এই আমাদের কোলাকুলি, কথকতা, আন্তরিক হিঃনীঃ আর টুকরো খবর। পড়ুনঃ মোচ্ছবের মুখবন্ধ

এই সুতোর পাতাগুলি [1]     এই পাতায় আছে1--6


           বিষয় : অনেক পুরনো গল্প-কাজল
          বিভাগ : অন্যান্য
          বিষয়টি শুরু করেছেন : Angana
          IP Address : 131.95.121.132          Date:23 Dec 2007 -- 09:49 AM




Name:  angana           Mail:             Country:  

IP Address : 131.95.121.132          Date:23 Dec 2007 -- 09:51 AM

কাজল

মালা ডাকলেন,"কাজল,এই কাজল।"
কোনো জবাব নেই।
আবার ডাকলেন, এবার একটু চড়া গলায়,"কা--আ-জল,কিরে হতচ্ছাড়ী, শুনতে পাসনা? ভাত বেড়েছি,খাবি না?"

কোনো সাড়াশব্দ নেই।এবার মালা রেগে ওঠেন।"কিরে কি হলো? এতক্ষণ ধরে ডাকছি, নবাবনন্দিনীর কোনো জবাব নেই?" কিন্তু এবারেও কোনো আওয়াজ আসে না কাজলের দিক থেকে।

মালা রেগে এবারে একেবারে তেতে ওঠেন,দুম দুম পা ফেলে কাজলের ঘরে ঢোকেন।চুলের মুঠি ধরে টেনে আনবেন ওকে। কিন্তু এসে মেয়ের গায়ে হাত রেখে চমকে উঠলেন। জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে। এতদিন পরে মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে দেখলেন তিনি। করুণ একটা মুখ, এলোমেলো চুল-রোগা হাড়পাঁজরা বার করা চেহারা! গায়ের জামাটা প্রায় ছেঁড়া পুরানো-চোখ বুজে এমন করে শুয়ে আছে মেয়ে যেন আর কোনোদিন চোখ মেলবে না।
মালার বুকটা আবার ছ্যাঁত করে উঠলো সেই বহুদিন আগের মতো।সেই সেবার যখন খুব শ্বাসকষ্ট হয়ে মেয়ে মর মর হয়ে গেছিল।





Name:  Angana           Mail:             Country:  

IP Address : 131.95.121.132          Date:23 Dec 2007 -- 09:59 AM

কেন জানি মালার চোখে জল এলো।তিনি এতদিন দেখতে পাননি কেন?কেন মেয়েটাকে দেখতে পারেন না তিনি? পড়াশোনায় আগে ভালো ছিল, এখন বছর কয়েক ধরে সেখানেও ভালো করছে না। কেন? তাঁরই অবহেলায়?
বহুদিন আগের কথা মনে পড়লো-তখন কাজল খুব ছোটো, ইস্কুলেও ভর্তি হয় নি। তখনই যা একবার দেখিয়ে দিতেন তাই মনে থাকতো ওর। ওর মধ্যে বুদ্ধির ঝকঝকে ঝিলিক দেখে মাঝে মাঝে তিনি বিহ্বল হয়ে যেতেন।সেই মেয়ে হারিয়ে গেল তাঁরই অবহেলায়? হে ঈশ্বর!
তিনি আলতো করে ওর গায়ে হাত রেখে ডাকলেন,"মামণি,কাজল!"
কাজল জ্বরে রাঙা চোখ মেলে মাকে দেখে ধড়মড় করে উঠতে গেল। কোনোরকমে বললো,"আমি তো কাজগুলো করেছি।হয়নি ভালো মতো?"
মালা কেমন কান্নাজড়ানো গলায় বললেন,"জ্বর হয়েছে, বললি না কেন?এই এত জ্বর নিয়ে কাজ করলি? একবার বলতি যদি! তাহলে---"শেষ করতে পারেন না কথা,কেন জানি খুব কান্না এসে যায়।
কাজল হাসে, জামার হাতা তুলে দেখায় কালচে একটা দাগ,ওর মা রেগে গিয়ে খুন্তি গরম করে ছ্যাঁকা দিয়েছিলেন একদিন।বলে,"ভয়ে বলি নি।যদি আবার খুন্তি গরম করে চেপে দাও এখানে?"
ওর মা ওর মুখের দিকে চেয়ে থাকেন, কিছুই বলতে পারেন না। চারিদিক হঠাৎ যেন নিস্তব্ধ হয়ে গেছে। পাশের ঘরে কাজলের ভাই আর বাবা কথা বলছে,টিভিতে খবর পড়ছে একটা পরিচিত গলা, পাশের বাড়ীর রান্নাঘর থেকে রান্নার শব্দ আসছে, প্রেশার কুকারের হুইসিল - সব যেন হঠাৎ করে মুছে যায় মালার কাছে।
মনে পড়ে সেইদিনটা,কাজলকে জোরে চেপে ধরে গরম খুন্তি চেপে ধরেছিলেন ওর বাহুতে।মেয়েটা ওর ভয়ার্ত চোখ দুটো মেলে তাকিয়েছিল মালার দিকে। কিচ্ছু বলে নি মুখে,শুধু চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়েছিল। কাউকে বলে নি। পরে মালাই বার্নল লাগিয়ে দিয়েছিলেন,তখনো ভয়ে সিঁটিয়ে ছিল। এতদিন পরে কেন ঐ কথা বলছে?
কাজলের হাসিটা কেমন অভিমানে ভিজে যায়।আস্তে আস্তে বলে,"আমার কেউ নেই। কে আর আমায় বাঁচাবে?"
মালা বললেন,"মাথায় জলপটি দিয়ে দিই, চুপ করে শো দেখি।"




