আপনার মতামত         



রাজা-রাণী'র গল্প

প্রগতি চট্টোপাধ্যায়





রূপকথায় রাজা-রাণী'র গল্প থাকে। অবধারিত না হলেও, মাঝে মাঝে। রাখাল ছেলে,গরীব ব্রাক্ষ্মণ,রাজবাড়ীর দাসী,মানুষের ভাষায় কথা-বলা পাখি,তিন প্রান্তরের কাছ-ঘেঁষা মাঠ---এরাও রূপকথার নানা চরিত্র হয়। তবে রাজা-রাণী থাকবেই।

কেরালায় রাজা-রাণীর গল্পের থেকে ভূতের গল্পের অধিক মাহাত্ম্য। ভূতেরা রাজা-রাণীর থেকে অনেক সরসতায় চরিত্র-চিত্রিত। কেরালার প্রধানতম মেয়ে-ভূত হ'লো, যক্ষী। মলয়লমে,সংস্কৃত উচ্চারণ রীতি অনুযায়ী বলা হয় এক্‌ষী। যক্ষী খুব সুন্দরী হয়। কচি আম পাতার মতন গায়ের রঙ,হাঁটু পর্যন্ত চুলের ঢাল,রাঙা-রাঙা একটুকুনখানি তিরতিরে ঠোঁট,মীণাক্ষি,আর লাবণ্যে শিউলি ফুলের মতন পূর্ণা।
কিন্তু হলে হবে কি, পায়ের পাতাটি পেছনের দিকে ওল্টানো।
যক্ষীর রূপের মায়াজালে একবার পড়লে আর উদ্ধার নেই। রক্তশূন্য হবে দেহ,মননহীন হবে হৃদয়।
সন্ধ্যা-হবো-হবো কালে, পাহাড়-জঙ্গলে অঝোর ট্রপিক্যাল বৃষ্টিরেখার তীক্ষ্ণ তরবারি কে উপেক্ষা করে এক গাছ থেকে আরেক গাছে লাফ দেয় যক্ষী... নীচে পথ হারানো পথিক তার রক্ত-মজ্জা চুষে খাওয়ার টার্গেট... এইখানে
বাংলার গল্পের সঙ্গে কেরালার গল্পের একটা সরলরৌখিক মিল আছে।
প্রেতিনীর লাবণ্যপ্রভায় মর্ত্যের পুরুষের চোখ
ধাঁধিয়ে যাওয়া,রক্ত-মাস শুকিয়ে মরে যাওয়া।
লাবণ্যপ্রতিমা মেয়েটি জঙ্গলে হারিয়ে গিয়ে হয় যক্ষী, প্রেতিনী... পথ ভুল করা পথিক টি সাদামাঠা পুরুষ মানুষ ই থেকে যায়।

