আপনার মতামত         



আর কোনো সুখের খবর নেই

সোভি সামুর

অনুবাদ ও টীকা -বোধিসত্ত্ব দাশগুপ্ত, সহযোগিতা - উর্বী



লেখক পরিচিতি: লেখক সোভি সামুর লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অফ ওরিয়েন্টাল স্টাডিজে অর্থনীতি বিষয়ে পিএইচডি ছাত্র। তাঁর গবেষণার মূল বিষয় ১৯৯৩ সালের অসলো চুক্তির পরবর্তী সময়ে পালেস্তিন অঞ্চলের রাজনৈতিক অর্থনীতি ও "অর্থনৈতিক উন্নয়ন'। স্নাতক স্তরে সোভি জার্মানির এর্লাংগেন- ন্যুরেমবর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনো করেন। ২০০০-২০০১ সালে পালেস্তিনে বিরজিট বিশ্ববিদ্যালয়ের এক বছরের জন্য পড়তে আসেন (সাধারণত এই ব্যবস্থা কে অ্যাব্রড স্টাডিজ ইয়ার হিসেবে পরিগনিত করা হয়)।
সম্প্রতি ২০০৬ এর জানুয়ারি মাস থেকে প্রায় ছ' মাস পালেস্তিনে ছিলেন। তেলআভিভ বিমানবন্দরে সোভিকে দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদ সইতে হয়। ওনার নিজের মতে অবশ্য এ হল গিয়ে সাধারণ পদ্ধতি। এছাড়া জুন জুলাই মাসে যখন গাজা ও পরে লেবাননে ইজরায়েলি সৈন্যবাহিনী বোমাবষর্ন করে,সোভি তখন পালেস্তিনে ছিলেন। অনুদিত রচনাটি এই সময়ের ফসল। পালেস্তিন থেকে কিছু চিঠি/ডায়রির মত করে লেখা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার বর্ণনা লিখেছিলেন, এই রচনাটি ও সেরকম, ঠিক প্রকাশের উদ্দেশ্যে লিখিত নয়। প্রস্তাব পাওয়ার পরে কিছুটা অবাক হয়েই, বাংলা অনুবাদে সম্মতি দিয়েছেন এবং আমাদের অনুরোধে আগ্রহী পাঠকদের জন্য একটি সংক্ষিপ্ত সূত্র-তালিকা প্রস্তুত করে দিয়েছেন। তাঁকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই।     --অনুবাদক


""নিজের দেশ যার কাছে কেবলই মায়ায় মিঠে, সে আনকোরা মুসাফির, সব দেশই যাঁর আপন দেশ হয়ে ওঠে, তিনি তো পাকা ভবঘুরে। আর পৃথিবীর সমস্ত দেশ ই যে মানুষটার কাছে বিদেশ বিভুঁই, শুধু সেই মানুষটিই হয়ত পরিপূর্ণ মানুষ।'' - হুগো , সেন্ট ভিক্টর (১)।

""জীবনের একটা অপরিচিত পর্যায়ে এসে পৌঁছেছি, অথচ এর আগে পর্যন্ত আমি সারা জীবন নিজেকে বলে এসেছি, "ভ্লাদিমির , তুমি এখনো সব চেষ্টা নি:শেষ করনি, এখনো উজাড় কর নি নিজেকে', এবং তার পরেই আবার নতুন করে শুরু করেছি''- ওয়েটিং ফর গোদো - বেকেট।(২)

আমি একজন পালেস্তিনীয়। জন্ম বেইরুটে। বড় হয়েছি জার্মানি তে। তবে আসলে অবশ্য আমি সাফাদের (৩) লোক। এই কথাটা আমি কখনো মনে করিয়ে দিতে ভুলি না। বেইরুটে বেশি দিন থাকা হয় নি আমার। তবে সব মিলিয়ে আমার বাবা যতদিন সাফাদে থাকতে পেরেছেন, তার থেকে ঢের বেশিদিন আমার ছোটোবেলা বেইরুটে কেটেছে। জার্মানিতে বড় হয়েছি, আমার জার্মান পাসপোর্ট আছে, আর কিছুদিন আগে পর্যন্তও আমি জার্মানি কেই আমার দেশ বলতাম। পালেস্তিনীয় হয়ে জন্মেছিলাম, অন্তত বাবা মা সেই রকমই আমায় শিখিয়েছিলেন। কিন্তু পালেস্তিনের মানুষ হয়ে জন্মাবার অর্থ বহুদিন ধরে আমি অস্বীকার করেছি। তবে কালক্রমে এটা বুঝেছি যে, আসলে কোনো দেশ নেই আমার, এমন একটাও জায়গা নেই যাকে আমি আমার (৪) বলতে পারি। জার্মানির নাগরিক, জার্মানিতেই জীবনের অধিকাংশ সময় কেটেছে, তবু জার্মানি কে আমি আমার দেশ বলতে পারি না। তবে এ কথা ঠিক, স্থানহীনতা,দেশহীনতা, শিকড়হীনতার অসুখ থেকে জার্মানি আমায় এক ধরণের মুক্তি দিয়েছে, জার্মানিতে জীবন যাপনের ফলেই আজ আমি প্রথম বিশ্বের নাগরিক। তবু জার্মানি কে আমি আমার দেশ বলতে পারি না।
একটা কথা প্রায় ই বলতাম, অনেককেই বলেছি , বলি, কিছুটা বিশ্বাস ও করতাম যে যেহেতু "উন্নয়ন'(৫) আমার বিষয়; আর এই বিষয় নিয়েই আমি কাজ করতে চাই, সেহেতু স্বাভাবিক ভাবেই, জার্মানি তে আমার করবার মত কোনো কাজ নেই। বিষয়টি এমনই, এর সংজ্ঞানুসারে, জার্মানির বাইরেই এই "উন্নয়ন' সংক্রান্ত কাজের "সুযোগ' বেশি! কিন্তু জানি এই সমস্ত কথাই মনকে চোখ ঠারা, কিছুটা সাজানো মিথ্যা। একটা সুন্দর সুবিধেজনক মিথ্যা। হয়তো একেবারে ভিত্তিহীন অবাস্তব নয়, তবু মিথ্যা। আমি জার্মানি ফিরতে পারব না, তার একমাত্র কারণ জার্মানি তে আমার জন্য কোন জায়গা নেই। আসলে আমার ফেরার মত কোন দেশ নেই।

আপাতত লন্ডনে থাকি। বিচিত্র এই লন্ডন শহরে, অগণিত মানুষ আছেন ঠিক আমারই মত যাঁদের নিজের কোন দেশ আর নেই, ফেরার মত কোন জায়গা নেই। স্বীকার করতেই হবে, এই লন্ডনই একমাত্র শহর আজ যেখানে আমার ফিরতে ইচ্ছে করে। অথচ ইতিহাসের এমন বিচিত্র গতি, আজ এই মুহুর্তে আমার যে সত্যি কোনো দেশ নেই, এই অবস্থার জন্য কিন্তু শহর হিসেবে লন্ডনেরও আংশিক দায় বর্তায়।

এখন ইংরেজিতে লিখছি। কিন্তু সম্পূর্ণ অন্য দুটি ভাষার সঙ্গে আমার পরিচয় অনেক আগে থেকে। দুটো ভাষা নিয়েই আমায় কিছুটা লড়াই করতে হয়েছে। তার মধ্যে একটা ভাষায় বাবা মা কথা বলতেন, আরেকটা ভাষা আমায় শিখতে হয়েছে স্কুলে। দুটো ভাষাতেই আমি তেমন স্বচ্ছন্দ নই। প্রাত্যহিক সমস্ত কাজ আমি জার্মানে ভাবি। আর মা বাবার কথা, বাড়ির কথা, শৈশবের সমস্ত অনূভুতির স্মৃতিতে, স্নেহে, মমতায় আমার ভাষা আরবি। কিন্তু আজ যা লিখছি জার্মানে লিখতে পারতাম না, আরবিতেও নয়। ইংরেজি আমি পরে শিখেছি, এই ভাষাটি তেই আপাতত সবচেয়ে সাবলীল বোধ করি। ইংরেজি যদিও আমার নিজের ভাষা নয়। আসলে আমার নিজের, কখনও কোনদিন, ঠিক নিজের, কোন ভাষা ছিল না।

কেউ যদি একটা সাধারণ প্রশ্ন জিগেস করে - আমি কোথাকার লোক- খুব বিপদে পড়ে যাই। ২০০৬ সালের মার্চ মাসে আমি যখন রামাল্লায় এসে পৌঁছলাম, একটি লোক ঠিক এই প্রশ্নটি ই আমাকে করেছিল। বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আমি বলেছিলাম আমার পক্ষে এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া কঠিন, কারণ এ তো গভীর অস্তিত্ত্বের প্রশ্ন। তারপর খানিকটা ভেবে চিন্তে বলেছিলাম, " আমি বেইরুটে একজন পালেস্তিনীয় হয়ে জন্মে ছিলাম, তবে আমি সাফাদের লোক।বড় হয়েছি জার্মানি তে, আর এখন ল¾ডনই ঠিকানা ( আর কোনো উপযুক্ত শব্দ পেলামনা), আর কাজ করছি রামাল্লায়।' এই বিচিত্র ঘোরানো প্যাঁচানো উত্তর শুনে লোকটি সম্ভবত একটু বিরক্তই হল । তো আমি বিষয়টা হাল্কা করার জন্য বললাম, "এই রকম জটিল ভূগোলের জীবন কাহিনী আমার, আমি তো একজন আদর্শ পালেস্তিনীয়!' পরে ভেবে দেখেছি, আদর্শ পালেস্তিনীয় বলে আসলে কিছু হয় না। ইতিহাস এবং মূলত: গণস্মৃতির কোন এক বা একাধিক অমোঘ সুতোয় গ্রথিত, আবদ্ধ আমরা, অথচ প্রত্যেকেই ভীষন আলাদা। আমরা সকলেই এক ও একাধিক গৃহহীনতার, স্থানহীনতার, দেশহীনতার শিকার, এই যন্ত্রনা নিয়ে আমরা নিজেদের মধ্যেও বেশি কথা বলতে পছন্দ করি না। প্রকৃত অর্থে কাউকে বোঝানোও সম্ভব নয়। হালকা গল্প গুজব আর আড্ডার সময়ে আমি অবশ্য অতশত বলতাম না, শুধু বলতাম আমি জার্মানির পালেস্তিনীয়। তবে যদি কেউ জানতে চাইতো, আমার জার্মানিতেই জন্ম কিনা, আমি বেশ জোর দিয়েই বলতাম,"না, আমার জন্ম বেইরুটে।' জার্মানি সম্পর্কে মানুষের প্রচুর আগ্রহ,স্বাভাবিক ভাবেই অনেক প্রশ্ন করত সবাই, শেষের দিকে আমি একটু অধৈর্য্য হয়ে বলতাম, আমি জার্মানি তে বহুদিন থাকিনি, বেশি কিছু জানি না এবং তাতে খুব কিছু এসেও যায় না।

আমি পালেস্তিনীয়, কিন্তু ঠিক পালেস্তিনীয়দের মত দেখতে নই, তাই রামাল্লার লোকে সহজেই ধরে নিতেন আমি পালেস্তিনের লোক নই।

