গড্ডলিকার গল্প


শমীক মুখোপাধ্যায়


আপনার মতামত         


গড্ডলিকার গল্প
শমীক মুখোপাধ্যায়


চায়ে চুমুক দিতে দিতে অলস ভঙ্গিতে রাস্তায় চলমান ট্রাফিকের দিকে দৃষ্টি মেলে রেখেছিল মৈনাক। আর একেবারে তার চোখের সামনেই ঘটে গেল ঘটনাটা।

একটা বেওয়ারিশ কুকুরছানা, খুব বেশি হলে হয় তো কয়েক দিন বয়েস হবে, পৃথিবী সম্বন্ধে একেবারে অনভিজ্ঞ, ভরা মার্কেটের মাঝে ছোট্ট শরীরটা নিয়ে রাস্তা পার হতে যাচ্ছিল, আর দু'পা চলামাত্র হুড়মুড়িয়ে তার ওপর এসে পড়ল একটা সওয়ারি-বোঝাই রিকশা। পেছনের একটা চাকা চলে গেল কুকুরটার ঠিক গলার ওপর দিয়ে। একটা ক্ষীণ আওয়াজ বেরলো কি বেরলো না তার ছোট্ট গলাটা থেকে, সাথে সাথে বেরিয়ে এল তাজা লাল রক্ত। ছোটো শরীরটা ছটফটাতে লাগল তাতাপোড়া পিচের রাস্তার ওপর। ভিড়ে ভরা বাজারের কোনো হেলদোল হল না, কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে একটা হন্ডা অ্যাকর্ড গাড়ি এসে পিষে দিয়ে বেরিয়ে গেল অর্ধেক শরীর। ছটফটানি থেমে গেল সাথে সাথে। লালচে মাংস আর রক্তের সাথে কালো চামড়ায় মিশে ছড়িয়ে রইল রাস্তার একটা সামান্য অংশে।

কয়েক লহমায় ঘটনাটা এমন তাড়াতাড়ি ঘটে গেল, মৈনাক চোখ সরাতেও ভুলে গেছিল। সংবিত ফিরল কুকুরছানাটা পিষে শেষ হয়ে যাবার পরে। দিল্লির রাস্তায় মরা কুকুরের দেহাবশেষ পড়ে থাকতে দেখাটা এমন কিছু বিশেষ ব্যাপার না, কিন্তু মরে যাওয়া কুকুর দেখা আর চোখের সামনে একটা কুকুরকে মরে যেতে দেখা তো এক জিনিস নয়! প্রবল ঘেন্নায় চোখ সরিয়ে নিল মৈনাক, আর সরাতেই চোখ পড়ল রমেশের ওপর। ছেলেটা এসে গেছে। প্লাস্টিকের কাপটা পাশের নর্দমায় ছুঁড়ে ফেলল মৈনাক, "লায়ে হো ফরম?'

রমেশ ছেলেটা চটপটে। কথা না বাড়িয়ে, বাড়িয়ে ধরল নির্ধারিত অ্যাপ্লিকেশন ফর্মটা, "প্যায়সে লায়ে হো না? হো জায়েগা আপকা কাম, ফিক্‌র না করো আপ। আপ সার বস্‌ ইয়ে ফরম ভর দো। দস্‌ দিন কে অন্দর ম্যাডামকা প্যানকার্ড আ জায়েগা।'

পকেট থেকে গুনে গুনে দেড় হাজার টাকা বের করে রমেশের হাতে দিল মৈনাক। হস্তান্তরের সময়ে মনে মনে উচ্চারণ করল, শালা খানকির ছেলে। মনে মনে, যাতে রমেশ শুনতে না পায়। কাজটা হয়ে যাওয়া খুব দরকার। মাইরি, শ্রাবণী মাথা খেয়ে ফেলবে যদি এবারেও না হয়। দু-দুবার রিজেক্ট হয়েছে প্যান কার্ডের অ্যাপ্লিকেশন। আজব দেশ বটে, দিল্লি। টু বি প্রিসাইজ, উত্তর দিল্লি। প্যান কার্ডের অ্যাপ্লিকেশনও যে কারুর রিজেক্ট হতে পারে, জানা ছিল না মৈনাকের। পাসপোর্ট নয়, পাতি একটা প্যান কার্ড। যেটা যে কেউ করাতে পারে। মৈনাকের নিজেরও যখন হয়েছিল, অফিসের এজেন্টই অবশ্য করিয়ে দিয়েছিল, মনে পড়ে না তাকে কোনো টাকা দিতে হয়েছিল বলে। অবশ্য, সে ছিল ব্যাঙ্গালোর।

শ্রাবণী খুব আদর্শবাদী টাইপের মেয়ে। বিয়ের পর তিন বছর লক্ষ্মী মেয়ের মত হোমমেকার সেজে থেকে এখন তার শখ হয়েছে, ঘরে নিজস্ব বুটিক খুলবে। এবং, সম্পূর্ণ আইন মেনে। যা রোজগার হবে, সেটা দাখিল করবে বছরের শেষে। সেই সূত্রেই প্যান কার্ড বানানোর অপচেষ্টার শুরু। নাকি তিন তিনবার প্যান কার্ডের অ্যাপ্লিকেশন রিজেক্ট হলে তার আর প্যান কার্ড বানানোই যায় না! দু-দুবার রিজেকশনের পরে, অতএব মৈনাক তাই আর রিস্ক নিতে পারে নি। সেক্টর চারের মার্কেটে এসে বিজ্ঞাপন দেখে খুঁজে বের করেছে রমেশ নামের এই ছেলেটিকে, যে "সামান্য কিছু' পয়সার বিনিময়ে লোকজনের প্যান কার্ড, ড্রাইভিং লাইসেন্স, পাসপোর্ট ইত্যাদি বের করে দেয়। প্যান কার্ডের জন্য তার পারিশ্রমিক, দু হাজার টাকা। শুরুতে দেড়হাজার, কাজ হয়ে গেলে বাকি পাঁচশো। ... শ্রাবণী জানে না। জানলে নিশ্চয়ই এই টাকাটা খরচ করতে দিত না, উলটে নিজেই তৃতীয়বার প্যান কার্ডের জন্য অ্যাপ্লিকেশন করতে দৌড়তো। ঘুষ দিয়ে কাজ করিয়ে নেবার স্ট্রং বিরোধী শ্রাবণী। হা:, মেয়েটা বাইরের জগৎ সম্বন্ধে জানে-ই বা কী, কোন্‌ চাকা ঘোরাতে যে কোথায় ক'মণ তেল ঢালতে হয়, সে-সব জেনে মরতে হয় মৈনাকদের।

রমেশের টাকা গোনা হয়ে গেছে। নির্লিপ্ত মুখে টাকাটা পকেটস্থ করে নিয়ে পাশে পিচিক করে থুতু ফেলল। এটা তার আত্মসন্তুষ্টির মুদ্রা। ফর্মের একটি বিশেষ জায়গার দিকে আঙুল দেখিয়ে সে বলল, "সব কুছ ভরনে কি জরুরত নহি হ্যায়। আপ বস্‌ য়ঁহাপে ম্যাডামকা এক সিগনেচার মার দিজিয়ে। বাকি ম্যায় ভর লুঙ্গা।'

নির্দিষ্ট জায়গায় শ্রাবণীর নামের একটা ডামি সই মেরে ফর্মটাও রমেশের হাতে তুলে দিল মৈনাক, অগর নহি হুয়া তো?'

লালচে দাঁত বের করে প্রশ্রয়ের হাসি হাসল রমেশ নামের ছেলেটি, "সার, নহি হোনেবালী চিজোঁ কো হোনী বনানা হি তো মেরা কাম হ্যায়, হ্যায় না? মেরা নাম্বার হ্যায় আপকে পাস, অগর সাত দিন কে অন্দর আপকো ফোন না মিলা, তো আপ এঁহি পে আ জানা, ম্যঁ¡য় ইধর হি বৈঠতা হুঁ। হাথোঁ হাথ প্যায়সে ওয়াপস কর দুঙ্গা ম্যঁ¡য়।'

ঘন দুধের তিন ফুটিয়া চা খেয়ে জিভটা এমনিতেই বিস্বাদ হয়ে ছিল মৈনাকের, এই রমেশ ক্যাটেগরির ছেলেগুলোর সঙ্গে কথা বলে মেজাজটা আরো খিঁচড়ে গেল। উল্টো ফুটেই অফিস, মরা কুকুরছানাটার দেহাবশেষ সন্তর্পণে ডিঙিয়ে রাস্তা পার হল মৈনাক। কাজটা হয়ে গেলেই ভালো, শ্রাবণীও খুশি, সে নিজেও খুশি।

পিচ গলা গরম থেকে ঢুকেই অফিসের এসিটা স্বস্তি দিল মৈনাককে। চোখ বন্ধ করে গা এলিয়ে দিল চেয়ারে। কিন্তু চোখ বন্ধ করতেই কুকুরছানাটার মুখটা ভেসে উঠল চোখের সামনে। কুকুরছানাটা মরে যাচ্ছে, কয়েকদিন মাত্র বয়েস, রিক্সার চাকাটা ওর গলার ওপর দিয়ে গড়িয়ে গেল, টাটকা লাল রক্ত বেরিয়ে এল ঐটুকুনি মুখ থেকে। কুকুরছানাটা মরে যাচ্ছে ...

ধুত্তোর! জোর করে চোখ খুলে আবার কম্পিউটার স্ক্রিনের দিকে মনোনিবেশ করল মৈনাক। খবরের কাগজের পাতা খোলা সামনে। বাবা রামদেব অনশনে বসছেন কাল থেকে রামলীলা ময়দানে। সারা দেশ থেকে নাকি হাজারে হাজারে ভক্ত এসে জুটছে সেখানে, বাবার সঙ্গে অনশন চালাবে বলে, আমরণ। কালো টাকা, ভ্রষ্টাচার, আরো কী কী সব যেন মুদ্দা নিয়ে।

যত ভাটের কারবার। উইন্ডো বন্ধ করে কাজের ডকুমেন্ট ওপেন করে বসল মৈনাক। আর ঠিক তখনই শ্রাবণীর ফোনটা এল।



।।২।।

বুটিক খোলার শখটা হঠাৎ চাপে নি শ্রাবণীর মাথায়। বলা যেতে পারে, এটা তার অনেকদিনের ইচ্ছে হয়ে মনের ভেতর ঘুমিয়ে ছিল। রোজকার কাজের ফাঁকে, মৈনাক ভট্টাচার্যের মিসেস ভট্টাচার্য হয়ে ওঠার নিরলস প্রচেষ্টার মাঝখানে পড়ে, কোথায় যেন সেই ইচ্ছেটাকে আর লালন করা হয়ে ওঠে নি। ছোটো থেকেই আঁকার হাত ভালো ছিল শ্রাবণীর, ঠিক সিনসিনারি নয়, আলপনা, বিভিন্ন রকমের কারুকার্য করা ডিজাইনে তার বরাবরই নামডাক ছিল পাড়ায়। স্কুলে সেলাইয়ের খাতায় দিদিমণিরা সেলাইয়ের দিকে তাকানোর প্রয়োজন বোধ করতেন না, ঢাউস ঢাউস আর্টপেপারের পাতার বর্ডার জুড়ে সুন্দর সুন্দর ডিজাইন বানিয়ে রাখত শ্রাবণী, দিদিমণি তার দিকে তাকিয়েই নম্বর দিয়ে দিতেন।

খুব উঁচুমানের ছাত্রী ছিল না সে কোনওদিনই, কোনওরকমে গ্র্যাজুয়েশন কমপ্লিট করেই কীভাবে যেন মৈনাকের সঙ্গে আলাপ, তারপরে প্রেম এবং তারপরে চুটিয়ে প্রেম। অবশেষে বিয়ে করে দিল্লির বুকে ঘর বেঁধে থিতু হয়ে বসা। মৈনাক কাজ করে এক অডিট ফার্মে, প্রায় প্রতিদিনই তাকে দিনের একটা বড় সময় অফিসে বা ক্লায়েন্টের অফিসে কাটিয়ে আসতে হয়, ছুটির দিনগুলো ছাড়া আর স্বামীকে তেমন পাওয়া হয়ে ওঠে না। বিয়ের পরের প্রাথমিক উন্মাদনার দিনগুলো কেটে গেছে, দুজনেই এখন দুজনের কাছে খুব খুব চেনা, এখন আস্তে আস্তে মৈনাকের অফিস আর তার গৃহবধূর জীবনচর্যার মধ্যে ধীরে ধীরে ঢুকে পড়ছে বিশাল শূন্যতা।

বাচ্চার কথা ভেবেছিল শ্রাবণী, কিন্তু মৈনাক এখনই বাবা হতে চায় না। তাই আগামী আরও দু বছরের জন্য সে-চিন্তা দূরে সরিয়ে রাখতে হয়েছে। এখন মৈনাকের উন্নতির সময়, বাচ্চাকাচ্চা হয়ে যাওয়া মানে পেছনে পুরোদমের সংসারের শেকল লেগে যাওয়া, শেকলে বাঁধা পড়ার সময় এখন মৈনাকের নেই। অন্তত আগামী দুটো বছর।