সে যাই হোক, কেরালার রূপকথা-লোককথার ভাঁড়ার-ঘর মোটামুটি সারা বিশ্বের লৌকিক গল্প-কাহিনির প্রোটোটাইপ দিয়েই সাজানো। ভালো শেষমেশ জিতবেই, সৎ গরীব গৃহস্থ লক্ষ্মীর মুখ দেখবে।
পার্থক্য আছে, এবং সেটা বেশ চিত্তাকর্ষক। কেরালার লোককথা একটু বেশী ইতিহাসায়িত,ঘটনার কাল-ক্রমণী মাঝে মাঝেই বেশ সুনির্দিষ্ট। কাহিনি'র রাজা মিলে যাচ্ছেন ইতিহাসের রাজার সঙ্গে। ভক্ত নাম্বুদিরি ব্রাক্ষ্মণ দেখা পাচ্ছেন তাঁর আরাধ্য দেবতার--গুরুবায়ুর শ্রীকৃষ্ণের-- এই কাহিনি'র ব্রাক্ষ্মণ টি একটি সত্য চরিত্র ,রক্ত-মাংসের।
তাই দেখছি,রূপকথা-লোককথার কুশীলব রা ঝাপসা হলেও বেশ আশ্চর্য ভাবে ইতিহাসের খুঁটি তে বাঁধা পড়ে আছে। এই গল্পগুলির আধারশিলা হ'লো মিথায়িত ইতিহাস, বা ইতিহাসের মিথ।
বেশীর ভাগ গল্পসূত্রই লোকবাহিত, লোকশ্রূতিতে লিপিকৃত। হয়তো এইজন্যই এই ধরণের গল্পের টান এখনও কমেনি। কেরালায় অভিজাত রা সপ্তদশ-অষ্টাদশ শতকেও মলয়লম ভাষায় সাহিত্য চর্চা বিশেষ করতেন না। যা কিছু লেখনীয় হবে, তা সংস্কৃতে। এখন এই সংস্কৃতে লেখার বাইরেও এক ধরণের লেখার স্রোত নিরন্তর বয়ে চলেছিলো-- একটা সাব-অল্টার্ন ধারা, যা আশ্রয় করেছিলো লোকগল্পের অবয়ব।
এখন এই অবয়বটি ক্রমশই সামাজিক হায়ারার্কি ভাঙ্গতে থাকে। নাম্বুদিরি ব্রাক্ষ্মণের সামাজিক অধিষ্ঠান কিছুটা নড়বড়ে হয়,ব্রাক্ষ্মণের দারিদ্র্য বা নির্বুদ্ধিতা কাহিনিবস্তু হয়, রাজার পাওয়ার-প্লে স্তিমিত হয়ে পড়ে--- কাহিনির আসল নায়ক হয়ে পড়েন সেই তথাকথিত নিম্নবর্গের মানুষ।
কেরালার অতি বিখ্যাত গ্রামীণ ব্যালাড হ'লো-- 'বাডাক্কন পাট্টু'--অর্থাৎ, উত্তরের গীত।
কেরালায় অতি পরিচিত এই গাথায় বলা আছে সমাজের অন্য স্তরের মানুষের গল্প-- যারা ব্রাক্ষ্মণ নন বা রাজাও নন। তাচ্ছোলি ওথেনন এর গল্প এর মূল বিষয়বস্তু। যিনি এক বীর যোদ্ধা--'কালারিপায়াট্টু',যা কিনা কেরালার দুর্ধর্ষ মার্শাল আর্ট-- তাতে অতি কুশল। আছে উন্নি আর্চা'র গল্প, যিনি এক দৃপ্ত বীরাঙ্গনা-- কালারিপায়াট্টু,অসিচালনায় সুদক্ষা।
রোম্যান্টিক মর্মর আছে এই কাহিনি তে ও, তবে অন্য রকম। তাচ্ছোলি এক গুপ্ত কমব্যাটে নিজের মামা'র হাতে মারা যান। কাহিনির নায়িকা উন্নি আর্চা তাচ্ছোলি ওথেনন এর সমান্তরাল চরিত্র। উন্নি আর্চা না থাকলে 'বাডাক্কান পাট্টু' লেখাই হয়তো হতো না।
বলা হচ্ছে, সতেরো-আঠেরো শতকে কাহিনির প্রেক্ষাপট। লোককথার হিসেবে খুব পুরোনো নয়। কেরালার বন্দর-শহরে তখন ডাচ-পর্তুগিস বাণিজ্য-অধিষ্ঠান ভালো রকম শক্ত ঘাঁটির।রাজা দের রাজনৈতিক ক্ষমতা খানিকটা থিতিয়ে আসছে। হয়তো এই সময়েই দরকার ছিলো অন্য বর্গ থেকে উঠে আসা এক লার্জার দ্যান লাইফ চরিত্রের। লোককাহিনি তে এমনটাই দেখা যায়।

