আপনার মতামত         



দিন আনি দিন খাই (৩য় পর্ব)

সুমেরু মুখোপাধ্যায়


১।

"মৃত্যু - যাতনা প্রকৃত বর্ণনা দেওয়া অসম্ভব। তবু আমি তোমাকে তার কিছু বর্ণনা দিচ্ছি। আল্লাহ'র শপথ করে বলছি, আমার কাঁধের উপর যেন, বাযোয়া নামক বিশাল পাহাড়টি চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমার আত্মা যেন সূচের ছিদ্র দিয়ে টেনে বার করা হচ্ছে। আমার পেট যেন কাঁটায় ভরপুর। আর আসমান ও যমীন যেন একত্রে মিশে গেছে আর আমি তাতে পিষ্ট হচ্ছি।

অত:পর তিনি বললেন, হে পুত্র! আমার জীবনে তিনটি পর্যায় রয়েছে। প্রথম পর্যায়ে আমি মুহম্মদ সল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের রক্তপিপাসু ব্যাক্তিদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম। যদি আমি সেই সময় মৃত্যুবরণ করতাম কতই না সর্বনাশ হত। অত:পর আল্লাহতায়ালা আমাকে ইসলাম গ্রহনের তাওফিক দিয়েছেন। তখন মুহম্মদ (দ:) ছিলেন আমার সর্বাধিক পছন্দনীয় ব্যাক্তি। তিনি আমাকে বিভিন্ন অভিযানের দায়িত্ব দিতেন। আপসোশ! যদি আমি সেই সময় মৃত্যুবরণ করতাম, তাহলে রাসুলের সরাসরি দোয়া পেতাম। তৃতীয় পর্যায়ে আমি দুনিয়ার কাজে ব্যস্ত হলাম। জানি না আমার অবস্থা এখন কেমন হবে। একথা বলেই তিনি ইন্তেকাল করলেন।'



তার লাশ চিত্তরঞ্জন হাসপাতাল থেকে নিয়ে আসা হয় সুকান্ত পল্লীতে। চিংড়িঘাটায়। আমিও হেঁটে হেঁটে আসি। জনা দশেক লোক আর খাটিয়া নামিয়ে রাখা হয় আমাদের বারোয়ারী উঠোনে। এরপর আমার আর কিছু মনে নেই। ধূপের ধোঁয়ায় আস্তে আস্তে আটকে যায় কলকাতা শহরের গাড়িগুলি। তাদের শব্দহীন ঘাঁই মেরে বসে থাকা ক্রমশ মিলিয়ে যায় সামনে থেকে। রাস্তার মোড়ে মোড়ে লালবাতি সবুজবাতি হলুদবাতি আইসক্রীমের মত গলতে শুরু করে যেন প্রখর রৌদ্রে পুড়ে যাচ্ছে চারপাশ। জ্বরের মধ্যে জানাজার নামাজ ঘুরে ফিরে আসে। তার কবর জিয়ারত করা হয়। আমি তার পিছু পিছু চলে যেতে যেতে বুঝতে পারি আমিও হয়ে পড়েছি দেহহীন। পান আহারহীন। পুরুষাঙ্গে সাড়া পাইনা বহুদিন, ক্রমশই আমি টের পাই এই লিঙ্গরহিত জন্ম ফেরেশতারই নামান্তর। আমি তো কখনও আল্লাহতায়ালার হুকুম অমান্য করি না। আল্লাহতায়ালার জিকিরই আমার খাদ্য।

বাড়িঘর পিছু হটতে থাকে ক্রমশ ভেঙেচুরে কিছু পুলিশের সাইরেন শব্দগাড়ির মত পিছু হটতে হটতে সমস্ত মরুভূমি করে দেয়। আমাদের খাপরার চালের বাড়ি সুগন্ধী ধোঁয়ায় ভরে ওঠে। আমার পাঁজরার হাড়গুলি জুড়তে জুড়তে সারসার কুলগাছ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। আমি আকাশের দিকে চাই। আকাশেরা আমার দিকে কুলগাছের কাঁটাওয়ালা হাত বাড়িয়ে দেয়। আমি তার সাথে আছি এটুকুই যেন সান্ত্বনা। আকাশ দিয়ে উড়ে যাওয়া ভীষণ সহজ, এ এক অন্য খেলা। জেট প্লেনের দুধসাদা গতিপথে আমাদের পায়ের ছাপ রেখে যাই। মিটিমিটি তারারা প্রবল হয়ে হাসে। কোন ভয় আমাদের স্পর্শ করে না। আমার সামনে পর্যায়ক্রমে ইবলিস ও নারসিস এসে হাজির হয়। লা হাওলা ওয়ালা কুয়াতা ইল্লা বিল্লাহ। আমি জিকির করতে করতে উড়ে চলে যাই কার্পাসদানাটির ন্যায়। আমরা দুজন সিদরাতুল মুনতাহা পর্যন্ত গিয়ে থামি। এ আমাদের অন্য আকাশ, অন্য খেলা। একমাত্র রাসুলুল্লাহ সাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছাড়া আর কারও পক্ষে সিদরাতুল মুনতাহা অতিক্রম করে সামনে এগুনো সম্ভব হয়নি। সপ্তম আকাশের কুলগাছটি আমাদের সকলকে ফিরিয়ে দেয়। এমনকি জিব্রাইল (আ:) পর্যন্ত পেরাতে পারে না সেটা।

