন্দোলনে' প্রভাবিত হয়ে পদত্যাগ করবেন না-সকলেই পদ আঁকড়ে বসে থাকবেন (4)। হিন্দু মহাসভার তৎকালীন লাইনকে বোঝা সহজ হবে সাভারকর-ব্যবহৃত দুটি শব্দবন্ধ দিয়ে-'Responsive cooperation'(ব্রিটিশ প্রভুর সঙ্গে) ও 'Reasonable compromise'(5)। মহাসভা নেতা ও বাংলার প্রাদেশিক সরকারের উপপ্রধানমন্ত্রী শ্যামাপ্রসাদ বাংলার গভর্নরকে একটি চিঠি লেখেন এই আন্দোলন কিভাবে দমন করতে হবে সেবিষয়ে তাঁর মতামত জানিয়ে- "প্রশ্ন হচ্ছে কিভাবে এই আন্দোলনকে (ভারত ছাড়ো) বাংলায় আমরা প্রতিহত করতে পারি? প্রদেশের প্রশাসন এমনভাবে চালাতে হবে যেন কংগ্রেসের হাজার চেষ্টা সত্ত্বেও এই আন্দোলন প্রদেশে শিকড় গাড়তে না পারে..." (6)।

আর এস এস অত্যন্ত সাবধানে অগাস্ট আন্দোলনের ছোঁয়াচ বাঁচিয়ে চলে। গোলওয়ালকর পরবর্তীকালে জানাবেন এইসব আন্দোলন মানুষকে আইনশৃঙ্খলাহীন করে তোলে.. আর এস এস সেই সময় অত্যন্ত সাবধানতার সঙ্গে এই আন্দোলনকে পরিহার করে চলেছিল; কেবলমাত্র দৈনন্দিন কাজকর্মের মধ্যেই সংগঠন নিজেকে সীমাবদ্ধ রেখেছিল। ব্রিটিশ গোয়েন্দা দপ্তরও সে কথা স্বীকার করে। বোম্বাই সরকারের পাঠানো একটি নির্দেশনামার উত্তরে আর এস এস বলে-সরকারী আদেশ অমান্য করবার কোনো ইচ্ছেই তাদের নেই। ব্রিটিশ সরকার মনে করে আর এস এস -এর দিকে থেকে সরকারবিরোধী কোনো গোলমালের আশংকা নেই; কাজেই তাদের অন্যান্য কাজকর্ম নিয়ে সরকারের মাথা ঘামানোরও কোনো দরকার নেই (7)।

Notes
1.Muslim League and Hindu Mahasabha in Coalitions, Dr. Hari Desai , 25th September 2017,https://www.asian-voice.com/News/India/Muslim-League-and-Hindu-Mahasabha-in-Coalitions
2.During the Quit India Movement, RSS was in bed with Muslim League, Shamsul Islam, Aug 8th, 2017, https://www.nationalheraldindia.com/eye-on-rss/during-the-quit-india-m
ovement-rss-was-in-bed-with-muslim-league

3.Muslim League and Hindu Mahasabha in Coalitions, Dr. Hari Desai
4.Prabhu Bapu (2013). Hindu Mahasabha in Colonial North India, 1915–1930: Constructing Nation and History. Routledge. pp. 103–. ISBN 978-0-415-67165-1
5.During the Quit India Movement, RSS was in bed with Muslim League, Shamsul Islam.
6.Abdul Gafoor Abdul Majeed Noorani (2000), The RSS and the BJP: A Division of Labour, LeftWord Books, pp. 56–, ISBN 978-81-87496-13-7.
7.Bipan Chandra, Communalism in Modern India,2008, p.140.


Name:  I          

IP Address : 7845.15.120123.164 (*)          Date:21 Oct 2018 -- 01:44 AM

অগাস্ট আন্দোলনের বিরোধিতা করেছিলেন কমিউনিস্টরাও। আগেই বলা হয়েছে, কমিউনিস্টদের জনযুদ্ধের তত্ত্ব দেশের একটা বড় অংশের মানুষকে তাঁদের প্রতি বিমুখ করে তুলেছিল। সি পি আইয়ের তাত্ত্বিক নেতা ডঃ গঙ্গাধর অধিকারী (1) শেষজীবনে এসে লিখেছিলেন- " ফ্যাসিবাদ -বিরোধী যুদ্ধে আমাদের সাধারণ সমর্থন ঘোষণা সঠিক ছিল। তাছাড়াও জাপানী আক্রমনের বিরুদ্ধে আমাদের দেশকে রক্ষা করতে হবে এই কথা বলাও সঠিক ছিল।কিন্তু জাতীয় আন্দোলন ছাড়া কি কমিউনিস্ট পার্টি দেশকে রক্ষা করতে পারত? একথা কল্পনা করা কি বাস্তবানুগ ছিল যে আক্রমণের মুখোমুখি হয়ে দেশের জনসাধারণ, জাতীয় নেতৃত্ব ফ্যাসিবাদের পক্ষে চলে গেছে বলে তাদের ত্যাগ করবে এবং ফ্যাসিবাদ-বিরোধী দেশপ্রেমিক কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে মিলিত হবে?... একমাত্র পথ ছিল জাতীয় আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হওয়া, তার বিরোধিতা করা নয়(2)।"

সুভাষচন্দ্রকে 'কুইসলিং' বলা ছিল কমিউনিস্টদের আরেক বড় ভুল। জাপ বাহিনীর সঙ্গে আজাদ হিন্দ ফৌজ নিয়ে এগোতে থাকা সুভাষচন্দ্র শিগ্গিরই ব্রিটিশকে কুপোকাত করে ভারত স্বাধীন করে দেবেন, এই বিশ্বাস বহু মানুষের মধ্যে তখন বদ্ধমূল। এহেন সুভাষচন্দ্রকে 'বিশ্বাসঘাতক' বলে কমিউনিস্টরা পুরো একঘরে হয়ে পড়লেন। মণিকুন্তলা সেন স্মৃতিচারণ করেছেন-
"এর ফলে জনতার কাছ থেকে আমরা উপহার পেলাম ঘৃণা, বিতৃষ্ণা ও ধিক্কার। সুভাষচন্দ্র তখন বাংলার জনমানসে যে কতবড় শ্রদ্ধার আসনে বসেছিলেন, সেটা বোধ হয় আমাদের জানা ছিল না। নয়তো সুভাষচন্দ্র কী করছেন জানবার আগেই আমরা তাঁকে কী অপমানই না করলাম, এবং দেশের মানুষকে কী আঘাতই না দিলাম ! সুভাষ বসুর প্রশংসা গান্ধীজিও করেন নি, জওহরলালও করেন নি।... জাপানী বাহিনী নিয়ে এলে জওহরলাল নিজে গিয়ে তাঁর বিরুদ্ধে দাঁড়াবেন, এও বলেছিলেন।...সুভাষচন্দ্রের লাইন আদৌ কংগ্রেস-সমর্থিত ছিল না। কিন্তু পরবর্তীকালে কংগ্রেসের চুনোপুঁটি থেকে নেতারা পর্যন্ত বাংলাদেশে সুযোগ বুঝে পরম সুভাষভক্ত সেজে কি লম্ফঝম্পটাই না করল ! ... ইংরেজের 'দালাল' বলে কংগ্রেসীরা আমাদের গালাগাল দিত। কিন্তু পার্টির লাইনের বক্তব্যে তা ছিল না। বরং ইংরেজ সরকারের বিরুদ্ধে যা বলা হত তাতে তারা ক্রুদ্ধ হয়েও কিছু করার সাহস পায় নি আমাদের ফ্যাসিস্টচক্রের বিরোধিতার জন্য। এ বিরোধিতা তো কংগ্রেসকেও স্বীকার করতে হয়েছিল আন্তর্জাতিক পটপরিবর্তন ও ভারতের সঙ্গে তার সম্পর্ক মনে রেখেই। কিন্তু একথা তাঁরা সরাসরি তাঁদের মঞ্চ থেকে প্রথমদিকে বলতে পারলেন না এবং কংগ্রেসকর্মীদেরও শেখালেন না বোধ হয় দুটো কথা মনে রেখে। প্রথমত এতে ইংরেজবিরোধিতার ধার কমে যাবে এই ভয় এবং দ্বিতীয়ত দেশদ্রোহী আখ্যা দিয়ে যদি কমিউনিস্টদের কিছুটা কাৎ করা যায় তো মন্দ কি? সুতরাং স্বাধীনতা যখন এলই না, তখন কারান্তরালে চুপচাপ থাকাই বুদ্ধিমানের কাজ মনে করলেন তাঁরা (3)

ভারত ছাড়ো আন্দোলনের ডাক দেওয়ার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই জেলে চলে যাওয়াটা সত্যিই কংগ্রেস নেতাদের কাছে শাপে বড় হয়েছিল। মুক্ত থাকলে তাঁদের বেশ একটা অস্বস্তিকর অবস্থার মধ্যে পড়তে হত। প্রথমতঃ, বিশ্বরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তাঁদের ফ্যাসিবিরোধী ভাবমূর্তিতে প্রবল আঘাত লাগতো। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সহানুভূতি কতদিন বজায় থাকত বলা কঠিন।জওহরলাল যে কী করে বসতেন তাও বলা মুশকিল। দ্বিতীয়ত, আন্দোলন হিংসাত্মক হয়ে ওঠার দায়ভারও তাঁদের, বিশেষতঃ গান্ধীকে নিতে হত। সেই অবস্থায় গান্ধী কী করতেন, আন্দোলন প্রত্যাহারের ডাক দিতেন কিনা তাও তর্কযোগ্য।

সাময়িকভাবে ব্রিটিশ-বিরোধিতার লাইন ছাড়ার জন্যে সরকার কমিউনিস্ট পার্টির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়। তা হলেও ব্রিটিশ প্রশাসনের সন্দেহের তালিকা থেকে কমিউনিস্টরা মুক্ত হয়েছিল এটা বোধ হয় বলা যাবে না। সুমিত সরকার লিখছেন -"সাম্প্রতিককালে প্রকাশিত নথিপত্র থেকে পরিষ্কার বোঝা যায়, (যুদ্ধপ্রস্তুতিতে) কমিউনিস্টদের হঠাৎ -দেওয়া সমর্থন-প্রস্তাবকে বহু সরকারী আমলাই গভীর সন্দেহের চোখে দেখেছিলেন, বিশেষতঃ জাপ-বিরোধী গেরিলা-শিক্ষণের অনুরোধকে ঃ 'বাহ্যত ওরা ফ্যাসি-বিরোধী ও যুদ্ধের পক্ষে কিন্তু তলায় তলায় সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী; এবং এই দিক থেকে চিন্তা করলে ওদের দাবীর ব্যাপারে একটার সঙ্গে অন্যটার যোগ থাকতেই পারে।' (লিনলিথগোকে বিহারের লাট স্টুয়ার্ট, ৬ই মে, ১৯৪২, ম্যানসার, খন্ড ২, পৃ ৪৬)।" (4)

