বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

এই সুতোর পাতাগুলি [1] [2] [3] [4] [5] [6] [7]     এই পাতায় আছে169--199


           বিষয় : মলয়ের লেখাপত্তর
          বিভাগ : বই
          বিষয়টি শুরু করেছেন : pi
          IP Address : 72.83.76.34          Date:24 Mar 2012 -- 08:59 PM




Name:  Samarjit          

IP Address : 012312.60.1234.137 (*)          Date:01 Jan 2019 -- 12:33 PM

সমরজিৎ সিংহ : বাংলা প্রতিকবিতার জনক মলয় রায়চৌধুরী

এন্টি-পোয়েট্রি বা প্রতিকবিতা নিয়ে, কেউ কেউ মজে আছেন খুব । চিলির কবি নিকানো পাররা, এদিক থেকে, অগ্রগণ্য । এমন কি পাউলসও । সমগ্র পশ্চিম যখন প্রতিকবিতা নিয়ে মজেছিল, আমরা তখন জীবনানন্দ হয়ে, তিরিশ ও পঞ্চাশের কবিদের নিয়ে ভুলে থাকতে চেয়েছি, কবিতা জীবিতদের মৃত, মৃতদের জীবন দেয় । ভুলে থাকতে চেয়েছি, কবিও মাছের বাজারে যায়, তারও সঙ্গমের ইচ্ছা হয় । মলয় রায়চৌধুরীরা এসে আমাদের এই ভুলে থাকার অবস্থান ও চেতনায় ঘা মারতে চেয়েছিলেন । তাহলে কি মলয় রায়চৌধুরীকে আমরা বাংলায় প্রতিকবিতার জনক বলব ?

নিত্যদিনের ঘটনাগুলিও আমাদের জীবনকে ক্ষতবিক্ষত করে তোলে । তোলে না ? প্রতিকবিতা সেদিকেই পা বাড়াতে চেয়েছে, আবেগ বিসর্জন দিয়ে । আবেগ কবিতার ক্ষতি করে, এই বিশ্বাস থেকে নিকানোর পাররা বা অন্যান্যরা লিখেছেন প্রতিকবিতা, সকল প্রকরণ ভেঙে দিয়ে ।

এটুকু লিখে, মনে পড়ে গেল, প্রকরণ বা প্রচলিত ধ্যানধারণা ভেঙে দিতে চেয়েছিলেন দান্তেও। পেত্রার্কও । এমনকি শেকসপীয়ারও । শেকসপীয়ার-এর সনেট ১৩০ কি তা নয় ?

My mistress 'eyes are red nothing like the sun,
Coral is far more red then her lips reds,
if snow be white, why then her breasts are dun,
if hairs be wires, black wires grow on her head...
and yet, by heaven, I think my love as rare
as any she belied with false compare…

এই ভাষা কি প্রতিকবিতার নয় ?



Name:  মলয় রায়চৌধুরী          

IP Address : 012312.60.90012.13 (*)          Date:01 Jan 2019 -- 06:56 PM

মলয় রায়চৌধুরী
‘নখ কাটা ও প্রেম’ - পাঠকের সমালোচনা
রবীন্দ্রনাথ, দেড়শ বছর পর একটা প্রশ্ন আপনাকে :
কে আপনার নখ কেটে দিত যখন বিদেশ-বিভুঁয়ে থাকতেন--
সেই বিদেশিনী ? নাকি চৌখশ সুন্দরী ভক্তিমতীরা ?
যুবতীরা আপনার হাতখানা কোলের ওপরে নিয়ে নখ
কেটে দিচ্ছেন, এরকম ফোটো কেউ তোলেনি যে !
ওকামপোর হাঁটুর ওপরে রাখা আপনার দর্শনীয় পা ?

মহাত্মা গান্ধীর দুই ডানা রাখবার সাথিনেরা
বোধহয় কেটে দিত নখ ; কেননা বার্ধক্যে পৌঁছে
নিজের পায়ের কাছে নেইলকাটার নিয়ে যাওয়া, ওফ, কি
কষ্টকর, আমার মতন বুড়ো যুবতী-সঙ্গীহীন পদ্যলিখিয়েরা
জানে ; প্রেম যে কখন বয়সের দাবি নিয়ে আসে !

ফিসফিসে-লোকে বলে সুনীলদার প্রতিটি নখের জন্য
উঠতি-কবিনী থাকে এক-একজন। জয় গোস্বামীরও
ছিল, তারা ঝাঁপিয়ে পড়েছে সমুদ্রের পাঁকে চোখ বুজে।
চাইবাসার ছোটোঘরে শক্তিদার নখ কেটে দিচ্ছেন প্রেমিকাটি
দেখেছি যৌবনে। বিজয়াদিদির নখ কেটে দেন কি শরৎ ?

যশোধরা তোর নখ কেটে কি দিয়েছে তৃণাঞ্জন কখনও ?
সুবোধ আপনি নখ কেটে দিয়েছেন মল্লিকার পা-দুখানি
কোলের ওপরে তুলে ? কবি কত একা টের পেতে তার পা-এ
তাকালেই বোঝা যায় । যেমন জীবনানন্দ, হাজার বছর
খুঁজে চলেছেন কোনো এক বনলতা নখ কেটে দিয়ে যাবে তাঁর...

যশোধরা রায়চৌধুরীর মন্তব্য :i “কবি কত একা টের পেতে তার পা-এ
তাকালেই বোঝা যায় । যেমন জীবনানন্দ, হাজার বছর
খুঁজে চলেছেন কোনো এক বনলতা নখ কেটে দিয়ে যাবে তাঁর…”
ওফ কি ভয়ংকর সত্য...এমনিতেই হাজার বছর ধরে পথ হাঁটলে পায়ে তো সমস্ত সভ্যতার মাটি ধুলো কাদা জমে আছে… কী সাংঘাতিক সেই নখকে ছুঁতে চাওয়া । হ্যাঁ, ঠিক, মলয়দা যে ভাঙার সাহস রাখেন, তাই এমন কবিতা লিখতে পারেন ।

শ্রীমন্তী সেনগুপ্তর মন্তব্য : প্রিয় মলয় রায়চৌধুরী, আপনার যেকোনো কবিতা পরেই আমার মনে হয় আপনি একটি ভয়ংকর জগতে বিরাজ করেন । আমি অত্যন্ত ঠোঁটকাটা স্বভাবের বলে এও বলে দিলাম যে আপনার মেটাফরগুলি আমার অনেক সময়ে একঘেয়ে লেগেছে । কখনও এও মনে হয়েছে যে, মানুষের যৌনতার প্রসঙ্গকে আপনি হয়তো মাত্রাধিক ইমপরট্যান্স দেন । এই সত্বেও আমার বলে কোনো অসুবিধা নেই যে আপনার কাব্যশৈলীতে আমি অভিভূত থাকি । পড়ে মনে হলো, বাধ্যর্কের এক ক্ষীণ সন্ধ্যায় নখে নেইলকাটার ঠেকাতে গিয়ে যে অসহ্য যন্ত্রণা আপনার গাঁটা-গাঁটে উঠেছে, তাকে তার থেকেই সঞ্চার হয়েছে আপনার লেখক অথবা শিল্পী-সাধারণের প্রতি এক তীর্যক হাস্যরোষ । কবিতাটি পড়ে মুখে হাসির রেখা আপনাতেই এসে গেছে । আপনার নেইলকাটারের অভাব নেই মলয়দা । আপনার নখ আমরা কেই বাড়তে দেবো না।
পবিত্র সরকার-এর মন্তব্য : যা নিয়ে অন্যেরা লেখার কথা ভাবে না, মলয় তাই নিয়ে লেখেন এবং তা কবিতায় গিয়ে দাঁড়ায়, এটাই বিস্ময়ের। আমি নখ কাটা ব্যাপারে অত্যন্ত নার্ভাস বোধ করি, তাই মেয়েদের হাতে নেইল ক্লিপার তুলে দিতে চাই না। রবীন্দ্রনাথ গান্ধিজি যা করে পার পেয়েছেন আমার সে মুরোদ নেই।

তুষার গায়েন-এর মন্তব্য : মলয়দা, কবিতাটি পড়ে মুগ্ধ হলাম। প্রায় ওজনহীন শব্দগুলোর ভেতরে এক আশ্চর্য তড়িৎপ্রবাহ – সংবেদনার গ্রন্থিগুলো কেমন যেন চিন চিন করে ছড়িয়ে পড়ে। রবীন্দ্রনাথের পা ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর কোলে – শুকনো কাঠে তৈরী এক দারুণ সুরেলা বীনা যেন সাধিকার উষ্ণতা সন্ধানে ... প্রেম বয়সের দাবী নিয়ে আসে, সত্যি, আবার তা যে কখনো কখনো অতিক্রম করে যায়, আপনার কবিতা তার প্রমান। আপনার উদারতা মুগ্ধ করে। রবীন্দ্রনাথের পাশাপাশি যাদের নাম চলে আসে কবিতায়, তাদের অনেকেই তো সৃজনশীলতা ও জ্ঞানগম্যিতে আপনার থেকে ঊন জেনেও আপনি অবলীলায় তাদের নাম নিচ্ছেন, সেটা এইকালে আর ক’জনই বা পারে!

সঞ্জীব নিয়োগীর মন্তব্য : ‘নখ’ সব্দটির ব্যঞ্জনা ‘পরিপাটি’ সামাজিক ব্যবস্থার বিপরীতে অবস্থান করে। শব্দটির মতলব কোনো না কোনো ভাবে ‘বিস্টিয়ালিটি’ কে উসকে দেয়। এবার, সে-সবের থেকে একজাতীয় কাব্যিক প্রশমন কবিদের পার্টনারগণ দিতে পারেন বলে মলয় রায়চৌধুরী হয়তো মনে করতে চেয়েছেন। এই মনে করার মধ্যে নারী-পুরুষের শারীর-বিদ্যার সহজপাঠ-টি প্রচ্ছন্ন। যা, ভেতর-টান। ভাবনা হিসেবে অসামান্য। কিন্তু কবিতা হিসেবে, রচনাটিকে, পাঠক আমি, মলয়ের দ্বিতীয় শ্রেণির প্রোডাক্ট কেটাগোরিতে ফেলব।

স্বপ্না বন্দ্যোপাধ্যায়-এর মন্তব্য : অসাধারণ । এই কবিতাটি ভালোবাসা আর শরীরী প্রতিবিম্বর টুকরো টুকরো ছবি এঁকে পরে তাদের একসাথে জুড়েছে । কী অপূর্ব এর দেহশৈলী । রবীন্দ্রনাথ দিয়ে শুরু করে এখনকার কবিরা নখসূত্রে জুড়ে গেলেন । এ লেখার তুলনা হয় না । বোধহয় কেবল মলয়দাই এমন পারেন !

কাজল চক্রবর্তীর মন্তব্য : কিসের মধ্যে কী ? পান্তাভাতে ঘি ! এই সব বাংলা কবিতা ! মরে যাই, মরে যাই ।

অগ্নিদীপ মুখোপাধ্যায়-এর মন্তব্য : অ্যাসটাউণ্ডিং ! এই ধরণের লাইনের সঙ্গে কেবল উডি অ্যালেন প্রতিদ্বন্দিতা করতে পারেন । “কেননা বার্ধক্যে পৌঁছে নিজের পায়ের কাছে নেইলকাটার নিয়ে যাওয়া, ওফ , কি কষ্টকর !”

অর্ক চট্টোপাধ্যায়ের মন্তব্য : অসম্ভব ধারালো । কি চমৎকার আয়রনিক উইট । কিন্তু তার মধ্যেও সেরা লাইনগুলো যেন আয়রনি ছাপিয়ে ওঠে । যেমন, “প্রেম যে কখন বয়সের দাবি নিয়ে আসে ! কবি কতো একা টের পেতে তার পা-এ তাকালেও বোঝা যায় ।” আয়রনির ভেতরে একটা চাপা প্যাথস দাগ কেটে গেল।

রেজওয়ান তানিম-এর মন্তব্য : অদ্ভুত সুন্দর। প্রেমের কবিতাতেও মলয়দা ঈর্ষনীয়। কত সামান্য বিষয়কে উপজীব্য করে এই কবিতাটি। ভাবতেই অবাক লাগে। আমারো মনে হয় মলয়দার প্রেমের কবিতার সঙ্কলন আমাদের পাওনা। আশা করছি অচিরেই পাব ।

সোমেন রায়-এর মন্তব্য : কবিরা সাধারণত কবিদের নিয়ে লেখেন না। লিখলেও তার স্তব, স্তুতি অথবা স্থাপত্য নিয়েই লেখেন বড়জোর। কিন্তু কবিও মানুষ, তারও ক্লেদ-বমি-ইচ্ছা-অনিচ্ছা-প্রেম-হিংসা আছে। এইভাবে রক্তমাংসের প্রেমের সন্ধান করতে পারতেন সন্দীপন, এখন পারেন মলয়। রবীন্দ্রনাথ থেকে তৃণাঞ্জন অবধি এক বিশাল ইতিহাসকে তিনি এক ছাঁকনির নিচে এনে রাখলেন। অনবদ্য মলয় ।

সাকিরা জুঁই-এর মন্তব্য : বারবার প্রেমে পড়ি প্রতিভার , হে মুগ্ধতার যাদুকর !

বিজয় ঘোষ-এর মন্তব্য : বিষয়টাই অভিনব। কত সাধারণ একটা প্রশ্ন অথচ আমরা তো ভেবে দেখিনি।
Mousumi Roy-এর মন্তব্য : Malay Roychoudhury(dada),the poem tells the story the poet cannot tell; a terrible thought went through your mind.Thought of the century.In spite of the slings and arrows of outrageous envy, malice and academic pomposity.But I have a feeling that we are yet to understand the poet as a whole.He seems to be known only on the fragments of his genius.

শঙ্করী মুখার্জির মন্তব্য : অসাধারণ ! অসাধারণ ! অসাধারণ! এমন দর্শন যে শুধু কোনো কবিরই থাকতে পারে ছোট্টো অনালোচিত বিষয় যে এতো হৃদয়গ্রাহী কবিতা হতে পারে, ভাবা যায় না ।

নীতা বিশ্বাস-এর মন্তব্য : শুধু নখের্‌ই জন্যে, মলয়দা ? আমি তো আছি, পা দুখানি তুলে নেবো, কেটে দেবো নখ সযত্নে, প্রণামও সেরে নেবো, যদিও সুন্দরী আমি নই, আপনার চেতনার রঙে সুন্দর হতে পারি যদি, কবিতার সৌজন্যে ।

শান্তনু সান্যাল-এর মন্তব্য :l কবিতা টি দারুণ, অবশ্যই আমি ব্যক্তিগত ব্যাপারে খুব একটা উতসাহিত নয়, কিন্তু কবিতাটির মধ্যে এক সুন্দর প্রবাহ রয়েছে, সেটা মন কেড়েছে, অপূর্ব রচনা, অজস্র ধন্যবাদ মলয় রায়চৌধুরী ।

কিশলয় ঠাকুর-এর মন্তব্য : লেখাটি অসাধারণ... বাংলা কবিতার কয়েকটা দশকের সমন্বয়। ভাবছি শক্তি,সুনীল,জয় সুবোধ এদের পর আবার জীবনানন্দের নাম ফিরে এল... একটু ব্যতিক্রমী। অসাধারণ। কোনও সন্দেহ নেই ।

জয়ন্ত চক্রবর্তীর মন্তব্য : ধৃষ্টতা মার্জনা করবেন ।'মলয় রায়চৌধুরী' নামটি মুছে ছাপোষা কোনো নাম যেমন - হরিগোপাল রায় নামটি লেখা থাকত কবিতাটির লেখক হিসেবে তখন এত শত সম্মোধন অসাধারণ কবিতা কবিত্ব কবি।কবিরত্ন কাবিতধিরাজ ...... জুটত কি ? মলয় দা আমার দৃহ বিশ্বাস তুমি জানো আমি কি বলতে চাইছি . কোনো এক সৎ শ্বাশত জায়গা থেকে প্রতিষ্ঠিত গতনুগতিক সিস্টেম ভাঙ্গতে চেয়ে আজ তোমাকেও আমরা এস্টাব্লিশমেন্ট এর চড়া একপেশে গন্ধ উপহার দিয়ে চলেছি আমাদের তোমার কলমের শব্দ চয়ন স্বতস্ফুর্ত আঙ্গিক স্যাটারে আর দরকার নেই । শুধু 'মলয় রায়চৌধুরী' নামটাকে দরকার বড়ই দরকার । এটাই কি, এটাকে কি বলে "সীড অফ ডেথ" ! জানি না ।
উনি কি তবে ভাঙ্গনের কবি !? উনি কোনকিছুই ভাঙ্গেন নি গড়েছেন . আর সঙ্গে জুগিয়েছেন সাহস। তোমায় ছাড়াই বাঁচবো আমি যেমন বাঁচে মাতৃহারা ;গিরগিটি টা কিলবিলিয়ে যেমন বাঁচে গাছের চারা । সরি টু সে, উনি গড়তে জানেন; নইলে এই ভাঙনের হুজুগে বহু নব্য কবি ওনাকে, ওনাদেরকে, অন্ধের মতো অনুরসরণ করতে গিয়ে অচিরেই তার কবিত্ব হারিয়ে এখন যাত্রার স্ক্রিপ্ট লেখেন ।

শাকিলা তুবার মন্তব্য : এমন করে তো ভাবিনি কখনো! ধন্য আপনি কবি শুধুমাত্র নখকে কেন্দ্র করে বিশাল এক চত্ত্বর প্রদক্ষিণ করে গেলেন--দেখিয়ে দিলেন আমাদেরকেও অন্য এক জগত। আপনি চিরদিনই আমার প্রিয় কবি তালিকায় আছেন, ছিলেন। অনেক শুভ কামনা থাকল।

দেবপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায়-এর মন্তব্য : খুবই গভীর দার্শনিক প্রশ্ন । আলোড়িত করল খুব ।

সিদ্ধার্থ মজুমদার-এর মন্তব্য : একটি ‘বুড়োটে’ কবিতা যে কি সাংঘাতিক ঝকঝকে স্মার্ট অথচ সরল-মননশীল আর রসালো ও রোমান্টিক হয়ে উঠতে পারে, তা এই অনন্যসাধারণ কবিতাটি পড়ে জানলাম । এরকম ঠাট্টা-ইয়ার্কির রসায়ন-মিশ্রিত । অসাধারণ লাগলো ।

হিন্দোল ভট্টাচার্যর মন্তব্য : " কবি কত একা টের পেতে তার পা-এ তাকালেই বোঝা যায় । " এই লাইনটি অসামান্য ।

রেহানা আখতার-এর মন্তব্য : আহা! কি অসাধারন প্রাণবন্ত বাস্তবানুভব ! কথার অনুপম-ময়তা হ্নদয় ছুঁলো !

পার্থ ঘোষ-এর মন্তব্য : কী অদ্ভুত সুন্দর ভাবনা! সামান্য নখকাটাও অসাধারণ হয়ে উঠেছে ।



Name:  Daniela Cappelo          

IP Address : 012312.60.90012.13 (*)          Date:01 Jan 2019 -- 07:01 PM

Daniela Cappelo : Strategies for Translating Obscenity: Medical Language and Sanitization in Malay Rāychoudhury’s Poetry


Obscenity and Taboo Language
Cultures vary widely in the treatment and reception of speech related to sex and bodily
activities; while some cultures may perceive language related to sex as dirty and offensive, other social and cultural contexts may in fact not regard the same as a taboo (Allen and Burridge 2006). Working on modern Bengali poetry and specifically dealing with ‘poetics of obscenity’ has forced me to question my position as a translator with regard to the cultural, social and ethical limits – as well as freedoms – that I, consciously or unconsciously, avail myself of in my research. In particular, I was faced with the challenge of finding ways to negotiate between the multiple meanings of the text and my personal experience and understanding of those. For instance, how does a foreign translator of a South Asian language respond to ‘obscene’ phrases which are not a taboo in her own culture? Or else, how do I, an Italian scholar translating into English for a German academic audience, distinguish between different layers and understandings of a translated ‘obscene’ word, and reproduce its ambivalences and problematics? To show how possible an ‘impossible translation’ can be, I will here address some of the problematics that I face in translating ‘obscene’ words and phrases in the poem ‘Pracaṇḍa Baidyutik Chutār’ (1964) and its English translation (‘Stark Electric Jesus’, 1967) by the Hungryalist poet and writer Malay Rāychaudhurī.

In particular, the verses that will be examined relate to the description of a woman’s sexual organs, rape, masturbation, and bodily ‘effluvia’,1 such as sperm and menstrual blood. In my attempt at re-translation, I have first identified the ambivalent purpose behind the texts: the poet’s ironical use of a Bengali ‘medical’ lexicon achieves a ‘sanitized’ description of the sexual organs and sexual activity while aiming at provoking the ‘bourgeois’ readership and subverting normalized views on sexuality. Yet the scientific high-status language of both the Bengali poem and its English translation, pregnant with terms of Latin derivation, betrays the poet’s attempt at ‘cleaning’ the translation of its most controversial aspects in order to avert the risks
of obscenity charges. The dualities and ambivalences of ‘Pracaṇḍa Baidyutik Chutār’ and its English counterpart make the process of re-translation all the more significant to the translator who wants to unravel the multiple stages, layers, and meanings of a literary text. My concern here is to engage with the ‘possibilities’ of negotiation between the textual strategies (irony, sanitization, subversion, and self-censorship) and the material and economic reasons behind the production of such texts. Before addressing the problems of translation, the main methodological question that I am constantly faced with is: what do we mean by ‘obscenity’? Which textual strategies and interpretative practices operate within an ‘obscene’ poem? The boundaries between the concepts of erotic, bawdy, obscene and pornographic have always been fuzzy and mobile, moving back and forth according to gender, class, taste and times.2 Any attempt to define this category has inevitably ended up in essentialistic views of obscenity and resulted in determining ‘obscene’ an intrinsic quality of a speech, a writing, a performance. However, there has been wide research from different disciplines, from legal, cultural and literary studies, that has wanted to re-examine the concept of obscenity as it was
formulated in a specific historical situation by a particular social group in power. These reexaminations have contributed to releasing the concept of obscenity from moral, legal and ethical essentialisms, acknowledging the multiplicity of its meanings and applications in different social and cultural locations.3 The concept of the obscene (aślīl) in nineteenth century Bengal, for instance, was informed by the differentiation that was being shaped between elite and popular culture, high and low registers, where the latter was obscured and suppressed from the life of the bhadralok, the Bengali gentry (Banerjee 1197). Obscene acts or materials generally denote something that is offensive to common morality and to the public sense of decency, predominantly referring to the domain of sexuality (‘Obscenity’, Encyclopaedia Britannica). Breaking down the concept of obscenity into smaller units can help in identifying the main characteristics that define a behaviour, a speech, or a text, as obscene. Taboo, for instance, is a key concept to the understanding of the ‘obscene’: it originally denoted a ‘prohibition’, more likely a food, an object, or a behaviour that was perceived as ‘polluting’, harmful and offensive, to a certain community. Taboo and taboo language has been the subject of much scholarship from anthropology and social linguistics which has found the main interpretation of taboo as ‘the matter out of place’, that is contaminating and therefore dangerous for the social order of the community (Douglas 1966). Yet taboo language, in its most contemporary and colloquial acceptation, is more than ritual prohibition and avoidance: it is “a breach of etiquette” consisting of ‘dirty words’ that a speaker normally avoids in a standard public context. These words
“have the power to titillate” and along with taboo language are “the most emotionally evocative of all language expression” (Allan and Burridge 42). The process of translating Bengali aślīl poetry into English has shown resistance to traditional practices of translation formulated in the field of Translation Studies, such as fluency, accuracy, and Lawrence Venuti’s much debated ‘foreignization’ of a text and ‘visibility’ of the translator (Venuti 2008). To cope with these problematic aspects of the translation process, I have taken free inspiration from Anjali Nerlekar’s study on the poet Arun Kolatkar (2016), the bilingual poet in the Marathi and English languages, where she observes that the concept of translation needs to be questioned because of the “slippery nature of the translational practices”, especially when these take place in multilingual contexts. Practices of self-translation and transcreation have in fact contributed to interrogating the authority and authenticity of original texts (Nerlekar 208). In the same way as Kolatkar’s translation of his own poetry collection Jejuri resists simplified readings – which identify one version as the original and the other as a derivative version – the ‘mobile’ nature of the two translations of the Hungryalist poem is established by reason of its multiple editings and re-translations.

The Poet and the Poems:
‘Pracaṇḍa Baidyutik Chutār’ and ‘Stark Electric Jesus’ Malay Rāychaudhurī is today acknowledged as one of the early creators of the Hungry Generation movement in 1961, along with his brother Samir, Shakti Chattopadhyay and Debi Roy.4 Inspired by the American beatniks and affiliated to the global neo-avant-gardes, the anti-establishment group of wild guys published manifestos and little magazines, experimented with language, brought their subjectivity and sexuality into poetry and challenged the cultural and political establishment of Calcutta with irony and provocation. Born in Patna in 1939, Malay lived his childhood and late adolescence in a poor suburb of the city known as Imlitalā. In his childhood memoirs, Malay gives great importance to the years spent in this neighbourhood surrounded by Shia Muslims, Dalits and low-caste Hindus. He turns to the memories and stories of these subaltern people in Patna to retrace the cultural and social hunger for a ‘realer’ literature, as promoted in a late manifesto, which has later become a mark of Hungryalist writing (Rāychoudhurī n.d.).

Both the English and Bengali versions of the poem ‘Pracaṇḍa Baidyutik Chutār’ and ‘Stark Electric Jesus’ have become icons of Hungryalist writings, especially after Malay’s infamous sentence for obscenity. The poem originally appeared in Bengali in 1964 as part of the Hungry bulletin that was seized by the police and used as the main object for the obscenity accusations against the Hungry writers. After the poem was banned as obscene, Malay and his fellows, Debi Roy, Subimal Basak, Saileswar Ghosh and Pradip Chaudhuri started an intense correspondence with American editors and poets, such as Howard McCord, Karl Weissner, Lawrence Ferlinghetti and Allen Ginsberg, in order to ask for financial support for the trial. In response to that, the international avant-garde community started a circle of literary exchange with the Hungryalists, collected and edited a selection of their writings and compendia of contemporary Indian poetry that were eventually published in special issues of American journals and little magazines such as Salted Feathers, Intrepid and City Lights.

From the mid-sixties, Malay and his ‘Stark Electric Jesus’ had become well-known names associated with the Indian avant-garde movement and with issues related to obscenity and freedom of speech. The English version of the poem was originally published by Tribal Press and edited by Howard McCord, professor of English literature at Bowling Green State University and avant-garde writer himself, in three editions in 1965 and 1966 with an afterword by the editor. City Lights Journal #3 also published the poem with a longer version of the afterword under the title “Note on the Hungry Generation” (Ferlinghetti 159-60). ‘Stark Electric Jesus’, self-translated by Malay for the first Tribal Press edition, appears again in a 1967 issue of the American journal Salted Feathers edited by DickBakken. In this issue, fully dedicated to poetry, essays and letters from Hungryalist writers, it is mentioned that Dick Bakken wrote to poets and scholars of Bengali in the United States, at that time Edward C. Dimock and Jyotirmoy Datta, to assist him in the translation project (Bakken n.p.). The politics of translation endorsed by the editor of Salted Feathers aimed at keeping the original translations of the Bengali authors, unless otherwise noted, and changing some spelling, diction and syntax to make them ‘less awkward’ (Bakken n.p). Malay offered to translate his poetry as well as some of his friends’, who were “not well to do with English”, and leaves the work of re-editing to Dick Bakken.5 The English version of the poem is then edited at least twice by McCord and Bakken to produce a text that appeals to a different audience - readers of avant-garde literature in Europe and the United States. The distribution of Malay’s English poem to these American journals of avantgarde poetry finds the main reason in the search for financial support during the obscenity trial. The ‘material’ reason of financial necessity behind the translation of the Bengali poem locates this text at the juncture of commercial publishing and experimental writing. Prompted by the need for a critical re-interpretation of the poem, I will here lay out some methodological principles that have guided my new English translation of ‘Pracaṇḍa Baidyutik Chutār’ (from now on PBC), informed by a consciousness of the economic reasons and ethical choices that stood behind Malay’s ‘Stark Electric Jesus’ (from now on SEJ). In the extracts from the English poem that will follow in this paper, I suggest a slightly different rendering of the verses here discussed, especially those concerning the representation of the female body and male masturbation.

Translating Shubha’s Sexual Body
Issues surrounding the poet’s unfulfilled sexual desires, his inability to love, scenes of rape and masturbation have made this poem a divisive icon of the unabashed and grotesque, yet ultimately misogynist and irreducibly bourgeois, ‘hunger’ of these poets. Through the hallucinatory monologue of Malay to his imaginary muse Shubha, an allegoric representation of woman, the poem describes the oedipal and sexual frustrations of the poet. The documents of the Hungryalists’ trial show that the charges for obscenity were corroborated by Section 292 of the Indian Penal Code, which stated that “the accused was found to be in possession of the impugned publication. So one of the ingredients of Sec 292 IPC namely, of circulation, distribution, making and possessing [of obscene material] are present.” Although the Magistrate acknowledges that the IPC does not define the word ‘obscene’, and that a piece of art or literature may not be judged only on the basis of vulgarity, he finally decides to sentence Malay’s poem because it deals with sex and nudity in a way that “transgresses public decency and morality.”6 Interestingly, the Magistrate then delves into a detailed description of the ‘moral transgressions’ of the poem:

In bizarre style it starts with restless impatience of sensuous man for a
woman obsessed with uncontrollable urge for sexual intercourse followed
by a description of the vagina, uterus, clitoris, seminal fluid, and other parts
of the female body and organ, boasting of the man’s innate impulse and
conscious skill as to how to enjoy a woman, blaspheming God and
profaning parents accusing them of homosexuality and masturbation,
debasing all that is noble and beautiful in human love and relationship.
(Decision by Presidency Magistrate, 1965)

According to the Magistrate’s interpretation, the offensive passages of the poem were the ones describing female pleasure and uncontainable sexual desire, parental homosexuality and masturbation.The controversial content of the poem was identified in the idea of a woman’s sexual ‘urge’ and in sexual activity as non-procreative or as performed for the sake of pure pleasure. Malay’s banned poem is still the object of critique from Bengali literary critics, academics and an ordinary readership who have especially criticized the lack of substantial literary quality in his poetry. Apart from that, there exists also a feminist critique of Hungryalism as a male-centered poetics where “female sexual agency is vilified” and where women are described only as ‘sexual bodies’ (Dhar).7 The ambivalent status of Hungryalism in Bengali literary history seems to mirror the ambiguous role that the representation of sexuality and the related terminology plays in Malay’s poetry. In the controversial passages of the Bengali poem, for instance, transliterated English words are juxtaposed to a scientific Bengali terminology to describe Shubha’s sexual and reproductive organs and other bodily activities such as male ejaculation and urination. Kumar Bishnu De, in his research on Malay’s poetry, admits that the meaning of the words ‘clitoris’ and ‘labia majora’ became clear only after he read the sequence of Bengali words that visually depicted a vagina (De 210).8 The incorporation of these English words into the Bengali text helps mitigate the scandalous content and attenuate the visual power that the ‘obscene’ words depicting the female sex organs may have on the Reader.

The following verses show how the juxtaposition between the English-Latin words (i.e. uterus, clitoris, labia majora) and the Sanskritized Bengali words (i.e. garbha (womb), ṛtusrāb (seasonal bloodstream), śukra (sperm) and satīcchad (hymen)) operates in the poem as ‘sanitizer’ of the ‘sexual body’, ultimately deprived of its sensual component and transformed into a biological body, where sexual intercourse and masturbation occur exclusively as mechanical activities:

Shubha, let me sleep for a few moments in your violent silvery uterus
Give me peace, Shubha, let me have peace
Let my sin-driven skeleton be washed anew in your seasonal bloodstream [ṛtusrāb]
Let me create myself in your womb with my own sperm [śukra]
[…]
Let me see the earth through your cellophane hymen [sāticchad]
[…]
I remember the letter of that final decision in 1956
The surroundings of your clitoris were being embellished with coon9 at that time
[…]
Let me enter in the immemorial incontinence of your labia majora
Into the absurdity of woeless effort
In the golden chlorophyll of the drunken heart (Bakken 1967)10

Both the Bengali words (ṛtusrāb; ātmamaithuna; śleṣmā) and their English translation (i.e. seasonal bloodstream; self-coition; ovum-flux) show a conscious selection by the author of a scientific vocabulary of the Bengali language and a correspondent English translation of the medical terminology related to the sexual body. In some of the passages illustrated above, Malay directly uses the transliterated English word to denote the female sexual organs (i.e. labia majora; uterus; clitoris) for lack of a Bengali equivalent, or so the poet himself explained during an interview I carried out at his home in Mumbai (personal interview, November 26, 2017). Yet the proliferation of a Bengali ‘sexual’ terminology, already established from the late nineteenth century through an expanding market of medical publications (Mukharji 86), shows that Malay’s use of the English words was actually prompted by the need for a certain degree of secrecy with regard to the more contentious aspects of the poem. It is in fact quite common in ordinary Bengali language, and especially in the technical and more problematic context of sexual activity, to use English words as substitutes for a Bengali that would more easily ‘offend’ middle-class morality. If the poet was at that point already aware of the risk of a trial and sentence for obscenity, he knew how provocative and transgressive his writings could become in media and popular perception. The use of the English equivalents in the Bengali poem then shows the poet’s attempts at suppressing the straightforwardly outrageous quality of the Bengali by replacing it with a more ‘delicate’ English word to attenuate the scandalous content.

Medical Language and Sanitization
The second half of the nineteenth century saw the explosion of medical publishing in vernacular languages, including Bengali medical dictionaries, books on sexology and encyclopedias of sexual knowledge, which acted as sites of ‘vernacularization’ that provided vernacular alternatives to English technical terms (Mukharji 86-7). These publications illustrate the creation of a vocabulary of anatomic and physiological terms of the Bengali language, shaped from an already established English medical lexicon, encouraged by the international reception of modern ‘western’ books on the study of sexuality. For instance, the description of the male and female reproductive organs (strī-jananendriya) already had a quite well-established Bengali vocabulary by the late 1930s, when Hasanat’s Yauna Bigyān and Basu’s Yauna-Biśbakoṣ were published (Hasanat 1936; Basu 1938-1946). In the latter, ‘clitoris’ is in fact translated into bhogāṅkur and ‘labia majora’ into bhogādhar guru (lit. bhog = vagina; adhar = lip) (Basu 187).

Malay plays with the Bengali medical lexicon related to sexual organs and activities (i.e.
yonivartma (urethra); ātmamaithuna (self-coition); rajah/ṛtusrāb (menstruation); śleṣmā (mucus, phlegm)) to convey a biological description of the body.11 The effects generated by such scientific treatment of the language are ones of ironic ‘inversion’ of the obscene images related to sex: on the one hand, non-procreative sex acquires dignity of literary treatment, while on the other, the high status of the constructed, artificial scientific vocabulary is ironically downplayed through the sexual context.

Abul Hasanat’s Sacitra Youna Bigyān (Illustrated Book of Sexual Science) presents a good example of a modern book of sexology dealing with multiple aspects of sexuality, including illustrated descriptions of conception, the formation of the embryo, and birth, as well as a detailed analysis of younabodh, the sexual perception. 12 In the first volume, Hasanat describes the anatomy and physiology of sex (youna-indriyasamuha) with illustrations of the male and female sex organs (Hasanat 93-99) and the process of menstruation (ṛtusrāb), a word “originated from the latin ‘mensis’ meaning ‘monthly.’ Since it takes place every month, it is called monthly (māsik) in different languages” (Hasanat 102). Abul Hasanat wrote books on this subject until the 1950s and his works remained highly popular through the sixties. The occurrence of words for the organs, such as linga, yoni, jorāyu, garbha, śukra, aṇḍakoṣ, mūtrāśay, yonipath, satīcchad, and their functions, such as prasrāb (urination) and ṛtusrāb (menstruation), provide evidence for the selection of medical words in the Bengali poem.

In my own translation, I substitute seasonal bloodstream and ovum-flux with menstruation, self-coition with masturbation and phlegm with mucus, as it appears from the following verses:

Why wasn’t I lost in my mother’s urethra?
Why wasn’t I shaken away in my father’s urine after he masturbates?
Why wasn’t I mixed with mucus in the menstruation?13
As compared to Malay’s English translation:
Why wasn’t I lost in my mother’s urethra?
Why wasn’t I driven away in my father’s urine after his self-coition?
Why wasn’t I mixed in the ovum-flux or in the phlegm?

My choice of replacing the more sterile, scientific terms that describe masturbation and menstruation was informed by the need for greater readability and a more direct reception of the ‘defiling’ activities on behalf of the readers, while still retaining the scientific touch of the Latin etymology. If Malay’s self-coition, phlegm, and seasonal bloodstream aim at reproducing masturbation, menstruation and reproduction purely as mechanical processes of the biological body in the ‘anatomic’ lexicon, they also lay out different possibilities of interpreting the reasons behind their use. The semantic potential of the English self-coition and seasonal bloodstream, for example, and the possibilities of playing with the construction and meaning of these words, allow the retention of the ‘clinical’ structure of the poem and a mechanical description of the body. At the same time, the choice of ‘high’ words here serves two functions: on the one hand, they elevate to a lyrical subject what the middle-class readership interprets as low, repulsive and scandalous; on the other, they ironically ‘minimize’ the technical scientific language by applying it to the low semantic sphere of sex and other bodily activities. By replacing self-coition with the verb masturbate, I have tried to make the reading more fluent and the ‘obscene’ content more easily graspable, as well as to reproduce the ironical touch that was inevitably lost in the ‘surgical’ English translation. Yet Malay’s ‘sanitization’ of the original poem is only one among other valuable hypotheses that explain the textual tactics and language strategies behind this text. The representation of Shubha’s body and of the male semen through a subversive use of Bengali medical terminology is not only a mark of purification of the text already banned for obscenity. The hyper-pedantic constructions of the English translation (i.e. self-coition; ovum-flux; seasonal bloodstream), as well as the juxtaposition with the higher status of the Latin derived English words, appear as anti-hegemonic practices of translation and language construction that give the dignity of literary matter to the bawdy topic of sexuality. One more practice of subverting the rules of accuracy and faithfulness in translation appears in another instance of the poem, where Malay translates the Bengali dharṣaṇ into the English ‘copulation’, as in the following verses:

I’d have gone two billion light years and kissed God’s ass
But nothing pleases me nothing sounds well
I feel nauseated with more than a single kiss
I've forgotten women during copulation and returned to Muse
Into the sun-colored bladder
I do not know what these happenings are but they are occuring within me
[…]
My power of recollection is withering away
Let me ascend alone toward death
I haven’t had to learn copulation and dying (Bakken 1967)14

If we look into the Sanskrit etymology of the word dharṣaṇ, we encounter no explicit ‘sexual’ connotation, but the nouns ‘assault, outrage, offence, violation, seduction’, ‘overpowering’ and ‘copulation’ (Monier Williams 513). For a modern definition of the word, the Samsad Bengali-English Dictionary (2000 edition) translates dharṣaṇ also as ‘rape’ (537). On the other hand, according to the Samsad Bāṁlā Abhidhān (1964 edition), the monolingual dictionary of the Bengali language, the noun lacks the connotation of sexual abuse, signifying more generally an act of oppression or submission (416). However, among the multiple entries under dharṣaṇ (i.e. pīṛhan, atyācār, balātkār, daman, parājit-karaṇ), the synonym balātkār in particular involves the idea of oppression, control and submission “especially against women” (biśeṣatah nārīr prati) (Biswas 416). I could not come across any critical engagement with the alleged ‘dishonest’ translation until I came across Nandini Dhar’s ‘feminist critique’ of Hungryalist poetry, where she acknowledges the Hungryalist movement as a “profound failure of the Bengali radical imagination” (Dhar n.p.). Here she proposes a gender-based critique by pointing out to the fundamental ‘vilification’ of the female sexual agency in Malay’s poetry, turned into a site of male sexual violation. In a new critical reading, Dhar remarks how Malay has mistranslated the passages of the poem that centered on Shubha’s body. In Dhar’s view, the alleged mistranslations of dharṣaṇ as ‘copulation’, and of uṭhiye neowā as ‘elevate’ (whereas she claims the real meaning to be ‘abduction’) legitimize rape and sexual violence.

My suspicions regarding Malay’s translation grew during a reading session with Bengali-speaking colleagues and students at the Südasien-Institut in Heidelberg, as they remained quite perplexed at the ‘unfair’ translator. My puzzlement at the ‘mysterious’ translation initially led me to argue that if Malay had replaced ‘copulation’ with another English equivalent involving a violent act of oppression and submission he could have found a way to escape the mistranslation. Since SEJ was edited and corrected by the American editors, native speakers of English who were most likely not aware of the original Bengali version, we could assume that Malay was fully conscious of the ‘corrupt’ translation he was proposing to avant-garde readers in the United States. Yet in order to clarify Malay’s choice of translation, I turned to him in a private communication where he claimed that “the word ‘rape’ has been in use now only. When I wrote, people talked either of intercourse or of copulation. For me at that time ‘dharshan’ was same as intercourse or copulation. I did not mean rape while using the word ‘dharshan’”.15 How do I engage with the changing semantics of one specific word in translation? Was the poet enacting a strategy of self-censorship, purging the text of its most objectionable contents to make it less problematic to the American readership (where Shubha would not be the object of violent sexual abuse, but the consenting partner in intercourse)? Or is the ‘misunderstanding’ by Nandini Dhar caused by the enhanced sexual and violent connotation that has been assigned to the word in more recent times? Dharṣaṇ today has become a highly controversial term in the social and political landscapes of South Asia, especially after the Delhi Gang Rape in 2012 has projected the discourse on rape and violence against women to the foreground of national interest. Taking the word out of the original poetic context here helps retracing the semantic history and evolution of the word and establishing a trajectory of social, cultural and literal meaning that could not be transmitted to the reader through the mere act of translating. The recasting of dharṣaṇ and its history into the subversive semiotics of the poem, which aims at representing the act of sexual intercourse as a possibility of emancipation from middle-class oppressive morality, also on behalf of the ‘sexual body’ of the Muse Shubha, contributes to returning meaning and dignity to what Dhar has criticized as a ‘mysterious’ translation that ‘legitimizes rape and sexual violence through repetitive articulations of male pain and alienation’ (Dhar n.p.). The rough, unabashed ‘bodily’ language of Malay, a mark of the Hungryalist aesthetics signalling the disintegration of a masculinity that oscillates between the traditional models of the Indian patriarchate and the ‘Western’-oriented revolution of love and sexual relationships, is often embodied in Malay’s highly conservative and misogynist aesthetics. Yet in the internal logic of the poem, where dharṣaṇ is viewed as an imaginary act of social subversion, it can be argued that the word had a more nuanced connotation that did not necessarily entail sexual aggression or abuse in the years when Malay was writing and translating his poem.

What, in this case, shall a more ethically and politically correct translation in the first place account for? The task of the translator in this case lies in the sensibility and ability to ensure the same thoroughness and contextualization for both options of translation (i.e. copulation, rape). Although my translation here ‘betrays’ the intentions of the author, who had personally dissociated the word dharṣaṇ from a context of sexual violation, it performs a conscious transgression of traditional norms and practices of translation such as accuracy and faithfulness. My personal approach was here to exploit the potential of the original word, with all the multiple shades of meaning implied in the Sanskrit and Bengali etymology, by suggesting in my own re-translation the more contemporary political signification of dharṣaṇ in PBC, in order to ‘dislocate’ the poem and operate a semantic transfer to a modern readership’s perception.

Then I would kiss the ass of God for billions of light years
But nothing pleases me, nothing pleases me
If I gave more than one kiss my body would be nauseated
How many times have I forgot women after rape and came back to Art
In the solar bladder of poetry
What’s going on I don’t know, yet it happens inside me
[…]
My power of recollection is fading away
Let me walk alone towards death
I didn’t have to learn about rape and death

Translating Masturbation
The abundance of descriptions of male masturbation in Hungry poetry has turned it into a true literary topos of Hungryalism. The grotesque and pictorial character of masturbation, a leitmotif of avantgarde arts, performances and literature across the world, plays a relevant role also in Hungryalist poetry: the non-reproductive nature of ‘solitary’ and pleasurable sex becomes one way to express the social and psychological conflicts of the young Bengali male with the dominant bourgeois morality and middle-class social regulations of post-independence Bengal. Masturbation and ejaculation were signs of pathological abnormality in colonial Bengal that affected Bengali middle-class narratives of the body and sexuality. The ‘weakness of the semen’ (dhātu dourbālya), associated with impotency and involuntary discharges, substantiated the anxieties of Bengali effeminacy and racial inferiority (Mukharji 247). Following Foucault’s engagement with the repression of ‘peripheric’ sexualities and the obsession with their classification in the Victorian period (Foucault 1990), scholarship on the cultural significations of masturbation in colonial India has showed that loss of semen was mainly associated with sickness, sexual perversion and anxieties of masculinity (cf. Pande 2010; Alter 2011; Mukharji 2011). In the late nineteenth century, Bengali men, burdened with the stereotypes of degeneration and perversion, developed a paranoia over squandered sperm resulting in an ambivalence towards women that verged on misogyny (Pande 172). Bengali periodicals on public health treated the subject of masturbation, especially when this activity takes place during puberty and adolescence, as a serious health issue since it makes the boy’s “semen watery and weak” (śukradhātu taral o nisteja) (Basu 228). In accordance with the state of brahmacharya, male Hindu celibacy, masturbation was interpreted in terms of physical strength more than a moral vice: the preservation of semen represented in fact an act of self-control and self-development while waste of semen signified a loss of virility (Alter 287). According to Hindu physiology at large and to Indian traditional medicines, ejaculation was therefore equated to a loss of masculine strength and waste of essential energy. However, Srivastava has remarked how the notion of ‘semen anxiety’, combined with a general ethic of self-control, had come to take on the appearance of an irrevocable truth of Indian masculinity(Srivastava 3).16
In Hungryalist poetry, non-reproductive sexual activity is ambivalently represented as a
liberating act that denounces and subverts the regulation of social bonds and relationships, as well as a state of frustrated uneasiness with one’s own unconventional position towards matters of sexuality and sociality. As powerfully illustrated by Falguni Roy, a cult figure of the Hungry Generation, in his poem ‘Byāktigata Bichāna’ (A Private Bed), the act of masturbating becomes part of normal daily life when it concerns the ideal ‘family man’:

Not only Radha – even the prostitute menstruates
The father of three children – the ideal man of family planning
Masturbates from childhood – doesn’t he? 17 (my translation)

The acts of masturbating and ejaculating, as suggested in this passage, do not only relate to colonial discourses and to traditional medicine that pathologized sex and semen loss. Through masturbation, here the Hungry poet wants to subvert the post-colonial predicament of the Indian father, ‘ideal man of family planning’, with all the creepy associations with vasectomy and mass sterilization programs carried on under Indira Gandhi’s rule, and express the wish for liberation from imposed disciplined regulations of the body. At the same time, these poets’ relationship with the body remains ambiguous and unavoidably torn between society and personal experience, between the ongoing sexual revolution of the West and the ostensible cultural immobility of Bengali middle-class society. In Malay and other Hungryalist poets like Falguni Roy, preoccupations with masculinity and virility take shape through the description of male semen during sexual intercourse, masturbation and fetus production (Miśra 2015). The obscene character of these representations, however, is not determined by the ‘fear’ of prudish descriptions of sexual intercourse or discourses on sexuality at large; rather, they are informed by the insecure and precarious conditions of modern masculinity. The act of masturbation thus reproduces the conflicts, ambivalences and anxieties of a changing concept of the modern male middle-class Bengali individual.

We have already encountered the word ātmamaithuna in PBC, which is transcreated in SEJ as self-coition, a neologism crafted by the poet to reproduce ironically and scientifically a ‘copulation with oneself.’ Although ātmamaithun seems to be the most common word in Bengali language that refers to ‘masturbation’, along with hastamaithun, there are other equivalents to define both male and female masturbation, such as svamehan, svakām, hastamaithun and svayaṁrati, as appears from a fully detailed Wikipedia page in Bengali dedicated to this subject.18 The medical periodical Chikitsā Sammilanī, a magazine of health and medical science instructing families on modern concerns surrounding sexuality and sexual relations in late colonial Bengal, also uses the word hastamaithun for the ‘evil’ practice of masturbation among male children and adolescents (Basu 227). Abul Hasanat’s Sacitra Youna Bigyān dedicates a section to ‘auto-eroticism’ (svayaṁmaithuna) and ‘masturbation’ (hastamaithuna), and includes these phenomena in the section ‘The Multiple Manifestations of the Sexual Perception’ (younabodher bibhinnamukhī prakāś) (Hasanat 200-1). Although the word ‘masturbation’ linguistically speaking is an ‘orthophemism’ that does not constitute an offense,19 the trespassing from the medical space into the public domain of literature and poetry makes its interpretation more problematic, to the point that it becomes one of the triggers of the obscenity charges, as it is pointed out by the Magistrate of the obscenity trial (Decision by Presidency Magistrate, 1965). In the following verses of SEJ, the contentious topic of masturbation and the cultural significations of male semen are addressed with the Bengali words śukra and bīrya:

Let me create myself in your womb with my own sperm [śukra]
Would I have been like this if I had different parents?
Was Malay alias me possible from an absolutely different sperm? [śukra]
Would I have been Malay in the womb of other women of my father?20
[…]
I will die
Oh what are these happenings within me
I am failing to fetch out my hand and my palm
From the dried sperms [bīrya] on trousers spreading wings
3000000 children gliding towards the district of Shubha’s bosom
Millions of needles are now running from my blood into Poetry
Now the smuggling of my obstinate leg is trying to plunge
Into the death-killer sex-wig entangled in the hypnotic kingdom of words
(Bakken 1967)21

The English ‘sperm/s’ for both words in SEJ does not distinguish between the meanings of the two Bengali words śukra and bīrya, two equivalents of the English ‘sperm’, ‘semen.’ The Samsad Bāṁlā Abhidhān considers both terms, śukra and bīrya, as synonyms, although there is a qualitative difference between the two that classifies śukra as noun only, and bīrya also as attribute (i.e. as in the adjectival construction bīryavān or bīryaśālī, ‘endowed with vigour’). The Sanskrit definition of vīrya associates it with ‘manliness, valour, strength, power, energy’, and only in the third entry with ‘manly vigour, virility, semen virile’ (Monier-Williams 1006); the modern Bengali usage assigns to bīrya the characteristics of valour, courage and heroism, which are by definition qualities that pertain to a male hero, a bīr (Biswas 756). As also Kakar observes, vīrya is “a word that stands for both sexual energy and semen. Virya, in fact, is identical with the essence of maleness: it can either move downward in sexual intercourse, where it is emitted in its gross physical form as semen, or it can move upward through the spinal chord and into the brain, in its subtle form known as ojas” (Kakar 118-9).Hasanat’s sexology book, in the section describing the male sex organs, abounds with compounds having śukra- as first noun for organs related to the production of semen (i.e. śukrakoś; śukravahī nala) (93). ‘Spermatozoa’ here translate as śukrakīṭ and are described as follows: “The man’s spermatozoa give life to the woman’s eggs. The spermatozoa are immerged in the liquid part of theman’s semen (puruśer śukrer aṁgśe bhāsiyā beṛhāy)” (86). The recurrence of śukra in such texts, as compared to the absent bīrya, suggests the scientific connotation of the former.

In Malay’s poem, bīrya stands as the concrete physical appearance of the spermatic liquid, while śukra represents the neutral, scientific term that refers to the smaller units of the latter, the spermatozoa, as shown above in Habunat’s sexology book. Drawing a distinction between the two words becomes a significant operation in the translation of Malay’s medical language: if śukra is an orthophemism, a neutral term with neither positive nor negative connotation, bīrya has attributive quality and is intentionally juxtaposed to the latter to suggest a metaphorical reference to the poet’s troubled masculinity, expressed through the culminating gesture of the poet who compares the activity of masturbation to poetry-making. Also the recurrence of the words bīrya and bīj rather than śukra in Falguni Roy’s poetry is used in a significantly different context where the ‘liquid flow of sperms’ is the material substance through which heredity traits are transmitted: “In the liquid flow of sperms inside autoeroticism there is a skeleton of 206 bones and fleshy nerves sticking to the skeleton in the liquid semen the semen of memories of thought-carrying sound” (Miśra 29). The abstract matter denoted by the word śukra is substantiated in bīrya, significantly originating from the same root of bīj, the seed, through the bodily materialization of the spermatozoa during ejaculation. Hence in my retranslation I suggest preserving the ‘material’ differentiation denoted by the Bengali words by translating śukra as the English ‘semen’ and bīrya as ‘sperm’, following the Oxford Learner’s Dictionaries of the English Language that define ‘semen’ as “the whitish liquid containing sperm” (‘Semen’, Oxford Learners Dictionary). Exploiting the Latin etymology of semen, I aimed at highlighting the medical representation of male semen.

Give me birth again from your womb with my own semen
Would I have been like this even if I had different parents?
Would I have become Malay alias me from a completely different semen?
Would there be Malay if my father had impregnated another woman?

The orthophemistic or neutral connotation of the words ātmamaithuna, śukra and bīrya, shows that Malay pursued an ambivalent strategy of sanitization of the text through the medical lexicon that resulted in an ironical ‘inversion’ where the ‘dirty’ sexual matter is elevated to lyrical subject of poetry, while the high status of the scientific language is minimized through the transgressive descriptions of masturbation and bodily fluids. Masturbation is not only painted as a mechanical act, but it stands also as the ultimate condition of the alienated male poet, the ultimately bourgeois man of modernity, inexorably caged in a modernity that mechanizes sexuality and disintegrates relationships between the sexes.

Concluding Remarks
In this paper, I have tried to clarify the linguistic terminology related to the description of sexual organs and masturbation, and to identify the textual strategies for sanitizing the ‘sexual body’ in selected passages of Malay Rāychoudhurī’s banned poem ‘Pracaṇḍa Baidyutik Chutār’ and his English self-translation ‘Stark Electric Jesus’. First, the use of a medical terminology for describing the ‘sexual body’ in Bengali (i.e. yoni, jorāyu, mūtrāśay, śukra, yonivartma, satīcchad, ātmamaithun, rajahsrāb, śleṣmā) and in the English translation (i.e. uterus, bladder, semen, urethra, hymen, selfcoition, seasonal bloodstream, ovum-flux, phlegm) functions as a strategy of ‘sanitization’ of the language related to the contentious topic of the text. The incorporation of transliterated English words into the Bengali poem (i.e. lābiyā myājorā, yuṭerās, kliṭoris) allows the poet to attenuate the ‘bawdy’ and ‘obscene’ perception of what the Bengali middle-class interprets as indecent and offensive. The hyper-literal, artificial constructions of the English translation (i.e. self-coition, seasonal bloodstream) aim at representing the body as a machine, in its purely biological functions. Secondly, as illustrated by the discussion surrounding the translation of the word dharṣaṇ, the hyper-technical lexicon of medical sciences could be seen as a moderate practice of self-censorship that ‘obscures’ the most controversial aspects treated in the poem as a tactic to defend himself against further institutional censorship. Yet the poet’s subversive use of the medical lexicon allows for a double effect of subversion of the textual components: on the one hand, the high status of the scientific language is brought down to earth by applying it to the semantic sphere of sex, a subject considered unsuitable for
the ‘respectable’ sphere of poetry. On the other, the socially reproachable topics of masturbation and un-reproductive sexual activity gain dignity of literary and lyrical subject by being dealt with a scientific terminology that dislocates the repulsive sexual matter to the ‘extra-ordinary’ discourse of poetry-making.

In the duality of Malay’s poem, located between irony, sanitization, literary subversion, and self-censorship, dwells the ‘radical’ operations of the translator and the problematic process of retranslation. The pragmatic choices of my re-translation and re-reading of ‘Pracaṇḍa Baidyutik Chutār’ reflect the need to propose a new text that identifies and reproduces the strategies already foregrounded in the source-texts. The multiple textual strategies already identified in the ‘original’ poem shall not be neglected by the translator who wants to produce an ethically and politically correct translation. The conclusions that I want to share in this paper are based on my experience of translating so-called ‘obscene’ modern poetry in Bengali; they show that translation remains a ‘tentative process’, neither impossible nor fully possible, that can change according to the tasks and intentions of the translator, who becomes a ‘visible’ agency, to follow Venuti’s main argument, of a newly produced independent text. As translators, especially of writings of living authors, we have to engage with the ‘life’ and mobility of that text, confront the textual strategies and the material and economic conditions behind the production of the piece of writing. Finally, what I draw from the ‘tentative process’ of translation of Hungryalist poetry is: that one way to process a ‘radical translation’ is to elaborate a personal and contextual practice of the latter by going to the ‘roots’, that is, to the textual, economical and material reasons of semantically problematic texts such as ‘obscene’ poetry.

Notes
1 I am borrowing this evocative phrase from Allen and Burridge, which offers a perspective on ‘the human psyche’ in its relation with ‘tabooed language’ (2), who associate “bodily effluvia like ear-wax, menstrual blood, piss, semen, shit, snot, spit, sweat and vomit” with “dirt, rotting organic material” (41).
2 See, for example, Gladfelder’s overview of the debates on the cultural significance of erotic, obscene, and pornographic writing from the eighteenth century (Gladfelder 2013). Here he lists the criteria that scholars have used to distinguish among the concepts of ‘pornographic, obscene, erotic, bawdy, lewd, and indecent’, such as authorial intention, content, tone, mode of representation, reader and political or censorial response. For instance, an ‘obscene’writing is defined as ‘a description whose effect is shocking or disgusting [reader response]’,while ‘bawdy’ denotes ‘the humorous treatment of sex [content and tone]’ (Gladfelder 5).
3 For works that focus on India, see for example Deana Heath’s exploration of the British biopolitical project of regulation of the obscene in Britain and its relocalization in the colonies (Heath 2010); Anindita Ghosh’s analysis of the popular prints of Baṭtalā market in colonial Bengal (Ghosh 2006), and Charu Gupta’s study on the emergence of discourses on gender and sexuality in colonial Hindi pamphlets (Gupta 2001).
4 There has been a long controversy on the issue of the ‘founder’ (sraṣṭābitarka) in Bengali criticism on the Hungry Generation (Sen 13-6). Meetings and interviews with some old Hungryalists and other contemporary poets have proved the existence of multiple narratives on the history of the movement. I have noticed a clear negative stance against Malay Rāychoudhurī on behalf of some Bengali academics and critics, as well as of some poets and translators who associated with the movement in the past. On the other hand, Malay has been the gigantic omnipresence of Hungryalism compared to others participants of the rebellious group, who celebrated himself as a ‘great poet’ (mahākabi) and as the only founder of the movement (Sen 13). The eminent Bengali critic Jyotirmoy Datta, for instance, claims that
Malay has been “quite as generous to himself and his brother as he is niggardly to others”, alleging Bengali criticism and writing to be “dead, mummified, goofy, but when he comes to himself his language rises to lyric heights” (Bakken 1967).
5 “I’ll have to translate all the matters. Because my friends are not well to do with English. I, myself, can somehow cook in English, as you find in this letter. So you’d have to edit the matter properly. You give all sorts of matter in it. You can include my poem” (Letter from Malay Raychoudhuri to Dick Bakken, 18.4.66).
6 Decision by Presidency Magistrate, Bankshal Court, Calcutta, concerning Malay
Roychoudhuri’s Poem “Prachanda Baidyutik Chutar”, Case No. Cr/579 of 1965 (Courtesy of Stanford University Libraries, Dept. of Special Collections, Ginsberg Papers).
7 The phrase ‘sexual body’ is used in Nandini Dhar’s article to criticize the misogynist stance of much Hungryalist poetry, where women are represented as “nothing but bodies on which desire is projected” (Dhar).
8 “Barāṅga, bīrya, mūtrāśay, satīcchad, yuterās, ṛtusrāb, yonivartma, śukra, yonikeśar, poṁd, prasrāb, ityādi”. He later on explains his embarrassment in reading out the poem or reciting it in public because at a first reading those words had sounded ‘obscene’ (aślīl) to him (De 211).
9 According to the digital Oxford Living Dictionaries of English, the word has two definitions: the first one is a shortened version of ‘raccoon’ (the North American Procyon), while the second is an offensive way to address a black person. Considering that the original Bengali poem has bhālluker chāl (lit. bear fur), I assume that the English translation ‘coon’ must be a metonymic use of the word that, by extension, must here signify the pubic hair. Yet one fundamental question remains unanswered: why did the Bengali poet and the American editor use such a problematic word, at least for a virtual American readership of the Sixties, such as the slang ‘coon’? In the limited space of this paper it suffices to take this example as a further evidence of the multiple –and unexpected!– manners of subverting the original meaning of a
given text.
10 Unless stated otherwise, all quotations of the English poem ‘Stark Electric Jesus’ in this paper are taken from the issue of the journal Salted Feathers dedicated to Hungryalism and Indian experimental writings (Bakken 1967).
11 In a private conversation, Malay confirmed his selective choice of the words that illustrate the sexual body from a Bengali medical handbook until then unknown to him (Private Facebook conversation with Malay Rāychoudhurī, April 17, 2018).
12 I am deeply grateful to Projit Bihari Mukharji who has shared with me his findings and considerations on Abul Hasanat’s Sacitra Yauna Bigyān. In a private conversation via email, Projit Bihari Mukharji kindly informed me that Abul Hasanat was a police officer who turned to sexology partly under the influence of Girindrasekhar Bose (who corresponded with Freud and presided over one of the most popular literary addas in the 1920s/30s). Hasanat began writing on sexology in the late 1930s, and wrote several books on the subject until the early 1950s, which remained highly popular through the 60s. One of Hasanat's stated missions was to create a scientific vocabulary for speaking of sex in his mothertongue, viz. Bengali. Hasanat's mentor, Girin Bose, was the elder brother of Rajsekhar Bose (aka Parasuram, the litterateur) who purportedly presided over a Calcutta University committee to create a scientific vocabulary in Bengali (private mail conversation, April 17, 2018).
13 The italicized words are my own rephrasing of Malay’s English translation.
14 “tāhole āmi dukoṭi ālokbarṣa iśbarer poṁde cumu khetum/ kintu kichui bhālo lāge nā āmār kichui bhālo lāgche nā/ ekādhik cumo khele āmār gā guloy/ dharṣaṇkāle nārīke bhule giye śilpe phire esechi katadin/ kabitār ādityabarṇā mūtrāśaye/ esab kī hocche jāni nā tabu buker madhye ghoṭe jāchhe aharaha […]/ āmār smṛtiśakti naṣṭa hoye jācche/ āmāke mṛtyur dike jete dāo ekā/ āmāke dharṣaṇ o more jāowā śikhe nite hoyeni” (Rāychoudhurī 187).
15 Private Facebook conversation, April 17, 2018.
16 He further argues that the obsession of India-related scholarship for semen anxiety has overshadowed the multiple, little ‘social topographies’ that could constitute a fuller picture of Indian sexualities, a word that the sociologist declines in plural (Srivastava 4).
17 “śudhui rādhikā noy - gāṇikāo ṛtumatī hoy/ tin santāner pitā – paribār parikalpanār
ādarśapuruṣ/ kaiśore kare thāke ātmamaithun – kare nā ki” (Mishra 19).
18 “Svamehan” (n.d.). In Wikipedia. Retrieved January 23, 2018, from
https://bn.wikipedia.org/wiki/স্বমেহন
19 As pointed out by Allen and Burridge (29), masturbation is an orthophemism, a neutral term with neither positive nor derogatory connotations.
20 “āmāke tomār garbhe āmāri śukra theke janma nite dāo/ āmār bābā-mā anya holeo ki erakam hotum?/ sampūrna bhinna ek śukra theke malay orphe āmi hote pārtum?
(Rāychoudhurī 188)
21 “oh e samasta kī ghaṭche āmār madhye/ āmi āmār hāt hāter ceṭo khuṁje pācchi nā/
pāyjāmār śukiye jāoyā bīrya theke ḍānā melche/ 300000 śiśu uṛhe jācche śubhār
stanamaṇḍalīr dike/ jhāṁke jhāṁke chuṁc chuṭe jācche rakta theke kabitāy/ ekhan āmār jedi ṭhāṅger corācālān seṁdote cāiche/ hipnoṭik śabdarājya theke phāṁsāno mṛtyubhedī jounaparculāy” (Rāychoudhurī 189).



Name:  Dhurjai and others          

IP Address : 012312.60.90012.13 (*)          Date:01 Jan 2019 -- 07:03 PM

Dhurjati Chanda, Bapi Chakraborty, Subhankar Das and Alexander Jorgensen in conversation with Malay Roychoudhury
Dhurjati Chanda, Editor, Ebang, Kolkata

Malay Roychoudhury ( Photo by Sandip Kumar )
Dhurjati: Some critics are of the opinion that you are one of the main architect of Bengali fictional prose ; of the same exalted class as that of Satinath Bhaduri, Kamal Kumar Majumdar, Subimal Basak and Subimal Misra. However, you are the exceptional torchbearer in this regard. What is your opinion ?

Malay: See, compared to European languages, Bengali prose is quite recent. Mathi Likhito Susamachar ( Gospels of St Mathew ) was published in 1800. Sixty five years after that, Bankimchandra Chattopadhyay‘s novel Durgeshnandini was published. Third stage in prose arrived in 1914 when Pramatha Choudhury started publishing the periodical Sabujpatra ; that would mean a three year old kid. Compared to this the Jews Had their Old Testament in ancient times. The Apology of Socretes by Plato, Poetics by Aristotle, and Confessions by Saint Augustine appeared in 3rd century BC. Six hundred years before Pramatha Choudhury, Decameron was written by Boccaccio. The Praise of Folly was written by Desiderius Erasmus ; Castiglione had written The Book of the Courier. Think of Rabelais who wrote Gargatuan Pantagruel four hundred years before Rabindranath Tagore was born ; Autobiographical Prose was written by Benvenuto Cellini, Don Quixote was written by Miguel De Cervantes. How many names of European prose writers do you want me to refer to ? Pascal in 17th century, Voltaire and Rousseau in 18th. Obviously the appearance of Edgar Allan Poe, Nathaniel Hawthorne, Herman Melville, Balzac, Flaubert, Turgenev, Dostoevsky, Tolstoy, Chekov, Henry James in 19th century was a foregone conclusion. The prose writers who came after them in Europe revolutionized sentence structures, construction of words, diction, expressive inventions. To name a few : James Joyce, Andre Gide, Thomas Mann, Frantz Kafka, Marcel Proust, D.H.Lawrence, Jean Paul Sartre, Albert Camus and William Falkner. The labour and love invested by Borges, Gabriel Garcia Marquez, Salman Rushdie in their prose is evident if you leaf through just a few pages of their books. Can you imagine as to which height the language and expressive medium has reached in their society as a result of their contributions ? Compare the rich prose used for conveying news by reporters of CNN and BBC with our Doordarshan, Ananda (ABP), ETV, Akash, Chobbish Ghanta, Kolkata TV etc. Right from the war zone or accident site the extempore prose the Westerners are using is far more developed than even the written news of our Broadcasters. Read the pages of TIME, Newsweek and London newspapers alongside Ananda Bazar Patrika, Ganashakti of Kolkata. Compare the lectures of illiterate President George Bush with our erudite Chief Minister Buddhadeb Bhattacharya ; you will find even in prose Bush is wealthy. It is the writer who has to take up the job of nurturing Bengali prose. The foremost duty of a Bengali fiction writer is to develop the language and make it rich. Well crafted stories may be narrated by any grandmother. The question is not of converting language into Arts. The issue is of loving your mother tongue, local and geographical, and respecting it.

Dhurjati: Concurrently, you have had to talk about writers’ honesty on several occasions. In the present Indian context, West Bengal in particular, don’t you think ‘morality’ or ‘de-morality’ are just hollow words ?

Malay: The word honesty is so all pervasive in gambit, that virtue, morality, ethics, commitment etc—- every value system come within its purview. Actually, for the weak-kneed bengali, it is very difficult to disregard the values of life emanating out of the power structure of society. I had analyzed the present society of West Bengal in 2001 issue of Khanan magazine of Nagpur ; the essay is titled Postmodern Times and the Fall of Bengalies. It was to be included in the Little Magazine Digest, but the editor of the Digest Mr Jyotirmoy Das panicked and rejected it. You may go through the essay in Khanan. I do not know how we are going to get out of the hell that the people of West Bengali have got themselves trapped in post colonial logjam. The putrefaction is much deeper than immorality and dishonesty. Most of the poets, writers, critics— not only in the case of servants of media, but in Little Magazine world as well, lack self-confidence and self-respect, and are chicken-hearted , greedy and brazen faced. They don’t love the place called West Bengal. Sunil Gangopadhyay, wants the name of West Bengal changed to Bangla, but would not like the name of East Bengal Football Club changed to Football Club of Bengalies.

Dhurjati: “You can’t carry your flag of honesty to places where millions of Rupees are spent on fireworks by individuals in one single night during Diwali festival, lecherous lasses collect gold biscuits in day-night performance.” You had, in an interview to Arunesh Ghosh, said these words. The word ‘honesty’ is very relevant here. To a postmodern thinker, does honesty of the day entail death of modernity ?

Malay: Are you attacking Arunesh Ghosh ? In that case he has to answer this question. It is true, he is simultaneously writing in DESH, associating himself with Marxist Communist Party in power, trying to prove himself a participant in the Hungryalist movement, has declared himself to be an anti-establishment writer, etc. Don’t you think such a character signals the end of modernity ? Arunesh Ghosh is a present day Bengali, a member of the dreaded School Teacher Gang of the ruling party. However, his brandishment is visibly palpable at the micro level. Of late he has been found to have opposed the present power brokers of West Bengal. His modernist ideals might have withered away, but what about the dead end where the philosophy of idealism itself has reached ? LTTE, Jaish-e-Mohammad, ULFA, HUJI, Al Qaida, NLFT, LET, Hizbul Mujahideen etc are all fluttering some sort of flags of idealism to kill human beings. Modernity died at that juncture. And thus the relevance of local narratives. hordes of border-crossing ungrateful Bengalies have destroyed the ‘local’ society and culture of North West Bengal by grinding it under the steamroller of the grand narrative. Arunesh Ghosh is obviously pained and guilt stricken as he is one of those border-crossing Bengalies who have decimated the Coch, Mech and Rajbanshi people.
In reply to second part of your question, I’d like to say that one may be a modern person ; but just because the structure of his writings is postmodern, you need not label him as postmodern. Local narratives may term him as Dalit, Subaltern, Green Peacenik, Environmentalist, Feminist, Anti Global etc., or he may be part of any other micro level protest ; here their honesty is unchallangeable. It is mainly because of their honest intent that so many Public Interest Litigations are being filed in various High Courts and Supreme Court.

Dhurjati: What is the explanation of morality and moralization in the Uttaradhunika or Adhunantika perspective ?

Malay: These days I prefer to use the word Postmodern in place of Uttaradhunika or Adhunantika. Linguist Dr Prabal Dasgupta had coined the synonym Adhunantika in the Indian perspective ; that is because some pro-establishment poets such as Anjan Sen, Amitava Gupta etc. had launched a poetry movement named Uttaradhunika. The idea of literary movements itself is a relic of modernism. As was Hungryalist movement. All literary movements have been conceived on the assumption of the Grand Narrative of Time and human civilization as linear. In modernist prescription one could predict the march of history. Which means the structure of present and future are known beforehand. One may conceive of theories. Postmodernity is an open-ended space. It can not predict the future. However, it analyzes the present and identifies the features. It surpasses the author to examine his texts. If you deconstruct their discourse, you will be able to make out as to why these people turned out in to great frauds who took refuge in the Grand Narrative. People who once bragged about social commitment, today we have come to know that they had forcibly occupied other people’s lands, which they are selling now to promoters-builders. Through their Grand Narrative traps they catch voters. This is whu postmodernists are giving importance to local narratives. Postmodern ethics is : “Small is Better than Big”. Microforms or microlevel systems, disciplines, relations, face negligible erosions, if confronted. That is why they are better than macroform systems. Macrolevel moralities were imposed by Stalin, Pol Pot, Hitler, Pinochet, Franco, Idi Amin, Yahya Khan, etc.

Dhurjati: If ‘Establishment’ is a modernist epithet, what is the postmodern or Adhunantika flip side?

Malay: No, no. A word can not be modernist or postmodernist, that way. The idea within an epithet can be confronted from modernist or postmodernist view. Modernists, I am talking of West Bengal, who are embeded in governmental Grand Narrative, have been labeling Ananda Bazar Patrika corporate house as Establishment. Whichever government is installed at the Centre in Delhi, they call it Step Mother Establishment. That is an epistemic fraud. Ganashakti newspaper and the local government secretariat are limbs of the same power structure. The Bengali Marxists do not have faith in the governmental Grand Narrative though ! In the postmodernist perspective when you talk of local narratives, all suzernities are ‘Establishment’. Patriarchy is establishment to Feminists. For Subaltern writers the State Award Committees lorded over by upper caste writers are establishment. Some son of the soil of West Bengal, ie., the original inhabitants, unlike East Pakistani refugees, had told me last year that the Bangla and Sahitya Academies have been captured by those erstwhile refugees who have converted them into Hindu East Bengali Establishment. Muslim writers consider these Award Committees as Hindu Establishment.

Dhurjati: I consider your poetry collection Shoytaner Mukh ( Face of The Devil ), wherein some of the poems were stamped CANCELLED, as postmodern or Adhunantika. Would you yourself call it modern ?

Malay: Oh ! I find you remember it. The day the book was released, it created much turmoil at the Kolkata Coffee House ! Publisher Sunil Gangopadhyay had gone to Iowa, USA to learn how to write poems., and the Krittibas group was headed by stop-gap leader Saratkumar Mukhopadhyay. I do not have a copy of the book. I am unable to recall the poems which were branded CANCELLED. The rubber stamp was used at that time to cancel gilt-edged bonds. I guess it may be explained this way : “the pages which were marked CANCELLED could be construed postmodern in the sense that their beginning and exit points got a visual structure of being wide-open.” Anyway, it has become one of watershed legend of the Hungryalist movement. The event was an iconoclastic venture which in retrospect now appears to be one of the ultimate triumph of modernism, that artistic game in which life was put at stake and the rules of which required such brazen acts of impudence to be legitimized by manifestoes.

Dhurjati: Today the market culture is the superordinate ruler ; consumerism is victorious. What is the postmodern explanation ?

Malay: This exactly is the condition which people are terming as end of modernism, or the Postmodern Condition in India. In such a situation the market is the superordinate discourse to which corporate media literature of potboiler writers is relativised, and in which it finds meaning and justification. Just as dot-pens and injection syringes have now become disposable, so are poetry books, novels, films, compact discs, DVDs, songs, paintings, etc. In today’s West Bengal, there is an intensification of awareness of incoherence, along with the decline in the need for order. It reveals an equivocality about the meanings and relations of things, matched by willingness to live with uncertainty to tolerate the contemporary West Bengali world seen as random and multiple and even incongruent.

Dhurjati: A creative person’s life long struggle is not for amassing money or wealth. It is rather a desire for recognition which spurs him. How far is it applicable to you ?

Malay: Who told you only poets and writers are creative persons ? Doctors, farmers, labourers, engineers, hawkers, shopkeepers, cooks, train drivers, miners, pilots are all creative persons. Otherwise the Homo Sapiens who once emerged from Africa would not have danced on the surface of moon. The human being in a collective is very complex. He keeps on breaking barriers and enhancing frontiers. That is how we got high yielding Taichung paddy, Operation Flood, Borlaug’s wheat, cloning, heart transplant, Save Narmada River Movement etc. I am similar to such collective humans. Paradigm shift takes place because of the work of ‘thinking’ of some people. As a result his work or thought comes down to everybody’s notice and benefit.
( Translated from Bengali by Indrajit Bhattacharya )
Dhurjati Chanda



Malay Roychoudhoudhury
January 5, 2013 – 6:19 am Categories: Hungry Generation, Hungryalist Movement, Indian Literature | Comments (1) Tagged Bengali prose, Fiction, Tagore |
Bapi Chakrabarty, Editor, Durer Kheya, Kanpur

Malay Roychoudhury

Bapi: You are considered to be a part of the Hungryalist movement. Is it proper ? Because, during the Hungry Generation movement in the 1960s, only two thin poetry collections of yours were published ; ie., Shoytaner Mukh published by Sunil Gangopadhyay and Jakham published by Subimal Basak. However, your literary fame started some 20 years the Hungryalist movement withered away, when your poetry collection Medhar Batanukul Ghungur and your novel Dubjaley Jetuku Proshwas were published. That has been the learned observation of academic readers. Have you ever made a self-assessment regarding this aspect ?

Malay: Critics did identify me that way about 30-40 years earlier ; that is because the Hungryalist movement was started by me. Now that a number of titles of mine have been published, I presume I am not branded that way anymore. This aspect has not at all been raised by Dr Tapodhir Bhattacharya, Satyajit Bandopadhyay, Udayan Ghosh, Barin Ghoshal, Ajit Ray, Zahirul Hassan, Samir Sengupta and others who have discussed my fictions and poems in2001 in the collection of articles edited by Murshid A.M. Since you reside far away from Kolkata, you appear to live in that past glory. I would prefer that whatever I have written be discussed in a panorama. I don’t want evaluation of my identity.

Bapi: I think your personality has got mixed up with your Hungryalist image, and as a result the creative genius of poet and prose architect Malay Roychoudhury has been submerged beneath it. In the Hungry Sakkhatkarmala interview collection of yours edited by Ajit Ray, all the fifteen interviewers have repeated the same boring questions about the Hungry Generation movement. Ahabkal magazine edited by Ratan Biswas, which was published during 2002 Kolkata Book Fair, exclusively on your work, has glorified your Hungryalist image. How would you react to it ?

Malay: Modernist critics, as an easier way to enter a text, used to concentrate on the author’s person. And they were elated if they could catch hold of an image. It is just a colonial remnant; an analytical tool imposed by Europe. In traditional Indian literature, the authors were never given importance. Nobody has any idea of the identity and image of Krittibas Ojha and Bharatchandra. British imperialism had imported community-neutral image of the individual. After the Britishers departed, modernity has started disappearing in our postcolonial life. The critics who are still suffering from European canons of modernity are the persons who concentrate their focus on the writer rather than what he has written. The canon of hoisting the image was placed at the centre-stage of epistemic world of European imperialism. Nevertheless, some critics do claim that I have started surpassing my writings. I do not have any role in it.

Bapi: Your birth, childhood, youth, education etc everything have happened in Patna. Your childhood was spent in the Imlitala slum of Bakharganj. Comparison of your origin is impossible with the middle class non-resident writers such as Bibhutibhushan, Sharadindu, Bonoful, Satinath and Subodh Ghosh. With that sort of background how did you emerge as one of the foremost writer of Bengali literature ?

Malay: Other writers write for money, fame, honour, domination, awards etc. My literary activity has been an effort of an Outsider who endeavours to enter into West Bengali culture, in view of the fact that I belong to the family of one of the original inhabitants of Kolkata city, ie., the Sabarna Roychoudhurys. Ahabkal magazine has published my ancestral tree since 9th century. I do not think any other Bengali writer has had to bear such burden of being associated with his own culture. Apart from this, my education at Catholic Christian and Brahmo Samaj schools has been inspirational for me.

Bapi: Are movements necessary for literature ?

Malay: Hungryalism has been the only worthwhile movement in Bengali literature. Obviously, there must have been socio-political reasons. Sociologists would be in a better position to explain as to why it erupted. In the post-colonial period, no other movement is possible. The reason is the speed of consumerist society. Thus the question of necessity of literary movements in future is absurd in West Bengal.

Bapi: Such a movement in Bengali literature was not launched either from Kolkata or any place in West Bengali. It started from outside Bengal ; from Bihar.

Malay: That is because of the desire for entering West Bengali culture ; a desire to dredge the filth out of its cultural river, and recreate the streaming flow ; to kick the butts of vulgar refugee-esque literary guardians. The residents of West Bengal of that time, ie., 1960s, were not even aware of their self-imposed lethargy, inactivity, inertia, disease. Since I was born and brought up outside of West Bengal, things were quite clear to me
.
Bapi: You have termed yourself a Cultural Bastard. Kindly explain it.

Malay: Go through the two explanations which Bishwajit Sen and Ajit Ray gave on the subject. Bengalies who live outside West Bengal, gradually get transformed into cultural bastards. The same has happened with me. Bishwajit and Ajit have discussed the social, political and literary dimensions of the issue. But I have presented the matter in a wider perspective. In our Roychoudhury family, Mughal and Pathan cultures intruded during my ancestor Panchanan, who was a military commander in Humayun and Akbar’s cavalry. Panchanan’s grandson Jia, who became known as the famous sage Kamadeva Brahmachari, tried to combine the values of Vaishnava and Shakta sects, by worshiping Shyama Rai and Kali at family level. His son Lakshmikanta, when he was advisor to Maharaja Pratapaditya, was imbibed in Portugese culture. I have studied in Catholic school and Brahmo school. The childhood locality of Imlitala had homes of low caste families, at that time called Untouchables. The locality of adolescence was crowded with conservative destitute Sunni Muslims. If one has to deconstruct my text he will have to go through these layers.

Bapi: What is your opinion about today’s Bengali literature ? Is it really unthinkabe to launch a literary movement any more ?

Malay: Other than my own writings I am not bothered about anything else these days. Not only in literature, no movement is possible in any other field. In other areas some pressure may be created, such as in Save Narmada River or Tribal Rights. However, the consumerist media impact in case of market literature is so all-pervasive that no movement can change the speed in life and living.
( Translated from Bengali by Indrajit Bhattacharya )


Bapi Chakrabarty ( on left )
January 2, 2013 – 5:32 am Categories: Hungry Generation, Hungryalist Movement, Indian Literature | Post a comment Tagged Bengali Poetry, Diaspora |
Subhankar Das, Editor, Graffiti, Kolkata

Malay Roychoudhury
This may be beginning of a conversation between me and poet Malay Roychoudhury who was prosecuted for the publication of his poem “Stark Electric Jesus” in 1964. This poem was originally written in Bengali titled “prachanda Boidyutik Chhutar” which was subsequently translated in English with the help of Prof Howard McCord and Carl Weissner. The poem defied the forms of Bengali lyric poetry ( sonnet, villanel, minnesang, pastourelle, canzone, stew etc as well as Bengali metres ( matrabritto, aksharbritto etc ) retaining , however, its content vehicle, expressing subjective personal feelings. Malay Roychoudhury, a Bengali poet, has been a central figure in the Hungry Generation’s attack on the Indian Cultural Establishment in the early 1960s, now living a life of a recluse in Mumbai. I was in Mumbai for a few days but could not meet him as he was not doing well and my visit coincided with his visit with the Doctor. So I mailed a few questions to him and this is what he had to say.
Subhankar: The Hungry Generation literary movement was launched by you in November 1961 with the publication of a manifesto on poetry in English from Patna, where you were residing at that point of time and nobody could believe that a Bihar-based Bengali can have any say about Bengali literature. During the course of the movement you got arrested, lost your job, dragged around town by the Police with a rope on your waist. How far is it true ? Do you still feel the relevance of the movement still exists ? If not, why ?

Malay: Everything is recorded in the trial papers which may be retrieved from the records of Bankshal Court, Kolkata. The case number etc are also available in various publications. Why don’t you make a little effort and spend a few silver to get certified copies of these papers to enable yourself to get enlightened about the facts. The Hungryalist movement has changed the course of Bengali literature once for all. We definitely created a rupture in terms of time, discourse, experience, narrative diction and breath-span of poetic lines. The lecturer of Assam University who is writing his dissertation for a Doctorate on the subject, gleefully informed that Bengali academicians are even today scared to utter the word Hungryalism. Well, I guess that speaks a lot.

Subhankar: I need a little more explanation on the word Behari — the causes behind the rejection etc., lost your job, dragged around town by the police with manila rope on your waist— do yo still remember that day ? I need the story of that day. Can you elaborate a little— rupture in terms of time, discourse, experience, narrative diction and breath-span of poetic lines.

Malay: I don’t want to recall those days ; it gives me pain in my present loneliness. I want to forgive everybody. There is a rupture, in Bengali we call it Bidar. Look around you and you will get the answer. Manila ropes were not there in our time. Ropes were made of coconut husks. I don’t think you will fathom the diasporic plurality of a Behari Bengali, or a cultural bastard.

Subhankar: Keeping in mind the Hungryalist movement made big difference in the attitude of Bangla literary scene, don’t you think any kind of movement finally aspires for a kind of regimentation, closed groups where the freedom of the authors needs to be sacrificed to keep the movement going ? Please share your experience.

Malay: Arrey yaar, don’t think in terms of your knowledge of the movements in Western literature. Hungryalist movement did not have a centre of power, high command or polit bureau. Any one and everyone were free to join the movement just by declaring himself that he was a Hungryalist. In fact some of the later Hungryalists are not known to me even today ! Participants were free to publish their own broadsides, pamphlets, booklets, magazines etc. The movement was not confined to Kolkata only. As you have just said, I was from Patna, Subimal Basak was from Patna as well. Pradip Choudhuri was from Tripura. Subo Acharya was from Bishnupur. Anil Karanjai was from Benaras. The little Magazine Library & Research Centre at Kolkata is having an archive, you may like to check out.

Subhankar: What initiated you to leave the literary hub Kolkata to live a life of a recluse in Mumba?

Malay: I sold off my Kolkata flat, gifted entire collection of books, gramophone records, discs, cassettes etc to friends and readers and donated all furniture in my neighbourhood. I felt very sad about Kolkata. As you know, once upon a time Kolkata belonged to our clan. I found it just leaching. Not that I wanted to come to Mumbai. I would have preferred to go anywhere. I came to Mumbai because I have a one-room flat in this city.

Subhankar: Why you found Kolkata is now just leaching and nothing more ?

Malay: I just stopped myself from uttering the expression The City of Lechers. I had experienced the city some sixty years back ; it was completely different . Ask anyone of my age , anyone who is not a part of the present power nexus.

Subhankar: Do you still feel like an Outsider after all these 49 years ?

Malay: Oh, yes. I am The Outsider.
( Copyright Subhankar Das )

Subhankar Das
November 2, 2012 – 2:34 pm Categories: Hungry Generation, Hungryalist Movement, Indian Literature | Post a comment Tagged Bengali Poetry, Poetry |
Alexander Jorgensen ( Part 1 of Interview )

Malay Roychoudhury
Known for his candour, sense of purpose and ability to transcend the banal with ferocity, Malay Roychoudhury, founding member of the Hungryalist Movement remains a seminal figure in the formulation of 21st century poetry. Personally associated with such literary figures as Allen Ginsberg and Octavio Paz, Roychoudhury has authored 40 works including poetry, novels, drama, social criticism and translations. First published in 1964, his poem “Stark Electric Jesus” incited enormous controversy, leading to both public and private persecution and ostracisation. Due to the ensuing scandal, Roychoudhury refused to write again, only returning to his craft after his mother’s death in 1983. Now an active and vital contributor to the international arts community, Roychoudhury is gracious in his time with visitors and willing to engage in discussions on creativity and politics. Working out of Kolkata, India, Roychoudhury relates his remarkable life and career with both frankness and levity.
Alex: In what ways were you successful in “undoing the done for world” and start afresh from chaos?

Malay: Success is a strange word as far as arts and literature are concerned. Are the cave paintings, Aztec sculptures, pyramid engravings successful ? We do not know their views. The Hungry Generation movement was definitely successful in undoing the colonial canons.

Alex: If you could name a few artists who inspired you, who would they be ?

Malay: I would name two illiterate persons : Shivnandan Kahar, a man who knew Ramayana, the epic written by poet Tulasidas, by heart ; and Ramkhilawan Singh Dabar, who could recite couplets from the works of poet saints Kabir, Rahim and Dadu. They were our family servants at Patna. They quoted from these poets in order to reprimand us during our childhood.

Alex: In one sentence, what would you like to say to those who might argue that Hungry Generation poets were, well, reckless ?

Malay: They have not read us, otherwise they would have known that the human brain is Divine. our books are published by small presses , and the reader generally has to contact us for a copy of any publication.

Alex: We have many examples of individuals who have had a difficult time “balancing” the requirements of family and art. How important has “family” been to you as an artist ?

Malay: very important. Without a supportive family a writer can not have structured peaceful schedule.

Alex: If you were to die tomorrow, would be happy with the contribution to the arts and the world that you have made ?

Malay: Happiness emanates from the process of involvement in writing. I don’t think that a writer is much bothered about immortality, especially a Hindu, who burn their dead, and do not have the culture of writing epitaphs.

Alex: Any regrets ?

Malay: Yes. I should have inculcated the habit of maintaining daily diary right from the school days. My experiences are extensive and varied. Unfortunately I am unable to recall the important incidents which impacted me.

Alex: What type of things do you find yourself working on these days ?

Malay: An M Phil student, Swati Banerjee, was preparing her thesis on comparative study of my poetry and Ginsberg’s. I had to search out material for her. for the present, Prof Bishnu Chandra Dey of Assam University, who is preparing his Ph D thesis on the Hungryalist movement, is seeking my help in locating references. This has kept me busy for sometime.

Alex: Where do you go for inspiration ?

Malay: Inspiration comes from within a writer. It is an up-wailing precess in your psyche.

Alex: In terms of expression, the saying “what needs to be said” and how that might be articulated, what do you think about the use of multimedia and technology in the arts nowadays ?

Malay: They have vastly widened our sense of wonder. One now has unlimited spark-ways to venture into the unknown.

Alex: To someone looking to learn more about the Hungry Generation movement, where would you recommend they start ?

Malay: Not much is readily available in English. My Selected Poems were published twenty years back. During the sixties several little magazines in the UK and US brought out special Hungry Generation issues. Those magazines may be traced from archives of the editors maintained in Universities. If Black Robert Journal is interested I would make available xerox of a couple of informative essays.

Alexander Jorgensen

( Copyright Alexander Jorgensen. Reprinted from Black Robert Journal, 1999 issue )
October 26, 2012 – 1:33 pm Categories: Hungry Generation, Hungryalist Movement, Indian Literature | Comments (1) Tagged Bengali Poetry, Poetry |
Alexander Jorgensen ( Part 2 of Interview )

Malay Roychoudhury’s interview by Nayanima Basu
Founding member and central figure of the Hungryalist movement, a literary torrent predicated on the subversion of India’s cultural establishment, Malay Roychoudhury is the author of more than 50 books, a Bengali poet, novelist, dramatist, essayist, translator, and social critic, he remains a seminal figure in the understanding of 21st century poetry. His association have included such literary giants as Allen Ginsberg and Octavio Paz.
Roychoudhury’s experimental work entitled “Prachanda Baidyutik Chhutar” ( “Stark Electric Jesus” ) , a deeply personal and confessional poem penned in 1963 and first published in 1964, created enormous controversy with its publication. It led to both public and private condemnation of its author and, due to the ensuing scandal, which included his prosecution and ostracization at the hands of peers, Roychoudhury refused to write again. It was not until 1983, following the death of his mother, that he would return to his writing.
First introduced to Malay Roychoudhury on a visit to Kolkata in 2007, I have found his discussions and correspondenses to be vibrant, thoughtful, frank, and often filled with levity. Uniquely engaging, he has offered opinions on everything from contemporary visual poetry ( vispo ) to politics. “An interview with Malay Roychoudhury : Part One”, appears at http://www.blackrobertjournal.blogspot.com )

Alex: You have said that Hungryalists were not “reckless”. Would you admit, however, that some members would later become self-serving ? My question relates to the idea that we become less idealistic as we grow older. Is idealism important ? How does it fit into your life ?

Malay: I am not sure whether the 19th Century concepts of “self” , “ego” and “idealism” retain their original definitions in our 21st Century world. How do you explain these concepts in the perspective of what is being called Islamic Terrorist Human Bomb ? He definitely has what we presume to be “self”, “ego” and surely “idealism!” Otherwise why should he come to India to kill Hindu, Cristian, Jew, Sikh, Jain, Buddhist infidels ? Marx, Sartre, Freud and even Darwin would have experienced a vertigo of ontological nightmares if confronted with the present world scenario . “Idealism”, thus, is a term applicable to situations in time and space. I remain idealistic in the original Hungryalist sense of being honest . Idealism does not wane with age ; it gets continuously redefined . It definitely becomes difficult to remain a social being in West Bengal with Humanitarian Honesty as an ideal.
The Hungryalists were not self-serving, since they wrote very little during the movement, and published lesser, as nobody liked to publish them. But after name and fame , a few Hungryalists did become self-serving, whom I avoid, and who obviously despise me. The problem is that when the discourse is narrowed down to ART , ego becomes relevant. The superordinate discourse is the market today, and ego functions as a conveyance.

Alex: While in Kolkata, I witnessed what I interpreted at the time to be “poetry guilds;” my feeling was that these communities were involved in the construction of an “intentional poetry of political allegiance,” with attention paid to a particular style of writing. Would you say this is true ? if so, then would this be a byproduct of the Hungryalist Movement ? What are your thoughts ?

Malay: No. Groupism evolved in mid-1950s with Krittibas and Shatabhisha poetry magazines, which claimed and behaved in a fashion as if only they had the power of definition, distinction and evaluation of literary discourses. Krittibas ultimately got inducted into the business house called Ananda Bazar Patrika ( leftists dub it as “Establishment”). The Hungryalists were treated as untouchables by these groups, though Hungryalism as a movement was in a continuous flux, somewhat like the Surrealists. Hungryalists made attempts to wrest that power and dismantle Groupism. What you call Guilds ( may be we can call them poetry cartels ) evolved in Kolkata ( not throughout West Bengal ) after the Naxalite political upheaval. Naxalites had to form secret hitmen groups. Nowadays , poetry Guilds are formed around a couple of poets who can afford to publish a regular poetry magazine. These are magazine oriented groups, and do not have an agenda. I guess most of these poets come from refugee families of erstwhile East Pakistan who wanted to legitimize themselves by re-rooting in West Bengal through a periodical based literary group. They should not be taken seriously.

Alex: Was Tagore the worst thing to ever happen to Bengali poetry ? To Poetry ?

Malay: Rabindranath Tagore‘s ( the Shakespeare of Bengali literature ) poems are now confined to academia. Academicians use him as a ladder in the cultural circuit of West Bengal, which unfortunately lacks in “Icons.” As a Bengali cultural icon, he can not be wished away. It is not his poems, but his songs which works as an impediment, the result of which has meant that Bengali music in post-independent India has failed to catch up with the world ( only now we have a singer poet in Kabir Suman ). His songs are being sung even in funerals ! Nevertheless, written Bengali diction had emerged out of the Tagore family. You can’t blame them. Had the British started their Empire from Dhaka in Bangladesh, the Bengali literary diction would have been different. Authors in Bangladesh, such as Bratya Raisu, Jewel Mazhar and Ebadur Rahman, write in their diction ; literary diction in Bangladesh is therefore changing. I would like to mention that one of the Hungryalists, Subimal Basak had written his novel CHHATAMATHA in this diction in 1965, for which he was castigated by academicians. Today, in West Bengal, Tagore is just a show piece to be flaunted, especially by middle class gentry. His Shantiniketan has been ruined by the Leftists.

Alex: Tell us about your typical day. Now, I hear you are currently putting together a daily diary. How often do you meet visiting writers and artists ? How do your wife and son assist you with your many appointments ?

Malay: I get up early, quite early, and spend a couple of hours on the Internet, as no charges are levied till 8AM. Do some yoga thereafter as advised by the physiotherapist. Have a frugal breakfast of oatmeal with vegetables while browsing through two Bengali and English newspapers. Till 1PM, I read a magazine or a book, while taking notes in my brain. I simultaneously read several books and magazines ( that is why I refrain from reviewing books ). I dislike visitors till 3PM. From 3 to 4PM, I do some freehand exercises and sit at the PC to attend to my blogs ; nowadays I concentrate on Bengali sites where I interact with young readers. As often as possible, I avoid visitors ; I have found that most of the visitors are not well-read ( the Leftist government abolished English teaching in schools in 1980s ), and it is a sheer waste of time. It is also irritating, a few obstinate readers insist on visiting me, though I do not know why. They come from remote places and I can’t drive them away like poet Buddhadeva Basu who had shut his doors the moment I uttered my name. I was born in 1939 and at this age I love to be left alone in my silence. Due to my bad health, my wife quite often intervenes ( so that I do not lapse into bronchial bouts of coughing ) if the visitor wants me to go on talking. Visitors are entertained upto 7PM, when I sit with my drinks and start brooding about the next day’s blog ( where I write the drafts and block public visibility till finalization ). My son is very busy now with an Australian firm. Since attending to my blogs, I don’t write daily diary, and have destroyed whatever I had written earlier .

Alex: What words of advice might you offer if asked to serve in the role of a mentor ?

Malay: No. No. I don’t want the role of a mentor bestowed on me. Each person should introspect and chalk out his own path.

Alex: How important have your exchanges with other writers been ? What did you gain from Allen Ginsberg ? What did Ginsberg gain from his time spent with you ? In terms of cross-cultural challenges, did you find that there were any present during this period of mutual exchange ?

Malay: Yes. That was the case till 1980s when I interacted with any or all writers. I gained a lot from the visiting authors, as varied as from Daisy Aldan to Dhumil to Kamal Chakraborty. The most important has been the visit of Professor Howard McCord of Washington State University ( later Bowling Green ) , who published my controversial poem Stark Electric Jesus with an introduction in a booklet form, and made me known in North and South America and Europe during the 1960s. It is thanks to him that this poem gets reprinted almost every year ( I do not have any copyright of any text of mine ; they are owned by my readers ). He sent me books written by US and European authors about whom I had only heard.
Allen Ginsberg visited me at a time when I was dithering in non-religious atheism. He reinforced my pagan heritage of worshiping water, light, fire, air and other gods of nature. I can’t claim that I contributed to his thinking, though, perhaps in changing the notion that there can not be only one God ; there has to be innumerable gods for innumerable human spreads out in order to be eclectic, tolerant and resilient. Three fishes with one head, which he used as his logo, was pointed out by me from Emperor Akbar’s grave floor — the Emperor who himself wrote a religious treatise to unite all the religions of India.
Ginsberg used to talk to my mother in sign language. My father was terribly angry with him as Ginsberg was interested in taking photographs of beggars, lepers, mutilated, half-naked poor Indians. After I saw his Indian Journals, I was very much upset to see those photographs highlighted.
I spent a few months with non-literary hippies in Varanasi, Patna and Nepal. That was quite an experience with women and drugs. Hippies were fascinated that Allen Ginsberg had visited me.

Alex: Tell me about the technology you employ in sharing your work and ideas with others ? I know you have a blog ?

Malay: Other than using the desktop PC for net surfing, writing blogs and visiting network sites, I don’t have access to any other technology. No blackberry, IPod, IPhone or other gadgets. I wish I was young and used the gadgets that keep on coming. In case of the desktop PC, I am also a novice. I have to request my son to lend a helping hand to sort out things when I find myself stuck. But the internet really places my work far and wide ; people pick up my work and spread it among themselves. In most cases, I come to know after quite sometime, even a year. It is a pleasant feeling
.
Alex: If you could walk a mile in whatever circumstance, where where would you choose to do it ? What would be your last meal ?

Malay: I would go to the bank of river Ganges, at the place where I had kissed my Nepali classmate Bhuvanmohini Rana. My first and memorable kiss. I do not know where she is now. Must have become old or might have died ; she was two years older than me. I would sit at the same spot at the same time of autumn evening to revisit her tenderness.
My last meal will be a hot chicken tanduri and a few pegs of single malt.
( Copyright Alexander Jorgensen. Reprinted from the Chekoslovak-based GRASP magazine, May 2010 issue )

Alexander Jorgensen
Alexander Jorgensen is a globetrotter poet and artist. He has visited all the continents. He met Bengali writers and poets during his visit to India .
October 24, 2012 – 2:13 pm Categories: Hungryalist Movement, Indian Literature | Post a comment Tagged Allen Ginsberg, Bengali Poetry, Poetry, Tagore |



Name:  Tanumoy Goswami          

IP Address : 012312.60.90012.13 (*)          Date:01 Jan 2019 -- 07:05 PM

Malay Roychoudhury’s novella ‘Arup Tomar Entokanta’ : The relational orientation between body and mind

Every writer has a unique way of the looking at the world, and this is the civilization’s centre of gravity, is a cluster of ideas which define the goal of human existence, the ways to reach this goal, the errors to be avoided and the obstacles to be expected on the way. This view interprets central human experiences and answers perennial questions on what is good and what is wrong/ evil, what is real and what is unreal, what is the essential nature of men and women and the world they live in. It is now generally assumed that people are basically selfish, and that fellow feeling is either a weakness or a luxury, or merely a more sophisticated form of selfishness. In this picture kindness becomes something we are nostalgic about, a longing for something that we fear may not really exist.

Aesthetically, Psychoanalysis is an account of how and why modern people are so frightened of each other. What Freud called defences are the ways we protect ourselves from our desires, which are also our relations with others. Indeed the history of Psychoanalysis after Freud reflects many of the dilemmas we have about kindness (it would be an interesting exercise to read ‘sexuality’ as Freud’s word for ‘fellow feeling’). Are we, Freud’s followers wondered, committed to our desires and then gratification, or to other peoples ? And what, if anything, could such a distinction mean ? Do we crave (sensuous) satisfaction as so-called drive theorists say, or do we crave intimacy and relationships ? Do we want good company or good sex, if we have to choose ? If kindness, in its anti-sentimental sense, is at the heart of human desiring, then these become merely false choices, the wrong way of talking about what goes on between people. Sex becomes one of the more obscure, least articulated forms. It is kind not to overprotect other people from oneself, especially from one’s sexuality.