Name:  Angana           Mail:             Country:  

IP Address : 131.95.121.132          Date:23 Dec 2007 -- 10:05 AM

কাজল আবার বিছানায় লুটিয়ে পড়ে যায়। পাশে রাখা চাদরটা টেনে নেয় গায়ের উপর। খুব শীত করছে ওর।
মালা পাশের বাড়ী থেকে কয়েক টুকরো বরফ চেয়ে আনেন। কাজলের কপালে বরফ ঘষার সময় ও উঁ উঁ করে। মালা বলেন,""কি রে লাগছে?"" কাজল ওর মায়ের হাত সরিয়ে দেয় কপাল থেকে।বলে,""খুব কষ্ট হচ্ছে মা।বরফ দিয়ো না।তোমার ঠান্ডা হাতটা বরং রাখো।""
একটু পরে,যখন একটু ভালো লাগছে ওর,তখন মালা গেলেন ছেলেকে আর স্বামীকে খেতে দিতে। ওরা যখন খাচ্ছে, তখন একটু দুধ গরম করে এনে দিলেন কাজলকে,সঙ্গে সেঁকা পাঁউরুটি।কাজল খেতে চাইছিল না,মালা একটু জোর করলেন।কাজল বললো,"না খেলে আবার গরম খুন্তি লাগিয়ে দেবে?" মালা এমনিই বললেন,"হ্যাঁ।"
কাজল ওর মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বিছানায় পড়ে গেল অচেতন হয়ে।

ঐ রাতেই তাড়াতাড়ি ডাক্তার ডেকে আনলেন কাজলের বাবা,তিনি যখন এলেন তখন কাজলের জ্ঞান ফিরেছে। ডাক্তার ভালো করে পরীক্ষা করে দেখলেন, বললেন,"খুব দুর্বলতা, অপুষ্টি। রক্তচাপও খুব কম।সাবধানে রাখবেন মেয়েকে। যত্ন করবেন। আমি কিছু ওষুধ লিখে দিচ্ছি আর একটা ভালো ভালো খাবারের তালিকা করে দিচ্ছি। ওগুলো খাওয়াবেন। এই বেড়ে ওঠার বয়সে এত অপুষ্টি,এ তো ভালো কথা নয়।"
ডাক্তার ওষুধ লিখে আর ডায়েট চার্ট তৈরী করে দিয়ে চলে গেলেন।

সারারাত কাজলের খুব জ্বর, ভুল বকছিল জ্বরের ঘোরে। মালা বিছানার পাশে বসেছিলেন, ওর কপালে হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলেন। একবার ওর হাতের পোড়া দাগটার উপরে হাত বোলাতে বোলাতে চোখের জল ফেললেন। কি মনে করে একবার ওর মুখে চুমো খেলেন। তাকিয়ে তাকিয়ে দেখলেন। নিজের কৈশোর পেরোনোর দিনগুলোকে মনে পড়লো।





Name:  Angana           Mail:             Country:  