কমিউনিস্ট পার্টির লাইনটি অবশ্য পার্টি-কর্মীদের কাছেই বেশ অস্প্ষ্ট ঠেকছিল। আরেকবার মণিকুন্তলা সেনকে উদ্ধৃত করি-
" পার্টির নির্দেশ ছিল 'দেশপ্রেমিক ও পুলিশের মাঝখানে দাঁড়াও', 'পঞ্চম বাহিনী ও দেশপ্রেমিকদের মাঝখানে দাঁড়াও', কিন্তু কেমন করে এ নির্দেশ কার্যকর করবো? কারা পঞ্চমবাহিনী? যারা আমাদের কথা মানে না, তারাই কি? এখন মনে হয় ঐ কথাটা প্রয়োগ না করলে ভালো ছিল। 'দেশদ্রোহী' বললে যেমন আমাদের গায়ে জ্বালা ধরে, না জেনে কাউকে 'পঞ্চমবাহিনী' বলার অধিকারও তেমনি আমাদের নেই... ফলে 'পঞ্চমবাহিনী' কথাটার হাস্যকর অপপ্রয়োগ ঘটতে লাগল। সামান্য একটা 'ভুখামিছিল' নিয়ে যাচ্ছিল সোশ্যালিষ্ট পার্টির লোকেরা। মিছিলে ছিল নিতান্তই ছোট ছোট ছাত্র ও ছেলেমেয়েরা আর অল্প কিছু গরীব লোক। এই মিছিল বেশী এগোলেই পুলিশ ওদের পেটাবে মনে করে আমরা কিছু কর্মী সেটা ঠেকাতে গেলাম। ওরা রেগে গিয়ে আমাদের একজন কর্মীকে মারধোর করল। আমরাও 'পঞ্চমবাহিনী' বলে ওদের গালাগাল দিলাম। পরে জেনেছিলাম-আমারই এক পরিচিত সোশ্যালিষ্ট বন্ধুর নেতৃত্বে ঐ মিছিলটা যাত্রা শুরু করেছিল। তিনি আমাদের লাইন না মানতে পারেন, কিন্তু পঞ্চমবাহিনী কখনোই নন। পরে তিনি আমাকে অনুযোগ করেছিলেন, 'তুমি এই কাজ করলে?' এ ধরনের ভুল অনেক ঘটতে লাগল।" (5)

এসবের পর ১৯৪২ সালে 'পাকিস্তান ও জাতীয় ঐক্য' বিষয়ে সি পি আই গ্রহণ করল গোলমেলে 'অধিকারী তত্ত্ব'। তত্ত্বটি শুরু হয়েছিল ভারত একটি বহুভাষাভাষী ও বহু জাতিসত্ত্বা নিয়ে তৈরী দেশ-এই বিষয়টির ওপর জোর দিয়ে, যা মোটেও অযৌক্তিক ছিল না। বলা হল, সোভিয়েট ইউনিয়নের মত এখানেও বিচ্ছিন্ন হওয়ার অধিকারকে মেনে নিতে হবে; তাহলেই তৈরী হবে একটি প্রকৃত গণতান্ত্রিক ও স্বেচ্ছা-সংযুক্ত যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু তারপরেই থিসিসটি এসে পৌঁছল সিন্ধি, বালুচি, পাঞ্জাবী (মুসলমান), পাঠান ইত্যাদি মুসলিম জাতিসত্ত্বার বিচিত্র ধারণায়; এবং শেষ হল এই বলে যে, মুসলিম লীগ নেতৃত্ব এখন 'কতকটা জাতীয় কংগ্রেসের নেতৃত্বের মতই সাম্রাজ্যবাদের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে এক বিরোধী ভূমিকাই পালন করছেন' (6) । জাতিসত্ত্বার আইডেন্টিটি ও ধর্মীয় আইডেণ্টিটি এক করে ফেলার এ এক অদ্ভুত জগাখিচুড়ি প্রয়াস। ফলে কমিউনিস্ট পার্টিলাইনে অগ্রাধিকার পেল লীগের মধ্যে প্রগতিশীল অংশকে খুঁজে বের করা, বারংবার গান্ধী ও জিন্নাকে সমঝোতা করবার আবেদন জানানো, কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের মধ্যে সন্ধিস্থাপনের চেষ্টা। পার্টি এমনকি দেশভাগ ও পাকিস্তানের দাবীও প্রায় মেনে নিতে চলেছিল, কিন্তু ১৯৪৬ সালে ব্রিটিশ কমিউনিস্ট পার্টি নেতা রজনী পাম দত্ত (7) এসে হস্তক্ষেপ করে পার্টিলাইনে বদল আনেন।রজনী পাম সি পি আই নেতাদের মুসলিম লীগের সাম্প্রদায়িক চরিত্র সম্বন্ধে সাবধান করে বলেন ভারতের এখন যা প্রয়োজন তা হল একতা; বিভেদ নয়। তাঁর মনে হয়েছিল মুসলিম লীগ তাদের সাম্প্রদায়িক কর্মসূচী অগ্রসর করতে গিয়ে আসলে ব্রিটিশের হাতেই তামাক খাচ্ছে। দুটি শত্রুভাবাপন্ন পৃথক রাষ্ট্রের জন্ম বৃটিশের ডিভাইড অ্যান্ড রুল নীতিকেই পরিপুষ্ট করবে। কিন্তু ভারতকে যদি একটি প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে হয়, কেন্দ্রীয় প্ল্যানিংয়ের মাধ্যমে তার সমাজবাদী নীতিগুলিকে কার্যকর করতে হয়, তাহলে সবার আগে তাকে অখন্ড রাখতে হবে। (8)

Notes
1. ডঃ গঙ্গাধর অধিকারী একজন বিখ্যাত মার্ক্সবাদী তাত্ত্বিক ও রসায়নবিজ্ঞানী। আইনস্টাইন ও ম্যাক্স প্ল্যাঙ্কের সঙ্গে কাজ করেছেন। মীরাট ষড়যন্ত্র মামলায় কারারুদ্ধ হওয়ায় স্বয়ং আইনস্টাইন তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী র‌্যামসে ম্যাকডোনাল্ডকে চিঠি লিখে অধিকারীকে মুক্ত করতে অনুরোধ করেন।
2.Communist Party and India`s path, p.51
3.মণিকুন্তলা সেন, সেদিনের কথা, নবপত্র প্রকাশন, পৃ ৬০-৬১।
4.সুমিত সরকার, পৃ ৩৫৫।
5.মণিকুন্তলা সেন, পৃ ৬১।
6.Gangadhar Adhikary, 'National Unity Now !', People's Age, 8 Aug, 1942
7. রজনী পাম দত্তঃ বাঙালী পিতা ও সুইডিশ মাতার সন্তান রজনী পাম দত্তের জন্ম ও কর্ম ইংল্যান্ডে। ব্রিটিশ কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য রজনী পাম ছিলেন রামবাগানের দত্তবাড়ির সন্তান। পিতা উপেন্দ্রনাথ ছিলেন সার্জেন। রজনী পাম দত্তের ঠাকুর্দার ভাই ছিলেন বিখ্যাত ঐতিহাসিক-সাহিত্যিক রমেশ চন্দ্র দত্ত।১৯৩৯-৪১ অবধি তিনি ছিলেন ব্রিটিশ কমিউনিস্ট পার্টির সেক্রেটারি। বরাবরের ভারত-বন্ধু রজনী পাম দত্তের উল্লেখযোগ্য বইগুলির মধ্যে একটি হল India Today।
8.Muhammad Amir Hamzah, Role of the Communist Party of India in Pakistan Movement with reference to the right of self -determination, http://www.academia.edu/14288233/Role_of_the_Communist_Party_of_India_
in_Pakistan_Movement_with_reference_to_the_right_of_self_-determinatio
n



Name:  I          

IP Address : 7845.15.674523.4 (*)          Date:21 Oct 2018 -- 09:49 PM

কারারুদ্ধ হওয়ার ৬ মাস পর ১৯৪৩ এর ৯ই ফেব্রুয়ারি গান্ধী আগা খাঁ প্যালেসে ২১ দিনের অনশন শুরু করেন। ৩১শে ডিসেম্বর বড়লাট লিনলিথগো-কে লেখা একটি 'ব্যক্তিগত' চিঠিতে তিনি বলেন- যেভাবে তাঁকে ও অন্যান্য কংগ্রেস নেতাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে, গ্রেপ্তারের পরে বড়লাট যে সরকারী বয়ান দিয়েছেন, ভারতসচিব লিও আমেরি তাঁর বিরুদ্ধে যেরকম বিষোদ্গার শুরু করেছেন, সেসবের বিরুদ্ধে প্রতিবাদস্বরূপ তিনি এই অনশন করতে চলেছেন। লিখেছেন- ''আমার কাছ থেকে আশা করা হচ্ছে আমি কংগ্রেসীদের 'তথাকথিত' হিংসাত্মক কার্যকলাপের নিন্দা করবো; কিন্তু খবরের কাগজের 'heavily censored' রিপোর্ট ছাড়া এমন আর কোনো তথ্য আমার কাছে নেই যার ভিত্তিতে আমি এর নিন্দা করতে পারি। আর আমি বলতে বাধ্য যে এইসব রিপোর্টের ওপর আমার বিন্দুমাত্র বিশ্বাস নেই।" (1) .


একটি অস্ট্রেলীয় দৈনিক The Mercury-র লন্ডন সংবাদদাতা তাঁর ১২ই ফেব্রুয়ারি'র প্রতিবেদনে লিখছেন-" The fast is a sequel to correspondence with the Viceroy (Lord Linlithgow) in which Gandhi repudiated the suggestion that Congress was responsible for murder and sabotage, which he blames on the Government." মৌলানা আবুল কালাম আজাদ লিখেছেন, জেলে বসে তাঁরা খবরের কাগজ মারফৎ জানতে পেরেছিলেন গান্ধীজী 'চিত্তশুদ্ধি'র জন্য অনশন শুরু করেছেন। আজাদের মনে হয়েছিল গান্ধীজী দুটি কারণে এবারের অনশন শুরু করে থাকতে পারেন-এক তো তিনি ভাবতেই পারেন নি সরকার এত তাড়াতাড়ি তাঁদের গ্রেপ্তার করবে। দ্বিতীয়তঃ, তাঁর আশা ছিল তিনি তাঁর অহিংসার আদর্শে আন্দোলনটিকে গড়ে তুলতে যথেষ্ট সময়-সুযোগ পাবেন। দুটির কোনোটিই না ঘটায় তিনি তাঁর ভুলের প্রায়শ্চিত্তস্বরূপ অনশন করছেন (2) ।

সে যাই হোক,লিনলিথগো'র প্রত্যুত্তর গান্ধীকে খুশী করতে পারে নি। দুজনের মধ্যে চিঠি বিনিময় চলতে থাকে। ৫ই ফেব্রুয়ারির চিঠিতে লিনলিথগো লেখেন- "I would welcome a decision on your part to think better of it, not only because of my own natural reluctance to see you willfully risk your life, but because I regard the use of a fast for political purposes as a form of political blackmail (himsa) for which there can be no moral justification, and understood from your own previous writings that this was also your view." (3) জবাবে ক্ষিপ্ত গান্ধী লেখেন -"উত্তরপুরুষ আমাদের বিচার করবে-আপনি, যিনি এক সর্বশক্তিমান সরকারের প্রতিনিধি আর আমি, একজন সাধারণ মানুষ যে কেবল তার দেশ ও মানবতার সেবা করতে চেয়েছিল।"

গান্ধীর অনশন সম্বন্ধে ব্রিটিশ সরকারের মনোভাবের সঙ্গে একমত না হলেও একথা অবশ্যই মনে হয়, প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করবার জন্য অনশনের ব্যবহার এক ধরণের বলপ্রয়োগ তো বটেই। গান্ধীর অনশনের বিরুদ্ধে এই রাজনৈতিক ব্ল্যাকমেলিংয়ের অভিযোগ বারবারই উঠেছে তাঁর বিরোধীদের পক্ষ থেকে। গান্ধী যদিও ব্যাপারটিকে এইভাবে দেখাতে চান নি; তিনি বলেছেন নৈতিক চাপের (moral Pressure) কথা। কিন্তু গান্ধীকথিত 'কোনোরকম বলপ্রয়োগ ছাড়াই ক্ষমতা' অর্জনের আদর্শের সঙ্গে এর বিরোধ রয়েছে। Rediscovering Gandhi বইয়ের লেখক
ডঃ জয়নারায়ণ শর্মা লিখেছেন-'...আসলে দুজন গান্ধী ছিলেন-একজন আদর্শবাদী গান্ধী, অন্যজন বাস্তববাদী রাজনীতিবিদ গান্ধী। আদর্শবাদী গান্ধী স্বপ্ন দেখতেন সম্পূর্ণ চাপমুক্ত এক রাজনৈতিক ক্ষমতার , যেখানে সহিংস বা অহিংস, কোনোরকম বলপ্রয়োগেরই প্রয়োজন পড়বে না। কিন্তু বাস্তবে যখন তিনি তাঁর ক্ষমতা প্রয়োগ করতেন তখন প্রতিপক্ষের ওপর কিছু চাপ তো থাকতোই।' (4)।

