আপনার মতামত         



প্রবাসের দিনগুলিতে প্রেম

অধীশা সরকার


প্রবাসের দিনগুলিতে প্রেম -১

১।
শরীরের সুড়ঙ্গ ধরে ঢুকে যাছে, ঠোঁট ফাঁক করে কষ বেয়ে নেমে আসছে ফেনা ফেনা। বস্তুটা যে কি তাও যদি ভালো করে জানতাম। যারা কমলালেবু খায় তারা একে বলে প্রেম। বাকিরা কেউ বলে ছ্যাঁচড়ামো, কেউ বলে উদ্ভিদ, কেউ বলে হ্যারি পটার।
বইমেলার ধুলোর গন্ধ ময়দান ছেড়ে বাইপাসে পালাচ্ছে। তাই দেখে উড়ন্ত এলোজাহাজ ঐ নেমে গেল গভীর বিকেলে। এই ধোঁয়া ধোঁয়া অন্ধকারের ইমেজে মিশে যাচ্ছে সেই সন্ধিক্ষণ। নাকি আমার বিভ্রান্তি সবটাই। দিবাস্বপ্ন। হ্যালুসিনেশন।
শীতগাছের কঙ্কালসার ক্ষুধা থেকে যতটা আশঙ্কা জমা হয় বুকে তার কিছুটা সকালে লেগে থাকে বেসিনের গায়ে। কিছুটা রুমালে থাকে। খানিকটা ক্যালেন্ডারের গায়ে লালকালির দাগে।
অবান্তর মোমবাতির দিকে তাকিয়ে থাকা। মোমবাতি অতীত দেখায় না। ভবিষ্যতও না। তীক্ষ্ণ আঁচে আকর্ষণ করে। আরাম দেয় না। উক্তি দেয় না। আগ্রহ দেয় না। বেমানান উষ্ণতা দেয় খানিক। মোমবাতির দিকে তাকিয়ে থাকলে একসময় নিজেকে মৃত মনে হতে পারে।
কালাপানি পেরিয়ে এসেছি আমি। পানির দোলায় দুলছে ঘড়ির কাঁটার গায়ে বিন্দু বিন্দু ঘাম। দুলছে লন্ডন ব্রিজ। চার্চের কঠিন গঠনে ছোপ ধরিয়েছে অলীক পলাশ।
কভেন্ট গার্ডেনের রাস্তায় পয়সা ছড়িয়ে দিলে চারপাশের পাথরে কোঁদা মূর্তিরা একে একে জীবন্ত হয়ে ওঠে। কোনো এক দুষ্ট যাদুকরের শাপে ওরা পাথর হয়ে গেছে। ক্ষণিকের জন্য ওদের স্বরুপে ফিরিয়ে আনার আনন্দে কভেন্ট গার্ডেনের রাস্তায় শ্বেতশিশুরা হাততালি দিয়ে ওঠে।
আলো আঁধারী রাস্তায় চকোলেট আর পুতুল বিক্রি হয়। ঠাণ্ডা বাতাস। কাঠের বেঞ্চ। কোনো ভ্যাগাবন্ডের বাঁশী। পথ হারিয়ে ফেললে আমরা দু'জনে মাঝে মাঝে এসেছি এখানে। অথচ আমি জানি তুমি এখানে কখনো আসনি।
জানতাম এই অশনিসংকেত পিছু ছাড়বে না। জানতাম ফিরে আসবে নিভু নিভু মোমবাতির আলোকবর্ষ পেরিয়ে। আমরণ শত্রুতা করবে ব্যাটারি ফুরিয়ে যাওয়া ঘড়ির থেমে থাকা সময়ে।
হয়তো একেই বলে অসময়। যখন কি-বোর্ডে আটকে যায় দশ আঙুল। অসাড় ঠোঁট। মস্তিষ্ক গলে গলে নামতে থাকে শিরদাঁড়া বেয়ে। বিস্মৃতির ভরাডুবী পেরিয়ে যেতে চায় তেপান্তর।
বিচ্ছেদের মূহুর্ত গুলো স্পষ্ট। দগদগে। মিলনের মূহুর্তগুলো ঝাপসা হয়ে আছে। ঘৃণা ধারালো। ভালোবাসা কি মজবুত? মাঝখানে সুক্ষ্ম রেখা। স্ক্রিনের গায়ে মাউস ছোঁয়াতে হয় ভীষণ সাবধানে। একটা ভুল ক্লিক হয়ে যেতে পারে সেই মারণাস্ত্র যা নিজেকে ধ্বংস করে অন্যের আগে।
মাঝে মাঝে ক্লান্ত লাগে। ক্লাস মিস, অফিস লেট, ওভেনের অন্তরালে জমতে থাকে উষ্ণতার স্বপ্ন।

