একটি নারীর মৃত্যু


মিঠুন ভৌমিক


আপনার মতামত         


একটি নারীর মৃত্যু
মিঠুন ভৌমিক




""একজন সামান্য মানুষকে দেখা যেত রোজ
ছিপ হাতে চেয়ে আছে; ভোরের পুকুরে
চাপেলী পায়রাচাঁদা মৌরলা আছে;
উজ্জ্বল মাছের চেয়ে খানিকটা দূরে""


প্রতিদিন খুব ভোরে, কাক ডাকারও আগে নীলিমার ঘুম ভাঙে। দিনের এই সময়টা আকাশ ঘন অন্ধকারে ঢাকা থাকে, ঘড়ি দেখে বুঝতে হয় ভোর হয়েছে। শীত আসছে, এখন রাত শেষ হতে দেরি হয় খুব। আজকাল ঘুম থেকে উঠে একটা হালকা চাদর গায়ে না দিয়ে বেরোনো যায়না, মফস্বলের এই দোতলা বাড়িটা, তার বাসিন্দাদের মতই সর্বাঙ্গে কুয়াশার চাদর জড়িয়ে ঘুমিয়ে থাকে।

অন্যদিনের মতই নীলিমা বাইরে এলেন। বাগানের একটা অংশ আবছা দেখা যাচ্ছে, একটা বৃত্তাকার অংশ, যেন মঞ্চ প্রস্তুত করা হয়েছে। সেখানে গুটিকয় ফুলগাছ- শিউলি, জবা,কাঠগোলাপ। শিউলি গাছটায় ভালো ফুল হয়। এখন যেমন ডালে, পাতায়, গাছের গোড়ায়, সর্বত্র ফুল জমে আছে। একটু পরেই নীলিমা ঐ ফুল তোলার বন্দোবস্ত করবেন। সেই কাজে তাঁর সহকারী হবে সোহম। সোহমের বয়স চার। নীলিমার কনিষ্ঠপুত্র সিদ্ধার্থর একমাত্র সন্তান সোহম। জ্যেষ্ঠপুত্র সাত্যকিরও একটি ছেলে আছে, অর্ণব।

কিন্তু ফুল তোলার ঢের দেরি। পেটা ঘড়িটা একটু আগেই জানিয়েছে সবে পাঁচটা বেজেছে। ঘুমে অচেতন বাড়িটায় এতটুকু স্পন্দন না তুলে, অতি সন্তর্পণে উঠোনে একটা চেয়ার টেনে বসলেন নীলিমা। সকালের এই সময়টাই শুধু ওঁর একান্ত নিজের। দিন ও রাত্রির অবশিষ্ট, ছিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ গত আটচল্লিশ বছর ধরেই অন্যদের অধিকারে। তাই, এই প্রায়ান্ধকার সময়টা নীলিমা নিজের পাশে এসে বসেন। এই যেমন এখন আছেন। এখন তাঁর বাগানের ঐ আলোকিত বৃত্তের দিকে চেয়ে থাকতে ইচ্ছে করছে। বয়সটা কম হলে ওখানেই, মাটিতে একটু বসতেন। বয়স ঝুরো বালির মত, ঝরতে ঝরতে একদিন হিসেব গুলিয়ে ফেলে হা-পিত্যেস করে বসে থাকে। তখন শুধুই ফুরোবার প্রতীক্ষা।




""কেমন আশার মত মনে হয় রোদের পৃথিবী,--
যতদূর মানুষের ছায়া গিয়ে পড়ে""


অর্ণবের আজকাল কিছুই ভালো লাগেনা। এক অর্থহীন নিয়মানুবর্তিতায় সে রোজ ঘুম থেকে ওঠে, বই খুলে বসে, টিউশনে যায়, এবং বন্ধুদের কথা শোনে। স্কুলে পড়া শোনার ভান করে একদৃষ্টে চেয়ে থাকে বোর্ডের দিকে, ইন্টিগ্রেশনের বাঁক খাওয়া চিহ্ন ভেদ করে কোথায় যেন তার মন পড়ে থাকে। স্যারের মুখের দিকে তাকালে স্নায়ুচাপে ভোগে সে এখন। মনে হয় যেন ওঁরা চোখের দিকে তাকিয়েই বুঝে ফেলছেন সব।

