আপনার মতামত         



হিন্দু সাম্প্রদায়িকতা ও সরকারী জনগণনা

কল্লোল দাশ…প্ত




বলা হয় সাধারণভাবে হিন্দুরা খুব একটা সাম্প্রদায়িক মনোভাবাপন্ন নয় । ওপর ওপর দেখতে গেলে কথাটা সত্যি বলেই মনে হয় । সেমেটিক ধর্ম…লির মতো হিন্দু ধর্ম কোনো "একটা'
আচরণবিধির ওপর দাঁড়িয়ে নেই । অজস্র শাখা-উপশাখায় বিভক্ত হিন্দুরা নানান রকমের আচারবিধির মধ্য দিয়ে ধর্ম পালন করেন । প্রত্যেকেরই নিজের নিজের বিশ্বাস মতো যাগ-যজ্ঞ, দেব-দেবী, পূজা-পার্বন আছে । কিন্তু সকলের কাছে সকলেই হিন্দু বলে মান্যতা পায় । যাদের হিন্দুসমাজ দেবতার মন্দিরে প্রবেশাধিকারও দেয় না, সেই নিমÀবর্ণর মানুষরাও কিন্তু হিন্দু বলেই স্বীক«ত । এমন কি চার্বাকপ¿Û£ বলে পরিচিত নাস্তিকদেরও হিন্দু সমাজের অর্ন্তগত বলেই ধরা
হয় । সারা ভারতে বর্ণহিন্দুরা সাধারণভাবে নিরামিষাশী । কিন্তু পূর্বভারতে তা নয় । আবার, পূর্বভারতের বর্ণহিন্দুরাও গোমাংস (গরু বা মোষ) কিংবা শুয়োরের মাংস খায় না । কিন্তু সদ্যপ্রক্তন হিন্দুরাষ্টÊ নেপালের হিন্দুদের এই নিয়ে কোনো নিষেধ নেই । কাজেই মনে হতেই পারে সাধারণভাবে হিন্দুরা বেশ উদার মনোভাবাপন্ন । বিষয়টা একটু তলিয়ে দেখলে এই "উদারতা'-র আসল চেহারাটা বেরিয়ে পড়ে । হিন্দুদের এক একটি শাখা/উপশাখার আচারকে আলাদা করে দেখলেই পরিস্কার হয়ে যায় । এমন কখনোই নয়, যে হিন্দুরা নিরামিষাশী, তাঁরা মাছ-মাংস খাওয়াকে অনুমোদন করেন, বা ভারতের আমিষভোজী বণহিন্দু গোমাংস কিংবা শুয়োরের মাংস খাওয়াকে মান্যতা দিচ্ছেন । এই "উদারতা' বা "অসাম্প্রদায়িকতা'-র প্রলেপ আলগা হয়ে আসে যেই অন্য ধর্মাবলম্বীদের (বিশেষ করে ইসলাম) সম্পর্কে হিন্দু মনোভাবের প্রশ্ন এসে পড়ে ।
তবে, এই প্রস®‰ একটা কথা উল্লেখ না করলে অন্যায় হবে, হিন্দুদের এই মনোভাবের পিছনে অন্য ধর্মের (বিশেষত: ইসলাম ও খ্রীস্টধর্ম) প্রকাশভ‰£র অনুদারতা, ধর্মান্তকরণ নিয়ে বাড়াবাড়ি, পৌত্তলিকতা সম্পর্কে ঘৃণা/বিদ্রুপ, রাজশক্তির ধর্ম হিসাবে ক্ষমতার ব্যবহার, স্বাধীনতা পূর্ব/পরবর্তী সরকারী পর্যায়ে সংখ্যালঘু তোষণ এবং অবশ্যই ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগ, এসবও ভীষণ ভাবে কাজ করেছে ।
যদিও প্রায় আটশ বছর পাশাপাশি থাকায়, সাধারণ মানুষের মধ্যে, একধরণের সাংস্ক«তিক- অর্থনৈতিক-দৈনন্দিন কাজের আদানপ্রদানের এবং মেলামেশার ফলে, পরস্পরের প্রতি একটা সহনশীলতা, জীবনযাত্রার পার্থক্যকে মেনে নেওয়া - এ…লো অনেক বেড়েছে ।