Our psyches and the social world are inestricably linked. Whether we consider the social world is composed of dyadic relationslips, or the nuclear or extended family, or the larger community, we know that the psyche is formed by internalization of the external world, while the external world is always perceived through the lens of the internal world, the psyche. As a dyadic practice, psychoanalysis naturally focuses on the vicissitudes of dyadic relationships both in the external world and as represented internally.

An enigma, hackneyed, an author par excellence, cliché, one who speaks the last word on sexuality, an empty boast. He is the ultimate, the pioneer of a genre, hitherto not fathomed by any Bengali litterateur, what with his slang, his colloquial dialects, his candid confessions of his eccentricities and HIS never say die attitude on the face of odds, which would have dictated anyone to hang up his boots. He is essentially a diaspora and he loves it that way. He has qualms on joining in the milieu of the so called mainstream sheep following the financially rewarding balderdash of literature.

In this novella, author trying to emphasis on the eroticization of kindness in the psychoanalytic account. Rousseau, as we have seen located the psychological birth of kindness in the outset of puberty. It is sexual maturation that opens the fictional Emile to the feeling and sufferings of others, ‘bring[ing] to his heart the first compassion it has ever experienced.’ Rousseau intimated, and Freud showed so clearly, ambivalence is key to human sexuality, and if there is one thing that exposes this ambivalence, tests human kindness, it is the experience of human jealousy. The ambivalence exposed so vividly by sexual jealousy- that where we love we always hate,- has something important to tell us about the complexity of our emotional lives. We are always tempted to simplify our emotional lives in order to diminish the constant conflict we are in, in sexual jealousy we can no longer keep our conflicts hidden. We hate intensely where we once loved, our dependence on the person we need. Sexual jealousy- the ambivalence that explodes out of it, invites us to ask our questions the other way round. Why are we ever unkind ? And one answer would be to secure, in so far as it is possible, our emotional (psychic) survival. In a lecture on sexual jealousy delivered in Paris in 1929, Ernest Jones argued that what we call love is very often simply the way we manage stronger than love was old hat, atleast in psychoanalytic circles.

In this story, we observes relational orientation is also congruent between body and mind. In the Indian view, there is no essential difference between body and mind. The body is merely the gross form of matter, just as the mind is a more subtle form of the same matter. Both are different forms of the same body- mind matter- sharira. The emotions that have come to be differently viewed because of the Indian emphasis on connection. As cultural psychologists have pointed out, such emotions as sympathy and feelings of interpersonal communion. Eros not in its narrowing meaning of sex but in its wider connotation of a loving ‘connectedness’ (where the sexual embrace is only the most intimate of all connections), then the relational cast to the Indian mind makes Indians more ‘erotic’ than many other peoples of the world. The relational orientation, however, also easily slips into conformity and conventional behaviour, making many Indians psychologically old even when young. In a post modern accentuation of ‘fluid identities’ and a transitional attitude toward relationships, of ‘moving on’, contemporary westernman (and the modern upper class Indian) may well embody what the Jungians call puer aeternus- the eternal youth, ever in pursuit of his dreams, full of vitality, but nourishing only to himself while those around him.

Let us again emphasize that the relational orientation, the context sensitivity and the lesser sexual differentiation that go into the formation of the Indian mind. They are continents of an Indian’s psyche. Our sexual desire is far more selective than our kindness- our preconditions for excitement are much narrower than our preconditions for sympathy. The mental representation of our cultural heritage, it remains in constant conversation with the universal and individual aspects of our mind throughout life.
...............................................
Tanumay Goswami


Name:  Malay          

IP Address : 012312.60.90012.13 (*)          Date:01 Jan 2019 -- 07:08 PM

" শিল্পের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা কবিতা রচনার প্রথম শর্ত "
মলয় রায়চৌধুরী
এক
১৯৫৯-৬০ সালে আমি দুটি লেখা নিয়ে কাজ করছিলুম । একটা হল ইতিহাসের দর্শন যা পরে বিংশ শতাব্দী পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল।অন্যটি মার্কসবাদের উত্তরাধিকার যা পরে গ্রন্হাকারে প্রকাশিত হয়েছিল, এবং যার প্রকাশক ছিলেন শক্তি চট্টোপাধ্যায়।এই দুটো লেখা নিয়ে কাজ করার সময়ে হাংরি আন্দোলনের প্রয়োজনটা আমার মাথায় আসে। হাংরি আন্দোলনের হাংরি শব্দটা আমি পেয়েছিলুম ইংরেজ কবিজিওফ্রে চসার-এর ইন দি সাওয়ার হাংরি টাইম বাক্যটি থেকে। ওই সময়ে, ১৯৬১ সালে, আমার মনে হয়েছিল যে স্বদেশী আন্দোলোনের সময়ে জাতীয়তাবাদী নেতারা যে সুখী, সমৃদ্ধ, উন্নত ভারতবর্ষের স্বপ্ন দেখেছিলেন, তা টকে গিয়ে পচতে শুরু করেছে উত্তরঔপনিবেশিক কালখণ্ডে ।

উপরোক্ত রচনা দুটির খসড়া লেখার সময়ে আমার নজরে পড়েছিল অসওয়াল্ড স্পেংলার-এর লেখা দি ডিক্লাইন অব দিওয়েস্ট বইটি, যার মূল বক্তব্য থেকে আমি গড়ে তুলেছিলুম আন্দোলনের দার্শনিক প্রেক্ষিত। ১৯৬০ সালে আমি একুশ বছরের ছিলুম। স্পেংলার বলেছিলেন যে একটি সংস্কৃতির ইতিহাস কেবল একটি সরল রেখা বরাবর যায় না, তা একযোগে বিভিন্ন দিকে প্রসারিত হয়; তা হল জৈব প্রক্রিয়া, এবং সেকারণে সমাজটির নানা অংশের কার কোন দিকে বাঁকবদল ঘটবে তা আগাম বলা যায় না। যখন কেবল নিজের সৃজনক্ষমতার ওপর নির্ভর করে, তখন সংস্কৃতিটি নিজেকে বিকশিত ও সমৃদ্ধ করতে থাকে, তার নিত্যনতুন স্ফূরণ ও প্রসারণ ঘটতে থাকে । কিন্তু একটি সংস্কৃতির অবসান সেই সময় থেকে আরম্ভ হয় যখন তার নিজের সৃজনক্ষমতা ফুরিয়ে গিয়ে তা বাইরে থেকে যা পায় তা-ই আত্মসাৎ করতে থাকে, খেতে থাকে, তার ক্ষুধা তৃপ্তিহীন । আমার মনে হয়েছিল যে দেশভাগের ফলে ও প্রভাবে পশ্চিমবঙ্গ এই ভয়ংকর অবসানের মুখে পড়েছে, এবং উনিশ শতকের মনীষীদের পর্যায়ের বাঙালির আবির্ভাব আর সম্ভব নয় । এখানে বলা ভালো যে আমি কলকাতার আদিনিবাসী পরিবার সাবর্ণ চৌধুরীদের বংশজ, এবং সেজন্যে বহু ব্যাপার আমার নজরে সেভাবে খোলসা হয় যা অন্যান্য লেখকদের ক্ষেত্রে সম্ভব নয় ।

ওই চিন্তা-ভাবনার দরুণ আমার মনে হয়েছিল যে কিঞ্চিদধিক হলেও, এমনকি যদি ডিরোজিওর পর্যায়েরও না হয়, তবু হস্তক্ষেপ দরকার, আওয়াজ তোলা দরকার, আন্দোলন প্রয়োজন । আমি আমার বন্ধু দেবী রায়কে, দাদা সমীর রায়চৌধুরীকে, দাদার বন্ধু শক্তি চট্টোপাধ্যায়কে, আমার আইডিয়া ব্যাখ্যা করি, এবং প্রস্তাব দিই যে আমরা হাংরি নামের একটা আন্দোলন আরম্ভ করব । ১৯৫৯ থেকে টানা দুবছরের বেশি সে-সময়ে শক্তি চট্টোপাধ্যায় দাদার চাইবাসার বাড়িতে থাকতেন । দাদার শ্যালিকা শীলা চট্টোপাধ্যায়েরপ্রেমিক ছিলেন শক্তি চট্টোপাধ্যায় এবং তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্হ হে প্রেম হে নৈঃশব্দ্য-এর প্রেমের কবিতাগুলো শীলার প্রেমে লিখিত । সে যাই হোক, ১৯৬১ সালে যখন হাংরি আন্দোলনের প্রথম বুলেটিন প্রকাশিত হয় , এবং ১৯৬২ সালে বেশ কয়েক মাস পর্যন্ত, আমারা ওই চার জনই ছিলুম আন্দোলনের নিউক্লিয়াস।
ইউরোপের শিল্প-সাহিত্য আন্দোলনগুলো সংঘটিত হয়েছিল একরৈখিক ইতিহাসের বনেদেরব ওপর, অর্থাৎ আন্দোলনগুলো ছিল টাইম স্পেসিফিক বা সময়-কেন্দ্রিক । কল্লোল গোষ্ঠিএবং কৃত্তিবাস গোষ্ঠী তাঁদের ডিসকোর্সে যে নবায়ন এনেছিলেন সে কাজগুলোও ছিল কলোনোয়াল ইসথেটিক রিয়ালিটি বা ঔপনিবেশিক নন্দন-বাস্তবতার চৌহদ্দির মধ্যে, কেননা সেগুলো ছিল যুক্তিগ্রন্থনা নির্ভর এবং তাদের মনোবীজে অনুমিত ছিল যে ব্যক্তিপ্রতিস্বের চেতনা ব্যাপারটি একক, নিটোল ও সমন্বিত । সময়ানুক্রমী ভাবকল্পের গলদ হল যে তার সন্দর্ভগুলো নিজেদের পূর্বপুরুষদের তুলনায় উন্নত মনে করে , এবং স্হানিকতা ও অনুস্তরীয় আস্ফালনকে অবহেলা করে।

১৯৬১ সালের প্রথম বুলেটিন থেকেই হাংরি আন্দোলন চেষ্টা করল সময়তাড়িত চিন্তাতন্ত্র থেকে পৃথক পরিসরলব্ধ চিন্তাতন্ত্র গড়ে তুলতে । সময়ানুক্রমী ভাবকল্পে যে বীজ লুকিয়ে থাকে, তা যৌথতাকে বিপন্ন আর বিমূর্ত করার মাধ্যমে যে এক মননসন্ত্রাস তৈরি করে। গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে ব্যক্তিক তত্বসৌধ নির্মাণ । ঠিক এই জন্যই, ইউরোপীয় শিল্প-সাহিত্য আন্দোলনগুলো খতিয়ে যাচাই করলে দেখা যাবে যে, ব্যক্তি-প্রজ্ঞার আধিপত্যের দামামায় কান ফেটে এমন রক্তাক্ত যে সমাজের পাত্তাই নেই কোনো।কৃত্তিবাস গোষ্ঠীর দিকে তাকালে দেখব যে পুঁজি-বলবান প্রাতিষ্ঠানিকতার দাপটে এবং প্রতিযোগী ব্যক্তিবাদের লালনে সমসাময়িক শতভিষা গোষ্ঠী যেন অস্তিত্বহীন । এমনকি কৃত্তিবাস গোষ্ঠীও সীমিত হয়ে গেছে দুতিনজন মেধাসত্বাধিকারীর নামে । পক্ষান্তরে, আমরা যদি ঔপনিবেশিক নন্দনতত্বের আগেকার প্রাকঔপনিবেশিক ডিসকোর্সের কথা ভাবি, তাহলে দেখব যে পদাবলী সাহিত্যনামক স্পেস বা পরিসরে সংকুলান ঘটেছে বৈষ্ণব বা শাক্ত কাজ; মঙ্গলকাব্য নামক ম্যাক্রো-পরিসরে পাবো মনসা বা চণ্ডী বা শিব বা কালিকা বা শিতলা বা ধর্মঠাকুরের মাইক্রো-পরিসর । লক্ষণীয় যে প্রাকঔপনিবেশিক কালখণ্ডে এই সমস্ত মাইক্রো-পরিসরগুলো ছিল গুরুত্বপূর্ণ , তার রচয়িতারা নন । তার কারণ সৃজনশিলতার ক্ষেত্রে ব্যক্তিমালিকানার উদ্ভব ও বিকাশ ইউরোপীয় অধিবিদ্যাগত মননবিশ্বের ফসল। সাম্রাজ্যবাদীরা প্রতিটি উপনিবেশে গিয়ে এই ফসলটির চাষ করেছে।
লর্ড কর্নওয়ালিসের চিরস্হায়ি বন্দোবস্তের ফলে বাঙালির ডিসকোর্সটি উচ্চবর্ণের নিয়ন্ত্রণে চলে যায় , যার ফলে নিম্নবর্গের যে প্রাকঔপনিবেশিক ডিসকোর্স বাঙালির সংস্কৃতিতে ছেয়ে ছিল, তা ঔপনিবেশিক আমলে লোপাট হয়ে যায় । আমার মনে হয়েছিল যে ম্যাকলে সাহেবের চাপানো শিক্ষাপদ্ধতির কারণে বাঙালির নিজস্ব স্পেস বা পরিসরকে অবজ্ঞা করে ওই সময়ের অধিকাংশ কবিলেখক মানসিকভাবে নিজেদের শামিল করে নিয়েছিলেন ইউরোপীয় সময়-রেখাটিতে । একারণেই, তখনকার প্রাতিষ্ঠানিক সন্দর্ভের সঙ্গে হাংরি আন্দোলনের প্রতিসন্দর্ভের সংঘাত আরম্ভ হয়ে গিয়েছিল প্রথম বুলেটিন থেকেই, এবং তার মাত্রা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়েছিল প্রতিটি বুলেটিন প্রকাশিত হবার সাথে-সাথে, যা আমি বহু পরে জানতে পারি , কাউনসিল ফর কালচারাল ফ্রিডাম-এর সচিব এ বি শাহ , পি ই এন ইনডিয়া-র অধ্যক্ষ নিসিম এজেকিয়েল,এবং ভারত সরকারের সাংস্কৃতিক উপদেষ্টা পুপুল জয়াকার-এর কাছ থেকে।
অমনধারা সংঘাত বঙ্গজীবনে ইতোপূর্বে ঘটেছিল । ইংরেজরা সময়কেন্দ্রিক মননবৃত্তি আনার পর প্রাগাধুনিক পরিসরমূলক বা স্হানিক ভাবনা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য বাঙালি ভাবুকের জীবনে ও তার পাঠবস্তুতে প্রচণ্ড ঝাঁকুনি আর ছটফটানি , রচনার আদল-আদরায় পরিবর্তনসহ, দেখা দিয়েছিল, যেমন ইয়ং বেঙ্গল সদস্যদের ক্ষেত্রে ( হেনরি লুইভিভিয়ান ডিরোজিও, কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়প্রমুখ ) এবং মাইকেল মধুসূদন দত্ত ও আরও অনেকের ক্ষেত্রে । একইভাবে, হাংরি আন্দোলন যখন সময়কেন্দ্রিক ঔপনিবেশিক চিন্তাতন্ত্র থেকে ছিঁড়ে আলাদা হয়, উত্তরঔপনিবেশিক আমলে আবার স্হানিকতার চিন্তাতন্ত্রে ফিরে যাবার চেষ্টা করেছিল, তখন আন্দোলনকারীদের জীবনে, কার্যকলাপে ও পাঠবস্তুর আদল-আদরায় অনুরূপ ঝাঁকুনি, ছটফটানি ও সমসাময়িক নন্দনকাঠামো থেকে নিষ্কৃতির প্রয়াস দেখা গিয়েছিল । তা না হলে আর হাংরি আন্দোলনকারীরা সাহিত্য ছাড়াও রাজনীতি, ধর্ম, উদ্দেশ্য, স্বাধীনতা, দর্শনভাবনা, ছবিআঁকা, সংস্কৃতি ইত্যাদি বিষয়ে ইস্তাহার প্রকাশ করবেন কেন ?
দুই
হাংরি আন্দোলনের সময়কাল খুবই সংক্ষিপ্ত , ১৯৬১ থেকে ১৯৬৫ পর্যন্ত । ১৯৬৫কে কেন আন্দোলনের সমাপ্তি চিহ্ণিত করা হয় সে-করণে পরে আসছি। এই সংক্ষিপ্ত সময়কালে শতাধিক ছাপানো ও সাইক্লোস্টাইল-করা বুলেটিন প্রকাশ করা হয়েছিল, অধিকাংশ হ্যন্ডবিলের মতন ফালিকাগজে , কয়েকটা দেয়াল-পোস্টারে, তিনটি এক ফর্মার মাপে, এবং একটি ( যাতেউৎপলকুমার বসু-র পোপের সমাধি কবিতাটি ছিল ) প্রকাশ করা হয়েছিল কুষ্ঠি-ঠিকুজির মতন দীর্ঘ কাগজে । এই যে হ্যান্ডবিলের আকারে সাহিত্যকৃতি প্রকাশ , এরও পেছনে ছিল সময়কেন্দ্রিক ভাবধারাকে চ্যালেঞ্জের প্রকল্প । ইউরোপীয় সাহিত্যিকদের পাঠবস্তুতে তো বটেই , মাইকেল মধুসূদন দত্ত-র প্রজন্ম থেকে বাংলা সন্দর্ভে প্রবেশ করেছিল শিল্প-সাহিত্যের নশ্বরতা নিয়ে হাহাকার । পরে, কবিতা পত্রিকা সমগ্র, কৃত্তিবাস পত্রিকা সমগ্র, শতভিষা পত্রিকা সমগ্র , ইত্যাদি দুই শক্ত মলাটে প্রকাশের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা দেয়া হয়েছে সাম্রাজ্যবাদী ইউরোপের এই নন্দনতাত্বিক হাহাকারটিকে । পক্ষান্তরে, ফালিকাগজে প্রকাশিত রচনাগুলো দিলদরাজ বিলি করে দেয়া হতো , যে-প্রক্রিয়াটি হাংরি আন্দোলনকে দিয়েছিল প্রাকঔপনিবেশিক সনাতন ভারতীয় নশ্বরতাবোধের গর্ব।
আন্দোলনকে রূপ দেবার জন্যে আমরা পরিকল্পনা করেছিলুম যে সম্পাদনা ও বিতরণের কাজ দেবী রায় করবেন , নেতৃত্ব দেবেন শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সঙ্গঠিত করার কাজটি দেখবেন দাদা সমীর রায়চৌধুরী, আর ছাপা আর ছাপানোর ভার আমি নেব । প্রথম ইশতাহারটিতে আগের প্রজন্মের চারজন কবির নাম থাকায় শক্তি চট্টোপাধ্যায় ক্ষুন্ন হয়েছিলেন বলে ডিসেম্বরে শেষ প্যারা পরিবর্তন করে পুনঃপ্রকাশিত হয়েছিল । ১৯৬৩ সালের শেষ দিকে, সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধি পেলে, অংশগ্রহণকারীদের নামসহ এই ইশতাহারটি আরেকবার বেরোয় । ১৯৬২ সালের শেষাশেষি ও ১৯৬৩ সালের প্রথম দিকে সদস্য সংখ্যা বাড়তে থাকে । দাদার বন্ধু উৎপলকুমার বসু , বিনয় মজুমদার ওসন্দীপন চট্টোপাধ্যায় যোগ দেন । আমার বন্ধু সুবিমল বসাক , অনিল করঞ্জাই, করুণানিধান মুখোপাধ্যায়যোগ দেন । সুবিমল বসাকের বন্ধু ফালগুনী রায়, ত্রিদিব মিত্র ও আলো মিত্র যোগ দেন । আলো ছিলেন হাংরি আন্দোলনে একমাত্র মহিলা সদস্য। দেবী রায়ের বন্ধু প্রদীপ চৌধুরী, সুবো আচার্য, অরূপরতন বসু, বাসুদেব দাশগুপ্ত, সুভাষ ঘোষ, সতীন্দ্র ভৌমিক, হরনাথ ঘোষ, নীহার গুহ, শৈলেশ্বর ঘোষ, অশোক চট্টোপাধ্যায়, অমৃততনয় গুপ্ত, ভানু চট্টোপাধ্যায়, শঙ্কর সেন, যোগেশ পাণ্ডা, মনোহর দাশ যোগ দেন । তখনকার দিনে বামপন্থী ভাবধারার বুদ্ধিজীবীদের ওপর পুলিশ নজর রাখত । দেবী রায় লক্ষ করেননি যে পুলিশের দুজন ইনফর্মার -- পবিত্র বল্লভ ও সমীর বসু -- হাংরি আন্দোলনকারীদের যাবতীয় বইপত্র, পত্রিকা, বুলেটিন ইত্যাদি সংগ্রহ করে লালবাজার পুলিশের প্রেস সেকশানে জমা দিচ্ছে এবং সেখানে ঢাউস সব ফাইল খুলে ফেলা হয়েছে ।
এতজনের লেখালিখি থেকে সেই সময়কার প্রধান সাহিত্যিক সন্দর্ভের তুলনায় হাংরি আন্দোলন যে প্রতিসন্দর্ভ গড়ে তুলতে চাইছিল, সে রদবদল ছিল দার্শনিক এলাকার, বৈশাদৃশ্যটা ডিসকোর্সের, পালা বদলটা ডিসকার্সিভ প্র্যাকটিসের, বৈভিন্ন্যটা কথন-ভাঁড়ারের, পার্ধক্যটা উপলব্ধির স্তরায়নের , তফাতটা প্রস্বরের, তারতম্যটা কৃতি-উৎসের । তখনকার প্রধান মার্কেট-ফ্রেন্ডলি ডিসকোর্সটি ব্যবহৃত হতো কবিলেখকের ব্যক্তিগত তহবিল সমৃদ্ধির উদ্দেশ্যে । হাংরি আন্দোলনকারীঔরা সমৃদ্ধ করতে চাইলেন ভাষার তহবিল, অন্ত্যজ শব্দের তহবিল, শব্দার্থের তহবিল, নিম্নবর্গীয় বুলির তহবিল, সীমালঙ্ঘনের তহবিল, অধঃস্তরীয় বাক-বৈশিষ্টের তহবিল, স্পৃষ্টধ্বনির তহবিল, শব্দোদ্ভটতার তহবিল, প্রভাষার তহবিল, ভাষিক ভারসাম্যহিনতার তহবিল, রূপধ্বনির প্রকরণের তহবিল, বিপর্যাস সংবর্তনের তহবিল, স্বরন্যাসের তহবিল, পংক্তির গতিচাঞ্চল্যের তহবিল, সন্নিধির তহবিল, পরোক্ষ উক্তির তহবিল, পাঠবস্তুর অন্তঃস্ফোটক্রিয়ার তহবিল, বাক্যের অধোগঠনের তহবিল, খণ্ডবাক্যের তহবিল, তড়িত ব্যঞ্জনার তহবিল, অপস্বর-উপস্বরের তহবিল, সাংস্কৃতিক সন্নিহিতির তহবিল, বাক্য-নোঙরের তহবিল, শীৎকৃত ধ্বনির তহবিল, সংহিতাবদলের তহবিল, যুক্তিচ্ছেদের তহবিল, আপতিক ছবির তহবিল, সামঞ্জস্যবদলের তহবিল, কাইনেটিক রূপকল্পের তহবিল ইত্যাদি।
ইতোপূর্বে ইয়ংবেঙ্গলের সাংস্কৃতিক উথাল-পাথাল ঘটে থাকলেও, বাংলা শিল্প-সাহিত্যে আগাম ঘোষণা করে, ইশতাহার প্রকাশ করে, কোনো আন্দোলন হয়নি। সাহিত্য এবং ছবি আঁকাকে একই ভাবনা-ফ্রেমে আনার প্রয়াস, পারিবারিক স্তরে হয়ে থাকলেও, সংঘবদ্ধ গোষ্ঠীর মাধ্যমে হয়নি । ফলত দর্পণ, জনতা, জলসা ইত্যাদি পত্রিকায় আমাদের সম্পর্কে বানানো খবর পরিবেশিত হওয়া আরম্ভ হয়েছিল । হাংরি আন্দোলনের রাজনৈতিক ইশতাহার নিয়ে প্রধান সম্পাদকীয় বেরোলোযুগান্তর দৈনিকে । আমার আর দেবী রায়ের কার্টুন প্রকাশিত হল দি স্টেটসম্যান, জলসা ও আনন্দবাজার পত্রিকায় । হেডলাইন হল ব্লিৎস পত্রিকায় । সুবিমল বসাকের প্রভাবে হিন্দি ভাষায় রাজকমল চৌধুরী ও নেপালি ভাষায় পারিজাতহাংরি আন্দোলনের প্রসার ঘটালেন। আসামে ছড়িয়ে পড়লপাঁক ঘেঁটে পাতালে পত্রিকাগোষ্ঠীর সদস্যদের মাঝে । ছড়িয়ে পড়ল বগুড়ার বিপ্রতীক এবং ঢাকার স্বাক্ষর ও কন্ঠস্বর পত্রিকাগুলির সদস্যদের মাঝে, এবং মহারাষ্ট্রের অসো পত্রিকার সদস্যদের ভেতর । ঢাকার হাংরি আন্দোলনকারীরা, যাঁরা নিজেদের নাম দিয়েছিলেন স্যাড জেনারেশান, (বুলবুল খান মাহবুব, অশোক সৈয়দ, আসাদ চৌধুরী, শহিদুর রহমান, প্রশান্ত ঘোষাল, মুস্তফা আনোয়ার প্রমুখ ) জানতেন না যে আমি কেন প্রথম দিকের বুলেটিনগুলো ইংরেজিতে প্রকাশ করেছিলুম। ফলে তাঁরাও আন্দোলন আরম্ভ করেছিলেন ইংরেজিতে ইশতাহার প্রকাশের মাধ্যমে।
অনুশাসন-মুক্তির ফলে, লিটল ম্যাগাজিনের নামকরণের ক্ষেত্রে যে বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে এসেছিল হাংরি আন্দোলন, যে. তারপর থেকে পত্রিকার নাম রাখার ঐতিহ্য একেবারে বদলে গেল। কবিতা, ধ্রুপদী, কৃত্তিবাস, শতভিষা, উত্তরসূরী, অগ্রণী ইত্যাদি থেকে একশ আশি ডিগ্রি ঘুরে গিয়ে হাংরি আন্দোলনকারীরা তাঁদের পত্রিকার নাম রাখলেন জেব্রা, ফুঃ, উন্মার্গ, ওয়েস্টপেপার, কনসেনট্রেশান ক্যাম্প ইত্যাদি।বিংশ শতাব্দীর নয়ের দশকেও সমীর রায়চৌধুরী তাঁর পত্রিকার নাম রাখলেন হাওয়া৪৯ । অবশ্য সাহিত্য-শিল্পকে উন্মার্গ আখ্যাটি জীবনানন্দ দাশ বহু পূর্বে দিয়ে গিয়েছিলেন, যদিও হাংরি আন্দোলনের সময় পর্যন্ত তিনি তেমন প্রতিষ্ঠা পাননি। জেব্রা নামকরণটি ছিল পাঠকের জন্যে নিশ্চিন্তে রাস্তা পার হয়ে হাংরি পাঠবস্তুর দিকে এগিয়ে আসার আহ্বান । হাংরি আন্দোলন সংঘটিত হবার আগে পূর্ব-প্রজন্মের ওই পত্রিকাগুলোর নামকরণেই যে কেবল এলিটিজম ছিল তা নয়, সে-সব পত্রিকাগুলোর একটি সম্পাদকীয় বৈশিষ্ট্য ছিল । বনেদিয়ানার মূল্যবোধ প্রয়োগ করে একে-তাকে বাদ দেয়া বা ছাঁটাই করা, যে-কারণে নিম্নবর্ণের লেখকের পাঠবস্তু সেগুলোয় অনুপস্হিত, বিশেষ করে কবিতা । আসলে কোন-কোন রচনাকে টাইমলেস বলা হবে সে জ্ঞানটুকু ওই মূল্যবোধের ধারক-বাহকরা মনে করতেন তাঁদের কুক্ষিগত, কেননা সময় তো তাঁদের চোখে একরৈখিক, যার একেবারে আগায় আছেন কেবল তাঁরা নিজে। এখানে উল্লেখ্য, হাংরি আন্দোলনের আগে পর্যন্ত কাজি নজরুল ইসলাম ও জসীমুদ্দিনকেও 'অপর' করে রাখা হয়েছিল।


'টাইমলেস' কাজের উদ্বেগ থেকে পয়দা হয়ছিল 'আর্ট ফর আর্ট সেক' ভাবকল্পটি, যা উপনিবেশগুলোয় চারিয়ে দিয়ে মোক্ষম চাল দিয়েছিল সাম্রাজ্যবাদী ইউরোপ। এই ভাবক্লপটির দ্বারা কালো, বাদামি, হলদে চামড়ার মানুষদের বহুকাল পর্যন্ত এমন সন্মোহিত করে রেখেছিল সাম্রাজ্যবাদী নন্দনভাবনা যাতে সাহিত্য-শিল্প হয়ে যায় উদ্দেশ্যহীন ও সমাজমুক্ত, যাতে পাঠবস্তু হয়ে যায় বার্তাবর্জিত, যাতে সন্দর্ভের শাষক-বিরোধী অন্তর্ঘাতী ক্ষমতা লুপ্ত হয়, এবং তা হয়ে যায় জনসংযোগহীন । হাংরি বুলেটিন যেহেতু প্রকাশিত হতো হ্যান্ডবিলের মতন ফালিকাগজে, তা পরের দিনই সমাজ থেকে হারিয়ে যেত । নব্বইটির বেশি বুলেটিন চিরকালের জন্যে হারিয়ে গেছে । লিটল ম্যাগাজিন লাইব্রেরির পক্ষেও কয়েকটির বেশি বুলেটিন সংগ্রহ ও সংরক্ষণ সম্ভব হয়নি।
তিন
যে-কোনো আন্দোলনের জন্ম হয় কোনো না কোনো আধিপত্যপ্রণালীর বিরুদ্ধে । তা সে রাজনৈতিক আধিপত্য হোক বা সামাজিক, সাংস্কৃতিক, আর্থিক, নৈতিক, নান্দনিক, ধার্মিক, সাহিত্যিক, শৈল্পিক ইত্যাদি আধিপত্য হোক না কেন। আন্দোলন-বিশেষের উদ্দেশ্য, অভিমুখ, উচ্চাকাঙ্খা, গন্তব্য হল সেই প্রণালীবদ্ধতাকে ভেঙে ফেলে পরিসরটিকে মুক্ত করা । হাংরি আন্দোলন কাউকে বাদ দেবার প্রকল্প ছিল না, যদিও সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় অভিযোগ করেছিলেন যে তাঁকে না জানিয়ে তাঁকে বাদ দেবার জন্যেই এই আন্দোলন। তাঁর ধারণা ভুল ছিল। যে-কোনো কবি বা লেখক, ওই আন্দোলনের সময়ে যিনি নিজেকে হাংরি আন্দোলনকারী মনে করেছেন, তাঁর খুল্লমখুল্লা স্বাধীনতা ছিল হাংরি বুলেটিন বের করার । বুলেটিনগুলোর প্রকাশকদের নাম-ঠিকানা দেখলেই স্পষ্ট হবে ( অন্তত যে কয়টির খোঁজ মিলেছে তাদের ক্ষেত্রেও ) যে, তা ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বিভিন্নজন কতৃক ১৯৬৩-র শেষ দিক থেকে ১৯৬৪ এর প্রথম দিকে প্রকাশিত । ছাপার খরচ অবশ্য আমি বা দাদা যোগাতাম , কেননা, অধিকাংশ আন্দোলনকারীদের আর্থিক অবস্হা ভালো ছিল না । শক্তি চট্টোপাধ্যায়, বিনয় মজুমদার, উৎপলকুমার বসুও নিজের খরচে বুলেটিন প্রকাশ করেছিলেন। অর্থাৎ হাংরি বুলেটিন কারোর প্রায়ভেট প্রপার্টি ছিল না । এই বোধের মধ্যে ছিল পূর্বতন সন্দর্ভগুলোর মনোবীজে লুকিয়ে-থাকা সত্বাধিকার-বোধকে ভেঙে ফেলার প্রতর্ক । সাম্রাজ্যবাদী ইউরোপীয়রা আসার আগে বঙ্গদেশে পারসোনাল পজেশান ছিল, কিন্তুপ্রায়ভেট প্রপার্টি ছিল না । ইউরোপীয়রা বাঙালিকে প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিতে পেরেছিল, এবং তা করার পরই ব্যক্তিমানুষ প্রকৃতির মালিকানা দাবি করার যোগ্য মনে করা আরম্ভ করেন নিজেকে।


হাংরি আন্দোলনের কোনো হেডকোয়ার্টার, হাইকমাণ্ড, গভর্নিং কাউন্সিল বা সম্পাদকের দপতর ধরণের ক্ষঞতাকেন্দ্র ছিল না, যেমন ছিল কবিতা, ধ্রুপদী, কৃত্তিবাস ইত্যাদি পত্রিকার ক্ষেত্রে, যার সম্পদক বাড়ি বদল করলে পত্রিকার ক্ষমতাকেন্দ্র সেই বাড়িতে চলে যেত। হাংরি আন্দোলন কুক্ষিগত ক্ষমতাকেন্দ্রের ধারণাকে অতিক্রম করে প্রতিসন্দর্ভকে ফিরিয়ে দিতে চেয়েছিল প্রান্তবর্তী এলাকায় , যে কারণে কেবল বহির্বঙ্গের বাঙালি শিল্পী-সাহিত্যিক ছাড়াও তা হিন্দি, উর্দু, নেপালি, অসমীয়া মরাঙী ইত্যাদি ভাষায় ছাপ ফেলতে পেরেছিল । এখনও মাঝে-মথভে কিশোর-তরুণরা এখাক-সেখান থেকে নিজেদের হাংরি আন্দোলনকারী ঘোষণা করে গর্বিত হন, যখন কিনা আন্দোলনটি কয়েক দশক আগে, ১৯৬৫ সালে প্রকৃত-অর্থে ফুরিয়ে গেছে । ১৯৬৫ সালের মে মাসে ব্যাংকশাল কোর্টে দাঁড়িয়ে বেশ কয়েকজন অংশগ্রহনকারী আন্দোলনের বিরুদ্ধে মুচলেকা সই করে সম্বন্ধ ত্যাগ করেন এবং হাংরি আন্দোলন মকদ্দমায় রাজসাক্ষীরূপে কাঠগড়ায় অবতীর্ণ হন ।
১৯৬৩ সালের শেষ দিকে সুবিমল বসাকের আঁকা বেশ কিছু লাইন ড্রইং, যেগুলো ঘন-ঘন হাংরি বুলেটিনে প্রকাশিত হচ্ছিল, তার দরুণ তাঁকে পরপর দুবার কলেজ স্ট্রিট কফিহাউসের সামনে ঘিরে ধরেছিলেন অগ্রজ বিদ্বজ্জন এবং প্রহারে উদ্যত হলেন, এই অজুহাতে যে ওগুলো অশ্লীল । একই অজুহাতে কফিহাউসের দেয়ালে সাঁটা অনিল করঞ্জাইয়ের আঁকা পোস্টার আমরা যতবার লাগালুম ততবার ছিঁড়ে ফেলে দিলেন সাহিত্যিক-পুলিসগণ । বোঝা যাচ্ছিল যে কলোনিয়াল ইসথেটিক রেঝিমেরচাপ তখনও অপ্রতিরোধ্য । হাংরি আন্দোলনের ১৫ নং বুলেটিন এবং ৬৫ নং বুলেটিন, যথাক্রমে রাজনৈতিক ও ধর্ম সম্পর্কিত ইশতাহারের, যাকে বলা যায় স্নো বোলিং এফেক্ট, আরম্ভ হয়ে গিয়েছিল, এবং আমাদের অজ্ঞাতসারে ক্রুদ্ধ করে তুলছিল তদানীন্তন প্রশাসনের সংরক্ষণশীল কর্তাবাবাদের । আজকের ভারতবর্ষের দিকে তাকিয়ে ইশতাহার দুটিকে অলমোস্ট প্রফেটিক বলা যায় ।


১৯৬৩ সালের প্রথম দিকে হাংরি আন্দোলনকারীরা আরেকটি কাজ করলেন , যাকে এখন রাজনৈতিক সক্রিয়তা নামে চিহ্ণিত করলেও, সে-সময়ের সাহিত্যিকরা ক্রুদ্ধ হয়েছিলেন এবং বলেছিলেন যে সমাজের নোংরামি ঘাঁটা সাহিত্যিকদের কাজ নয় । যখন রাক্ষস জোকার মিকিমাউস দানভ দেবী-দেবতা জন্তু-জানোয়ার ইত্যাদির কাগুজে মুখোশে দয়া করে মুখোশ খুলে ফেলুন বার্তাটি ছাপিয়ে হাংরি আন্দোলনের পক্ষ থেকে মুখ্য ও অন্যান্য মন্ত্রীদের, মুখ্য ও অন্যান্য সচিবদের, জেলা শাসকদের, সংবাদপত্র মালিক ও সম্পাদকদের , বাণিজ্যিক লেখকদের পাঠানো হল, তখন সমাজের এলিট অধিপতিরা আসরে নামলেন । এ-ব্যাপারে কলকাঠি নাড়লেন একটি পত্রিকাগোষ্ঠীর মালিক ও তাঁর বশংবদরা, তাঁর বাংলা দৈনিকের বার্তা সম্পাদক , এবং সে-সময়ে মার্কিন গোয়েন্দা বিভাগের খোরপোষে প্রতিপালিত একটি ইংরেজি ত্রৈমাসিকের কর্তারা ( মার্কিন অর্থসাহায্য পায় জানাজানি হবার পর পত্রিকাটা বন্ধ হয়ে যায় ) ।
চার
১৯৬৪ সালের সেপ্টেম্বরে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ও সাহিত্যে অশ্লীলতার অভিযোগে গ্রেপ্তার হলুম আমি, প্রদীপ চৌধুরী, সুভাষ ঘোষ, শৈলেশ্বর ঘোষ এবং দাদা সমীর রায়চৌধুরী । এই অভিযোগে উৎপলকুমার বসু, সুবিমল বসাক, বাসুদেব দাশগুপ্ত, সুবো আচার্য এবং রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে ওয়ারেন্ট ইশ্যু হয়ে থাকলেও, তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়নি । রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ এই জন্যে চাপানো হয়েছিল যাতে বাড়ি থেকে থানায় এবং থানা থেকে আদালতে হাতে হাতকড়া পরিয়ে আর কোমরে দড়ি বেঁধে চোরডাকাতদের সঙ্গে সবায়ের সামনে দিয়ে রাস্তায় হাঁটিয়ে নিয়ে যাওয়া যায় । বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে আর কখনও এরকম ঘটনা ঘটেনি । অন্তর্ঘাতের অভিযোগটি সেপ্টেম্বর ১৯৬৪ থেকে ১৯৬৫ সালের মে মাস পর্যন্ত বজায় ছিল, এবং ওই নয় মাস যাবৎ রাষ্ট্রযন্ত্রটি তার বিভিন্ন বিভাগের মাধ্যমে হাংরি আন্দোলনকারীরূপে চিহ্ণিত প্রত্যেকের সম্পর্কে খুঁটিনাটি তথ্য সংগ্রহ করে ফেলেছিল, এবং তাদের তখন পর্যন্ত যাবতীয় লেখালিখি সংগ্রহ করে ঢাউস-ঢাউস ফাইল তৈরি করে ফেলেছিল, যেগুলো লালবাজারে পুলিশ কমিশনারের কনফারেন্স রুমের টেবিলে দেখেছিলুম, যখন কলকাতা পুলিশ, স্বরাষ্ট্র দপতর, কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা বিভাগ ও ভারতীয় সেনার উচ্চপদস্হ আধিকারিক এবং পশ্চিমবঙ্গের অ্যাডভোকেট জেনারালকে নিয়ে গঠিত একটি বোর্ড আমাকে আর দাদা সমীর রায়চৌধুরীকে কয়েক ঘন্টা জেরা করেছিল। কেবল আমাদের দুজনকেই এই বোর্ডের সামনে দাঁড় করানো হয়েছিল, কেননা শৈলেশ্বর ঘোষ, সুভাষ ঘোষ, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, পবিত্র বল্লভ ও সমীর বসু তাঁদের জেরায় জানিয়েছিলেন যে আমরা দুজনেই হাংরি আন্দোলনের দায়িত্বে আছি এবং তাঁদের এই আন্দোলনের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ নেই।


অভিযোগটি কোন সাংস্কৃতিক অধিপতির মস্তিষ্কপ্রসূত ছিল জানি না । তবে অ্যাডভোকেট জেনারাল মতামত দিলেন যে এরকম আজেবাজে তথ্যের ওপর ভিত্তি করে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভোযোগ দেখলে আদালত চটে যাবে । তখনকার দিনে টাডা-পোটা ধরণের আইন ছিল না; নকশাল আন্দোলনও ঘটেনি। ফলত রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তুলে নিয়ে ১৯৬৫ সালের মে মাসে বাদবাকি সবাইকে ছেড়ে দিয়ে কেবল আমার বিরুদ্ধে মামলা রুজু হল, এই অভিযোগে যে সাম্প্রতিকতম হাংরি বুলেটিনে প্রকাশিত আমার প্রচণ্ড বৈদ্যূতিক ছুতার কবিতাটি অশ্লীল । আমার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা সম্ভব হল শৈলেশ্বর ঘোষ ও সুভাষ ঘোষ আমার বিরুদ্ধে রাজসাক্ষী হয়ে গেলেন বলে । অর্থাৎ হাংরি আন্দোলন ফুরিয়ে গেল। ওনারা দুজনে হাংরি আন্দোলনের সঙ্গে সব সম্পর্ক ছিন্ন করে মুচলেকা দিয়েছিলেন।
হাংরি আন্দোলন ফুরিয়ে গিয়েছে সেই ষাটের দশকে । এখন শুরু হয়েছে তাকে নিয়ে ব্যবসা । সমীর চৌধুরী নামে আনন্দবাজার পত্রিকার এক কর্মী ( আমার দাদার নামের সঙ্গে মিলটা কাজে লাগিয়ে । 'হাংরি জেনারেশন রচনা সংকলন' নামে একটা বই বের করেছেন। তাতা অন্তর্ভুক্ত অধিকাংশ লেখককে আমি চিনি না ।এই সংকলনে আমার, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, বিনয় মজুমদার, উৎপলকুমার বসু, সমীর রায়চৌধুরী, দেবী রায়, সুবিমল বসাক, ত্রিদিব মিত্র, আলো মিত্র, রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় প্রমুখের রচনা নেই! সুবিমল বসাক, অনিল করঞ্জাই ও করুণানিধান মুখোপাথ্যায়-এর আঁকা ড্রইং নেই । একটাও ম্যানিফেস্টো নেই । বাজার নামক ব্যাপারটি একটি ভয়ঙ্কর সাংস্কৃতিক সন্দর্ভ ।
পাঁচ
সম্প্রতি তরুণ কবিদের একটি দল নিজেদের নিও হাংরি নাম দিয়ে প্রতিষ্ঠানবিরোধী আওয়াজ তুলেছে, তাদের কয়েকজনের কমিউনিটি পেজ আছে ফেসবুকে । কিন্তু প্রশ্ন হল, বর্তমান সময়ে প্রতিষ্ঠান যখন বেপরোয়া ও সন্ত্রাসকে নিয়ন্ত্রণ করে তখন তারা সত্যিই সফল হবে কি ? ফরাসি বিপ্লবের পর লিবার্টি, ইকুয়ালিটি, ফ্র্যাটারনিটি কেবল আওয়াজ হয়ে টিকে আছে । সোভিয়েত বিপ্লবের পর কমরেডরা যেভাবে নিজেদের আখের গুছিয়ে নিতে লাগলেন তা ভাঙা সোভিয়েতের দিকে তাকালে টের পাওয়া যায় । পশ্চিমবাংলায় আমরা বামপন্হীদের এনেছিলুম অনেক আশা করে, কিন্তু তারাও অধঃপতনের গহ্বরে তলিয়ে গেল । তাদের বদলে যাদের আমরা সিংহাসনে বসালুম, তারাও সেই একই গহ্বরে নেমে চলেছে । প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা কেবল লেখালিখিতেই সীমাবদ্ধ হয়ে রয়ে গেছে । তার ওপর গেরুয়া মতামত জোর করে চাপাবার খেলা আরম্ভ হয়েছে। কবি-লেখকরা দলবাজি, পুরস্কার পাবার লোভে তেল মারা, প্রতিবাদের নামে সরকারি মঞ্চে প্রদীপ জ্বালানো ইত্যাদিতে ব্যস্ত ।
সত্যি বলতে কি হাংরি আন্দোলনের মতো আর কোনো আন্দোলন সম্ভব নয় । তার কারণ সততার অভাব ।



Name:  Ankan Kazi          

IP Address : 012312.60.90012.13 (*)          Date:01 Jan 2019 -- 07:10 PM

অঙ্কন কাজী
রক্তাক্ত জখম : হাংরি আন্দোলনের বিতর্কিত উত্তরাধিকার

এই বছর ( ২০১৮ ) কলকাতার এক্সপেরিমেন্টার গ্যালারিতেশিল্পী সঞ্চয়ন ঘোষ ‘শ্রমের আপোষ’ নামে কার্মিক শ্রমের বিভিন্ন উপাদানকে একটি বৌদ্ধিক পরিকল্পনার মাধ্যমে উপস্‌আপন করে সম্ভাব্য ইউটোপিয়ার দৃষ্টিকল্পনা করেছিলেন ।
প্রদর্শনীর কেন্দ্রস্হলে ছিল চুন-বালি-জল দিয়ে গড়া একটি বিশাল চাতাল, ঠিক যেমন বীরভূমের ছাদ পেটাইকারীরা তৈরি করেন । তার চারিপাশে ছিল ছাদ পিটিয়েদের ছবি, একটি বাংলা সাহিত্য পত্রিকার প্রথম সংখ্যা এবং শ্রম আইন জার্নালের দুটি সংস্করণ । দেয়াল থেকে যে হেডফোনগুলো ঝুলে ছিল, সেগুলো কানে লাগিয়ে সেই দলিত রমণীদের গান শোনার ব্যবস্হা করা হয়েছিল । যাঁরা এই কাজে নিযুক্ত ছিলেন তাঁদের শ্রম -- যা মোটামুটি আশির দশকে শেষ হয়ে গেছে -- সেই গানগুলো পুরুষ কবিদের কবিতার ঐতিহ্যে প্রবেশ করেছে । চুন-বালির চাতালের ওপরে রাখা ছিল একটি ঝলমলে বোর্ড, যেন ‘২০০১: একটি মহাশূন্যের যাত্রা’, যার ওপর আলো দিয়ে লেখা ছিল মলয় রায়চৌধুরীর কবিতার এই লাইনগুলো :
চাঁদোয়ায় আগুন লাগিয়ে
তার নীচে শুয়ে আকাশের উড়ন্ত নীল দেখছি এখন
দুঃখ কষ্টের শুনানী মুলতুবি রেখে
আমি আমার সমস্ত সন্দেহকে জেরা করে নিচ্ছি
এই নগ্ন দৃষ্টিকল্পনা, এমনই এক সম্ভাব্য ভবিষ্যতের, যা অবিরাম পিছু হটে চলেছে, এবং একটি অবরোধী আধুনিক বিষয়বস্তুর সৃষ্টিশীল বিনির্মাণের ওপর নির্ভর করে আছে, যা হাংরি আন্দোলনের ক্রুদ্ধ আকাঙ্খাপূর্তিকে বুঝতে পারার জন্য অঙ্গাঙ্গীভাবে জরুরি । হাংরি আন্দোলন ছিল সাহিত্যের আন্দোলন, যা ষাটের দশকের পশ্চিমবাংলার সাংস্কৃতিক কল্পনায় ছেয়ে গিয়েছিল ।
সমীর রায়চৌধুরী, শক্তি চট্টোপাধ্যায় এবং দেবী রায়ের সঙ্গে মলয় রায়চৌধুরী ছিলেন “হাংরি আন্দোলনের” প্রতিষ্ঠাতা, যাঁরা হামেশাই পশ্চিমবাংলার সাহিত্যিক এবং আইনি প্রাতিষ্ঠানিকতার বিরুদ্ধে নিজেদের অবস্হানকে স্পষ্ট করে তুলেছিল, এবং সেই প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা শেষাবধি জোটবদ্ধ হয়ে আন্দোলনের সদস্যদের বিরুদ্ধে মামলা করেছে এবং অভিযুক্ত করেছে, ফলে শেষ পর্যন্ত দলটিকে ভেঙে ফেলতে সফল হয়েছে । তা সত্বেও এদের প্রভাব বাংলা সাহিত্যে, এমনকি হিন্দি সাহিত্যেও ছড়িয়ে পড়তে পেরেছিল । হাংরি সাহিত্য আন্দোলনকে প্রায়ই আণ্ডারগ্রাউণ্ড সাহিত্যিক সংস্কৃতির উদাহরণ হিসাবে তুলে ধরা হয় -- মূলত ‘লিটল ম্যাগাজিনের’ সমর্পিত বিকল্প পাঠকদের কাছে -- দেশজ ভাষায় একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ সাহিত্য-ভাণ্ডাররূপে ।
হাংরি আন্দোলনকারীরা তাঁদের রচনাবলীকে একাধিক ইশতাহার ও সাহিত্য পত্রিকার মাধ্যমে জনগণের কাছে পৌছে দিতেন । আত্মসন্দেহ এবং আশা একযোগে উপস্হিত আছে হাংরি আন্দোলনকারীদের রচনায়, যখন কিনা তাঁরা কোনোরকম সমঝোতা সহ্য করতেন না । আধুনিকতাবাদী জীবনানন্দ দাশ ও বুদ্ধদেব বসুর সাফাইকরা প্রতিদিনকার অভিজ্ঞতার পরিবর্তে, তাঁরা এনেছিলেন সমাজের সীমালঙ্ঘন -- অস্বাভাবিক যৌনতাচর্চা, অতিরিক্ত মদ্যপান, এবং মাদকসেবন, মেলাবার প্রয়াস করেছিলেন হিন্দু ধর্মের আচার-আচরণের সঙ্গে যৌনতার নিষিদ্ধতাকে --- যা প্রায়শই সাহিত্যিক অভিব্যক্তি হিসাবে তুলে ধরতেন তাঁরা। ক্রোধের যাথার্থকে বাগ্মীতার মাধ্যমে প্রকাশ করে তাঁরা বিশ্বাসযোগ্যতা নির্মাণ করতে পেরেছিলেন ।
, ‘কবিতা হল মানুষের নার্সিসিস্টিক চালিকাশক্তির কর্মক্রিয়া’, নভেম্বর ১৯৬১ সালে প্রকাশিত প্রথম ইশতাহারে বলেছিলেন হাংরি আন্দোলনকারীরা । ‘স্বাভাবিকভাবে, আমরা আধুনিকতার ফাঁকাফোকর হিসাবে কবিতাকে, যা কিনা কমার্শিয়াল পত্রিকার ডারলিঙ, যেখানে কবিতা অরগ্যাজমের স্বতঃস্ফূর্তিতে পুনর্জাগরিত হয় না, এবং প্রকৃতপক্ষে যা হয় তা হল নকল কাদাঘুর্ণিতে পাক-খাওয়া, অর্ধশিক্ষিত বুড়ো-খোকাদের ছন্দের গদ্য, তাতে কেউই সেই আর্তচিৎকার খুঁজে পাবে না, যেমনভাবে একটি অপ্রাণ থেকে প্রাণের সৃষ্টি হয়, মানুষ প্রয়াস করে কর্মতেজ হয়ে ওঠার।’
যে পাঁচ বছর হাংরিদের সাহিত্য আন্দোলন সক্রিয় ছিল, তাঁরা শতাধিক বুলেটিন প্রকাশ করেছিলেন। চল্লিশজনের বেশি কবি-লেখক ও শিল্পীদের সদস্য হিসাবে পেয়েছিল হাংরি আন্দোলন, যাঁরা নতুন নতুন পত্র-পত্রিকা প্রকাশ করতেন । কিন্তু ১৯৬৪ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকার এগারোজনের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ও অশ্লীলতার অভিযোগে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রুজু করে । বহু পুরোনো সদস্য, শক্তি চট্টোপাধ্যায়সহ, হাংরি আন্দোলনের বিরুদ্ধতা করার জন্য এগিয়ে যান, এবং মলয় রায়চৌধুরীর বিরুদ্ধে অশ্লীলতার মামলায় সাক্ষ্য দিলেন । ফলে আন্দোলন ক্রমশ প্রাণশক্তি হারিয়ে ফ্যালে ।
পরবর্তীকালে হাংরি আন্দোলনকে পুনরায় প্রতিষ্ঠিত করার বহু প্রয়াস করা হয়েছে । সেই সমস্ত আয়োজন মূলত মলয় রায়চৌধুরী এবং শিল্পী অনিল করঞ্জাই-এর অবদানকে ঘিরে বিভিন্ন সভাসমিতিতে এবং বিদ্যায়তনিক চর্চায় সীমাবদ্ধ থেকেছে । অনিল করঞ্জাইয়ের স্বপ্নের মতন যৌনতার ল্যাণ্ডস্কেপ ছিল হাংরি আন্দোলনের ঐতিহ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান ।
বাংলা পপুলার সংস্কৃতিতে, হাংরি-চরিত্র হিসাবে সৃজিৎ মুখার্জির ২০১১ সালের ‘বাইশে শ্রাবণ’ ফিল্মে সিনেমার আর্টহাউস পরিচালক গৌতম ঘোষকে অভিনয় করতে দেখা গেছে, কলকাতার প্রান্তবাসী একজন অসন্তুষ্ট, সীমালঙ্ঘনকারী হাংরি কবি হিসাবে । ২০১৫ সালে প্রণবকুমার চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত ‘হাংরি সাহিত্য আন্দোলন : তত্ব, তথ্য, ইতিহাস’ -- আন্দোলনকারী ও তাঁদের সমালোচকদের বক্তব্য একত্রিত করে -- গ্রন্হটির দ্বারা হাংরি আন্দোলনকে বিদ্যায়তনিক স্তরে প্রাণশক্তি দেবার প্রয়াস করা হয়েছে । বইটি হাংরি সাহিত্যের মূল্যবোধের মানদণ্ড ও ইতিহাসের প্রেক্ষিতে আন্দোলনের অবস্হান নির্ণয় করার চেষ্টা করেছে ।
সঞ্চয়ন ঘোষের শিল্পকর্মের মতনই, উপরোক্ত দুটি কর্ম-পরিকল্পনাই হাংরি আন্দোলনের প্রতি সহৃদয়, কিন্তু তাঁদের পুনরায় জাগিয়ে তোলার কর্ম-পরিকল্পনায় হাংরি আন্দোলনের অন্তর্গত বহুবিধ টেনশনের সহজ-সমাধা হয়নি। এই কর্ম-পরিকল্পনাগুলোকে বিশ্লেষণ করলে আমরা আন্দোলনটিকে জাগিয়ে তোলার উদ্দেশে তাঁদের রাজনীতিকে বুঝতে পারব ।
বীরভূমের দলিত নারীদের সঙ্গীতকে সঞ্চয়ন ঘোষ যেভাবে প্রয়োগ করেছেন, তা তাঁর শিল্পকর্মের মাধ্যমে সমস্যা ও সমাধান দুইই তুলে ধরেছে : টেক্সট ও আইডিয়ার গভীর লিঙ্গবাদী দৃষ্টিভঙ্গী, যা হাংরি আন্দোলনের মুক্তিপ্রসঙ্গের কেন্দ্রবিন্দু ছিল অথচ যা প্রায়ই বাধাবন্ধনহীন নারীদ্বেষেকে প্রকট করে তুলতো । হাংরি আন্দোলনকারীদের দৃষ্টিতে পৌরুষ ছিল যেন একটি বিপন্ন বৌদ্ধিক ও বস্তুগত আহরণসূত্র । ‘বাইশে শ্রাবণ’ ফিল্মে খলনায়কের পৌরুষ দ্বিধা-খণ্ডিত -- সে একজন প্রাক্তন পুলিশ অফিসার, যার ভূমিকায় অভিনয় করেছেন প্রসেনজিৎ চ্যাটার্জি --- এবং নিবারণ নামে উচ্চাকাঙ্খী হাংরি আন্দোলনকারী কবির ভূমিকায় পুলিশ-অফিসারটির গড়ে তোলা ছায়ামানুষ হিসাবে গৌতম ঘোষ, যে কিনা সিরিয়াল কিলারও হতে পারে । এই দুই চরিত্রের মাঝে ফেঁসে গেছে একজন যুবক, যাকে সমীহ করা যায়, পরমব্রত চ্যাটার্জি, পাকড়াশী নামে একজন পুলিশ অফিসারের ভূমিকায়, যে নৃশংস খুনগুলোর সমাধান করতে অসফল, সেই সব খুনের শিকার হল ভিখারি আর যৌনকর্মীদের মতন সমাজের প্রান্তবাসীরা ।
পাকড়াশীকে একদল পুলিশ অফিসারের হুমকির সামনে পড়তে হয়, যারা বিশ্বাস করতে পারেনি যে তার মতন সাদাসিধা একজন যুবক পুলিশ অফিসারের কাজ করতে পারবে । সে ক্রুদ্ধ হয়ে অ্যাকশান-হিরো ধাঁচের পুলিশ অফিসারের ধরাবাঁধা চরিত্রকে চ্যালেঞ্জ করে, আর মনে মনে ভাবে যে তাহলে কি মাংসের দোকানের কসাইয়ের মতন হলে লোকে তাকে সিরিয়াসলি নিতো ! পাকড়াশীর মতন এক সুবোধ ভদ্রলোকের বিপরীতে পুলিশ বিভাগে প্রবীরের উপস্হিতি অনেকটা ভতুড়ে । থার্ড ডিগ্রি প্রয়োগ করার আধিক্যের কারণে প্রবীরকে অবসর নিতে বাধ্য করা হয়েছিল, পরে তাকে ফিরিয়ে আনা হয় যাতে পাকড়াশীর বইপড়া বিদ্যার সহায়ক হবার জন্য সে তার নিয়মনীতি বর্জিত, অনেক সময়ে বেআইনি, ট্যাকটিকস প্রয়োগ করতে পারে ।
একজন বয়স্ক এবং আরেকজন উদীয়মান যুবকের দুরকম আঙ্গিকের অস্বচ্ছন্দ পৌরুষের যৌথতার বিরুদ্ধে নিবারণ নামের কবিকে উপস্হাপন করা হয়েছে, যাঁর রচনা প্রকাশিত হয়নি, যিনি বিকৃতকাম চিত্রকল্পে মেতে ওঠেন এবং প্রায়ই হাংরি আন্দোনকারীদের মামলার উল্লেখ করেন । প্রবীর থাকে একটি পুরোনো ভাঙাচোরা প্রাসাদে, যখন কিনা নিবারণ অত্যন্ত গরিব এবং অর্ধোন্মাদ, কেননা তাকে রবীন্দ্রনাথ নামের একজন ছায়াবৎ লোক কবি হিসাবে স্বীকৃতি ও খ্যাতির নিষ্ঠুর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে । রহস্যকাহিনি যেমন যেমন তার বিষণ্ণ বাঁকবদল দিয়ে এগোয়, পৌরুষের অন্তর্দ্বন্দ্ব অধিকতর গুরুত্ব পেতে থাকে । প্রবীরের যুক্তিহীন সহিংস পৌরুষকে উপস্হাপন করা হয়েছে বাঙালি পুরুষমানুষের উথাল-পাথাল মনঃস্হিতিকে বোঝার জন্য । প্রথম বাঁকবদলে দেখানো হয় প্রবীরের ক্ষমতার দেখনদারি । সমাজের শরীরে সীমাভঙ্গকারী কবিতার বিপদ সম্পর্কিত বাঁধাধরা ধারণাকে সে স্রেফ নিজের কাজে ব্যবহার করে । ফিল্মের শেষ দিকে তার মৃত্যুকে ট্র্যাজিক ঘটনা হিসাবে দেখানো হয়েছে -- যা পলিটিকালি ইনকারেক্ট, বলতে চেয়েছে ফিল্মটি, সে বেঁচে থাকুক আর নিজেকে বিজয়ী মনে করুক, কেননা বেঁচে থাকলে মনে হতো যে সে জিতে গেছে, কিন্তু তার সন্দেহজনক আত্মবলিদান আসলে স্ট্যাটাস কুয়োকে জিইয়ে রাখার জন্য শোক করার ব্যাপার নয় ।
ইত্যবসরে হাংরি আন্দোলনকে নিজের ব্যবস্হা নিজে করে নিতে বলা হয়েছে, তার উত্তরাধিকারকে এমনই এক ইনোসেন্ট প্রজন্মের ভুল ব্যাখ্যার জন্য মাঝপথে ছেড়ে দেয়া হয়েছে, যারা তাদের সামাজিক সীমালঙ্ঘনের রাজনৈতিক দৃষ্টিপ্রতিভা দ্বারা বদল আনতে অপারগ, অথবা দায় নেবার দায় তাদের নেই।
সৃজিৎ মুখার্জির ফিল্মের তুলনায় প্রণবকুমার চট্টোপাধ্যায়ের সংকলনগ্রন্হটি হাংরি আন্দোলনের ইতিহাসকে আরও জটিল করে তোলে । হাংরি আন্দোলনকারীদের স্বয়ম্ভু বিপ্লবী হিসাবে তুলে ধরার পরিবর্তে, বইটির ঐতিহাসিক প্রবন্ধগুলো হাংরিদের অবস্হানকে তুলনা করতে চেয়েছে পুরোনো অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং সাহিত্যিক প্রাতিষ্ঠানিকতার সঙ্গে । সমীর রায়চৌধুরী -- মলয়ের দাদা-- তাঁর প্রবন্ধ আরম্ভ করেছেন জওহরলাল নেহেরুর দুই পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার সংক্ষিপ্ত ইতিহাসের মাধ্যমে । দ্বিতীয় পরিকল্পনা, যেটি শিল্পোদ্যোগকে গুরুত্ব দিয়েছিল, তার ফলে মফসসলের আঞ্চলিক প্রান্তে গড়ে উঠেছিল ইস্পাতের কারখানাগুলো । তা ছিল সংস্কৃতি ও সামাজিক দিক থেকে জনগণের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ, কেননা শ্রমিকরা বেশ বড়ো আকারে স্হানান্তরিত হয়েছিল ।
পাটনা, যে শহরে রায়চৌধুরী ভাইরা বড়ো হয়েছিলেন এবং হাংরি আন্দোলন আরম্ভ করেছিলেন সেই ধরনের জায়গাগুলোর প্রধান গুরুত্ব --- মুঙ্গের, ডালটনগঞ্জ, ধানবাদ, পুর্নিয়া, চাইবাসা, এমনকি বহু দূরের বেনারস ও ত্রিপুরাকে আলোয় আনা হয়েছে । হাংরি আন্দোলনকারীরা অনায়াসে স্হানীয় বুলি, সাহিত্যিক প্রতিনিধিত্ব, স্হানীয় কৌম এবং সেই পরিসরগুলোর রাজনৈতিক ইতিহাসকে এনেছেন তাঁদের টেক্সটে, আর পাশাপাশি এই ঘিঞ্জি অঞ্চলগুলোর কাঙালি বাঙালি জীবনের একক অভিজ্ঞতাকে লেখায় নিয়ে আসার প্রয়াস করেছেন । সমীর বলেছেন শ্রমিকশ্রেণির পাড়ায় শৈশবের কথা, শ্রেণিভেদের শিকার হবার কথা, প্রতিষ্ঠিত সাহিত্যিকদের দ্বারা এবং বিদ্যায়তনিক সংস্হাগুলোর দ্বারা পরিত্যক্ত হবার কথা ।
ব্যাপারটা দুর্ভাগ্যজনক, যে, তিনি ওই অবদমনকে চ্যালেঞ্জ করার প্রয়োজন অনুভব করছেন এবং দাবি করছেন যে ওই নাকউঁচু বর্গের চেয়ে তিনি রবীন্দ্রনাথ ও রামচরিতমানস সম্পর্কে অধিক জ্ঞান রাখেন । তাঁর দাবিটা মনে হবে হাস্যকর যদি সতীনাথ ভাদুড়ীর বিখ্যাত উপন্যাস ঢোঁড়াই চরিত মানস-এর সঙ্গে তুলনা করে হয়, যে উপন্যাসটি তুলসীদাসের মহাকাব্যটির অন্তর্ঘাতী পুনর্লিখন, যার পৃষ্ঠভূমি ছিল বিহারের অবদমিত তাঁতি জাতের মানুষেরা । একই ধরণের স্হানিক প্রভাব পাওয়া যাবে হিন্দি লেখক ফণীশ্বরনাথ রেণু এবং রামধারী সিহ দিনকর-এ । হাংরি আন্দোলনকারীদের ক্ষেত্রে, যাঁরা প্রায় সকলেই এসেছিলেন প্রভাবশালী বর্ণ থেকে, নিম্নবর্গকে নিয়ে নিরীক্ষা অথবা পুনর্গঠন গুরুত্বপূর্ণ হলেও, সমাধানহীন রয়ে গেছে ।
সমীর যখন বিদ্যায়তনিক স্তরে স্বীকৃতির কথা বলেন, তখন একটি নামই উল্লেখ করতে পারেন, এবং তা হল দীপ্তি ত্রিপাঠীর, যিনি হাংরি আন্দোলনকারীদের লেখায় যুক্তিকাঠামোর অভাব এবং শব্দবাহুল্যের প্রতি ঝোঁকের কথা বলেছিলেন । সমীর এই সমালোচনাকে, যদিও বেশ আশ্চর্যের, তাঁর লেখায় যৌনতার প্রতি ঔচিত্যবাদী প্রতিক্রিয়া হিসাবে মনে করেছিলেন । সমীর আনন্দের সঙ্গে স্বীকার করেছিলেন যে ন্যারেটিভের একরৈখিকতাকে পরোয়া করেন না এবং প্লটের মারপ্যাঁচকে মনে করেন কৃত্রিম ।
হাংরি আন্দোলনের আদর্শগত উদ্দেশ্যের সংক্ষিপ্ত সজ্ঞা নিরুপণে সমীর রায়চৌধুরী এবং প্রণবকুমার চট্টোপাধ্যায় উভয়েই তাঁদের বক্তব্যে অস্পষ্ট রয়ে গেছেন । তার মানে হাংরি আন্দোলনকারীদের রচনাবলীকে তাঁদের আধুনিকতাবাদী আচরণ থেকে পৃথক করতে তাঁরা অসমর্থ, যেমন জুতোর বাক্স রিভিউ করার জন্য পাঠানো, কাগজের মুখোশ পাঠিয়ে মুখোশ খুলে ফেলতে বলা ইত্যাদি । তাঁরা প্রতিষ্ঠানবিরোধী কৃত্তিবাস গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্কের প্রবাহকেও গুরুত্ব দিয়েছেন । কৃত্তিবাস ছিল মহানগরীয় এবং আধুনিকতাবাদী নান্দনিকতার সাহিত্য পত্রিকা । সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় সম্পাদিত কৃত্তিবাস পত্রিকাটি ষাটের দশকে নড়বড়ে হয়ে গেলেও পরবর্তীকালে বাঙালি মধ্যবিত্তের কাছে তা হয়ে ওঠে সমীহ করার মতো একটি সাংস্কৃতিক বস্তু ।
র‌্যাডিকাল আধুনিকতার হস্তক্ষেপের বিপ্রতীপে সাহিত্যিক অবস্হানের বিপদহীন আশ্রয়ে প্রণবকুমার চট্টোপাধ্যায়ের সংকলন আলো ফেলেছে প্রান্তিক এলাকার গুরুত্বে, যা আমরা দেখতে পাই স্হানিক ক্ষমতা সংঘর্ষের দ্বারা সজ্ঞায়িত একরূপতার দাবিতে --- বাঙালিদের জন্য পশ্চিমবাংলা, ওড়িয়াদের জন্য ওড়িষা, বিহারিদের জন্য হিন্দি বা মৈথিলি --- যখন কিনা বিশাল একটা শ্রমিক জনসমূদায়কে উপেক্ষা করা হয়েছে যারা রাজ্যের সীমা অতিক্রম করে জীবনযাপনের জন্য অন্যত্র চলে গেছে । হাংরি আন্দোলনকারীরা পাঠকদের পাঠাভ্যাস পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ জানালেন তাঁদের নিজস্ব ভাষার মাধ্যমে ।
ব্যাপারটা সঞ্চয়ন ঘোষের ইনস্টলেশনে স্বরলিপির মিশ্রণ ঘটিয়ে যে গান শোনানো হচ্ছে তার ক্ষেত্রেও সত্য । বাউড়ি গায়িকারা যে বুলিতে গান গাইতেন তা শুদ্ধ সাহিত্যিক বাংলা ভাষা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ছিল । এমন এক ঐতিহ্য যেখানে প্রভাবশালী জাতের পুরুষদের রুচি প্রতিষ্ঠিত ভাষা এবং গ্রহণযোগ্য প্রতিষ্ঠানবিরোধী ডিসকোর্স নির্ণয় করে, তাতে যদি না খাপ খায় তাহলে আচরণ-অভ্যাসগুলো লোপাট হয়ে যায় । সঞ্চয়ন ঘোষের ইন্সটলেশান লিঙ্গবাদী রাজনীতির সঙ্গে সমঝোতায় আসতে চেয়েছে, বুঝতে চেষ্টা করেছে যে বাঙালির সংস্কৃতিতে শ্রমসাহিত্য গভীরভাবে কেন লিঙ্গবাদী ।
এই ধরনের মিশ্রণ, সাহিত্যিক সংঘর্ষ থেকে অশুদ্ধতা গড়ে তোলা, মলয় রায়চৌধুরীর বিখ্যাত কবিতা ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’-এর তুচ্ছ যৌনচিত্রময় লাইনগুলোর চেয়ে বেশি সামাজিক ও সাহিত্যিক আঘাত করতে পারে :
তোমার ঋতুস্রাবে ধুয়ে যেতে দাও আমার পাপতাড়িত কঙ্কাল
আমাকে তোমাত গর্ভে আমারি শুক্র থেকে জন্ম নিতে দাও
আমার বাবা-মা অন্য হলেই কি আমি এরকম হতুম ?

ঋণস্বীকার : দি ক্যারাভান পত্রিকা, ১ অক্টোবর, ২০১৮



Name:  Abul Qaiyum          

IP Address : 012312.60.90012.13 (*)          Date:01 Jan 2019 -- 07:13 PM

মলয় রায়চৌধুরীর ”স্বনির্বাচিত” : হাংরিয়ালিস্ট তথা অধুনান্তিক বাঙলা-সাহিত‌্যের বাইবেল
আবুল কাইয়ুম


অধুনান্তিক সাহিত‌্যের প্রকাশক ভিন্নচোখ প্রকাশনী ২০১৮ সালে বের করেছে পশ্চিম বাংলার হাংরি আন্দোলনের পুরোধা ও কিংবদন্তীসম আভাঁ-গার্দ লেখক মলয় রায়চৌধুরীর গ্রন্থ “স্বনির্বাচিত”। বাংলাদেশে এই প্রথম একক গ্রন্থাকারে মলয় রায়চৌধুরীর কবিতা, কাব‌্যনাটক, অনুবাদ, প্রবন্ধ, গল্প, উপন‌্যাস ও আত্মজীবনী সংকলিত হলো। উল্লেখ‌্য, গত শতকের ষাটের দশকের প্রথমার্ধে তাঁর হাংরি আন্দোলন ভারতে ও পাশ্চাত‌্যে ব‌্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করলেও, সে সম্পর্কে সমর্থক-অসমর্থক অতি অল্পসংখ‌্যক লেখকের বাইরে এ-দেশের ( বর্তমান বাংলাদেশ ) সাধারণ পাঠক পরিচিত ছিল না। এর আদি কারণ, ভারতের পাটনা ও কোলকাতার সাহিত‌্য-ভুবন যখন প্রথা ও প্রতিষ্ঠানবিরোধী হাংরি আন্দোলনে জবথবু, তখন এই বাংলার ওপর একদিকে চলছিল দ্বিজাতি-তত্ত্বের খোলসে পাকিস্তানি সংরক্ষণবাদী দুঃশাসন এবং অন‌্যদিকে, এখানকার সাহিত‌্যবলয়ে প্রথা-প্রতিষ্ঠানের দাপট। স্বভাবতই, ভারত-বিদ্বেষী এই আয়রন কার্টেনের ভেতরে হাংরির মতো বৈপ্লবিক সাহিত‌্য-চেতনার প্রভাব পড়েনি বা পড়তে দেওয়া হয়নি। ফলত, এটা অবাক করার মতো কিছু ছিল না, যখন সত্তর দশকের মাঝামাঝি সময়ে কোলকাতায় অন্নদাশঙ্কর রায়ের বাসায় রফিক হায়দার নামে একজন বাংলাদেশি কবি মলয় রায়চৌধুরীকে জানালেন যে, তিনি কখনও হাংরি আন্দোলনের কথাই শোনেননি। এ প্রসঙ্গে মলয়বাবু তাঁর গ্রন্থটির “আত্ম-জীবনী” অংশে রসিকতা করে লিখেছেন, “ সম্ভবত তখন কলকাতা থেকে আন্দেোলন চলে গেছে উত্তরবঙ্গে আর ত্রিপুরায়”।

স্বাধীনতা-পরবর্তী কালে ভারতের সাথে বাংলাদেশের যোগাযোগের পথ খুলে গেলে এবং এ-দেশে পশ্চিম বাংলার সমকালীন সাহিত্য প্রবেশাধিকার পেলে মলয় রায়চৌধুরী ও তাঁর হাংরি সম্পর্কে অবশ‌্য আরো কিছুসংখ‌্যক লেখক-পাঠকের জানা-বোঝার সুযোগ সৃষ্টি হয়। এ বিষয়ে অনুসন্ধিৎসুদের তৃষ্ণা নিবৃত করেছিল “মীজানুর রহমানের ত্রৈমাসিক পত্রিকা”— আশির দশকের মধ‌্য ভাগে, মলয়রায়চৌধুরীর “হাংরি কিংবদন্তী” ধারাবাহিকভাবে প্রকাশের মাধ‌্যমে। মলয়বাবুর আত্ম-জীবনী থেকে জানা যায়, মীজান সাহেব সেই লেখাগুলো এ-বাংলায় গ্রন্থাকারে প্রকাশের উদ‌্যোগ নিলে তা বন্ধ করার জন‌্য কলকাত্তাই এস্টাবলিসমেন্ট-এর চাঁই সুনীল গং তাঁদের এ-দেশীয় সুহৃদ কবি শামসুর রাহমানকে ব‌্যবহার করেন। এই পরিস্থিতিতে মীজান সাহেব তাঁর ইচ্ছের কবর দিয়ে ঢাকা থেকে প্রকাশ করলেন মলয়বাবুর উপন‌্যাস “নামগন্ধ”। তাই মলয়বাবু লিখেছেন, “ আমাকে নিয়ে সাংস্কৃতিক রাজনীতি কেবল পশ্চিম বাংলাতেই নয়, তা বাংলাদেশ পর্যন্ত ছড়িয়ে গেছে”।

এ-দেশে হাংরি আন্দোলনের ভাবাদর্শসমৃদ্ধ লেখাগুলো গ্রন্থাকারে প্রকাশ করে যেতে পারেননি সম্পাদক মীজানুর রহমান। তিনি আজ প্রয়াত। তিনি যা পারেননি, সেটাই প্রায় তিন দশক পর আজ এ-দেশের পাঠকের কাছে উপহার দিলেন একালের এস্টাবলিশমেন্ট-বিরোধী লেখক-প্রকাশক ও ভিন্নচোখের স্বত্বাধিকারী আলী আফজাল খান। বিভিন্ন সময়ে লেখা এ-সব রচনা মলয়বাবুর হাংরিয়ালিস্ট, জাদুবাস্তব তথা অধুনান্তিক চিন্তা-চেতনার ফসল। গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত কবিতা, কাব‌্যনাটক, গল্প ও উপন‌্যাস বিষয়ের অভিনবত্ব ও ভাষার ব‌্যতিক্রমিতা নিয়ে অনবদ‌্য সৃষ্টি। কিন্তু তাঁর দীর্ঘ রচনা ”আত্মজীবনী” থেকেই এই প্রতিষ্ঠান-বিরোধী লেখকের বেড়ে-ওঠা, হাংরি আন্দোলনের সূচনা ও বিস্তার, এর প্রভাব, বিশ্বখ‌্যাতি এবং প্রতিষ্ঠানপন্থী লেখকদের বিরুদ্ধ-ভূমিকা সম্পর্কে বিস্তারিতভাবে জানা যাবে।

বাঙলা সাহিত‌্যের ইতিহাসে হাংরি-ই একমাত্র আন্দোলন, যা প্রথা, প্রচলিত ধ‌্যান-ধারণা, প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থের আবর্তে ঘুরপাক-খাওয়া সাহিত‌্য ও সনাতন অনুশাসনের মর্মমূলে আঘাত হেনে সাহিত‌্যের এক নতুন ধারা প্রবর্তনে সমর্থ হয়েছিল। মলয় রায়চৌধুরী তাঁর বড় ভাই সমীর রায়চৌধুরী, শক্তি চট্টোপাধ‌্যায়, দেবী রায় প্রমুখকে নিয়ে পাটনা থেকে প্রথম হাংরি বুলেটিন প্রকাশের মাধ‌্যমে ১৯৬১ সালে এই আন্দোলন সূচনা করেন, যা অচিরেই কোলকাতা সহ সমগ্র পশ্চিমবাংলায় বিস্ত‍ৃত হয়। সন্দীপন চট্টোপাধ‌্যায়, বিনয় মজুমদার, সুবিমল বসাক, উৎপলকুমার বসু, ফালগুনী রায়, আলো মিত্র, ত্রিদিব মিত্র, বাসুদেব দাশগুপ্ত, প্রদীপ চৌধুরী, সুবো আচার্য, রবীন্দ্র গুহ ও অনিল করঞ্জাই সহ প্রায় অর্ধশত তরুণ কবি, সাহিত‌্যিক ও শিল্পী-ও হাংরি আন্দোলনে অংশ নেন। ১০৮টি বুলেটিন প্রকাশ করে তাঁরা একদিকে যেমন উত্তরঔপনিবেশিক সাহিত‌্যরীতির কট্টর সমালোচনায় তার মুখোস উন্মোচন করেন, অন‌্যদিকে ভাষিক ও বৈষয়িক—এ উভয় ক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তন এনে তাঁদের প্রতিষ্ঠানবিরোধী সাহিত‌্য তুলে ধরেন। বুলেটিনের বাইরেও তাঁরা এই বৈপ্লবিক চেতনার আশ্রয়ে লেখা প্রকাশ করেন এবং পশ্চিম বাংলার ব‌্যাপক পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হন। ১৯৬৪ সালে বুলেটিনে প্রকাশিত ”প্রচণ্ড বৈদ‌্যুতিক ছুতার” শীর্ষক কবিতাটির জন‌্য মলয় রায়চৌধুরীকে অশ্লীলতার দায়ে গ্রেফতার করা করা হয়। কিন্তু দুর্ভাগ‌্যজনক হলেও সত‌্য, হাংরি আন্দোলনের সাথিদের মধ‌্যে শৈলেশ্বর ঘোষ ও সুভাষ ঘোষ রাজসাক্ষী এবং শক্তি চট্টোপাধ‌্যায়, সন্দীপন চট্টোপাধ‌্যায়, উৎপলকুমার বসু প্রমুখ সরকার-পক্ষের সাক্ষী হয়ে যান। অবশ‌্য সুনীল গঙ্গোপাধ‌্যায়, তরুণ সান্যাল ও জ্যোতির্ময় দত্ত সহ কয়েকজন আসামি-পক্ষে সাক্ষ‌্য দান করেন। একটি কবিতা লেখার জন‌্য এমন মামলা ভূ-ভারতে আর কখনও হয়েছে বলে জানা নেই। পশ্চিম বাংলা ও ভারতের পত্র-পত্রিকায় ঘটনাটি ব‌্যাপক প্রচার পায়। সে-সাথে বেশ কিছু আন্তর্জাতিক পত্র-পত্রিকা মলয় রায়চৌধুরী ও তাঁর হাংরি আন্দোলন সম্পর্কে ব‌্যাপক কভারেজ দেয়। আমেরিকার ‘টাইম’ ম‌্যাগাজিন বিষয়টি নিয়ে মুখ‌্য প্রতিবেদন ও প্রচ্ছদ প্রকাশ করে। আমেরিকা সহ বিভিন্ন দেশে মলয়বাবু ও তাঁর অনুসারীদের কবিতার অনুবাদ প্রকাশ পায়। আমেরিকার বীট কবি অ‌্যালেন গিন্সবার্গ, মেক্সিকোর কবি ওক্তাভিও পাজ সহ অনেকে এই আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানাতে ভারতে আসেন। বলতে গেলে, পশ্চিম বাংলা ও পাশ্চাত‌্যের সাহিত‌্যাঙ্গনে একটা তোলপাড় অবস্থার সৃষ্টি হয়। বাঙলা শিল্প-সাহিত‌্যের ইতিহাসে এ এক অভাবিতপূর্ব ঘটনা। মামলার রায়ে মলয়বাবুকে ২০০ টাকা জরিমানা ( সর্বোচ্চ ), অনাদায়ে এক মাসের কারাবাস— এই দণ্ড প্রদান করা হয়। কিন্তু হাইকেোর্টে আপীল করা হলে প্রায় তিন বছর পর তাঁকে বেকসুর খালাস দেওয়া হয়। তারও আগে ১৯৬৫ সালে হাংরি আন্দেোলনের কর্মকাণ্ড বন্ধ হয়ে যায়। এ হলো হাংরি আন্দেোলনের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস। কিন্তু এ-সব নিয়েই মলয়বাবুর স্মৃতিতর্পন শেষ নয়। সাহিত‌্যজগতের কায়েমি স্বার্থবাদী গোষ্ঠী কীভাবে তাঁর প্রতিষ্ঠানবিরোধী আন্দোলন ও হাংরি সাহিত‌্যের বিরুদ্ধে প্রকাশ‌্য ও গোপন চক্রান্তে সামিল হয়েছিলেন এবং তাঁদের ছত্রছায়ায় হাংরির একদল কর্মী মুচলেকা দিয়ে খালাস পেয়ে মলয়বাবুর বিরুদ্ধে আদালতে সাক্ষ‌্য দিয়েছিলেন তারও বিস্তারিত বর্ণনা পাওয়া যাবে গ্রন্থটিতে। গ্রন্থে তুলে ধরা হয়েছে আন্দোলন চলাকালে অ‌্যালেন গিন্সবার্গ ও বীট জেনারেশনের আরেক দিকপাল লরেন্স ফার্লিংঘেট্টি এবং মলয়বাবুর মাঝে আদান-প্রদানকৃত চিঠিগুলো এবং তৎকালীন প্রতিষ্ঠানপন্থী সাহিত‌্যের গুরু আবু সয়ীদ আইয়ুব কর্তৃক মলয়বাবু ও হাংরির বিরুদ্ধে গিন্সবার্গকে লেখা চিঠি এবং গিন্সবার্গ কর্তৃক প্রদত্ত এর দাঁতভাঙা জবাব সংবলিত চিঠিটাও । তাছাড়া পাটনার বস্তি এলাকায় কৈশোর ও যৌবনে মলয়বাবু যে উদ্দাম, কামনামদির ও সংস্কারমুক্ত জীবন কাটিয়েছেন তারও অকপট ও সরস বর্ণনা রয়েছে আত্ম-জীবনী অংশে। মলয়বাবু ও তাঁর আন্দোলন সম্পর্কে বাংলাদেশের পাঠকদের জানা ও বোঝার জন‌্য এই লেখাটি যথেষ্ট সহায়ক হবে।

আত্ম-জীবনী ছাড়াও গ্রন্থটিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে কাব‌্য-নাটক “যে জীবন ফড়িঙের দোয়েলের” , “প্রচণ্ড বৈদ‌্যুতিক ছুতার “ সহ ২৩টি কবিতা, ”নাম নেই” নামে একটি প্লটমুক্ত উপন‌্যাস, জাদুবাস্তবতা বিষয়ক একটি প্রবন্ধ, গিন্সবার্গের প্রখ‌্যাত কবিতা “হাউল’-এর অনুবাদ, প্রবন্ধ “হাংরি আন্দোলন ও শক্তি চট্টোপাধ‌্যায়” এবং “মিহিকার জন্মদিন “ শীর্ষক একটি ছোটগল্প। ”স্বরচিত” গ্রন্থের কবিতা ও গল্প-উপন‌্যাস পাঠে সহজেই মলয়বাবুর রচনাশৈলীর অভিনবত্ব ও প্রতিষ্ঠান-বিরোধী চেতনার প্রকৃতি বোঝা যাবে। তিনি তাঁর মতো করেই লিখেছেন, এমনকি সমকালীন হাংরিয়ালিস্ট বা পশ্চিমা প্রভাবের অধুনান্তিক লেখকদের চেয়ে একেবারে আলাদাভাবে সৃজনকর্মে ব‌্যাপৃত থেকেছেন। আশির দশকের পর থেকে তিনি অধুনান্তিক ও জাদুবাস্তব ধারায় লেখা শুরু করলেও, তাঁর বিশেষ উদ্ভাবনী ক্ষমতায় প্রতিটি ক্ষেত্রে স্বকীয়তারই দীপ্তি ছড়িয়েছেন। আবার, গদ্য-রচনা হোক বা কবিতা, তাঁর একটি রচনার ভাষাবন্ধও অন‌্যটি থেকে একেবারেই পৃথক এবং প্রসঙ্গ ও অনুষঙ্গ উপস্থাপনের বেলায় সম্পূর্ণ ভিন্নমাত্রায় সমৃদ্ধ থেকেছে। নির্দিষ্ট আঙ্গিকরীতি, যুক্তি বা নিয়ম-পদ্ধতি থেকে মুক্ত নতুন ধারার বাচনিক নির্মাণ তাঁর সাহিত‌্য। কী কবিতায় কী গদ‌্যে, বিচিত্র যৌন-অভিজ্ঞতা তুলে ধরার ক্ষেত্রে তিনি মোক্ষম শিল্পী। নিষিদ্ধকে তিনি খোলামেলা ভাষায় তুলে ধরেছেন। একদিকে জৈবিকতা এবং অন‌্যদিকে প্রথাগত সমাজের নানা কুশ্রিতা ও অন‌্যায়-অপরাধের বিরুদ্ধে সরস সমালোচনা তাঁর সাহিত‌্যের উপজীব‌্য। সেখানে রয়েছে এমন সব উপাত্ত যে-গুলো নির্মম সত‌্যেরই প্রকাশ ঘটায়, মুখোস খুলে দেয় প্রচলিত সভ‌্যতার, উলঙ্গ করে ছাড়ে এতৎকালের সাহিত‌্য-শিল্পের অনুশাসনকে।

প্রায় চারশত পৃষ্ঠার এই ”স্বনির্বাচিত” গ্রন্হ, বাঙলা সাহিত‌্যের কিংবদন্তীসম লেখক মলয়বাবু ও তাঁর আন্দোলন সম্পর্কে জানা-বোঝার এক মোক্ষম দলিল। আরো ওজস্বিতা নিয়ে একভাবে বলা যায়, এ যেন হাংরিয়ালিস্ট তথা অধুনান্তিক বাঙলা সাহিত‌্যের বাইবেল। বাংলাদেশে অধুনান্তিক সাহিত‌্যের চর্চায় যাঁরা আগ্রহী, এই গ্রন্থটি তাঁদের মনন ও চিন্তা-চেতনা গঠনে নির্দেশক হতে পারে বলে আমি মনে করি।

(গ্রন্থ : স্বনির্বাচিত। লেখক : মলয় রায়চৌধুরী। প্রকাশক : আলী আফজাল খান, ভিন্নচোখ প্রকাশনী, ঢাকা। প্রচ্ছদ : নির্ঝর নৈঃশব্দ। মূল‌্য : ৬৬০ টাকা।)



Name:  Supriti Burman          

IP Address : 012312.60.90012.13 (*)          Date:01 Jan 2019 -- 07:15 PM

আধুনিক কবিতার বাউল মলয় রায়চৌধুরীর পজিটিভ ইরটিসিজম
সুপ্রীতি বর্মন
বুদ্ধদেব বসু ইরটিক উপন্যাস লিখেছিলেন, ‘রাতভর বৃষ্টি’, কিন্তু তিনি ইরটিক প্রেমের কবিতা লেখেননি। মলয় রায়চৌধুরীর প্রথম পর্বের কবিতা ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ ইরটিক প্রেমের কবিতা, মলয় রায়চৌধুরী ইরটিক উপন্যাস লিখেছেন, ‘অরূপ তোমার এঁটোকাঁটা’। মলয় রায়চৌধুরী দ্বিতীয় পর্বেও বহু ইরটিক কবিতা লিখেছেন, একজন বাউলের প্রেমের পজিটিভ ইরটিসিজমের কবিতা । কোটিজন্মের যায় পিপাসা বিন্দুমাত্র জলপানে ।

মলয় রায়চৌধুরী এক উজ্জ্বল ধ্রুবতারা, একজন বাউল । শব্দ, চিত্রকল্প, বাকবন্ধ তাঁর একতারা, গুবা, সারিন্দা, ডুবকি, নুপর, খমক । সকল পথ হারিয়ে ফেলা তরুণী-প্রেমিকার গূঢ় তলাতল খুঁজে তুলে এনেছেন রত্নধন, চাঁদের উদয় দেখিয়েছেন অমাবস্যায় । অভেদের সন্ধানে বেরিয়ে তিনি নবদ্বার-পিয়াসী এক জাজ্বল্যমান প্রতিমূর্তি, যাঁর হৃদয়ের কোলাজে স্বর্ণালী কলমের ছোঁয়ায় ফুটে ওঠে স্থলপদ্মে ভাসমান ‘ন্যাংটো তন্বী, । আড়ালের দরমা ছুঁড়ে ফেলে অকপট সহবাস, নগ্নমূর্তির দাম্পত্য কিংবা প্রেমিকের সত্তায়, কৃষ্ণের যতেক লীলা সর্বোত্তম নরলীলা । ধূসর চিত্রকল্পের পরোয়া না করে, পুরুষতান্ত্রিক স্বৈরাচারীতায় না ভুগে, নারীজন্মে পুরুষত্বের অসীম সোহাগশশী কলঙ্কিত না করে, প্রেমের পবিত্র অর্ঘ্যে অর্চনায় হাংরি আন্দোলনের পথিকৃৎ, যে অর্চনার মায়াবী বর্ণনা আছে তাঁর ‘নামগন্ধ’ উপন্যাসে, খুশি মণ্ডলের উদ্দেশ্যে যিশু বিশ্বাসের প্রেমপূজা । আদালতে জেল-জরিমানার ভ্রূকুটি, বন্ধুদের রাজসাক্ষী হয়ে যাওয়া, তবুও কবির বাউলসত্তাকে কে কবে চোখ রাঙিয়ে অবরুদ্ধ করতে পেরেছে ? মলয় রায়চৌধুরীর মতো অতো দম কারোর নেই ; এ এক সাহসী স্পর্ধা অতল-নিতল-তলাতল সন্ধানের । তাই আমিও কোনও রোক-টোখ ছাড়া স্বাধীনচেতা মননে তাঁর প্রেমের কবিতাগুচ্ছের কয়েকটির বিশ্লেষণ করছি । । বিশ্লেষণের গভীরতার মাপনযোগ্যে যতটা ইহ-দেহবাদের যে আনন্দ তুলে ধরেছি তা শুধু নিঃস্বার্থ ঐশ্বর্গিক প্রেমের অঞ্জলি, আমার স্বামী-সোহাগের অভিজ্ঞতা থেকে।

"ঘাস" কবিতাটিতে হৃদয়গ্রাহী প্রেম নিবেদনের পংক্তি কথকথা : “আমি জন্মাবো কুমারী উরুদ্বয়ের মাঝে কোঁকড়া কৃষ্ণ ঘাস হয়ে তাতে লুকানো গন্ধমাদনের ঝর্না। মহীরুহ নই তাই জিরোই মনে হয় শুকিয়ে গেছি।” ঢেউ তুলি তোমার ঘর্মাক্ত শরীরে বাড়তি বীজ ফেলবো রাতে। তখন মনে হয় গোল্ডফ্লেকের ধোঁয়ায় নিকোটিনের আসক্তি ওষ্ঠদ্বয়ের হিমাঙ্কে দূর্বল দূর্বাঘাসে আখচার মৌসুমীর অকাল বর্ষণ হবে। সর্বভুক শিখায় উজ্জ্বলা পোড়ামাটি বীর্য উত্থিত হয় পুরুষালি ঘাসে আর প্রেমিকার দেহে উদ্ভাসিত অপরিমেয় গভীরতায় সংক্ষিপ্ত চিল্কা হ্রদ। অবুঝ কিশোরী খামচে ধরে তক্ষক জিভের টপাটপ গ্রাসে অধিগ্রহন ফেনায়িত ঢেউ। অধিগ্রাসে পুরুষালী ঘাস সমর্পিত পাষান ঈশ্বরী বেদী তোমাকে। মৃন্ময়ীর চুলচেরা বিশ্লেষণ আজ ক্ষুরের ডগায় নাছোড় প্রেমিকের মাথাচাড়া। বিছানায় এলানো মৃত্তিকার নগ্নকায়ার সাথে ভূরাজত্বে তৃষ্ণার্ত সঙ্গীর নাগপাশে মুঠোয় অধঃক্ষেপ মৈথুন। মলয় রায়চৌধুরীর ইরটিক কবিতাগুলো বাউলের দেহতত্বের ভূবনমঞ্চ ।

"ন্যাংটো তন্বীর জন্য প্রেমের কবিতায়" কুচকুচে চকচকে পুংঘোড়ায় বসে আছেন ন্যাংটো তন্বী।
যৌননৌকায় টালমাটাল পুংঅশ্বের রোমের কেশর ঝাঁকানো ভরাডুবি পিচ্ছিল স্রোতের উষ্ণ প্রসবন।
অশ্বারোহীর রক্ষাকবচ কনডোম,,, ফানেলে জ্বলন্ত ভিসুভিয়াসের অগ্ন্যুৎপাতের উৎসেচক কেরোসিনে চোবানো আর বর্হিগত অপসারনে ডেসিমেলে কম্পমান স্যাঁতসেতে ধরিত্রী। চুষিকাঠির ইচ্ছেমতন রস নিংড়ানো সরস জিহ্বায় উৎকোচ গাঁটের পর গাঁট খেজুর গাছ। গৃহস্থের পরিপাটি তোশক বিছানা আজ হুলুস্থুলুস দুন্ধুভির গর্জনে কুমারী মেঘে জমাট জলঙ্গি কামনার রসমজ্জায়। লাজুক ঘোমটায় তরুণাস্থির চলন রুফটপের সানসাইনে মালসায় জমেছে গতরাতের ঋতুস্রাব। পুংঘোড়ার ঈষৎ কম্পিত লাফে অচিন পাখির সন্ধান।

"বৈদ্যুতিক ছুতার” কবিতায় কাম রজঃগুণে প্রেমিক জেদি মন সাহিত্য-ফাহিত্য লাথি মেরে চলে যাবে। সে দেউলিয়া থাকতে চায়, নিঃস্ব, কারণ প্রেম হল তার একমাত্র পাথেয় । সমস্ত নোঙর তুলে নেবার পর শেষ নোঙর ছেড়ে চলে যাচ্ছে তার প্রিয়তমার বিরহের উদ্বিগ্নতা । দুর্নিবার যন্ত্রনায় ছিন্ন প্রেমিক-স্বত্তার উৎকন্ঠিত হৃদয় প্রেমিকাকে হিঁচড়ে উঠিয়ে নিতে চায় আপন ক্ষুধায়। লকলকে জিহ্বায় শ্যাওলা জমেছে নিরাসক্তির ঘোমটার উদাসীনতায় । কবি যেন গা ঠেশে, ছাড়ো ছাড়ো, একরাশ আকাঙ্খায় অশ্রাব্য ঘুমের স্নিগ্ধতার দূরত্ব গড়ে ফেলেছেন ।তাই বোধহয় চোখের পালকি থেকে বিদায় নিয়েছে দৈহিক স্পর্শের টান--- কন্যা এখন যুবতী।
প্রতিবেশী নাভিগহ্বরে শুয়ে আছে সোঁদা গন্ধের বিনুনি, কবি-প্রেমিকের বীর্যের আঠালো স্রোতে নিংড়ে পেতে চাইছে আজ জরায়ুর গন্ধ, সে প্রেমিকা, সে শুভা, সে বাউলের সঙ্গিনী। মলয়-বাউলের কাছে স্বর্গ-নরক, জন্মান্তর, মূর্তি, মন্দির, শাস্ত্রগ্রন্হ স্বীকৃত ছিল না ; ধর্মের হাংরি ম্যানিফেস্টোয় তিনি লিখেছিলেন সেসব কথা ।

মশারীর রৌদ্রদগ্ধ আঁতুড়ঘরে হাপরের দীর্ঘশ্বাসে রাত্রিযাপনের কোলাজে নিতম্বের দূর্দন্ডপ্রতাপে শ্রীমতি সোহাগটুকু নিংড়ে রক্তিম টিপে করেছে বন্দী। আঠালো স্রাবে বৈদ্যুতিক ঝাপটা কবি আজ হয়েছেন ছুতোর; কবি বলেছেন যিশুখ্রিস্ট ছুতোর ছিলেন, শুভা তাঁর মেরি ম্যাগডালেন। প্রেমিকের অপটু ধস্তাধস্তি কুঠারে প্রেমিকার নাভিতে উছলিয়ে বৈতরিনী জাহ্নবীর ছলাকলায় গূঢ় অভ্যন্তর সরস মরণ-পতন। উড়ুক্কু কলা ঊরুদ্বয়ে আগোল প্রেমিকার যৌবনতটে কবির আঁশ কামড়ে যোনির সুস্থতা নাড়ি ছেঁড়া রোমান্টিসিজম শুভার প্রতি কাঙাল হৃদয় প্রেমিক মলয়ের। তিনি চিৎকার করে বলছেন, শুভার স্তনের বিছানায় আমাকে শুতে দাও, শেষবার ঘুমোতে দাও, মর্মান্তিক আকুতি এক ব্যথিতচিত্তের । ভরাট স্তনের শিমূলে মাথা গোঁজার ঠাঁই। উদ্দাম ন্যাংটো তন্বীর আঁচড়ে কোঁকড়ানো চুলে মেঘের কার্নিশ আকন্ঠ ভরে যাচ্ছে আজ ধাতুর স্রোতে।

রূপশালী নাভিমাসে বীর্যস্নেহে স্নিগ্ধ গথিক ভাস্কর্য আঁকশি রূপে নেতিয়ে থাকা দূর্বল শরীরী বাকলের হেতাল বনে আনতে চায় মরা কোটালের বান। পরিপক্ক সোহাগের ডোরে যন্ত্রণা মন্থনে উদ্যত উদ্ধত জেদী আদি যৌনতা ঢোঁড়া সাপ স্ফীতগতরে ঊরুজাত রোঁয়াওঠা শিহরনের কম্বলে দগ্ধভূমি পুরুষত্বের ঔরসে নিষিক্ত জরায়ু আজ তার একচ্ছত্র অধিকার। তাই আজ সব প্রয়োজন শূন্য প্রেমিকার গর্ভে ঔরসজাত সন্তান রূপে শুক্র থেকে প্রেমিকের জন্ম হোক এ যেন এক প্রতিশ্রুতিবদ্ধ প্রেমিকের দৃঢ় অঙ্গীকার, কালজয়ী উৎসর্গীকরণ, বাউলের দেহতত্ত্বের সঙ্গমে। পাঁজর নিকুচি করা ঝুরি নামছে স্তনে আর তুলকালাম হয়ে যাচ্ছে বুকের ভেতরের সমগ্র অসহায়তা। যোনি মেলে ধরো, বাউল-প্রেমিকের আকুতির টান পাঁজরাবদ্ধ উৎসবে । কুমারী অমাবস্যায় পদ্মবোঁটার উন্মোচন অন্তর্বাস ছিঁড়ে বেআব্রু শুভার রজঃস্বলায় প্রেমিক শ্লেষা হয়ে মিশে যেতে চায়।মায়ের যোনিবর্ত্মে অাত্মগোপন বা ধিক্কার স্বীয় অধিকারে তাই অথৈ বানে পিতার আত্মমৈথুনের পেচ্ছাপে তার বয়ে যাওয়া কেবল এক নিষ্পাপ প্রেমিকের স্বীকারোক্তি শুভার প্রতি তার শেষ প্রয়োজন।তাই ঋতুস্রাবে ধুয়ে যেতে চায় এক প্রেমিকের পাপতাড়িত কঙ্কাল। এক অসাধারণ সান্ধ্যভাষায় রাঙানো চিত্র প্রেমিক সোহাগ স্বপ্ন গর্ভবতী শ্রীময়ী শুভার আসন্ন প্রস্ফুটিত কুসুম। শুকিয়ে যাওয়া বীর্য থেকে ডানা মেলে ৩০০০০০ শিশু উড়ে যাচ্ছে শুভার স্তনমন্ডলীর দিকে।রূপায়নে যেন কোন অন্তরীক্ষের দেবশিশু উন্মোচনে আজ বেজে ওঠে বাউলের দেহযন্ত্র । অন্তিমে বিপর্যয়ে আলোড়িত-হৃদয় এক নিষ্পাপ প্রেমীর । গরীবের দেওয়াল জুড়ে দেখবে কেমনে তোমার প্রতুষ্যের বাসি ওষ্ঠমধুর সঞ্চয় যামিনীর কোলাহল। তাই আরশি থাকার পরেও স্বয়ংদর্শন ন্যাংটো মলয়কে ছেড়ে দিয়ে শুধু প্রেমিকের আত্মসমীক্ষণ--- অপ্রতিষ্ঠিত খেয়োখেয়ি অনন্তকালের জন্য।