লোকায়ত গল্পে এক ধরণের রবিন হুডীয় চরিত্র সব সময়ই থেকে যায়। শেরউড বনে গরীব মানুষ খিদের জ্বালায় হরিণ মারলে রবিন তাকে পক্ষপুটে আশ্রয় দেন। হ্যাভ আর হ্যাভ নট্‌স দের দ্বান্দ্বিকতায় অনেক লোকগল্পের বীজ লুকিয়ে থাকে। পৃথিবীব্যাপী। এই গরীব-তারণ রবিন হুডীয় চরিত্র যদি সামাজিক আইন-কানুনের তোয়াক্কা না করেন তবে গল্পের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ে।
কেরালায় এমন একটি চরিত্র হ'লো 'কায়ামকুলম কোচুন্নি'। কায়ামকুলম কেরালার ব্যাক-ওয়াটার সন্নিহিত ছোটো জনপদ। জানিনা এই প্রায় ঘুমন্ত জনপদটিতে কবে কোচুন্নি নামে এই মানুষ টি থাকতেন। কোচুন্নি কে বলা যায় কেরালার রবিন হুড, গরীব-গুর্বো'র প্রায় ঈশ্বরস্বরূপ, ধনী দের যম। এই ধরণের চরিত্রের যে চিরন্তরতার টান তা রাজা-রাণীর গল্পের থেকে হয়তো অনেক বেশী ই হয়।

কেরালায় লোককথার আঙ্গিক টাই বেশী প্রশস্ত, বিশুদ্ধ রূপকথার স্যুর রিয়ালিস্টিক আকৃতি একটু মেঘাবৃত। সরল প্র্যাকটিকালিটি'র টান টাই বেশী মনে হয়। বাংলার কুঁচবরণ কন্যার মতন কোনো কন্যা নেই, যদিও উন্নি আর্চা আছে, যক্ষী আছে। হয়তো দক্ষিণারঞ্জন মিত্র-মজুমদারের মতন কুঁচবরণ কন্যাদের কেউ লিরিকে আঁকেন নি, বুদ্ধু-ভুতুম কে সুপুরীর ডোঙ্গায় সাত সাগর পাড়ে কলাবতী রাজকন্যার দেশে পাঠান নি।

রাজা-রাণীর গল্প শুরু হচ্ছে ইতিহাসের সাল তারিখ মিলিয়ে। এক রাজা আর এক রাণীর কাহিনি তে বেশ কিছুটা রূপকথার আদল আছে। যদিও রাজারাণী দু'জনেই ইতিহাসায়িত।
প্রথম জন , এক রাণী--আরাক্কাল বিবি।
আরাক্কাল বিবি'র গল্পটি হ'লো এই --উত্তর কেরালা,যাকে সাধারণত মালাবার নামে উল্লেখ করা হয়, সেখানে কোলাথিরি বংশের রাজারা রাজত্ব করতেন। খুব বড় কিছু রাজা নয়, ছোট্টো পরিধি। এই রাজবংশের এক রূপের ডালি কন্যা নদীর ঘাটে স্নান করতে নামেন। স্নানের আমেজে বেভুল হয়ে জলের ঘূর্ণি তে পড়ে প্রাণান্ত হবার উপায় হয় প্রায়,তখন একটি মুসলিম তরুণ মেয়েকে উদ্ধার করে নদীর ঘূর্ণি থেকে।মেয়েটি এই হৃদয়বান ,সাহসী তরুণ কে বিয়ে করেন। মেয়ের হিন্দু বাপে-মায়ে প্রাসাদচত্বরের মধেই একটি বাড়ীতে কন্যা-জামাতার সংসার গড়ে দেন। এই বাড়ী'র নাম ছিলো আরাক্কল ভবন, আর নবোঢ়া কন্যা দেখতে দেখতে পরিচিত হলেন আরাক্কল বিবি নামে।
আরাক্কল বিবি'র বংশের ধারা মাতৃতান্ত্রিক রীতি বজায় রেখেছে, এই এখনও পর্যন্ত, কন্নুর শহরের কাছে আরাক্কল রাজবাড়ীটি এখনও দেখার মতন। প্রসিদ্ধ চিত্রকর ইউসুফ আরাক্কল এই বাড়ীর ই ছেলে।