তাই সাধারণ মানুষের মধ্যে সাধারণ অবÙÛ¡য় "সাম্প্রদায়িকতা'-র প্রকাশ প্রকট না হলেও অবচেতনে তা থেকেই যায়, যার প্রকাশ ঘটে খুব "নির্দোষ' আচমকা মন্তব্যে । আমার হিন্দু বন্ধু যখন আমার মুসলমান/খ্রীস্টান বন্ধুর সাথে আলাপিত হবার পর বলে ফেলেন - "আপনাকে তো মুসলমান/খ্রীস্টান বলে বোঝাই যায় না' বা "আপনি তো দারুণ বাংলা বলেন' - তখন অবচেতনের "সাম্প্রদায়িকতা' প্রকাশ্যে চলে আসে । কিন্তু , কোন নিষ্ঠাবান হিন্দু যখন মুসলমান প্রতিবেশীর সন্তানের অসু¤খে রাত জেগে তার সেবা করে, শীতের সকালেও সÀ¡ন করে ঘরে ঢোকেন, তখন সত্যিই নির্ণয় করা কঠিন হয়ে পড়ে এই আচরণও "সাম্প্রদায়িক' কি না ।
তবে এসবই সাধারণ অবÙÛ¡র কথা ।
যখন দা‰¡ লাগে...............যখন মানুষের ঘর-বাড়ি, মন্দির -মসজিদ, বিবেক-বুদ্ধি পুড়তে থাকে................
১৮৯১ সন । সেনসাস কমিশনার ও"ডোনেল তখনকার জনগণনা তথ্যের ভিত্তিতে রির্পোট দিলেন জাতি হিসাবে হিন্দুরা ৬২০ বছরের মধ্যে লুপ্ত হয়ে যাবে ।
১৯০৯ সন । তাকে সংশোধন করে ইউ এন মুখার্জি "বে‰লী'-তে লিখলেন "হিন্দু"স্‌ এ ডাইং রেস' । তাতে তিনি হিসেব করে দেখালেন ৬২০ নয়, মাত্র ৪২০ বছরের মধ্যেই হিন্দুরা জাতি হিসাবে লুপ্ত হয়ে যাবে ।
১৯২১ সন । আবার জনগণনা রির্পোট-এ লেখা হলো , আপেক্ষিক এবং মোটের হিসাবে হিন্দুরা হেরে যাচ্ছে । গত দশ বছরে হিন্দু জনসংখ্যা প্রতি ১০,০০০ হাজারে ৩৪৭ কমেছে । কমার হার ৩.৫ শতাংশের সামান্য কম ।
১৯২২ সন । ১৯১১ এবং ১৯২১-এর জনগণনা তথ্যের ভিত্তিতে লেখা হতে থাকলো "হিন্দুয়োঁকা সংরক্ষণ ঔর আত্মরক্ষণ' - কেউ কেউ যুক্তি দিচ্ছেন , সংখ্যায় কি আসে যায় । বরং আমাদের উচিৎ আর্যতেÆর শুদ্ধতা রক্ষা করা । এর মানে কি ? প্রতিটি জনগণনায় এটা পরিস্কার যে হিন্দুরা ক্রমাগত সংখ্যায় কমছে , অন্যদিকে মুসলমান আর খ্রীস্টানরা বাড়ছে । আর আপনি বলছেন আর্যতেÆর শুদ্ধতা রক্ষার কথা ! আমাদের প্রথম এবং প্রধান কাজ হবে সংখ্যায় বেড়ে চলা ।
লেখা হচ্ছে "হিন্দুয়োঁকা সাথ বিশ্বাসঘাত' - ৩৩ কোটি থেকে আমরা নেমে এসেছি মাত্র ২০ কোটিতে । ১৯১১ এবং ১৯২১-এর সেনসাস অনুযায়ী হিন্দুরা কমেছে ৮ লক্ষ , অন্যদিকে মুসলমানরা বেড়েছে ২১ লক্ষ । এই ভাবে চলতে থাকলে কয়েক বছরের মধ্যেই ভারতবর্ষে আর্যÉ আর খুঁজে পাওয়া যাবে না ।
"জাতি' হিসাবে মুছে যাবার এই ভয় জনÈ দিলো নানান লি‰ এবং যৌনতা সর্ম্পকিত প্রশ্নের ।