একলা শ্রাবণী, তাই পাড়ার মার্কেট থেকে কিনে আনে আর্টপেপার, আবার শুরু করে তুলি-রঙের সাথে খেলা। বিক্ষিপ্তভাবে টিভির চ্যানেল ঘোরায়, রান্নার রেসিপি বা শাশুড়ি বউয়ের সাজানো ঝগড়ার ফাঁক দিয়ে তার নজরে আসে অ্যাঙ্কর বা অ্যাক্টরের পরিধানের সালোয়ার সুটের নকশা, বা সিরিয়ালের সেটের ঘর সাজানোর কোনো বিশেষ ছাঁদ। মনে রয়ে যায়। টিভি বন্ধ করে আর্ট পেপারের টুকরোয় মেলে ধরে নিজের কল্পনা। কিছুটা হয়, বেশির ভাগটাই হয় না।

পাশের ব্লকের সাততলার মিসেস কাপুরের নিজের বুটিক আছে মোতিনগর মার্কেটে। শ্রাবণীর সাথে ভালোই আলাপ আছে, কাপুরের বাড়ির কাজের লোক তাদের বাড়িতেও বাসন মাজা ঘর ঝাড়ামোছার কাজ করে। অনেকদিন দোনামোনা করে একদিন সাহসে ভর করে নিজের বানানো কিছু ডিজাইন নিয়ে একদিন কাপুরের কাছে হাজির হয় শ্রাবণী।

তার তরফে উদ্যম বলতে, এইটুকুনিই। পাকা ব্যবসাদার মিসেস কাপুর চিনে নিতে ভুল করেন নি শ্রাবণীর প্রতিভা। তিনি পরদিন নিজে চলে আসেন শ্রাবণীর ফ্ল্যাটে, আবিষ্কার করেন শ্রাবণীর অপছন্দ হওয়া আরো বেশ কিছু ছবি, এবং তৃতীয়দিনের মাথায় তিনি শ্রাবণীকে প্রস্তাব দেন নিজের বিজনেস পার্টনার হবার। শ্রাবণী ডিজাইন বানাবে, তাঁর বুটিকের মাস্টারজীরা তার ওপরে বেস করে বানাবে সালোয়ার, চুড়িদার, ডিজাইনার শাড়ি। প্রফিটের থার্টি ফাইভ পার্সেন্ট তার। প্লাস মাসে-মাসে একটা স্টেডি সম্মানদক্ষিণা, হাজার সাতেক টাকা।

বছরের শেষে কোনোভাবেই ইনকামট্যাক্সের আতস কাচের নিচে আসবে না শ্রাবণীর উপার্জন, তবুও, নিজের রোজগার, নিজেরই রোজগার। নিজের সংসারের জন্য তারও কিছু কন?ট্রিবিউশন। সেটা সে নিয়মিত করে যেতে চায়, আর ঠিক আর পাঁচটা চাকুরে লোকের মতই করতে চায়। বছরের শেষে সরকারের কাছে নিজের উপার্জনের হিসেব দাখিল করে। ...তাই প্যান কার্ড, তাই মৈনাককে ধরে ঝুলোঝুলি।

কিন্তু বিধি বাম। কী সব উদ্ভট কারণ দেখিয়ে তার প্যান কার্ডের অ্যাপ্লিকেশন রিজেক্ট হয়ে এল একবার। অবিশ্যি তাতে তার মিসেস কাপুরের বুটিকে জয়েন করা আটকাচ্ছে না, কিন্তু শ্রাবণী অনড়। প্যান কার্ড সে করাবেই। দ্বিতীয়বার অ্যাপ্লাই করেছে, এখনো তার উত্তর আসে নি, মৈনাক ফলোআপ করছে, কে-জানে কবে পাওয়া যাবে।

আজও শ্রাবণী বসেছিল তার আঁকার সরঞ্জাম নিয়ে। মাথায় নিত্যিনতুন আইডিয়া খেলছে। টিপিক্যাল বাংলার কিছু ট্র্যাডিশনাল আটপৌরে ডিজাইন আছে, সেগুলো আজকাল ওই দেবদাস মার্কা সিনেমাগুলোতে মাঝে মাঝে ঘুরেফিরে আসছে, কিন্তু বিকৃতভাবে। অবাঙালি পরিচালকরা ঠিকভাবে ফুটিয়ে তুলতে পারে নি বাংলার আটপৌরে শাড়ির ফ্যাশন, তার ডিজাইন। এইগুলোকে একটু মডার্ণ লুক দিয়ে যদি কামিজের বুকের জমিতে ফুটিয়ে তোলা যায়, হোয়াইট বা হাল্কা ক্রিম ব্যাকগ্রাউন্ডে ... দিল্লির মেয়েরা কিন্তু লুফে নেবে।

মগ্নতা ভাঙল ফোনের আওয়াজে। ফুলদি, কল্যাণী থেকে। এই সময়ে?



।।৩।।

মানুভাইয়ের কিরানা স্টোর এখন বেশ ভালোই চলছে।

ভারেদিয়া গ্রাম। তালুক ভারুচ। বর্ধিষ্ণু গ্রাম। গাঁয়ের সব লোক এখন একডাকে চেনে মানুভাইয়ের দুকানকে। মেয়ে সুরিতা এইবার দসবি দিল। ইলেভেনে উঠবে। পঢ়ালিখার পাশাপাশি বাপুকে সাহায্যও করে যথাসম্ভব। সুরিতা একইসঙ্গে মানুভাইয়ের ছেলে আর মেয়ে। মা-মরা মেয়েটাকে সেই ছোট্ট বয়েস থেকে বুকে আগলে মানুষ করেছে মানুভাই। কুদরত এক ঝটকায় সেদিন তাদের খোলা ময়দানে এনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল।

সচ্ছল একটা সংসার ছিল মানুভাইয়ের। মা ছিল, বিবি ছিল, জ্যোতিকাবেন। দো-মঞ্জিলা কোঠীও ছিল। আজ সে দস্‌ সাল পহ্‌লে। দু হাজার এক সালের ছাব্বিশে জানুয়ারির সকালে সেই খতরনাক ভূকম্প কয়েক মিনিটের মধ্যে মাটিতে মিশিয়ে দিয়েছিল তার দো-মঞ্জিলা বাড়িটা। মানুভাই তখন মাঠে গিয়েছিল গরুগুলোকে ছাড়তে। মেয়ে সুরিতা তখন আট সাল কি বাচ্চি। মাটি খামচে ধরে কয়েক মিনিট পড়ে থাকতে হয়েছিল মানুভাইকে। কাঁপুনি থামার পরে কোনোরকমে যখন ফিরে আসতে পারল বাড়ির দিকে, তখন সব শেষ। এমনকি বাড়ির দিকে যাবার রাস্তা পর্যন্ত ফেটে চৌচির।

ভগ্‌বানজী মেহেরবান কিনা, জানে না মানুভাই। পরের দশ ঘন্টার নিরলস চেষ্টায় বেরিয়েছিল তার মা আর বিবির মৃতদেহ, সিমেন্টের চাঙড়ের নিচ থেকে। আর বেরিয়েছিল জ্যান্ত সুরিতা। ওইটকু মেয়ে কীভাবে খাটের নিচে চলে গেছিল। বাড়ি ভেঙে গেছে, খাট ভাঙে নি। মেয়েটা বেঁচে গেছিল।

বাপ আর মেয়ে, দুজনেই মা-হারা, এসে দাঁড়িয়েছিল মাঠের ধারে। সান্ত্বনা দেবার মত বেশি লোক বেঁচে ছিল না ভারেদিয়া গ্রামে। কোঠীর পর কোঠী ভেঙে তুবড়ে, গোটা গ্রাম তখন শ্মশান। নিজের শোকের থেকে তখন বেশি বড় হয়ে উঠেছিল মেয়েটাকে দেখভাল করা। মেয়েটার শোক কমানো। নিজের চোখের সামনে মা-কে আর মোটি-দাদীকে মরে যেতে দেখেছে ওইটুকু মেয়ে।

সরকার থেকে সাহায্য এসেছিল অনেক, বিদেশে থাকা গুজরাতিরাও সাহায্য পাঠিয়েছিল অনেক, এনজিওবাবুদের মারফৎ। শুধু তাদের গ্রাম ভারেদিয়াই নয়, পুরো ভারুচ, ভুজ, কচ্ছ, আমেদাবাদ, ... বলতে গেলে গোটা গুজরাত ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছিল কয়েক মিনিটের ভূকম্পে। সব ধীরে ধীরে গড়ে তোলা হয়েছিল। সাহায্যের টাকায় মানুভাই আবার আস্তে আস্তে গড়ে তুলেছিল একটা ছোটো ঘর, গরুগুলোর জন্য একটা ছাউনি, আর একটা দোকানঘর।

ঠিক এক বছরের মাথায় লাগল দাঙ্গা। তাদের গ্রাম ভাদেরিয়াতে কিন্তু মুসলিম, দলিত কিছু কম ছিল না। কিন্তু সেদিন সব হারানো মানুষগুলোর কাছে, তলোয়ার ত্রিশূল ধরে কাটাকাটি করার চেয়ে আবার নতুন করে জীবন শুরু করার তাগিদটাই বেশি ছিল। প্রতিবেশির ধর্মপরিচয় খুঁজে বের করে তাকে তলোয়ারে কাটার ইচ্ছে জাগে নি এই গাঁয়ের কারুরই। সারা গুজরাত যখন জ্বলছিল দাঙ্গার আগুনে, তখন এই গ্রাম ছিল আশ্চর্যরকমের শান্ত। মহল্লার সব জোয়ানরা, হিন্দু মুসলিম নির্বিশেষে পালা করে রাতপাহারা দিত, মুসলিমদের নমাজের সময়ে তাদের সতর্ক নজর দিয়ে ঘিরে রাখত হিন্দুরা, নভরাত্রের সময়ে মুসলমানেরা হিন্দুদের ঘরে ঘরে গিয়ে খবর রাখত, কারুর কোনো অসুবিধে হচ্ছে কিনা। পৃথিবী মায়ের এক ঝটকা গ্রামের মানুষগুলোকে সব ভেদাভেদ ভুলে এক করে দিয়েছিল।

আজকের ভারেদিয়া গ্রামকে দেখলে সেই সব দিনের কথা কল্পনাও করা যাবে না। সুন্দর সাজানো একটা গ্রাম। বেশির ভাগ মানুষেরই হয় ব্যবসা আছে, নয় জমি জিরেত আছে। মানুভাইয়ের কিরানা স্টোর আছে। তা থেকে ভালোই আয় হয়, গাই আছে আটটা, তার মধ্যে দুধেল এখন চারটে। আনন্দ্‌ থেকে আমূল ডেয়ারির গাড়ি আসে রোজ দুধ নিতে, মানুভাই সেখানে দুধ জমা করে আসে। ভালো টাকা পায়। গাঁয়ের ভেতর দিয়ে এখন পাকা রাস্তা, বাঁধানো টিউবওয়েল। তরক্কি হি তরক্কি।

রামদেবজীর খুব ভক্ত মানুভাই। টিভিতে রামদেবজীর বাণী সময় পেলেই শোনে। রামদেবজীর দেখিয়ে দেওয়া যোগাসনগুলো করে, বলতে নেই, মানুভাইয়ের শরীর থেকে, এখনো যৌবন যায় নি। আধিব্যাধি বলতে কিছু নেই। যদিও দশ বছর হয়ে গেল, মেয়ের মুখ চেয়ে আর শাদি-ওয়াদির কথা ভাবে নি মানুভাই, কিন্তু এখন মাঝে মাঝে মন চায় একটা নরম হাতের ছোঁয়া, শরীর চায় আরেকটা শরীর। দীর্ঘদিন উপোসী সে।

মেয়েটা দসবি পাশ দিল, হাতে কিছু টাকাপয়সা জমেছে, মেয়েটাকে নিয়ে একটু কোথাও ঘুরে এলে হত, মনটাও শান্তি পেত, মেয়েটাও খুশি হত। মানুভাইয়ের অনেক দিনের ইচ্ছে কাশী বারানসী যায়, সেখান থেকে হরদ্বার আর কতই বা দূর, একবার গিয়ে বাবা রামদেবকে চাক্ষুষ দেখে বাবাকে প্রণাম করে আসবারও তার বড়ই ইচ্ছে।

তার চিন্তা কমিয়ে দিলেন স্বয়ং রামদেবজী। কালকেই টিভিতে বলেছে রামদেবজী আসছেন দিল্লিতে, ভ্রষ্টাচার কে খিলাফ নাড়া লাগাতে। রামলীলা ময়দান আছে লাল কিলার পাশে, সেইখানে বসবে রামদেবজীর যোগশিবির, চার জুন থেকে। সারা দেশ থেকে লোক যাচ্ছে তাঁর শিবিরে যোগ দেবার জন্য। রামদেবজী সেখানে ভ্রষ্টাচার হঠাবার জন্য অন্‌শন করবেন সব লোকের সাথে। যারা যারা যাবে, সব্বাই সেখানে তাঁর সাথ দিতে পারে অন্‌শনে। রাজনৈতিক নেতাদের ভ্রষ্টাচার আম আদমিকে যে কীভাবে পিষতে থাকে, কীভাবে পুলিস চৌকি থেকে এমএলএ সাহিব পর্যন্ত সব্বাই লুঠতে থাকে সামান্য কটা হকের পাওনার জন্য, সে মানুভাইদের মত লোকেদের চেয়ে বেশি কে-ই বা জানে। ... মনের ভেতর থেকে একটা সাড়া পাচ্ছিল মানুভাই, তার ওখানে যাওয়া উচিত, নিজের জন্য না-হোক, স্বামীনারায়ণজীর কৃপায় তার আজ তেমন কোনো অভাব নেই, কিন্তু এই গ্রামের জন্য, এই দেশের জন্য তার একবার বসবার খুব ইচ্ছে হচ্ছিল রামদেবজীর পায়ের কাছে। রামদেবজীর আন্দোলনে যদি দেশটা ধীরে ধীরে সত্যিই বদলে যায়, তা হলে তার মত কত মানুভাইয়ের যে উপকার হবে দেশ জুড়ে, ভাবতেই খুব ভালো লাগছিল মানুভাইয়ের।

