আপনার মতামত         



সীমান্ত শরণার্থী আর কবিতা (দ্বিতীয় পর্ব)

অদ্রীশ বিশ্বাস



১।
কাদের বাড়ি বর্ডারের কাছে? আমি বর্ডার দেখতে চাই শুনে ক্লাসে হাত উঠল জনা পাঁচেকের। মুখগুলো দেখে যখন খানিকটা শক্তপোক্ত কাউকে খুঁজছি, যাওয়ার জন্য নির্ভর করা যাবে ভেবে, তখন ক্লাসেই ভীড়ের মধ্যে থেকে কেউ একজন বলল, "স্যার, সাবিনার বাড়ি বর্ডারের একদম কাছে, যেতে হলে ওর সঙ্গেই যান।'
কে সাবিনা? এই হাত তোলাদের মধ্যে যাকে সবচেয়ে আগে বাদ দিয়েছি সেই রোগাপটকা ছোটোখাটো চেহারার প্রায়-অ্যানিমিক মেয়েটা বলল, "আমি স্যার।' কোথায় বাড়ি তোমাদের? "বিন্দোল স্যার।' বাড়ি থেকে বর্ডার কত দূর? "একদম কাছে স্যার, এই বাড়ি এই বর্ডার।' এমনভাবে বলল যেন এই খাওয়ার ঘর, এই শোওয়ার ঘর। দেখা যাক কী হয় ভেবে আমি লেগে গেলাম ওর সঙ্গে। ঠিক হল, সামনের বৃহষ্পতিবার ট্রেকার ধরে ওর সঙ্গে বিন্দোল।
ভীড়ে ঠাসা ট্রেকার। লোক উপচে পড়ছে। ছাদের উপরে বাচ্চা কোলে বাবা আর মা একটা বাজারের থলেতে গোটা সংসার পুরে ভিতরের সিটে ঝিমুচ্ছে। অপ্রাপ্তবয়স্ক যে হেলপার চিৎকার করছে "বিন্দোল বিন্দোল' বলে, তার গলায় লোকনাথের হার, চোখে সানগ্লাস। তাই দেদার মেয়ে দেখছে, এটা দেখছে, ওটা দেখছে, কেউ সেটা ধরতে পারছে না। আমি ওর কাছে এক আনপর টাউনের লোক, এইসব ঝারিবাজির কিছুই বুঝিনা ভেবে খানিকটা অসতর্ক। দেশগাঁয়ের লোকেদের প্রতি যতটা সতর্ক আমার প্রতি ততটা নয়। প্যাসেঞ্জারদের জায়গা করে দিতে সিটে বসা মেয়েদের এদিকে ওদিকে ভারি ইনোসেন্ট ভঙ্গিতে সেক্সি হাত ঢুকিয়ে দিচ্ছে আর গাড়ি হাঁকাচ্ছে হাইওয়ে ধরে। স্পিড প্রায় পঞ্চাশ-ষাট। ব্রেকের অবস্থা খারাপ।
বিন্দোল এমন একটা গ্রাম যেখানে বর্ডার গেছে বসতির সবচেয়ে কাছ দিয়ে। দুদেশের মধ্যে যাতায়াতের পাকা ব্যবস্থা না থাকলেও দিব্যি পারাপার চলে দিনেরাতে। বিশেষত লোকাল ব্যবসা বাণিজ্যের। ছোটোখাটো কৃষি ও গোচারণের কাজে আসে লোক, চলেও যায়। ফল আসে এদিক থেকে ওদিকে। ধূপকাঠি, আতর, লোকাল বেকারির প্রোডাক্ট যায় এদিক থেকে ওদিকে। তবে এদিকের লোক গিয়ে যত না ওদিকে ব্যবসা করে, তারচেয়ে ওদিকের লোক এসে এদিক থেকে এইসব প্রোডাক্ট কিনে নিয়ে যায়, বিক্রিবাটা করে। অর্থাৎ, ওরাই বিক্রি করতে আসে আবার ওদিকের ব্যবসায়ীরা বিক্রির জন্য কিনে নিয়ে যায়। বিয়েসাদি হয়, বরযাত্রী আসে, কন্যাযাত্রী যায়। এসবই হয় পাসপোর্ট ভিসার তোয়াক্কা না-করে। আইন যাকে বলে বেআইনী। পাসপোর্ট অফিস এখান থেকে অনেক দূরে - ভৌগোলিক ভাবে, মনস্তাত্বিকভাবেও।
মানুষ বর্ডার চায় না। সে চায় অবাধ যাতায়াত। বর্ডার তো ভৌগোলিক সীমানা, মন সেই সীমানা অতিক্রম করতে চায়। রাজনৈতিক বাধায় আটকে থাকে সেই বন্দোবস্ত, ফাইলের পর ফাইল চালাচালি হয়, চিঠিচাপাটি লেখা হয়। রিপোর্ট দেওয়া হয়, চুক্তি হয়, চুক্তি অ্যামেন্ডমেন্ট হয়, আইনের ধারা-উপধারায় ব্যাখ্যাত হয় সীমান্ত আর ততক্ষণে গোপনে সেই সীমান্ত দিয়েই ছুট লাগায় একটা কিশোর, সামনে একদল গরু, ছুট লাগায় একটা পরিবার, ছুট লাগায় একটা সংস্কৃতি।