এই মুহুর্তে বেইরুট প্রায় গুঁড়িয়ে যাচ্ছে আর সাফাদে আছড়ে পড়ছে অসংখ্য রকেট। যখন প্রথম শুনলাম সাফাদে রকেট আক্রমণ হয়েছে, একটা মিশ্র অনুভুতি হয়েছিল। কারণ আমি তো যতই হোক সাফাদেরই লোক। এখন যুগপত অবরোধ এবং গোলাবর্ষণে গাজা আর ওয়েস্ট ব্যাংকের মানুষ বিপর্যস্ত, বিধ্বস্ত (৬)। বেইরুট যে ধ্বংস হল, গাজা আর ওয়েস্ট ব্যাংকের পালেস্তিনীয়রা যে এক বীভৎস যৌথ শাস্তির শিকার হচ্ছেন, এ সবই কিন্তু সম্ভব হচ্ছে, আমি যে দেশটিতে বড় হয়েছি আর যে দেশের রাজধানীতে কিছুদিন পরেই ফিরে যাব তাদের প্রকাশ্য বা অনুচ্চারিত রাজনৈতিক সমর্থনে।
বেইরুটে যখন বোমা পড়ছিল, তখনো আমার একটা মিশ্র অনুভুতি হচ্ছিল। আমার তো বেইরুটেই জন্ম। শৈশবে বেইরুট ছাড়ার পর আর কখনো বেইরুটে ফিরি নি, কোনোদিন হয়তো আর যাবো না। মুশকিল হল, বেইরুট যে সব কারণে বিখ্যাত(৭), অন্তত এ যুদ্ধের অব্যবহিত আগে, তাতে আমার আবেগের কোন জায়গা নেই। বেইরুটে আমার জন্ম, কিন্তু বেইরুটে আমার বাড়ি নেই, বেইরুট আমার দেশ হয়ে ওঠেনি। অথচ বেইরুট কিন্তু শুধু আমার জন্মস্থান মাত্র নয়, যে কোনো পালেস্তিনীয়র কাছে বেইরুট শুধু একটা জটিল ম্যাপের উপরে বসানো বিন্দুমাত্র নয়, শুধু শহর নয়।এই শহর পালেস্তিনীয় জাতিসত্ত্বার, আমার ব্যক্তিগত ইতিহাসের , সর্বোপরি এক ও অগণিত দুর্মর স্মৃতির অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ (৮)। ইতিহাস নিজের পুনরাবৃত্তি ঘটায়, এবং সত্যি বলতে কি এই ইতিহাসের ক্রুর রসিকতার অর্থ সবসময় আমার কাছে স্পষ্ট নয়। ১৯৭৮ সালে আমি যখন জন্মাই, তখন এই একই সেনাবাহিনী বেইরুট কে আরেকবার গুঁড়িয়ে দিচ্ছিল। ১৯৭৮ এর ঐ আক্রান্ত সময়ে যে শুধু আমার জন্ম তা নয়, যে দিনটিতে আমি জন্মেছিলাম, সে দিনটি পালেØতিনীয় দের সামগ্রিক স্থানচ্যুতির ইতিহাসে তাৎপর্যপূর্ণ, দিনটি 'ল্যান্ড ডে' (৯)। আর যে আত্মীয়র নামে আমার নাম দেওয়া হয়েছিল , তিনি এমন ই কোনো আক্রান্ত সময়ে নিখোঁজ হন। যখন বয়স অল্প ছিল কী ভীষণ রাগে অভিমানে আমি আমার নামটার জন্য মা-বাবার বিরুদ্ধে মামলা করার কথা ভাবতাম। এখন বুঝি, ওঁদের বোধ হয় খুব বেশি দোষ দেওয়া যায় না।

আমার বর্তমান জীবন আমার এই অতীতের উত্তরসূরী সন্তান এবং হত্যাকারী। এখন আমার জীবন দু ধরণের সুবিধায় আচ্ছন্ন। এর মধ্যে কিছু সুবিধা আমি অর্জন করেছি। আর বাকি এসেছে কেবল ঘটনাচক্রে এবং সৌভাগ্যক্রমে। আমি নিশ্‌চিত আমার বর্তমান আমার অতীতকে সতত আক্রমণ করে। একটি ভিন্ন অতীত হয়ত আমায় নিজের একটা দেশ দিত, অপরিচিত এক অনুভুতি এনে দিত আমার জীবনে, যাকে অনেকে পিছুটান বলেন। মাঝে মাঝে মাথার মধ্যে একটা কথা ঘোরে। একই সঙ্গে প্রাপ্তি ও লঙ্ঘনের এই সহাবস্থান এবং মন্থন, সময়ের বাঁক পেরোতে পেরোতে, পালিয়ে বেড়াতে বেড়াতে এরা কোথায় পোঁছবে? এর উত্তর আমার জানা নেই। শুধু বলতে পারি তীব্র নি:সঙ্গতা এর অন্যতম ফসল। এই নি:সঙ্গতা আমায় তাড়া করে ফেরে। কখনও উচ্চকিত কখনও লীন। যা কিছুর একসঙ্গে থাকার কথা , তারা সব, আলিঙগন নয়, আবর্তচ্যুত হয়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার কারণেই সম্ভবত এই নি:সঙ্গতা। এমন একটা পৃথিবীতে অবশ্যই যেতে ইচ্ছে করে যে পৃথিবীতে কোনো সীমান্ত নেই, রাষ্ট্র নেই, সম্পত্তি নেই, সম্পত্তির প্রতাপ নেই, স্বকীয়তাহীন সম্পর্ক নেই। এই সব কথা নিয়ে আলোচনা করেওছি, আমার বন্ধুদের সঙ্গে, কমরেডদের সঙ্গে। তবে সব আলোচনার শেষে তাঁদের ফেরার মত বাড়ি আছে, আমার নেই। কেন? কেন শুধু আমাকেই সব ছাড়তে হয়?

নিজের বলতে পারার মত একটা জায়গা না থাকলে বেঁচে থাকা খুব সহজ নয়। সমস্ত দুনিয়া আমার বাড়ি, সমস্ত দুনিয়াতেই আমি শিকড়হীন শরণার্থী। এক শহর থেকে আরেক শহরে, এক দেশ থেকে আরেক দেশে অন্তহীন চলাই আমার ভবিতব্য। স্বীকার করতেই হচ্ছে, এ কারণে আমি পৃথিবী র সমস্ত দিকে যেতে পারি, সে অর্থে কখনই আমাকে বাড়ি ছেড়ে পথে বেরোতে হয় না। স্মৃতি এবং ইতিহাস নিয়েই সংসার আমার। এই আমার ঘরদোর। আমার ইতিহাস প্রতিনিয়ত আ&#৩৪৭;²¡ন্ত, আমার স্মৃতি দুর্মর হওয়া সত্ত্বেও অবাস্তব এবং আমার সত্ত্বা ছিন্ন ভিন্ন, আমি কোনদিনে কোন জায়গায় ফিরবো না। যে সব দুর্ভাগা অগণিত মানুষের নিজের বলতে কোন জায়গা নেই, যারা চিরতরে স্থানচ্যুত,দেশহীন, তাদেরই একজন আমি। আমাদের সংখ্যা খুব কম নয়। আমরা গৃহহীন কিন্তু এই তাবৎ পৃথিবী আমাদের ঘর , এই পৃথিবী আমাদের, কিন্তু আমরা তার বন্ধু হয়ে উঠিনি। সমস্ত বসুন্ধরায় আমরা অক্লান্ত ভাবে নিজেদের জায়গা খুঁজে ফিরি, আর এই দৌড়, এই অন্তহীন খোঁজ আমাদের প্রতিনিয়ত মনে করিয়ে দেয় , ইতিহাস ও স্মৃতি অনেক অসুস্থ সময়ে, শুধু কারাগার গড়ে তোলে, প্রাচীর হয়ে ওঠে। আমাদের সংশয় আমাদের কাছেই অমোঘ হয়ে উঠছে, তাকে অতিক্রম করা আমাদের পক্ষে ক্রমশ দু:সাধ্য হচ্ছে।

আমার মা বাবা আমায় বলেছিলেন আমি পালেস্তিনীয়। দীর্ঘকাল আমার পক্ষে এই সত্ত্বা কে স্বীকার করা আমার পক্ষে বেশ কঠিন ছিল। কেবলমাত্র জন্মাবার অপরাধে প্রথম দিনটি থেকে আমি স্থানচ্যুত হতে চাইনি, আমি বাসা চেয়েছিলাম, দেশ চেয়েছিলাম, নিজের ইতিহাস , নিজের স্মৃতির উপরে কিছুটা অধিকার চেয়েছিলাম, নিজের জায়গা চেয়েছিলাম যেখানে আমি বার বার ফিরে ফিরে যেতে পারি। আমার মনে হত কেন শুধু আমাকেই চিরতরে দেশ ছাড়া হয়ে জন্মাতে হয়েছে। এই অবস্থার মধ্যে দিয়ে যে সব মানুষকে যেতে হয় তাঁদের হয়ত ভিন্ন প্রতিÏ&#৩৪৭;²য়া হত। সময় ও স্থানচ্যুতি যাঁদের কাছ থেকে দেশহীনতা কেড়ে নেয়, সেই দুর্ভাগা মানুষেরা প্রত্যেকে নিজের মত করে এই সংকটের মোকাবিলা করেন। কেউ নতুন দেশটিকে নিজের বলে ভাবতে শুরু করেন, একাত্ম হয়ে ওঠেন প্রধান ধারার জনজীবনের সঙ্গে। আমার ভাইবোনেরা কেউ কেউ এরকম ভাবেই ভাবেন। প্রথম দিকটায় আমিও সেই ভাবেই টিঁকে থাকতাম। কিন্তু আমার ব্যক্তিগত ইতিহাস ও স্মৃতি কে ত্যাগ করা আমার শেষ পর্যন্ত আমার পক্ষে সম্ভব হয় নি। নিজেকে কিছুদিন অস্বীকার করতে পারি, কিন্তু কতদিন পারব? আমি জানি জীবনে দুটি দিকই থাকে, একটা দিক নীরবে ছেড়ে দিয়ে মেনে নেওয়ার দিক, আরেকটা দিক হল বিভিন্ন দ্বন্দ্বের মধ্যে এক ধরণের তার্কিক বোঝাপড়া করে এগোনো। যদিও এই মুহুর্তে কোন বোঝাপড়া বা তার সম্ভবনা আমার চোখে আসছে না। এই তীব্র দ্বন্দ্বই আমার জীবন। নিজের মধ্যেই এই অন্তহীন বিতর্কে নিমজ্জিত হয়েই আমায় বাঁচতে হবে।

***

কয়েক মাস আগে সাফাদে গেছিলাম। এত ভাল লাগে আমার ওখানে! কল্পনা করার চেষ্টা করছিলাম, ঐ অপূর্ব মহীরুহে ঘেরা সাফাদে, ঝকঝকে আকাশের তলায় বাস করতে কেমন লাগবে? সাফাদে যেন জন্মালাম, আর থেকে গেলাম, এই সব ভাবছিলাম, বেশ কঠিন কল্পনা করা। আমি দেখুন একদিক থেকে সাফাদের লোক, অন্য দিকে সাফাদে আমার কোন জায়গা নেই। কিন্তু আমার সত্ত্বা সাফাদের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে, কল্পিত কোন এক সাফাদ ব্যতীত আমার অস্তিত্ত্ব অসম্পূর্ন। সাফাদের রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে ১৯৪৮ এর আগের সাফাদ কে কল্পনা করার চেষ্টা করতাম, নিজের মনে বকর বকর করতাম, 'এই তো তোমার বাড়ি, এই তো সেই অপূর্ব সাফাদ।' পরে আবিষ্কার করলাম সাফাদের লোকজন ঠিক চট করে মানুষকে আপন করে নেন না, প্রত্যেক "বহিরাগত' কেই তাঁরা সাফাদের মাটির অধিকারের লড়াইয়ে প্রতিদ্বন্দী হিসেবে দেখেন। শুধু মাটির, বসতি দখলের প্রতিযোগিতা বা যুদ্ধ নয়, ইতিহাস আর স্মৃতির অধিকার অর্জনের লড়াই তে আমি তাঁদের শত্রু। তাঁদের সন্দেহ আমি হয়তো আমি আমার জায়গা ফিরে পেতে এসেছি। কয়েক ঘন্টা পরেই আমায় সাফাদ থেকে ফিরে যেতে হল, ফিরে আর যাবই বা কোথায়,সেই দুনিয়ার পথে আবার বেড়িয়ে পড়া, আমার সাফাদে আজ আমি সন্দেহজনক বহিরাগত, কয়েকটা ফোটোগ্রাফই আমার কাছে এই সাফাদের স্মৃতি ও স্মৃতির সাক্ষী। এবং আমি জানি সাফাদের ভবিষ্যতও ঠিক এর ইতিহাসের মতই বেদনাবহ।