উত্তরপ্রদেশে (তখনকার যুক্তপ্রদেশ) বিধবা বিবাহ নিয়ে এক বিতর্কে ১৯১১-র জনগণনা রির্পোট উদ্ধ«ত করে বলা হলো - এটা জানা কথা যে , মুসলমানদের প্রজনন ক্ষমতা হিন্দুদের চাইতে বেশী । এমনকি "ওদের' বেঁচে থাকার ক্ষমতাও হিন্দুদের চাইতে বেশী । বিগত ১০ বছরের তথ্য তাই বলছে । বিধবা বিবাহের নিষেধ কোনো ভাবেই মুসলমানদের ম®ধ্যে কোনো সমস্যা নয় । সেই কারনে মুসলমান বিধবা "ওদের' জনসংখ্যার মাত্র ১৪ শতাংশ , যেখানে হিন্দু বিধবা "আমাদের' জনসংখ্যার ১৭ শতাংশ । গর্ভধারণের উপযুক্ত বয়েসে (১৫-৪০) এই পার্থক্য নি:সন্দেহে জনসংখ্যার বাড়া-কমায় বড় ধরনের ফারাক গড়ে দেবে ।
বলা হতে লাগলো - এক বিরাট সংখ্যক হিন্দু বিধবা "যবন' এবং "ম্লেচ্ছ'-দের ঘরে চলে গিয়ে তাদের সংখ্যা বৃদ্ধিতে সাহায্য করছে ।
১৯২৫ সন । জগৎ…রু শংকরাচার্যÉ হিন্দু মহাসভার এক সমাবেশে বলেন যে , জনগণনার হিসাব অনুযায়ী এই হারে হিন্দুরা সংখ্যায় কমতে থাকলে এবং মুসলমানরা সংখ্যায় বাড়তে থাকলে ১০০ বছরের মধ্যে হিন্দুরা অবলুপ্ত হবে ।
সে সময়কার এক বহুল প্রচারিত কবিতা -
গোদমে ইসাইয়ত ইসলাম কে ,
বেটিয়েঁ বহুয়েঁ লিটাকর হম লেটে ।
আহ্‌ , ঘাটে পর হমেঁ ঘাটা হুয়া ,
মাঁ বহুয়োঁ কা ঘাটা কর হম ঘাটে ।
অর্থাৎ একজন হিন্দু বিধবার "যবন' বা "ম্লেচ্ছ'-দের ঘরে চলে যাওয়ার মানে "আমাদের' একজনের ক্ষতি - "ওদের' বহুজনের লাভ । শেষ বিচারে "আমাদের' বহু…ণ ক্ষতি ।
"হামারা ভীষণ হাস্‌' এই শিরোনামে সংবাদপত্রে প্রবন্ধমালা লেখা হতে থাকলো । বলা হলো -
হিন্দু বিধবা বাস করে এমন বাড়ির আশে পাশে সবসময় মুসলমান …ন্ডাদের ঘোরাফেরা করতে দেখা যায় । কারন, যৌন ক্ষুধায় কাতর হিন্দু বিধবারা মুসলমানদের হাতে সবচেয়ে সহজ শিকার । মুসলমান শিশুর জনÈ দিতে দিতে, এই নিকাহ্‌ পড়া হিন্দু বিধবারা, হিন্দুদের সর্বনাশের শেষ কিনারায় ঠেলে দিচ্ছে । প্রায় ৫০ লক্ষ হিন্দু বিধবা ইতিমধ্যেই এর শিকার হয়ে পড়েছে । তাই হিন্দু পুরুষদের উদ্দেশ্যে সাবধানবাণী লেখা হলো হিন্দু বিধবার জবানীতে -
জিস্‌ দিন থাম যায়েগী মন মে , কঁহি নিকল ম্যায় জাউ‰£ ,
কিসি য়বন কা হাথ পকড়কর , উসকো ম্যায় আপনাউ‰£ ।
পয়দা করকে বচ্চে উসে , উসকি শক্তি বঢ়াউ‰£ ।
গৌয়োঁকো কাটওয়াউ‰£ নিত্‌ , মন্দির ম্যায় তোড়ওয়াউ‰£ ,
দেওÙÛ¡নোঁকো মিটাকর , মসজিদ ম্যায় বানাউ‰£ ,
ধর্মগ্র¿Û জÆলওয়া দু‰£ ম্যায় , চুটিয়োঁকো কাটওয়াউ‰£ ।
অতএব হিন্দু পুরুষের অন্যতম কর্তব্য বিধবা বিবাহ করা । হায় বিদ্যাসাগর !