এই পৃথিবীতে সবসময় কোথাও না-কোথাও
ভোর হচ্ছে, সেভাবেই কোথাও না-কোথাও
সীমান্ত পেরুচ্ছে কেউ, ভোরের আগে অথবা পরে ...

২।
যখন বিন্দোলে নেমে সীমান্তে দাঁড়ালাম তখন দুপুর গড়িয়েছে। গ্রাম, বসতি কম, তারপর ফাঁকা। কখনও বসতির কাছে ঘেঁষেই কাঁটাতারের ফেন্সিং। মূল রাস্তাটা ছেড়ে আবাদি জমি, জমির সর্বত্র যে চাষ হয় তা নয়। ঘাস। গাছপালাও ইতস্তত। তারই মধ্যে দিয়ে পায়ে চলার পথ গেছে বাংলাদেশে। বি এস এফ, বি ডি আরের ক্যাম্প দূরে। সশস্ত্র জওয়ান টহল দেয়। তাড়া করে আবার করেও না। সামাজিক, রাজনৈতিক পরিস্থিতির উপর নির্ভর করে। কোনো খবর থাকলে সতর্ক। বাড়তি অ্যালার্ট। তখন লোকজনও ভোঁ-ভা।
এখন কেন লোকজন নেই, দুপুরবেলা বলে? প্রশ্ন শুনে সাবিনা বলল, "কে বলল নেই, এই তো পাখিয়ালা আসছে।' কখনও কখনও এমন ঘটনা ঘটে যা এতটাই অর্থবহ ব্যঞ্জনাময় যে মনে হয় এসবই বানানো, কারো সাজিয়ে তৈরি করা। যেমন এখন, চোখ তুলতেই দেখি এক পাখিয়ালা বাঁকে করে খাঁচাভর্তি পাখি নিয়ে আসছে। সবই প্রায় টিয়া। একটা ময়না। সীমান্ত তো একধরনের বন্ধন মানুষের কাছে। পাখির সেই বন্ধন নেই - সে উড়ে বেড়ায়। এসব কাঁচা দার্শনিক ব্যঞ্জনার কাছে সাহিত্য রচনার জন্য আজ আর যাওয়ার দরকার নেই। কিন্তু জীবনে তো এখন সেটাই ঘটছে। বন্দী পাখিরা মানুষের কাঁধে চড়ে যাবতীয় আশংকা মনে নিয়ে সীমান্ত পার হচ্ছে। ধরা পড়লে লোকটার জেল হবে আর পাখিগুলোর? কোন দেশের পাখি! আইনের মতে লোকটা যে দেশের পাখিগুলোও নাকি সে দেশের। কিন্তু তার গ্যারান্টি কি? হতেও তো পারে এদেশের পাখি উড়ে গেছে ওদেশে, তারপর ধরা পড়েছে। কিংবা অন্য কোনো দেশের - বার্মা, মালয়, জাভার। তাহলে? পাখির হয়ে সওয়াল করার কেউ নেই যাতে জানা যাবে কোথায় ওদের দেশ। খুব বিজাতীয় বিশেষ কোনো প্রজাতির পাখি হলে না হয় আলাদা করা চলে কিন্তু টিয়া ময়না তো দুই বাংলারই পাখি। তাহলে কী হবে? সমস্যাটা থেকেই যাবে। পাখিয়ালা চলে গেল, যেমন যায়। পায়ের নিচে কখন যে বাংলাদেশ বদলে ইন্ডিয়া হয়ে গেল রোজ রোজ নজর রাখা যায় না। সাবিনা কি গেছে বাংলাদেশ? পায়ের নিচে বদলে যাওয়ার শিহরণ টের পেয়েছে? আমি জানি না।

চল, একবার, একসাথে দৌড়াই
ভেদ করে কাঁটাতার, বি এস এফ, বি ডি আর
যদি শেষে মরে যাই
বড় জোর ভুত হব, শান্তির দূত হব
রিং টোনে শোনা যাবে
রঙ দে বাসন্তী রঙ দে .....