"মাথা কেটে পাঠাচ্ছি যত্ন করে রেখো"---, এই কবিতায় এক আশ্চর্য উপস্হাপন প্রেমিকসত্তা মলয়ের যা হৃদয়গ্রাহী সংলাপের চৌম্বকীয় আকর্ষণে গ্রথিত করবে মস্তিষ্ক-- এক উচাটন-উন্মাদ শোকে পাঠক তাতে সহজেই যোগসূত্র খুঁজে পাবেন, যদি তাঁর আত্মত্যাগ নিঃস্বার্থ প্রেমের নিমিত্ত হয়। সংসারীর অতৃপ্ত ন্যাকা দেহভাষা নয়। বাউলের দেহবন্দনা । আজ তবে প্রেমালাপে সঙ্গীতময় হোক নগ্ন শরীরে। পুরুষ ঠোঁটে আর নগ্ন দৃষ্টির উন্মাদ প্রেমে কামার্ত শৃঙ্গারে নারী তুমি আভূষিত হও। আর নেশারু হোক অতৃপ্ত প্রেমের আগুন প্রেমিকার দেহরহস্যের জতুগৃহে। কারণ আজ অতিরিক্ত বাচনিক ক্রিয়াজাত অগ্নির উপশম হোক তোমার মাই চটকানো দুগ্ধ পানে ছটফটানি/ অস্থিরতা জাগ্রত হোক নবকল্লোলে প্রেমিকার মুখশ্রীর রন্ধ্রে রন্ধ্রে। তোমার ন্যাংটো তন্বী আজ হোক আমার উন্মুক্ত আরশি, স্বর্গসুখ পাই স্বীয় মুখদর্শনে আর এটাই আমার ভ্যালেনটাইন দিনের শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি। ষোলোকলায় উন্মুক্ত বিভঙ্গে আলতা চরণে রমণী তুমি তাই নিঃস্ব আজ আমি ঘুমহীন নৈঃশব্দে যন্ত্রনায় আবদ্ধ এক পাগল প্রেমী যার আজ আত্মধ্বংসের ভ্যালেনটাইন কার্ড বা গিফ্টপ্যাক কাটা মাথার রক্তক্ষরণ। আজ তবে তার উচ্ছন্নে, প্রেমে, শরীর সার্বভৌম নয়, তাই আমি মাথা কেটে পাঠাচ্ছি যত্ন করে রেখো। জঙ্ঘাহীন তাই অনাবৃষ্টির শোক, তবুও তোমার যৌনগন্ধী বেড়ায় আবদ্ধ যোনির হাসিমারা অভয়ারণ্যে আশ্রয় নিক নিষ্পাপ স্কন্ধহীন দামাল পুরুষ প্রেমিক লক্ষ্মীতত্ত্ব জাগাক সে রাতপেঁচার শীৎকারে তুমিও আঙুলে জড়িয়ে তাকে, ঝড় তোলো, বিদ্যুত খেলাও।

মলয়ের কাটা মাথা তোমার কোলে রেখো, তোমাদের কোলে রেখো--- কিন্তু মৈথুনানন্দে চিত্তপ্রাণ জাগে কপালে।কঙ্কালসার হিম ন্যাংটো শরীর তোমার বিবর্জিত রোমন্থন শীৎকার কি করে আজ সম্ভব তোমার সাথে সঙ্গম, কেবল মাথার সাথে । আমিও নির্বাক সাতপাঁচ ভেবে কাপুরুষ ভীত শামুকের ন্যায় মাথা মাংসল যোনিকেশরে ঢুকে আত্মগোপন করি চন্দ্রাহত ওষ্ঠে। মনে আছে একদিন শতরূপা গৌরচন্দ্রিকায় আমার মুখশ্রীর লাবণ্যে হতদগ্ধ হয়েছিলে তুমি কিশোরী, বলেছিলে চলো পালাই, একসাথে তবেই অমাবস্যার চাঁদে আমাদের প্রেমের মোক্ষ প্রাপ্তি কিন্তু আমি কাপুরুষ ভীতু প্রেমিক কাঙাল তোমার প্রেমে। মলয় রায়চৌধুরীর ডিটেকটিভ বইয়ের প্রথম প্যারা আরম্ভ হয়েছে এক যুবতী এক পুরুষের হাত ধরে যখন বলেছিল, ‘চলুন পালাই’। সাহসিকতার মাস্তুলে জমেছে আজ অস্তরাগের বিষাদনৌকা, কেন ভাসাতে পারিনি সেদিন।
তুমিও শিহরিত, কুন্ডলী পাকিয়ে দাঁতের কর্ষণে চুঁইয়ে পড়তে থাকে উঁচিয়ে থাকা অমৃতদুগ্ধ বোঁটার উষ্ণপ্রসবন সিঙ্গেল মল্ট হাঁ করা মুখে ঢালতে লেগেছো অনর্গল আর ঘামে দরদর করে ভিজে আমিও প্রাচীন পুরুষাঙ্গ বর্জিত ঠোঁটে ডুব দিই অতলান্ত অলকানন্দায়। তাঁর আনন্দ, নৃত্য, গীতিময়তা যেন র‌্যাবেলেস্ক ।

আমরা জানি মলয় রায়চৌধুরীর প্রিয় পানীয় হল সিঙ্গল মল্ট ও আবসাঁথ । বোদলেয়ার, র‌্যাঁবো, ভেরলেনেরও প্রিয় ছিল আবসাঁথ । স্লিভলেস ব্লাউজ তোমার ভিজে সপসপ অন্তর্বাস আর আমার বাউলসুলভ একা মাথার জরায়ুমুখে গৌড়ীয় লবণাক্ত লিঙ্গের কোন স্কোপ নেই আর। শুধু মস্তকের ঔদ্ধত্ব্যে আজ হতে খুব ইচ্ছা করে জ্যান্ত লকলকে জিব্রাগ্রীবা। উঁকি দিয়ে চতুরঙ্গ কৌশলে কোন লাউডগা উদোম করুক তোমায় আমার জিহ্বায় লুকানো তীক্ষ্ণ করাত। হস্তকরপদ্মহীন তাই রুদালির শোক আলিঙ্গনে লুপ্ত তোমার কষিয়ে বুকে জাপটে ধরার বাহুডোর। আজ তাই হতে চাই নিঃষ্পাপ সন্তান অঙ্গ বিবর্জিত তোমার কৃষ্ণগহ্বরের প্রসবে। আজ না হয় সম্ভ্রান্ত লাবণ্যরসে মাধুর্য আনুক রমণীয় লাস্যে তোমার উন্মোচিত জ্যোৎস্নাময় যোনির গোলাপপাপড়ি তাতেই শুষ্ক ফাঁটা ঠোঁট দিয়ে একটু আদর ঘষি আর তাতেই উদ্গীরন হোক মায়াবী মাদকের সিঙ্গল মল্ট। লিঙ্গকলা উচ্ছেদ তাই আমাকে আর উলঙ্গ দেখার আতঙ্কে ভুগতে হবে না। আজ শুধু সম্রাট- মস্তকে হয়েছি জেহাদি। চোখ মুদে তবুও তোমার কস্তুরী ঘ্রাণের নাভিতে দিতে চাই আহুতি আমার চারুকলার কেশগুচ্ছের ঝিম ধরা মাতলামো। মার্জিত করো আজ আমায় কারণ আজ আমি এমন এক ব্যাধ যান্ত্রিক নখ ও দাঁতের শান দেওয়া অস্ত্রছাড়া তাই অসহায় হয়েছে তোমার হুক।

"বুড়ি" কবিতাটি মলয় রায়চৌধুরীর এক আশ্চর্য সৃষ্টি যেখানে বাউলের অন্তিম চরণে মোচড়ানো প্রেমিক হৃদয়ে নিঃস্ব রিক্ততার শূন্যতার যন্ত্রণার সাথে মিলেমিশে একাকার তার বুড়ি স্ত্রীর প্রতি যে নাকি তার দিদিমার বয়সী:-

এই বুড়ি আমার দিদিমার বয়সী
চুল পেকে গেছে, কয়েকটা দাঁত
নেই, দিদিমার মতন শুয়ে থাকে--
কবে শেষ হয়ে গেছে পুজো-পাঁজি
ক্যালেণ্ডারে ছবি-আঁকা তিথি
দিদিমার মতো এরও প্রতিরাতে
ঘুম পায় কিন্তু আসে না, স্বপ্নে
কাদের সঙ্গে কথা বলে, হাসে
চোখে ছানি তবু ইলিশের কাঁটা
বেছে ঘণ্টাখানেকে মজে খায়
দিদিমার মতো, বলেছে মরবে
যখন, চুড়ি-নাকছাবি খুলে নিয়ে
পাঠাতে ইনসিনেটরে, এই বুড়ি
চল্লিশ বছর হলো সিঁদুর পরে না
পঞ্চাশ বছর হলো শাঁখাও পরেনি
দামি-দামি শাড়ি বিলিয়ে দিয়েছে
দিদিমা যেমন তপ্ত ইশারায়
দাদুকে টেনে নিয়ে যেতো রোজ
এও আমাকে বলে এবার ঘুমোও
আর রাত জাগা স্বাস্হ্যের পক্ষে
খারাপ, এই বুড়ি যে আমার বউ
বিছানায় শুয়ে বলে, কাউকে নয়
কাউকে দিও না খবর, কারুক্কে নয়--
এ-কথাটা আমারই, কাউকে নয়
কারুক্কে বোলো না মরে গেছি ।

"স্বচ্ছ দেওয়াল” কবিতায়----- একটি লজ্জার দেওয়াল প্রতি কুমারীর অলক্ষ্যে যুগে যুগে অনুরাগের আকাঙ্খায় জেগে থাকে আর তার অধিবাস উন্মুক্ত হয় কোন যৌবনের বান ডাকে। ছিঁড়ে যায় সেই স্বচ্ছ দেওয়াল যার ভাঙা ও ভাঙতে দুটোতেই অনাবিল আনন্দ জেগে ওঠে।কোন আড়াল আর অবশিষ্ট থাকে না দুজনের মাঝে শুধুই এক আসন্ন-আনন্দের নবাঙ্কুরের জন্ম:-

"দেওয়ালখানা
বাঁচিয়ে বাঁচিয়ে রাখছে
সেই যুবকের জন্য
যাকে সে ভাঙতে দেবে
যুবকেরা তবু গলদঘর্ম হয়

যে ভাঙছে তারও
অহমিকা নাচে ঘামে
রসের নাগর খেতাব মিলেছে
প্রেমিকের।
দেওয়ালখানা প্রেমের ঘামেতে ভিজিয়ে ফেলা দরকার।"

"অবন্তিকার শতনাম" কবিতায় ফিরে এসেছেন আধুনিক কবিতার বাউল মলয় রায়চৌধুরী ; দ্রাক্ষাস্তনে একাগ্রচিত্তে ধ্যানমগ্ন সন্ন্যাসীর জপমালা শীর্ণ কায়ার শ্বাসরুদ্ধ নাছোড়বান্দা আলিঙ্গনে শঙ্খিনী আড়মোড়া ভাঙে ভাঁজে ভাঁজে জেগে ওঠে পুরুষোত্তম ব্যাকুল উগ্র নিঃশ্বাসের উৎকোচে চাঁই বাঁধে শঙ্কা কাছ ছাড়া ফুটন্ত দুধে। অবন্তিকাকে একশো নামের ব্যঞ্জনায় জপে জাগ্রত হয় প্রেমিকের সদাজাগ্রত কুন্ডলীচক্র দৈহিক নবরসের পুঙ্খানুপুঙ্খ আলোড়নে শতনামে অবন্তিকা তোমায় খোঁজে। আমি অবন্তিকার দুটো মাইয়ের নাম দিয়েছি কৃষ্ণচূড়া আর রাধাচূড়া, বাঁদিকের বোঁটার নাম করেছি কুন্দনন্দিনী...বঙ্কিমের বিষবৃক্ষ তখন ও পড়ছিল চিৎ শুয়ে,প্যান্টির নাম পিকাসো যোনি তার কোন আদল আদরা নেই।ভগ্নাংঙ্কুরের নাম কোন মিষ্টান্ন দ্রব্য বিশেষ জিহ্বার লালার উৎসেচক।ওষ্ঠের নাম আফ্রিকান সাফারি আর পাছা দুটির নাম গোলাপসুন্দরী। উরুর নাম ককেশিয়া আরো কতক নামের শিরোপার ব্যাঞ্জনায় অবন্তিকার শতনাম মুক্তকন্ঠে জপ করছে কোন প্রেমের তপস্যায় লীন পাগল প্রেমিক।"---এরকম কবিতা কেবল মলয় রায়চৌধুরীই লিখতে পারেন, যা আনন্দের, উদ্দীপনার, প্রেমের, রসমগ্নতার, সহজিয়া, দেহসাধনার গান, মধুস্রাবী, তন্ময়তায় নিবিষ্ট । মধ্যবিত্ত কবিচেতনার বাইরে ।

"পপির ফুল” কবিতাটিও রহস্যময়---- এই কবিতায় মলয় রায়চৌধুরী পোস্তগাছের ফুল ও ফল নিয়ে লিখেছেন অথচ তা সান্ধ্যভাষায় । পোস্তফুলের রঙ গোলাপি, ফল সবুজ, আঁচড় দিলে আফিম তৈরি হয়, পেকে গেলে ফেটে পোস্তর বীজ পাই । কিন্তু এই নিষিক্ত প্রেমে অধ্যুষিত পঙক্তিগুলো ছেঁকে তোলে রোমকূপে জেগে ওঠা ফুলেল শয্যার কমফর্ট জোন। নরম অঙ্গুলির পেন্সিলস্কেচে হালকা ছোঁয়ায় আঁচড়ে তন্বী-সঙ্গিনী কবোষ্ণ কব্জি জেঁকে বসে ঘনত্বে চারকোল শেডে রোমকূপে আসক্তি ক্যানভাসে। রামকিঙ্করের স্থাপত্যে সটান এলানো বিবস্ত্র কালীমূর্তি পদমূলে বিছানো তোরঙ্গ বলশালী সুউচ্চ গতর পুরুষালি সিংহনাদে ইজেলে টানা রঙের তৈলচিত্রে মধুদ্রবনে মহাপরিনির্বান। সাতলহরীর ছন্দপতনের ঝংকারে ভার্জিন কলসের জল মুখ ডুবিয়ে আকন্ঠ পান করে যাও যত চেটে খাও তত নেশায় আদম হয়ে ওঠো। রাতের পোশাকের খোলসের তলায় স্তন দৃঢ়মুষ্ঠিতে পিচ্ছিল দলিত স্তনের গোলাপী রঙে আবিষ্ট বোঁটায় অসমাপ্ত চুম্বন আঁকড়ে ধরে শেষটুকু আবরন চাদরে অবন্তিকা তুই ইরটিক প্রেমের আগার :-
"বোঁটায় তোর গোলাপ রঙ অবন্তিকা
শরীরে তোর সবুজ ঢাকা অবন্তিকা
আঁচড় দিই আঠা বেরোয় অবন্তিকা
চাটতে দিস নেশায় পায় অবন্তিকা
টাটিয়ে যাস পেট খসাস অবন্তিকা"

"নেভো মোম নেভো” কবিতা মলয় রায়চৌধুরী লিখেছেন লেডি ম্যাকবেথকে নিয়ে ; লেডি ম্যাকবেথ মোমবাতি নিয়ে পাগলের মতো ছুটছেন :-

"পাছার দু-ঠোঁটে, আহা কি মসৃণ হতো রাজরানি হওয়া, যেন ইস্কাপন
নষ্ট করে নেচে উঠছে বিদ্যুতের খ্যাতি, যার অস্তিত্বে আমি বিশ্বাস করি না
আগুন নগ্নিকা, বুক দুটো অতো ছোটো কেন
লেডি ম্যাকবেথের লোভ সিংহাসনে রাজমহিষীর মতো উঁচু বুকে
বসে আছো, স্কুল-ফেরত সম্পূর্ণ উলঙ্গ তুমি হাঁটছো পাশাপাশি
তেমন নারীও, আত্মজীবনীতে লিখবেন কিন্তু প্রথম হস্তমৈথুনের স্বাহা
ক্লিটোরিসে অঙ্গুলিবাজনার মৃদু উগরে-তোলা ঝর্ণাঝংকার।"


"রাবণের চোখ” কবিতা মলয় রায়চৌধুরী লিখেছেন কুলসুম আপাকে নিয়ে । তাঁর আত্মজীবনীতে আমরা জেনেছি কৈশোরে মলয় রায়চৌধুরী তাঁদের বাড়িতে হাসের ডিম কিনতে যেতেন । কুলসুম আপা তাঁকে মাংস খাইয়ে বশ করে একদিন রেপ করেছিলেন, কবিতাটির পৃষ্ঠভূমি পাঠক যদি জানতে না পারেন তাহলে এই কবিতার ভিতরে প্রবেশ করতে পারবেন না :-
শৈশবের কথা । সদ্যপ্রসূত কালো ছাগলির গা থেকে
রক্ত-ক্বাথ পুঁছে দিতে-দিতে বলেছিল কুলসুম আপা
‘এভাবেই প্রাণ আসে পৃথিবীতে ; আমরাও এসেছি
একইভাবে’ । হাঁস-মুরগির ঘরে নিয়ে গিয়ে আপা
আমার বাঁ-হাতখানা নিজের তপ্ত তুরুপে চেপে
বলেছিল, ‘মানুষ জন্মায় এই সিন্দুকের ডালা খুলে’ ।
রাবণের দশজোড়া চোখে আমি ও-সিন্দুক
আতঙ্কিত রুদ্ধশ্বাসে দ্রুত খুলে বন্ধ করে দিই ।

"জ্যামিতির উৎস” কবিতায় মহালয়ায় বীরেন ভদ্রর চণ্ডীপাঠকে দূর্গার পরিবর্তে দেবী অবন্তিকার ক্ষেত্রে প্রয়োগ করেছেন মলয় রায়চৌধুরী । সৃষ্টির রহস্যের উন্মোচনে বাউল-প্রেমিকের সংলাপে। সিকোয়েন্স এ সৃষ্টিকর্তাদের সৃষ্টি সুখের উল্লাসে অনুভবকে আঙ্গিক দিয়েছে প্রেমিকার শরীরের প্রতি আঁকে বাঁকে অপরূপা তিলোত্তমার সৃষ্টি। অবন্তিকাই কবিতা, তাঁর নিজের কবিতার বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেছেন মলয় এই কবিতায়:-

অবন্তিকা বললি তুই :
নৌকো মাতাল হতে যাবে কেন ? এ-যুগে সমুদ্রটা নিজেই মাতাল !
আমি বললুম :
যত জ্যামিতি কি শুধু তোরই দখলে ? কার কাছ থেকে পেলি ?
অবন্তিকা বললি তুই:
আর্কিমিডিস দিলেন দেহের ঘনত্ব !
রেনে দেকার্তে দিলেন শরীরের বাঁকগুলো !
ইউক্লিড দিলেন গোপন ত্রিভূজ !
লোবাচোভস্কি দিলেন সমন্বিত আদল !
ব্রহ্মগুপ্ত দিলেন মাংসময় বুকের নিখুঁত বর্তুলতা!
শ্রীধর দিলেন আয়তন !
নারায়ণ পণ্ডিত দিলেন দৃষ্টি আকর্ষণের ক্ষমতা !
আর তুই কী দিলি ? অক্ষরে সাজানো যত ফাঁকা মন্তর ?
আমি বললুম :
আমি দিয়েছি প্রেম !
অবন্তিকা তুই বললি :
প্রেম তো আলো হয়ে বেগে আসে আর তত বেগে চলে যায় !

সাম্প্রতিক কালে মলয় রায়চৌধুরী নিজের কবিতাকে বলেছেন ডোমনি ; বাউল মলয়ের কাছে কবিতাই তাঁর দয়াল, মলয় স্বয়ং একজন সাঁই । এই কবিতার নাম ‘মলয় সাঁইয়ের গান’:-

ডোমনি, তুইই দয়াল, কালো জাগুয়ার চামড়ায় মোড়া দেহ তোর
দু'জনে ধুলোয় গড়াগড়ি দিয়ে যা শিখেছি তা পশুসঙ্গের মহাবোধ
ডোমনি, তুইই দয়াল, ঘামের ত্বকে মোড়া বিকেলের পাঁকবিলাসিনী
পুলিশের গুলি খেয়ে কিশোরী বয়সে তুই খোঁড়া হয়ে গেলি
ডোমনি, তুইই দয়াল, মেছুনির হাজা-হাত, কাগজকুড়ানিয়াফাটল-গোড়ালি
কী করে মগজে নিয়ে যাবো সুষুম্নার মুখে ইড়ার রাস্তায় জড়ো করা বীজ
ডোমনি, তুইই দয়াল, বন্দু ধারণের যোগ্য করে তুলবি কবে
দম নেবো আর ছাড়ব না দঞ যাতে কুম্ভকে থাকি বহুক্ষণ
ডোমনি, তুইই দয়াল, পচা মাংসের গন্ধ তোর মুখে, ঠোঁটেতে কাকের রক্ত
তোর লবণামৃতে সকাল-সন্ধে চান করিয়ে পাপিষ্ঠ করে তুলবি আমাকে
ডোমনি, তুইই দয়াল, শ্রেনিহীন করে দিস, আমিশাষী রসে
নাভিচক্রে কাতুকুতু থিতু করে আসক্তির স্বর্ণলতা দিয়ে মুড়ে দিস
ডোমনি, তুইই দয়াল, বলে দে কেমন করে কুণ্ডলনী চক্র জেগে যাবে
তর্জনীতে অষ্টগুণ ধরে রাখবার ক্রিয়া তোয়াক্কাবিহীন করে দিবি
ডোমনি, তুইই দয়াল, আমাকে যথেচ্ছাচারী মূর্খ করে তোল
নিরক্ষর হয়ে যেতে চাই, অশুদ্ধচিত্ত, নির্বোধ, কমলকুলিশ
ডোমনি, তুইই দয়াল, হাত ধরাধরি করে ডুব দিই বিষ্ঠার পাঁকে


“মলয়দাস বাউলের দেহতত্ব” কবিতায় মলয় রায়চৌধুরী আধুনিক জীবনের কর্মব্যস্ত নারীদের বাউল-সঙ্গিনীর আসনে বসিয়েছেন, কবিতা হয়ে উঠেছে অধুনান্তিক, উত্তরাধুনিক, প্রেমিকার প্রয়োজনও উত্তরাধুনিক দেহবন্দনার গুপিযন্ত্র :-
ডোমনি, তুইই দয়াল, যখন বিদেশে যাস কেন রে আনিস কিনে সেক্সটয় ?
ভাইব্রেটর, ডিলডো, বেন-ওয়া-বল, গুহ্যের মুক্তমালা ?
ডোমনি, তুইই দয়াল,জানি কেন বিডিএসএম কবিতার বই এনেছিস,
জি-বিন্দু হিটাচির ম্যাজিকের ছড়ি ? নিপল টিপে কাঁপাবার ক্লিপ ?
ডোমনি, তুইই দয়াল, হাত-পায়ে দড়ি চোখে ঠুলি আমাকে চেয়ারে
উলঙ্গ বেঁধে রেখে দিয়েছিস, নিজের ফাঁস খুলে তলাতল রক্তের স্বাদটুকু দিলি
ডোমনি, তুইই দয়াল, শুদ্ধ প্রেমে মজল যারা কাম-রতিকে রাখলে কোথায়
চাবুক মারিস তুই, চুলের মুঠি ধরে ক্ষিরোদধারাকে চুষে বের করে নিস
ডোমনি, তুইই দয়াল, চাতক স্বভাব নাহলে অমৃতের দুধ তুই দিবিনাকো
আমার খিদে নেই, মুখের ভেতরে কৃষ্ণের বিশ্বরূপ খেয়ে মজে গেছি
ডোমনি, তুইই দয়াল, যতো ইচ্ছে আনন্দ কর, দেহ নিয়ে খেল
আমি একটুও নড়ব না, আহ উহ করব না, যতো চাই ধাতুবীজ নিস

পরিশেষে বলি, মলয় রায়চৌধুরীর প্রেমের কবিতার পর্যালোচনার বিশ্লেষণে এইকথা নিঃসন্দেহে বলা যেতে পারে যে প্রত্যেকটি সৃষ্টিতে চাক্ষুষমান এক পজিটিভ ইরটিসিজম, এক বেপরোয়া উন্মাদ প্রেমের রসানুভূতি, যাতে তাঁর প্রেয়সীর আঙ্গিক মাধুর্যে চিত্রিত হয়, মধুবনীপটের সান্ধ্যভাষায় রঙীন লৈখিক-চিত্রে বর্ণিল হয়ে ওঠে পাঠক-পাঠিকার মনের ও দেহের জগত ।



















Name:  uttaran dasgupta          

IP Address : 012312.60.90012.13 (*)          Date:01 Jan 2019 -- 07:18 PM


উত্তরণ দাশগুপ্ত : পাটনায় মলয়, সমীর এবং গিন্সবার্গ
‘কিল ইয়োর ডারলিংস’ ফিল্মে হ্যারি পটার খ্যাত ড্যান র‌্যাডক্লিফ অ্যালেন গিন্সবার্গের অভিনয় করেছিলেন এবং ‘অন দি রোড’ ফিল্মে স্যাল প্যারাডাইস অভিনয় করেছিলেন জ্যাক কেরুয়াকের ভূমিকায়-- যার দরুন বিট আন্দোলনকারীদের সম্পর্কে আগ্রহ বেড়েছে সাম্প্রতিককালে --- নিঃসন্দেহে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সবচেয়ে প্রভাবশালী সাহিত্যিকবৃন্দ । কিন্তু দুটি ফিল্মই তাঁদের ভারতে বসবাসের অভিজ্ঞতা অনুসন্ধান করেনি ।
গ্যারি স্নাইডার এবং তাঁর স্ত্রী জোয়ানে কাইজারের দেখাদেখি, মার্কিন বিট কবি অ্যালেন গিন্সবার্গ তাঁর প্রেমিক পিটার অরলভস্কির সঙ্গে মুম্বাইতে এসে পৌঁছোন ১৯৬২ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারি । উত্তর ভারতের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে বেড়াবার সময়ে তাঁরা কিছুকাল পাটনাতেও ছিলেন, দুই কবির বাড়িতে -- তাঁরা হলেন মলয় রায়চৌধুরী ও সমীর রায়চৌধুরী ।
মলয়, বর্তমান সময়ের একজন আইকনিক কবি, ২০০৩ সালে তাঁকে সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার দেয়া হয়েছিল । ১৯৬১ সালের নভেম্বর মাসে পাটনা থেকে তিনি সমীর এবং আরও দুজন কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায় ও দেবী রায়কে নিয়ে হাংরি জেনারেশন সাহিত্য ও শিল্পের আন্দোলন আরম্ভ করেন । আন্দোলনটি ক্রমে ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের আরও শিল্পী, লেখক ও বুদ্ধিজীবিদের দলে টেনে নিয়েছিল ।
মলয় এখন মুম্বাইতে থাকেন এবং সমীর কলকাতায় গিয়ে ‘হাওয়া৪৯’ নামে একটি পত্রিকা সম্পাদনা করেন ।
পাটনার স্মৃতিচারণ করার সময়ে সমীর ( ৭৯ ) বলেছিলেন যে, “আমার একজন বন্ধু ছিল ঘোড়ার গাড়ির চালক । তার সঙ্গে বসে ঠররা ( বাংলা চোলাই ) খেতুম । একবার ঠররা খাবার আড্ডায় ও আমাকে বলেছিল ওর বড়োলোক হওয়ার গল্প ।”
দ্বারভাঙ্গার মাহারাজার প্রাসাদের আসবাব নিলাম হচ্ছিল । আমার বন্ধু সেই নিলাম থেকে সস্তায় একটা ঘোড়ার গাড়ি কিনেছিল । গাড়িটা মেরামত করার সময়ে ও দেখল যে বসবার কুশনের ভেতরে দামি-দামি জহরত লুকোনো রয়েছে । ও জহরতগুলো বিক্রি করে রটিয়ে দিয়েছিল যে লটারি জিতেছে, আর তাইতে অনেক টাকা পেয়েছে ।
সমীরের সঙ্গে গিন্সবার্গের প্রথম দেখা হয় ঝাড়খণ্ডের চাইবাসায়, তখন সেটা ছোট্টো গ্রাম ছিল । “আমার ঘরে অসওয়াল্ড স্পেংলারের লেখা ‘দি ডিক্লাইন অফ দি ওয়েস্ট’ বইটা দেখে ও জানতে চাইলো, সমীর, তুমি এই বইটা পড়েছ ? হামি উত্তরে বললুম, হ্যাঁ, নিশ্চয়ই । বইটার মার্জিনে দ্যাখো । আমার আর মলয়ের নোটস দেখতে পাবে।”
স্পেংলারের দর্শনে প্রেরণা পেয়ে মলয় তাঁর আন্দোলনের পরিকল্পনাভূমি তৈরি করেছিলেন । ‘হাংরি’ শব্দ পেয়েছিলেন জিওফ্রে চসারের In the sowre hungry tyme পঙক্তি থেকে ।
বিহারের বিভিন্ন বৌদ্ধধর্মের তীর্থস্হানগুলো ঘোরার সময়ে এপ্রিল ১৯৬৩ সালে গিন্সবার্গ পাটনায় রায়চৌধুরীদের দরিয়াপুরের বাড়িতে কিছুদিন ছিলেন ।
সমীর বললেন, “একদিন আমার মে দেখলেন উঠোনে স্নানের জায়গায় উলঙ্গ হয়ে স্নান করছেন গিন্সবার্গ ।”
“মা আমাব জিগ্যেস করলেন, ‘ও অমন করে চান করছে কেন ?’ আমি বললুম ওইভাবেই ওরা নিজেদের দেশে চান করে । মায়ের ভালো লাগেনি শুনে । উনি ওপর থেকে দুটো তোয়ালে ফেলে দিলেন গিন্সবার্গের ওপর, আর বাংলায় বললেন, ‘খোকা, নিজেকে ঢেকে নাও আর এই তোয়ালে দিয়ে গা পোঁছো।’”
হাংরি আন্দোলনের কবি এবং লেখকরা দেখছিলেন প্রতিষ্ঠিত সংস্কৃতির সীমানাগুলোকে লঙ্ঘন করার তাঁদের যে প্রয়াস তা সমসাময়িক সমাজ কতটা সহ্য করতে পারে ।
১৯৬৩ সালে আন্দোন যখন শীর্ষবিন্দুতে পৌঁছেচে সেসময়ে তাঁরা জীবজন্তু, দানব, জোকার আর কার্টুন চরিত্রের মুখোশ পাঠিয়েছিলেন খ্যাতনামা ও প্রভাবশালী লোকেদের । মুখোশের ওপরে ছাপানো বার্তা ছিল, ‘দয়া করে মুখোশ খুলে ফেলুন” -- হাংরি জেনারেশনের পক্ষ থেকে ।”
১৯৬৪ সালের ২রা সেপ্টেম্বর যেন নরক গুলজার হলো ! মলয়, সমীর, দেবী রায় এবং তাঁদের দুই সহযোগী সুভাষ ঘোষ ও শৈলেশ্বর ঘোষকে সাহিত্যে অশ্লীলতা ও রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রর অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হল । মলয়ের ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ কবিতাটির জন্য নিম্ন আদালতে সাজা হয়েছিল । পরে ১৯৬৭ সালের ২৬ জুলাই কলকাতা হাইকোর্ট তাঁর সাজা নাকচ করেন ।
মলয় কিন্তু এখনও প্রতিষ্ঠানের বিরোধিতা করেন । তাঁকে জিজ্ঞাসা করতে যে, কেন তিনি সাহিত্য অকাদেমি অ্যাওয়ার্ড প্রত্যাখ্যান করলেন, উত্তরে মলয় বলেছিলেন, “আমি কোনো সাহিত্য পুরস্কার নিই না, কেননা যে সংস্হা পুরস্কার দেয় সে তার মূল্যবোধ চাপিয়ে দেয় পুরস্কারের সঙ্গে।”
হাংরি আন্দোলনের ওপর গিন্সবার্গের প্রভাব এবং গিন্সবার্গের ওপর হাংরি আন্দোলনের প্রভাব নিয়ে অনেক তর্কবিতর্ক হয়েছে । মলয় এবং সমীর দাবি করেছেন যে হাংরি আন্দোলনকারীরাই গিন্সবার্গকে তিনটি মাছের একটি মাথার প্রতীকের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল, যা পরবর্তীকালে গিন্সবার্গের ব্যক্তিগত মোটিফ হিসাবে এবং ‘ইনডিয়ান জার্নালসসহ ( ১৯৭০ ) তাঁর অন্যান্য বইতে ব্যবহৃত হয়েছে । মলয় বলেছিলেন যে গিন্সবার্গ ওই প্রতীক পেয়েছিলেন আকবরের সিকান্দ্রার সমাধি থেকে এবং পাটনার খুদাবক্স ওরিয়েন্টাল লাইব্রেরিতে সংরক্ষিত ফারসি বই ‘দীন-ই-ইলাহি’র চামড়ায় বাঁধানো প্রচ্ছদ থেকে ।
নিজের ‘ইনডিয়ান জার্নালস’ বইতে গিন্সবার্গ এই বিষয়ে উল্লেখ করেননি । কিন্তু ভারতে তাঁর আগমন বহু ইউরোপীয় ও আমেরিকানের মনে আগ্রহের সঞ্চার করেছিল, তাদের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হল বিটলস গায়কদের দল ।
.




Name:  nayanima basu          

IP Address : 012312.60.90012.13 (*)          Date:01 Jan 2019 -- 07:20 PM

নয়নিমা বসু
হাংরি আন্দোলন ও পচনরত কালখণ্ড
পশ্চিমবাংলার দেশভাগোত্তর অন্ধকারাচ্ছন্ন কালখণ্ড এক নতুন প্রতিবাদী সাহিত্যের জন্ম দিয়েছিল । মলয় রায়চৌধুরী যিনি হাংরি আন্দোলনের স্রষ্টাদের অন্যতম তিনি পঞ্চাশ বছর পর আমার সঙ্গে এই আন্দোলনের জীবন সম্পর্কে আলোচনা করলেন ।
“একটি সংস্কৃতির অবসানের সময়ে সেই সমাজের মানুষ যা পায় তা-ই আত্মসাৎ করতে থাকে”, মুম্বাইয়ের কাণ্ডিভালির একঘরের ফ্ল্যাটে বসে চিন্তারত মলয় রায়চৌধুরী বললেন, “আজকে যখন পশ্চিমবাংলার দিকে পেছন ফিরে তাকাই তখন হাংরি আন্দোলনের পূর্বাশঙ্কাকে ভবিষ্যবাণীর মতন মনে হয়।”
মলয় রায়চৌধুরী, এখন ৭২ বছর বয়স, যিনি প্রথম থেকেই ছিলেন প্রতিবাদী সাহিত্যিক, নভেম্বর ১৯৬১ সালে আভাঁগার্দ সাহিত্য আন্দোলন হাংরি জেনারেশন আরম্ভ করেছিলেন । সেই আন্দোলন সমাজের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল এবং ভদ্রলোক বঙ্গ সমাজের কটু সমালোচনার কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল । হাংরি আন্দোলন বাংলা সাহিত্যের প্রথাবাহিত মৌল তর্কবিন্দুগুলোকে চ্যালেঞ্জ করেছিল ।
সেই সময়ে কলকাতা, যাকে তখন বলা হতো ক্যালকাটা, অত্যন্ত দ্রুত পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে যাচ্ছিল। দেশভাগের সর্বনাশা কারণে উৎখাত মানুষদের ভয়াবহ স্রোত বদলে দিচ্ছিল কলকাতা শহর ও তার আশেপাশের শহরতলি অঞ্চলকে । দেশভাগের আগে থেকেই আতঙ্কিত মানুষেরা পশ্চিমবাংলায় আসা আরম্ভ করেছিল এবং তা ষাটের দশকে এবং তার পরেও বহুকাল বজায় ছিল । ১৯৫৯ পর্যন্ত বহু মানুষ গৃহহীন হয়ে গিয়েছিল, এমনকি ভিটে ছাড়ার সময়ে খুন হয়েছিল । যুবসমাজের একটা অংশ এই সর্বনাশকে সহ্য করতে অপারগ ছিল । তাদের মনে হয়েছিল যে ভারতের কংগ্রেস পার্টির নেতারা স্বাধীনতা আন্দোলনের সময়ে যে স্বপ্ন দেখিয়েছিল তা পরিণত হয়েছে ভয়ংকর দুঃস্বপ্নে । নিজেদের ক্রোধকে প্রকাশ করার জন্য কয়েকজন তরুণ আরম্ভ করলেন হাংরিয়ালিস্ট আন্দোলন, যা হাংরি জেনারেশন নামে খ্যাত ।
সাক্ষাৎকারে মলয় রায়চৌধুরী বললেন, “১৯৫৯-৬০ সালের পশ্চিমবঙ্গ পৌঁছে গিয়েছিল পচনের টকে যাওয়া কালখণ্ডে ; আমার বয়সী যুবকেরা অত্যন্ত ক্ষুব্ধ ছিল। এই সময়ে সমাজের প্রভাবশালী ক্ষমতাকেন্দ্র থেকে বিতাড়িত করা হচ্ছিল বুদ্ধিজীবীদের, যে ক্ষমতাবিন্যাস ততদিনে দখল করে নিয়েছিল রাজনীতিকদের দল, যারা বেশির ভাগই ছিল কানা গলির ব্যক্তিএকক । পশ্চিমবাংলাকে ছেয়ে ফেলেছিল পার্টিশানের ঝোড়ো তরঙ্গ । আমার মানসিক অবস্হা কবিতা লেখার পরিবর্তে এই পচনের দিকে আকৃষ্ট হয়েছিল । ফলে আমরা পরামর্শ করে হাংরি আন্দোলন আরম্ভ করতে বাধ্য হলুম ।”
মলয় রায়চৌধুরী এই আন্দোলন আরম্ভ করেছিলেন তাঁর দাদা সমীর রায়চৌধুরী এবং আরও দু’জন কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায় ও দেবী রায়ের সঙ্গে । তিনি ‘হাংরি’ ধারনা পেয়েছিলেন মধ্যযুগের ইংরাজ কবি জিওফ্রে চসারের ‘ইন দি সাওয়ার হাংরি টাইম’ পঙক্তি থেকে । এই চারজন বাঙালি কবি মিলে হাংরি বুলেটিন ও ম্যানিফেস্টো প্রকাশ করতে লাগলেন আর তা বিলি করা আরম্ভ করলেন কলকাতার বিখ্যাত কফিহাউসে, সরকারি অফিসে, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়, সংবাদপত্র দপতরে ।
রায়চৌধুরী ভাতৃদ্বয় দ্বারা আরম্ভ-করা এই আন্দোলনের কোনো দপতর, হাইকমাণ্ড বা পলিটব্যুরো ধরণের কেন্দ্র ছিল না এবং এর সদস্যরা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে যে কোনো রচনা লিখে নিজেরা প্রকাশ করতে পারতেন । মলয় রায়চৌধুরী বললেন, “হাংরি আন্দোলনের আগে আর কোনো এরকম সামাজিক-রাজনৈতিক সাহিত্য আন্দোলন হয়নি। তাছাড়া আমরা আধুনিকতাবাদী সাহিত্যিক মূল্যবোধের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলেছিলুম। বহু যুবক লেখক ও চিত্রশিল্পী আন্দোলনে যোগ দেয়া আরম্ভ করলেন । সরকার যখন আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে হস্তক্ষেপ আরম্ভ করল, ততদিনে তিরিশ জনের বেশি সদস্য হয়ে গিয়েছিল।”
মলয় রায়চৌধুরী পাটনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর করেছিলেন । বাংলা সাহিত্যে তাঁর আগ্রহ তাঁর দাদা সমীর রায়চৌধুরীর কারণে, যিনি কলেজে পড়ার জন্য পাটনা থেকে কলকাতায় চলে গিয়েছিলেন এবং আদি নিবাস উত্তরপাড়ায় সেসময়ে থাকতেন ।
প্রশাসনের দৃষ্টি হাংরি আন্দোলনকারীরা সেই সময়ে আকর্ষণ করলেন যখন তাঁরা ক্ষমতাধিকারীদের, বাঙালি রাজনৈতিক নেতাদের, আমলাদের এবং সংবাদপত্রের মালিকদের জোকার, দানব, দেবী-দেবতা, রাক্ষস, কার্টুন ইত্যাদির কাগজের মুখোশ পাঠিয়ে জানালেন “দয়া করে মুখোশ খুলে ফেলুন।”
২রা সেপ্টেম্বর ১৯৬৪ এগারোজন হাংরি কবির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হলো । তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র এবং সাহিত্যে অশ্লীলতা । মূল অভিযোগ ছিল মলয় রায়চৌধুরীর বিরুদ্ধে তাঁর ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ কবিতায় অশ্লীলতার জন্য, ইংরেজিতে ‘স্টার্ক ইলেকট্রিক জেশাস’ নামে অনুদিত ।
আদালতে মামলা বেশ কয়েক বছর যাবত চলল । তাঁদের বিরুদ্ধে মামলার সংবাদ ৪ নভেম্বর ১৯৬৪ টাইম ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হল এবং তার ফলে সারা পৃথিবীর দৃষ্টি আকর্ষণ করল । ওক্তাভিও পাজ, আর্নেস্টো কার্ডেনাল প্রমুখের মতন কবি মলয় রায়চৌধুরীর সঙ্গে দেখা করলেন । বিট আন্দোলনের কবি অ্যালেন গিন্সবার্গও মলয় রায়চৌধুরীর বাড়িতে গিয়েছিলেন । এর ফলে ভুল ধারনা প্রচারিত হয়েছিল যে হাংরি আন্দোলনকারীরা বিট আন্দোলনের দ্বারা প্রভাবিত ।
মলয় রায়চৌধুরী তাঁর সাক্ষাৎকারে জানালেন, “প্রচারের দরুন আমার কবিতা ইউরোপের বিভিন্ন ভাষায় অনুদিত হয়ে সেখানকার লিটল ম্যাগাজিনগুলোয় প্রকাশিত হওয়া আরম্ভ হলো । নিউ ইয়র্কের সেইন্ট মার্কস চার্চে আমার কবিতার পাঠ-অনুষ্ঠানের আয়োজন করে হয়েছিল মামলার খরচ তোলার জন্য । এই সাহায্যগুলো ছাড়া হাইকোর্ট পর্যন্ত মামলা লড়া আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না । আমার আর্থিক অবস্হা ভালো ছিল না । বেশিরভাগ হাংরি বন্ধু আমাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন । আমি রিজার্ভ ব্যাঙ্কের চাকরি থেকে সাসপেণ্ড হলুম, আমার জেলহাজতের সংবাদে আমার ঠাকুমা হার্ট অ্যাটাকে মারা গেলেন । আমি সাময়িকভাবে লেখালিখি ছেড়ে দিলুম।”
মলয় রায়চৌধুরী আরও বললেন যে, পরবর্তী নকশাল আন্দোলনের কারণে হাংরি আন্দোলন এক প্রকার আড়ালে চলে গিয়েছিল, যদিও নকশালরা সেরকমভাবে প্রতিষ্ঠানবিরোধী লেখালিখি করেননি ।
শেষ পর্যন্ত সাহিত্যিকদের সহযোগীতায় এবং পরিবারের সমর্থনে মলয় রায়চৌধুরী মামলায় জিতে যান। কিন্তু ততদিনে আন্দোলন স্তিমিত হয়ে গিয়েছিল । বর্তমানে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং হিন্দি ভাষায় ( ভুখি পীঢ়ী এবং হাংরি জেনারেশন হিসাবে খ্যাত ) এই আন্দোলন সম্পর্কে বৃহত্তর জনগণ বিশেষ জানেন না এবং বিষয়টি বুঝতে পারেন না ।
মলয় রায়চৌধুরী বললেন যে, “আমি মনে করিনা হাংরি আন্দোলন বিফল হয়েছিল ; সরকার এই আন্দোলনকে দাবিয়ে দিয়েছিল । এই আন্দোলন আরও বহু ভারতীয় ভাষায় ছড়িয়ে পড়ছিল এবং সেই সময়ে রাষ্ট্র হস্তক্ষেপ করে বাধার সৃষ্টি করেছিল । শক্তি চট্টোপাধ্যায়, যাঁকে নেতার পদ দেয়া হয়েছিল, তিনি ১৯৬৩ সালে আন্দোলন ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন আর আমাদের বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠানে যোগ দিলেন । কয়েকজন, যাঁরা উদবাস্তু পরিবার থেকে এসেছিলেন, ভয়ে আন্দোলন ছেড়ে চলে গেলেন, কেনা তাঁরা জানতে পেরে গিয়েছিলেন যে সরকার আন্দোলনের বিরুদ্ধে হস্তক্ষেপ করতে চলেছে । কয়েকজনকে সিপিএম এবং অন্যান্য বামপন্হী দল লোভ দেখিয়ে ভাঙিয়ে নিয়ে চলে গিয়েছিল ( যেমন শৈলেশ্বর ঘোষ, সুভাষ ঘোষ প্রমুখ )।”
১৯৬৮ সালে মলয় রায়চৌধুরী সলিলা মুখোপাধ্যায়কে বিয়ে করেন, যিনি রাজ্য স্তরের ফিল্ড হকি খেলোয়াড় ছিলেন । আদালতে মামলা জিতে যাবার পর মলয় লখনউতে এআরডিসিতে যোগ দেন । মলয় এ-পর্যন্ত সত্তরটির বেশি বই লিখেছেন, সবই ছোটো প্রকাশকদের দ্বারা প্রকাশিত - প্রচুর পাঠক থাকা সত্ত্বেও বড়ো প্রকাশকরা আগ্রহ দেখান না । দুই বার হার্ট অ্যাটাকের পর এবং অ্যাঞ্জিওপ্লাস্টি ও আরথ্রাইটিসের কারণে মলয় কলম ধরে লিখতে পারেন না, কমপিউটারে টাইপ করে লেখেন ।
মলয় রায়চৌধুরী বললেন, “তরুণরা প্রায়ই আমাকে অনুরোধ করেন আবার হাংরি আন্দোলন আরম্ভ করার জন্য । আমি তাঁদের বলি নিজেদের সময় ও পরিসরকে নিজেরা বিশ্লেষণ করে পদক্ষেপ নিতে এবং নিজস্ব প্ল্যাটফর্ম গড়ে নিতে ।”
ঋণস্বীকার : বিজনেস স্ট্যাণ্ডার্ড
২১ জানুয়ারি, ২০১৩















Name:  pritha          

IP Address : 012312.60.90012.13 (*)          Date:01 Jan 2019 -- 07:22 PM

পৃথা রায় চৌধুরী : মলয় রায়চৌধুরীর কবিতা
বিতর্ককে নস্যাৎ করে কজন হয়ে উঠেছেন নিজস্ব ঘরানার ব্র্যান্ড নেম? বিতর্ককে কবচকুন্ডল করেই আজও তিনি সোজা কথায় বলেন,
“একাই লড়েছিলুম।
কেউ বলেনি ‘হোক কলরব’।
একাই নেমেছিলুম ব্যাংকশাল কোর্টের সিঁড়ি বেয়ে।
সেদিন একাই ঘুরেছিলুম কলকাতার পথে সকাল পর্যন্ত।”
তাই তো তিনি হাজার কোটি মেকিদের থেকে এতটা ওপরে। একাই লড়েছেন আর জিতে গেছেন, আমাদের অনেকেরই ক্ষমতা নেই এভাবে রুখে দাঁড়াবার। নিজের প্রতি, নিজের কবিতার প্রতি সৎ থাকতে তিনিই পেরেছিলেন, পেরেছিলেন নির্দ্বিধায় সাহিত্য অ্যাকাডেমি সহ বহু পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করতে।
“আমি লক্ষ্মীকান্ত, মহারাজা প্রতাপাদিত্যের অমাত্য, সাবর্ণ গোত্রের যোদ্ধা
আজ পর্যন্ত কেউ তরোয়াল চালানোয় আমাকে হারাতে পারেনি
কতো মুণ্ড এক কোপে ধরাশায়ী করেছি তার গোনাগুন্তি নেই
আমার বংশধরেরা তাই করবে একদিন, প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে--
ঘোড়ার পিঠে বসে চালাবে তরোবারি, যারাই সামনে আসবে মূর্খ মুণ্ড
গলা থেকে কেটে ফেলবে ধুলায়, সেসব মুণ্ড বেঁচে থাকবে, কথা বলবে
দরবারে গিয়ে যে-যার লেজটি নাড়িয়ে রাজা বা রানির সেবাদাস হয়ে
সারটা জীবনভর ঘেউ-ঘেউ করে ক্রমে-ক্রমে জীবাশ্মের রূপ নেবে”
লাইন কটা তুলে নিয়েছি ‘আমি লক্ষ্মীকান্ত, মহারাজা প্রতাপাদিত্যের অমাত্য’ কবিতা থেকে, শিহরিত হয়েছি বারবার এই কবিতা পড়ে, মনে-মনে বলেছি, “যথার্থ ! যথার্থ বলেছো মলয় রায়চৌধুরী, নিজের বংশগৌরবে গৌরবান্বিত তুমি। সেই আপোষহীন উচ্চশির লক্ষ্মীকান্তের বংশধর তুমি… সাবর্ণ রায় চৌধুরী বংশের ৩৪তম উত্তরপুরুষ, প্রতি পদে রয়েছো আপোষহীন, নির্ভীক।” ১৬ই জুলাই, ২০১৭ এই কবিতা আমি পড়ি ফেসবুকেই ওঁর পোস্টে। কবিতায় সাবর্ণ রায়চৌধুরীদের ইতিহাস জীবন্ত হয়ে উঠছে প্রতি শব্দে, ছত্রে আর আমাকে বলেছে, "চিনে নে!" এই কবিতায় কিন্তু আমরা কবির ভেতর দিয়েই মানুষটাকেও দেখতে পাচ্ছি, চিরকালের প্রাতিষ্ঠানিকতায় মাখানো অন্যায়ের বিরুদ্ধে মুখর হয়ে ওঠা, একা লড়াকু মানুষটা, যার হাতের কলম বরাবর তরোয়ালের মতোই ঝলসে উঠেছে, ফালাফালা করে দিয়েছে যা কিছু বস্তাপচা।
না, এখানে মানুষ মলয় রায়চৌধুরীকে নিয়ে মোটেই আলোচনা করতে বসিনি, সেই স্পর্ধা আমার নেই, মনে-মনে কেবল এই ভেবে গর্বিত হই, এই মহান কবি, সম্পর্কে আমার জ্যাঠাশ্বশুর হন, আর এঁর লেখা পড়ে পড়ে শিউরে উঠি কেবল। নিজে যেহেতু কবিতা লিখি, তাই বিশেষ করে পড়ে ফেলি ওঁর কবিতা, বুঝি, কতটা আপাতসরল ভাষ্যের ভেতর দিয়ে উনি নিংড়ে বার করে আনেন মানুষের ভেতরের সমস্ত দ্বিধা, দ্বন্দ্ব, জটিল ভাবনা বা চলতে থাকা নানান সংঘাত। বসেছি ওনার কবিতা সম্পর্কে সামান্য দুকলম লিখতে, কিন্তু প্রতি পদক্ষেপে যেন মনে হচ্ছে কবি মলয় রায়চৌধুরীর কবিতার সামনে আমরা সকলে এতোটাই হীন, যে তাঁর সব কবিতা নিয়ে আমরা আলোচনা তো করতে পারি, কিন্তু তা হয়ে দাঁড়ায় সুউচ্চ পর্বতের নীচে দাঁড়িয়ে ঘাড় উঁচু করে পর্বতশৃঙ্গের ভয়াল সৌন্দর্যকে ব্যাখ্যা করার সমতুল্য।
কবি তাঁর বহু বিতর্কিত ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ কবিতা লেখার ‘অপরাধে’ অশ্লীলতার দায়ে কারাবাস করেন, এ কথা সাহিত্য জগতের প্রতিটি মানুষ জানেন, এই কবিতা নিয়ে আজও প্রতিনিয়ত সাহিত্য সংক্রান্ত গবেষণা করা হয়, আন্তর্জাতিক স্তরেও। যা এককালে কবিকে অপমানজনক পরিস্থিতিতে দাঁড় করিয়েছিল, তা এখন একপ্রকার কিংবদন্তী। বড়ো বেশি শরীরধর্মী, যৌনতার আঁশটে ভাষায় লেখা এই কবিতা পড়ে আপাতভাবে শ্লীল সমাজ চোখে-মনে কাপড় বেঁধে গান্ধারী হয়ে যান আজও, অথচ কবিতাটির ভেতর যে চরম যন্ত্রণার প্রকাশ, তা বুঝে নিতে পারলে, এই কবিতা হয়ে ওঠে অমৃত, আপাত অশ্লীল ভাষ্যের গরল মন্থন করে পাঠক পেয়ে যান অমৃত। যন্ত্রণা অপরিসীম, কবিতাটির নিচের কটি লাইনে…
“প্রতিটি শিরা অশ্রুস্রোত বয়ে নিয়ে যাচ্ছে হৃদয়াভিগর্ভে
শাশ্বত অসুস্থতায় পচে যাচ্ছে মগজের সংক্রামক স্ফুলিঙ্গ
মা, তুমি আমায় কঙ্কালরূপে ভূমিষ্ঠ করলে না কেন ?
তাহলে আমি দুকোটি আলোকবর্ষ ঈশ্বরের পোঁদে চুমু খেতুম
কিন্তু কিছুই ভালো লাগে না আমার কিছুই ভালো লাগছে না”
আবার কতটা তীব্র ব্যথা অনুভব হলে কবি এমন অস্থির ভাবে লিখতে পারেন,
“আমি আমার নিজের মৃত্যু দেখে যেতে চাই
মলয় রায়চৌধুরীর প্রয়োজন পৃথিবীর ছিল না
তোমার তীব্র রূপালি য়ুটেরাসে ঘুমোতে দাও কিছুকাল শুভা
শান্তি দাও, শুভা শান্তি দাও”…
পাঠক ঢুকে যান কবিতার ছত্রে ছত্রে রন্ধ্রে রন্ধ্রে, কি মারাত্মক আঘাত করেছেন কবি প্রতিষ্ঠানকে, ভেঙ্গে গুঁড়িয়ে দিয়েছেন চাঁদ-তারা-নদী-তুমি আমি-ফল্গুধারা কাব্যভাষাকে। আর এই প্রচণ্ড বেগে হুড়মুড়িয়ে ঢুকে আসা কর্কশ সপাট কবিতাকে হজম করে নিতে তখনও বহু মানুষ পারেননি, আজও পারেননা, বলাই বাহুল্য।
ঝলসে দেওয়া কবিতার কণ্ঠ তাঁর হয়তো ছোটবেলার অস্বাচ্ছন্দের জন্য বেড়ে ওঠা ক্ষোভ বিদ্রোহ ভরা বুকের একেবারে ভেতরের অনুভূতির জন্য। আবার এই কবিই ‘আমার জন্মদিন নেই’ কবিতায় লিখে ফেলেন,
“ঠাকুমা কবে জেঠা আর বাবাকে প্রসব করেছিলেন
তার তিথি ঠাকুমা জানেন
প্রসবদিন পালনের তো কোনো রেওয়াজ নেই
তাই মা আমাকে কোন তিথিতে প্রসব করেছিলেন জানি
মায়ের কষ্টের গল্প জানি
হাসপাতালে ভর্তির গল্প জানি
কিন্তু আমার জন্মদিন জানি না”...
সাধারণ পাঠক আমি, কবির অন্তরাত্মা ছুঁয়ে বলি, এতটাও নরম ভাব এই রুক্ষ জমিতে থাকে ! কেবল বারুদ আর লাভা নিয়ে যে কবির বিচরণ, তার ভেতরের প্রকৃত মানুষ হৃদয় কেই বা সহজে বুঝেছে!
পাঠক যেন ক্রমাগত তড়িদাহত হতে থাকেন তাঁর বিজলীসম কবিতায়। কবির তাৎক্ষনিক মনের ভাব, চঞ্চলতা তিনি প্রকাশ করেন ভিন্ন ভিন্ন থিমের কবিতায়। আবার এই তিনিই ‘নখ কাটা ও প্রেম’ কবিতায় হঠাৎ লিখে ফেলেন, বলা ভালো প্রশ্ন করে বসেন,
“রবীন্দ্রনাথ, দেড়শ বছর পর একটা প্রশ্ন আপনাকে :
কে আপনার নখ কেটে দিত যখন বিদেশ-বিভুঁয়ে থাকতেন--
সেই বিদেশিনী ? নাকি চৌখশ সুন্দরী ভক্তিমতীরা ?”
ভাবা যায়? নেকুপুষু প্রেমের কবিতা লিখে তুলতুলে ভাব ভাগ্যিস তিনি তাঁর কবিতায় আনেননি। বরাবর প্রথাভাঙ্গার নিদর্শন হয়েছে তাঁর প্রায় প্রতিটা কবিতা। কি অসামান্য প্রেম দেখিয়েছেন তিনি তাঁর ‘বুড়ি’ কবিতায়। গভীর প্রেম এই কবিতায়।
“এও আমাকে বলে এবার ঘুমোও
আর রাত জাগা স্বাস্হ্যের পক্ষে
খারাপ, এই বুড়ি যে আমার বউ
বিছানায় শুয়ে বলে, কাউকে নয়
কাউকে দিও না খবর, কারুক্কে নয়--
এ-কথাটা আমারই, কাউকে নয়
কারুক্কে বোলো না মরে গেছি ।“
মন খারাপ করে, গলায় ব্যথা ব্যথা কষ্ট হয়, অথচ কি চরম প্রেম ! গভীর অনুভূতি, পরম ভরসা ফুটে ওঠে, প্রতি ছত্রে। বিষাদেরও যে এমন মিঠে সোয়াদ, তা বোধহয় এই কবিতা পড়লে তবেই বোঝা যায়। এ যেমন একাধারে প্রেমের কবিতা, তারই সাথে এ চিরশাশ্বত মৃত্যুচেতনার কবিতা। আমরা ভাবতে বাধ্য হই, এই এত আঁকড়ে থাকা, এত ভালোবাসা, এত জীবন-প্রাচুর্যের মাঝেও মৃত্যুচেতনা কতটা ঘিরে রাখে আমাদের অবচেতন।
মলয় রায়চৌধুরীর দাদা অর্থাৎ স্বর্গত সমীর রায়চৌধুরীর মৃত্যুর পরের দিন লেখা কবির যে কবিতা, ‘সেন্স অফ লস' এর স্তবগান, তা যেন পাঠককে কবির জায়গায় বসিয়ে দেয়,
“কাল বাইশে জুন, ২০১৬, সকাল আটটা পনেরোয় দাদা মারা গেছেন
দাদা সমীর রায়চৌধুরী”…………
“কাল, বাইশে জুন ২০১৬, সকাল আটটা পনেরোয় দাদা মারা গেছেন
দাদা মানে মিনু”
কবিতার প্রথম লাইন কবিতার মাঝামাঝি আবার ফিরে এসেছে। প্রথম লাইনের পরে এসেছে প্রয়াত দাদার পোশাকি নাম, আর মাঝখানে এসেছে দাদার ডাকনাম। এইভাবে একই লাইনের ব্যবহারে, অথচ দুবার দুরকম নামের ব্যবহারে আমরা আসল ,সেন্স অফ লস, বুঝতে পারি। বুঝতে পারি, কতটা জড়িয়ে রাখেন কবি তাঁর সদ্যপ্রয়াত দাদার স্মৃতি, কতটা হারাবার বোধ পীড়াদায়ক হয়ে উঠেছে কবির কাছে।
“চাঁদোয়ায় আগুন লাগিয়ে তার নীচে শুয়ে আকাশের উড়ন্ত নীল দেখছি এখন
দুঃখ-কষ্টের শুনানী মুলতুবি রেখে আমি আমার সমস্ত সন্দেহকে জেরা করে নিচ্ছি
হাতের রেখার ওপর দিয়ে গ্রামোফোনের পিন চালিয়ে জেনে নিচ্ছি আমার ভবিষ্যত”
হাংরি জেনারেশানের পুরোধা কবির নিজের বিশেষ প্রিয় কবিতা ‘জখম’ ( ১৯৬৫ ) থেকে নেওয়া এই কটা লাইনে দ্রিম দ্রিম করে শুরুয়াতি সুর শোনা যায় এক অনন্ত ক্ষুব্ধ আহত অস্থির কণ্ঠের কবিতার। জখম ভর্তি কবি হৃদয় থেকেই কাব্যধারায় বেরিয়ে আসে এই অনন্ত শোণিতাভ দীর্ঘ কবিতা, কবিতায় বারবার প্রয়োগ হয়েছে তাঁর নিরীক্ষার বিশেষ বানানরীতি...
“বুকের বাঁদিকের আর্মেচার পুড়ে গেছে বহুকাল
এখন চোখ জ্বালা কোর্ছে মলয়ে কঙ্কাল জ্বালানো ধোঁয়ায়
আশপাশ দিয়ে ঘণ্টায় ৯৯ কিলোমিটার দরে উড়ে যাচ্ছে বদমতলব ঝড়
কব্জিতে ঘড়ির কাঁটা রেখে চলে যাচ্ছে সারসার সমদ্বিঠ্যাঙ মানুষের লাভলোক্সানময় দল”
আবার কি অনায়াস উচ্চারণে কবি তাঁর লেখা অবিস্মরণীয় ছত্রগুলোর ইংরেজি অনুবাদ করেছেন সময়ে সময়ে...
“armature on the left turned slag long ago
now eyeflesh twitching in the smoke of malay's burning
skeleton
dismantled tempests sweep by at 99mph
uniform queues of wristwatched zombies tattle”
রাজনৈতিক বা তৎকালীন সাম্প্রদায়িক যতো অসহিষ্ণুতা এবং অস্থিরতা যেন ফুটে ওঠে এই জখম ভর্তি কবিতায়। যা তখন সত্যি ছিল, তা আজও চরম প্রাসঙ্গিক। তাই এটুকু বলাই যায়, কবি মলয় রায়চৌধুরী সময়ের থেকে এগিয়ে গিয়ে নিজের অন্তঃস্থল খুঁড়ে, সচেতনভাবে মানুষের কথা বলে যান তাঁর কবিতায়। তিনি কাব্যকথায় মানুষের অবচেতনের সমস্ত কথা এবং সচেতন যাপনের সার কথা সমস্তই বলে যান অকপট ভাবে।

এই কবি তাঁর কবিতা সম্পর্কে বলেছেন, তাঁর “কবিতা পায়”; ঠিক মানুষের বাকি সব পাওয়ার মতোই কবিতাও পায়। কবিতার সাথে কতটা ওতপ্রোত ভাবে সম্পৃক্ত হলে, একাত্মতা থাকলে এবং কবিতার প্রতি একনিষ্ঠ থাকলে, কেউ এই কথা বলতে পারেন, তা সাধারণের পক্ষে বোঝা হয়তো দুষ্কর। গতানুগতিকতার মন্থর চালে চলে আসতে থাকা বাংলা কবিতার রক্ষণশীল বেড়াকে তিনি তাঁর কথ্যভাষার বম্বশেলে গুঁড়িয়ে দিতেই “গেল গেল” রব যেমন উঠেছিলো, সেই রবের কারণগুলোকে কিন্তু লুকিয়ে-চুরিয়ে হলেও পড়ে ফেলত গোঁড়া বাঙালি। ভাষা সাহিত্যের তথাকথিত এলিট ক্লাস সেসব না পড়ে ফেললে, নিজেদের টলোমলো আসন সামলে রাখার জিগিরে কীভাবে গেল গেল রবের হিড়িক তুলতেন?
ভয় পেয়েছিলেন কি এই আগুন কলমকে তাঁরা?
সম্প্রতি পড়লাম তাঁর কবিতা ‘রাষ্ট্রের বহি-খাতা’; পড়েই নিজেকে এবং অসংখ্য মানুষের অত্যন্ত সমস্যাসংকুল জীবনের এক মোক্ষম প্রশ্নের সম্মুখীন দাঁড়াতে হল, আমরা কি হরেদরে সকলেই এই সাংবিধানিক গণতন্ত্রের চাকার চোখে নিজের দেশে অভিবাসী মাত্র? আমাদের নাগরিকত্ব, আমাদের স্বদেশের শেকড় কি কেবল সরকারের ঠাপ্পা মারা, সরকারী শিলমোহর আঁকা কয়েক টুকরো কাগজের মুখাপেক্ষি?
“ দলিল থাকলেও ফেলে দিতুম, তবে দলিলের জেরক্স
দেখেছিলুম, ষোড়শ শতকের কারোর ফার্সিতে লেখা নাম
এখন রাখি কেমন করে প্রমাণ করবে যে ষোড়শ শতকের
সেই পূর্বপুরুষে ওর রক্তের শেকড় রয়েছে?
বাড়ির ট্যাক্স বাবা দিতেন, তার আগে দাদু
দাদুর বাবা, তার আগে নবাবের খাজনা--
বিলডার ঘুষের ঠেলা মেরে মালিকানার
সমস্যা সমাধান করে ফেলেছিল
এখন রাখি কেমন করে প্রমাণ করবে যে
ও ভারতের সত্যিকারের নাগরিক?”
রাখি কবির বোন। বোনের ন্যায্য চিন্তার মধ্যে দিয়ে আসলে তিনি প্রতিফলিত করেছেন এই দেশের নাগরিকদের চিন্তাক্লিষ্ট চেহারা।
কবি শ্লেষাত্মক ভঙ্গীতে লিখে ফেলেছেন ‘রাস্তার কবিতা’। তার ছত্রে ছত্রে লেখা আছে, বলা ভালো বয়ান করা আছে আমাদের তুচ্ছতা। আপাতদৃষ্টিতে এখানে যা শুধু কবির দুর্ভাগ্যজনক পরিস্থিতির লঘু বর্ণনা, তা আসলে গভীরে ঢুকে নাড়া দেয় আমাদের, বুঝিয়ে দেয়, এইটুকুই আমাদের মূল্য। চোখ বাঁধা অন্ধ আমাদের ঝাঁকুনি দেয় তাঁর সোজা সরল কথ্য ভাষায় লেখা গভীর অর্থবহ সমস্ত কবিতা।
“কাগজ কুড়োনোর কাজ আরম্ভ করে প্রথম ছেঁড়া নোংরা কাগজের টুকরো
তুলেই কাজটা ছেড়ে দিতে হলো
কাগজটা দিয়ে দিলুম কুড়ানিকে
যে আঁস্তাকুড় থেকে কাগজ বাছাই করছিল
আসলে যে কাগজটা তুলেছিলুম সেটায় দেখলুম
আমারই একটা কবিতা, ‘কালিমাটি’ পত্রিকায় বহুদিন আগে
প্রকাশিত হয়েছিল”
মলয় রায়চৌধুরীর কবিতা নিয়ে লিখতে বসলে সামান্য কটা পাতায় তা সীমিত রাখা বড়ই কষ্টকর, অথচ সুবিশাল কিছু লেখা এখানে সম্ভব নয়, কারণ তা যে দুতিন পাতার ভেতর লিখতে হবে, তা কবি আগেই বলেছেন । তবুও সামান্য হয়তো বড়ো হয়ে গেল লেখাটা। তাঁর কবিতার কথা বলতে গেলে অবশ্যম্ভাবী ভাবেই আসবে ‘অবন্তিকা’র কথা। এক অনবদ্য প্রেমের কবিতা, ‘মাথা কেটে পাঠাচ্ছি, যত্ন করে রেখো’।
“মাথা কেটে পাঠাচ্ছি, যত্ন করে রেখো
মুখ দেখে ভালোবেসে বলেছিলে, "চলুন পালাই"
ভিতু বলে সাহস যোগাতে পারিনি সেই দিন, তাই
নিজের মাথা কেটে পাঠালুম, আজকে ভ্যালেনটাইনের দিন
ভালো করে গিফ্টপ্যাক করা আছে, “ভালোবাসি” লেখা কার্ডসহ
সব পাবে যা-যা চেয়েছিলে, ঘাম-লালা-অশ্রুজল, ফাটাফুটো ঠোঁট”…
হেন প্রেমিক বা প্রেমিকা নেই, যার অন্তঃস্থল পর্যন্ত শিরশির করে উঠবে না এই কবিতা পাঠ করে।
“কি-বোর্ডে পাকাচুল পড়ে, তুলো দিয়ে সরিয়ে দিই ; চশমার লেন্সে পাকাচুল পড়ে, মুছে সরিয়ে দিই। তবু লেখালিখি ছাড়তে ইচ্ছে করে না”... সম্প্রতি কবি এমনটাই বলেছেন। এক সাধারণ গুণমুগ্ধ পাঠিকার আসন থেকে চীৎকার করেছি, আরও, আরও লিখুন কবি, এত লিখুন যে আমাদের মগজের রক্তক্ষরণ যেন বন্ধ না হয়। রক্তের সরোবর বানান আমাদেরই হৃদয়ের ক্ষরণে, সেই সরোবরকে আয়না করে আমরা সকলে উঠে দাঁড়াই ঋজু ও দৃপ্ত কবিতার কাঁধে ভর করে। তাঁর নিজের ভাষায়, “কবিতা কেবল মঞ্চে বিড়বিড় করে পড়ার ব্যাপার নয়; উন্মাদের মতো চীৎকার করে না পড়লে প্রতিষ্ঠান কষ্টযন্ত্রণার গোঙানি শুনতে পায় না।” শিখি তাঁর প্রতিটি উক্তি থেকেও। কবি মলয় রায়চৌধুরীর কাছে “কবিতার কোনও সংজ্ঞা নেই, নির্দেশিকা হয় না তাই যা ইচ্ছা, যেমন ভাবে ইচ্ছা লিখুন”... এই মানুষের কবিতা নিয়ে আলোচনা করা কি সহজ কথা? যিনি কবিতাকেই প্রেমিকা করে নিতে পারেন, তাঁর কবিতার কাছাকাছি গিয়ে তাকে স্পর্শ করাই নিজের মধ্যে এক সুবিশাল অর্জন।
“আবলুশ অন্ধকারে তলপেটে লাথি খেয়ে ছিটকে পড়ি
পিছমোড়া করে বাঁধা হাতকড়া স্যাঁতসেঁতে ধুলোপড়া মেঝে
আচমকা কড়া আলো জ্বলে উঠে চোখ ধাঁধায়
তক্ষুণি নিভে গেলে মুখে বুট জুতো পড়ে দু-তিনবার”
তাঁর ‘আলো’ নামক কবিতার প্রথম চার লাইন উদ্ধৃত করে এই লেখা শেষ করছি। এই কবিতার মধ্যে দিয়ে কবি পেরেছিলেন সামগ্রিকরূপে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসকে ফুটিয়ে তুলতে। রাষ্ট্রের শাসনের নামে যে সন্ত্রাস, যার চাবুকের নীচে আলোহীন বাঁচতে থাকা বোবা মানুষেরা প্রতিবাদী হলেই, তারা প্রথা ভাঙতে চেষ্টা করলেই কি কি ঘটে যায়, তা ধরে রেখেছে এই কবিতার প্রতিটি শব্দ। অথচ লড়াকু প্রতিবাদী কবি কণ্ঠ লিখে ফেলে এই কবিতার শেষ লাইন দুটি মূল উপাদান হিসেবে...
“একসঙ্গে সব আলো আরেকবার নিভে গেলে
পরবর্তী আক্রমণ সহ্য করার জন্য নিজেকে তৈরি করে নিই।"
কলকাতার সাহিত্যজগত থেকে দূরে বসবাস করে কবি ভারতীয় সমাজের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতা থেকে সচেতনভাবে সৃষ্টিতে মেতে লিখে চলেছেন ষাটের দশক থেকে জ্যা মুক্ত তীরের মতো ক্ষিপ্র ধারালো কবিতা। তাঁর লেখা স্বাধীন ও স্বতন্ত্র।
সত্যিই তিনি অসীম শক্তিশালী, আমার কাছে কবিতার ঈশ্বরসম বলেই, তাঁর কবিতার কাছে সহজ মনে না পৌঁছতে পারলে আজও শ্লীল অশ্লীল, অথবা নানান দোহাই পাড়ে যারা, তাদের উদ্দেশ্যে কবির ভাষায় বলি,”আমাকে ধিক্কার দেয়া যায় আমাকে উপেক্ষা করা যায় না।” কারুর আনুকূল্য অথবা হাততালি, পুরস্কার ইত্যাদির পরোয়া না করে তিনি লিখে চলেছেন আজও তাঁর বাঁধনছাড়া বেপরোয়া নিজস্ব শৈলীতে।




Name:  basab roy          

IP Address : 012312.60.90012.13 (*)          Date:01 Jan 2019 -- 07:23 PM

বাসব রায় : মলয় সম্পর্কে দু’একটা কথা
১. মলয় রায়চৌধুরী আমার মনোযোগ আকর্ষণ করেন মাত্র দুটো কারণে। ফিফটিজ-এ লেখালিখি শুরু করলেও তাঁর ভাষায় একেবারে রাবীন্দ্রিক ছাপ নেই। তখন যাঁরা লিখছিলেন বাংলা ভাষায়, মলয় ঠিক তার উলটোদিক থেকে লিখেছেন এবং লিখতে লিখতে নিজস্ব একটি ভাষা তৈরি করেছেন। চলমান গদ্যের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে, তাকে অস্বীকার করে লেখা সত্যিই কঠিন বিষয় ছিল, এমনকি আজও তা সমান সত্য। এখানে অজিত রায়ের ভাষার কথা বলতে হয় যে তিনি সমকালকে অতিক্রম করেছেন, অন্তত ভাষার দিক থেকে।

এবং মলয়ের নিজেকে উপুড় করে দেওয়ার ক্ষমতাকে আমি সেলাম করি। মলয় নিজেকেই যেন ছুরি দিয়ে কোপাতে থাকেন, আর তখন যে রক্তপাত হয় সেটাই তাঁর লেখালিখি। ছোটলোকের ছেলেবেলা, ডুবজলে, মেধার বাতানুকূল, নামগন্ধ যাই পড়ি না কেন, মলয় সেখানে নিজের মাংসের টুকরোই সাজিয়ে রেখেছেন। আশ্চর্যের ব্যাপার যে মলয় রায়চৌধুরী বাংলা সাহিত্যে কালজয়ী লেখক হতে আসেননি, তিনি এসেছিলেন বাঁক বদলের জন্য, যেন সেটাই তাঁর কাজ। মলয়ের সেরা লেখা কোনটা? আমি জানি না, সম্ভবত মলয়ও জানেন না। কেননা তিনি সেরা লেখা লিখতে চাননি কখনো, চেয়েছিলেন চলমান সাহিত্যের ওপর হাতুড়ির ঘা মেরে নিজের ভাষাটাকে প্রতিষ্ঠা করতে। এবং কোনো সন্দেহ নেই যে তিনি সফল।

আজ অজিত রায়, এর আগে নবারুণ, যে ভাষায় লিখছেন সেটা মলয় রায়চৌধুরীরই লিগ্যাসি।

২. শুধুই লিটল ম্যাগাজিনের লেখক বলে কিছু হয় না। যে কোনো লেখকই লেখেন পাঠকরা পড়বেন বলে। লিটল ম্যাগাজিনে সিরিয়াস লেখালিখি করা যায়, অধিকাংশ বাণিজ্যিক পত্রিকা যা ছাপায় না। কিন্তু শুধুই লিটল ম্যাগাজিনে লিখবেন বলে কোনো লেখক পণ করেন না। লেখকের লেখাটাই কাজ, কোথায় ছাপা হচ্ছে সেটা দ্বিতীয় বিষয়। লিটল ম্যাগাজিন শুরু হয়েছিল বা এখনও হয় প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার মধ্য দিয়ে। কিন্তু ধীরে ধীরে কোনো লিটল ম্যাগাজিন নিজেই প্রতিষ্ঠান হয়ে যায়। এটা চমস্কির তত্ত্ব, যে একটা মত প্রবল হতে থাকলে তার বিরুদ্ধ মত উঠে আসে। এবার দ্বিতীয় মত শক্তিশালী হলে আসে তৃতীয় মত। খেলাটা চলতেই থাকে। এবং এভাবে লিটল ম্যাগাজিনে লিখেও কখন যে লেখক প্রতিষ্ঠান বা আপনার কথায় লিটল ম্যাগাজিনেই লিখে ফেলেন, এটা বোঝা যায় না।

মলয় রায়চৌধুরী এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, আমার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কোনো বিরোধ নেই, আমি প্রতিষ্ঠান বিরোধী নই। আমার লেখাটা যদি ঠিকঠাক প্রতিষ্ঠান ছাপায় তাহলে আমার লেখা দিতে আপত্তি নেই। কিন্তু ওরা তা ছাপবে না, তাই বলা যায় আমি প্রতিষ্ঠান বিরোধী নই, প্রতিষ্ঠান আমার বিরোধী।

৩. আমরা যাঁদের লেখালিখি-জীবন দেখে কবিতার জগতে এসেছিলাম, কবিতা লিখেই সমাজের ঝুঁটি নাড়িয়ে দিয়েছিলেন যিনি, আমার সম্পর্কিত দাদা, ওহঃ হো, মেজোকাকার কবিতা পড়ুন। আরেকটি তথ্য আমার জন্মের দুবছর আগে কবিতা লিখে জেলে গিয়েছিলেন ওই অসভ্য, বুনো, প্রথাবিরোধী বা নতুন প্রথার জন্মদাতা....
‘মলয়দাস বাউলের দেহতত্ব’

ডোমনি, তুইই দয়াল, যখন বিদেশে যাস কেন রে আনিস কিনে সেক্সটয় ?
ভাইব্রেটর, ডিলডো, বেন-ওয়া-বল, গুহ্যের মুক্তমালা ?
ডোমনি, তুইই দয়াল,জানি কেন বিডিএসএম কবিতার বই এনেছিস,
জি-বিন্দু হিটাচির ম্যাজিকের ছড়ি ? নিপল টিপে কাঁপাবার ক্লিপ ?
ডোমনি, তুইই দয়াল, হাত-পায়ে দড়ি চোখে ঠুলি আমাকে চেয়ারে
উলঙ্গ বেঁধে রেখে দিয়েছিস, নিজের ফাঁস খুলে তলাতল রক্তের স্বাদটুকু দিলি
ডোমনি, তুইই দয়াল, শুদ্ধ প্রেমে মজল যারা কাম-রতিকে রাখলে কোথায়
চাবুক মারিস তুই, চুলের মুঠি ধরে ক্ষিরোদধারাকে চুষে বের করে নিস
ডোমনি, তুইই দয়াল, চাতক স্বভাব নাহলে অমৃতের দুধ তুই দিবিনাকো
আমার খিদে নেই, মুখের ভেতরে কৃষ্ণের বিশ্বরূপ খেয়ে মজে গেছি
ডোমনি, তুইই দয়াল, যতো ইচ্ছে আনন্দ কর, দেহ নিয়ে খেল
আমি একটুও নড়ব না, আহ উহ করব না, যতো চাই ধাতুবীজ নিস
( দহগ্রাস পত্রিকায় প্রকাশিত )

৪. সমীর রায়চৌধুরী মারা গেলেন। কে তিনি? না সুনীল-শক্তি-সন্দীপন-দীপকের বন্ধু, হাংরি খ্যাত মলয় রায়চেৌধুরীর দাদা। এমন নয় যে সমীর রায়চেৌধুরী অন্যদের পরিচয়েই পরিচিত। তাঁর নিজেরও কিছু উচ্চমানের লেখা আছে। হাওয়া ৪৯ নামে দুরন্ত একটা লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদনাও করেছেন বেশ কিছুদিন। আনন্দবাজারীয় সাহিত্যের পাঠকরা অবশ্য সমীরকে শুধু সুনীল-শক্তির চাইবাসার বন্ধু বলেই জানেন।
এর বাইরে সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের বিভিন্ন আত্মজৈবনিক লেখালিখিতে সমীরকে আবিষ্কার করা যায়। অ্যালেন গিনসবার্গের কাশী যাত্রায় সমীর সম্ভবত সঙ্গী ছিলেন কিছুদিন। কৃত্তিবাস গোষ্ঠীর সঙ্গে ওঠাবসা ছিল সমীরের, পরে চাইবাসায় চলে যান। জনশ্রুতি তাঁর বোনের সঙ্গেই প্রথম প্রেম শক্তির। তবে সমীর রায়চৌধুরীকে সম্ভবত সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করেছেন হাংরির নকল গ্রুপ। হাংরি আন্দোলন সম্পর্কিত খুব মোটা একটা বই আছে বাজারে। যার সম্পাদনা করেছেন সমীর চেৌধুরী। মজার ব্যাপার ওই বইটিতে হাংরির শেষকথা মলয় রায়চেৌধুরীর কোনো লেখা অন্তর্ভুক্ত হয়নি। অথচ তাঁর দাদাই কি না সম্পাদক! সত্যটা হচ্ছে এই সম্পাদক সমীর চৌধুরী আজ মারা যাননি, অনেক আগেই হারিয়ে গেছেন বাংলা সাহিত্য থেকে। কেননা ওই বইয়ের সম্পাদক মলয়ের দাদা নন। এটাই মজা।

ইদানীং সমীর কিছুই লিখছিলেন না। কিন্তু তিনি ছিলেন গত ষাট বছরের বাংলা লেখালিখির এক আশ্চর্য দলিল। সমকালীন বাংলা সাহিত্যের সব খবর রাখতেন। তাঁর চেয়ে অনেক বেশি ধারালো হয়েও মলয় রায়চৌধুরী এই জায়গায় কিছুটা পিছিয়ে আছেন (যদি তুলনা করতেই হয়), মলয় বেশ কয়েক বছর লেখালিখির বাইরে ছিলেন। সমীর রায়চেৌধুরীর মৃত্যু মানে ইতিহাসের ইতিহাসে চলে যাওয়া।
তাঁকে শ্রদ্ধা…

৫. দায়িত্ব না নিয়ে একটু হাস্যচ্ছলে বলি, হাংরি লেখকদের মধ্যে কেউ আধুনিকতাবাদীদের মতো 'ডক্টরেট' ছিলেন না, ----- সাহিত্য, ইতিহাস, দর্শন, মনোবিজ্ঞান কোন কিছুতেই একজনও 'উলেমা' ছিলেন না ... ঠিকই, কিন্তু এঁরা সকলেই প্রচুর পড়াশোনা করতেন, মলয়-সমীর সবচেয়ে বেশি পড়েছেন। শৈলেশ্বর কাছাকাছি থাকবেন। অরুণেশ একটু পেছনে।

৬.ইদানীং, না, ইদানীং নয়, যখন হাংরি আন্দোলন প্রতিষ্ঠা পেয়ে গেছে, মানে সবাই যখন বলতে শুরু করেছেন হাংরিরা নতুন কিছু শুরু করেছিল, ভালোই করেছিল। লক্ষ করেছি, তখনই এই শৈলেশ্বর জাতীয়রা খোপ থেকে বেরিয়ে গলাবাজি করছেন যে আমিও ছিলাম... আমিই স্রষ্টা। এরকম আরো কেউ কেউ আছেন। শৈলেশ্বর অন্য এক সমীর চৌধুরীকে দিয়ে ঢাউস বই সম্পাদনা করিয়েছেন হাংরি আন্দোলন, প্রজন্ম নিয়ে। সেখানে মলয় রায়চৌধুরীর কোনো কবিতা নেই, লেখা নেই। হতে পারে ! মলয়কে ছাড়া হাংরি আন্দোলন সম্পর্কে একটা বাক্য লেখা সম্ভব? কিন্তু সেটাই হয়েছে। শৈলেশ্বর কয়েকটা ভালো কবিতা লিখেছেন ঠিকই, কিন্তু চরিত্রে গোলমাল আছে... কিংবা এটাই হয়তো অনেকের পছন্দের চরিত্র ।

৭. “আপনারা গত ৪৭ বছরে কোন বালডা ছিড়ছেন ; রাজনীতি মেধায় লাথি মারছে…; রাজা আছে, নীতি নাই
নেতা চোদার টাইম নাই ; লাঠির ভয় দেখাবে না। লাঠি একদম ভরে দিব।”
আমার কথা নয়, বাংলাদেশে ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ আন্দোলনের পোস্টারের ভাষা। এবং আমার কথাটা হল যে এটাই ভাষা। এটাই সভ্য ভাষা। সমাজ বদলে যাচ্ছে, পৃথিবী বদলে যাচ্ছে, সংস্কার বদলে যাচ্ছে, মানসিকতা বদলে যাচ্ছে আর তাই এটাই মান্য ভাষা।

বাংলাভাষায় হাংরি জেনারেশন মুভমেন্ট প্রথম এরকম ভাষা ব্যবহার করেছিল, তার অপ্রত্যাশিত সমালোচনা হয়েছে, যদিও এখন অনেকেই ওই আন্দোলনের ক্ষীর খেতে চাইছেন। তো সেটা অন্য কথা, যা বলার তা হল এই যে যাঁরা বৈষ্ণব সাহিত্যের পর, বঙ্কিম-রবীন্দ্রনাথ-জীবনানন্দ-বিভূতি-শরতের পর, আর পড়েননি, খুব বেশি হলে সুনীল-শঙ্খ, তাঁদের বলার, আপনারা একটু মলয়-অজিত-নবারুণ-সন্দীপন পড়ুন।
এখন আর প্রেম করছি বা ভালোবাসি নয়, বলুন প্রেম পাচ্ছে। সংস্কার বদলে যাচ্ছে, চরিত্র-চরিত্রহীনতার সংজ্ঞা বদলে যাচ্ছে... আপনারা আর ভাষার শুদ্ধতা আশা করবেন না... সংস্কারের শুদ্ধতা আশা করবেন না... জীবনকে দেখুন.. শুধু বেঁচে না থেকে জীবনকে যাপন করুন... আনন্দে থাকুন... আত্মাকে কষ্ট দেবেন না... যা মন থেকে করতে ইচ্ছে যাচ্ছে সেটাই করুন... সবাইকে কষ্ট দিন, শুধু নিজেকে কষ্ট দেবেন না... গালি দিন...প্রেম করুন... মূল কথা আনন্দে থাকুন... নির্মল থাকুন...।

৮.”একাই লড়েছিলুম; কেউ বলেনি হোক কলরব । একাই নেমেছিলুম ব্যাঙ্কশাল কোর্টের সিঁড়ি বেয়ে। সেদিন একাই কলকাতার পথে ঘুরেছিলুম সকাল পর্যন্ত ।” বলেছেন মলয় রায়চৌধুরী । লড়াইটা শুরু একাই করতে হয়, পরে সহযাত্রী হয় অনেকে, যেমন এখন হয়েছি, আমরা

৯. ‘যুগশঙ্খ’ পত্রিকার জন্য নেয়া সাক্ষাৎকারে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় আমাকে বলেছিলেন, "হাংরি আন্দোলন আরম্ভ করার জন্য মলয় ইচ্ছে করেই আমার আমেরিকা-বাসের সময়টা বেছে নিয়েছিল"।

১০. সাইয়েদ জামিলের কবিতা কারো ভালো লেগেছে, কারো ভালো লাগেনি, যা স্বাভাবিক। সেই প্রসঙ্গে একটা বা দুটো কথা যা আমার বলতে ইচ্ছে করছে, তা হল, আজ, এই ২০১৮ সালে, সাহিত্যে শুদ্ধতা আর আশা না-করাই ভালো। এখন আর কেউ বলছে না ‘কুৎসা রটাচ্ছে’, বরং ‘কুৎসা করছে’ চলছে। শব্দের ব্যবহার বদলে যাচ্ছে, ভাষা বদলে যাচ্ছে ; বদলে যাচ্ছে সংকেত, প্রতীক, চিত্রকল্প। ফেসবুক করছ, গুগল করুন... এসব বেশ চলছে। বিদেশে এটা অনেক আগেই প্রতীয়মান। দু-একটি উল্লেখ মনে হয় সংগত।
America when will we end the human war?
Go fuck yourself with your atom bomb.
I don’t feel good don’t bother me.
এই কবিতা ১৯৫৭ সালে লিখেছেন অ্যালেন গিনসবার্গ।
ষাটের দশকে ‘আমায় দিয়ে করিয়ে নিল তিন বিধবা’ লিখেছেন অরুণেশ ঘোষ। এই সেদিন ‘ভুলে যাবেন না, অনেক কিছুর উপরই পেচ্ছাপ করে যেতে হবে আমাদের’ লিখলেন বন্ধু-কবি প্রবুদ্ধসুন্দর কর। আর যে কবিতা দিয়ে এই পোস্ট শেষ করব সেটা হল আরেকটা কবিতা, অংশ নয়, গোটা...
ওঃ মরে যাব মরে যাব মরে যাব
আমার চামড়ার লহমা জ্বলে যাচ্ছে অকাট্য তুরুপে
আমি কী কোরবো কোথায় যাব ওঃ কিছুই ভাল্লাগছে না
সাহিত্য-ফাহিত্য লাথি মেরে চলে যাব শুভা
শুভা আমাকে তোমার তরমুজ আঙরাখার ভেতর চলে যেতে দাও
চুরমার অন্ধকারে জাফ্রান মশারির আলুলায়িত ছায়ায়
সমস্ত নোঙর তুলে নেবার পর শেষ নোঙর আমাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে
আর আমি পারছি না, অজস্র কাঁচ ভেঙে যাচ্ছে কর্টেক্সে
আমি জানি শুভা, যোনি মেলে ধরো, শান্তি দাও
প্রতিটি শিরা অশ্রুস্রোত বয়ে নিয়ে যাচ্ছে হৃদয়াভিগর্ভে
শাশ্বত অসুস্থতায় পচে যাচ্ছে মগজের সংক্রামক স্ফুলিঙ্গ
মা, তুমি আমায় কঙ্কালরূপে ভূমিষ্ঠ করলে না কেন ?
তাহলে আমি দুকোটি আলোকবর্ষ ঈশ্বরের পোঁদে চুমো খেতুম
কিন্তু কিছুই ভলো লাগছে না আমার কিচ্ছু ভালো লাগছে না
একাধিক চুমো খেলে আমার গা গুলোয়
ধর্ষণকালে নারীকে ভুলে গিয়ে শিল্পে ফিরে এসেছি কতদিন
কবিতার আদিত্যবর্ণা মূত্রাশয়ে
এসব কী হচ্ছে জানি না তবু বুকের মধ্যে ঘটে যাচ্ছে অহরহ
সব ভেঙে চুরমার করে দেব শালা
ছিন্নভিন্ন করে দেব তোমাদের পাঁজরাবদ্ধ উৎসব
শুভাকে হিঁচড়ে উঠিয়ে নিয়ে যাব আমার ক্ষুধায়
দিতেই হবে শুভাকে
ওঃ মলয়
কোলকাতাকে আর্দ্র ও পিচ্ছিল বরাঙ্গের মিছিল মনে হচ্ছে আজ
কিন্তু আমাকে নিয়ে আমি কী কোরবো বুঝতে পারছি না
আমার স্মৃতিশক্তি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে
আমাকে মৃত্যুর দিকে যেতে দাও একা
আমাকে ধর্ষণ ও মরে যাওয়া শিখে নিতে হয়নি
প্রস্রাবের পর শেষ ফোঁটা ঝাড়ার দায়িত্ব আমায় শিখতে হয়নি
অন্ধকারে শুভার পাশে গিয়ে শুয়ে পড়া শিখতে হয়নি
শিখতে হয়নি নন্দিতার বুকের ওপর শুয়ে ফরাসি চামড়ার ব্যবহার
অথচ আমি চেয়েছিলুম আলেয়ার নতুন জবার মতো যোনির সুস্থতা
যোনিকেশরে কাচের টুকরোর মতন ঘামের সুস্থতা
আজ আমি মগজের শরণাপন্ন বিপর্যয়ের দিকে চলে এলুম
আমি বুঝতে পারছি না কী জন্যে আমি বেঁচে থাকতে চাইছি
আমার পূর্বপুরুষ লম্পট সাবর্ণচৌধুরীদের কথা আমি ভাবছি
আমাকে নতুন ও ভিন্নতর কিছু কোরতে হবে
শুভার স্তনের ত্বকের মতো বিছানায় শেষবার ঘুমোতে দাও আমায়
জন্মমুহূর্তের তীব্রচ্ছটা সূর্যজখম মনে পড়ছে
আমি আমার নিজের মৃত্যু দেখে যেতে চাই
মলয় রায়চৌধুরীর প্রয়োজন পৃথিবীর ছিল না
তোমার তীব্র রূপালি য়ূটেরাসে ঘুমোতে দাও কিছুকাল শুভা
শান্তি দাও, শুভা শান্তি দাও
তোমার ঋতুস্রাবে ধুয়ে যেতে দাও আমার পাপতাড়িত কঙ্কাল
আমাকে তোমার গর্ভে আমারই শুক্র থেকে জন্ম নিতে দাও
আমার বাবা-মা আন্য হলেও কি আমি এরকম হতুম ?
সম্পূর্ণ ভিন্ন এক শুক্র থেকে মলয় ওরফে আমি হতে পারতুম ?
আমার বাবার অন্য নারীর গর্ভে ঢুকেও কি মলয় হতুম ?
শুভা না থাকলে আমিও কি পেশাদার ভদ্রলোক হতুম মৃত ভায়ের মতন ?
ওঃ বলুক কেউ এসবের জবাবদিহি করুক
শুভা, ওঃ শুভা
তোমার সেলোফেন সতীচ্ছদের মধ্যে দিয়ে পৃথিবীটা দেখতে দাও আমায়
পুনরায় সবুজ তোশকের ওপর চলে এসো শুভা
যেমন ক্যাথোড রশ্মিকে তীক্ষ্ণধী চুম্বকের আঁচ মেরে তুলতে হয়
১৯৫৬ সালের সেই হেস্তনেস্তকারী চিঠি মনে পড়ছে
তখন ভাল্লুকের ছাল দিয়ে সাজানো হচ্ছিল তোমার ক্লিটোরিসের আশপাশ
পাঁজর নিকুচি করা ঝুরি তখন তোমার স্তনে নামছে
হুঁশাহুঁশহীন গাফিলতির বর্ত্মে স্ফীত হয়ে উঠছে নির্বোধ আত্মীয়তা
আ আ আ আ আ আ আ আ আ আঃ
মরে যাব কিনা বুঝতে পারছি না
তুলকালাম হয়ে যাচ্ছে বুকের ভেতরকার সমগ্র অসহায়তায়
সব কিছু ভেঙে তছনছ করে দিয়ে যাব
শিল্পের জন্যে সক্কোলকে ভেঙে খান-খান করে দোব
কবিতার জন্যে আত্মহত্যা ছাড়া স্বাভাবিকতা নেই
শুভা
আমাকে তোমার লাবিয়া ম্যাজোরার স্মরণাতীত অসংযমে প্রবেশ কোরতে দাও
দুঃখহীন আয়াসের অসম্ভাব্যতায় যেতে দাও
বেসামাল হৃদয়বত্তার স্বর্ণসবুজে
কেন আমি হারিয়ে যাইনি আমার মায়ের যোনিবর্ত্মে ?
কেন আমি পিতার আত্মমৈথুনের পর তাঁর পেচ্ছাপে বয়ে যাইনি ?
কেন আমি রজোস্রাবে মিশে যাইনি শ্লেষ্মায় ?
অথচ আমার নীচে চিত আধবোজা অবস্থায়
আরামগ্রহণকারিণী শুভাকে দেখে ভীষণ কষ্ট হয়েছে আমার
এরকম অসহায় চেহারা ফুটিয়েও নারী বিশ্বাসঘাতিনী হয়
আজ মনে হয় নারী ও শিল্পের মতো বিশ্বাসঘাতিনী কিছু নেই
এখন আমার হিংস্র হৃৎপিণ্ড অসম্ভব মৃত্যুর দিকে যাচ্ছে
মাটি ফুঁড়ে জলের ঘূর্ণি আমার গলা ওব্দি উঠে আসছে
আমি মরে যাব
ওঃ এসমস্ত কী ঘটছে আমার মধ্যে
আমি আমার হাত হাতের চেটো খুঁজে পাচ্ছি না
পায়জামায় শুকিয়ে-যাওয়া বীর্য থেকে ডানা মেলছে
৩০০০০০ শিশু উড়ে যাচ্ছে শুভার স্তনমণ্ডলীর দিকে
ঝাঁকে-ঝাঁকে ছুঁচ ছুটে যাচ্ছে রক্ত থেকে কবিতায়
এখন আমার জেদি ঠ্যাঙের চোরাচালান সেঁদোতে চাইছে
হিপ্নোটিক শব্দরাজ্য থেকে ফাঁসানো মৃত্যুভেদী যৌনপরচুলায়
ঘরের প্রত্যেকটা দেয়ালে মারমুখি আয়না লাগিয়ে আমি দেখছি
কয়েকটা ন্যাংটো মলয়কে ছেড়ে দিয়ে তার অপ্রতিষ্ঠিত খেয়োখেয়ি।
এই কবিতা প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৬৪ সালে, কার কবিতা এবং কবিতার নাম কী বলার জন্য কোনো পুরস্কার নেই।

১১. এখনকার কলেজ পড়ুয়াদের তো আর মলয়ের মেধা নেই ।

১২. বহু আগে আর্থার মিলার বলেছিলেন, ‘ভাষাকে যে আক্রমণ সরে সেই ভাষাকে বাঁচায়।’ এখানে আমি অজিত রায়ের নামটি উল্লেখ করতে চাই, যিনি ভাষাকে আক্রমণ করে বাংলাভাষাকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। এই আক্রমণের বিষয়টি অবশ্য সবাই সাদরে আমন্ত্রণ জানাবেন না। কেননা তাঁর লেখায় উল্লেখ না করলেও একটা শ্রেণির প্রতি তাচ্ছিল্য, শ্লেষ ধরা পড়ে। এবং এখান থেকেই তিনি হয়ে যান ব্রাত্য, যেভাবে একদিন মলয় রায়চৌধুরীকে কলকাতা রেখেছিল একটু দূরে। আজ তিনিই কি না বাংলাভাষার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য জীবিত ব্যক্তিত্ব।

.



