এই সুতোর পাতাগুলি [1] [2]     এই পাতায় আছে2--32


           বিষয় : বিষয়:মুহূর্তকথা
          বিভাগ : অন্যান্য
          শুরু করেছেন : Sanchayita Biswas
          IP Address : 137.0.0.1 (*)          Date:25 Apr 2017 -- 10:18 PM




Name:  pi          

IP Address : 137.0.0.1 (*)          Date:26 Apr 2017 -- 09:23 AM

ভাল লেখা।আর ততটাই মনখারাপের।


Name:   Sanchayita Biswas           

IP Address : 137.0.0.1 (*)          Date:26 Apr 2017 -- 08:35 PM

২।

আমাদের স্কুলটায় অনেক গলিখুঁজি।কম জায়গায় বিভিন্ন সময়ে ছাত্রীসংস্থানের জন্য গজিয়ে ওঠা ঘরের সারি গোটা স্কুলটাকে দমবন্ধ একটা বাড়ি বানিয়ে দিয়েছে।এমনই দমবন্ধ একটা একতলার কোণে কলতলার পাশে দুটো ঘরে থাকতেন শুভা দিদিমণি আর ডালিয়া দিদিমণি।শুভা দিদিমণি কি পড়াতেন ভুলে গেছি…।ডালিয়া দিদিমণি ইংরেজী পড়াতেন।রোগা,ছোটখাটো মানুষটি আমাদের ক্লাস টেনের ক্লাস টিচার ছিলেন।ক্লাস শান্ত রাখার চেষ্টা তিনি করতেন না।খুব মৃদুস্বরে যা পড়াতেন,তা তৃতীয় বেঞ্চ অবধি পৌঁছোত না বোধহয়।পড়ানোর শেষে অনুশীলনীর কাজ করতে দিয়ে জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকতেন…কিংবা হাসি হাসি মুখ করে আমাদের দিকে।অধিকাংশ ছাত্রীরাই অনুশীলনীর কাজ করে সময় নষ্ট করতো না।সেসময়টা যে কাটাকুটি খেলা বা ঝিমলির বয়ফ্রেন্ডের পাঠানো প্রেমপত্র পড়বার আদর্শ সময় ছিল।দিদিমণি কোনো অজ্ঞাত কারণে আমায় বেশ পছন্দ করতেন।ক্লাসওয়ার্ক করে খাতা দেখাতে গেলে ফিসফিস করে বলতেন,"আমি জানতাম তুমি ঠিক খাতা দেখাবে।"ইলেভেনে পড়বার সময় উনি অবসর নেন।তারপর আর কখনো ওনাকে দেখিনি।বোধহয় অনেক দূরে কোথাও বাড়ি ছিল ওনার।আগে ছুটিছাটায় বাড়ি ফিরতেন।অবসরের পর একেবারে চলে গেলেন ঐ অগোছালো তক্তপোশ, দড়িতে ঝোলানো শাড়ি আর অবিবাহিত গন্ধওয়ালা কড়িবরগার ঘরে তালা দিয়ে।…


চন্দ্রা দিদিমণি ফিজিক্স পড়াতেন।অসাধারণ পান্ডিত্য তার…দুর্দান্ত পড়াতেন।কিন্তু তার আপাতকঠিন ব্যক্তিত্বকে ভয়ানক ভয় পেতাম।বড়ো বড়ো চোখ,সম্পূর্ণ প্রসাধনবর্জিত গম্ভীর কন্ঠস্বরের মানুষ তিনি।মাধ্যমিকের সময় অ্যাডিশনাল নিয়ে ফেললাম ফিজিক্স…গোটা ব্যাচে শুধু আমি!দিদিমণি কিন্তু কখনো কুন্ঠা দেখাননি শুধু আমাকে নিয়ে ক্লাস করাতে।জীবনটা বদলে গেল উচ্চমাধ্যমিক পড়বার সময়।বাবা প্রস্থানোদ্যত।মা শোকসন্তপ্ত। ছোট্ট একটা ভাই।সমস্তটা মিলে ঘেঁটে গেল জীবনটা।সায়েন্সটা,নিদেন পক্ষে অঙ্কটা ছেড়েই দেবো ভেবেছিলাম।শুধু এবং কেবলমাত্র চন্দ্রা দিদিমণির প্রয়াসে ছাড়তে পারিনি।কাঠিন্যও যে নমনীয়তার সমার্থক, তা আগে বুঝিনি।…

আজকাল প্রায়ই স্বপ্ন দেখি অ্যাডিশনাল ফিজিক্সের ঘরটাকে।মাথার উপর ঘটাংঘটাং শব্দে পাখা ঘোরে।পিছনের পুকুরের ধারে বিশাল আমগাছ।তাতে এত্তো বড়ো মৌচাক।বেঞ্চে খোদাই করা 'পিয়া+চয়ন'।চিত্তরঞ্জন মাইতির বই খোলা।পাখার বাতাসে এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে পৃষ্ঠা।'g' এর মান বের করতে পারছি না।কঠিন চোখে তাকিয়ে আছেন চন্দ্রা দিদিমণি।ভয়ে ভয়ে খাতা এগিয়ে দিচ্ছি।ডালিয়া দিদিমণির তালাবন্ধ ঘর থেকে পরিত্যক্ত স্যাঁতসেঁতে গন্ধ আসছে। কানের কাছে মৃদু একটা স্বর,''আমি জানতাম তুমি ঠিক খাতা দেখাবে।"…





Name:  শেসে          

IP Address : 137.0.0.1 (*)          Date:26 Apr 2017 -- 08:48 PM

রেলে চাকরী করার সুবাদে বাবা বছরে বেশ কয়েক সেট পাস পেতেন | তাও ট্রেনে করে আমাদের একমাত্র বেড়ানোর জায়গা ছিল মামাবাড়ি | কারণ সেখানে থাকিং-খায়িং ফ্রি | শিয়ালদা থেকে কু ঝিক্ ঝিক্ করে সাহেবগঞ্জ, স্টিমারে করে গঙ্গা পার হওয়া, স্টিমারের ডাইনিং হলে ডালডা দিয়ে রান্না করা দেশি মুরগীর ঝোল খেয়ে মণিহারিঘাটে নেমেই বাবার হাত ধরে ছুটতে ছুটতে ওপারের মিটার গেজের ট্রেন ধরা সব চোখের সামনে ভেসে এলো সঞ্চিতার লেখাটা পড়ে | গতকাল বাবার চলে যাওয়ার একুশ বছর পূর্ণ হোলো | লেখাটা বাবাকেও মনে করিয়ে দিল ||


Name:  শেসে          

IP Address : 137.0.0.1 (*)          Date:26 Apr 2017 -- 08:48 PM

রেলে চাকরী করার সুবাদে বাবা বছরে বেশ কয়েক সেট পাস পেতেন | তাও ট্রেনে করে আমাদের একমাত্র বেড়ানোর জায়গা ছিল মামাবাড়ি | কারণ সেখানে থাকিং-খায়িং ফ্রি | শিয়ালদা থেকে কু ঝিক্ ঝিক্ করে সাহেবগঞ্জ, স্টিমারে করে গঙ্গা পার হওয়া, স্টিমারের ডাইনিং হলে ডালডা দিয়ে রান্না করা দেশি মুরগীর ঝোল খেয়ে মণিহারিঘাটে নেমেই বাবার হাত ধরে ছুটতে ছুটতে ওপারের মিটার গেজের ট্রেন ধরা সব চোখের সামনে ভেসে এলো সঞ্চিতার লেখাটা পড়ে | গতকাল বাবার চলে যাওয়ার একুশ বছর পূর্ণ হোলো | লেখাটা বাবাকেও মনে করিয়ে দিল ||


Name:  Titir          

IP Address : 137.0.0.1 (*)          Date:26 Apr 2017 -- 09:38 PM

বিষন্নতার গন্ধমাখা, কিন্তু তা আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে নেই। বড় ভালো লাগছে পড়ছে।


Name:  d          

IP Address : 144.159.168.72 (*)          Date:27 Apr 2017 -- 02:17 PM

ভারী সুন্দর সঞ্চয়িতা।


Name:  pepe          

IP Address : 113.21.127.76 (*)          Date:28 Apr 2017 -- 02:57 PM

@ শেসে কাটিহার এ ছিল মামাবাড়ি আপ্নার?


Name:  sanchayita biswas          

IP Address : 212.142.81.27 (*)          Date:28 Apr 2017 -- 07:44 PM

৩।

কবে থেকে রকি মায়ের পোষ মানলো,মনে নেই।তবে সে সময় আমি হাই স্কুলে পড়তাম।মরচে রঙের নেড়ি রকি মায়ের সাথে ভাব করেছিল বোধহয় রাস্তাতেই।মায়ের স্কুল যাবার পথটা তারও বিচরণভূমি ছিল।কি করে যেন আসা যাওয়ার পথে মায়ের পোষ মেনে গেল সে।আমাদের বাড়ি থেকে মায়ের স্কুলটা হেঁটে মিনিট পাঁচেকের দূরত্ব।রোজ পৌনে এগারোটা থেকে রকি মায়ের জন্য দাঁড়াতো আমাদের গেটে।মা স্কুলের জন্য বেরোলেই সেও মায়ের পাশে পাশে হাঁটতো চুপচাপ।পূর্ণিমা সুইটস্ আসলেই খুব আশা নিয়ে চাইতো মায়ের দিকে।মা প্রবল ব্যস্ততার মধ্যেও দোকানের মালিক রাজকুমার কাকুকে হাঁক দিয়ে যেত,"ওকে একটা নিমকি দিন।আমি ফেরার সময় পয়সা দিয়ে যাবো।"নিমকিতে কামড় দিতে দিতে রকি নজর রাখতো মা কতদূর গেল।তাড়াতাড়ি নিমকি গলাধঃকরণ করে সে মায়ের দিকে ছুটতো।…সারাটা দুপুর রকি স্টাফরুমের সামনের টানা বারান্দায় শুয়ে থাকতো।মা ক্লাস নিতো।রকি বসে থাকতো ক্লাসঘরের দরজায়।টিফিনে দু'টাকার মুড়ি বরাদ্দ ছিল ওর।