যখন আমি বুঝতে শুরু করলাম যে আমার কোনো দেশ নেই, আমার কোনো নিজের জায়গা নেই, তখন থেকে কিন্তু আমি এক সঙ্গে বুঝতে পারছিলাম, মেনে নিতে পারছিলাম যে আমি একজন পালেস্তিনীয়। একদিনে, খুব সহজে আমি এই সত্ত্বাকে খুঁজে পাইনি, আমার দেশ খুঁজতে গিয়ে, নিজের বলতে পারি এরকম একটা জায়গা খুঁজতে খুঁজতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়ে, বিচ্ছিন্ন হতে হতে এই সত্ত্বাটিকে আমি খুঁজে পেয়েছি। পালেস্তিনের অধিবাসী পালেস্তিনীয় হবার কি অর্থ আমার একেবারেই জানা নেই, তবে পালেস্তিনের বাইরে অক্ষচ্যুত গ্রহের মত নিরুদ্দেশ হয়ে টিঁকে থাকতে থাকতে পালেস্তিনীয় হয়ে ওঠা বলতে কি বোঝায় আমি বেশ জানি। সুতরাং আমি এই বার জানুয়ারি মাসে যখন পালেস্তিনে এলাম, তখন আমি একটা দিক থেকে পরিষ্কার ছিলাম মনে মনে, আমি পালেস্তিনের বাইরের পালেস্তিনীয়, এইটি ই আমার পরিচয়। রামাল্লায় যখন এসে পৌঁছলাম, তখন বুঝতে অসুবিধে হয় নি, আমার স্মৃতির পালেস্তিনের সঙ্গে, আমি যে পালেস্তিনে এসে পৌঁছেছি দুটি আলাদা। রামাল্লায় আসার পর থেকেই একটা কথা আমার মনে হয়। ১৯৬৭(১০) থেকে যে পালেস্তিনের বিরাট অঞ্চল অধিগৃহীত, সেখানে পালেস্তিনীয় রা থাকেন, "ব্যাংক' এবং "স্ট্রিপ' নামক দুটি জায়গায় ! আমি পালেস্তিনে যখন পৌঁছলাম, এয়ারপোর্ট থেকে ই আমায় বুঝিয়ে দেওয়া হচ্ছিল আমি পালেস্তিনীয় হবার কারণেই একজন অপরাধী। এমন একটা এয়ারপোর্ট, যেটা পালেস্তিনের মাটিতেই, কিন্তু অন্য দেশে। বাস্তবে অবশ্যই আমি একেবারে সাজানো আপ্যায়নের আশা করি নি, কিন্তু সত্যি আশা করিনি, একজন অপরাধীর মত আমাকে প্রশ্নের , সন্দেহের কাঠগোড়ায় দাঁড় করানো হবে। অপরাধ অবশ্য মারাত্মক। দেশের মাটিতে নিজের ইতিহাসের কাছে, স্মৃতির কাছে ফিরতে চাই, অতএব বিচিত্র কোনো যুক্তি তে আমি বিপজ্জনক!

একটা কথা আমি কোন দ্বিধা না করে বলতে পারি,যা কিছু আমায় দেশহীন করেছে তার সমস্ত কিছুকেই আমি ঘৃণা করি। এই ঘৃণার জন্য আমি লজ্জিত নই, কুন্ঠিত নই। এই ঘৃণা ব্যক্তিগত হয়ে উঠছে ক্রমশ:। এয়ারপোর্টে আমার দু:সহ আমন্ত্রনের পরে অনেক সপ্তাহ কেটে যাওয়া সত্ত্বেও আমি প্রায় ই স্বপ্ন দেখতাম, আমায় জেরা করেছিল যে লোকটা(১১), আমি যেন তার মুখে একটা পিস্তল ঢুকিয়ে দিচ্ছি। আমি হত্যাকারী হতে চাই না, কিন্তু আমি ওকে ভয় দেখাতে চাই, আমি চাই কিছুক্ষণের জন্য যেন মৃত্যুভয় ওকে গ্রাস করে, ও যেন আমার কাছে প্রাণভিক্ষা চায়, ঠিক যেমন আমি ওর কাছে দয়া ভিক্ষা করেছিলাম। আপনারা দুশ্‌চিন্তা করবেন না, আমি জানি ঘৃণা কে বর্জন করা উচিত। আমি অনেক কিছুকে ঘৃণা করতে বাধ্য হই, কিন্তু আমি খুব ভাল ভাবে জানি এই ঘৃণা আমায় নিয়ন্ত্রন করে না। কিন্তু আমি নিশ্‌চিত, মানুষ হিসেবে আমি এগিয়ে। ও কিন্তু আমার ইতিহাস, আমার অতীত, আমার স্মৃতি, আমার ভালবাসা সমস্ত কিছু কে ঘৃণা করে, আমাকে সম্ভবত মানুষ হিসেবে গণ্য করে না, মনেই করেনা, মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকার কোন অধিকার আমার আছে।

ওয়েস্ট ব্যাংকে আমার প্রথম অভিজ্ঞতা, একটা প্রকান্ড, অতিকায়, দীর্ঘ বিস্তীর্ণ প্রাচীর (১২)। এই বিশাল প্রাচীরের মধ্যে দিয়েই আমাকে পালেস্তিনে ঢুকতে হয়েছিল। পালেস্তিনের আপাতত এইটেই বাস্তব অবস্থা। সমগ্র পালেস্তিন এখন দেওয়াল দেওয়ালে একটি বৃহৎ কারাগার বিশেষ। যদিও যে ওয়েস্ট ব্যাংক কে ঘিরে রাখা হয়েছে, তাকে আদৌ পালেস্তিন বলা যায় কিনা তা নিয়ে আমার নিজের প্রশ্ন আছে, তবুও আমি যতদিন রামাল্লায় ছিলাম, আমার মনে হয়েছিল আমি বন্দী, বিনা অপরাধে, বিনা বিচারে বন্দী। আমায় সারাজীবন ই সম্ভবত বন্দী থাকতে হবে, ইতিহাসের কাছে, স্মৃতির কারাগারে বন্দী, অন্য মানুষের প্রাচীর দিয়ে এই কারাগার তৈরী, এই দেওয়াল তৈরী ই করা হয়েছে একটি উদ্দেশ্যে, আমাদের যেন কখনও স্বাধীনতা না আসে, শুধু মনে রাখা দরকার কোনোদিন ই আমাদের কোন স্বাধীনতা ছিল না।

এই আবদ্ধ কারাগার কে পালেস্তিন বলা যায় না, আমি তাই একে শুধুই ওয়েস্ট ব্যাংক বলব।

রামাল্লাতেই আমি সবচেয়ে বেশি সময় কাটিয়েছি এইবার। অল্প কিছুদিন কেটেছে টুল্করামে। টুল্করামে এখনো আমার আত্মীয়স্বজন আছেন কয়েকজন। যে জীবনে পশ্‌চিমে অভ্যস্ত সেই জীবন একমাত্র রামাল্লাতেই কিছুটা পাওয়া যায়। এখানে মহিলাদের সঙ্গে আমি কথা বললে কেউ তাকাবে না, আর মদ সহজলভ্য! তবে রামাল্লার তুলনায় টুল্করামে মানুষেরা অনেক সাধাসিধে আর খাঁটি, কিন্তু জীবন বেশ গতের, বাঁধাধরা, আত্মীয়া ছাড়া আর কোন বয়সের কোন মহিলার সঙ্গে কথা সম্ভব নয়, এবং অত্যন্ত দু:খের কথা একেবারেই মদ টদ পাওয়া যায় না! নাজারেথ অবশ্য টুল্করাম আর রামাল্লার মাঝামাঝি কোথাও অবস্থান করে। নাজারেথ আমার ঠিক ভাল লাগে না, নাজারেথ সেই পালেস্তিনের অঙ্গ, বাস্তবে যে পালেস্তিনের সত্যি কোন অস্তিত্ব নেই।

যা বলছিলাম, রামাল্লা শহরেই আমি নিজের মত কিছুটা থাকতে পারি। যে আমি পালেস্তিনের বাইরে থাকার কারণে, পালেস্তিনের অবস্থার কারণে বা বলা উচিত পালেস্তিনের অবস্থা সত্ত্বেও যে আমি তৈরী হয়ে উঠেছি, তার পক্ষে রামাল্লায় থাকা অপেক্ষাকৃত ভাবে সহজ। আমি কিন্তু রামাল্লা যে খুব পছন্দ করি, তা নয়। আগেও আমার খুব ভাল লাগত না, এখনও লাগে না। এখানে ভোগবাদের প্রকোপ এত বেশী, মানুষকে খুব মেকি মনে হয়। এবং টেস্টোস্টেরোনের অত্যাচার ও বড্ড বেশি! চারিদিকে প্রচুর হাই হিল আর গাঢ় লিপস্টিকের ছড়াছড়ি। সুস্থ স্বাভাবিক ভাবে, কোন সামাজিক চাপ মাথায় না নিয়ে, মেয়েদের সঙ্গে কথা বলা এই শহরে প্রায় অসম্ভব। রামাল্লার লোকেরা পুরোপুরি আলাদা, অন্যরকম। আমার মতই যে সবাই কে হতে হবে এমন কথা নেই, কিন্তু আমার পক্ষে এই একটা সত্য নিয়ে বেঁচে থাকা কঠিন, কিন্তু এই ভবিতব্য। আমার নিজের লোকেরা আমার থেকে ভীষণ আলাদা। আমার নিজের মানুষদের কাছে আমি বহিরাগত, তাঁরা আমার কাছে অদ্ভুত। এই দ্বন্দ্বই আমার কাছে রামাল্লার মূল স্মৃতি।

আমার ধারণা একেবারে শৈশব থেকেই আমি একটু অন্যরকম আর বিদ্রোহী ছিলাম, যদিও তখন বিদ্রোহ করার মত বিশেষ কিছু ছিল না! কিসের বিরূদ্ধে যে আমার অত রাগ ছিল আমি নিজেই জানি না। স্কুলে আমি খুব খারাপ ছাত্র ছিলাম, এত খারাপ ছিলাম যে কেরানিগিরি বা মামুলি হিসেবরক্ষকের জন্য যে ন্যুনতম কোর্স করা দরকার তাতেও আমার সুযোগ পাওয়া কঠিন ছিল, সেই আমলেও দিনের মধ্যে আমার সবচেয়ে প্রিয় খেলা ছিল, চিন্তা করা, আমার সমাজ নিয়ে পারিপার্শ্বিক নিয়ে তার সঙ্গে আমার সম্পর্ক নিয়ে চিন্তা করা। আমি এখনও মনে করি পারিপার্শ্বিকের সঙ্গে , সমাজের সঙ্গে, অগুন্তি যে সমস্ত পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে একটা মানুষকে যেতে হয়, তাকে নিয়ে গভীর চিন্তা করা জরুরী, কোন কোন সময়ে এই পদ্ধতিটি হয়ত কিছুটা ক্লান্তিকর, তবু জরুরী।