IP Address : 131.95.121.132          Date:23 Dec 2007 -- 10:08 AM

বেশ কয়েকদিন জ্বরে ভুগে সেরে উঠলো কাজল। এই সময়ে মালা দিনরাত সেবা করেছেন।কিন্তু কাজল কুঁকড়ে থাকে। মা ওর জন্য এত করতে পারেন,ওর যেন বিশ্বাস হয় না।

সেরে ওঠার পর আবার মালা কঠোর ব্যবহার করতে শুরু করেন। কাজলকে মারেন,বকেন,গালাগালি দেন। ওকে দিয়ে অনেক কাজ করান।
পুজোর জামা কিনতে গিয়ে সবার সামনেই বলেন,""এই কেলেকুষ্ঠি মেয়েকে নিয়ে হয়েছে জ্বালা, কোনো রঙই মানায় না।""
কাজল চোখের জল লুকিয়ে চলে আসে।

পরে এসে মায়ের শাড়ীর কুঁচি ঠিক করে দেয়।মা এমন দেবীর মতো সুন্দরী,সে কেন এমন কালো দেখতে? কার ওপর অভিমানে কাজলের গলা বুঁজে আসে।

মালার পায়ে ব্যথা হলে পা টিপে দেয় কাজল,পা জড়িয়ে জড়িয়ে পা টিপে দেয়। তবু কিছুতেই মালার মনের মতো হয় না ও।

পড়াশোনায় ভালই করছিল,তাই সেখানে মালা কিছু বলতে পারেন না। কিন্তু অন্য কোনো ব্যপারে একটু ভুল করলেই বড্ডো কড়া সাজা।




Name:  Angana           Mail:             Country:  

IP Address : 131.95.121.132          Date:23 Dec 2007 -- 10:10 AM

কাজল যখন ভিন রাজ্যের কলেজে পড়তে চলে গেল,তখন ট্রেনে তুলে দেবার সময় খুব কাঁদছিলেন মালা।

বহু বছর পরে,প্রবাসিনী কাজল বাড়ী ফিরছে।উ:।কত বছর বাইরে ছিল সে! কতদিন মাকে দেখেনি।ভাইকে দেখেনি।বাবাকে দেখে নি।

স্টেশনে ওকে নিতে এসেছিল সবাই। প্রাথমিক উচ্ছ্বাসটুকু কেটে যাবার পর এখন সবাই বেশ শান্ত। ট্যাক্সিতে জিনিসপত্র তুলে গুছিয়ে বসেছে সব।

সারাটা দুপুর আর বিকেল খুব হৈ চৈ চললো। তারপরে রাতের খাওয়া তাড়াতাড়ি খাইয়ে দিয়ে সবাইকে শুতে পাঠালেন মা। সারাদিন যা হৈ হুল্লোড় গেছে!





Name:  Angana           Mail:             Country:  

IP Address : 131.95.121.132          Date:23 Dec 2007 -- 10:14 AM

ঘরে নীল ঘুম বাতি জ্বলছে। সারাদিনের ক্লান্তির পরে নি:সাড়ে ঘুমিয়ে গেছে কাজল। মালা এসে চুপ করে ওর বিছানার পাশে বসলেন।
মেয়ের মুখের দিকে চেয়ে রইলেন বহুক্ষণ। কত বছর ধরে তাঁর অদেখায় কত সুন্দরী হয়ে উঠেছে কাজল! এমন রেশমের মতো চুল হয়েছে ওর? ভাবতে ভাবতে বিছানা জুড়ে ছড়িয়ে পড়া ওর রেশমকোমল কেশগুচ্ছ হাতে নিয়ে নাড়েন চাড়েন।""আহা বেঁধে দিতে হবে কাল!""ভাবেন মালা।
ঘুমের ঘোরে পাশ ফেরে কাজল। মালা ওর হাতের পোড়া জায়গাটায় হাত রাখলেন।নি:শব্দে কাঁদছিলেন তিনি। মুখ নামিয়ে সেখানে চুমো খেতেই জেগে গেল কাজল।প্রথমে অনেককাল আগের মতো লজ্জায় কুঁচকে গেল। তারপরে মাকে নিবিড় করে জড়িয়ে ধরে মায়ের বুকের মধ্যে মুখ রাখলো।
বহুকাল পরে দুটি তপ্ত প্রাণ একসঙ্গে জুড়োচ্ছে আজ।
বাইরে অঝোরধারে বৃষ্টি নামলো।

********************




এই সুতোর পাতাগুলি [1]     এই পাতায় আছে1--6