ধোঁয়ায় মাখামাখি হয়ে চারপাশের রাস্তাঘাট এদিক ওদিক মুড়ে যায় যেন খারাপ হয়ে যাওয়া আমাদের ক্যাসেটের জটবাঁধা কালো ফিতে। আমি লক্ষ্য করি তার চারপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে সমস্ত বিষধর সাপেরা। জটপাকানো গানের টেপের ফিতে চালাতে গেলে ঝপ করে উঠে পড়ে প্লে'র সুইচটা। তেমনি মাথা তুলে দাঁড়ানো হাওড়া ব্রীজ এদিক সেদিক ছড়িয়ে সরু তলোয়ারের মত আমাদের লুকানো প্রেম হারানো কথারা ইটচাপা দুর্বাঘাসের সাদা রং। রোজ সন্ধ্যেয় সূর্য ডুবে গেলে ঘাস আর ঘাসের ছায়া কালো হয়ে যায়। ঝুটিবাঁধা ছেলের দল সুকান্তপল্লী কাঁপিয়ে গান ধরে আর আকাশের সমস্ত তরবারী গীটারের তার হয়ে দুলে ওঠে।

আকাশে ছড়ানো মেঘের কাছাকাছি
দেখা যায় তোমাদের বাড়ি
তার তিন দেওয়াল যেন স্বপ্ন বেলোয়ারী
তার কাঁচ দেওয়াল যেন স্বপ্ন বেলোয়ারী
আকাশে ছড়ানো মেঘের কাছাকাছি
দেখা যায় তোমাদের বাড়ি

চিলেকোঠায় বসা বাদামী বেড়াল
বোনে শূণ্যে মায়াজাল
ছাইরঙা প্যাঁচা সে চোখ টিপে বসে আছে কত না বছরকাল

কালো দরজা খুলে বাইরে তুমি এলে
বাগানের গাছে হাসি ছড়াবে বনফুলে
এই বাড়ির নেই ঠিকানা
শুধু অজানা লাল সুরকির পথ শূণ্যে দেয় পাড়ি
সেই বাড়ির নেই ঠিকানা
শুধু অজানা লাল সুরকির পথ শূণ্যে দেয় পাড়ি
বাঁকানো সিঁড়ির পথে সেখানে নেমে আসে চাঁদের আলো
কাওকে চেনো না তুমি তোমাকে চেনে না কেউ সেই তো ভালো
সেথা একলা তুমি গান গেয়ে ঘুরে ফিরে
তোমার এলোচুল ঐ বাতাসে শুধু ওড়ে
সেই বাড়ির নেই ঠিকানা
শুধু অজানা লাল সুরকির পথ শূণ্যে দেয় পাড়ি

আকাশে ছড়ানো মেঘের কাছাকাছি
দেখা যায় তোমাদের বাড়ি।


"তিনি বলেন,আমরা রাসুলুল্লাহ(দ:)এর সাথে এক আনসারীর জানাজায় গেলাম। কবর খোড়ার পূর্বেই আমরা কবরস্থানে পৌঁছে গেলাম। তখন রাসুলুল্লাহ (দ:) বসে পড়লেন আর আমরাও তার চারপাশে বসে পড়লাম। চারিদিক নীরব নিস্তব্ধ। রাসুলের হাতে একটি কাষ্টখন্ড। তিনি তা দ্বারা মাটিতে দাগ দিলেন। অত:পর স্বীয় মস্তক উত্তোলন করে দুই বা তিনবার বললেন, তোমরা কবরের আযাব থেকে আল্লাহর নিকট সাহায্য প্রার্থনা কর। তারপর বললেন, মুমিন যখন দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়ে আখেরাতের অভিমুখি হয়, তখন তার নিকট সূর্যের ন্যায় উজ্জ্বল চেহারার ফেরেশতারা উপস্থিত হয়। তাদের সাথে জান্নাতের কাফন ও জান্নাতের সুগন্ধী থাকে। দৃষ্টির সীমা পর্যন্ত স্থান জুড়ে তারা বসে। তারপর মালাকুল মওত এসে তার শিয়রে বসে বলে- হে প্রশান্ত আত্মা! তুমি আল্লাহর ক্ষমা ও সন্তুষ্টির দিকে চলে এস।