রামাল্লা ওয়েস্ট ব্যাংকের অন্তর্ভুক্ত এবং আগেই বলেছি, ওয়েস্ট ব্যাংক কে ঠিক পালেস্তিন বলা যায় না, এবং আমি পালেস্তিনীয় হিসেবে রামাল্লায় ছিলাম, সে বেশ দু:সহ অভিজ্ঞতা বা অন্য ভাবে ভাবলে এ এক বিশেষ আর্ট। রামাল্লায় জীবন বলতে কিছু নেই, যেটা আছে সেটা কে জীবন বলে না, সেটা এক ধরণের টিঁকে থাকা। পালেস্তিন বাসীর পক্ষে এই টিঁকে থাকাই অতীত ছিল, এই টিঁকে থাকাই তাঁদের ভবিষ্যত। এই টিঁকে থাকার অদম্য ইচ্ছেই পালেস্তিনের পালেস্তিনীয় দের জাতি সত্ত্বার একটি মূল দিক, প্রতিরোধ ও বটে। আরবি ভাষায় এর জন্য একটি শব্দ আছে , সুমুদ। স্রেফ অস্তিত্ত্ব টিঁকিয়ে রাখাটাই তাঁদের প্রতিরোধের লড়াই, এবং এই টিঁকে থাকাটাই পালেস্তিনীয় দের পক্ষে এক ধরণের প্রতিরোধ, এই লড়াই টুকুর জন্যই তাঁরা এখনও বেঁচে আছেন। ওয়েস্ট ব্যাংকে থাকতে যাওয়ার আগে সম্ভবত আমার এই প্রতিরোধের মানসিক প্রস্তুতি নেওয়া উচিত ছিল। এই অদম্য টিঁকে থাকার মানসিকতা আমায় ছেড়ে চলে গেছিল, এবং কিছু বুঝে ওঠার আগেই আমি দেখলাম আমি লড়াইয়ের মানসিকতা হারিয়ে নি:স্ব হয়ে গিয়েছি। আমি আমার নিজের মধ্যে সেই প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারিনি, প্রতিদিন চারপাশে মৃত্যু,কঠিন দারিদ্র , প্রচন্ড অপমান, তীব্র হতাশা র মুখোমুখি হওয়ার মত সাহস আমার অবশিষ্ট ছিল না। ঐ ঘূর্ণাবর্তে আমি হারিয়ে যেতে শুরু করলাম। ওয়েস্ট ব্যাংকের ঐ রাহুগ্রÙ ত জীবন আমার ব্যক্তিগত জীবনে বিশাল প্রভাব ফেলতে শুরু করে। আমার হয়তো আরো লড়াই করা উচিত ছিল, হয়তো আরো শক্ত হাতে চেষ্টা করা উচিত ছিল, কিন্তু আমি পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছিলাম। পালেস্তিন কে ঘিরে থাকা রাষ্ট্রীয় চক্রব্যুহ, আমার নিজের জীবনে শেকলের মত জড়িয়ে গেল। আমি বুঝতে পারিনি যে আমি অমোঘ ভাবে এক বিষন্ন মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলাম। যদি কারো কাছে চিৎকার করে সাহায্য চাইতাম, হয়তো কেউ এসে আমার হাতটা ধরতো, কেউ হয়তো আমার কথা শুনত যত্ন করে, কিন্তু কেউ আমাকে ঠিক বুঝতে পারত কিনা আমি জানি না। যাদের নিজের বলতে কোন ঘর নেই, দেশ নেই, তাদের পক্ষে রামাল্লায় এসে নিজের একটা জায়গা খুঁজে পাওয়ার আশা দুরাশা মা&#৩৪৭;, আজকে সাম্প্রতিক অতীতের দিকে তাকালে আমার এই কথাটাই মনে হচ্ছে। আমার ধারণা আমি এই ভুলটাই করেছিলাম। রামাল্লার মানুষ যে ভাবে খানিকটা জোর করে কখনো কখনো আনন্দ খুঁজে নেন, এও এক ধরণের প্রতিরোধ, খুব অচেনা লেগেছিল আমার কাছে।

তবে একটি বিশেষ স্বীকারোক্তি না করে, সমস্যাটা ঠিক বোঝাতে পারব না। ছোটবেলা থেকে যে "লিবেরাল' জীবনযাপনে আমি অভ্যস্ত, রামাল্লায় সে জীবনযাপন করার সুযোগ যাঁদের জীবনে এসেছে আমি তাঁদের সঙ্গে ঠিক মিশতে পারতাম না। নিজের রাজনৈতিক বোধ এবং শ্রেণীচেতনা আমার সর্বক্ষণের সঙ্গী। অথচ রামাল্লায় 'লিবেরাল' জীবনযাপন করেন যে সব মানুষ, রাজনৈতিক ভাবে তাঁদের মধ্যে একটি গুরুত্ত্বপূর্ণ অংশের আমি বিরোধী । তাঁরা এমন একটা পালেস্তিন চান, যেখানে আমি জানি আমার মত পালেস্তিনীয় দের কোন জায়গা হবে না। তাঁদের পালেস্তিন তাঁরা কিনে নিতে চান, আমার স্মৃতি,ইতিহাস এর বিনিময়ে। তাঁদের ঈপ্সিত "কর্তৃপক্ষ' (১৩) , আমার বাপ পিতামহদের রাজনৈতিক প্রতিরোধের সমস্ত ইতিহাসকে অস্বীকার করে। একটা চটজলদি সমাধানের অজুহাতে মূলত: আরো অর্থোপার্জনের প্রচেষ্টা। এঁদের মধ্যে অনেকেই স্রেফ সুবিধেভোগী, এঁদের কারো কারো সঙ্গে যদিও আমায় গবেষক হিসেবে, কাজের জগতে দেখা করতে হয়েছে, তবু আমি কিছুতেই এঁদের বন্ধু বলে মানতে পারি না। আমার পক্ষে পূর্ব পুরুষের লড়াইয়ের আদর্শের সঙ্গে ইতর বেইমানি করা সম্ভব নয়। কাজের জন্য আমায় অসংখ্য ডিরেকটর, অফিসার, ট্রাস্টি বোর্ড সদস্য, বিভিন্ন এনজিওর অভিজাত বর্গ, অসংখ্য বিদেশি বিশেষজ্ঞ যাঁরা সারাদিন পালেস্তিনের মানুষ কে "উন্নয়ন' সম্পর্কে অক্লান্ত জ্ঞান প্রদান করছেন, এই বিচিত্র লোকেদের সঙ্গে দেখা করতে হয়েছে। কোন ইচ্ছে ছিল না আমার, তবে ঐ লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক হওয়ায়, একটু পাত্তা পাওয়া গিয়েছে। আমার অনেক পালেস্তিনের বন্ধু , সহকর্মী দের এই লোকগুলোর সঙ্গে দেখা করতেই প্রতিনিয়ত প্রচুর কাঠ খড় পোড়াতে হয়, আর আমি উড়ে এসে জুড়ে বসে দিব্য লাল কার্পেট পেলাম। রামাল্লাতেই আমার অন্য অনেক পালেস্তিনীয়দের সঙ্গে দেখা হয়েছে, যাঁদের আমি খুব শ্রদ্ধা করি, কিছুটা ঈর্ষাও করি, তাঁরা ঐ বদ্ধ পরিস্থিতিতেও বিরাট সাহস, মানবিকতা আর আত্ম সম্মানের সঙ্গে বাঁচার রসদ পান বলে। আর্থ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দিক থেকে এঁরা অনেকেই আমার সমগোত্রীয়, আবার অনেকেই ভিন্ন। কিন্তু রাজনৈতিক মতামতের দিক থেকে আমাদের অবস্থান অনেক কাছাকাছি। কিন্তু তবু আমি বিচ্ছিন্নতার হাত থেকে মুক্তি পাই নি। সম্ভবত: এই সব মানুষের জীবনধারণের সঙ্গে আমার জীবিকার, কাজের, বাঁচার পদ্ধতির মিল না থাকায়, আমি এঁদের কাছে আসতে পারিনি, কিন্তু এই বিচ্ছিন্নতা, অত্যন্ত লজ্জার বিষয়, এক ধরণের বিলাসিতা। শুধুমাত্র একটি কারণেই এই বিলাসিতা আমি ত্যাগ করতে বাধ্য হইনি। আমার ওখান থেকে পালিয়ে আসার পথ ছিল এবং মনের ভেতরে কোথাও না কোথাও আমি জানতাম , আমার ওখানে না থাকলেও চলবে। একটা শিক্ষা নিতে খুব দেরী করে ফেলেছি, স্থানকালের ফেরে যে মানুষের কাছে টিঁকে থাকাটাই বিরাট লড়াই, তাঁদের মাঝখানে এই ন্যাকা বিচ্ছিন্নতাবোধ অর্থহীন, এই অধিকার অন্তত: আমার সময় আমাকে দেয় নি। এবং পালেস্তিনের বাইরের পালেস্তিনীয় মানুষের সঙ্গে কিছু আলাপ করার সুযোগ পেয়েছি, আমার মনে হয়েছিল তারা আমারই মত। আলাপ হওয়ার পরে দেখলাম এরা অনেকেই আমার শুন্যতাবোধ এবং একাকিত্ত্বের অনুভূতি গুলি বুঝতে পারছেন, কারণ তাঁরাও এর হাত থেকে মুক্তি পাননি। আমরা অনেকেই এই একই বিচ্ছিন্নতার শিকার হওয়া সত্ত্বেও, পরষ্পরের কাছাকাছি আসতে পারি নি, ব্যক্তিগত আবর্তের থেকে বেরোতে পারিনি কেউ ই। পালেস্তিনের বাইরে থেকে যে সব পালেস্তিনীয় এসেছিলেন, তাঁদের অনেকেই এসেছিলেন,"ছুটি কাটাতে' অথবা "অভিজ্ঞতা অর্জনের' লক্ষ্যে, বা এক ধরণের "রোমাঞ্চের' খোঁজে, এরা সবাই কোন না কোন ভাবে পালেস্তিনের বর্তমান অবস্থার জন্য বিচ্ছিন্নতার শিকার হয়েছেন, কিন্তু এদের প্রত্যেকের ই ফেরার মত একটা জায়গা ছিল, "দেশ' ছিল, সেই নতুন দেশে কোন এক ধরণের একাত্মতা তাঁদের নিজস্ব নতুন শিকড় গড়ে তুলতে সাহায্য করেছে।