রকি কিন্তু আসলে মেয়ে ছিল।সেই একবার সে রাতের বেলায় খেতে এলো কালো রঙের এক পুরুষসঙ্গী জুটিয়ে।মা তো দেখেই রেগে গেল।উঠোনে খাবার দিতে দিতে গজর গজর করতে শুরু করলো,"তোর লজ্জা নেই!কেলো বয়ফ্রেন্ড নিয়ে খেতে এসেছিস আমার কাছে!পাজী মেয়ে!"রকি কি বুঝেছিল,জানি না।কিন্তু সে গোটা সময়টাতেই মুখ নীচু করে দাঁড়িয়ে ছিল।কিছুকাল পরে সে আবার এসেছিল আমার ঘরের পাশে কলাগাছের তলায় চার-পাঁচটা খুদের জন্ম দেবে বলে।একটা সোনালী শীতের সকালে দেখি,বাবার পেতে দেওয়া চটের উপর গর্বিত নতুন মা তার চোখ-ফোটেনি-পা-গজায়নি বাচ্চাগুলোকে নিয়ে শুয়ে আছে।কি প্রশান্তি তার কুচকুচে চোখদুটোয়!…

রকিকে শেষ দেখেছি বাবা-মায়ের ভেলোর যাবার সময়।ব্যাগপত্র ঠাসা ভ্যানটাতে যখন হাত নাড়তে নাড়তে চলে গেল বাবা-মা,তখন ঝাপসা হয়ে আসা চোখে দেখলাম রকি ভ্যানের পিছু পিছু ছুটছে…পাড়ার শেষ সীমায় এসে মরচে রঙের শরীরটা দাঁড়িয়ে পড়লো।শেষ দুপুরের রোদ এসে পড়ছে ওর ঈষৎ দোদুল্যমান লেজটায়…দূর থেকে দূরে চলে যাচ্ছে বাবার কান্না চাপতে চাওয়া মুখটার বিকৃত রেখাগুলো।…



রাণী শুয়ে থাকতো পাড়ার মুদিখানার সামনের চত্ত্বরে।ভাই ওখানে গেলেই নাক দিয়ে ভাইয়ের হাতে ঠেলা দিতো যতক্ষণ না একটা বিস্কুট প্রাপ্তি হয়।একদিন তো ভাইয়ের পিছু পিছু বাড়িতেই চলে এলো।খুব গুছিয়ে বসলো উঠোনে।ভীম তখন কয়েকমাসের বাচ্চা।রাণীকে দেখেই বারান্দা থেকে প্রবল আক্রোশে "ঘেউ ঘেউ" শুরু করলো।রাণী কিন্তু তেড়েও আসলো না,পাত্তাও দিলো না।এমন একটা ভাব যেন "বাচ্চাদের কথায় আমি কিছু মনে করি না"।চুপচাপ বসে রইলো সারা দুপুর।মধ্যাহ্নভোজন করে দুলকি চালে চলে গেল নিজের কাজে।…রাণীর মতো ভদ্র মেয়ে আমি দেখিনি।কক্ষণো বুভুক্ষের মতো খেত না।খুব আস্তে আস্তে আয়েস করে ভাত খেত সে।উঠবার সময় পাতে একটু ভাত রেখে উঠতো।ভীম যখন রাগের চোটে গ্রীল ভাঙার উপক্রম করতো,খুব ধীরে ধীরে ভীমের সামনে এসে দাঁড়িয়ে হালকা কৌতুহল নিয়ে ভীমের ছেলেমানুষী ব্যবহার উপভোগ করতো।তারপর লেজ নাড়তে নাড়তে পাড়া টহল দিতে যেত।

রাণী খুব বেশীদিন আমাদের বাড়িতে আসেনি।কোনো আনন্দমত্ত মোটরসাইকেলের নীচে পিষে গিয়েছিল সে।আমার ভাই তারপর থেকে আর ঐ মুদিখানার সামনে যেতে চায় না।রাণী চলে যাবার পর কিছুদিন দেখতাম ভীম বসে আছে বারান্দায়…চোখ দিয়ে খুঁজছে কাকে।কি জানি,রাণীকেই খুঁজতো কি না!!


ভীম চলে যাবার পর আমার মা প্রায় পাগল হয়ে গেল।সারা বাড়িতে কেঁদে কেঁদে ঘুরতো ভীমকে ডেকে ডেকে।একটা বিড়াল জুটেছিল সেই সময়।মাকে কাঁদতে দেখলেই মায়ের সামনে বসে "মিউ মিউ" করতো।বোধহয় সান্ত্বনা দিতো !বেড়ালটার সারা গায়ে ঘা…হাড্ডিসার চেহারা।সারা রাত বসে থাকতো বাথরুমের পাপোষে।এতোই রুগ্ন যে এক কাপ দুধ বা এক মুঠো মাছভাতও শেষ করতে পারতো না খেয়ে।আমরা বাইরে গেলে চুপচাপ উবু হয়ে বসে থাকতো বারান্দায়।কখনো গুটি মেরে শুয়ে থাকতো আমার ঘরের জানালায়।দগদগে ঘা থেকে কখনো রস গড়াতো।তাগাদা দিতাম চলে যাবার জন্য,কিন্তু তাড়াতে পারতাম না।গোরা আসার পর গোরার সুরক্ষার জন্যই ওকে তাড়াতে বাধ্য হলাম।রোজ বারান্দার বাইরে বসে "মিউ মিউ" করতো রাতেরবেলায়।ভাত দিলে খাবে না।ও খাবার চায়নি,আশ্রয় চেয়েছে শীতের রাতে।কখনো আশ্রয় দিয়েছি,কখনো মন শক্ত করে তাড়িয়ে দিয়েছি।ঘেয়ো বেড়াল যে!ও রাগ করেছে নিশ্চয়ই।রাতে আসা বন্ধ করেছে।দিনের বেলায় রান্নাঘরের সামনের পাঁচিলে বসে থেকেছে মাছের গন্ধ শুঁকবে বলে।…


ভুলেই গিয়েছিলাম বেড়ালটার কথা।আজ রান্নাঘরের জানলা দিয়ে দেখি অন্য একটা বেড়াল বসে আছে পাঁচিলে।রোদ মাখছে একা একা।ঘেয়ো বিড়ালটা থাকলে ওখানে সে বসতেই পারতো না।মাকে জিগ্যেস করলাম,"সেই বেড়ালটা কোথায়?"মা কাজ করতে করতে জবাব দিলো,"আর আসে না।"কে জানে,হয়তো মৃত্যু আসন্ন জেনে নিরুদ্দেশ হয়ে গেছে।কিংবা মরে গেছে।কিংবা অনেকদিন পর আবার আসবে।পাঁচিলের ওপর থেকে জানান দেবে নিজের উপস্থিতি।…রকি কবে মারা গেছে জানি না।ভেলোর থেকে মা-বাবা ফেরার পর দীর্ঘদিনের টানাপোড়েনে মনে পড়েনি ওকে।তারপর একসময় অনেককিছু হারিয়ে আবার নিস্তরঙ্গ হয়েছে জীবন।মা স্কুলে যাবার পথে খুঁজেছে রকিকে।আমি বেপাড়ায় টিউশন পড়তে গিয়ে মরচে রঙের কুকুর দেখে হাঁক দিয়েছি "রকিইই"।রকিকে আর দেখিনি।রাণীকেও না।তবুও আশায় থাকি।সেই ঘেয়ো বেড়ালটা একদিন ফিরে আসবে হয়তো।শীতের রাতে বাথরুমে যাবার সময় হয়তো দেখবো পাপোষের উপর গুটিসুটি মেরে শুয়ে আছে।…



Name:   Sanchayita Biswas           

IP Address : 212.142.67.143 (*)          Date:29 Apr 2017 -- 07:53 PM

৪।
আমাদের সীমিত শৈশব আটকে ছিল বাসাবাড়ির লাগোয়া একচিলতে জমিতে।বেপাড়ায় খেলতে যাওয়ার উপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা ছিল।ফুতু,বুজাদা,বুনা,দিদিমনা আর দোদুলের দিদি তমা…এই কয়জন মিলে মঞ্জুপিসির তুলসীতলায় খেলতাম কুমীরডাঙা বা গৎ।কখনো কখনো বাবোল এসে যোগ দিত আমাদের খেলায়।বাবোলের মা আমাদের একটু হীনচোখে দেখতো।ওদের প্রতিষ্ঠিত ব্যবসা,দোতলা বাড়ি,নিজস্ব গাড়ি।আমাদের নিরিখে অনেক উচ্চবিত্ত।তাই বেচারা খুব একটা খেলতে আসার অনুমতি পেত না।

বুনা আর দিদিমনা জমজ বোন।বাবা মারা যাবার পর মায়ের সাথে মামাবাড়ি এসে উঠেছিল।বুজাদা ওদের মামাতো দাদা।বুজাদা ইংরাজী মাধ্যম স্কুলে পড়তো বলে ওর স্টেটাসটা যেন আমাদের চেয়ে উঁচুতে ছিল।কখনোই কুমীরডাঙা খেলায় ওকে কুমীর হতে হতো না।কানামাছি খেলায় ওর চোখ বাঁধা হতো না।লুকোচুরি খেলায় সবার আগে ধরা পড়লেও ওকে আউট করা অলিখিতভাবে বারণ ছিল।বুনা আর দিদিমনা কোমর বেঁধে ঝগড়া করতো যদি ক্রিকেট খেলার সময় ওকে ব্যাট না করতে দেওয়া হয়।অনেক সময় বুজাদার পিসি এসেও আমাদের বকাঝকা করতেন যদি বুজাদাকে কবাডি খেলায় "মোড়" দেওয়া হতো।ওরা সবাই বকাঝকা বা ঝগড়া করবার সময় বলতো,"জানিস ও ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ে!এতো সাহস ওকে আউট করিস!"ইংরাজী মাধ্যমে পড়লে কি হয়, জানতাম না।না বুঝেই খামোখা সম্ভ্রম জন্মাতো আমাদের মনে।