নবী (দ:) বলেন, তখন আত্মা বেরিয়ে আসে এবং ফেরেশতারা তাকে ধরে চোখের পলকে জান্নাতের সেই কাফন ও সুগন্ধীর মাঝে রেখে দেয়। আর তখন তা থেকে পৃথিবীর সর্বোত্তম মেশকের সুগন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। তারপর ফেরেশতারা তার রূহকে নিয়ে আকাশে উড়তে থাকে। ফেরেশতাদের অন্যকোন দলের সাথে দেখা হলে তারা জিজ্ঞাসা করে, এই পবিত্র রূহ কার? তারা তখন তার উত্তম নাম ধরে বলে, অমুকের সন্তান অমুকের রূহ। এইভাবে তারা তাকে নিয়ে দুনিয়ার আসমানে পৌঁছে ও তার জন্যে দরজা খুলতে বলে। তখন তাদের জন্যে দরজা খোলা হয় এবং তাদের স্বাগত জানিয়ে প্রত্যেক আকাশের নৈকট্যশীল ফেরেশতারা তাদের সাথে এগিয়ে আরেক আকাশ পর্যন্ত যায়। এভাবে তারা সপ্ত আকাশে পৌঁছায়। তখন আল্লাহতায়ালা বলেন, ইল্লিয়নে তার অবস্থানের কথা লিখে দাও। আর তাকে পৃথিবীতে ফিরিয়ে নিয়ে যাও। আমি মাটি থেকেই তাদের সৃষ্টি করেছি এবং মাটিতেই তাদের ফিরিয়ে নেব এবং পুনরায় মাটি থেকেই আমি তাদের উত্থিত করব। তখন তার রূহকে শরীরে ফিরিয়ে আনা হয়, আর তার নিকট দুজন ফেরেশতা এসে জিজ্ঞাসা করে, তোমার রব কে? সে উত্তর দেয়, আমার রব আল্লাহ। তারপর তারা জিজ্ঞাসা করে, তোমার দ্বীন কি? সে উত্তর দেয়, আমার দ্বীন ইসলাম। তারপর তারা জিজ্ঞাসা করে, যে লোককে তোমার নিকট পাঠানো হয়েছিল, তার সম্পর্কে বল? সে বলে, তিনি আল্লাহর রাসুল। তখন তারা বলে, তুমি কিভাবে জেনেছ? সে বলে, আমি আল্লাহর কিতাব পাঠ করেছি। তার প্রতি ঈমান এনেছি এবং তাকে সত্য মনে করেছি। তখন এক আহ্বানকারী বলেন, সত্য বলেছে, তার জন্যে জান্নাতের বিছানা বিছিয়ে দাও। তাকে জান্নাতের কাপড় পরিয়ে দাও। তার জন্যে জান্নাতের দরজা খুলে দাও, যা দিয়ে জান্নাতের সুগন্ধী ও ফুরফুরে বায়ু আসবে। অত:পর তার কবরকে দৃষ্টির সীমা পর্যন্ত প্রসারিত করা হয় এবং তার নিকট সুন্দর চেহারা বিশিষ্ট উত্তম সুগন্ধীযুক্ত এক ব্যাক্তি এসে বলে, ঐ সুসংবাদ গ্রহণ কর, যা আজ তোমাকে আনন্দিত করবে। আজ সেই দিন, যার প্রতিশ্রুতি তোমাকে দেওয়া হয়েছিল। তখন সে বলে, তুমি কে? লোকটি বলে, আমি তোমার নেক আমল। সে বলে, হে আমার রব! এখনই ক্কেয়ামত হয়ে যাক, যেন আমি আমার পরিবার পরিজন ও সেবকদের নিকট ফিরে যেতে পারি। "



২।



সুবহে সাদেক

( শেষরাতে আকাশের পূর্ব দিগন্তে উত্তর দক্ষিণ যে শুভ্র আভা আত্মপ্রকাশ করে ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেতে থাকে তাকে সুবহে সাদেক বলে )