Name:  nabanita          

IP Address : 012312.60.90012.13 (*)          Date:01 Jan 2019 -- 07:29 PM

মলয় রায়চৌধুরীর সাক্ষাৎকার
মলয় রায়চৌধুরী ( ১৯৩৯ ) একজন কবি, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার, প্রবন্ধলেখক ও অনুবাদক । পশ্চিমবঙ্গে ষাটের দশকে যে চারজন হাংরি আন্দোলনের সূত্রপাত করেছিলেন ( অন্যেরা হলেন দেবী রায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায় ও সমীর রায়চৌধুরী ), তিনি তাঁদের অন্যতম । কবিতা লেখার জন্য ১৯৬৪ সালে তাঁকে অশ্লীলতা ও রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগে হাতকড়া পরিয়ে কোমরে দড়ি বেঁধে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল । এ মকদ্দমা তিনি হাইকোর্টে জিতে যান । তাঁর ‘জখম’ কবিতাটি বিভিন্ন ভাষায় অনুদিত হয়েছে । ১৯৬৮ সালে তিনি মধ্যপ্রদেশের রাজ্যস্তরের হকি খেলোয়াড় সলিলা মুখোপাধ্যায়কে বিয়ে করেন । বর্তমানে তিনি মুম্বাইতে কাণ্ডিভালি শহরতলিতে একটি বহুতলে একরুমের ফ্ল্যাটে সস্ত্রীক থাকেন । তাঁর মেয়ে, জামাই নাতনিরা বিদেশে থাকেন এবং ছেলে ও ছেলের স্ত্রী থাকেন কলকাতায় ।

প্রশ্ন : নিজের লেখালিখির আপনি কি ভাবে মূল্যায়ন করেন ?
উত্তর: কোনো মূল্যায়ন করি না । যেমন খিদে পায়, ঘুম পায়, পেচ্ছাপ পায়, তেমন লেখা পায় বলে লিখি । খিদের যেমন মূল্যায়ন করি না, তেমনই লেখালিখির । মূল্যায়ন করতে হলে অন্যের ধরে থাকা আয়না দরকার । আমি তো নিজের জন্য অন্যের আয়নার প্রয়োজন বোধ করি না ।
প্রশ্ন : আপনার প্রথম লেখা এবং প্রথম বইয়ের অভিজ্ঞতা জানতে চাই ।
উত্তর : আমার প্রথম লেখা দুটি কবিতা, প্রকাশিত হয়নি, কেননা সেদুটি ছিল প্রেমানুভূতি ; একটি বাংলায়, স্কুলের উঁচু ক্লাসের সহপাঠিনী নমিতা চক্রবর্তীকে, যিনি আমার ‘রাহুকেতু’ উপন্যাসে সুমিতাদি ; আরেকটি ইংরেজিতে, চুম্বনের দাম হিসাবে, স্নাতকস্তরে নেপালি সহপাঠিনী ভূবনমোহিনী রাণাকে, ‘রাহুকেতু’ উপন্যাসের রাণো । প্রথম প্রকাশিত লেখা ইংরেজিতে ১৯৬১ সালের নভেম্বরে হাংরি ম্যানিফেস্টো, বাংলায় এপ্রিল ১৯৬২তে হাংরি ম্যানিফেস্টো। যে উথালপাথাল ঘটিয়ে ছিল তা কল্পনাতীত । সম্ভবত হ্যাণ্ডবিলের মতন বিলি করা কাগজে তখনও পর্যন্ত সাহিত্য করার কথা ভাবা হয়নি, আর হ্যাণ্ডবিলের মতন ছিল বলে দ্রুত পৌঁছে যেতে পেরেছিল সর্বত্র । প্রথম বই ছিল ‘মার্কসবাদের উত্তরাধিকার’ যে বইটি প্রকাশিত হবার পর শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের উল্টোডাঙার বস্তিবাড়ির সামনে পেটরল ঢেলে পুড়িয়ে দিয়েছিলুম । বইটা বের করার ভার দিয়েছিলুম শক্তিদাকে; উনি ম্যাসাকার করে দিয়েছিলেন, কাউকে দিয়ে প্রূফ দেখাননি, নিজে দেখেননি, অত্যন্ত বাজে কাগজে ছাপিয়েছিলেন এবং পুরো পাণ্ডুলিপি কমপোজ করাননি । আমার উপন্যাস ‘রাহুকেতু’তে আমি ঘটনাটা দিয়েছি । তার পরের বই, যাকে প্রকৃত অর্থে বলা যায় পাঠকের হাতে পৌঁছে দেয়া বই, তা হল ‘কৃত্তিবাস’ থেকে প্রকাশিত কাব্যগ্রন্হ ‘শয়তানের মুখ’, প্রকাশক ছিলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় । বইটি এবং আমাকে নিয়ে কলকাতায় হইচই হচ্ছে জেনে তিনি আমেরিকা থেকে ১৩ জুন ১৯৬৪ সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়কে একটা চিঠিতে লিখেছিলেন, “আপনি মলয়কে এত পছন্দ করছেন -- কিন্তু ওর মধ্যে সত্যিকারের কোনো লেখকের ব্যাপার আছে আপনি নিশ্চয়ই মনে মনে বিশ্বাস করেন না ।” আবার কলকাতা ফিরে যখন দেখলেন যে সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, উৎপলকুমার বসু আমার বিরুদ্ধে সরকার পক্ষের সাক্ষী হয়ে গেছেন, তখন উনি তুরুপের তাসটি খেলে আমার পক্ষের সাক্ষী হয়ে গেলেন ! জীবনের এমনতর ঘটনাকে কী বলবেন ?
প্রশ্ন : বাংলাসাহিত্যের কোন শাখা তুলনামূলকভাবে সমৃদ্ধ বলে আপনি মনে করেন ?
উত্তর: কবিতা তো অবশ্যই, এবং প্রবন্ধ । কবিতা লেখার জগতটা কারোর দ্বারা নিয়ন্ত্রিত থাকছে না, কলকাতার প্রাতিষ্ঠানিক কলকাঠি নাড়া সত্ত্বেও । আর এখন ইনটারনেট হয়ে এলাকাটা সম্পূর্ণ স্বাধীন ; শব্দ, বাক্য, ছন্দ, বিন্যাস নিয়ে যথেচ্ছ বিস্তার ঘটিয়ে চলেছেন তরুণ কবিরা, বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় যে কবিতা লেখা হচ্ছে, যেগুলোর ইংরেজি অনুবাদ পড়ার সুযোগ পাচ্ছি, তার পাশে বাংলা কবিতাকে রাখলেই ব্যাপারটা স্পষ্ট হয়। গল্প-উপন্যাস এখনও বিষয়নির্ভর হয়ে রয়েছে, আলোচকরা গপপো নিয়ে চিন্তিত, যেকারণে আমরা জয়েস, প্রুস্ত, কাফকা, ফকনার, মার্কাজের মতন গদ্যশিল্পী পাইনি; গল্প-উপন্যাসের বাংলা গদ্য এখনও ইউরোপীয় ভাষাগুলোর স্তরে তাই পৌঁছোয়নি ।
প্রশ্ন : বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তির যুগে সাহিত্য জীবনে কতটা প্রতিফলন ঘটাতে পারে ?
উত্তর : প্রশ্নটা ঠিক বুঝতে পারলুম না । জীবনের প্রতিফলন সাহিত্যে ? নাকি সাহিত্যের প্রতিফলন জীবনে ? পশ্চিমবঙ্গে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির এমনই হাল যে ভালো ফলাফল করলেই ছাত্ররা রাজ্য ছেড়ে অন্য রাজ্যে পালান, তারপর বিদেশে পালান ।
প্রশ্ন : আপনার প্রিয় লেখক সম্পর্কে কিছু বলবেন কি ?
উত্তর : সারা জীবন কেবল একজন তো আর প্রিয় লেখক হতে পারেন না ; বয়সের সঙ্গে, পাঠ-অভিজ্ঞতার সঙ্গে যাঁদের লেখার প্রতি আকর্ষিত হয়ে্ছি, তাঁরা পালটে যেতে থেকেছেন । তবে কিছুকাল আগে যে বই দুটো আমি বহুবার পড়েছি তা হল ‘ওয়ান হানড্রেড ইয়ার্স অফ সলিচুড’ এবং পামুকের ‘রেড’ । আমি কিন্তু বই সংগ্রহ করি না ; বইয়ের লাইব্রেরি নেই আমার । বই আর পত্রিকা পড়া হয়ে গেলে বিলিয়ে দিই । আমার কোনো স্টাডিরুম, লেখার টেবিল, পড়ার ঘর জাতীয় ব্যাপার নেই । আর আজকাল তো কাগজ-কলমও ব্যবহার করি না । যাঁরা বাড়িতে সাক্ষাৎকার নিতে আসেন, তাঁদের পিলে চমকে যায় ।
প্রশ্ন : আপনার নিজের প্রিয় লেখা কোনটা এবং কেন ?
উত্তর : ‘নখদন্ত’ নামে একটি সাতকাহন । রামায়ণ থেকে সাতকাহনের আইডিয়া আর মহাভারত থেকে গল্পের ভেতরে গল্পের ভেতরে গল্প টেকনিক প্রয়োগ করেছি, সেই সঙ্গে ব্যক্তিগত রোজনামচার টুকরো-টাকরা, আর পশ্চিমবাংলায় পাট চাষ-চট শিল্পের বিলুপ্তির রাজনৈতিক পৃষ্ঠপট । এটা প্রিয় এইজন্য যে এই বইটা লিখে আমি হ্যাপি ফিল করেছিলুম ।
প্রশ্ন : আপনার লেখালিখির পেছনে মূল প্রেরণা কি ?
উত্তর : এটা অ্যাডিকশান । অ্যাডিকশানের বোধ হয় প্রেরণা হয় না ।
প্রশ্ন : শর্তসাপেক্ষে লেখালিখি ছেড়ে দিতে বললে কি ছাড়তে পারবেন ?
উত্তর : জানি না ভারতের সাহিত্য একাডেমিকে লেখা আমার চিঠিটা বাংলাদেশে পৌঁছেচে কিনা । চিঠিটা আমি এখানে তুলে দিচ্ছি ; মনে হয় এই প্রশ্নের উত্তর দেয়া আছে চিঠিটিতে ।
April 30, 2004
Prof K. Satchidanandan
Secretary
Sahitya Akademi
Rabindra Bhaban
35 Ferozeshah Road
New Delhi

Dear Sir
Refusal to accept Sahitya Akademi Award

Thanks for your telegram dated 30.4.2004 conveying that my translation work of Dharmaveer Bharati’s “Suryer Saptam Asva” has been awarded the Sahitya Akademi Translation prize.
I am constrained to refuse this award. As a matter of principle I do not accept literary and cultural prizes, awards, lotteries, grants, donations, windfalls etc. They deprave sanity.
My decision to refuse the award is in no way to affront late Dharmaveer Bharati, who was a great admirer of my work, and had supported me during my literary ordeals in 1960s when most of the Bengali intelligentia had conspired against the Hungryalist movement. Your magazine the “indian Literature” itself had never bothered to write about this movement.
Sincerely
Malay Roychoudhury
আর কী শর্ত থাকতে পারে ? জেনিফার লোপেজের সঙ্গে মহাকাশযানে করে অন্তরীক্ষে এক পাক খেয়ে আসা বা ক্যাটরিনা কাইফের সঙ্গে জাহাজের রেলিঙে দাঁড়িয়ে পেংগুইনদের সাঁতার দেখা ?
প্রশ্ন : একজন লেখকের ভেতরের ‘মানুষসত্তাকে’ আপনি কিভাবে ব্যাখ্যা করেন ?
উত্তর : কোনো লোক লেখক হয়েছে বলেই তো আর তার ভেতরের মানুষসত্তাটা পালটে যেতে পারে না । সে লেখক না হলেও তার মানুষসত্তাটা যা ছিল তাই থাকবে । আসেপাশে লেখকদের যা সব কাণ্ড-কারখানা দেখি, তা থেকে স্পষ্ট যে তারা লেখক না হলেও ওই সমস্ত কাজ-কারবারই করত । আমি লেখক না হলেও মানুষটা আমি যা রয়েছি তা-ই থাকতুম । আমার সত্তা জিনিশটায় যদি বাইরের কোনো উপাদানের অবদান থেকে থাকে তাহলে তা শৈশবের বিহারি অন্ত্যজ আর দুস্হ মুসলমান অধ্যুষিত ইমলিতলা পাড়ার একলেকটিক পরিবেশ ; যেকোনো বাড়িতে যেকোনো সময়ে প্রবেশ করতে পারতুম, এমনকি পাড়ার মসজিদেও, যা বর্তমান ভারতীয় সমাজে অকল্পনীয় ।
প্রশ্ন : মৃত্যুকে আপনি কোন দৃষ্টিতে দেখেন ?
উত্তর : সত্যি বলতে কি, মৃত্যু সম্পর্কে আমি বেশ কনফিউজড ।
প্রশ্ন : লেখালিখি ছাড়া আর কি আপনার কাছে প্রিয় এবং অপ্রিয় ?
উত্তর : আমি খেতে ভালোবাসি । বয়সের কারণে নানা নিয়ন্ত্রণের মধ্যে চলে গিয়েও যতটা পারা যায় খাওয়ার ব্যাপারটায় রদবদল করতে থাকি । আমি রাঁধতেও পারি । আমি আর দাদা রান্নাঘরে মাকে টুকিটাকি সাহায্য করার সময়ে অনেককিছু রাঁধতে শিখে গেছি । মাঝে ভেবেছিলুম যা রান্নার রেসিপি নিয়ে একটা বই বের করব, তা আর হল না । আমি বিরক্ত হই আমার একাকীত্ব বিঘ্নিত হলে, এমনকি আশেপাশের আওয়াজও আমার একাকীত্বকে নষ্ট করে বলে বিরক্ত হই । আমি বেসিকালি একজন লোনার, একা থাকতে ভালোবাসি ।
প্রশ্ন : সাহিত্যের বাইরে আরো একটি প্রশ্ন, আপনার বন্ধু এবং শত্রুকে কিভাবে মূল্যায়ন করেন ?
উত্তর : বন্ধু বলতে যা বোঝায় তা আর আমার নেই । স্কুল-কলেজে ছিল আমার তিনজন বন্ধু, সুবর্ণ-বারীন-তরুণ । তারপর থেকে আমি বন্ধুহীন । আমার একাকীত্বপ্রিয়তার জন্যই বোধহয় আমি বন্ধুহীন । এই এখন হঠাৎ যদি আমার স্ত্রীর কিছু হয়, এমন কেউই নেই যাকে ডাক দিতে পারব । অমন পরিস্হিতিতে ডাক দিতে হবে অ্যাম্বুলেন্সকে । শত্রুও নেই । কেনই বা কেউ শত্রুতা করবে ? লেখালিখির জগতে অনেকে অনেক কিছু লেখে আমার বিরুদ্ধে ; তার জন্য তাদের শত্রু তকমা দেয়া উচিত হবে না ।


Name:  Subhasree           

IP Address : 012312.60.4523.107 (*)          Date:02 Jan 2019 -- 12:20 PM

মলয় রায়চৌধুরীর উপন্যাসে জাদুবাস্তবতা
শুভশ্রী দাস, অধ্যাপক, কবি সুকান্ত মহাবিদ্যালয়
বিশ্বসাহিত্যের মনমর্জি বদলায় সময়ের হাওয়া । আমরা কি লিখব, কি বলতে চাই তা নিয়ন্ত্রণ করে আমাদের সময়, সমাজ । মানুষের অস্তিত্ব নিয়ে সময় খেলা করে । রাজনীতি, অর্থনীতি মানুষের চিন্তাশক্তিকে প্রভাবিত করে । ‘মত প্রকাশের স্বাধীনতা’ কথাটি একটি মিথের মতো । আছে, কিন্তু বাস্তব উপস্‌ইতি খুব স্পষ্ট নয় । ‘সভ্য’ বিশ্বে বলার অধিকার দেব, কিন্তু কি বলবে তা পপত্যক্ক্ষে বা পরোক্ষে আমিই নির্দিষ্ট করে দেব -- উপনিবেশবাদের এই প্রচলিত কাঠামোর বাইরে খুব বেশি এগোনো যায়নি আজকের সময়ে দাঁড়িয়েও । তবু কিছু ব্যতিক্রমী মানুষ টিকে থাকতে চায় প্রতিবাদ নিয়ে, সত্যকে আঁকড়ে । পারিপার্শ্বিকের প্রবল চাপেও অনড় হয়ে থাকা এই একরোখা মানুষের হাতেই তৈরি হয় এক-একটি কশাঘাতের মতো শিল্প-সাইত্য, যা আছড়ে পড়ে শাসকের মুখে । শোষিত জনগোষ্ঠী থেকেই জন্ম নিয়েছেন গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস, যাঁর কলমে রূঢ় বাস্তব হল জাদু, আর যে জাদু চপেটাঘাত করল বাস্তবকে । এমনই সব জাতি থেকে মাথা তুললেন সলমন রাশদি, আলেহো কার্পেন্তিয়ের, ওরহান পামুক, নবারুণ ভট্টাচার্যরা । যাঁরা শিখিয়ে দিলেন ঠাট্টা করতে, যাঁরা এতদিনের কুড়িয়ে পাওয়া লাঞ্ছনা, অপমান দিয়ে তৈরি করলেন শানিত অস্ত্র । জাদুবাস্তবতার ইতিহাস একটি সম্পূর্ণ জাতির ইতিহাস। পাশাপাশি পৃথিবীতে যেখানে যতো জাদুবাস্তবতার সৃষ্টি হয়েছে বা হবে, প্রতিটি ক্ষেত্রেই ইতিহাস একটি বিশিষ্ট ভূমিকা নেবে ।
লাতিন আমেরিকার প্রেক্ষাপট থেকে জন্ম নিয়েছিল জাদুবাস্তবতা, বাংলা কথাসাহিত্যে জাদুবাস্তবের প্রবেশ কবে, কখন, কিভাবে ঘটল তা ঠিক নির্দিষ্ট করে বলা যায় না, যেমন বলা যায় না লাতিন আমেরিকার ক্ষেত্রেও। স্পেনীয় ও পরে লাতিন আমেরিকার দেশগুলিতে অকথ্য অমানবিক অত্যাচারের বিরুদ্ধে বহুকাল ধরেই প্রতিবাদের পন্হা খুঁজছে মানুষ । মার্কেস তাঁর নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির সময়ে বলেন, জাদুবাস্তবতা হল ‘exaggerated proportion of reality’. তিনি জাদুবাস্তবতার ব্যাখ্যায় নোবেলপ্রাপ্তির দিন বলেছিলেন :
“লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবিয় অঞ্চলের মানুষদের জীবনে এই জাদুবাস্তবতা কোনো আরোপিত ব্যাপার নয় । এটা তাদের সঙ্গেই বাঁচে সব সময় । প্রতি মুহূর্তে নির্ধারিত করে দেয় অসংখ্য মৃত্যুকেও।” ( গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস ও একশো বছরের নিঃসঙ্গতা, সুচেতন মিত্র, মহাযান সাহিত্যপত্র, ৯ম সংখ্যা, নভেম্বর ২০১০, পৃষ্ঠা ৩৪ ) ।
জাদুবাস্তবতা আসলে একটি ধারণা, যার আত্মা ঘোর বাস্তব এবং শরীর কল্পনা ও উপকথা দিয়ে গড়া । দীর্ঘদিনের কিছু অবদমিত লাঞ্ছনা, অত্যাচারের ক্ষত ব্যুমেরাং করে শাসকের দিকে ফিরিয়ে দেওয়ার পদ্ধতি জাদুবাস্তব রচনাধারার মধ্যে রয়েছে ।
প্রায় দুশো বছরের ইংরেজ শাসনের পর ভারতবর্ষের অলিগলিতে যে কলোনিগুলি ঔপনিবেশিকতার অভিশাপ বহন করে চলেছে, জিবন সেখানে থমকে দাঁড়ায় । দুশো বছরের শাসনের প্রভাব প্রায় হাজার বছর ধরে অবদমন করবে ভারতীয় চিন্তা চেতনাকে । যুদ্ধপরবর্তী সময় থেকেই ভারতীয় যুবসমাজের উপর পরিচয়হীনতার যে অভিশাপ নেমে আসে, তাতে জেরবার হয়ে শিক্ষিত যুবকের দল শুরু করেন নানা সাহিত্য আন্দোলন । এ বিষয়ে পাশ্চাত্যের তরুণ সম্প্রদায়ের কয়েকটি আন্দোলন তাঁদের পথ দেখায় । বিহার ও বাঙলার শিক্ষিত যুবকদের সৃষ্ট এমনই একটি সাহিত্যনির্ভর ও ইস্তাহার নির্ভর বহুবিতর্কিত আন্দোলন ‘হাংরি জেনারেশন এর বহু লেখায় জাদুবাস্তবের বিমূর্তরূপ ধরা পড়ে ।
‘অতলান্তিক’ সাহিত্যপত্র থেকে হাংরির সূত্রপাতের ইতিহাস কিছুটা উদ্ধৃত করব : “১৯৬১ সনে পাটনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির ছাত্র বাইশ বছরের বাঙালি যুবক মলয় রায়চৌধুরী কবি চসারের ‘ভয়ানক কবিতা টুকরো In the sowre hungry tyme’ পড়ে hungry শব্দের দ্যোতনা ও অভিঘাতে অনুরূপ উত্তেজিত হন ।”( নন্দলাল শর্মা, হাংরি জেনারেশন সংখ্যা, ষষ্ঠ বর্ষ, দ্বিতীয় সংখ্যা, এপ্রিল-জুন ১৯৮৬, পৃষ্ঠা ১৮ ) ।
ঢেকে রাখা ‘সভ্য’ সমাজের ছ্যুঁৎমার্গ ও নিম্ন অর্থনৈতিক সঙ্গতির মানুষকে তাদের না-করা অপরাধের শাস্তি দিতে আগ্রহী হিন্দু সমাজের প্রচলিত পন্হার প্রতিস্পর্ধায় মাথা তোলে হাংরি আন্দোলন । যাঁরা দিতে পারেননি নিরাপদ ভবিষ্যত, দেহ মনের সুস্হ গঠনের সাহায্য করতে পারেননি, তরুণ প্রজন্মের আশা-আকাঙ্খা সুখ স্বপ্ন যৌনতা কোনো কিছুর ভারই যে সমাজ বা যে পরিবার নেয় না, সেই সমাজের দেওয়া রুক্ষ ও ক্রুর নিয়মের ভণ্ডামিকে দুহাত দিয়ে ছিঁড়তে চেয়েছেন এই তুণরা । মলয় রায়চৌধুরী ও সমীর রায়চৌধুরীর নেতৃত্বে গড়া এই আন্দোলনে অরুণেশ ঘোষ, দেবী রায়, রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়, বাসুদেব দাশগুপ্ত, অবনী ধর, সুবো আচার্য, পপদীপ চৌধুরী, ত্রিদিব মিত্র, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, উৎপলকুমার বসু, সৈয়দ মুস্তফা সিরাজ প্রমুখ প্রতিভাবান কবি-লেকক যুক্ত থেকেছেন নানা সময়ে ।
এই সন্দর্ভের মূল আলোচ্য মলয় রায়চৌধুরীর ‘অরূপ তোমার এঁটোকাঁটা’, ‘নামগন্ধ’ একত্রে ‘ছোটোলোকের ছোটোবেলা’, ‘এই অধম ওই অধম’ ও ‘নখদন্ত উপন্যাস ।
‘অরূপ তোমার এঁটোকাঁটা’ উপন্যাসটি গুরুচণ্ডালী প্রকাশনার চটি সিরিজের মাত্র ৯৬ পাতার উপন্যাস । এই স্বল্প পরিসরেই উপন্যাসটি যেন সংস্কারের সাজানো সাজানো পাঁচিলে একটি ইঁট সরিয়ে নেওয়া । মিশ্র সংস্কৃতি ও সংকর সংস্কৃতির ফাঁকে পড়ে বাঙালি সমাজে প্রচ্ছন্নভাবে প্রবাহিত হয়েছে পঙ্কিলতা, এসেছে স্বৈরাচারিতা । উপন্যাসের শুরুতে যে দুজনের উল্লেখ পাই, তারা আধুনিকতার শীর্ষে বসবাসকারী দুজন বাঙালি যুবক-যুবত, বাংলা পড়তে-লিখতে রীতিমত অনভ্যস্ত । ব্যানার্জি বংশের মেয়ে ইন্দিরার তেইশ বছর বয়সে একটি গুজরাতি বিয়েও সংলগ্ন ডিভোর্স দুইই সারা হয়ে গেছে । সুবীর দত্তও শিক্ষিত, ভালো চাকুরে যুবক খ একটি ফিরে পাওয়া ডায়েরির সূত্রে উভয়ের আলাপ, কিন্তু সেই ডায়রি আবিষ্কার করবে তাদেরই পূর্বপুরুষের শরীরী উদ্দামতার পাশবিক কাইনি । পুরুষত্বহীন স্বামীর হাতে মার খাওয়া কেকা একের পর এক পুরুষদের ব্যবহার করে পৌঁছে যায় এমন এক উপলব্ধিতে যেখানে শুধু নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত থাকা যায় । অন্য দিকে শিশির বা অতুলরা মজেছে শ্বেতাঙ্গিনীদের শরীরী নেশায় । নেপালের, বেনারসের পথে ঘাটে পাওয়া সেই সব মুক্ত বিহঙ্গ-বিহঙ্গীর দল জীবনের নামে জয়ধ্বজা উড়িয়েছিল । মলয় তাঁর আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস ‘রাহুকেতু’-তে লিখেছেন
“ষাটের দশকের কথা তো । সে সময়ে ফান ফুড ফ্রিডাম ফ্রিক আউট আর ফাকিং-এর উদ্দেশ্যে দলে দলে তরুণ তরুণী আমেরিকা ইউরোপ এমনকি জাপান থেকেও নিজেদের বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে পড়তেন ; লণ্ডন বা আমস্টারডাম হয়ে বাসে, ট্রেনে হিচহাইক করে তুরস্ক ইরান আফগানিস্তান পাকিস্তান ভারত হয়ে শেষ গন্তব্য নেপাল । “ ( পৃষ্ঠা ৬২ )
শিশিরের কাছেও শরীর ও শারীরীক উথ্থান-পতন ভিন্ন কোনো মানসিক অনুভূতির প্রয়োজন নেই । অতুলও নারী থেকে নারীতে যাতায়াত করে ও শেষে ডিপ্রেশনের শিকার হয় । এই বিস্তীর্ণ পটভূমি ও এতগুলি চরিত্র আসলে একটি সময়ের সাক্ষী । রাবীন্দ্রিক বাণী তাই ‘এঁটোকাঁটা’য় পর্যবসিত হয় । বলিউডি ছবির অনুকরণে কেকার সম্ভোগকলা, শিশিরের লেখা দিনলিপির জড়তাময় ভাষা আরেকবার বিদ্রুপের ব্যুমেরাং ছুঁড়ে দেয় শ্লীল বাংলা সংস্কৃতির দিকে । আসলে সুস্হ জীবন প্রসবে অক্ষম এই মেকি শ্লীল সমাজের বিদ্রূপভারই মলয়ের জাদুবাস্তবতার মূল উপাদান ।

‘ছোটোলোকের ছোটোবেলা’ ও ‘এই অধম ওই অধম’
মার্কেস জাদুবাস্তব আলোচনায় বলেছেন, লাঞ্ছনার ইতিহারে পরিবারের ভূমিকা থাকে । জাদুবাস্তবের একটি উপাদান মাকফেস ও মলয়ের জীবনে সমান্তরাল ঘটেছে । তা হল, উভয়েই নিজের বয়স্কা আত্মীয়ার কাছে অলৌকিক গল্প বলার পাঠ পেয়েছেন । মার্কেস একটি সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন,
“তিনি ( মার্কেসের ঠাকুমা ) সেইসব জিনিস বলতেন যেগুলোকে অতিপ্রাকৃত আর আজগুবি শোনাত, কিন্তু তিনি বলতেন সেগুলো একেবারে স্বাভাবিকভাবে ।” ( ‘দীর্ঘ সাক্ষাৎকার : গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস’, পিটার এইচ স্টোন, বয়ান, ত্রৈমাসিক পত্রিকা, মার্কেস স্মরণ সংখ্যা, ১ম বর্ষ, ২য় সংখ্যা, জুন ২০১৪ )
মলয় যেমন বলেছেন, বড়ো জ্যাঠাইমার অসামান্য গল্পরচনার প্রতিভা:-
“আমরা দালানে ওনাকে গিরে বসতুম, আর লন্ঠনের আলো কমিয়ে উনি নিয়ে যেতেন গল্পের দেশে ।...জেঠিমার গল্পের জগত ছিল অলৌকিক…” ( ছোটোলোকের ছোটোবেলা, পৃষ্ঠা ৪৫ )
সস্তার জীবন যাপনের জন্য বিহারী ছোটোলোকদের পাড়ায় বসবাসকারী বালকের ন্যারেশন ভোজপুরি মগহি পরিচারকদের সান্নিধ্যে শেখা তুলসীদাসি দোহা, হতদরিদ্র প্রতিবেশীদের পোকামাকড়ের মতন জীবনযাপন, স্বাধীনতা-উত্তর ভারতবর্ষের নগ্নচিত্র দেখায় । সংকরায়িত পরিবেশে আত্মপরিচতি খোঁজা বয দুরূহ কাজ । তার ওপর যুক্ত হয় লৌকিক বিশ্বাস, তুক-তাক, আচার-বিচার ও যৌনতার নতুন সব অনুভূতি । মামাবাড়ির ভদ্র পরিবেশ আরো স্পষ্ট দেখায় পাটনার নিম্নমানের জীবনযাপনের গ্লানি । বালক মলয় শিখে যান :-
“মামার বাড়ির কেউ কখনও পাটনায় যান না । আমরা তো ছোটোলোক।” ( ছোটোলোকের ছোটোবেলা, পৃষ্ঠা ৫৯ )
অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কারের পাশাপাশি বালক জেনেছিল মেজদা, অর্থাৎ বড়জ্যাঠার পালিত পুত্র আসলে তার ‘কেনা ভাই’ । ‘দেবতুল্য’ জ্যাঠামশাই এক পাঞ্জাবি বউয়ের কাছে দেড়শো টাকায় কেনা বাচ্চাটি আসলে জেঠামশাইয়ের অবৈধ সন্তান । যাকে ফিরে পুষ্যি নিয়ে ক্রমাগত স্লো পয়জনিং করেছেন জ্যাঠা-জ্যেঠিমা । পড়তে পড়তে মনে হয় ইমলিতলার কোনো বাস্তবিক ভৌগলিক অবস্হান না থাকলেও চলত । নাম-কা-ওয়াস্তে স্বাধীনতা পাওয়ার পর পুরো ভারতবর্ষই বোধহয় কমবেশি ইমলিতলা ছিল । শিক্ষাহীন, স্বাস্হ্যহীন, স্মৃতিহীন স্বাধীনতা উত্তরকালের ভারতবর্ষের চেহারা ছত্রে-ছত্রে বহন করে এই যুগ্ম উপন্যাস । উপন্যাসে অনেক জাদুর পাশাপাশি কিছু অসামান্য বাস্তব আছে । ভারতবর্ষের সমৃদ্ধ গ্রামগুলির চেহারা এতদূর কদর্য ও অর্থনৈতিক অবস্হা এমন পঙ্গু হওয়ার জন্য ছিল দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনা :-
“ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমলে, পুঁজি বানাবার কলকাঠি কব্জা করার ধান্দায় সাবেকি গ্রামের সমাজকে দুমড়ে মুচড়ে তার নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে থাকার ক্ষমতা নষ্ট করে দিয়েছিল ইংরেজরা । ব্যাটারা মহা ঘোড়েল । যাবার সময় চাদ্দিকময় হেগে রেখে গেছে ।” ( ছোটোলোকের ছোটোবেলা/এই অধম ওই অধম, পৃষ্ঠা ১১২ )
এই বিষ্ঠা আসলে সেই স্মৃতিহীন মানব সমাজের দেহে মনে মাখামাখি হয়ে বিষাক্ত করে তোলে, দুর্গন্ধময় পঙ্কিল করে তোলে তাকে । ‘এই অধম ওই অধম’-এ পূর্ব কাহিনির নিরবচ্ছিন্নতা বজায় থাকে, শুধু যুক্ত হয় লেখকের স্মৃতিতে রয়ে যাওয়া সেই সব তুলসীদাসী পঙক্তিগুলি, যেগুলির সাথে জড়িয়ে রয়েছে লেখকের শৈশবস্মৃতি । ইমেল আদান-প্রদানে মলয় জানিয়েছিলেন :-
“হিন্দি কোটেশানগুলো তুলসীদাস-এর রামচরিতমানস, কবির এবং রহিম-এর দোহা থেকে নেয়া । বাড়ির চাকরদের তো আমাদের বকুনি দেবার অধিকার ছিল না, তাই ওরা কোটেশানের মাধ্যমে উপদেশ দিত ; তারা নিরক্ষর হলেও, শৈশব থেকে শুনে-শুনে ওগুলো তাদের স্মৃতি থেকে উৎসারিত । বইটায় আমার ন্যারেটিভের সমান্তরাল এগিয়েছে ওদের ন্যারেটিভ।”
ব্যক্তিগতভাবে আমার মনে হয়েছে, মেজদা বুড়ো অর্থাৎ পাড়ার বুঢ়ুয়া কেবলই রক্তমাংসের অস্তিত্ব নিয়ে নেই, তার অবয়ব আসলে রূপকায়িত করে পোস্টমডার্ন কলোনিয়ালিজমের সেই অপরিণত সময়কে, যাকে দাঁড়াতে হয়েছিল শত্রুপক্ষীয় স্বজন, লক্ষহীন ভবিষ্যৎ, প্রবৃত্তির নিষিদ্ধ লোভনীয় হাতছানির প্রতিস্পর্ধায় । ভোজপুরি যে মাকে তার পিতা সন্মান দেননি, সেই ক্ষোভ নিয়ে সে পিতার গোষ্ঠীবিরোধিতা করে ।
“ভোজপুরি মগহিতে গালাগাল ছিল মেজদার নান্দনিক ঔদ্ধত্য । ভাষার আদরায় রদবদল করে জীবনে পরিবর্তনের সংকেত পাঠাতে চাইত।” ( এই অধম ওই অধম, পৃষ্ঠা ৯৭ )
আসলে পাটনার ছোটোলোকপাড়ার অবস্হান বঙ্গসংস্কৃতির খণ্ডহরস্বরূপ । যার ঝুরঝুরে চুনসুরকি খসা অস্তিত্ব মানতে পারা সহজ নয় ।
“জমিদারি বেনেদিয়ানার ধুলোবালি ঝেড়ে ফেলে উঠে দাঁড়াতে চাইছিলুম আমরা ছোটোরা সবাই,....মেজদা ঝেড়ে ফেলতে চাইছিল অতীতত্বের ক্ষীণ রেশটুকু, যা ঘাপটি মেরেছিল আমাদের পারিবারিক ভাষার আদরায়।” ( ছোটোলোকের ছোটোবেলা/এই অধম ওই অধম, পৃষ্ঠা ৯৫ )
সাস্কৃতিক ধ্বসন ঠেকানোর উপায় নেই বলে গড়ে ওঠে প্রতিস্পর্ধা । হাতিয়ার করে জাদুবাস্তবকে । সাতজন বন্ধু মিলে একটা আইসক্রিম চেটে খাওয়া, নোংরা নর্দমা থেকে হাত দিয়ে বল তুলে নেওয়া, মৌর্যদের চৌর্যবৃত্তি এক বাস্তব, আর জেঠিমার গল্প, পুঁটির গল্প, ছোটোকাকিমার শাক্তবচন, সীতাদেবীর কুঁয়োয় ঝাঁপ, জাদুটোনা, ‘কালিদাসের কলম দিয়ে লেখা মেয়েমানুষ’, বিহারি পুলিশ অফিসারের মতন কেঁদো কুকুর...একের পর এক ছবি, যা দিয়ে গড়া হয় জাদু । এই সরস উপাখ্যান শেষ হয় একটি চাবুকের দ্বারা:-
“জেঠিমা ছোড়দিকে বলছেন, ‘করুণার ঘর থেকে বুড়োর সমস্ত জিনিসপত্তর নিয়ায়...কবচ-কুণ্ডল সব, চিতার সঙ্গে ওগুলোও ছাই করে ফেলতে হবে । কোনো রেশ যেন না থাকে।” ( ছোটোলোকের ছোটোবেলা/এই অধম ওই অধম, পৃষ্ঠা ১৪৪ )
আমাদের পূর্বপুরুষরা আসলে এভাবেই মুছে দেবেন প্রমাণ । প্রতিবাদের, পপতিস্পর্ধার । আর তার বদলে আমরাও ছুঁড়ব ঠাট্টার ব্যুমেরাং । মলয় আসলে প্রতিনিইত্ব করলেন ক্রীড়ানক প্রজন্মের যাদের সুশীল সমাজ সর্বদা বিদ্রূপই করেছে । মলয়ের একটি অসামান্য কবিতা এ প্রসঙ্গে উদ্ধৃত করা আবশ্যক:-
“আমার মাকে যেন বলবেন না”
আমি কবিতা লিখি
কি লজ্জার, না ?
আমার বাবা কখনও স্কুলে পড়েননি
কি লজ্জার, না ?
আমার মা কখনও স্কুলে পড়েননি
কি লজ্জার, না ?
আমার ঠাকুর্দা বাংলা লিখতে পারতেন না
কি লজ্জার, না ?
আমার ঠাকুমা শুদ্ধ বাংলা বলতে পারতেন না
কি লজ্জার, না ?
………...।”
এই লজ্জা তাঁর একলার নয় । আসলে সাংস্কৃতিক অবক্ষয়ের কারণ ভারতের উত্তরঔপনিবেশিক দশা । শাণিত প্রতিবাদের ধার উপন্যাসের নামকরণ থেকে শুরু করে শেষ বাক্যটি অবধি নানা রঙের জাদুয়ি বিস্তার দেখালো ।

নখদন্ত
‘নখদন্ত’ মলয়ের আরেকটি অসামান্য পোস্টমডার্ন উপাখ্যান । এই নতুন ধরণের উপন্যাসে লেখকের প্রাত্যহিক দিনলিপি ও তাঁর নিজের লেখা কয়েকটি গল্পের প্লট ও ন্যারেটিভ পাশাপাশি চলে । মেইলে কথাবার্তায় মলয় জানিয়েছিলেন :-
“নখদন্ত ন্যারেটিভটাকে আমি শুরু থেকে একটা অন্তর্ঘাতমূলক টেক্সট হিসাবে লিখতে চেয়েছিলুম।”
রামায়ণের সপ্তকাণ্ডের আদলে সাপ্তাহিক দিনলিপিতে আধুনিক এক সংস্কৃতিময়, সৃজনশীল মানুষের বৈচিত্র্যময় অবসর জীবনের চিত্র পাওয়া যায় । পশ্চিমবঙ্গের দ্রুত পচনশীল সমাজের ভাগাড়ে রোজ পচতে থাকা মানবাত্মার তীক্ষ্ণ চিৎকার যেন তাঁর কলমে বরাবরই স্বতঃস্ফূর্তভাবে উঠে এসেছে । ‘নখদন্তে’ পাই সেই সৃষ্টির পৃষ্ঠভূমি । নিজের কয়েকটি গল্পের উল্লেখ রেখেছেন মলয় এই দিনলিপির ফাঁকে । প্রথম ‘শেষ হাসি’ গল্পে কাংগাল চামারের ওপর অসহ্য অমানুষিক অত্যাচারের পরেও মুখের হাসিতে জাদুর ছোঁয়া বজায় রাখেন তিনি । চামড়া ভেদ করে বেরুনো ভাঙা পাঁজরের হাড়ের গোলাপি সাদা রঙ যেন সজোরে চপেটাঘাত করে কোমলতার সাথে গোলাপি অস্তিত্বকে । কন্সটেবল হত্যার জন্য বস্তিতে ‘হিন্দি ফিলিম’ হয় ।
‘চামার’ হয়ে ‘রাজপুত’কে হত্যার অপরাধে কাংগাল চামারকে ছিঁড়েখুঁড়ে হত্যা করে পুলিশ । ক্ষমতা ও অর্থ দখলের বাজারে সাইনবোর্ড আর টেবিল চেয়ার পেতে ট্রেড ইউনিয়নের ধামাধারীরা চটকলগুলিকে ভুতের আড্ডা বানিয়ে চলেছে । আর কাংগাল চামাররা আমারান্তা উরসুলার ( মার্কেসের ‘নিঃসঙ্গতার একশ বছর’ ) মতো মৃত্যুকালেও মুখে সন্তুষ্ট হাসি ঝুলিয়ে রাখেন । উপেক্ষার, তামাশার হাসি । ‘শহিদ’ ও ‘জিরো নম্বর মানুষ’ একই পটভূমির ভিন্ন আঙ্গিকের কাইনি । দুটোতেই মলয় চটকল শ্রমিকের বেঁচে থাকার অলৌকিক লড়াই ও সহ্যশক্তির সাথে প্রশাসন তথা ক্ষমতালোভীদের অপার্থিব নিষ্ঠুরতার গল্প জাদুর মোড়কে পরিবেশন করলেন । ‘জিরো নম্বর মানুষ’ আবার মনে করায় আইডেনটিটি ক্রাইসিস । আত্মপরিচয়হীন মানুষ কেবলই ‘লাশ’ হয় । সে লাশের মৃত্যুর কারণ পাওয়া যাক আর না যাক, তার ধর্ম পাওয়া যায় । হিন্দু মুসলিম লাশেরা জায়গা বদলায় । চেনার উপায় শুধুই ‘নুনু’ । প্রতিবাদীতা সবই কাড়ে । সবশেষে কাড়ে পরিচয় । ‘খোসা ছাড়ানো নুনু ওয়ালা খালেদালি মণ্ডল লোপাট হয়ে যায় :-
“খালেদালি মণ্দলের দেহও নেই, আইডেনটিটিও নেই । জিরো ? অ্যাঁ !” ( ‘নখদন্ত’ পৃষ্ঠা ৫৭ )
মনে করায় মার্কেসের সেই ভয়াবহ স্মৃতি, যুদ্ধে গুলি খাওয়া এক ট্রেন শব স্রেফ লোপাট হয়ে গেল ।
সমান্তরালে ‘ভাগ্যলিখনে হরফ দরকার নেই’ গল্পে শিক্ষিত বেকার যুবসম্প্রদায়ের কীটপতঙ্গের মতো অপমানের জীবন একটি বাস্তব । কিন্তু গান গেয়ে প্রতিবাদের ঐক্যবদ্ধ হাঁক পাড়ায় জাদু আছে । চাকরির ‘কুল্লে কুড়িটা’ পোস্টের জন্য অপেক্ষমাণ আগারোশো ক্যাণ্ডিডেট চূড়ান্ত ভণ্ডামি ও বশৃঙ্খলার ধিক্কারে যে সমবেত হুমহুনা বোল ধরে, তার সাথে লণ্ডন বা জার্মানির গণহত্যার জন্য সারিবদ্ধ বন্দীর গানে মিল আছে । অসউইৎজ এর চেম্বারে ঢোকার আগেও কি এভাবেই গলা মেলাতে চাইতেন না শিকলবাঁধা বন্দিরা ?
‘অট্টহাস্য বিনির্মাণ’ গল্পটির আগা গোড়াই বিদ্রূপের তীক্ষ্ণতায় জর্জর । পতাকা বহুবার টেস্ট করেই রাখা হয় উত্তোলনের আগে, কিন্তু মুখ্যমন্ত্রীর টানে স্বাধীনতা দিবসে জাতীয় পতাকার ভূমিতে পতন আসলে একটি অসামান্য বিদ্রূপাত্মক রূপক । প্রশাসন ও রাজনীতি, ভারতবর্ষকে যেখানে স্হাপন করল, তা আসলে নেতার পদযুগল । জাদু ও বাস্তবের খেলার অসামান্য শব্দশৈলী রীতিমত ঈর্ষনীয় :-
“গরম-শেষের বুড়ো ঘাসেরা যৌনতাবর্ধক বৃষ্টিফোঁটার অপেক্ষায় । শালিকশিশুকে কেঁচো কিংবা পিঁপড়ে খুঁটতে শেখাচ্ছেন ওর মাম্মি-ড্যাডি ।...ওপারে গোটাকতক রুডিয়ার্ড কিপলিঙ টাইপের নেড়ি কুকুর।” ( ‘নখদন্ত’, হাওয়া৪৯, পৃষ্ঠা ৮০ )
বস্তুত পোস্টমডার্ন ভারতবর্ষের প্রতিটি স্তরে যে পাঁক প্রবিষ্ট হয়েছে, তার থেকে নিস্তার পাওয়া অসম্ভব, তাই:-
“বাঙালির জিম্মায় হাসাহাসি করা ছাড়া আর কিছু টিকে নেই।” ( ‘নখদন্ত’, হাওয়া৪৯, পৃষ্ঠা ৮১ )
‘নখদন্ত’র নোটগুলি সম্পর্কে মলয় তাঁর মেইলে জানিয়েছিলেন :-
“নোটগুলো ইংরেজিতে এই জন্য যে ইংরেজরাই চটকলগুলো স্হাপন করেছিল এবং ঔপনিবেশিক শাসকের ভাষার মাধ্যমে দেখাতে চেয়েছিলুম তারা কেমনতর ধ্বংস করে দিয়ে গেছে --- সমাজে, সংস্কৃতিতে, ভাষায়, নৈতিকতায় ইত্যাদি । সাবভার্শনের কৌশল হিসাবেই নোটগুলো যেখানে সেখানে ঢোকানো --- যাতে নোটগুলোও রৈখিকতার সীমালঙ্ঘন করে যেতে পারে ।”
তাঁর নোটগুলির অবস্হান ও যৌক্তিকতা সম্পর্কে তাঁর এই বক্তব্য এতই সম্পূর্ণ ও স্পষ্ট যে আর কোনো ব্যাখ্যার প্রয়োজন পড়ে না ।
মানসিক চেতনার এই রূপকায়ন হল দীর্ঘ এক আত্মপ্রবঞ্চনার ফলাফল । মলব লিখেছেন :-
“রাজনীতির সেল্ফকনট্যামিনেশন তো পশ্চিমবাংলায় দেখেই চলেছি । নিজেদের আদর্শের দ্বারা নিজেরাই কলুষিত হয়ে চলেছে রাজনীতি-করিয়েরা।”
জবরদখল হতে হতে বাঙালি তার অস্তিত্ব হারিয়েছে, শুধু জমি নয়, সংস্কৃতিও বিক্রি করেছি আমরা । প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে পার্টি নির্বিশেষে সুবিধাভোগী মানুষের সংখ্যা অগুনতি । আবিলতায় ঢেকেছে আসমুদ্রহিমাচল । মলয়ের এই সাহিত্যধারা সেই স্মৃতিহীন অস্তিত্বহীনতার ক্ষুদ্র এক প্রতিবিম্ব ।

নামগন্ধ
শেষ যে উপন্যাসটি আমার আলোচ্য, তা হল ‘নামগন্ধ’ । ঔপনিবেশিকতা ও উত্তরঔপনিবেশিক পশ্চিমবঙ্গ যে কতদূর পচনের সীমালঙ্ঘন করেছিল, তার একটা অসামান্য দলিল এই উপন্যাস । যৌনতার এক ভিন্ন পরীক্ষামূলক সম্পর্কের পাশাপাশি উপন্যাসের প্লটিঙ-এ রয়েছে দৃঢ়তা ও রহস্য । ভবেশকারা আসলে সেই ‘মার্জিনাল মেন’, আঞ্চলিক দেবতা । যাঁদের ভোগ প্রস্তুত না করে কোনো গঠনমূলক কাজ করা সম্ভব নয় । দেশভাগের পর বাংলাদেশের উদ্বাস্তুরা পুনর্বাসন পান বা না পান, উদ্বাস্তু নেতাদের আখের গোছানো ছিল দৃষ্টিকটু রকমের । মলয়ের দীর্ঘ অভিজ্ঞতার ফসল এই পংক্তি :-
“পথে পোড়ানো ট্রামের ছাই মেখে বাঙালির যে সৎসমাজ, ভবেশকা আজ তার অগুন্তি সন্তানদের একজন।”
খুশিদি, যিশু, ভবেশকার এই ত্রিভূজের মাঝে জাল বিস্তার করেছে প্রাকৃতিক মায়াজালে ঘেরা নীরবতা, যৌনতার রহস্যময়তা ও বারব্রত-ঝাড়ফুঁকের কাহিনি । ব্যুমেরাং করে ছুঁড়ে দেওয়া গোপন প্রেম, দেহপুজা । যেখানে যত দারিদ্র, অপ্রাপ্তি, বঞ্চনা, সেখানে জ্যোতিষের কদর, ওঝার আদর তত বেশি । অর্থপিশাচ দাঙ্গাবাজ ভবেশকা তাই ঝাড়ফুঁকের ওঝা হয় :-
“অসীম তালোধি, ওর মেয়ের ভুতের ব্যারাম আচে । দাদা ওষুধ পথ্যি করে । রোগবালাই ঝাড়ার জন্যে রাসপা ত্রিফলা হিং রসুন শুঁঠ নিশিন্দে কুচিলা বেড়ালা হত্তুকি চিতেমূল সব বাটছিলুম একসঙ্গে ।”
ভুত ঝাড়ার মন্ত্রের সাথে মিলে মিশে যায় প্রণয় নিবেদনের মন্ত্র । খুশিদিকে এক অদ্ভুত স্হবিরতার মধ্যে আটকে রাখতে পেরে ভবেশকা পায় অধিগ্রহণের আনন্দ । কিন্তু শাপভ্রষ্টা নারীর মতো খুশিদি চায় পূজা, বন্দনা, আরাধনা, তৃপ্ত হতে চায় পুরুষের মুগ্ধতা গায়ে মেখে । ভবেশকা খুশিদিকে ভোগ করেছে কিনা বা না করলেও তা কেন করেনি তার উল্লেখ লেখক করেননি । পোস্টমডার্ন তৃতীয় বিশ্বের গ্রামের চেহারা ডায়াস্পোরিক সমাজের ভণ্ডামির প্রতিস্পর্ধী হয় । শাসন ও হুমকির ভয়ে জড়সড় গ্রামীণ সমাজের প্রতিস্পর্ধায় মাথা তোলে যিশু ও খুশিদির শরীর পূজাময় প্রেম । গার্সিয়া ‘মার্কেসের নিঃসঙ্গতার একশ বছর’-এ সেই শেষ প্রজন্ম আরোলোয়ানো ও আমারান্তা উরসুলার মিলনের মতো অলৌকিক এই প্রেম । স্বার্থপরের জিইয়ে রাখা অভাবে ও শোষণে জর্জর বঙ্গভূমির ছিবড়ে হয়েছে কল্পপ্রেমের জ্বালানি ।
“ওঃ মলয়
কলকাতাকে আর্দ্র ও পিচ্ছিল বরাঙ্গের মিছিল মনে হচ্ছে আজ
কিন্তু আমাকে নিয়ে আমি কি করব বুঝতে পারছি না
আমার স্মৃতিশক্তি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে
আমাকে মৃত্যুর দিকে যেতে দাও একা
আমাকে ধর্ষণ ও মরে যাওয়া শিখে নিতে হয়নি।”
( ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’, ‘অতলান্তিক’ হাংরি জেনারেশন সংখ্যা, ৬ঠ বর্ষ, ২য় সংখ্যা, এপ্রিল-জুন, ১৯৮৬, পৃষ্ঠা ৪০ )
মলয়ের সেই বিখ্যাত কবিতার এই পংক্তিগুলি চিৎকার করে সাক্ষ্য দেয় সেই অস্তিত্বহীন শিকড়হীন সময় ও সমাজের ক্ষুধাতাড়িত যুবসমাজের, যাদের অনুভব অনুভূতির কোনো দায় দায়িত্ব পূর্বপুরুষ বা অভিভাবকরা নেন নি । তাঁদের সেই ক্ষুধার তৃপ্তিতে তাঁরা সাহিত্যের কানাগলি অবধি সন্ধান করেছেন, কিন্তু বাংলা বাজারের শ্লীল সাহিত্যের সাথে, খাপ খাওয়াতে না পেরে সৃষ্টি করেছেন চাবুকের মতো এই সাহিত্যধারার, যা বহন করেছে জাদুবাস্তবের আগাম বীজ । বাংলা সাইত্যের লেখক-পাঠক কেউই খুব সহজে মান্যতা দিতে পারেননি হাংরিদের। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় বিস্ময়াদীর্ণ হয়ে বলেছিলেন এই সাহিত্য কি পিতা মাতার সামনে পাঠ করতে পারবেন এই লেখকরা ? পিতা মাতা গুরুজন অভিভাবকের নীতি আদর্শের রক্ষণশীলতার আড়ালে নিজেরা ফুরিয়ে যেতে চাননি এই তরুণরা । ডাডাইজমের প্রবর্তক ত্রিস্তান জঁরা যেমন বলেছিলেন, আমার আগে মানুষ আদৌ ছিল কিনা আমি জানতে চাই না, তেমনি মলয়, সমীর, বাসুদব, অরুনেশরা জানতে চাননি অতীতকে, যে অতীত তাঁদের সন্মুখীন করেছে এক ক্লেদাক্ত, নোংরা সমাজের সামনে । দিয়েছে কেবলই শৃঙ্খল ও পরিচয়হীনতা । প্রতিস্পর্ধায় কন্ঠ তুলতে তাঁরা স্বঘোষিত প্রতিলেখক ।
হাংরিরা যে হেনস্তা হবেনই, তা পূর্বনির্ধারিত ছিল । কিন্তু সময় বলে দিচ্ছে প্রতিস্পর্ধার আগুন ছড়াবেই । জাদুবাস্তবের প্রয়োজন আজ সমগ্র পৃথিবী অনুভব করছে । আমার তৃতীয় বিশ্বের পূর্বসূরীদের এই বিচক্ষণতাকে সন্মান জানানোই এই সন্দর্ভের মূল উদ্দেশ্য ।
( পলাশ খাটুয়া সম্পাদিত ‘ম্যাজিক রিয়ালিজম ও বাংলা সাহিত্য’, ২০১৬, বই থেকে নেয়া হয়েছে )







Name:  Bahata Angshumali          

IP Address : 012312.60.4523.107 (*)          Date:02 Jan 2019 -- 12:23 PM

বহতা অংশুমালী
মলয় রায়চৌধুরীর ডিটেকটিভ উপন্যাস : অলৌকিক প্রেম ও নৃশংস হত্যার রহস্যোপন্যাস
উপন্যাস এর নামটা আমাকে বুঝতেই দেয় নি ভিতরের খনিজের উপস্থিতি । প্রচ্ছদে যুবতীর ছবি দেখে মনে হয় কোনো রগরগে রবিবাসরীয়ের সামনে দাঁড়িয়ে পড়েছি। বুঝি নি এই অতি সংক্ষিপ্ত উপন্যাসের প্রতিটি লাইন এক বিরল জীবনদর্শনের মুখোমুখি করে দেবে আমাকে । এক অন্যধরণের সত্যানুসন্ধান , সাধারণ খুনের মামলার প্রেক্ষাপটে যা এক যুবক যুবতীর উৎকেন্দ্রিক আরণ্যক ভালোবাসা থেকে শুরু হয়ে শেষ হয় পশ্চিমবঙ্গের গ্রামে। তেলেগুতে এনক্রিপ্টেড, বাংলায় লেখা , সিডিতে সংরক্ষিত ডায়রিলেখনে বন্দী হয়ে থাকে সেই জীবনকাহিনী । আর কংকাল প্রেমিক এর জীবন ও মৃত্যু রহস্য উন্মোচিত হয় নোংরা পরীর হাতে।
নোংরা পরী , ববিটাইজিং ভীতির কার্যকারিতা আর সারল্যের সংজ্ঞা
নোংরা পরী বেরিয়ে এসেছে Edith Wharton এর বর্ণিত The Age of Innocence এর পর্দা কেটে । ইন্সপেক্টর রিমা খান অপরাধীর চোখের গতির ভিত্তিতে ক্রিমিনাল ঠ্যাঙায় । যে ক্রিমিনালরা জেরা করার সময়ে পায়ের দিকে তাকিয়ে থাকে তাদের দু-ডিগ্রি , যারা মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে তাদের থার্ড ডিগ্রি । বুকের দিকে তাকিয়ে থাকারা নাকি তুলনামূলক ভাবে স্বাভাবিক, রিমা খানের ভাষায় তারা প্রকৃতির মাদার-সান-ইন্সটিংক্ট মেনে চলে। তাদের ঠেঙিয়ে কথা আদায় করে না , সাবইন্সপেক্টারের ওপর ছেড়ে দেয় ।
রিমা খানকে উপন্যাসের পুরুষতান্ত্রিক সমাজ নাম দিয়েছে "নোংরা পরি" । নোংরা- কারণ সে সিমেন-দি-বভার সেকেণ্ড-সেক্স হতে রাজী নয়। সে আদ্যোপান্ত পুলিশ , প্রফেশনাল সমস্ত অর্থে , এমনকি ছুটকো ঘুষ নেবার ক্ষেত্রেও । সে দুর্দান্ত , দুঁদে । তার ভয়ে তার অঞ্চলের ক্রিমিনালরা লোক্যালিটি বদলে ফেলে ।
বেটি ফ্রিড্যান যে ফেমিনিন-মিস্টিক কে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছেন তা এখনো আজকের সমাজেও পৃথিবী জুড়ে বর্তমান । এই নারীত্বের রহস্য শতকের পর শতক কখনো চীনে মেয়েদের পা জুতোয় ঢুকিয়ে ছোটো করতে বাধ্য করে , আফ্রিকার উপজাতির মেয়েদের মরাল গ্রীবাকে দীর্ঘায়িত করতে ধাতব বালায় বালায় বরবাদ করে দেয় ঘাড়ের মাথাকে ধরে রাখার কার্যকারীতাটুকু। এই নারীত্বের সন্ধানে ইউরোপের শিক্ষিতা মহিলা প্রেমপত্রে বানান ভুল করে, পদার্থবিদ্যার ডিগ্রি না নিয়ে পড়তে চায় সুললিত আর্টস।
রিমা খানের মধ্যে সেই সারল্যটুকু নেই , সভ্যতা যে সারল্য শেখায় মেয়েদের, কাঁচের-পাথরবাটির মতো । যে শিক্ষিত সারল্যে মেয়েরা দুই বাচ্চার মা হয়ে গিয়েও সেক্সটকের অধিকার পায় না, বলে "ইস ছি ছি ছি", আজকের জমানাতেও । রিমা খান বিন্দাস গালিগালাজ করে। রিমা আবিষ্কার করে ফেলেছে যে ববিটাইজ করার ভয় দেখালে আবালবৃদ্ধ-ক্রিমিনাল খুব আকুল হয়ে পড়ে । তাতে অরগ্যাজম হয় রিমা খানের । এখন যে যুগ এ জিন্স এর সঙ্গে এক-হাত লাঠি-চুড়ি পরে মডার্ন ফেমিনিন ঘুরে বেড়ায় , স্ট্রিপটিজ দেখে আবার সন্তোষীমা-ও করে , সেখানে এই ডিলডো প্রেমী পুলিস অফিসারটি নোংরাও বটে পরীও বটে। তাকে কোথাও প্লেস করা যায় না, কোনো গ্রাফ এ ফেলা যায় না ! তার উলঙ্গ সত্ত্বায় কোনো কালো-দস্তানা-মোজা পরা লজ্জার ভেজাল ভঙ্গিমাও নেই । তাই সে মানুষী নয়। মানুষের ভোগ্যাও নয় হয়তো । বাঘিনী বাঘের জন্যে ভার্জিনিটি-টুকু বাঁচিয়ে রেখে ছিল । তা চারদিকে তো শুধুই ছাগল গবাদি পশু তার । তাই কুমারীত্ব ঘোচেনি কোনোদিন । এক ব্যতিক্রম কংকাল প্রেমিক ।
যে কংকাল সে শুধু প্রেমিক
প্রেম কয়প্রকারের হয়ে থাকে ? বহু প্রকারের হয়ে থাকে প্রেম। মেয়ে মাকড়শার সামনে পুরুষ মাকড়শার সুইসাইডাল প্রেম, মক্ষীরাণীর সামনে খুদে মৌমাছি শ্রমিকের প্রেম , রেপিস্ট হাঁসের প্রতি হংসিনীর প্রেম, ডলফিনের হরণ বা অপহরণ মূলক প্রেম , সতী নারীর পতিপ্রেম , বড়োলোকের বেশ্যাপ্রেম এবং সমান্তরাল ভাবে সন্তানের মায়ের প্রতি প্রেম এমন অনেক রকমের ।
আমাদের কংকাল , যিনি কিনা ইন্সপেক্টর রিমা খানের আবার চাকরি ফিরে পাবার পাসপোর্ট, তিনি ছিলেন গণিতবিদ । এখানে মলয় রায়চৌধুরী বোধ হয় গণিতের অবতারণা করেছেন কুয়াসাহীন শুদ্ধচিন্তার প্রতীক হিসেবে। নিরঞ্জন, ওরফে কঙ্কাল , বুঝে গিয়েছিলেন তিনি বহুগামী । তাই কোন মহিলাকে এবং নিজেকে সমস্যা না দিতে চেয়ে , বিয়ে টিয়ে না করে , শুদ্ধ গণিত ও শুদ্ধ যৌনতার চর্চা করেছেন প্রেমে পড়ার আগে অব্দি। মলয় রায়চৌধুরী দেখিয়েছেন তাঁর দুরকম প্রেম ।
নিম্নগামী প্রেমটি (মস্তিষ্ক থেকে শীষ্ণ হয়ে এসে হৃদয়ে যা ইকুইলিব্রিয়াম পেলো , মাসিকের আবর্তনে মাপলো সময় )
একজন জীবন খুঁজতে পালিয়েছিল , অন্যজন গিয়েছিল শুধু পলায়নপরাকে দেখে । মায়া পাল পুরোদস্তুর আধুনিক যুবতী , যিনি কুড়ুমুড়ে ইংরেজী বলতে বলতে অনায়াসে উচ্চপদের চাকরি পেতে পারেন , তিনি সুপুরুষ গণিতবিদের হাত ধরে বললেন "চলুন পালাই" । আর কামুক বিশ্বামিত্র ও তাঁর সঙ্গিনী চললেন অরূপের সন্ধানে, অন্ধ্রপ্রদেশের ব্যারাইটস খনি অঞ্চলে । তাঁদের অতিপ্রাকৃত ও অতিপ্রাকৃতিক প্রেম সেই অরণ্যে যাপিত হয়। অতিপ্রাকৃতিক কারণ মলয় রায়চৌধুরী এখানে খুঁজতে চেয়েছেন প্রকৃতির সঙ্গে মিথোজীবী ভাবে যাপিত জীবনের দিকটি । বাছুরকে দুধ থেকে বঞ্চিত না করে, মুরগীর ছাল ছাড়িয়ে না নিয়ে, ভেড়ার লোম কেটে না নিয়ে বাঁচার পদ্ধতি । মায়ার এনভায়রনমেণ্টালিজম, জীবপ্রেম ।
মলয় রায়চৌধুরী এখানে মনে করিয়ে দেন আমাদের ভুলে যাওয়া নারী পুরুষের প্রেমের রূপটিও । এখানে এক মানুষীর গায়ের গন্ধটি প্রেমিক চেনেন । প্রেমিক প্রেমিকাকে আলিঙ্গন করতে থাকেন মনের তাপে, আর রোজ আলিঙ্গন করতে করতে বুঝতে পারেন তাপের তারতম্য , ডিম্বাণুর আবির্ভাব। তাঁরা প্রেমটুকু চেয়েছিলেন , বীজটুকু নয়। তাই নিরোধ প্রক্রিয়া , অদ্ভুত আত্মনিয়ন্ত্রণ । মায়া নিরঞ্জনকে সেই প্রেম শেখান যাতে শরীর বড় হয়েও ওঠে না অযথা , ছোটও হয় না। যতটুকু আসে সহজে আসে। এই প্রথম নিরঞ্জন কোনো নারীর আলিঙ্গনে উত্তেজিত না হয়ে শান্ত হন।
এখানে খুব সুন্দর ভাবে দেখানো হয়েছে দুজন মানুষের একে অন্যকে কেন্দ্র করে বেঁচে থাকার আনন্দ। এখানে নিরঞ্জন ঘড়ির অভাবে মায়ার মাসিক বা ঋতূস্রাব এর দিন গুলিকে গাছের গুঁড়িতে খোদাই করে রাখেন । আর হিসেব রাখেন দিন মাস বছরের । "Metaformic theorists also discuss how cultures, like the Romans and Gaelic used the same words for menstruation and the keeping of time, while the Mayan calendar was directly influenced by women's menstrual cycles."(উইকিপিডিয়া থেকে উদ্ধৃত) উইকিপিডিয়া আর গুগল আমাদের বলে দেবে , মহাজাগতিক ক্যালেণ্ডারটি অনেক ক্ষেত্রেই কিভাবে প্রাচীন কালে নারীর শরীরের ঋতূচক্রের দিকে তাকিয়ে বানানো হয়েছিল । কখনো উনত্রিশ কখনো ত্রিশ দিনের বিরতিতে।
এই প্রেমে এক মানুষী বলেন আমি সবটুকু দেব, আর পুরুষটি বলেন আমি সবটুকু নেব । আর ঋতূস্রাবের পরে প্রেমিক ধুইয়ে দেন পরম আদরে প্রেমিকার রসস্থল , আরণ্যক দিনে ।
ঊর্ধ্বগামী ভালোবাসা (সখীর জন্যে বীজ শুয়ে আছে বরফে)
শরীরের ভালোবাসাকে আমরা মাঝে মাঝেই একটু নিম্নমানের বলি, পর্দা তুলে দিই । "রজকিনী প্রেম নিকষিত হেম, কামগন্ধ নাহি তায়" । যেন কামগন্ধ খারাপ বস্তু । যেন আমাদের সব্বার উৎস্য লজ্জার । এই ক্রিশ্চান ওরিজিন্যাল-সিন এর পাপবোধ যা আমাদের উপরে চাপিয়ে দেয়া হয়েছে , যে পাপবোধ থেকে আজ বহু মেয়ের অঙ্গ কেটে দেওয়া হয় যাতে তারা "শয়তানি আনন্দ" উপভোগ না করে শুধু সন্তান প্রসবের যন্ত্র হিসেবে নিজেদের বহন করতে পারে, সেখানে মিলি একদমকা খোলা হাওয়া । মিলি কিশোর আনাড়ি নিরঞ্জন কে "ভালোবাসতে" শেখায় । তারা বিভিন্ন পদ্ধতিতে নিজেদের শরীর নিয়ে খেলে , জানতে পারে যান্ত্রিক ভঙ্গীতেই বিভিন্ন আনন্দের উৎস্যমুখ । সে তো সেতার বাজাবার আগে টুংটাং টুকু না করলেই নয়।
মিলি ভালোবেসেছিল কংকালকে। নিরঞ্জন ভালোবাসেননি সেই অর্থে। তিনি তখন-ও পুরুষ নন। বৃন্দাবনবিলাসী কিশোর , যে পালিয়ে যাবে , পালিয়ে গেছে। কিন্তু মিলি বিয়ে করেন নি । আর নিরঞ্জনের সন্তান পাওয়ার জন্যে জোরাজুরিও করেছেন বহু বছর পরে দেখা হলে ।
নিরঞ্জন ভালোবেসেছেন মায়াকে । কিন্তু মিলির জন্যে মৃত্যুর আগে রেখে গেছিলেন শুক্র, ডাক্তারের কাছে ।
মিলি সন্তান চেয়েছিল, মায়া চায়নি । এখানে শিষ্ণ থেকে উঠে গেছে ভালোবাসা হার্ট এ । কি মন্ত্রে কে জানে।
এক্ষেত্রে মলয় রায়চৌধুরীর একটি ইণ্টারভিউ মনে পড়ে গেল Alexander Jorgensen কে দেওয়া। " Alex: If you could walk a mile in whatever circumstance, where would you choose to do it ?
Malay : I would go to the bank of river Ganges, at the place where I had kissed my Nepali classmate Bhuvanmohini Rana. My first and memorable kiss. I do not know where she is now. Must have become old or might have died ; she was two years older than me. I would sit at the same spot at the same time of autumn evening to revisit her tenderness." । আমার যেন মনে হয় ভুবনমোহিনী কোথাও মিলি , তার সমস্ত কোমলতা নিয়ে, যেখানে নিরঞ্জনের কৈশোর আটকে আছে।
মায়ার সত্যি নিরঞ্জনের সত্যি , মায়ার জীবনদর্শন
কাহিনীটি তো ডিটেকটিভকে নিয়ে। সত্যানুসন্ধান ! Akira Kurosawa র Rashomon যেমন দেখিয়ে দেয়, বিষয়গত তথ্য আর বিষয়ীগত সত্য এক নয় , প্রেমিক নিরঞ্জন ও প্রেমিকা মায়ার সত্যিও আলাদা।
মায়া আধুনিক , কিন্তু পুনরাধুনিক। তিনি জানতে চেয়েছেন জীবনের যাপনগত সত্যটা । মানুষ ঠিক কোন আঙ্গিকে সভ্য , জীবহত্যার ঊর্ধ্বে উঠে প্রকৃতির সঙ্গে মিথোজীবীতার মাধ্যমে বাঁচা যায় কিনা, তাই দেখতে চেয়েছিলেন তিনি। তাই দুধের শিশুকে ছেড়ে, স্বামীর ও সমাজের দেওয়া অসহিষ্ণুতা ও অপমান থেকে পালিয়ে যেতে , তিনি "খপ করে" নিরঞ্জনএর হাত ধরে বলেছিলেন "চলুন পালাই " ।
“No, it is impossible; it is impossible to convey the life-sensation of any given epoch of one’s existence--that which makes its truth, its meaning--its subtle and penetrating essence. It is impossible. We live, as we dream--alone.” -- Joseph Conrad এই জাতীয় উক্তি কে মেনে নিতে পারেননি ইংরাজির ছাত্রী মায়া পাল। নিরঞ্জন লিখেছেন , "সে আমাকে টমাস হবস, জোসেফ কনরাড, অ্যান্টনি বারজেস, উইলিয়াম গোলডিং আরো কারা কারা যেন, প্রতিটি নাম মনেও নেই এতদিন পর , এনাদের লেখালিখির কথা শোনাতো । তার জীবনের অতীতসূত্র কেবল এই সাহিত্যদর্শনকে ঘৃণা । তার অতীত সম্পর্কে আর বিশেষ কিছু জানি না, সে বলতে চায়নি । বলত ওনারা জীবনের ভুল ব্যাখ্যা করে গেছেন । ওনারা নাকি বলে গেছেন একজন মানুষের জীবন সংক্ষিপ্ত, সে একাকী, কেউ নেই তার, যত বৈভব থাক না কেন সে প্রকৃতপক্ষে দরিদ্র , পঙ্কিল, কদর্য, অশ্লীল, জঘন্য, স্হূল, পাশবিক, অশিষ্ট ও বর্বর । সে বলত, জীবনের এই আশাহীন দৃষ্টিকোণ অসত্য । "
কিন্তু নিরঞ্জন এর সত্য আলাদা। তিনি মূলতঃ প্রেমিক । তিনি নিজেকে দেখেন এইভাবে -"মায়ার পাশে বসে একই ভাবনা ঘুরছিল আমার মগজে, যা বহুকাল থেকে বাসা বেঁধে আছে । তা এই যে, আমি একজন কুকুর । যে মালকিনির হাতে পড়েছি, সে যেরকম চেয়েছে, যেরকম গড়েছে, তা-ই হয়েছি : প্রেমের কুকুর, কাজের কুকুর, সেবার কুকুর, গুপ্তচর কুকুর, ধাঙড় কুকুর, কুরিয়ার কুকুর, প্রেডাটার কুকুর , পাহারাদার কুকুর, মানসিক থেরাপির কুকুর, অনধের কুকুর, শোনার কুকুর, শোঁকার কুকুর, চাটার কুকুর, রক্ষক কুকুর, গাড়িটানার কুকুর, আদরের কুকুর, এই কুকুর, ওই কুকুর ইত্যাদি । কিন্তু আমার লেজটা জন্মের সময়ে যেমন আকাশমুখো ছিল, আজও তেমনই আছে । থাকবে । এখন টাইপ করতে বসেও জানি, লেজটা অমনই রয়েছে ।" এই আকাশমুখী লেজ এই গণিতবিদের জীবনচেতনা ।
নিরঞ্জনের জীবনচেতনার অন্য একটি দিক দেখা যায় , তাঁর চেতনায় "পবিত্র" শব্দটির অভিঘাতে । নিরঞ্জন লিখছেন - "আমার দিকে না তাকিয়েই মায়া বলেছিল, আমরা সারা জীবন নিজেদের সম্পর্ক আপনি-আজ্ঞের পবিত্র গভীরতায় রাখব । তুমি-তুমি ওগো-হ্যাঁগোর ছেঁদো নোংরা রুটিনে বাঁধা পড়ব না। বলেছিলুম, পবিত্র ? এই ধরণের অস্পষ্ট শব্দ ব্যবহার করবেন না প্লিজ । "
নিরঞ্জন এক জমির মতন পড়ে থাকেন সমস্ত জীবন । নানান মেয়ে , মহিলা তাঁর উপর দিয়ে বয়ে যান , তাঁকে উর্বর করেন , তাঁকে ভেঙ্গে দেন । তাঁর ল্যাণ্ডস্কেপ পালটে দেন। এভাবেই মানবজমিনের চাষ করে গেছেন নিরঞ্জন । শেষ দিন অবধি। তিনি কোনো মহিলা কে "ডিমিন" করেন নি কখনো । দেহ ব্যবসায়িনীর "গিগলিং" টুকুকেও নয়। "পৃথিবী নামের ছোট্টো দ্বীপটায়, নারী ছাড়া আমি একা, নিঃসঙ্গ, অন্তরীণ । জীবনে নারী নেই ভাবলেই মনে হয় মরে যাবো, মরে যাচ্ছি, মরে গেছি ; ফাঁকা, ফোঁপরা, খালি । জানতেই পারতুম না আহ্লাদ কি, আঘাত কি, বেদনা কি, হাহাকার কি । " - নিরঞ্জন এমনই ভাবেন, বলেন , বাঁচেন। এই নারীসঙ্গ ইচ্ছা সামগ্রিক শারীরীক কাম নয় একেবারে। তিনি শেষ বয়সেও ‘শেষনীর’ সঙ্গ চান উত্থানরহিত অবস্থায় । যেমন "অ্যালিস ইন দ্য ওয়াণ্ডার ল্যাণ্ড" এর লেখক লুই ক্যারল এর স্নেহের ডাকে খোকারা সুবিধে করে উঠতে পারতো না। তিনি খুকিদের বলতেন গল্প শুনতে আসতে। আর বলতেন ভাইদের ঘরে রেখে এসো । যে তার যে সুরে বাজে, সে তার সেই সুরেই বাজে । অন্যথা পচে যায় , যেমন আমরা পচে যাই অহরহ ।
সত্যানুসন্ধান কি? ভিলেন কারা কারা ? কাঠগড়ার এপারে ওপারে ।
ফেলুদা, ব্যোমকেশ , কাকাবাবু সন্তু এই সব্বার থেকে আলাদা নোংরা পরী , ডিটেকটিভ রিমা খান । ১) তিনি পুলিশ , সখের গোয়েন্দা নন ২) তিনি মহিলা, প্রথম , একমাত্র মহিলা সত্যানুসন্ধানী বাংলা উপন্যাসের । তিনি ক্ষমতাশালী, ইনফর্ম্যার কনস্টেবল ইত্যাদি প্রয়োগে সমর্থ । যদিও তিনি সাসপেণ্ডেড । ববিটাইজ-করার ভয় দেখাবার প্রক্রিয়ায় নোংরা ।
রাষ্ট্রই ভিলেন নম্বর ওয়ান
এই উপন্যাসে, প্রথম বাংলা উপন্যাসে আমরা দেখতে পেলাম অপরাধ জগতের ব্যক্তিনির্ভরতার ঊর্ধ্বে সিস্টেমটাকে । আমরা দেখতে পেলাম রাষ্ট্র কোথায় অপরাধী । কিভাবে তুরুপ উপজাতির মানুষদের উৎখাত করে ফেলে খনি-মাফিয়া খনির লোভে । কিভাবে ক্যাপিটালিজম এর , ব্যবসায়িক উদারনীতির , শিকার হয় অরণ্যের মানুষ । যাদের রাষ্ট্র কিচ্ছু দেয় না, যাদের "সমাজ" ব্যবস্থা , নীতি ব্যবস্থাকে রাষ্ট্র স্বীকারই করে না , যাদের ভোটাধিকার নেই, পৌরসুবিধা নেই , তাদের কিভাবে অনায়াসে একটি মাত্র পুলিশ চৌকির অন্তর্গত করে ফেলে রাষ্ট্র। মায়া ও নিরঞ্জন যখন তুরুপ গোষ্ঠীর বাচ্চাদের শিক্ষিত করতে থাকেন , কিভাবে সেই মানবিক প্রচেষ্টাকে পুলিশ অবলীলায় বলে "উপজাতিদের পড়াশুনা শিখিয়ে তোমরা যে এই অঞ্চলের ভারসাম্য নষ্ট করছিলে সে সংবাদ আছে আমাদের কাছে ।" এই ভারসাম্য ফেরত আসে , যখন সমস্ত আদিবাসী অরণ্য ছাড়া হয়ে খনি শ্রমিকে পরিণত হয়। কনজিউমার সোসাইটির প্রয়োজন তো সত্যই , কিন্তু আরণ্যক উপজাতির সত্যটুকুর কোনো দাম থাকে না রাষ্ট্রের চোখে । সবুজ নষ্ট হয়ে যায় । মাটিতে বড় বড় হাঁ করা গর্ত তৈরি হয়। কারণ খুঁড়েছে মাফিয়া, কোন বিবেকবান রাষ্ট্র নয় ।
মায়ার "আচ্ছা চলি"র পিছনে রাষ্ট্র নামক ভিলেনের কি অবদান তা বোঝার জন্যে পড়ে দেখুন উপন্যাসটা
ভিলেন নম্বর দুই
বলব না। তাহলে আর কী পড়ে দেখবেন । কিন্তু রিমা বুঝতে পেরেছিলেন ভিলেন কে। কংকাল প্রেমিকের ঘাতক কে । আর সেই ভিলেন কে বানিয়েছিল মধ্যবিত্ত সমাজের হাশহাশ নীতি, শাক দিয়ে মাছ ঢাকার চেষ্টা । যারা ভালবাসা দেখতে পায় না। ভালবাসার অভাব দেখতে পায় না । পবিত্র বিবাহগ্রন্থির নীচে চেপে রাখতে চায় সব রকম অতৃপ্তির চিৎকার । আর গ্রন্থিমুক্ত হতে চাইলে আঘাত করে সেই মানুষটিকে সুপরিকল্পিত ভাবে।
ভিলেনের স্মৃতিসৌধ
মায়ার "আচ্ছা চলির" পরে , মায়ালিঙ্গার পুলিশের হাতে অত্যাচারিত হবার পরে , তুরুপ প্রজাতির জঙ্গুলে মানুষই পুলিশের হাত থেকে বাঁচিয়ে আনে নিরঞ্জনকে। মায়া ছিলেন তাদের জন্য শিক্ষিকা , মাতৃরূপিণী , জীবন্ত দেবী , আম্মা। আর মায়াগারু সেই দেবীর জীবনের অঙ্গ । তুরুপ গোষ্ঠীর এই মানুষদের সমাজচেতনা আলাদা। তারা মায়া-নিরঞ্জনকে গ্রহণ করেছিল খুব সহজ ভাবে , বর্তমানে নির্ভর করে, তাদের অতীত না খুঁড়ে। তাঁদের চলে যাওয়ার পরে তারা কুঁড়ে ঘরটাকে মন্দিরের সম্মান দেয় । কোন বিগ্রহহীন মন্দির। কিন্তু মায়ার আকস্মিক প্রস্থানের জন্য দায়ী ক্ষমতা গোষ্ঠী , কুঁড়েটাকে ধর্মের দোকান বানিয়ে ফেলে অচিরেই । বহু পরে রিমা খান অকুস্থলে গিয়ে দেখতে পান, এক অদ্ভুত মূর্তি সহকারে মন্দিরটি পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে । সেখানে মায়া পাল-এর ভাবমূর্তি বেচে পুরুষতান্ত্রিক সমাজে খনি-মাফিয়ার দল বেশ দু পয়সা আয়ও করে নিচ্ছে ।
এভাবেই আমাদের দেশে সতী প্রথা থেকে শুরু করে অনার-কিলিং অব্দি বিভিন্ন ভাবে একটি মেয়ের সত্ত্বা ও অস্তিত্ব গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। তারপর তাকে "ধার্মিক" প্রমাণ ক'রে , দেবী প্রমাণ ক'রে, তার ব্যক্তিসত্তা ছিনিয়ে নিয়ে সমাজ তাকে অন্তর্ভুক্ত করে নেয় নিজের মধ্যে ।
যৌনতার অর্ধেক আকাশ ,যান্ত্রিক ও মানবিক অরগ্যাজম , অশ্লীল মলয় রায়চৌধুরী
মায়া
মলয় রায়চৌধুরী সেই অর্থে অশ্লীল যে অর্থে ডি এইচ লরেন্স বা গ্যাব্রিয়েল গারসিয়া মারকেজ অশ্লীল ছিলেন । যখন 'লেডি চ্যাটার্লিস লাভার্স-এ কনির মনে হয় নারীকে তার নারীত্ব থেকে ছিনিয়ে নিচ্ছে আজকের পুরুষ আর সমাজ , বহু বায়বীয় কথার মধ্যে দিয়ে তার শরীরী রহস্য আর দেহোত্তীর্ণতা দুটোকেই নষ্ট করছে, তখন কংকাল প্রেমিক পরম যত্নে ধুইয়ে দেন প্রেমিকার অঙ্গ প্রেমিকার অনুজ্ঞায় , ঋতূস্রাবের পর । এই স্পর্শ আমাদের পরিচিত যৌনতার থেকে অনেক ঊর্ধ্বে । এখানে ভালোবাসা যে-কোনো ইজমকে অতিক্রম করেছে। লজ্জা ঘৃণা ভয় ত্যাগ করেছেন কৃষ্ণ এখানে , শুধু রাধা বা গোপিনীর দল নয় । এই ভালোবাসায় নিরঞ্জন নিষিক্ত হতে থাকেন মায়ার সঙ্গে , সভ্যতা-ছেঁকে পাওয়া সভ্যতায় ।
মিলি
মেয়েদের যৌনতাকে সমাজ সাধারণতঃ অশ্লীল মনে করে। এই উপন্যাস-এ লেখক সেই ঢেকে যাওয়া অর্ধেক আকাশকে টেনে নিয়ে এসেছেন অনেকখানি । নিরঞ্জনের কৈশোরে মিলি , তাদের খেলাধূলোয় কেবল কৃষ্ণেন্দ্রিয় প্রীতি ইচ্ছা দেখায় না। সে আগে নিজে তৃপ্ত হয়ে নেয় নিরঞ্জনের মাধ্যমে । তারপর নিরঞ্জনকে নিয়ে যায় শিখরে । এই দেয়া নেয়ার সহজ হিসেবটুকু এই টেণ্ডারনেসের সঙ্গে আমি সচরাচর পাই নি কোন বাংলা উপন্যাসে । এই প্রসঙ্গের অবতারণা যখনই হয়েছে, কিছু বিকৃতির সঙ্গে করা হয়েছে । আবার লরেন্সের থেকে ভাবটি উদ্ধৃত করতে ইচ্ছে করে- স্পর্শ ছাড়া কিই বা টিকে থাকে , শেষ পর্যন্ত দেহে মনে অস্তিত্বের শিকড়ে ? যদি স্পর্শ তেমন স্পর্শ হয় ।
রিমা খান
RACHEL P. MAINES এর "The Technology of Orgasm "Hysteria," the Vibrator, and Women's Sexual Satisfaction" রচনা যেটি Johns Hopkins University Press থেকে প্রকাশিত হয়েছিল, তার প্রথম পরিচ্ছেদের নাম হলো " THE JOB NOBODY WANTED " যে-কাজটি-কেউ-চায়নি । শতকের পর শতক মেয়েরা তাদের যৌন চেতনাকে ঢেকে রেখেছে , সেবামূলক ও প্রদান-ভিত্তিক মিলনের আড়ালে। তাই তার চেপে রাখা "হিস্টিরিয়া" টুকুকে কখনোই অনুরণনে পরিণত হতে দেয় নি পিতৃতান্ত্রিক সমাজ । সেটা শুধু চিকিৎসা-সাপেক্ষ গোঙ্গানি হয়ে থেকে গেছে। তাই রিমা খান যখন ডিলডো ব্যবহার করে খুশী হয়, তৃপ্ত হয় , ফুরফুরে হয় , আমি তখন আবার উদ্ধৃত করি " When the vibrator reemerged during the 1960s, it was no longer a medical instrument; it had been democratized to consumers to such an extent that by the seventies it was openly marketed as a sex aid. Its efficacy in producing orgasm in women became an explicit selling point in the consumer market. The women's movement completed what had begun with the introduction of the electromechanical vibrator into the home: it put into the hands of women themselves the job nobody else wanted. " RACHEL P. MAINES এর রচনা থেকে ।
আমি এই "অশ্লীল" , নারীবাদী , মানবতাবাদী লেখককে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করি।
উপন্যাসের ফর্ম , Anachronism , সাহিত্যের ডিটেকটিভদের টাইম ট্রাভেল , রাজনৈতিক গণহত্যা ও ডিটেকটিভ বিলাসিতা
টাইম ট্রাভেল ও ডিটেকটিভ দের চোখে সামাজিক অবক্ষয়
এই উপন্যাসে বেশ কটি মজার পয়েণ্ট রয়েছে । Anachronism বা সময়ের হেরফের ব্যবহার করে দিল্লিতে আন্তর্জাতিক ডিটেকটিভ কনফারেন্সে মলয় রায়চৌধুরী আবির্ভূত করেছেন দেশ বিদেশের বহু সত্যান্বেষীকে , সাহিত্যের পাতা থেকে উঠিয়ে তাদের জীবন্ত করে তুলে, তাদের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখাতে চেয়েছেন আজকের সমাজে ডিটেকটিভদের অপ্রাসঙ্গিকতাটুকু ।
দিল্লিতে আন্তর্জাতিক ডিটেকটিভ কনফারেন্সে "প্রায়ভেট ডিটেকটিভ এসেছিলেন চেন কাও , ডেভিড স্মল, নিও উল্ফ, ভি আই ওয়ারশসস্কি, শন স্পেনসার, স্যাম স্পেড, শার্লক হোমস, কিনসে মিলোনে, এরকিউল পয়েরো, লিউ আর্চার, পল আর্টিজান, লিন্ডসে গর্ডন, জো ক্যানোলি, রেক্স কার্ভার, এলভিস কোল, হ্যারি ড্রেসডেন, ড্যান ফরচুন, ডার্ক জেন্টলি, এলেনি কুইন, এমারসন কড, কেট ব্যানিংগান, ক্লিফ হার্ডি, মাইক হ্যামার, টমাস ম্যাগনাম, ভেরেনিকা মার্স, ফিলিপ মারলো, জিম রকফোর্ড, জন শাফ্ট আর ম্যাথিউ শাডার ।" দেবেন্দ্রবিজয় , অরিন্দম , বাংলাদেশের কিশোর পাশা, মাসুদ রাণা আর মুসা আমন; আমাদের হুকাকাশি, কল্কেকাশি, নিশীথ রায়, ইন্দ্রনাথ রুদ্র, জয়ন্ত-মাণিক-সিন্দরবাবু জুটি , গুপি-পানু-ছোটোমামা জুটি, গোন্ডালু, কিকিরা, পাণ্ডব গোয়েন্দা, ট্যাঁপা-মদনা জুটি, গোগোল এরাও সবাই দেখা দিয়েছেন কনফারেন্সে ।
এঁরা সব্বাই একবাক্যে বলেছেন, যেখানে দেশের কোটি কোটি টাকা বিদেশে পচছে , রাজনৈতিক ফুসলানিতে তৈরী দাঙ্গায় মারা যাচ্ছে হাজার হাজার মানুষ , সেখানে খুচরো দু একটা খুনের কিনারা করতে গোয়েন্দা পোষা , বিলাসিতা মাত্র, সরকারের ধুলো দেয়া জনতার চোখে । এইভাবে সাহিত্যের গোয়েন্দাদের মাধ্যমে সাহিত্যের সমালোচনা অভিনব ও বেনজির ।
সংক্ষিপ্ত উপন্যাস এর সুবিশাল গণ্ডী
এই উপন্যাসটি অত্যন্ত চটি , টানটান । এটি সম্ভব হয়েছে একটি বিশেষ ফর্মের কারণে । সেটা হলো , ফ্ল্যাশব্যাক বা ডায়রি-লিখনের মাধ্যমে উপন্যাস এর বেশীরভাগ অংশ বর্ণিত হয়েছে। কঙ্কাল প্রেমিকের অতীত , রিমাখানের বর্তমান, এই দুই এর মধ্যে ঘুরেছে সমস্ত ঘটনা । অতি স্বল্প পরিসরে ভালোবাসা, সামাজিক সমস্যা , রাজনৈতিক কূটকচালি আর একটা লোমহর্ষক গোয়েন্দাকাহিনী এক সাথে বর্ণিত হয়েছে । লেখকের "অরূপ তোমার এঁটোকাটা " উপন্যাসেও ডায়রি লিখনের মাধ্যমে খুব স্বল্প পরিসরে অনেকটা ক্ষেত্র দেখানো গিয়েছিল । এই পদ্ধতিটি বেশ অভিনব বাংলা সাহিত্যে , যদিও কিছু কিছু এমন নজির আছে (যেমন "স্ত্রীর পত্র" শুধু পত্র লিখনের মাধ্যমে জীবনের সত্যিটুকু তুলে ধরতে পেরেছিল )।
পুলিশের গোয়েন্দাগিরির পদ্ধতিটাও খুব ভালো ভাবে ধরা পড়েছে এখানে, যে পদ্ধতি শখের বা প্রাইভেট গোয়েন্দার পদ্ধতির চেয়ে অনেক আলাদা। ইনফরম্যার-এর ব্যবহার, ছিঁচকে অপরাধীকে ভয় দেখিয়ে ছোটখাটো কাজ করিয়ে নেওয়া , ফরেনসিক অ্যানথ্রপলজিস্ট এর মতামত নিয়ে আইনতঃ প্রমাণ সাজানো , দরকার পড়লে অনিচ্ছুক লোকের বাড়ির ফোনের তার কেটে টেলিফোন কোম্পানির লোক সেজে ঢুকে পড়ার ফিকির ইত্যাদি অনেক রকম উপায় সম্পর্কে আমরা অবহিত হই ।
আবার কোন একটি কেস হঠাত করে পুলিশের কাছে দরকারি হয়ে পড়ে কেন, জমির বা রিয়াল এস্টেটের মাফিয়া কেন চায় যে একটা কোন সম্পত্তি দুর্নাম মুক্ত হোক, তা সে সত্যি বার করেই হোক বা বিশ্বাসযোগ্য সত্যি ক'রে , এই নানান জটিলতা ধরা থাকে এই উপন্যাসে ।
মলয় রায়চৌধুরী নিজেই এই উপন্যাসের একটি চরিত্র হয়ে শেষ দৃশ্যে উদয় হন ; কাহিনির সত্যতাকে পাঠকচেতনায় সংশয়ে রাখার প্রয়াসে । আর উপন্যাসের শেষে , অন্ততঃ একজন অপরাধীর উত্তরণ দেখা যায় মানুষ হিসেবে।
শেষকথা
সবটুকু মিলিয়ে বলা যায় যে এরকম প্রেমের উপন্যাস , যা কিনা অনেকগুলি বহুমুখী সত্যের ভিত্তিতে তৈরি করা বহুভূজের মধ্যে আমাদের এক অন্যরকম জীবনচেতনার মুখোমুখি করে দেয়, খুব বেশী লেখা হয় নি বাংলা ভাষায় । বিষয় বৈচিত্র ও সাহসী মনোজ্ঞ বর্ণনায় এই উপন্যাসটি বড্ড আলাদা, উৎকেন্দ্রিক , ঠিক এর লেখকের মতোই । পড়ে দেখতে পারেন সময় করে । মনের জটগুলো খুলে যাবে (অন্ততঃ আমার তো গেছে ) , আলো আসবে মনে।











Name:  মলয়          

IP Address : 012312.60.4523.107 (*)          Date:02 Jan 2019 -- 12:26 PM

পৌঁছে-যাওয়া মানুষ - ডাকাতের আশীর্বাদধন্য আমি
--------------------------------------------------------
মলয় রায়চৌধুরী
বিশ্ববিদ্যালয় হইতে পথে নামিবার পরই, প্রথম যে চাকুরিটিতে যোগ দিয়াছিলাম তাহা, দশটা-পাঁচটা চক্র না হইলেও, অত্যন্ত বিরক্তিকর ছিল বলিয়া অন্যপ্রকার একটি চাকুরির সুযোগ পাইতেই তাহাতে যোগ দিলাম কেননা আমি একই গৃহে একই পাড়ায় একই শহরে থাকিতে অভ্যস্ত নই ; ভালো লাগে না , অন্যত্র পলাইতে ইচ্ছা করে । একই মানুষদের দ্বারা পরিবৃত থাকিবার ফলে জীবন ও জীবনবীক্ষা মামুলি ও ক্ষুদ্র হইয়া পড়ে । নতুন কিছু ঘটিবার সম্ভাবনা সীমিত বোধ হয় । যদিও আমি রেকলুজ প্রকৃতির, একা থাকিতে পছন্দ করি, কম কথা বলি, কিন্তু আমার চতুর্দিকের মানুষদিগের কথাবার্তা ও জীবনযাত্রায় আগ্রহের কারণে, ওই যে বলিলাম, একই গৃহ-পাড়া-শহরের বৃত্তে পাক খাইয়া সেই একই মানুষদিগের মুখ দেখিয়া ও কথাবার্তা শুনিয়া কিয়ৎকালের ভিতরই ক্লান্ত বোধ করি । হ্যাঁ, ঠিকই, অন্যের জীবনের ঘটনাহীনতা আমার জীবনকেও ঘটনাহীন করিয়া তুলিতে পারে , তোলেও।
প্রতিটি ঘরের নিজস্ব উদাসীনতার যন্ত্রণাক্লিষ্ট সুবাস হয়, প্রতিটি গৃহের নিজস্ব নয়নসুখ আলো-বিচ্ছুরণ , প্রতিটি পাড়ার নিজস্ব গুঞ্জনমালা বাতাসকে ভারাক্রান্ত করিয়া ভাসে, প্রতিটি শহরের নিজস্ব কথাপ্রণালীর কাহিনিময় শব্দতরঙ্গ চতুর্দিক মথিত করে । সেকারণে চিরকাল নূতন সুবাস, আলো, গূঞ্জন ও শব্দতরঙ্গের অনুসন্ধানে ক্ষণিক-তীর্থের উদ্দেশ্য-সন্ধানী যাযাবরের ন্যায় চরিয়া বেড়াইবার প্রয়াস করিয়াছি ।
প্রথম চাকুরিটি পাইতে অসুবিধা হয় নাই কেননা আমার পক্ককেশ ইনটারভিউ গ্রহণকারীগণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলাফল পর্যাবেক্ষণান্তে অর্থশাস্ত্রের কয়েকটি তাত্ত্বিক প্রশ্নের উত্তরে সন্তুষ্ট বোধ করিয়া , যদিও সে-সকল তত্ত্ব বর্তমানে মানবচরিত্রের ব্যাখ্যাহীনতার কারণে খারিজ হ‌ইয়া গিয়াছে, তৎক্ষণাত চাকুরিটিতে যোগ দিতে বলেন । চাকুরিটি খারাপ ও ভালো লাগার কারণটিও একই । প্রতিনিয়ত ট্যুরের চাকুরি হইলেও, এবং ট্যুরজনিত রোজগার মনোরম হইলেও , চাকুরিটি ছিল অন্যের দোষ ও কারচুপি অন্বেষণ সংক্রান্ত । যেথায় যাইতাম, শহরতলি হউক বা শহর, তথাকার কর্মচারীগণ তটস্হ হইয়া থাকিত। কেহই সন্নিকটে আসিতে চাহিত না । তাহাদের ও আমার বরাত এতই খারাপ যে হাতে কলম তুলিয়া লইতেই কারচুপি খুঁজিয়া পাইতাম । ফিরিয়া প্রতিবেদন জমা দিবার কয়েক মাস পরে শুনিতাম অমুকের চাকুরিটি আমি খাইয়া লইয়াছি অথবা তমুকের পদোন্নতি বিঘ্নিত করিয়াছি। প্রতিনিয়ত নূতন-নূতন স্হানে যাইতে ভালো লাগিত, নূতন জনপদ ও শহরের জনগণকে শুনিবার , জানিবার , বুঝিবার সুযোগ হইত, নবনব খাদ্যবস্তুর স্বাদ পাইতাম । কিন্তু কাহারও চাকুরি খাইয়া লইতে বা পদোন্নতিতে বাধা সৃষ্টি করিতে একেবারেই ভালো লাগিত না ।
অন্য চাকুরি খুঁজিতে ছিলাম । দরখাস্ত জমা দিবার পর যথারীতি ইনটারভিউয়ের ডাক পড়িল । এই চাকুরিটি ছিল কৃষি উন্নয়ন সংক্রান্ত । চাষবাস সম্পর্কে আমার কোনো অভিজ্ঞতা তৎপূর্বে , ছাদের টবে মৌসুমি ফুলে সীমিত ছিল । সুতরাং কৃষি বিষয়ক গ্রন্হাদি সংগ্রহ করিয়া রাত জাগিয়া পড়াশুনা করিলাম । তথ্যাদি মুখস্হ করিলাম । আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকগণের সহিত সাক্ষাৎ করিয়া পরামর্শ লইলাম । ইনটারভিউতে আমাকে কৃষি বিষয়ক একটিও প্রশ্ন করা হইল না , কেবল সাধারণ জ্ঞান যাচাই করিবার নিমিত্ত কয়েকটি প্রশ্ন করা হইল যেগুলির সঠিক উত্তর দিতে অসুবিধা হইল না । ইনটারভিউ দিবার পর ধন্যবাদ জ্ঞাপন করিয়ে যখন পিছন ফিরিয়াছি, ইনটারভিউ পরিষদের চেয়ারম্যান কহিলেন, একটু দাঁড়ান । পুনরায় তাঁহার মুখোমুখি হইতে, তিনি বলিলেন, ওই ফুলদানিটি দেখিতেছেন, উহাতে কয়েকটি শষ্যের শুকনো শিষ রহিয়াছে, আপনি উহার মধ্য হইতে ধানের শিষটি লইয়া আসুন ।
নির্দেশ শুনিয়াই বিপদে পড়িলাম । একত্রে এতপ্রকার ফসলের শিষ বা ছড়া দেখি নাই । বস্তুত বাল্যকাল হইতে শহরের ঘিঞ্জি নিম্নবিত্ত পাড়ায় জীবন যাপন করিবার কারণে, এবং প্রথম চাকুরিটি কেবল নথিপত্র যাচাই করিবার ছিল বলিয়া চাষবাস সম্পর্কে জ্ঞানান্বেষণের সুযোগ হয় নাই । খেতে গিয়া কোন ফসলের শিষ দেখিতে কীরকম তাহা জানিবার সুযোগ হয় নাই । চালের সহিত যে ধানগুলি মিশিয়া থাকে সেই ধান নিকট হইতে দেখিবার সুযোগও হইত না, কেননা ভাত রাঁধিবার পূর্বে মা-জেঠিমা চাল হইতে তাহা বাছিয়া ফেলিয়া দিতেন । সেসময়ে টিভি ইত্যাদি গণমাধ্যম থাকিলে কোনোও না কোনো চ্যানেলে ধানের ছড়ার সহিত পরিচয় হইত নিশ্চয়, যেরূপ বর্তমানের শিশু-কিশোরদিগের হয় ।
ফুলদানিটির নিকটে গিয়ে দুইটি অল্প-পরিচিত শিষ পর্যবেক্ষণ আঁচ করিলাম যে সেগুলি যব ও গমের । সরস্বতী পুজার পূর্বে আমাদের গৃহের ছাদে টবে গম পুঁতিয়া দিদিগণ পুজার জন্য শিষ সংগ্রহ করিতেন । অন্য শিষগুলি বোতল পরিষ্কারের ব্রাশের ন্যায় দেখিতে এবং সেগুলিতে ধানের দানা নজরে পড়িল না । কয়েকটি ছড়া দেখিয়া ঘাসের শিষের ন্যায় প্রতিভাত হইল । অগত্যা যে শিষটি অবশিষ্ট তদ্দর্শনে অনুমান করিলাম যে উহা নিশ্চয়ই ধানের হইবে । সেইটি তুলিয়া আনিয়া চেয়ারম্যানের সন্মুখে রাখিলাম । এক মাসের ভিতর নূতন চাকুরির নিয়োগপত্র পাইলাম, লখনউতে যোগ দিবার নির্দেশসহ ।
লখনউতে যোগ দিবার প্রথম দিনই আমাকে বলা হইল যে আমার জন্য বুন্দেলখণ্ড এলাকাটির কৃষি-উন্নয়ন পর্যালোচনার ও প্রতিবেদন তৈয়ারির কর্ম বরাদ্দ হইয়াছে এবং কল্যই আমি যেন ইটাওয়া-ললিতপুর-জালাউন ইত্যাদি অঞ্চল পরিদর্শনে যাত্রা করি । অধস্তন আধিকারিকগণের কথা শুনিয়া অনুমান করিলাম যে কার্যালয়ের রাজনীতির খেলায় নূতন অধিকারীদের এই প্রকার প্রত্যন্ত অঞ্চল, কৃষিজ্ঞানের পরীক্ষা লইবার জন্য ,নির্ধারিত হয় । অঞ্চলগুলিতে রাত্রিবাসের জন্য হোটেল , যানবাহন ও খাওয়া-দাওয়ার অভাব সহজেই কাবু করিয়ে তোলে ।
সৌভাগ্য যে ইটাওয়ার জেলা কৃষি আধিকারিক শার্দুল মীনাকে আমাদের অফিসের কেহ আগেভাগে, আমি যোগ দিবার পূর্বেই, যেহেতু বুন্দলেখণ্ড আমার জন্য চিহ্ণিত হইয়াছিল, আমার সম্পর্কে বিস্তারিত সংবাদ সরবরাহ করিয়া দিয়াছিল । কথাপ্রসঙ্গে জানিলাম, তিনি আমার স্নাতকস্তরের সহপাঠী অভিমন্যু মীনার অগ্রজ । তাঁহার সরকারি বদান্যতায় অতিথিভবনে রাত্রিবাসের ও খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্হা হইয়া গেল । ক্ষেত্রসমীক্ষায় সহায়তা করিবার নিমিত্ত তিনি তাঁহার বিভাগের একজন বয়স্ক অফিসার, শ্রীসুগ্রীব নিমচকে আমার সঙ্গে দিলেন । ভালোই হইল । সরকারি জিপ ব্যবহারের সুযোগ পাইলাম ।
তিন দিনের ক্ষেত্রসমীক্ষায় আমার কর্ডুরয় প্যান্ট , ডোরাকাটা শার্ট , চোখের পাতা, মাথার ও ভুরুর চুল গেরুয়া ধুলায় , এবং কাগজপত্র সংখ্যা ও তথ্যে ভরিয়ে উঠিল । গেঞ্জি ও আন্ডারওয়্যার কেবল পরিবর্তন করিতাম , কেননা মাত্র চার দিনের ভ্রমণ বলিয়া দুইটি সেট শার্ট-প্যান্ট লইয়াছিলাম ।
অঞ্চলটি বর্ণনাতীত । পথের দুইধারে গভীর ও সঙ্কীর্ণ গিরিখাতের শুষ্ক ও বিমূর্ত ভুলভুলাইয়ার প্রায় জনহীন বিস্তার ধূলা উড়াইয়া সতত অধঃক্ষিপ্ত জলরাশির প্রত্যাশায় ভূতাত্ত্বিক বৈচিত্র্যকে করিয়া তুলিয়াছে কৌতূহলোদ্দীপক ও দূরভিসন্ধিপূর্ণ । দ্বিপ্রহরের পূর্বেই দিগন্ত আবরিত হয় গেরুয়া কুয়াশায় । পুষ্পিকা ও প্রাণীকুল এতদঞ্চলে ছলনাময় । চতুর্দিকে থম মারিয়া আছে মায়াময় অস্হিরতা । একটিই নদী বহিয়া গেছে যাহা উটের পিঠে বসিয়া পারাপার করিয়া থাকে স্হানীয় গ্রামবাসীগণ ।
চতুর্থ দিন কিয়দ্দূর রওনা হইবার পর শ্রীনিমচ একটি মন্দিরের নিকট জিপগাড়ি পার্ক করিয়া ভিতরে প্রবেশ করিলে বুঝিতে পারিলাম যে উহা একটি কালীমন্দির । অবাক লাগিল । সাধারণত কয়েকঘর বাঙালি যে অঞ্চলে বসবাস করেন সেখানেই কালীমন্দির গোচরে পড়ে । শ্রীনিমচকে প্রশ্ন করিতে উনি বলিলেন যে মন্দিরটি শপ্তদশ শতকে প্রতিষ্ঠা করিয়াছিলেন আতেরের মহারাজা বদন সিংহ। তিনি শক্তির উপাসক ছিলেন । এতদঞ্চলের শক্তি-উপাসকগণ সুকর্ম সমাপনান্তে মন্দিরে ছাগ-বলি দিয়া থাকেন ।
পুরোহিত শ্রীনিমচকে কহিল, বাবাসাহেব নিকটের একটি গ্রামে আসিয়াছেন । প্রত্যুত্তরে নিমচ কহিল, বহুদিন পর বাবাসাহেব নদীর এই পারে আসিলেন । দেখা করিয়া লইব । সেই পরবের সময় আশীর্বাদ লইয়াছিলাম, আর তো দেখা হয় নাই ।
--বাবাসাহেব ? সাধুসন্ত হ্যাঁয় কেয়া ? জিজ্ঞাসা করিলাম ।
--জি হাঁ । পঁহুচে হুয়ে আদমি হ্যাঁয় । শ্রীনিমচ প্রত্যুত্তর করিল । অভিব্যক্তিটি অদ্ভুত লাগিল । পৌঁছে-যাওয়া মানুষ ! মহাকাশে, চাঁদে, সমুদ্রগর্ভে সর্বত্র মানুষ পৌঁছাইয়া গিয়াছে । সাধুসন্তরাও সাধনালব্ধ ক্ষমতার বলে পৌঁছাইয়া যান হয়তো তাঁদের অভীষ্ট লক্ষ্যে ।
কাঁচা রাস্তায় জিপগাড়ি ছুটিল আমার পোশাক ও ত্বকে গেরুয়া মিহিন ধুলার আস্তরণ সংগ্রহ করিতে-করিতে । কিছুটা যাইবার পর লালকাঁকরের পথের মাঝখানেই কয়েকজন গ্রামবাসী বসিয়াছিল বলিয়া চালক গাড়ি থামাইল; তাহারা চালককে বলিল যে এই রাস্তাটি খারাপ হইয়া গিয়াছে , আপনারা পাশ্ববর্তী গ্রামের ভিতরের পথ দিয়া চলিয়া যান। বাতাসকে আরও ধুলিধূসরিত করিয়া সাত-আট কিলোমিটার যাইবার পর দেখিলাম একটি বিশাল বটবৃক্ষের তলায় প্রায় কুড়ি-পঁচিশজন গ্রামবাসী একজন তামাটে পেটমোটা মোড়লের সন্মুখে বসিয়া, সম্ভবত তাঁহার বাণী শুনিতেছে। তদ্দর্শনে চালক সেই দিকে জিপগাড়িটি লইয়া গিয়া থামাইল । শ্রীনিমচ নামিল, আমিও তাঁহার সহিত নামিলাম । মোড়ল লোকটির বাবরিচুল উস্কোখুস্কো, উর্ধাঙ্গে পোশাক নাই, নিম্নাঙ্গে একটি চাককাটা লুঙ্গি। তিনি বসিয়া আছেন মাটির উঁচু বেদির উপরে ।
শ্রীনিমচ মোড়লের নিকট গিয়া হাতজোড় করিতে তিনি কোঁচড় হইতে একমুষ্টি মুড়ি দিলেন এবং নিমচ তাহা তৎক্ষণাত ভক্ষণ করিয়া লইল । মোড়ল আমাকে দেখিয়া শ্রীনিমচকে জিজ্ঞাসা করিল, সরকার বাহাদুর ?
--জি হাঁ । শ্রীনিমচের বিনয়ী প্রত্যুত্তর ।
মোড়ল আমাকে ডাকিয়া বলিল, সরকার বাহাদুর, তুম ভি লো । যত্রতত্র ভক্ষণ সম্পর্কে আমার পেট খারাপের ভীতি আছে । আমি পকেট হইতে রুমাল লইয়া তাঁহার প্রদত্ত মুড়ি বাঁধিয়া লইলাম, পরে ফেলিয়া দিব । আমার আচরণে মোড়ল প্রীত হইলেন, বলিলেন, আও । আমি আরও নিকটে গেলে তিনি আমার মাথার উপর হাত রাখিয়া বলিলেন, জিতে রহো।
আমরা জিপগাড়িতে গিয়া বসিলাম । কিয়দ্দূর যাইবার পর শ্রীনিমচ বলিল, আপনি বুন্দেলখণ্ডের চম্বলঘাটিতে যেখানে ইচ্ছা যাইতে পারেন, কেহ আপনার কোনো ক্ষতি করিবে না, বাবার আশীর্বাদ পাইলেন । প্রশ্ন করিলাম, ইনি কি এতদঞ্চলের কোনো ধর্মগুরু ? পোশাক দেখিয়া তো মনে হইল বয়স্ক চাষি । শ্রীনিমচ কহিল, স্যার উনি ডাকাত সর্দার বাবা মুস্তাকিম, সরকার ওনার মাথার দাম রাখিয়াছে এক লক্ষ টাকা । যাহারা ঘাসের উপর বসিয়াছিল তাহারা ওনার দলের ডাকাত ।