বুজাদাদের বাড়িটা আমার খুব ভালো লাগতো।সামনে অনেকটা বাঁধানো উঠোনের একপাশে একটা নারকেলগাছ হেলে পড়েছে গলিরাস্তার উপর।পাশে ক্ষয়াটে একটা পেয়ারা গাছ যার প্রায় সবটাই বাবোলদের উঠোনে উঁকি দিচ্ছে শ্যাওলামোড়া পাঁচিলের উপর দিয়ে।উঠোন পেরিয়ে ঢুকেই আরেকটা উঠোন।তাকে ঘিরে রয়েছে বারান্দাওয়ালা কয়েকটা ঘর।ওদের বাড়িতে সবসময় ঢোকার অনুমতি ছিল না।শুধু লক্ষ্মীপুজোর দিন আর চৈত্রমাসে বাবার গানের প্রসাদ নেবার জন্য ঢুকতে পেতাম।সেই যেবার ওদের ঠাম্মা মারা গেল,সেবার অবশ্য সারা পাড়া ঢুকে পড়েছিল ওদের বাড়িতে।ওরা কে কোন্ ঘরে থাকতো জানি না।তবে ঢুকেই বামদিকের সিঁড়িওয়ালা উঁচু বারান্দার ঘরে বুজাদার কাকাকে প্রায়ই দেখতাম।হয়তো ওটা ওনার ঘর ছিল।ওই ঘরটাকে আমি মনে মনে রান্নাঘর বানাতাম।যে বৌটা দুপুরে রান্না সেরে স্নান করতে গিয়ে একটা শাঁকচুন্নীর কবলে পড়েছিল,ঐ রান্নাঘরটা যেন ঐ বৌটার।বেচারা বৌটাকে শ্যাওড়া গাছে বন্দী করে শাঁকচুন্নীটা এসেছে সংসারে।রাতের বেলা ভাত চাইতে রান্নাঘরে গিয়ে বর দেখছে মাটির উনুনে গনগনে আঁচে পা ঢুকিয়ে বসে আছে চুলখোলা বিস্রস্তবসনা বৌ!বুজাদার অবিবাহিত ভালমানুষ কাকাকে মনে হতো সেই বোকাসোকা ভালমানুষ বরটা,যে ভয় পেয়ে একদৌড়ে ছুটেছিল গুনীনের কাছে সর্ষে-শুকনো লঙ্কার পুঁটুলি আনবে বলে।…



ফুতু আমার চেয়ে বয়সে বড়ো ছিল।কিন্তু রোগা,কোলকুঁজো ফুতুকে অনেক ছোট লাগতো বয়সে।দিনের বেলায় কাকপক্ষী বসতে পারেনা ওদের বাড়িতে…ওর মা আর ঠাকমার ঝগড়ার চোটে।রাতে শুরু হয় বাবা-মায়ের মারপিট।ফুতুর মায়ের গঠনও ফুতুর মতো।কিন্তু জিভ সাংঘাতিক ধারালো।সেই মায়ের মেয়ে ফুতু একদিন আমাদের 'এলিট' বুজাদাকে গাল দিলো ''শালা"। মুহূর্তের মধ্যে খন্ডযুদ্ধ শুরু হয়ে গেল দুই পরিবারের মধ্যে।আমি অবশ্য এই যুদ্ধের শুরু বা শেষ কোনোটাই দেখিনি।যে মুহূর্তে ফুতু উচ্চারণ করলো "শালা",বাড়ির দিকে ছুটতে শুরু করেছি উত্তেজিত হয়ে।ছোট করে কাটা চুলগুলো বাতাসে উড়ছে,চোখমুখ লাল হয়ে গেছে আমার।ওটা যে নিষিদ্ধ শব্দ।শুধু খারাপ লোকেরাই উচ্চারণ করে "শালা","জানোয়ার","বজ্জাত" বা "কুত্তার বাচ্চা"।বাইরের ঘরে সেলাই করছিল মা।হাঁফাতে হাঁফাতে গিয়ে নালিশ করি,"মা,ফুতু সেই বাজে কথাটা বলেছে।"মায়ের ভুরু কুঁচকে যায়,"কোন্ বাজে কথা?"মুখে উচ্চারণ করা বারণ যে শব্দ,তা বানান করতে থাকি ফিসফিস করে,"তালব্য শ-এ আকার,ক-এ আকার।"মা সেলাই রেখে এক ঝটকায় হাত ধরে আমার,"আর কখনো যেন এসব শব্দ শোনা বা বলা না হয়।ফুতুর সাথে আর খেলবে না।"ঠিক সেই সময়ই বুজাদার পিসির গলা শুনতে পাই ফুতুর উদ্দেশ্যে,"মাতালের মেয়ে!মায়ের যেমন শিক্ষা!"ফুতুর মা ঝাঁঝিয়ে ওঠে রাস্তার ওপাশে ওদের একতলার বারান্দা থেকে।"শালা" শব্দটা আমার মনে গেঁথে যায় 'ফুতুর সেই বাজে কথা' হিসেবে।

বড়ো হতে হতে আজকাল আমিও খারাপ মানুষ হয়ে গেছি।মুখে উচ্চারণ না করলেও অনেক সময় মনে মনেও কাউকে কাউকে 'ফুতুর সেই বাজে কথাটা' বলে পরিতৃপ্তি পাই।পরক্ষণেই মায়ের গলা কানে আসে,"আর কখনো যেন এসব কথা শোনা বা বলা না হয়।"মনে মনে জিভ কাটি।কিন্তু পাপবোধ সত্ত্বেও আবার খারাপ মানুষ হয়ে যাই অভ্যেসবশে।





Name:   Sanchayita Biswas           

IP Address : 212.142.70.51 (*)          Date:30 Apr 2017 -- 07:25 PM

৫।

বেশ খানিকটা অগোছালো 'L' আকারের ঘাসবিছোনো জমি ছেড়ে তিন রাস্তার মোড়ে তৈরী হয়েছিল দোতলা বাড়িটা।জমির এককোণে নীচু একটা 'টাইম-কল'।সকালবিকাল সেখানে জল নিয়ে ঝগড়াঝাঁটি-ভাবভালবাসা সবই চলে।তিনধাপ উঁচু উঁচু সিঁড়ি বেয়ে লোহার বরফিকাটা গ্রীল।তার ভেতরে ছোট্ট একচিলতে বারান্দায় একটা বেঞ্চ আর দুটো নীচু কাঠের চেয়ার।চেয়ারগুলোর হেলান দেবার খাঁড়া অংশটায় তিনটে করে কাঠের শিক লাগানো।তার একটা আবার নড়বড় করে।এই বারান্দাটা থেকে শুরু হয় মায়ের সংসার।


শোবার ঘরের লাগোয়া লম্বা একটা কামরা।একটা তক্তপোশ রাখার পর তাতে আর কিছু রাখার জায়গা নেই।তবু এককোণে দাঁড়িয়ে থাকে আলকাতরামাখা চালভরা একটা টিন।তক্তপোশের দুই পাশে দুটো কাঠের শিক লাগানো জানলা।জানলার ওপাশে টাইম-কল।তার পাশে খোয়াওঠা রাস্তা।রাস্তার পাশের নর্দমা উপচে ওঠে প্রবল বৃষ্টিতে।বাচ্চুদা বাপ্পাদা দুইভাই মিলে মাছ খোঁজে সেইসময়।জল বাড়তে বাড়তে ঘাসজমি ডুবিয়ে উঠে আসে বারান্দার সিঁড়ির দুইধাপ।আমার চব্বিশ-পঁচিশ বছর বয়সী মা তাতে কাগজের নৌকা ভাসায়।পাশে বছর তিনেকের একটা মেয়ে বিষ্ময়মাখা চোখে বসে থাকে।


রেলস্টেশন এখান থেকে বেশ দূর।তবু স্পষ্ট শোনা যায় আটটার ইছামতী লোকালের শব্দ।হয়তো মা কান পেতে বা মন বিছিয়ে বসে থাকে বলে আওয়াজটা অস্পষ্ট থেকে শ্রুতিগোচর হয়!আটটা বাজলেই মেয়েকে কোলে নিয়ে মা কামরাঘরের কাঠের শিকওয়ালা জানলায় চলে যায়।মেয়েকে জানলায় দাঁড় করিয়ে চাপা আনন্দমেশানো স্বরে বলতে থাকে,"দ্যাখো তো,দ্যাখো তো সোনা,তোমার বাবা আসছে নাকি?"মেয়ের চোখ অনুসরণ করে মায়ের দৃষ্টিপথ।দু'জোড়া চোখ আটকে থাকে রাস্তার বাঁকে যেখান থেকে সুদর্শন এক দীর্ঘদেহী পুরুষ রোজ রাতে ঘরে ফেরে প্রিয় মুখগুলো দেখবে বলে।


স্কুলে বেরোনোর আগে মা ভাত মাখায় মেয়ের জন্যে।এ মেয়ে খিচুড়ি যাওবা খায়,অন্য কিছু খাওয়াতে গেলে প্রচুর কষ্ট করতে হয়।সারা দুপুর মেয়ে লোকের কাছে থাকলেও অন্যের হাতে বাচ্চাকে খেতে দিতে মায়ের বেজায় আপত্তি।তাই স্কুলে যাবার আগে যেমন মেয়েকে খাইয়ে যায় মা,ক্লাসের ফাঁকে এসে দুপুরের খাওয়াও খাওয়ায়। লাল মেঝেতে ছোট্ট থালায় ভাত মাখায় মা।ছোট্ট মেয়েটা হলদে চুলের মেয়েপুতুল নিয়ে খেলা করে বারান্দার চেয়ারে।তাকে চান করিয়ে চুল বেঁধে চেয়ারের কাঠের গরাদের সামনে দাঁড় করায়।ভাত মাখতে মাখতে মেয়ের রিনরিনে স্বর কানে আসে মায়ের,"ও তোনাটা,ও তোনাটা,দ্যাথো তো দ্যাথো তো,তোমাল বাবা আত্তে নাকি?"দেয়ারের গরাদের ফাঁকে ভাবলেশহীন এক হলদে চুলের পুতুল…তার পিছনে অনুকরণপ্রিয় সরল এক শিশু…।মা থমকে যায়।তারপর হেসে উঠে মেয়েকে কোলে তুলে নেয়।


অনেক বছর পরে অন্য এক শিশুকে নিয়ে অন্য কোনো বাড়ির গেটে মা দাঁড়িয়ে থাকে মেয়ের অপেক্ষায়।রাস্তায় দৈত্যাকার সব গাড়ি।কোলের শিশুটি হাঁ করে দেখে তাদের।সে গাড়ি দেখলে বলে "গায়িইইই"।কুকুর দেখলেই উত্তেজিত হয় "বৌ বৌ"।কাক দেখেই হাঁক ছাড়ে "পাকিইইই"।মা উচ্ছ্বসিত হয়।বাচ্চাটাকে আদর করতে করতে বলে,"দ্যাখো তো সোনা,তোমার মা আসছে নাকি?"বাচ্চাটি অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে রাস্তার বাঁকে যেখানে অতীতের সেই অনুকরণপ্রিয় শিশুটি প্রিয় দুটি মুখ দেখবে বলে ফিরে আসছে পৃথিবীর প্রায় সবরকম মালিন্য গায়ে মেখে।মায়ের কোল থেকে আনন্দে চিৎকার করে ওঠে বাচ্চাটা,"মামাআআআমমম…"।



