পুজোর হুজুগ -- পুজোর থিম, থিমপুজো


সৈকত বন্দ্যোপাধ্যায়


আপনার মতামত         


পুজোর হুজুগ -- পুজোর থিম, থিমপুজো
সৈকত বন্দ্যোপাধ্যায়



এবার পুজোর লেটেস্ট থিম কী? কোন থিম হিট, কোন থিম আভাঁগার্দ?


পরিবর্তন

পুজোর জগতেও এবার এসে গেল পরিবর্তন। ষষ্ঠীর দিন এক বাংলা চ্যানেল জানালেন, এবার ফোকাসে পরিবর্তন। আর কলকাতা-কলকাতা নয়। এবার পুজো গোটা বাংলার। এবার পুজো বৃহৎ চেতনার। বঙ্গ চেতনা ও মানবচেতনার। ছোটোখাটো ইস্যুতে থিমকে আর বেঁধে রাখা যাচ্ছেনা যাবেনা। হাওড়ার পুজো কমিটির প্রধান জানালেন, তাঁদের এবারের পুজোর থিম জঙ্গলমহল, সাঁওতাল সমাজ ও নাগাল্যান্ড। জঙ্গলমহল আর ভূমিপুত্র না হয় বোঝা গেল, কিন্তু নাগাল্যান্ড কেন? না, নাগাল্যান্ড সরকার তাদের ভূমিপুত্রদের নিয়ে যে ধরনের উন্নয়ন ঘটিয়েছে, বাংলার সরকার দশকের পর দশক ধরে তার কানাকড়িও করতে পারেননি। এই জ্বলন্ত ইস্যুকেই তাঁরা তুলে ধরছেন তাঁদের থিমে। অন্যদিকে সল্টলেকের পুজো কমিটির প্রধান জানালেন, তাঁদের এবারে থিম নারীশক্তি। যিনিই ত্রাতা, তিনিই মাতা। ভাবছেন সে আর নতুন আর কি হল? দেবী দুগ্গা তো এমনিতেই নারী শক্তি। কিন্তু শুনতে সোজা হলেও আসলে ব্যাপার ততটা নয়, এসব বুঝতে হবে পরিবর্তিত পরিস্থিতি ও বৃহৎ পরিপ্রেক্ষেতির প্রেক্ষাপটে। এ নারী তো সে নারী নয়। এ যে পরিবর্তিত নারী।

তবে এ সবই ছোটোখাটো। এবার পুজোয় সবচেয়ে ব্যাপক পরিবর্তনটি ঘটিয়ে ফেললেন সুবিখ্যাত এক ভারতীয় কোম্পানি। পুজোর আগে তাঁদের বিজ্ঞাপন: "এবার পুজোয় জ্যামে সামনের গাড়িটা স্টার্ট না নিলে, না চেঁচিয়ে বরং ঠেলে হেল্প করব। লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে প্যান্ডেলের গা থেকে শোলার কাজ খুলে নেবনা। গাড়ির ভিড়ে বাচ্চা মেয়ে কানের কাছে ভেঁপু বাজালে চোখ রাঙাব না। অঞ্জলির ফুল হাতে না পেলে ঠেলাঠেলি না করে, অপেক্ষা করব। ছোটো ভাইকে বলব ভাসান দেখতে যেতে, আমি বাড়ি পাহারা দেব।

এবার খুশি ভাগ করে নেবার পালা।'


কোম্পানির নাম টাটা স্টিল। এত মামলা-মোকদ্দমা-হার-জিতের পরে শেষ লাইনের আত্মোপলব্ধি দেখে পিলে চমকে যাচ্ছে? হুঁহুঁ বাওয়া এরেই কয় থিমের নাম পরিবর্তন।


পরিবেশ

এবার পুজোয় মহিষাসুর কে? কলকাতা পুরসভা জানিয়েছেন প্লাস্টিক ছাড়া আবার কে? প্লাস্টিক গিলে খাচ্ছে নর্দমার মুখ, ফি বর্ষায় ভাসিয়ে দিচ্ছে কলকাতাকে। তাই প্লাস্টিকাসুর বর্জন করুন। ব্যস। সেই থেকেই ধুম লেগেছে হৎকমলে। ফাঁকতালে রিলায়েন্স কোম্পানি তাঁদের দোকানের প্লাস্টিকের প্যাকেটের দাম করে দিয়েছেন দু টাকা। পরিবেশ বান্ধবও হওয়া গেল, আবার পাঁচ পয়সার প্লস্টিকে উনচল্লিশগুণ লাভও করা গেল।

শুধু প্লাস্টিকেই শেষ নেই। সঙ্গে আছে পরিবেশ বান্ধব পুজো। এবার পুজোয় গ্রিন পুজোর স্পেশাল প্রাইজ ঘোষণা করা হয়েছে। রমরমিয়ে চলছে তার অ্যাড। এবার লাইটিং হচ্ছে এলইডির। প্যান্ডেল হচ্ছে কুটুম-কাটুম ( মানে রিসাইক্লড জিনিসের তৈরি আর কি)। মন্ডপের পাশে টেম্পোরারি বৃক্ষরোপন হচ্ছে। প্রতিমার হাতে থাকবে কাগজের অস্ত্র (সরবরাহে অমুক সংবাদপত্র)। ম্যারাপের গায়ে ঝুলিয়ে দেওয়া হচ্ছে নানা জ্ঞানের কথা। সেসব যত আরবিট তত ভালো। যেমন: ইনজেকশন দিয়ে সিরিঞ্জ যত্রতত্র ফেলবেন না । বা, গলায় পরুন হীরে, মাইক চালান ধীরে।