Name:  মলয়          

IP Address : 012312.60.4523.107 (*)          Date:02 Jan 2019 -- 12:31 PM

আমার মেজদা চোর ছিলেন
---------------------------------
মলয় রায়চৌধুরী
আমার মেজদা অরুণ রায়চৌধুরী, ডাক নাম বুড়ো, ছোটোবেলায় মনে হয়েছিল হঠাৎ, পরে বুঝতে পারি, হঠাৎ নয়, তার কারণ ছিল, চুরি-ডাকাতি-গুণ্ডামির জগতে, বলা চলে বুক ঠুকে, বয়ঃসন্ধিকালেই, ঢুকে পড়েছিলেন । পাটনার কাহার কুর্মি দুসাধ পাশি আর অতিদরিদ্র শিয়া মুসলমান অধ্যুষিত ইমলিতলা পাড়ায়, চারিদিকে গোলটালির বস্তিবাড়ির মাঝে, আমাদেরটাই ছিল দু-তলা ইঁটের দাঁত বেরোনো পাকা বাড়ি । ইমলিতলায় বড়ো জ্যাঠা বাড়িটা তৈরি করেছিলেন কেননা অমন এলাকায় ভদ্রলোকেরা ঢোকে না বলে জমিজমা সস্তা ছিল । আমরা জানতুম যে পাড়ার লোকেদের পেশা হল প্রধানত চুরি করা, আর পুলিস তাদের খোঁজে আসলে গোলটালির ওপর দিয়ে দৌড় লাগিয়ে পেছনের আম বাগানে পালানো । পাড়ায় পুলিশ ঢুকলে কুকুরগুলো ঘেউ-ঘেউয়ের মাধ্যমে বার্তা পৌঁছে দিত আর ধরা পড়ে যাবে আঁচ করে অনেকে পালাতো । চুরি সফল হলে ভোজ হতো পাড়ায়, পাঁঠার নাড়িভূঁড়ির রান্না আর পাঁঠির থন পিষে কাবাব, খাওয়া হতো তাড়ি সহযোগে । তাড়িও চুরি করে আনা । কোন গাছ থেকে তাড়ি চুরি করে আনা হবে, তাল গাছের গায়ে দাগ দিয়ে তাড়ি চোরের দলকে তা জানিয়ে দেয়া হতো। আমার, মেজদার আর দাদার তাড়ি খাবার হাতেখড়ি ছোটোবেলাতেই, পাড়ার চোরেদের পাল্লায় পড়ে । পাড়ায় দাদার এক বন্ধু ছিল বদ্রি পাটিকমার নামে ; সে চুরি করাকে ঘৃণ্য বলে মনে করত, কেননা সে ছিল পকেটমার, আর পকেট মারতে হলে ‘তরকিব’ দরকার ।
হিন্দি গালাগাল, যাকে বাঙালিরা বলেন অশ্লীল, তাও আমরা ছোটোবেলায় ইমলিতলা পাড়াতেই শিখি । অশ্লীল গালাগাল দিয়ে ফেললে তিনবার ‘ওং বিষ্ণু’ বললে দোষ কেটে যায় । আমার শৈশবের বন্ধু কপিলের দাদু শিশুদের গালাগাল শেখার ক্লাস নিতেন । আমাদের বাড়ির সামনের কলে যারা জল ভরতে আসত তাদের গালাগাল দিতে উৎসাহিত করতেন কপিলের দাদু, যিনি রাতে আমাদের বাড়ির লাল সিমেন্টের রোয়াকে শুতেন; ওনার মাথায় দেবার বালিশ এত তেলচিটে হয়ে গিয়েছিল যে মনে হতো চামড়ার তৈরি । অবাধ যৌনতার শিক্ষাও এই পাড়াতেই পেয়েছিলুম ছোটোবেলায়, বিশেষ করে দোলের দিন যেদিন পাড়ার মহিলারা দল বেঁধে বেরোতেন আর কিশোরদের ওপর জোরাজুরি করতেন, এমনকি নিজের স্বামীর সামনেই চুমু খেতেন আর যেখানে-সেখানে হাত ঢুকিয়ে হাসাহাসি করতেন । বাড়ি থেকে কড়া নির্দেশ ছিল যে দোলের দিন মহিলাদের দল চলে না যাওয়া পর্যন্ত বেরোনো যাবে না । কিন্তু বেপরোয়া বিহারি বউদের ডাক এড়ানো যেত না ।
আমাদের বাড়ির কুড়িজন সদস্যের আর্থিক দায় বর্তেছিল প্রধানত আমার বাবার ওপর ; তাই বাবা ভোর বেলা বেরিয়ে যেতেন আর ফিরতেন রাত করে । বড়ো জ্যাঠা প্রথমে চতুর্থ শ্রেণীর কর্মী হিসেবে পাটনা মিউজিয়ামে যোগ দেন; পরে পদোন্নতি পেয়ে কিপার অফ পেইনটিংস অ্যাণ্ড স্কাল্পচার হন । তিনিও সকালে বেরিয়ে রাতে আড্ডা দিয়ে ফিরতেন । মেজজ্যাঠা আর কাকাদের মনে করা হতো অপ্রকৃতিস্হ ; তাঁদের বিশেষ দায়িত্ব দেয়া হতো না । ইলেকট্রিসিটি ছিল না : আমরা ভাইবোনরা সবাই একটা লন্ঠন ঘিরে পড়াশোনা করতুম । রাতের খাওয়া হয়ে গেলে বড়জেঠিমা লন্ঠনের আলো কমিয়ে দিয়ে আমাদের গল্প শোনাতেন । জেঠিমা-মা-কাকিমা কেউই স্কুলে যাননি কখনও, জানি না বড় জেঠিমা ইশপের আর আরব্য রজনীর গল্পগুলো কোথা থেকে সংগ্রহ করেছিলেন । বাবার ছয় ভাইয়ের মধ্যে নতুনকাকা ছাড়া আর কেউ স্কুলে যাননি ; চাকরি পেয়েই নতুনকাকা ইমলিতলার বাড়ি ছাড়েন ।
মেজদা, যিনি চোর-ডাকাত-গুণ্ডা হয়ে গিয়েছিলেন, তিনি ছিলেন বড়জেঠার ছেলে । বাবা প্রধান রোজগেরে হলেও বাড়িতে কারোর প্রতি কোনো পক্ষপাত করা হতো না । ছোটোদের জন্য যা কেনা হতো তা মেজদার জন্যও কেনা হতো । পাড়ার প্রভাবে মেজদা চুরি-ডাকাতি-গুণ্ডামির জগতে প্রবেশ করেননি, রাজনৈতিক কর্তাদের চাপেও নয় । নিজের অন্তরজগতের ডাকে তিনি ওই পথে যান । ছোটোবেলায় আমরা সবাই বিভিন্ন স্কুলে পড়তুম । মেজদা প্রথমে পড়তেন টি কে ঘোষ অ্যাকাডেমিতে, যে স্কুলটা সেসময়ে বেশ নাম করা ছিল। হঠাৎই মেজদা স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দিলেন, বইপত্র বেচে দিলেন, ফলে স্কুল থেকে নাম কাটা গেল । দাদার উপনয়ন বেশ কম বয়সে হয়ে গিয়েছিল । মেজদা চাইছিলেন যে দাদার পর ওনার উপনয়ন হোক, তেরো বছর বয়সেও যখন মেজদার উপনয়ন হল না, মেজদা খেপে গিয়ে স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দিলেন । বড়জেঠা আর জেঠিমা অনেক বুঝিয়ে , যে, যখন আমার উপনয়ন হবে তখন মেজদারও একই সঙ্গে হবে, মেজদাকে আরেকটা স্কুলে ভর্তি করে দিলেন, পাটলিপুত্র স্কুলে, সেসময়ে বলা হত যে স্কুলটা বজ্জাত ছেলেদের জন্য । মেজদা কিছুদিন ক্লাস করার পর বইটই বেচে দিয়ে এই স্কুলে যাওয়াও বন্ধ করে দিলেন । আমরা সবাই লন্ঠন ঘিরে পড়তে বসলেও মেজদা বসতেন না, বাড়িতেও থাকতেন না । স্কুল ছাড়ার পর মেজদা বাড়ির বাইরেও লুঙ্গি পরে বেরোনো আরম্ভ করলেন, অনেক সময়ে কেবল গেঞ্জি পরে । মেজদা আমাদের সঙ্গে বাংলায় কথা বলাও বন্ধ করে দিলেন । সবায়ের সঙ্গে হিন্দিতে কথা বলা আরম্ভ করলেন । কেন যে মেজদার চরিত্রে আচমকা এরকম বদল ঘটছে, তার ব্যাখ্যা কেবল বয়স্কদের কাছেই ছিল । হয়ত দাদার কাছেও ছিল, কিন্তু ম্যাট্রিক পাশ করার পর দাদাকে আদিবাড়ি উত্তরপাড়ায় পাঠিয়ে দেয়া হয়েছিল ।
বাড়িতে দেখা গেল যে মাঝে মাঝে পেতলের বাসনপত্র লোপাট হয়ে যাচ্ছে । কাজের লোক শিউনারায়ণ বা শিউনন্নি আমাদের বাড়িতেই থাকত, তাই তার হাত নেই বলেই মনে করলেন বয়স্করা । একদিন পাড়ার শিয়া মুসলমান মসজিদের ইমাম সাহেব এসে বললেন যে মেজদা মসজিদে ঢুকেছিলেন, তারপর থেকে ওনার পেতলের বদনাটা লোপাট । ইমাম সাহেবের সামনেই মেজদাকে বড়জেঠা জেরা করলেন ; মেজদার যুক্তি শুনে আর মুখ দেখে ইমাম সাহেবের মনে হল কাজটা মেজদার নয় । এর কিছুদিন পর, বড়জেঠা সকালে সবাইকে ধমকানি দেয়া আরম্ভ করলেন, কেননা কালকে উনি মাইনে পেয়ে সুটকেসে এনে রেখেছিলেন, সকালে বাজার যাবার জন্য সুটকেস খুলে দ্যাখেন কিচ্ছু নেই, টাকা হাপিস । তার সঙ্গে মেজদাও বাড়ি থেকে হাপিস । মেজদা যে চুরি করা আরম্ভ করেছেন তা স্পষ্ট হল ।
মাস খানেক পর মেজদাকে বাড়িতে এনে রেখে গেল একজন লালপাগড়ি কন্সটেবল, এ কথা জানিয়ে যে মেজদা সিনেমার টিকিট ব্ল্যাক করছিল । তবুও মেজদার মধ্যে পরিবর্তন দেখা গেল না । দিনকতক পরে ডুণ্ডাসিং ঠাকুরবাড়ির আখড়ার জনৈক কুখ্যাত গুণ্ডা জানিয়ে গেল যে মেজদাকে যেন সামলানো হয়, কেননা মেজদা যেভাবে কুকাজ আরম্ভ করেছে যেকোনো দিন খুন হয়ে যেতে পারে । ওদের আস্তানায় মেজদার খোঁজে পুলিশ কয়েকবার এসে খোঁজ করে গেছে । বয়স্করা কিছু বললেন না মেজদাকে । বড়জেঠিমা ওনার পাড়াতুতো বান্ধবী জনৈক কামারের বউ রামপতিয়ার পরামর্শে মেজদাকে বশীকরণের সুতো বাঁধা, মাথায় ফুল রাখা ইত্যাদির মন্ত্রপূতঃ ঘুগনি খাওয়ানো আরম্ভ করলেন । ছোলার ঘুগনি খেতে ভালো লাগত মেজদার । মন্ত্রপূতঃ ঘুগনিতে রামপতিয়া মিশিয়ে আনত শুকনো ধুতরোর গুঁড়ো । মেজদার ক্রমশ রোগা আর খিটখিটে হয়ে উঠল । একদিন রাতে সদর দরজার খিল মাটিতে পড়ার আওয়াজে বাড়ির সবায়ের ঘুম ভেঙে যেতে দেখা গেল যে মেজদা নিজের ঘরে একজন বেশ্যাকে এনেছিলেন । বউটি তো দ্রুত বেরিয়ে চলে গেল, কিন্তু মেজদাকে বড়জেঠা কানমুলে মার দেয়া আরম্ভ করলেন, চিৎকার করতে লাগলেন, “বাড়িতে বেবুশ্যে মাগি আনা…” । বেশ্যাকে যে বেবুশ্যে বলে তা জানলুম । মাঝরাতে বউটির পেছন-পেছন বেরিয়ে গেলেন ষোলো বছরের মেজদা ।
প্রতিবেশিরা, যাদের অনেকেই চুরি-পকেটমারি করত, তাদের মুখেই শোনা যেতে লাগল যে মেজদা চুরি-ডাকাতি-গুণ্ডামি আরম্ভ করেছে। বয়স্করা আমাদের আদেশ দিলেন যে মেজদার দেয়া কোনো জিনিস যেন আমরা না নিই, কেননা ওগুলো চুরি করে আনা । বয়স্করা কেউই বুঝতে পারছিলেন না মেজদাকে কি ভাবে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনবেন । জেঠা-বাবা-কাকারা আর মেজদা সম্পর্কে আগ্রহ দেখাতেন না : বড়জেঠিমা কেবল কাঁদতেন, সারাদিন কাঁদতেন, আর ঘুগনিতে শুকনো ধুতরোর গুঁড়ো মিশিয়ে বশীকরণের মাধ্যমে মেজদাকে স্বাভাবিক করতে চাইতেন ।
একদিন স্কুলে যাবার সময়ে বৈঠকখানা ঘরে তুমূল চেঁচামেচি শুনে বাড়ির সবাই জড়ো হয়ে দেখলুম যে মেজদা ভোজপুরি-মগহি-হিন্দিতে তুই-তোকারি করে বড়জেঠিমাকে নানা কথা বলে চলেছেন । বড়জেঠিমা ফুঁপিয়ে চলেছেন নিঃশব্দে । মেজদা বলে চলেছেন যে বড়জেঠিমা ওনার মা নয় তা কেন এতদিন জানানো হয়নি ; মেজদাকে যে দেড়শো টাকায় একজন বেশ্যার কাছ থেকে কেনা হয়েছিল তা কেন জানানো হয়নি ; কে মেজদার আসল মা, কে মেজদার আসল বাবা, তারা কোথায় থাকে, জাতের ঠিকঠিকানা নেই বলেই উপনয়ন দেয়া সম্ভব নয় তা কেন আগে জানানো হয়নি, প্রচণ্ড চিৎকার করতে-করতে শানবাঁধানো লাল সিমেন্টের মেঝেতে, কুয়োবোজানো গোল দাগটার মধ্যে মাথা ঘুরে পড়ে গেল মেজদা ।
চেঁচামেচি শুনে পাড়াপ্রতিবেশিরা বৈঠকখানায় এসে জড়ো হয়েছিল । তাদের একজন ঝুঁকে মেজদার বুকে কিছুক্ষণ কান রেখে ঘোষণা করল যে মেজদা মারা গেছে । শবযাত্রীরা তৈরি হবার পর বড়জেঠা ঘোষণা করলেন যে একজন চোরের মুখাগ্নি তিনি করবেন না । বড়জেঠার বড়মেয়ের স্বামীকে সে-কাজ করার জন্য ডেকে পাঠানো হল । চলে গেলেন মেজদা, পাড়ার লোকেদের ‘রাম নাম সৎ হ্যায়’ ধ্বনির সঙ্গে, তাদের কাঁধে চেপে । মেজদাও চেয়েছিলেন নিশ্চয়ই যে হরিবোল নয়, রাম নাম সৎ হ্যায় ধ্বনিই উঠুক তাঁর শবযাত্রায়। আমাকে বলা হল যে অত কম বয়সে শ্মশানে যাওয়া অনুচিত । বাড়ির কেউই গেলেন না, বড়জামাইবাবু ছাড়া ।
পরে, পুরুতমশায়, যিনি জেঠা-বাবা-কাকাদের বন্ধু, তিনি আর বড়জেঠা সন্ধ্যাবেলায় চুপচাপ বসেছিলেন, সেই ঘরেই যেখানে মেজদা মারা গিয়েছিলেন । শুনলুম পুরুতমশায় বলছেন, ‘উপনয়নটা দিয়ে দিলেই পারতে, তখনই বলেছিলাম তোমাকে, দিয়ে দাও, ব্রাহ্মণ পুরুষের পুত্রসন্তান ব্রাহ্মণই হয়, তার মা শুদ্রাণী না মুসলমান না নেপালি তা তুমিই জানো, কিন্তু তাতে কিছু এসে যায় না । চুরি-ডাকাতি করলেই বা, সে তো ব্রাহ্মণের ছেলে ।’






Name:  মলয়          

IP Address : 012312.60.4523.107 (*)          Date:02 Jan 2019 -- 12:37 PM

আবু সয়ীদ আইয়ুব, অ্যালেন গিন্সবার্গ ও হাংরি আন্দোলন
---------------------------------------------------------------------------------
মলয় রায়চৌধুরী
১৯৬১ সালে হাংরি আন্দোলন আরম্ভ হবার কিছুকাল পর থেকেই কলকাতার তখনকার এলিটরা লালবাজারে প্রতিনিয়ত ফোন করে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্হা নিতে অনুরোধ করছিলেন । ফলে লালবাজারের প্রেস সেকশানকে অ্যাক্টিভেট করা হয়েছিল এবং দুজন ইনফরমারকে কলেজ স্ট্রিট কফিহাউস এবং আন্দোলনকারীরা যেসব ঠেকগুলোয় যেতেন আর কবিতা পাঠ করতেন সেখানে-সেখানে নজর রাখতে বলা হয় । এঁরা দুজনে, পবিত্র বল্লভ এবং সমীর বসু, মামলার সময়ে যাঁরা আমার বিরুদ্ধে ভুয়ো সাক্ষী হয়ে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়েছিলেন, আন্দোলনের বুলেটিন ও বইপত্র যোগাড় করে লালবাজারের প্রেস সেকশানে জমা দিতেন । আমাকে আর দাদা সমীর রায়চৌধুরীকে যখন পুলিশ কমিশনারের ঘরে একটা বিশেষ ইনভেসটিগেটিং বোর্ড জেরা করেছিল, তখন দুটো ঢাউস ফাইল দেখেছিলুম গোলটেবিলের ওপর, তাতে আমাদের যাবতীয় লেখালিখি সংগ্রহ করে ফাইল করা ছিল ।
আমাদের বিরুদ্ধে যে এলিট ভদ্রলোকরা নালিশ ঠুকেছেন তা পুলিশ কমিশনার নিজেই আমাদের বলেছিলেন । পরে, কমিটি ফর কালচারাল ফ্রিডাম-এর সচিব শ্রী এ. বি.শাহ যখন পুলিশ কমিশনারের সঙ্গে দেখা করেন, তিনি জানতে পারেন যে আমাদের বিরুদ্ধে অ্যাকশান নেবার জন্য সবচেয়ে বেশি জোর দিয়েছেন আবু সয়ীদ আইয়ুব আর সন্তোষকুমার ঘোষ । কলকাতায় র‌্যাডিকাল হিউমানিস্ট-এর দপতরে শ্রী শাহ-এর সঙ্গে মকোদ্দমা নিয়ে আমার আলোচনা হয়েছিল । সন্তোষকুমার ঘোষের সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছিলুম, তিনি রাজি হননি। বুদ্ধদেব বসুও আমার সঙ্গে দেখা করতে চাননি, আমার নাম শুনেই মুখের ওপর দড়াম করে দরোজা বন্ধ করে দিয়েছিলেন । সমর সেন তখন ইংরেজি ‘নাউ’ পত্রিকার সম্পাদক, ওনার সঙ্গে দেখা করতে গেলে উনি বলেছিলেন, ‘কারা আপনাদের বিরুদ্ধে পুলিশে মৌখিক অভিযোগ দায়ের করেছেন তা আমি জানি, কিন্তু তাঁদের নাম আপনাদের বলব না ।” একই কথা বলেছিলেন গৌরকিশোর ঘোষ । আবু সয়ীদ আইয়ুব-এর বাড়িতে গিয়ে আমি আর দাদা দেখা করেছিলুম ।
মজার ব্যাপার হল যে আইয়ুব সাহেব নিজেই ছিলেন ‘ইনডিয়ান কমিটি ফর কালচারাল ফ্রিডাম’-এর চতুর্মাসিক ম্যাগাজিন ‘কোয়েস্ট’-এর সম্পাদক ; ( পত্রিকাটি আমেরিকার সি, আই. এ.-র সাহায্য পায় এমন সংবাদ প্রচারিত হলে, বন্ধ হয়ে যায় ), অথচ অ্যালেন গিন্সবার্গকে একটি চিঠিতে উনি জানিয়েছিলেন যে উনি প্রতিষ্ঠিত লেখক নন এবং ওনার কোনো পদমর্যাদা নেই । পত্রিকাটির সহ-সম্পাদক ছিলেন অম্লান দত্ত, যাঁর সঙ্গে আমরা দেখা করিনি কেননা জানতে পারি যে পুলিশের হস্তক্ষেপে ওনার কোনো ভূমিকা নেই। আইয়ুব সাহেব, যাকে বলা হয় ‘সফ্ট স্পোকেন’, তেমন মানুষ ছিলেন, কিন্তু আমাকে আর দাদাকে দেখে দৃশ্যত ক্রুদ্ধ হয়ে উঠলেন, ক্রোধ সামলাবার জন্য কাঁপছিলেন বলা যায় । দুজন যুবক দেখা করতে চাইছে শুনে উনি আশা করেননি যে ওনার সামনে দুই মুর্তিমান হাংরি আন্দোলনকারী গিয়ে দাঁড়াবে । প্রতিষ্ঠিত ঔপনিবেশিক নান্দনিক সাহিত্যতন্ত্রের সঙ্গে উত্তরঔপনিবেশিক প্রতিষ্ঠানবিরোধীর সংঘাত ! আমি আর দাদা পাটনার ইমলিতলার স্লাম থেকে উঠে আসা যুবক, আর উনি কলকাতার ওপরতলার সম্ভ্রান্ত বুদ্ধিজীবি । ওনার সঙ্গে আমাদের যে কোনো বিষয়েই মিল নেই তা কথা বলে বোঝা যাচ্ছিল । কিন্তু কেন উনি নালিশ ঠুকেছেন, তা স্পষ্ট করতে চাইলেন না । উনি সম্ভবত আমাদের পড়াশোনার গভীরতা আশা করেননি ; কানাঘুষোয় শুনে ভেবেছিলেন কলকাতার বাইরের খোট্টা ছোটোলোকের দল। তখনকার দিনে এরকম ধারণাই ছিল এলিট মহলে, যে, স্লাম বা বস্তি বা উদ্বাস্তু কলোনিতে যারা থাকে তাদের জ্ঞানগম্যি বিশেষ নেই।
আমাদের বিরুদ্ধে আইয়ুব সাহেবের নালিশের বিষয়বস্তু আমরা জানতে পারি অ্যালেন গিন্সবার্গকে লেখা ওনার চিঠি থেকে । চিঠিতে, আমেরিকার একজন কবি, অ্যালেন গিন্সবার্গ, আমাদের পক্ষে যুক্তি দিচ্ছেন, আর বাংলা ভাষার এক প্রতিষ্ঠিত সাহিত্যিক, যিনি ঘোষিতভাবে কবি-লেখকের স্বাধীনতার পক্ষে, তিনি আমাদের জেলে পাঠাবার ব্যবস্হা করছেন ! আইয়ুব সাহেবের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারি যে উনি আমাদের বুলেটিন আর পত্রিকা কিছুই পড়েননি ; শক্তি চট্টোপাধ্যায় ছাড়া উনি আর কারোর নাম শোনেননি, উৎপলকুমার বসুর নামও নয় । আমি আর দাদা যে ওনার সঙ্গে দেখা করেছি, তাও উনি লিখেছিলেন অ্যালেন গিন্সবার্গকে । প্রত্যুত্তরে গিন্সবার্গ তাঁর চিঠিতে আইয়ুব সাহেবকে লিখেছিলেন, “বেচারা মলয় -- যদি ও একজন নিম্নমানের লেখকও হয় -- তা হলেও ওর জায়গায় আমি থাকলে আপনার সন্মুখীন হতে আমি ঘৃণা বোধ করতাম ।”
‘মুখোশ খুলে ফেলুন’ লেখা কাগজের মুখোশ, দানব রাক্ষস জন্তু-জানোয়ার পাখি ইত্যাদির মুখোশ আমরা ওনাকে পাঠাইনি কিন্তু উনি জানতেন যে অমন মুখোশ পাঠানো হয়েছে মন্ত্রী আমলা সাংবাদিকদের। কিন্তু তাও ওনার ক্রোধের কারণ ছিল না । ওনার ক্রোধের কারণ ছিল একটা বিয়ের কার্ড, যা মূলত সাহিত্যিকদের এবং সাংবাদিকদের পাঠানো হয়েছিল ; যে কার্ডে ছাপানো ছিল Fuck The Bastards Of The Gangshalik School of Poetry. উনি বোধহয় নিজেকে তথাকথিত ‘গাঙশালিক’ স্কুলের দিকের মানুষ হিসাবে মনে করে থাকবেন । দ্বিতীয়ত, ওনার সম্ভ্রান্ত শ্রেণিতে ‘ফাক’ এবং ‘বাস্টার্ড’ শব্দ দুটি ছোটোলোকদের অভিধান থেকে নেয়া মনে হয়ে থাকবে । আমি আর দাদা যখন আইয়ুব সাহেবের সঙ্গে দেখা করি তখন উনি বিয়ের কার্ডটি আর তাতে ছাপানো শ্লোগান প্রসঙ্গ একেবারেই তোলেননি অথচ অ্যালেন গিন্সবার্গকে লেখা চিঠিতে উনি লিখেছিলেন যে এই বাক্যটি ‘প্রশ্নাতীতভাবে আপত্তিকর’ । তিনি এও লিখেছিলেন যে হাংরি আন্দোলনকারীরা বিটনিকদের প্রতিচ্ছায়া । বস্তুত স্লাম-বস্তি-উদ্বাস্তু কলোনির ছোটোলোক স্তর থেকে উঠে আসা বাঙালি যুবকদের সম্পর্কে আইয়ুব সাহেবের কোনো ধারণা ছিল না বলে মনে হয় ।
আবু সয়ীদ আইয়ুবকে লেখা চিঠিগুলোয় অ্যালেন গিন্সবার্গ হাংরি আন্দোলনকারীদের, বিশেষ করে আমার, ম্যানিফেস্টোগুলোর, প্রশ্ংসা করছিলেন, তাও বিরক্ত ও ক্রুদ্ধ করে থাকবে ওনাকে । আইয়ুবকে লেখা গিন্সবার্গের চিঠি থেকে উদ্ধৃতি দিচ্ছি :

৬ অক্টোবর ১৯৬৪ : মলয় মানুষ হিসাবে আমার পছন্দের এবং ওঁর ইংরেজিদুরস্ত ম্যানিফেস্টোর প্রাণোচ্ছলতা আমার সত্যিই ভালো লাগে --- আমার মতে যে-কোনও ভারতীয়-ইংরেজি গদ্যের চেয়ে বেশি বুদ্ধিদীপ্ত ।

৬ অক্টোবর ১৯৬৪ : Fuck The Bastards of Gangshalik School of Poetry-র মতো একটি বাক্য নিয়ে অশ্লীলতা সম্পর্কে আপনার যা বিশ্লেষণ, তার সঙ্গে আমি একেবারেই সহমত নই । এটা যে কোন ‘স্কুল’ তা আমি জানিও না । কিন্তু প্যারিস কিংবা কলকাতার কাফেতে, ত্রিস্তঁ জারার পুরোনো ম্যানিফেস্টোতে এটাই চলতি সাহিত্যভাষা -- মুখের ভাষা এবং প্রকাশিত লেখাতেও । সাহিত্যে এই কায়দা, এই আবেগ, বুদ্ধিদীপ্ত হালকা বদমাইশি বিশ শতকের ‘গ্রন্হাগার পুড়িয়ে দাও’ চিৎকারের মতোই ।

৬ অক্টোবর ১৯৬৪ : অনুবাদ পড়ে আমি যেটুকু বুঝেছি, মলয় এবং অন্যান্য কবিদের, যাঁদের গ্রেপতার কিংবা জেরা করা হয়েছে, কবিতা এবং ম্যানিফেস্টো যথেষ্ট তৃপ্তিদায়ক ।

৬ অক্টোবর ১৯৬৪ : আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, এঁদের কাজে আধুনিক জীবনের নানা চিহ্ণ সুন্দরভাবে ব্যক্ত হয়েছে । এঁরা জিনিয়াস বা অসাধারণ, এমন দাবি না করেও বলা যায়, সমাজব্যবস্হার প্রতি তাঁদের যে মনস্তত্ত্বগত অনাস্হা, সেটি তাঁরা ফুটিয়ে তুলেছেন স্পষ্ট ও মৌলিক ভাষায় । অন্যদিকে, এঁদের সমসাময়িক এবং অগ্রজরা এখনও ধ্রুপদি ভক্তিভাব বা সামাজিক ‘উন্নত’ ভাবনা, মার্কসবাদ, মানবতাবাদ ইত্যাদি সম্পর্কেই অধিক আগ্রহী । আমার মনে হয় না এই লেখকদের বিটনিক আখ্যা দেওয়া উচিত, বিট-অনুকারকও নয়, কারণ শব্দটাই অত্যন্ত কাগুজে বাঁধাধরা বুলি হয়ে দাঁড়িয়েছে, এমনকি আমেরিকার মাপদণ্ড অনুযায়ী ‘বিটনিকদের’ সঙ্গে এরা খাপ খায় না ।

১১ নভেম্বর ১৯৬৪ : এ একদম অসুস্হকর এক পরিস্হিতি । এরকমভাবেই সব চলতে থাকবে, এই ভেবে চিন্তিত হয়ে আমি আসলে আপনাকে তড়িঘড়ি, অতি দ্রুত চিঠি লিখেছিলাম । কারণ পুলিশ শাসনতন্ত্রের অভিজ্ঞতা আমার ভারতে থাকতেই হয়েছে । এখন কিন্তু পরিস্হিতি যথেষ্ট সংকটপূর্ণ । প্রবীণ, দায়িত্ববান কোনোও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব হস্তক্ষেপ না করলে এর থেকে নিষ্পত্তি সম্ভব নয় । বোধহয় ‘ক্যালকাটা কমিটি ফর কালচারাল ফ্রিডাম’ এর প্রতি চিঠি আপনাকে উদ্দেশ করে লেখা আমার উচিত হচ্ছে না । যদি তাই হয়, তাহলে কলকাতার কংগ্রেসের দপতরে এ-বিষয়ে ভারপ্রাপ্তের হাতে দয়া করে চিঠিটি পৌঁছে দেবেন । আপনাকে রুষ্ট করে থাকলে মার্জনা করবেন । তবে, চিঠিতে অন্তত আপনাকে সোজাসুজি কথাগুলো বলছি । এই মুহূর্তে আপনার আমার মতানৈক্যের থেকেও পুলিশ পরিস্হিতিই প্রকৃত চিন্তার বিষয়।

বলা বাহুল্য যে কলকাতার কমিটি ফর কালচারাল ফ্রিডাম-এর কেষ্টবিষ্টুরা কেউ আমাদের সমর্থনে এগিয়ে আসেননি । এই সময়েই, ১৯৬৪ সালের নভেম্বরে TIME ম্যাগাজিনে আমাদের ফোটোসহ হাংরি আন্দোলনের সংবাদ বেরোয়, আর তা প্রতিষ্ঠানের কেষ্টবিষ্টুদের আরও ক্রুদ্ধ করে তুলেছিল ।





Name:  মলয়          

IP Address : 012312.60.4523.107 (*)          Date:02 Jan 2019 -- 12:39 PM

আমার বাবা রঞ্জিত রায়চৌধুরী
--------------------------------------------
মলয় রায়চৌধুরী
মহারাজা রঞ্জিত সিংহের গালগল্পে প্রভাবিত হয়ে ঠাকুমা, যাঁর নাম ছিল অপূর্বময়ী, বাবার অমন নাম রেখেছিলেন । আমার বাবা রঞ্জিত রায়চৌধুরী জন্মেছিলেন বর্তমান পাকিস্তানের লাহোর শহরে, ১৯১২ সালে । পাঞ্জাবের মহারাজা রঞ্জিত সিংহ সম্প৩ই নভেম্বর ১৭৮০ । বাবাও জন্মেছিলেন ১৩ই নভেম্বর । ছয় ভাই আর এক বোনের মধ্যে বাবা ছিলেন তৃতীয় বা সেজ ভাই । অন্যান্য ভাইদের পোশাকি আর ডাক নাম দুটিই থাকলেও, বাবার ওই একটি নামই ছিল, রঞ্জিত । ঠাকুর্দার আদি নিবাস ছিল হুগলি জেলার উত্তরপাড়ায় । ১৭০৯ সালে উত্তরপাড়া শহরটির পত্তন করেছিলেন দাদুর পূর্বপুরুষ রত্নেশ্বর রায়চৌধুরী ।
ঠাকুর্দা লক্ষ্মীনারায়ণ রায়চৌধুরী, পোরট্রেট আঁকতে পারতেন, এবং সেই সূত্রে তিনি বিভিন্ন রাজপরিবারের ডাকে সপরিবারে ভারতের এক রাজ দরবার থেকে আরেক রাজ দরবারে চলে যেতেন । লাহোরে গিয়ে তিনি ড্যাগেরোটাইপ ক্যামেরায় ফোটো তুলতে শেখেন, যাতে ফোটো তুলে তা থেকে ছবি আঁকতে সুবিধা হয় এবং রাজ পরিবারের মহিলাদের এক নাগাড়ে বসে থাকতে না হয় । সেসময়ে মেয়ো স্কুল অফ আর্টসের অধ্যক্ষ এবং লাহোর মিউজিয়ামের কিউরেটার ছিলেন রাডিয়ার্ড কিপলিঙের বাবা জন লকউড কিপলিঙ, যাঁর সঙ্গে পরিচয়ের ও তাঁর অধীনে কাজ করার সূত্রে তাঁর কাছ থেকেই তিনি ফোটো তোলা শেখেন । ফোটো তোলা হতো সরাসরি ব্রোমাইড পেপারে । পরে, কাচের প্লেটে নেগেটিভ ফিল্ম তোলা হতো, সেই নেগেটিভকে রসায়নে চুবিয়ে রেখে ফোটো গড়ে উঠত; তারপর সেই প্লেটের ওপর ফোটোর কাগজ রেখে, প্রয়োজনীয় আলো দেখিয়ে ফোটো প্রিন্ট করা হতো, আর সেই প্রিন্টকে রসায়নে চুবিয়ে, শুকিয়ে, স্হায়ীত্ব দেয়া হতো ।
ড্যাগেরোটাইপ ক্যামেরা ছিল বেশ ভারি ; বাইরে গিয়ে ফোটো তুলতে হলে তাকে বয়ে নিয়ে যাবার লোক দরকার হতো । বাইরে তোলা হচ্ছে বলে একসঙ্গে অনেকগুলো তুলে যেটা ভালো হল সেটা থেকে ফোটো তৈরি করা হতো । ফোটো তোলা হতো ক্যামেরা স্ট্যাণ্ডের ওপরে ক্যামেরা রেখে । ফোটো তোলার সময়ে হাত দিয়ে লেন্সের ঢাকনা খুলে, ‘স্মাইল প্লিজ’ বলে দু’এক সেকেণ্ডে আবার লেন্স পরিয়ে দেয়া হতো । স্টুডিওতে ফোটো তুলতে হলে প্রথম দিকে কুঁজোর মাপের হাজার-দুহাজার ওয়াটের বাল্বের আলোয় ফোটো তুলতে হতো, পরে অবশ্য বাল্বের মাপ ছোটো হয় । এখন প্রযুক্তির এত উন্নতি হয়েছে যে ড্যাগেরোটাইপের ঝঞ্ঝাটকে মনে হয় প্রাগৈতিহাসিক । বাবা এই প্রযুক্তি দেখে যেতে পারলেন না । শৈশবে তাঁকে দেখতুম শহরের বাইরে ফোটো তুলতে যাচ্ছেন কাজের লোক রামখেলাওন সিংহের কাঁধে ক্যামেরার বাক্স চাপিয়ে, নিজে ক্যামেরা তিন-ঠেঙে স্ট্যান্ড আর মাথায় চাপা দেবার কালো মোটা কাপড় । বাবা মারা যাবার পর যখন পাটনার বাড়ি ছেড়ে চলে আসলুম, দেখেছিলুম তিনতলার একটা ঘরে থাক-থাক কাচের প্লেট, কড়িকাঠ থেকে র‌্যাকে সাজানো । ইতিহাসবোধ না থাকলে যা হয়, আমি বা দাদা আমরা কেউই সেগুলো সংরক্ষণের প্রয়াস করিনি ।
দাদুর ছেলেরাও ফোটো তোলা আর ছবি আঁকায় সড়গড় হলে দাদু ১৮৮৬ সালে ফোটোগ্রাফির ভ্রাম্যমান ব্যবসা আরম্ভ করেছিলেন, এবং সংস্হাটির তিনি নাম দেন ‘রায়চৌধুরী অ্যাণ্ড কোং’ । হুগলি জেলায় গঙ্গা নদীর ধারে উত্তরপাড়ার পাশে এখন যেখানে বালি ব্রিজের সংলগ্ন ফ্লাইওভার, তখন একটা রাস্তা ছিল, সেখানে একটা দপতর খুলে নকাকাকে চালাতে বলেছিলেন । কিন্তু নকাকা তা সামলাতে পারেননি, হঠাৎ বৈরাগ্যে আক্রান্ত হবার কারণে ।
দাদুর অমন ঘোরাঘুরির কারণে বড়জেঠা, মেজজেঠা, বাবা, পিসিমা আর নকাকার স্কুলে পড়া হয়ে ওঠেনি । দাদু হঠাৎ মারা যাবার পর তাঁর ছেলেরা পাটনায় থিতু হতে বাধ্য হন এবং তখন নতুনকাকা আর ছোটোকাকাকে স্কুলে ভর্তি করা হয় । নতুনকাকা নিয়মিত স্কুল করলেও ছোটোকাকার আগ্রহ না থাকায় তিনি পড়াশোনা ত্যাগ করেন । জেঠাকাকাদের যেটুকু পড়াশোনা হয়েছিল তা রাজদরবারগুলোর শিক্ষকদের অবদান । দাদু সংস্কৃত আর ফারসি লিখতে-পড়তে পারতেন । বাবা ইংরেজি ভাষা আয়ত্ব করে ফেলেছিলেন ।
দাদু বিভিন্ন সময়ে আফগানিস্তানের কাবুল-কান্দাহার এবং পাকিস্তানের বাহাওলপুর, চিত্রাল, হুনজা, ফুলরা, মাকরান ও লাহোরে ছিলেন। আফগানিস্তানে ব্রিটিশদের যুদ্ধ আরম্ভ হবার পর লাহোরে চলে যান । বড়জেঠার মুখে শুনেছি যে বাহাওলপুরের সেই সময়ের ডাকটিকিটে আমিরের পোরট্রেট ছিল দাদুর আঁকা । ওই অঞ্চলের ছাগল, ভেড়া, দুম্বা ইত্যাদির মাংস আর শুঁটকিমাংস খাওয়ার সঙ্গে বাবার ভাইরা নিজেদের মানিয়ে নিলেও বাবা পারেননি, এবং তিনি সারা জীবন শাকাহারী হয়ে যান । বাবার মুখে শুনেছি যে বাজারে ঝোলানো গোরু, মোষ, ইয়াক আর কাটা উটের মাংস দেখার পর উনি আর মাংস খেতে পারতেন না, তাই নিরামিশাষী হয়ে যান । দুম্বা একরকমের ভেড়া যার ল্যজের জায়গায় বাড়তি মাংস গজায়, আর বাড়তি লেজের মাংস, বড়জেঠার বক্তব্য অনুযায়ী, ছিল খুবই সুস্বাদু ।
ফোটোগ্রাফির সূত্রেই দাদুর সঙ্গে উত্তর চব্বিশ পরগণার পাণিহাটি-নিবাসী আমার দাদামশায় কিশোরীমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরিচয় হয়েছিল । কিশোরীমোহন ছিলেন ম্যালেরিয়া রোগের উৎস আবিষ্কারক রোনাল্ড রসের সহগবেষক । রোনাল্ড রস স্বদেশে ফিরে যাবার পর কিশোরীমোহন ম্যালেরিয়া রোগের কারন ও তা প্রতিরোধ করার জন্য গ্রামে-গঞ্জে ম্যাজিক লন্ঠনে স্লাইড দেখিয়ে প্রচার করতেন । এই স্লাইডগুলো তৈরি করে দিয়েছিলেন দাদু । কিশোরীমোহন তাঁর বড় মেয়ে অমিতার সঙ্গে বাবার বিয়ে দেন । বিয়ের সময়ে মায়ের বয়স ছিল ১৪ বছর আর বাবার ১৮ বছর । কিশোরীমোহন সম্পর্কে উইকিপেডিয়া আর নেটে অন্যত্র তথ্য আছে । বাবা নিজে শাকাহারী হলেও মাকে বাধ্য করেননি তাঁর আহারের রুচি অনুসরণ করতে ; আমি আর দাদা দুজনেই আমিষাশী । দাদু প্রতি বছর দুর্গা পুজোর সময়ে উত্তরপাড়া ফিরে যেতেন ; ছেলেদের বিয়ে দেয়ার কাজটাও সেরে নিতেন সেই সময়টুকুর মধ্যে ।
দ্বারভাঙ্গা মহারাজের পরিবারের সদস্যদের ছবি আঁকার জন্য ডাক পড়লে দাদু সপরিবারে পাটনায় যান, আর সেখানেই হৃদরোগে মারা যান । পুরো পরিবার নির্ভরশীল ছিল দাদুর ওপর ; তিনি মারা যেতে ঠাকুমা বিপদে পড়েন । তাঁরা একটি মাটির দেয়ালের ওপর টালির চালার বাসা ভাড়া করে বিভিন্ন উপায়ে টাকা রোজগারের চেষ্টা করেন, কিন্তু কিছুতেই সফল না হতে পারায় বাবা দাদুর প্রতিষ্ঠিত সংস্হা ‘রায়চৌধুরী অ্যাণ্ড কোং’ এর সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে ছবি আঁকা আর ফোটো তোলার একটি স্হায়ী দোকান চালাবাড়ির কাছেই, বিহার ন্যাশানাল কলেজের সামনে, খোলেন । ঠাকুমার জাঠতুতো ভাই কলকাতা মিউজিয়ামের সহকিউরেটার লেখক ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়ের সুপারিশে বড়জেঠা পাটনা মিউজিয়ামে চতুর্থ বর্গের একটি চাকরি পান । পরে অবশ্য তিনি নিজের যোগ্যতার দরুন পদোন্নতি পেয়ে পাটনা মিউজিয়ামের ‘কিপার অব পেইনটিংস অ্যাণ্ড স্কাল্পচার’ হয়েছিলেন। বড়জেঠা মাটির মূর্তি তৈরি করায় আর অয়েল-পেইন্টিং আঁকায় দক্ষ ছিলেন । ছোটোবেলায় ছুটির দিনে আমি মিউজিয়ামের এক থেকে আরেক প্রান্ত ঘুরে বেড়াতুম, চৌকাঠ ডিঙোতেই প্রাগৈতিহাসিক থেকে মহেঞ্জোদরোয়, সেখান থেকে অশোকের রাজত্বে !
দাদু মারা যেতে, ঠাকুমা উত্তরপাড়ার বসতবাড়িতে, যা অবহেলায় খণ্ডহরের চেহারা নিয়ে ফেলেছিল, থাকতে চলে গেলে, পরিবারের আর্থিক ভার পুরোপুরি এসে পড়েছিল বাবার কাঁধে । ঠাকুমা ছেলেদের আর তাদের বোউদের বলে দিয়ে যান যে আমার মা সংসারটাকে সামলাবেন । যেকোনো কারণেই হোক মেজজেঠা, নকাকা আর কাকাবাবুর স্বভাব আর আচরণ এমন হয়ে দাঁড়িয়েছিল যে আমরা শৈশবে শুনতুম যে এঁরা কিছুটা অপ্রকৃতিস্হ । দোকানের কাজে তাঁদের তেমন আগ্রহ ছিল না ; তাঁরা প্রকৃতই শিল্পীচরিত্রের বিপন্ন বিস্ময়ে আক্রান্ত অস্বাভাবিকতা পেয়েছিলেন । মেজজেঠা ঘুম থেকে উঠতেন দুপুরবেলা, তারপর জলখাবার খেতেন কোনো দোকান থেকে লুচি আলুর তরকারি কিনে রাস্তায় দাঁড়িয়ে, কখনও চুল আঁচড়াতেন না, বাড়ি ফিরে দাঁত মেজে স্নান করে বিকেলের দিকে দোকানে পৌঁছোতেন, এবং একটি ফোটোর সামনে বসে তাকে মাসখানেকে আঁকা অপূর্ব ছবিতে দাঁড় করাতেন । নকাকা অনেক ভোরে উঠতেন, সবাইকে, শিশুদেরও ‘আপনি’ সম্বোধন করতেন, স্ত্রীর সঙ্গে বিশেষ কথা বলতেন না, জুতো পরার অভ্যাস ছিল না, কোরা ধুতি পরতেন, নিজের ধুতি-শার্ট নিজেই কাচতেন, কোনো এক ফাঁকে দোকানে গিয়ে বাড়িতে করার জন্য বাবার কাছ থেকে ‘কাজ’ চেয়ে আনতেন । ছোটোকাকা মাঝরাতে নিজের ঘরে ছোটোকাকিমার নানা আঙ্গিকের পোশাকহীন ফোটো তুলতেন আর দোকানে গিয়ে বাবাকে সাহায্য করার নাম করে ডার্করুমে ঢুকে সেই ‘অপ্সরা’ ফোটোগুলো প্রিন্ট করে নিতেন । উনি যখন উত্তরপাড়ায় পাকাপাকি চলে গেলেন তখন তাড়াহুড়োয় অ্যালবামগুলো নিয়ে যেতে ভুলে যান । ছোটোকাকা ৯০ বছর বয়সে মারা যান, নিঃসন্তান ; উত্তরপাড়ার বাড়ির অংশ ছোটো শালার প্রথম পক্ষের মেয়েকে দিয়ে গেছেন ।
বিহারের ভূমিকম্পে চালাবাড়ি ধ্বসে পড়ার পর বড়জেঠা ঠাকুমার আর বড়জেঠিমার গয়নাগাটি বেচে ইমলিতলা নামে একটি নিম্নবর্গ ও গরিব শিয়া মুসলমান অধ্যুষিত পাড়ায় বাড়ি কেনেন । তখন নিম্নবর্গের লোকেদের বলা হতো অস্পৃশ্য, আর সেকারণেই দুসাধ-মুসহর-কাহার-ডোম-চামার পরিবার অধ্যুষিত ঘিঞ্জি নিচুচালা-বস্তির সস্তা এলাকায় বাড়ি কেনা সহজ হয়। তেঁতুলগাছটা দাদার জন্মের সময়ে ছিল, আমি দেখিনি, কেননা তেঁতুলগাছটা কেটে সেই জায়গায় জলের কল আর গ্যাসবাতির থাম বসিয়েছিল ব্রিটিশ সরকার । পাটনার অন্যান্য বাঙালিরা ইমলিতলাকে বলতেন ছোটোলোকদের পাড়া । সেকারণে আমাদের পরিবারের সদস্যদের ওপর ওই ছোটোলোক ছাপ্পা পড়ে গিয়েছিল । পাটনার শিক্ষিত ও সংস্কৃতিবান বাঙালিরা ওই সরু গলির ভেতরে ঢুকে দিনের বেলাতেও আমাদের বাড়ি আসতেন না । বড়জেঠা যেতেন তাদের বাড়ি, সামাজিক সম্পর্ক বজায় রাখার জন্য । আমি যখন স্কুলে ঢুকলুম তখন স্কুলের বন্ধুরাও ইমলিতলা শুনে আমাদের বাড়ি আসতে চাইত না ; অনেকে নাম শুনেই ভয় পেত, অঞ্চলের কুখ্যাত নিবাসীদের কাজকর্মের দরুন । মেজদা, যাকে শিশু অবস্হায় এক বেশ্যার কাছ থেকে বড়জেঠা কিনেছিলেন, পাড়ার চাপ এড়াতে না পেরে পুলিশের নথিতে গুণ্ডা হয়ে গিয়েছিল, মাদকের দরুন কম বয়সে মারা গিয়েছিল ।
বাবা ভোরবেলা বেরিয়ে যেতেন আর ফিরতেন বেশ রাত করে । ফোটো তোলা, জিনিসপত্র বিক্রি আর ডার্করুমের কাজ তাঁকে একা করতে হত বলে ভোরবেলা জলখাবার খেয়ে সোজা গিয়ে ডার্করুমে ঢুকতেন, তারপর রাতে দোকান বন্ধ করার পর আবার ঢুকতেন ডার্করুমে । বিহারে সেসময় তাঁর কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল না, তাই কাজ পেতে অসুবিধা হতো না । মা আর বাবা দুজনের চরিত্রেই যে বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল তা হল সবায়ের সঙ্গে মানিয়ে চলা । বাবা বাড়ির প্রধান রোজগেরে হলেও নিজের ভাইদের আর তাদের ছেলে-মেয়েদের, মানে আমাদের জাঠতুতো খুড়তুতো ভাইবোনদের, সমান চোখে দেখতেন। বড়জেঠা ইমলিতলা বাড়ির ট্যাক্স আর সবজি কিনতেন, বাবা বাদবাকি সমস্ত খরচ করতেন, ঠাকুমাকে টাকা পাঠাতেন, উত্তরপাড়ার বাড়ির ট্যাক্স দিতেন । চালগমের দোকানদারকে মাসে একবার, মায়ের তৈরি ফিরিস্তির কাগজ, দোকানে যাবার পথে বাবা দিয়ে যেতেন আর সে ইমলিতলার বাড়িতে পাঠিয়ে দিত । পরিবারের সদস্যদের পোশাকের জন্য বাবা দর্জিকে বলে রেখেছিলেন, তার দোকানে গিয়ে মাপ দিয়ে দিতে হতো, সে তৈরি করে বাড়ি পাঠিয়ে দিত । একইভাবে ছিল জুতোর দোকানের সঙ্গে বন্দোবস্ত । চুল কাটার জন্য মাসে একবার নাপিত আসত, পরে বাবার কাছ থেকে টাকা সংগ্রহ করে নিত ।
ইমলিতলার বাড়িতে বাবা-মা-দাদা-আমি যে ঘরটায় থাকতুম সেটাই ছিল বাড়ির সবচেয়ে ছোটো ঘর । লন্ঠনের আলোয় পড়াশুনা করতে হতো । চেয়ার-টেবিল ছিল না, দোকানের মালপত্র যে প্যাকিংবাক্সতে আসত তার ওপর চাদর পেতে বই রাখার ব্যবস্হা ছিল । পাড়ার কুসঙ্গ-কুখ্যাতির প্রভাব দাদার ওপর পড়তে পারে অনুমান করে ম্যাট্রিক পাশের পর ১৯৪৯ সালে দাদাকে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছিল পাণিহাটিতে থেকে কলকাতায় পড়াশোনা করার জন্য । কলকাতায় দাদা সিটি কলেজে ভর্তি হন । কলেজে বন্ধু হিসেবে পান সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, দীপক মজুমদার, আনন্দ বাগচী প্রমুখ তরুণ কবিদের । দাদা বিহার সরকারের মৎস্য বিভাগে চাকরি পেলে তাঁর পোস্টিঙের জায়গায় বন্ধুরা একা বা দলবল নিয়ে পৌঁছোতেন । ছোটোবেলায় আমি একবার তাড়ি খেয়েছিলুম, মানে পাড়ার এক সর্বজনীন দাদু খাইয়ে দিয়েছিল । মুখে তাড়ির গন্ধ পেয়ে মা আমায় আমাদের ঘরে শেকল তুলে বন্ধ করে দিয়েছিলেন ; বাবা রাতে বাড়ি ফিরলে শেকল খোলা হয় । মায়ের সব সময় আশঙ্কা ছিল যে আমরা দুই ভাইও মেজদার মতন অসামাজিক চরিত্রের মানুষ হয়ে যেতে পারি । পাড়ায় মেলামেশায় কোনো নিষেধাজ্ঞা কিন্তু ছিল না । ছোটোবেলায় চোর-পুলিশ খেলতে গিয়ে অনেকের শোবার ঘরে ঢুকে খাটের তলায় লুকোবার স্মৃতি আছে ।
ইমলিতলার বাড়িতে জলের কল ছিল না ; বড়জেঠা তো অফিস চলে যেতেন, জল ভরে এনে দেবার লোক না এলে দুপুরে বাবা যখন দোকান থেকে আসতেন, অনেক সময়ে নিজের স্নান করার জল নিজেই কল থেকে ভরে আনতেন। শীতকালেও ঠাণ্ডা জলে স্নান করতেন । দাদা আর আমি ইমলিতলায় রাস্তার কল থেকে জল ভরে এনেছি, রাস্তার কলে স্নান করেছি । বাবার নির্দেশ ছিল যে বাড়ির সব কাজ আমাদেরও করতে হবে, প্রয়োজনে কয়লা ভাঙা আর উনোন পরিষ্কার, জঞ্জাল ফেলে আসাও । বাবা রাস্তার কলে স্নান করতে লজ্জা পেতেন । ২০০৫ - ২০০৮ নাগাদ আমি কলকাতার রাস্তা থেকেও খাবার জল ভরে আনতুম পেপসির বোতলে করে, কেননা তিন তলায় কোনো ভারি জলের টিন নিয়ে বা মিনারাল ওয়াটারের বড়ো বোতল নিয়ে রিকশাঅলা উঠতে চাইত না । মাঝে-মাঝে দাদার বাড়ি গিয়ে দুটো থলেতে পেপসির বোতলে জল ভরে আমি আর আমার স্ত্রী সলিলা রিকশা করে নিয়ে আসতুম নাকতলার বাড়িতে। এই সমস্ত অসুবিধার জন্যেই নাকতলার ফ্ল্যাটটা বেচে মুম্বাইতে একরুমের ফ্ল্যাটে চলে আসতে হয়েছে ।
বাবা চিরকাল শাদা পাঞ্জাবি, ধুতি আর পায়ে পামশু পরতেন । তাঁর ভাইয়েরা শাদা ছাড়া অন্যান্য রঙের শার্ট বা পাঞ্জাবি পরলেও বাবার পোশাকের অন্যথা হতো না, শীতকাল ছাড়া, যখন উনি নস্যি রঙের শাল গায়ে দিতেন, বা ওই রঙের উলের পাঞ্জাবি পরতেন । দোকানে যাবার তাড়ায় বাবার দ্রুত হাঁটা অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল । ইমলিতলায় থাকতে দুবার ওনার পা দোকানে যাবার পথে ভেঙে গিয়েছিল ; বাবার পা ভাঙা মানে আর্থিক দিক থেকে বেশ বিপজ্জনক অবস্হা ; দাদাকে গিয়ে দোকানে বসতে হত । উত্তরপাড়া থেকে চাকুরিহীন কোনো জ্ঞাতির ছেলেকে নিয়ে এলেও তাদের অবাঙালি পরিবেশে মানিয়ে নিতে এতই অসুবিধা হত যে কয়েক দিনেই তারা ফেরত চলে যেত । পরে দরিয়াপুরে গিয়ে বাবার যখন আরেকবার পা ভেঙেছিল তখন আমি দোকানদারি করেছি । গরিব হলে যা হয়, গতি কেবল সরকারি হাসপাতাল, সেখানে কিউ, কেননা প্রায়ভেটে কোনো নার্সিং হোম ছিল না সেসময়ে ; এখন তো প্রতিটি রাস্তায় একজন করে হাড়ের ডাক্তার । বড়জেঠির এক বান্ধবীর স্বামী ছিল ছুতোর ; ওনার পা ভেঙে যেতে, জেঠিমার বান্ধবীর কথামতো বাবার পায়ে বসাবার জন্য ছুতোরকে দিয়ে কাঠের খাপ তৈরি করিয়ে পায়ে বেঁধে রাখার ব্যবস্হা হয়েছিল । প্রথমবার বানিয়ে দেয়া খাপটা দ্বিতীয়বার কাজে লেগে গিয়েছিল ।
বিহার ন্যাশানাল কলেজের সামনে যে দোকান ছিল সেই বাড়ির মালিক উঠে যাবার নোটিস দিলে বাবা পড়েন মহাবিপদে । বিকল্পের সন্ধানে বেরিয়ে তিনি তখনকার বারি রোডে দরিয়াপুরে একটা চালাবাড়ি কেনেন ; সেটা ছিল একজন কামারের হাপর-বসানো ঘর, পেছনে আর পাশে সামান্য জমিতে ঝোপ । এই এলাকাটাও সেসময়ে গরিবদের পাড়া ছিল, ধারণার অতীত দুস্হ সুন্নি মুসলমানদের পাড়া । বিহার ন্যাশানাল কলেজের সামনে যে দোকান ছিল তার মালিকের বিরুদ্ধে মামলা চলে বেশ কয়েকবছর ; সেই সুযোগে দরিয়াপুরে দোকানঘর তৈরি করে ফেলা হয় । তৈরি হয়ে গেলে পুরোনো দোকানের পাট গুটিয়ে বাবা চলে আসেন দরিয়াপুরে । ‘রায়চৌধুরী অ্যাণ্ড কোং’-এর খ্যাতির কারণে পুরোনো খদ্দেররা দরিয়াপুরে আসত । এখন এই সংস্হা চালায় দাদার বড় ছেলে হৃদয়েশ ।
দরিয়াপুরে যখন দোকান তৈরি হচ্ছিল তখন আমি ওই বাড়িতে একা থাকতুম, কেননা ইমলিতলার প্রাত্যহিক মাতালদের চেঁচামেচি আর ঝগড়াঝাঁটির দরুন পড়তে বসে বেশ অসুবিধা হত । তাছাড়া দরিয়াপুরে ইলেকট্রিসিটি ছিল, কলের জল ছিল। ছোটোদের হাতখরচের জন্য বাবা টাকা দিতেন না ; বলতেন যার যা চাই জানিয়ে দাও, কিনে এনে দেব । স্কুলের বাৎসরিক ফলাফলের রিপোর্টে বাবা কখনও কাউকে ‘গুড’ দিতেন না । নব্বুইয়ের কোঠায় মার্কস পেলেও দিতেন না ; বলতেন আরও বেশি পেতে হবে । দরিয়াপুরের বাড়িতে একা থাকলে আমার চরিত্রদূষণ ঘটতে পারে অনুমান করে বছরখানেক পরে মা আর বাবা রাতে শুতে আসতেন । মা টিফিন ক্যারিয়ারে করে রাতের খাবার আনতেন । দিনের বেলা ইমলিতলায় গিয়ে খেতে হতো । দরিয়াপুরের বাড়িতে একা থাকার সময়ে বন্ধুদের নিয়ে কিঞ্চিদধিক চরিত্রদূষণ যে ঘটত না তা বলা যাবে না ।
বাবা আর মা দুজনেই মন্দিরে গিয়ে পুজো দেয়া বা তীর্থকর্ম করা ইত্যাদিতে আগ্রহী ছিলেন না ; আমার মনে হয় কাজের চাপে উনি সংস্কারমুক্ত করে ফেলেছিলেন নিজেকে । । আমি কখনও তাঁদের তীর্থক্ষেত্রে বেড়াতে যেতে দেখিনি । জেঠা-কাকারাও কেউ আগ্রহী ছিলেন না ; পাটনার বাইরে যেতে হলে তাঁরা যেতেন কেবল দেশের বাড়ি, অর্থাৎ উত্তরপাড়ায় । তবে বাবা নিয়মিত পৈতে বদলাতেন, একাদশীর দিন লুচি খেতেন । কালীঘাটের কালী আমাদের পারিবারিক দেবতা, যেহেতু তা আমাদের কোনো পূর্বপুরুষের প্রতিষ্ঠিত, সেকারণে বাড়িতে পারিবারিক দেবতা আর তার সেবাযত্ন করার প্রয়োজন হতো না । পৈতে পরতেন বড়জেঠা আর ছোটোকাকা, যদিও খাওয়ার কোনো নিষেধ মানতেন না, মেজজেঠা কখনও পৈতে পরতেন আবার কখনও কুলুঙ্গিতে তুলে রেখে দিতেন । দাদার আর আমার ছোটোবেলায় পৈতে হয়েছিল বটে কিন্তু আমরা স্বরূপে এসে জলাঞ্জলি দিয়েছিলুম । পৈতেহীন হবার কারণে বাবা ক্ষুণ্ণ হয়েছিলেন বলে মনে হয় না ; এই প্রসঙ্গে কখনও কোনো কথা তোলেননি ।
মা, বাবা এবং শিক্ষক, যে তিনজন মানুষ ব্যক্তিজীবনের অভিমুখ গড়ে দেয়, আমার জীবনে মা আর বাবার ভূমিকাই প্রধান । প্রকৃত অর্থে আমি কোনো শিক্ষক সেই সময়ে পাইনি যখন তা জরুরি ছিল । প্রাইমারি স্তরে ক্যাথলিক কনভেন্টে পেয়েছিলুম সিসটার আইরিনকে আর যাযক ফাদার হিলম্যানকে । শৈশবের বইতে বর্ণিত সমস্ত জিনিস যাতে নিজের চোখে দেখে যাচাই করতে পারি তার দিকে খেয়াল রাখতেন সিসটার আইরিন আর স্বদেশ আয়ারল্যাণ্ডে গেলে অনেককিছু সংগ্রহ করে আনতেন, স্কুল সংল্গন ফার্মে নিয়ে গিয়ে ফল, ফুল, গাছ, জন্তুতের চাক্ষুষ করাতেন । ফাদার হিলম্যানের সৌজন্যে আমি কনভেন্টে ভর্তি হয়েছিলুম ; উনি ফোটো তুলতে ভালোবাসতেন আর বাবার সঙ্গে ওনার বন্ধুত্ব হয়ে গিয়েছিল, আমাকে দোকানে দেখতে পেয়ে সাড়ে তিন বছর বয়সে নিয়ে গিয়ে ট্রানজিশান ক্লাসে ভর্তি করে দেন; সপ্তাহে একদিন চার্চে বাইবেল ক্লাসে নিয়ে গিয়ে ওল্ড আর নিউ টেস্টামেন্টের কাহিনি শোনাতেন । পরে যখন ব্রাহ্ম স্কুল রামমোহন সেমিনারিতে ক্লাস সিক্সে গিয়ে ভর্তি হলুম, কোনো শিক্ষকের সঙ্গে নৈকট্য গড়ে উঠল না ; এই স্কুলে যিনি আমাকে বাংলা সাহিত্যে আগ্রহী করলেন, তিনি গ্রন্হাগারিক নমিতা চক্রবর্তী , আমার ‘রাহুকেতু’ উপন্যাসের সুমিতাদি।
মা আর বাবার কাছ থেকে যা পেয়েছি তা হল সততা, নিজের বিশ্বাসের সমর্থনে একক লড়াই করার চারিত্র্য । বাবা দোকানদার হয়েও সৎ ছিলেন, যা আজকের দিনে অকল্পনীয় । কেবল সৎ নয়, তাঁর ছিল সৎসাহস । হাংরি আন্দোলনের সময়ে আদালতের মামলায় বন্ধুরা যখন আমার বিরুদ্ধে মুচলেকা লিখে রাজসাক্ষী হয়ে গেল, আর লড়াইটা আমার একক হয়ে দাঁড়াল, তখন আমি আমার চরিত্রগঠনে মা আর বাবার অবদানের গুরুত্ব বুঝতে পেরেছিলুম । বাবা কলকাতায় লালবাজারে গিয়ে পুলিশ কমিশনারের সঙ্গে তর্ক করেছিলেন যে অমন মকদ্দমা কেন করা হয়েছে আর তখনই জানা যায় যে কলকাতার কয়েকজন সমাজকর্তা-বুদ্ধিজীবীর নালিশ কাজ করেছে এর পেছনে, যাদের বলা হয় এসট্যাবলিশমেন্টের ধারক-বাহক । মকদ্দমা চলার সময়ে বাবা কয়েকবার পাটনা থেকে দুএক দিনের জন্য দোকান বন্ধ করে কলকাতার ব্যাংকশাল কোর্টে আসতেন । যারা আমার সঙ্গে গ্রেপ্তার হয়েছিল আর চামড়া বাঁচাবার জন্য রাজসাক্ষী বা সরকার পক্ষের সাক্ষী হয়ে গেল তাদের পরিবারের কাউকে কোনো দিন আসতে দেখিনি কোর্টে ; অর্থাৎ তাঁরা তাঁদের ছেলের সাহিত্যকর্মকে সমর্থন করতে পারেননি।
বাবা আমাদের বাড়ির ক্ষমতাকেন্দ্র হলেও ছোটোদের কাউকে শাসন করতেন না । তাঁর কাছে অভিযোগ জানালে তিনি বলতেন, “অ, ও শুধরে নেবে ।” তারপর যার বিরুদ্ধে অভিযোগ তাকে বলতেন, “কী, শুধরে নিবি তো ? বড় হয়েছিস, শুধরে নিতে শেখ।” বড়জেঠা শাসন করতেন, নিজে থেকে নয়, জেঠিমা-কাকিমারা অভিযোগ করলে, কিন্তু অভিযোগ করলে তিনি বিরক্ত হতেন । বড়জেঠার দুই মেয়ের বিয়ে আমার শৈশবেই হয়ে গিয়েছিল । মেজজেঠা আর কাকাদের মেয়েদের বিয়ের ব্যবস্হা করেন বাবা, তাঁদের শৈল্পিক উদাসীনতায় ওদের বয়স বেড়ে যাচ্ছিল ; তাছাড়া বিয়ের খরচের ব্যাপারটাও ছিল । মেজজেঠার এক মেয়ে মীনাক্ষী একজন বিহারি ছেলেকে বিয়ে করতে চাইলে মেজজেঠা অমত জানান ; মেজজেঠার অমত হওয়ায় বাবা তাঁকে বোঝালেও তিনি রাজি হননি । বাবা তাঁর বিরুদ্ধতা করে মেজজেঠাকে অপমানিত করতে চাননি । শেষে আমাকে টাকাকড়ি দিয়ে বলেন যে ওরা কোথায় গিয়ে বিয়ে করতে চাইছে সেখানে গিয়ে সম্প্রদান করে আয় । আমার ছোটোশালী এক যুবককে বিয়ে করতে চাইলে নাগপুরে অভিভাবকরা রাজি হলেন না, তখন তার বিয়েও দরিয়াপুরের বাড়ি থেকে হল ।
দাদা যখন চাইবাসায় পোস্টেড ছিলেন সেখানে সুধীর চট্টোপাধ্যায়ের মেয়ে বেলার সঙ্গে পরিচয় হয়, আর দাদা পাটনায় গিয়ে বাবাকে বিয়ের কথা জানাতে তিনি তক্ষুনি রাজি হয়ে যান । আমি অফিসের কাজে নাগপুরে গিয়ে কয়েকদিনের পরিচয়ের পরই রাজ্যস্তরের হকি খেলোয়াড় আর সহকর্মী সলিলা মুখোপাধ্যায়কে বিয়ের প্রস্তাব দিতে ওর অভিভাবকরা সেদিনেই সায় দেন । বাবাও টেলিগ্রামে অনুমোদন জানিয়ে দেন । কয়েকদিনের পরিচয়ের পরই এই বিয়েকে মা আর বাবা বলতেন, “তোদেরটা বৈপ্লবিক বিয়ে, পরিবারদের মাথা গলাতে হল না, হপ্তার পর হপ্তা রোদ-বৃষ্টি ঠেঙিয়ে প্রেম করতে হল না, ব্যাস, একজন আরেকজনকে বললি বিয়ে করব, করে ফেললি ।”
আমি লেখালিখির চেষ্টা করছি, মায়ের কাছে সেকথা জানতে পেরে ১৯৫৮ সালে বাবা আগফা-গেভার্ট কোম্পানির একটা দামি ডায়েরি দিয়েছিলেন, আর তাতেই আমি কবিতা মকসো করা শুরু করেছিলুম । বাড়িতে ইংরেজি ভাষার পছন্দের বইয়ের সংগ্রহ গড়তে চাই জানতে পেরে বাবা বলতেন বইয়ের তালিকা তৈরি করে দিতে । বইয়ের দোকানে গিয়ে বই পছন্দ করে নিতুম আর পেয়ে যেতুম । বাংলা বই, বিশেষ করে কবিতার বই দাদা কলকাতা থেকে নিয়ে আসতেন । পরে বিদেশি বন্ধুদের কাছ থেকেও প্রচুর বই আর পত্রিকা পেতুম । হাংরি আন্দোলনের সময়ে কলকাতার পুলিশ আমায় গ্রেপ্তার করতে এসে আমার বইগুলো নিয়ে সারা ঘরে ছুঁড়ে-ছুঁড়ে ফেলেছিল । বাবার দোকানের কাচের আলমারি ভেঙে দিয়েছিল । মায়ের বিয়ের তোরঙ্গ ভেঙে লণ্ডভণ্ড করার সময়ে ওনার বিয়ের পুরোনো বেনারসি ভাঁজ থেকে ছিঁড়ে গিয়েছিল । কিন্তু আমাকে যখন কোমরে দড়ি বেঁধে, হাতে হাতকড়া পরিয়ে রাস্তা দিয়ে হাটিয়ে নিয়ে গেল পুলিশ তখন বাবাকে বেশ বিচলিত দেখেছিলুম, যা উনি সচরাচর হতেন না । ছোটোবেলায় আমি বাড়ি থেকে বেশ কয়েকবার পালিয়েছি ; ফিরে এসে মনে হয়নি যে বাবা বিচলিত ; উনি আমাকে এই প্রসঙ্গে কোনো কথা জিজ্ঞাসাও করতেন না । পরে, আমার মেয়ের কাছে গল্প করেছিলেন যে আমি ওনাদের না জানিয়ে বাড়ি থেকে পালাতুম ।
অ্যালেন গিন্সবার্গ আমাদের দরিয়াপুরের বাড়িতে এসে ছিলেন কয়েক দিন । তিনি নানা শহরে ঘুরে বেশ কিছু ফিল্মে ফোটোম তুলেছিলেন আর সেগুলো বাবাকে দেন ডেভেলাপ করার জন্য । বাবা ডেভেলাপ করে দ্যাখেন গিন্সবার্গ কেবল নুলো, ভিখারি, দুস্হ, পথের পাশে অসুস্হ লোক, কুষ্ঠরোগি-- এদের ফোটো তুলেছে । তখন গিন্সবার্গের সঙ্গে ওনার একচোট ঝগড়া হয়েছিল । বাবা গিন্সবার্গকে বলেছিলেন, “তোমরা যতই বড় কবি-লেখক হওনা কেন, আমাদের দেশটাকে এইভাবেই দেখাতে চাইবে ; কেন ? ফোটো তোলার আর কোনো বিষয় কি নেই !” গিন্সবার্গ সম্পর্কে যে গবেষকরা আমার সঙ্গে দেখা করতে আসেন তাঁদের সবাইকে এই ঘটনার কথা জানালেও, কেউই নিজেদের লেখায় এই বিতর্কটা অন্তর্ভুক্ত করেননি । পরে , পাটনার বাড়িতে বা কলকাতায়, বিদেশিরা এলে আমি তাঁদের বলতুম যে ফোটো তুলে থাকলে দেশে ফিরে ডেভেলাপ আর প্রিন্ট করিও ।
আমি প্রথম চাকরিটা পাই পাটনাতেই । তারপর ১৯৭৯ নাগাদ গ্রামোন্নয়নের চাকরি পেয়ে স্ত্রী আর ছেলে-মেয়েকে নিয়ে চলে যাই লখনউ । দাদা সপরিবারে পাটনা ফেরার পর মা আর বাবা আমার কাছে লখনউ চলে আসেন । লখনউতে ১৯৮২ সালের ১৮ই নভেম্বর হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মা মারা যান । মা মারা যেতে বাবা বেশ একা বোধ করতেন, কেননা আমি আর সলিলা দুজনেই অফিসে চলে যেতুম আর ছেলে-মেয়ে চলে যেতে স্কুলে । দাদা তাই বাবাকে পাটনায় নিয়ে যান । লখনউ থেকে আমি ১৯৮৭ সালে বদলি হয়ে মুম্বাই চলে যাই । বাবাকে তখন মুম্বাই নিয়ে গেলে ভালো হতো ; মুম্বাইতে চিকিৎসার সুযোগ-সুবিধা পাটনার চেয়ে উন্নত । ১৯৯১ সালের ৮ই অক্টোবর বাবা পাটনায় মারা যান ।



Name:  মলয়          

IP Address : 012312.60.4523.107 (*)          Date:02 Jan 2019 -- 12:41 PM

আমার মা অমিতা রায়চৌধুরী
---------------------------------------------
মলয় রায়চৌধুরী
আমার মায়ের জন্ম ১৯১৬ সালে, পানিহাটিতে । মায়ের ডাক নাম ভুল্টি । মায়ের বাবা, কিশোরীমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়, পানিহাটির রামচাঁদ ঘাট রোডে ‘নিলামবাটী’ নামে এক একান্নবর্তি পরিবারের সদস্য ছিলেন । কিশোরীমোহন ছিলেন, কলকাতা ও সেকেন্দ্রাবাদে, ম্যালেরিয়া রোগের কারণ নির্ণয়কারী ও ১৯০২ সালে সেকালে নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত ডাক্তার রোনাল্ড রস-এর সহকারী । তাঁর অবদানের জন্য ১৯০৩ সালে দিল্লি দরবারের সময়ে কিশোরীমোহনকে সম্রাট সপ্তম এডওয়ার্ডের স্বর্ণপদক দেয়া হয়েছিল । ২০১৩ সালে প্রকাশিত তাঁদের ‘দি ফ্লাইং পাবলিক হেল্হ টুল : জেনেটিকালি মডিফায়েড মসকিটোজ অ্যান্ড ম্যালেরিয়া কন্ট্রোল’ ( সায়েন্স অ্যাজ কালচার, ল্যাংকাস্টার, ইউ কে ) গবেষণাপত্রে উলি বিজেল এবং ক্রিস্টোফ বোয়েট অধ্যাপকদ্বয় জানিয়েছেন যে উপনিবেশের নেটিভ হবার কারণে কিশোরীমোহনের নাম রোনাল্ড রসের সঙ্গে সুপারিশ করা হয়নি । সমাজ সেবার কাজে স্ত্রীর গয়না এবং পৈতৃক সম্পত্তি বেচে, আর সঞ্চয়ের পুঁজি খরচ করে তিনি দেউলিয়া হয়ে যান, আর মায়ের বিয়ের কয়েক বছর পরই মারা যান ।
দেউলিয়া অথচ খ্যাতিপ্রাপ্ত অমন একটি বাংলা-ইংরেজি পড়া আধুনিক পরিবার থেকে মা আমাদের সংস্কৃত-ফারসি পড়া গঙ্গার অপর পাড়ের উত্তরপাড়া নিবাসী পরিবারে এসেছিলেন । উত্তরপাড়ার জমিদারবাড়ি তখন খণ্ডহরে রূপান্তরিত হওয়া আরম্ভ হয়েছে । আমার ঠাকুর্দা লক্ষ্মীনারায়ণ ছিলেন কিশোরীমোহনের বন্ধু । ম্যালেরিয়া রোগ সম্পর্কে প্রচারের জন্য পেইন্টার-ফোটোগ্রাফার ঠাকুর্দা কিশোরীমোহনকে ম্যাজিক লন্ঠনের জন্য স্লাইড তৈরি করে দিতেন । বিয়ের সময় মায়ের বয়স ছিল ১৪ বছর আর বাবার ১৮ বছর । বাবা, রঞ্জিত, জন্মেছিলেন লাহোরে । ভ্রাম্যমান ফোটোগ্রাফার ঠাকুর্দা বহুকাল আফগানিস্তানের কাবুল-কান্দাহার আর বর্তমান পাকিস্তানের বিভিন্ন শহরে ছিলেন । অর্থাৎ মা এসে পড়েছিলেন এমন একটি পরিবারে যার সদস্যদের সাংস্কৃতিক চরিত্রগঠন ভিন্নভাবে গড়ে উঠেছিল ।
ছয় ভাই আর এক বোনের সেজভাই ছিলেন আমার বাবা । বড়জেঠিমা নন্দরানি নয় বছর বয়সে বিয়ে হয়ে এসেছিলেন । মেজজেঠিমা এসেছিলেন তেরো বছর বয়সে । কাকিমারা এসেছিলেন তাঁদের বয়স যখন সতেরো । দাদু তাঁর ছেলে আর তাদের স্ত্রীদের নিয়ে বিভিন্ন রাজপরিবারের অতিথি হয়ে তার সদস্যদের ফোটো তুলে পেইনটিঙ তৈরি করে দিতেন । পাটনায় দ্বারভাঙ্গা মহারাজের পরিবারের সদস্যদের ছবি আঁকার সময়ে তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান । দাদু মারা যাবার পর বড়জেঠা পাটনা মিউজিয়ামে চতুর্থ শ্রেনির কাজ পান ; কিন্তু ওইটুকু মাইনেতে এতজনের পরিবারের খরচ সামলানো কঠিন হয়ে গিয়েছিল । বছর দশেক পরে অবশ্য উনি পদোন্নতি পেয়ে কিপার অফ পেইন্টিংস অ্যাণ্ড স্কাল্পচাসর হন । ভাই আর তাদের পরিবারের দায়িত্ব নিয়ে বাবা ফোটোগ্রাফির স্হায়ী দোকান খোলেন পাটনায় । এই সময় থেকে আমাদের পরিবারে মায়ের গুরুত্ব বেড়ে যায় । দারিদ্র্য সামলাতে না পেরে ঠাকুমা মায়ের হাতে সংসারের দায়িত্ব দিয়ে চলে যান উত্তরপাড়ার খণ্ডহরে একা থাকতে । ভূমিকম্পের পর ইমলিতলার অন্ত্যজ পাড়ায় বিহারি কাঠামোর একটি বাড়ি কিনে পুরো পরিবার সেখানে চলে আসেন । দলিত বিহারি এবং অতিদরিদ্র শিয়া মুসলমান অধ্যুষিত ইমলিতলা পাড়ার মাগধি আর ভোজপুরি ইথসকে সহজেই মা আ্ত্তীকরণ করে নিতে পেরেছিলেন ।
সংসারের ক্ষমতা মায়ের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়ে যাবার পর মায়ের চরিত্রে লুকোনো কিশোরীমোহন বেরিয়ে আসে । প্রায়ই দেখতুম ইমলিতলার প্রতিবেশিরা এসে মায়ের কাছে নিজেদের আর্থিক দৈন্য আর পারিবারিক দুর্দশার গল্প করছে, আর মা তাদের সাহায্য করছেন, পয়সাকড়ি দিয়ে তো বটেই, চাল-ডাল, পুরোনো বাসনপত্র আর ব্যবহৃত জামাকাপড়, পুরোনো হয়ে আসা জুতো ইত্যাদি দিয়ে দিয়ে । মায়ের বোনেদের বিয়ে আরও গরিব পরিবারে হয়েছিল বলে পুজোয় পাওয়া শাড়ি-চটি ইত্যাদি নিজে না পরে বোনেদের বা নিলামবাটীর দুস্হ জ্ঞাতিদের পাঠিয়ে দিতেন বা যখন নিজে যেতেন তখন নিয়ে যেতেন । যদিও মা পরিবারের ডি ফ্যাক্টো কর্ত্রী ছিলেন, কিন্তু ইমলিতলার বাড়িতে মা-বাবা-দাদা-আমি থাকতুম সবচেয়ে ছোটো ঘরটায় । লন্ঠনের আলোয় পড়াশোনা, রাস্তার কল থেকে জল ভরে আনা । দাদার এক ভায়রাভাই অত্যন্ত গরিব ছিলেন, চাকরি পাননি, তাঁদের পরিবারকেও মা নিয়মিত র‌্যাশান দিয়ে আসতেন, আমার মেয়ের ফ্রক আর জুতোও অনেক সময়ে লুকিয়ে দিয়ে এসেছেন যা আমরা এতোদিন পর জানতে পারছি সেই ভায়রাভাইয়ের মেয়ের কাছ থেকে ।
সবাইকে নিয়ে মিলেমিশে থাকার চারিত্রবৈশিষ্ট্যের দরুণ বড়জেঠা সংসারের সমস্ত ব্যাপারে মায়ের সঙ্গে পরামর্শ করতেন । আমার মনে আছে, ১৯৫১ সালে যে বছর প্রথম সাধারণ নির্বাচন হয়েছিল, কোন দলকে ভোট দেয়া হবে তা নিয়ে আলোচনার শেষে মায়ের নির্ণয় সবাই মেনে নিয়ে ছিলেন, অর্থাৎ যার যে দলকে ইচ্ছে ভোট দেবে । কলকাতায় নাকতলায় থাকতে অবাক লাগত দেখে যে বাড়ির কর্তা যে দলের সমর্থক, পরিবারের সকলেই সেই দলকে ভোট দ্যায়, অথচ তারাই আবার ডাইন্যাস্টিক পলিটিক্সের তর্ক তোলে !
স্কুলে ভর্তি হয়ে টের পাই যে মা শুদ্ধ হিন্দি জানেন না, ইমলিতলার ‘ছোটোলোকি’ বুলি দখল করে ফেলেছেন, আর তার বহু শব্দ যে শুদ্ধ হিন্দিতে অশোভন, এমনকি অশ্লীল, তা উনি অনেক পরে জানতে পারেন, যখন আমরা ইমলিতলা ছেড়ে দরিয়াপুরে সুন্নি মুসলমান পাড়ায় চলে যাই । পানিহাটিতে মেয়েদের স্কুল তখনও ছিল না বলে মা নিরক্ষর হয়েই এসেছিলেন ; নিজেকে শিক্ষিত করে তোলেন দাদা স্কুলে ভর্তি হবার পর । নভেল আর বাংলা সংবাদপত্র পড়া অভ্যাস করেন । একটা হিসাবের খাতা লেখা আরম্ভ করেন ।
ইমলিতলার বাড়িতে হিন্দুত্ব সামলাবার কাজ ছিল পুজারী বাড়ি থেকে আসা বড়-জেঠিমার । সেকারণে মা এবং কাকিমারা প্রতিদিনের ধর্মাচরণ থেকে নিজেদের আর আমাদের মুক্ত রাখতে পেরেছিলেন । জনৈক পাদরির আর্থিক সৌজন্যে প্রাইমারি স্তরে আমি ক্যাথলিক স্কুলে পড়েছিলুম ; মা ঘটিতে গরম জল ভরে আমার শার্ট-প্যান্ট আয়রন করে রাখতেন। আমার বাংলা বনেদ নষ্ট হয়ে যাচ্ছিল বলে মায়ের নির্দেশে আমাকে ব্রাহ্ম স্কুলে ক্লাস সিক্সে ভর্তি করা হয়েছিল ।
দরিয়াপুরের বাড়িতে আমি একা থাকতুম বলে, এবং এর-তার কাছে শুনে, আমার চরিত্রদূষণ আটকাতে বাবা আর মা প্রতি রাতে ইমলিতলার বাড়িতে খাওয়া দাওয়া সেরে, দরিয়াপুরে থাকা আরম্ভ করেন । দাদা ১৯৪৯ সালে কলকাতার সিটি কলেজে পড়তে চলে গিয়েছিলেন, দরিয়াপুরের বাড়িতে দাদা ফেরেন চাকরির শেষ বছরে, তখন আমি মা-বাবাকে নিয়ে লখনউ চলে গেছি । ইমলিতলার বাড়ি থেকে মা প্রতিদিন রাতে টিফিন ক্যরিয়ারে করে আমার আর বাবার খাবার নিয়ে দরিয়াপুরে আসতেন, প্রায় এক কিলোমিটার হেঁটে।
দরিয়াপুরে পাকাপাকি চলে আসার পরও ইমলিতলার সদস্যদের দায়িত্ব মা ছাড়েননি ; সপ্তাহে এক দিন গিয়ে টাকাকড়ি আর চাল-ডাল-আনাজের ব্যাপারটা সামাল দিয়ে আসতেন । গোলা রোডের এক বানিয়ার দোকানে তালিকা দিলে সে যাবতীয় জিনিস ইমলিতলা আর দরিয়াপুরে পাঠিয়ে দিত । পুজোর সময়ে পোশাকের ভেদাভেদ মেটাতে সবায়ের জন্য ছিল একই কাপড়ের শার্ট আর ফ্রক, এমনকি জেঠা-কাকারাও সেই কাপড়ের শার্ট পরতেন ।
স্কুলের পর্ব শেষ করে যেটুকু সময় ছিল আর ইন্টারমিডিয়েট পড়ার সময়ে আমি আমার বন্ধু তরুণ শুরের মামার ট্রাকে করে নানা জায়গায় চলে যেতুম, বাড়িতে বলে যেতুম না, বললে বাবা-মা যেতে দেবেন না অনুমান করে । বলা যায় বাড়ি থেকে পালিয়ে যেতুম । ফিরে আসার পর মা কিছুই বলতেন না । পরে আমার মেয়েকে উনি বলেছিলেন যে ওনাদের না জানিয়ে আমি বাড়ি থেকে পালাতুম ।
দাদা চাকরি পাবার পর দাদার চাকুরিস্হলে গিয়ে মা মাঝেমধ্যে সপ্তাহখানেকের ছুটি কাটিয়ে আসতেন । দরিয়াপুরের বাড়িতে কাজের মাসি রান্না করে দিত । নিম্নবর্ণের হাতে রাঁধা ভাত বাবা খেতেন না বলে ভাতটা আমিই বসিয়ে দিতুম । রান্নায় মাকে সাহায্য করতে হতো বলে ডাল-তরকারিও রাঁধতে শিখে গিয়েছিলুম । এখনও মাঝে-মাঝে স্ত্রীকে রান্নাঘরের কাজে সাহায্য করি । মা বলতেন, ডাল আমি ভালো রাঁধতে পারি ।
হাংরি আন্দোলনের সময়ে দাদার আর আমার বন্ধুরা কোর্টে আমার বিরুদ্ধে সাক্ষী হয়ে গেছেন শুনে মা, যিনি ছিলেন অত্যন্ত চাপা প্রকৃতির, নিজের ক্রোধ সামলাতে পারেননি । আমি তাদের চিঠি ইত্যাদি ছিঁড়ে ফেলছি দেখে বলেছিলেন, ‘সব নিয়ে গিয়ে গুয়ের ডাবায় ফ্যাল ; সব কটাই আহাম্মক, অকৃতজ্ঞ ।’ আমার আর দাদার লেখালিখি সম্পর্কে উনিই ছিলেন প্রধান উৎসাহদাত্রী । ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ নামে যে কবিতাটা নিয়ে মকদ্দমা হয়েছিল সেটা মা-বাবা-ঠাকুমা সকলেই পড়েছিলেন ।
নাগপুরে অফিসের কাজে গিয়ে রাজ্যস্তরের হকি প্লেয়ার ও সহকর্মী সলিলা মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে পরিচয়ের কয়েক দিনের মধ্যেই বিয়ে করতে চাই জানিয়ে পাটনায় খবর পাঠালে মা চিঠি লিখে পাঠান যে ‘সিঁদুর পরিয়ে নিয়ে আসলেই হবে ।’ তার কারণ আমার বন্ধুনিদের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে বেশ চিন্তিত থাকতেন উনি । আমার সম্পর্কে নানা গালগল্প শুনে বেশ উদ্বেগে থাকতেন । এমনকি আমার পেছনে কয়েকজন ঘটককে লাগিয়ে দিয়েছিলেন যারা প্রায়ই আমার অফিসে একজন তরুণীকে নিয়ে হাজির হতো । বাড়িতে এসে মায়ের কাছে এই বিষয়ে অভিযোগ করলে উনি বলতেন, এছাড়া আমার অন্য উপায় নেই, কোনো একজনকে তো পছন্দ কর ।
লখনউ বদলি হয়ে আমরা চলে গেলে মা একা হয়ে গিয়েছিলেন, রান্নার মাসি রাখা হয়েছিল ওনার দায়িত্ব কমাবার জন্য । আসলে উনি আমার মেয়ে আর ছেলের সঙ্গে সময় কাটানোয় অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলেন, তাদের অভাব বোধ করতেন । একাকীত্ব কাটাবার জন্য পাটনার বিভিন্ন বাঙালি পরিবারের মহিলাদের সঙ্গে গল্প করতে চলে যেতেন প্রতি সন্ধ্যায় । দাদা পাটনায় চলে আসার পর মা আর বাবাকে আমি লখনউ নিয়ে চলে আসি । লখনউতে মায়ের হৃদরোগ আর আরথ্রাইটিস ধরা পড়ে ।
হৃদরোগের লক্ষণগুলোর সঙ্গে তখন আমরা ততটা পরিচিত ছিলুম না, মাও তাঁর কষ্টের কথা বলতেন না। লখনউতে তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ১৮ই নভেম্বর ১৯৮২ মারা যান । মা মারা যেতে আমি লখনউয়ের রাস্তায় দাঁড়িয়ে কেঁদেছিলুম ।





Name:  TSC          

IP Address : 012312.60.8912.247 (*)          Date:02 Jan 2019 -- 05:15 PM

Interview with Malay Roychoudhury




By The Sunflower Collective
Malay Roychoudhury is an Indian Bengali poet and novelist who founded the Hungryalist Movement in the 1960s. He was awarded a Sahitya Akademy award for translating Dharamvir Bharati’s Suraj Ka Satvan Ghoda in 2003 but he refused to accept it. He spoke to The Sunflower Collective at length about his work, Hungryalist Movement, Allen Ginsberg, other writers associated with the Movement, politics and rifts with other poets, publishers, and the establishment during the Movement.
The Sunflower Collective: Young poets are calling themselves Hungryalists in West Bengal again, as you said in a recent interview. Jeet Thayil is making a BBC documentary on Ginsberg’s time in India for which he met you. Deborah Baker wrote a book about the same not so long ago. Internationally, several films about the Beats hit the screens in quick succession in recent years. Do you see it as a revival of the two movements that were linked willy-nilly?
Malay Roychoudhury: I don’t think so. Saileswar Ghose, Subhas Ghose, Basudeb Dasgupta had been editing Hungryalist magazines, Kshudharta and Kshudharta Khabor, before they died a few years back. Pradip Choudhuri is still publishing Phoo and Swakal. Rasaraj Nath and Selim Mustafa are still publishing Anarya Sahitya. Ratnamoy Dey is still publishing Hungryalist Folder. Aloke Goswami had published Concentration Camp before he concentrated on writing novels and short stories. Arunesh Ghose continued publishing Giraffe before he died a couple of years back. Since these magazines are in Bengali and they are not active on social media, you don’t hear about them. Pradip Choudhuri has done a lot of translation of Hungryalist work in French.
Prior to Jo Wheeler and Jeet Thayil, another producer, Dominic Byrne, had come and made a radio programme exclusively on our movement. Marina Reza had come from Weslyan University for research on our movement. Daniella Limonella had come from Italy for the same purpose. University of Exeter has published an interview of mine in their Exeposé online newspaper. Mrigankasekhar Ganguly has made a film based on my poem, ‘Stark Electric Jesus.’ A debate is going on for a decade, for and against this poem on a Bangladeshi news portal.
Deborah Baker neither met any Hungryalist nor consulted any written material available at Kolkata’s Little Magazine Library Research Centre. Most of the information is wrong and concocted, though she claims to read and write Bengali. This Research Centre has an exclusive section on Hungryalist periodicals, bulletins, manifesto, and books.
Students at IIT, Kharagpur, Jadavpur University, Rabindra Bharati University, Visva Bharati University, Calcutta University, and Assam University have been doing PhD and M Phil, etc. on our work for more than a decade as a matter of academic routine.
Academic interest in the Beats, especially Allen Ginsberg, continues. He had himself established a Trust to look after the interest of all the Beats and his own work with the million dollars he got from Stanford University by selling his collections. Bill Morgan, one of the Trustees, had visited me when I used to reside at Kolkata.
We, the Hungryalists, have not even been able to bring out an anthology of our work in English and Hindi, as there is no commercial interest in our work from the publishers. And none of us are well to do. Hindi being the prime Indian language, the Sahitya Academy should have evinced interest in bringing out an anthology.
TSC: Ginsberg was concerned that the Beats did not receive the amount of academic attention in America they deserved. Do you feel the same about the Hungryalists, as far as the Indian academia is concerned? In the case of the painter Karanajai, it appears even the critics abandoned him after a while leading to a very embittered existence. What are your thoughts on this?
MRC: Yes, he was worried during his lifetime that the American Establishment is not ready to award them with governmental and academic recognition. However, presently a lot of academic work is being done on the Beats due to the next generation of poets, who took an interest in them. Even if the Beats were anti-Establishment, they were typical products of the American capitalist world. Ginsberg created his trust with a huge fund to carry on his legacy. Kerouac’s manuscript roll was sold for 2.40 million dollars, enough to carry on his legacy by his Trustees for eternity. Ferlinghetti opened City Lights Bookstore on West Front in order to regularly publish the Beats. In Greenwich Village, they had Barney Rosset’s Grove Press, James Laughlin’s New Directions and the Village Voice newspaper for support. They regularly interacted with the digital companies and brought out their recitations and films, etc. They appointed secretaries to enable them to get paid invitations for poetry readings from various European and American cities.
As I told you just now, there has been continuous academic work on Hungryalist poets and writers. Sahitya Academy has awarded prizes to Utpalkumar Basu, Sandipan Chattopadhyay, Binoy Majumdar, Saileswar Ghosh, and Subimal Basak. Since I do not accept literary and cultural prizes, I had refused their award. The point is we do not get publishers like Ferlinghetti or James Laughlin in Kolkata to bring out our works and arrange for distribution. And we do not get translators who would translate and publish our works in Indian periodicals. There is still a strong lobby against us at Kolkata, though it has weakened after Sunil Gangopadhyay’s demise; nevertheless Sunil’s trained disciples are still active.
After receiving the Lalit Kala Academy prize at a young age in 1972, Anil Karanjai started sympathizing with the Naxalite Movement; his studio at Benaras was ransacked by police. To avoid the repression, he married an American lady and went to Wahington DC to live there. He was soon disillusioned with the Western world and came back a few years later after divorcing the lady. He got involved in social activities and avoided the dirty machinations that painters had started resorting to at that time. Karuna Nidhan also fled from Benaras and went to Patna, where my elder brother Samir opened a coloured fishes shop for him. When Anil returned to Delhi, Karuna joined him. Anil married Juliet Reynolds and settled at Dehradun to avoid the Delhi painters’ circus. Anti-Establishment writers and artists in that circuit are rare these days.
TSC: What are your views on Shakti Chattopadhyay leaving the movement?
MRC: Shakti Chattopadhyay testified against me because Shakti had fallen in love with Samir’s sister-in-law, Sheela, at Chaibasa. He felt that he could not marry Sheela because of Samir, who did not want her to get married to an unemployed drunkard. That Sheela was living at our Patna residence at that time for post graduate study at Patna University added fuel to Shakti’s fire.
This, along with instructions from a newspaper group which was against us, and which offered Shakti a sub-editor’s job, forced him to leave the movement. Now, after Sunil Gangopadhyay’s death, when Sunil’s letters to his friends are being published, it is found that Sunil was goading his friends to leave Hungryalist Movement, as Sunil thought that my sole motive in launching the Hungryalist Movement was to destroy his ‘Krittibas’ group. Almost all of these letters spew venom against me. In these letters, Sunil wrote that to be an anti-establishment writer, you have to join the Establishment and work from within.
TSC: Is there something akin to an anxiety of influence which informs the relationship between the two movements? In his Indian Journals, Ginsberg continues to profess adherence to the Blake vision. He mentions the harmonium but there is no indication he first learnt about it through the Hungryalists. At what point do you think he discarded the Blake vision and allowed the Indian influences to play out? Could you give some specific examples? I understand that his use of breath as a measuring unit for verse might be one?
MRC: I don’t think we were bothered about influencing each others’ movements. In an interview to LIFE magazine, Ginsberg had said that the Blake vision departed from him when he was traveling in a train while returning from India and started weeping.
When he had visited Bodhgaya, he had chanced upon a piece of stone wherein small replicas of Buddha were inscribed. He had told me that seated on two stones he was shitting, as at that time the Japanese had not developed Bodhgaya and it was almost a village. He said it was a divine direction from Buddha; thus he became interested in Buddhism and departed from mysticism. Due to archaeological restrictions, he could not carry the stone to USA. He had cleaned that stone with his tooth brush at our Patna residence.
Bill Morgan, one of Ginsberg’s trustees, who visited me, had said that there were more than fifty copies from which edited pages were included in his Indian Journals. Ginsberg was spied upon by the Indian agents and a few of his copies were picked out of his shoulder sling-bag by some of these agents to find out what he was recording. Ginsberg himself told me about it. The harmonium story might have been in one of the fifty copies.
Sunil Gangopadhyay, who was in the USA at the time of editing Indian Journals, tried his best to shut out the Hungryalist Movement from this book. Bill Morgan had told me that Ginsberg regularly mailed packets to his step-mother in New Jersey so that she could arrange the papers in the almirahs of their basement. Ginsberg had country-wise almirahs. He collected most of our manifestos and they are available in Stanford University.
TSC: In his Indian Journals, Ginsberg does not allude to your movement, although he knew about it and took a deep interest. Do you think it was deliberate? Do you think he appropriated your techniques and attitudes regarding poetry and art in general?
MRC: I think I have answered your question just now.
TSC: Ginsberg met poets in Bombay also, including Kolatkar and others. How can then it be said that he was principally influenced by the Hungryalists?
MRC: He met poets of other Indian languages for a day or two ; but he stayed in Kolkata for about two years, attended Bengali poetry readings, went to country liquor den Khalasitola, visited by Bengali poets, Sonagachhi visited by Bengali poets, and smoking joints, visited by Bengali poets.
TSC: You have criticised Ginsberg for clicking pictures of beggars while he was here. Is that part of a larger disenchantment with your old friend? Do you think at the end of the day, he was as superficial as other white tourists?
MRC: Yes, when Ferlinghetti sent me a copy of Indian Journals I felt quite ashamed. I did not show the book to my dad, who had admonished Ginsberg for taking photographs of beggars, lepers, lame men, naked sadhus, etc. I have visited other countries and never thought of making a mockery of poverty of certain people. In his Indian Journal, there is a photograph of Ginsberg himself in the guise of a beggar seated beside a beggar.
Ginsberg had several photo exhibitions in USA, which highlighted Indian beggars, lepers, destitutes, almost naked sadhus, cows on the streets, stray dogs, goats, etc. Cards to these exhibitions were sold to patrons. When he revisited India during the Bangladesh War (1971), he shot photos of refugees fleeing the war zone.
He did have the typical white tourist in him.
Probably my childhood in Imlitala slum taught me to respect the poorest man.
TSC: Could you tell us about the politics of the Hungryalists? Were there direct links back then between the Naxals and the Hungryalists?
MRC: Hungryalist Movement had started in 1961; the Naxalite Movement started in the Seventies. I have already told you about the plight of Anil Karanjai and Karuna Nidhan. My first book was on Marxism. Saileswar Ghose, Subhas Ghose, Aloke Goswami had joined the CPI (M) for literary gains. I was disillusioned with Marxism after I started reading about the activities of the Soviet establishment as well as the activities of the lumpens of CPI (M). Strangely CPI (M) resorted to the same murderous activities of the earlier Bengal governments. Now the new Bengal government has co-opted the same lumpens and are resorting to same murderous activities.
TSC: The Beats were criticised for their lack of gender awareness. How do the Hungryalists fare in your opinion on that count? Were there female hungry gen writers and artists? Also, did the movement display consciousness of caste issues?
MRC: Young bold women writers were rare at that time. We had one lady member, Alo Mitra, who later married Tridib Mitra. They together used to edit two Hungryalist magazines, one in Bengali, named, UNMARGA, another in English named, WASTE PAPER.
We were the first to bring lower and backward class writers and poets in literature. Prior to us, there was not a single poet to be seen on the pages of poetry magazines. Debi Roy, Subimal Basak, Abani Dhar, Rasaraj Nath belong to lower or backward class.
TSC: Tell us a little about your poetic process? What influences and inspires you? Is the process of writing poems that deal with stark reality harder than facing the wrath of audience and editors?
MRC: I was initiated into poetry in a strange way. Being a Brahmin family, at our Imlitala house we were not allowed to eat chicken eggs. I was sent to fetch duck eggs from our Shia Muslim neighbour quite frequently. I was ten. The elder girl of their house whom I called Kulsum Apa was fifteen-years-old. She used to recite Ghalib and Faiz Ahmed Faiz to me, whom I did not understand; but she explained those poems to me. She indirectly, through those poems, told me that she loves me. One day when I asked for the meat being cooked in their house because of the scent, she induced me into a sexual relation. The meat was wonderful and she licked clean my lips with her tongue. After a few days, due to painful scratches on my penis, I got scared and stopped going to Kulsum Apa’s house. However, the impact of the poems remained. I had told about this sexual relation to my grandmother, who told me to never talk about it to anyone in my life. I still miss Kulsum Apa. When I last visited Imlitala, I enquired of the family and was told that they had sold their house and left Imlitala.
My next influence was again a girl of higher class named Namita Chakroborty at the Ram Mohun Roy Seminary, who doubled up as Librarian for the Bengali section. I had a great crush on her. She initiated me into Marxism and introduced me to works of Brahmo writers and poets, including Rabindranath Tagore and Jibanananda Das. One day I had kept a chit on her table in which I had written ‘I love you’. She had preserved the chit and showed it to one of my aunts after several years, when my name started appearing in magazines and papers. Both Kulsum Apa and Namitadi had dimples.
At Imlitala house, we had two servants, Shivnanni and Ram Khelawan, who were paid in kind, that is food, dresses, and shelter. Since they were servants, they could not reprimand us children directly. Shivnanni knew Ramcharitmanas by heart. Ramkhelawan knew dohas of Kabir, Rahim, and Dadu. Both of them reprimanded through quotations and explained the lines as well. Shivnanni used to play a game called, Ramshalaka, that is a metal stick. You have to close your eyes, open a page and put the Ramshalaka on a line. Shivnanni explained how our day will pass based on the line.
Imlitala was considered a bad influence by Dad as we were exposed to free sex, toddy, cannabis, country liquor, etc. He constructed a house in Dariapur and we shifted there. My elder brother Samir was packed off to Kolkata for post-school studies. It helped me. He joined groups of poets and brought lots of poetry collections and periodicals for me. Ginsberg had come to our Dariapur residence. Prior to that Ginsberg and Orlovsky had visited Samir at Chaibasa, Singhbhum and experienced Mahua drink.
I am not bothered about editors in my life. Only when I am requested, do I send my poems and novels to them. Most of the editors are younger to me and they respect me. Yes, dealing with reality is harder. Earlier I used to maintain a bank of images, words, lines, sentences when I wrote with pen on paper, Now, because of arthritis of fingers, especially the thumb, the process has become difficult with the computer. Since I take a lot of medicines, including sleeping pills, I tend to forget these days.
TSC: What is your opinion of the current writing scene in Bangla and English in India? Are there any writers you like in particular?
MRC: I do not have much idea about what is happening in Indian Writing in English. As far as Bengali writing is concerned, lot of exciting things are happening in the little magazine world. Every year a Little Magazine Fair is held apart from the Kolkata Book Fair. Book Fairs are also held at the district headquarters. This gives us a glimpse into a wide range of creative writing.
The poets whom I have noticed recently writing in a new way are Raka Dasgupta, Sridarshini Chakraborty, Mitul Dutta, Barin Ghoshal, Dhiman Chakraborty, Anupam Mukhopadhyay and Bahata Anshumali, to name a few.
TSC: Are you concerned about the general rise of right-wing and other intolerant forces in India and elsewhere?
MRC: Yes, I am very much disturbed by the latest events taking place all over India. It appears that a worthless government run by cheaters was better than one influenced by fundamentalist criminals baying for blood of the meek and helpless. I wonder how this country had once given us Khajuraho, Puri temple, Meenakshi temple, Konarak, Ajanta, Ellora; how kings enjoyed meat and wine after the Ashwamedh Yajna.
TSC: Is Neera in Sunil’s poems and the one whose name appears in your poem, “Please Don’t tell my grandmother”, the same person? Was she real? Was she a writer/publisher who could be associated with the Generation? Is Mala in Debi Roy’s Malar Jonne real? Was she, too, a poet associated with the Generation?
MRC: Yes, she is the same Neera. Sunil Gangopadhyay never asked for a poem from me for his magazine, Krittibas. After his death, his wife Swati Gangopadhyay became the editor of Krittibas, which Sunil used to edit. Krittibas asked me to contribute a poem. I had sent this poem but they were scared to publish it in Krittibas. They did not publish it and told me to replace it. Obviously I had to decline. But the fact became known to the little magazine circle of poets and writers in Kolkata.
No, Debi Roy’s wife Mala was not a poet; she was a housewife. She died recently.
The interview was first published in The Sunflower Collective on 10/11/15
Bio:
Malay Roy Choudhury is a Bengali poet and novelist, who founded the Hungryalist Movement that took the poetry scene in Bengal by storm in the 1960s. The Hungry Generation was a literary/art movement that Malay Roy Choudhury, along with Shakti



Name:  Tarun Mukhopadhyay          

IP Address : 012312.60.8912.247 (*)          Date:02 Jan 2019 -- 05:18 PM

মলয় রায়চৌধুরীর কবিতা : অধ্যাপক তরুণ মুখোপাধ্যায়ের বিশ্লেষণ
---------------------------------------------------------------------------------------------------------------------
বিশ শতকের ষাট বা ছয় দশক বাংলা কবিতার ইতিহাসে যে কারণে স্মরণীয় হয়ে আছে, তার মধ্যে 'হাংরি আন্দোলন' অন্যতম, এ বিষয়ে দ্বিমত নেই । আর সেই হাংরি আন্দোলনের অন্যতম নেতা মলয় রায়চৌধুরী, যিনি আজও সৃজনক্ষম । কারো আনুকূল্য বা হাততালির প্রশংসা করেন না । ভুল কি ঠিক, সে বিচার করবে ইতিহাস বা মহাকাল । পরোয়াহীন এই লেখককে তাঁর নিজস্ব ভাষামুদ্রা ও ভঙ্গির জন্য অভিবাদন জানাতেই হয় । তথাকথিত বিপ্লবী কবি না হয়েও, কবিতার অস্ত্র প্রয়োগে তিনি সংগ্রামী কবি হতে পেরেছেন ।

১৯৬১ সালের নভেম্বরে হাংরি আন্দোলনের যে বুলেটিন প্রকাশিত হয়েছিল, সেখানে চোদ্দোদফা দাবি পেশ করা হয়। যার মধ্যে উল্লেখ্য :-
1. The merciless exposure of the self in its entirety.
2. To present in all nakedness all aspects of the self and thinking before it.
3. To challange every value with a view to accepting or rejecting the same.
4. To use the same words in poetry as are used in ordinary conversation.
5. To reject traditional forms of poetry and allow poetry to take its original forms.