অর্ণবের বয়স এখন সতেরো। বয়সের তুলনায় সে একটু বেশিই চাপা। পড়াশোনায় সে মন্দ নয়, আবার দুর্দান্তও নয়। বাবার ক্যারিশমার ধারেকাছেও সে যেতে পারেনি এখনও পর্যন্ত। সাত্যকি নিজের সমস্ত পরীক্ষায় প্রথম দুজনের মধ্যে থেকেছেন। সেখানে অর্ণবের সেরা সাফল্য টেনথ হওয়া, তাও ক্লাস ফাইভে। হীনমন্যতা মানুষকে স্থবির করে দেয়। অর্ণব মানসিকভাবে স্থবির। দুনিয়ার কোন উচ্ছ্বাসই তার মধ্যে সাড়া জাগায় না।

আজ ঘুম থেকে উঠে অর্ণব দেখলো বেলা বেশ অনেকটাই গড়িয়ে গেছে। রোদ ঝলমল দিন। সাহিত্যে সূর্য্যকে প্রাণের প্রতীক হিসেবে দেখানো হয়। কবিতায় রোদ ঝলমল দিন মানে ভালো সময়। অথচ অর্ণব জানে এমন দিনেও মন খারাপ হয়। একলা লাগে। সূর্য্যস্নাত সকাল বরং ওকে আরো বেশি করে মনে করিয়ে দেয়, চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, মনে কত শত বছরের অন্ধকার বার্ধক্য বাসা বেঁধেছে। এর উৎস কি অর্ণব বোঝেনা। আর্থিক অনটন, না বাবা মায়ের টালমাটাল সম্পর্ক, না ওর হীনমন্যতা--- কোনটাকে সে নিজের মানসিক অসুখের জন্য দায়ী করবে বুঝে উঠতে পারেনা সে। তাই সেখানেও সময় বইতে থাকে চোরাস্রোতের মত। সতেরো বছর বয়সের জীবন, যত একঘেয়ে, মনকেমনকরা বা উদ্দেশ্যহীনই হোকনা কেন, বড়ো দ্রুতগামী।




সে-সব রূপোলি মাছ জ্ব'লে ওঠে রোদে,
ঘাসের ঘ্রাণের মত স্নিগ্ধ সব জল;
অনেক বছর ধ'রে মাছের ভিতরে হেসে খেলে
তবু সে তাদের চেয়ে এক তিল অধিক সরল;


খাওয়া সেরে নীলিমা যখন নিজের ঘরে এলেন তখন দুপুর গড়িয়ে গেছে। রোদে বাইরে বসলেই ভালো হতো এখন, অসময়ের বিশ্রামে শরীর খারাপ হতে পারে। কিন্তু আজ এমনিতেই শরীরটা জুতের না । পা দুটো ভারি লাগছে, শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে সকাল থেকেই। নিজের অসুখবিসুখের খবর জানাতে আজকাল সংকোচ হয় ওঁর। দত্তদের বাড়ির গিন্নি সেদিন বলছিলো, বয়স হলে নাকি সবাই অবুঝ হয়ে যায়। তখন বানিয়ে বানিয়ে অসুখের কথা বলে। আসলে বুড়োরা একা হয়ে যায় তো, তাই এসব করে নজর কাড়তে চায়। কথাটা শুনে থেকে খুবই গুটিয়ে আছেন নীলিমা। কে বলতে পারে, অজান্তেই তিনি ওরকম হয়ে যান নি?