Name:   Sanchayita Biswas           

IP Address : 178.235.194.179 (*)          Date:05 May 2017 -- 12:20 PM

৬।
স্মৃতিগুলো খুব বেখাপ্পা।একটা আরেকটার সঙ্গে জড়ামড়ি করে বসে থাকে কখনো।আবার কখনো বিচ্ছিন্ন দৃশ্য তৈরী করে মাথার মধ্যে।তার সাথে সময় বা কাল ঠিক করে মেলাতে না পেরে তত্ত্ব তৈরী করি মনে মনে।মায়ের সাথে একটা মুহূর্ত ধরা আছে আমার স্মৃতিতে।দুপুর দুপুর বিকেল…আমাদের ভাড়াবাড়ির জানলা দিয়ে তেরছা রোদ আসছে…আমি বোধহয় ঘুম থেকে উঠেছি…মা উপুড় হয়ে আমার দিকে হাসি হাসি মুখ করে কি যেন বলছে…মায়ের মোটা মোটা দুটো বেণী বিছানায় লুটোচ্ছে…আটপৌরে তরুণী মুখ…সুন্দর নয়,সাধারণ…।আমার শুধু মনে হয়,ওইদিন আমি প্রথম মাকে চিনেছি।…

অনেকদিন পর্যন্ত মায়ের সন্তান ছিলাম…ঠিক যেমনটি সবাই হয়।তারপর জীবনটা অন্যরকম হয়ে গেল।হঠাৎ করে দেখলাম,আমি মায়ের মা হয়ে গেছি…শোকতপ্ত মাকে আর অভিভাবকহীন সংসারকে শক্তহাতে সামলাতে শিখে ফেললাম।কি করে যেন মা আর আমি সহযোদ্ধা হয়ে গেলাম।ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকা অংশগুলোকে জোড়াতালি দিয়ে অন্যরকম জীবন তৈরী করে ফেললাম দুজনে।…


শীত শীত একটা সন্ধ্যেবেলায় ভিড় হাসনাবাদ লোকালে উঠেছি। আমার উল্টোদিকের সীটে মা বসে আছে…সারা শরীর জুড়ে প্রিয়জন হারানোর শোক…ভীষণ সাদা সিঁথির দিকে তাকাতে পারছি না।ট্রেন ছুটছে বাড়ির দিকে।আমার হাতে সদ্যমৃত বাবার একটা ফাইল…অফিস থেকে দিয়েছে।ভিড় কমছে আস্তে আস্তে।মহিলা কামরার মাসিরা দেশজ ভাষায় গান ধরেছে অন্য কোনো পাশে। শব্দ মিশে যাচ্ছে ট্রেন আর হাওয়ার শব্দে।টুকরো টুকরো সুর ছুটে আসছে আমাদের দিকে।বাইরে ভীষণ অন্ধকার…ঠিক যেমন আঁধার আমার মনে। চোখ ফেটে জল আসছে…সামলাতে পারছি না।সবাই আমার দিকে তাকিয়ে আছে…আর তাকিয়ে আছে মায়ের দিকে।আমরা কেউ কারো দিকে তাকাচ্ছি না…।একই শোকে ভিজছি আমরা…সহযোদ্ধার মতোই।


Name:  d          

IP Address : 144.159.168.72 (*)          Date:05 May 2017 -- 12:25 PM

............................


Name:  কান্তি          

IP Address : 55.117.200.75 (*)          Date:05 May 2017 -- 09:00 PM

মন ভারি হয় তবু মন ছুঁইয়ে যায়। বড় ভাল লাগল।



Name:  Suhasini          

IP Address : 213.99.208.18 (*)          Date:08 May 2017 -- 10:31 AM

'একই শোকে ভিজছি আমরা…সহযোদ্ধার মতোই'।


Name:   Sanchayita Biswas           

IP Address : 178.235.194.179 (*)          Date:08 May 2017 -- 08:32 PM

৭।
অনেকদিন বাড়ি ছেড়েছি…পাড়া-এলাকা-শহর পেরিয়ে এখন অন্য-জীবন যাপন করছি।অবরে-শবরে ঘরে ফিরি।ইছামতীর সেতুর উপর দিয়ে সাঁইসাঁই করে গাড়ি ছোটে।নীচে ইছামতী শুয়ে থাকে আকাশে চোখ রেখে।
নদীর দিকে চোখ ফেরালেই প্রথমে শ্মশানের মন্দিরটা চোখে পড়ে…ছিমছাম,সুন্দর, নিরীহ একটা মন্দির।আগে এরকম চুনকাম করা সৌন্দর্য ছিল না।ঠিক কেমন ছিল,তাও খুব একটা মনে নেই। কারণ কেবলমাত্র কালীপুজোর রাতে মা বাবার সাথে ওখানে শ্মশানকালীর পুজো দেখতে যেতাম।বাঁশের গায়ে মোটা মোটা টিউব লাইট জুড়ে জায়গাটা এতো ঝলমলে করে রাখা হতো যে আসলে কেমন দেখতে জায়গাটা,তা কখনো খেয়াল করিনি।নীচু মন্দিরে দেবীমূর্তির গলায় অনেক জবার মালা…ধূপ-ধুনো-কাঁসর-ঘন্টা-উপাচার-দীর্ঘদেহী পুরোহিতের কপালে লাল তিলক।ভয়ে ভয়ে তাকাতাম, যদি পাপ হয়।ছোট্ট শালপাতার বাটিতে মোটাচালের খিচুড়ি।খিচুড়ির গন্ধে মিশে যাচ্ছে একটু দূরের কাঠের চুল্লী থেকে আসা বিজাতীয় গন্ধ।…

কেমিস্ট্রি পড়তে যেতাম এক সহপাঠীর বাড়িতে।রাস্তার পাশের দোতলা বাড়ি…উল্টোদিকে একটা অমলতাস গাছ।চৈত্র মাসে গাছভরা হলুদ ঝাড়লন্ঠন।এ রাস্তা শ্মশানমুখী।এই অমলতাস গাছ,ঐ পানাভরা পুকুর,ওপাশের সন্ধ্যামণির ঝোপের ধারে উঁচু শ্যাওলাজমা পাঁচিল…এরা প্রায় রোজদিন শোনে "বলো হরি,হরি বোল"।মাঝদুপুরের ভাতঘুম নষ্ট হয় শোকের উচ্ছ্বাসে।পর্যায় সারণী গুলিয়ে যায় শ্মশানবন্ধুদের মিছিলে।…


শেষ দুপুরে ঢুকেছি ওই গলিতে।কাঁধে ব্যাগ…মাথায় গিজগিজ করছে অরগ্যানিক কেমিস্ট্রি -পারিবারিক টানাপোড়েন-কবিতার খাতা-ইনফ্র্যাচুয়েশন…ভাঙা রোদ বিনুনী ছুঁয়ে যাচ্ছে বারবার।শান্ত গলি হঠাৎ মুখর হয়ে উঠলো।পিছন ফিরেই দেখি চারজনের কাঁধে চড়ে ফুল আর ধূপে সেজেগুজে আসছে মৃত্যু…আমারই দিকে।সরু গলি…পালাবার পথ নেই।শ্বাস চেপে হাঁটার গতি বাড়িয়ে দিই…পালাতেই হবে ধূপের গন্ধ থেকে,খই আর পয়সা ছড়ানো পথ থেকে।ছোট্ট গলি সহসা দীর্ঘ হয়ে যায়।আমিও এগোই…পিছনে পিছনে মৃত্যু।…



এই পথ দিয়েই আমার বাবা গিয়েছে।তখনও ইলেকট্রিক চুল্লী তৈরী হয়নি।ইছামতীর তীরে সন্ধ্যের আকাশের নীচে শুয়ে বাবা যখন অন্য কোনো যাত্রায় পাড়ি দিয়েছে,তখন সব পাখিরা ঘরে ফিরছে।…এই নদী,এই আকাশ আমার ভীমকেও পৌঁছে দিয়েছে বাবার কাছে।…



পাড়া-এলাকা-শহর পেরিয়ে অন্য-জীবনে ফিরি ইছামতীর সেতুর উপর দিয়ে।নীচে শুয়ে থাকে নদী।নদীর দিকে তাকালেই চোখে পড়ে শ্মশানের মন্দির।মন্দিরের পাশে উঁচু পাঁচিল।পাঁচিলের পাশের পলিমাটির ঢাল মিশে গেছে নদীতে।ওখানেই কোথাও একটা আমার বাবা দাঁড়িয়ে থাকে…পাশে ভীম।বাবার ঠোঁটে মৃদু হাসি…ভীমের পশম পশম শরীর জুড়ে আনন্দ ঝিলমিল করে।আমি বেশ দেখতে পাই ভীম আমাকে দেখেই খুশী হয়ে লেজ নাড়তে থাকে।বাবা হাত তোলে,"সাবধানে ফিরিস।"


Name:  Du          

IP Address : 182.58.108.9 (*)          Date:08 May 2017 -- 09:13 PM

নদীতীরের স্মশান ছোটবেলার শহরে দাড়িয়ে থাকে হারানো জনদের নিয়ে -- মন ছুয়ে গেল লেখা।


Name:   Sanchayita Biswas           

IP Address : 178.235.194.179 (*)          Date:09 May 2017 -- 12:00 PM

৮।
মায়ের বড়ো দুঃখ,মেয়ে সাজে না।সব মেয়েরা চুল বাঁধে কায়দা করে…সুন্দর পোষাক পরে পরীর মতো ঘুরে বেড়ায়।আমিও রোজ খেয়াল করি,আমার চারদিকে পরীরা ঘুরে বেড়ায়।মা বিয়েবাড়িতে গিয়ে দেখে কনের চারপাশে কত পরীর মতো মেয়ে হেসে লুটোচ্ছে…কায়দা করে খাবার খাচ্ছে,যাতে ঠোঁটের রং নষ্ট না হয়।মা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মেয়ের দিকে চায়।সাদামাটা সাজগোজ…চুলগুলো এলোমেলো হয়ে গেছে…পরনের পোষাকটা আসতে না আসতেই লাট হয়ে গেছে।মেয়ের রূপও নেই…রূপের প্রতি আগ্রহও নেই।