ভোর হয়। কিছু পাখি ডেকে ডেকে উড়ে যায় ও কলতলার নিয়মিত ঝগড়া শুরু হয় আজানের ভেতর। এই সময় একরাশ কাদায় হাতি হয়ে পরিতোষ ফেরে। সুকান্তপল্লীর সকলেই পরিতোষকে ভালবাসে, আমিও বাসি, টেপিও বাসে। চারপাশে শোরগোল পড়ে যায়। পাঁকে ভরা নর্দমার উপর এপাশে ওপাশে পা দিয়ে চুপটি করে বসে থাকে পরিতোষ। মেয়েরা ঘড়ায় ঘড়ায় জল ঢালে। কলোনির সমস্ত লাল নীল রং চটে যাওয়া বালতি থেকে জল ঝরে পড়ে পরিতোষের উপর।কি শীত কি গৃষ্ম পরিতোষ কোন উচ্চবাক্য করে না। সে চুপটি করে বসে থাকে মাথা নিচু করে, চোখ বুজে। কাদা গলে ধীরে ধীরে প্রকাশ পেতে থাকে, তার শরীর ভর্তি ক্ষত। কেবলমাত্র সেখানে হাত দিলেই সে বাপ বাপান্ত করে, সঙ্গে চিল চীৎকার। কলোনি জোড়া খাপরার চাল সেই চীৎকারে দুলতে দুলতে পরিতোষের বৌকে ফুটফুটে পরী বানিয়ে দেয়। আমার খুব খারাপ লাগে, আগের দিনের কিনে আনা বরফ চটের থলে থেকে বের করে খড়ের কুচি ধুয়ে আমি তুলে দিই তার হাতে। রোদ বাড়ে, পরিতোষের সমস্ত গা শুকিয়ে গেলে ওরা দুজনে উঠে নিজেদের ঘরে চলে যায়, চুপচাপ। তারপর সারটা দিন ফুশ মন্তরেরা উড়ে বেড়ায় কলোনির গলি আর নর্দমার উপর দিয়ে। উনুনের অস্থির ধোঁয়া থেকে বাঁচতে জানালা দরজা বন্ধ করে আমি সুস্মিতার কথা ভাবি। এই অদ্ভুত সংসারে কি করে পড়ে আছে ও! পরিতোষ ঘুমিয়ে পড়লে সমস্ত গঞ্জনা ডিঙিয়ে ও চলে আসে আমার কাছে। দুজনে একসঙ্গে রং গুলি, মেটানিল, মেলাচিট। তারপর খাপে খাপে ভরে দিলে তৈরী হয়ে যায় আইসক্রীম শাবকেরা। ঘর অন্ধকার করে আমরা দুজনে কাজ করে যাই, টেপি গুনগুনিয়ে গান গায়। সেই সব গান রেকর্ড আর ক্যাসেটের ফিতে হয়ে চলতে থাকে যখন ও ঘরে থাকে না তখনও। ও একা একাই কাজ করে, বিছানা গোছায়, বাসন ধোয়। আমি সেই ফাঁকে মোড়ের দোকান থেকে চাল, তেল, নুন, হলুদ, আলু আর তিন টুকরো মাছ কিনে আনি। ক্রমশ এগিয়ে আসছে বাজার। আগে ছিল দুটো দোকান আর তিনটে ঝাঁকাওয়ালা। তারপর গলি জুড়ে ছিল আমাদের আইসক্রীমের গাড়ি সারসার। মাঝে রঘু আর যতীনের ফুচকার গাড়ি। ক্রমশ বাজার এগিয়ে আসছে আর গাড়িগুলো হারিয়ে যাচ্ছে। বাজার করে নিয়ে এলে টেপি রান্না করতে যায়, আমি ওর জন্যে নিয়ে আসা আয়াত পড়তে থাকি। জাফরান ও মধু মিশিয়ে রেশমী কাপড়ের উপর লেখা আয়াত লিখে তাবিজের ভেতর ঢুকিয়ে দিয়েছেন মৌলভী। বলেছেন, মোম আর কুন্দ্রকূটের মিশ্রণে আগুন দিলে যে ধোঁয়া হয় সেই ধোঁয়া তাবিজে লাগাতে। এই তাবিজ সঙ্গে নিয়ে সে যেখানে যাবে আল্লাহর ফজলে ইজ্জত ও সন্মান লাভ করবে, একদিন সত্যি পরী হয়ে যাবে, সুস্মিতা সেন হয়ে ঘুরে বেড়াবে সিনেমায় সিনেমায়। দিন কাটে,কলোনির গুঞ্জন ক্রমশ স্তিমিত হয়ে যায়, সুস্মিতা পরী হয়ে চলে আসে আমার কাছে।

জোনাকী সিনেমাহলের সামনে আমি অপেক্ষা করি তার জন্যে, বিকেল হলে সেজে গুজে চলে আসে সে। ও নতুন ব্যবসা শুরু করেছে, আমি ওর জন্যে টিকিট কিনে রাখি ও সেগুলো ব্ল্যাক করে। সিনেমা অনুযায়ী দাম বাড়ে টিকিটের, সীন অনুযায়ী পয়সা। এরপরেও আছে উপরি রোজগার, যেমন, লোহা বেচাও ব্যবসা আবার লোহার ছাট বেচাও ব্যবসা। এ ব্যবসার ভাগীদার টর্চ হাতে হলের গেটে দাঁড়িয়ে থাকা গৌরাঙ্গ আর বিমল। টিকিটের অর্ধেকটা পেয়ে মন ভরে না তাদের, বাকি যে টিকিটের অংশটা নিয়ে ঢুকে পড়ে পাব্লিক, সেটাও তাদের চাই। সুস্মিতা সেগুলো জড় করে বেচে দেয় বাদামওয়ালাদের, নাসির আর গণেশ পার্মানেন্ট খদ্দের। সেগুলো দিয়ে তৈরী হয় ঝাল নুনের মোড়ক, নীল হলুদ লাল সব মোড়ক জমতে জমতে থোকা থোকা ফুল হয়ে যায় আর সে এক সর্ষেক্ষেত, শাহরুখ খান নাচ করে, দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে যায়েঙ্গে লে যায়েঙ্গে। আমরা মাঝে মাঝে হলে ঢুকে যাই,সিনেমা দেখি আর নিরুদ্দেশ হয়ে যাই । আর নিরুদ্দেশ হয়ে যায় কলোনির খাপরা চাল, পুতিগন্ধময় নর্দমা, সকাল-বিকেলের জলপড়া গঞ্জনা আর লকলকে জিহ্বার ধোঁয়ার গন্ধ থেকে। আইসক্রীমের গাড়ি ঠেলতে ঠেলতে হাজির হই মেলা , যাত্রা, গানের আসরে। আমরাই গান করি, আমরাই নাচ করি আর শীতের কুয়াশার ভিতর জড়াজড়ি করে বসে থাকি, আলাউদ্দিন খলজি, পৃথ্বীরাজ চৌহান আর পদ্মিনীর গল্পের মত। শরীর জুড়ে পোকারা ঘুরে বেড়ায়, বাইরে জোনাকীপোকা, লাল নীল আলো আর ষ্টেজের উপর সানি দেউল বীর বিক্রমে ফিরে ফিরে আসে বিভিন্ন গল্পের ভিতর। পৌরাণিক পালা আর বাউল গান, সব জমা করে রাখি, সিনেমাহলের অন্ধকারে হাতে করে নিই আগুণের গোলা। কখনো আমার বাড়ি যাই, কখনও ও আমার বাড়ি। আমি নবীজিদের কথা শোনাই,ইসলামের কথা চুপ করে শোনে সে। তারপর আমরা রেডিও চালিয়ে দিই, পরপর গান শুনিয়ে চলা এফ এম রেডিও, আমাদের মিলনের সমস্ত আওয়াজ সে ঢেকে দেয় বাজনার শব্দে।