নীলিমার ঘরটা বেশ ছায়াছায়া। যাকে সঙ্গী করে জীবনের অনেকটা পথ চলেছিলেন, সেই মানুষটি ছায়া ভালোবাসতেন। বাড়ি ও বাগানময় ছায়ার বন্দোবস্ত করে দিয়ে নি:শব্দে সরে পড়েছেন। এখন এই শান্ত, ঠান্ডা ঘরে বসে নিস্তরঙ্গ দুপুর ও বিকেল কাটে নীলিমার। খোলা জানলার ফ্রেমে ধরা থাকে এক এক টুকরো ছবি। নির্বাক ছবি সব। শব্দ নেই তাই সময় থেমে থাকে। তারপর দুপুর, বিকেল, সন্ধ্যা পেরিয়ে রাতের দিকে হঠাৎ করে সম্বিৎ ফিরে পান, নিতান্তই জৈব তাগিদে। কখনও বা সন্ধ্যায় সোহম আসে। সে এসে ফিরিয়ে নিয়ে যায় । সেইসব সন্ধ্যায় সোহমের দিকে পরম কৃতজ্ঞতায় তাকিয়ে থাকেন নীলিমা।

কিন্তু আজ বেশিক্ষণ বসে থাকা গেলনা জানলার পাশে। শরীরটা বেশ খারাপই লাগছে। বার্ধক্যের খামখেয়ালীপনা নয় বোধহয়। তবু আরেকটু দেখা যাক, এই ভেবে নীলিমা শুয়ে পড়লেন। চোখ বন্ধ করলেও অনেক কিছুই দেখা যায়।





""ক্রমে শীত, স্বাভাবিক ধারণার মত এই নিচের নগরী
আরো কাছে প্রতিভাত হয়ে আসে চোখে""


ক্লাসে এসে অর্ণবের মনে পড়লো আজ পরীক্ষা হওয়ার কথা ছিলো। বার্ষিক পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য মাঝেমধ্যে এইভাবে ছাত্রছাত্রীদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়, যাতে তারা লক্ষ্যে অবিচল থাকে সারাবছর। অর্ণবের মত সবাই কিছু লক্ষ্যহারা নয়, তাদের জীবনের উদ্দেশ্য ও অর্থ আছে। অন্তত অর্ণবের তাই মনে হয়। তার চারপাশে যারা ঘুরেফিরে বেড়াচ্ছে, সেই মানুষগুলো কত নিশ্চিৎ! কী পরম নিশ্চয়তায় তারা পেরিয়ে যাচ্ছে একের পর এক বছর, মানিয়ে নিচ্ছে শরীর ও মনের মধ্যে ঘটতে থাকা যাবতীয় বদল! অবাক লাগে অর্ণবের। এই সপ্রতিভ প্রজন্মকে দেখে বিব্রত বোধ করে সে। নিজেকে বেমানান লাগে তার। অন্যদের থেকে নিজেকে আলাদা ভাবে সে। আপশোষ, অভিমান, অপরাধবোধ - এইসব চেনা শব্দকে দুহাতে জাপটে বেঁচে আছে সে।

পরীক্ষার খাতায় খুব হেলাফেলা করেই কিছু উত্তর লিখলো সে। নম্বর তো খারাপ হবেই, কিন্তু খুব বেশি খারাপ যাতে না হয় তাই সে বারকয়েক চোখ বুলিয়ে নিলো উত্তরগুলোয়। পাশমার্কের ওপরে পেলেই আলাদা করে আর কেউ খেয়াল করবেনা ওকে। নাহলেই গার্জেন কল, বাবার রাগত চেহারা আর বাড়িশুদ্ধু লোকের সামনে ক্রমশ গুটিয়ে নিজের ছায়ায় মিশে যাওয়া। একেবারেই কোন আলোকিত বৃত্তের মধ্যে আসতে চায়না সে। কেউ ওর দিকে আলাদা করে তাকাক, ওকে খেয়াল করুক- এসবেতেই ওর বড়ো ভয়। সবার অলক্ষ্যে দিনগুলো কেটে যাক, তাহলেই স্বস্তি।