১৯৭৯ সন । এরই ধারাবাহিকতায় হিন্দু মহাসভা প্রকাশ করলো - "দে কাউন্ট দেয়ার গেইনস্‌ , উই ক্যালকুলেট আওয়ার লসেস' । এইভাবে জনগণনার তথ্যকে ব্যবহার করে সাম্প্রদায়িক চিন্তাকে সাধারণের মধ্যে জনপ্রিয় করে তোলা হয়েছে/হচ্ছে বহুযুগ ধরে । হিন্দু/হিন্দুতেÆর অবলুপ্তি ধারণাকে অতিকথায় পরিণত করে, নাটকীয় ভাবে এক ভয়ঙ্কর আতঙ্কের মিথ্যা মায়াজাল ছড়িয়ে, এমন এক মানসিক ÏÙÛতিতে হিন্দুদের পৌঁছে দেওয়া হয়েছে যেখানে তাঁরা বাস্তবে সংখ্যা…রু হয়েও মানসিকভাবে নিজেদের সংখ্যালঘু বলে মনে করছেন । আর এই ভিত্তিভ¨মির উপরেই গড়ে উঠেছে সাম্প্রদায়িক দা‰¡…লির মান্যতা ।

যখন দা‰¡ লাগে...............যখন মানুষের ঘর-বাড়ি, মন্দির -মসজিদ, বিবেক-বুদ্ধি পুড়তে থাকে................
১৮০১ সালে ব্রিটেনে প্রথম জনগণনার কাজ শুরু হয় । সেখানে জনগণনার বিষয়টিকে একেবারেই ধর্মনিরপেক্ষ ভাবে দেখা হয়েছিলো । ব্রিটেনের জনগণনা তথ্যে ধর্মের জায়গা প্রায় ছিলোনা বললেই চলে । যদিও বা কখনো ধর্ম সর্ম্পকিত বিষয় নিয়ে তথ্য আহরণ করা হয়েছে , তার জন্য অতিরিক্ত সর্তকতা নেওয়া হয়েছে , এবং সবসময়েই তা জনগণনা তথ্যের থেকে আলাদা করে প্রকাশিত হয়েছে । ২০০১-এ এসে ব্রিটেনের জনগণনায় ধর্মকে ঢোকানো হয়েছে । আমেরিকান জনগণনায় এখনও খুব নির্দিষ্ট ভাবে ধর্মকে বাদ রাখা হয়েছে ।
ভারতে জনগণনার কথা ব্রিটিশদের মাথায় আসে ১৮৫৬ সালে । তখনো কোম্পানির আমল । ভারতীয় উপমহাদেশের প্রায় সবটুকুই মহামান্য কোম্পানির তাঁবেতে । শাসনকে আরও দক্ষ, আরও কার্যকরী করতে হলে, দেশটাকে, তার মানুষজনকে, জানতে হবে - এরকম একটা ঔপনিবেশিক প্রয়োজন থেকেই ভারতে জনগণনার কথা ভাবা । ঠিক ছিলো ১৮৬১ থেকে কাজ শুরু হবে, ১৮৫৭-র মহাবিদ্রোহ সব হিসাব ওলট পালট করে দেয় । "শয়তান' কোম্পানির হাত থেকে ক্ষমতা যায় "মহানুভব' ব্রিটিশ রাজের হাতে । তখন ভারত জুড়ে - মহারানী ভিক্টোরিয়া মাঈকির জয় জয়াকার ।
শেষ পর্যন্ত ভারতে জনগণনা শুরু হয় ১৮৭২ সালে ।
প্রথম থেকেই ভারতের জনগণনার মূল আধার হয়ে দাঁড়ালো ধর্ম । সমস্ত তথ্যই ধর্ম বিশ্বাসের বিভাজনের ভিত্তিতে আহরিত এবং প্রকাশিত হতে থাকলো । শুধু জনগণনা নয়, ভারতবর্ষ সংক্রান্ত অন্য সমস্ত ব্রিটিশ প্রতর্কেও ধর্ম-ই হয়ে দাঁড়ালো বিভাজনের প্রধান ভিত্তি । এর মোক্ষম উদাহরণ হলো ব্রিটিশ প্রণীত ভারতের ইতিহাসের পর্ব বিভাজনে - "হিন্দু পিরিয়ড',"মুসলিম পিরিয়ড'................। অথচ ইউরোপের ইতিহাস বিভাজন হয়েছিলো - "এনশিয়েন্ট', "মিডিয়েভল' এবং "মর্ডান' পিরিয়ড-এ ।