দেশ মানে কী, দেশ জিনিসটা কত বড়, তা জানে না মানুভাই, বার চারেক আম্‌দাবাদে গেছে সে, একবার বম্বাই গেছিল, সে তার ব্যবসার কাজে। কিন্তু মোটা-মোটা এটা বুঝছে সে, রামদেবজীর আন্দোলন সফল হলে দেশে আর কোনো ভ্রষ্টাচার থাকবে না, পুলিস রিশ্‌বৎ নেবার আগে দশবার ভাববে, নেতারা আর রিলিফের টাকা মারতে পারবে না। দরকার হলে মানুভাইদের মত লোকেরা কোর্টে যেতে পারবে, সেখানে বকিল জজসাহাবরা তাদের কথা শুনবে, নতুন আইন পাস হবে, সেই আইনের বলে তারা আম আদমির দল ভ্রষ্টাচারী লোকজনেদের শাস্তি দিতে পারবে। রামদেবজী বলেছেন, ভ্রষ্টাচারীদের ধরে ধরে ফাঁসিতে ঝোলাও। এই কথাটা খুব পসন্দ্‌ হয়েছে মানুভাইয়ের। হ্যঁ¡, যারা হাজার হাজার মানুষকে রাতারাতি পথের ভিখিরি বানিয়ে দিতে পারে শুধু নিজেদের জেব ভরবার জন্য, তাদের বেঁচে থাকার কোনো অধিকার নেই। রাতের পর রাত পলিথিনের আচ্ছাদনের নিচে খোলা মাঠে কাটিয়েছে সে, মেয়ের মুখে একটু খাবার তুলে দেবার জন্য অন্য লোকের মুখ থেকে খাবার কেড়ে নিতে বাধ্য হয়েছে সে কয়েকবার। পলিটিকাল বাবুভাইরা কেবল এসেছে আর গেছে। ওয়াদা আর ওয়াদা। হম ইয়ে করেঙ্গে, বো করেঙ্গে, আর লুঠে গেছে রিলিফের টাকা। পুলিস এসে পরেশান করেছে রাতের পর রাত। ওইটুকু একটা মেয়েকে নিয়ে কীভাবে যে আবার নিজের পায়ে দাঁড়াতে পেরেছিল মানুভাই, সে তার নিজের থেকে বেশি ভালো আর কে-ই বা জানবে? জানবে ভারেদিয়া গ্রামের আরও অনেক লোক, যারা একই অবস্থার মধ্যে দিয়ে গেছিল দু হাজার এক সালের সেই ভয়ঙ্কর দিনের পর। সবারই কমবেশি একই গল্প। পুলিস লুঠছে, বাইরে থেকে আসা লোকজন লুঠছে, পলিটিকাল নেতারা লুঠছে, আর সেই লুঠমারের মধ্যে বাঁচার জন্য লড়ে যাচ্ছে সব হারানো মানুষের দল।

ভ্রষ্টাচার কী জিনিস, খুব ভালো করে জানে ভারেদিয়া গ্রামের লোকজন, জানে গুজরাতের আম আদমি। রামদেবজী একেবারে তাদের মনের কথা বলেছেন। ... কাশী বারানসী তো পরেও হবে, আবার হবে, এইবেলা রামদেবজীর দর্শনটা দিল্লিতে গিয়ে সেরে এলে, দর্শন কে দর্শনও হবে, মেয়েটাকে নিয়ে দিল্লি বেড়ানোও হবে। দিল্লিতে কতকিছু দেখার জিনিস আছে, মানুভাই নিজেও কখনো দিল্লি যায় নি আগে, এই মওকায় দেশের রাজধানীটা ঘুরে আসা যাবে।

গাঁওয়ের আর পাঁচজনের সঙ্গে কথা বলে একটা দল বানাবার চেষ্টা করেছিল মানুভাই, কিন্তু একমাত্র গিরধরভাই ছাড়া আর কেউ নিজের ধান্দা ছেড়ে দিল্লি যেতে রাজি হল না। গিরধরভাইয়ের নিজের কোনো ধান্দা নেই, স্রেফ গরুর দুধ বেচে তার দিন চলে যায় হেসেখেলে। পাঁচ-ছদিনের জন্য সে আরামসে দিল্লি ঘুরে আসতে রাজি হয়ে গেছে।

কথা পাকা হল। দু'তারিখের পশ্চিম এক্সপ্রেস। থাকার জায়গা নিয়ে ভাবতে হবে না। রামলীলা ময়দান নাকি বিশাল বড়, সেখানে পুরো ময়দান জুড়ে শামিয়ানা লাগানো হয়েছে। পঙ্খাও লাগিয়েছে। সারাদিন দিল্লি টো-টো করে ঘুরে বেড়ানো যাবে, রাতে শামিয়ানার নিচে ভজন কীর্তন করতে করতে ঘুমিয়ে পড়া যাবে।

জয় রামদেবজী কি।



।।৪।।

খানিকক্ষণের জন্য কথা হারিয়ে ফেলেছিল শ্রাবণী। বাবা হসপিটালে? বাবা ... শ্রাবণীকে এক্ষুনি যেতে হবে কলকাতা। এক্ষুনি। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব।

ফোনের ওপ্রান্তে মৈনাক। শ্রাবণী আপ্রাণ চেষ্টা করছিল নিজেকে স্বাভাবিক রাখবার, কিন্তু তার গলা ভেঙেচুরে যাচ্ছিল বারবার। বাবার এটা থার্ড অ্যাটাক। বেলভিউতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ডাক্তার খুব একটা আশা দিতে পারছে না। দুদিন তিনদিন কাটে কি কাটে-না। ট্রেনের টিকিট দেখতে হবে, এক্ষুনি।

ব্যালেন্স শীটের হিসেব মাথায় উঠল মৈনাকের। শ্বশুর লোকটিকে সে খুব অ্যাডমায়ার করে। তার নিজের বাবা নেই আনেকদিন হয়ে গেল, শ্রাবণীর বাবা সেই শূন্যস্থানটা কেমন যেন বিনা আয়াসেই পূরণ করে দিতে পেরেছিলেন। বাবা-বাবা, বা শ্বশুর-শ্বশুর সম্পর্কের চেয়েও অনেক বেশি সম্পর্ক, কীরকম একটা বন্ধু-বন্ধু ব্যাপার হয়ে গেছে ভদ্রলোকের সঙ্গে। সেই লোকটা আজ আইসিইউ-তে জীবনের সঙ্গে যুঝছে, হৃদপিণ্ড আর সঙ্গ দিতে চাইছে না তার। এই চিন্তাটা ভীষণভাবে বিচলিত করল মৈনাককে। ঝটপট ইন্ডিয়ান রেলের সাইটটা খুলে বসল মৈনাক। পাশাপাশি, মেকমাইট্রিপ।

টিকিটের অবস্থা দেখে চোখ কপালে উঠল তার। ঠাঁই নাই, ঠাঁই নাই। গরমের ছুটির সিজন চলছে। দিল্লি কলকাতার লোয়েস্ট ফ্লাইটের ভাড়া সতেরো হাজার টাকা পারহেড। ট্রেনে সব ভর্তি। সেকেন্ড এসি, থার্ড এসি সবেতে ওয়েটিং লিস্ট চলছে দুশো-আড়াইশো। কোনোভাবে কাল পরশুর মধ্যে কনফার্ম টিকিট পাবার চান্স নেই।

শ্রাবণীকে আবার কল ব্যাক করল মৈনাক, "কোথাও টিকিট নেই শ্রাবণী। কলকাতা যাবার সমস্ত সীট বুকড।'

শ্রাবণীর বুক ঠেলে আবার কান্না আসে, "প্লেনেও হবে না?'

"শুধু কলকাতা যেতে খরচা হবে পঁয়তিরিশ হাজার মত। আসার টিকিট আলাদা।'

"পঁ-য়-তি-রি-শ হাজার? কোনোভাবেই এর থেকে কম হওয়া সম্ভব নয়?'

"না শ্রাবণী। মিনিমাম থার্টি ফাইভ। আমি সব এয়ারলাইন্স চেক করে নিয়েছি। খরচা করে যাওয়া যেতেই পারে, কিন্তু ... ওখানে গিয়েও একটা খরচাপাতির ব্যাপার আছে। আমি তোমার ফুলদিকে ফোন করেছিলাম একবার, বাবা এখনও স্টেবল আছেন, তবে পেসমেকার বসাতে হবে মনে হচ্ছে। এবং সেটা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব। ... বুঝতে পারছি না, দেখি দু একটা এজেন্টকে ফোন করে।'

শ্রাবণী অন্ধকার দেখল চোখের সামনে। যাওয়া যাবে না? "আচ্ছা, মিস্টার ব্যানার্জি আছেন না কোন একটা মিনিস্ট্রিতে? তিনি কোনো ব্যবস্থা করতে পারেন না? মিনিস্টার কোটা, হেডকোয়ার্টার কোটা? এসব তো হয় রেলে, আমি জানি।'

আশার আলো দেখল মৈনাকও। মিস্টার ব্যানার্জির নিশ্চয়ই কোনো কানেকশন থাকতে পারে। ব্যানার্জির নম্বর ডায়াল করে সে, এবং অনতিবিলম্বেই হতাশ হয়। ব্যানার্জি আছে এনভায়রনমেন্ট মিনিস্ট্রিতে, রেল মিনিস্ট্রিতে তার চেনাশোনা আছে, কিন্তু সেখান থেকেও কোনো আশার আলো দেখা গেল না। সামার ভেকেশনের টাইমে সমস্ত কোটা শেষ।

ব্যানার্জিই উপায় বের করলেন, আপনি এক কাজ করুন মৈনাকবাবু। কাল খুব ভোর ভোর চলে যান রিজার্ভেশন কাউন্টারে। পারলে আজ রাত থেকেই লাইন দিয়ে বসে থাকুন, সকালে কাউন্টার খুললেই তৎকালে টিকিট কাটুন, বিকেল বেলায় ট্রেনে চড়ে বসুন। একটাই মাত্র রাস্তা।

তৎকাল। হ্যঁ¡, এই একটা অপশন আছে বটে। অনলাইনে তৎকাল বিশেষ এফেক্টিভ নয়। সকালের দিকে লগইন করাই যায় না, ও গিয়েই লাইন দিতে হবে, একমাত্র ওইভাবেই টিকিট পাওয়া যায়।

অফিসের খুব কাছে পড়ে পুরনো দিল্লি স্টেশন। নিয়ারেস্ট রিজার্ভেশন কাউন্টার বলতে, ওটাই। তাড়াতাড়ি অফিস থেকে বেরিয়ে যেতে হবে, দেখা যাক, কাউকে ফিট করিয়ে দিয়ে আসা যায় কিনা! শ্রাবণীকে নিয়েই যাবে না-হয়।

দুবেকে ডেকে নিল মৈনাক, কিছু কাজ বুঝিয়ে দিতে হবে বেরোবার আগে। দুবে তো সব শুনে হাঁ। "আপনি এই বাজারে পুরানি দিল্লি রেল স্টেশনে যাবেন? বরং নিউ দিল্লি যান, সরোজিনী নগর যান, পুরানি দিল্লির দিকে যাবেন না প্লিজ। প্রচুর লোক জড়ো হচ্ছে ওদিকে, কাল সকাল থেকে রামদেবজীর অন্‌শন শুরু হচ্ছে রামলীলা ময়দানে। সারা ইন্ডিয়া থেকে পিলপিল করে লোক আসছে। ভিড়ে ভিড়াক্কার হবে ওদিকের রাস্তা। এই সময়ে ওদিকে যাবেন তো ফেঁসে যাবেন। জানেন তো, আজ রামদেবজীকে রিসিভ করতে গেছিলেন কপিল সিব্বাল, প্রণব মুখুর্জি আর সুবোধকান্ত সহায়। কী বাটারিং করছে মাইরি তিন মিনিস্টারে মিলে। রামদেবজী অন্‌শনে বসলে ওদের সব ভান্ডাফোড় হয়ে যাবে কিনা!'