আজ দিনটা ভালো না খারাপ? ভাবতে ভাবতে ফিরছিলো অর্ণব। আলাদা করে ভালো বা খারাপ কোন দিন সে মনে করতে পারলো না। বরং অস্বস্তিকর দিন কিছু মনে পড়লো। অঙ্ক পরীক্ষায় ফেল করার দিন মনে আছে। তারপর সেই যেদিন টিউশনে রিয়ার পাশে বসেছিলো সেদিনটাও। সেদিনই প্রথম নিজেকে ঘেন্না করতে শুরু করে তার। রিয়াকেও প্রচন্ড অচেনা লেগেছিলো। সেই থেকে একে একে সবাই অচেনা হয়ে গেছে তার কাছে।

নিজের চিন্তায় মগ্ন থেকেও অর্ণব খেয়াল না করে পারল না, আজ বাড়িটা আশ্চর্য রকমের শান্ত। এখন সন্ধ্যে প্রায়। আজকাল বিকেল পাঁচটাতেই অন্ধকার হয়। আর এইসময় সাধারণত: একতলাটা গমগম করে। সোহমকে মুখে মুখে পড়ানো হয় এইসময় কোন কোন দিন। অন্তত একটা টিভিতে খবর চলে। আজ সেসব কিছুই নেই। দোতলা অবশ্য একইরকম আছে আজও। রোজকার মতই সেখানে বিরাজ করছে অখন্ড নীরবতা।





""ভাদ্রের জ্বলন্ত রৌদ্রে তবু আমি দূরতর সমুদ্রের জলে
পেয়েছি ধবল শব্দ- বাতাসতাড়িত পাখিদের""


চোখ খুলেই প্রথমে কিছু দেখতে পেলেন না নীলিমা। কতক্ষণ কেটে গেছে, কতক্ষণ এভাবে শুয়ে আছেন, কিচ্ছু মনে পড়ছে না। একবার মনে হলো, বুঝি অন্ধ হয়ে গেছেন। একটু পরে অবশ্য চোখটা সামান্য সয়ে এল। হাতপা অসাড়, একটা ঝিমধরা ভাব। এতটা রাত হয়ে গেল, কেউ একবার ডাকলোনা কেন আজ? নাকি সন্ধ্যেই হয়েছে সবে, কে জানে! ঘুম পাচ্ছে খুব, সারা শরীর ঘুমে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে নীলিমার। নেশার মত, বাহারি শিশিতে ভরা বিষের মত ঘুম টানছে তাঁকে।

********************

দোতলায় উঠে এসে অর্ণব খানিকটা হতভম্ব হয়ে গেল। ওর এখন কি করা উচিত? এমনিতে খুব একটা হঠাৎ সে এখানে আসেনা। ঠাম্মাকে ওর ভালো লাগে, আবার ভয়ও করে। কি গম্ভীর আর শান্ত ঠাম্মা! ইতিহাসের প্রতি খানিকটা পক্ষপাত আছে অর্ণবের। যা কিছু পুরোনো, জীর্ণ, অসহায় এবং সময়ের সাথে দৌড়ে পরাজিত --- তা-ই ওকে খুব টানে। ঠাম্মাকে সে একজন পরাজিত মানুষ বলেই জানে। সে জানে ঠাম্মা পরাজিত ও একা। পরাজিত বলে একা, না একা হয়ে কোণঠাসা বলে পরাজিত --- অর্ণব জানে না।

নীলিমার ঘরের দরজা ভেজানো দেখে অর্ণব অবাক হলো। সন্ধ্যে পেরিয়ে যাওয়ার পরে কোনদিন নীলিমা শুয়ে থাকেন না। ঘরে আলো জ্বলে, দরজা খোলাই থাকে। আজ এর একটাও নেই। বেশ কিছুক্ষণ ইতস্তত করে সে দরজায় টোকা দেয়। মৃদু টোকা। পরে সেই টোকা আরেকটু জোরে হয়। শেষে স্বভাববিরুদ্ধ ভাবে , খুবই বিচলিত হয়ে সে দরজাটা খুলে ঘরে ঢোকে। এবং নীলিমাও সেই আওয়াজে চোখ খোলেন।