আমি কখনোই সাজতে পারতাম না।স্কুলে যেতাম একমাথা তেল আর দুটো বিনুনী করে।কোথাও বেরোনোর নাম শুনলে আমার গায়ে জ্বর আসতো।এক্ষুণি মা বলবে,"ঐ জামাটা পর্","এইভাবে চুল বাঁধ্","কাজল-টিপ পর্"।কোথাও যাবার আগে আমার আর মায়ের মধ্যে ছোটখাটো খন্ডযুদ্ধ লেগে যেতো।অশান্তি চরমে উঠতো পুজোর সময়।বাবা বলতো,"রেডি হ',ঠাকুর দেখতে যাবো"।মা বলতো,"চুড়ি পর্","লিপস্টিক লাগা","টিপ কই","নতুন জুতো পর্"।চুড়ি পরলে মনে হয়,হাত থেকে পড়ে যাবে…হাত উঁচু করে রাখতাম।লিপস্টিক নামক বস্তুটি আমি সামলাতে পারতাম না…ঘেঁটে গিয়ে আমাকে ভ্যাম্পায়ারের মতো লাগতো।টিপ ঘেমে গিয়ে কপাল থেকে কখন পড়ে যেতো,টের পাইনি কখনো।নতুন জুতো বড়ো ফোস্কাদায়ক।পরবার কিছুক্ষণের মধ্যেই ল্যাংচাতে শুরু করতাম।…এই ভয়াবহ অশান্তির হাত থেকে বাঁচবার জন্য প্রায় প্রতি পুজোতেই আমি বেড়াতে যাওয়ার আগে বেঁকে বসতাম।প্রায় প্রতি পুজোতেই পিঠে পাঁচ আঙুলের দাগ নিয়ে ফোঁপাতে ফোঁপাতে ঠাকুর দেখতে যেতাম।মানুষের ভিড়-মন্ডপ থেকে ভেসে আসা গান-টুনিলাইটের কারুকাজ-ছাতিমের গন্ধের মাঝে আমার কাজল গলে দুই গালে দাগ লেগে থাকতো অবাধ্যতার।

আমি অবাক হই রোজ।রোজ ভাবি,ঐ যে মেয়েটা ট্রেনের জানলায় বসেছে…ওর রেশম রেশম চুলগুলো হাওয়ায় ঘেঁটে যাচ্ছে…ও পরের স্টেশনে নামবার আগে চুলগুলো গুছিয়ে নেয়…কি সুন্দর দেখতে লাগছে!অটোয় বসে রোজ দেখি একজন ছোটখাটো দিদিমণিকে…কাঁধে ব্যাগ…হাতে ছাতা…এই ভিড়েও কেমন সুন্দর পরিপাটি রয়েছে পরনের শাড়িটা!স্কুলের বন্ধুরা কেমন সাজগোজ নিয়ে আলোচনা করতো ক্লাসের বিরতিতে…আলগোছে লম্বা লম্বা নখে হালকা গোলাপী নেলপালিশ লাগিয়ে নিতো…হিলতোলা জুতো পরতো পা না মচকে…পনিটেলের বাঁধনের থেকে কয়েক কুচি চুলকে স্বাধীনতা দিতো চোখে পড়ার…কানের পিছনে লুকোবার।আমি তখনো হাঁ হয়ে দেখতাম,এখনো দেখি।

মা ভেবেছে,মেয়ে স্কুল ছেড়ে কলেজে গিয়ে সাজতে শিখবে…কিংবা কলেজ পাশ করে ইউনিভার্সিটিতে গিয়ে…কিংবা চাকরী পেয়ে…নিদেনপক্ষে বিয়ের পরে!বেচারী মা!মেয়ে রোদ-বৃষ্টিতে ছাতা নেয় না…সানস্ক্রিন লোশন মাখে না…ব্যাগে চিরুনী-লিপস্টিক-পাউডার রাখে না…আলুথালু ফিনফিনে চুলের জট ছাড়ায় না বাইরে যেতে না হলে…ন্যাতা ন্যাতা পোষাক পরে যেখানে সেখানে চলে যায়!


মা নিজেও সাজে না কখনো।আসলে মাকে সাজতে হয় না।মা এত্তোবড়ো একটা খোঁপা বা এই মোটা একটা বিনুনী করে চওড়া প্লিটের শাড়ি পরলেই মাকে অসাধারণ লাগে।মা বুঝতে পারে না,মায়ের ব্যক্তিত্বের জৌলুশই মায়ের সাজ সম্পূর্ণ করে দেয়।মা বোঝে না,মেয়ের সেই সৌন্দর্যটুুকু নেই…।মেয়ে বড়ো সাধারণ…বড়ো সোজাসাপটা,রহস্যহীন।চাকরী-সংসার-সম্পর্ক সামলে মেয়ে রোজ জানলায় বসে দেখে,পাঁচিলের গায়ে নয়নতারার ঝোপটা নিজের আনন্দে ফুল ফোটাচ্ছে।


Name:   Sanchayita Biswas           

IP Address : 55.123.14.108 (*)          Date:15 May 2017 -- 07:28 PM

৯।
সন্ধ্যে নামার পর বড় রাস্তায় গিয়েছিলাম প্রয়োজনে।এ রাস্তা নদীর কাছে নিয়ে যায়।আজ বিজয়া দশমী।সমস্ত দোকানপাট যে বন্ধ,সে কথা মনে ছিল না।কালীমন্দিরের প্রণামীবাক্সটাও গুটিয়ে রাখা হয়েছে।আত্মাহীন মন্ডপ দাঁড়িয়ে আছে মাথা নীচু করে…ম্রিয়মাণ আলোকসজ্জা ।একজন-দুইজন করে ফিরে আসছে নদী থেকে।একটু পরেই ফিরতি মানুষের ঢল নামবে এই রাস্তায়।বারোয়ারী পুজোর ছেলে-ছোকরারা ভিজে গায়ে কাদা মাখামাখি অবস্থায় ঘরে ফিরবে…কেউ ক্লান্তপায়ে,কেউ-বা এলোমেলো পদক্ষেপে।সিঁদুরখেলার স্মৃতি নিয়ে ফিরবে এয়োস্ত্রীর দল।তাদের রাঙা সিঁথি-আরক্তিম কপোলের দিকে তৃষ্ণার্ত চোখে চাইবে কোনো অবিবাহিত তরুণী কিংবা প্রিয় কোনো মানুষ।…

আমার মাকে কখনো সিঁদুর খেলতে দেখিনি।ঠাকুর বরণ করে মা সটান ঘরে ফিরে আসতো।ভাসান দেখতেও মা ভালবাসতো না।আসলে বিদায় ঘিরে এতো উচ্ছ্বাসের কারণ মা খুঁজে পেত না।আমিও পাই না।আমাদের মফঃস্বল শহরে দুর্গাপুজো হয় খুব জাঁকজমক করে।ইছামতীর সাহচর্যে ভাসানটাও হয় জমজমাট।নদীর ধারটা থিকথিক করে জনসমাগমে।নদীতে কত নৌকো…তাতে বিশাল বিশাল প্রতিমা…প্রতিমা ঘিরে কত কত লোক…হাঁকডাক…কাঁসরবাদ্যি…"ঐ ঐ ঐ গেল দেশবন্ধুর ঠাকুর"…"তিন পাক ঘোরানো হয়ে গেল প্রান্তিকের প্রতিমা"…ঝপ্ ঝপ্ ঝপাস্…"দুগ্গা দুগ্গা,আবার এসো মা"…।

শেষ দুপুরের ভাঙা রোদে যখন বিদায়ী ঢাকের আওয়াজ মেশে,তখন আমরা দুই ভাইবোন বাবার সাথে ভাসান দেখতে যেতাম নদীর ধারে। আমি বুঝতে পারতাম না পাড়ের লোক কি করে বোঝে মাঝনদীতে ভাসমান অত নৌকোর মধ্যে কোন্ ঠাকুরটা কোন্ ক্লাবের।আমি শুধু দেখতাম লোকেরা কেমন তিনপাক ঘোরানোর পর নির্মমভাবে জলে ঠেলে দিতো ঠাকুরকে।নদী থেকে হিমালয় অবধি কোন্পথে পৌঁছনো যায়,বুঝতে না পেরে একটু পরেই উসখুশ করতাম ভিড় থেকে বেরিয়ে আসার জন্য। সারা শহর যখন ভাসান দেখতো অসীম আগ্রহে,আমরা তখন বাড়ির পথ ধরতাম।...

দশমীর সকালে বাবা কলাপাতা কেটে রাখবেই।কাঠির ডগায় তুলো মুড়িয়ে তৈরী হতো কলম। ভাসান শেষে সন্ধ্যেবেলায় ঠাকুরের আসনের সামনে বসতাম দুই ভাইবোন।আলতার বাটিতে কলম চুবিয়ে কলাপাতায় লিখতাম "শ্রী শ্রী মা দুর্গা সহায়"।আলতা শুকোলে বাবা পাতাগুলো তুলে রাখতো কুলুঙ্গিতে।মনে করে গতবছরের পাতাগুলোও বুড়িয়ে দিতো পুকুরে।প্রতিবছরের মতো আজও কলাপাতায় আলতা চুবিয়ে লিখেছি "শ্রী শ্রী মা দুর্গা সহায়"।কুলুঙ্গিতে পাতাটা তুলে রাখতে গিয়ে দেখি অনেক শুকনো পাতা…অনেক বছর ধরে জমেছে।একবার ভাবলাম ফেলে দিই।তারপর এ বছরের পাতাটা নির্বিকার চিত্তে রেখে দিলাম পুরোনো পাতার ভিড়ে।…বিদায় দিতে আমি সত্যিই ভালবাসি না।


Name:  San Gita          

IP Address : 57.15.12.34 (*)          Date:16 May 2017 -- 12:31 AM

অপূর্ব! বিষন্ন এক কবিতা যেন!


Name:  San Gita          

IP Address : 57.15.12.34 (*)          Date:16 May 2017 -- 12:31 AM

অপূর্ব! বিষন্ন এক কবিতা যেন!