এসব নিয়ে আলোচনা করার অবস্থায় ছিল না মৈনাক, তবু দুবের কথা শুনে তার মুখ বেঁকে গেল ক্ষীণ হাসিতে, "খুব সোজা সরল ইকোয়েশন, তাই না দুবেজী? রামদেব অনশনে বসছে, তাই সে খুব ভালো লোক, তাই সে রামদেবজী, আর মিনিস্টারদের বেলায় সব কপিল সিব্বাল, প্রণব মুখুর্জি, কপিলজী নয়, প্রণবজী নয়। তারা খুব খারাপ লোক, ঠিক হিন্দি সিনেমায় যেমন হয়, তাই না? রামদেবের কোনও দু-নম্বরী নেই, সাদাসিধে লোক, যোগাসন করে আর ওষুধ বিক্কিরি করে আর ধর্মের নামে সরকারকে এক পয়সা ট্যাক্স দেয় না, কোথায় স্কটল্যান্ডে দ্বীপ কিনে রাখছে, কোথায় প্রাইভেট জেট কিনে ফেলছে, তার বেলায় কোনও ভ্রষ্টাচার নেই, আর কেউ সুইস ব্যাঙ্কে টাকা জমালেই তখন সে ভ্রষ্টাচারী হয়ে যায়। পারেন বটে আপনারা। গেরুয়া পরা বাবাজী দেখলেই পাবলিক এমন ভাবালু হয়ে যায় ...'

হা-হা করে হেসে ওঠে দুবে, "আরে মোইনাকসাব, আপ তো ইমোশনাল হো জা রহে হো। ম্যায়নে কব কহা রামদেবজী বিলকুল ক্লিন আদমি হ্যায়? আচ্ছা ছোড়িয়ে, রামদেবজী নহী, সির্ফ রামদেব। খুশ? ম্যঁ¡য় রামদেব বাবা কা কোই ভক্ত-বক্ত নহী হুঁ, মেরি ওয়াইফ বহুৎ মানতি হ্যায় উনকো, উনকে মু সে সুনতে সুনতে মেরা ভি আদত হো গয়া রামদেবজী বোলনা, হালাঁকী ও সব উনকা ... কেয়া কেহ্‌তে হ্যায়, কপালভাতি ইয়ে উয়ো, ইয়ে সব কোই মাইনে নেহি রাখতা মেরে লিয়ে ... ম্যায় তো বস্‌ আপকো ইয়ে হি বোল রহা থা কি পুরানি দিল্লিকে তরফ মত জাও আজ ... মুঝে ভি জানা থা উস তরফ এক ক্লায়েন্টকে পাস, ম্যায়নে তো মনা কর দিয়া ... বুরা মত মানো মোইনাকসাব, আপ বংগালিলোগ রাজনৈতিক মুদ্দা সুনতে হি কাফি এগ্‌সাইটেড হো জাতে হো, লেকিন আপকে বংগাল সে ভি কাফি লোগ আ রহে হ্যায় ইধার, বাবা কে ইয়োগা ক্যাম্প মে হিস্যা লেনে, সুননে মে আয়া ...'

ধুত্তেরি। বকতে পেলে কিছু চায় না ব্যাটা বিহারি। যা হবে হোক, ওল্ড দিল্লি স্টেশনেই যাবে মৈনাক। ব্যালান্স শীটের প্রপোজালগুলো দুবেকে ব্রিফ করতে শুরু করে, মনটা পড়ে থাকে কলকাতায় অসুস্থ শ্বশুরমশাইয়ের দিকে।

কাজ হস্তান্তর করে, ছুটির ব্যবস্থা করে মৈনাক যখন অফিস থেকে বেরোবার সময় পেল, তখন চারটে বেজে গেছে।



।।৫।।

শ্রাবণী জেদ ধরেছিল, সে-ও যাবে সঙ্গে। মৈনাক না করতে পারে নি।

ওল্ড দিল্লি রেলওয়ে স্টেশনে গাড়ি রাখা একটা বড় সমস্যা। কোনোরকমে গাড়ি রেখে রিজার্ভেশন কাউন্টারের দিকে এগোতে গিয়ে ধাক্কা খেয়ে গেল ওরা দুজন। সামনে জনসমুদ্র। হাজারে হাজারে লোক ভিড় জমিয়ে রয়েছে প্রতিটা কাউন্টারের সামনে। টিকিট কাটার লাইন এখন দিয়ে লাভ নেই, কারণ টিকিট পাবার কোনো চান্স নেই, আগে যেতে হবে এনকোয়্যারিতে। যদি কোনো সামার স্পেশাল ট্রেন পাওয়া যায়, বা কোটার কোনো বন্দোবস্ত করা যায়। না হলে তৎকালের জন্য জায়গা খুঁজে রাখতে হবে।

প্রতিটা লাইনের চারপাশে ঘুরঘুর করছে দালালের দল। "হান্‌জী সাব, বোলিয়ে কোটা বডোডরা মুম্বই নাসিক চেন্নাই হায়দ্রাবাদ ...' একজন লিস্টের মধ্যে কলকাত্তা বলে ফেলতেই তার ওপর লাফিয়ে পড়ল মৈনাক, কলকাত্তার টিকিট কবেকার হবে? কোন গাড়ির হবে? দালাল সরিয়ে আনল মৈনাককে লাইন থেকে। "ছে জুন কা মিল জায়েগা। কালকা মেল, চেয়ারকার।' "ছে জুন নেহি, মেরেকো কল্‌ কা হি চাহিয়ে, হো সকে তো আজ রাতকি ভি কোই গাড়ি হো' ... মৈনাকের উৎসাহে জল ঢেলে দিল দালাল, "নেহি সাব, তিন দিন সে পেহ্‌লে কোই সি ভি গাড্ডি মে জগাহ্‌ নেহি মিলনেওয়ালি। মিনিমাম তিন দিন ওয়েটিং টাইম।'

এনকোয়্যারি কাউন্টারের মুখ অবধি পৌঁছতে পৌঁছতে সময় লাগল প্রায় পঁয়তাল্লিশ মিনিট। এবং পৌঁছিয়েও বিশেষ কিছু লাভ হল না। নো সামার স্পেশাল, নো স্পেশাল কোটা। সকালবেলার তৎকাল কোটাই একমাত্র সম্বল, কলকাতার জন্য রাজধানী, দুরন্ত, কালকা, পূর্বা সব ট্রেনেই তৎকাল আছে, যেটাতে পাবেন সেটাতেই যাবেন। না পেলে পাবেন না। আমাদের কিছু করার নেই।

ভিড়ের চাপ এক ধাক্কায় লাইন থেকে সরিয়ে দিল মৈনাক আর শ্রাবণীকে। সেই দালালটা তখনো ঘুরঘুর করছিল, আবার তাকে ধরল মৈনাক। কাল তৎকালের জন্য কখন থেকে লাইন রাখা যেতে পারে?

দালাল একবার মাথা থেকে পা পর্যন্ত মেপে নিল শ্রাবণীকে। অস্বস্তিতে চোখ ফিরিয়ে নিল শ্রাবণী। দাঁত খুঁটতে খুঁটতে জবাব দিল দালাল, লাইন তো আপ অভি সে ভি রাখ সকতে হ্যায়। হম্‌ রাখ লেঙ্গে আপকি লাইন।

কী বলে রে! মাল পাগল না ঘোড়েল? কাল সকাল আটটায় কাউন্টার খুলবে তার জন্য এখন সন্ধ্যে সাড়ে সাতটা থেকে লাইন রাখতে হবে? ... দালাল নির্বিকার, "আপ কি মর্জি। সোচ লো। লাইন রাখওয়া লো, ঘর জাকে আরাম সে শো জাও, সুবাহ্‌ সুবাহ্‌ আ জাও। হম্‌ মিল জায়েঙ্গে য়েঁহি পর। কাউন্টার খুলেগা, এক দো নাম্বার মে আপ কা কাম হো জায়েগা।' হলদেটে চোখ আরো একবার জরিপ করে নেয় শ্রাবণীর শরীর, "ম্যাডাম কো ভি লেকে আইয়েগা, লেডিজ কাউন্টার হ্যায় উধার, ছত্তিস অওর সাঁইতিস মে, জলদি জলদি কাম হো জায়েগা।'

দায়ে পড়ে সমস্ত কিছু চোখ বুজে ইগনোর করে মৈনাক, "কী গ্যারান্টি তুমি সকালে লাইন রাখবে? আমি তোমাকে খুঁজে পাবো কী করে?' ছ্যাতলা পড়া দাঁত বের করে হাসে দালাল, আপনাকে খুঁজে নিতে হবে না, আমি রাতে এইখানেই থাকি, আমি আপনাকে খুঁজে নেব। সকালে আপনাকে লাইন ছেড়ে দেব, আপনি আমাকে পয়সা দেবেন তখন।'

অবিকল দুপুরের সেই প্যান কার্ডের এজেন্টের মত হাসি। "কোই ফিকর না করো সাব, হম তো ডেলি এহি করতে রহতে হ্যায়।' অতএব আসল প্রশ্নটা তোলে মৈনাক, "কিতনা লোগে?'

মুচকি হেসে দুটো আঙুল তোলে দালাল। "দুশো?' মৈনাকের প্রায় হাতে চাঁদ পাবার মত অবস্থা। ঠোঁটের আড়াল থেকে আবার প্রকাশ পায় ছ্যাতলা পড়া একসারি হলদেটে দাঁত, "কেয়া বাত করতে হো সাব, দো-শো মে কেয়া হোত্তা আজকল? দো হাজার লাগেগা, জগাহ্‌ রাখনে কে লিয়ে।'

অন্য সময় হলে একটা খিস্তি মেরে চলে আসত মৈনাক, কিন্তু এখন দায় তার। দালালও সেটা জানে বিলক্ষণ। স্থির চোখে সে মেপে যাচ্ছে মৈনাকের প্রতিটা বডি ল্যাঙ?গুয়েজ। অতএব, মনের তুমুল বিরক্তি চেপে রেখে সে স্থির চোখে তাকায় দালালের দিকে, "জ্যাদা মাঙ্গ রহে হো তুম। সহি বতাও। ম্যায় পাঞ্চশ' দে পাউঙ্গা।'

"ফির তো সাব আপ কিসি আওর কো ঢুন্ড লিজিয়ে। পাঞ্চশ'মে রাতভর কওন রুকেগা।'

দশ মিনিট লাগল ব্যাপারটাকে এক হাজারে নামিয়ে আনতে। সামনে দাঁড়িয়ে প্রতিটা বার্গেনিং শুনে গেল শ্রাবণী। ঘেন্নায় রাগে তার সারা গা থরথর করে কাঁপছিল, অন্যায় কাজে পয়সা দেওয়া সে একেবারে সহ্য করতে পারে না, আজ তারই বাবার অসুস্থতার সুযোগ নিয়ে এই নোংরা লোকটা ... মৈনাককে তার বাবার জন্য কত নিচে আজ নামতে হচ্ছে। ফিরে চলে আসারও কোনো উপায় নেই, তাকে যেতে হবেই কলকাতা। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব। অন্যদিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে রেখে নিজেকে কন?ট্রোল করার চেষ্টা করে যেতে লাগল শ্রাবণী।

"মেরা নাম জগজীবন হ্যায় সার। ম্যায় এঁহি পে মিলুঙ্গা কল্‌ আপ সে। সুবাহ্‌ ছে বাজে আ জানা। সাড়ে ছটা পর্যন্ত দেখব, আপনারা না-এলে আমি অন্য লোককে জায়গা দিয়ে দেব। আপনি এলে আপনি জায়গা পাবেন, আমাকে পয়সা দেবেন, আমি জায়গা আপনাকে ছেড়ে দেব। কোই দিক্কৎ না হোগি।'

ক্লান্ত বিধ্বস্ত অবস্থায় ফেরার রাস্তা ধরল মৈনাক আর শ্রাবণী। গোছগাছ যথাসম্ভব করে রাখতে হবে, কাল সকাল পাঁচটা সাড়ে পাঁচটার মধ্যে চলে আসতে হবে।

ফেরার রাস্তায় ভিড়টা পেল তারা। আসার সময়ে তেমন জ্যাম ছিল না। পুরনো দিল্লির এই অঞ্চলে যেমন নরমাল জ্যাম থাকে, তেমনই। কিন্তু এখন ব্যাপারটা কেমন যেন আলাদা লাগছে। সবাই যেন কীসের এক ইনফর্মেশন পেয়ে একসাথে ছুটে চলেছে লালকেল্লার দিকে। এটা ঠিক নর্মাল ভিড় নয়। কী হয়েছে?