- কে এলি? বনি?
- তোমার কী হয়েছে? শরীর খারাপ লাগছে?
- ও কিছু না।
বলে নীলিমা অর্ণবকে কাছে ডাকার জন্য হাতটা বাড়ান। কিন্তু হাত নড়ে না, শুধু হাত কেন, শরীরের প্রায় কোন অঙ্গই নাড়াতে পারেন না নীলিমা। অর্ণব পাথরের মত হয়ে যায় এক লহমায়। তারপর প্রবল চিৎকার করে নিচের দিকে নামতে থাকে।

নিচের তলায় তখন কেউ ছিল না। লোকজন জড়ো হয়ে, এদিকে ওদিকে খবর দিয়ে যখন সাত্যকি ও সিদ্ধার্থকে ডেকে আনলো ততক্ষণে ডাক্তার এসে গেছেন। ওঁরা দুজনেই খুব কাজের মানুষ, সমস্ত ব্যবস্থা খুব দ্রুত ও পরিপাটি করেই হলো। তারপর, নিজের ঘরে, খুব মৃদু, আরামদায়ক আলোয় শুয়ে রইলেন নীলিমা।




""এখন কিছুই নেই --- এখানে কিছুই নেই আর,
অমল ভোরের বেলা র'য়ে গেছে শুধু""


সেদিন অনেক রাত করে ঘুমোলো সবাই। জোর করে পড়তে বসে থাকলো অর্ণব অনেকক্ষণ। একতলায়, বসার ঘরে তখন জোর আলোচনা হচ্ছে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে। কোন ডাক্তারকে রেগুলার চেকাপের জন্য রাখা উচিত, কোন নার্সিং হোমে ভালো চিকিৎসা হয়, ইন্‌শিওরেন্সের কাগজপত্রে কোন ভুল থাকছে কিনা, এইসব। জল খাওয়ার অছিলায় কাছাকাছি গিয়ে অর্ণব শুনতে পেলো কাকুর গলা। সিদ্ধার্থ তখন তারিখ নিয়ে একটা কি যেন বলছিলেন, ভালো শোনা গেলনা। অর্ণব আরো এগিয়ে গেল, দেওয়ালের ধার ঘেঁষে দাঁড়িয়ে, একরকম আড়ি পেতেই শুনলো ওঁদের কথোপকথন।

- আঠেরো তারিখের ওদিকে হলে ক্লেইমটা ভ্যালিড হয় বলছিস?
- হ্যাঁ, এইতো দেখনা। এখানে লিখেছে তো।
- কিন্তু তার আগে যদি অবস্থা খারাপ হয়?
- হুঁ, সেটাই তো চিন্তার। কী করবে?
- সকাল হোক। এখন তো এমনিতেই কিছু করার নেই। চৌধুরি তো বলেই গেল মেজর অ্যাটাক নয়, আর টাইমলি ট্রিটমেন্ট হয়েছে।
- ওকে। তুই শুয়ে পড়। এখন তো এই হুজ্জোত চলবে কদিন।
- হুঁ, যাই।

অর্ণব কিছুই বুঝলো না তেমন। ইনশিওরেন্স নিয়ে কথা হচ্ছে, এটুকু ছাড়া।

ঘুম আসছেনা আর। তাই একবার বাইরে, বাগানের দিকে গেল সে। এখন অনেক রাত। আজও শিউলি ফুটেছে। রোজ সকালে ঠাম্মা এই ফুলের গাছটা দুহাতে ধরে ঝাঁকায়, আর নিচে সোহম একটা বিশাল ঝুড়ি পেতে দাঁড়িয়ে থাকে। বৃষ্টির মত ফুল পড়ে তখন। ঠাম্মা আর সোহম দুজনেই সেইসময় হাসে। অর্ণবের এখন মনে হলো, এইতো একটা ভালো সময়। একটা গোটা ভালো দিন না পেলেও, এরকম কিছু মুহূর্ত তার কাছেও জমে আছে।

এইসব ভেবে অর্ণবের একটু ভালো লাগলো। ইচ্ছে হলো একবার দোতলাটা দেখে আসে। ওপরে আজও নীলিমা একাই শুয়েছেন। ওষুধ খাইয়ে সবাই নেমে এসেছে। হয়ত পালা করে রাত জাগবে ওরা, আর মাঝে মাঝে খবর নিয়ে যাবে।