উদাহরণস্বরূপ গান্ধী-আম্বেদকর পুনাচুক্তির কথা ভাবা যেতে পারে। ১৯৩২ সালের ২০শে সেপ্টেম্বর কমিউন্যাল অ্যাওয়ার্ড প্রত্যাহারের দাবীতে গান্ধী ইয়েরওয়াদা জেলে আমরণ অনশন শুরু করেন। ব্রিটিশ সরকার ঘোষণা করে, কমিউন্যাল অ্যাওয়ার্ড তথা পৃথক ইলেকটোরেট দলিতদের (Depressed Class) দাবীমত ঘোষণা করা হয়েছে, অতএব দলিতরা তাঁদের দাবী থেকে সরে না এলে সরকারের কিছু করার নেই। সরকারী এই ঘোষণা শুনে কংগ্রেসের বর্ণহিন্দু ও দক্ষিনপন্থী নেতারা আম্বেদকরের ওপর চাপ তৈরী করেন পৃথক ইলেকটোরেটের দাবী থেকে সরে আসার জন্য। স্যার তেজবাহাদুর সপ্রু একটি মীমাংসাপ্রস্তাব আনেন- দলিতদের আলাদা কোনো ইলেকটোরেট থাকবে না, সকল হিন্দুর জন্য একটি জয়েন্ট ইলেকটোরেটই বহাল থাকবে, কিন্তু তার মধ্যে দলিতদের জন্য একটি নির্দিষ্ট সংখ্যক আসন বরাদ্দ থাকবে। আম্বেদকর নিমরাজি হয়ে যান গান্ধীর স্বাস্থ্যের কথা ভেবে। এর পর প্রশ্ন ওঠে কতদিনের জন্য এই ব্যবস্থা বহাল থাকবে তাই নিয়ে।আম্বেদকর দাবী করেন যে অন্ততঃ ১৫ বছরের জন্য এই ব্যবস্থা বহাল থাকুক; ১৫ বছর বাদে একটি গণভোট করে বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা হোক। গান্ধী ১৫ বছরের বদলে ৫ বছর-এ রাজী হয়ে যেতে বলেন আম্বেদকরকে। গান্ধী এ-ও বলেন যে তিনি স্বীকার করেন আম্বেদকরের যুক্তি অকাট্য। কিন্তু বর্ণহিন্দুদের মনপরিবর্তনের জন্য ৫ বছরই যথেষ্ট বলে তাঁর মনে হয়। তার বেশী সময় যদি আম্বেদকর দাবী করেন তাহলে তাঁর(গান্ধীর) মনে হবে যে আম্বেদকর বর্ণহিন্দুদের উদ্দেশ্য ও সততা সম্বন্ধে সন্দিহান ও আসলে চান দলিতদের সংগঠিত করে গণভোটের রায়কে প্রভাবিত করতে। আম্বেদকর দর কষাকষি করে ১০ বছরের দাবী জানালে গান্ধি তাঁর শেষকথা শুনিয়ে দেন-'৫ বছর অথবা আমার মৃত্যু। বেছে নিন।' (5) । সাক্ষাৎকারটি সেখানেই শেষ হয়ে যায়। আম্বেদকর চাপের কাছে নতিস্বীকার করে ভগ্নমনোরথ হয়ে ফিরে আসেন।

ডঃ শর্মা বলেছেন রাজনৈতিক পদ্ধতি হিসেবে অনশন কেবল সহানুভূতিশীল প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধেই সফল হতে পারে। মহম্মদ আলি জিন্নার মত আপোষহীন গান্ধীবিরোধীর সঙ্গে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দিতায় গান্ধী কখনো অনশনের পথে হাঁটেন নি। পুনা চুক্তি নিয়ে অনশনের ক্ষেত্রে আম্বেদকরের জায়গায় যদি জিন্না থাকতেন , তাহলে ফল সম্পূর্ন উল্টোও হতে পারতো। (6)

Notes
1.MKG to Linlithgow, 31st December, 1942, The National Archives, London.
2.Azad, p.94.
3.Linlithgow to MKG , 5th February,The National Archives, London.
4.Jai Narain Sharma,Rediscovering Gandhi, Concept Publishing Company, 2007, Vol. 3, p. 99.
5.Ibid, p.94
6.Ibid, p.98


Name:  I          

IP Address : 7845.15.011223.145 (*)          Date:21 Oct 2018 -- 11:21 PM

আগের প্রসঙ্গে ফিরে আসি। এবারে কিন্তু লিনলিথগো গান্ধীকে এক ইঞ্চিও জমি ছেড়ে দেওয়ার পক্ষপাতী ছিলেন না। সরকার ধরেই নিয়েছিল, গান্ধীর যা বয়স আর স্বাস্থ্যের যা অবস্থা, তাতে ২১ দিন অনশন করা মানে সাক্ষাৎ মৃত্যু। কিন্তু সরকার সেই সম্ভাবনায় বিচলিত হয় নি। ঠিক করা হয়েছিল গান্ধীর কোনো দাবীই মেনে নেওয়া হবে না। "আমার নিজস্ব মতামত সম্পূর্ণ পরিষ্কার। গান্ধী যদি অনশন করে মরতে চান তাহলে তাঁকে মরতে দেওয়া হোক"- আমেরি-কে লিখেছেন লিনলিথগো। (1)

প্রশাসন গান্ধীর সম্ভাব্য মৃত্যুর প্রস্তুতি নিতে থাকে। দাহকার্যের জন্য চন্দনকাঠও এনে রাখা হয়। ঠিক হয়, আগা খাঁ প্যালেসেই তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন করা হবে ও চিতাভষ্ম ছেলেদের হাতে তুলে দেওয়া হবে।(2)। চার্চিল লিনলিথগোকে চিঠি লিখে জানতে চান-"আমি শুনেছি গান্ধী ওর অনশনের ধোঁকাবাজির সময় খাবার জলে গ্লুকোজ মিশিয়ে নেয়। সেটা সত্যি কিনা খতিয়ে দেখা যাবে কি?" (3)

১৮ই ফেব্রুয়ারি থেকে গান্ধীর স্বাস্থ্যের দ্রুত অবনতি শুরু হয়। চিন্তিত রুজভেল্ট ( ''সম্ভবতঃ মাদাম চিয়াং কাই শেক ও শ্রীমতি রুজভেল্টের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে''- লিখেছেন ভারতসচিব লিও আমেরি ) লিনলিথগো'র কাছে তাঁর বিশেষ দূত পাঠান বড়লাটকে বুঝিয়েসুঝিয়ে গান্ধীকে মুক্ত করতে। লিনলিথগো রুজভেল্টের দূতের সঙ্গে দেখা করতেই অস্বীকার করেন; বলেন মার্কিন- হস্তক্ষেপের ফল হবে 'disastrous।' (4)

২১শে ফেব্রুয়ারি রাতে গান্ধীর খিঁচুনি শুরু হয়। ৯ জন ডাক্তারের প্যানেল ঘোষণা করে, গান্ধীর ইউরেমিয়া এমন অবস্থায় পৌঁছেছে যে অবিলম্বে অনশন প্রত্যাহার না করলে তাঁর জীবন বিপন্ন হয়ে পড়বে। জেনারেল স্মাটস চার্চিলকে একটি ব্যক্তিগত বার্তা পাঠিয়ে অনুরোধ করেন- গান্ধীর মৃত্যু এড়ানোর জন্য সবরকম চেষ্টা করা উচিৎ। দরকার হলে ওঁকে জোর করে খাওয়ানো হোক বা ইঞ্জেকশন দেওয়া হোক। নিরুদ্বিগ্ন চার্চিল উত্তর দেন-" আমার মনে হয় না গান্ধীর মরবার সামান্যতম ইচ্ছে আছে।সম্ভবতঃ গত এক সপ্তাহে ও আমার চেয়েও ভালো খাবারদাবার খেয়েছে।"

ডাঃ বিধান রায় গান্ধীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক হিসেবে তাঁর দেখাশোনা করবার জন্য সরকারের কাছে চিঠি লেখেন। সরকার সে আবেদন মঞ্জুর করে। একটা সময় অবস্থা এতটাই সংকটজনক হয়ে পড়ে যে, সরকার গান্ধীমৃত্যুর ঘোষণা ভারতবাসীর কাছে প্রচার করবার জন্য বিশেষ বুলেটিন বানানোর কাজ শুরু করে। কিন্তু অতিমানবিক ইচ্ছাশক্তির জোরে গান্ধী এবারের ফাঁড়া কাটিয়ে উঠলেন। ২১ দিন পরে তিনি তাঁর অনশন ভঙ্গ করেন।

গান্ধীর জন্য অবশ্য আরো আঘাত অপেক্ষা করছিল। ডিসেম্বর মাসে কস্তুরবা নিউমোনিয়ায় মরনাপন্ন হয়ে পড়েন। গান্ধীকে জেল থেকে সাময়িকভাবে ছাড়া হয় মৃত্যুপথযাত্রী স্ত্রী-র পাশে থাকবার জন্য। অনেকদিন ধরে ভুগে, অনেক কষ্ট পেয়ে অবশেষে ২২শে ফেব্রুয়ারি কস্তুরবা মারা যান। দাহকাজ শেষ হলে গান্ধী জেলখানায় ফিরে যান। মীরা বেন সেই রাস্তায় গান্ধীর সঙ্গে ছিলেন।সেই প্রথম তিনি গান্ধীকে কাঁদতে দেখেন।

তার অনেক আগেই গান্ধীর প্রিয় সচিব মহাদেব দেশাই আগা খাঁ প্যালেসে গান্ধীর চোখের সামনেই হৃদরোগে মারা গিয়েছেন।

১৯৪৪ সালের এপ্রিল মাসে জেলখানায় মৌলানা আজাদের কাছে একটি টেলিগ্রাম এসে পৌঁছয়। তাতে তাঁর স্ত্রী-র মৃত্যুসংবাদ ছিল। আজাদ স্ত্রী-র শেষকৃত্য করবার জন্য বড়লাটের কাছে সাময়িক মুক্তির আবেদন জানান। বড়লাট তার কোনো উত্তর দেন না। এর তিনমাস পরে আজাদের বোন মারা যান।

স্বাধীনতার পথ ছেয়ে যায় প্রিয়মৃত্যুবিচ্ছেদের বেদনায়। যদিও আরো অনেক মৃত্যু, হিংসা, দাঙ্গা-দেশভাগ তাঁদের পথ চেয়ে বসেছিল। সমষ্টির যে বেদনার কাছে নিজের ব্যক্তিগত ব্যথা তুচ্ছ হয়ে যায়।

Notes
1. Linlithgow to Amery, 8 Feb 1943,The National Archives, London.
2. Ajad, p.94
3. Churchill to Linlithgow, 11 Feb, 1943,The National Archives
4. Linlithgow to William Phillips, 19 Feb, 1943


Name:  সিকি          

IP Address : 894512.168.0145.123 (*)          Date:22 Oct 2018 -- 09:36 AM

ইন্দো,

পড়ছি। একটা রিকো আছে। সর্দার বল্লভভাই পটেল লোকটির ওপর কি একটু আলাদা করে আলো ফেলতে পারবে? পাসিং রেফারেন্স পড়েছিলাম কোথাও একটা যে, পটেল হিন্দু মহাসভা তথা আরএসএসের ওপর যথেষ্ট সহানুভূতিশীল ছিলেন। মূলত তাঁর সহানুভূতির কারণেই সাভারকরের ট্রায়াল খুব ভালোভাবে সম্পন্ন হয় নি এবং সহজেই গান্ধীহত্যা ষড়যন্ত্রের আরোপ থেকে সাভারকর মুক্তি পেয়ে যান বেকসুর।

পরবর্তীতে পটেল দিল্লিতে আরএসএসের শোভাযাত্রায় প্রথান অতিথিও হয়েছিলেন বলে পড়েছিলাম। লিঙ্ক দিতে পারব না - তুমি একটু সাহায্য করবে?


