আপনার মতামত         



খোলা পাতা - খোলা কোড (প্রথম পর্ব)

অরিজিৎ মুখোপাধ্যায়




স্বাধীনতাহীনতায় কে বাঁচিতে চায় রে,
কে বাঁচিতে চায়
দাসত্ব শৃঙ্খল বলো কে পরিবে পায়ে রে,
কে পরিবে পায়ে...

কবিতাটা হাল ফ্যাশানের নয়। রঙ্গলাল বন্দ্যো স্বপ্নেও ভাবেননি, ভাবতে পারেন না যে তাঁর এই কবিতাটা একবিংশ শতাব্দীতে জনৈক সফটওয়্যার ক্ষ্যাপা সফটওয়ার-সংক্রান্ত লেখার শুরুতে ব্যবহার করবে। কিন্তু করলুম। কেন? কারণ ওপেন সোর্স সফটওয়্যারকে তলিয়ে দেখতে গেলে এই ফিলোজফিটা প্রয়োজন। আর প্রয়োজন একটু পিছিয়ে তাকানোর - কোথা থেকে, কি ভাবে এই ওপেন সোর্স, বা ফ্রী সফটওয়্যার, বা একটি বহু-প্রচলিত নাম "গ্নু" (ইংরিজীতে GNU) বাজারে এলো।

পিছিয়ে যাই ষাটের দশকে।

অ্যাকাডেমিক হ্যাকার সংস্কৃতি এবং স্টলম্যান

ষাটের দশক - কম্পিউটার জগতে মিনিকম্পিউটারের যুগ - ট্রানজিস্টর, ম্যাগনেটিক মেমরিকে কাজে লাগিয়ে অপেক্ষাকৃত "ছোট" পিডিপি, বা ভ্যাক্স কম্পিউটার। তখন ইন্টারনেটও নেই, কম্পিউটারের ভিতরে কি লাঠালাঠি-মারামারি চলে তার ঠিকানাও খুব বেশি প্রকাশিত নয়, অল্প লোকেই এইসব যন্ত্রপাতি নিয়ে কাজ করেন - যাঁরা করেন, তাঁরা ভিতরের খুঁটিনাটি আরো খুঁটিয়ে বুঝতে চেষ্টা করেন। আজকের সাথে তুলনা করুন - আপনার উইন্ডোজ পিসির ভিতরে কি চলছে আপনি কি জানার চেষ্টা করেন কখনো? মাঝে মাঝে মনিটরে পুরো "এক মনিটর নীল সমুদ্র" এসে হাজির হয় - নিন্দুকেরা বলে "ব্লু স্ক্রীণ অব ডেথ" - বা একটা চৌকো বাক্স ভেসে ওঠে - Fatal Error - কেন, কি হচ্ছে, জানার কথা ভাবেন? বা জানলেও সেটাকে ঠিক করার কথা? সেই মিনিকম্পিউটারের যুগে লোকে ভাবতো, এবং ভিতরে কি হচ্ছে সেটা খুঁটিয়ে দেখে ওষুধও দিত - এই সব লোকেদের বলা হত "অ্যাকাডেমিক হ্যাকার" - কারণ এদের বেশিরভাগ সময় পাওয়া যেত ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসে, যার মধ্যে সবার আগে নাম ওঠে এমআইটি, বার্কলি এবং কার্নেগি মেলনের। হিপি-কালচারের মতন এই হ্যাকার-কালচারেরও নিজস্ব কিছু নিয়ম ছিল, অলিখিত -

* প্রশ্ন করার অবাধ স্বাধীনতা
* গোপনীয়তা অত্যন্ত নিন্দনীয়
* তথ্য আর জ্ঞানের আদানপ্রদান
* প্রচলিত কিছুকে নিয়ে, তাকে বদলে নতুন কিছু তৈরী করার অধিকার - কম্পু ভাষায় "ফর্ক"
* অথরিটির গুষ্টির তুষ্টি
...