***


ছ বছর আগে আমি যখন রামাল্লায় এসেছিলাম, তখন আমায় মনে মনে এই ভাবে প্রতিদিন মরতে হয় নি। রামাল্লায় দৈনিক জীবনধারণ তখনও অসহ্য ছিল, বাস্তবিক দিক থেকে অনেক বীভৎস ছিলো। তখন এসে আমি বছর খানেক ছিলাম এবং দ্বিতীয় ইন্তেফাদা আন্দোলন(১৪) কয়েক মাস প্রত্যক্ষ করেছিলাম। দৈনন্দিন জীবন তখন বড় কঠিন ছিল, অথচ আমার একবারের জন্যেও মনে হয় নি আমি মৃত্যুপথযাত্রী। সে সময়ে (রাজনৈতিক কারণে) মৃত্যু দৈনন্দিন প্রবাহের অন্তর্ভুক্ত ছিল, এখন সেরকম অবস্থা নয়, মৃতু বা হত্যা ঘটে রামাল্লার রাস্তায় এখনো, তবে আপেক্ষিক ভাবে অনেক অনেক কম, এখন মৃত্যু প্রত্যক্ষ করি টেলেভিশনে। আমার রামাল্লাবাসের দুটি সময়কে যে সব বড় কারণে পৃথক ভাবে চিহ্নিত করতে পারি, তার মধ্যে আমার নিজের মধ্যে পরিবর্তনই সবচেয়ে বেশি। তখন আমি রামাল্লায় গিয়ে পড়েছিলাম একজন "লিবেরাল' ইউরোপীয় হিসেবে, যুক্তিবাদ, এনলাইটেনমেন্ট, সভ্যতার সব ভারী ভারী গোল গোল ধারণা মাথার মধ্যে বয়ে নিয়ে। তাছাড়া তখন বছর দুয়েক ধরে মন দিয়ে নিও-ক্লাসিকাল অর্থনীতি পড়ে আমার ভক্তিভাব প্রবল, ধরেই নিয়েছি, মডেল গুলো ঠিক, মানুষ জন সব ভুল। গত ছ বছরে আমার রাজনৈতিক অবস্থানের, ধারণার পরিবর্তন হয়েছে। গতবার এখানে আসার পরেই ধীরে ধীরে আমি একজন "পালেস্তিনীয়' হয়ে উঠতে শুরু করি। অধিগ্রহনের পাশবিকতার সাক্ষী হতে গিয়ে, নিরপেক্ষ দূরত্ত্বের রক্ষাকবচ আমায় ত্যাগ করতে হয়েছিল। তাই গতবার আমার যেমন একটা উত্তরণ হয়েছিল, এইবার আমার হারিয়ে যাওয়ার পালা, এক অমোঘ সত্যের মধ্যে এখন আমায় আশ্রয় নিতে হয়েছে, এই আমার শেষ অবলম্বন। আমাকে মেনে নিতে হয়েছে, আমার আসলে কোন দেশ নেই ফিরে যাওয়ার মত কোন ঘর নেই। আমি একজন পালেস্তিনীয়, কিন্তু পালেস্তিনে আমার কোন জায়গা নেই।

মাঝে মাঝেই আমার মনে হয় কি করে আমি ইস্ট তিমোরে বেঁচে ছিলাম। বছর তিনেক আগে আমি ইস্ট তিমোরে ছিলাম, রাষ্ট্রসংঘের কাজে। ওখানেও আমি আমার কাজের কারণে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলাম। স্থানীয় মানুষের অসহনীয় দুর্দশা প্রত্যক্ষ করেছিলাম। "উন্নয়ন' বিষয়টির সমস্ত দিক সম্পর্কেই বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েছিলাম। কিন্তু এই হতাশা কে সেবার আমি জয় করে ছিলাম, একটা কাজ করে, আমি আমার গবেষণার প্রস্তাব লিখে ছিলাম তখনি। নি:সন্দেহে তিমোরের মানুষ দের সঙ্গে একাত্ম বোধ করতাম একটাই কারণে। যে সমাজব্যবস্থা, যে সব প্রক্রিয়া, তিমোরকে প্রতিনিয়ত ধর্ষন করতো, ঠিক সেই সমস্ত সামাজিক প্রÏ&#৩৪৭;²য়াই পালেস্তিনের বীভৎস দুর্দশার কারণ। তবু ইস্ট তিমোরে আমি গেছিলাম একজন বহিরাগত হিসেবে, সেখানে বহিরাগত হিসেবেই আমায় থাকতে হয়েছে, একটা মানসিক দূরত্ত্ব হয়ত সবসময়েই ছিলো, এই মানসিক দূরত্ব খুব স্বাভাবিক ভাবেই পালেস্তিনে ও রামাল্লায় আমার ছিল না।

মানুষ সবসময়েই শেখে, আমি যতবার বিভিন্ন দেশে গিয়েছি, দীর্ঘ সময় ধরে থেকেছি, সব সময়েই আমি কিছু না কিছু শিখেছি, এবং সেই শিক্ষা আমার সর্বক্ষণের সঙ্গী। অনেক শিক্ষাই মানুষ কে মানুষ কে গ্রহণ করতে বাধ্য হয়, হয়তো সবটা না বুঝেই। এই সব শিক্ষার অভিঘাতেই একটি সাধাসিধে কিশোর থেকে আজকে এই ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছি। অভিজ্ঞতার শিক্ষা সবসময়ে খুব মোলায়েম হয় না, তবে আমার তাতে আপত্তি নেই। পলায়ন প্রবৃত্তি একধরণের পরাজয় স্বীকার, তবে কখনও কখনও একটা বিষয় থেকে মন কে সরাতে না পারলে, কিছুটা পালাতে না পারলে, সে পরাজয় কে সম্পূর্ণ রূপে এড়ানো যায় তা নয়। তবু কি করব, মধ্যপন্থা খুঁজে পাওয়ার পদ্ধতি আমার ঠিক ভাল জানা নেই। তবে এই বারে রামাল্লায় আমায় এই সব কঠিন শিক্ষা পেতে আমায় খুব বড় দাম দিতে হয়েছে, তার মধ্যে সবচেয়ে যন্ত্রণাদায়ক হল,পালেস্তিনের এই অবস্থার থেকে মনটাকে কিছুক্ষণের জন্য সরিয়ে জীবনটাকে একটু গড়েপিটে নেওয়ার একটা সামান্য দ্বিতীয় সুযোগ আর জুটলো না।

যাই হোক আমার যাওয়ার সময় হয়ে এসেছে, ওয়েস্ট ব্যাংক,পালেস্তিন ছেড়ে আমায় এই বার যেতে হবে, আমি জানিনা আমি কোথা থেকে কোথায় যাচ্ছি। যে শহর যে দেশ ছেড়ে আমি যাচ্ছি, সে এক মৃত্যু উপত্যকা, তাকে আমি এক ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যে আমি ছেড়ে যাচ্ছি, এই দেশটির নি:সঙ্গ মৃত্যুর পরে সারা পৃথিবীতে প্রতিদিন এই দেশের স্মৃতিতে নি:শব্দ শবযাত্রা সংগঠিত করার দায়িত্ত্ব আমি সম্ভবত এড়াতে পারব না।ছেড়ে যাওয়া সহজ কথা নয়, আরো কঠিন হয়ে উঠেছে, কারণ আমি যে মেয়েটিকে এখনো ভালবাসি, তাকে ছাড়াই আমায় ফিরে যেতে হচ্ছে। আমাদের সম্পর্ক ভেঙ্গে গেছে। আমি যার সঙ্গে আমার স্মৃতি,সত্ত্বা,ইতিহাস ভাগ করে নেব ভেবেছিলাম, তাকে আমায় ছেড়ে যেতে হচ্ছে। আমার ধারণা ছিল পালেস্তিনে থাকতে থাকতে আমরা দুজনে নিজেদের আরও ভালবাসতে শিখব, সে আর হল না। এই সম্পর্কটির মৃত্যু হল সম্ভবত আমারই জন্যে, পালেস্তিনের দুর্বিষহ অবস্থা ধীরে ধীরে আমাকে গ্রাস করেছিল, তার থেকে বেরোতে পারলাম না বলেই হয়ত এই ঘটনা ঘটে গেল। পালেস্তিনের রাজনৈতিক অবস্থা, রামাল্লায় টিঁকে থাকতে চাওয়া একজন বহিরাগত পালেস্তিনীয়র সংকট ধীরে ধীরে আমার নিজের ব্যক্তিগত সংকটে রূপান্তরিত হল। দেশ নেই আমার, মনে মনে সমস্ত আবেগ কে জড় করে রাখতে চেয়েছিলাম যে ঘরে,সে ঘর ও ধ্বংস হয়ে গেল।

"তোমাকে সরাসরিই বলি, এখানে এখনই বলতে ইচ্ছে করছে, আমি খুব দু:খিত। নিজেদের কে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে দেখেও, আমি দুর্বল ছিলাম, রুখতে পারি নি। আমি কখনই আশা করি নি, আমার সঙ্গে সঙ্গে তুমিও বিষন্নতার গহ্বরে প্রবেশ করবে, কারণ তা মৃত্যুর নামান্তর। ঘড়ির কাঁটা কে যদি পিছিয়ে নিয়ে যেতে পারতাম, তুমি আমাকে যে ভালবাসা দিয়েছিলে, যে স্বপ্ন দিয়েছিলে, সাহস করে বলি, যে আনন্দ দিয়েছিলে তা যে আমি আর কখনও পাই নি, সেটা হয়ত তোমার এবং নিজের কাছে প্রমাণ করার আরেকটা সুযোগ পেলে ভাল হত। এই শুন্যতাবোধ অতিক্রম করে উঠতে পারিনি এখনও।'

পালেস্তিন ছাড়ার এক সপ্তাহ আগে, আমি টুল্করামে গেছিলাম, আত্মীয় স্বজনের কাছে বিদায় নিতে। আমার এক আত্মীয়ের বাড়িতেই ছিলাম, খুবই দরিদ্র এঁরা। অর্থনীতির হিসেবে দারিদ্র সীমার নীচেই হবেন, তবে টুল্করামের সব ভালমানুষ লোকের মতই এঁদের জীবন খুব ধীরে সুস্থে চলে, মানে এনারাই চালান। কোন তাড়াহুড়ো নেই, গয়ংগচ্ছ জীবন। আমি ক্লান্ত হয়ে পড়ি খানিকটা, কিছুক্ষন পরেই কিছুই আর বলবার বা করবার মত থাকে না! রামাল্লা থেকেই আমার আর এক ভাইয়ের সঙ্গে গাড়িতে করে টুল্করাম গেছিলাম। সে দিব্য পয়সা করেছে, রামাল্লাতেই থাকে, তার দামী এসইউভি গাড়িতে চেপেই গেলাম দুজনে। রামাল্লায় মাস তিনেক ওর বাড়িতেই ছিলাম, কিন্তু ওর সঙ্গে আমার বেশ কয়েক সপ্তাহ দেখাই হয় নি। কোনদিনই ঠিক এই ভাইটিকে আমার তেমন পোষায় নি। ও আমেরিকা থেকে রামাল্লায় ফিরেছে স্রেফ টাকা কামানোর জন্যে। আমার কাছে ওর মনটা এক দিক থেকে "মৃত'। ওর বাড়িতে গিয়ে ওঠার সময়েই আমি বুঝতে পেরেছিলাম, এই সুখের "মৃত্যু' ওর কাঙ্খিত। আমি যে নিজে, সামান্য অন্য অর্থে, ধীরে ধীরে অন্য এক "মৃত্যুর' দিকে এগোচ্ছিলাম সে কথা স্বীকার করার সাহস হয় নি তখন।

এই আত্মীয় ভাইটির দামী গাড়িতে আমি যখন চড়ে বসলাম, তখন আমরা আবিষ্কার করলাম যে আমাদের জামা কাপড় কাকতালীয় ভাবে একই হয়ে গেছে। এক চোট হাসি ঠাট্টা হল। গোলাপী শার্ট আর সাদা ট্রাউজার পড়ে আমরা যখন এক সঙ্গে যাচ্ছিলাম, তখন স্থানীয় দের অনভ্যস্ত চোখ হয়তো আমাদের এক জোড়া সমকামী পুরুষ ভাবছিল। কথায় কথায় জানলাম ওর আর আমার জীবনে আরো কিছু অনাকাঙ্খিত মিল রয়েছে। ওর সম্পর্কটিও ভেঙ্গে গেছে, আমিও বললাম, লরা এবং আমার সম্পর্কও ভেঙ্গে গেছে। কথা বলতে বলতে ,দুজনের মধ্যেই জমে থাকা বিরক্তি এবং অভিযোগ বেরিয়ে এল কিছুটা। বেরিয়ে এল যে রামাল্লায় আমাদের দুজনেরই মোটে ভাল লাগছে না। যা বোঝা গেল রামাল্লার বাইরে আমরা হয়ত আরেকটু ভাল থাকতাম। আমরা দুজনেই কিছুটা হারিয়ে যাওয়া মানুষ। ও যে পদ্ধতিতে বাকি জীবন কাটানোর কথা ভাবছিল, আমি তার সঙ্গে একমত হতে পারলাম না। ওকে বোঝাতে চাইলাম যে আমার কাছে আমার ইতিহাস ও স্মৃতির কি মূল্য। ও বুঝলো বলে মনে হয় না, আমায় শুধু বললো, রামাল্লায় আর ফিরে না আসতে। দ্বিমত হতে বাধ্য হলাম।