Name:   Sanchayita Biswas           

IP Address : 55.123.14.108 (*)          Date:16 May 2017 -- 10:16 PM

১০।
পুজো শেষ হলেই মফঃস্বলে শীত শীত আমেজ এসে যায়।ভোরের দিকে গায়ে কাঁথা দিতে হয়।রাত বাড়লে সিগারেটের ধোঁয়ার মত কুয়াশা জমে থাকে আধফোঁটা শিউলির কুঁড়িতে।প্রতিপদের চাঁদ রসভারাক্রান্ত হতে হতে কোজাগরীতে পৌঁছোয়।খোয়াভাঙা গলিতে সন্ধ্যের বাতাসে ঘুরে বেড়ায় মুড়কি-মোয়া-নাড়ুর সুঘ্রাণ।

মায়ের অনেকদিনের শখ নিজের বাড়িতে লক্ষ্মীপুজো করবার।নিজের উঠোন নিজস্ব বারান্দা বেয়ে ছোট ছোট লক্ষ্মীর পা হেঁটে এসে ছোট্ট একটা ঠাকুরঘরে ঢুকবে।কারুকাজ করা কাঠের জলচৌকির উপর পাতা থাকবে আসন…তাতে চটের উপর লাল আর সাদা উলে নকশাদার ফুল তোলা।আসনে সিঁদুরমাখা ছোট্ট বেতের আঁড়ি।আঁড়িতে উপচে পড়বে ধান।তার উপর পান-সুপুরী-কাঁচা টাকা-আলতা-সিঁদুর-শাঁখা-পলা-লোহা-কড়ি।লাল চেলী দিয়ে আঁড়িতে ঘোমটা টানা…লক্ষ্মী ঠাকরুণের প্রতীকী রূপ।মায়ের এ ইচ্ছে অধরাই থেকে যায়।ভাড়াবাড়িতে একার সংসার।অভিভাবকহীন সংসারে দুটো বাচ্চা নিয়ে হিমসিম খেয়ে যেতে হয়।তার মধ্যে খোঁজ চলে এক টুকরো জমির…নিজস্ব একটু মাটির।

সেবার অনেক অসুবিধা সত্ত্বেও মা জেদ ধরে আয়োজন করে লক্ষ্মীপুজোর।বাবা দশকর্মা বাজার করে দেয়।মা সদ্য কেনা আঁড়িটা হাতে নিয়ে বসে থাকে বহুক্ষণ।ছোট্ট এক চিলতে শোবার ঘরে ঠাসাঠাসি আসবাবের মধ্যে কোনোরকমে জায়গা করে নিয়েছে রথের মেলা থেকে কেনা ছোট্ট ঠাকুরঘরটা।তাতে পুরী থেকে কেনা জগন্নাথ-বলরাম-সুভদ্রার পাশে বসে থাকে মা কালী আর মা লক্ষ্মীর ছবি।বাণীপিসির মা রোজ সকালে ফুল দিয়ে যায় পুজোর।সেই ফুলে সেজে ওঠে সিংহাসনটা।ওর সামনেই পুরোনো জলচৌকি ধুয়ে নিয়ে মা লক্ষ্মীর আসন পাতে।পিতলের ঘট,পুষ্পপত্র,বারকোশ,কোশাকুশি,জলশঙ্খ কিছুই তো নেই মায়ের।এর ওর থেকে চেয়ে চিন্তে জোগাড় হয় পুজোর বাসন।অঞ্জুদি আর বুলুদি হাতে হাতে গুছিয়ে দেয় সব।আসনের চারদিকে মাটির তালের উপর চারকাঠি বসিয়ে তাতে লাল সুতো বেঁধে দেয়।একদলা মাটিরর উপর আবীর-হলুূদ-ময়দা ছড়িয়ে তার উপর জলঘট স্থাপণ করে।ঘটের উপর পঞ্চপল্লব…তার উপর ধানভরা সরা…ধানের মাঝে স্বস্তিকচিহ্ণ আঁকা ডাবের শরীরে নতুন লাল গামছার ঘোমটা।… নারকেল কুরিয়ে আখের গুড় আর এলাচদানা মেখে স্টোভে নাড়ু করতে বসে মা।সুগন্ধে ম ম করে রান্নাঘরের সামনের একফালি উঠোন।পিঁড়েতে উবু হয়ে বসে থাকি মায়ের পাশে।আগুনের তাতে লালচে হয়ে ওঠে মায়ের মুখ।…মা আলপনা দেয় খড়িমাটিতে ন্যাতার পুটুলি ভিজিয়ে।রংচটা সিঁড়ি দিয়ে বারান্দা পেরিয়ে অদেখা দেবী হেঁটে আসেন মায়ের অপটু হাতে গোছানো ক্ষুদ্র আয়োজনে। …



অনেক পথ পেরিয়ে এসে আজ মায়ের নিজস্ব অনেক কিছু আছে।মা আজকাল প্রায় প্রতিবছর নিজের গড়া ঠাকুরঘরে নিজের কেনা বাসনে মা লক্ষ্মীর আবাহন করে।অনেক অতিথির সমাগম হয় এ বাড়িতে।দাসপাড়ার বস্তিবাসী মা-বাচ্চাগুলো ফল-ছোলা-খইয়ের সাথে সাথে নাড়ু আর মিষ্টির আকাঙ্খায় এসে দাঁড়ায় গেটের ওপাশে।পুজোর গোছগাছ করতে এখন আর কাউকে ডাকতে হয় না।মা-মেয়ে মিলেই সবটা গুছিয়ে ফেলে।প্রতিবছর আঁড়ি সাজাতে গিয়ে মেয়ের মনে পড়ে বহু বহু আগের একটা সন্ধ্যেবেলা।দশকর্মা ভান্ডার থেকে কেনা নতুন একটা আঁড়ি হাতে নিয়ে নিজের একটা সংসারের স্বপ্ন দেখছে আমার তরুণী মা…পিঠ ছাপানো চুল লাল মেঝেতে আশ্রয় পেয়েছে…মায়ের আটপৌরে আঁচলে মশলার গন্ধ…মায়ের দৃষ্টি জানলা পেরিয়ে পাড়া পেরিয়ে কতদূরে নিবদ্ধ…আকাশে চতুর্দশীর চাঁদ উঠেছে।...



Name:  de          

IP Address : 69.185.236.55 (*)          Date:17 May 2017 -- 03:22 PM

স্বপ্নের মতো লেখা -


Name:  pi          

IP Address : 174.100.177.10 (*)          Date:17 May 2017 -- 03:44 PM

সত্যিই ...


Name:   Sanchayita Biswas           

IP Address : 178.235.194.179 (*)          Date:18 May 2017 -- 06:22 AM

১১।
আমার স্মৃতির একটা বড়ো অংশ জুড়ে অহেতুক মুহূর্তরা বাস করে।অবরে সবরে তারা আসে যায়…শরতের মেঘের মতো।এই যেমন,কবে যেন একটা গাছ দেখেছিলাম কোথাও যাওয়া আসার পথে।গাছটা সাদা সাদা ফুলে আপাদমস্তক ঢাকা।সে পথটা কোথায়,তা আর মনে নেই।কি গাছ ছিল ওটা,জানি না।কিন্তু গাছটা আমি প্রায়ই দেখি অফ পিরিয়ডে কিংবা নির্ঘুম রাতে।...

সেবার মামাবাড়িতে গিয়েছিলাম।মামার কোনো বন্ধুর বাড়িতে বেড়াতে যাওয়া হয়েছিল একটা সন্ধ্যেবেলায়।সেই ভদ্রলোক বা তার পরিবারকে কিংবা সেই সান্ধ্য-আড্ডার কিছুই আমার মনে নেই।আমার শুধু মনে আছে বাড়িটা ছিল একটা বিশাল মাঠের মাঝে।হয়তো ছোট ছিলাম বলে মাঠটা অতো বড়ো মনে হয়েছিল…আসলে মাঠটা ছোটই ছিল।সেই সন্ধ্যেটায় উত্তাল বাতাস বইছিল।বগিথালার মত একটা চাঁদ ঝুলেছিল অগোছালো বাড়িটার মাথায়।…


আমাদের পাড়ায় লোডশেডিং হতো খুব।কারেন্ট অফ হলেই বারান্দায় এসে বসতাম সবাই।বারান্দা পেরিয়ে একচিলতে জমি পেরিয়ে ছোট রাস্তার ওপারে সুন্দরীদিদিদের বাড়িতে ঢোকার গলি।গলির একপাশে ছোটনদের শ্যাওলাধরা উঁচু পাঁচিল।অন্যপাশে আগাছা গজানো মেসবাড়ির চাতাল।সুন্দরীদিদিদের বাড়িটা দেখা যাচ্ছে আমাদের বারান্দা থেকে।টালি দেওয়া চালের ওপর বিশাল একটা শিরীষগাছ।অনুজ্জ্বল চাঁদ উঁকি দিচ্ছে গাছের ফাঁক দিয়ে।আজ বাতাস নেই…ভীষণ গুমোট।রাস্তায় পায়চারি করছে অনেকে।কে যেন রাস্তায় দাঁড়িয়ে গল্প করছে মায়ের সাথে।মা বারান্দার বেঞ্চে বসে শুনছে সেই গল্প…সাপের মাথায় মণি পাওয়ার গল্প।কোন্ বাড়িতে নাকি গত অমাবস্যায় দেখা গেছে একটা বিষাক্ত সাপ…মাথায় মণি নিয়ে ফণা তুলে আছে।মা গল্পটা বিশ্বাস করছে কি না বুঝতে পারছি না।তবে আমি বিশ্বাস করছি।আমার বিশ্বাসের সাথে কিভাবে যেন শিরীষগাছের ফাঁক দিয়ে আসা চাঁদের আলোটা জড়িয়ে গেছে…মনে হচ্ছে,শিরীষগাছটার কাছে গেলেই দেখবো, মণি পাহারা দিচ্ছে সাপটা।কুন্ডলীকৃত দেহের মাঝে ঝলমলে সাদা আলোর বিচ্ছুরণে চোখ ধাঁধিয়ে যাবে।রাত গাঢ় হচ্ছে।মেসবাড়ির ছাদে সিগারেটের আলো…জ্বলছে নিভছে।অনেক দূরে স্টেশনে অ্যানাউন্স করছে,"আপ ইছামতী লোকাল ঢুকছে এক নম্বর প্ল্যাটফর্মে"।ঘটিগরমওয়ালার ঘন্টা শুনতে পাচ্ছি ছোট রাস্তার মুখে…ঝুমঝুম ঝুমুরঝুম।…