Name:  I          

IP Address : 7845.15.451223.183 (*)          Date:22 Oct 2018 -- 10:29 AM

হ্যাঁ সেসব কথায় পরে আসবো। প্যাটেলকে নিয়ে অনেক কিছু লেখার আছে।


Name:  Du          

IP Address : 7845.184.2345.14 (*)          Date:24 Oct 2018 -- 05:34 AM

লেখাটা চুম্বকের মতো হচ্ছে। অসম্ভব ভালো।


Name:  I          

IP Address : 785612.40.90034.186 (*)          Date:24 Oct 2018 -- 10:48 AM

ধন্যবাদ, দু দি।


Name:  de          

IP Address : 90056.185.673423.53 (*)          Date:24 Oct 2018 -- 03:08 PM

অসামান্য লেখা - এ লেখা বই হয়ে যেন অবশ্যই বের হয় - আমি দত্তক নেবো - আগেভাগেই বলে দিলাম -


Name:  দু          

IP Address : 237812.58.560112.134 (*)          Date:24 Oct 2018 -- 08:03 PM

আমিও আছি।


Name:  I          

IP Address : 785612.40.5656.86 (*)          Date:25 Oct 2018 -- 11:53 PM

জওহরলাল নেহরু ফজলুল হকের পলিটিক্যাল সেক্রেটারি ছিলেন ১৯১৮ থেকে ১৯১৯।জানতেন? আমি তো জানতাম না!


Name:  I          

IP Address : 785612.40.9001212.179 (*)          Date:27 Oct 2018 -- 11:48 PM

আগের লেখায় একটা ভুল তথ্য দিয়েছি। শুধরে নিচ্ছি। কস্তুরবা তাঁর স্বামী মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর সঙ্গে আগা খাঁ প্যালেসেই বন্দী ছিলেন। বন্দী থাকা অবস্থাতেই তাঁর নিউমোনিয়া হয় ডিসেম্বরে। ফেব্রুয়ারিতে তাঁর মৃত্যুও হয় ঐ আগা খাঁ প্যালেসে। কাজেই গান্ধীকে জেল থেকে ছাড়া হয় স্ত্রী-র পাশে থাকার জন্য-এই তথ্যটি ডাহা ভুল। গান্ধী কস্তুরবার অসুস্থতার গোটা সময় জুড়ে তাঁর পাশেই ছিলেন। তাঁকে সাময়িক্ভাবে ছাড়া হয়েছিল কস্তুরবার শেষকৃত্য সম্পন্ন করবার জন্য।


পরের লাইনটি অবশ্য সঠিক (অন্ততঃ মীরা বেন'এর বক্তব্য অনুযায়ী)। যে, মীরা বেন সেই প্রথম গান্ধীকে কাঁদতে দেখেন।

যেটুকু জুড়বার, তার সঙ্গে এই লেখার মূল ধারার কোনো যোগ অবশ্য নেই। গান্ধী কস্তুরবার চিকিৎসার জন্য একজন আয়ুর্বেদিক চিকিৎসক নিয়োগ করবার দাবী জানিয়েছিলেন; বেশ দেরী করেই সরকার একজন কবিরাজকে নিয়োগ করে( এই বিলম্ব, গান্ধীর মতে ছিল, অযৌক্তিক)। মৃত্যুর দিন সকালে কনিষ্ঠ পুত্র দেবদাস মায়ের জন্য কলকাতা থেকে পেনিসিলিন ইঞ্জেকশন নিয়ে এসে পৌঁছেছিলেন; কিন্তু গান্ধীর বিরুদ্ধতায় তাঁকে সেই ইঞ্জেকশন দিতে দেওয়া হয় নি।


Name:  S          

IP Address : 90067.146.9004512.46 (*)          Date:27 Oct 2018 -- 11:57 PM

পোথোম পব্বের লিন্ক কোথায়?


Name:   Indranil Ghosh Dastidar           

IP Address : 785612.40.9001212.179 (*)          Date:28 Oct 2018 -- 12:24 AM

http://www.guruchandali.com/blog/2017/09/20/1505930784058.html?author=
980183108708487



Name:  S          

IP Address : 90067.146.9004512.46 (*)          Date:28 Oct 2018 -- 12:27 AM

ধন্যযোগ।


Name:  I          

IP Address : 785612.40.9001212.179 (*)          Date:28 Oct 2018 -- 02:38 AM

'ভারত ছাড়ো' আন্দোলনের মেয়াদ ফুরিয়ে এল '৪২ এর শেষদিকে। ক্ষমতা হস্তান্তরের আগে আর কোনো বড়মাপের আন্দোলনের মুখোমুখি হতে হয় নি ব্রিটিশ ভারত সরকারকে। হলে অবশ্য ব্রিটিশ সরকার তা সামলাতে পারতো কিনা তা লাখ টাকার প্রশ্ন। অত্যন্ত নির্মমভাবে অগাস্ট আন্দোলন দমন করা হয়েছিল। সাময়িকভাবে জাতীয় আন্দোলন হেরে গিয়েছিল বটে, কিন্তু লম্বা দৌড়ে এর ফল ব্রিটিশের পক্ষেও খুব আশাব্যঞ্জক হয় নি। যুদ্ধের শেষে ব্রিটেন বিজয়ী হয়ে বেরিয়ে এল ঠিকই, কিন্তু যে সাম্রাজ্যে কখনো সূর্য অস্ত যায় না, সেই মহামহিম 'এম্পায়ার' তখন তার অতীতের ছায়া। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে দুই মহাশক্তি-মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন। ব্রিটেন সেখানে অনেক পিছিয়ে থাকা তিন নম্বর শক্তি।মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে তখন তার প্রবল ঋণের বোঝা। সেই প্রথমবারের জন্য ভারতবর্ষও ব্রিটেনের ঋণগ্রহীতা থেকে ঋণদাতার তালিকায় উঠে এসেছে। '৪৩-এর এপ্রিল নাগাদ যুদ্ধবাবদ ভারতের কাছে ব্রিটেনের ঋণ গিয়ে দাঁড়িয়েছে ৪৫ কোটি পাউন্ড স্টার্লিং আর ঋণের বোঝা বাড়ছে তো বাড়ছেই; এর আর কোনো শেষ দেখা যাচ্ছে না ('৪৫ সাল নাগাদ এই পরিমাণ গিয়ে দাঁড়াবে ১০০ কোটি পাউন্ডে)। ১৯৪৪ সালে অর্থনীতিবিদ জন মেনার্ড কেইনস ভারতের ঋণ শোধ করবার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে ধার অথবা 'উপহার' নেওয়ার কথা ভাবছেন। ব্রিটিশ প্রশাসনের অনেকেই অব্শ্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ব্রিটেনের অভ্যন্তরীন বিষয়ে নাক গলাতে দিতে চান না; তার চেয়ে বরং ভারতকে এককালীন কিছু থোক টাকা ধরে দিতে তাঁদের আপত্তি নেই। (1)

এহেন দুর্বল অর্থনীতি নিয়ে ভারতশাসন তখন ব্রিটেনের কাছে সহায়্সম্বলহীন জমিদারের হাতিপোষার অবস্থায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে। ভারত তখন শোষিত হতে হতে ছিবড়েতে পরিণত; লাভের গুড় সব শেষ। উল্টে এই বিশাল উপমহাদেশের প্রশাসন, পুলিশ ও সেনাবাহিনীর রক্ষণাবেক্ষণ করতে গিয়ে ব্রিটিশ সরকারের ডাইনে আনতে বাঁয়ে কুলোয় না। এই অবস্থায় আবার একটি বিদ্রোহ দমনের ঝুঁকি ব্রিটেনের পক্ষে নেওয়া সম্ভব ছিল না। বজ্রমুষ্টিতে শাসন চালানোর দিন শেষ-এবার প্রয়োজন আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে কোনোভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করে মানে মানে ঘরে ফিরে যাওয়া। ১৯৪৩-এর গ্রীষ্মে লিনলিথগো ভাইসরয়ের পদ থেকে অবসর গ্রহণ করলেন। যাবার আগের বছরই মার্কিন সাংবাদিক লুই ফিশারের সঙ্গে একটি সাক্ষাৎকারে তিনি বলছেন-"আমরা আর খুব বেশীদিন ভারতে থাকছি না। কংগ্রেস অবশ্য একথা বিশ্বাস করে না।কিন্তু আমাদের মেয়াদ ফুরিয়ে এসেছে। আমরা ফিরে যাওয়ার জন্য তৈরী হচ্ছি।"(2)

পরবর্তী ভাইসরয় হয়ে এলেন ভারতের সেনাপ্রধান লর্ড ওয়াভেল; এবং তাঁর স্থলাভিষিক্ত হলেন স্যার ক্লড অকিনলেক। ওয়াভেল কোনোদিক থেকেই অতি উদারপন্থী ছিলেন। কিন্তু তখন সময় অন্য, চোখ রাঙানীর দিন শেষ, এবার আলোচনার টেবিলে বসবার পালা। ওয়াভেল চার্চিলকে লিখলেন ঃ যুদ্ধের পরে সম্ভাব্য আন্তর্জাতিক জনমত ,ব্রিটিশ জনসাধারণ এবং সেনাবাহিনীরও যা মনোভাব হবে, তাতে গায়ের জোরে ভারতকে ধরে রাখা সম্ভব হবে না। 'এই ধরণের বিদ্রোহী, যেমন ডি ভ্যালেরা, জগলুল (পাশা), এদের সঙ্গে আগেও আমাদের আলাপ -আলোচনা করতে হয়েছে' আর বাস্তবিকই এখনই আলোচনা শুরু করে দেওয়া হবে বুদ্ধিমানের কাজ। কারণ যুদ্ধ শেষ হলেই বন্দীরা মুক্তি পাবে এবং সেনাবাহিনী ভেঙে দেওয়া ও বেকারির ফলে আসবে অশান্তি, আর তাতেই তৈরী হবে 'বিক্ষোভ দেখানোর এক উর্বর ক্ষেত্র, যদি না তার আগেই আমরা কংগ্রেসের শক্তিকে ঘুরিয়ে দিতে পারি আরো লাভজনক কোনো খাতে, যেমন ভারতের প্রশাসনিক সমস্যা সংক্রান্ত কাজকর্ম বা সাংবিধানিক সমস্যা সমাধানের চেষ্টায়'। (3)

বস্তুতঃ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মিত্রশক্তির জয়ের পেছনে ভারতীয় সৈনিকদের অবদান ছিল বিশাল (যদিও পশ্চিমী ইতিহাস সেকথা সুবিধেমত ভুলে গিয়েছে)। আড়াই লাখ সৈন্যের এই বিশাল বাহিনী ( দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মিত্রশক্তির বৃহত্তম বাহিনী এবং মানবসভ্যতার ইতিহাসে বৃহত্তম স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী) মিত্রশক্তির হয়ে যুদ্ধে লড়েছে উত্তর ও পূর্ব আফ্রিকার মিশর, তিউনিসিয়া,আলজেরিয়া, ইথিওপিয়ায়,লড়েছে ইউরোপীয় রণাঙ্গনে ফ্রান্স-গ্রিস-ইতালিতে; এবং সবচেয়ে বেশী লড়েছে পূর্ব রণাঙ্গনে মালয়-বোর্ণিও-সিঙ্গাপুর-হংকং ও বার্মায়। ৮৭ হাজারের মত সৈনিক (কোনো কোনো হিসাবে ৮৯ হাজার) মারা গেছেন, আহত হয়েছেন ৩৪ হাজারেরও বেশী, এবং যুদ্ধবন্দী হয়েছেন আরো ৬৭ হাজার।(4) যুদ্ধে ব্রিটেনকে ভারতের দেওয়া যুদ্ধসামগ্রী- রসদের আর্থিক মূল্য অর্থনীতিবিদরা তাও হিসেব করে উঠতে পারেন, কিন্তু এই বিপুল পরিমাণ সৈনিকের ত্যাগের মূল্য কিভাবে হিসেব করা সম্ভব জানি না।