আরেকটু এগোতে বোঝা গেল ভিড়ের গতিপথ। লালকেল্লা নয়, ভিড়টা চলেছে রামলীলা ময়দানের দিকে। সিগন্যালে দাঁড়িয়ে পাশে অটোর ভেতরে চলা কথোপকথন থেকে শুধু এইটুকুই বুঝল মৈনাক, রামদেবের সঙ্গে নাকি কপিল সিব্বালের কী নিয়ে ধুন্ধুমার ঝগড়া হয়ে গেছে। তাতে করে রামদেব আমরণ অনশনের হুমকি দিয়ে দিয়েছেন। এখন দিল্লি শহরে তো রামদেবের ভক্তের অভাব নেই। খবর পেয়ে কাতারে কাতারে লোক ছুটেছে বাবাজীকে দেখতে।

শালা, ধম্মের ষাঁড়! ওষুধ বেচা ব্যবসায়ী, এসেছে ধম্মের জিগির তুলে পলিটিশিয়ানদের সাথে টক্কর মারতে। ... অ্যাক্সিলেটরে চাপ দেয় মৈনাক। ভিড়টা ছাড়িয়ে একটু ফাঁকা রাস্তায় এগোতে টের পায়, তার ঠিক পাশের সিটে বসে একটানা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে চলেছে শ্রাবণী।

গিয়ার থেকে হাত সরিয়ে শ্রাবণীর কোলের ওপর হাত রাখে মৈনাক, কিছুক্ষণের জন্য।



।।৬।।

দিল্লি স্টেশনে নেমে পুরো ব্যোমকে গেল মানুভাই। একসাথে এত লোক, এত দৌড়োদৌড়ি সে কখনও আগে দেখে নি। গিরধরভাই চেপে ধরে রেখেছে সুরিতার হাত, মেয়েটাও এত বড় রেলস্টেশন আর এত এত লোক দেখে কেমন সিঁটিয়ে গেছে।

একটা অটো ধরা গেল, রামলীলা ময়দান কতদূরে গিরধরভাই বা মানুভাই কেউই জানে না, অটোওলা বলল, সে চেনে রামলীলা ময়দান। সকাল থেকে সে দুবার প্যাসেঞ্জার নিয়ে গেছে ওদিকে। তিনশো রুপিয়া লাগবে।

মানুভাইরা সঙ্গে বিশেষ কিছু সামান আনে নি, মাত্রই দুটো ছোটো ছোটো সুটকেস। অনেক দরাদরি করেও আড়াইশোর নিচে নামানো গেল না। পুরানি দিল্লি ইস্টিশন থেকে নাকি রামলীলা ময়দান অনেক দূর। মানুভাই অত ভালো হিন্দিও বলতে পারে না, বেশি কথা বলতে গেলে গুজরাতিই বেরিয়ে যায় মুখ থেকে। অগত্যা আড়াইশো টাকাতেই রফা হল।

রামলীলা ময়দানে পৌঁছতে সময় লাগল বিশ মিনিট মত। দূর থেকেই বোঝা যাচ্ছিল রামদেবজী এখানেই আছেন। বড় বড় হোর্ডিং লাগানো চারদিকে। পুরানি দিল্লি ইস্টিশনে একটা গুজরাতি আখবর কিনতে পেরেছিল মানুভাই। সেখানে রামদেবজীর সঙ্গে কপিল সিব্বাল পরনব মুখুর্জি এইসব মিনিস্টারদের মিটিংএর খবর ছিল। মিটিং-এ নাকি কিছু ফয়সালা হয় নি। রামদেবজী তাই আজ থেকেই অনশনে বসছেন।

ময়দানে পৌঁছে আরো চমকে গেল ওরা। এ তো জনসমুদ্র! এত লোক এসেছে রামদেবজীর ডাকে সাড়া দিয়ে? বাবাজী কে ইতনে সারে ভক্‌ত্‌? কিছু না হোক, হাজার চল্লিশের মত লোক তো হবেই। দুহাতে সুটকেস, আর মেয়েকে গিরধরভাইয়ের জিম্মায় ধরিয়ে গুটিগুটি ভিড়ের মধ্যে ঢুকে পড়ল মানুভাই। না, জনতা তেমন অশান্ত নয়। সবাই শান্ত ভব্যভাবে বসে আছে। শামিয়ানার ভেতরটা বেশ ঠাণ্ডা। চারদিকে পঙ্খা চলছে। দূরে অনশন মঞ্চ, সেখানে রামদেবজী বসে আছেন, সঙ্গে আরো অনেক বাবাজী, দু একজন মৌলভী সাহেবও রয়েছেন, আর বোধ হয় দু একজন শিখ সর্দারজীও রয়েছেন। বাহ্‌, সর্বধর্ম কা মিলন। বাবাজীই পারেন সবাইকে একসাথে নিয়ে বসতে। এ তো সর্বধর্মসমন্বয়।

এঁর কথা সরকার শুনছে না? সরকারের এত হিম্মৎ? মানুভাই মুগ্ধ হয়ে দেখে, রামদেবজীকে ঘিরে রয়েছে এক জ্যোতির্বলয়। রামদেবজীর কথা তার কানে ঢোকে না।

কিন্তু কানে ঢোকে অন্য কিছু। খুব কাছেই কে বা কারা যেন কথা বলছে গুজরাতিতে। সুরিতার কানেও গেছে, গিরধরভাইয়ের কানেও ঢুকেছে। তিনজনেই একসাথে ঘাড় ঘোরায়। অদূরে এক বড়সড় ফ্যামিলি, প্রায় ন-দশজন। একটু ইতস্তত করে গলা বাড়াল মানুভাই।

আলাপ পরিচিতি হয়ে যেতে সময় লাগল না বিশেষ। একটা নয়, দুটো ফ্যামিলি, তারাও এসেছে ভারুচ থেকে। খুব ভালো লোক, কয়েক মিনিটের মধ্যেই সুরিতাকে তারা আপন করে নিল নিজেদের দলে, বড় টিফিনকৌটো খুলে পুরি সবজি ভাগবাঁটোয়ারা হল, ভাগ পেল সুরিতা, মানুভাই, গিরধরভাই। মানুভাই একটু কিন্তু কিন্তু করছিল, সামনেই রামদেবজী অন্‌শন করছেন, এই জায়গায় বসে পুরি সব্‌জি খাওয়া ...কিন্তু ধারেকাছে অনেক লোককেই দেখা গেল খাচ্ছে দাচ্ছে। শাহ্‌ভাইও বিশেষ কোনো পাত্তা দিলেন না মানুভাইকে, আরে ভাই, রামদেবজীকে দেখভাল করার জন্য অনেক লোক রয়েছে, রামদেবজী অনশন করলেও তাঁকে দেখার জন্য দশজন ডক্টর রয়েছেন, কিছু হলে স্যালাইন চড়িয়ে দেবেন, নিম্বুপানি পিলাবেন। আপনি মশাই এসেছেন দূর ভারুচ থেকে, মেয়ে নিয়ে এসেছেন এই জুন মাসের গরমে, আপনি এখন থেকে অনশন করতে শুরু করলে আপনাকে কে দেখবে, আর আপনার মেয়েকেই বা কে দেখবে? এখন খেয়ে পিয়ে নিন, দিল্লি ঘুরে নিন, বাবাজীর অনশন তো এখন চলবে অনেক দিন, সময় মতো আপনিও বসে যাবেন, কী আছে? কে দেখছে এত বলুন তো?

তা ঠিক। কে দেখছে? তবু, বাবাজীর সামনে বসে ...

খেতে খেতে মনটা শান্ত হল। শাহ্‌ভাইদের পরিবারের দু একজনের দিল্লি আগে ঘুরে যাওয়া আছে, তাদের থেকে শুলুক তালুক জেনে নিল মানুভাই, কাছাকাছির মধ্যে লাল কিলা দেখে আসা যাবে, আর মেট্রো রেলে চড়লে উধার কুতব মিনার, ইধার অক্‌ষরধাম স্বামীনারায়ণ মন্দির সবকিছু দেখে আসা যাবে। দিল্লির অক্‌ষরধাম নাকি গুজরাতের মন্দিরটার থেকেও ভালো বানিয়েছে।

সুটকেসসহ সুরিতা আর গিরধরভাইকে শাহ্‌দের জিম্মায় রেখে বেরলো মানুভাই। ফেরার ট্রেনের টিকটের ব্যবস্থাও করতে হবে। অটোওলা ওদেরকে বুঢ়বক বানিয়েছে, পুরানি দিল্লি ইস্টিশন রামলীলা ময়দান থেকে মোটেই দূরে নয়, হেঁটেই মেরে দেওয়া যাবে। বার বার অটো ভাড়া করার মত পয়সা মানুভাই নিয়েও আসে নি।

তখন সন্ধ্যে হয়ে এসেছে, স্টেশনে যখন পৌঁছলো মানুভাই। থিকথিক করছে ভিড়। প্রতি মুহূর্তে হাজারে হাজারে লোক নামছে, ভিড় জমাচ্ছে আশেপাশে, বেরিয়ে যাচ্ছে রাস্তায়। একটা বড় দল বেরলো, হিমাচল থেকে এসেছে, সবার মাথায় গেরুয়া পট্টি বাঁধা, বড় একটা ব্যানারে হিন্দিতে কী সব লেখা, তারা দল বেঁধে, "জয় শিরীরাম,' "বাবা রামদেবজী কি জয়', "ভ্রষ্টাচার মুর্দাবাদ' ইত্যাদি নাড়া লাগাতে লাগাতে বেরিয়ে গেল চাঁদনী চকের দিকে।

রিজার্ভেশন কাউন্টারের দিকে প্রচণ্ড ভিড় ঠেলে এগোতে লাগল মানুভাই।





।।৭।।

ভোর চারটেয় উঠে পড়েছিল মৈনাক আর শ্রাবণী। কাল তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়তে হয়েছিল, যদিও ঘুম আসতে চাইছিল না সহজে। ফুলদিকে ফোন করেছিল শ্রাবণী, বাবার অবস্থা এখনো একই রকম, আইসিইউতে রাখা রয়েছে, তবে ডাক্তার বলেছেন খুব বেশি বিপদের কিছু নেই, এবারের ধাক্কাটাও উনি সামলে উঠতে পারবেন, মোটামুটি রেসপন্ড করছেন। ... কিন্তু তাতেও মন মানে নি শ্রাবণীর। বাক্স গুছোতে গুছোতে সমানে চোখ মুছে গেছে মৈনাককে লুকিয়ে।

মৈনাককে টিভি খুলে রাখতে হয়েছিল, নিজের মনের অস্থিরতা লুকিয়ে রাখার জন্য। মাঝে মাঝে সুটকেস গোছানোতেও হাত লাগিয়েছে। তারই ফাঁকে ফাঁকে খবরের চ্যানেলের দিকে চোখ রেখে ছিল। কপিল সিব্বাল আর রামদেবে বিশাল টক্কর লেগেছে। রামদেবের কে এক চ্যালা নাকি সাদা কাগজে হাতে লিখে দিয়েছিল আজ বিকেল চারটের মধ্যে অনশন তুলে নেওয়া হবে। নিচে নিজের নামও সই করে দিয়েছিল। কপিল সিব্বালও কম ধুরন্ধর লোক নয়, ঠিক বিকেল চারটে পর্যন্ত মুখ বন্ধ করে ছিল, তার পরেও যখন রামদেব অনশন বন্ধ করার নাম করে নি, কপিলবাবু বার দুয়েক রামদেবকে ফোনে ধরার চেষ্টা করেন। ফোনে রামদেবকে না-পাওয়া যাওয়ায়, কপিলবাবু যত্ন করে সেই কাগজটির দু-আড়াইশো কপি জেরক্স করে সাংবাদিক সম্মেলন ডেকে বেঁটে দিয়েছেন। চ্যানেলে চ্যানেলে এখন সেই চিঠির কপি আর তাই নিয়ে উত্তপ্ত তরজা, তর্কবিতর্ক। রামদেব এখন বেকায়দায় পড়ে উলটো সুর গাইতে শুরু করেছে, সরকার বিশ্বাসঘাত করেছে, আমি অনশন থামাব না, ভ্রষ্টাচারবিরোধী বিল পাস না-হওয়া পর্যন্ত আমার আন্দোলন থামবে না, এই সব গরম গরম বক্তৃতা দিতে শুরু করেছেন রামদেব, স্টেজে বসে।

শালা বুজরুক! ... দরজায় তালা লাগাতে লাগাতে কাল রাতের টিভি ক্লিপিংগুলো আরেকবার চোখের সামনে ভেসে উঠল মৈনাকের।

ভোরবেলার দিল্লি এখনো শান্ত। দুধওয়ালা আর কাগজওয়ালা ছাড়া আর কেউ জাগে নি তেমন। মাঝে মাঝে হুশ হুশ করে বেরিয়ে যাচ্ছে কিছু কল সেন্টারের গাড়ি, কিছু পুলিস ভ্যান। কুড়ি মিনিটের মধ্যে দিল্লি স্টেশনে হাজির হয়ে গেল তারা। পুরনো দিল্লি কিন্তু এই ভোর পৌনে ছটাতেই জেগে উঠেছে, হয় তো শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এখানকার মানুষ এইভাবেই ভোর হতে দেখছে। চায়ের দোকান, কুলি, ট্যাক্সি, পুলিস আর অসংখ্য মানুষের ভিড়। রিজার্ভেশন কাউন্টারের চাতালে তেমন কোনো ভিড় নেই, কিছু রাতজাগা লোকজন লাইন লাগিয়ে শুয়ে আছে চাদর মুড়ি দিয়ে, বন্ধ কাউন্টারের সামনে। এক প্রান্তে তিনটে দেহাতি লোক লুঙ্গি গুটিয়ে উবু হয়ে বসে চা খাচ্ছে, আর মাঝে মাঝেই পাশে থুতু ফেলে যাচ্ছে।

চারদিকে চোখ লাগিয়েও মৈনাক কালকের সেই দালালটাকে স্পট করতে পারল না। কী যেন নাম বলেছিল? জীবনরাম? শ্রাবণীকে জিজ্ঞেস করল মৈনাক। শ্রাবণী একটুক্ষণ চিন্তা করে মনে করে ফেলল, জগ্‌জীবন নাম বলেছিল বোধ হয়। ... তো সে নাম যাইই হোক, সে কোথায়? ...