রাজার গল্প আরও অধুনাকালের। উনিশ শতকের। এই রাজা হলেন দেশীয় রাজ্য ত্রিবাঙ্কুরের 'স্বাতী তিরুনাল'। স্বাতী নক্ষত্রে জন্ম এই রাজার, তাই রাজাকে এমন ভাবেই উল্লেখ করা হয়। রাজা ছিলেন 'গর্ভ শ্রীমান', অর্থাৎ, মাতৃগর্ভেই রাজা রূপে স্বীকৃত।
এখন, আপাত-আধুনিক কালের এই রাজাকে নিয়ে রূপকথা বোনা যায় কি? রূপকথা না হলেও, লেজেন্ড হয়তো। স্বাতী তিরুনাল এক ধরণের ট্র্যাজিক হিরো। রাজকার্যের থেকেও মন বেশী পড়ে থাকে সঙ্গীতে। কর্ণাটকী রীতির সঙ্গীত ছাড়াও , ভাবতে অবাক লাগে ,সুদূর দক্ষিণে বসে যথাবিহিত চর্চা করেছেন হিন্দুস্তানী সংগীতের।মোহিনী আট্যম নৃত্যশৈলীর নবরূপকার তিনি। ভরতনাট্যম নৃত্যভঙ্গিমা কে কিছুটা কেরলীয় রোমান্টিকতায় নমনীয় করে,সোনালী-পাড়-ঘি রঙের পোশাকে নর্তকী কে সাজানো স্বাতী তিরুনালের চারুকৃতি। রাজা নাচ-গান ভালো বাসেন, ইংরেজী পড়াশোনার ইস্কুল খোলেন, হিন্দীতেও কবিতা লিখে ফেলেন,নরম মলয়লমে ঘুমপাড়ানি'র গান রচনা করেন।
সেদিন বিখ্যাত ওড়িশী নৃত্যশিল্পী শ্যারন লোয়েন এক অনুষ্ঠানে স্বাতী তিরুনালের একটি লালাবাই নৃতায়িত করলেন, যার প্রথম পদ,'ওমানা তিঙ্গল...ও আমার চাঁদের কণা'... অতি মধুর, চন্দ্রজোৎস্নার মতনই কোমল এই সংগীত।

বিশুদ্ধ রূপকথার জন্য মঝে মাঝেই দরকার পড়ে বিহঙ্গমা-বিহঙ্গমী, যক্ষী, বাবা-য়াগা,কলাবতী রাজকন্যার। আরও থাকে কিছু চরিত্র-- যারা হাল্‌কা মজায় আনে দুধসাদা আর মসীকালো চরিত্রের ভিড়ে একটু মুক্ত নি:শ্বাস। কেরালায়, এমন একটি চরিত্র হ'লো ,'কুট্টিচাতন'। এরা আকারে লিলিপুটীয় বামন কিন্তু দুষ্টুমী তে তুখোড়। অনেকটা বিদেশী উপকথার 'নোম' বা 'ট্রোল' এর মতন একটা আভাস আছে কুট্টিচাতনের মধ্যে।
আর আছে হাতি। তাদের নানান নাম, নানান কীর্তি। মলয়লম কথা-কাহিনি'র জগৎ জুড়ে তারা। কেউ 'চন্দ্রশেখরণ',কেউ 'পদ্মনাভন'। গুরুবায়ুর মন্দিরে প্রধান হাতি পদ্মনাভন তার জীবনকালেই বিশুদ্ধ মিথের অন্তর্গত হয়।

এইভাবেই প্রেতযোনি থেকে রাজারাণী, সাদাসিধা নাগরিক থেকে যোদ্ধা, উচ্চবর্গ-নিম্নবর্গ, মনুষ্যেতর বামন থেকে বুদ্ধিমান হাতি --- সবই সারিবদ্ধ ভাবে দাঁড়িয়ে থাকে লোককথার ছায়াসরণিতে ... কাহিনি সবই জানা। মাঝে মাঝে কালের নিয়মে অবসৃত হয়,আবার উঠে আসে আধুনিক পঠন-পাঠন,সমাজিক-রাজনৈতিক বিশ্লেষণ নিয়ে..

লোকগল্পের বিশুদ্ধ আকর্ষণ কখনও থিতিয়ে পড়ে না, স্রোত বইতেই থাকে... বইতেই থাকে...