তোমার বাড়ির রঙের মেলায়
দেখেছিলাম বায়োস্কোপ
বায়োস্কোপের নেশা আমায় ছাড়ে না
বায়োস্কোপের নেশা আমায় ছাড়ে না
ডাইনে তোমার চাচার বাড়ি বাঁয়ের দিকে পুকুরঘাট
সে ভাবনায় বয়স আমার বাড়ে না
সে ভাবনায় বয়স আমার বাড়ে না।।

অন্তরে থাক পদ্ম গোলাপ
গদ্যে পদ্যে আঁকছি মুখ
ঘুরতেছিলাম রঙের মেলায়
অপূর্ব সেই তোমার চোখ
অমন পলক ফেলতে তো কেউ পারে না
অমন পলক ফেলতে তো কেউ পারে না
তোমার বাড়ির রঙের মেলায়
দেখেছিলাম বায়োস্কোপ
বায়োস্কোপের নেশা আমায় ছাড়ে না
বায়োস্কোপের নেশা আমায় ছাড়ে না।।


হঠাৎ তোমায় মন দিয়েছি
ফেরত চাইনি কোনদিন
মন কি তোমার হাতের নাটাই
তোমার কাছে আমার ঋণ
মন হারালেও মনের মনের মানুষ হারে না
মন হারালেও মনের মনের মানুষ হারে না
তোমার বাড়ির রঙের মেলায়
দেখেছিলাম বায়োস্কোপ
বায়োস্কোপের নেশা আমায় ছাড়ে না।।


"হযরত ইদ্রিস (আ:) হযরত আদম (আ:)এর ইন্তেকালের একশত বছর পর জন্ম গ্রহণ করেছিলেন। তিনি হযরত নূহ (আ:)র পরদাদা ছিলেন। তার উপর তিরিশখানা সহীফা নাযিল হয়। তাঁর আসল নাম আখনুখ। অতি বিদ্যান ছিলেন বলে লোকে তাঁকে ইদ্রিস বলে ডাকত। তাঁর সময় থেকেই সর্বপ্রথম অক্ষর দ্বারা লেখার প্রচলন হয়। তিনি দর্জির কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন ও বারো মাস রোযা রাখতেন। মুসাফিরকে না খাইয়ে তিনি কখনও নিজে আহার করতেন না। একদিন হযরত আজরাইল (আ:) মানবরূপ ধারন করে তাঁর অতিথিরূপে আসেন। তিনি হযরত ইদ্রিস (আ:)এর আদরযত্নে মুগ্ধ হয়ে তাঁর সঙ্গে বন্ধুত্ব স্থাপন করেন। তিনদিন পর হযরত আজরাইল (আ:) নিজের পরিচয় দিলে তখন হযরত ইদ্রিস (আ:) তাঁকে অনুরোধ করেন যে, আপনি তো সমস্ত প্রাণীর রূহ কবজ করে থাকেন, আপনি আমার রূহ কবজ করুন, আমি মৃত্যুযন্ত্রনা দেখতে চাই। আল্লাহতায়ালার হুকুমে হযরত আজরাইল (আ:) তাঁর রূহ কবজ করলেন ও তিনি পুনরায় জীবিত হয়ে উঠলেন। তৎপর হযরত ইদ্রিস(আ:) তাঁকে বেহেশত দেখাবার জন্যে অনুরোধ করে বসেন। তাঁর অনুরোধে হযরত আজরাইল (আ:) তাঁকে বেহেশতে নিয়ে গেলেন, এইরূপে হযরত ইদ্রিস (আ:) সশরীরে বেহেশতে চলে গেলেন। তিনি ব্যতীত কোন মানুষ সশরীরে বেহেশতে যাওয়ার সৌভাগ্য লাভ করেননি। আমাদের হযরত রাসুলুল্লাহ (দ:) শবে মেরাজের সময় বেহেশতে গিয়েছিলেন বটে কিন্তু তিনি চলে এসেছিলেন। মানুষের পক্ষে সশরীর বেহেশতে যাওয়ার থেকে উচ্চ সন্মান লাভ আর কি হতে পারে?'