ওর ভেঙ্গে যাওয়া সম্পর্কটাকে ও হয়ত কেবলমাত্র আরেকটি ব্যর্থ প্রেম হিসেবে দেখছে, আমার পক্ষে সেই পদ্ধতি অবলম্বন করা ঠিক সম্ভব হয় নি। এই সব কথাবার্তার মধ্যে আমি কাঁদতে শুরু করলাম, কিছুতেই আর কান্নাটাকে আটকে রাখতে পারলাম না। ও আমায় যখন জিজ্ঞাসা করল যে যা হারাবার তা তো হারিয়েছে, কিন্তু আমি কিছু পেয়েছি কিনা। তখন আমি মাথা গরম করে চিৎকার করে ওকে জানিয়ে দিলাম যে , যদিও শুধু সাফল্য এবং অর্থোপার্জন আমার জীবনে, প্রাপ্তির মাপকাঠি নয়, তবুও দু একটি জিনিস আমি জীবনে অর্জন করেছি। যদিও আমার কাজের মধ্যে আমি আমার ইন্সটিটিÏউটের প্রচুর সমালোচনা করতে বাধ্য হয়েছি, তবু আমার কাজ আমার ইনস্টিটিউট-এ, বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশংসিত। একার হাতে আমি একটি পত্রিকা প্রকাশ করেছি, যে বিষয়ের পত্রিকা আমি ছাড়া আর কেউই করত না, যদিও এর মধ্যে প্রকাশিত সমস্ত লেখার জন্য আমি কারও কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য নই, তবে এর সমস্ত প্রকাশিত লেখার জন্য সমস্ত দায়িত্ত্ব আমার। আমি সরাসরি বললাম যে পালেস্তিনের অর্থনীতিকে আমার অনেক কিছু আছে দেওয়ার মত, অর্থনীতি বলতে আমি অবশ্য রামাল্লার যাবতীয় সি ইও আর মার্কেটিং এর মুর্খ গুলোর কথা বলছিনা, আমি বলছি, তাঁদের কথা যাঁরা অর্থনীতির ভিত্তি সেইসব নামহীন মানুষদের কথা। আরো বললাম যে আমারই ইনস্টিটিউটে আমি যে কোন দিন ফিরে যেতে পারি, বা পশ্‌চিমের যে কোন ইনস্টিটিউট এ ফিরে গিয়ে আমি ভাল মাইনের কাজ পেতে পারি। এই গুলো এক অর্থে সাফল্য ঠিক ই, তবে এই সাফল্য হাতে পেয়ে আমি ক্লান্ত। এও জানালাম যে তথ্য ছাড়া গবেষণা হয় না, পি এইচ ডিগ্রী অ¿তত হয় না, সেই তথ্য কষ্ট করে হলেও আমি সংগ্রহ করে নিয়েছি, এই ক মাসে আমার জীবনের চাপান উতোর সত্ত্বেও, আমি জানি এই পি এইচ ডি শেষ করতে পারব। টুল্করামের চেক পোস্টে পৌঁছনোর ঠিক আগে আমি ওকে বললাম, আমি শুধু ভাল থাকতে চাই, ভাল থাকার অধিকার সবার মতই আমারও আছে।

টুল্করামে ঢোকার আগের শেষ চেকপোস্টটি বড় কঠিন ঠাঁই। ইজরায়েলি নাম্বার প্লেটের গাড়িতে যাত্রী একজন জার্মান আর একজন আমেরিকানের পক্ষেও কঠিন। বেশির ভাগ সময়েই টুল্করাম হল একেবারে ঘেরা মিলিটারি এলাকা। আমার জার্মানির নাগরিকত্ব এবং পাসপোর্ট কিছু ক্ষেত্রে আমায় রক্ষা করে, তবু আমি যে কোন চেকপোস্টেই , প্রথম থেকে মোটেই ভয় পাইনি ভাব দেখাতে গিয়েই যেন একটু বেশি ঘাবড়ে যাই। আমরা পাসপোর্ট দিতেই, দায়িত্ত্ব প্রাপ্ত সৈনিক আমাদের আরবিতে জিজ্ঞাসা করল, আমরা কোথাকার লোক। সঙ্গে সঙ্গে আমার ঐ ভাই বলে কি, "মানে আপনারা ঠিক কি জিজ্ঞাসা করছেন, আমাদের কোথায় জন্ম, না আমরা কোথায় থাকি, না এই এখন আমরা কোথা থেকে আসছি, না আমাদের পূর্বপুরুষ কোথাকার লোক ছিলেন, মানে একটু খোলসা করে বলবেন?' এবং গোটাটা বলল ইংরেজিতে। যে কোন চেকপোস্টে আমার বেশ ভয় করে, কিন্তু এক্ষেত্রে এই সব কান্ড দেখে আমি না হেসে পারি নি।

দিন দুয়েক পরে আমি রামাল্লায় ফিরলাম, আসার সময়ে এলাম বাসে। চার ঘন্টা সময় লাগল। এমনিতে দেড় ঘন্টার বেশি লাগার কথা নয়। তবে কোন কিছুই তো স্বাভাবিক নয় আজকাল। রাস্তায় চেকপোস্টে অপেক্ষা করতে করতে আমি ভাবছিলাম সেই বছর ছয়েক আগে আমি যখন জীবনে প্রথম চেকপোস্টের মধ্যে দিয়ে যেতে বাধ্য হই, তখন একটি বড় শিক্ষা হয়েছিল আমার। বই পড়ে, ক্লাস করে যতই শিক্ষিত হওয়া যাক না কেন, এই চেকপোস্টের মধ্যে দিয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতার জন্যে তৈরি হওয়া অসম্ভব। এই বিশেষ পরিস্থিতিটির মধ্যে দিয়ে না গেলে ক্ষমতা আর ক্ষমতাহীনতা কাকে বলে ঠিক পুরো বোঝা যাবে না। ছ বছর আগে আমি যখন এসেছিলাম, তার আগেই 'মধ্যপ্রাচ্য' সম্পর্কে পুঁথিগত বিদ্যে আমার ছিল কিছু, তবে ক্ষমতাহীনতা এবং ক্ষমতা সম্পর্কে স্বাভাবিক ভাবেই আমার ন্যুনতম ধারণা ছিল না। তখন আমি যদিও সন্দেহ করেছিলাম আমাদের প্রোফেসররা ঠিক পুরো ছবি টা দিচ্ছেন না, সমস্যাটা ঠিক "ইতিবাচক বাস্তববুদ্ধি',"হারানো সুযোগ' সংক্রান্ত নয়, শুধু 'সঠিক নির্ণায়ক' খুঁজে বের করার নয়, তবু ঐ চেকপোস্টে অপেক্ষা করতে করতে আমি এই সব ভিত্তিহীন তত্ত্বের মূল্য সম্পর্কে ভাবছিলাম, মানে না ভেবে পারছিলাম না। অর্থনীতিতে গবেষণা শুরু করার কিছুদিনের মধ্যেই এই নিজের কাজের প্রয়োজনেই আমাকে এই সব তত্ত্বের থেকে মুখ তুলতে হয়েছিল, 'আধুনিক অর্থনীতি' বিষয়ের আওতার বাইরে গিয়ে আমাকে কাজ করতে হয়েছে। 'আকাডেমিক' আর 'বুদ্ধিজীবি' এই শব্দ দুটো আমার সম্পর্কে কেউ ব্যবহার করলে আমার মনে হত আমাকে অপমান করা হচ্ছে।

তত্ত্বের গুরুত্ত্ব আমি অস্বীকার করি না। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্ব সমূহ কিন্তু আকাডেমিয়ার বাইরে তৈরি হয়েছে। আকাডেমিয়া একটি পদ্ধতি হতে পারে, দুর্বল পদ্ধতি, এবং সম্ভবত এর গুরুত্ব ক্রমশ কমছে। আকাডেমিয়া ঠিক আদর্শবাদের জায়গা নয়। তত্ত্বের প্রয়োজন আছে, আমাদের অনেক কিছু শেখা বাকি, সত্যি বলতে কি, আমি মনে করি মানুষের সম্মিলিত অভিজ্ঞতা ও শিক্ষা, পরিবর্তনের আবশ্যিক পূর্বশর্ত। তবে আজকাল প্রচুর তত্ত্ব গজাচ্ছে, তারা অনেকাংশেই আদৌ বোধগম্য নয়, সমস্যাকে অকারণে রহস্যাবৃত করে , সর্বোপরি, দুনিয়ার অবিচার অনাচারকে তাত্ত্বিক নিরাপত্তা দেয়। সুবিধাপ্রাপ্ত এবং বিচ্ছিন্ন আকাডেমিকরা যে সব তত্ত্ব প্রসব করেন অনেক সময়েই সে সব নেহাত ই পেশাদারী, ব্যবসায়িক কারণে, সে সব কখনও কখনও কৌতূহল উদ্রেক করে, ভাবায়, কখনো আদৌ করে না। তবে যদি বাস্তবের সাধারণীকরন ,বিমূর্তীকরণ দ্বারা আরব্ধ তত্ত্বের মূল উদ্দেশ্য হয় বাস্তব অবস্থার পরিবর্তন তাহলে তত্ত্বের অধিকার থাকে মানুষের হাতে। আমাকে অনেকে একটু 'বেশি বুদ্ধিজীবি' , আকাডেমিক বলে থাকেন, তবে আমি নিজের কাছে পরিষ্কার, আমি সাধারণ মানুষের জন্য কাজ করতে চাই, নইলে এত সব তত্ত্ব সম্পূর্ণ অর্থহীন, আমি জানি এই কাজ করতে গেলে আমাকে অসংখ্য প্রশ্নের আর দ্বন্দ্বের সমাধান করার প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে, তবু আমি মনে করি, এটা সম্ভব।