৩।
নানা কথার মধ্যে দিয়ে সেই প্রশ্নটায় আসা গেল যেটার জন্য এতদূর আসা। পোড়া রোদের ভেতর দুহাত কোমরে দিয়ে রোগা মেয়েটা বলল, "এদিকে পুরো ফ্যামিলি নিয়ে চলে আসার ব্যাপার বিশেষ পাবেন না। তার কারণ, এখানে চারপাশে সব মুসলিম গ্রাম। ওপাড়েও তাই। যারা এদেশ থেকে আসে তারা সাধারণত হিন্দু। সেটা এইসব মুসলিম গ্রামের মধ্যে দিয়ে সুবিধাজনক হয় না বলে এদিকে ততটা হয় না। ওটা পাবেন বালুরঘাটের দিকে আবার জলপাইগুড়ি, কোচবিহারের দিকটায়।'
মুসলমান পরিবার কি একদমই আসে না? "আমার তো মনে পড়ে না স্যার, কেউ এসেছে বলে। আমি বিশ বছরেও শুনিনি। মানে রিফিউজি হয়ে। তবে কাজের জন্য অনেক মুসলিম ছেলেই এদেশে আসে, দিল্লি, বোম্বে যায়।'
আর জেহাদির জন্য? উগ্রপন্থী ট্রেনিং নিতে যাচ্ছে আসছে না কেউ? "সেটা তো বাইরে থেকে ধরা পড়বে না কে যাচ্ছে আসছে। কাগজ পড়েই যা জানা আমাদেরও। গ্রামে কারো সম্পর্কে তেমন কিছু শুনিনি। তবে এমন একদিন আসবে যখন এইসব গ্রামগুলো থেকেও ওপেনলি জেহাদি ঘোষণা শোনা যাবে।'
কেন বলছ এই কথা? এমন একটা কথা বলে ফেলে খানিকটা লজ্জায় পরে গেছে যেন তাই সামলানোর জন্য বলছে হিন্দু-মুসলমান ঐক্যের কথা, মেলামেশার কথা। "পড়াশোনা করতে যাওয়া ছাড়া হিন্দুদের সঙ্গে মেশার তো আর কোনো সুযোগ নেই। হিন্দুরা তো মাদ্রাসায় ভর্তি হয় না। যারা হিন্দুপ্রধান অঞ্চলে পড়তে গেল না সেইসব ছেলেমেয়েরা তো মুসলিম সমাজ ছাড়া আর কিছুই চিনল না। কীভাবে ঐক্য হবে?'
তাবলে জেহাদি হবে কেন? "ঐক্য না হলে জেহাদই তো হবে স্যার। হিন্দুরা কিন্তু মুসলিমদের সঙ্গে একটুও মেশে না। যদি না আমরা হিন্দুদের সঙ্গে মিশি।"
তাহলে মুসলমান দেশগুলোয় জেহাদি হচ্ছে কেন? "ওই দেশগুলোই তো ভেতরে ভেতরে নিয়ন্ত্রণ করছে সব জায়গার মুসলিমদের।'
তোমাদের গ্রামে তার প্রভাব কেমন? "আগে বাঙ্গালি মুসলিমদের মধ্যে আরবি পোষাক ব্যবহারের রীতি বিশেষ ছিল না। এখন নানা কারণে, অকারণে প্যান্ডেল বেঁধে বাইরে থেকে উর্দুভাষী মৌলবী এসে ধর্মকথা বলে যাচ্ছে। তাদের প্রভাব পড়ছে, গ্রামের জীবনযাত্রায়। ওদের নকল করে পোষাক পরছে। উর্দু-আরবির চল এখন গ্রামের ভেতর অনেক বেশি।'