ঔপনিবেশিক ভারতে শাসন বজায় রাখতে, সাধারণের মধ্যেকার সূক্ষ বিভাজনকে বাড়িয়ে দেখাতে নানান ধরণের কায়দা ব্যবহার করা হলো - সাম্প্রদয়িক সম্প্রীতি ক্ষুন্ন হবার মূল্যেও ।
জনগণনার কাজ শুধুই কতো…লো মূক তথ্যের সারণী তৈরী করা নয় । এই কাজে সে মানুষকে নানান শ্রেণী/গোষ্ঠী/দল-এ ভাগ করে । বিভাগ…লি নির্দিষ্টকরণ সম্প¨র্ণ হলেই তাদের সংজ্ঞার প্রয়োজন হয় । এই বিভাজন…লিকে যৌক্তিক ভাবে গ্রহনীয় করে তুলতে প্রত্যেকটি বিভাগের আলাদা সংজ্ঞা তৈরী করতে হয় । আর একমাত্র তারপরই গণনার কাজ শুরু হতে পারে ।
এই সংজ্ঞা…লি পুরোনো বিভাগ ভে®‰ নতুন বিভাগ তৈরী করে । নতুন ঐতিহ্য, নতুন পরম্পরা, সৃস্টি হতে থাকে, পুরোনো ঐতিহ্য, পুরোনো পরম্পরা লুপ্ত হয়ে যায় । জনগণনার কাজে সৃষ্ট এই সংজ্ঞা…লি শুধুই বিভিন্ন শ্রেণী/গোষ্ঠী /দল-এর নামাকরণ নয়, এর সাথে যুক্ত হয়ে যায় সংখ্যা । ফলে জনগণনার কাজ, ক্ষমতার এক ধরণের সংখ্যাতাতিÆক পাঠও তৈরী করে । এর প্রভাব নির্ভর করে কিভাবে সরকার এই সংজ্ঞা এবং সংখ্যাকে ব্যবহার করবে, আর মানুষ তাতে কিভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে, তার ওপর ।
এই ঔপনিবেশিক জনগণনায় যে বিভাগ ও সংজ্ঞা ব্যবহার করা হয়েছিলো তা একেবারেই
তৎকালীন বৃটিশ দৃষ্টিভ‰£ থেকে ভারতীয় সমাজকে দেখা । তখন ভারতচর্চা একটি বিষয় হিসাবে
গণ্য হতে থাকে । ইউরোপীয় আলোকায়নের হাত ধরে আলোকপ্রাপ্ত ভিক্টরীয় ইংল্যান্ডের ভদ্রলোকেরা তাদের যুক্তি, তাদের বিশ্ববীক্ষা দিয়ে ভারতীয় সমাজের বিভাজন…লি এবং তাদের ভিতরকার ও পরস্পরের মধ্যকার ঊর্দ্ধ-অধ: সর্ম্পক এমন ভাবে তৈরী করলেন যা তাদের আলোকায়িত ভিক্টরীয় যুক্তিবোধের সাথে খাপ খায় । এই কার্যক্রমের দিশা হিসাবে কাজ করলো পঁ¨জির ক্রমবর্ধমান বিকাশের সাথে বিকশিত হয়ে ওঠা জাতীয়তাবাদ, যা র্নমান, এÉ¡ংলো-স্যাক্সন, স্কট, ওয়েলস্‌ জাতিসমূহকে একসাথে জুড়ে তৈরী করে ফেলেছিলো একটা বৃটিশ জাতি, আর তাদের একটা রাষ্টÊ - গ্রেট ব্রিটেন ।