লেডিজ নাম লেখা একটা কাউন্টারের সামনে চোদ্দজন লোক ঘুমোচ্ছে। তাদের পেছনে শ্রাবণীকে নিয়ে দাঁড়াল মৈনাক। আর ঠিক তখনই পেছন থেকে ডাক এল, আ গয়ে হো সাব? মৈনাক ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল, একটা পুলিস কনস্টেবল। তার দিকেই তাকিয়ে হাসছে। দাঁতের লাল ছোপটা চেনা। এটাই কি কালকের সেই দালালটা? জগজীবন? মৈনাক এগিয়ে গেল।

হ্যঁ¡, জগজীবনই তো! কাঁধের পেতলের পাট্টায় ইংরেজিতে লেখা – আর পি এফ। মালটা রেল পুলিসের কনস্টেবল? এখানে ঘুষ নিয়ে রিজার্ভেশনের দালালি করছে? মাই গুডনেস! জগজীবন ততক্ষণে লালচে দাঁত বের করে শ্রাবণীকে নতুন করে পর্যবেক্ষণ করা শুরু করেছে, মেরা সার রাত কো এঁহিপে ডিউটি লাগতি হ্যায়, আপ চিন্তা না করো সাব, অ্যায় সালে, উঠ্‌, উঠ্‌ য়ঁহা সে, ইয়ে লিডিজ হ্যায়, বলে হাতের খেঁটো লাঠি দিয়ে পর্যায়ক্রমে খোঁচা লাগিয়ে গেল সামনের ঘুমিয়ে থাকা চোদ্দজনকে, ম্যাডাম লাইন রাখ কে গয়ি থি, তুম সবলোগ উসকে পিছে। চলো পিছে হো জাও ...

মৈনাক মুগ্ধ হয়ে দেখল, ঘুমচোখে উঠেই সামনে পুলিসের পোষাক আর পুলিসের লাঠি দেখে একটাও প্রতিবাদ না করে লোকগুলো সরে গেল পেছনের দিকে। শ্রাবণীকে খুব খাতির করে "আইয়ে ম্যাম আইয়ে' করে একেবারে লাইনের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়ে বলল, অব বাস, খিড়কি খোলতে হি পেহলি টিকট আপকো মিল জায়েগি।

মৈনাককে পাশে নিয়ে বন্ধ জানলার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো শ্রাবণী। শ্রাবণীর দিক থেকে চোখ না-সরিয়ে নিজের ডানহাতটা মৈনাকের দিকে বাড়িয়ে ধরল রেলপুলিসের কনস্টেবল জগজীবন, অব সাব মেরা হিসাব কিতাব কর দিজিয়ে।

মৈনাক চারদিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিল। এক সরকারি কর্মচারি, সারারাত তাদের জন্য জায়গা রাখার বদলে ঘুষ চাইছে, খুলে আম। সবার সামনে। সো-কল্‌ড ভ্রষ্টাচারের একটা ছোট্ট উদাহরণ। এখান থেকে জাস্ট ঢিল ছোঁড়া দূরত্বে এক বাবাজী ভ্রষ্টাচারের বিরুদ্ধে নাড়া লাগিয়ে অনশনের নাটক করছে। কাল অলরেডি কপিল সিব্বাল ওর প্যান্টুল খুলে নিয়েছে, কিন্তু তাতে করে প্রতিবাদের কারণটা ছোট হয়ে যায় না। আর সেই অনশন টাইপের নাটুকে প্রতিবাদের ন্যাকামিতে যে কারুর কিসুই যায় আসে না, তার জ্বলন্ত প্রমাণ এই খচ্চরটা। কাল ওকে একবারও পুলিস বলে চিনতে পারে নি, আর আজ একেবারে ধরাচূড়ো পরে, নিজের অফিশিয়াল ইউনিফর্মে ডিউটির মধ্যে দাঁড়িয়ে ঘুষ খাচ্ছে। ... অবশ্য, পুলিস আর কবে ঘুষ নেবার সময়ে ইউনিফর্মের পরোয়া করেছে? শালা পুলিসের ইউনিফর্ম তৈরিই তো হয় লোককে ভয় দেখিয়ে ঘুষ নেবার জন্য। শুয়োরের বাচ্চাদের দলে এটা আরেকটা শুয়োরের বাচ্চা। এখন আর এ নিয়ে মাথা ঘামিয়ে কী হবে, টিকিট পাওয়া দরকার, তার জন্য যা করতে হয়, হবে।

পার্স থেকে গুণে গুণে দুটো পাঁচশো টাকার নোট বের করে দিল মৈনাক। টাকাদুটো হাওয়ায় মেলে ধরে টাকার আসলত্ব সম্বন্ধে নিশ্চিন্ত হয়ে আবার লালচে দাঁত বের করে লাঠিটাকে বগলে গুঁজে নিল জগজীবন, আচ্ছা জী, তো হম্‌ চলতে হ্যায় ম্যাম। ফিকর না করো, টিকট আপকো মিল জায়েগি। অব ম্যায় চলতা হুঁ, রামলীলা ময়দান জানা হ্যায়।

বিদ্রূপে ঠোঁট বেঁকে গেল মৈনাকের, রামলীলা ময়দান? কিঁউ ভাই? বঁহা জাকে অন্‌শন মে বৈঠনা হ্যায়? ভ্রষ্টাচার মিটানা হ্যায় তুমকো?

লোকটা আবার হাসল, কেয়া বাত কর রহে হো সাব, ও সব নওটঙ্কি তো কব কা খতম হো গয়া। কল্‌ দের রাত কো পুলিস আয়ি থি পুরা ফোর্স লেকে। সব কো ভাগা দিয়া, রামদেবজী কো ভি সালোয়ার কামিজ পেহনাকে লে গয়া নাচানে কে লিয়ে।

শ্রাবণীর কানেও গেছে কথাটা। ঘেন্নায় লোকটার মুখের দিকে তাকাচ্ছিল না এতক্ষণ সে, কিন্তু কথাটার ধাক্কায় সবকিছু ভুলে সে পেছন ফিরে তাকাল। মানসিক অবস্থা এসব আলোচনার অনুকূল নয় বলে সে এতক্ষণ মুখ খোলে নি, নইলে রামদেবের এই আন্দোলনের পেছনে তার মন থেকে সম্পূর্ণ সমর্থন ছিল। অন্যায়ের বিরুদ্ধে যে কোনো লড়াইয়ের সে সমর্থন করে।

শ্রাবণীকে লাইনে দাঁড় করিয়ে রেখে বাইরে থেকে একটা খবরের কাগজ নিয়ে এল মৈনাক। খুব বড় করে লেখা নেই, ছোট করে বক্সে লেখা আছে খবরটা। গভীর রাতে নাকি সত্যিই দিল্লি পুলিসের বিশাল দল এসে তছনছ করে দিয়েছে রামলীলা ময়দান। রামদেবকে তুলে নিয়ে গেছে। অনেকে আহত, হসপিটালাইজড। ...সম্ভবত রাত একটা দেড়টার পরের ঘটনা, ততক্ষণে কাগজ ছাপা শুরু হয়ে গেছে তাই বড় করে খবর দেওয়া যায় নি। বাড়ি গেলে টিভিতে দেখা যাবে। কাগজ থেকে চোখ সরিয়ে দেখতে পেল মৈনাক, দূরে সেই দালাল কাম পুলিস কনস্টেবল জগজীবন বাইরের রাস্তায় লোকজনের ভিড়ে মিশে যাচ্ছে।

বাঁচা গেছে। রামদেব মালটার ভড়ং আর সহ্য হচ্ছিল না। ঠাণ্ডাঘরে সরকারের সঙ্গে চুকলিবাজি করে এখানে বসে অনশনের ভড়ং করছিল। শালা পাবলিক মাইরি কী করে যে এইসব মালগুলোকে গুরু বলে মানে আর ল্যা-ল্যা করে ছুটে আসে, কে জানে! হঠাৎ করেই মৈনাকের চোখের সামনে ভেসে ওঠে একদিন আগে দেখা কুকুরছানাটার মরে যাবার দৃশ্য। গলার ওপর দিয়ে চলে যাচ্ছে ভারি রিকশার চাকা, ছোট্ট মুখ দিয়ে গলগল করে বেরিয়ে আসছে রক্ত ... রক্ত ...

পেটে কেমন মোচড় দিয়ে উঠল মৈনাকের। খালি পেট বলে বোধ হয়, সকালে কিছু খেয়ে আসা হয় নি। কাউন্টার খুলতে এখনো এক ঘণ্টা।



।।৮।।

টিকিট পাওয়া যায় নি, বোধ হয় জনরল ডিব্বাতে বসে ফেরত যেতে হবে। পুরানি দিল্লি স্টেশনে কেউ বলে দিয়েছিল মানুভাইকে, নতুন দিল্লি স্টেশন থেকে একটা ট্রেন যায় আহমেদাবাদের দিকে, তাতে গিয়ে চাপলে আরামসে বসার জায়গা পাওয়া যাবে। বেশি সময় তাই আর নষ্ট করে নি মানুভাই, ময়দানে ফিরে এসেই সুরিতাকে নিয়ে বেরিয়ে পড়েছিল। লালকিলা দেখে এসেছে। জামা মসজিদটাও বাইরে থেকে দেখে এসেছে। অনশন সে করছে না। বাচ্চা মেয়েটা অনশনের ধাক্কা সামলাতে পারবে না। শাহ্‌ভাইদের কথামতো সে ঠিক খুঁজে পেয়ে গেছিল চাঁদনি চকের ভেতরে পরান্ঠেওয়ালি গলি। বিকেল বিকেল সবাই গিয়ে সেখান থেকে খেয়ে এসেছে। বঢ়িয়া পরাঠা বানায় গলির দুকানদারেরা।

সন্ধ্যেবেলা ফিরে এসে দেখে, মঞ্চের ওপর তো চাঁদের হাট বসে গেছে! রামদেবজী বাণী দিচ্ছেন, পাশে বসে আছেন সাধ্বী ঋতম্ভরাজী। ওদিকে আরও কিছু সাধুসন্ত নাকি এসেছেন হরদ্বার থেকে, তাঁরাও বসে আছেন স্টেজ আলো করে, দুচারজন মৌলভীকেও দেখা যাচ্ছে ওঁদের মাঝে। ... কিন্তু রামদেবজী তো ধর্মের বাণী দিচ্ছেন না! তিনি তো অন্য কিছু বলছেন। রাজনীতির কথা বলছেন।

আশেপাশে দু একজনকে জিজ্ঞেস করে ঘটনার একটা ভাসা ভাসা বিবরণ পেল মানুভাই। সংসদ ভবনে নাকি কপিল সিব্বালজী গালি দিয়েছেন রামদেবজীর নামে। একটা সাদা কাগজে উল্টোপাল্টা কথা লেখা ছিল, রামদেবজী নাকি আজ বিকেল সাড়ে চারটের সময়ে অনশন ভেঙে দেবার কথা বলবেন, আর সরকার নাকি তাঁর কিছু দাবিদাওয়া মেনে নেবে, এসব নাকি আগে থেকেই ঠিক করে রাখা ছিল। সাড়ে চারটের পরেও রামদেবজী অনশন না ভাঙায় সিব্বলসাব নাকি পত্রকারদের ডেকে সেই কাগজের ফোটোকপি করে সব্বাইকে বেঁটে দিয়েছেন, আর বলেছেন, ওই কথাগুলো লিখে নাকি সই করে দিয়েছেন রামদেবজীর সাথী বালকিষণজী। রাজনীতির লোকজন সব্বাই এখন মজা ওড়াচ্ছে রামদেবজীর। জরুর এটা রামদেবজীর অপমান, রামদেবজী সেই কথাই বলছেন এখন, সরকার নাকি আসল মুদ্দাগুলো থেকে আমজনতার নজর সরিয়ে নিতে চাইছে। অপমানের বদলা নিতে রামদেবজী এখন মুদ্দা হাসিল না হওয়া পর্যন্ত অনশন করবেন। তার জন্য যদি তিনি মরে যান, তাও করবেন। অনশন থেকে তিনি পিছু হঠবেন না।

বিশাল ছাউনির নিচে এখানে ওখানে উত্তেজিত লোকেদের জটলা। নেহাত চারদিকে বিশাল বিশাল ফ্যানের ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়েছে বলে গরমটা তেমন বোঝা যাচ্ছে না। সব্বাইকারই এক কথা, রামদেবজীর অপমান মেনে নেওয়া যায় না। আজ সারারাত ধরে ভজনকীর্তন হবে। কাল থেকে সবাই অনশনে বসবে। ভ্রষ্টাচারবিরোধী এই আন্দোলনে তারা সবাই থাকবে রামদেবজীর সাথে।

পেটপুরে খেয়ে আসার ফলে এখন আর খিদে নেই কারুরই। সুরিতা, মানুভাই, সবারই চোখ ঘুমে ঢুলে আসছে। চাদর বিছিয়ে আস্তে আস্তে কাত হয়ে পড়ল সুরিতা, দুপাশে বসে বসে ঢুলতে লাগল মানুভাই আর গিরধরভাই।



অনেক রাত তখন, প্রচণ্ড একটা হইহল্লার আওয়াজে ঘুম ভেমে গেল সবার। চোখ খোলা মাত্র ঘুম চটকে গেল মানুভাইয়ের। এ কী হচ্ছে? ...কিছু বুঝে ওঠার আগেই হুড়মুড় করে তিনচারটে লোক প্রায় ওদের ঘাড়ের ওপর এসে উলটে পড়ল। একজনের হাতটা বেকায়দায় লেগে গেছে গিরধরভাইয়ের সুটকেসে। সুরিতা কোনোরকমে সরে গিয়ে নিজেকে বাঁচাল, আর হাঁউমাউ করে কাঁদতে শুরু করে দিল। হাতে চোট পাওয়া লোকটাকে বাকি দুজন তুলে ফেলল মাটি থেকে, তারপরেই আবার হাঁকপাঁক করে দৌড়। তার মধ্যেই যেটুকু সময় পাওয়া গেল, মানুভাইয়ের কানে ঢুকল কয়েকটা শব্দ, "ভাগো, পুলিস আয়ি হ্যায়, সবকো পিট পিট কে ভাগা রহি হ্যায়।'

"পুলিস' শব্দটা ম্যাজিকের মত কাজ করল। নিমেষের মধ্যে উঠে পড়ল তিনজনে। কী ব্যাপার, কী বৃত্তান্ত, কিছুই জানার অবকাশ নেই এখন, লোক যে যেদিকে পারছে পালাচ্ছে, অজস্র পুলিস ঢুকছে ছাউনির বিভিন্ন প্রবেশপথ দিয়ে, সামনে যাকে পারছে তার পা, পিঠ লক্ষ্য করে লাঠি চালাচ্ছে। পাশে শাহ্‌ভাইরাও নেই, কখন পালিয়েছে কে জানে! কিন্তু পুলিস মারছে কেন?