রামাল্লা ছেড়ে চলে যাওয়ার আগে, ভাবছি কি ছেড়ে যেতে হচ্ছে আমাকে, আর কোথায়ই বা যাব? রামাল্লায় আমি নিজের জায়গা খুঁজে পেতে চেয়েছিলাম, আমি ঠিক ব্যর্থ হয়েছি বলছি না, তার একমাত্র কারণ হল, রামাল্লার বদলে তো আর কোন জায়গা তো খুঁজে পাই নি। আবার ব্যর্থ হইনি বললে মেনে নিতে হয় যে আমি যে দেশ প্রাণপনে খুঁজছি তাকে হাতের মুঠোয় পেয়েও আমি আপন করতে পারলাম না। বার বার এই সমস্ত ঘটনা আমাকে মনে করিয়ে দেয়, আমার কোন বাসা নেই, কোন ঘর নেই, কোন দেশ নেই। আমার 'সত্ত্বা' বা 'আইডেন্টিটি' সম্পর্কে কথা বলতে আমি ঠিক স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি না। জন্মসূত্রে পালেস্তিনীয়, আমার অভিজ্ঞতা আমাকে বস্তুবাদী করেছে আর তার সঙ্গে এনে দিয়েছে অসংখ্য সমস্যা এবং দ্বন্দ্ব, অদূর ভবিষ্যতে অন্তত এদের সমাধান হওয়ার সম্ভবনা নেই। বাস্তবের সঙ্গে একটা বোঝাপড়ায় আসতে গেলে আমাকে হয়ত এই সিদ্ধান্তে পৌঁছতে হবে আমার কোন 'সত্ত্বা' নেই। এছাড়া 'নিজের সংস্কৃতি' নামক বস্তুটি সম্পর্কেও কথা বলতে আমার কুন্ঠা হয়। আমার আবার কি ই বা সংস্কৃতি আছে? ঐ "সংকর সংস্কৃতি'র উত্তর আধুনিক ধারণাটি সম্পর্কে আমার উৎসাহ কম। আমি কোনদিন কোন সমাজের অন্তর্ভুক্তই ছিলাম না, যে একটা সংস্কৃতি গ্রহণ করব। যদি "সত্ত্বার' অর্থ হয় কোন কিছুর অঙ্গীভূত হওয়া তাহলে বলতে হয় আমার ক্ষেত্রে এই 'কোন কিছু' র কোন বাস্তব অস্তিত্ত্ব নেই। আমার "সত্ত্বা' এই দিক থেকে দেখলে, আমার বেঁচে থাকার সমস্ত অর্থ কে অস্বীকার করে। শুধু জানি আমার সচেতনতা ই আমার একমাত্র সম্বল, এই সচেতনতার সঙ্গেই আমি থাকব, অবশ্যই কিছু শর্তসাপেক্ষে। এই সচেতনতাকে আমি বেছে নিই নি, আমার বাছার উপায় ছিল না। বাস্তবের, জীবনের, অভিজ্ঞতার, পারিপার্শ্বিকের চাপে এবং প্রতিÏ&#৩৪৭;²য়ায় এই সচেতনতা তৈরী হয়েছে, হতে শুরুও হয়েছিল আমার মতামত ছাড়াই,বড় শ্লথ,ক্রমিক এবং যন্ত্রণাদায়ক এই প্রক্রিয়া। যেদিন এই সচেতনতা তার চলচ্ছক্তি হারাবে, সেইদিন সম্ভবত: কোন স্থানু জড় মুহুর্তে আমার মৃত্যু হবে।

"মানুষ তার সচেতনতা দিয়ে অস্তিত্ত্ব গড়ে না, তার সামাজিক অস্তিত্ব তার সচেতনতা গড়ে তোলে'। এই উক্তি টি মার্ক্স এর। আমি প্রায়ই ভাবতাম "জার্মান ইডিওলজি'(১৫) রচনায় মার্ক্স কেন একথা বলেছেন। আমার জীবন সম্ভবত এই উক্তির উদাহরণ স্বরূপ। বহুদিন আগে এই রচনা পাঠের সময় থেকেই আমার এই বাক্যবন্ধটি আমায় খুব ভাবিয়েছে। আজও ভাবায়, তবে আজকাল শুধু ভাবায় না, খানিকটা অস্বস্তিকর ভাবে আমাকে এর সত্যতা স্বীকারে বাধ্য করে। এই বোধটিই হয়ত আমার এইবারের রামাল্লা ও পালেস্তিন বাসের প্রধান শিক্ষা। এই শিক্ষা আমার মনের মধ্যে গভীর ভাবে গেঁথে রয়েছে। আরেকটু সহজে কি শিক্ষা পেতে পারতাম না, এই যন্ত্রনা, দুর্দশা ছাড়া কি এই শিক্ষা পাওয়া সম্ভব ছিলো না? আচ্ছা আমিই একটু আগে বলেছিলাম না, কঠিন অভিজ্ঞতার মাধ্যমে মানুষ যা শেখে তাই তার জীবনের বড় শিক্ষা। ধুর, উল্টোপাল্টা বকছি, চুপ করা উচিত এইবার।

এই সব ভাবনা চিন্তা থেকে খানিকটা মুক্তি পাওয়ার জন্যেই এইবার আমার পালেস্তিন থেকে ফেরার কথা লিখব। এইবার আমি এয়ারপোর্টে যাব। রাস্তা দিয়ে দু পাশ দেখতে দেখতে আমি ফিরবো। এই বিমানবন্দরেই কয়েকদিন আগে আমার দু:স্বপ্নের মত ভয়াবহ অভিজ্ঞতা হয়েছিল। এই অপূর্ব দেশ দু চোখ ভরে দেখতে দেখতে আমি বিমানবন্দরে ফিরব, কি আর বলব, আমার আর এদেশে থাকা হল না। তবে তেমন ভয় আর করছেনা, আমি জানি আমায় ফিরতে হবে, এই বিমান বন্দরের মধ্যে দিয়েই, শুধু আশা করি আরেকবার আমায় একই রকম ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে যেতে হবে না।

আমি জানি এই চলে যাওয়া মানসিকভাবে খুব সহজ হবে না, সম্পূর্ণ রূপে বিধ্বÙত হয়ে ফিরে যাওয়া খুব সহজ নয়, মেনে নিতে খুব কষ্ট হচ্ছে, এই খানে আমি আমার দেশ খুঁজতে এসেছিলাম, ঘর খুঁজতে এসেছিলাম এবং আমি সম্পূর্ণ বিফল। ফেরাও খুব সহজ হবে না, কারণ এই পরাজয় এবং হারানোর স্মৃতি আমায় তাড়া করে ফিরবে। এই সেই দেশ যেখানে লরাকে হারিয়েছি আমি। পালেস্তিন থেকে ফিরে আমি যেখানে যাব, আমি তো সেখানেও দলছুট,নিজেরই অসংখ্য শব কাঁধে নিয়ে দিকভ্রষ্ট হয়ে ঘুরে বেড়াতে হবে আমায়। মুক্তি নেই। না: এই ফিরে যাওয়া সম্পর্কে আর লিখব না, যা লিখেছি এইখানে, এর অনেকটাই খুব ব্যক্তিগত, তবু না লিখে পারিনি, ফিরে যাওয়া সম্পর্কে লিখলে সেটা আরো ব্যক্তিগত হবে।

একটু বিশ্রাম চাই, খুব ক্লান্ত লাগে, ঘুমোতে চাই আমি, গত ছ মাসে একেবারে ঘুমোতে পারিনি। ভোর চারটের প্রার্থনা আমায় জেগে জেগেই শুনতে হয়েছে। একদম ঘুমোতে পারি না। আমার ভাবতে শেখা উচিত নিজের দেশ না থাকা সত্ত্বেও আমার যা আছে সে বড় কম নয়, নতুন করে আমায় ঘুমোতেও শিখতে হবে। না চেয়ে ভালবাসতে শিখতে হবে, ভালবাসাও তো জরুরী।
দ্বন্দের সমস্যা হল, তাকে হয় সমাধনের পথে যেতে হয়, নতুবা ধ্বংস হতে হয়। লরা যদি থাকত এই মুহুর্তেই হয়তো বলে উঠতো "লা লুচা কন্টিনিউয়া কম্পেনেরো' - যদি পারতাম তোমার সঙ্গেই আবার লড়াইয়ে নামতাম বন্ধু- আমাকেও চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে একটা পরিস্থিতি গড়ে তোলার জন্য যাতে আমাদের আর নিজেদের শব নিজেদের কাঁধে নিয়ে বয়ে বেড়াতে না হয়। এটুকু, অন্তত এই টুকু, আমাদের করতেই হবে।

ব্যক্তিগত ভাবে অবশ্য আমার লড়াই টা শুধু কিছু "হয়ে' ওঠার নয়, কিছু "বাদ দেওয়ার লড়াই" ও বটে। আপাতত শুধু ঘুমোতে চাই। ঘুম থেকে উঠে নতুন স্মৃতিমন্থনের পালা। কি হারালাম তার স্মৃতি, কি এখনো আছে তার স্মৃতি।

রামাল্লা ১৩/০৮/২০০৬

" শব, অসংখ্য শব, কাঁধে নিয়েই জন্ম আমার
এই জন্মের অথবা আগমনের উপরে কোন নিয়ন্ত্রন ছিল না আমার,
প্রজন্মান্তরের এক শিকল আর আমারই ইতিহাসের শিকার আমি,
পূর্বপুরুষ দের জীবন থেকে বিরতিহীন।
আমার পরের বা তার ও পরের প্রজন্মের শিশুরা, ওদেরও মুক্তি নেই।
অল্পকিছুদিন পরেই, ঠিক আমার মতই তাদেরকে বুঝতে হবে, ঠিক আমি যেমন উদগ্রীব হয়ে বুঝে নিতে বাধ্য হয়েছিলাম,
শব, অসংখ্য শব কাঁধে নিয়ে জন্ম তাদের।'
- কামাল নাসির(১৬)




অনুবাদকের ম¾তব্য - আমার অনুবাদের অভিজ্ঞতা সামান্য এবং মধ্যপ্রাচ্যের জটিল রাজনীতি সম্পর্কে ধারণা প্রচলিত গণমাধ্যমের উপরে সম্পূর্ণ নির্ভরশীল। এছাড়াও যেহেতু এই গদ্যটি ঠিক প্রকাশের জন্য রচিত নয়,সর্বোপরি প্রবন্ধ হিসেবে অনুদিত হবার জন্য লেখা নয়, তাই রচনাটির কিছু সমস্যা আছে। এর কিছুটা ইচ্ছে করেই আমি সম্পাদনায় বাদ দিই নি। লেখক সোভি সামুরের সঙ্গে অনুবাদের এই প্রচেষ্টা নিয়ে আলোচনার সময়ে মনে হয়েছে, উনিও অতিরিক্ত সম্পাদনায় তেমন আগ্রহী নন। পালেস্তিনের অসংখ্য স্বাধীনতা প্রেমী, স্রেফ দুর্দশাগ্রস্ত, অর্থনৈতিকভাবে অনগ্রসর মানুষের সঙ্গে প্রতিরোধের রাজনীতিতে যেমন নিজেকে সামিল মনে করছেন, তেমনি অসম্ভব ব্যক্তিগত ও গভীর ক্ষত,সংশয়, বিরক্তি, ক্রোধ, অভিমান, দু:স্বপ্ন, স্ববিরোধ,আত্মানুসন্ধান, স্মৃতি বিস্মৃতি, সামান্য হলেও রসসিঞ্চিত রম্যভাব, প্রতিরোধ কিংবা অধিগ্রহণ এর রাজনীতি সম্পর্কে এক দৃষ্টিভঙ্গীর উত্তরণ, এবং এই সমস্ত কিছুরই খানিকটা পুনরাবৃত্তি এই রচনায় স্বমহিমায় উপস্থিত। কি বোর্ডের টরে টক্কায় সমুদ্রের ঢেউ এর মত শব্দের পরে শব্দ আছড়ে পড়ে যে সব বাক্য তৈরী হয়েছে, তারা যেন এক অসম্ভব জেদে ভাষাকে, দেশকে, জাতিকে , সীমান্তকে, ব্যক্তিকে অতিক্রম করতে চায়। এই ভাষা মান্টোর টোবা টেক সিং দের ভাষা। সঙ্গী শুধু এক কালের অধিকারের বোধ, যে বোধ, স্থান, স্মৃতি, সংস্কৃতি, ভাষা আক্রমণের-অধিগ্রহণের,জাতিভেদের, রাষ্ট্র তথা নিয়ন্ত্রন গঠনের, আত্মবিস্মৃতির, ইতিহাস বর্জনের প্রক্রিয়াসমূহকে কতগুলি কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। কারণ আর কিছুই নয়, বিব্রত আর বিষাদগ্রস্ত অথচ ক্ষুরধার বিশ্লেষণক্ষম একটি মন লিখছে, কথা বলার মত করে লিখছে, নিজের আর ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের জন্য, হয়ত সচেতন বুদ্ধিজীবির অদম্য আকাঙখায় কোন ভবিষ্যতের বিশ্ব নাগরিকের জন্য। এই লেখাটি অনুবাদ করতে উদ্যোগী হয়েছিলাম এই কারণেই। বাংলাভাষার পাঠক-পাঠিকাদের কাছে নতুন কিছু নিয়ে আসার দাবী করিনা, করার স্পর্ধা নেই। পালেস্তিনের মানুষের জন্য সমবেদনা সংগ্রহ এই প্রচেষ্টার উদ্দেশ্য নয়। কয়েক প্রজন্ম ধরে স্থানচ্যুত বন্ধুর কলম বেচে মূলধারার সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে অথেন্টিসিটির প্রতিযোগিতায় নামার আগ্রহ আমার নেই। তার জন্য আমি বা আপনারা ছাড়াও, বহু ভাষায় বহু লিখিয়ে,সাংবাদিক,বুদ্ধিজীবি মানুষের অসংখ্য কলম রয়েছে, রয়েছেন তাঁদের বিশ্বজোড়া পাঠক পাঠিকা, বাঁচতে গিয়ে,কথা বলতে,কথা শুনতে,হারতে,হারাতে গিয়ে যারা কাছাকাছি আসছেন।