গোটা ভারতীয় উপমহাদেশ জুড়ে, স্মরণাতীত কাল ধরে, নানান জাতি, উপজাতি, ধর্মীয় গোষ্ঠী , উপগোষ্ঠী বিরাজ করতো । বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই এইসব বিভাগ…লির খুব নির্দিষ্ট করে কোনো সীমানা ছিলো না , এবং প্রায়শ:ই এরা একে অন্যের সাথে সম্প«ক্ত হয়ে থাকতো । ফলে আলাদা করে এই সব বিভাগ…লির সীমানা চিহ্নিত করাও প্রায় অসম্ভব ছিলো । এই সব বিভাগ…লি নিজেদের ও পরস্পরের সর্ম্পকে জ্ঞান ছিলো খুবই সীমিত, ফলে নিজেদের পরিচয় নিয়ে এরা কখনোই খুব আক্রমনাত্মক হয়ে ওঠেনি, বা সেই অর্থে পরিচিতির সংকট জাতীয় কোনো সমস্যাও এদের কখনো গ্রাস করেনি । অজ্ঞানতার এই আর্শীবাদ দূর হয়ে গেলো ঔপনিবেশিক জনগণনার আলোকায়নে । এই প্রথম একদল মানুষ জানতে পারলেন তাঁরা "সংখ্যা…রু' । অন্যরা জানলেন তাঁরা "সংখ্যালঘু' । হিন্দুরা জানলেন যে আচর আচরণের সমস্ত পার্থক্য সত্ত্বেও তাঁরা হিন্দু । এর আগে পর্যন্ত তারা নিজেদের পরিচয় দিতো শৈব্য, শাক্ত, বৈষ্ণব, বা ব্রাহ্মণ, কায়ÙÛ, ছেত্রি বা তাঁতী, জেলে, চামার, বেণে হিসাবে । জনগণনা এদের শেখালো এসব সত্ত্বেও তারা হিন্দু । ওই সব বহু টুকরো টুকরো পরিচয় মুছে দিয়ে উঠে এলো একটা পরিচয় ,আর তার সাথে যোগ হলো সংখ্যা । এই সংখ্যাবাচক পরিচয়ে তারা হয়ে উঠলো "সংখ্যা…রু সম্প্রদায়' । এই ভাবে ঔপনিবেশিক জনগণনা বিশ শতকের প্রথমেই আমাদের উপহার দিলো সাম্প্রদায়িকতা ।
প্রাক্‌ ঔপনিবেশিক সময় ভারতীয় উপমহাদেশের বিভাজন…লি ছিলো মূলত: জাতপাতের ওপর ভিত্তি করে । ধর্মবিশ্বাস নিয়ে ততো আগ্রহী ছিলো না মানুষ । প্রতিবেশীর ধর্মবিশ্বাসের চাইতেও মানুষ অনেক বেশি আগ্রহী ছিলো এটা জানতে যে, সে জলচল কিনা । অবশ্য এই জলচলের বিভাজনের মধ্যে অন্য ধর্ম (বিশেষ করে ভারতীয় উপমহাদেশের বাইরে থেকে আসা ধর্ম) একটা জাত হিসাবেই গণ্য হতো - যবন বা ম্লেচ্ছ ।
জনগণনার কাজে ঔপনিবেশিক শাসকরা যে বিভাজন…লি তৈরী করলো তা এরকম :
১) ভারতীয় আর্যÉ - ক) হিন্দু - (১) ব্রাহ্মণ্য হিন্দু , (২) বৈদিক হিন্দু , (৩) ব্রাহ্ম হিন্দু ;
খ) শিখ ; গ) জৈন ; ঘ) বৌদ্ধ
২) ইরাণীয় - জারুসÙ»£য় (পার্সি)
৩) সেমেটিক - ক) মুসলমান , খ) খ্রীষ্টান , গ) ইহুদি
৪) আদিম - মূলত: বিভিন্ন আদিবাসী সম্প্রদায়ের ধর্ম
৫) বিবিধ - এই চার বিভাগের অর্ন্তভুক্ত নয় এমন ।