৩।


সুবহে কাযেব

( পূর্ব থেকে পশ্চিমে বাঘের লেজের ন্যায় যে শুভ্রতা আত্মপ্রকাশ করে, অল্পক্ষণের মধ্যেই বিলীন হয়ে অন্ধকারে ছেয়ে যায় তাকে সবহে কাযেব বলে। )






আমাদের বিয়ের পর অশান্তি চরমে উঠতে থাকে। ওয়াতনে আসলি ছেড়ে আমরা নতুন করে ঘর বাঁধি। কিন্তু গঞ্জনা আমাদের পিছু ছাড়ে না। তার নদী বহুদূর থেকে হিমেল বাতাস ছুঁড়ে দেয় আর কাঁচা খিস্তি হয়ে ওঠা গানেরা আমাদের চারপাশে দুষ্টু জ্বিন হয়ে যায়। রাত্রির পাহাড় কান্না নিয়ে আসে আমাদের জীবনে আর আসে রাজু। তার সাইকেলে ঝোলা ব্যাগ আর ব্লাডারে পেপসি। নেশায় নেশায় রাত বাড়ে আমি পাত্রে পাত্রে রং গুলি। সরু সরু প্লাষ্টিকের খাপে সেগুলো ভরে পেপসি আইসক্রীম বানাতে থাকি, তারা সব ফ্ল্যাটবাড়ি, সমস্ত বাইপাস জুড়ে। জানালা দরজাহীন পেপসিরা কেউ আমিশা প্যাটেল কেউ প্রিয়াঙ্কা চোপড়া হয়ে ঘুরে বেড়ায় আমাদের শহরে, এই সব কেউ ছোঁয় না, এখানে কারুরই বুঝি ছেলেবেলা নেই আর! রাত বাড়ে, আইসক্রীমের গাড়ি একে একে ফিরে আসে, ঘরে বসে তার আওয়াজ শুনি। আমার আইসক্রীমের গাড়িটা আর নেই। বেচে দু হাজার টাকা সেলামী দিয়ে তবে হয়েছে আমাদের নতুন ঘর। আমাদের জীবনে এখন কোন আইসক্রীম নিয়ে সাধ-আহ্লাদ নেই, চেঁচামেচি ছাড়া কথা নেই, দুজনে দূরে দূরে বসে শুনি দূর থেকে ভেসে আসা যাত্রাপালার গান। ক্রমশ পিছিয়ে যাচ্ছে যাত্রা, নিউ টাউন ছাড়িয়ে বাসন্তীর দিকে। চারিদিকে ফ্ল্যাট মহল্লা হচ্ছে, কম্পুটার কম্পুটারে আলো হয়ে যাচ্ছে শহর, আমাদের কোন কাজ নেই, কম্পুটার নাকি সবাই কে ছুটি করে দেয়, সে নিজে নিজেই চলে আর আলো দেয় সারা রাত সারা শহর জুড়ে। দাড়িতে রং মেখে থলেতে থার্মোকলের বাক্সে বরফ ভরে পেপসি নিয়ে একপাশে দাঁড়িয়ে থাকা ছাড়া আমার কোন কাজ নেই। আমার বিবি সকাল হলে চলে যায় বহুদূরে, খুঁজে পেতে আনে কচুশাক, কলমিশাক, হিংচে, তা সেদ্ধ করে খাই আমরা। চাল কেনার পয়সা যোগাড় করা দূর অস্ত, পেপসিতে লাভ কই! এখন আমাদের গাড়ি নেই, সোহাগ নেই কেবল পড়ে আছে একরাশ নরকযন্ত্রণা। সোনাবিবিটা আমার কিছুতেই পরী হয়ে ওঠে না, মুখে গুড়াখুর লাল ছাপ আর কাঁচা খিস্তি। আমার আজকাল ঘরে ফিরতেও ইচ্ছে করে না, ইচ্ছে করে পরিতোষের মত সারারাত ঘুরে বেড়াই রাস্তায় রাস্তায়, নেশা ভাং করতেও টাকার দরকার, পেটে বিদ্যে লাগে! ও কেবল পরিতোষই পারে, আমার খুব ইচ্ছে করে ওকে দেখতে, আচ্ছা আমরা তো আগের মতন একসাথে থাকতেই পারতাম!

লোকে বলে বলে রে ঘর বাড়ি বালা না আমার
কি ঘর বানাইমু আমি শূণ্যেরও মাঝার
লোকে বলে বলে রে ঘর বাড়ি বালা না আমার

বালা করি ঘর বানাইয়া কয়দিন থাকমু আর
হায়রে কয়দিন থাকমু আর
আয়না দিয়া চাইয়া দেখি পাকনা চুল আমার
লোকে বলে বলে রে ঘর বাড়ি বালা না আমার

এই ভাবিয়া হাসন রাজায় ঘর দুয়ার না বান্ধে
হায়রে ঘর দুয়ার না বান্ধে
কোথায় নিয়া রাখব আল্লায় তাই ভাবিয়া কান্দে
লোকে বলে ও বলে রে ঘর বাড়ি বালা না আমার।।
লোকে বলে বলে রে ঘর বাড়ি বালা না আমার।।