আজকের সাধারণ ধারণায় হ্যাকার হল কিছু ক্ষ্যাপা লোক, অধিকাংশ ক্ষেত্রে অপরাধপ্রবণ, যারা ভারত সরকারের ওয়েবসাইটে গিয়ে আবোলতাবোল লিখে আসে, বা ব্যাঙ্ক এবং ইনসিওরেন্স কোম্পানীর ওয়েবসাইটে হানা দেয়...এর সাথে অ্যাকাডেমিক হ্যাকার কালচারের ধ্যানধারণার আকাশপাতাল ফারাক। উনিশশো চুরাশিতে প্রকাশিত Hackers: Heroes of the Computer Revolution এই অ্যাকাডেমিক হ্যাকারদের কাজ, ফিলোজফি, বেঁচে থাকাকে তুলে ধরেছিলো।

ষাটের দশকের শেষে, সত্তরের শুরুতে রিচার্ড স্টলম্যান এমআইটির আর্টিফিশিয়াল ইনটেলিজেন্স ল্যাবে কাজ শুরু করেন, হার্ভার্ডের ছাত্র থাকার সময়েই - এবং হ্যাকার কমিউনিটিতেও চলে আসেন অচিরেই - "RMS" নামে। স্টলম্যানও সেই পাঠানের মতন - "না অ্যানার্কিও আমরা গুঁড়িয়ে দেবো" - ১৯৭৭-এ একবার এমআইটি কম্পিউটার সায়েন্স ল্যাবে পাসওয়ার্ড চালু হয়, স্টলম্যান পাসওয়ার্ড ভেঙে ঢুকে সমস্ত পাসওয়ার্ড ফাঁকা করে দিয়ে বাকিদের মেল করে দেন যে পাসওয়ার্ড বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে...

আশির দশকে এই হ্যাকার কমিউনিটি ভাঙতে শুরু করে - যখন কম্পিউটার এবং সফটওয়্যার প্রস্তুতকারকদের মধ্যে প্রতিযোগিতা শুরু হয়...অধিকাংশ কোম্পানি সফটওয়্যারে কপিরাইট এবং লাইসেন্স ব্যবহার করতে শুরু করে যাতে সেগুলো কপি বা রি-ডিস্ট্রিবিউট না অরা যায় - এবং ক্রমশ এটাই নিয়মে পরিণত হতে শুরু করে...আর এই সময় থেকেই সফটওয়্যার মোনোপলির সাথে স্টলম্যানের লড়াই শুরু। ষাটের দশকের গোড়ার কাউন্টারকালচারে (সিভিল রাইটস মুভমেন্ট বা ফ্রী স্পীচ মুভমেন্ট ইত্যাদি) সরাসরি জড়িয়ে না থাকলেও তখনকার কিছু আদর্শ স্টলম্যানকে উদ্বুদ্ধ করেছিলো - নন-ডিসক্লোজার এগ্রীমেন্টে সই করে সুনিশ্চিত ভবিষ্যৎ তৈরী করতে অস্বীকার করেন তিনি। উনিশশো চুরাশীর জানুয়ারীতে স্টলম্যান এমআইটির AI ল্যাব ছেড়ে GNU প্রোজেক্টে পুরোদমে কাজ করতে শুরু করেন।

GNUপ্রোজেক্ট - ফ্রী সফটওয়্যার আন্দোলনের শুরু

সেপ্টেম্বর ১৯৮৩-তে স্টলম্যান ARPANet মেইলিং লিস্টে প্রথম GNU প্রোজেক্টের ঘোষণা করেন, পরে বেশ কিছু USENET নিউজ গ্রুপেও এটা প্রকাশিত হয়। পঁচাশিতে বেরোয় GNU Manifesto - যেখানে স্টলম্যান ইউনিক্সের মতন একটা অপারেটিং সিস্টেমের কথা বলেন - ইউনিক্সের মতন, অথচ ফ্রী - GNU-এর পুরো কথা হল GNU's not Unix, একটা রিকার্সিভ অ্যাক্রোনিম। সাথে সাথেই তৈরী হয় Free Software Foundation - একটা non-profit অর্গানাইজেশন, ফ্রী সফটওয়্যারকে আইনি স্বীকৃতি দেওয়ার জন্যে। সারা পৃথিবীর লোকের ডোনেশনে চলা এই সংস্থার অবৈতনিক প্রেসিডেন্ট স্টলম্যান। গ্নু-এর ওয়েবসাইট থেকে কিছু অংশ তুলে দিই -