চার্চিল অবশ্য ছিলেন অনমনীয়; পরিস্থিতির গুরুত্ব তিনি বুঝতেন না, এমনটা নিশ্চয় নয়, কিন্তু 'এম্পায়ার' নিয়ে এক প্রাচীন, অন্ধ মোহ তাঁকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল এটা অনস্বীকার্য। তাঁর সেই বিখ্যাত উক্তি মনে করুন-"I have not become the King's First Minister in order to preside over the liquidation of the British Empire." (5) অবশ্য চার্চিলের দিন ফুরিয়ে আসছিল। বিশ্বযুদ্ধোত্তর ব্রিটেনে ভারতবর্ষের অধিকার নিয়ে চার্চিলের অবাস্তব আবেগের সমর্থক খুব একটা কেউ ছিলেন না-না ব্রিটিশ রাজনীতিবিদ-প্রশাসকরা, না সাধারন ব্রিটিশ জনগণ । চার্চিল ক্রমেই একা হয়ে পড়ছিলেন। আর ১৯৪৫ সালের নির্বাচনে তো তিনি ধুয়ে-মুছে সাফ হয়ে গেলেন।

Notes
1.Tunzelmann, p.122 (Robert Skidelsky, John Maynard Keynes: Fighting for the Britain, 1937-1946, Macmillan, London, 2000, pp.341-2, 379-84

2.Ibid (Fischer, Life of Mahtma Gandhi, p. 394

3.সুমিত সরকার, পৃ ৩৪৮ (Wavell, The Viceroy's Journal, Oxford, 1973, pp.97-8)

4.https://en.wikipedia.org/wiki/Indian_Army_during_World_War_II (https://issuu.com/wargravescommission/docs/ar_2014-2015?e=4065448/31764375)

5.https://www.telegraph.co.uk/culture/books/non_fictionreviews/3667997/How-victory-spelt-the-end-of-empire.html





Name:  amit          

IP Address : 340123.0.34.2 (*)          Date:28 Oct 2018 -- 04:33 AM

যথারীতি দারুন।

একটা প্রশ্ন আছে, ভারত তো তখনো ব্রিটিশ এম্পায়ার এর অংশ, তাহলে এই ১০০ কোটি পাউন্ড এর ধার কিভাবে হিসেবে করা হয়েছিল - ? মানে ভারতে কি তখন আলাদা করে বাজেট করা হতো ? না কি ফেডারেল বুজতে একটা পার্ট ইন্ডিয়ার জন্য ধরা হতো ? আমি ইকোনমিক্স একেবারেই বুঝি না, বোঝার চেষ্টা করছি আজকে ভারতে কেন্দ্র সরকার আর রাজ্য সরকারের মধ্যে যে ভাবে দু লেভেল এ বাজেটিং করা হয়, আরো বড়ো স্কেল এ ইংল্যান্ড আর ভারতের মধ্যেও কি সেভাবে করা হতো ? নাকি আলাদা ?


Name:  amit          

IP Address : 340123.0.34.2 (*)          Date:28 Oct 2018 -- 05:07 AM

ওপরে ফেডারেল বাজেট হবে ।


Name:  I          

IP Address : 785612.40.1289.205 (*)          Date:28 Oct 2018 -- 11:23 AM

অমিত,
আমিও ইকোনমিক্সের ১০০ মাইলের মধ্যে ঘেঁষি না।এ নিয়ে সহজ ব্যাখ্যা কোথাও পেলামও না।তবে আন্দাজ করছি এই হিসেবটা ব্রিটেনের ব্রিটিশ সরকার আর ভারতের ব্রিটিশ সরকারের মধ্যে।মানে ভারতের অর্থভাণ্ডার থেকে টাকা খরচা হয়েছিল ব্রিটেনের জন্য যুদ্ধসামগ্রী কিনতে।এর আগে অব্ধি ভারত ঋণী ছিল ব্রিটেনের কাছে, কেননা ভারতে ইনফ্রস্ট্রাকচার তৈরী করতে ব্রিটেন টাকা দিয়েছিল(নিশ্চয়ই ভারত থেকে লুট করা মালের দাম এর মধ্যে ধরা হয় নি।)

আর ব্রিটেনের সরকারের পক্ষে বোধ হয় প্রতিটা কলোনির জন্য আলাদা করে বাজেট অ্যালোকেশন করা সম্ভব ছিল না।সে তো হারকিউলিয়ান টাস্ক হবে।অত রাশি রাশি কলোনি। নিশ্চয় প্রতিটা কলোনির সরকার নিজের নিজের বাজেট আলাদা করে বানাত।

অর্থনীতি জানা কোনো লোক বুঝিয়ে দিলে ভালো হয়।


Name:  I          

IP Address : 785612.40.9000112.221 (*)          Date:29 Oct 2018 -- 01:42 AM

কংগ্রেসের দিক থেকে দেখলে 'ভারত ছাড়ো আন্দোলন'এর সুফল ও কুফল দুইই ছিল। একটা সুফল তো আগেই বলা হয়েছে-জেলে থাকার ফলে কংগ্রেস নেতাদের যুদ্ধসংক্রান্ত অনেক অস্বস্তিকর প্রশ্নের (ব্রিটিশ বিরোধিতা মানে ফ্যাসিবাদের সমর্থন করা কিনা, জাপানের সামরিক-সঙ্গী সুভাষচন্দ্রের আজাদ হিন্দ ফৌজকে সমর্থনের বিষয়ে কংগ্রেসের কী মত ইত্যাদি) উত্তর দিতে হয় নি। উল্টে জেল থেকে বেরিয়ে আসার পর তাঁরা জনতার চোখে হিরো প্রতিপন্ন হলেন;দীর্ঘ কারাবাসজনিত আত্মত্যাগের মহিমা আর জনতার মধ্যে ফুটন্ত ব্রিটিশ-বিরোধিতা এ দুই মিলে তাঁরা মানুষের চোখের মণি হয়ে উঠলেন (যদিও আসল লড়াইটা লড়েছিলেন কংগ্রেসের আত্মগোপনকারী সমাজবাদী নেতা ও কর্মীরা।) ১৯৩৭ - ১৯৩৯-এ কংগ্রেস সরকারগুলির সাদামাটা পারফরম্যান্স (ও কোনো কোনো ক্ষেত্রে জনবিরোধী নীতির কথা) মানুষ ভুলে গেলেন (1)। সবচেয়ে বেশী লাভবান হলেন কংগ্রেসের কিছু দক্ষিণপন্থী নেতা; এঁরা ত্রিশের দশক থেকে ব্রিটিশ সরকারের সঙ্গে সহযোগিতার কথা বলে আসছেন, কিন্তু এখন বেমালুম সেসব কথা হজম করে 'ভারত ছাড়ো আন্দোলন'এর গৌরবে ভাগ বসালেন। (2)

কংগ্রেসের ক্ষতির দিকটা হল রাজনীতির ময়দান মুসলিম লীগের জন্য পুরো উন্মুক্ত হয়ে যাওয়া। জিন্না ও লীগ এর পূর্ণ সুযোগ নিয়েছিলেন। কংগ্রেস মন্ত্রীসভা পদত্যাগ করায় ইতিমধ্যে সিন্ধ, উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ ও আসামে মুসলিম লীগ ক্ষমতা দখল করেছিল। বাংলায় শ্যামা-হক মন্ত্রীসভারও সময় ঘনিয়ে এসেছিল। বাংলার গভর্নর জন হার্বার্ট ফজলুল হকের প্রতি খুব একটা প্রসন্ন ছিলেন না। মুসলিম লীগের বিরোধী দলনেতা খাজা নাজিমুদ্দিন ফজলুল হকের কাছে পটুয়াখালি'র পরাজয় কোনোদিন মেনে নিতে পারেন নি; তাঁর এবং ফজলুল হকের সম্পর্ক ছিল বেশ তিক্ত। নাজিমুদ্দিন-ইস্পাহানি চালিত বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগ গভর্নরের কাছে অভিযোগ আনে হক দিন দিন হিন্দু মহাসভা নেতা শ্যামাপ্রসাদের আরো ঘনিষ্ঠ হচ্ছেন এবং এই সরকার ক্রমেই মুসলিম জনতার স্বার্থের পরিপন্থী হয়ে উঠছে; অতএব এই সরকারকে বরখাস্ত করা হোক। ১৯৪৩ এর ১৫ই ফেব্রুয়ারি বিধানসভায় হক অভিযোগ করেন গভর্নর তাঁর বিশেষ ক্ষমতাবলে মন্ত্রীসভার বেশ কিছু সুপারিশ অগ্রাহ্য করেছেন। গভর্নর এই অভিযোগে ক্ষিপ্ত হন ও মূলতঃ তাঁরই উদ্যোগে লীগ হক সরকারের বিরুদ্ধে দু-দুটি অনাস্থা প্রস্তাব আনে। দুটিই অবশ্য অল্প ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হয়। উপায়ান্তর না দেখে গভর্নর তাঁর ক্ষমতা প্রয়োগ করে ফজলুল হককে বাধ্য করেন পদত্যাগ করতে। মুসলিম লীগ নাজিমুদ্দিনের নেতৃত্বে একটি সংখ্যালঘু সরকার গঠন করেন। ইউরোপীয় ব্লকের বিধায়কদের সমর্থন এই সরকারকে টিকিয়ে রাখবে পরবর্তী নির্বাচন অবধি। (3)

চার-চারটি প্রদেশে ক্ষমতায় আসার সুযোগ মুসলিম লীগ নেতারা পুরো উসুল করেছিলেন। লীগের জনপ্রিয়তা ও সদস্য-সংখ্যা দ্রুত বাড়লো। প্রাদেশিক নেতারা সংগঠনকে শক্ত হাতে ধরলেন। মুসলিম লীগ জাতীয় রক্ষীবাহিনী (ন্যাশন্যাল গার্ড) নামে একটি আধাসামরিক বাহিনীকে পুনর্জীবিত করে তোলা হল। (4) প্রাচীনপন্থী প্রাদেশিক যেসব মুসলিম নেতা ছিলেন, তাঁদের হাত থেকে নিজের পছন্দসই লোকের হাতে ক্ষমতা ছিনিয়ে এনে কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে জিন্না আরো সুবিধাজনক অবস্থায় পৌঁছলেন। উপমহাদেশের মুসলমানদের একমাত্র প্রতিনিধি হওয়ার দাবী প্রতিষ্ঠার দিকে এগোলেন। কংগ্রেসের সঙ্গে সমমর্যাদা দাবী করলেন। সহানুভূতিশীল ব্রিটিশ সরকার সে ব্যাপারে তাঁকে যথেষ্ট সাহায্য করেছিল।যুদ্ধের সময় ব্রিটেনের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়ায় লিনলিথগো তাঁর প্রতি বিশেষ কৃতজ্ঞ ছিলেন, আগেই বলেছি। তার প্রতিদানস্বরূপ, এবং কংগ্রেসকে খর্ব করবার জন্যেও জিন্নাকে সরকার গান্ধীর সমমর্যাদা দিয়ে আলোচনায় ডাকে। উৎফুল্ল জিন্না বলেন, " যুদ্ধের পর... (ইংরেজদের )আমার প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির হঠাৎ পরিবর্তন হয়ে যায়। মিঃ গান্ধীর সঙ্গে একই ভূমিকায় আমার প্রতি আচরণ করা হয়। আমার কেন উত্তরণ হল এবং মিঃ গান্ধীর পাশাপাশি কেন আমাকে স্থান দেওয়া হল তা ভেবে আমি বিস্ময়াভিভূত হই।" (5)