চিন্তাভাবনা শুরু করার আগেই মানুভাইয়ের ঠিক সামনে এসে পড়ল একটা বোমার মত জিনিস, ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে। মাটিতে পড়ামাত্র গল্‌গল্‌ করে ধোঁয়া বেরোতে লাগল সেটা থেকে। বম্‌ নাকি? তা হলে আখরি সময় এসে গেছে! উগ্রবাদী হামলা হল কি? তাই কি পুলিস এসেছে? ...পালাতে হবে, কিন্তু কোনদিক দিয়ে? চারদিকেই তো পুলিস! যাকে সামনে পাচ্ছে তাকেই পিটছে। হাত দিয়ে, লাঠি দিয়ে।

বোমাটা ফাটল না, কিন্তু তার ধোঁয়াতে চোখ জ্বলে গেল মানুভাই, গিরধরভাই, আর সুরিতার। চোখে সব ধুন্ধলা ধুন্ধলা লাগছে। চোখ থেকে অনবরত জল পড়ছে। আঁসু গ্যাসের শেল। ভয়ের চোটে সুরিতা গলা চিরে তারস্বরে কাঁদছে। আর সময় নেই। তাড়াতাড়ি সুরিতাকে গিরধরভাইয়ের হাতে ধরিয়ে দিল মানুভাই, নিজে কোনোরকমে এক হাতে তুলে নিল সুটকেস, চাদর টাদর যা পড়ে রইল থাক, প্রাণে বাঁচলে পরে চাদর দেখা যাবে, অন্য হাতে শক্ত করে চেপে ধরল গিরধরভাইয়ের হাত। বিশাল জনতা পাগলের মত এদিক ওদিক ছুটছে, একবার হাত ছেড়ে গেলে আর খুঁজে পাওয়া যাবে না। ঠিক করে তাকাতে পারছে না কেউই, তবু কোনোরকমে আন্দাজ করে বুঝল জনতা একটা বিশেষ দিকেই পালাচ্ছে।

মানুভাই, গিরধরভাই, সুরিতা পরস্পরের হাত ধরে সেই জনতার ঢেউয়ের মধ্যে ঢুকে গেল। ততক্ষণে চোখ একটু সাফ হয়েছে গিরধরভাইয়ের। ছুটতে ছুটতে দেখতে পেল, কয়েকটা পুলিস মিলে লাথি মেরে, লাঠি দিয়ে পিটিয়ে ভেঙে তুবড়ে দিচ্ছে চেয়ারের পর চেয়ার। অন্যদিকে একটা পেডেস্টাল ফ্যান মাথার ওপর তুলে ভিড়ের দিকে তাক করে ছুঁড়ে মারার চেষ্টা করছে একটা পুলিসের লোক। আতঙ্কে একদিকে সরে আসতে গেল গিরধরভাই, আর তাতেই হঠাৎ করে ভিড়ের চাপে হাত ছেড়ে গেল সুরিতার। সাথে সাথে ভিড়ের মধ্যে হাত চালাল গিরধর, কিন্তু ততক্ষণে ভিড় আরও বেশি করে ছত্রভঙ্গ হয়ে যাচ্ছে, মুহূর্তের মধ্যে ভিড়ের ধাক্কায় গিরধরভাই ছিটকে পড়ে গেল অন্য এক দিকে।

মানুভাইয়েরও হাত ছেড়ে গেছে ভিড়ের ধাক্কায়। ভিড়ের ঠেলায় দুলতে দুলতে এগিয়ে যাচ্ছে মানুভাই, গিরধর আর সুরিতা বেটির নাম ধরে তারস্বরে ডাকতে ডাকতে, কিন্তু প্রচণ্ড কোলাহলে মানুভাই নিজের কথাই শুনতে পেল না। আতঙ্কে অবশ হয়ে গেল তার সারা শরীর। কোথায় চলে গেল ওরা দুজন? কীভাবে খুঁজে পাবে এই ভিড়ের মধ্যে ওদের? কেউই যে এখানে কিছুই চেনে না!

মরিয়া চেষ্টায় শরীরের সমস্ত শক্তি একসাথে জড়ো করে ভিড়ের থেকে বাইরের দিকে আসবার চেষ্টা করল মানুভাই। একবার মঞ্চের কাছে পৌঁছতে পারলে ... ওইখানে মাইক আছে, মাইকে বললে গিরধরভাই নিশ্চয়ই শুনতে পাবে। ... কিন্তু কোথায় মাইক? মাইক তো বাজছে না! বেশ খানিকক্ষণ হল থেমে গেছে। মঞ্চ ওইদিকটায়, অনেকটা দূর, কাউকে তো দেখাও যাচ্ছে না! রামদেবজী নেই, সাধুসন্তরাও প্রায় কেউ নেই, কিছু লোক আর বেশ কিছু লাঠি হাতে পুলিস মঞ্চের ওপর ছুটে ছুটে বেড়াচ্ছে। মঞ্চে একটাও মাইক রাখা নেই আর।

মঞ্চের দিকে তবুও এগোবার চেষ্টা করতে লাগল মানুভাই। গিরধরভাই নিশ্চয়ই পাকড়ে রেখেছে সুরিতাকে, সুরিতার নিশ্চয়ই কিছু হয় নি ... এক পা এগোতেই কোত্থেকে আবার উড়ে এসে পড়ল আরেকটা আঁসু গ্যাসের শেল। মানুভাই এইবার চিনে গেছে শেলটা, সঙ্গে সঙ্গে উল্টোদিকে সরে এল। সাথে সাথে জনতার আরেকটা ঢেউ এসে ভাসিয়ে নিয়ে গেল মানুভাইকে। সামনে যাকে পেল, তার কাঁধ খামচে ধরে সোজা হবার চেষ্টা করতে করতেই মানুভাই চোখের সামনে দেখতে পেল, একটা বুড়ি মহিলা ভিড়ের ধাক্কায় উলটে পড়ল, আর হাতটুকু তুলতে পারার আগে তাকে মাড়িয়ে চলে গেল জনা তিরিশেক লোক। সবাই প্রাণের ভয়ে ভাগছে।

সুরিতার কথা কয়েক মুহূর্তের জন্য মাথার ভেতর থেকে বেরিয়ে গেল মানুভাইয়ের। সর্বশক্তি দিয়ে সে ঝাঁপিয়ে পড়ল বুড়িটার ওপর। রক্তে ততক্ষণে মেখে গেছে বুড়ির সারা শরীর, বাঁ হাতের একটা দিক থেঁতলে গেছে, হাড়গোড়ও বিশেষ আস্ত নেই বলে মনে হচ্ছে। কোনওভাবে বুড়িকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিতে পারল মানুভাই, তুলে নিয়ে সরে আসার চেষ্টা করতে লাগল ভিড়ের থেকে। ভিড়ের চাপ ততক্ষণে একটু হাল্কা হয়েছে। মানুভাই অচেতন বৃদ্ধাকে নিয়ে মঞ্চের দিকে এগনোর চেষ্টা করতে লাগল। গিরধরকে বলা হয় নি, তবুও ... হারিয়ে গেলে পরে ওখানে চলে গেলে তাও খুঁজে পাওয়া যাবার উম্মীদ থাকে।

একটা ফাঁকা জায়গা দেখে সেখানে বৃদ্ধাকে শুইয়ে এদিক ওদিক তাকাতে লাগল মানুভাই, এইখানেই কোথায় ডক্টরদের একটা ক্যাম্প ছিল না? ওইদিকে কি? ভাবতে ভাবতেই তার পিঠে পড়ল একটা থাবড়া, "কেঁও বে? আভিতক খড়া হ্যায় য়ঁহাপে? জানে কা মন নহী কর রহা হ্যায়? দুঁ কেয়া এক ডন্ডা?'

পলকা চেহারার এক পুলিস কনস্টেবল। হাতে একটা মোটা লাঠি। মানুভাইয়ের গায়ে যা জোর আছে, তাতে লোকটার হাত থেকে লাঠি কেড়ে নিয়ে ওকে পেটানো খুব কঠিন কাজ নয়, কিন্তু মানুভাই সেসব কিছুই না করে খানিকক্ষণ ভাবলেশহীন মুখ করে তাকিয়ে থাকল পুলিসটার দিকে। তারপর খুব বিনয় করে বলল, ভাইসাব, ইয়ে বুড্‌ঢি গির গয়ি, চোট আয়ি হ্যায় ইসকো, ডক্টর কে পাস লে জানা হ্যায়, ইধর কোই ডক্টরলোগ বৈঠে হুয়ে থে, কঁহা গয়ে সব?

পুলিসটা, সম্ভবত, প্রতিপ্রশ্ন আশা করে নি। ভেবেছিল, এই আতঙ্কের ডামাডোলে লাঠি দেখালেই লোকটা ভেগে যাবে। একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বলল, ডক্টর সারে চলে গয়ে। কিসকে লিয়ে রহেগা য়ঁহা? বাহার লে জা, বাহার মিল জায়েগা ডক্টর।

বাহার? বাইরে কী করে চলে যাবে মানুভাই? তার মেয়ে যে হারিয়ে গেছে এইখানে! বুড়ির অবস্থা দেখে মেয়ের কথা কিছুক্ষণের জন্য ভুলে গেছিল মানুভাই, কিন্তু সুরিতা কোথায় গেল? গিরধরভাই? বিপন্ন চোখে একবার মঞ্চের দিকে তাকাল মানুভাই। মঞ্চ তখন পুরো ফাঁকা, গড়াগড়ি খাচ্ছে কয়েকটা মাইক্রোফোন আর জলের গ্লাস। রামদেবজীকে কোথাও দেখা যাচ্ছে না, সঙ্গের সাধুসন্ত্‌ আর মৌলবীসাহেবরাও সব কোথায় চলে গেছে। পুলিস কি ওদের সবাইকে মেরে ভাগিয়ে দিয়েছে? রামদেবজীকেও? রামদেবজীর ওপর পুলিস লাঠি চালিয়েছে? কী করে পারল? রামদেবজী কী করেছেন ওদের? সুরিতা কোথায়? সুরিতা কোথাআআয়?



পলকা চেহারার পুলিস অন্যদিকে চলে গেছে ততক্ষণে। অচেতন অবস্থায় বুড়ি পড়ে থাকে দুটো ভাঙা চেয়ারের মধ্যে, নেশাগ্রস্তের মত মানুভাই এগোতে থাকে মঞ্চের দিকে, তার চোখে পড়ে না পুলিসের ভিড় ওইদিকেই সবচেয়ে বেশি। সুরিতাকে যে খুঁজে বের করতেই হবে! এই এত বড় শহরের মধ্যে কী করে তার মেয়ে হারিয়ে যেতে পারে? সুরিতা ছাড়া যে তার আর কেউ নেই! পুলিসকে বলতেই হবে, বোঝাতেই হবে।

মঞ্চের ঠিক কাছেই বুক চাপড়ে বিলাপ করছিলেন আরও এক দম্পতি। ভাষা বোঝা যাচ্ছিল না, তবু শোকের ভাষা হয় তো একরকমেরই হয়। তাদেরও কেউ হারিয়েছে এই ভাগদৌড়ের ডামাডোলে। মানুভাই তাদের কাছে যায়, হিন্দিতে পুছ করে, কী হয়েছে? তার নিজের গলা দিয়েও তখন স্বর বেরোচ্ছে না। এক অজানা আতঙ্ক তাকে গ্রাস করছে ধীরে ধীরে। বিশাল ময়দানে যতদূর পর্যন্ত চোখ যাচ্ছে, কোথাও গিরধরভাই বা সুরিতাকে দেখা যাচ্ছে না। তা হলে কি ওরা সুরিতাকে বাইরে নিয়ে গেছে? বাইরে ... কোথায়? সুরিতা তো কিছুই জানে না। মানুভাই কি তা হলে বাইরে যাবে? ওই সব লোক যেখান দিয়ে বেরিয়েছে, সেখানে?