এদের সাথে গ্রাম ছেড়ে গেছে কেউ? "না তা হয়নি। সেটা বেশি মুর্শিদাবাদ-মালদায়। এখানকার মুসলিমরা অতটা গুরুত্ব পায় না খানদানি মুসলিম সমাজে। ওদের নজরে আমাদের গ্রামগুলো, আপনি যে বলেন "আদার', সেই আদার। পাত্তা পায় না।'
তাহলে তো সুবিধা বেশি ওদের, অসহায়ের ত্রাতা হয়ে এসে তুলে নিয়ে যেতে পারে। "ভেতরে ভেতরে হচ্ছে কিনা জানি না, তবে কেউ এখনও এই কারণে গ্রাম ছাড়েনি।'
এই গ্রামে তোমার কোনো ছেলেবন্ধু নেই? আমায় আঙ্গুল তুলে বর্ডার দেখাল সাবিনা। রোদ পড়ে আসছে। হলুদ আলোর ভেতর কিছু পতঙ্গ উড়ছে আর ওই হলুদ পথ ধরে ওদেশ থেকে সাইকেল চালিয়ে আসছেন সাদা দাড়িয়ালা মধ্যবয়সী এক মুসলমান ভদ্রলোক। কাঁটাতার ফাঁক করে সাইকেল গলিয়ে আবার চড়ে বসলেন। মাটির উঁচু-নিচুতে ঝাঁকুনি খেতে খেতে তিনি আমাদের দিকেই আসছেন। ইনি তোমার ছেলেবন্ধু? এতক্ষণে মেয়েটা হাসল। দুদিন ধরেই লক্ষ্য করেছি ও একটু কমই হাসে। ঠান্ডা, সিরিয়াস ভাব। সব কথারই পরিপাটি জবাব। হঠাৎ হেসে ওঠায় ওর ভাঙ্গা দাঁত দেখতে পাওয়া গেল। রুগ্ন চেহারার মতই রুগ্ন সেই দাঁতের হাসিতে ক্লান্তি, ক্ষয়। আমিও সেই হাসির লেজ ধরেছি। যদি দুজনের হাসি মিলে একটা মজা সঞ্চারিত হয় এই সীমান্তের গ্রামে তাহলে মন্দ হয় না। অন্তত বি এস এফ, বি ডি আর ছুটে এসে দেখে যেতে পারে এই হাসির ক্ষণনাট্য কিংবা পোলেমিক। সাক্ষী থাকবে ওরা, বলে কিনা এই লোকটা ছেলেবন্ধু! হাসতে হাসতে সাবিনা বলল, "উনি আমার জ্যাঠামশাই।'
তবু ভালো ছেলেবন্ধু নয়। হাসি থামল আমাদের কিন্তু উনি ওদেশে গিয়েছিলেন কেন! "রোজই তো যান। দুবেলা। আসলে স্বাধীনতার আগে থেকেই আমাদের বাড়ির লোকরা স্থানীয় মসজিদগুলোর মৌলবীর কাজ করে আসছে। মসজিদ দুটো, দেশভাগের পর একটা বাংলাদেশে পড়ে গেল। কিন্তু কাজটা বহাল রইল। এখানকার মসজিদেও উনি মৌলবী, ওখানকারটায়ও। আগে করত দাদু, এখন জ্যাঠা। বি এস এফ, বি ডি আর ওনাকে সবাই চেনে। কেউ ধরে না।'
এমন কি হয় যে যাওয়া হল না গোলমালে? "হ্যাঁ, বহুবার হয়েছে। যাওয়া হল না কিংবা ফেরা হল না।'
ঘর্মাক্ত জ্যাঠামশাই আমাদের সামনে আসতেই আলাপ করিয়ে দিল সাবিনা। আমি বললাম, সালেম আলেকুম। উনি কিছুই বললেন না! শুধু হাসলেন। বাড়ি যাওয়ার অনুরোধ করলেন। হাওয়াই চপ্পলের ফিতে সোজা করে বললেন সাইকেলের ঘন্টিটা সারাতে হবে। সাবিনা দেখল বেলটা বাজছে না। রাতে কি এখানে আসা যাবে একবার? "হ্যাঁ স্যার, আজ পূণিমা।'