লীগের এই অগ্রগতি অবশ্য শুধু সরকারী সাহায্য দিয়ে বুঝতে গেলে ভুল হবে। নানা কারণে পাকিস্তানের দাবী সাধারণ মানুষের মনে ধরেছিল। পাকিস্তান হলেই হিন্দু জমিদার-মহাজনদের শোষণের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে-বাংলা ও পাঞ্জাবের মুসলিম চাষীদের মধ্যে এমনটা প্রচার করা হয়েছিল। এছাড়াও পাকিস্তান প্রস্তাবে ছোট মুসলিম ব্যবসায়ী শ্রেণীর বেড়ে ওঠা আর উদীয়মান মুসলিম বুদ্ধিজীবীদের চাকরির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। মুসলিম সংখ্যালঘু প্রদেশে এই প্রতিশ্রুতি লীগকে অনেক সমর্থক এনে দেয়। (6) । মুসলিম লীগের পুর্বতন ভিত্তি জমিদার শ্রেণীর হাত থেকে জিন্না ক্রমেই লীগকে বের করে আনছিলেন। তাঁর প্রধান ভিত্তি হয়ে দাঁড়াচ্ছিল উদীয়মান মুসলিম পুঁজিপতিরা। লীগের পত্রপত্রিকার টাকা জোগাতেন ইস্পাহানি ও আদমজি পরিবারের ব্যবসায়ীরা। জিন্নার আশীর্বাদ নিয়ে ১৯৪৫ সালে তৈরী হয় ফেডারেশন অফ মুসলিম চেম্বার্স অফ কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রীজ। যুদ্ধের শেষে মুসলিম মালিকানাধীন ব্যাঙ্ক ও বিমান কোম্পানী তৈরীর উদ্যোগও শুরু হয়। বস্তুতঃ কি মুসলিম, কি হিন্দু, ভারতীয় পুঁজিপতিরা কখনোই সাম্প্রদায়িকতার অমোঘ টান এড়াতে পারেন নি। হিন্দু পুঁজিপতিদের কাছে ছিল হিন্দু মহাসভা-আর এস এস -গোরক্ষিণী সভা, মুসলিম পুঁজিপতিদের ছিল মুসলিম বিচ্ছিন্নতাবাদ। অবশ্য মুসলিম পুঁজিপতি ও ছোট ব্যবসায়ীদের বিচ্ছিন্ন হতে চাওয়ার আর একটা বড় কারণ ছিল হিন্দু পুঁজিপতিদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা এড়ানো। (7)

যুদ্ধের পরে পরেই ভারতের অর্থনীতির হাঁড়ির হাল হল। দ্রব্যমূল্যবৃদ্ধি-নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিষের আকাল- মুদ্রাস্ফীতি সাধারণ মানুষের জন্য ব্যাপক দুর্দশা নিয়ে এল। কিন্তু তারই মধ্যে ভারতীয় পুঁজিপতিদের (মুখ্যত হিন্দু) রমরমা;কালোবাজারি-ফাটকাবাজি করে খাদ্যে মুনাফা, শেয়ার কেনাবেচা-সব মিলিয়ে তার এমন সুখের দিন কমই এসেছে। স্বভাবতই এই শ্রেণী স্থিতাবস্থা বজায় রাখার জন্য আগ্রহী ছিল। তাই ১৯৪৫ এর পরে নতুন কোনো গণ-আন্দোলনের ছিল তারা সম্পূর্ণ বিরোধী। তারা তাদের প্রভাব খাটালো বরং আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ পথে ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য। তাদের ইচ্ছা পূর্ণ হল- দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল কংগ্রেস নতুন করে আর গণ-আন্দোলনের পথে গেল না। ক্ষমতা হস্তান্তরিত হল, তবে তার জন্য বিরাট এক মূল্য দিতে হল দেশের মানুষকে ঃ দেশভাগ; আর ভ্রাতৃঘাতী রক্তাক্ত দাঙ্গা। (8)

Notes

1.সুমিত সরকার পৃ ৩৪৯ (D D Kaushambi, The burgeoisie Comes of Age in India, reprint , Kaushambi, Exasperating Essays, Pune, p. 17.

2.তদেব

3.https://en.wikipedia.org/wiki/A._K._Fazlul_Huq

4.এই বাহিনীটি ১৯৩১ সালে যুক্ত প্রদেশে প্রতিষ্ঠিত হয়। আর এস এস গঠনের প্রতিক্রিয়ায় এটি তৈরী হয়েছিল। ৪৬-৪৭এর দাঙ্গায় এই বাহিনী এক ন্যক্কারজনক ভূমিকা নিয়েছিল।

5.ভবানীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়, পৃ ৪৯ (Mansergh, The Transfer of Power, pp.59-60)

6.সুমিত সরকার, পৃ ৩৫৩

7.তদেব

8.তদেব




Name:  I          

IP Address : 7845.15.894523.248 (*)          Date:02 Nov 2018 -- 01:07 AM

1941 saaler jaanuyaari maase gRihabandee thaakaakaaleen paaThaan inasiorens ejenTer chhadmabeshe subhaashhachandra deshatyaag karen. uttara pashchim seemaant pradesh periye tini kaabule ese pou`nchhan. kaabuler sobhiyet dootaabaaser sa`Mge JogaaJog karen, Jadio taaraa taa`nr prati kono aagrahai dekhaay naa.jaarmaan dootaabaaser abasthaao tathoibach; taaraa taa`nke anant apexaay basiye raakhe. ekamaatr itaaleey dootaabaas taa`nr prati saday hay. dootaabaaser ek karmee rome taarabaartaa paaThaan: nabaagat byakti ekajan 'buddhimaan, paaradarshee, aabegadeepta,eba`m ni:sandehe bhaarateey raajanoitik netaader madhye sabacheye baastababuddhisampann"(1) । ইতালীয় দূতাবাস থেকে তাঁকে জনৈক ইতালীয় কূটনীতিজ্ঞ 'কাউন্ট অরল্যান্ডো মাজেত্তা'-র নামে একটি ভুয়ো পাসপোর্ট দেওয়া হয়। সেই পাসপোর্ট নিয়ে তিনি এপ্রিলের শুরুর দিকে আফগান-রুশ সীমান্ত থেকে মস্কো হয়ে রোম ও সেখান থেকে বার্লিনে পৌঁছন।

এই যাত্রাপথ অনুসরণ করায় বসু নিজের অজান্তেই একটি গুপ্তহত্যার প্রচেষ্টার হাত থেকে রক্ষা পান। কেননা মার্চ মাসেই ব্রিটেনের কাছে সুভাষের গতিবিধির খবর পৌঁছে গিয়েছিল এবং তিনি যে বার্লিন যেতে পারেন , তাও ব্রিটিশ গোয়েন্দারা আঁচ করে ফেলেছিলেন। ব্রিটেনের গুপ্ত গোয়েন্দাবাহিনী 'স্পেশাল অপারেশনস এক্সিকিউটিভ' সুভাষকে গুপ্তহত্যার নির্দেশ জারি করে। কিন্তু গোয়েন্দারা সুভাষের যাত্রাপথটি অনুমান করতে ভুল করে। তারা ভেবেছিল তিনি ইরান, ইরাক ও তুরস্ক হয়ে জার্মানি পৌঁছবার পরিকল্পনা করছেন। স্থির হয় , তুরস্কেই তাঁকে হত্যা করা হবে।গোয়েন্দাবাহিনীর গোপন ডায়েরি থেকে জানা যায় ভারতসচিব লিও আমেরিও এই পরিকল্পনা অনুমোদন করেন।(2)

জার্মান সাহায্য চেয়ে সুভাষ যে যুক্তি সাজান, তা এইরকম ঃ জার্মানি ও ভারতের উদ্দেশ্য অভিন্ন-তা হল ব্রিটেনের পরাজয়। এই লক্ষ্যে জার্মানির উচিৎ জার্মান মাটিতে একটি স্বাধীন ভারত সরকার প্রতিষ্ঠায় সাহায্য করা। এই সরকার বেতারবার্তার মাধ্যমে ভারতীয় জনগণকে ব্রিটিশ-বিরোধী বিদ্রোহে উৎসাহিত করবে এবং ভারতীয় বিপ্লবীদের কাছে অস্ত্র সরবরাহ করে চলবে। অক্ষশক্তি ব্রিটিশ কলোনি উচ্ছেদের সরকারী ঘোষণা করলেই মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকায় যুদ্ধরত দেশপ্রেমিক ভারতীয় সৈনিকরা দলে দলে ব্রিটিশ সেনাবাহিনী ত্যাগ করবে। বিপ্লবের জমি তৈরী হয়ে উঠলে মাত্র পঞ্চাশ হাজার সৈন্যও যদি ভারতসীমান্তে গিয়ে পৌঁছয়, তাহলেই ব্রিটিশ সিংহ ল্যাজ গুটিয়ে পালাবে। (3)

হিটলার স্বয়ং এই যুক্তিজালে কতদূর প্রভাবিত হয়েছিলেন , বলা মুশকিল। সুভাষকে কিছু সাহায্য অবশ্যই দেওয়া হয়েছিল; জার্মান সহযোগিতায় তিনি 'আজাদ হিন্দ' বেতারকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন। আফ্রিকা থেকে যুদ্ধবন্দী ৪৫০০ ভারতীয় সৈনিকের একটি বাহিনীও তৈরী হয়। কিন্তু এই পর্যন্তই; জাপান ও ইতালী ভারতের স্বাধীনতার স্বপক্ষে একটি যৌথ ঘোষণায় আগ্রহী থাকলেও হিটলার সেই উৎসাহে জল ঢেলে দেন।যুদ্ধের সেই পরিস্থিতিতে তিনি ব্রিটিশদের আরো ক্ষিপ্ত করে তুলতে চান নি। ১৯৪২ সালের মে মাসে হিটলারের সঙ্গে একমাত্র সাক্ষাতের পর সুভাষও পরিস্থিতির খানিক আঁচ পান; তাঁর মনে হয় হিটলার তাঁকে ও তাঁর দলবলকে প্রচারযুদ্ধের জন্যই ব্যবহার করতে চাইছ্নে, আসল যুদ্ধের জন্য নয় (4)।'৪৩ এর মে মাসে হতাশ হয়ে তিনি জার্মান সাবমেরিনে চেপে বার্লিন ছেড়ে জাপানের উদ্দেশ্যে রওনা হন।

নর্ডিক জাতির উৎকর্ষতায় বিশ্বাসী হিটলার ব্রিটেনের প্রতি একধরণের শ্রদ্ধা-সম্ভ্রমের ভাব পোষণ করতেন। জার্মানির পুনরুত্থানের জন্য তিনি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের মডেলটি অনুসরণীয় বলে ভাবতেন। স্বভাবতই তিনি কলোনীর অ-নর্ডিক জাতিসমূহের অধিকার সম্বন্ধে বিরূপ ছিলেন। ভারতের সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী আন্দোলনের সম্বন্ধে তাঁর মনোভাব ছিল-উচ্চতর ইংলিশ-নর্ডিক জাতির বিরুদ্ধে নীচ ভারতীয়দের বিদ্রোহ একটি ঘৃণ্য ব্যাপার এবং তা পরাজিত হতে বাধ্য।আত্মজীবনী 'মেইনক্যাম্ফ'এ হিটলার ভারতীয় জাতীয়তাবাদীদের বর্ণনা করেছেন ' বিকলাঙ্গদের জোট' বলে ; জানিয়েছেন, জার্মান জাতির ভাগ্য তিনি কিছুতেই এহেন নীচ জাতির সঙ্গে যুক্ত হতে দেবেন না। ১৯৩৭ সালে লর্ড আরউইনের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন-'গান্ধীকে গুলি করে মেরে ফেলুন, তাতেও কাজ না হলে কংগ্রেসের কয়েক ডজন নেতাকে গুলি করুন; না হলে আরো শ দুয়েককে-মারতে থাকুন, যতক্ষণ না শান্তিশৃঙ্খলা ফিরে আসছে" (5)। এহেন হিটলার যে ব্রিটিশ-বিরোধী সামরিক অভিযানে খুল্লমখুল্লা কোনো মদত দেবেন না, তা তেমন অস্বাভাবিক ছিল না।বিশেষতঃ যিনি দীর্ঘকাল অবধি ব্রিটিশ ও জার্মান বন্ধুতা ও সহযোগিতার কথা ভেবে এসেছেন।

Notes
1.Madhushree Mukherjee, Churchill's Secret War,Penguin Random House India, 2018, p.23 (Bose and Bose, Netaji, Vol X, p.197)

2.Ibid, (SOE War Diaries: HS7/214-17)

3.Ibid,p.39 (Bose, vol XI,Netaji, pp. 45-7)

4.https://en.wikipedia.org/wiki/Subhas_Chandra_Bose (Thomson, Mike (23 September 2004), Hitler's secret Indian army, BBC News, retrieved 6 February 2016).