এই কাজ করতে গিয়ে জনগণনা কর্তাদের বেশ ঝামেলায় পড়তে হয়েছিলো । এই সব বিভাগ…লি কখনোই স্বয়ংসম্প¨র্ণ নয় । এরা একে অন্যের স®‰/মধ্যে এমন ভাবে জড়িয়ে যে আলাদা করাটা প্রায় অসম্ভব । যেমন কাদের হিন্দু বলা হবে - এই নিয়ে নানান সংজ্ঞা দেওয়া হতে লাগলো । ১৮৭২-এর জনগণনা সংজ্ঞা অনুযায়ী , হিন্দু হলো ভারতের সেই অধিবাসী যারা ইউরোপীয়, আর্মেনীয়, মুঘল, পারসীয় বা অন্য কোন বিদেশী জাতি থেকে উদ্ভুত নয় , যাদের জাতিগত অবÙÛ¡ন হিন্দু ধর্ম অনুমোদিত যে কোন একটি জাত-এর ভিতর , যারা ব্রাহ্মণের আধ্যাত্মিক আধিপত্য স্বীকার করে , যারা গোহত্যা করে না ।
আগ্রা-অওধ যুক্তপ্রদেশের জনগণনা কর্তা জর্জ গ্যারিসনের মতে, হিন্দি অর্থ ভারতের সমস্ত অধিবাসী । হিন্দু অর্থ ভারতের অ-মুসলমান অধিবাসী ।
শুধু হিন্দু নয়, শুদ্ধ হিন্দু কে তাই নিয়েও মাথা ঘামিয়েছে জনগণনা । ১৯১১-য় বলা হলো সেই সব গোষ্ঠীকে হিন্দুদের থেকে আলাদা করে দেখাতে , যারা - ১) ব্রাহ্মণের আধ্যাত্মিক আধিপত্য স্বীকার করে না , ২) ব্রাহ্মণের বা হিন্দুধর্ম অনুমোদিত অন্য কোন …রুর থেকে মন্ত্রদীক্ষা নেয় না , ৩) বেদের কত«তÆ স্বীকার করে না , ৪) প্রধান হিন্দু দেবদেবীর পূজা করে না ,
৫) কোন ব্রাহ্মণ যাদের যজমান হিসাবে গ্রহন করে না , ৬) হিন্দু মন্দিরে যাদের প্রবেশাধিকার নেই , ৭) যাদের ছুঁলে বা যারা কাছে এলেই হিন্দুরা অশুদ্ধ বোধ করে , ৮) যারা মৃতদেহ কবর দেয় এবং ৯) যারা গোমাংস খায় বা গরুর পূজা করে না ।

এই করতে গিয়ে দেখা গেল , মধ্যপ্রদেশের বেরার-এ যাদের হিন্দু বলে ধরা হয়েছিলো তাদের মধ্যে ২৫ শতাংশ ব্রাহ্মণের/বেদের কত«তÆ স্বীকার করে না । ৫০ শতাংশ ব্রাহ্মণের বা হিন্দুধর্ম অনুমোদিত অন্য কোন …রুর থেকে মন্ত্রদীক্ষা নেয় না । ২৫ শতাংশ প্রধান হিন্দু দেবদেবীর পূজা করে না । ৩৩ শতাংশের মন্দিরে প্রবেশাধিকার নেই । ২৫ শতাংশ অচ্ছুত । ১৪ শতাংশ মৃতদেহ কবর দেয় । ৪০ শতাংশ গোমাংস খায় ।
বাংলা বিহার উড়িষ্যায় ৫৯টি হিন্দু জাতের মধ্যে ৭টি জাত, যাদের সংখ্যা তখন ১০ লক্ষেরও বেশী, যারা এই ৯টি বৈশিষ্টের কোন একটির অধিকারী । প্রায় ১৪টি জাত গোমাংস খায় এবং হিন্দু মন্দিরে যাদের প্রবেশাধিকার নেই । এদের অশুদ্ধ হিন্দু বা অংশত হিন্দু বলা হল ।