Name:   সিকি           

IP Address : 132.177.20.167 (*)          Date:18 May 2017 -- 08:14 AM

পড়ব না এগুলো এখন।

খানিক পড়েই বুঝেছি, তাড়াহুড়োয় এ লেখা পড়তে নেই।

জমিয়ে রাখলাম। একলা হলে পড়ব। সময় নিয়ে পড়ব।


Name:   Sanchayita Biswas           

IP Address : 178.235.194.179 (*)          Date:19 May 2017 -- 05:12 PM

১২।
বিজাতীয় শব্দে আজ সকালে ঘুম ভেঙেছে…গাছ কাটার শব্দে।খাটের যেদিকে মাথা দিই,সেদিকের জানলার ওপাশে একটা বড়োসড়ো কাঁঠালগাছের বসত।বিয়ে হয়ে আসা থেকে দেখছি গাছটাকে।অল্পস্বল্প ফল দেয় ভরা গ্রীষ্মে।আসলে ওই জায়গাটা এতো ছায়া ছায়া যে ভালো রোদ পায় না গাছটা।তাই ফলটাও খুব সুস্বাদু হয় না।তবু থাকার অভ্যেসে সে রয়ে গেছে…যেভাবে সবল-দুর্বল সবরকম মানুষকে সইয়ে নেয় সংসার,ঠিক সেই ভাবে।…



সেদিন সকালে স্নানের শেষে ছাদে উঠেছিলাম ছাদের গাছগুলোকে দেখতে।কাঁঠাল গাছটা যে অসুস্থ,তা সেই দিনই খেয়াল করলাম।অতো বড়ো একটা গাছ…তার বিশাল একটি শাখা সম্পূর্ণ পত্রবিবর্জিত।যত পাতা ছিল,তার প্রায় সবটাই ঝরে গিয়ে ঢেকে ফেলেছে ছাদ আর ছাদের কার্ণিশ। ভিতর ভিতর ক্ষয়ে যাচ্ছে গাছটা।এরকমভাবে একদিন ক্ষয়ে যেতে দেখেছিলাম আমার প্রবল শক্তিশালী বাবাকে।ডাক্তার বলেছিলেন,শরীরের স্নায়ুগুলো নাকি শুকিয়ে যাচ্ছে বাবার।আমি মনে মনে দেখছিলাম শীর্ণকায়া চুর্ণীনদীকে।…



আমার শ্বশুরমশাই তদারক করছিলেন কাঁঠালগাছটা কাটার।গাছটাকে উনি পছন্দ করেন।নেহাতই নিরুপায় হয়ে কেটে ফেলছেন। একজন কাঠুরে মোটা দড়ি দিয়ে মোটা মোটা ডালগুলোকে পেঁচিয়ে ধরে টেনে রেখেছে মাটির দিকে।আরেকজন গাছে উঠেছে কুঠার হাতে।পেশাদারী হাতে কুপিয়ে কেটে ফেললো ডালগুলো।অসহায় শব্দে একে একে লুটিয়ে পড়লো শক্তিশালী শাখাপ্রশাখা।বিশাল বনস্পতি নগ্ন হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো মূল কান্ডটুকু নিয়ে।গাছটার গোড়ার দিক থেকে তখনও উঁকি দিচ্ছে সদ্য বেরোনো সবুজ চিকন একটা ডাল…তিন-চারটে কচি পাতা সমেত।…



আমার বাবাকে কোনোদিন অসুস্থ হয়ে শুয়ে থাকতে দেখিনি বলে মনে মনে একটা জোর ছিল সবসময়।বাবার কিছু খারাপ হতে পারে,এটা আমার কখনোই মনে হয়নি।একটা ছোট্ট নিশ্চিন্ততা মনের কোথাও একটা বাসা বেঁধে ছিল শেষ দিন অবধি।যেদিন বাবাকে ছাড়াই প্রথম সকালটা এলো,সেদিনও আমার মধ্যে শোকের চেয়ে বিষ্ময়বোধটাই বেশী ছিল।আমি ভীষণ অবাক হয়ে গিয়েছিলাম।আমার বিশ্বাসটা ভয়াবহরকমের চিড় খেয়ে গিয়েছিল।শীত শীত সেই সকালটা জানলার মোজাইকে তখন রোদের আলপনা আঁকছিল…যেরকমভাবে গতকালও এঁকেছে…আগামীকালও আঁকবে।…




আমার মেয়েটা সারা উঠোন প্যাঁকপ্যাঁক জুতো পরে গুড়গুড় করে হাঁটছে।টগরগাছের পাতা মুঠোয় নিয়ে খলখল করে হাসছে।চিৎকার করে উঠলো প্রতিবেশী বৌদিকে দেখে,''জেম্মা"। ঘষঘষ শব্দে করাত চলছে গুঁড়ি বরাবর।পাশে থালার ওপর এঁটো চায়ের কাপ…তলানীতে সর পড়ে আছে।…



কাঁঠাল গাছটার জন্য রাস্তা দেখতে পেতাম না এই জানালাটা দিয়ে।এখন দেখতে পাচ্ছি।আগে দেখতে পেতাম না বলে অনুযোগ করতাম।এখন দেখতে পাচ্ছি বলে অস্বস্তি হচ্ছে।পূর্ব অভিজ্ঞতা দিয়ে বুঝতে পারছি,অস্বস্তিটা অনেকদিন থাকবে।চোখটা বারবার গাছটার শূণ্য বসতের দিকে চলে যাবে।ছাদে কাপড় মেলার যে তারগুলো গাছটার গায়ে আটকানো ছিল,সেগুলো দীর্ঘকাল জমে থাকবে ছাদের কোণে।তারপর বর্ষায় ভিজে একসময় পচে যাবে।ভিজে জামাকাপড় অন্য কোনো তারে শুকোতে দেবো।সেটাই একসময় অভ্যেস হয়ে যাবে।না থাকাটা অনেকরকম অভ্যেস বদল করে দেয়।সেটাই নিয়ম।…


Name:  d          

IP Address : 59.203.248.0 (*)          Date:19 May 2017 -- 07:01 PM

.................


Name:   Sanchayita Biswas           

IP Address : 178.235.194.179 (*)          Date:20 May 2017 -- 08:50 AM

১৩।
পুজো শেষ হলেই দুপুরগুলো বদলে যায়।কেমন ওম ওম হয়ে যায় রোদ্দুরটা…চোখে আরাম লাগে।আমার শ্বশুরবাড়িটা মোটামুটি বাগানবাড়ি।একটু ছায়া ছায়া ভাব সারা বাড়িটার গায়ে প্রায় সবসময় লেগে থাকে।পুজোর পরই এ বাড়িতে শীত টুকি দেয়।পামগাছ আর বেগমবাহারের ঝাড় পেরিয়ে নানা রঙের পাতাবাহার আর রঙ্গন লাল সুরকি বিছোনো পথটার দুইদিকে সান্ত্রীর মতো দাঁড়িয়ে থাকে।শীতটা কেমন করে যেন ওদেরকে ফাঁকি দিয়ে বাড়ির সাদা দেয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড়ায়।এই জানলা ওই জানলা দিয়ে উঁকি দেয়।পাপোষের কিনারায় দাঁড়িয়ে নখ খোঁটে অপ্রস্তুতভাবে।




বারান্দার গায়ে একটা কামিনীর ঝাড় দাঁড়িয়ে আছে বহুদিন ধরে।দুপুরে স্নান করার পর আমার শ্বশুরমশাই বারান্দার ওইখানে গীতাপাঠ করেন সাদা ধুতি পরে।দুই এক কুচি রোদ রোজই দেখি গ্রীলের ফাঁক দিয়ে শ্লোকগুলোর ওপর পড়ছে।উনি তাঁর প্রাচীন তর্জনীটা দিয়ে ছুঁয়ে থাকেন রোদেলা শ্লোকগুলোকে।আমার বড়ো মায়া লাগে এই মুহূর্তটায়।



একটা মরচে রঙের কুকুর রোজ আসে এ বাড়িতে।সকালে রুটি খায় কলতলার উঠোনে বসে।দুপুরে ভাত খেয়ে সরু শরীরটা নিয়ে সামনের সিঁড়িতে শুয়ে থাকে সে।ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে বোধহয় পাতাঝরার শব্দ শোনে।দুপুরের রোদটা যখন বারান্দা পেরিয়ে উঠোন পেরিয়ে আমলকীগাছের মাথায় আশ্রয় নেয়,কুকুরটা গা মুচড়ে আড়মোড়া ভাঙে তখন।থাবার ডগা থেকে ঘুম ঝেড়ে ফেলে পাড়া বেড়াতে যায়।ও জানে না,ওর এই রোজনামচাটুকু আমার কতোটা প্রিয়।



পুজোর ছুটি চলছে।প্রতিবারের মতো এবারও আমি কোথাও বেড়াতে যাচ্ছি না। সারা দুপুর জেগে জেগে গুলতানি করছি ফেসবুকে।আমার ভালো লাগছে।মোহর ঘুমোচ্ছে গায়ে পা তুলে…টুকটুকে ঠোঁটদুটো তিরতির করে কাঁপছে মাঝে মাঝে।ওর কপালে কাজলের টিপে আমার আঙুলের ছাপ…গায়ের কাঁথাটা পা দিয়ে সরিয়ে দিচ্ছে বারবার।এই যে ছাতারে পাখির কিচিরমিচিরে মাঝে মাঝে অটোর ঘড়ঘড় আওয়াজ মিশছে, মোহর পাশ ফিরে আমায় খুঁজে নিচ্ছে…ছুঁয়ে থাকছে... অস্ফুটে ডাকছে "মামমাম"।আবার ডুবে যাচ্ছে শেষ না হওয়া স্বপ্নে।আমি স্নিগ্ধ হয়ে যাচ্ছি নির্ভার শৈশবে…যেমন করে সোনালী দুপুরটা রোজ ভরে ওঠে আটপৌরে আনন্দে।…