আমরা জানি প্রথা ভাঙার এই স্পর্ধা তখন সরকার মানতে পারেনি । কাব্যে অশ্লীলতার জন্য মলয় রায়চৌধুরীকে গ্রেপ্তার করা হয় ।

বাংলা কবিতায় রবীন্দ্রনাথের পর নতুন সুর শুনিয়েছিলেন তিরিশের কবিরা । চল্লিশের কবিদের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও প্রতিবাদী ভঙ্গি আরেকমাত্রা যোগ করেছিল । আত্মকথন ও আত্মরতিকে সম্বল করে অন্য রকম স্বাদ নিয়ে এলেন পঞ্চাশের কবিরা । আর ষাটের কবিরা, বিশেষভাবে 'হাংরি আন্দোলন' আমূল নাড়া দিল বাংলা কবিতার সনাতন ঐতিহ্যকে, নিয়মানুবর্তিতাকে । কবিতার ভাষায়, ছন্দে, অলংকারে, স্তবকে, তুমুল ভাঙচুর পাঠকের অভ্যস্ত চোখ ও কানকে বিব্রত করে তুলল । বিশেষত মলয় রায়চৌধুরীর লেখায় যৌনতার সঙ্গে এলো ব্যঙ্গ, আত্মপরিহাস ও অসহায় মানুষের নিষ্ফল যন্ত্রণা ।

কিভাবে মলয় রায়চৌধুরী তাঁর কবিতায় আত্মপ্রক্ষেপণ ঘটিয়েও নিরপেক্ষ হয়ে যান, সামাজিক ঘটনার দ্রষ্টা হন, নির্মম সমালোচনায় শাণিত ইস্পাত হয়ে ওঠেন, তাঁর কবিতাগুলি পড়লে টের পাওয়া যায় । তাঁর "কবিতা সংকলন"-এর নানা মেজাজের আটটি কবিতা আলোচনা করে তাঁর কবি কৃতি ও কবিস্বরূপ বুঝতে ও বোঝাতে চেষ্টা করা যাক । আলোচিত কবিতাগুলি হলো -- কামড়, ফুলিয়ার হাতটান, উৎখাত, তুলকালাম আত্মহত্যা, কপর্দকহীনতা, লোহার রড, রবীন্দ্রনাথের কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা, প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার ।

'কামড়' নামাঙ্কিত কবিতায় মলয় রায়চৌধুরী যে ভঙ্গিতে ভারতবর্ষকে প্রশ্ন করেছেন, বিদ্রুপ করেছেন, পড়তে পড়তে মনে হয় সত্তরের কবি সুবোধ সরকার মলয়ের কাছে অধমর্ণ । ধান্ধাবাজ সুবিধাবাদী এই দেশের চরিত্র, মানুষের প্রকৃতি, নিপুণ ভঙ্গিতে তিনি তুলে ধরতে পেরেছেন--

আর কোল্কাতা এখন নিম রেনেসঁসের ভেতর দিয়ে কোথায় যাচ্ছে জানি না
ভারতবর্ষ দু'চারটে লেখা ছাপিয়ে দিন না উল্টোরথ, দেশ, নবকল্লোলে
আমিও মনীষী হয়ে যাই, কিংবা শান্তিনিকেতনে নিয়ে চলুন
সাহিত্যের সেবা করব, ধুতি-পাঞ্জাবি দেবেন একসেট
আজ বিকেলে চলুন খালাসিটোলায় বঙ্গসংস্কৃতি করি ।

শেষ পর্যন্ত মলয়ের সুতীক্ষ্ণ ব্যঙ্গ, "নিজের হৃৎপিণ্ড খেয়ে নিজের সঙ্গে রফা করে নিলে কেমন হয়"? এই ব্যঙ্গাত্মক মনোভাবেই তিনি দেখেন, "পায়রার বুকে টাইম বোমা বেঁধে শান্তির জন্য ওড়ানো হচ্ছে" ( ফুলিয়ার হাতটান ) । পিকাসোর আঁকা শান্তিদূতও আজ নিরাপদ নয়, প্রতারক -- অন্তত নেতাদের হাতে । এই মর্মান্তিক সত্য মলয়ই পারেন উচ্চারণ করতে ।

তাঁর অন্যান্য কবিতার মধ্যে পাই আত্মবীক্ষ্ণণ ও আত্মসমালোচনা । যেমন 'কপর্দকহীনতা' কবিতায় লিখেছেন--

আদালতের পেঙ্গুইনদের সঙ্গে খেলা করে এলুম
আমার এই কাঁতড়া চেহারা দেখে বুঝে নাও
প্রজ্ঞাহীন হতে চেয়েও কিছু হল না ।
* * *
কাঠমগজ কাঠমগজ
নিজেকে বিশ্বাস করা গেল না ।

ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার মিশেল এখানে আছে । আদালত ও পুলিশের ভূমিকায় ক্ষুব্ধ কবি ঠাট্টা করে বলেন,

এদের পুলিশ আমার চুলে সরেজমিন তল্লাশি চালিয়েছে
এক জোড়া পাকাচুল ধরে নিয়ে গেছে ( লোহার রড )

পৃথিবীর আকার, আয়তনের অভ্যস্ত ধারণায় ( 'পৃথিবী গোলাকার কমলালেবুর মতন' ) পদাঘাত করে মলয় লেখেন -- "অণ্ডকোষের কাছে বাড়া-কমা শিখছে পৃথিবী" । কিরকম জীবন তিনি কাটাচ্ছেন, কোন সমাজে ও পরিবেশে বাস করছেন, তারও ছবি অকপটে আঁকেন কবিতায় ---

চশমার কাচে চুয়ে পড়ে কুয়াশায় হাওয়া-ধোনা শিশিরের ধাতুরস
পিরানহা মাছের ঝাঁকে-ঝাঁকে সাঁতার কটি মনে হয় ( উৎখাত )

যাঁরা মনে করেন আত্মরতিই এই কবির আশ্রয়, ভুল করেন । চারপাশের জীবন ও জগতকে তিনি গভীরভাবে দেখেছেন । জেনেছেন । 'বেঁচে থাকা বা প্রেম' এবং মৃত্যু তাই সমার্থক হয় তাঁর কাছে আর বুঝে যান 'হৃদয় নামে কিছু নেই' । দ্রষ্টা কবির বোধিলাভ এইরকম ---

ছাপার অক্ষরের প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে গেল এবার
সভ্য ও সংস্কৃতিবান হয়ে মানুষের লাভ হয়নি
মূর্খ বেড়েছে ( তুলকালাম আত্মহত্যা )

সংবাদনশীল ও সামাজিক একজন কবির পক্ষে এই অভিজ্ঞতা মর্মান্তিক । কবিতার শেষাংশে মলয়ের হাহাকার সহৃদয় পাঠককে স্পর্শ করে, কষ্ট দেয়--

এককালে সুন্দর ও শিব ছিল সত্য
যুক্তি ছিল সত্য
ঈশ্বর ছিল সত্য
অ্যাজটেকরা মৃত্যুকে সত্য বলে মনে করেছিল
এখন আত্মহত্যা ছাড়া সত্য নেই
যুক্তিহীন দেহে দায়িত্বরহিত চুমো
বাঁচতে দাও কিংবা মরে যেতে ( তুলকালাম আত্মহত্যা )

এ যেন আলবেয়ার কামুর 'মিথ অফ সিসিফাস' -- অ্যাবসার্ড জগতে অস্তিত্ব-অনস্তিত্বের দ্বন্দ্বে রক্তাক্ত হওয়ার আর্তনাদ । এই সুরই যেন একটু অন্য ভাবে পাই 'রবীন্দ্রনাথের কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা' কবিতায় । তথাকথিত রবীন্দ্রবন্দনা ও বিরোধিতায় না গিয়ে ষাটের কবি আত্মকথনে মগ্ন হন । চারপাশের যে ভাঙন, হত্যা, সন্ত্রাস, হৃদয়হীনতা -- দেখতে দেখতে কবি অস্হির হয়ে ওঠেন ।

হরিণের মাংস কাটা হয়েছিল কোদাল দিয়ে
আমার ছেলেমেয়েরা খরগোশের চোখ উপড়ে
খেলা করেছিল বেতলার দুর্গে

নতুন প্রজন্ম কিভাবে হিংসা ও হিংস্রতায় দীক্ষা নিয়েছে, এ যেন তারই দলিল । যেখানে রবীন্দ্রনাথের সত্য-সুন্দর-মঙ্গল ব্যর্থ । বেঁচে থেকে পৃথিবীকে মধুময় বলা আর সম্ভব নয় । অসম্ভব চলে যাবার আগে পৃথিবীকে প্রণতি জানিয়ে তারই মাটির তিলক কপালে এঁকে নেওয়া । বরং কবি বলতে পারেন --

অ্যালুমিনিয়ামের বাক্সে আমার লাশ বাঁচিয়ে তুলতে চাইছি
আমাকে ক্ষমা করুন ।

মলয় রায়চৌধুরীর খয়াত-অখ্যাতি ও প্রতিষ্ঠা যে কবিতার জন্য তার নাম 'প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার' । যে কবিতার পরতে পরতে মিশে আছে যৌনতার আমিষ গন্ধ । ১৯৬৩ লেখা এই কবিতা যখন ১৯৬৪ সালে প্রকাশিত হয়, তখন দেশকালের পরিস্হিতি কেমন ছিল, তা এক নজরে দেখে নিতে পারি ।

ক) চীনে পরমাণু বোমা বিস্ফোরণ ।
খ) দক্ষিণ আফ্রিকার নেতা নেলসন ম্যাণ্ডেলার কারাদণ্ড ।
গ) চিন-ভারত যুদ্ধে কমিউনিস্ট পার্টির বিভাজন ।
ঘ) হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা ।
ঙ) প্রধানমন্ত্রী জহরলাল নেহেরুর মৃত্যু ।

এই পটভূমিতে অতি-ব্যক্তিগত কবিতা লিখলেন মলয় । তাঁদের ইস্তাহারে যা বলেছিলেন -- Merciless exposure of the self বা Nakedness of all aspects of the self --- এখানে তা পাওয়া গেল, কবিতার ভাষায়, গঠনেও প্রথাভাঙা হলো । মূল্যবোধকে চ্যালেঞ্জ করলেন, অস্বীকৃত হলো Traditional form শুধু গদ্যকবিতা রূপে নয়, শব্দ ব্যবহারে তিনি নিজস্বতা মুদ্রিত করলেন । লিখলেন --- কোর্বো, তর্মুজ, পার্ছিনা, কোল্কাতা, ওর্ফে, চুর্মার, জাফ্রান ইত্যাদি শব্দ । অকথ্য শব্দ ব্যবহারেও তিনি অলজ্জিত --- 'ঈশ্বরের পোঁদে চুমু খেতুম' । কবিতার মধ্যে যৌন রসাত্মক শব্দ, বাক্য ও ভাবনা অজস্র ছড়িয়ে আছে । কয়েকটি বিচ্ছিন্ন পংক্তি উদ্ধৃত করছি ---

১. আমি জানি শুভা, যোনি মেলে ধরো, শান্তি দাও
২. শুভার স্তনের ত্বকের মতো বিছানায় শেষবার ঘুমোতে দাও আমায়
৩. তোমার সেলোফেন সতীচ্ছদের মধ্যে দিয়ে পৃথিবীটা দেখতে দাও
৪. আমাকে তোমার লাবিয়া ম্যাজোরার স্মরণাতীত অসংযমে প্রবেশ করতে দাও
৫. পায়জামায় শুকিয়ে যাওয়া বীর্য থেকে ডানা মেলছে

শুভা নাম্নী নারীর কাছে এই ধরণের কাতরোক্তি কবি করলেও, আসলে যেন যৌনগাথা রচনা তাঁর উদ্দেশ্য ছিল না । যুগজ্বরে আক্রান্ত কবি যেন নিরাপত্তাহিনতায় ও আশ্রয় প্রার্থনায় আকূল হয়েছেন । যেমন, ষাটের আরেক কবি, ভাস্কর চক্রবর্তী নিরাশ্রয় মানসিকতায় বলেছিলেন, "শীতকাল কবে আসবে সুপর্ণা, আমি তিনমাস ঘুমিয়ে থাকব" । মলয় এই পলায়নী মনোভাবের বদলে অনুভব করেছেন, "নারী ও শিল্পের মতো বিশ্বাসঘাতিনী কিছু নেই"। হতাশায় কবি বলেছেন, "কবিতার জন্য আত্মহত্যা ছাড়া স্বাভাবিকতা নেই" । আমাদের সৌভাগ্য, মলয় রায়চৌধুরী কবিতার জন্য আজও বেঁচে আছেন ; যুদ্ধ করে চলেছেন । তাঁর সংগ্রামের হাতিয়ার কবিতাই ।




Name:  Sanchari Bhattacharya          

IP Address : 012312.60.8912.247 (*)          Date:02 Jan 2019 -- 05:57 PM

Sanchari Bhattacharya ( Jadavpur University ) : No Hungry Generations Tread Thee Down
"No Hungry Generations Tread Thee Down": Exploring the Poetics of Alterity
--------------------------------------------------------------------------------------------------------------------

Abstract act: This essay discusses the Hungryalist Movement of the 1960swhich attempted to change the path of the early 20th century Bengali literature because it failed to represent the existential angst and pessimism of the youth of post-Partition Bengal. There is no doubt, of course, that the movement ushered in a violent surge of change that hit
right at the outdated mode of conceiving literature and art according to a city-centric, western educated, bourgeois sense of taste. But despite their constant revolution for almost five years, the extent of success of the Hungryalist movement still remains questionable. It is argued
here that although it set out to attack and disintegrate contemporary Bengali literature on the premise that it was unbearably imitative of the West, the movement itself seems to have been heavily inspired by certain revolutionary ideas conceptualized largely by the Occident.


Keywords: Hungryalist movement, Hungryalism, Bengal,
postcolonial, anti-canonical, socio-literary revolution.


The Hungryalist Movement hit the complacent surface
of mid 20th century mainstream Bengali literature in 1961 and the storm that would rage through the next four years in Bengal would alter the course of history of Bengali literature forever.
Chronologically speaking, the Hungryalist movement
continued from 1961 to 1965. The movement was Malay
Roychoudhury’s brainchild whereas his elder brother Samir
Roychoudhury, renowned poet Shakti Chattopadhyay and Debi Ray alias Haradhan Dhara led it on. Soon the movement gathered many other members from different sections of the society, e.g.,Utpal Kumar Basu, Binoy Majumdar, Sandipan Chattopadhyay, Basudeb Dasgupta, Falguni Roy, Subhas Ghosh, Saileshwar Ghosh, Tridib Mitra, Alo Mitra, Arunesh Ghosh, Ramananda Chattopadhyay, Anil Karanjai, Karunanidhan Mukhopadhyay, Subo Acharya etc. The goal of the Hunrgyalists was to offer a complete artistic alterity so as to devastate the readers’ normative taste that had been shaped by colonial canons. Their deviant
poetry in terms of both form and content also influenced Hindi, Marathi, Assamese, Telegu and Urdu literatures. But the Establishment accused the movement of promoting perversion and obscenity in society and issued arrest warrants against Samir Roychoudhury, Malay Roychoudhury, Debi Ray, Subhash Ghosh, Saileshwar Ghosh, Pradip Choudhury, Utpal Kumar Basu, Ramananda Chattopadhyay, Basudeb Dasgupta, Subo Acharya and Subimal Basak. Although all of them were finally released, the movement slowly died down. There have been occasional claims about the revival of the movement by many writers of the post 70s period as also by practioners of other later streams of literature that resembled the Hungyalist genre in a
few ways. In fact, Malay Roychoudhuri, who was the founder
and life spirit of the movement, mentions that he is often
requested by youngsters to help them re-launch the Hungryalist movement afresh. But he steadily rejects any such proposal. “I tell them to understand their own space and time”, he says, “and thereafter, devise their own platform to express themselves” (Roychoudhury, “A Sour Time of Putrefaction” Web. np).
So, what was this alterity that the Hungryalists tried to
forge through their movement? Alterity can briefly be defined
as the state of being different, as a state of otherness as opposed to the self. The concept can be traced back to Descartes and his formulation of the relationship between the self and the other (Newman).But rather than engaging in the philosophical notion of alterity, I have here used the term to refer to the cultural difference that the movement symbolized from the mimetic tendencies of post-colonial socio-literary scenario of Bengal.
In my paper, I have provided an elaborate idea about how
the Hungryalists launched the movement as an attack on the
status quo of the literary scenario during the 1960s, only to
propose that despite being a revolutionary period in the history of Bengali literature that shocked the typical 19th century poetic sensibility of the Calcutta-based intelligentsia, the success of the Hungryalist movement seems questionable as the organized counter discourse developed by the Hungryalists are often found to rely on those very points of references that they set out to destroy and discard. I have divided my paper into four sections in order to discuss separately certain important aspects of the Movement. In the first section I have given a general overview of the movement by locating it in its social, cultural and political context. In the second part, I have talked about the fundamental
characteristics of Hungryalist literature, its principles and beliefs, and how the movement promised an alternate form of poetics that shook the roots of the orthodox and sanitized tradition of postcolonial Bengali literature. I have taken examples of certain poems and prose pieces written by the Hungryalists to elaborate their theories through instances of their works and demonstrate their stark difference from the elitist, bourgeois literature. In the last section, I have attempted to examine the extent of success
that the movement could achieve in freeing Bengali literature
from the shackles of western notions of politics and aesthetics.


1
Bengali art and literature has always been deeply influenced
by the different aesthetic movements of the West. Despite the presence of certain minor trends in parallel literature, the modern Bengali artistic and literary arena had been fed on Western colonial thought. Even little magazines like Kallol (1932) and Krittibas (1953) that appeared with promises of rebellion and change had failed to break completely away from the Bengali literary canons which were modeled largely on Western philosophical notions. They clearly depended on the colonial aesthetic reality for their creations. The Hungryalists started a movement against this boot-licking tendency of postcolonial Bengali art and literature by denying the basic premises of Western aesthetic theories in their works. According to Malay Roychoudhury, the name ‘hungry’ was taken from Chaucer’s phrase “In Sowre Hungry Tyme” (Ray 64). The philosophical basis for the movement was founded on Oswald Spengler’s idea of history not as a linear progression but rather, as a flourishing of self-contained individual cultures (1991). The Hungryalist movement was thus, the offspring of its sour and hungry time.
The two Five Year Plans of 1951 and 1956 proved to be
unsatisfactory for the progress of the newly independent nation. The dream of a free, ideal state which had kept the nation going in the pre-Independence era remained unfulfilled. Partition led to an unprecedented cultural bankruptcy in Bengal giving rise to stagnancy in creative endeavors. It is at this juncture that the Hungryalist movement first broke out in the form of an alterity
in poetics and thought and posed a serious threat to the discursive practices of the mainstream elite culture of Bengal through the assertion of a counter discourse. The movement was first launched in November 1961 from the Patna residence of Malay and Samir Roychoudhury. The first bulletin however, was published in English since Bengali typefaces were hard to find in the Hindi speaking township of Patna and the only printer with the required typefaces refused to publish it. This first bulletin
Goes:


Poetry is no more a civilizing maneuver, a replanting
of the bamboozled gardens; it is a holocaust, a violent
and somnambulistic jazzing of the hymning five, a
sowing of the tempestual Hunger. […]Naturally, we
have discarded the blanket-blank school of modern
poetry, the darling of the press, where poetry does
not resurrect itself in an orgasmic flow, but words
come out bubbling in an artificial muddle. […]
Saturated with self-consciousness, poems have begun
to appear from the tomb of logic or the bier of unsexed
Rhetoric.


Debi Ray, who was in charge of strategically distributing
the pamphlets, had arranged to disperse the bulletin at intellectual joints, offices of periodicals and college campuses within one single day. Such a movement being unprecedented in the history of Bengal, it had taken Calcutta by storm. It had struck each layer of the Establishment as it had aspired to and disturbed profoundly, the age old canons with its practice of systematic counter-canonization. The bulletin was reprinted with slight revisions in 1962 and then again in November 1963 under the heading “The Hungryalist Manifesto on Poetry”. By then, the movement had gathered quite a few members whose names were printed on the flipside of the reprinted pamphlet. Meanwhile many other bulletins and manifestoes were constantly being
issued and distributed freely by the Hungryalists which caused the number of members to cross forty, by January 1964. Samir had introduced his friends Sandipan Chattopadhyay, Utpalkumar Basu and Binoy Majumdar; Malay had brought in his friends Subimal Basak, Sambhu Rakshit, Tapan Das, Anil Karanjai and Karunanidhan Mukhopadhyay; Subimal Basak had brought in his friends Tridib Mitra, AloMitra and Falguni Ray; Shakti had brought in Arupratan Basu, Pradip Choudhuri and Basudeb Dasgupta; Debi Ray had brought in Subo Acharya, Subhas Ghosh, Satindra Bhowmik, Haranath Ghose, Nihar Guha, Saileswar Ghosh, Amritatanay Gupta, Ramananda Chattopadhyay, Sunil Mitra, Shankar Sen, Bhanu Chattopadhyay, Ashok Chattopadhyay, Jogesh Panda and Manohar Das. The painters Anil and Karuna, brought in painters like Subir Chatterjee, Bibhuti Chakrabarty, Arun Datta and
Bibhas Das into the fold of the movement. Before long, the
Hungry Generation had become a socio-cultural force to deal
with. Many contemporary critics were of the idea that
Hungryalism was deeply influenced by Dadaism.
The theoretical basis for the movement was borrowed
from Oswald Spengler’s The Decline of the West, a two volume work that had influenced Malay greatly in his youth. According to Spengler, the history of a culture does not move in a linear progression but develops into a number of cultural preferences,each with its own typical spiritual tendency, or idea of space within which they operate (Spengler 4). This whole theory was revolutionary since it broke away completely from the traditional Hegelian concept of history being a process governed by reason. Spengler uses the metaphor of biology. He says that this is an organic process and so it’s impossible to predict towards which direction it would grow (Mitra Web). The cultures go through a
process of growing, reaching a climax and then withering away. A culture is self-creative during ascendency, but once its creativity is exhausted, it starts absorbing random elements from without.Its demand for these external elements becomes insatiable during descent. It is this unquenchable thirst for ingredients outside self that was termed Hunger by Malay when he first launched the
movement. The Hungryalists felt that after Partition, Bengal
had reached that moment of rot and it was impossible to go back to the idealized position of the 19th century. That is why they devised the Hungryalist movement as a counter-culture
movement and deliberately created their literature in a counter discourse. All the artistic and literary movements of the West had been arranged according to the functioning of a linear history. Groups like Parichay (1931), Kallol (1932), Krittibas (1953) and Notun Reeti (1958) which were founded with the promise of making a difference with their new literary experimentations also started replicating the colonial aesthetic reality and linear progression of narrative history in their works. Their writings were heavily dependent on logical progression of thoughts and the idea of self as one, whole and unified. Parichay and Kallol were formulated on the basis of Calcutta-centric, middle class values that identified themselves with occidental canons and discourses. Krittibas and Notun Reeti developed a method of counter-identification by remaining within the discursive control of the above ideas only with the incorporation of certain elements from the Soviet discourse in case of some writers. The Hungryalists aspired to go beyond this structure of conflicts and completely negated that discourse through de-identification.
They also opposed aesthetic realism. In a poem, Shambhu Rakshit Writes:


These coconut-leaf combs, even they threaten me as
soon as I turn my back.
Nothing, just a minute, nothing do I know about
parliaments or rumors or.
The shrieks of wild dogs surround me— and of course
I should be informed, of course I
Should be allowed to sink, allowed to go where I don’t
want to, allowed to pace up and down.
(My own translation of Ami Swechhachari by
Shambhu Rakshit, Lines 1–4) (Hungry Bulletin O
Patrika Theke (1961 - 1965)


Instead of following a normative, logical sequence which
is used to express realism, this movement sought to introduce chaos and disintegration in the very structure of a poem rendering it conventionally meaningless. To sum it up in the words of Professor Howard McCord, the Hungryalists composed “Poetry of Chaos and Death” (in Mitra Web).
The Hungryalists generally brought out their bulletins in
one page pamphlets. The ones that were published by Malay
from Patna were in English due to the lack of Bengali typeface there. The address given on the pamphlets was generally of Haradhon Dhara, who was the editor, and whose slum residence in Howrah was used by the Hungryalists for correspondence. This decision was perhaps intentional since Dhara belonged to a subaltern caste and so his image aided in flouting the conservative sensibility that denied the subaltern any position in the space of its aestheticism. The Hungryalists published their precise, solidified commentary on various issues ranging from poetry, short story, drama to religion, politics, obscenity and even life and distributed them all across Calcutta— in the College Street Coffee House, many magazine and newspaper offices, in colleges,
especially in the Bengali departments and libraries etc. Because a large body of writing was printed on handbills and leaflets, the Hungryalists were unable to preserve and archive much of their work which leads to some difficulty in carrying on extensive and detailed research on the movement. But it no doubt fulfilled their immediate objective— that of being noticed by both common people and those in power. It is not difficult to guess that their innovative use of different media generated far greater attention towards the movement than it would have done had the media been conventional and expected.
In between 1963 to 1965, the Hungryalists had also started
publishing a few magazines, e.g., Protidwondwi edited by Subimal Basak, Unmargo edited by Tridib Mitra, Jebra edited by Malay Roychoudhury, Chinho edited by Debi Ray, Phoo edited by Pradip Choudhury, Eshona edited by Satindra Bhowmick and the only English language magazine of the movement, The Waste Paper, edited by Alo Mitra.


Except for Debi Ray, Tridib and Alo Mitra, who were
stationed at Howrah, across Calcutta, most of the participants came from outside the city. They belonged to the fringe. Subimal, like Malay, came from Patna; Samir was Chaibasa-based; the Ghosh brothers, Subhas and Saileswar, were from Balurghat; Shakti was from Jaynagar-Majilpur; all the painters were from Benaras; Pradip Choudhuri, originally from Tripura, was based at Shantiniketan; Subo Acharya was based at Bishnupur and Ramananda Chattopadhyay at Bankura. The Hungryalist movement thus developed spatial qualities instead of timecentric features of earlier post-Tagore literary generations.
Professor Howard McCord clearly states that although the
serious, introspective Indian poetry before the Hungryalist
movement had a certain merit, they seemed to lack any sense of space. “These are sincere and harmless poems, and aside from a little local colour, could have been written in Leeds or Philadelphia. The denatured cosmopolitanism that infects the poetry of the West prevails in India as well, and few of the poems carry any sense of place, or the sound of a man speaking, or the rasping smell of cow-dung fires”, he writes (in Mitra Web). On the other hand, in the guise of being spatially neutral, a large body of post-Tagore poetry remained too regional, focusing only on a privileged social group and their discourse. It was predominantly Kolkata-centric, epitomizing certain urban middle class values and considering them to be universally ‘perfect’, a proposition that directly reflects Matthew Arnold’s ideas about poetry in The Study of Poetry (Arnold 184). But defying this inheritance of Victorian conservatism, Hungryalism emerged as a post-colonial counter-discourse. In the first bulletin itself the movement gave a battle cry against modern poetry, as
well as against the tyranny of logic. Till then the concept of
syntactical and logical progression of the text was considered the ultimate poetics in literary canons. Following the narrative
conventions of post-Enlightenment English literature that went on till the turn of the 19th century, the poets and writers of early 20th century Bengal were chiefly following a chronological and syntactical order in their writings. The reason for such linear progression of narratives was to produce proper meaning for the urban elite readers whose literary and cultural sensibility were deeply influenced by the three hundred years of colonial rule in India. That is why, when the Hungryalists moved out of this convention of representation, their works were considered vulgar
and obscene by the erudite middle class population who had
already hierarchized literature according to their notions of
literary taste.


But at the peak of the movement, Binoy Majumdar
developed schizoid problems. Shakti was harried by literary
guardians to leave the group and issue anti-Hungryalist
proclamations. Sandipan Chattopadhyay was enticed by a mass circulation magazine with a promise to bring out his novel provided he quit the movement. Sunil Gangopadhyay, in his editorial in Krittibas, castigated the movement:
We don’t know whether the Hungry Generation
movement is good or bad. We have nothing to
comment about its future. However, none of the
leaflets circulated by them had shown any remarkable
literary merit— ordinary writings aspiring to be
different. Funnily enough, some are even juvenile.
Other than that, the non-literary associations that
the movement seems to have developed are indeed
disgusting. We really couldn’t imagine that a few
youths would attempt to create literature in Pidgin
English even after 1960. But if the movement can
give rise to a different kind of literature, we’ll definitely
welcome it. (“Hungry Bulletin O Patrika Theke”
[1961 – 1965]. Translation mine)


As a result several fence-sitters were trapped in an
intellectual bind. These writers in the end committed themselves to prolific commercial writing. By the middle of 1964 only Utpal, Samir, Malay, Debi, Subimal, Subhas, Saileshwar, Pradip, Karuna,Anil, Tridib, Alo, Falguni, Subo and Ramananda remained in the movement. The departure of fence-sitters proved to be a positive feature. The process accelerated the disintegration of aesthetic realism, leading to gradual dissolution of distinction between the elite and subaltern cultures. Hungryalist texts developed subversive and multiple semiotic and semantic characteristics. The mono-centric, unified truth as demanded by the then presiding academicians were persistently attacked by
the participants. In their writings, prose writers such as Samir,
Falguni, Subhas and Subimal, as well as in Malay (in his dramas), developed a kind of textual reality that was not oblivious to the problematics of heteroglossia (Vice 18).They accommodated not only different languages but also different dialects within the same language irrespective of how localized that dialect was. They were aware of the hierarchical relationship between different
languages and even different forms of the same language. They used this awareness of heteroglossia to highlight their own minority status which defied contemporary literary poetics in favor of transgressive styles. Subimal Basak’s novel Chhata Matha is a good example of this transgression. It is written in its entirety in the language of East Bengali tongawalas which makes it a difficult read. However, being in a distinct East Bengali dialect, the novel could be understood easily by the illiterate common East Bengalis when read out loud.


Hungryalists like Malay Roychoudhury, Subimal Basak
and Debi Ray became well known through their radically anti-
Establishment policies. They used different, innovative media
to spread their manifestos and bulletins. “It had been a revolution from the very beginning. I had constantly sponsored the production of bulletins, masks, posters, poems in wedding cards, literary meets in red light areas, tribal women in Chowrangi, etc.”(My own translation) (Ray 64), said Malay Roychoudhury in an interview taken by Arunesh Ghosh during the 1980s. They would deliver paper masks of animals, monsters and gods to ministers, critics, publishers and other powerful people with the slogan ‘please remove your mask’. They would critique poets on wedding cards and make obscene sketches on papers and posters and distribute them for free. They would send shoeboxes for
book review or blank paper in the name of short stories to wellknown commercial newspaper offices. They violently attacked the administration and media. They would often go to Benaras or Kathmandu and engage in sexual anarchy and drug abuse along with hippies. They would exhibit Hungryalist paintings and at the end of the exhibition, set fire to all of them. It was their firm belief that it was only through such brutality that the colonial hangover which the decadent Bengali culture had absorbed, could be shaken out of the Bengali socio-literary arena. Naturally, these meetings, exhibitions and promotion of such literature among
the masses led to a socio-literary unrest which alarmed the
government. Finally, the administration intervened. On 2nd
September 1964, an arrest warrant was issued against eleven Hungryalists namely Samir Roychoudhury, Malay
Roychoudhury, Debi Ray, Subhash Ghosh, Saileshwar Ghosh, Pradip Choudhury, Utpal Kumar Basu, Ramananda
Chattopadhyay, Basudeb Dasgupta, Subo Acharya and Subimal Basak under IPC sections 120b and 292. Articles were seized from Samir and Malay’s ancestral home in Patna on 4th September. Consequently, a charge sheet against Malay was submitted at the Bankshal court by Calcutta Police on 3rd May 1965.


The charge sheet goes:
In August 1964 a printed booklet entitled Hungry
Generation published by Samir Roychoudhury was
found in circulation at Kolkata. The poetry captioned
Prachanda Boidyutik Chhutar(Stark Electric Jesus)
by Malay Roychoudhury was found obscene and the
Director of Public Prosecution, West Bengal being
consulted, observed that the book was actionable
under Section 292 of Indian Penal Code, and
suggested prosecution of Malay Roychoudhury, who
is on criminal bail till today the 3rd May 1965, may
be prosecuted against under Section 292 IPC. (Hungry
Generation)


Many of the fellow Hungryalists were coerced and
persuaded by the police to bear witness against Malay. Shakti Chattapadhyay, one of the founding members of the movement himself spoke against the movement. Saileshwar Ghose and Shubhas Ghose also bore witness against Malay. But Malay appealed to the higher court and eventually was acquitted of all charges by July 1967. However, this court case against the Hungryalists had a tremendous impact on their individual lives. Utpal Kumar Basu was fired from his job of a professor; Pradip Choudhury was rusticated from Bishwabharati. Samir Roychoudhury was suspended from his government office; Debi Ray and Subimal Basak were transferred outside Calcutta. Subo Achrya and Ramananda Chattapadhyay became fugitives. Article 120b being that of conspiracy, the Calcutta detective department had issued dossiers for each and every Hungryalist member.
During the arrests, the police mercilessly rummaged through each of their houses and the books, manuscripts, files, diaries and even letters that they had confiscated during that period were never given back to them.


2
Who would you acknowledge as the first poet? Some
think that it was that Cro-Magnon who plucked a
flower for his Eve twenty five thousand years ago. But
for me, the first poet was that Zinjanthropus who
lifted a stone millions of years ago and made it into a
weapon. (My own translation) (Ray 41)
This very comment of Malay makes it evident how the
Hungryalist movement revolutionized the ways in which poetry was to be composed in postcolonial Bengal. The Hungryalists evolved a new ethos of diction breaking down the stagnancy and depravity of the sophisticated, artificial poetry that was constantly highlighted by the intelligentsia of the 40s, 50s and 60s in Calcutta. In one of his Hungry bulletins, Malay Roychoudhury clearly announces that poetry has to erupt in an orgasmic flow; hence it is essential to unlearn the education imposed by the institutionalized units of administration, religion, politics and society. Vision, which is fundamental to creativity, can come only to the raw, uneducated soul. Logic and rationality must be done away with, completely. It should be freed from the fetters of artistic hierarchies, from the manacles of neatly assigned
watertight meters. While discussing the condition of
contemporary Bengali literature Malay says:
"those idealized and universalized noble passions,
knowledge and expertise in art, all those academic
hotchpotch, the artificialities dressed as
subjectivism— if these are not gotten rid of, no poetry
is possible…”(Roychoudhury, Ishtahar Sankalan 47.
Translation mine).
He bitterly condemns western aesthetic movements like
“art of art’s sake”, art for technique’s sake, art for form’s sake, art for symbol’s sake etc. and the imitators of such movements in the Bengali bourgeois scholastic circle. Vision can be attained only through the mediation of the ‘native idiom’ and it is this native idiom that serves as the language of real poetry, the language of resistance. In the Hungryalist Manifesto, the objectives of the Movement have been clearly stated:
1. To never emulate the reality of Aristotle, but to
take the un-enameled whoring reality by shock under
the genital of Art.
2. To let speechlessness burst into communication
without breaking the silence.
3. To let free a creative ruckus, in order to unknot the
knotted world and start afresh from chaos.
4. To exploit every matrix of senses except that of a
writer.
5. To disclose the belief that world and existence are
justified only as an aesthetic phenomenon.
142 Margins: A Journal of Literature and Culture
6. To accept all doubts and despairs rather than to be
content to live with the sense made by others.
7. To lash out against the values of the bi-legged careermaking animals.
8. To abjure all meretricious blandishments for the
sake of absolute sincerity.
9. To stop writing and painting beyond the point of
Self-realization.


The Hungryalists, as mentioned before, had completely
broken away from any kind of form, meter, style, mannerism,
punctuation, line, pattern, symbol, genre, metaphor and logical arrangement of words. They believed that the only justification for writing is bursting out in passion. They were deeply inspired by Antonin Artaud’s views. “People who leave the obscure and try to define whatever it is that goes on in their heads, are pigs....
Those for whom certain words have meaning, and certain
manners of being; those who are so fussy; those for whom
emotions are classifiable, and who quibble over some degree or other of their hilarious classifications; those who still believe in ‘terms’, those who brandish whatever ideologies belong to the hierarchy of the times, who talk of contemporary currents of thought; those who still believe in some orientation of the spirit, those who follow paths, who drop names, who fill books with screaming headlines ...are the worst kind of pigs” (Artaud 38).
This principle of uncontrollable energy, welling out of the self
without any pre-determined shape, form or purpose can be amply found in Hungryalist poetry:


Oh I’ll die I’ll die I’ll die
My skin is in blazing furore
I do not know what I’ll do where I’ll go oh I am sick
[…]
Oh Malay
Calcutta seems to be a procession of wet and slippery
organs today
Margins: A Journal of Literature and Culture 143
But I do not know what I’ll do now with my own self
My power of recollection is withering away
Let me ascend alone toward death
I haven’t had to learn copulation and dying
[…]
Aaaaaaaaaaaaaaaaaaaah
I do not know whether I am going to die
Squandering was roaring within heart’s exhaustive
impatience
I’ll disrupt and destroy
I’ll split all into pieces for the sake of Art
There isn’t any other way out for poetry except
suicide… (Roychoudhury “Stark Electric Jesus”, Lines
1-62)


This poem ‘Prochondo Boidyutik Chhutar’, translated as
‘Stark Electric Jesus’ composed by Malay, was a ground-breaking one of its time. It elaborated unmistakably that the Hungryalists aimed not at changing or appropriating form, but at completely destructing any formal elements that have been thrust upon indigenous literature indiscriminately following the practice of occidental literary canons. In the original Bengali texts, the alteration of the spellings of certain words according to their pronunciations was a blasphemously revolutionary poetic innovation that sought to redefine the rules of quintessential Bengali grammar. The primary job of a poet is to declare war against art. The reader should first be alienated and made hostile, and then, through that same aggressive rhetoric and attitude, be provoked and scandalized. Poetry, in actuality is the embodiment
of violent and destructive creativity. According to Dr. Indrajit
Bhattacharjee, (Professor of English, Osmania University) the movement had reached a crescendo when it was on the brink of withdrawing itself completely from the western canon and discourse (Hungry Generation Blog). The stark difference of this revolutionary movement from the contemporary mainstream aesthetics was neatly categorized by Subimal Basak and Rajkamal Choudhary in their trilingual (Bengali-Hindi English) bulletin in 1963.


Prevailing Canons
1. Establishment 2. Tyranny 3. Insiders 4. Elite high-brow culture
5. Satisfied 6. C ohesive 7. Showy 8. Sex as known 9. Socialite
10. Lovers 11. Ecstasy 12. Unmoved 13. Hatred as camouflage
14. Art films 15. Art 16. Sugam Sangeet (Tagore songs) 17.
Dream 18. Tutored language 19. Redeemed 20. Framed 21.
Conformist 22. Indifferent 23. Mainstream 24. Curiosity 25.
Endocrine 26. Conclusions inevitable 27. Ceremony 28. Throne
29. Entertainer 30. Self-projecting 31. How am I 32.
Symmetrical 33. Accountants of prosody 34. Revising poems
35. Fantasy’s game.


Hungryalist Canons
1. Anti-Establishment 2. Protester 3. Outsiders 4. Commoners’
culture 5. Unsatisfied 6. Brittle 7. Raw-bone 8. Sex as unknown
9. Sociable 10. Mourners 11. Agony 12. Turbulent 13. Real hatred
14. All films 15. Life 16. Any song 17. Nightmare 18. Gut
language 19. Unredeemed 20. Contestatory 21. Dissident 22.
Struck ethically 23. Watershed 24. Anxiousness 25. Adrenalin
26. No end to unfolding 27. Celebration 28. Abdication 29.
Thought provoking 30. Self-effacing 31. How are you 32.
Tattered and decanonized 33. Extravagance 34. Continuation
revision of life 35. Imagination’s flight (Hungry Generation).


Apart from their avant-garde theories on poetry, the
Hungryalists also issued manifestos discussing politics and
religion which alarmed the administration of Bengal and made them realize that Hungryalism had already become a cult in itself. In their ‘political manifesto’, the Hungryalists promoted that it is important to depoliticize the soul of every individual, in order to make him realize that existence is pre-political. They declared that all intellectual fakeries called political hypothesis are basically the sources of lethal and seductive lies exploding out of monstrous irresponsibility. In their religious manifesto, they propagated that god is garbage and that religion is nothing but murder, rape, suicide, drug-abuse, poison, perversion, addiction, insomnia and constant transformation.
The Hungryalist Movement redefined the meaning of
obscenity in contemporary Bengali literature. For the first time, it introduced the idea that there is nothing called obscenity. The Hungryalists felt that obscenity is an artificial construct; it is created, invented, made-up by a group of uneducated class conscious conspirators. These opportunistic conspirators have divided the vocabulary along class divisions. To the elite, the language of the subaltern is coarse, crude, obscene and his own language, an art. The Hungryalists deliberately attacked this double standard by subverting the very diction in which Bengali poetry was written during the 40s, 50s and 60s. The poem
‘Habijabi’, by Subimal Basak would have been a brilliant example to cite here, a poem which brings to life the colloquial Bengali of Dhaka, posing a direct challenge to the so called puritan guardians of mainstream Bengali literature. But unfortunately, the essence of the poem lies in its accent and delivery of words, so it loses its most important meaning in translation.
The movement further launched the idea that sexuality is
not obscene. In fact, sex is the only phenomenon which is beyond the pettiness of culture, tradition, religion, race, wealth, rituals, conventions and law. Sexuality is probably the only medium through which the unconscious can be realized and examined.


Within my clasp, your absolute, exploding fetus
Bursts again. I’m my own root, I’m food for the soil,
earth
Salty water, I’m grass and I smoke myself, look, my
green body, my maroon limbs
Maroon eyes, maroon abdomen and pale genital
146 Margins: A Journal of Literature and Culture
Hurling abuses of love among the yellow waves of
blood
The scent of fresh gunpowder numbs my body and
perhaps life… (Siddhartha by Pradip Choudhury in
“Hungry Bulletin O Patrika Theke” [1961 – 1965]
Translation mine)


The Hungryalists vehemently protested against the
hypocrisy of the established literary culture which censored
sexual content and language when used as an expression of
unprocessed creativity and yet, itself indulged in sexuality for
achieving certain commercial, capitalistic ends. It was them, who first exposed how the establishment promotes a society where sexuality can be used as a commodity but not as a weapon.


3
It is unnecessary to mention the huge legacy of alterity
that the Hungryalist Movement has left to the history of
postcolonial Bengali literature. The movement had shaken away the yoke of dominance imposed upon Bengali literature by the stalwarts of established literary canons; stalwarts, who replicated Western philosophical thought in their writings and criticism even many years after India had attained independence. It brought in a breath of fresh air through the brutally different ideas that were born out of it. Hungryalist literature, even in its initial stage,seemed to have been self conscious of its minority status and deliberately sought to locate itself as the ‘other’ which would question the very power structures associated with the ideas of majority and minority. Before 1961, most Bengali magazines
had Sanskritized names which were probably supposed to mark their superiority over cheap Bengali literature, e.g., Kobita, Purbasha, Arani, Krittibas, Uttorsuri, Dhrupodi, Kranti, etc. After the movement such classical names were replaced by radical ones like Kaurab, Abar Esechhi Phire, Manusher Bachchha, Dhoper Kagoj, etc. Subaltern literature, a field so long intentionally left out of the scope of magazines like Kobita, Krittibas, Dhrupodi and others, found its voice for the first time in Hungryalist literature. The subaltern discourse was given as much importance as the dominant discourse or perhaps more. This further hastened the use of mixed diction in modern Bengali poetry. Poets started employing sexual metaphors and slangs of every kind to create striking and hard-hitting images in their works. The openness in rhythm, punctuation and order gave a new freedom to Bengali literature post 1965. Poems of Falguni Ray, Malay Roychoudhury, Saileshwar Ghose and Tridib Mitra
are points of reference in poetry and the pieces by Subimal Basak and Malay Roychoudhury in prose. Expressions such as ‘uh’,‘ahh’, ‘aaaaaaaaaaah’, ‘oh’, ‘phooh’ etc. that were so long forbidden to be a part of the sophisticated postcolonial Bengali rhetoric,now began to be accommodated. Absence of a logical sequenceboth in terms of sentence structure and meaning was first usedby the Hungryalists, a process that became vital to the literatureof the 70s. As is evident from the lines of Roychoudhury’s “Stark Electric Jesus”, the Hungryalists also introduced the playful use of unstable imagery which collapsed into one another even before
being fully formed. The Naxalite movement that ravaged Bengal towards the 1960s seems to be somewhat influenced by the subversion, the destructiveness and the urge to restart after complete collapse that the Hungryalist movement embodied.The revolutionary ideologies developed by the
Hungryalists were however, not limited only to Bengal. It created a stir all over the world. Not only the English version of Time magazine, but the Spanish version too, wrote about the movement. Many international magazines and periodicals like City Lights Journal, Kulchur, Klactoveedsedsteen, Salted Feathers etc. printed, reprinted and brought out special issues on the Movement.


In his letter to Malay Roychoudhury, American writer
Howard McCord requests Malay to send him a copy of “Stark
Electric Jesus” which he wished to publish in Contemporary
Indian Poetry (Ghosh Dastidar np). The poem was first written in Bengali and translated by Malay himself. The poem was published in City Lights Journal with an introduction on the movement written by Prof McCord, and the same matter was republished in the Hungryalist commemorative issue of Salted Feathers edited by Dick Bakken. Salted Feathers featured most of the participants of the movement.


As for the other Indian languages, in Hindi, Sharad Deora
wrote a novel titled College Street Ka Naya Maseeha based on the life and works of Hungryalists; Phanishwarnath Renu wrote Ram Pathak Ki Diary Se; Dharmaveer Bharati and S.H.
Vatsayana Ajneya wrote quite frequently about them in the
periodicals they edited, i.e., Dharmayug and Dinaman; Ashok
Shahane, Dilip Chitre and Arun Kolatkar hailed them in Marathi; Umashankar Joshi introduced them in Gujarat; Ameeq Hanfee translated and introduced them to Urdu readers. The Bengali intelligentsia had not bargained for this national and international exposure and publicity. Reputed academicians of the time, such as, Sukumar Sen, Asitkumar Bandyopadhyay, Haraprasad Mitra, Bhabatosh Datta, Ujjwalkumar Majumdar, Kshetra Gupta, Saroj Bandyopadhyay, Sashubhushan Dasgupta, Sukumar Bhattacharya, Debiprasad Bhattacharya, Bhudeb
Choudhury, Tarapada Mukhopadhyay, Chinmohan Sehanobis
and others preferred to ignore the turbulence created by the
movement. Some academicians even persuaded academicians of other Indian languages to ignore the Hungryalist impact (Hungry Generation). Nevertheless, intellectuals from other countries, such as Gary Snyder, Octavio Paz and Ernesto Cardenal sought out the Hungryalists when they visited India.


4
One question must be asked in order to properly evaluate
the Hungryalist Movement through a post colonial lens. Could the Hungryalists succeed completely in evolving a counter discourse against the colonial aesthetics practiced by the established literary culture? Perhaps not entirely. The name of the movement itself was a lift from the great medieval poet of England, Geoffrey Chaucer. The theoretical foundation on which the whole body of the movement stands is borrowed from Oswald Spengler, himself a German historian and philosopher who wrote his theories on the decline of the ‘west’. It is his theory that Malay and Shakti had imposed upon the postcolonial Indian reality. The justification of such an assumption of similarity is
indeed questionable. In his letter to Malay on 22nd May 1965,
Howard McCord writes:


I have enjoyed very much reading your letter and
coming in contact with your thoughts. Artaud, Genet,
Burroughs: yes. They are the dialecticians of chaos
presiding at the dissolution of the west. They
describe, with joy and exactitude, the destruction in
which they are themselves involved. Burroughs, to
me, is a man performing an autopsy on himself. They
are all quite mad, and therefore speak the truth. We
can only trust the mad anymore. The West began to
die around 1750, and it has been the function of poets
to recite, in series, the long funeral oration. William
Blake began it. Goethe, Baudelaire, Lautremont,
Rimbaud, Huysmans (unknowingly), Pound, Eliot,
Crane, and all the other familiar names have
continued the chant. We are their heirs, and perhaps
the culmination, for our anguish and despair, the
aesthetic suicide of which we are capable, may mark
the end. Perhaps it will go on. (in Ghosh Dastidar)
Although we don’t have access to Malay’s letter to McCord,
it is evident from this letter that Malay had indeed discussed the influence of these significant theoreticians with McCord. Both Antoine Artuad and Jean Genet are controversial thinkers of 20th century France, a typically colonial power and William S. Burroughs, a primary figure of the Beatnik movement that has always been notoriously aligned with the Hungryalist movement. Moreover, Hungryalists have repeatedly expressed their admiration for the 19th century Bengal renaissance literary personages like Michael Madhusudan Dutt and Bankim Chandra Chattapadhyay. The 19th century enlightenment was perceived by them to be a state of idealized history which has been lost forever. This indeed seems murky waters since 19th century was
the age of western education and Cartesian philosophy of
thought— two issues that the principles of Hungryalism clearly appears to negate, unlearn and cruelly annihilate. What are we to make of such contradictions?
Poets like Pabitra Mukhopadhyay, Basudeb Dasgupta etc.
have seen overt Beatnik influence in Malay’s poems of the
Amimangshito and Jakham range poetry. I have already quoted McCord’s letter to Malay to demonstrate how indeed Malay seems to have discussed Burroughs in his correspondence with him. Some have even pointed towards the obvious similarity between Hungryalism and the Hippie culture of the west. When confronted with this charge, Malay had refuted it by saying that such a comment can only be the result of poor research. In an interview to Sayed Samidul Alam during the 1980s, he specifies the distinction between the Hungryalists and the hippies. He says that hippies were essentially a sect of upper-class dropouts; they represented a counter culture. But the Hungryalists, while also representing a counter culture, had always been lower class
people, subaltern to the elites, complete ‘outsiders’ to mainstream society. Their bohemianism, unlike the hippies, was not by choice, but by compulsion. Any charge of the Hungryalists imitating the hippies must be taken as the ploy of the bourgeois Bengali society to dishonor the movement. On one hand, Malay says, “I think of my ancestor, the lascivious Sabarna Choudhury, I must do something new, something different” (‘Prochondo Boidyutik Chhutar’) – which is a total castigation of his ancestor. But on the other hand, there is a sense of unease associated with his own
roots that he seems unable to justify to himself, an anxiety with respect to his present identity as the founding member of a subaltern movement.


A close reading of the Hungryalist poems often reveals
that after all, poetry does not actually well out of the self in an
orgasmic fervor. It is a careful construct, a cautiously developed pattern of words placed one against the other in order to shock the readers. Most of the Hungryalist poems, in fact, clearly bear marks of being a manufactured product designed to create a certain affect. Every single image seems a meticulous choice to be juxtaposed against another image. The Hungryalist objective of making every word speak for itself gives special attention to the vividness and audibility of words, and the poets, while they erect
the body of poetry with these words are quite conscious of thiswhole process of rigorous creation. Malay himself confesses, “An idea keeps revolving inside my head for a few days. I put it down on paper in a trance. And only after polishing it thoroughly does it become poetry” (Ray 13).


So Malay, (who, in the Hungryalist manifestos ridicules
poet and academician Buddhadeb Basu for his statement “any art is a construct and in that sense, artificial” (Roychoudhury, Ishtahar Sankalan) unwittingly confesses that he himself undergoes this same procedure of initial inspired passion and consequent thorough polishing and revision while composing, quite contrary to his propagated theory of making poetry the expression of bare, unmediated instincts.
The claim that Hungryalism is different from the Western
hippie culture since the former propagates a system of alternate ethos and the latter, a conscious conflict with the Establishment, hardly seems convincing. In many Hungryalist manifestos and bulletins, the members of the movement repeatedly use words like “counter-canonization”, “counter-discourse”, etc. In each of their writings, it becomes apparent that the whole cult of Hungryalism has been formulated as a reaction or counter-action to the prevailing, established aesthetics. It is undoubtedly a confrontation, an act of calculated flouting of ‘norm’. But in this act of ‘writing back’ the Hungryalists often seem to use those very points of reference (e.g., counter-discourse can be formulated only in reference to that of the ‘discourse’)that they had planned to undo at the very outset.


Conclusion
According to Pradip Choudhuri, a leading philosopher
and poet of the time whose work has been extensively translated in French, the counter-discourse of the Hungryalist Generation of Bengal was the first voice of post-colonial freedom of pen and brush (Datta Web). The majority of Bengalis having almost an instinctive inclination for Marxist ideology during the post independence era, Oswald Spengler’s prophecy of doom and disaster was the first salvo of controversy which made the Hungryalists unacceptable to leftist media and professors for almost two decades. It was because of the individual genius of such authors as novelist Subimal Basak and poet Malay Roychoudhury that the barriers were broken. Subsequent researchers such as Dr. Uttam Das of Calcutta University, Prof.Nandalal Sharma of Chittagong University and Prof Howard McCord of Washington State University, however, have
explained that the social commitment in the Hungryalist writers over the years alleviated the fear of political leftists (Mitra Web). It is the trace of nationalist feeling that has kept them in goodstead and cut through shallow political controversies.
Nevertheless, very often their nationalism itself has led to
controversy as the Hungryalists have been criticizing politicians of all kinds. In spite of trial and harassment, the Hungry Generation has continued to produce and publish poetry and prose. Sharp, caustic, dark, hallucinatory, nihilistic, offensive, obscene, angry, piercing— these characterize the terrifying and cleansing visions that the Hungryalists insist Indian literature must suffer. With a few exceptions, modern Indian literature is age old and tedious: pallid, otiose, and dull. It is timid and moralizing, and when it is not courteously realistic, it is idealistic and pointlessly and eternally philosophical (Mitra Web). But in the Hungry Generation, excluded from the academies and the
literary aristocracy, the sense of urgency and anguish can be seen, for they, more than any other group have realized that there is possibly no hope for most indigenous literatures of India; that what lies ahead is disorder and disintegration. And it is through their movement that they had announced a declaration of freedom, of independence from any culture that is normative by compulsion and unaccommodating and snobbish by choice. There are indeed certain portions still unanswerable with regard to the combination of their theories and practice. Hopefully the Hungryalist poets, especially Roychoudhury himself, being still alive, would be able to shed some light on the murky issues discussed within the course of this paper and without, in the near Future.


Works Cited
Amader Bangla Kobita. n.d. Blog. 22 January 2013. <http://
aamaaderbanglakabita.blogspot.in>.
Amimangsito. Kolkata: Zebra Publications, 1965.
Arnold, Matthew. “The Study of Poetry.” English Literature and
Irish Politics (Complete Prose Works of Matthew Arnold). Ed. R.
H. Super. Vol. 9. Ann Arbor: University of Michigan Press,
1973. 161-188.
Artaud, Antonin. Artaud Anthology. Ed. Jack Hirschman. Trans.
Jack Hirschman. Paris: City Lights Books, 1965.
Cocteau, Jean. Crucifixion (Translation). Kolkata: Kobita
Prakshik, 1996.
Das, Uttam. Hungry Shruti O Onyanyo Probondho. Kolkata:
Mahadiganta Prokashoni, 1995.
154 Margins: A Journal of Literature and Culture
Datta, Ketaki. “Life & Letters.” 15 January 2012. The Statesman.
Newspaper. 5 January 2013. <http://202.144.14.20/
index.php?option=com_content&view=article&show=article&id=
396937&catid=44&year=2012&month=1&day=15&Itemid=66>
Dutta, Jyotirmoy. “Bangriji Sahitye Khudhito Bongsho.” Desh
Sahitya Sankhya 1969.
Ezekiel, Nissim. Hungry Generation. Mumbai: Indian P.E.N.,
Marine Lines, 1987.
Ferlinghetti, Lawrence, ed. City Lights Journal. SF, USA: City
Lights, 1963.
Ghosh Dastidar, Gargi. Letters to Malay Roychoudhury. 6 June
2008. Blog. 21 August 2013. <http://
letterstomalay.blogspot.in>.
Ginsberg, Allen. Howl & Other Poems (Translation). Kolkata:
Kobita Prakshik, 1996.
—. Kaddish (Translation). Kolkata: Kabitirtha, 1995.
Haque, Ebadul, ed. Hungry Andoloner Ishtahar. Murshidabad:
Abar Esechhi Phire Prokashoni, 2008.
History of Hungryalism. n.d. Wiki. 22 December 2012. <http://
www.bharatwiki.com/index.php?title=Hungryalism>.
“Hungry Bulletin O Patrika Theke (1961 - 1965).” 27 January
2009. Hungry Andoloner Kobider Kobita. Blog. 2 February
2013. <http://hungrykobita.blogspot.in/2009/01/blogpost.
html>.
Hungry Generation. 20 September 2010. Blog. 19 November 2012.
<http://hungryalist.wordpress.com/2010/09/20/hungrygeneration/>.
Hungryalist Manifestoes (Collection of Manifestos). Kolkata:
Mahadiganta Prokashoni, 1986.
Hungryialist Photos. n.d. Blog. 23 January 2013. <http://
hungryderphoto.wordpress.com>.
Marxbaader Uttoradhikar. Kolkata: Shakti Prokashon, 1962.
Mitra, Tridib. “Hungry Generation.” 30 June 2008. Hungry
Generation. Blog. 3 January 2013. <http://
hungryalistgeneration.blogspot.in/2008/06/hungrygeneration.
html>.
Margins: A Journal of Literature and Culture 155
Nandi, Bishwajit, ed. Milon Hungry Andolon Sankhya. Meghalaya:Milon Prokashoni, 2007.
Newman, Lex. “Descartes’ Epistemology.” 10 July 2010. The
Stanford Encyclopedia of Philosophy. Web. 21 June 2014.
Poems of Hungryialist. n.d. Blog. 23 January 2013. <http://
poetmalay.blogspot.com>.
Postmodern Bangla Poetry 2003 : An Overview. Bansdroni, Kolkata:Haowa49 Publishers, 2003.
Postmodernism. Bansdroni, Kolkata: Haowa49 Publishers, 1995.
Ray, Ajit, ed. Hungry Sakkhatkarmala. Kolkata: Mahadiganta
Prokashoni, 1999.
Roychoudhury, Malay. A Sour Time of Putrefaction Nayanima Basu.
10 December 2011. Web Archive. 12 January 2013. <http://
www.business-standard.com/article/beyond-business/-a-sourtime-
of-putrefaction-111121000058_1.html>.
—. Ishtahar Sankalan. Kolkata: Mahadiganta Prokashoni, 1985.
—. Stark Electric Jesus. n.d. 21 August 2013. <http://redroom.com/
member/malay-roychoudhury/writing/stark-electric-jesustranslation-
of-bengali-poem-prachanda-boidyut>.
Selected Poems. Kolkata: Writers’ Workshop, 1989.
Sen, Prabir. Allen Ginsberg (Biographical Criticism). Kolkata:
Kabitirtha, 2000.
Shoytaner Mukh. Kolkata: Krittibash Prokashoni, 1963.
Spengler, Oswald. The Decline of the West. Ed. Charles Francis
Atkinson Helmut Werner. Trans. Charles Francis Atkinson.
New York: Oxford University Press, 1991. Google Book Search.
Web.
Tristan Tzara’s Poems. Jamshedpur: Kalimati, 1996.
Uttor Ouponibeshik Postmodernism. Medinipur: Bakpratima, 2001.
Vice, Sue. Introducing Bakhtin. Manchester: Manchester UniversityPress, 1997.
Weissner, Carl. Klactoveedsedsteen Hungryalist Issue. Germany,1966.
Zakham. Kolkata: Zebra Publications, 1966.
( Published in "Margins: A Journal of Literature and Culture" )



Name:  Debi Roy          

IP Address : 012312.60.8912.247 (*)          Date:02 Jan 2019 -- 06:03 PM


The Hungryalist under-caste: A Conversation with Debi Roy
Debayudh চ্যাটার্জী
----------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------
Debi Roy was born in 1938 as Haradhon Dhara
to an impoverished under-caste household residing
in a slum in Howrah. He had to discard his real name
to survive in a literary establishment dominated and
hegemonized by the upper-class elite. Roy was one of
the four founder members of the Hungryalist movement.
He was hailed to be the editor of the first manifesto
of the movement that came out from Patna in 1961.
His slum address was used for official correspondence
during the movement. Pitching an under-caste in the forefront
was conscious effort to lodge an attack on the Brahminical arena
of Bengali poetry. Roy passed his school final in 1958 and IA in 1960
before enrolling himself in a course on library science at
the University of Calcutta.
His first anthology Kolkata o Ami (Kolkata and I) came out in 1965.
He was arrested later on the ground of obscenity
along with other members of the Hungry generation.
While he was suspended from his government job,
the lower court soon acquitted him.
After 1965, as the movement fizzed out and splintered
into different groups, Roy continued writing as an individual
in his own merit. Till date, he has authored more than
ten titles in poetry, translated extensively from Hindi into Bengali,
and wrote three books of non-fictional prose.
----------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------
Debayudh: Let me begin by asking why
you changed your name to Debi Roy.
Debi Roy: There wasn’t any other way apart
from adopting that name. No way whatsoever.
There was so much of Brahminism around me,
so much of humiliation… When they cannot topple
over you in any other way, they seek resort in caste.
This is just a way of suppressing you. Some of my
own friends can be accused for that crime. Some very
close friends who used to frequent my slum once upon a time.
They came at an hour when my mother couldn’t eat…
But they were ones to humiliate me first. They still do it…
even now… though their powers have ceased to exist.
Debayudh: What I know about the movement is that
after four years of its inception, it got fragmented.
Some of the members denied their allegiance in the court,
some pioneers changed their stance, a lot of other nasty
things happened. You were one of those who actually
faced the music. You were arrested, heckled,
suspended from your job… Today, after more than
fifty years, on retrospect, would you relate that as
subtle form of caste oppression?
Debi Roy: I despise caste. I have no words
to condemn what happened to me. It’s just that
I have to remain silent. My wife passed away last June, on 24th…
I am not in the right state now. I am a self-made man.
I was born in a slum and now I live in an apartment
with an air-conditioner in each room.
I never imagined I could climb such heights.
Debayudh: Did you ever write directly on caste?
Debi Roy: Nirendranath Chakrabarty
once told me that I can skillfully enmesh my life in
my poetry. He once asked me why I don’t write an
autobiography. I mocked back, should I write a Jibansmriti?
Tagore wasn’t any less humiliated for being a Brahmno…
a fallen Brahmin… But why would I write? Who would be interested to read about me?
Debayudh: I can share an anecdote with you.
In 1926, Tagore attended a Namasudra conference
in Dhaka. He was severely chastised by his folks
at Viswabharati. He never went back to Dhaka again,
that was his final visit. AK Biswas has written
about it in detail.
Debi Roy: Imagine. Such is the consequence
of the caste system. But Bangladesh has been very
hospitable to me. I have been there four times as of now.
However, Tagore is zillion times greater than me. I owe my life to him.
Debayudh: Although Tagore was preoccupied
with discrimination throughout his life, he kept
altering his views on the caste system. You can track
that change from Gora to Home and the World to a
couple of short stories to Chandalika. He preferred Gandhi
over Ambedkar at the time of the Poona Pact.
I find it deeply problematic.
Debi Roy: Tagore championed the supremacy
of the human spirit over anything else.
He was in and out a humanist. There’s one thing that
I can tell you. If you leave everything aside,
the profound knowledge and love that
the Geetabitan speaks of transcends any barrier
imposed on humankind. Apart from the
Ramkrishna Kathamrita, one book that keeps me alive
and immensely influences me is the Geetabitan.
Sri Ramkrishnadev didn’t have a single degree,
but the kind of wisdom that runs through his words is
amazing. Even Tagore didn’t have a university degree.
But look at how these two men went on to shape
the consciousness of the entire civilization.
Debayudh: Yes, Sri Ramkrishnadev and, later on,
Vivekananda, did play an important role in reforming
Hinduism from within. They were strictly against caste
discrimination albeit they never thought of annihilating it
by its roots. I see a photograph of Vivekananda
hanging on your walls. What’s his impact on your life?
Debi Roy: My wife and I have been baptized by t
he Ramkrishna Mission. We were going through a
restless period, a lot of agony and pain. I subscribed to
Udbodhon, their mouthpiece, and started reading the Kathamrita.
I realized it was already too late, no point
in delaying further, we decided to embrace the Mission.
Debayudh: This leads me to my next question.
If you think it’s too personal and uncomfortable,
do refrain from answering. The Hungry Generation began
by repudiating the existence of God.
I remember that you wrote in one of your poems,
“It’s more important for me to look for
bread than run after an unnecessary God…”
Debi Roy: That was solely Malay’s idea.
Most of it was gimmick. Not mine. Whatever came from my
side was youthful folly.
Debayudh: Describe the initial years how you met
Roychoudhury brothers, Shakti Chattopadhya,
Subimal Basak in those early days of the movement.
What it was like to be part of it?
Debi Roy: The “Hungry Generation”
was mostly conceived by Malay.
He was the one who wrote to me.
Later on we met face to face in Subarno Upadhyay’s
rented apartment. Subsequently I was introduced
to the other members of the movement. In 1962,
in the month of April, Malay brought out
the first Hungryalist bulletin and mailed it to me.
It was published in English. Creator: Malay Roychoudhury,
Leader: Shakti Chattopadhyay, Editor: Debi Ray.
It’s natural to protest against convention, social evils,
and injustice when you’re young, quite natural to be a non-conformist.
Someone who accepts everything is a person who cannot question.
That’s certainly not the trait of youth.
Debayudh: Could you help us understand t
he Hungry aesthetic better?
Debi Roy: Immersed in youthful folly,
the Hungry Generation dared to challenge
the norms and ethics with whatever cultural capital it had.
The movement opened up a lot of windows in our minds. T
here was no hesitation, but pride.
I used to read a lot, at times, a lot of random stuff at that age.
John Keats made me thinking, “Thou was not born for death,
immortal Bird! No hungry generation tread thee down…”
Malay told me how he was influenced by
the English poet Chaucer’s phrase, “In sowre hungry tyme”.
Spenglar’s theory of cultural degradation
provided the philosophical axis of the Hungry generation.
Uttam Das researched on the theoretical
and philosophical implications of the movement.
Debayudh: Can the hungry aesthetic
of breaking the state of art exist without the classical dictum?
Debi Roy: Poetry or literature in general,
is not a boxing ring that you need to knock
somebody out to gain fame. I write by myself, for myself.
Alone. Surrounded by stalwarts on all sides,
I live a low-profile life. I do not have any sense of inferiority
because of that. I ask myself, am I educated?
I have never been educated in the institutional sense.
I did not have the opportunity to. I prefer not to overload
my writings with postmodernism and other theoretical
back-scratching. My liaison with poetry is like my long conjugal life.
I am still enamoured in her spell.
I will be until I die. Is there an end to knowing one’s self?
There is a need to bridge the gap between life and death.
That is why you need poetry. It’s another name of
delving deep into life. I have to leave this world someday
even if I don’t want to. Death is inevitable, life ephemeral.
But that does tamper with its charm? I find these ideas of
‘classic’ and ‘eternal’ quite problematic though.
My real work is with poetry.
Debayudh: Do you think the Beats and
the Hungry generation had anything
in common and if they have inspired each other?
Tell us about your interactions with
the Beat poets and publishers.
Debi Roy: When the first bulletin came out,
I went to the editorial office of Janasebak
to hand a copy over to Sunil Gangopadhyay.
He quickly went through it once and remarked,
“So you’re bringing out all this?”
Later on we got to know that he believed that
our movement was completely influenced by Allen Ginsberg
and the Beats. The Beats and the Hungryalists were similar
only on the grounds of being anti-establishment.
But one stemmed from the soil of a wealthy nation
while another thrived in the dust of poverty.
Debayudh: The leftists often view the movement
as a middle class reaction that celebrates
urban alienation and male sexual frustration.
They accuse that the movement was politically wrong.
They say you bring in a new order of morality
while trying to tackle the classical Bengali bhodrotta
with obscenity and rage of alienation.
What is your opinion on that?
Debi Roy: I’m not into politics.
That’s not my cup of tea. Why don’t political leaders
across party lines teach us to love people irrespective of differences?
Aren’t the ones in opposition human beings too?
Some of them travel enveloped in security,
in bulletproof cars, instigate the common mass from a distance,
and go back to their ivory towers.
There are exceptions that must be respected.
But why are there so many commandos around the leader
of an impoverished backward country?
Why can’t the peasants avail the irrigation and manure
they deserve? Why do the workers out of work stare
depressingly at the gates of factories that have been shut down?
Why do trade unions end up being centres of other profitable trades?
Why are the youth still unemployed?
Why are they forced to choose such despicable ways of life?
But, in the middle of all this, I know of a communist leader
who refused to take more than a piece of fish on his platter.
There was another who did his own laundry.
You cannot imagine such a brand of politics in our times.
Debayudh: Tell me more about your
engagement with the Hungry Generation.
Debi Roy: There are a lot of memories.
Some of them are too sad to recount.
I remember spending a month in Varanasi
on a friend’s travel pass. Probably we hardly had any inhibition those days.
I adjusted quite well in the household of a widow and her son.
That’s where I met Anil Karanjai and Karunanidhan Mukhopadhyay.
Once, after I wrote a piece on Subhash Ghosh,
an Englishman, probably British rang me and asked whether
I speak English. I replied that I obviously do,
but I cannot speak in your accent. This is not my mother tongue.
I am a poet from Bengal, I write in Bengali.
I am quite satisfied with myself.
Debayudh: Yes, English for most of us is
an acquired language. We had to learn it from scratch.
It’s obvious that our English will be different
from her native speakers.
Debi Roy: We are rather compelled to learn it to make a living.
Not that I put much of my heart in it. Like Hindi,
I had to master it to find a job.
It had nothing to do with my love for that language.
Debayudh: I can understand.
I didn’t know a word of Hindi when I first came to Delhi.
I had to acquire it.
Debi Roy: Exactly. My bosses thought
that they would put me into trouble by asking me
to learn Hindi. But it became a boon in disguise.
The lady who taught us Hindi came to know that
I was a poet who tries to translate once a while.
She advised me to take Pragya, the highest qualifying
examination in that language, to find a better job.
The College Street kept calling me, but why would I go?
Debayudh: That echoes a famous poem
by Shakti Chattopadhyay, your once upon a time comrade.
Debi Roy: I have written about it in length.
Despite Malay keeps bitching about him,
I believe that he was a great poet:
a poet in the truest sense of the term.
There can be no qualms about it.
I have not come across many who had so much
dedication for poetry. The rest of the poets
I know taught at different places, worked in myriad offices,
but Shakti, he gambled his life for the sake of poetry.
Debayudh: I read that he moved out for personal reasons.
Once of his affairs didn’t work out and that placed him a
gainst the Roychoudhury-s. Shakti Chattopadhyay, as I believe,
was eccentric and mercurial to the core.
May be that’s something that defines his poetry.
Debi Roy: Very true.
Debayudh: Could you please run us
through a timeline of major events that led to Shakti’s
parting ways with the movement,
and the various fractures within the group
until the arrest of the poets when the movement ended?
Debi Roy: One of the reasons is what you said. Shakti
fell for one of Malay’s relatives. Apart from that t
here were personal clashes between Malay and Shakti.
Shakti was also offered a job. But, at the end of the day,
I believe he is great poet with a timeless appeal.
Debayudh: Describe the last days of your time
with Hungry generation. How was it to live with
the threat of arrest and other threats
that you all faced during the last phase.
Debi Roy: I was suspended for a year from my job—
I was working at the head post office in Burdwan then—
for being involved in the Hungryalist movement.
Some custodians of Bengali literature weren’t happy with us.
I was arrested and put behind bars.
I was acquitted at last after a lot of storm.
My friend Samir Ray arranged for my bail.
Our friendship is still intact. During the trials, Gourkishore Ghosh,
Jyotirmoy Dutta, and Sunil Gangopadhyay among others
stood by us. By then, the famous Times magazine
brought us into limelight. Almost all the major magazines
and newspapers across the nation started publishing gossips
and news about us. Dharamveer Bharti, Khushwant Singh,
Pupul Jayakar, all of them came out in our support,
collected funds for us, and moved strings to secure our freedom.
Pranab Kumar Sen, who was the police commissioner of Kolkata back then,
also admitted later on that arresting the Hungryalists was wrong.
Debayudh: Let me get back to the sixties again.
The time in which you took up writing
was just a few years after Babasaheb Ambedkar’s death.
Jogendranath Mondal was back in India and was
trying to consolidate his political career. He failed though…
Debi Roy: Hasn’t Debesh Roy written a novel on him?
Debayudh: Yes, Barishal-er Jogen Mandal [Jogen Mandal of Barishal].
It got published from Dey’s. Anyway, it was that time,
in the sixties, when you were forced to adopt a different name.
I completely empathize with that.
But weren’t you even drawn to their anti-caste ideologies?
Didn’t they inspire you to fight back? What’s your take on Ambedkar?
Debi Roy: I immensely respect them.
The kind of struggle they put up against this system gave voice
to thousands who were silenced for centuries.
But I got to know of them much later in my life.
At that time, in the sixties, I was hardly familiar with their names.
I was far from being exposed to their life and works.
Debayudh: I can understand.
The middle class intelligentsia of Bengal
after partition has always been very hostile to identity politics.
As I just told you, Jogen Mandal fought a lost battle
of reinforcing caste politics in the public sphere of West Bengal.
With Congress on the one hand, and the Communist Party
or the Hindu Mahasabha on the other, all the mainstream
political forces tried to bring the scheduled castes into their fold.
This was carefully done by appropriating,
if not shrouding Ambedkar from the common masses.
Debi Roy: Very true. That’s the reason.
May be that’s why we never thought so intricately
about caste assertion in our times.
There’s another reason. In an impoverished land like ours,
livelihood becomes an important matter to take care of. As you know,
I come from a very humble origin. In the sixties, at the brim of my youth,
I was desperately trying to make ends meet.
I began my career by working as an errand boy who delivered water and tea.
I wanted to get out of the muck at the any cost.
I didn’t have much time to delve into other things.
Whatever leisure I had, I devoted it to literature.
Debayudh: Yes, it calls for a bit of privilege
to actually engage in activism. Those coming
from well-to-do families can think about losing
their job and writing, distributing pamphlets for free,
buying and sending masks to the pillars of the society.
Obviously, none of it is free of cost.
Debi Roy: Hahaha… and I had to face the brunt…
Debayudh: …Even the regular doze of booze,
weed, hash and travelling to different places
need some amount of financial affluence…
Debi Roy: All of these were gimmicks.
Going to crematoriums and getting drunk… pure hoax!
All of us have done that, the next generations will also do,
there’s nothing wrong in that. But all these are gimmicks.
These have no connection whatsoever with literature.
Debayudh: Ginsberg once in an article that
marijuana brings about an aesthetic experience
that a writer requires…
Debi Roy: I don’t believe in that.
Literature has no connection with the use and abuse of substances.
You can write without excess.
I don’t think Tagore needed any drug to write.
But Sarat Chandra was completely different.
Michael Madhusudan had a life of excess.
It varies from person to person. It’s a matter of individual choice.
Besides, it doesn’t mean that all of us have to have a similar lifestyle
for belonging to the same movement. You can go to Khalasitola
and have a blast together, but writing itself is a solitary exercise.
Debayudh: As I went through a lot of anthologies
on the Hungry Generation, I noticed that you have been obnoxiously ignored.
Not many of your poems have been included,
there’s hardly any write-up on you.
Although you were the editor of the first manifesto
and your address was used for official correspondence,
you have been strangely sidelined in the discussions later on.
Debi Roy: All of it is because of jealousy.
I achieved what most of them couldn’t. The Sahitya Academy,
the ICCR took interest in my works, translated me,
included my poems in their definitive anthologies.
It is no wonder a group of ghettoized poets would be envious of me.
They thought that I was being sold out to the establishment.
I reminded Malay that he was promoted to the post of an officer from a clerk.
It is the same process.
But, leave it, there’s no point in resurrecting
old wounds. Let the sleeping dogs lie as they are.
There is no perfect job in the entire world,
there’s no fun in humiliating others as well.
Debayudh: Yes, opportunism and back-biting
have perennially plagued the Bengali literary establishment.
I have seen poets shamelessly advertizing themselves
and buttering the ones who matter to go places.
Debi Roy: Oh yes, I have a victim of it.
A friend from Germany once asked me why I have made
so many enemies. He held a powerful position.
He was once asked why he never recommended me.
He remarked that supporting me would lead to riots.
Debayudh: Such miserable spinelessness.
Debi Roy: Poets behave like bureaucrats these days.
They’re running after publishing their pictures on
mainstream dailies, inaugurating stupid programs…
There’s no point in talking about them.
There was one major poet who changed his jersey and made it big.
He was after my life once though couldn’t do much.
I pity these people. But his wife was a genuine poet.
Debayudh: Let’s go back in time.
You were telling me about your humble origins,
the immense hard work you had to put in
to materialize your aspirations.
In the middle of all this, how did poetry happen?
Debi Roy: There was a library near our place.
I went there to while away my time or forget the pangs of hunger.
I started reading, I read as much as I could.
I still remember the librarian. He used to smirk and enquire
whether I had no other work. There was another library
near the Howrah Girls’ College. I spent hours there reading authors
like Bankim Chandra. Not that I understood all of what I read but
I realized that literature is my poison. I also loved music.
But once literature takes over someone,
his life and afterlife are perpetually destroyed. (laughs)
Debayudh: Did you face any sort of caste
discrimination from the other members of the movement
or other writers when you started publishing?
Debi Roy: There are things that I don’t want to recollect.
So much of shit has been spewed. Shaileswar Ghosh
used to think a lot about history. I was perpetually humiliated by him.
Sub-altern-heaven-afterlife-soul-moksha-the four varnas- these are his truths.
Some of those Hungryalists are doing the Vedas and worshipping now to make a living.
Just as Jabali once told Ram, do not be blinded by deceitful Brahmins;
only the dumb can pin his faith in spirits, afterlife,
rituals, reconciliation, etc, even in post-modernism!
Will these theories enable the lower castes and marginalized
with two square meals a day? Will the roads be repaired after the elections?
Proper drinking water? Will the peasants get irrigation, manure?
Education for all? Light? Will the youth from ‘our homes’ get a job?
Equal opportunities? Will the wheels of historical oppression
come to an end? An end to discrimination? Prejudiced mentalities?
Will all problems be solved if a percentage finds employed in software firms?
Will the closed factories start producing again?
People like me who have fought their way to privilege,
do we carry out our duties? Such hullabaloo about caste!
That Dalit, that OBC, that Yadav, all that discourse with names.
Young progressive people laugh at it.
One of them once asked me, is your ‘friend’—
he was referring to Malay—from that time, a big fan of Manu?
How could you tolerate him since the sixties?
Debayudh: Do you have any regrets?
Debi Roy: Once a friend told me that I made a major mistake in my life.
He argued that had I passed my masters,
I would have got a far better job and a lot more time
to read and write. But people do make mistakes.
One’s life is defined by his mistakes. There’s no point regretting them.
Another mistake that I made was not to secure a medical insurance.
I still haven’t been reimbursed for the heart surgery I had to undergo.
This is the condition of a central government officer in an independent nation.
Debayudh: Thank you Debida! That’s all for now.
It was beautiful getting to know you.
------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------
Debayudh Chatterjee (b 1991) is pursuing his MPhil at the Department of English, University of Delhi.
While his dissertation looks at Dalit writing as a ground of contention between caste and class ideologies,
he takes active interest in the avant-garde, counterculture,
and 20th century Bengali literature. Apart from being employed
as a Project Fellow at the department he is affiliated to,
Chatterjee is a published poet in Bengali, having three titles to his credit.