এছাড়াও তখন ভারতীয় উপমহাদেশে এরকম অজস্র গোষ্ঠী বিরাজ করতো যারা নিজেদের হিন্দু বলতো অথচ তারা মুসলমান ধর্মের বহু আচার আচরণ মেনে চলতো । আবার ঠিক এর উল্টোটাও বিরল ছিলো না যারা নিজেদের মুসলমান বলতো অথচ হিন্দু ধর্মের বহু আচার আচরণ পালন করতো । বাংলাতেই এরকম - আউল, বাউল, ফকির, দরবেশ, কর্তাভজা, লালনপ¿Û£ আরও অ…ণতি এমন গোষ্ঠী আজও বিরাজ করে ।

ঔপনিবেশিক শাসনকর্তারা এই বিভাজন…লিকে সামনে নিয়ে এলো এবং এর সাথে সংখ্যা জুড়ে
তৈরী করলো সাম্প্রদায়িক অপরতÆ যা পর×পরের বৈরীতার উপর দাঁড়ানো ।
ঠিক এই ভিত্তিভ¨মির ওপর দাঁড়িয়েই বারবার জিগির ওঠে "ওরা' "আমাদের' সংখ্যায় ছাড়িয়ে যাচ্ছে । "আমরা'-ই তো আসল সংখ্যালঘু ।

অথচ সংখ্যা আজও অন্য কথা বলে :
সন১৮৮১১৮৯১১৯০১১৯১১১৯২১১৯৩১১৯৪১
হিন্দু৭৫.০৯৭৪.২৪৭২.৮৭৭১.৬৮৭০.৭৩৭০.৬৭৬৯.৪৬
মুসলমান১৯.৯৭২০.৪১২১.৮৮২২.৩৯২৩.২৩২৩.৪৯২৪.২৮


সন ১৯৫১১৯৬১১৯৭১১৯৮১১৯৯১১৯৯১ (পরিবর্তিত) *
হিন্দু ৮৪.৯৮৮৩.৫১৯৮.৭২৮২.২৯৮১.৮০৮১.৫৪
মুসলমান ৯.৯১১০.৭০১১.২১১১.৭৩১২.২০১২.৬০

* ১৯৯১-এ অসম এবং জম্মু-কাশ্মীরে জনগণনার কাজ হতে পারে নি । তাই অতীতের বৃদ্ধির হার হিসাব করে পরিবর্তিত সংখ্যা পেশ করা হয় ।

এমনকি যদি অবিভক্ত ভারতীয় উপমহাদেশের হিসাবও ধরা হয় তবু ১৯৯১-এর জনগণনা অনুযায়ী সংখ্যা অন্য কথাই বলে :
মুসলমান জনসংখ্যা বাংলাদেশ ১০৮,৭৬০,০০০-র ৮৬.৮০% অর্থাৎ ৯৪,৪০৩,৬০৮
মুসলমান জনসংখ্যা পাকিস্তান ১২৬,৪০৬,০০০-র ৯৭.০০% অর্থাৎ ১২২,৬১৩,৮২০
মুসলমান জনসংখ্যা ভারত ৮৪৬,৩৪৯,০৫০-র ১২.৬০% অর্থাৎ ১০৬,৬৩৯,৯৮০
মুসলমান জনসংখ্যা মোট ১,০৮১,৫১৫,০৫০-র ২৯.৯২% অর্থাৎ ৩২৩,৬৫৭,৪৮০

তবু

যখন দা‰¡ লাগে...............যখন মানুষের ঘর-বাড়ি, মন্দির -মসজিদ, বিবেক-বুদ্ধি পুড়তে থাকে................



কোথায় পেলাম :
১) সেনসাস, কমিউনালিজম, জেন্ডার এÉ¡ন্ড আইডেন্টিটি - চারু …প্ত
ই.পি.ডব্লিউ সেপ্টেম্বর ২০০৪ সংখ্যা
২) ফ্যাক্ট এÉ¡ন্ড ফিকশন অফ হিন্দুতÆ ক্লেইমস্‌ - আর বি ভগৎ
ই.পি.ডব্লিউ সেপ্টেম্বর ২০০৪ সংখ্যা
৩) সেনসাস এÉ¡ন্ড দ্য কনস্টÊ¡কশন অফ কমিউনালিজম ইন ইন্ডিয়া - আর বি ভগৎ
ই.পি.ডব্লিউ সেপ্টেম্বর ২০০৪ সংখ্যা
৪) দ্য সেনসাস ইন ব্রিটিশ ইন্ডিয়া-নিউ পার্সপেটভিস্‌ - মনোহর
নিউ দিল্লী পাবলিকেশন
৫) দ্য কনস্টÊ¡কশন অফ কমিউনালিজম ইন কলোনিয়াল ইন্ডিয়া - জ্ঞানেন্দÊ পান্ডে
অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস
৬) ভিসনস্‌ অফ আ ডেমোগ্রাফিক ডুমস্‌ ডে - কেওনার্ড এলস্ট
ভয়েস অফ ইন্ডিয়া