স্পনসরশিপে আপত্তি নেই, তবে সেগুলিও যেন পরিবেশ বান্ধব হয়। ভ্যাকুয়াম ক্লিনারের অ্যাড দিলে ভালো হয় (আপনার পরিবেশকে রাখে ক্লিন ক্লিন সুপারক্লিন)। কাপড় কাচা সাবানের অ্যাডও চলবে (শুধু কাপড় নয়, পরিবেশকেও ঝকঝকে রাখুন)। গাড়ি-টাড়ি একদম নো-নো। চললেও যেন ইউরো-৪ হয়। মনে রাখবেন, সব দিক খতিয়ে দেখে টেখে তবেই বিচারকরা শ্রেষ্ঠ পরিবেশ-বান্ধব পুজোকে প্রাইজ দেবেন।

কি বলছেন? মাইকে গান চলবে কিনা? অবশ্যই চলবে। সে জন্য এবারের পুজোতেই কলকাতা পুরসভা এনেছেন স্পেশাল পরিবেশ বান্ধব গান। পুজোর আগে এফএমএ এফএমএ যা সুপার-ডুপার হিট। "রয়ে রক্ত, ময়ে মশা, জয়ে জমা জল'। মন্ডপে মন্ডপে এই গান তেড়ে চালান। একই সঙ্গে বহু পাখি মরবে। বাচ্চাদের অক্ষর পরিচয় হবে। জমা জলের বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালানো যাবে। আর মুফতে প্রাইজও চলে আসতে পারে আপনার পকেটে। তবে হ্যাঁ, মাইক কিন্তু শব্দসীমার নিচে চালাবেন।


মহাগুরু

কিন্তু এসবই আসলে উপর উপর। পরিবর্তনই বলুন বা পরিবেশ, সবই বাঙালির চামড়ার উপর দিয়ে চলে যায়। এবার পুজোয় বাঙালির অন্তরতম থিম কোনটি? চামড়ার বহু গভীরে বসবাস করে যে হৃদয়, তা কোন ছন্দে লাবডুবাচ্ছে? কোন সুরের মূর্চ্ছনায় বেজে বেজে উঠছে অন্তরের বীণা? কোন সে মহাথিম? কে সেই মহাগুরু?

এক-আধজন বলবেন তিনি বিগ এম মানে মিঠুন। বেশিরভাগই বলবেন ব্যাড এম মানে মমতা। ক্রীড়াপ্রেমীরা সৌরভ বলতে পারেন, ইউটিউব ভক্তরা পাওলি দাম। কিন্তু যে যাই বলুন ডাহা ফেল। বাঙালি ফ্যাশন বদলায়, মুড বদলায়, পোশাক বদলায় এমনকি গার্লফ্রেন্ডও বদলায়। কিন্তু অন্তরের অন্ত:স্থলের হৃদয়নাথকে বদলায়না। সবাইকে চিরকালের মতো হারিয়ে বাঙালির ব্যক্তিত্ব আসলে একজনই। পুজো হোক বা না হোক, তিনি নব নব রূপে আসেন মাত্র।

এবার পুজোয় তাঁর ট্রাফিক অবতার। উপস্থিতি ম্যাজিকাল। এবার যদি পুজোয় আপনি কলকাতা শহরে সড়কপথে ভ্রমন করেন, দেখবেন বিপ্লব এসে গেছে দুনিয়ায়। গরমে ভ্যাপসা হোন কি ঝলসানো, বাসে চালভাজা হোন কি মুড়িঘন্ট, জ্যামে দেড়ঘন্টা দাঁড়াতে হোক কি তামাম রাত, দেখবেন, গোটা রাস্তায় কেউ মেজাজ হারাচ্ছেন না, কারণ আপনি ট্রাফিক লাইটের সামনে এলেই, সিকিমে ভূমিকম্পের চেয়েও আচম্বিতে, জাপানের সুনামির চেয়েও মাখন মসৃণতায়, শানিত আততায়ীর ছুরির মতো সহজে, চকিতে আপনার হ্‌দয় বিদ্ধ করে যাচ্ছেন, কে আবার, আপনার প্রাণের পরে লুকিয়ে আছেন যিনি, সেই রবীন্দ্রনাথ। আপনি দরদরিয়ে ঘমছেন আর ট্রাফিক আলোকের ঝর্নাধারায় আপনাকে ধুইয়ে দিয়ে যাচ্ছে রবীন্দ্রগান। তিনিই আপনার প্রাণের আরাম আত্মার শান্তি। আপনি কাঁদছেন, আপনি হাসছেন, আপনি ভেসে যাচ্ছেন। আর আপনাকে রেড লাইটে রাঙিয়ে রেখে আরও একবার পুজোর সেরা থিমের পুরষ্কার জিতে নিচ্ছেন, সেই এক ও অদ্বিতীয় যুগলসেতু নিবাসী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।


ছবি: সায়ন করভৌমিক