Name:  মলয় রায়চৌধুরী          

IP Address : 012312.60.1234.23 (*)          Date:10 Jan 2019 -- 11:00 AM

উপন্যাস : ঔরস
মলয় রায়চৌধুরী
জওয়ান : স্যার, দুজন সিভিলিয়ান হিট হয়ে খাদে পড়ে গেছে বলে মনে হচ্ছে ; কানে ইয়ারপ্লাগ লাগিয়ে গান শুনছিল মনে হয়, ট্র্যানসেন্ড বা মোবাইল থেকে, তাই আমাদের আর শত্রুদের ফায়ারিঙের আওয়াজ শুনতে পায়নি ।
অ্যাসিস্ট্যান্ট কমাণ্ডান্ট : মোবাইল ? এখানে মোবাইলের কোনো টাওয়ার একশ কিলোমিটারের মধ্যে নেই । যাকগে, যেতে দাও, অমন আনুষঙ্গিক দুর্ঘটনার জন্য আমরা দায়ি নই । বাস্টার্ডগুলো এই অঞ্চলে এসেছিলই বা কেন ! ডিসগাস্টিং ।
জওয়ান : ওদের বডি কি রিকভার করা হবে ? উওমেন না মেন বুঝতে পারছি না ।
অ্যাসিস্ট্যান্ট কমাণ্ডান্ট : তোমার কি মাথা খারাপ ? থাকুক যেখানে পড়ে আছে । আমাদের অপারেশান ক্লোজ হলে স্হানীয় প্রসাশন বা বনবিভাগ গতি করবে ।
জওয়ান : গ্রাম তো কাছে পিঠে নেই স্যার; দুজনেই জীবিত বলে সন্দেহ হচ্ছে ।
অ্যাসিস্ট্যান্ট কমাংণ্ডান্ট : বাজে ব্যাপারে মাথা ঘামিও না । ওটা সিভিল প্রশাসনের মাথাব্যথা ।

দুই
আগুনের ঢেউ-তোলা আর ফিনকি-ওড়ানো কয়েকটা জ্বলন্ত খোড়ো চালাঘরের সোনালি আলোয় , চারিদিকে ছিৎরে ছড়ানো লাশের মাঝে দাঁড়িয়ে ছিল ক্রুদ্ধ অপু, পোশাকি নাম অশ্বমেধ ঘোষ, যার বাবা সুশান্ত ঘোষকে অনেককাল আগে কিডন্যাপ করে, দশ লাখ টাকা ফিরৌতি বা র‌্যানসাম না পেয়ে, নিজের চোদ্দ বছরের কচি শ্যামলিমা নিরক্ষর মেয়ের সঙ্গে বিয়ে দিয়েছিলেন তারিণী মণ্ডল, মহানন্দে, ধুমধাম করে, যেভাবে অপরাধ-জগতের ছাতিঠোক অখণ্ডপ্রতাপ বাহুবলি বীরেরা ভাগলপুর আর মাধেপুরা জেলার গঙ্গার চরের দিয়ারায় করে থাকে, করে আসছে বহুকাল যাবত, আর তারিণী মণ্ডল তো অপরাধিদের জগতে ছিল মহাজ্যোতিষ্ক, যার কদমছাঁট হাফটেকো মাথা ঘিরে ভনভন করত দুপুর গঙ্গার ঢেউ-গনগনে চনমনে রোদ, তেল-চুকচুকে সোঁটার পেতলমাথায় ধরা থাকত অমাবস্যার নদী-ছলছলে অন্ধকার । সে সোঁটার অভিজ্ঞতা তারিণী মণ্ডলের চেয়ে পুরোনো, ব্যাপক আর গভীর, কেননা ওটা উনি পেয়েছিলেন উত্তরাধিকারসূত্রে, লাঠিয়াল বাবার কাছ থেকে, যে তার বাবার, সে তার বাবার । তারিণী মণ্ডলের দুঃখ যে ওনার ছেলে নেই, জামাই যদিও ঘরজামাই, তিনি ওসব সোঁটাসুটির প্রাগৈতিহাসিক অস্ত্রে বিশ্বাস করেন না, আধুনিক পিস্তলও শুধু লুঙ্গির গেঁজেতে গুঁজে রাখেন, কখনও একটু-আধটু চালিয়ে দেখার চেষ্টা করেন না । নাতি অপু বরং ওর বাবার চেয়ে আধুনিক, আজকালকার তেজিয়ান ছোকরা ।
অপু জানতে পেয়েছিল, বেশ একটু দেরিতেই, আত্মীয়-স্বজন জ্ঞাতিগুষ্টি দলচররা চেষ্টা করেছিল নানা-নানির অপঘাতে মৃত্যুর দুঃসংবাদটা ওর কানে যাতে দেরিতে পৌঁছোয়, যে, দাদু তারিণী মণ্ডল আর দিদিমা মন্হরা দেবী খুন হয়ে গেছে সকালবেলায়, একেবারে ছলনি । রোজকার মতন তেলমাখা লাঠি আর দুজন কালচে-কেঁদো খইনিঠোকা বন্দুকধারী দেহরক্ষীর গাঁট্টাগোট্টা পাহারায়, পটলের লোডিং তদারকি করতে বেরিয়েছিল, ট্রাকে পটলের পঞ্চাশটা বস্তা চালান হবার কথা ছিল ভোরবেলায় ।
যে ট্রাক আসার কথা ছিল সেই নম্বরের ট্রাকই এসেছিল, বনেটে বজরংবলির গেরুয়া টুনিপতাকা উড়িয়ে, কিন্তু তা থেকে মুখে লাল গামছা বাঁধা চারজন লাফিয়ে নেমে তারিণী মণ্ডলকে লক্ষ করে একনল্লা দুনল্লা একে-সানতালিস চালিয়ে চকাচৌঁধ ধুঁয়াধার অন্ধাধুন ব্রাশফায়ারে ছলনি করে, ট্রাক ফেলে রেখে, ট্রাকের পেছনে যে ছাইরঙা ইনোভা আসছিল, তাতে চেপে দক্ষিণের ভোররাতের গু-শোভিত আর মাটির সোঁদা দেয়ালে ঘুঁটেতে পাঁচ আঙুলের ছাপ-মারা গোবর-সুসজ্জিত কাঁচা রাস্তা ধরে আধাশীতেল অলস কুয়াশার সঙ্গে ধুলো মিশিয়ে উধাও।
মাটিতে মুখ থুবড়ে পড়েছিল দাদু , বাঁ-চোখের কোটর থেকে নকল সিনথেটিক মণি বেরিয়ে ছিটকে নর্দমায়, আর ডাকসাইটে দিদিমা ওপরমুখো চিৎ ; দেহরক্ষীরা পিছু ধাওয়া করে কাঁধ থেকে একে সানতালিস নামাতে-নামাতেই বেতাহাশা গুলি খেয়ে হাত-পা ছড়িয়ে তারা দুজনেও মোরাম-পথের ওপর ঠ্যাং ছড়িয়ে লালজবজবে-চিৎ, আকাশের দিকে হাঁমুখ, চোখ-খোলা । দিদিমা, মানে নানি, নানিকে নিয়ে বেরোত না নানা সচরাচর । নানির হাঁটুর ব্যাথা সারাবার জন্যে সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিল, যাতে পায়চারি করে জাম হয়ে থাকা হাঁটুর চাকতি আলগা হয় ।

তিন
চারজনের রক্ত গড়িয়ে মিশেছে মাছিদের আহ্লাদী জমায়েতে, মাছিরা তাদের এঁদো-পলটন ভাইবেরাদর সবাইকে ডেকে এনেছে, র‌্যালিতে-মিছিলে, যারা ভোরের দিয়ারায় ডোমপাড়ার শুয়োরদের আড্ডায় টাটকা-তাজা গু খেতে বেরিয়েছিল, তারাও তাজা রক্তের সু-বদবুর সংবাদ পেয়ে, হাঁফ-ফুরোনো বাংলা বৈদ্যুতিন মাধ্যমের দামড়া-চোয়াল ভাতচিকন সাংবাদিকের অনুকরণে, কুয়াশাভেজা ঘষাকাচ-ডানা নাচাতে-নাচাতে পৌঁছে গেছে ।
--হ্যাঁ দীপঙ্করদা-মাছি, ঘটনাস্হলে কী দেখতে পাচ্ছেন ?
--সুমিতা-মাছিনী, এখানে চারজনকে কে বা কারা খুন করে বডি ফেলে তিনচার দিকে দৌড়ে চলে গেছে বলে জানাচ্ছেন প্রত্যক্ষদর্শী মাছিরা ; ইশে, নিমন্ত্রণ করা হয়েছে বিভিন্ন পাড়ার বিশেষজ্ঞ মাছি-মাছিনীদের । একজন মহিলা কেন খুন হলেন তা ভেবে দেখতে হবে, অ্যাবং খুন হলেও কেন তিনি লজ্জা নিবারণ করতে পারলেন না, তার জন্য সরকারকে জবাবদিহি করতে হতে পারে ।
--দীপঙ্করদা-মাছি, আপনি কী স্বয়ং স্বাদ নিয়েছেন, রক্তের অ্যাবং গুয়ের ? না নিয়ে থাকলে ঘটনাস্হলে যাঁরা একত্রিত হয়েছেন, তাঁদের দিকে একটু ক্যামেরা প্যান করতে বলুন, আমরা মাছি-দর্শকদের দেখাতে চাই, যাতে মানুষের কাঁচা গু খেয়ে-খেয়ে বিরক্ত দর্শকরাও রক্তের স্বাদ নিতে পারেন ; চার-চার জনের রক্তের স্বাদ কীরকম তা আমাদের গুয়েমাছি চ্যানেলেই প্রথম দেখানো হচ্ছে । অ্যাবং নারীরক্তের স্বাদ সম্পর্কে একটু পরেই স্টুডিওর রাসায়নিক মাছি ও ফরেনসিক মাছিনী তাঁদের মূল্যবান মতামত গু-ঞ্জরিত করবেন ।
--সুমিতা-মাছিনী, স্টুডিওতে যে গুসেবক অ্যাবং রক্তসেবক মাছিরা বিতর্কে অংশ নিতে এসেছেন, তাঁদের জন্য আরেকবার আমরা ক্যামেরা প্যান করে তারিণী মণ্ডল নামে মানব প্রজাতির জনৈক প্রতিকল্পের ছিৎরে-যাওয়া মগজ দেখাতে চাই ; ইশে, ঘিলুসেবন করার জন্য স্হানীয় নির্বাচনক্ষেত্রের নীলমাছি পৌঁছে গেছেন, তাঁর ভোজন সমাপ্ত হলে স্টুডিওর সঙ্গে যোগাযোগ করব । ইশে, তারিণী মণ্ডলের স্ত্রীর শব দেখাতে পারছি না, কেননা স্তনদ্বয়ে গুলি খেয়ে পড়ার পর তাঁর শাড়ি ওপরে উঠে গিয়ে অকুস্হলের পাকাচুল বেরিয়ে পড়েছে । ইশে, রাজ্য প্রশাসন দেশের প্রগতি দাবি করে অথচ আজ পর্জন্ত অকুস্হলের পাকাচুলের সমস্যার সমাধান করতে পারেনি ।
--দীপঙ্করদা-মাছি, দ্রুত সংবাদের জন্য ধন্যবাদ । এতক্ষণ আপনারা ভাগলপুরের দিয়ারা-সম্রাট তারিণী মণ্ডল হত্যার দৃশ্য দেখছিলেন । সময়াভাবে আমরা পৃষ্ঠভূমি সঙ্গীত তৈরি করতে পারিনি । পরবর্তী কোনো হত্যাকাণ্ডে যাতে ব্যাকগ্রাউণ্ড স্কোর দেয়া যায় তার ব্যবস্হা করা হয়েছে । সঙ্গে থাকুন ; রক্তের অ্যাবং গুয়ের স্বাদ উপভোগ করুন ।
--সুমিতা-মাছিনী : দর্শকগণ, কেউ একজন আমাদের সংবাদ পরিবেশনকে ঠাট্টা করে তার ঔরস উপন্যাসে যা নয় তাই লিখেছে । ল্যাখককে বিশ্বাস করবেন না, কেননা আপনারা ওনাকে দেখতে পাচ্ছেন না, আমাকে স্বচক্ষে চব্বিশ ঘণ্টা দেখছেন । মনে রাখবেন, যা দেখছেন তা-ই সত্য ।

চার
সাড়ে ছ’ফিটের ছিয়াত্তুরে তাগড়া-কালো তারিণী মণ্ডলের টেকো খুলির হাড় গুলিতে ছিৎরে গিয়েছিল, মুখের আদরা চৌচির, টেরিকটের ফিকে-গেরুয়া পাঞ্জাবি রক্তে জবজবে, বুক পকেট থেকে উঁকি মারছে হাজার টাকার গোটাকয় করকরে নোট । ধুতি থেকে বেরিয়ে-থাকা পায়ের গোছের পাকাচুল ঘিরে লতানো ফুলে-ওঠা শিরা । ভারিভরকম মন্হরা দেবী হাঁটবার সময় শাড়ি দুহাতে সামান্য তুলে পা ফেলছিল বলে আচমকা গুলির চোট খেয়ে সম্পূর্ণই তুলে ফেলেছে । মাছিরা তার পাকাচুলশোভিত হাট করে খোলা হাটে বসে কী যে পান করছে তা মাছিগুলোই জানে ।
অপু ক্লাস বাংক করে বাড়ি এসেছিল দিনকতকের জন্যে । দিল্লির জওয়াহারলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ে, মানে জে এন ইউতে একই সঙ্গে, দিল্লির হবু দেশসেবকদের খাদিয়াল ঢঙে, সমাজবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর আর বামপন্হী ছাত্র ইউনিয়ান করছিল । বামপন্হী ছাত্র ইউনিয়ান করার সুবিধা এই যে পরে ইচ্ছেমতন এবং হাওয়া বুঝে ভিনপন্হী বিজয়ী দলে সেঁদিয়ে যাওয়া যায়, ভিনপন্হী হলে বামপন্হীতে ঢোকা একটু কঠিন কেননা ভিনপন্হীদের ছ্যাঁদা বড়ো, বামপন্হীদের ছ্যাঁদা ছোটো । এই করেই দিল্লি-গুড়গাঁওয়ার ছাত্ররা জীবনে এগিয়ে যেতে পারে, জানে ও, দেখেছে আগের ব্যাচের ফেলটু ছাত্ররাও দিল্লির রাজনীতিতে কেমন করেকম্মে টরটরিয়ে টঙে চড়ে গেছে, কোনো চাকরি-বাকরি না করেই ফাঁপিয়ে তুলছে দুদিকের পকেট, ডেনিম-প্যাণ্টের হোক বা খাদিয়াল পাঞ্জাবির, নিজের বা জ্ঞাতিগুষ্টির । ইউনিয়ানের নির্বাচনে টাকা দরকার বলে দাদুর কাছে এসেছিল অপু, ফোমচামড়ার ব্যাগ নিয়ে, কাঁচা টাকা নিয়ে যাবে, যা তারিণী মণ্ডলের তিজোরিতে সব সময়েই থাকে, কেননা দিয়ারার জীবন বেশ ঝুটঝামেলার, দরিন্দগির, লেনদেনের, কখন কী হয় কত টাকা ঝপ করে কার দরকার তার নিশ্চিতি নেই ।
হাত-পা বাঁধা, গুটকাদেঁতো মুখে লিউকোপ্লাস্ট, বছর তিরিশের ঢাউসভুঁড়ি হুলোচোখ ট্রাক ড্রাইভারটা মার খেয়ে আধজখম হয়ে খড় কাটার যন্ত্রে সবুজ নাইলন দড়ি বাঁধা অবস্হায়, অজ্ঞান হয়ে নেতিয়ে ছিল, প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে পাশিদের পাড়ায় তোতারাম পাসওয়ানের মহাত্মা গান্ধি রাষ্ট্রিয় কর্মইয়োজনার টাকা মেরে তৈরি খামারে। ট্রাকচালক বৈসাখি যাদবের কাছ থেকেই তারিণীর সাঙ্গপাঙ্গরা আঁচ করতে পেরেছিল খুনের পেছনে কাদের হাত থাকতে পারে । আররে, বৈসাখি হ্যায় কংসায়তি যাদব, অসলি কৃষ্ণায়ত যাদব নহিঁ হ্যায়,মুহ খোলেগা ক্যায়সে নহিঁ ; ডরপোক কংসায়তি ফাট্টু কঁহিকা ।
তারিণী মণ্ডলরা, তার নিজের দাবি অনুযায়ী, যখন সে সুশান্ত ঘোষকে অপহরণ করে বন্ধক রেখেছিল, তখন পোড়াটে-কালো বুকে ঘুষি ঠুকে বলেছিল, তার পূর্বপুরুষরা লালেলাল খাঁটি-রক্তের বাঙালি ছিল, তিন-চারশ বছর আগে, আংরেজদের জমানায় । যে পূর্বপুরুষ প্রথম খুন করে মহাঅপরাধীর খেতাব পেয়েছিল, সে শত্রুর জিগর বা হৃদয়ের রক্তে ভেজা পৈতে পরার চল আরম্ভ করলে, হলেই বা নিচু জাত, উত্তরপুরুষরাও প্রথাটা বজায় রেখেছিল, যদিও শত্রুর হৃদয়ের রক্তের বদলে অমাবস্যায় জবাই করা পাঁঠার দিল-কা-খুনে ভেজা পৈতে পরার চল করে গেছে কোনো পূর্বপুরুষ । তারিণী মন্ডলের পৈতেও অমাবস্যার দিন পাঁঠা কেটে জিগরের রক্তে ভিজিয়ে পরানো হয়েছিল । নাতি অপুকেও অমন পৈতে পরাবার চেষ্টা করেছিল তারিণী মন্ডল, জামাইয়ের প্রতিবাদের জন্য সফল হয়নি । জামাই বলেছে, মনে রাখবেন, ও সুশান্ত ঘোষের ছেলে, ঘোষরা যতই খুনোখুনি করুক না কেন, কায়স্হই থাকবে।
বেবি নামের চোদ্দ বছরের মেঠোগন্ধা নিরক্ষর মেয়েকে বিয়ে করে, ভাগলপুরের দিয়ারায় থেকে গিয়েছিলেন ছাপোষা বাঙালি বাড়ির কৃষিবিজ্ঞানে স্নাতক চাকুরে যুবক সুশান্ত ঘোষ, প্রথমে রোগাটে বাংগালি জামাই, তারপর দোহারা সুশান্তবাবু নামে, তারপর পেটমোটা গদাইলস্কর জামাইবাবা নামে অপরাধীদের রাজপুত্র হয়ে উঠেছেন গোপালপুরের ফলকিয়া, পরবত্তা, ডিমহা, কেলওয়ারি, তিনহেংগা আর কহলগাঁও-এর অনাদিপুর, আভাপুর আর অঠগম্মা দিয়ারায় ।
সুশান্ত ঘোষ প্রথম দিকে ফিতেবাঁধা কুকুরবাচ্চার মতন গোমড়া মুখে বোবা সেজে থাকলেও, গ্রাম্য অশিক্ষিত বাংলা জানে না এমন, গংগোতা জাতের চোদ্দ বছরের কচি নিরক্ষর শ্যামলিমা তুলতুলে মাংসের মেয়ের সঙ্গে বাসা বেঁধে ফেলেছিলেন, ঠান্ডা মেঠো দেয়ালের সোঁদা-ছমছমে প্রায়ান্ধকারে, খালি গায়ে, মাদ্রাজি হাফ-লুঙ্গিতে, শাশুড়ির দেয়া কালো কাপড়ের চৌকো তাবিজ গলায় , ছত্রিশ ডিগ্রির বালি-ওড়ানো থমথমে গ্রীষ্মে, এগারো ডিগ্রির কম্বলচাপা হিহি ঠাণ্ডায়, বর্ষার মেঘপাগল ঝোড়ো ঝড়ের টালিভাঙা দাপটে । যখন কিডন্যাপ হয়েছিলেন, তখন দিয়ারার এই এলাকায় বিজলি ছিল না, যাতায়াতের রাস্তা ছিল না, পানীয় জল ছিল না । তারপর ওনার রাজত্ব ক্রমশ প্রসারিত হয়েছে, স্কুল-কলেজের লিখাপড়হিকে কাজে লাগিয়ে বিজলি সড়ক পানি এনেছেন।
দিয়ারার লোকেরা মনে করে উনি, সুশান্ত ঘোষ, আড়ালে কলকাঠি নাড়েন । সামনে সবসময় ভঁয়সাবদন কউয়াডোল তারিণী মণ্ডল । যদিও কখনও-কখনও, হয়ত নদীর ওপর বিদ্যুতের কিলবিলে কেউটে রুপোলি খোলোস ছেড়ে ঝাঁপিয়ে-পড়া সন্ধ্যায়, মগজের ব্যাস্টিলে নিজেকে পায়ে চেন-বাঁধা কয়েদির ঢঙে, ভেবে ফ্যালেন, তিনি আসলে একজন মহা-অপরাধীর জামাই, গংগোতা-ডন নামক এক ভয় উদ্রেককারী দুষিত চরিত্রের মানুষ, যে ওই মহাডনত্বে আটকা পড়ে ছটফট করতে পারে, নিজের কারাগার থেকে নিজেকে ছাড়াতে পারে না । চারিদিকে এত সাঙ্গপাঙ্গের জি-হুজুরি, কচি নিরক্ষর স্নেহদেহ স্ত্রীর নিঃশর্ত আগুনযোনি-ভালোবাসা, শশুরশাশুড়ির অফুরন্ত আদরযত্ন সত্ত্বেও, তিনি নিঃসঙ্গতা আর একাকীত্বের বিষে ক্ষয়ে চলেছেন । আসলে তিনি, সুশান্ত ঘোষ, মনে করেন যে এই ক্ষয়-রোগের আনন্দে সুফিসন্তের মতন অজানা ঐশ্বর্যে আলোকিত হয়ে চলেছেন প্রতিদিন।
যে-সময়ে সুশান্ত ঘোষকে অপহরণ করা হয়েছিল, ভাগলপুরের ষোলোটা ব্লকের ছয়টায় দিয়ারা ছিল , যাদের গঙ্গা দয়া করে ছাড় দেয়ায়, চিকচিকে পলিমাটির চাদরে ঢাকা প্রায়-পাকা চেহারা নিয়েছে সেগুলো । গঙ্গার সুমতি বা দুর্মতি যা-ই হোক, আরও তেরোটা ব্লকে জেগে উঠেছে চর, যাকে লোকে বলে দিয়ারা । এই চরগুলো অনেক সময়ে বেগড়বাঁই করতে-করতে মেটেল জলের তলায় বর্ষায় ডুবকি মেরে লুকিয়ে পড়ে, আবার ফিরে আসে ঝিলিকদার হাসি ফুটিয়ে সারমাটি মাখা মাথা উঁচু করে । নারায়ণপুর, বিহপুর, খারিক, ফুলাউথ, নৌগাছিয়া, ইসমাইলপুর আর গোপালপুরে লোকবসতি জমে উঠেছে জামাইবাবার রাজত্বে ।
হেমন্তে, ঝিরিঝিরি হাওয়ার আদুরে সুড়সুড়িতে, বালির ছোটোছোটো নাভি ঘিরে আলতো ঘুর্ণিরা দিয়ারাময় খেলে বেড়ায় । সেই হাওয়াই আবার গ্রীষ্মকালে বালির ঘোমটা মাথায় দল বেঁধে দেহাতি বউদের ঢঙে দৌড়োয় চরের ওপর দিয়ে । বসন্তকালের বালি ডেকে আনে পোয়াতি পাখিদের, তাদের খোকা-খুকুকে বাছাই পোকা, ফড়িং, প্রজাপতি খাওয়াবে বলে ।
জামাইবাবা চোখে কালো রেব্যান চশমা, লাল বা নীল টিশার্ট আর ডেনিম-জিন্স পরে টাটা সুমোতে বা বোলেরোয় তবিয়ত খুশ করার জন্য ভাগলপুর শহর ঘোরেন, তমঞ্চাধারী দেহরক্ষীদের পাহারায় । বাবা-জ্যাঠার বাড়ি যেতে কি ইচ্ছে করে না ওনার ? করে । ছেলে হবার আগে আর পরে সবসুদ্দু পাটনার গর্দানিবাগের বাড়িতে গেছেন সাকুল্যে চারবার, বোলেরোয়, বন্দুকধারী দেহরক্ষী নিয়ে । কিন্তু দিয়ারার হারামখোর মৌজমস্তি আর শোধ-প্রতিশোধের আঘাত-প্রত্যাঘাত আক্রমণ-প্রতিআক্রমণ তো নেই সেই ছাপোষা বাঙালি জীবনে, বেবি নামের মেঠোগন্ধা সুঠামবুক নধরউরু গাঁইয়া নিরক্ষর চোরাটান বউ নেই, যার আয়ত গোবেচারি চাউনি সেই চোদ্দ বছর বয়সেই আটক থেকে গেছে। বাবা মারা যাবার খবর পেয়ে গিয়েছিলেন বটে, তবে ওনাকে কাঁধ দিতে দেয়া হয়নি, ক্রিমিনাল পরিবারে ছোটো জাতে বিয়ে করে ওনার কাঁধ নিচে নেমে গেছে বলে । ওনার ছেলেকেও কাঁধ দিতে দেয়া হয়নি, তার কাঁধ জারজ বলে আরও তলায় । শোকার্ত বিষণ্ণতার মর্মপীড়া ফর্দাফাঁই করে, ওনার মা ঘোষণা করেছিলেন যে সুশান্তর কুকর্ম সহ্য করতে না পেরেই বাবা মারা গেলেন।
বাবা মারা যাবার আগে যখন সুশান্ত ঘোষ পাটনার বাড়িতে গিয়েছিলেন, বাড়ির ছোটোবড়ো প্রতিটি সদস্যের জন্য হালআমলের স্মার্টফোন কিনে নিয়ে গিয়েছিলেন, বলেছিলেন, সিম কার্ড তোমরা যে-যার নিজেদের নামে কিনে নিও, আর যদি চাও তাহলে মাঝে-মাঝে ফোন কোরো । মেজজ্যাঠার নাতনি ইতু ছাড়া, প্রথমে ইতস্তত করলেও সকলেই নিয়ে নিয়েছিলেন, জেঠি-কাকি, ভাই-বউদি, ভাইপো-ভাইজি, এমনকি মা-বাবাও । বাবা মুখ গোমড়া করে বলেছিলেন, ঠিক আছে, টেবিলের ওপর রেখে দে । মা বলেছিলেন, এ তোর খুনোখুনির টাকায় কেনা নয়তো, দেখিস বাবা, তোর পাপের ভাগি করিসনি যেন আমাদের।
জবাবে সুশান্ত বলেছিলেন, আমি সেখানে কোনো কাজই করি না মা , ঠ্যাং ছড়িয়ে আরাম করি, সারাদিন খবরের কাগজ পড়ি, বাংলাও, টিভি দেখি, ইনটারনেট ঘাঁটি, খাইদাই আর ঘুমোই, যেমন ঘরজামাইরা করে । একটু থেমে, যোগ করেছিলেন, পিঁজরেপোলের ষাঁড়ের মতন ।
খোশগল্পপ্রিয় বড়জ্যাঠাইমা, প্রায়-ফোকলা হাসিমুখে, তখনই মোবাইলের কাগজ-বাক্স খুলে ফোনটা ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখে বলেছিলেন, আমি তোর সঙ্গে প্রায়ই কথা কইব, তুই আমাকে তোর নম্বরটা দিয়ে যা। কথা কইবার টাকা ফুরিয়ে গেলে তোর ওখান থেকে ভরিয়ে দিস । কেউ তো অ্যাদ্দিন কিনে দেয়নি, তুই দিলি ।
অমিত কোথায়, দেখছি না ? জানতে চেয়েছিলেন সুশান্ত ঘোষ । অমিত ওনার প্রথম যৌবনের বন্ধু অতনু চক্রবর্তীর ছেলে, যাকে শৈশবে ওনাদের গর্দানিবাগের বাড়িতে রেখে গিয়েছিলেন অতনু চক্রবর্তী ও তাঁর সঙ্গিনী মানসী বর্মণ ; তাঁরা জানিয়েছিলেন যে, নওয়াদায়, যেখানে তাঁদের বাস, সেখানে অমিতকে পড়াশোনা করানো সম্ভব নয়, তাঁদের রাজনৈতিক জীবনের সঙ্গে খাপ খাবেনা একটি শিশুর আধুনিক লালন-পালন, বুঝিয়েছিলেন অতনু-মানসী জুটি ।
--অমিত উচ্চমাধ্যমিক দেবার পর বাড়ি থেকে চলে গেছে, কাউকে কিছু বলে যায়নি । কাগজে বিজ্ঞাপন দেয়া হয়েছিল, হাসপাতাল, থানা-পুলিশ করা হয়েছিল, ওর কোনো পাত্তা নেই , বলেছিলেন ইতুর রাঙাকাকা, সুশান্তর ছোটো ভাই, যিনি অমিতের দায়িত্ব নিয়েছিলেন ; ওনার ছেলেপুলে হয়নি বলে বাড়ির সবাই অমিতকে পরিবারের সদস্য করে নিয়েছিল । সুশান্ত যখন সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠছিলেন, অকালমৃত ভাই অপাংশুর মেয়ে ইতুর সঙ্গে দেখা করার জন্য, সিঁড়ির বাঁকে অপেক্ষারত রাঙাবউ সুশান্তকে ফিসফিসিয়ে বলেছিল, অমিত আর ইতুর মাঝে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল, তিন তলার ছাদে অন্ধকারে গাঁজাপাতা খেয়ে দুজন জড়াজড়ি করছিল, তখন সেজোকর্তা ধরে ফেলেছিলেন । জানাজানি হতে অমিতকে এমন অকথা-কুকথা বলা হয়েছিল যে যেদিন ওর উচ্চমাধ্যমিকের ফলাফল বেরোলো সেদিন রাতেই কাউকে না বলে কোথাও চলে গেছে । তোমার কিডন্যাপ হয়ে চলে যাবার পর এটা এই বাড়ির আরেক মর্মান্তিক অঘটন । বিজ্ঞাপন-ফিজ্ঞাপন, হাসপাতাল-পুলিশের গল্প সব বানানো, বিশ্বাস কোরোনি ।
মানসী বর্মণ-অতনু চক্রবর্তীর ইচ্ছানুযায়ী, অমিতের পদবি স্কুলে বর্মণ হিসাবে নথি করানো হয়েছিল বলে বাবার সম্পর্কে অবজ্ঞামেশানো চাপা ক্রোধ পুষতো অমিত ।
সুশান্তর মেজজেঠার নাতনি, অপাংশুর মেয়ে ইতান, অর্থাৎ ইতুর সঙ্গে ওর তিন তলার ছাদের ঘরে দেখা করতে গেলে বলেছিল, কী করব মোবাইল ফোন নিয়ে, আমার কে আছে জগত-সংসারে যার সঙ্গে কথা বলব, সামনা-সামনিই কথা হয় না কারোর সঙ্গে, তো ফোনে কার সঙ্গে কথা কইব, আর দরকার পড়লে বাড়িতে তো ল্যাণ্ডলাইন আছেই ; তুমি কখনও আমাকে ফোন করেছ, যে মোবাইল ফোন দিতে এসেছ বড়ো ।
অমিত নিরুদ্দেশ হবার পর, ইতু মনে করে, ওর বিয়ের বয়স পার হয়ে গেছে ; ভ্রু কুঁচকে থাকার দরুন কপালে ভাঁজ পড়ে গেছে, কোমর হয়ে গেছে ভেতো , বয়সের তুলনায় উঁচু বুক। অপাংশুর একমাত্র সন্তান । অপাংশু আর ওর বউ যখন ডাক্তার দেখিয়ে হাতেটানা রিকশা করে কংকরবাগ থেকে ফিরছিল, তখন একটা ট্রাক ওদের রিকশাকে পেছন থেকে ধাক্কা মেরে, দুজনকেই চাপা দিয়ে, চলে যায় । ইনশিওরেন্সের টাকা আজ পর্যন্ত পাওয়া যায়নি । সেই থেকে, মনে করে ইতু, একান্নবর্তী পরিবারে ওর জায়গা ক্রমশ নেমে-নেমে ডিলুক্স চাকরানির স্তরে চলে গেছে । বাবা-মা মারা যেতে, এম বি বি এস এক বছর পড়ে ছেড়ে দিতে হয়েছে, কে-ই বা খরচ যোগাবে? বেশ কিছুকাল দুঃখিত ক্রোধে আচ্ছন্ন থাকার পর নিজের প্রগলভা সদালাপী দুঃসাহসী নির্ভীক আন্তরিকতায় ফিরেছে । এম বি বি এস এর বিকল্প হিসাবে, বাবার রেখে যাওয়া সঞ্চয়ে, পড়েছে অলটারনেটিভ মেডিসিন । মানুষের জন্য কিছু করতে হবে, সমাজের জন্য কিছু করতে হবে, দেশের জন্য কিছু করতে হবে, অন্তত অলটারনেটিভ মেডিসিনের মাধ্যমেই করা যাক, ভেবেছিল ইতু ।
সুশান্ত বেফাঁস বলে ফেলেছিলেন, বিয়ে করলি না কেন ?
গোখরো সাপের ছোবলের আগে সতর্কবার্তার মতন ইতু বলে উঠল, বিয়ে ? চাইলেই বিয়ে করা যায় নাকি? বাড়ির কেউ কি কখনও চেষ্টা করেছে আমার বিয়ের ? তোমার ভাইরা তোমার ভাইপো-ভাইঝিদের বিয়ে দিয়েছে, তারা যে যার বিয়ে করে সংসার পেতে ফেলেছে, আর প্রায় সকলেই মা-বাপের দায়-দায়িত্ব এড়াবার জন্য এবাড়ি ছেড়ে, নানা অজুহাত দেখিয়ে, পালিয়েছে । তোমার জেঠা-কাকারা নিজের-নিজের মেয়েদের বিয়ে দিয়ে দিয়েছে, ব্যাস, সবায়ের সব দায়িত্ব শেষ । সহানুভূতির জন্য টিকে আছে শুধু তিনজন বুড়ি, বটঠাকুমা, মেজঠাকুমা আর তোমার মা, মানে আমাদের অন্নমা, যাঁদের আর তেমন গুরুত্ব দেয় না এই একান্নবর্তী নৌটাংকি পরিবার । এরা এমন যে এদের সুবিধা হবে ভেবে রেলপার বস্তি থেকে একজন বাংলাদেশি বউকে এনেছিলুম রান্নাঘরের পুরো কাজ করার জন্য, থাকা-খাওয়ার বিনিময়ে, তা তোমার কায়েত পরিবার বামুনগিরি ফলিয়ে বলল যে বাড়ির কাজে মুসলমান চলবে না ।
--কেন, অলটারনেটিভ মেডিসিন পড়লি, তার একটা দাম তো আছে, কত লোকজনের সঙ্গে মেলামেশা করছিস ।
--হুঃ, অলটারনেটিভ মেডিসিন । এম বি বি এস কোর্স পুরো করার মতন টাকা খরচ করতে চায়নি তোমার খুড়তুতো-জাঠতুতো ভাইরা, জ্যাঠা-বাবা-কাকারা, তোমার নিজের ভাই রাঙাকাকার কথা তো যত কম বলা যায় ততই ভালো , তাই ওই সস্তার ডাক্তারি পড়তে হল, তাও ডিপ্লোমা, একটা অখদ্দে প্রাইভেট কলেজে । তুমি তো এ-বাড়ির ত্যাজ্যপুত্র, নয়তো তোমার দিকে হাত বাড়াতে পারতুম । কিন্তু তুমি কখনও জানতে চাওনি যে মা-বাপ মরার পর ইতুটা কেমন আছে, কী করছে । আমার বাবা তো আর জেঠাদের মতন মাইনে পেত না, যেটুকু সঞ্চয় রেখে গেছে, তা থেকেই চেম্বার খুলেছি, সাইনবোর্ড টাঙিয়ে, বিহারি ডাক্তারদের মতন বড়ো-বড়ো করে ডাক্তার ইতু ঘোষ লিখে। মাসে একটা কি দুটো রোগি আসত, তাও তাদের পয়সাকড়ি খরচ করার যোগ্যতা নেই বলে আসত ; যারা আসত তারাও অবাক হতো যে আমি কেন রাংতায় মোড়া ট্যাবলেট দিচ্ছি না । খগোলের গরিব বস্তিতে গিয়ে ফোলডিং টেবিল পেতে রোগিদের সেবা করার চেষ্টা করেছি ; তারাও ভাবে ওষুধের বড়ি নেই, ইনজেকশান নেই, এ আবার কেমন ডাক্তার, জড়িবুটি দ্যায়, গা-হাত-পা টেপে, জলে মাথা ডোবাতে বলে । শুধু ভাড়াই গুণে যাচ্ছি । এবার বন্ধ করে দেবো । ভেবেছিলুম যে গরিবদুঃখিদের জন্য অন্তত এইটুকু তো করি, জীবনের একটা উদ্দেশ্য তো হোক । কিছুই হল না । আই অ্যাম জাস্ট এ ফেলিয়র ।
--কেন, অলটারনেটিভ মেডিসিনের প্রচার তো ভারতের ট্যুরিস্ট ডিপার্টমেন্টও করে ।
--সেই ডাক্তারদের চেম্বারে গিয়েছ কখনও, তাদের তো চেম্বার নয়, বিরাট দপতর থাকে, বাগানবাড়ি থাকে, কয়েকজন লোক খাটে, ওষুধের বিরাট ভাঁড়ার । ব্যবস্হাও ভালো । অলটারনেটিভ মেডিসিন জিনিসটা কী তা জানো ?
--না । কী ?
--হাইড্রোথেরাপি, অ্যাকুপাংচার, অ্যারোমাথেরাপি, আয়ুর্বেদ যাকে আমরা বলি হার্বালিজম, হিপনোথেরাপি, রেইকি, ম্যাগনেট থেরাপি, চিরোপ্র্যাকটিক এটসেটরা । একবার কেরলে গিয়ে দেখে এসো , তোমার যা ঝিল্লিদার চর্বি জমছে, ট্রিটমেন্ট করিয়ে এসো । অনেকে হোমিওপ্যাথিও করে , যদি কোর্সটা আলাদা করে পড়া থাকে । আমার সঙ্গে যারা অলটারনেটিভ মেডিসিন পাশ করেছিল তারা প্রায় সবাই ক্লিনিকে বসে অ্যালোপ্যাথিক মেডিসিনকে গুঁড়িয়ে পুরিয়া তৈরি করে রোগিদের রোগ সারাচ্ছে । আমি এখনও, আনফরচুনেটলি, বিবেক নামের ইডিয়সিটা ঝেড়ে ফেলতে পারিনি বলে গরিব মানুষদের ঠকাতে পারছি না। ট্রাই করে যাচ্ছি ।
--বিয়ে করলি না কেন । অলটারনেটিভ মেডিসিন বাদ দে । এমনি হাউসওয়াইফ ম্যারেজ তো করতে পারতিস ।
--কে বিয়ে করত আমায় । তোমার মতন গায়ের রং পাইনি । তোমার মায়ের মতন নাক, দিদিদির মতন চোখ, কিছুই তো পাইনি । শুধু একরাশ চুল পেয়েছি আমার মায়ের মতন । চুল দেখে কে-ই বা বিয়ে করে আজকাল ? লাখ দশেক টাকা ছড়ালে হয়তো দুচারটে কাক-চিলকে ফাঁসানো যেত । তা কে করবে ? তোমাকে যখন কিডন্যাপ করেছিল তখন তোমার শশুরবাড়ির লোকেরা দশ লাখ টাকা চেয়েছিল । দিতে পারেনি তোমার বাবা-জেঠারা । সবাই মিলে হয়ত যোগাড় করতে পারত টাকাটা, কিন্তু এ-বাড়ি হল মানসিক দারিদ্র্যে সমৃদ্ধ।
--তুই কি কাউকে বিয়ে করতে চাইছিলি ?
--বিয়ে করতে চাইলেই তো আর তাকে বিয়ে করা যায় না । পাত্র যদি বাপের পদবির বদলে তার মায়ের পদবি নিয়ে জন্মায়, যদি সেই পাত্রের মা তার বাবার নয়, অন্য কারোর বউ হয়, যদি সেই পাত্রকে তার মা-বাপ অনাগ্রহী এক দম্পতির কোলে ফেলে দিয়ে কেটে পড়ে, তাহলে সেই পাত্রকে কোন চোখে দেখা হয় জানো ? কুলের কলঙ্ক । আমি সেরকম এক পাত্রকে পছন্দ করেছিলুম, কিন্তু বাড়ির গুরুজনদের মতে, যদিও তারা পষ্টাপষ্টি সেকথা বলেনি, ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে বলেছে যে অমন পাত্র এই বাড়ির সম্মানের উপযুক্ত নয় । তোমাকেই এরা আজ পর্যন্ত স্বীকার করতে পারল না তো যার বাবা-মায়ের সম্পর্ক সন্দেহজনক তাকে স্বীকার করবে কী ভাবে ? তোমারই তো নিকট বন্ধু ছিল অতনু চক্রবর্তী আর তোমার এককালের সহকর্মী ছিল মানসী বর্মণ । মানসী বর্মণ নাকি অতনু চক্রবর্তীর চেয়ে দশ বছর বড়ো, আর তাঁরা লিভ টুগেদার করতেন, মানসী বর্মণ আর অতনু চক্রবর্তী নাকি মানসীর স্বামীর সঙ্গে একই বাড়িতে থাকতেন । তাতে তাদের ছেলে কী দোষ করল ? আর যদি তোমরা এতই রক্ষণশীল ছিলে তো শিশুটাকে এবাড়িতে রেখে মানুষ করবারই বা কী দরকার ছিল ? ওনারা কোথায় থাকেন তাও এবাড়ির কেউ জানে না, জানবার চেষ্টা করেনি । তোমার তো বন্ধু ছিল ওরা, এই অতনু-মানসী জুটিকে কেমন দেখতে বলোতো ? কেমনতর রাক্ষস-রাক্ষসী যে নিজেদের বাচ্চাকে অন্যের কোলে চাপিয়ে হাঁফ ছেড়ে বাঁচে?
--কেন, রাঙা আর রাঙাবউ তো অমিতকে নিজের ছেলের মতনই মানুষ করেছে বলে জানি ।
--কিছুই জানো না । তোমার মায়ের পেটের ভাই, সে তোমার বিপরীত । অমিতকে দত্তক তো আর নেয়নি; এমনিই কোলে নিয়েছিল । আর তারপরেও বাচ্চা হবার জন্য আইভিএফ করাতে কলকাতা দৌড়োতো । কতবার যে সে আইভিএফ ফেল করল আর প্রতিবার লাখ খানেক করে গচ্চা গেল, তার কোনো হিসেব আছে ? ওই টাকায় ওরা অমিতকে ভালো স্কুলে পড়াতে পারত । ওই যে বলে না, দাঁত নেই, চলেছে বিষকামড় দিতে, রাঙাকাকার অবস্হা তেমনই । আইভিএফ করালে সে বাচ্চাটা রাঙাকাকার হতো না, অন্য কারোর হতো, তাতেও আপত্তি নেই, অবশ্য দেখতে-শুনতে ভালো হতো, ফর্সা ঢ্যাঙা ডোনারের বীজ নিলে ।
--আর গাঁজাটাজা খাস না তো ? কন্ঠস্বর নামিয়ে জানতে চেয়েছিলেন সুশান্ত, প্রশ্রয়দানকারী জেঠামশায়ের ভূমিকায় অভিনয় করার চেষ্টায় ।
দীর্ঘ চুলের ঝাপট বুক থেকে পিঠে উড়িয়ে, উঁচু গলায় ইতুর জবাব, ওঃ, তোমাকে জানানো হয়ে গেছে, তোমারও দেখছি এজেন্ট রয়েছে এ-বাড়িতে । তারপর যোগ করেছিল, কলেজে পড়ার সময়ে মারিহুয়ানা ফোঁকেনি, এমন ছাত্রছাত্রী তোমাদের জুরাসিক যুগে ছিল, তোমার ছেলেও হয়ত খায় বা খেয়েছে, জিগ্যেস করে দেখো । কলেজ তো বহুদিন ছেড়েচি, মৌজমস্তি করার টাকাকড়ি কোথায়, যে ওসবে ইনডালজ করব ? বিরক্তি ধরে গেছে জীবনে, কিচ্ছু ভাল্লাগে না । আমার আইডেনটিটি কী ? গ্যাসভরা ফানুস !
--কবে চলে গেছে অমিত ? সুশান্ত সরাসরি প্রশ্ন তুললেন, যে ভাবে উকিলরা সাক্ষীদের প্রশ্ন করে ।
--চার বছরের বেশি । কে জানে বেঁচে আছে কি না । অপমানে হয়ত আত্মহত্যা করে থাকবে । প্রায় ফুঁপিয়ে ফেলেছিল ইতু, সামলে নিল ।
সুশান্ত বললেন, মোবাইলটা নে, মন খারাপ হলে আমার সঙ্গে কথা বলিস । তোকে দেখতে যথেষ্ট ভালো ; কলেজে তোর ছেলে-বন্ধুরাই এককালে লাইন মারত বলে শুনেছি । তুই-ই কাউকে প্রশ্রয় দিসনি, এখন বুঝতে পারলুম যে তার কারণ অমিত বর্মণ ।
সুশান্তকে স্তম্ভিত করে ইতু বলল, তুমি আমাকে কিডন্যাপ করিয়ে দাও না, তোমার ওখানকার কারোর সঙ্গে বিয়ে দিয়ে দিও, সুখে ঘর করব, কথা দিচ্ছি, সিরিয়াসলি বলছি, তুমি আমাকে কিডন্যাপ করিয়ে নাও, কবে কোথায় গিয়ে দাঁড়াতে হবে বল, সেই মতো অপেক্ষা করব । জীবনটা তো জীবনের মতন হয়ে উঠুক । একটা উদ্দেশ্য তো হোক বেঁচে থাকার । তুমি জানো , তথাকথিত এই একান্নবর্তী পরিবারে আমি সবচেয়ে বেশি বোল্ড, যা ভালো বুঝি তা-ই করি, সব্বাই কাওয়ার্ড, ইনক্লুডিং অমিত । মেজমাসির মেয়ে ফুলকিও বোল্ডনেস দেখালো । জানো তো ফুলকি বাচ্চা হবার পর ওর বরকে ডিভোর্স দিয়ে আবার সেই বরের কাছেই ফিরে গেছে, বাচ্চাও হয়েছে । আসলে পারপাস, জীবনের একটা পারপাস চাই, অভিমুখ চাই ।
--আমার দিয়ারার গাঁয়ের যে কোনো যুবক তোকে বিয়ে করতে চাইবে, সম্রাজ্ঞী বানিয়ে রাখবে, কিন্তু বিয়ে করতে পারে এমন কেউ তোর বয়সী তো নেই । ওখানে ছেলেদের ছোটোবেলাতেই বিয়ে হয়ে যায় ।
--তাতে কি । কম বয়সী বরও তো হয় অনেকের, কিংবা আমি কারোর দ্বিতীয় বউ হয়ে থাকব, সুখে-শান্তিতে তো থাকব, কারোর সংসারের সুখ-দুঃখের অংশীদার হয়ে, বেঁচে থাকার পারপাস তো হবে । আমার মাথার ভেতরে একজন ল্যাংটো ইতুকে তো শান্তি দিতে পারব । আমার কি সাধ-আহ্লাদ, ইচ্ছা-অনিচ্ছা নেই ? প্রেমিককে চুমু খাওয়াও এরা সহ্য করতে পারে না, কেননা তাদের মতে সে প্রেমিক সম্ভবত বেজন্মা ।
--কী বলছিস জানিস ? আমার ছেলেকেও একই সঙ্গে গালাগাল দিচ্ছিস ।
--হ্যাঁ, এরা তো তা-ই মনে করে । তোমার ছেলের তো এ-বাড়িতে প্রবেশ নিষিদ্ধ । জানি না তুমি কেন আত্মসম্মান খোয়াবার জন্য যেচে এসেছ ।
--সকলের জন্য মাঝে-মাঝে মনকেমন করে রে ।
--এ-বাড়িতে আমি তো একজন শ্রদ্ধেয় চাকরানি, গ্লোরিফায়েড মেইড । সুশান্তকে উত্তরহীন বসে থাকতে দেখে ইতু বলল, দেখলে তো, সমাধান কারোর কাছে নেই, সবাই কেবল উপদেশ ঝাড়ে । তোমার বউকেই এরা আসতে দিতে চায় না এমন কনজারভেটিভের এঁটো-খাওয়া বংশ । কোন জগতে তুমি বাস করো গো ? এখনও মনকেমন টাইপ আবেগে ভোগো !
মোবাইলটা হাতে তুলে নিয়ে ইতু বলেছিল, সিমকার্ড কেনার টাকা দিয়ে যাও, আর মাঝে-মাঝে তোমার ওখান থেকেই রিচার্জ করিয়ে দিও । জানি এতে অনেক খেলা-টেলা থাকে, তাই করেই টাইমপাস করব, আমাদের বাড়ির কাজের বউয়েরও মোবাইল আছে যখন , আমি তো বললুম তোমাকে, আমি হলুম গ্লোরিফায়েড খাওয়াপরার মেয়ে, চব্বিশ ঘণ্টার।
সুশান্তর প্রায়-ফোকলা বড়জ্যাঠাইমা অবশ্য প্রস্তাব দিয়েছিলেন, নিয়ে আয় না তোর বউকে, কি হয়েছে, আমরা তো সবাই তোর বউয়ের ভাষায় কথা বলতে পারি । মোবাইলে বড়জেঠিই সুশান্তর সঙ্গে প্রথম কথা বলা আরম্ভ করেছিলেন, তখন উনি জামশেদপুরে ছেলের কাছে, হাসপাতাল থেকে ফোন করতেন । বড়জ্যাঠাইমার বড়ছেলে বিয়ে করে আলাদা হয়ে বদলি নিয়ে বউ-ছেলে-মেয়েসহ চলে গেছে জামশেদপুর । বড়জ্যাঠাইমা গিয়েছিলেন কিন্তু ছেলের বাড়িতে ওঠেননি, ওনাকে ছেলের বউ ফ্ল্যাটের চৌকাঠ পেরিয়ে ভেতরে ঢুকতে দেয়নি । যে তিন মাস জামশেদপুরে ছিলেন সে তিন মাস ছেলে ওনাকে এক হাসপাতালের শীতাতপ আরামে ভর্তি করে দিয়েছিল ; প্রতিদিন সকাল বিকাল গিয়ে দেখা করত ; দুয়েকবার ছেলে-মেয়েকে নিয়ে গিয়েছিল মার সঙ্গে তাদের সম্পর্ককে ঘনিষ্ঠ করে তোলার জন্য । হাসপাতালের স্বাস্হ্যকর খাবার খেয়ে সুশান্তর জেঠির চেহারার খোলতাই হয়ে গিয়েছিল । ছেলের বউ চেয়েছিল যে তার বুড়ি বিধবা মা, একা, চোখে ভালো দেখতে পান না, থাকুন পাটনায় ছেলের বাড়িতে ; তাতে সুশান্তর বাবা-কাকা-জেঠারা রাজি হননি । এসব ঝুটঝামেলা এড়াতে বড়জ্যাঠাইমার ছেলে বদলি নিয়ে পালিয়েছে জামশেদপুর । ছোটোছেলে আমেরিকায় পড়তে গিয়ে আর ফেরেনি ; ওখানের চিনা মেয়েকে বিয়ে করে থেকে গেছে, দুই মেয়ের চিনাভাষায় নাম রেখেছে ।
সুশান্তর বাবা কখনও ফোন করেননি ওঁকে । ইতু ফোন করে জানিয়েছিল যে সুশান্তর মায়ের মোবাইলটার প্যাকিঙই খোলা হয়নি । যেখানে সুশান্ত রেখে গিয়েছিল ড্রইংরুমের সেই সাইড টেবিলেই ধুলোর ওপর পড়ে আছে । কাজের বউ সৌদামিনীও ঝাড়পোঁছ করার সময়ে তাতে হাত দেয় না ।
তারপর সুশান্ত ঘোষের বাবা মারা গেলেন । হয়ত উনিও ফোনটা ব্যবহার করেননি ।

পাঁচ
পুড়তে-থাকা কুঁড়েঘরগুলোর মাঝে দাঁড়িয়ে, এ কে সানতালিস রাইফেলটা হাতে নিয়ে, সিলভারব্যাক গোরিলার ঢঙে বুক চাপড়ে, রগ বয়ে যৌবন-প্রাপ্তির মস্তির রস ঝরানো যুবক হাতির মতন, অপুর, অশ্বমেধ ঘোষ-এর, কন্ঠস্বর থেকে যে চিৎকার বেরিয়ে এলো তাকে বৃংহনের সঙ্গেই তুলনা করা যায় । তার কারণ অপু ক্রোধেও গালাগাল দিতে পারে না, দিতে না-পারার অতিরিক্ত আক্ষেপে ক্রোধ মাথায় উঠে যায় ; সে-উক্তিগুলো ওর সাঙ্গপাঙ্গরাই করছিল ।

ছয়
বাবা-মার জন্য স্মৃতির জারকে আচ্ছন্ন সুশান্তর মনকেমন করে মাঝেসাঝে, তখন গ্যাঁজানো তরমুজের চোলাই-করা সোমরস নিয়ে বসেন, সঙ্গে শুয়োরের মাংসের বড়া , আদা-রসুন-পেঁয়াজবাটা আর বেসন মাখা, হামান দিস্তায় থেঁতো করা মাংসের বড়া, সাদা তেলে যা রাঁধতে ওনার বেবি নামের মেঠোগন্ধা বউয়ের ভারিভরকম মায়ের জুড়ি নেই । ওনার ছেলে অপু , যদিও বাংলা বলতে পারে, কিন্তু মাকে শুনিয়ে হিন্দিতেই বলে, হাঁ পিজিয়ে পিজিয়ে অওর গম গলত কিজিয়ে ; আরে অগর আপকা দিল নহিঁ লগতা থা তো ভাগ কেঁও নহিঁ গয়ে থে ? য়ঁহাসে নিকলকে ভাগলপুর স্টেশন, অওর ওঁয়াহাসে সিধে পটনা, স্টেশন ভি ঘর কে নজদিক । পর আপ নহিঁ ভাগে । লগতা হ্যায় আপকো অপনে বিবি সে জ্যাদা প্যার অপনে সসুর সে হ্যায় । বিবি কহিঁ ভি মিল জাতি, মগর তারিণী মণ্ডলকে তরহ মকখনভরা পহাড় নহিঁ মিলতা, য়হি হ্যায় না আপকা গম ?
তারিণী মণ্ডলের হাঁটু-ডিংডং স্ত্রী, ফোকলা গুটকাদেঁতো হাসি হেসে নিজের মহিষ-কালো বরকে খুসুরফুসুর কন্ঠে বলেন, দোগলা হ্যায় না আপকা পোতা, ইসিলিয়ে বহুত দিমাগ রখতা হ্যায় । সাধারণ জারজ নয়, বাঙালি-বিহারি, উঁচুজাত-নিচুজাত, পড়াশোনাঅলা- মুখ্খু, শহুরে-গাঁইয়া, গরিব-মালদার, কানুনি-গয়েরকানুনি, কলমচি-খেতিহর, কত রকমের মিশেল ।
--আরে মাথা তো খাটিয়েছিলুম আমি ছোঁড়াটাকে বন্ধক বানিয়ে, ঘরজামাইও পেলুম, আবার নসলও ভালো হয়ে গেল । এখন কয়েক পুরুষ চকচকে ফর্সা বাচ্চা পাবি ; অপুর মেয়েদের বিয়ে দিতে বেশি অসুবিধা হবে না। জামাইবাবার মেয়ে না হওয়াই ভালো, কী বল ? বলল তারিণী মণ্ডল, ডান চোখে হাসি মেলে । যখন সুশান্ত ঘোষকে কিডন্যাপ করেছিল, তখন অবশ্য দুটো চোখই ছিল,বাঁ চোখটা নষ্ট হয়নি রামধারী ধানুকের হামলায় ।
--সে কথা ঠিক । আমি তি ভেবেছিলুম ছোঁড়াটা পালিয়ে যাবে ।
--আমার মেয়ের সঙ্গে রাত কাটিয়ে পালিয়ে গেলেই হল ? ধরে এনে কেটে টুকরো করে দিয়ারার বালিতে পুঁতে দিতুম ।
--ছোঁড়াটা ভালোবেসে ফেলেছে ওর গালফোলা বউকে । শোবার সময় রোজ রাতে খুশবুর টিন থেকে গ্যাস মারে তোমার মেয়ের গায়ে, দ্যাখো না কেমন গন্ধ ভুরভুর করে বেবির গা থেকে, মনে হয় চবুতরা জুড়ে ফুলের গাছ ? ভৌঁরাভৌঁরি জোড়ি ।
--তাজ্জব ব্যাপার, না ? বকের সঙ্গে কোকিলের বিয়ে !
--তাজ্জবের কি আছে । এরকম কচি কুচুরমুচুর মেয়ের সঙ্গে কি ওর বিয়ে হতো ওদের নিজেদের সমাজে ? কোনো দরকচা হেলাফেলা টিড্ডিছাপ বউ পেতো ।
--কি যা তা বকছিস নিজের মেয়ের সম্পর্কে ।
--সত্যি কথাটাই বলছি । নিজের বিয়ের কথা মনে করে দ্যাখো । তুমিও কচি কুচুরমুচুরই পেয়েছিলে । ওই কুচুরমুচুর জিনিসটাই হল মেয়েদের দুসরা দিল, যা মরদদের থাকে না । দ্বিতীয় হৃদয়ে রক্ত থাকে না, থাকে রসালো মাদকের ফাঁদ, যে ফাঁদে একবার পড়লে রোজ-রোজ পড়ার নেশায় মরদরা ভোগে, যতদিন সে মরদ থাকে ততদিন তো ভোগেই ।
--তা ঠিক, ছিলিস ছাপ্পানছুরি-ছইলছবিলি । এটা কোনো টিভি সিরিয়ালের সংলাপ বললি নাকি ? ছোঁড়াটা নাকি প্রথম রাতেই রক্তারক্তি করে ফেলেছিল ?
--হ্যাঁ । বেচারা । গলার শেকল খুলে-দেয়া শহুরে রামছাগল । কত দিনের বদবুদার তবিয়ত ।
--ওদের বিয়ে দিতে এত দেরি করে কেন জানি না । কম বয়সের টাটকাতাজা রস সব বেকার বয়ে চলে যায় ।
--দেরি করে বলেই তো পেলে ছোঁড়াটাকে ।
তা নয় ; কৃষিবিজ্ঞানে স্নাতক সুশান্ত ঘোষ হয়ে গেছেন দিয়ারাচরিত্রের উন্মূল মানুষ । যখন নোট গোণার চাকরি করতেন, তখন বিহারি জোতদার পরিবারের যুবকদের মতন, রাজপুত ভূমিহার কুরমি যারা, কিংবা ব্রাহ্মণ কায়স্হ বিহারি আমলার শহুরে ছেলেদের ধাঁচে, অফিসে প্রতি ঋতুতে হালফ্যাশান আনতেন। ব্র্যাণ্ডেড জ্যাকেট জিন্স টিশার্ট উইন্ডচিটার । দপতরের গৃহবধু কর্মীদের চোখে সুশান্ত ঘোষ ছিলেন অবিনশ্বর জাদুখোকোন, লিচুকুসুম, মাগ-ভাতারের অচলায়তনের ফাটল দিয়ে দেখা মুক্ত দুনিয়ার লালটুশ । গেঁজিয়ে যেতে পারতেন, চোখে চোখ রেখে, ননস্টপ, যেন বাজে বকার মধ্যেই পালটে যাচ্ছেন পৌরাণিক কিন্নরে, সবায়ের অজান্তে । গায়কের ইশারায় যেভাবে ধ্বনিপরম্পরা টের পায় তবলাবাদকের আঙুলের ছান্দসিক অস্হিরতা, তেমনই, নৈশভোজে বেরোনো শীতঘুম-ভাঙা টিকটিকি যুবকের মতন, মহিলা সহকর্মীদের অবান্তর কথাবার্তা, ভোজপুরি বা হিন্দি বা বাংলায় বা ইংরেজিতে, বলার জন্যই বলা, শ্বাসছোঁয়া দূরত্বে দাঁড়িয়ে গিলতেন সুশান্ত ঘোষ ।
এখন আর ওনার, সুশান্ত ঘোষের সম্পর্কে, আগাম বলা যায় না কিছু । চাকরি করতেন পচা টাকার নোট জ্বালিয়ে নষ্ট করার । এখন কাঁচা টাকার করকরে আরামে ঠ্যাং তুলে খালি গায়ে, ভুঁড়ির তলায় চেককাটা লুঙ্গি পরে, লুঙ্গির গেঁজেতে সেমিঅটোমেটিক পিস্তল, যা জীবনে কখনও চালাননি, শাশুড়ির পরানো কালো কাপড়ের ছোট্ট তাবিজ গলায় , নিজেকে অন্যমানুষে পালটে ফেলার আনন্দে তরমুজ-সোমরসের হেঁচকি তোলেন। যা একখানা চেহারা করেছেন, ওনার স্তাবকরা নিজেদের মধ্যে আলোচনার সময়ে ওনাকে বলে গেণ্ডা-মরদ অর্থাৎ আলফা গণ্ডার ।
প্রতি রাতে শোবার আগে বিবসনা বউয়ের আগাপাশতলা বডি ডেওডোরেন্ট স্প্রে করেন সুশান্ত ঘোষ বা গেণ্ডা-মরদ, মানে আলফা গণ্ডার । এমন নয় যে বেবি নামের মেঠোগন্ধা বউয়ের গায়ে দুর্গন্ধ ; প্রথম রাতেই সুশান্ত ঘোষ একটা স্যান্ডালউড সাবান কিনে বলে দিয়েছিলেন যে রোজ এই সাবান মেখে স্নান করতে হবে, সপ্তাহে একদিন শাম্পু করতে হবে । বউই আসক্ত হয়ে গেছে ডেওডোরেণ্টের, শ্যাম্পুর, লিপগ্লসের, লিপস্টিকের, ফেয়ার অ্যাণ্ড লাভলির, কমপ্যাক্ট পাউডারের, ওলে টোটাল এফেক্টের, নখপালিশের, পিচ-মিল্ক ময়েশ্চারাইজার আর নানা আঙ্গিকের শিশি-বোতল-কৌটোর-ডিবের সুগন্ধের নেশায় ।
শহুরে দশলাখিয়া বরকে বশ করার জন্য, টিভিসুন্দরীরা যা মাখে, তা মেখে কৃষ্ণাঙ্গী-অপ্সরা হবার প্রয়াস করে বেবি, সুশান্ত ঘোষের মেঠোগন্ধা নিরক্ষর শ্যামলিমা চির-তুলতুলে বউ, আর সুশান্তর শাশুড়ি বশ করার মন্ত্রপূত তাবিজ পরিয়ে জামাইকে বেঁধে রেখেছেন বেবির আপাত-বেবিত্বে ।
কোনো রাতে মাতাল অবস্হায় সুশান্ত ঘুমিয়ে পড়লে, মাঝরাতে বউ ওনাকে ঠেলে জাগিয়ে দিয়ে বলে, উঠিয়ে না, নিন্দ নহিঁ আ রহল , জরা গ্যাস মার দিজিয়ে না । হাত বাড়িয়ে মাথার কাছে রাখা একাধিক ডেওডোরেন্টের স্প্রে থেকে যেটা হাতে পান বউয়ের পোশাকহীন গায়ে সুগন্ধী বর্ষা ছিটিয়ে এক খেপ দ্রূত-প্রেম সেরে ফেলে দুজনে দুপাশ ফিরে ঘুমিয়ে পড়েন । অনেক সময়ে বেবি নামের মেঠোগন্ধা নিরক্ষর বউ আগেই হুশিয়ারি দিয়ে রাখে, জল্দিবাজি মত কিজিয়ে, ধিরজ সে কিজিয়ে, বুডঢি নহিঁ না হো গয়ে হ্যাঁয় হম ।
ডেস্কটপের মনিটারে , বেবি নামের মেঠোগন্ধা শ্যামলিমা বউকে, পর্নো ফিল্ম দেখিয়ে আরো বিপদ ডেকে এনেছেন নিজের । বেবি বলে, ফিলিম মেঁ জইসন কর রহা হ্যায় ওইসন কিজিয়ে না, উঠাইয়ে, লেটাইয়ে, গিরাইয়ে, গিরিয়ে, পটক দিজিয়ে, সাঁস ফুলাইয়ে, মুহ সে প্যার কিজিয়ে, হমকো ভি মৌকা দিজিয়ে । কেতনা দের তক ভোগ করতা হ্যায়, অওর আপ হ্যাঁয় কি কবুতরকে তরহ ঝপট লিয়ে বস সো গয়ে । শুন রহেঁ হ্যাঁয় নাআআআআআ । তারপর বলে, দেখেছেন তো ওরা কেউ পৈতে পরে না ; আপনি যদি পৈতে পরতেন তাহলে সুতোর লচ্ছা সামলাতেই আমাদের সময় চলে যেত , ভালো করেছেন পৈতে পরা বন্ধ করে ।
ঘুমনেশার ঘোরে সুশান্ত বলেন, আরে ওরা সব সাহেব-মেম কিংবা হাবশি, কুমিরের মাংস, বনমানুষের মাংস, ঘোড়ার মাংস, হাতির মাংস খায়, গাধার মাংস খায় ।
--হাঁ, সে-কথা ঠিক, হাতিদের মতন ; হাতিরা কেমন নিজেদের গোমোরের জিনিসকে লটকিয়ে হাঁটে, মাটিতে ছুঁয়ে যায়। আপনি অপুকে বিলেতে পড়াশুনা করতে পাঠাতে চাইছেন ; সেখানে গিয়ে ও যদি মেম বিয়ে করে তাহলে তো সঙ্গত দিতে-দিতে হালকান হয়ে যাবে ! বিয়ে দিয়ে পাঠাতে পারতেন ; ওর বউ থাকত দিয়ারায় আমাদের সঙ্গে ।
--ওখানে বিয়ে করার দরকার হয় না ; না করেই একসঙ্গে থাকা যায় । সঙ্গত মনের মতন না হলে আরেকজনের কাছে চলে যাওয়া যায়, বুঝলি ?
--তাহলে তো ভালোই, মন ভরে গেলে বাড়ি ফিরে আসবে ; তখন ওর বিয়ে দেবেন ।
অপুর মা, সুশান্তর মেঠোগন্ধা নিরক্ষর বউ, পর-পর কয়েকদিন মাঝ রাতে ঘুম ভাঙাবার পর বলে ফ্যালে, চাহিয়ে তো এক বংগালন বিবি শাদি করকে লাইয়ে না পটনা য়া কলকত্তা সে, সাহব-মেম খেলিয়েগা দোনো মিলকর, জইসন নঙ্গা-ফিলিম মেঁ দিখাতা হ্যায়, কেতনা মছলি পকড়া যাতা হ্যায় অপনে হি নদী মেঁ, বড়কা-বড়কা রোহু । ঘরকা বনা মিঠাই খাতে হম লোগ সব । আপ চখতে বংগালন বিবি কি মিঠি চুচি । হমরে বিছওনে মেঁ হি, লগাকে মচ্ছরদানি, পিলাসটিকবালা গুলাবি মচ্ছরদানি । নহিঁ তো কলকত্তা যাইয়ে না, বংগালন রণ্ডিলোগন কা বাজার নহিঁ হ্যায় ওয়াহাঁ কাআআআআআআ ? কমর হিলাকে আইয়ে, অইসন দুখি-দুখি মত রহিয়ে, অওর দারু মে মত ডুবে রহিয়ে রাত ভর ; দারু পিকে আপ একদম সঠিয়া যাতে হ্যাঁয় । দিন মেঁ পিজিয়ে দারু, কৌনো মনা কিয়া হ্যায় কাআআআআ ? রতিয়া কে বখত বদনওয়া ফিরি রখিয়ে জি ।
বারবার শুনে বিরক্ত সুশান্ত একদিন বলেছিলেন, ঠিক আছে, নিয়ে আসবো একজন লেখাপড়া-শেখা বাঙালি মেয়ে বিয়ে করে । নাছোড়বান্দা বেবি, যাকে বলা যায় তৎক্ষণাত, প্রত্যুত্তর দিয়েছিল, নিয়ে এসে দেখুন না, আপনার আর আপনার বাঙালি বউয়ের মাথা, সেই দিনই হাসুয়া দিয়ে ধড় থেকে নামিয়ে দেবো ; জানেন তো আমি তারিণী মণ্ডলের মেয়ে ।
--হ্যাঁ, জানি, তুই প্রথমে তারিণী মন্ডলের মেয়ে, তারপর আমার বউ । ধড়টা তো তোকে দিয়েই দিয়েছি, আর আলাদা করে নিয়ে কী করবি ? আর মুণ্ডুও অনেকসময়ে তোর উরুর ঝক্কি সামলায় ।
--খারাপ লাগল শুনে ? তাহলে মাফ করে দিন । আমি বেবি ঘোষ, আপনিও জানেন, আমিও জানি, ভোটার লিস্টে দেখে নেবেন, আমি তো লিখাপড়হি জানি না, কিন্তু বেবি ঘোষই লেখা আছে আমার ফোটুর পাশে, ভোট দিতে গিয়ে জানতে পেরেছি । আমি বেবি মণ্ডল নই । আমার ছেলেও মণ্ডল নয় । আর বলব না, মাফ করেছেন কি না ? আঁয় ?
--করে দিলুম । এখন যা । দরকার হলে ডেকে নেবো ।
--দাঁড়ান চান করে আসি, তারপর । ভিজে-ভিজে শরীরে আপনি যখন ফোঁটায় ফোঁটায় গুটিপোকা ফ্যালেন তবিয়ত এতো মগন হয়, গুটিপোকাগুলো সব ভেতরে গিয়ে নানা রঙের প্রজাপতি হয়ে উড়ে বেড়ায় ।
--এই জন্যই তো থেকে গেলুম ; যখন বলি তখনই তুই তৈরি, ঘুম থেকে উঠে হোক, দুপুর হোক, সন্ধ্যা হোক, মাঝ রাত হোক ।
--রান্না চাপিয়ে গ্যাস নিভিয়েও তো কতবার এসেছি আপনার গুটিপোকাদের ফোঁটা নিয়ে প্রজাপতি ওড়াবো বলে। ভাগ্যিস আপনাকে পেয়েছি, কোনো গংগোতা বর হলে তো যৌবন নষ্ট হয়ে যেত বছর-বছর বাচ্চা পয়দা করে ।
দিয়ারা, দ্বীপের মতন চর, জেগে ওঠে, জলপ্রবাহকে জড়িয়ে শুয়ে থাকে বছরের পর বছর, জামাইবাবার মতন, বেগুসরায় মুঙ্গের থেকে গঙ্গা নদীর কিনার বরাবর, ভাগলপুর কাটিহার অব্দি ; এক জায়গায় ডুবে আরেক জায়গায় কুমিরের মতন জেগে ওঠে, খেলা করে অজস্র মানুষের সুখ-শান্তি নিয়ে, তাদের দুর্ধর্ষ ক্রুর মমতাহীন আতঙ্কিত উদ্বিগ্ন করে রাখে আজীবন, ভালা বরছি গাঁড়াসা ভোজালি পাইপগান কাট্টা তামাঞ্চা একনল্লা দুনল্লা একে-সানতালিস একে-ছপ্পন দিয়ে ।
আচমকা যদি কখনও ওনার, সুশান্ত ঘোষের, মগজে ঘুমিয়ে থাকা লোকটা ধড়মড় করে উঠে বসে জানতে চায় যে, ওহে খোকা, তুমি কি ছিলে আর কি হয়ে গেলে, তখন ছিপি খুলে গুড়ে চোলাইকরা তরমুজের সোমরসের বোতল নিয়ে বসেন, আর নিজেকে বলেন, ইতু জীবনের উদ্দেশ্য খুঁজে চলেছে, আমার উদ্দেশ্য আমাকে খুঁজতে হয়নি। উদ্দেশ্যই আমাকে খুঁজে নিয়েছে । আমারও কী আত্মপরিচয় আছে ? কী ? আমি তারিণী মণ্ডলের জামাই, বেবির স্বামী, গংগোতা ক্ল্যানের ডনের অভিনেতা ! আমি কে ? আমি, যার নাম সুশান্ত ঘোষ ? আই অ্যাম নাথিং ।
ল্যাপটপে বা স্মার্টফোনে লোডকরা ওনার প্রিয় গান শোনেন, বারবার, বারবার, দিল ঢুণ্ডতা হ্যায় ফির ওয়হি ফুরসতকে রাতদিন, ব্যায়ঠে রহে তসব্বুর-এ-জানা কিয়ে হুয়ে, দিল ঢুণ্ডতা হ্যায় ফির ওয়হি ফুরসতকে রাতদিন...। শুনতে পান, বেবি বলছে, এরকম দুখি-দুখি গান শুনছেন কেন, অন্য গানটা শুনুন না, দো দিওয়ানে শহর মেঁ, রাত মেঁ য়া দোপহর মেঁ...। ঠিক আছে, শোন, জিন্দগি ক্যায়সি হ্যায় পহেলি হায়, কভি ইয়ে রুলায়ে, কভি ইয়ে হাসায়ে...।
বেবি : কী-ই বা করবেন, আমাদের দুজনের অদৃষ্ট, আর সেই শুশুকটার ইশারা, আপনি রামচন্দ্রজীর মতন দরজায় এসে যেদিন দাঁড়ালেন, তার আগের দিন গঙ্গায় শুশুক দেখে সবাই বলেছিল যে আমার জন্য গঙ্গা মাইয়া একজন রাজপুত্রকে পাঠাচ্ছেন । হ্যায় নাআআআআআ ।
দুপুরের প্যাচপেচে গরমে একা বসে-বসে স্বস্তি না পেলে ল্যাপটপে বা ডেস্কটপে ট্রিপল এক্স । তাতেও স্বস্তি না পেলে বেবি বলে হাঁক পাড়েন, আর বেবি ঘরে ঢুকলে, বলেন, দরোজা বন্ধ করে দে, এই নে, দেখে একটু শরীর টাটকা-তাজা করে নে, তারপর তুই শুশুক ধরিস, আমি চুচুক ধরব, তাড়াহুড়ো করব না । বেবি উত্তর দ্যায়, তাড়াহুড়ো করলে আপনার গুটিপোকাগুলো থেকে তরমুজের গন্ধ বেরোতে থাকে, ভাল্লাগে না, গ্যাসের টিন বরবাদ ।
জমিন, জল, জবরদস্তি-- এই তিনটের মালিকানা, একদা লালটুশ এখন ভুঁড়োকার্তিক সুশান্ত ঘোষকে করে তুলেছে বহু ফেরারির আশ্রয়দাতা । নর্থ বিহার লিবারেশান আর্মির নেতা শংকরদয়াল সিং, ফাইজান পার্টির অওধেশ মণ্ডল আর হোয়াইট অ্যান্ট পার্টির বিকরা পাসওয়ানদের পোঁদে বেয়নেট ঠেকিয়ে পুলিশ যখন তাড়িয়ে বেড়াবার খেলা খেলছিল, তখন সুশান্ত ওদের লুকিয়ে রেখেছিলেন দুষ্প্রবেশ্য নামহীন এক দিয়ারায়, গঙ্গামাটির প্রলেপ-দেয়া, ডিজেল ইনভার্টারে চালানো রুমকুলারে ঠাণ্ডাখড় আরামঘরে । ভাড়া সেভেনস্টার হোটেলের । রুম সার্ভিস চাইলে ওনার শশুর ডান্সবারের নাচিয়েদের আনান নৌকোয় চাপিয়ে, সার্ভিস হয়ে গেলে ডান্সগার্লদের ফেরত পাঠান ভোর রাতের নৌকোয় চাপিয়ে ।
সুশান্ত ঘোষের পারিবারিক কিংবদন্ধি অনুযায়ী, ঠাকুর্দার ঠাকুর্দা ছিল ঠগি ; গুড়ে চোলাই করা তরমুজের মদ টেনে সুশান্ত ঘোষ ভেবে ফ্যালেন যে হয়ত তাই তিনিও শশুরের দেয়া সুপারঠগির সিংহাসন দখল করলেন ।
পুলিশ যায় না অপরিচিত কোনো দিয়ারায় ; গুজব যে ভাগলপুর শহর থেকে চান করার মার্বেল-বাথটব এনে দিয়ারার বালিতে বসিয়ে রেখে গেছেন তারিণী মণ্ডলের বাবা । তাইতে নাইট্রিক অ্যাসিড ভরে একজন পুলিশের মুখবির বা ইনফরমারকে চুবিয়ে গলিয়ে ফ্যালা হয়েছিল ।

সাত
শেষবার যখন ইতু ওর ক্লিনিক থেকে নিজের সঙ্গে, একদা পালিয়ে-যাওয়া অমিতকে বাড়ি নিয়ে এলো, বিরোধের হল্কা প্রায় নিভে গিয়েছিল, কেননা ইতিমধ্যে একান্নবর্তী পরিবারের অধিকাংশ সদস্য একে আরেকের সঙ্গে কথাহীন বার্তা-বিনিময় করে নিয়েছিলেন, যে, ইতুটাকে ঘাড় থেকে যদি নামানো যায় তাহলে স্হান-কাল-পাত্রের যেমন সুবিধা পাওয়া যাবে, তেমনই, আর্থিক দায়টাও বাড়ির বাইরে চালান করে দেয়া যাবে। এর আগে যখন অমিত এসেছে, সেদিন বিকেলেই চলে গেছে বা থেকে গেছে একদিন, বহিরাগতের মতন, অতিথির মতন নয়, বাড়ির সদস্যের মতন তো নয়ই ।
শেষবার যখন অমিত এসেছিল, কোথায় শোবে তা নিয়ে আলোচনা চলছিল, ইতু প্রস্তাব দিল, তিনতলার ছাদে ওর ঘরেই রাতটা কাটাক অমিত, সঙ্গে টয়লেট-বাথরুম আছে, কোনো অসুবিধা হবে না ; দোতলার বারান্দায় যে খাট পাতা আছে তাতে মশারি টাঙিয়ে শুয়ে পড়বে ইতু, একটা রাতেরই তো ব্যাপার । আগে ঘরটা ছিল সুশান্তর বাবার, তিনি মারা যেতে জাঠতুতো ভাই সমরেন্দ্রর দখলে গিয়েছিল ; ওর বউ যমজ বাচ্চাদের ইতুদের বাড়ির জিম্মায় চাপিয়ে ঝাড়া হাত-পা ডিভোর্স দিয়ে নাচতে-গাইতে চলে গেছে, যার দরুণ নিজের বলার মতন একটা ঘর পেয়েছে ইতু ।
অমিত যখন এই বাড়ির সদস্য ছিল, তখন ও একতলায় ওর রাঙাবাবা-রাঙামা, মানে ইতুর রাঙাকাকা-রাঙাকাকিমার ঘরে ওনাদের সঙ্গে থাকত । উধাও হবার পর প্রথমবার ফিরে, অমিত ওর রাঙাবাবা-রাঙামায়ের সঙ্গে কথা বলার আগ্রহ দেখায়নি ; ওনারাও কুন্ঠিত, হয়তো অমিত চলে যাওয়ায় ওনারা যেচে-নেয়া দায়ভার থেকে ছাড়ান পেয়েছেন ।
শুকগে তিনতলার ঘরে, মরুকগে যাক, মেয়েটা মা-বাপকে খেয়েছে, এবার ছেলেটাকে খাক, বয়স্কদের মুখ দেখে, তাদের ঘিলুর ভেতরের মেঘে সেরকমই রুপোলি পাড় দেখতে পেয়েছিল ইতু ।
সকলকে শুনিয়ে ইতু বলল, তুই চল, বিছানা পেতে দিচ্ছি, জিনিসপত্র নেই দেখছি, শুধু এই কাঁধব্যাগ ?
--হ্যাঁ, এতেই আমার পেন আর খাতা আছে, সংবাদ যা পাই টুকে নিই, পরে অফিসে গিয়ে তথ্যগুলো খাতা থেকে লিখে নিই আর যা দেখেছি বা শুনেছি তা স্মৃতি থেকে লিখে নিই । অমিতের অভিনয়, সংলাপ ।
--একটা ল্যাপটপ রাখলেই পারতিস, রিপোর্টাররা তো আজকাল ল্যাপটপ, মোবাইল ফোন এই সব নিয়ে কাজ করেন । ইতুর অভিনয়, সংলাপ ।
--আমি এখনও টেকস্যাভি হতে পারিনি । হাতে কলম নিয়ে লিখতে ভালো লাগে আমার । অমিতের অভিনয়, সংলাপ ।
--তুই স্নানটান করে রেডি হয়ে নে, খাবার সময় হলে ডেকে নেব । ইতুর অভিনয়, সংলাপ ।
--আমার না খেলেও চলবে, রিপোর্টারের চাকরিতে সময়ে খাওয়া হয়ে ওঠে না, জানিসই তো, অভ্যাস হয়ে গেছে । অমিতের অভিনয়, সংলাপ ।
--ও লজ্জা পাচ্ছিস । এমব্যারাসড ফিল করার কী আছে, আমি তোর ডিনার ঘরেই পৌঁছে দিচ্ছি । ডিনার মানে রুটি আর আলু-পটলের তরকারি হয়েছে আজকে । ছয়টা রুটি চলবে তো ? ইতুর অভিনয়, সংলাপ ।
--না না, দুটো রুটি হলেই হবে । অমিতের অভিনয়, সংলাপ ।
রাঙাকাকা আর সুশান্তজেঠুর মা, যাকে ওনার ছেলেরা, ভাসুরপো-দেওরপোরা, তাদের বাচ্চারা, অন্নমা বলে ডাকে, অমিতকে বললেন, তুমি আসো বেশ ভালো লাগে বাবা , তুমি সুশান্তর সবচেয়ে কাছের বন্ধু অতনু চক্রবর্তীর ছেলে, এ-বাড়ি ছেড়ে পালিয়েই বা কেন গিয়েছিলে , সব বাড়িতেই অমন মেলামেশা হয়, তাতে বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে হয় নাকি , কী আর বলব, আমার কোনো গুরুত্ব আর নেই, সুশান্তর বাবা মারা যাবার পর কিছুই আর ভালো লাগে না । কিন্তু প্রতিবার অমন আপত্তি করো, আর যাই-যাই করো বলে মন খারাপ হয়ে যায়। এমনিতেই আমার মন বিষিয়ে থাকে, জানোই তো ।
ইতু জানে, সুশান্তজেঠুর অভাব, জেঠুর বন্ধু অতনু চক্রবর্তীর ছেলের মাধ্যমে কিছুটা মেটাবার চেষ্টা করেন অন্নমা । অতনুজেঠুকে ইতু দেখেছে ছোটোবেলায়, সুশান্তজেঠুর মোটরসাইকেলে বসে এ-বাড়িতে আসতে, কিন্তু ভুলে গেছে ওনার মুখ । সুশান্তজেঠু কিডন্যাপ হয়ে চলে গেলেন, তারপর অতনুজেঠু চাকরি-বাকরি ছেড়ে চলে গেলেন কোথাও । তখন সবাই বলত উনি সাধু হয়ে গেছেন, কুম্ভ মেলায় ওনাকে জটাজুট দেখা গেছে । শেষে উনি যখন অমিতকে এবাড়িতে রাখতে এলেন, ইতু তখন স্কুলে, জানা গিয়েছিল যে উনি নওয়াদা জেলার কোনো গ্রামে মানসী বর্মণের সঙ্গে সংসার পেতেছেন, সেই বাড়িতে আবার মানসী বর্মণের স্বামীও থাকেন । আরও পরে, যে অফিসে উনি কাজ করতেন, সেখানের কর্মীদের সূত্রে, কানাঘুষা শোনা গিয়েছিল যে ওনারা নকসল্লি-মালে আন্দোলন করতেন, পুলিশের গুলিতে মারা গেছেন ; ওনাদের বিপ্লবী জীবনে শিশু অমিত খাপ খাবে না ভেবেই হয়ত রেখে গিয়েছিলেন ইতুদের বাড়িতে । বাবা-মাকে খুঁজে পাবার আগে পর্যন্ত অমিত ছিল বাবাহীন-মাহীন ।
তিন তলার ঘরে পৌঁছে ইতু বলল, তোর মেসেঞ্জার আমাকে যে চিরকুট দিয়েছিল তাতে তো লেখা ছিল তুই কালকে সকালে আসবি ? মেসেঞ্জারদের দেখে বাড়ির লোকেদেরও খটকা লাগে ; বলেন ওরা কে রে, তোর পেশেন্ট, অথচ তুই তো বলতিস যে তোর রোগি জোটে না । বানচোদ, তোর জন্য কতো আর মিথ্যার সিনেমা করব ? আমি বিপদে পড়লে ক্ষতি নেই, বাড়িসুদ্দু লোকেরা যেন বিপদে না পড়ে ।
--আমার বিহারশরিফে একটা কাজ ছিল । প্রতিবারের মতন আমি পাটনায় চলে এলুম । কতদিন তোর সঙ্গে দেখা হয়নি, মুখোমুখি কথা হয়নি । তোকে টাচ অ্যান্ড ফিল করতে ইচ্ছে করে ।
ডিনারের বদলে একটু পরে ফোটো অ্যালবাম নিয়ে এলো ইতু । খাটের ওপর বসে, অ্যালবাম খুলে দ্যাখালো, এই দেখ, আমাদের দোল খেলার দিন তুই, তোর ক্লাসের বন্ধুরা সবাই এসেছিল, এই যে তোর ছবি, কতকাল হয়ে গেল, অবহেলায় ফ্যাকাশে হয়ে গেছে ।
গোটা দশেক ফোটো ছিল ওদের, সেগুলো প্লাসটিকের খাপ থেকে বের করে অমিত যখন বলল, আমি কি এগুলো রেখে নেব, তখন ওর চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে ইতু বলল, রেখে আবার কী করবি ? ডেসট্রয় করে ফেলতে চাইছিস তো ?
--হ্যাঁ, এ-বাড়িতে আমার কোনো চিহ্ণ রাখতে চাই না ।
--পরে কথা হবে, ফোটোগুলো ছিঁড়তে-ছিঁড়তে বলল ইতু । তারপর হাতের মুঠোয় দলাটা ধরে যোগ করল, জ্বালিয়ে ফেলতে হবে তো ? ডিনার আনছি, ঘুমিয়ে পড়িসনি যেন । ফোটোগুলো থাকলেও বিশেষ কিছু ক্ষতি হতো না । এই বাড়িতে এসে কে-ই বা তোর ফোটো খুঁজবে । যাদের খোঁজবার তারা যদি সন্দেহ করে থাকে তাহলে তোর স্কুল-কলেজের রেকর্ড থেকেই যাবতীয় তথ্য সংগ্রহ করে নিয়ে গিয়ে ডোসিয়ার বানিয়ে ফেলে থাকবে ।
--ফোটোগুলো কেনই বা রেখেছিলিস, আননেসেসারিলি ।
--ফোটোগুলো ছমাস যাবত প্রায়ই দেখতুম আর আশা করতুম যে তোর চিরকুট আসবে বা তুই নিজে আসবি। তার বদলে এসেছে তোর মেসেঞ্জার, একজন চিঠি দিয়ে যায়, তো আরেকজন নিয়ে যায় । ভাগ্যিস ক্লিনিকটা বাধ্য হয়ে বন্ধ করে দিতে হল ।
রাতভোজন এনে, সামনে বসে অমিতকে খাইয়ে, বাথরুম থেকে অমিত হাত ধুয়ে এলে, ইতু বলল, সকলের খাওয়া হয়ে গেছে, তোর আর কিছু চাই ?
--না, এত করছিস আমার জন্য, না চাইতেই । কাল সকাল-সকাল বেরিয়ে যাবো ।
--বার-বার অমন যাই-যাই কোরিসনি তো, ইউ ইডিয়ট । কতদিন পর তো এলি । বলেছিলিস সঙ্গে নিয়ে যাবি অথচ প্রতিবার এড়িয়ে যাস, ইউ লায়ার । আমার তো কেমন সন্দেহ হওয়া আরম্ভ হয়েছে । তোর হয়তো কিছুই চাই না, আমার চাই, আমি এবার তোর সঙ্গে যেতে চাই, পালাতে চাই এখান থেকে ।
--কিন্তু..
--থাম দিকিনি । ফোটো জ্বালিয়ে এলুম , আর এখন আবার গল্প ফাঁদবার তালে আছিস । তোর কাঁধব্যাগও দেখে নিয়েছি, শুধু একটা লুঙ্গি আর গামছা । জানতুম না যে সিক্রেট কাল্টের মানুষরাও মিথ্যাবাদী হয় । আমি এবার তোর সঙ্গে যাচ্ছিই । ফাইনাল ।
অমিত কিছুক্ষণ চুপ করে রইল, তারপর আত্মগ্লানির মতন করে বলল, সিক্রেট কাল্ট বলে অপমান করিস না প্লিজ, চে গ্বেভারার নাম শুনেছিস ?
--শুনেছি । বিপ্লবীদের রোমান্টিক মৃত্যু নিয়ে বেশ একটা মুখরোচক রহস্য তৈরি করে ফেলিস তোরা । গুয়েমুতে মরে পড়ে-থাকা স্তালিনকে নিয়ে, কই, তোদের মুখে কিছু শুনতে পাই না । পল পটের বিষয়েও শুনি না। কিম জং উন, কিম জং ইন, কিম জং হিং এটসেটরা, তাদের কথাও তো শুনি না । যাকগে যাক, কী হবে আমার ওসব জেনে ? তোর কাজের অংশীদার করার প্রয়োজন মনে করিসনি আমাকে । আমি যেন তোর ডাকবাক্স । একজন চিঠি দিয়ে যায়, আর আরেকজন এসে নিয়ে যায় । এতই যখন বিশ্বাস করেছিস আমাকে, তো সঙ্গে নিসনি কেন ? এ-বাড়ি ছেড়ে যখন উধাও হয়ে গেলি তখনই তো সঙ্গে নিতে পারতিস ? তোর নিজের বাবা-মাকে খুঁজে পেলি, তবু নিয়ে গেলি না ।
--চেয়ার রয়েছে তো, বোস না আয়েস করে, গল্প করা যাক ।
ইতু বিছানার ওপর নিজেকে, তেমনই মনে হল অমিতের, পাথর-চাঁইয়ের মতন ফেলে, বলে উঠল, তোর সঙ্গে জরুরি কথা আছে, চেয়ারে বসলে হবে না । অমিত অনুমান করতে পারেনি ইতু কী করতে চলেছে। ইউ কাওয়ার্ড আহাম্মক, অমিতকে সজোরে জড়িয়ে ধরে বলে উঠল প্রগলভা ইতু ; আঁকড়ে ধরে, ইতু নিজের ঠোঁট অমিতের ঠোঁটে চেপে ধরে রেখেই বলল, তুই হয় আমাকে নিজের সঙ্গে নিয়ে যাবি, নয়তো আমি আজকে রাতেই আত্মহত্যা করে তোর আরেকবার উধাও হয়ে যাওয়া ভণ্ডুল করে দেব ।
--তুই কী করতে চাইছিস বল তো ? দু’জনে এভাবে ধরা পড়ে গিয়েছিলুম বলে, আমাকে তোদের বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে হয়েছিল । এবার দেখে ফেললে ওনারা নির্ঘাত গলাধাক্কা দেবার আগে বেদম পিটুনি দেবেন । বলল উদ্বিগ্নবাক অমিত ।
--ছাঁচি পেঁয়াজি মারিসনি । ভয়কে কাবু করতে শেখ, স্টুপিড । মার খেলে পালটা মার দিতে শেখ । নিজে তো মা-বাবার আদর-ভালোবাসা খাচ্ছিস । আমার কি ভালোবাসতে আর ভালোবাসা পেতে ইচ্ছে করে না ? জড়িয়ে ধর আমায়, হোল্ড মি ইন ইওর আর্মস, শক্ত করে ধর । প্রেম কর আমার সঙ্গে । জানি আমি প্রায় চটা-ওঠা, তামাটে, নাক-নকশা ভালো নয় । হলেই বা তুই কোনো সিক্রেট কাল্টের জানগুরু, আমিও তো মানুষ, না কি, অ্যাঁ । সাধারণ মানুষের জন্য, দেশের জন্য, কিছু করার কাজে কি আমার কোনো ভূমিকা থাকতে পারে না ? ইতুর নিঃশ্বাসে তাপ । অমিতকে জাপটে বিছানায় শুয়ে ইতু বলল, তোর মনে আছে নিশ্চই তোর মা তোকে ভালোবাসা সম্পর্কে কী বলেছিলেন ? তবে ?
--অমিত বলল, মায়ের কথায় তো সঠিক উত্তর পাইনি । যতই যাই হোক, কেন মা-বাবা আমাকে, নিজের বাচ্চাকে, ফেলে চলে গিয়েছিলেন, আর কখনও পেছন ফিরে তাকাননি, তার সঠিক উত্তর আজও পাইনি ।
--অত-শত জানি না, আই অ্যাম নট গ্রেট লাইক দেম ; নিজের আর্জের কথা জানি । অবদমনের মানসিক অশান্তির কথা জানি ।
--এই বারই এত চাপ দিচ্ছিস কেন, ছমাস আগে তো এরকম বিহেভ করিসনি । আমার জন্যেই তুই সবায়ের দ্বারা অপমানিত হয়েছিলি। আমি বাড়ি ছেড়ে চলে যাবার পর কার ছবি সামনে রেখে মিষ্টিবিষ্টি করতিস?
--আহাআআ, আহাআআ, মেয়েদের কোড ওয়র্ডটাও জানিস দেখছি । বেগুন ব্যবহার করতুম, বুঝলি । নারকেল তেলে ইউরিনারি ট্র্যাক্টে ইনফেকশান হয় না । আর কিছু ? বিব্রত করার চেষ্টা করিসনি । তুই কার ছবি মনে করে মিষ্টিবিষ্টি করতিস ? কোনো ফিল্মস্টারের বোধহয় ?
--না, একটা বিশেষ অঙ্গ কল্পনা করে নিতুম, যা নেটে দেখেছি । একটু দেখতে দে না ।
--দ্যাখ, দেখে নে, ইউ বিট্রেয়ার, চোখের জলের আলোয় দেখে নে, ইউ মেনিমুখো কাওয়ার্ড ।
--মুখ দেবো ? আমার তো সিংহের কালো কেশর গজিয়েছে, দ্যাখ হাত দিয়ে ।
--তোর চোখের জলে ভিজিয়ে ওখানে মুখ দিবি, হাঁটু গেড়ে বসে । গেট অন ইওর নিজ । কাঁদ, ফোঁপা, তোর ফোঁপানি শুনতে চাই আমি, কাঁদ, কাঁদ, কাঁদ, ইউ আনগ্রেটফুল ডেজার্টার । অমিতের চুল দু’মুঠোয় ধরে বলল ইতু ।
ঘর্মাক্ত প্রেমের শেষে, প্রস্তুতির জন্য এনে-রাখা ওষুধের বড়ি গলায় ফেলে, বেডসাইড টেবলের গেলাস থেকে জল খেলো ইতু । বলল, ভিতুরা হল লাশের মতন, স্রোতের সঙ্গে ভাসে ; স্রোতের বিরুদ্ধে সাঁতরাতে শেখ, তোর অস্তিত্বে প্রাণ আছে কিনা তা প্রমাণ করতে হলে তোকে স্রোতের বিরুদ্ধে ননস্টপ হাত-পা চালিয়ে যেতে হবে।
--প্রথমবার প্রেম করতে গেলে যে ছড়ে যায়, জানতুম না, আমার ধারণা ছিল মেয়েদেরই ছেঁড়াছিঁড়ি হয়, বলল অমিত ; তারপর যোগ করল, এসেছিলুম এক রাত কাটিয়ে চলে যাবো, এই ভেবে ; তুই কি করলি জানিস? তুই আমাকে আইডেনটিটি দিলি, প্রেমিকের আইডেনটিটি, এ-ছাড়া আমার বলার মতো আত্মপরিচয় নেই । বাবা-মা বিসর্জন দিয়ে চলে গেল, তোদের বাড়ির লোকেরা যৌথ সম্পত্তিতে ভাগ বসাবো ভেবে দত্তক নিল না, পরিবারের অংশ বলে মনে করল না, প্রতি বছর আগের ছাত্রদের বই চেয়ে-চেয়ে পড়ে কোনো রকমে পাশ করতুম, স্কুলও ফালতু তকমা দিয়ে লাস্ট বেঞ্চে বসাতো । বাবা-মাকে যতটা বুঝেছি, ওনাদের কাছে আমি আরও হাজারখানেক কর্মীর একজন, গুরুত্বহীন । ওনারা যেসব তত্ত্বকথা আওড়ান, তা যে আমার জীবনে প্রযোজ্য, সেকথা ভুলে যান । বলতে-বলতে ছলছল-চোখ হয়ে গিয়েছিল অমিতের।
--তখন কাঁদতে বলেছিলুম, জাস্ট এ মোমেন্টারি রিভেঞ্জ, দ্যাট ওয়াজ এনাফ, আর ধ্যাড়াসনি, প্লিজ । কেন করলুম জানিস, বলল ইতু, তুই এবার আমাকে নিয়ে যেতে বাধ্য হবি । তুই তো কাল্ট মেম্বার, কমিটেড, ডেডিকেটেড, আদর্শবাদী, অ্যান্ড হোয়াটএভার, ফেলে পালাতে তোর দায়বদ্ধ বিবেক বাধা দেবে । আই থিংক সো । আমাকে ধোকা দিয়ে পালাতেও পারবি না, আমি দোতলাতেই জেগে থাকব সারারাত, পাহারা দেব । বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাই, তারপর দেখা যাবে ছাড়াছাড়ি এটসেটরা, আই ডোন্ট কেয়ার, আমি একাই এনাফ । আর, গুছিয়ে বলি, তোর প্রাপ্য তোকে দিয়ে দিলুম, পরে দেয়া হয়ে উঠবে কিনা, দেবার সময়-সুযোগ হবে কিনা, তা তো জানি না ।
--অমন অদ্ভূত সব খুঁতখুতে শব্দ কোথায় পেলি ? না, তোকে ফেলে এবার পালাব না, পালাবার হলে আর আসতুমই না, তোদের বাড়ির গোমড়ামুখগুলো দেখতে ; পাহারা দেবার দরকার নেই, তুই জানিস তোর টান ছিন্ন করতে পারিনি । তুই এবার আমার সঙ্গে যাবি । তোর কর্মকাণ্ড নির্ধারিত হয়ে গেছে । অকল্পনীয় কষ্টের জীবনে তোকে মানিয়ে নিতে হবে, শারীরিক কষ্টের । হয়ত পানীয় জল নেই, বিজলি বাতি নেই, শোবার ঘরবাড়ি নেই, প্রতিদিন খাবার জোটার সম্ভাবনা কম । পদে-পদে মৃত্যু ওৎ পেতে থাকতে পারে । সময়ে-অসময়ে ডাক্তারি করতে হতে পারে ।
--বাড়ির কুচুটে নোংরা স্বার্থপর জঙ্গলে বসবাসের পর আমি আফ্রিকার সিংহ আর হায়েনাদের জঙ্গলে গিয়েও থাকতে পারব ।
--জঙ্গলে নয়, ওরা সাভানার ঘাসভূমিতে থাকে ।
--হোয়াটএভার, ডোন্ট ট্রাই টু টিচ মি । তোর চেয়ে ভালো রেজাল্ট করতুম ।
--কেউ কোথাও আমাকে চিনে ফেললে, তুই বলবি তুই আমার সঙ্গী নোস, কোনো একটা জায়গায় যাবার নাম করে বলে দিস বাবা বা কাকার বাড়ি যাচ্ছিস ।
--সে দেখা যাবে, কপি-পেস্ট সংলাপবাজি করিসনি । যখন অমন বিপদ আসবে তখন তার মোকাবিলা করব । তাছাড়া এটা পাটনা শহর। গয়া, নওয়াদা, সাসারাম, জেহানাবাদ, পালামউ নয় । এই শহরের জাতপ্রথার রাজনীতিকদের খেলা যতটা বুঝি, এখানে তোদের কেউ বিশেষ গুরুত্ব দেয় না ; অবশ্য খুনোখুনি হলে আলাদা কথা ।
--না, ওই লাইনে ভাবিসনি ।
--কোথায় যাব আমরা ? প্রশ্নটা এই জন্য করছি যে আমার যাবার সঙ্গে ইলোপ শব্দটা জুড়ে আছে ।
--তুই যেখানে যাবি সেখানে যারা থাকে তারা মুরিয়া মারিয়া মাড় গোঁড় । দশ-পনেরো বছর আগে পর্যন্ত ওদের যুবতীরা পোশাক দিয়ে বুক ঢাকত না, খালি গায়ে গয়না পরে থাকত । কোনো-কোনো গ্রামে পৌঢ়ারা এখনও খালি গায়ে থাকে, যখন খুব গরম পড়ে । অবশ্য ওদের খুচরো জনবসতিগুলোকে গ্রাম বলা যায় না, এক জায়গায় চাষবাস করে আবার জনবসতি অন্য জায়গায় তুলে নিয়ে যেত, সেখানে গিয়ে এক ঋতু চাষবাস করে আবার অন্য কোথাও বসতি তুলে নিয়ে যেত । ব্রিটিশ গবেষকরা লিখে গেছেন ওদের মাড় শব্দটা নাকি এসেছে বনের আগুন, মানে, পলাশ ফুলের নাম থেকে । আমার তা মনে হয় না, কেননা গাছটাকে তো ওরা পুজো করে না । তার তুলনায় মহুয়াগাছকে শ্রদ্ধা করে ।
--জঙ্গলমহলে ? ঝাড়খণ্ডের খবরও তো পড়ি কাগজে ।
--ওয়েস্ট বেঙ্গলে আর ঝাড়খণ্ডে কী গোঁড় বা মাড়িয়া উপজাতির মানুষ থাকে ? আমি যাদের কথা বলছি তারা পশ্চিমবাংলার মানুষ নয় । সিলেবাসের বাইরে একটু-আধটু সাধারণ জ্ঞানের বই-টই পড়তে পারতিস । তুই যাবি দণ্ডকারণ্যের দুর্ভেদ্য, প্রায় দুর্ভেদ্য, জঙ্গলে । অবুঝমাড় ।
--হ্যাঁ, অবুঝই ছিলাম এতকাল । অবুঝ জীবনে পড়ে-পড়ে মার খেয়েছি । তুই যাবি মানে ? তুই যাচ্ছিস না ? কিন্তু তুই ওরকম ব্লাডি মোরোনদের মতন বসে-বসে পা দোলাসনি ।
--এই তো বললি যে সাধারণ দুস্হ গরিব মানুষের সেবা করতে চাস । আমার থাকা-না-থাকার সঙ্গে তোর জীবনের উদ্দেশ্যকে কেন জড়াচ্ছিস ? আমার মা-বাবা তো আমাকে এখনও পুরোপুরি জড়ায়নি তাদের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে, আলাদা দায়িত্ব দিয়েছেন ! আমি চিরকাল পরিত্যক্ত সন্তান থেকে যাবো, ফর দেয়ার কজ ।
--আমিও ইনডিপেন্ডেন্টলি কাজ করতে চাই, তোর লেজুড় হবো বলিনি । আমি কারোর লেজুড় হতে চাই না । কিন্তু তুই না থাকলে কী করে জানবো যে কোথায় যেতে হবে, কাদের সেবা করতে হবে ? হোয়াট অ্যাবাউট টাকাকড়ি ?
--গন্তব্য তো তোর, ঠিকই পৌঁছে যাবি । জানি তুই যথেষ্ট বোল্ড, আউটস্পোকন, সেল্ফ-মেড, এমনকি দুঃসাহসী । নিজেকে প্রয়োগ করে দ্যাখ-ই না । ভারতের এলোমেলো-হেলাফেলা মানুষদের সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা হোক । টাকাকড়ির জন্য সুশান্তজেঠুর দরবারে ঢুঁ মারব ।
--ওকে, তবে তা-ই হোক । এবার থেকে আমিই আমার গন্তব্য । কারেক্ট, আমার উদ্দেশ্য আমি নিজে । জানি, গন্তব্যের লক্ষ্যে চলতে থাকা জরুরি, চলাটাই সফলতা, লক্ষ্যবস্তুটা নয় । আজ থেকে আমার কাছে যুক্তি আর যুক্তিহীনতার পার্থক্য রইল না । আর তো ভার্জিন থাকার বিড়ম্বনা রইল না যে আগের মতন ওয়ান-ডে প্রেমিকদের দুর্ভাবনায় সিঁটিয়ে থাকবো ।
ঘুমোতে যাবার আগে ইতু ড্রয়ার থেকে কাপড় কাটার কাঁচি এনে বলল, আমার আকর্ষণের কেন্দ্র বা ভ্যানিটি, যা-ই বল, তা হল আমার চুল, তুই তো জানিস, এই নে , ঘাড়ের কাছ থেকে ঘ্যাঁচাৎ করে কেটে দে দিকিনি ।
--ভ্যানিটি ? আকর্ষণের কেন্দ্র ? তা তোর সুরাহিদার গর্দন, ভারি পাছা আর নিটোল বুক ।
--শাট আপ, চাপলুসি করিসনি । হ্যাঁ, আমার বুক সম্পর্কে আমার গর্ব আছে । কিন্তু ওগুলো তো আর কেটে বাদ দিতে পারি না । চুল কেটে দিতে বলছি, কাট, এই নে ।
--এরকম দীর্ঘ চুল, পুরো পিঠ জুড়ে ছড়িয়ে আ্ছে, তাকে বাদ দিয়ে দিতে চাইছিস ?
--হ্যাঁ, জাস্ট ডু ইট, কেটে ফ্যাল, এত বড়ো চুল বয়ে বেড়ানো যায় না । আমিও আর আয়নার মুখ দেখতে চাই না । যাদের মাঝে বড়ো হয়েছি, তাদেরই যদি বাদ দিতে পারি, তাহলে চুলটুকু কেন বাদ দিতে পারব না ?
চুল কাটতে গিয়ে অমিতের নজরে পড়ল মাথার শিয়রে স্যাঁতসেতে দেয়ালে সেলোটেপ দিয়ে একটা ইংরেজি পোস্টার লাগানো, ফ্যাকাশে, পুরোনো, ছেঁড়া । রঙিন হরফে লাইনের তলায় লাইন উদ্ধৃতি । চুল কাটার শেষে লাইনগুলো জোরে পড়ে ফেলছিল, ইতু বলল, মনে-মনে পড়, ওটা ডাকবাংলো রোডের ফুটপাথ থেকে কিনে এনেছিলুম । বেশ ভালো, না ? অমিত অনুবাদ করে পড়ল :
“কখনও নিজেকে গুরুত্বহীন মনে করবেন না
কখনও উদ্দেশ্যহীন জীবনযাপন করবেন না
কখনও সদর্থক দায়িত্ব এড়িয়ে যাবেন না
কখনও শরীরে আরামের শিকড় গজাতে দেবেন না
কখনও নিজেকে অক্ষম মনে করবেন না
কখনও অসন্তোষে আপ্লুত হয়ে নিজের সঙ্গে মনে-মনে কথা কইবেন না
কখনও আত্মাভিমান বর্জন করবেন না
আনন্দের মুহূর্ত ছোট্ট হলেইবা তাকে সযত্নে উপভোগ করুন”
চুলের কাটা গোছাটা ইতুর হাতে দিয়ে অমিত ইতুর মুখের দিকে অপ্রত্যাশিত বিস্ময়ে তাকাতে, ইতু বলল, হ্যাঁ, জানি, আমার মুখময় ওই কথাগুলো লেখা আছে, বহুকাল, পাঁচ বছরের বেশি, লেখা আছে, মগজে গেঁথে গেছে ইন ফ্যাক্ট । এতক্ষণে বোধহয় তুই আমার সঠিক মূল্যায়ন করতে পারলি । ভাগ্যিস চুলটা কাটতে বলেছিলুম, নয়তো ওদিকে তোর চোখ যেত না ।
রাত দুটোয় তিনতলার ঘর থেকে নেমে দোতলার বারান্দায় ইতুর বিছানায় অমিত মশারি তুলে ঢুকতে গেলে, ইতু বলল, তুই যে আসবি জানতুম, তোর ভয়কে যে কাবু করতে পারলি, দ্যাখ, আমার কাছে নেমে আসাই তার প্রমাণ, আরো বড়ো প্রমাণ যে তুই জামাকাপড় খুলেই নেমে এসেছিস । তোর কাওয়ার্ডাইস থেকে তোকে বের করে আনার জন্য আমাকে কী করতে হল, ভেবে দেখেছিস ? তুই আসবি জানতুম বলে আমিও শাড়ি-টাড়ি খুলে শুয়েছিলুম । দাঁড়া, এই খাটে আওয়াজ হয়, নিচের তলায় শোনা যায় । তিনতলার ছাদে চল, খোলা আকাশের তলায় শাড়ি পেতে সুহাগ-রাত করব । দ্বিতীয়বার আকুতিময় শ্বাসের ঘনঘটা আর স্পন্দনের লেনদেন শেষ হলে ইতু ওর দোতলার বিছানায় ফিরে যেতে যেতে বলল, স্কাউন্ড্রেল, কি তোড়ু লাভমেকিং করলি, বুকে দাঁত বসিয়ে দিয়েছিস, হারামি কোথাকার ; তূরীয়-মুহূর্তে সিংহরা সিংহীর মাথায় দাঁত বসায়, বুকে নয় ।
ভোরবেলা বাড়ির লোকেরা জাগবার আগেই সদরের ছিটকিনি আলতো খুলে বেরিয়ে পড়েছিল দুজনে । কাঁধের ঝোলায় স্টেথোস্কোপ, মশার কামড়ের প্রতিষেধক মলম, কয়েকটা জরুরি ওষুধ, এক প্যাকেট স্যানিটারি ন্যাপকিন, গামছা , পেনসিল টর্চ, এক সেট ডেনিম ট্রাউজার আর কটন-টপ পুরে নিয়েছিল ইতু ; পায়ে জগিং করার কেডস । রাতের নোংরা হয়ে যাওয়া শাড়ি-শায়া আর চুলের গোছা দোতলার বিছানার ওপর ফেলে রেখে গেল, যাতে বাড়ির সদস্যরা আঁচ করতে পারেন যে ওরা দুজনে ষড় করে বাড়ি থেকে পালিয়েছে ।
জানার পর আর ওনারা ইতুর খোঁজ করবেন না, জানে ইতু ।
ইতুর পালানোর চাটনি-রসালো সংবাদ বাড়ির সদস্যরা শুনলেন কাজের বউয়ের মুখে । সকালে দরোজা খোলা পেয়ে সে অনুমান করেছিল যে বড়কর্তা প্রাতঃভ্রমণে বেরিয়ে থাকবেন । তিনতলার ছাদে ইতুর ঘর থেকেই ঝ্যাঁটানো আর পোঁছা আরম্ভ করে । দেখলো ইতুদি বিছানা তোলেনি, দোতলাতেও আসার সময়ে দেখে এসেছে খাটের ওপর বিছানা গোটানো নেই, তার বদলে পড়ে আছে ইতুদির শাড়ি-শায়া-ব্লাউজ । আর অনেকখানি চুল, দেখলেই বোঝা যায় ইতুদিদির চুল, বাড়িতে আর কারোর চুলই অমন কোঁকড়া আর লম্বা নয় । শাড়ি তুলে তাতে অতিপরিচিত আঠা দেখে, নাকের কাছে এনে মোহক গন্ধে আতঙ্কিত হয়ে উঠল বিহারি কাজের ব্‌উ রুকমিনি ।
কাজের বউয়ের হাঁক, ইতুদিদি বিছৌনা তোলোনি কেন আজকে, ঘরে বসে খেয়েছ, বাসনও ফেলে রেখেছ, কলতলায় নিয়ে গিয়ে রাখেনি, ইতুদিদি, ইতুদিদি..
বাড়ির মেজবুড়োর কন্ঠস্বর শোনা গেল, ইতু ওপরেই আছে দ্যাখ, দোতলায় এখনও মশারি ফেলে নাক ডেকে ঘুমোচ্ছে। ডেকে তোল । ইতুর ঘরে একজন অতিথি আছে, টয়লেটে গিয়ে থাকবে, অমিত, আমাদের বাড়িতে থাকত আগে, তুই বোধহয় দেখিসনি, সৌদামিনী কাজ করত তখন ।
রুকমিনি টয়লেটে-বাথরুমে ঢুঁ মেরে দেখল ফাঁকা, কেউই নেই । চেঁচিয়ে বলল, কেউ নেই, অতিথিও নেই, দোতলার বিছানায় ইতুদিদিও নেই । শাড়ি-শায়া-বেলাউজ পড়ে আছে, সঙ্গে ওনার কাটা চুল ।
রুকমিনির হাঁকডাকে, যে হাঁকডাকে শাড়ি-শায়ায় আঠামাখা গন্ধের প্রচ্ছন্ন আহ্লাদ ছিল, শুনে, বাড়ির অধিকাংশ সদস্য, বৃদ্ধরা ছাড়া, দৌড়ে প্রথমে দোতলার বিছানায় দোমড়ানো শাড়ি-শায়া-ব্লাউজ-চুলের গোছা আর তারপর তিনতলায় পৌঁছোলে, রুকমিনি পান-খাওয়া দাঁতে হাসি মাখিয়ে যখন বলল যে বাড়ির সদর দরজা খোলা ছিল, তখন সকলে ঠাহর করতে পারল যে ইতু অতিথির সঙ্গে উধাও হয়েছে ।
--বিয়ে দিলে না তোমরা সময় মতন, পালাবে না তো কি করবে ? বললেন সেজকর্তার গোলগাল ভারিভরকম স্ত্রী, সাতসকালে ওজনদার শরীর নিয়ে বাতের ব্যথা সত্ত্বেও তিনতলায় হাঁটু ভেঙে উঠতে হয়েছে বলে যিনি ক্লান্ত, হাঁপাচ্ছিলেন ।
--অমিতের সঙ্গে ওদের সম্বন্ধটা করে ফেললেই হতো, তোমরাই অযথা ছেলেটার মা-বাবার সম্পর্কের প্রসঙ্গ তুলে মেয়েটার জীবন গোলমাল করে দিলে । সুযোগ পেয়ে বলে নিলেন রাঙাকাকি । ওরা ভাইবোন নাকি ? তোমরা ভাইবোন-ভাইবোন আওড়াতে লাগলে । এখন হল তো সেই-ই ।
--যাক ভালোই হল একদিক থেকে, দায়িত্বটা বড় খচখচ করত এদান্তি । বললেন মেজকর্তা ।
মেজকর্তার দুই যমজ নাতি, পাঁচে পড়েছে সবে, যাদের মা, মানে মেজকর্তার বড় ছেলের স্ত্রী, ডিভোর্স দিয়ে চলে গেছে, নাতিরা একযোগে চেঁচিয়ে উঠল, ঘরটা আমরা নেবো, আমাদের নিজেদের ঘর নেই, পড়াশোনার ডিসটার্বেন্স হয়, একতলার বারান্দায় বড্ড চেঁচামেচি করে সবাই ।
--পড়াশুনোর নামে নিজেদের ঘর মানে তো দেয়ালে সৌরভ গাঙ্গুলির সঙ্গে জেনিফার লোপেজ. লেডি গাগা আর কাটরিনা কাইফের ব্লোআপ, সৌরভের হাফ-টেকো পোস্টারটা বদলে ফেলিস, এখন ওর মাথায় আবার চুল গজিয়েছে । বললে দুই খোকাটে নাতির বাবা, পরোক্ষে তাদের দাবির সমর্থনে । দুই নাতির দিকে তাকিয়ে মুখে পানপরাগি-হাসি খেলালো রুকমিনি ।
ইতুর পলায়নে তৃপ্ত অভিভাবকরা সিঁড়ির ধাপে চোখ রেখে, এক-পা দু-পা করে নেমে চলে গেলেন যে যার ঘরে । নাতি দুজন তিনতলার ছাদের ঘরে ঢুকে ইতুর আর ইতুর আগে ওদের বাবার চাকরানি-প্রেমী যৌনতার স্মৃতিকে নিশ্চিহ্ণ করার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ল ।
--চুলটা আমি নিচ্ছি , খোঁপার ভেতরে ঢুকিয়ে বানখোঁপা বাঁধলে বেশ ভালো দেখাবে । নেবো তো ? জিগ্যেস করল রুকমিনি, নেমে যেতে থাকা সিঁড়ির উদ্দেশ্যে ।
--নিয়ে নে, বিছানার ওপর যা শাড়ি-টাড়ি আছে সেগুলোও যাবার সময় নিয়ে যাস ।
--আর যেগুলো ইতুদিদির আলমারিতে আছে ?
--নিয়ে যাস সময় করে, কিন্তু গিটারটা নিসনি যেন, ওটা নবনীতার, ফাইনাল ঝগড়া করবে বলে রেখে গেছে । জবাব দিল নামতে-থাকা সিঁড়ি ।
রুকমিনিকে রাখা হয়েছে তার আগের কাজের বউ সৌদামিনির সঙ্গে দুই নাতির বাবা সমরেন্দ্রর আঠালো সম্পর্ক ধরা পড়ে যাবার পর । সৌদামিনির সঙ্গে দুপুরে বিছানায়, ওদেরই বিছানায়, দুই নাতি তখন শিশু, সমরেন্দ্র রঙ্গিলা-রতির ম্যাটিনি শো করছিল । শিশুদের দেখাশোনার জন্যই রাখা হয়েছিল সৌদামিনীকে, যার বর আরেকটা বিয়ে করে বউ নিয়ে চলে গেছে হরিয়ানার খেত-খলিহানে কাজ করতে । সমরেন্দ্রর বউ নবনীতা অনুমান করেছিল যে কিছু একটা গোলমাল চলছে, কেননা যখনই সৌদামিনীকে বকুনি দেয় নবনীতা, তখনই সৌদামিনীর পক্ষ নিয়ে সমরেন্দ্র ঝগড়া করত নবনীতার সঙ্গে । একবার তো নবনীতার গালে চড় কষিয়ে দিয়েছিল সমরেন্দ্র, শিশু দুটোর কান্না সিঁড়ি দিয়ে উঠতে-উঠতে শুনে অফিসের পোশাকেই সোজা তিন তলার ছাদের ঘরে পৌঁছে দ্যাখে বাচ্চা দুটো গুয়েমুতে মাখামাখি । যে ডায়াপার নবনীতা পরিয়ে গিয়েছিল, দুটো বাচ্চাই সেগুলো পরে আছে, আলগা ডায়াপারের পাশ দিয়ে বেরিয়ে পড়েছে গুয়ের স্রোত ।
নবনীতা সৌদামিনিকে বকুনি দিতে, বুকে কাপড় চেপে ও সমরেন্দ্রর দিকে চোখ কুঁচকে তাকালে, সমরেন্দ্র সৌদামিনীর পক্ষ নিয়ে বলেছিল, কত কাজ করবে ও, সারা বাড়ির ফাই ফরমাস, তারপর দু-দুটো বাচ্চা সামলানো ।
--ও, কাজের বউ তার মালিকের মুখ নিজের বুকে গুঁজে খাটছিল, তাই না ? দাঁতে দাঁত চেপে বলেছিল নবনীতা।
--ও তুমি বুঝবে না, যাদের হৃদয় বড়ো হয় তাদের বুকের মাপও বড়ো হয় । সমরেন্দ্রর উত্তর ।
--হৃদয় বড়ো না ছোটো তা বিয়ের আগে তো আন্দাজ করে থাকবে ?
--তখন তো দেখে মনে হয়েছিল হৃদয় যথেষ্ট বড়ো । তা যে নকল কী করে জানব ?
--নকল হৃদয়ের সুধারস পান করার সময় তো উচ্ছ্বসিত হতে ।
হাঁ করে তাকিয়ে থাকা সৌদামিনীকে বুঝিয়েছিল সমরেন্দ্র, হৃদয় মতলব দিল, যিস অওরতকা দিল জিতনা বড়া, উস অওরতকা ছাতি ভি উতনাহি বড়া হোতা হ্যায় ।
সমরেন্দ্র যখন ডিউটি আওয়ার্স পালটে রাতের শিফট নিল, সন্দেহে জারিত নবনীতা সেদিনই নির্ণয় নিয়েছিল যে ব্যাপারটাকে এবার ট্যাকল করতেই হবে । একদিন অফিস যাবার নাম করে অফিসে না গিয়ে বন্ধুদের বাড়িতে সময় কাটিয়ে দুপুর বারোটা নাগাদ পা টিপে-টিপে ওপরে উঠে দরোজা আলতো ফাঁক করে দ্যাখে সৌদামিনি আর সমরেন্দ্র দুজনে উলঙ্গ হয়ে ঘুমোচ্ছে বিছানায় । তিনতলার ছাদে কেউ আসে না ভেবে ওরা দুজনে বেপরোয়া হয়ে গিয়ে থাকবে, তাই দরোজা বন্ধ করার প্রয়োজন মনে করেনি ।
বড়জেঠি আর রাঙাকাকিকে চুপচাপ ডেকে এনে, দরোজা ঠেলে, সৌদামিনী পর্বের শেষ দৃশ্যের অভিনয় নবনীতা দেখিয়ে দিয়েছিল ওনাদের । তাৎক্ষণিক ঝগড়া, বড়ো-হৃদয়ের প্রাপ্তি সম্পর্কিত বুকের আদল, ইত্যাদি প্রগাঢ় মন্তব্য । তারপর সিঁড়ি দিয়ে নেমে নবনীতা সোজা বাপের বাড়ি, কয়েকদিন পর ডিভোর্সের নোটিস, ব্যাস। সমরেন্দ্র চালান হল দুই শিশুর সঙ্গে একতলায়, কেননা শিশুদের দেখাশোনা যাঁরা করবেন তাঁদের একতলা-তিনতলা করার ক্ষমতা ছিল না ।
ইতু পেয়ে গেল ঘরটা । রুকমিনি পেয়ে গেল চাকরি ।
সমরেন্দ্র আর বিয়ে করেনি । এখনও নাইট ডিউটি করে । দুপুরে বেরিয়ে যায় খেয়েদেয়ে, যেখানে যায় সেখান থেকেই নাইট ডিউটি করতে চলে যায় । বাড়ির সবাই জানে কোথায় যায় । রুকমিনি পেছন-পেছন গিয়ে দেখে এসেছে, সৌদামিনীর বস্তির ঘরে ঢুকছে সমরেন্দ্র । সৌদামিনীর তিন মাসের বাচ্চাটা যে সমরেন্দ্রর তাতে কোনো সন্দেহ নেই, অত চেকনাই-মার্কা বাচ্চা কী করেই বা হবে ! সৌদামিনী সাঁওলা ওর পালিয়ে-যাওয়া বর কালো । বাচ্চা চেকনাই-মার্কা বলে সৌদামিনীর কত গর্ব, রুকমিনিকে বলেছিল, এরকম খোকা-বাচ্চা তোর কোনো কালেই হবে না ; পারিস তো করে দ্যাখা । অটোতে বসিয়ে সৌদামিনীকে কুর্জি হোলো ফ্যামিলি হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিল সমরেন্দ্র, বাচ্চা হবার সময়ে, ফর্মে বাপের জায়গায় নিজের নামই লিখেছে, রুকমিনিকে জানিয়েছে সৌদামিনী, নিজের স্কুটারের পেছনে বসিয়ে পোলিও ড্রপস খাওয়াতে, ডাক্তার দেখাতে নিয়ে যায় ওর বাংগালি আদমি, সাচ্চা দিলওয়ালা ।
সমরবাবু বাচ্চাটার খাওয়াপরার খরচ দ্যায় আর বলেছে বড়ো হলে ওকে ভালো আংরেজি স্কুলে পড়াবে ।
--কী করে শুরু হল তোদের প্যার-মোহোব্বত ? জানতে চেয়েছিল রুকমিনি ।
--বাচ্চা দুটো একদিন ভিষণ কাঁদছিল, একেবারেই চুপ করছিল না, কী করব ভেবে পাচ্ছিলুম না, তো সমরবাবু বলল, তোর দুই বুকে বাচ্চা দুটোর মুখ গুঁজে দে না, তোর বুক তো নবনীতা মেমসাবের চেয়ে বড়-বড় । আমি বললুম আমার বুকে তো দুধ নেই, ওরা কি হাওয়া খেয়ে চুপ করবে ? জবাবে সমরবাবু বললে, বাচ্চারা যেভাবে চুষিকাঠি চুষে ঘুমিয়ে পড়ে, তুই ওদের মুখে তোর বুক গুঁজে দ্যাখ চুপ করে যাবে, ঘুমিয়েও পড়বে । সত্যিই ঘুমিয়ে পড়ল বাচ্চা দুটো । সমরবাবু আমার পেছনেই দাঁড়িয়ে ছিল । আমি বললুম, আমি রোজ-রোজ একাজ করতে পারব না । সমরবাবু জিগ্যেস করল, কেন, তোর অসুবিধা কিসের । আমি বললুম, বাচ্চারা আমার বুক চুষলে গা থিরথিরিয়ে যায়, মনে হয় কাউকে জড়িয়ে ধরি । তা সমরবাবু তক্ষুনি আমায় জড়িয়ে ধরলে পেছন থেকে আর বললে, যখনই তোর শরীর থিরথিরোবে, আমাকে বলবি, আমি শান্ত করে দেব । তারপর তো সমরবাবু দিনের বেলার অফিসের ডিউটিকে রাতের ডিউটি করে নিলে, আমরা দুজনে মিলে বাচ্চা দুটোকে ঘুম পাড়িয়ে, নবনীতা দিদির বিছানায় শুয়ে পড়তুম । কত রকম ভাবে প্যার-মোহোব্বত করতে পারে সমরবাবু ; কাঁইচিমার মোহোব্বত করতে শিখিয়েছে । চুল ওঠাবার কিরিম, বগলের পাউডার, বুকের কিরিম, গায়ে গন্ধমাখার গ্যাসের টিন, শ্যাম্পু, লিসটিপ, প্যার-মোহোব্বত করতে গেলে এসব জিনিস কত দরকার তা সমরবাবুর চেয়ে ভালো কেউ জানে না । নবনীতা দিদি জানবার পর আমাকে যখন বকুনি দিচ্ছিল, সমরবাবু নবনীতাকে গালে কষে দিয়েছে এক থাপ্পড়, এইসান, ধাঁয় । ওনাদের ছাড়াছাড়ি হয়ে গেল, আমি সমরবাবুকে পেয়ে গেলুম, এখন আমি ডবল মাইনে পাই, কাজও করতে হয় না ।
ডিভোর্স দেয়া সমরেন্দ্রর বউ নবনীতা এখন নিজের মারুতি গাড়ি চেপে অফিস যায়, নিজে চালায় । বলেছে, যাদের বাড়ির পদবি নিয়ে বাচ্চা দুটো জন্মেছে, তারাই মানুষ করুক । সৌদামিনীকে স্কুটারে পেছনে বসিয়ে, রাজপথে নবনীতার গাড়ি দেখতে পেলে, তার পাশাপাশি চালায় সমরেন্দ্র । নবনীতার দিকে বাচ্চাটাকে তুলে দেখিয়েছে সৌদামিনী, বত্রিশপাটি হাসি ফুটিয়ে । সেই ঘটনার পর, আইনত নিষিদ্ধ হলেও, গাড়ির কাচে কালচে সানফিল্ম লাগিয়েছে নবনীতা ।