জানত যদি হাসন রাজায় বাঁচব কতদিন
হায়রে বাঁচব কতদিন
জানত যদি হাসন রাজায় বাঁচব কতদিন
হায়রে বাঁচব কতদিন
বানাইমু দালান-কোঠা করিয়া রঙিন
লোকে বলে বলে রে ঘর বাড়ি বালা না আমার
লোকে বলে বলে রে ঘর বাড়ি বালা না আমার
কি ঘর বানাইমু আমি শূণ্যেরও মাঝার।।

সকাল হলে উল্টোডাঙায় ভিআইপি মোড়ে ব্রীজের উপর রোদ পোহাই, কম্পুটার শহরের দিকে ধোপদুরস্ত পোষাক ও গাড়িতে মানুষেরা নানাবিধ ফ্লাইওভার দিয়ে চলে যেতে যেতে প্রশ্ন করে, কেউ তুলে নেয় গাড়িতে। অফুরান্তি ফ্ল্যাট এখন আমাদের চারপাশে, আর আমরা সকলেই রাজমিস্ত্রী আর যোগাড়ে হয়ে যাই চুন ইট আর সুরকির সাথে। সন্ধ্যেয় নেশা করা মাথা দুলে ওঠে ষ্টোনচিপসে ভরা মেশিনের মত। লোহার রডের খোঁচায় আর তপ্ত ইটে আমার শরীরেও এখন লাল লাল ক্ষত, প্রলেপহীন ক্ষত। সরু একফালি তক্তার উপর ইটের বোঝা মাথায় নিয়ে সুস্মিতা সেন তরতরিয়ে উঠে যায় দোতলা, তিনতলার ভারায়। দুপুরে ভাত জোটে কোন কোনদিন। এখানে রেশনকার্ড জমা দিলে তবে ভাত পাওয়া যায়, আমাদের কোন রেশনকার্ড নেই। স্থির বাসা নেই, জীবিকা নেই, জীবন নেই। কূলকাঁটায় ছেঁড়া সারা শরীর ঢাকতে ঘন্টা বাজিয়ে নেমে আসে কেবল আইসক্রীমের গাড়ি, বিষরঙে সাজানো সংসার আর রাজু আসে ব্লাডারের নেশা নিয়ে, ক্রিং ক্রিং। মেয়েরা মাথার বিড়ে নামিয়ে হাতের ইটের ধুলো ঝেড়ে আঁচলের খুটে বাঁধা পয়সা তুলে দেয় আইসক্রীমওয়ালাকে। ভাত না পেলে আলুর সব্জী আর দুটো রুটি। আমাদের রেশনকার্ড হল না এখনও, ভোটার লিস্টিতে নাম আছে, কিন্তু তাতে আছে ভোট কোন ভাত-রুটি নাই! ভাত খাওয়া যায় না, পয়সা বাঁচিয়ে রাখতে হয় সন্ধ্যের নেশার পয়সাটা। আরও কিছু পয়সা দরকার, আমার বিবি আজ দশদিন ভর্তি হয়েছে হাসপাতালে। আমার ভালবাসার সব ফ্ল্যাটবাড়ি দুলে দুলে ওঠে সন্ধ্যের নেশায়, চারপাশে বড় বড় গ্লো সাইনবোর্ড, আমার পড়ার কোন অক্ষর সেখানে নেই, আমার দেশে কোন উর্দু নেই অথচ বাপ-চাচারা তো শেখালো দুপাতা উর্ধু, কোন মতলবে? সব ক্রমশ দলা পাকিয়ে পরিতোষের প্রুফের খাতা হয়ে যায়। আমি পড়তে পারি না কিছু। গানেরা সব ছেঁড়া জট পাকানো টেপের কালো ফিতে। গাড়ির চীৎকারে সারা শহর নেচে ওঠে ধাই ধাই করে। প্রতি রাতে শহরে উৎসব চলে কেন না রঙিন হয় ঠান্ডা আইসক্রীমের খাপে নতুন ক্যাডবেরিরা। বড় বড় নেলপালিশ কখন জানি না টালমাটাল রাস্তা হয়ে যায়। ভারী দেখতে ইচ্ছা করে সুস্মিতার মুখ। পার্ক সার্কাস অব্দি যাব এই ভেবে রোজ শুরু হয় পথ চলা। একে একে পার হয়ে যাই বালি সিমেন্ট ইটের পাহাড়ের কান্না। সমস্ত বেকার যুবক, পাহারাদারদের হুইসেল শব্দ, দলা পাকানো গান, কিশোর কুমারের কন্ঠ নকল করা ঝুটিকাটা চুলের ছেলে-মেয়েরা, সস্তা গাড়ির চীৎকার, গাড়ি নাকি আরো সস্তা হবে, সমস্ত ধানের জমিতে একদিন তৈরী হবে নানান গাড়ি। নেশার ভেতর পড়ে থাকা ধানগাছের মত চারপাশে প্রুফ ছড়িয়ে দিতে দিতে চলেছে পরিতোষ, গায়ের সমস্ত যন্ত্রনায় দাগা দাগা লাল রঙ শুধু জেগে আছে ট্রাফিক বাতি হয়ে একসময় তারা সব সব ফুল হয়ে যায়। ফুলের পাপড়ি ছিড়ে ঝালনুন ছড়িয়ে দিতে চায় গণেশ আর নাসির। এরকম রাত বড় কাছে চলে এলে আমি মৃত্যুযন্ত্রনা টের পাই। জবাব দেবার বাকি, কেবল পড়ে আছে প্রশ্নেরা। একদল পুলিশ বড়কর্তার পিছনে দৌড়াতে দৌড়াতে দুষ্টু জ্বিন হয়ে যায়। তাদের আছে কেবল প্রশ্ন, প্রশ্নের অত্যাচার। পরিতোষের কাছে আছে সমস্ত প্রশ্নের জবাব, ও নিশ্চিত ইদ্রিস হয়ে যাবে এই রাস্তার শেষে। আমার কাছে আজ আর ভালোবাসাও নাই, কিছুই নাই।