৪।

চাঁদের হাসি বাঁধ ভেঙ্গেছে
ছড়িয়ে পড়ে আলো ...
হে, বি এস এফ জওয়ান
তোমার লাইটারটা জ্বালো
দেখি সীমান্তের ভাস্কর্য
এ কে ৪৭ পেরিয়ে যারা এল
তাদের মুখ, বসন্তের দাগ, হাওয়া ...

গন্ধে কি ভাসছে কোনো বাংলাদেশ
হে রজনীগন্ধা তোমার পাচার পাচার খেলায়
দেখ, এসেছে আজ বঙ্গবন্ধু
সীমান্তে দাঁড়িয়ে বলছে, ভাইসব
আজকের সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম;

এই স্বাধীনতার মানে চলন্তিকায় নেই
সীমান্তের অন্ধকারে
হারিয়ে যাওয়া আলোর ছেলে
ফিস্‌ফিসিয়ে জানতে চাইছে
ভাইজান পানি হবে ...

৫।
শীতকালে ফরেস্টের গাছে পরিযায়ী পাখি থিক্‌থিক করে। বসার জায়গা পায় না। গাছের নীচ দিয়ে যাওয়ার সময় গায়ে নোংরা পড়ে। সবুজ গাছের ডালে বিরাট ডানা মেলে দোলে আর হেঁড়ে গলায় ডাকে সাদা শামুকখোল। এক দেশ থেকে আসে অন্য দেশে। ডিম পাড়ে, বাচ্চা হয়, সাদা রঙ বদলে ধূসর হয় যখন তখন গোটা দল উড়তে শুরু করে। প্রথমে ছোট দল, তারপর বড় বড় দলে উড়ে যায় পুরনো ঠিকানায়। এভাবেই এক দেশ থেকে আরেক দেশে কোনো উদ্বাস্তু-চেতনা ছাড়াই যাতায়াত করে। তখনও যদি আবহাওয়া বদলে যায়, ভীষণ গরম কিংবা পলিউশনে পড়ে তাহলে মাথা খারাপ হয়ে যায় দলকে দল পাখির। তখন তারা জল খোঁজে, ঠা¾ডা জল। ঝাঁপিয়ে পড়ে কুলিক নদীতে। যারা গঙ্গা, যমুনা দেখেছে তাদের কাছে কুলিক কোনো নদীই না, খাল। বর্ষায় জল বয়ে যায়, ডোঙ্গা চলে, শীতে হাঁটুজল, বাচ্চারা গামছা দিয়ে মাছ ধরে, ছেলেছোকরারা রাস্তা বাঁচাতে প্যান্ট গুটিয়ে হিরো হোন্ডা নিয়ে পার হয়ে যায়। এ নদী বাংলাদেশ থেকে এসেছে। এমন ঘটনা দূর্লভ। পূর্ব ভারতের সব নদীই ভৌগলিক লজিকে বাংলাদেশে ঢুকেছে। সেদিকেই জমির ঢাল, সমুদ্র ইত্যাদি। অথচ কুলিক বাংলাদেশ থেকে ভারতে, ফলে উল্টোমুখী, স্রোত কম, জল নেই। তাছাড়া উত্তরবঙ্গের নদী এমনিতেই ক্ষীণস্রোতা। সেই কুলিকের বনাঞ্চল ধরে এগিয়ে গেলে ধানজমি, উঁচু মাটির রাস্তায় ভ্যানগাড়ির ওঠানামা কাটিয়ে গ্রাম, বসতির এলোমেলো বিস্তার। ক্রমে সদর শুরু হচ্ছে। মাঝখান দিয়ে ছুটে গেছে চৌত্রিশ নম্বর জাতীয় সড়ক। দুপাশে বেড়ার গুমটি। পাঞ্জাবি ধাবা নয়, বাঙ্গাল ভাতের হোটেল। এরা সব উদ্বাস্তু, ১৯৫০ থেকে ৭১-এর মধ্যে এসেছে। এদিকে বর্ডার পেরনো সহজ বলে ওই সময় আসার হারটা অন্যান্য জায়গার তুলনায় বেশি, গোটা উত্তরবঙ্গের মধ্যে। চারপাশ মুসলিম অধ্যুষিত, হিন্দুরা তাই শহরাঞ্চল সংলগ্ন। খুবই কনসেনট্রেটেড। সদর ছাড়া আশেপাশে বড় কোনো হিন্দু-প্রধান অঞ্চল বিশেষ নেই।