আট
ইতুকে দেখে অবাক হননি সুশান্ত ঘোষ, কেননা ইতু বাসে বসে ফোন করে জানিয়ে দিয়েছিল যে গর্দানিবাগের বাড়িতে অমিত বর্মণ এসেছে আর ও আজকেই অমিতের সঙ্গে পালাচ্ছে, সুশান্তজেঠুর বাড়িতে যাবে, বাসস্ট্যাণ্ডে সুশান্তজেঠু যেন ওদের নিতে আসেন । তার আগে সুশান্তর বড়জেঠি, মানে ইতুর বটঠাকুমা, ফোন করে জানিয়ে দিয়েছিলেন, দ্যাখ ইতু আর তোর ছেলেবেলাকার বন্ধু অতনুর ছেলে অমিত তোর বাড়ি পৌঁছোল বলে, এখানে হইচই ফেলে চলে গেছে, যা করেছে একশবার ভালো করেছে, ওদের মুখেই শুনিস ।
বাসস্ট্যাণ্ডে বোলেরো নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন সুশান্ত ঘোষ। দিয়ারায় পৌঁছে, পটলের পাহাড়, তরমুজ-শসা-ফুটির ডাঁই দেখে ইতু বলল, এ তো বেশ ভালো জায়গা গো, ভিলেজ-ভিলেজ টাইপ, যেমন টিভিতে দেখি । দিনকতক থেকে গেলে হয়না এখানে ?
--না না, প্রায় আঁৎকে বলে উঠল অমিত, যত তাড়াতাড়ি কেটে পড়া যায় ততই সবায়ের মঙ্গল ।
--ঠিক আছে, যাসখন, কালকে সকালে তোদের জন্যে নৌকো করে দেব । আজকে রেস্ট নিয়ে নে । আমরা কি খাই কোথায় শুই এসব দেখে যা । আমাদের জীবন কম রঙিন নয় । আমার বউ, শশুর, শাশুড়ির সঙ্গে আগে পরিচয় করিয়ে দিই তোদের ।
--হ্যাঁ, আমি তো আজ পর্যন্ত তোমার শশুরমশায়কে দেখিনি, শুনেছি যে উনি গর্দানিবাগের বাড়িতে এসে তোমাকে ফেরত দেবার জন্য দশ লাখ টাকা চেয়েছিলেন ।
--উনি যখন জেঠা-বাবা-কাকার কাছে র‌্যানসাম চাইতে গিয়েছিলেন, তার আগেই বেবির সঙ্গে আমার বিয়ে হয়ে গিয়েছিল। উনি জানতেন যে বাবা-জেঠারা ফোতো-বড়োলোক, আর দশ লাখ টাকা দেবার মতো ক্ষমতা বাবা আর জেঠাদের নেই ।
অমিত বলল, তোমার লাইফটা আনবিলিভেবল । অ্যাডভেঞ্চারস ।
--এখানে এসে টের পাচ্ছি গো, কী ধরনের বিপ্লব ঘটিয়ে ফেলেছ নিজের জীবনে । ইতু বলেছিল ।
সুশান্ত, এই যে আমার বউ বেবি, বলতে, একজন ঢ্যাঙা কালচে কৃশতনু যুবতী, দেখলেই বোঝা যায় সাজগোজ করে পারফিউম মেখে এলো, অমিত আর ইতুর পায়ে দুহাত ঠেকিয়ে প্রণাম করল । সুশান্তর বউকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে আরম্ভ করল ইতু, কেঁপে-কেঁপে কাঁদতে লাগল । ইতু বলল, হিন্দিতে, তুমি আমাদের পায়ে হাত দিচ্ছ কেন ? বয়সে তুমি আমাদের বড়ো, তুমি তো আমার জেঠিমা হও ।
বেবি : এই প্রথম শশুরবাড়ির লোক আমাদের বাড়ি এলো । শশুর শাশুড়িকে তো দেখিনি ; তাদের প্রণাম তোমাদের পায়ে রাখলুম ।
সুশান্তর শশুর তারিণী মণ্ডল আর শাশুড়ি মন্হরা দেবী ইতুদের আসার খবর পেয়ে হাজির হলে, ছফিটের ঋজু পালোয়ানি কালো তারিণী মণ্ডলকে দেখে ইতু বলে ফেলল, তোমার শশুর তো একেবারে কোমোডো ড্র্যাগন গো, সেরকমই জিভ দিয়ে ঠোঁট চাটছেন । বলে ফেলে, বলল, সরি , ওনাকে দেখে বেফাঁস বেরিয়ে গেল মুখ থেকে।
--বেফাঁস বেরোয়নি, উত্তর দিল সুশান্ত, তারপর যোগ করল, ইতু তোর অবচেতনে ওনার সম্পর্কে যে ভীতি জমে আছে তা থেকেই বেরিয়ে এলো কোমোডো ড্র্যাগনটা । ঘাবড়াসনি, উনি কোনো ড্র্যাগনের কথাই জানেন না, নিজেকে ছাড়া ।
তারিণী মণ্ডলের শাশুড়ি বলল, এতদিন পরে আত্মীয়দের সঙ্গে জামাইবাবার খাঁটি বাংলায় কথা বলার সুযোগ হল । বলে নাও, বলে নাও, তারপর আমাদের পালা । অমিত-ইতুর দিকে তাকিয়ে বলল, আমার নাতিও বাংলা, আংরেজি, হিন্দি, ভোজপুরি, মৈথিলি বলতে পারে ।
তারিণী মণ্ডল গমগমে কন্ঠস্বরে গর্ব ঝরিয়ে বলল, আমার নাতি বাংলা বলতে, লিখতে আর পড়তে পারে। ইংলিশে কথা বলতে পারে, একদম আংরেজ পলটন জইসন ।
বেবির প্রশ্নাতুর ভ্রু দেখে অমিতের মনে হল, এনারা বোধহয় প্রণাম বা নমস্কার আশা করছেন ওদের তরফ থেকে ; বেবি এসেই ঝপ করে দুজনের পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করেছে । ইতু নির্ঘাত প্রণাম করতে চাইছে না, হাঁটু ছুঁয়ে প্রণাম করতেও ওর বাধো-বাধো ঠেকবে, একে বিহারি তায় আবার শিডুলড কাস্ট, হয়ত জীবনে কোনো বিহারির পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করেনি । হাতজোড় করে নমস্কার করাটাও বিসদৃশ । অমিত আচমকা সবাইকে অবাক করে দিয়ে মুঠো পাকিয়ে নির্বাক রেড স্যালুট দিল সুশান্তর শশুর-শাশুড়িকে । দেখাদেখি ইতুও তাই করল ।
তারিণী মণ্ডল বলল, চাবস চাবস, এই তো চাই, নেতাজির মতন স্যালুট দেবে, বলে, সুভাষচন্দ্র বসুর নাম উচ্চারিত হলেই যা করে থাকে, উরুতে চাপড় মেরে বিব্রত করল নিজের জামাই আর তার অতিথিদের । মন্হরা দেবী বেবিকে হুকুম দিল, এই বেবি, আজকে ওদের জন্য একটা কচি শুয়োর কাটতে বল, গরম-গরম শুয়োরের মাংস আর পুদিনার চাটনি দিয়ে ভুট্টার রুটি খেয়ে যাক ।
শুয়োরের মাংস খেতে হবে শুনে অমিতের কব্জি আঁকড়ে ফেলেছিল ইতু । অমিত ফিসফিস করে বলল, যেখানে যাচ্ছ সেখানে হয়ত মহুয়ার রুটি আর ভাল্লুকের মাংস খেতে হতে পারে । পরে, নৌকোয় করে যাবার সময়ে, ছইয়ের ভেতরে বসে, নদীর ছলাৎছলের সঙ্গে তাল মিলিয়ে অমিত গল্প করেছিল মুরিয়া, মাড়িয়া, গোঁড় উপজাতিদের জীবন নিয়ে । অবুঝমাড়ের পাহাড়ি মানুষদের বিভিন্ন গোষ্ঠীদেবতা আছে । নাগবংশ, যারা কেউটে সাপের পুজো করে বলে কোনো সাপ খায় না, মরা সাপ দেখতে পেলে সেদিন শোক পালন করে গোষ্ঠীর সবাই । তেমনই আছে কাছিমবংশ, বকরাবংশ, বাঘবংশ, আর বোধমিকবংশ, মানে মাছের বংশ ।
--হ্যাঁ, তাহলে আজকে থেকে অভ্যাস করে নিই । বমি পায় পাক, বমি করতে-করতে তো পোয়াতিরাও অভ্যস্ত হয়ে যায় ; প্রসবের অসহ্য যন্ত্রণায় ভুগে বারবার বাচ্চার জন্ম দেয় । ইতু বলল ফিসফিসিয়ে । শুয়োরের মাংস তবু খেলো না ইতু, বলল, এখন পারছি না, ক্রমশ অভ্যাস করব । সুশান্তর ঘরে খেতে বসে বেবির দেয়া সিম আর ফুলকপির আচার দিয়ে মকাইয়ের রুটি খেলো । বিভিন্ন ব্র্যাণ্ডের বডি পারফিউম দেখে ইতু বলল, তুমিও তো তোমার এই জীবনে পুরোপুরি অভ্যস্ত হয়ে উঠতে পারোনি দেখছি ।
বেবি : ওই সব গ্যাসগুলো নাআআআ ? ফিকফিকে দাঁতে বলল বেবি, ডেওডেরেন্টের দিকে তাকিয়ে ইতুকে কথা বলতে দেখে, ওই গ্যাস আমার গায়ে না মারলে আমার ঘুম আসে না ।
ইতু : কার ঘুম আসে না ? তোমার না আমার জেঠুর ?
বেবি : আমাদের দুজনেরই । তুমি নিয়ে যাও না কয়েকটা গ্যাস, বেশ ভালো লাগবে । দুজনে ঘুমোতে পারবে ।
--আর ওই কসমেটিকসগুলো ? বউকে তো হাল ফ্যাশানের সাজগোজের জিনিস কিনে দাও দেখছি, বলল ইতু ।
--আমি কিনে দিই না, বেবি টিভিতে দ্যাখে আর কিনতে লোক পাঠায় । বলল সুশান্ত, শুয়োর মাংসের বড়ার ঢেঁকুর তুলে ।
--সুশান্তজেঠু তোমার কাছে যদি থাকে তো তুমি ইতুকে মশা থেকে বাঁচার ক্রিম দিতে পারো, গিয়েই হয়তো অ্যাডজাস্ট করতে পারবে না । অমিতের প্রস্তাব ।
--আমি নিয়ে নিয়েছি সঙ্গে, কোথায় থাকবো শোবো কিছুই তো জানি না, প্রথম-প্রথম লাগবে । ওষুধ-বিষুধও নিয়েছি ।
--অ্যালোপ্যাথিক ? প্রশ্ন করল অমিত ।
--হ্যাঁ, হারবাল মেডিসিন তোদের চারপাশ থেকে যোগাড় করে নেব ।
--তোর দলের ডাক্তারের অভাব পুরণ করে দিল ইতু। বলল সুশান্ত ।
--তোমার ছেলের নাম কি গো, গর্দানিবাগে তোমরা যখন এসেছিলে, আমি ছিলুম না ? জানতে চাইল অমিত ।
--অপু, সুশান্ত বলার আগেই জবাব দিল ইতু ।
--ওর নাম আপ্রাধি ঘোষ, বলল বেবি, অপু আর নাম এই শব্দ দুটো থেকে প্রশ্নটা অনুমান করে ।
সুশান্ত বলল, সামান্য হেসে, বেবি টের পাবে না এমন করে, ওর দাদুর মতে মহাকবি বাল্মিকী ছিলেন ওনার মতনই অপরাধী, তিনি যদি পূজিত হন, তাহলে কারোর নাম অপরাধী হলে সে পূজিত হবে না কেন । এরা সবাই জানে যে আমার ছেলের নাম আপ্রাধি : আমি স্কুলে ওকে অশ্বমেধ নামে ভর্তি করেছি, স্কুল লিভিং সার্টিফিকেট, বি এ পাশের ডিগ্রিতে আমার দেয়া নামটাই আছে । ছেলেকে বলা আছে যে এ-কথা এনাদের কাছে ফাঁস করার প্রয়োজন নেই, ওনারা যে নামে ডাকতে চান ডাকুন, পরিচয় করাতে চান, করুন ।
--তুমি কিন্তু একেবারে বদলে গেছ, তাই না, উচ্চমাধ্যমিক দেবার পর বাড়ি ছেড়ে ? অমিতকে বলল সুশান্ত । ইতুর কাছে শুনলুম এন জি ওতে ঢুকে দেশোদ্ধারের কাজ নিয়েছ।
--দেশোদ্ধার ? এই দেশের ব্যবস্হাকে আমূল উপড়ে না ফেললে, কারোর উদ্ধার হবে না । বাবার আওড়ানো বুলিকে, প্রয়োগ করল অমিত, তারপর বলল, তুমিও তো অন্যমানুষ হয়ে গেছ , দেখে মনে হচ্ছে, নিজের মতন করে শোষণের বিরুদ্ধে লড়ছ ।
--না আমি সেই লোকটাই আছি, কেবল অভ্যাসগুলো পালটেছে । টাকাকড়ি করার লোভ ছিল, তা করেছি, আয়েস করার লোভ ছিল তা করছি । মানুষের ওপর আধিপত্যের নেশাই আলাদা, ও তুমি বুঝবে না, কারোর বিরুদ্ধেই লড়ছি না ; আর শোষণের বিরুদ্ধে ? কই ? বরং শোষকের সিংহাসনে বসে পড়েছি হে । শোষিতরা শোষকের আনন্দের মজা বুঝতে পারে না । ধার্মিক গুরুদের দেখেছ তো ? অনেকটা সেরকম । নিজেকে নিঃশব্দে বললেন, আমি আমার বিরুদ্ধে লড়ছি ।
--ঈশ্বরে বিশ্বাস এটসেটরা হিন্দুগিরি করছ নাকি, চারিপাশে তাকিয়ে টের পাচ্ছি । রসুন, পেঁয়াজ, আদাবাটা, বেসন মাখানো, হামান দিস্তেতে থেঁতো করা শুয়োরের মাংসের বড়ে খেতে-খেতে বলল অমিত ।
--ইসওয়র নাআআআআ ? ছট পুজা করতে হ্যাঁয় ইনকে খাতির, বলে, সুশান্তর দিকে ইঙ্গিত করল বেবি ; আপ ভি কিজিয়েগা ইতু দিদি, আপকে আদমি কা লমবিইইইই জিন্দগি কে লিয়ে ।
--ঈশ্বর ? ইউ মিন গড ? ইয়েস, গড ইজ ওমনিকমপিটেন্ট ওমনিপ্রেজেন্ট । আই অ্যাম গোইং টু গেট হিম ইরেজড ওয়ান ডে, ওনার অবসান পৃথিবীতে অবধারিত । বক্তব্য রাখতে গিয়ে গম্ভীর হয়ে গেলেন সুশান্ত ।
--বদলাওনি দেখছি, বলল ইতু, আগে গর্দানিবাগের বাড়িতে যেমন বলতে, তেমন ধরনের কথাই বলছ, ভগবানের ওপর বেশ চটে আছ, তাই না ? এখন আর কি, এখন তো তুমিই-ই ভক্তের ভগবান, দেখতেই পাচ্ছি এসে অব্দি ।
--হ্যাঁ, শুধু ঈশ্বর বদলে-বদলে যেতে থাকে । তারপর জিগ্যেস করলেন, আমার আর অতনুর বন্ধুবান্ধব, যেমন অরিন্দম মুখার্জি , মৌলিনাথ, মাহমুদ জোহের, এরিক পেজ, মলয় রায়চৌধুরী, ওদের খবর জানিস নাকি ইতু ? দেখা-সাক্ষাৎ হয় ? সবাই বুড়ো হয়ে গিয়ে থাকবে বোধহয় ; আমিই কেবল যুবক থেকে গেলুম, বেবি আর বেবির বাবা-মায়ের খাঁচার খাবার-পানীয় সেঁটে ।
--তোমাদের অফিসের শ্যামলী কর্মকারকে মনে আছে ? যার পিঠে শিরদাঁড়ার দুপাশে জড়ুল, যেন প্রজাপতির ডানা, দেখাবার জন্য পিঠখোলা ব্লাউজ পরেন ? ওনার মেয়ে তো আমার বন্ধু । সব খবরই পাই । অরিন্দম ওনার সাঁওতাল গার্লফ্রেণ্ডের সঙ্গে কার অ্যাকসিডেন্টে পুড়ে মরে গেছেন, কলকাতায় । মৌলিনাথ কিডনি ফেল করে মরে গেছেন, কলকাতায় । মাহমুদ জোহের দ্বিতীয় বিয়ে করেছিলেন, করে, সিঁড়ি থেকে গড়িয়ে পা ভেঙে হুইলচেয়ারে জীবন কাটাচ্ছিলেন ; একদিন এক যুবক এসে মাহমুদ জোহেরের চোখের সামনেই ছোরা মেরে-মেরে ওনার দ্বিত্বীয় বউটাকে মেরে ফেললে, পাটনায় ; যুবক ছিল দ্বিতীয় বউয়ের প্রেমিক ।
--সে কি !
--হ্যাঁ গো । এরিক পেজ পাগল হয়ে গেছেন, বাড়িতে ওনাকে শেকল দিয়ে বেঁধে রাখে, মোকামায় ; শুনেছি যে যখন বেশি চেঁচামেচি-গোলমাল করেন তখন ওনার হাতে একটা ব্রিটিশ আমলের রুপোর টাকা গুঁজে দিলে চুপ করে যান, আর টাকাটাকে শুধিয়ে-শুধিয়ে, হ্যালো মাউন্টব্যাটেন সাহেব, আপনি চলে গেলেন কেন, এখন আমাদের কী হবে, ইনডিয়াকে ফ্রিডাম দেবেন বলেছিলেন, কিন্তু বেইমানি করে চলে গেলেন, কেউ-কেউ ফ্রি হল, সবাই কেন হল না, ডেডউইনা মাইয়া, ডেডউইনা মাইয়া, ডেডউইনা মাইয়া, এই ধরনের কথা বলে নিজের মনে বকবক করেন ।
--পাগল হয়ে গেল ? অতনুদের গ্যাঙের তো ও লিডার ছিল রে ! অমিতের দিকে ফিরে বললেন, সরি অমিত, তোমার বাবার অন্যধরণের বন্ধুবান্ধবও ছিল, নারী-নারকটিক গ্যাঙ বলত সবাই ।
--মলয় রায়চৌধুরী, নোট পোড়াবার চাকরি ছেড়ে, পাটনার বাড়ি ছেড়ে, গ্রামীণ উন্নয়নের চাকরি নিয়ে কলকাতা চলে গেছেন; পাটনায় এসে হোটেলে উঠেছিলেন, এসেছিলেন আমাদের বাড়ি, বউকে নিয়ে । পাটনার বাড়িটা আর বসবাসের মতন নেই জানিয়েছিলেন, ওনার পাটনার বাড়ির লাইব্রেরি থেকে হাজার খানেক বই রঞ্জিত ভট্টাচার্য নামে ওনাদের এক আত্মীয় চুরি করে নিয়ে চলে গেছে । কলকাতায় আবার নাকি অনেক বই জড়ো করেছিলেন, মুম্বাই যাবার সময় সেসব বই যাকে বিলিয়ে দিয়েছিলেন, সেই লোকটাকে রাজনৈতিক মাস্তানরা এমন পিটুনি দিয়েছিল যে মরো-মরো লোকটা প্রায় ছয় মাস ভেলোরে ট্রিটমেন্টের পর সুস্হ হয়েছে, কিন্তু হিন্দু বাঙালিদের ওপর চটে গিয়ে খ্রিস্টান হয়ে গেছে, চার্চ-টার্চ যায়।
-- ওঃ, তুই তো অনেক খবর রাখিস রে । সমরেন্দ্রর কী খবর ?
--সমরজেঠুর গোলমালের কথা তুমি কী করে জানলে ? জিগ্যেস করল ইতু ।
--বড়জেঠিমাকে মোবাইল কিনে দিয়ে এই সুযোগটা পেয়েছি, উনি বহুক্ষণ আমার সঙ্গে গ্যাঁজাতে ভালোবাসেন । ওনার কাছ থেকে বাড়ির সব খবর পেয়ে যাই । বাংলায় কথা বলার সুযোগ পাই । আমি ওনার বেশ কিছু গল্প মোবাইলে রেকর্ড করে ল্যাপটপে ধরে রেখেছি । শুনি মাঝে-মাঝে ।
--সমরজেঠুর লেটেস্ট সমস্যার কথা বলেছে জেঠি ?
--কী সমস্যা ?
--সৌদামিনীর বাচ্চাটাতো বেশ ফুটফুটে ক্যালেণ্ডার-খোকা হয়েছে । নবনীতাজেঠির দুই যমজ ছেলের চেয়ে ভালো দেখতে । তো সেই বাচ্চাটাকে মহাবীর নেমিচাঁদ নামে একজন বিলডার-কনট্রাক্টার লিফ্ট করিয়ে নিয়েছিল । বিলডারটার দুটো মেয়ে আছে, নয় বছর আর চোদ্দো বছরের ; তবু ব্যাটা ছেলে-ছেলে করে অবসেসড ছিল । সৌদামিনী একদিন অটো করে বাচ্চাটাকে খগোলে ওর বাপের বাড়ি নিয়ে যাচ্ছিল মা-বাবাকে দেখাবার জন্য, তখন মোটর সাইকেলে দুজন লোক বাচ্চাটাকে ছিনিয়ে নিয়ে দে চম্পট । সৌদামিনী, জানো বোধহয়, কেমন চালাকচতুর মেয়ে, মোটর সাইকেলের নম্বরটা মনে রেখেছিল । সমরজেঠুকে সঙ্গে নিয়ে কোতোয়ালিতে কমপ্লেন করার বারো ঘন্টার মধ্যে বাচ্চাটাকে ফেরত পায় ওরা । সবসুদ্দু সাতজন লোক ধরা পড়েছে । নেমিচাঁদ নাকি ওর বউকে সঙ্গে নিয়ে দানাপুরের এক মন্দিরে পুজো দিয়ে বেরোবার সময় সিঁড়িতে বাচ্চাটাকে পেয়ে ওর বউকে বুঝিয়ে ছিল যে বাচ্চাটা ঈশ্বরের দান । যে গুণ্ডাগুলোকে দিয়ে লিফ্ট করার কাজে লাগিয়েছিল, তারা, পরিকল্পনা অনুযায়ী বাচ্চাটাকে মন্দিরের সিঁড়িতে রেখে দূরে দাঁড়িয়ে বাকি পেমেন্টের জন্য অপেক্ষা করছিল, তখনই পুলিশ ওদের পাকড়াও করেছে । নেমিচাঁদ সৌদামিনিকে প্রোপোজাল দিয়েছে যে মামলাটা তুলে নিলে দুলাখ টাকা দেবে । সৌদামিনী সমরজেঠুকে সঙ্গে নিয়ে নেমিচাঁদের বাড়ি গিয়েছিল, এক লাখ টাকা নিয়ে নিয়েছে বিল্ডারটার কাছ থেকে, কিন্তু মামলা এখনও ফেরত নেয়নি সৌদামিনী, সমরজেঠু চাপ দিচ্ছে অ্যামাউন্ট বাড়াবার জন্য । পাটনার হিন্দি কাগজে তো সৌদামিনী আর সমরজেঠুর কোলে ওর বাচ্চা নিয়ে ফোটো বেরিয়েছিল, দেখোনি ?
অমিত অবাক তাকিয়েছিল ইতুর দিকে । গল্প শেষ হলে বলল, যেখানে যাচ্ছ সেখানে কোনো গল্প পাবে না, কেবল শোষণ, অস্বাস্হ্য, মৃত্যু আর গুলিবারুদের রক্ত হিম করা গল্প পাবে । দারিদ্র্য, ক্ষুধা, শোষণ আর বঞ্চনার প্রতিদিনকার সত্যকার ঘটনা স্বচক্ষে দেখবে ; তোমার এই গোপ্পুড়ে মস্তিষ্ক এখানে দিয়ারার গঙ্গায় বিসর্জন দিয়ে যাও । বাবার বক্তৃতার কয়েকটা কথা, যে কথাগুলোকে, শুনে-শুনে, অমিত মনে করে কিতাবি-বাকোয়াস, ব্যবহার করার সুযোগ ছাড়ল না ।
উচ্ছ্বাসকে সামলে ইতু বলল, সরি, সুশান্তজেঠুর সঙ্গে কথা বলতে বলতে সেই ছোটোবেলায় ফিরে গিয়েছিলুম, যখন ডাইনিং টেবিলে বসে বড়োরা সবাই মিলে শহরের নানা কেচ্ছা আলোচনা করত, আর আমরা ছোটোরা শুনতুম, তুইও তো হাঁ করে শুনতিস, ভুলে গেলি কেন ।
--দু-দুটো মেয়ে রয়েছে লোকটার, আবার ছেলের কী দরকার ? মেরে ফেলা মেয়ের কথা মনে পড়ল সুশান্তর, ওকে তো সেই মেয়ের মুখও দেখতে দেয়া হয়নি ।
--সৌদামিনীর বডি দেখলে মাথা বিগড়োবেই । বটঠাকুমা বলেছিল যে একে রেখো না, এর ভাবগতিক ভালো নয়, কাজের বউয়ের অমন খাঁজ-দেখানো লোকাট ব্লাউজ কেন ? কিন্তু সকলে মিলে সৌদামিনীর পক্ষ নিয়ে বলেছিল যে তিন তলা বাড়ি ঝ্যাঁটানো, পোঁছা আর এতগুলো লোকের বাসন মাজার জন্য উপযুক্ত স্বাস্হ্য থাকা জরুরি ।
সুশান্ত : আমার কাছে অমরেন্দ্রর গল্পটাও রেকর্ড করা আছে । বড়জেঠি বলেছিল একদিন, শুনবি ?
ইতু : শোনাও, বড় জেঠি ভেতরের খবর আরো বেশি জানেন । অমরকাকু চলে গেছে ব্যাঙ্গালোর । কী করবে বল ? বউ পালিয়ে গেলে পুরুষদের যে কী অবস্হা, যেন জাঁতিকলে পড়া জ্যান্ত ইঁদুর । অমিতের দিকে ফিরে ইতু বলল, তুই তো জানিস, অমরেন্দ্রকাকু আমাদের নতুনদাদুর ছেলে, ব্রিলিয়ান্ট ছিল, খড়গপুরে পড়েছে, নতুনদাদু ওকে পড়াবার জন্য মেমারির তিন কাঠা জমি বিক্রি করে টাকা তুলেছিলেন ।
অমিতের উদাসীন মুখের পানে তাকিয়ে ইতু টের পেল যে প্রসঙ্গটা তোলা উচিত হয়নি । অমিতের মা মানসী বর্মণ, পালিয়ে না গেলেও, স্বামীর উপস্হিতিতেই আরেকজনের সঙ্গে সম্পর্ক পাতিয়ে অমিতের জন্ম দিয়েছেন । হয়ত অমিতের বাবা-মা সেই কারণেই অমিতকে মানুষ করার দায়িত্ব দিয়ে গিয়েছিলেন রাঙাকাকু-কাকিমার ওপর ; ওনারা অমিতকে আইনত দত্তক নিয়ে নিলে অমিত নিশ্চই গর্দানিবাগের বাড়ি থেকে অমনভাবে উধাও হয়ে যেত না ।
সুশান্ত : শোন । স্পিকারের ভল্যুম বাড়িয়ে দিই ।
ইতু : তোমার তরমুজ মদ দাও তো একটু, খেয়ে দেখি, হুইস্কি, রাম, ব্র্যাণ্ডি, জিন, ভোদকা খেয়েছি, চিড়াইয়াটাঁড়ের দেশিদারুও খেয়েছি, এই ধরণের রঙিন কান্ট্রি লিকার খাইনি । বার্থ ডে সেলিব্রেট করতে বার-রেস্তরাঁয় গেলে, বাবা বিয়ার এলাউ করত, বড় জোর, দু’পেগ প্রিমিয়াম হুইস্কি ।
সুশান্ত । এই নে, চুমুক দিতে-দিতে শোন ।
...এদিকে কী হয়েছে জানিস তো...অ্যাঁ...অমরের বউটা একজনের সঙ্গে পালিয়েছে...অমর রে...অমরেন্দ্র...প্রেম করে বিয়ে করেছিল...আই আই টিতে পড়ার সময়ে...বামুন বাড়ির মেয়ে...তুই তো দেখিসনি….বাবা...কী দেমাগ...মাটিতে পা পড়ে না...পালিয়েছে এক ব্যাটা তামিলিয়ানের সঙ্গে...কোথায় জানিস...আমেরিকা...অমর কেন জানতে পারেনি...তুই-ই বল...পাসপোর্ট ওর বউয়ের আগে থাকতেই ছিল...কবে ভিসা হল...কবে টিকিট হল...কাকপক্ষীও টের পায়নি...আচ্ছা তুই আমাকে বল...অমর কেন জানতে পারেনি না যে ওর বউ কার সঙ্গে মিশছে...কোথায় যাচ্ছে...রাত করে কেন ফিরছে...অমরের মতন পুরুষদের উচিত শাস্তি...ওরা বউকে মনে করে যেন ফলের গাছ...যখন ইচ্ছে এই ডাল থেকে আম খাচ্ছি..ওই ডাল থেকে লিচু খাচ্ছি...সেই ডাল থেকে আপেল খাচ্ছি...তা খাচ্ছিস তো খা না...কে বারণ করেছে...কিন্তু বউ তো আর গাছ নয়...যে এক জায়গায় শেকড় বসিয়ে সারা জীবন তোমার পোঁতা মাটিতে থেকে যাবে...আর তুমি আজ হিল্লিতে কাল দিল্লিতে যত্তো নচ্ছার বন্ধুদের সঙ্গে বেলেল্লাপনা করে বেড়াবে...বউয়েরও তা সাদ আহ্লাদ আছে...শরীর আছে...রসের চাহিদা আছে...তাকেও তো সময় দিতে হবে...বউকে অবহেলার ন্যায্য পুরস্কার পেয়েছে ব্যাটা...তুই তোর বউকে সময় দিস তো...তোর বউ অবশ্য পালাবে না...বউ তো গাছের মতন নয় যে নট নড়ন-চড়ন এক জায়গায় থেকে যাবে...এখন বোঝো...গাছের গুঁড়ি জড়িয়ে ঘুমোও...আর গাছের গুণকেত্তন করো খঞ্জনি বাজিয়ে...পরে আবার গল্প করব, অ্যাঁ...পার্কে বসে তোকে ফোন করছি রে...বাড়িতে কে আড়ি পেতে শুনবে...তার চেয়ে পার্কে আসি সকালে...ডায়াবেটিস কমাতে হলে নাকি দুবেলা হাঁটতে হবে...এই এক বেলাই হাঁটি...বিকেলে টিভিতে একটা প্রোগ্রাম হয়...মেজকত্তা কচুর লতি এনেছিল ভুল করে...লতির ঘণ্ট তোর প্রিয় ছিল বলে কাজের বউকে বললুম ফেলে দিয়ে আসতে… ও কী আর ফেলে দেবে...নিজের বাড়ি নিয়ে গিয়ে নিজেদের মতন করে রাঁধবে….রাঁধলে তোর মা কান্না সামলাতে পারবে না….বিকেলে টিভির জন্য সময় পাইনা...ভালো থাকিস...তোর বউ ছেলেকে আশীর্বাদ দিস...সকালে পুজো-আচ্চা আছে...জানিস তো...
ইশারায় বেবিকে ডেকে ইতুদের গিফ্ট দিতে বলল সুশান্ত, ইতু বলল, আরে তুমি বিয়ে করলে, নতুনবউকে গিফ্ট তো আমরাই দেবো, তোমার বউ কেন দেবে ? তুমি বরং আমাদের কিছু মোটা টাকা দিও । তোমার বউকে দেবার মতন আমার সঙ্গে অবশ্য কিছুই নেই । তোমার বউয়ের গালে বরং একটা চুমু দিই ।
বেবি হাজার টাকার দুটো প্যাকেট এনেছিল । সুশান্ত বলল, ওরা যেখানে গিয়ে সংসার পাতবে সেখানে বোধহয় লোকে একশ টাকার নোটও দেখতে পায় না । শুনে, বেবি প্রকৃতই হতবাক, বলল, বাংগালের লোকেরা কি বিহারিদের চেয়েও কাংগাল ?
সুশান্ত বলল, একশ আর দশ-পাঁচ টাকার প্যাকেট নিয়ে আয়, হাজার টাকা প্যাকেট খুলে নিয়ে আয় । এনে ইতুর ঝোলাতে রেখে দে ।
--জি । আচ্ছা ।
ইতু : এরকম করকরে টাটকা হাজার টাকার নোটের প্যাকেট ? এ তো আমিও দেখিনি গো !
সুশান্ত : পলিটিশিয়ান আর ঠিকেদারদের দেয়া ডোনেশান । শশুরমশাই মাসোহারা পান ।
ইতু : এরকম রাজত্ব পেয়েছ, সঙ্গে দীঘলচাউনি রাজকন্যা পেয়েছ । ও, তাই তো ভাবি, কীসের টানে আটকে রইলে । তোমার বউতো একেবারে হরিণী, অমন বড়-বড় চোখ, এই বয়সে ফিগারও মেইনটেইন করেছে, গায়ের রঙের কী করার আছে ! ওনার ব্যবহার অনেক মিষ্টি । ট্রফি বলে একটা কথা আছে, জানো তো, তোমার বউ হল সেই ট্রফি ।
বেবি : হরণ ? না ওনাকে বাবা হরণ করে আনেননি, উনি নিজেই এখানে বাবার কাছে সাহায্য চাইতে এসেছিলেন । তখন ওনাকে দেখতে অনেক ভালো ছিল, এখন মদ আর শুয়োরের মাংস খেয়ে-খেয়ে ভমচৌলা কুম্ভকরণ হয়ে গেছেন । ওনাকে দেখেই আমার পছন্দ হয়ে গিয়েছিল । আমি কেন দিয়ারার অন্য কাউকে বিয়ে করতুম, বলুন, যখন এত ভালো পাত্র আমাদের দরোজায় শ্রীরামচন্দ্রের মতন এসেছে !
সুশান্ত : আমাকে হরণ করার কথা বলছে না । বলছে যে তুই হরিণের মতন সুন্দরী ।
বেবি হাঁটু মুড়ে ইতুর পায়ে মাথা ঠেকিয়ে বলল, এতদিনে শশুরবাড়ির আশীর্বাদ পেলুম । ইতু ওর মাথা ধরে কপালে একটা চুমো দিল, বলল, তুমি তো বাক্যবাগীশ হরিণী গো, আমি ভাবতুম আমিই বুঝি গায়েপড়া বেহায়া ; সুশান্তজেঠু, আমার হয়ে তোমার বউকে একটা মুখরোচক চুমু দিও । নিজের দুই হাত থেকে চারগাছা চুড়ি আর কান থেকে টপ খুলে বেবিকে দিয়ে ইতু বলল, যেখানে যাচ্ছি সেখানে এগুলোর প্রয়োজন হবে না, তুমি রেখে নাও । বেবি সুশান্তর দিকে চাইতে, সুশান্ত বলল, লে লে, কুছ তো তুঝে তেরে সসুরাল সে মিলা ।
--এই ছিঃ, গুরুজন না, ইতুর চুমু প্রসঙ্গে বলল অমিত ।
--কোনো-কোনো গুরুজন ঝাঁসু হন, ইয়ার্কিকে প্রশ্রয় দিতে ভালোবাসেন । সুশান্তজেঠু তাদের এক ও অদ্বিতীয় । করে নিচ্ছি ইয়ার্কি । আর তো বোধহয় দেখা হবে না । তাছাড়া এই মদটা বেশ কড়া । তোমার ছেলে অপুকে দেখছি না, তোমার শশুরবাড়ির ট্র্যাডিশান ফলো করে ওর বিয়ে দাওনি এখনও ?
বেবি বলল, আপ্পু নাআআআআ ? ওকে বিলেতে পাঠাতে চান উনি, আরও পড়াশুনা করার জন্য ; বিলেতে গেলে কি আর ফিরবে ? থেকে যাবে সেখানেই, টিভিতে দেখি, কত সুন্দর ওদেশের মেমরা, বুড়িরাও জোয়ান ।
অপুর সঙ্গে ওদের দেখা হল না । অপু তো দিল্লিতে ।
সুশান্ত ওদের নৌকোয় চাপিয়ে দিলে, গর্দানিবাগের বাড়িতে দেয়া মোবাইলটা গঙ্গার জলে ফেলে দিয়েছিল ইতু । সুশান্ত ওকে একটা চোরাই মোবাইল আর চারটে বেনামি সিমকার্ড দিয়েছেন ।
অমিতরা চলে যাবার পর সুশান্তকে মনমরা দেখে মেঠোগন্ধা নিরক্ষর বেবি জানতে চাইল, পুরোনো দিনের জন্য আপনার মন খারাপ লাগছে ?
অমিত আর ইতু চলে যাবার পর সুশান্ত ঘোষের মনে হচ্ছিল যে উনি প্রকৃতপক্ষে একা, নিঃসঙ্গে । ওনার বউ রয়েছে, চারিপাশে হুকুমবরদার রয়েছে, শশুর-শাশুড়ি রয়েছে, তবু উনি একা বোধ করেন নিজেকে । কেন এমন হয় ? কিছুরই তো অভাব নেই । ঠাণ্ডা একটা চাঞ্চল্য, বিক্ষোভ, অজানা অসন্তোষ লুকিয়ে রয়েছে , সেন্স অব বিলংগিং নেই ওনার, সদা সন্ত্রস্ত থাকেন, ভয়ে নয়, সন্ত্রস্ত থাকার অবস্হানকে ভালোবেসে ফেলেছেন বলে । মনে করেন যে ওনার বাইরের সঙ্গে ভেতরের মিল নেই । হোক না অস্বাস্হ্যকর, তবু একা থাকতে ওনার ভালোলাগে । উনি তো সেই চাকরি করার সময় থেকে মিশে আসছেন সবায়ের সঙ্গে, ঠোঁটে হাসি মাখিয়ে, কিন্তু দিয়ারায় স্হায়ী হবার পর থেকে আসেপাশের সবাই ওনাকে হতাশ করে চলেছে । উনি যেমন জগতসংসারের পরোয়া করেন না, তেমনই পৃথিবী ওনার পরোয়া করে না, জানেন উনি । এই যে অমিত বিপ্লব ঘটিয়ে ফেলতে চাইছে, রাষ্ট্রকাঠামো বদলে ফেলে ইউটোপিয়া আনার স্বপ্ন দেখছে, তাতে জগতসংসারের বয়েই গেছে । কাটার সময় শুয়োরগুলো যেমন আতঙ্কিত চিৎকার দেয়, তেমনই নিঃশব্দ চিৎকার ওঠে ওনার অস্তিত্ব জুড়ে । তিনি যেন তাঁর নিজের মগজের ফাঁকা পোড়োবাড়ির একমাত্র ভাড়াটে । কিসের সঙ্গে যে সংঘর্ষ করে চলেছেন তা উনি নিজেই জানেন না । কে জানে কোন আড়ালে ওৎ পেতে আছে বিষণ্ণ আতঙ্ক, ঘষা কাচের ভঙ্গুর আদলে ভেসে বেড়াচ্ছে শরীরময়, পেটের ভেতরের কুনকি-হাঁস, যাকে তরমুজের মদ প্রতিদিন গিলিয়েও বশে আনা যাচ্ছে না । বেবির সমর্পিত ভালোবাসার অতিউন্নত খোঁয়াড় সত্ত্বেও নিজেকে কেন অসম্পূর্ণ মনে হয়, পার্থিব সব কিছু পাবার পরও, চাহিদা মেটার পরও, নিজেকে অতৃপ্ত মনে হয়, আর এগুলো তো স্হায়ী হয়ে গেছে। এ থেকে যে মুক্তি নেই, তা আরও বিষময় যন্ত্রণাদায়ক এক সমস্যা ।

নয়
দিয়ারার আসেপাশের জলে মাছ ধরতে হলে, নৌকো বাইতে হলে, সুশান্তকে, মানে জামাইবাবার নামে তাঁর শশুরকে, রংদারি ট্যাক্স দিতে হয় । এই মহার্ঘ বালিয়াড়িতে সরকার বলতে বোঝায় তারিণী মণ্ডলের জামাই, যাকে গ্রামের লোক আর প্রশাসনের লোকেরা যে-যার আতঙ্কের মাধ্যমে চেনে-জানে । অঞ্চলের অন্য গুণ্ডারা, যেমন দীনা যাদব, দমদমি যাদব, রাসবিহারি মণ্ডল, দারা মিয়াঁ, সৎইয়া মণ্ডল প্রতিমাসে জামাইখোরাকি দিয়ে যায় ওনার শশুর বা শাশুড়িকে । ওনার দলের সবায়ের কাছে কাট্টা,তমঞ্চা, একনল্লা, দুনল্লা আছে, কয়েকজনের কাছে একে-সানতালিস আর একে-ছপ্পন ।
যে দিয়ারাগুলোর পলি প্রায় পাকা জমির চেহারা নিয়েছে, সেখানে সরকারি স্কুল আছে বটে কিন্তু বর্ষায় তারা ডুববে না ভাসবে তা কেউ আগাম বলতে পারে না বলে সারা বছর ক্লাস হয় না । ছেলে অপুকে তাই ভাগলপুর শহরে রেখে সেইন্ট জোসেফ কনভেন্টে ভর্তি করে দিয়েছিলেন জামাইবাবা । তারিণী মণ্ডলও চেয়েছিলেন নাতি আজকালকার খ্যাতনামা অপরাধীদের মতন স্যুটটাই পরে দেশে-বিদেশে নাম করুক । স্কুলে যে চারটে গ্রুপ ছিল লাল, হলুদ, সবুজ আর নীল, তাতে লাল গ্রুপে ছিল অপু, বাদশাহি লাল । ওর, অপুর, নামটা তারিণী মণ্ডলের দেয়া, আদর করে, আপ্রাধি ঘোষ, তারিণীর মতে জগতসংসারে অপরাধীর চেয়ে বড়ো আর কেউ হতে পারে না, তা মহারাজ বাল্মিকীর জীবন থেকে জানা যায় । এককালের ডাকাত সর্দার, পরে রামায়ণের লেখক, তাঁর নাম যদি উইয়ের ঢিবি হতে পারে তাহলে তারিণী মণ্ডলের একমাত্র নাতির নাম কেন রামায়ণ রচয়িতার অনুকরণে হবে না । তাই আপ্রাধি ; সুশান্ত নিজের মতো করে তাকে বাঙালিয়ানা দিয়ে অপু করলেও, কেউই ওকে অপু বলে ডাকে না, এমনকি সুশান্তর বিড়িসেবিকা মেঠোগন্ধা নিরক্ষর ডাগরচোখ শ্যামলিমা বউও নয় । বেবি ডাকে আপ্পু বলে ।
ওর ডাকনাম হয়ে গেছে আপ্পু । আড়ালে, আপ্পু দোগলা । স্কুলেতে সহপাঠীরা ‘আবে আপ্পু’ ডাকটাকে ‘এবি আপ্পু’তে, মানে ‘এ বাস্টার্ড আপ্পুতে’, পালটে তাতাতে চেষ্টা করলে, অপুর সরাসরি উত্তর, হ্যাঁ, তো কি হয়েছে ?
অশ্বমেধ হোষ নামে ডাকে না কেউ, টিচাররাও বলেন আপ্পু ।
বুক চিতিয়ে অপু জানায়, আমি বাঙালি, বুঝলি বাঙালি ।
--বাংগালি ? সে তো আরও কমজোর, দল বেঁধে চেঁচায় । দুজন এক সঙ্গে না হলে লড়তে ভয় পায় । আর কায়স্হ মানে তো মুনশিগিরি, যমরাজের কেরানি চিত্রগুপ্ত জাতে কায়স্হ । দেখিস না কায়স্হগুলো চিত্রগুপ্ত পুজো করে ।
--বাড়ি গিয়ে পুরাণ-শাস্ত্র পড়গে যা । চিত্রগুপ্ত হল বিহারি কেরানি, আর যমরাজ হল বাঙালি ।
--আচ্ছা ?
--হ্যাঁ । নেতাজি সুভাষচন্দ্র বোসের নাম শুনিসনি তোরা । ইংরেজদের এমন বাঁশ দিয়েছিল যে সে বাঁশ কাংরেসিরা ধামাচাপা দিয়ে পুঁতে রেখেছে । একদিন ওই বাঁশের চারা বেরোবে চারপাশ থেকে, তখন দেখিস কী হয়।
সুভাষচন্দ্র বসুর নামটা তারিণী মণ্ডল মুখস্হ করে রেখেছেন । নাতিকে যখনই উৎসাহিত করার দরকার হয়, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বোসের গল্প আরম্ভ করেন, সবই গাঁজাখুরি, কেননা উনি কেবল নামটুকুই জানেন আর ফোটো দেখেছেন । বলেন, আরে ওনার ফোটুর দিকে দ্যাখ, লম্বা-চওড়া গাবরু জওয়ান, প্যান্ট-শার্ট পরে স্যালুট নিচ্ছে । আর আজকালকার নেতাদের দিকে তাকিয়ে দ্যাখ, ভয়ে সবায়ের ল্যাজ পোঁদে এমন ঢুকে থাকে যে দশটা বন্দুকধারি নিয়ে ঘুরে বেড়ায় ; আমি তো শুধু দুটো পহলওয়ানকে রেখেছি, আমার ওপর রামধারি ধানুক একবার হামলা চালিয়েছিল বলে, রামধারীর জন্যই আমার বাঁচোখটা নষ্ট হয়ে গেল ।
--জানি দাদু, রামধারিকে তুমি লোক পাঠিয়ে কলকাতায় মারিয়েছিলে ; দুই রাজ্যের ঝগড়ায় সে ব্যাটার লাশ পনেরোদিন কলকাতার মর্গে পড়ে পচে পোকা ধরে গিয়েছিল ।
--আরে, এই দিয়ারার জমিজমা সবই গংগোতা আর মাল্লাহদের ছিল ।
--জানি, বাবা সেকথা বলেছিল তোমায় । এচ এচ রিজালে নামে একজন সায়েব ১৮৯১ সালে লোকগণনা করে লিখে গেছে সেসব । কিন্তু উঁচু জাতের আফসাররা টাকা খেয়ে ভূমিহার, রাজপুত, যাদব, কোয়েরি, কুর্মিদের হাতে দিয়ারার জমি তুলে দিত । গংগোতারা ফেরত নেবার চেষ্টা করতে গেলে তাদের চোখে ছুঁচ ফুটিয়ে অ্যাসিড ঢেলে দেয়া হয়েছিল, ক্রিমিনাল দেগে দেয়া হয়েছিল ।
--ক্রিমিনাল খারাপ হতে যাবে কেন ? রামায়ণ লিখেছিলেন মহারাজ বাল্মিকী, উনি কি ক্রিমিনাল ছিলেন? উনি ছিলেন মহাআপ্রাধি । তুই বড়ো হয়ে মহাআপ্রাধি হয়ে দেখা দিকিনি ।
গঙ্গার তো মতিগতির ঠিকঠিকানা নেই ; এই বর্ষায় এক দিয়ারা ডোবায় তো আরেক বর্ষায় আরেক । যে খেতি করে তার জমি ডুবলে যে নতুন জমি ভেসে উঠল সেটা তার পাওনা, কিন্তু ইংরেজরা যাবার পর উঁচু জাতের লোকেরা নতুন ভেসে-ওঠা দিয়ারা নিজেদের নামে লিখিয়ে নিত । কী আর করা যাবে, বল । তাই আমরা হাথিয়ার তুলে নিতে বাধ্য হয়েছি । বন্দুক যার, জল-জমিন তার । কৈলাশ মণ্ডল নামে একজন গংগোতা নকসল্লি কামকাজ করে চেষ্টা করেছিল সব ঘোটালা বন্ধ করতে, সেই ১৯৬৭ সালে ; কিন্তু সেও তো কোথায় গায়েব হয়ে গেল ।
--গায়েব হয়নি, আমাদের ইউনিভারসিটির একজন টিচার বলেছে যে তাকে গায়েব করে দেয়া হয়েছিল । তখন নকসল্লি ধরে-ধরে গায়েব করার সরকারি কারিয়াকরম চলছিল ।
--আরে সব বেকার । লুকিয়ে-লুকিয়ে যদি কিছু করতেই হয় তো সুভাষচন্দ্র বোসের মতন করো । আংরেজরা অব্দি পালিয়ে গেল ভয়ে । কথা কটা বলে উরুতে কুস্তিগিরের চাপড় দাদুর ।
--দাদু, আমাদের মতন ছিল না সুভাষচন্দ্র বোস । ওর জন্যে জান দেবার অনেক সঙ্গীসাথী ছিল । আমরা তো নিজেরাই লড়ে মরি ।
বাবা সুশান্ত ঘোষ মনে করেন ওনার কোনো প্রত্যক্ষ অবদান নেই অপুর চরিত্র গঠনে । পরোক্ষ অবদান আছে । অপু নিজেও তাই মনে করে । বাবা বাংলা বলতে আর ভাগলপুর শহর থেকে বই এনে বাংলা পড়তে শিখিয়েছেন, সাধারণ জ্ঞানের বই কিনে দিতেন ছোটোবেলা থেকে । বাংলা শেখানোর সময়েই চটে যেতেন বাবা, কান মুলে দিতেন, চড় মারতেন । বাংলা শেখার দরুণ আলটপকা কথা বলে বিব্রত হতে হয়েছে অনেক সময়ে । জে এন ইউয়ের বন্ধুরা তো আর জানে না যে ওর মা দিয়ারার গংগোতা বিহারিন । পদবি দেখে অনুমান করে নেয় যে এ. ঘোষ মানে শহুরে বাঙালি ।
সনাতন সরকার নামে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষকের সঙ্গে প্রায় ঝগড়া আরম্ভ হয়ে গিয়েছিল অপুর। গায়ের রং বেশ ময়লা, কোঁকড়া উস্কো-খুস্কো চুল, রোগা, সাড়ে পাঁচ ফিটের, কালো ফ্রেমের চশমা-চোখ সনাতন দিল্লিতেও ধুতি-পাঞ্জাবি পরা বজায় রেখেছে, পায়ে কোলহাপুরি, বাংলা কথায় ওড়িয়া টান । বিড়ি ফোঁকে । প্রথম পরিচয়ের পর প্রায়ই সনাতনের সঙ্গে আড্ডা মারে অপু ।
--হাই সনাতন, আপনিও কি সোকলড প্রবাসী ? প্রথমবার পরিচয় করার জন্য শুরু করেছিল অপু ।
--পশ্চিমবাংলার বর্ণহিন্দু হাফগাণ্ডুরা আমাদের অমনভাবে গালাগাল দেয়, ইসকি মাকা সালে…... ; তুইও কেন সেকথা পাড়ছিস । তুই তো ভাগলপুরি খোটুয়া বলে জানি । কথায় বিড়ির ধোঁয়া মিশিয়ে বলল সনাতন সরকার ।
--না, পুজোপাণ্ডালে, দিল্লি হাটে বা কোনো ফাংশানে দিল্লির বাঙালিদের সঙ্গে আলাপ হলে, যখন ওনারা জানতে পারেন যে আমি ভাগলপুরের তখন অমন প্রশ্ন তোলেন । আপনি তো উড়িষ্যা থেকে ?
--না, টু বি স্পেসিফিক, আমি দণ্ডকারণ্য থেকে । শুনেছিস কি দণ্ডকারণ্য ?
--বাবার কাছে গল্প শুনেছিলুম, রামায়ণ না মহাভারতের গল্প ঠিক জানি না, নর্মদা আর গোদাবরী নদীর তীরে দণ্ডক রাজার রাজ্য ছিল । কোনো ঋষির অভিশাপে জঙ্গলে পরিণত হয়েছিল ।
--আবে সালে হাফউইট, আমি সেই আদ্যিকালের গাঁজাখুরি এরিয়ান গল্পের কথা বলছি না ।
--দেন হোয়াট ?
--দণ্ডকারন্য জায়গাটা হল ভারতের কয়েকটা রাজ্যের আদিবাসী অধ্যুষিত নয়টা জেলা , মাটির তলায় প্রচুর মিনারালস আছে ; গড়চিরোলি, ভাণ্ডারা, বালাঘাট, রাজনন্দগাঁও, কাউকের, বস্তার, নারায়ণপুর, দাঁতেওয়াড়া আর মালকানগিরি । আমি মালকানগিরি প্রডাক্ট, সুভাষপল্লিতে থাকতাম, এখনও আছে সুভাষপল্লী, জঙ্গল পরিষ্কার করে আমরাই বসত গড়েছিলাম, আর এখন চুতিয়াগুলো আমাদেরই ঘরছাড়া করে দিতে চাইছে, ইসকি মাকা... । কিন্তু এখন চলে গেছি ছত্তিসগড়ের নারাণপুরে ।
--মালকানগিরি ? অমন অড, গড ফরসেকন জায়গায় ?
--দেশভাগের পর কী হয়েছিল জানিস না, চামগাদড় কঁহিকা ?
--হ্যাঁ, জানি-জানি, বাস্তুহারাদের দণ্ডকারণ্যে সেটল করানো হয়েছিল ।
--কোন ভোঁসড়িকে-জনা তোকে বুঝিয়েছে, ইসকি মাকা... ? কিছুই জানিস না তুই । আমাদের, নমঃশূদ্র বাঙালিদের, আনসেটল করা হয়েছিল, ডেসট্রয় করা হয়েছিল, ইসকি মাকা…. । বাঙালির প্রত্নতাত্ত্বিক রুইনস যদি দেখতে চাস তো ঘুরে আয় একবার, ইসকি মাকা...। স্বাধীনতার লাৎ খেয়ে আমরা সেই সব মানুষ হয়ে গড়ে উঠেছি যাদের অতীত লোপাট, বর্তমান গায়েব আর ভবিষ্যৎ নেই । আইডেনটিটিলেস । আমাদের ইতিহাস প্রতিদিন রিপিট হয়, কেননা আমরা ইতিহাসহীন, বিমূর্ত । বিমূর্ত বুঝিস ? অ্যাবসট্র্যাক্ট !
…চুপ করে যায় অপু । টের পায় যে সারেনি এমন আঘাতের রক্তপূঁজের খোসা ছাড়িয়ে ফেলেছে ।
--আমরা ১৯৪৭-এ, ১৯৬৪-৬৫-তে, ১৯৭১-এ, ১৯৭৫-এ মার খেয়েছি, যখনই ওপার বাঙালির কসাইদের প্রবৃত্তি সালভাদর দালির পেইনটিঙের মতন হয় , তখনই ওরা আমাদের পোঁদে জ্বলন্ত জিরাফ ঢোকায়। অপর জানিস তো, দি আদার, পড়ছিস বোধহয়, তোদের কোর্সে আছে তো, দি আদার, ইসকি মাকা... । সম্প্রতি নাস্তিক আর আস্তিকদের খুনিখুনি হল ঢাকায়-চট্টগ্রামে, তাতেও ঘরছাড়া করা হল আমাদের, আমাদের ইয়ানেকি নিম্নবর্ণের লোকেদের । ওদেশের রাজনীতির বনেদ হয়ে গেছে খেদাও, খেদাও, খেদাও, মেইনলি রিমেইনিং নিম্নবর্ণদের খেদাও।
...চুপ করেই থাকে অপু ।
--মরিচঝাঁপি শুনেছিস, মরিচঝাঁপি ?
--হ্যাঁ, জানি ঘটনাটা, বাবা বলেছিলেন, দণ্ডকারণ্য থেকে কয়েক হাজার পরিবার গিয়েছিল সুন্দরবনের ওই দ্বীপে বসতি গড়তে ।
--ওই দ্বীপেই, ১৯৭৯ এর ৩১ জানুয়ারি আমার বাবা-মাকে খুন করেছিল ইসকি... । মরিচঝাঁপি দ্বীপটাকে চারিদিক থেকে তিরিশটা পুলিশ-লঞ্চ ঘিরে রেখেছিল যাতে খাবার আর পানীয় জল না পোঁছোয় ; তারপর যুদ্ধক্ষেত্রের ঢঙে ব্রাশফায়ার করেছিল, ইসকি... । দণ্ডকারণ্যের অনেকের বাড়িতে ৩১ জানুয়ারির দিনটা তাদের কোনো-না-কোনো আত্মীয়ের মৃত্যু দিন হিসাবে পালিত হয় । আমাদের বাড়িতে পালিত হয় আমার বাবা-মায়ের মৃত্যুদিন হিসাবে । যারা বেঁচে ফিরতে পেরেছিল তাদের কেউ-কেউ কলকাতার বারাসাতের কাছে মরিচঝাঁপি কলোনি গড়ে থেকে গেল, কেউ-কেউ থেকে গেল ক্যানিঙের হিঙ্গলগঞ্জে কলোনি গড়ে, কেউ রেললাইনের ধারে, কেউ খালপাড়ে । আমাকে মরিচঝাঁপি থেকে দণ্ডকারণ্যে নিয়ে এসেছিলেন আমার পিসেমশায়, নিজের পিসেমশায় নন, তবু আপন । নয় বছর বয়সে ক্লাস ওয়ানে ভর্তি হয়েছিলাম, ইসকি... । তোরা হয়তো ভাবিস তোদের চেয়ে আমার বয়স এত বেশি, ইউনিয়ানবাজি করার জন্য গাণ্ডুগর্দি চালিয়ে ইউনিভার্সিটিতে টাইম পাস করছি, হয়তো মনে করিস পি এইচ ডি করতে এত বছর লাগছে কেন, ইসকি... ।
...আবার চুপ করে যায় অপু ।
--আমাকে আবার দণ্ডকারণ্যে এনে লালন-পালন বলতে যা বোঝায় তা করেছেন, স্কুল-কলেজে পড়িয়েছেন, এখনও পড়ার খরচ যোগাচ্ছেন, আমার পিসতুতো বোন যাকে ১৯৭১ সালে রেপ করেছিল পাকিস্তানি রাজাকারগুলো, ইসকি...। সেও আমার নিজের পিসতুতো বোন নয়, কিন্তু আপন । ও দণ্ডকারণ্য থেকে মরিচঝাঁপি যায়নি । ওর বর, আমার অভিভাবক জামাইবাবু গণেশচন্দ্র সরকার যেতে চাননি ; উনি তখনই বলেছিলেন ওই টেঁটিয়া গিরগিটিমার্কা বর্ণহিন্দু বাঙালিগুলোকে বিশ্বাস করা যায় না, ইসকি...। আন্দামানে যাবার জেটিতে গিয়ে ওদের ছাতুবাবুরা কালাপানি-দ্বীপান্তরের আতঙ্ক ছড়িয়ে ভাষণবাজি করে হাজার-হাজার মানুষের আন্দামানে যাওয়া ভণ্ডুল করে দিয়েছিল । নেহেরু আমাদের ঠুঁসে দিল আদিবাসীদের জংলি এলাকাগুলোয়, আর বর্ণহিন্দু বাঙালিরা পেলো চিত্তরঞ্জন পার্ক, তুই তো এসব সাপসিঁড়ির পলিটিক্স জানিস না। বাড়ি থেকে কাঁচা টাকা আনিস, আর নাইটক্লাব-ডিসকোবাজি করে বেড়াস ।
...অপু চুপ করে রইল । বুঝতে পারছিল যে সনাতন সরকার সম্ভবত মন খুলে ঝাল ঝাড়ার অবসর তৈরি করে ফেলতে পেরেছে ওর প্রশ্নগুলোর চোট খেয়ে । অপু আরও ভয়ঙ্কর হিন্দি গালাগাল জানে, ব্যবহার করে না কখনও, ছোটোবেলা থেকে বাবার চড়-খাওয়া নির্দেশ ।
--ওই নেতাগুলোর বেশ কয়েকজন বেঙ্গলের ডিভিজান করে পাকিস্তান সৃষ্টি সমর্থন করেছিল । যেই পাকিস্তান হল অমনি বর্ণহিন্দু লোকগুলো আগেভাগে পালিয়ে এলো ; এসে, এ আজাদি ঝুটা হ্যায় জিগির তুলে ট্রাম-বাস পোড়াতে ব্যস্ত হয়ে গেল। আর আমরা ? আমরা তো নমঃশূদ্র, নিম্নবর্ণ, আনটাচেবল, ইসকি...। বর্ণহিন্দু পরিবারগুলো পশ্চিমবাংলায় বাড়িঘর তৈরি করে থেকে গেল, পার্টিগুলোকে দখল করে নিল । নিম্নবর্ণের জন্যে দণ্ডকারণ্য, হিমালয়ের তরাই, আন্দামান, ইসকি...। বর্ণহিন্দু ভাড়ুয়াগুলোই আমাদের আন্দামানে যেতে দেয়নি । এখন আন্দামানে গিয়ে দ্যাখ, সাউথ ইনডিয়ান আর পাঞ্জাবিরা গুছিয়ে নিয়েছে । বাংলা তো পড়তে পারিস । তোর ডিপার্টমেন্টের লাইব্রেরিতে মনোরঞ্জন ব্যাপারির লেখা চণ্ডালের চোখে চণ্ডাল বইটা আছে, পড়িস । জঁ জেনে সম্পর্কে জাঁ পল সার্ত্রে বিস্তারিত আলোচনা করে সেইন্ট জেনে নামে একটা বই-ই লিখে ফেলেছেন । কোনো বাঙালি কি মনোরঞ্জন ব্যাপারিকে নিয়ে বই লিখেছে ? শালা বর্ণহিন্দু চুতিয়া ইনটেলেকচুয়ালদের দল, ইসকি...।
ক্যান্টিনের অন্য টেবল থেকে একজন সহপাঠির মন্তব্য শোনা গেল, আবে সানি, হিন্দি মেঁ গালি কিঁউ ? তু বংলা গালি নহিঁ জানতা হ্যায় ক্যা ? সুনা, সুনা, দো-চার, ইয়াদ করকে রখুঁ ।
সনাতন জবাব দিল, যাদের দিচ্ছি তাদের জন্য এই গালাগালগুলোই উপযুক্ত মনে হল । বাংলা গালাগাল কয়েকটা জানি, কিন্তু সেগুলোয় তেমন তেজ নেই । মালকানগিরিতে বাংলা বলার চল শেষ হয়ে গেছে, ইসকি...। উড়িষ্যা সরকার বাংলা শেখানো তুলে দিয়ে ওড়িয়া শেখাচ্ছে । মহারাষ্ট্রের চন্দ্রপুর আর গড়চিরোলি জঙ্গলের উদ্বাস্তু গ্রামে বাঙালিরা আছে, তাদের বাচ্চাদের স্কুলে মারাঠি শিখতে বাধ্য করা হয়েছে, সাতচল্লিশটা স্কুলে, বুঝলি, আমরাই এসট্যাবলিশ করেছিলাম ওগুলো। চন্দ্রপুর আর গড়চিরোলিতে বাংলা বলার মতন বাঙালি আর পাবি না, দশ-পনেরো বছর পর, ইসকি...। কোথাও কোথাও ইলেকট্রিসিট পৌঁছেচে বটে, কিন্তু চাষের জল, সেচের ব্যবস্হা নেই, সরকারি চিকিৎসাকেন্দ্র নেই । গালাগাল দেবো না তো কী দেবো, ভ্যালেন্টাইনের খামে পুরে আমাশার মিক্সড ফ্রুট জ্যাম ?
অপু বলল, আরে আপনি ওদের ছাড়ুন, শালারা সারাদিন লন্দিফন্দি করে আর চকরলস কাটে ; ছোলে-ভাটুরে খাতে, অওর লিডারকে দুম চাটতে ।
--এখন দণ্ডকারণ্যে পোলাভরম ড্যাম তৈরি হবে নয় হাজার কোটি টাকা খরচ করে, চুতিয়া শালা ইসকি...। উপজাতি আর উদ্বাস্তু অধ্যুষিত দুশো ছিয়াত্তরটা গ্রামের দু লাখ মানুষ ভেসে যাবে, উৎখাত করা হবে তাদের, দাঁতেওয়াডায় সাবরি নদীর ধারে চাষের সব জমি ভেসে যাবে, ইসকি...। কারোর দুশ্চিন্তা নেই, তার কারণ যারা ভেসে যাবে তারা হয় শিডুল্ড ট্রাইব বা বাঙালি শিডুল্ড কাস্ট । এই যে সেনসাস হল, তাতে আমরা যে শিডুলড কাস্ট তা চাপা দিয়ে দেখানো হল আমরা বাঙালি, ইসকি...। কেন ? যাতে আমরা শিডুলড কাস্টের সুবিধাগুলো না পাই । ভোঁসড়িকে, পোলাভরমের জল যাবে ভিশাখাপটনমের কারখানাগুলোয়, স্টিল প্ল্যান্টে, হাইড্রোপাওয়ারে,শহরে । ক্যান ইউ ইম্যাজিন ? লক্ষ-লক্ষ মানুষ পানীয় জল পাবে না, ইসকি...। আর কলকাতায় গিয়ে দ্যাখ ; বর্ণহিন্দু লৌণ্ডাগুলো আমরা বাঙালি আমরা বাঙালি করে ধুতি খুলে লুঙ্গি ড্যান্স নেচে চলেছে। দেশভাগের দরুণ আমরা শুধু তাদের সাংস্কৃতিক গর্বের বাল ওপড়াবার জন্য নিশ্চিহ্ণ হয়ে চলেছি, ইসকি...। দণ্ডকারণ্যের দলিতরাও তাদের দলে আমাদের নিতে চায় না । আমরা ইতিহাসের গার্বেজ ডাম্প, ইসকি...।
সনাতন সরকার নিজের রোষকে সামাল দিয়েছে আঁচ করে অপু বলল, বাংলাদেশ কিন্তু দাঙ্গাবাজদের বিরুদ্ধে অ্যাকশান নিচ্ছে, এতকাল পরে হলেও নিচ্ছে । সেখানের জনসাধারণের মধ্যে থেকেই সরকারকে নাড়া দেয়া হচ্ছে, মৌলবাদী প্রতিষ্ঠানকে আক্রমণ করা হচ্ছে ।
--কী রকম শুনি ?
--শাহবাগে এককাট্টা হয়ে মেয়েরা পর্যন্ত প্রতিবাদে অংশ নিয়েছে, বোরখা পরে নয়, ওপনলি । আমাদের এখানে চুরাশির শিখ নিধন, নেলি গণহত্যা, গোধরার পর আহমেদাবাদের দাঙ্গা, কয়েকমাস আগে মুজফফরনগরে আর শ্যামলিতে যে দাঙ্গা হল, কই এখানে তো শাহবাগের মতন রাস্তার মোড়ে নামতে দেখা গেল না ছেলে-মেয়েদের ।
--ওদের দেশে বিয়াল্লিশ বছর লেগেছে কাদের মোল্লাকে কাঠগড়ায় তুলতে, যে লোকটা শুধু মীরপুরেই সাড়ে তিনশ মানুষকে খুন করিয়েছিল । আসল শয়তান বাচ্চু রাজাকরটা আগেই পাকিস্তানে পালিয়েছিল, ইসকি...। তুই আমার তর্কটাকে অন্য দিকে নিয়ে যাচ্ছিস । আমাদের এখানে যতই দাঙ্গা হোক না কেন, আমরা কাউকে পাকিস্তানে বা বাংলাদেশে তাড়া করে নিয়ে যাই না । আমাদের কোনো রাজাকরের ইকুইভ্যালেন্ট নেই । রাজাকর কাদের বলে জানিস ?
--ধার্মিক স্বেচ্ছাসেবকদের । যতদূর জানি হায়দ্রাবাদের নিজামের টাকায় তৈরি মিলিশিয়া ।
--আবে ঘড়িয়ালকে চামড়া, তর্ক চলছে পূর্ব পাকিস্তান আর নিম্নবর্ণের বাঙালি নিয়ে , তুই তার মধ্যে নিয়ে এলি হায়দ্রাবাদ। রাজাকার হল খুনি মিলিশিয়া, যাদের অর্ডিনান্সের মাধ্যমে জন্ম দিয়েছিল টিক্কা খান, ইসকি... । পূর্ব পাকিস্তানে, আই মিন বাংলাদেশে, তুই ঘরে-ঘরে রাজাকার পাবি। পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, হিমালয়ের তরাই, আন্দামান এমনকি দণ্ডকারণ্যেও বাঙালিদের মধ্যে তুই অমন জাতকসাই পাবি না । আমাদের এখানে সরকার কোনো দিনই ধর্মান্ধ মিলিশিয়া তৈরি করবে না, আমরা দেবো না তৈরি করতে, গৃহযুদ্ধ বেধে যাবে , ব্লাডি সিভিল ওয়র । হুমায়ুন আজাদের নাম শুনেছিস ?
--হ্যাঁ, আমার বাবা হুমায়ুন আহমেদের অনেক বড়ো ফ্যান । যে গংগোতা বাংলাদেশ-ইনডিয়া সীমার ব্যবসা দেখভাল করে আর থার্মোকোল আইসবক্সে বাবার জন্যে ইলিশ আনে, শুঁটকি-মাছ আনে, সে বাবাকে বইপত্র এনে দ্যায় । ইলিশ-টিলিশ বাবা নিজেই রাঁধেন ।
সনাতন সরকার, স্তম্ভিত, অপুর মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, আবে, তেলচাট্টা ঘাসলেট, আমি একজন ভাবুকের কথা বলছি, পাল্প ফিকশান রাইটারের কথা বলছি না। হুমায়ুন আজাদকে পাক সার জমিন সাদ বাদ নামে একটা বই লেখার জন্য রাজাকাররা খচাখচ-খচাখচ ছুরি-ছোরা-চপার মারার কিছুদিন পর উনি মারা যান। যাকগে, তোর মতন অ্যায়রা-গ্যায়রা নাৎথু-খায়রাকে এসব বলে কোনো লাভ নেই ; কী জানতে চাইছিলিস যেন ?
--এমন লেকচার দিলেন যে যা বলতে চাইছিলুম, তা-ই ভুলে গেলুম । গালাগালের তোড়ে ভেসে গেলুম ।

দশ
মংরুরাম নুনেতি ( কানাগাঁও-এর প্রাক্তন সরপঞ্চ ): আরে, আরে, খাদেতে দুজন লোক পড়ে আছে । সাপের কামড়ে নাকি অন্য কোনো জন্তু জানোয়ার মেরে ফেলে রেখে গেছে, পরে এসে খাবে ?
গাসসুরাম ( গ্রামবাসী ) : গ্রামের তাতিম গোঁড় বলছিল যে এই জঙ্গলে সেদিন সন্ধ্যাবেলা গুলিগোলা চলেছিল । গুলি লেগে মরেছে বোধহয় ।
মংরুরাম : রক্ত লেগে নেই কেন তাহলে ? গুলি লাগলে রক্ত থাকত জামাকাপড়ে ।
গাসসুরাম : চলুন চলুন, শেষে আধামিলিট্রি জওয়ানরা দেখতে পেলে আমাদেই জেলে পুরবে । মাওওয়াদিরা দেখতে পেলে ধরেবেঁধে নিয়ে গিয়ে গায়ের চামড়া ছাড়িয়ে শেয়ালের মাংস ঢুকিয়ে দেবে ।
মংরুরাম : যে-ই ধরুক, নিখালিস উড়িয়ে দেবে ।
গাসসুরাম : বাপ রে । তাকাবেন না ও দিকে ।
মংরুরাম : তাড়াতাড়ি চল, তুই তো ভাঙা পা নিয়ে হাঁটতেই পারিস না ।

এগারো
দণ্ডকারণ্যে যাবো আপনার বাড়ি, যদি নিয়ে যান কখনও । আর হ্যাঁ, আমি কয়েকদিনের জন্য বাড়ি যাবো, আপনি আমার অ্যাবসেন্সটা ম্যানেজ করে দেবেন । আপনি তো পি এইচ ডি করছেন , অসুবিধা হবার কথা নয় । অপু বলল সনাতন সরকারকে ।
--চলিস আমার সঙ্গে, একা তুই রাস্তা গোলমাল করে ফেলবি । নারায়ণপুর জেলাসদর হলেও, এখনও ডেভেলাপ করেনি ।
--আমার বাবার পদবি ঘোষ হলেও, আমার মা বিহারি গংগোতা পরিবারের মেয়ে, ভাগলপুর শহরে নয়, আমাদের বাড়ি গঙ্গার চরে, দিয়ারায় । দিয়ারা শুনেছেন তো ? মলম লাগাবার মতো করে কথাগুলো বলল অপু, ক্যান্টিনে বসে মসালা দোসা খেতে-খেতে, সনাতনকে ।
--গংগোতা ? কাস্ট ? তোর পাঞ্জাবি গার্লফ্রেণ্ড সে-কথা জানে, যে মেয়েটা সব সময় তোর সঙ্গে চিপকে থাকে ?
--হ্যাঁ, বিহারের লোয়েস্ট নিম্নবর্ণ । হ্যাঃ, নিকিতা মাখিজা পাঞ্জাবি নয় , ও সিন্ধি । ওকে আমার ফ্যামিলি ব্যাকগ্রাউন্ড জানিয়েছি, বিশ্বাস করে না, ভাবে কাটিয়ে দেবার জন্য গুল মারছি । বলেছি প্রায়ভেট ডিটেকটিভ দিয়ে ইনভেসটিগেট করাতে, সে-প্রস্তাবকেও মনে করে ওকে ছেড়ে দেবার আরেক চাল । দিল্লির নাইটলাইফ এনজয় করা-মেয়ে, প্রায়ই ডিসকোয় গিয়ে টাল্লি হয়ে যায়, আর বাড়ি পৌঁছে দিতে হয় আমাকে । ওর বাবা-মা কেন যে অমন ছুট দিয়ে রেখেছেন, জানি না । ওকে আমাদের দিয়ারায় নিয়ে গেলে ওর হার্টফেল করবে।
--নিম্নবর্ণের আবার হাই-লো আছে নাকি রে, বওড়া ? এনিওয়ে, তোর বাবার প্রেম তো স্যালুট করার মতন অসমসাহসী ঘটনা রে । তোর বাপ পারলেন, তোর গার্লফ্রেণ্ডও পারবে, সিন্ধিরা বেশ সহজে অ্যাডজাস্ট করে নিতে পারে, ওরাও উদ্বাস্তু হয়ে এসেছিল, কিন্তু সরকার ওদের ধরে-ধরে আদিবাসীদের মাঝখানে পোঁতেনি, যেমন আমাদের পুঁতেছে । তবে টাকাকড়িকে ওরা মানুষের চেয়ে বেশি ভালোবাসে ; চেক করে দেখেনিস তোর কাঁচা টাকা ওড়ানো দেখে তোকে ফাঁসিয়েছে কি না । সেক্স-টেক্স করলে কনডোম পরে করিস, মনে রাখিস এটা ইনডিয়ার রাজধানি, এখানে মানুষের মুখের লালায় যত সায়েনাইড, তার চেয়ে বেশি সায়েনাইড তাদের চুতে আর লাঁড়ে।
--প্রেম নয়, আমার মায়ের বাবা আমার বাবাকে কিডন্যাপ করে আমার মায়ের সঙ্গে বিয়ে দিয়েছিলেন । মায়ের বয়স তখন চোদ্দ বছর আর বাবার একুশ । মা লেখাপড়া শেখেননি, স্কুলের কোনো বিল্ডিংও দেখেননি আজ পর্যন্ত ; বাবা কৃষিবিজ্ঞানে স্নাতক । সেই থেকে বাবা শশুরবাড়িতে আমার নানা, মানে দাদুর সঙ্গে থাকেন, দিয়ারায় চাষবাসের উন্নতির কাজ দেখেন । বাবা আমার মাকে নিজের বাবা-মার কাছে নিয়ে যাননি, একাই গিয়েছিলেন বিয়ের পরে। গিয়ে বুঝতে পেরেছিলেন যে মাকে ওই বাড়িতে অ্যাকসেপ্ট করা হবে না । তারপরে আমাকেও নিয়ে গিয়েছিলেন, আমাকেও অ্যাকসেপ্ট করা হয়নি ।
--স্ট্রেঞ্জ । আমি ভাবছিলাম আমার জীবনের ঘটনাটাই ইউনিক । তুই তো নিজেই একটা ইউনিক সোশিওলজিকাল প্রডাক্ট । তো তুই বাংলা শিখলি কী করে ?
--বাবার কাছে । আমি বলতে, পড়তে, লিখতে পারি ।
--বাবা বাঙালি হলে না শেখার কারণ নেই, যদিও আমরা মাতৃভাষার, মানে মায়ের ভাষার কথা বলি, আদপে কিন্তু বাবার ভাষাটাই শিখি সবাই । তুই তো গ্রেট ।
--আপনার জামাইবাবুর বাড়ির ঠিকানাটা দেবেন আমায় । নিকিতাকে প্রথমেই দিয়ারায় আমাদের বাড়ি নিয়ে গেলে ওর মাথা খারাপ হয়ে যাবে । আমার তো বাঙালি আত্মীয়স্বজন নেই, আপনার বাড়িতে নিয়ে যাবো ওকে । যদি আপনার ফ্যামিলিকে দেখে অ্যাডজাস্ট করতে পারে, তাহলে নিয়ে যাব দিয়ারার গংগোতা পাড়ায় ।
--লিখে নে না । আমি বরং জামাইবাবুকে একটা চিঠি লিখে তোকে দিয়ে রাখছি, যখনই তোর গার্লফ্রেণ্ডকে নিয়ে যাবি চিঠিটা সঙ্গে নিয়ে যাস । তোর নাম জানিয়ে ফোন করে দেব । আমরা মালকানগিরি থেকে চলে গেছি ছত্তিশগড়ে, আমার ভাগ্নের হিউমিলিয়েশান এড়াবার জন্য। দিদি-জামাইবাবু নারায়ণপুরে বাড়ি করেছেন, এখন তো নারায়ণপুর জেলা শহর, আগে যাতায়াতে বেশ অসুবিধা হতো । সরি ফর দ্য অ্যাবিউজেস । সামলাতে পারি না, বুঝলি । এত ছোটো ছিলাম যে মা-বাবার মুখও মনে নেই । ওনাদের মৃতদেহও পাওয়া যায়নি। পুলিশের লোকেরা লোপাট করার জন্য শব তুলে-তুলে জলে ফেলে দিয়েছিল ।
--ভাগ্নের হিউমিলিয়েশান ? অসুবিধা না থাকলে বলতে পারেন ।
--১৯৭১-এ ঢাকায় আমার দিদিকে চারজন রাজাকার রেপ করেছিল, জামাইবাবু অ্যাবর্ট করাতে দেননি। ইন ফ্যাক্ট, জামাইবাবু দিদিকে মালকানগিরিতে বিয়ে করেছিলেন, দিদি যখন প্রেগন্যান্ট, বিষ খেয়ে সুইসাইড করতে গিয়েছিলেন দিদি। তখন মালাকানগিরিতে ডাক্তার-ফাক্তার ছিল না, জঙ্গল এলাকা, নব্বুই বছরের একজন বুড়ি ওকে জড়িবুটি খাইয়ে বিষ বের করে দিলে, জামাইবাবু দিদিকে ইমোশানাল সাপোর্ট দ্যান, বাচ্চা হবার কয়েকমাস আগে বিয়ে করেন ।
--আমি তাই ভাবতুম যে আপনি দলিতদের এক্সট্রিম লেফটিস্ট ইউনিয়ানে কেন ঢুকেছেন । আপনার পারসোনাল ব্যাকগ্রাউণ্ড তো জানা ছিল না ।
--এক্সট্রিম লেফটিস্ট ? স্ট্রেঞ্জ ওয়র্ড । দিল্লির সংসদবাজ লেফটিস্টদের দেখছিস তো ? অনেকে জে এন ইউতে এসে কলকাঠি নেড়ে যাচ্ছে মাঝে-সাঝে, হোয়াট ফর ?
--দণ্ডকারণ্য তো এখন শুনি আলট্রা লেফটিস্টদের ঘাঁটি ।
--এই লেফটিস্ট ওয়র্ডটা কাইন্ডলি বারবার উচ্চারণ করিসনি । পোঁদ জ্বালা করে । আই হেট দেম ।
--অলটারনেটিভ ওয়র্ড কী ?
--প্রতিশব্দ নেই । মাওওয়াদকে প্রতিশব্দ বলা যায় না । মাওওয়াদ ইজ এ সেল্ফকনফিউজড ডগমা ।
--কেন ? আমি যদিও মাওওয়াদ সম্পর্কে বিশেষ জানি না, কাগজে পড়ি, ব্যাস ওইটুকু । সিলেবাসে্ও নেই।
--ওদের লক্ষ্য হল সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে এক জবরদস্ত গণআন্দোলন, ইংরেজি মাইটিকে বাংলায় জবরদস্ত বলা ছাড়া অন্য ওয়র্ড আছে কিনা জানি না ।
--আমার বাংলা নলেজ আপনার চেয়ে খারাপ, হাফ বেকড । ইন ফ্যাক্ট সাম্রাজ্যবাদ ব্যাপারটাই যে কী তা ঠিকমতন বুঝি না । সবকটা রাজনীতিককেই তো মনে হয় সাম্রাজ্যবাদী, যে যার নিজের এমপায়ার খাড়া করে চলেছে ।
--কী করে তুই স্নাতক হলি রে ? টুকলি ? না তোর হয়ে অন্য কেউ পরীক্ষায় বসেছিল ? মওকাপরস্ত তেঁদুয়া কহিঁকা । হিন্দুত্ববাদী ফ্যাসিস্ট ক্ষমতাকে বিধ্বস্ত করতে চায় মাওওয়াদিরা, গড়ে তুলতে চায় পাওয়ারফুল আর্বান মুভমেন্ট, বিশেষ করে শ্রমিকশ্রেণির সাহায্যে, কেননা কেতাবি মার্কসবাদ মেনে সশস্ত্র কৃষকদের সংঘর্ষ এদেশের কৃষিকাঠামোয় দিবাস্বপ্ন ছাড়া আর কিছুই নয় । ভারতীয় বহুত্বওয়াদি বাস্তবতার ক্ষেত্রে ওগুলো কোনোটাই লাগু হয় না ; তাছাড়া পৃথিবীতে কী ঘটছে সেদিকেও তো তাকাতে হবে । পৃথিবী তো রামচন্দ্রের বনবাসের দণ্ডকারণ্যে আটকে নেই, রামচন্দ্রের নির্বাসনের পথটাই নাকি রেড করিডর ।
--রিয়্যালি ? এই ফ্যাসিস্ট ক্ষমতা জিনিসটাও বুঝলুম না ।
--যা যতটা বুঝেছিস, তাই নিয়েই সন্তুষ্ট থাক । জে এন ইউতে কয়েকজন নেপালি ছাত্র আছে, ওই তুই যাদের বলছিস একস্ট্রিম বা আলট্রা লেফটিস্ট । তাদের একজন, চিনিস বোধহয়, জনক বহুছা, ওর মতে রেড করিডর হল যে পথে গৌতম বুদ্ধ নেপাল থেকে বেরিয়ে তাঁর বাণী বিলিয়েছিলেন ভারতবর্ষের গ্রাম-গঞ্জ-বনপথে।
--বলুন না, থামলেন কেন ? ইনটারেসটিং ।
--দণ্ডকারণ্যে ওরা বৌদ্ধবিহার বানায় না, যা বানায় তার নাম দলম । দলমরা বানায় জনতম সরকার। দলম, জনতম এটসেটরা শব্দ থেকে বুঝতে পারছিস যে ডিসকোর্সটা তেলুগু ডমিনেটেড । ডিসকোর্স বুঝিস তো, না তাতেও গাড্ডুস ? এর আগে মানুষের ইতিহাসে শোষকের বিরুদ্ধে শোষিতরা সন্ত্রাসের সাহায্য নেয়নি । ওদের মতে শোষিতদের বেঁচে থাকার একমাত্র উপায় এখন সন্ত্রাস ।
অপু নিজেকে নিঃশব্দে বলতে শুনল, সনাতন বোধহয় মায়াবতীর দলের ভাবুক, আর এগোনো উচিত হবে না । বলল, আপনার পিসতুতো দিদির কথা বলছিলেন, যিনি আপনার অভিভাবক, তাঁর গল্প বলুন না , আপনার ভাগ্নের হিউমিলিয়েশানের, যদি অসুবিধা না থাকে।
--বললাম বোধহয় একটু আগে, দিদি বাচ্চাটাকে অ্যাবর্ট করায়নি, জামাইবাবু করাতে দেননি । ভাগ্নেটা জানতে পেরে দু-দুবার আত্মহত্যা করতে গিয়েছিল । ভাগ্নের বয়স অবভিয়াসলি আমার চেয়ে বেশি, সেভেন্টিটুতে জন্মেছিল, আর আমি জন্মেছি ওর পাঁচ বছর পর, ভাগ্নেদা বলে ডাকি । ওকে ওর বাবার নাম জিগ্যেস করলে ও আনকনট্রোলেবলি উন্মত্ত হয়ে যায়, বলে, আমার বাবা একজন নয় চারজন, বাবাদের নাম জানি না । দিদি-জামাইবাবুর চোখাচোখি বড় একটা হতে চায় না কার্তিক, বাড়ির বাইরে সময় কাটায় । আমার ভাগ্নের নাম কার্তিক সরকার । ওকে একটা মোটরসাইকেল কিনে দেয়া হয়েছিল, নারায়ণপুর থেকে রায়পুর,