"কাফের বান্দা যখন দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আখেরাতের অভিমুখি হয় তখন কালো কালো বিকট চেহারা বিশিষ্ট ফেরেশতা তার নিকট নেমে আসে। তাদের সাথে থাকে চট। দৃষ্টির সীমা পর্যন্ত স্থাণ জুড়ে তারা বসে। তারপর মালাকুল মওত এসে তার শিয়রে বসে এবং বলে, হে দূরাচার আত্মা! আল্লাহর গযব ও ক্রোধের দিকে বেরিয়ে আয়। তখন তার আত্মা সকল অঙ্গ প্রত্যঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে। তারপর তাকে টেনে টেনে বের করা হায়। ফলে তার সাথে শিরা উপশিরা ছিন্ন ভিন্ন হয়ে যায়। তখন মালাকুল মওত তাকে ধরে চোখের পলকে সেই চটের মাঝে রেখে দেয়। তখন তা থেকে মৃত প্রাণীর উৎকট দুর্গন্ধ বার হয়। তারপর ফেরেশতারা তাকে নিয়ে আকাশে উড়তে থাকে, জখনই তারা ফেরেশতাদের কোন দলের নিকট দিয়ে যায়, তারা জিজ্ঞাসা করে- এই দূরাচার আত্মা কার? ফেরেশতারা তার কুৎসিত নাম নিয়ে বলে, অমুকের ছেলে অমুকের আত্মা। অবশেষে তারা দুনিয়ার আকাশে পৌঁছালে আকাশের দরজা খুলতে বলা হয়, কিন্তু দরজা খোলা হয় না। রাসুলুল্লাহ (দ:) বলেন- তাদের জন্যে আকাশের দরজা খোলা হবে না এবং সূচের ছিদ্র দিয়ে উট প্রবেশের মতই তাদের জান্নাতে প্রবেশ করাও চির অসম্ভব। তখন আল্লাহতায়ালা বলবেন, সিজ্জ্বিনে ( অর্থাৎ নাফরমানদের আত্মা রাখার দু:খময় আবাসে) তার অবস্থানের কথা লিখে দাও। তারপর তাকে ফিরিয়ে আনা হবে এবং তার শরীরে তার রূহ দেওয়া হবে। তখন ফেরেশ্তা এসে তাকে বসাবে ও জিজ্ঞাসা করবে, তোমার রব কে? সে বলবে, হায় হায়, আমি কিছুই জানি না। তারপর তারা জিজ্ঞাসা করবে, তোমার দ্বীন কি? সে বলবে , হায় হায়, আমি কিছুই জানি না। তারপর তারা জিজ্ঞাসা করবে যাকে তোমার কাছে প্রেরণ করা হয়েছে তার সম্পর্কে বল? সে বলবে, হায় হায়, আমি কিছুই জাণি না। তখন আকাশ থেকে এক আহ্বানকারী আহ্বান করে বলবে, আমার বান্দা মিথ্যা কথা বলেছে, তার জন্যে আগুনের বিছানা বিছিয়ে দাও। জাহান্নামের দিকে তার জন্যে একটি দরজা খুলে দাও যাতে তার উপর দিয়ে জাহান্নামের উত্তপ্ত হাওয়া প্রবাহিত হতে পারে। তোমার কবরকে এত সংকীর্ণ করা হবে যে একপার্শের পাঁজর আরেক পার্শে ঢুকে যাবে। আর তার নিকট অত্যন্ত দুর্গন্ধযুক্ত ভীতিপ্রদ পোশাক পরনে কুৎসিত ও বিকট চেহারার এক ব্যাক্তি আসবে এবং তাকে বলবে, আজ সেই দিন, যার প্রতিশ্রুতি তোমাকে দেওয়া হত। লোকটি বলবে, আমি তোমার বদ আমল। সে তোমাকে দারুণ কষ্ট দেবে। হে আমার রব, ক্কেয়ামত যেন না হয়। হে আমার রব, ক্কেয়ামত যেন না হয়।'


ঋণ- মালাবুদ্দা মিনহু, তাম্বিহুল গাফেলীন, নেয়ামূল কোরান। ব্যবহৃত গানগুলি লিখেছেন- দিব্য মুখোপাধ্যায়, বাপ্পা মজুমদার ও হাসন রাজা।
(চলবে)