ওই সময় যাঁরা উদ্বাস্তু হয়ে এসেছিলেন অনেক স্ট্রাগল করে তাঁরা এখন সেটেলড্‌। অনেকেরই ছেলেমেয়ে কলকাতা, দিল্লি, মুম্বাইতে চাকরি করে। বিদেশেও থাকে কেউ কেউ। সেইসব ছেলেমেয়েদের বাবা-মায়েরা এখন সুগার-প্রেশার কমাতে জাতীয় সড়ক ধরে সকাল-বিকেলে হাঁটেন। সারি সারি স্বাস্থ্যভ্রমণ। আলোচনার বিষয় ওই ছেলেমেয়ে, বঞ্চিত উত্তরবঙ্গ থেকে অনেক সময় ছেড়ে আসা দেশের স্মৃতি। বাংলাদেশের নস্টালজিয়া। এমনই এক বৈকালিক ভ্রমণে অবসর নেওয়া হেডমাস্টারমশাইকে প্রশ্ন করলাম, কোন ঘটনায় দেশ ছেড়েছিলেন মনে পড়ে? "কেন পড়বে না, ভালই মনে পড়ে ...' তারপর তার বলে যাওয়ার পালা।
"আমাদের গ্রামে তো বেশ কিছুদিন ধরেই টেনশন ছিল যে দাঙ্গা বাঁধবে। শোনা যাচ্ছিল আশেপাশের গ্রামে দাঙ্গা লেগেছে। বহু লোক গ্রাম ছেড়ে চলে গেছে, আমাদেরও নাকি চলে যেতে হতে পারে। বাবা-মা তাই খানিকটা রেডি হয়েই ছিলেন। বাক্স-প্যাঁটরা বাঁধা ছিল সপ্তাহখানেক। এর মধ্যে হঠাৎ একদিন দুপুরবেলা প্রতিবেশী এক চাষীর বাড়িতে নতুন কেনা মুরগি বাসা ছেড়ে বেরিয়ে গেল। পুরনো মুরগি হলে চিন্তা ছিল না, সে বাড়ি চিনে ফিরে আসবে কিন্তু নতুন মুরগি তো বাড়ি চিনবে না। তাই উদ্বিগ্ন হয়ে ওই মুরগির পিছনে দৌড়াতে শুরু করল চাষীবাড়ির দু-তিনজন। তাই দেখে গ্রামের লোকের ধারণা হল নিশচয় দাঙ্গা লেগেছে। বাকি লোকরাও ওদের পিছু পিছু দৌড়াতে শুরু করল। আমরাও বাক্স-প্যাঁটরা তুলে দৌড়াতে শুরু করলাম। টানা একবেলা দৌড়ে যেখানে এসে উঠলাম সেটা একটা ফেরিঘাট। নদী পেরিয়ে গাড়ি ধরলাম। তখন আমি বেশ ছোট। রাত্তিরটা মন্দিরে ছিলাম। বাবা সারারাত পাহাড়ায় জেগে, আমরা ঘুমাচ্ছি। মা সকালে উঠে বলল, কোলে নিতে পারব না, হেঁটে যেতে হবে কিন্তু। আবার হাঁটা, হাঁটতে হাঁটতে দেশ পেরিয়ে গেলাম, এদেশে ঢুকলাম যখন তখন রাত হয়ে গেছে।'
জাতীয় সড়ক ধরে ছুটে যাচ্ছে গাড়ি। এবার আমাদের বাঁক নিতে হবে। আলো ফুরিয়ে যাওয়ার আগেই ফিরতি পথ হেঁটে পৌঁছাতে হবে নিজের নিজের পাড়ায়। না হলে বাড়িতে চিন্তা করবে। অশক্ত শরীরে হাঁটতে বের হলে কার না চিন্তা হয়। শরীর ভাল রাখার এই হাঁটা, বাঁচার জন্য হাঁটা। হাঁটতে হাঁটতে ঘাম ঝরছে। সেই দেশ ছাড়ার হাঁটার সঙ্গে এই হাঁটার কি কোনো যোগ আছে? কিংবা আরো বেশি প্রতিষ্ঠিত হতে ছেলেমেয়ে নাতিনাতনিরা লন্ডনে ক্যালিফোর্নিয়ায় যে হেঁটে চলেছে তার সঙ্গে কি কোনো যোগ অছে এই উদ্বাস্তুর? ওরাও কি উদ্বাস্তু নয়? কে সেটল্‌ড আর কে সেটল্‌ড নয়- বলে দেবে কে! বাংলাদেশ ছেড়ে যে এদেশে এসেছিল, তার পরের জেনরেশন গেছে আরেক দেশে, আপোষে কিন্তু শিকড় ছিঁড়ে, উদ্বাস্তু হয়ে। কখনও অত দূরে নয়, হয়তো পাশের রাজ্যে, অন্য শহরে। আমারও তো তেমনই দশা।