5.Madhushree Mukherjee, pp.32-40



Name:  I          

IP Address : 7845.15.894523.248 (*)          Date:02 Nov 2018 -- 01:08 AM

১৯৪১ সালের জানুয়ারি মাসে গৃহবন্দী থাকাকালীন পাঠান ইনসিওরেন্স এজেন্টের ছদ্মবেশে সুভাষচন্দ্র দেশত্যাগ করেন। উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ পেরিয়ে তিনি কাবুলে এসে পৌঁছন। কাবুলের সোভিয়েত দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করেন, যদিও তারা তাঁর প্রতি কোনো আগ্রহই দেখায় না।জার্মান দূতাবাসের অবস্থাও তথৈবচ; তারা তাঁকে অনন্ত অপেক্ষায় বসিয়ে রাখে। একমাত্র ইতালীয় দূতাবাস তাঁর প্রতি সদয় হয়। দূতাবাসের এক কর্মী রোমে তারবার্তা পাঠানঃ নবাগত ব্যক্তি একজন 'বুদ্ধিমান, পারদর্শী, আবেগদীপ্ত,এবং নিঃসন্দেহে ভারতীয় রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে সবচেয়ে বাস্তববুদ্ধিসম্পন্ন"(১) । ইতালীয় দূতাবাস থেকে তাঁকে জনৈক ইতালীয় কূটনীতিজ্ঞ 'কাউন্ট অরল্যান্ডো মাজেত্তা'-র নামে একটি ভুয়ো পাসপোর্ট দেওয়া হয়। সেই পাসপোর্ট নিয়ে তিনি এপ্রিলের শুরুর দিকে আফগান-রুশ সীমান্ত থেকে মস্কো হয়ে রোম ও সেখান থেকে বার্লিনে পৌঁছন।

এই যাত্রাপথ অনুসরণ করায় বসু নিজের অজান্তেই একটি গুপ্তহত্যার প্রচেষ্টার হাত থেকে রক্ষা পান। কেননা মার্চ মাসেই ব্রিটেনের কাছে সুভাষের গতিবিধির খবর পৌঁছে গিয়েছিল এবং তিনি যে বার্লিন যেতে পারেন , তাও ব্রিটিশ গোয়েন্দারা আঁচ করে ফেলেছিলেন। ব্রিটেনের গুপ্ত গোয়েন্দাবাহিনী 'স্পেশাল অপারেশনস এক্সিকিউটিভ' সুভাষকে গুপ্তহত্যার নির্দেশ জারি করে। কিন্তু গোয়েন্দারা সুভাষের যাত্রাপথটি অনুমান করতে ভুল করে। তারা ভেবেছিল তিনি ইরান, ইরাক ও তুরস্ক হয়ে জার্মানি পৌঁছবার পরিকল্পনা করছেন। স্থির হয় , তুরস্কেই তাঁকে হত্যা করা হবে।গোয়েন্দাবাহিনীর গোপন ডায়েরি থেকে জানা যায় ভারতসচিব লিও আমেরিও এই পরিকল্পনা অনুমোদন করেন।(২)

জার্মান সাহায্য চেয়ে সুভাষ যে যুক্তি সাজান, তা এইরকম ঃ জার্মানি ও ভারতের উদ্দেশ্য অভিন্ন-তা হল ব্রিটেনের পরাজয়। এই লক্ষ্যে জার্মানির উচিৎ জার্মান মাটিতে একটি স্বাধীন ভারত সরকার প্রতিষ্ঠায় সাহায্য করা। এই সরকার বেতারবার্তার মাধ্যমে ভারতীয় জনগণকে ব্রিটিশ-বিরোধী বিদ্রোহে উৎসাহিত করবে এবং ভারতীয় বিপ্লবীদের কাছে অস্ত্র সরবরাহ করে চলবে। অক্ষশক্তি ব্রিটিশ কলোনি উচ্ছেদের সরকারী ঘোষণা করলেই মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকায় যুদ্ধরত দেশপ্রেমিক ভারতীয় সৈনিকরা দলে দলে ব্রিটিশ সেনাবাহিনী ত্যাগ করবে। বিপ্লবের জমি তৈরী হয়ে উঠলে মাত্র পঞ্চাশ হাজার সৈন্যও যদি ভারতসীমান্তে গিয়ে পৌঁছয়, তাহলেই ব্রিটিশ সিংহ ল্যাজ গুটিয়ে পালাবে। (৩)

হিটলার স্বয়ং এই যুক্তিজালে কতদূর প্রভাবিত হয়েছিলেন , বলা মুশকিল। সুভাষকে কিছু সাহায্য অবশ্যই দেওয়া হয়েছিল; জার্মান সহযোগিতায় তিনি 'আজাদ হিন্দ' বেতারকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন। আফ্রিকা থেকে যুদ্ধবন্দী ৪৫০০ ভারতীয় সৈনিকের একটি বাহিনীও তৈরী হয়। কিন্তু এই পর্যন্তই; জাপান ও ইতালী ভারতের স্বাধীনতার স্বপক্ষে একটি যৌথ ঘোষণায় আগ্রহী থাকলেও হিটলার সেই উৎসাহে জল ঢেলে দেন।যুদ্ধের সেই পরিস্থিতিতে তিনি ব্রিটিশদের আরো ক্ষিপ্ত করে তুলতে চান নি। ১৯৪২ সালের মে মাসে হিটলারের সঙ্গে একমাত্র সাক্ষাতের পর সুভাষও পরিস্থিতির খানিক আঁচ পান; তাঁর মনে হয় হিটলার তাঁকে ও তাঁর দলবলকে প্রচারযুদ্ধের জন্যই ব্যবহার করতে চাইছ্নে, আসল যুদ্ধের জন্য নয় (৪)।'৪৩ এর মে মাসে হতাশ হয়ে তিনি জার্মান সাবমেরিনে চেপে বার্লিন ছেড়ে জাপানের উদ্দেশ্যে রওনা হন।

নর্ডিক জাতির উৎকর্ষতায় বিশ্বাসী হিটলার ব্রিটেনের প্রতি একধরণের শ্রদ্ধা-সম্ভ্রমের ভাব পোষণ করতেন। জার্মানির পুনরুত্থানের জন্য তিনি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের মডেলটি অনুসরণীয় বলে ভাবতেন। স্বভাবতই তিনি কলোনীর অ-নর্ডিক জাতিসমূহের অধিকার সম্বন্ধে বিরূপ ছিলেন। ভারতের সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী আন্দোলনের সম্বন্ধে তাঁর মনোভাব ছিল-উচ্চতর ইংলিশ-নর্ডিক জাতির বিরুদ্ধে নীচ ভারতীয়দের বিদ্রোহ একটি ঘৃণ্য ব্যাপার এবং তা পরাজিত হতে বাধ্য।আত্মজীবনী 'মেইনক্যাম্ফ'এ হিটলার ভারতীয় জাতীয়তাবাদীদের বর্ণনা করেছেন ' বিকলাঙ্গদের জোট' বলে ; জানিয়েছেন, জার্মান জাতির ভাগ্য তিনি কিছুতেই এহেন নীচ জাতির সঙ্গে যুক্ত হতে দেবেন না। ১৯৩৭ সালে লর্ড আরউইনের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন-'গান্ধীকে গুলি করে মেরে ফেলুন, তাতেও কাজ না হলে কংগ্রেসের কয়েক ডজন নেতাকে গুলি করুন; না হলে আরো শ দুয়েককে-মারতে থাকুন, যতক্ষণ না শান্তিশৃঙ্খলা ফিরে আসছে" (৫)। এহেন হিটলার যে ব্রিটিশ-বিরোধী সামরিক অভিযানে খুল্লমখুল্লা কোনো মদত দেবেন না, তা তেমন অস্বাভাবিক ছিল না।বিশেষতঃ যিনি দীর্ঘকাল অবধি ব্রিটিশ ও জার্মান বন্ধুতা ও সহযোগিতার কথা ভেবে এসেছেন।

Notes
1.Madhushree Mukherjee, Churchill's Secret War,Penguin Random House India, 2018, p.23 (Bose and Bose, Netaji, Vol X, p.197)

2.Ibid, (SOE War Diaries: HS7/214-17)

3.Ibid,p.39 (Bose, vol XI,Netaji, pp. 45-7)

4.https://en.wikipedia.org/wiki/Subhas_Chandra_Bose (Thomson, Mike (23 September 2004), Hitler's secret Indian army, BBC News, retrieved 6 February 2016).

5.Madhushree Mukherjee, pp.32-40



Name:  I          

IP Address : 7845.15.894523.248 (*)          Date:02 Nov 2018 -- 01:09 AM

দুঃখিত, রিপোস্ট করলাম।


Name:  গবু          

IP Address : 2345.110.784512.157 (*)          Date:02 Nov 2018 -- 05:46 PM

বেশ করেছেন। আগের পোস্টের প্রথমদিকটা রোমান বলে অসুবিধে হচ্ছিল।

শুভ দীপাবলির আগাম শুভেচ্ছা!


Name:  I          

IP Address : 7845.15.7890012.176 (*)          Date:02 Nov 2018 -- 09:57 PM

শুভ দীপাবলী, আপনাকেও।


Name:  I          

IP Address : 7845.15.013423.85 (*)          Date:04 Nov 2018 -- 12:20 AM

১৯১৫ সালে বিপ্লবী রাসবিহারী বসু জাপানে আশ্রয় নিয়েছিলেন। তিনি ও তাঁর সহযোগী এ এম নায়ার অন্যান্য প্রবাসী জাতীয়তাবাদীদের নিয়ে ইন্ডিয়ান ইন্ডিপেন্ডেন্স লীগ তৈরী করেন। লীগের মিলিটারি উইং হিসাবে ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মি (আই এন এ)প্রতিষ্ঠা করার কথা ভাবা হয়। স্থির হয় জাপানের হাতে ধরা পড়া ভারতীয় যুদ্ধবন্দীদের নিয়ে এই সেনাবাহিনী তৈরী করা হবে। ১৯৪১ এর শেষদিকে জাপানী যুদ্ধবন্দী ক্যাপ্টেন মোহন সিং আই এন এ প্রতিষ্ঠা করেন। যদিও '৪২ এর ডিসেম্বরে প্রথম আই এন এ-কে জাপানীদের সঙ্গে মতপার্থক্যের জেরে ভেঙ্গে দেওয়া হয়।লীগের নেতারা সিদ্ধান্ত নেন সুভাষ চন্দ্র বসু জাপানে এলে তাঁর হাতে ইন্ডিপেন্ডেন্স লীগের দায়িত্ব তুলে দেওয়া হবে ও আই এন এ-কে পুনর্গঠিত করা হবে (1)। সেইমত ১৯৪৩ সালে সুভাষচন্দ্র নতুন করে আই এন এ প্রতিষ্ঠা করেন। বসু জাপানে একটি স্বাধীন ভারত সরকার (আর্জি হুকুমৎ- ই-আজাদ হিন্দ) গঠন করেন ও আই এন এ-কে (আজাদ হিন্দ ফৌজ) সেই সরকারের নিজস্ব সেনাবাহিনী বলে ঘোষণা করেন। জাপান সরকারের সহযোগিতায় জাপানী বন্দীশিবিরের ৬০০০০ ভারতীয় সৈন্যের মধ্যে ২০০০০ সৈন্য এই নতুন সেনাবাহিনীতে নাম লেখান(2)। দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার প্রবাসী ভারতীয়দের মধ্য থেকেও স্বেচ্ছাসেবক ও আর্থিক সাহায্য নেওয়া হয়। দেশের স্বাধীনতার জন্য ফ্যাসিবাদের সঙ্গে আপোষ করতে রাজী হলেও [অবশ্য একথাও সত্যি যে তাঁর নিজস্ব রাজনৈতিক আদর্শ ছিল সাম্যবাদ ও ফ্যাসিবাদের এক অদ্ভুত মিশ্রণ (3)] সুভাষচন্দ্র সাম্প্রদায়িকতার সঙ্গে আপোষ করতে কখনোই রাজী ছিলেন না। আজাদ হিন্দ ফৌজ ছিল সম্পূর্ন অসাম্প্রদায়িক একটি সংগঠন। বাহিনীর অনেক অফিসার ও সৈন্য ছিলেন মুসলিম। ঝাঁসীর রাণীর নামে একটি মহিলা ব্রিগেড গঠন করা হয়, যা ছিল এশিয়ার প্রথম মহিলা সেনা ইউনিট। এর নেতৃত্ব দেন ক্যাপ্টেন লক্ষী স্বামীনাথন। ৯টি অক্ষরাষ্ট্র আজাদ হিন্দ সরকারকে স্বীকৃতি দেয়।