এক পুলিসের সামনে হঠাৎ পড়ে যায় মানুভাই। হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে সেই পুলিসটার পা জড়িয়ে ধরে সে, মারী পুত্রী গুমাবি ছে সার, মারী পুত্রী গুমাবী ছে। ক্রুপা মানে মদদা, কিরপা করকে মুঝে মদদ কিজিয়ে, মেরি বেটি গুম হো গয়ি।

পুলিস তখন বিশাল জনতাকে তাড়িয়ে বের করে সবে হাঁফ ছাড়ার সময় পেয়েছে। এর মধ্যে এইসব উটকো ঝামেলা সে সইবে কেন? সবলে পা ঝাড়া দিয়ে ছিটকে ফেলে দিল মানুভাইকে। আরেক পুলিস এসে হিন্দিতে দুর্বোধ্য কী একটা খিস্তি করে মানুভাইয়র পায়ের ডিম লক্ষ্য করে লাঠি চালালো। কোনোরকমে পা সরিয়ে সেই লাঠি বাঁচিয়েই লাফিয়ে উঠল মানুভাই, উঠেই লাঠি হাতে সেই পুলিসের কলারটা চেপে ধরল হিংস্রভাবে। সাথে সাথে রে-রে করে ছুটে এল আরও দশ-বারোটা পুলিস। চারদিক থেকে উপর্যুপরি শুরু হল চড় থাপ্পড় আর গালাগালির বন্যা।

অতজনের সঙ্গে লড়াই করবার ক্ষমতা মানুভাইয়ের নেই। আতঙ্কে আর পালানোর ভয়ে সে এমনিই দুর্বল হয়ে গেছিল, আস্তে আস্তে তার মুঠি থেকে আলগা হয়ে বেরিয়ে এল পুলিসের জামার কলার। "মারী পুত্রী গুমাবি ছে ... সুরিতা ...মারী বিটিয়া ...সোধি ... তেনে সোধি ... মানে মদদা ...' অজস্র মারধোরের মধ্যে এই কথাগুলো বলতে বলতে ঢলে পড়ল মানুভাই।

চোখের সামনে অন্ধকার নেমে এল।



।। ৯ ।।

ফুলদিকে খবর দেওয়া হয়ে গেছে। সামার স্পেশাল ট্রেন ছাড়বে দুপুর একটায়। নিউ দিল্লি থেকে। অটো বলে রাখা হয়ে গেছে। এগারোটার সময়ে বেরোতে হবে। আর মাত্র দেড় ঘণ্টা সময় আছে হাতে। টিকিট পেতে একটুও অসুবিধে হয় নি। কাল দুপুরের মধ্যে কলকাতা পৌঁছে যাবে ওরা।

চান করতে যাবার জন্য মৈনাককে তাড়া দিতে এল শ্রাবণী। মৈনাক তখনো টিভির পর্দায় আটকে রয়েছে। আর নিজের মনে বিড়বিড় করছে, এ কীভাবে মেরেছে? কী করল এটা পুলিস? না হয় ভড়ং করছিল ভক্তদের নিয়ে, তাই বলে ... এইভাবে?

টিভির চ্যানেলে চ্যানেলে তখন কাল রাতের ঘটনার রিক্যাপ আর পোস্টমর্টেম। আরও উদ্ধত, আরও দুর্বিনীত মন্ত্রীদের মুখ। এবং তাদের মুখের ভাষা। কপিল সিব্বাল। হাসিমুখে সাফাই দিচ্ছেন কাল রাতের পুলিশি অ্যাকশনের। টিভির পর্দায় বারবার ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখাচ্ছে মঞ্চ থেকে লাফ মেরে রামদেবের নেমে আসা, ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে যাবার চেষ্টা করা। অন্যদিকে দিল্লির সমস্ত নামীদামী লোকেদের বক্তব্য ভেসে আসছে একের পর এক। সকলেরই এক কথা, সত্তরের দশকের এমার্জেন্সির সময়ের পর পুলিসের এমন ভয়াবহ অ্যাকশন কখনো দেখা যায় নি।

ভাগ্যক্রমে কেউ মারা যায় নি। কিন্তু অসংখ্য আহত, অনেকে নিখোঁজ, বিশেষ করে অল্পবয়েসী বাচ্চা হারিয়ে গেছে প্রচুর, হারিয়ে গেছেন বৃদ্ধ মানুষজন। তাদের যারা নিয়ে এসেছিল এই সমাবেশে তারা এখনো হত্যে দিয়ে পড়ে আছে চাঁদনি চক পুলিস স্টেশনের সামনে। পুলিস একটিও মিসিং ডায়েরি নেয় নি, উলটে লাঠি উঁচিয়ে বারকয়েক ভাগিয়ে দিয়েছে এই স্বজনহারানো লোকগুলোকে। তার পরেও তারা আবার ফিরে এসেছে পুলিস থানার সামনে। মওকা পেয়ে জুটে গেছে দশটা নিউজ চ্যানেলের ওবি ভ্যান। হতভাগ্য মানুষগুলোর বেশিরভাগই অন্য রাজ্য থেকে আসা। অনেকেই ভাল করে হিন্দি বলতে পারে না।

কোনোরকমে খাওয়া দাওয়া সেরে লাগেজ নিয়ে বেরলো মৈনাক, শ্রাবণী। আগে থেকে বলে রাখা অটোরিক্সা নিচেই অপেক্ষা করছিল। তাড়াতাড়ি পৌঁছতে হবে। আজ দিল্লির হাওয়া গরম। কখন কোথায় অবরোধ শুরু হয়ে যায়, কে জানে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বেরিয়ে পড়তে হবে এই শহর থেকে। ওখানে তার বাবা আইসিইউতে।

নিউ দিল্লি যাবার রাস্তায় পড়ে না রামলীলা ময়দান। লালকেল্লার অন্য সাইড দিয়ে বেরিয়ে গেছে রাস্তা। তবু সেই রাস্তাও যেন আজ কেমন থমথমে। আলাদা করে কিছু বোঝা যাচ্ছে না, তবু কিছু একটা যে হয়ে গেছে, বোঝা যাচ্ছে চারদিকে তাকালেই। রাতারাতি বড়বড় কাটআউটগুলোকে খুলে সরিয়ে ফেলা হয়েছে। খুব জোর করে যেন স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করে রাখা হয়েছে চারদিকে। রাস্তায় পুলিসের সংখ্যা একটু বেশি। অটোওলা মুখ খোলে, "বড়ি শর্মনাক হাদসা কর দি কল্‌ পুলিস নে। না জানে কিতনে লোগ লাপতা হো গয়ে কল্‌।'

মৈনাক উত্তর দিল না কোনও। তার চোখ হাতঘড়ির দিকে। চল্লিশ মিনিট সময় আর। অটোওলা আবারও মুখ খোলে, "লেকিন রামদেব বাবা নে কেয়া সার্কাস দিখায়া কল্‌, সাল্‌বার কামিজ পেহনকে অওরতোঁ কে বিচ ছুপ গয়া থা ... বড়া আয়া থা আম লোগোঁকে মসীহা বননে কে লিয়ে আরতি উতার দি উসকি, পুলিস নে।' মৈনাকের ঠোঁট বেঁকে যায় বিদ্রূপাত্মক হাসিতে। সে মজা পায় শুনে। খবরটা টিভিতে দেখেই এসেছিল। পুলিসের হাতে যখন এলোপাথারি মার খাচ্ছে তারই নামের টানে আসা তার অসংখ্য ভক্তের দল, রামদেব বাবা নাকি তখন পুলিসের লাঠির হাত থেকে বাঁচবার জন্য মেয়েদের পোষাক পরে মেয়েদের ভিড়ের মাঝে মুখ লুকিয়ে বসে ছিল। পুলিস নাকি তাকে ওই সালোয়ার কামিজ পরা অবস্থাতেই তুলে নিয়ে গেছে। খোরাকের একশেষ। আরেকটু মজা পাবার জন্য অটোওলাকে খোঁচাতে ইচ্ছে হয় তার, "আপ বাবা রামদেব কি বাণীয়োঁ পে বিশ্বাস নেহী রাখতে? জো ভি হো, ইতনে সারে লোগ তো উনকা দর্শন পানে কে লিয়ে হি আয়ে থে।' অটোওলা গুটখার প্যাকেট ছিঁড়ে মুখে ঢালে, "কেয়া কহ্‌ রহে হো ভাইসাব। হমারে বিশ্বাস অবিশ্বাসোঁ পে কেয়া ফর্ক পড়তা হ্যায়? যো খুদ এক ভ্রষ্টাচারী হ্যায়, ও কওন হোতে হ্যায় ভ্রষ্টাচার কে খিলাফ নারা লাগানেবালা। পতা হ্যায় কেয়া কেয়া জমীন জায়দাদ হ্যায় রামদেব বাবা কে পাস? অগর উনকো সাধুসন্ত মাননা হ্যায়, তো ম্যায় ভি এক সাধুসন্ত হুঁ। কোই শক্‌?'

... সামনে সিগন্যালের জন্য গাড়ি দাঁড়িয়ে। ওদের অটো ফুটপাথ ঘেঁষে দাঁড়ায়। লম্বা সিগন্যাল। অলস চোখে মানুষজন দেখতে থাকে শ্রাবণী। ঠান্ডা জলের গাড়ি। প্রতি গিলাস পঞ্চাশ পয়সা। পাশে দাঁড়িয়ে একটা পুলিস কনস্টেবল খৈনি ডলছে। তার পাশেই হাঁটুর ওপর লুঙ্গি তুলে ডাবের পাহাড়ের সামনে উবু হয়ে বসে ডাব বেচছে এক বিশালাকায় লোক। দা-টাকে একদিকে সরিয়ে রেখে বিকট আওয়াজ করে লোকটা থুতু ফেলে, জমা করে রাখা ডাবের কাঁদির ঠিক পাশেই। ঘেন্নায় চোখ সরিয়ে নেয় শ্রাবণী। তখনই কানে আসে কথোপকথনের আওয়াজ। সমস্ত কোলাহল ছাপিয়ে।

"এ মোটা ভাই, শুনিয়ে না, হম গুজরাট সে আয়ে হ্যায়। কল ময়দান সে ইসকা বাপ খো গয়া। ভাগদোড়ি মে। আপ থোড়া মদদ করিয়ে না, মোটা ভাই।'

শ্রাবণী চোখ ফেরায়। একটা আধবুড়ো লোক, সঙ্গে একটা পনেরো ষোল বছর বয়েসের কিশোরী। বিধ্বস্ত চেহারা দুজনেরই। অনুনয় বিনয় করছে খৈনি ডলতে থাকা পুলিসকে। পুলিসটা, খৈনি ডলতেই ব্যস্ত, ফিরেও তাকালো না বুড়োমতো লোকটার দিকে। উদাসীনভাবে খৈনি ডলেই যেতে থাকল। আবার মিনমিন করে ডাকল বুড়ো লোকটা, "মোটা ভাই, ও ভাইসাব ...'

খৈনিটা মুখে পুরে, এতক্ষণে তাদের দিকে তাকানোর সময় পেল কনস্টেবল। ঠিক "তাদের' দিকে নয়, তাকালো বিশেষভাবে মেয়েটার দিকে। দৃষ্টিটা, বিলকুল কাল বিকেলের সেই দালাল জগজীবনের মত। সশব্দে থুতু ফেলল কনস্টেবল, তারপরে কিছু একটা জিজ্ঞেস করার জন্য হাঁ করল, কিন্তু প্রশ্নটা আর শুনতে পেল না শ্রাবণী, কারণ সিগন্যাল ততক্ষণে সবুজ হয়ে গেছে, আর অটো চলতে শুরু করে দিয়েছে।

শ্রাবণী গা এলিয়ে দেয় সিটে। আরেকটা থুতু ফেলার শব্দ কানে আসে তার। কফ সাফ করে নিয়ে অটোওলা মুখ খোলে। "এক অওর বেচারা। ভটক রহা হ্যায়।' অটোর গতি বাড়ে। সামনে ফাঁকা রাস্তা।

অজস্র যানবাহনের মধ্যে ধীরে ধীরে হারিয়ে গেল হলুদ সবুজ রঙের অটো।





জামা মসজিদের দিকের ফুটপাথে তখন আপনমনে বিড়বিড় করছে একটা পাগল, মারী বেটি ... মারী বেটি গুমাবি ছে ... মানে মদদা ...

পাগলটার সারা গায়ে মারের কালশিটে দাগ। পাশেই শালপাতার থালায় করে পরাঠা হালুয়া খাচ্ছে দুটো লোক, একটা ওবি ভ্যানের সামনে দাঁড়িয়ে। চারদিকে ব্যস্ত লোক হেঁটেচলেদৌড়ে বেড়াচ্ছে। কেউ ফিরেও দেখছে না পাগলের দিকে। এ রকম কত পাগল ঘুরে বেড়ায় শহরের রাস্তায়।



ওবি ভ্যানের ভেতর থেকে একটা হাত বেরিয়ে এল। শালপাতায় মুড়ে ছুঁড়ে দিল ভুক্তাবশিষ্ট পরোটা আর সবজি, পাগলের দিকে।


সমস্ত ঘটনা ও চরিত্র বাস্তব। কেবলমাত্র কিছু চরিত্রের নাম কাল্পনিক।

ছবি: শঙ্খ করভৌমিক