হাইওয়ে ধরে রাতের শেষ বাস যখন
কলকাতা যায়, আমি তৃষ্ণার্ত চোখে দেখি
মোবাইলের টাওয়ারহীন, একা
এই একাকীত্বের কথা আর কেউ না-জানুক
জাতীয় সড়ক জানে।

৬।
বর্ষার পর জাতীয় সড়ক হয়ে যায় জাতীয় নরক। ভাঙ্গাচোরা, টালমাটাল রাস্তা কোথায়ও কোথায়ও সম্পূর্ন হাওয়া। পিচের চিহ্নমাত্র নেই। শুধু মাটি। রাতের বাস পাল্টি খায় ধানক্ষেতে। সারারাত ঝাঁকুনিতে যাত্রীদের ঘুম হয় না। সেভাবেই একদিন রকেট বাসের শেষ সিটে বসে কলকাতা যাচ্ছি। পাশের সিটে একটা বছর সতেরো-আঠেরোর ছেলে। একটু লম্বা মত, কুচকুচে কালো, পেটানো চেহারায় আদিবাসী লুক। টি-শার্ট আর টাইট জিন্‌সে বেশ স্মার্ট দেখাচ্ছে কিন্তু দীর্ঘক্ষণ ধরে লক্ষ্য করেছি ও মাঝে মাঝেই খ্রিÙটান কায়দায় ক্রস কাটছে। হাইওয়ের আলোয় জানলার ধারে বসা ওর এই জেগে থাকা আমার জেগে থাকাকে কৌতূহলী করছে। এমন অবস্থাতেও কেউ কেউ থাকে যারা ঘুমিয়ে পড়তে পারে, তাদের নাক ডাকা শোনা যাচ্ছে। আবার আমাদেরই মত যাদের পথ অমসৃণ হলে ঘুম ছুটে যায় তারা হয়তো আত্মশক্তির পরীক্ষা নিতে চোখ বুজে আছে কিংবা আত্নভোলাভাবে ঢলে পরছে সহযাত্রীর কাঁধে।
রাত তখন বারোটা বেজেছে, নাকি কাহিনির ধারা রাতকে বারোটা বাজিয়ে ছেড়েছে, মনে নেই। ধৈর্য আর রাখতে না পেরে ওর সঙ্গে আলাপ জমাই। মৃদু হাসি ওর দিকে। ও বলে, "হ্যালো।' একেই বলে বিশ্বায়ন, সর্বত্র সবাই এই একটা শব্দ শিখে গেছে। ইন্টারনেট থেকে পাড়ার পার্ক, শপিংমল থেকে গ্রামের হাট সর্বত্র "হ্যালো' কিংবা "হাই'। কীভাবে যে ঢুকে গেল কে জানে! অবাক হই কিন্তু এই নিয়ে এখন আর উষ্মা প্রকাশ করা অনুচিত জেনে নাম বিনিময় করি। ওই চলমান বাসের গা-ঁগাঁ ভেদ করে শ্রবণমুখী ফিস্‌ফিসানিতে ছেলেটা জানায় ও বাগুইহাটিতে একটা বোর্ডিং স্কুলে পড়ে। ক্লাস ইলেভেন। টেন পর্যন্ত দার্জিলিং সেন্টপল্‌সে পড়েছে। পড়াশোনায় ভাল বলে গ্রামের বাড়ির সবাই ওকে ছেলেবেলা থেকেই হোস্টেলে রেখে পড়তে পাঠিয়েছে। খ্রিস্টান হওয়ার জন্য সুযোগও মিলে গেছে সহজে। খুবই গরীব বাড়ি। বাবা চার্চে কাজ করেন। এস টি ভাতায় আর কমিউনিটির সাহায্যে ওর পড়া এগিয়ে চলেছে। আমি আগ্রহ অনুযায়ী প্রশ্ন করছি, ও উত্তর দিচ্ছে। সংক্ষিপ্ত, যথাযথ।
বাড়ি কোথায়? "বেঙ্গলে নয়, বিহারে। এখানকার সদর শহর থেকে আধঘন্টায় চলে যাওয়া যায় বারসই আর সেখান থেকে ট্রেকারে করে আরো আধঘন্টায় আমাদের গ্রামে। কিন্তু আমরা কেউ বারসই দিয়ে যাতায়াত করি না। কলকাতা যেতে গেলে শর্টকাট একটা রাস্তা আছে রায়গঞ্জে আমার, সেটা চল্লিশ মিনিট লাগে। তারপর এই রকেট ধরে নিই।'