স্থির হয় আজাদ হিন্দ ফৌজ জাপানী বাহিনীর সঙ্গে একত্রে মণিপুর অভিযান চালাবে। উত্তর পূর্ব ভারতের ব্রিটিশ বাধা অতিক্রম করে গাঙ্গেয় সমতটে পৌঁছতে পারলে আজাদ হিন্দ ফৌজ গেরিলা বাহিনী হিসাবে লড়াই করবে, কেননা সামনাসামনি যুদ্ধের জন্য প্রয়োজনীয় অস্ত্রবল ও লোকবল আজাদ হিন্দ ফৌজের ছিল না(4)। সংযুক্ত জাপ-ভারতীয়বাহিনী মণিপুরের মৈরাং পর্যন্ত দখল করে। মৈরাং টাউনে প্রথম স্বাধীন ভারত সরকারের ত্রিবর্ণলাঞ্ছিত পতাকা ওড়ানো হয়। সুভাষচন্দ্র আজাদ হিন্দ রেডিও মারফৎ 'জাতির পিতা' মহাত্মা গান্ধীর আশীর্বাদ প্রার্থনা করেন। জাপ বাহিনীর লক্ষ্য ছিল নিকটবর্তী ইম্ফল ও কোহিমা দখল করা; কিন্তু এই সময় থেকেই যুদ্ধের গতি জাপানের বিরুদ্ধে যেতে শুরু করে। ব্রিটিশ-ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রবল বাধার মুখে পড়ে জাপ বাহিনী ও আজাদ হিন্দ ফৌজ পিছু হটতে শুরু করে। ১৯৪৫ এ রেঙ্গুনের পতনের সাথে সাথে আজাদ হিন্দ ফৌজের পরাজয় নিশ্চিৎ হয়ে যায়। জাপানী সেনাবাহিনী ও আজাদ হিন্দ ফৌজের মধ্যেকার সম্পর্ক কখনোই খুব একটা উষ্ণ ছিল না, যুদ্ধের শেষদিকে তা আরো খারাপ হতে শুরু করে(5)।

রেঙ্গুন-পতনের তিন বছর আগেই অবশ্য জাপান আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ দখল করেছিল। ঐ তিন বছরে আন্দামানে জাপানী বাহিনী যে অবর্ণনীয় অত্যাচার চালিয়েছিল, তার সঠিক হদিশ পাওয়া মুশকিল, কেননা পরাজয় অবশ্যম্ভাবী জেনে জাপানী সৈন্যরা সব নথিপত্র নষ্ট করে দেয়। জনৈক স্থানীয় ভারতীয় ও এক ব্রিটিশ অফিসারের অপ্রকাশিত লেখা এবং সেসময়কার আন্দামান-বাসিন্দাদের স্মৃতিকথা থেকে সেই অত্যাচারের বিবরণ জানতে পারা যায়। গুপ্তচর সন্দেহে অজস্র ভারতীয়কে বিনা বিচারে বন্দী করে চূড়ান্ত অত্যাচার চালানোর পর হত্যা করা হয়। আন্দামানের ইন্ডিয়ান ইন্ডিপেন্ডেন্স লীগের সদস্যরাও রেহাই পান না।কোরিয়া ও মালয় থেকে অসংখ্য মহিলাকে বন্দী করে আনা হয় জাপানী সেনাবাহিনীর যৌনদাসী হিসেবে। ১৯৪৩ সালে সরকারীভাবে আন্দামান -নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের ভার আজাদ হিন্দ সরকারের হাতে অর্পণ করা হয়; কিন্তু সে শুধু নামেই। আসল ক্ষমতা রয়ে যায় জাপানী সেনানায়কদের হাতে। সুভাষচন্দ্র পোর্ট ব্লেয়ারে এসে স্বাধীন ভারতের পতাকা উত্তোলন করেন; কিন্তু সতর্ক জাপানী সেনা তাঁকে স্থানীয় মানুষজনের কাছ থেকে দূরে রাখতে সক্ষম হয়। অনেক চেষ্টা করেও ভারতীয়রা তাঁকে জাপানী সেনাবাহিনীর অত্যাচারের কথা জানাতে পারেন নি। ব্যথিত মানুষের মনে ধারণা তৈরী হয় সুভাষ তাঁদের বিশ্বাসের অমর্যাদা করেছেন (6)। ভারতীয় মূল ভূখন্ডের মানুষজন স্বভাব্তই এসব ব্যাপারের বিন্দুবিসর্গও জানতেন না; তাঁদের একটা বড় অংশ তখনো ইংরেজের হাত থেকে মুক্তি পেতে জাপানী সৈন্যবাহিনী ও আজাদ হিন্দ ফৌজের পথ চেয়ে বসে আছেন।

সামরিক শক্তির দিক দিয়ে আজাদ হিন্দ ফৌজ কখনোই খুব বড় কিছু একটা ছিল না। জাপানী ফৌজ কিম্বা ব্রিটিশ সেনাবাহিনী কেউই তাদের তেমন গুরুত্ব দেয় নি। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে আজাদ হিন্দ ফৌজের প্রত্যক্ষ প্রভাব খুব বড় কিছু ছিল না; কিন্তু অপ্রত্যক্ষ প্রভাব ছিল বিশাল। দেশপ্রেমী মানুষের মনে আজাদ হিন্দ ফৌজ এক বিরাট গৌরবের জায়গা নিয়েছিল। ফলে ১৯৪৫-এর নভেম্বরে সরকার আজাদ হিন্দ ফৌজের বন্দীদের বিচার শুরু করার উদ্যোগ নিলে দেশজুড়ে শুরু হয় গণ-বিক্ষোভ। সুভাষ-বিরোধী জাতীয় কংগ্রেসও তার অভিঘাত এড়াতে পারে নি। জনতার সাথে তাল মিলিয়ে চলতে গিয়ে কংগ্রেসী নেতারাও বাধ্য হন আজাদ হিন্দ ফৌজের গুণকীর্তন করতে। স্বয়ং নেহরু কালোকোট গায়ে দিয়ে বন্দীদের পক্ষে সওয়াল করেন। সরকার ভয় পায়, '৪২এর মত আর একটি দেশজোড়া আন্দোলন বুঝি শুরু হবে। '৪৫-৪৬এর শীতকালে ব্রিটিশ- ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যে লাগাতার বিক্ষোভ-অসন্তোষের সূচনা হয় , তার পেছনেও একটি বড় কারণ আজাদ হিন্দ ফৌজের অভিজ্ঞতা। এই সেনা অসন্তোষ চূড়ান্ত রূপ নেয় '৪৬-এর ফেব্রুয়ারি মাসে--বোম্বাই সহ গোটা ভারত কেঁপে ওঠে নৌ-বিদ্রোহে। সুমিত সরকার লিখেছেন-'ব্রিটিশদের দ্রুত পাততাড়ি গোটানোর সিদ্ধান্তের পিছনে এটিই সম্ভবত এককভাবে প্রধানতম নির্ধারক কারণ' (7) ।

ব্রিটিশ সামরিক ইতিহাসবিদ ক্রিস্টোফার বেইলি মন্তব্য করেছেন- "INA was to become a much more powerful enemy of the British empire in defeat than it had been during its ill-fated triumphal march on Delhi." (8)


Notes
---------
1.https://en.wikipedia.org/wiki/Subhas_Chandra_Bose

2.সুমিত সরকার পৃ ৩৫৪।

3.https://en.wikipedia.org/wiki/Subhas_Chandra_Bose (Pasricha, Ashu (2008), "The Political Thought Of Subhas Chandra Bose", Encyclopaedia Eminent Thinkers, 16, Concept Publishing Company.

4.https://en.wikipedia.org/wiki/Indian_National_Army (Fay, Peter W. 1993, The Forgotten Army: India's Armed Struggle for Independence, 1942–1945, University of Michigan Press, ISBN 0-472-08342-2).

5.https://en.wikipedia.org/wiki/Indian_National_Army (Toye, Hugh ,1959, The Springing Tiger: A Study of the Indian National Army and of Netaji, Allied Publishers, ISBN 978-81-8424-392-5)

6.https://en.wikipedia.org/wiki/Japanese_occupation_of_the_Andaman_Islands#cite_note-10 (Iqbal Singh The Andaman Story p. 249)

7.সুমিত সরকার, পৃ ৩৫৪

8.https://en.wikipedia.org/wiki/Indian_National_Army (Marston, Daniel , 2014, The Indian Army and End of the Raj, Cambridge University Press, ISBN 978-0-521-89975-8).







Name:   সিকি           

IP Address : 670112.215.1245.234 (*)          Date:04 Nov 2018 -- 07:44 AM

প্রসঙ্গত, আন্দামান সেলুলার জেলের সঁ এ ল্যুমিয়েরে ইংরেজ শাসকের করা বন্দীদের ওপর অবর্ণনীয় অত্যাচারের কথা খুব ডিটেলে বলা হয়। অথচ শর্ট স্প্যানে জাপানীরা যে নারকীয় অত্যাচার আর হত্যালীলা চালিয়েছিল, সেই বিবরণ পড়লে ইংরেজও লজ্জা পেত।

সুভাষকে পোর্ট ব্লেয়ারে আসতে দেওয়া হয় নি। উনি রস আইল্যান্ডে (তৎকালীন আন্দামানের অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ হেডকোয়ার্টার) আসেন এবং সেখান থেকেই ফিরে যান।


Name:  I          

IP Address : 7845.15.455623.42 (*)          Date:04 Nov 2018 -- 08:12 AM

ধন্যবাদ সিকি, ভুল ধরিয়ে দেওয়ার জন্য।একটু যদি রেফারেন্সটা দাও, ভালো হয়। টুকে দেবো।

আমি সিকির কমেন্টের অপেক্ষায় ছিলাম।জানতাম, আন্দামানে জাপানীদের নিয়ে লিখবো আর সিকি কিছু বলবে না, হতেই পারে না।


Name:  b          

IP Address : 4512.139.6790012.6 (*)          Date:04 Nov 2018 -- 08:39 AM

আই, "রেড সান ওভার ব্ল্যাক ওয়াটার" বইটা দেখতে পারেন। লেখক পোর্ট ব্লেয়ারে সত্তরের দশকে শিক্ষক হিসেবে যান। পুরোনো অধিবাসীদের স্মৃতি ইত্যাদির ওপরে ভিত্তি করে লেখা। কারণ জাপানীরা সব ডকুমেন্ট পুড়িয়ে দিয়েছিলো।



Name:  I          

IP Address : 7845.15.9001223.82 (*)          Date:04 Nov 2018 -- 11:56 AM

ধন্যবাদ , b; গুরুতে লেখার এই একটা বড় লাভ।কত ইনফর্মড মানুষের ইনপুট পাওয়া যায়।

এই সুতোর পাতাগুলি [1] [2] [3] [4] [5] [6] [7]     এই পাতায় আছে163--193