অনুবাদকের সংক্ষিপ্ত টীকা

(১) হুগো অফ সেন্ট ভিক্টর - ইউরোপের ধর্মতাত্ত্বিক, দার্শনিক, লেখক (১০৯৬ - ১১৪১)। এডোয়ার্ড সাইদের 'ওরিয়েন্টালিজম' (রুটেলেজ এন্ড কীগান, ১৯৭৫, পুন:প্রকাশ পেঙ্গুইন ১৯৯৫), গ্রন্থে ব্যবহতৃ। পৃ -২৫৯। সাইদ উদ্ধৃতিটির সূত্র হিসেবে উল্লেখ করেছেন জার্মান ফিলোলজিস্ট এরিক অয়েরবাখ এর রচনার কথা।
(২) স্যামুয়েল বেকেট - ওয়েটিং ফর গোদো, ১৯৫২, প্রথমে ফরাসি ভাষায় লিখিত ও প্রকাশিত।
(৩) সাফাদ - ১৯৪৮ এর যুদ্ধে ইজরায়েলে অন্তর্ভুক্ত পালেস্তিনীয় বাজার শহর। হাইফার পূর্বে অবস্থিত। এখন কাবালা ধর্মস্থান ও শিল্পকলা কেন্দ্র।
(৪) শব্দের সঙ্গে জড়িত ধারণায় গুরুত্ত্ব তথা স্বাতন্ত্র আরোপের জন্য লেখক অনেক সময়েই আইটালিক্স ব্যবহার করেছেন।
(৫) উন্নয়ন - ডেভেলপমেন্ট বিষয়। অধুনা পৃথক পঠন পাঠন হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগ গুলিতে বা পাঠক্রমে অন্তর্গত নাও হতে পারে।
(৬) ২০০৬ এর জুন মাসে গাজার রাফা অঞ্চল থেকে টানেলের মধ্যে দিয়ে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে ইজরায়েলের কারেম শালম থেকে ইজরায়েলি কর্পোরাল গিলাদ শালিত কে অপহরণ করে পালেস্তিনের কিছু যোদ্ধা। গাজার উপরে বোমা বর্ষন শুরু করে ইজরায়েলের সেনা বাহিনী। একটি বিদ্যুত স্টেশন সম্পূর্ণ অকেজো হয়ে পড়লে কিছু আ¿তর্জাতিক মিডিয়া ইজরায়েল রাষ্ট্র এর সমালোচনা করে। তখন থেকে খবরের কাগজে ও টেলিভিশন এ "কালেক্টিভ পানিশমেন্ট' বা 'যৌথ শাস্তি' শব্দ গুচ্ছ টি নতুন করে ব্যবহতৃ হতে শুরু হয়।জুলাই এর শুরুতে লেবানন-ইজরায়েল সীমান্তে হিজবুলার সঙ্গে একটি সংঘর্ষে , হিজবুলা দুজন ইজরায়েলি সৈনিক কে বন্দী/অপহরণ করে। ইজরায়েলি সেনা বাহিনী ১২ জুলাই ২০০৬ থেকে বেইরুটে ও লেবাননের অন্যত্র বোমাবর্ষণ শুরু করে। হিজবুলা পাল্টা রকেট/মিসাইল আক্রমণ চালায় ইজরায়েলের শহর গুলিতে। সাফাদেও মিসাইল আক্রমণ ঘটে। (সূত্র: গার্ডিয়ান, বিবিসি, ফ্রন্টলাইন)
(৭) বেইরুট শহর মধ্য প্রাচ্যে সবচেয়ে বেশি 'উদার' শহর বলে পরিচিত। এই শহরেই ২০০৫ এর ফেব্রুয়ারি মাসে "সেদার বিপ্লবের' মাধ্যমে নতুন ক্ষমতায় এসেছেন লেবাননের নতুন সরকার।
(৮)পালেস্তিনীয় রাজনীতিতে লেবাননের স্থান অনন্য। ১৯৪৮ এ , ইজরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকে লেবাননে প্রচুর পালেস্তিনীয় শরণার্থী এসে পড়েন। অসংখ্য সংঘর্ষ,যুদ্ধের ইতিহাসে দীর্ন লেবানন।
(৯)ল্যান্ড ডে - ৩০ মার্চ ১৯৭৬। এই দিনে ১৯৪৮ থেকে ইজরায়েলে অন্তর্ভুক্ত পালেস্তিনীয় অঞ্চল গুলির মূলত: কৃষিজীবি পালেস্তিনীয় আরব অধিবাসীরা একটি ধর্মঘটের ডাক দেন এবং নতুন করে জমি অধিগ্রহনের প্রচেষ্টা র প্রতিবাদে সামিল হন। আন্দোলন প্রথম শুরু হয়েছিল সাকনিন, আরাবে, ডেইর হানা এই গ্রাম গুলিতে। সে দিন ৬ জন ইজরায়েলের নাগরিক পালেস্তিনীয়, ইজরায়েলের সেনাবাহিনীর গুলিতে নিহত হন। পরবর্তী কালে পালেস্তিনের বিভিন্ন আন্দোলনে ল্যান্ড ডে একটি বিশেষ ভাবে স্মরণীয় দিন হয়ে ওঠে। (সূত্র -পালেস্তিন মনিটর)
(১০) ১৯৬৭ র ছয় দিনের যুদ্ধ।
(১১)গত জানুয়ারি মাসে, তেল আভিভ বিমানবন্দরে জিজ্ঞাসাবাদের সম্মুখে পড়েন সোভি।
(১২) ওয়েস্ট ব্যাংকে একটি বিশাল দেওয়াল গড়ে উঠছে ইজরায়েল রাষ্ট্র র উদ্যোগে।
(১৩) পালেস্তিনিয়ান ন্যাশনাল অথরিটি
(১৪) দ্বিতীয় ইন্তিফাদা - আরবি ভাষায় "ইন্তিফাদা'র অর্থ অভ্যুত্থান। এই দ্বিতীয় বা আল-আকসা ইন্তিফাদা জেরুজালেমে শুরু হয়েছিল ২০০০ সালের সেপ্টেম্বের মাসে।
(১৫)জার্মান ইডিওলজি - কার্ল মার্ক্স, ১৮৪৫
(১৬) কামাল নাসির (১৯২৫-১৯৭৩)- পালেস্তিনীয় কবি, পিএলও র রাজনৈতিক নেতা।

অনুদিত বিশেষ শব্দ/পরিভাষা তালিকা

সুবিধেভোগী - comprador
অধিগ্রহন - occupation
প্রক্রিয়া/ সামাজিক শক্তি - systemic forces
ইতিবাচক বাস্তববুদ্ধি - pragmatism
হারানো সুযোগ(রাজনৈতিক অর্থে) - lost opportunity
বিচ্ছিন্ন , বিচ্ছিন্নতা বোধ/বিচ্ছিন্নতা - alienated / alienation
সঠিক নির্ণায়ক - right parameters
অঙ্গীভূত - belonging
সচেতনতা - consciousness
হয়ে ওঠা - becoming
বাদ দেওয়া - unbecoming
প্রতিরোধ - resistance
সত্ত্বা - identity


Further Reading

Novels, Poetry etc.
- Ghassan Kanfani -Men in the Sun and other Palestinian Stories (transl. by Hilary Kilpatrick)
- Mahmoud Darwish et al.-Victims of a Map: A Bilingual Anthology of Arab Poetry
- Emile Habibi - The Secret Life of Saeed: The Pessomist
- Fawaz Turki - The Disinherited: Journal of a Palestinian Exile
- Sahar Khalifeh- The Inheritance (transl. by Aida Adib Bamia)
- Mahmoud Darwish- Memory for Forgetfulness: August, Beirut, 1982 (Paperback)
- Mahmoud Darwish - Unfortunately, It Was Paradise: Selected Poems (Paperback)

Online Sources, News etc:
- Middle East Research and Information Project (MERIP): Primer on the Uprising in Palestine
See also : Palestine, Israel and the Arab-Israeli Conflict - A Primer

- Regular updates, background information:
- Supports Israelis who refuse to join the army, website:
- The Palestinian Right to Return Coalition:
- Updates, news, background information:
- The Grassroots Palestinian Anti-Apartheid Wall Campaign:
- Palestinian Center for Human Rights:
- The Electronic intifada : background info, commentary etc:
- News, Commentary etc:
- Daily news on

History:
- Sami Hadawi - Bitter Harvest: A Modern History of Palestine, NY: Olive Branch Press, revised and updated ed. 1990.
- Walid Khalidi (ed.), All that Remains - The Palestinian Villages Occupied and Depopulated by Israel in 1948, Washington, D.C.: Institute for Palestine Studies 1992, 636 pp
- Ilan Pappe A History of Modern Palestine - One Land, Two Peoples (Paperback)

Films:
- Elia Suleiman -Chronicle of a disappearance
- Hany Abu-Assad - Paradise now
- James Longley - Gaza Strip
- John Pilger - Palestine is still the issue
- Mohamed Bakri - Jenin, Jenin

Miscelleneous.

- Rafi Segal (Editor), David Tartakover (Editor), Eyal Weizman (Designer) -
A Civilian Occupation: The Politics of Israeli Architecture (Hardcover)
- Arthur Neslen Occupied Minds- A Journey Through the Israeli Psyche (Paperback)
- Alternative Tourism Group- Tour Guide: Palestine & Palestinians
- Haim Gordon, Rivca Gordon, Taher Shriteh - Beyond Intifada: Narratives of Freedom
Fighters in the Gaza Strip (Hardcover)
- Joe Sacco - Palestine (Palestine explained in comic version)
- Julie Marie Peteet - Landscape Of Hope And Despair: Palestinian Refugee Camps (The
Ethnography of Political Violence) (Hardcover)

Since Oslo:
- Roane Carey (ed) - The New Intifada: Resisting Israel's Apartheid
- Tanya Reinhart - The Road Map to Nowhere: Israel/Palestine Since 2003 (Paperback)
- Edward W. Said -Peace And Its Discontents: Essays on Palestine in the Middle East Peace
Process
- Ray Dolphin - The West Bank Wall - Unmaking Palestine
- Joseph Massad - The Persistence of the Palestinian Question –
- Edward Said - After the last sky: Palestinian lives

কপিরাইট : সোভি সামুর