এভাবেই দু লাইন, চার লাইন পরষ্পর বলতে বলতে একসময় জানতে চাইলাম, তুমি সারা রাস্তা ধরে ক্রস করে চলেছ, সামনে কোনো পরীক্ষা নাকি? এবার যে উত্তর দিল সেটা বেশ লম্বা। ভাঙ্গা ভাঙ্গা বাংলা, হিন্দি আর ইংরেজী মিশিয়ে সে জানাল, কী একটা ছুটি উপলক্ষ্যে দু-তিনদিন আগে গ্রামের বাড়ি গিয়েছিল। সেখানে গিয়ে ও দেখে গ্রামে প্রত্যেক রাতে ডাকাতি হচ্ছে। পুলিশ কিছুই করছে না। কারণ পলিটিক্যাল ডাকাতি। দল বেঁধে এসে ঘর থেকে গরিব মানুষদের বের করে সারারাত উঠোনে দাঁড় করিয়ে রাখছে তারপর ভোরের দিকে সর্বস্ব নিয়ে চলে যাচ্ছে। হাতে বন্দুক, ভোজালি, লাঠি, বোমা ইত্যাদি। পর পর বাড়িগুলোয় ডাকাতি করে চলেছে। আজ ওদের বাড়িতে আসবে। বাড়ির লোকেদের ওর প্রতি অনেক স্বপ্ন-ভরসা, পড়াশোনা করে সংসার দেখবে; ওর যাতে কোনো ক্ষতি না হয়ে যায় তাই সবাই মিলে কলকাতায় পাঠিয়ে দিল। রাতের চলমানতার যে ক্লেশ আর ক্লান্তি থাকে তা মুহূর্তে উবে গেল আমার। হাইওয়ের আলোয় ওর কালো চামড়ায় চুঁইয়ে পরা তেল চক্‌চকে কিশোরমুখের দিকে তাকিয়ে আমি ভাবছি, আজ এই কারণে বর্ডার ক্রস করছে আদিবাসী ছেলেটা, স্টেট বর্ডার। পলিটিক্যাল ভায়োলেন্সের জন্য। ফিস্‌ফিস করে যেন ভেঙ্গে পরছে আমার কানের কাছে, "এখন তো ওরা আমাদের বাড়ি তছনছ করছে। গড সেভ দ্য হোম। তাই ক্রস করে চলেছি।'
আমি ভাবছি এক্ষুণি যার বাড়ি তছনছ হচ্ছে সে কীভাবে ঈশ্বরে বিশ্বাস রাখে! কে সেই ঈশ্বর যে তছনছ করে শেষে "সেভ' করবে? নাকি ও-ই ঈশ্বরকে রক্ষা করছে, যেভাবে বাড়ি ওকে রক্ষা করতে স্টেট বর্ডার পার করে দিয়েছে। এভাবেই তো মানুষ পালায়, পালিয়ে বাঁচে, মানুষের বিশ্বাসও সেই সূত্রে পালায়, এবং বাঁচে। পালাতে থাকা আদিবাসী ছেলেটাকে জিজ্ঞাসা করি, এসবের প্রতিশোধ নিতে ইচ্ছে করে? "করে কিন্তু আমি পারব না। চাকরি পেয়ে বাবা-মাকে গ্রাম থেকে নিয়ে আসব। বাগুইহাটিতে ঘর ভাড়া নিয়ে থাকব। আর কিছু¤ করার সাধ্য নেই আমার।'
বাগুইহাটি হোক কিংবা বেগবাগান, এন্টালি অথবা পার্ক স্ট্রিট - আবার একটা আদিবাসী পরিবার গ্রাম ছেড়ে, রাজ্য ছেড়ে, কমিউনিটি ছেড়ে উঠে আসবে। এই রাতের বাসে পাশে বসা ছেলেটার মনে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব উদ্বাস্তু হওয়া যায় ততই মঙ্গল, এমন প্রার্থনা। এ কেমন প্রার্থনা? জানি সারারাত জেগে থাকতে হবে ওর সঙ্গে, তবু শেকড়মুখী মানুষ আমি কেন বলে ফেললাম, চাকরি পেয়ে বাবা-মাকে আনতে তো অনেক দেরি, তার আগে নিয়ে আসা যায় না?
আমি তো উদ্বাস্তু চিহ্নিত করি, বেদনা শেয়ার করি, পরিবর্তিত পৃথিবীতে সেই উদ্বাস্তু-চেতনা কতটা সম্প্রসারিত হল তা লক্ষ্য করি কিন্তু আজ পর্যন্ত কোনোদিনও উদ্বাস্তু হওয়ার প্রার্থনায় তো সামিল হইনি। এখানে কেন হলাম? উদ্বেগের কাহিনি তো কম শুনিনি। যেখানেই যাই সেখানেই দেখি উদ্বাস্তুর কালো উদ্বেগের ছায়া। সশব্দে কিংবা নি:শব্দে এই ছায়াকেই স্মৃতিতে ধারণ করি। পথ হাঁটি। স্মৃতি জুড়ে সারি সারি উদ্বাস্তুর মিছিল। তাহলে? উত্তর আধুনিক সময়ের এই কি নতুন কোনো ছবি, যার জন্য নতুন উদ্বেগ! আমি জানি না।
ভাঙ্গা হাইওয়ে দিয়ে বাস ছুটে যাচ্ছে। ফিতের মত এই হাইওয়ে পেচিয়ে রেখেছে হাজার ভাঙ্গা কাহিনি, উদ্বাস্তুর, উদ্বাস্তু-চেতনার। কে জানে, কবে এই রাস্তা সারাই হবে!


(চলবে)