""সেই শৈশবের থেকে এ সব আকাশ মাঠ রৌদ্রে দেখেছি;
এই সব নক্ষত্র দেখেছি ""


প্রায় অন্ধকার ঘর, তাই অর্নবের খানিকটা সময় লাগলো চোখ সইয়ে নিতে। একটা হালকা নীল আলো জ্বলছে ঘরে। এই আলোটা আগে থেকেই ছিলো, ব্যবহৃত হতনা কখনও। আজ দরকার পড়েছে।

নীলিমা জেগে আছেন দেখে অর্ণব অবাক হলো। অর্ণবকে দেখে একটু হাসার চেষ্টা করলেন তিনি। একটা হাত অনেক কষ্টে একটু তুললেন। অর্ণব সেই ইঙ্গিত বুঝে ওঁর পাশে গিয়ে বসে হাতটা ধরলো। বোঝাই গেল বাকি রাতটা বড়ো শান্তিতে কাটবে ওঁর।

এইরকম চললো সারারাত। এক সত্তর ছুঁইছুঁই বৃদ্ধা আর এক সতেরোর কিশোর পাশাপাশি রইলো একটা রাত। নিচের তলায় চলতে থাকা জল্পনা থেমে গেছে অনেকক্ষণ। কাল সকাল হতেই আবার সেখানে পরিকল্পনা শুরু হবে। দক্ষ শিল্পীর মত নির্মম যান্ত্রিকতায় নিখুঁতভাবে রূপায়িত হবে সেই পরিকল্পনা।

আজ অনেকদিন পরে অর্ণবের মনে হচ্ছিলো সে একটু ভালো আছে। এই রাতটা, এই রাতটুকুই যেন তার সমস্ত জীবন। যতই রাত বাড়ছিলো ততই সে অস্থির হয়ে উঠছিলো। সামনে শুয়ে থাকা, চেতনে অবচেতনে গুটিয়ে পড়ে থাকা একটা শরীর, কেমন অবিশ্বাস্য লাগছিলো তার।

একই সঙ্গে মনের জটগুলো খুলে যাচ্ছিলো তার। সে এর আগে গল্পে পড়েছিলো, খুব অল্প সময়ে কখনও কখনও মানুষের মধ্যে পরিবর্তন আসে। আসে সে সেই পরিবর্তন প্রত্যক্ষ করলো। কি সহজেই না এখন শোনা যাচ্ছে, বলা যাচ্ছে ! নিস্তব্ধতাকে এতটুকু না ভেঙে ওরা দুজন কথা বলে চললো সারারাত। সমস্ত কথা বলার পর, বোঝাপড়া সম্পূর্ণ হলে রাতও শেষ হয়ে এলো। নীলিমা দেখলেন তাঁর স্মৃতি আর দৃষ্টি স্বাভাবিক হয়েছে। অর্ণব উঠে গিয়ে জানলাটা খুলে দিতেই একরাশ অন্ধকার ঢুকে এলো ঘরে। নীলিমার মনে পড়লো, আজ সকালেও পরম স্বাভাবিকতায় আক্রান্ত ছিলেন তিনি।

এরপর আর কিছু বাকি ছিলোনা তেমন। অল্পক্ষণের মধ্যেই নীলিমার দৃষ্টিশক্তি আবার ফিকে হয়ে এলো। প্রায় চল্লিশ মিনিট ধরে সেই সমস্ত লক্ষণই দেখলো অর্ণব, যা যা হলে তার নিচে খবর দেওয়ার কথা। এই প্রথম সে এত নিখুঁতভাবে একটা পরিকল্পনা কার্যকর করলো। একটিও শব্দ না করে, ঠিক যেমনটি নীলিমার সাথে তার কথা হয়েছে।

খুব ভোরের দিকে, একটাও কাক ডাকার আগেই নীলিমা মারা গেলেন।



কবিতার উৎস: জীবনানন্দ দাসের কাব্যগ্রন্থ ( ২য় খন্ড)
ছবি: সুমেরু মুখোপাধ্যায়