Name:   Sanchayita Biswas           

IP Address : 178.235.194.179 (*)          Date:21 May 2017 -- 01:29 PM

১৪।
বিশ্বকর্মা পুজোর দিন প্রতিবার বাঁশভরা লরি এসে দাঁড়াতো গলির মুখটায়।হস্টেল থেকে বেরিয়ে বালিশ-তোষকের দোকান পার করে তেমাথার মোড়ে দেখতাম শাবল দিয়ে গর্ত করছে রাস্তার দুইপাশে।
-"কি হবে ঐ গর্তগুলোতে?"প্রথমবার দেখে বেশ অবাক হয়ে প্রশ্ন করেছিলাম এক সহপাঠীকে।সে তো হেসেই অস্থির,"আরে বোকা, পুজো হবে ওখানে…দুর্গাপুজোর মন্ডপ গড়ছে।"আমি কেমন থতমত খেয়ে গেলাম,"রাস্তার উপর পুজো!"সহপাঠী এবার বিরক্ত,"তা কোথায় হবে?কয়টা মাঠ আছে কলকাতা শহরে?"আর অবাক হইনি কখনো।প্রতিবার বিশ্বকর্মা পুজো থেকে দেখতাম উত্তর কলকাতার এই ঘিঞ্জী গলিতে ইট-কাঠ-পাথর-কফ-থুথু-আস্তাকুড়ের মাঝে কেমন সুন্দর করে তৈরী হচ্ছে নকল প্রাসাদ।এখানে মা দুর্গা আসবেন ষষ্ঠীতে।অবশ্য তাঁর সাথে এই শহরে কখনো আমার দেখা হয়নি।প্রতি চতুর্থীতে ব্যাগপত্র গুছিয়ে আমি ফিরে গিয়েছি আমার নিস্তরঙ্গ মফঃস্বলীয় জীবনে।

আমাদের ছোট্ট শহরে পুজোটা হয় বেশ জাঁকজমক করে।পাড়ায় পাড়ায় পুজো…ছোট-বড়ো মাঠ জুড়ে সুদৃশ্য মন্ডপ…আলোকসজ্জা…ফুচকা-এগরোল-বিরিয়ানীর ঠেক…ঝালরঝুলুর জামাকাপড়পরা পরীর সারি…'মাচো' নায়কের দল উড়ন্ত বাইকে…সব মিলিয়ে জমজমাট একটা অভিজ্ঞতা।তার সাথে জুড়ে যায় আমার পড়ার টেবিলজোড়া পূজাবার্ষিকীর সম্ভার আর জানালার ওপাশে স্থলপদ্মের থোকা।



আমি কোনোদিনই খুব একটা হইচই করা মানুষ নই।তাই মন্ডপে বসে আড্ডা দেওয়া বা দল বেঁধে ঘোরার অভিজ্ঞতা আমার নেই।সাজগোজের আলিস্যিতে দোনোমনা করে করে আমার ষষ্ঠী-সপ্তমী-অষ্টমী কেটে যায়।মায়ের তাড়া খেয়ে বেরোতে বাধ্য হই নবমীতে।হেঁটে হেঁটে পা ব্যথা করে ঠাকুর দেখা আমার পোষায় না।মন্ডপে ঢোকবার জন্য দেড় মাইল লম্বা লাইন দেখলেই আমি পালিয়ে যাই।আমি কেবল মন্ডপই দেখি বেশীরভাগ সময়ে।আর দেখি মানুষজন।যে বাচ্চাটা বেলুন নেবে বলে চিলচিৎকার জুড়েছে তার অপ্রস্তুত মায়ের কোলে…তাকে দেখি।সেলফি-পাগল কৈশোর দেখি।ভিড়ের অছিলায় প্রিয় মানুষের হাত ছুঁতে চাওয়া তরুণীকে দেখি।সাজগোজের শালীনতা পেরিয়ে যাওয়া প্রায় তাড়কা রাক্ষসী গতযৌবনা নারীকে দেখি।যে রিকশায় করে ঘুরছি,তার চালকের গায়ের ছেঁড়া নাইট রাইডার্সের জার্সিটা দেখি।এস.ডি.ও. বাংলোর গায়ে দাঁড়িয়ে থাকা ছাতিম গাছটাকেও দেখি…সারা শরীরে ফুলের গন্ধ নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে গাছটা…কিন্তু নবমী নিশির উন্মাদনায় তাকে কেউ দেখছে না।



পুজোর ছুটি প্রায় শেষ হতে চললো।ভাইফোঁটার পর আবার কাজে বেরোতে হবে।আবার দশটা-পাঁচটার জীবন…আবার ছাঁচবন্দী হয়ে যাবো।ভিড় অটোয় চাপাচাপি করে যাবার সময় মনে পড়ে যাবে এক ফালি নখের মতো চতুর্থীর চাঁদটাকে…রাস্তার দু'ধারের আলোর সারির মধ্যে দিয়ে ছুটে চলা একটা ভ্যান-রিকশা…মন্ডপ থেকে গান ভেসে আসছে "হায় রে পোড়া বাঁশি ঘরেতে…হোওওওওও রইতে দিলো না ঘরেতে"…মাইকের উচ্চকিত নিরাপত্তায় আশ্রয় নিয়ে সুর লাগাতে চেষ্টা করছি "হোওওওও''তে…তখনই আবিষ্কার করছি আমার পাশে আমার স্বামীও বসে বসে একই চেষ্টা করছে…আর আমাদের সাথে ভ্যানচালকও…।


Name:  aranya          

IP Address : 83.197.98.233 (*)          Date:22 May 2017 -- 03:11 AM

অসাধারণ


Name:   Sanchayita Biswas           

IP Address : 178.235.194.179 (*)          Date:24 May 2017 -- 03:12 PM

১৫।




গোরা একা থাকতে মোটেও ভালবাসে না।বাড়িতে কেউ না থাকলেই ওর রাগ হয়।এটা-সেটা-ওটা প্রায়ই নষ্ট করে।অনেক চেষ্টা করেও এ স্বভাব পরিবর্তন করা যায়নি।মা প্রায়ই স্কুল থেকে ফিরে দেখে খবরের কাগজ কুটি কুটি করে ছড়িয়ে রাখা,জলের বোতল তুবড়িয়ে রাখা,সোফার কভার মেঝেতে ফেলা।মা কোমরে আঁচল জড়িয়ে বেতো পা নিয়ে গোরার পিছনে ছোটে।গোরা খাটের তলায় আশ্রয় নেয়।

গোরার সবচেয়ে মজা হয় আমি আর মোহর বাড়ি ফিরলে।গেট দিয়ে আমায় ঢুকতে দেখেই ওর তুর্কীনাচন শুরু হয়।সারা বাড়ি,খাট বিছানা নেচে নেচে লন্ডভন্ড করে।এক লাফে আমার গায়ে উঠে যায়।চটকে চটকে আদর করলে তবে সে খুশী।মোহরের গায়ে কিন্তু কক্ষণো ওঠে না ও।এটা অলিখিত একটা নিয়ম।

মোহরের জীবন্ত পুতুল হলো গোরা।মোহরের চারমাস বয়সে গোরা যেদিন আমাদের বাড়িতে এসেছিল,সেদিন সে ঠিক একমাস বয়সী শিশু।প্ল্যাস্টিকের বাক্স থেকে নেমেই ছোট্ট গোরা সারা বাড়িতে কি যেন খুঁজে বেড়াচ্ছিল।মা সোফার উপর তুলে দিতেই ঘুমিয়ে পড়লো।বুঝলাম,ও একটু নিরাপদ উষ্ণতা খুঁজছিল।মোহর আমার কোল থেকে ড্যাবড্যাব করে গোরাকে দেখতো।আর গোরা দেখতো আমাকে।যেখানে বসতাম আমি,ও ঠিক আমার পায়ের মধ্যে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়তো।মোহরকে আমার কোলে দেখলে কিরকম অদ্ভুতভাবে তাকিয়ে থাকতো।কে জানে,ওর হয়তো ওর মায়ের গায়ের ওমের স্মৃতি মনে আসতো।

গোরা সারা রাতে বেশ কয়েকবার এসে দেখে যায় আমাকে আর মোহরকে।আমরা দেরী করে ঘুম থেকে উঠলে দেখি গোরা খাটের মাথার দিকে মেঝেতে শুয়ে অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য।মোহর ঘুম থেকে উঠেই আগে ওইদিকে হাঁক পাড়ে,"গোয়া"।গোরা অমনি হাজির।মশারী তুলে দিতেই সোজা বিছানায় টান টান হয়ে শুয়ে পড়ে।এখন তার আদর চাই।কান চুলকে,পেট চুলকে দিলেই সে খুশী।এর মাঝেই মোহর ওর মুখের মধ্যে হাত চালান করে দেয় কিংবা লেজ থেকে দু'খানা লোম তুলে আমার হাতে দেয়।গোরাও দু'একবার চেটে দেয় মোহরের মুখ।মোহর খিলখিল করে হাসে।

মা চায়ে বিস্কুট ডুবিয়ে খেতে যায়।মোহর সেই বিস্কুট ছিনিয়ে নিয়ে গোরার মুখে গুঁজে দেয়,"খা খা"।গোরা বল নিয়ে ছুটে ছুটে খেলা করে।মোহর বড়দের মতো হাততালি দিয়ে ওকে উৎসাহ জোগায়,"বাঃ বাঃ।ছোতো।"মোহর প্যাঁকপ্যাঁক জুতো পরে হাঁটে।গোরা শব্দের রহস্য ভেদ না করতে পেরে তার পায়ে পায়ে ঘোরে এ ঘর সে ঘর।গোরার অযাচিত ঠেলায় মোহর হাঁটতে হাঁটতে পড়ে গেলে নিজেই জিভ কাটে,"এ মা!"আর গোরা ধাক্কা দেওয়ার লজ্জায় মুখ লুকোয় সোফার তলায়।

আজকাল বিকেলবেলায় লোকজন প্রায়ই রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় আমাদের গেটের দিকে তাকায়।সেখানে প্রায়ই একটা এক বছর চার মাস বয়সী দুইপেয়ে লিলিপুট গ্রীল ধরে দাঁড়িয়ে লোক চলাচল দেখে ঝলমলে দৃষ্টিতে।পাশে বছর খানেকের চারপেয়ে এক দেবদূত দাঁড়িয়ে থাকে।গ্রীলের ফাঁক দিয়ে তার লালচে নাক বেরিয়ে থাকে।কমলালেবু রোদ জড়িয়ে থাকে দু'জনকে।আমি আর মা বারান্দায় বসে দেখি আর মুগ্ধ হই।

এই সুতোর পাতাগুলি [1] [2]     এই পাতায় আছে2--32