"Free software" is a matter of liberty, not price. To understand the concept, you should think of "free" as in "free speech", not as in "free ice cream". Free software is a matter of the users' freedom to run, copy, distribute, study, change and improve the software. More precisely, it refers to four kinds of freedom, for the users of the software:

* The freedom to run the program, for any purpose (freedom 0).
* The freedom to study how the program works, and adapt it to your needs (freedom 1). Access to the source code is a precondition for this.
* The freedom to redistribute copies so you can help your neighbor (freedom 2).
* The freedom to improve the program, and release your improvements to the public, so that the whole community benefits (freedom 3). Access to the source code is a precondition for this.

অর্থাৎ, আমার কম্পিউটারের কোন প্রোগ্রাম আমি আমার খুশিমতন চালাবো। সেই প্রোগ্রাম কি ভাবে চলছে, বা কি করছে তা জানার সম্পুর্ণ অধিকার আমার আছে, এবং আমার প্রয়োজনমত আমি তার বদল করতে পারবো। আমার প্রতিবেশি/বন্ধুবান্ধবকে সাহায্য করার জন্যে আমি সেই প্রোগ্রাম তাকে দিতে পারবো, এবং আমি সেই প্রোগ্রামে বদল করে তাকে যদি আরো কার্যকরী করতে পারি, তাহলে সেই বদলগুলোও আমি সকলের কাছে পৌঁছে দিতে পারবো - যার জন্যে সেই প্রোগ্রামের সোর্স কোড (আভ্যন্তরীন সমস্ত ইনস্ট্রাকশন যা দিয়ে প্রোগ্রামটা তৈরী) সকলের কাছে থাকবে।

Free Software Foundation এই গ্নু প্রোজেক্টের প্রধান সাংগঠনিক স্পনসর।

গ্নু এবং Free Software Foundation-কে জাস্ট আরেকটা সফটওয়্যার ভাবলে ভুল করা হবে - সিভিল রাইটস মুভমেন্ট, ফ্রী স্পীচ মুভমেন্টের মতন এও আরেক আন্দোলন - সফটওয়্যার মোনোপলির বিরুদ্ধে। এই মুহুর্তে পৃথিবীর অধিকাংশ ইউনিভার্সিটি এই আন্দোলনের শরিক, কিছু বড় কোম্পানী এই আন্দোলনের শরিক হয়ে তাদের সফটওয়্যারকে "ওপেন সোর্স" করে দিচ্ছে - যেমন সান মাইক্রোসিস্টেমসের "সোলারিস" অপারেটিং সিস্টেম, নেটস্কেপ ব্রাউজার...অ্যাপলের ম্যাকিনটশ অপারেটিং সিস্টেম প্রধাণত OpenBSD-র ওপর তৈরী...উল্টোদিকে সফটওয়্যারে মোনোপলি প্রথার প্রধাণ স্তম্ভ মাইক্রোসফট, পৃথিবীর সমস্ত কম্পিউটার এবং অপারেটিং সিস্টেমের বেশি অংশ যাদের কব্জায়...

এ এক বড় বিচিত্র লড়াই - পেশাগত কারণে লড়াইটাকে খুব কাছ থেকে দেখি, ভিতর থেকেও - এক দিকে মাল্টি বিলিয়ন ডলারের মালিক বড় বড় কিছু কোম্পানী, অন্যদিকে অসংখ্য সাধারণ মানুষ, যাঁদের অনেকে সারাদিন অফিসে হাড়ভাঙা খাটুনি খেতে বাড়ি এসে ওপেন সোর্স প্রোজেক্টের কাজ করেন, অনেকে দিনভর শুধুই এই ওপেন সোর্স প্রোজেক্ট নিয়ে পড়ে থাকেন...যেখান থেকে মেটিরিয়াল বেনিফিট বলতে কিছুই তাঁদের পাওয়ার নেই। কে জিতবে তা বলবে সময়।

(আজ শুধু শুরুর কথা, পরের বার লিখবো যুদ্ধ কতদূর এগিয়েছে তাই নিয়ে)।