২।
নদী যদি ফেরারী হয় তবে তার স্রোতের চিহ্ন ছুঁয়ে যায় সহস্র দিগন্ত। চিহ্নের সরলরেখাগুলো একে অন্যের সঙ্গে মিশতে মিশতে তৈরী করছে মাকড়শার জাল। দেওয়ালে ঝুলছে শুকনোলঙ্কার মালা। ভেলভেটের ঝুলিতে জমানো বিদেশী কয়েন। চৈতালী রাতের স্বপ্ন ব্যাকইয়ার্ডে অবাধ গজিয়ে ওঠা অচেনা হলুদ ফুল। খামে ভরা কর্পূর।
জালের ফাঁকে ফাঁকে গড়ে উঠছে ফাঁদ পাতার ও ফাঁদে পড়ার নানা উপকরণ।
যদি পাগল ছাড়া কেউ ম্যাজিক দেখাতে না পারে, আর তুমি তো আদতেই সু:স্থ মানুষ, তোমার আর এ যাত্রা নদীর সঙ্গে ফেরারী হওয়া হলো না। অথচ যে ম্যাজিশিয়ান বসে আছে নদীর উৎস অন্ধকার করে, তারও চিহ্নের পরীখা বাঁধা। ম্যাজিক দেখানোর মঞ্চে সামিয়ানা টাঙানো শেষ। এবার শো শুরু হবে।
হল নিস্তব্ধ। মোবাইল সুইচ্‌ড অফ। যে নদী ফেরারী হয়েছিল তার ফিরে আসার আর্জি পেশ করে ম্যাজিশিয়ান তার টুপি খোলেন। টুপির মধ্যে থেকে বেরিয়ে আসে ছেঁড়া ছেঁড়া খবরের কাগজের পাতা। হলময় উড়তে উড়তে তারা বিভিন্ন দর্শকের পকেটে ধুকে যেতে থাকে। হাততালি পড়তে থাকে, হাততালি।
ফেরারী নদীর তীরে দুই ডাইনী ততক্ষণে এঁকে চলেছে সাঁঝবেলার পেন্টাগ্রাম। ঢেউয়ের আগায় ভেসে চলা চিহ্ন গুলির অর্থ তারা জানে না।

৩।
কলকাতায় বৃষ্টি পড়ছে। আমি এতদূর থেকেও সেই বৃষ্টির শব্দ শুনতে পাচ্ছি। একটানা শব্দ। বহু, বহুক্ষণ ধরে এই বৃষ্টি পড়ার শব্দ, একইভাবে একটানা এই ঝরে জেতে থাকা, একসময় এই শব্দটাকে নৈ:শব্দ মনে হয়। জানলার বাইরে কমলা রোদ্দুর। ইংলন্ডে এই উইকেন্ড মেঘমুক্ত। সাউন্ডট্র্যাকে তবু অবিরাম বর্ষণ।
সমুদ্রের ছদ্মবেশে আসে থিমপার্কের জলকেলি। সন্ধ্যা নামে মেঘের রং বদলে। ফোন আসে। সমস্ত আপেক্ষিক যৌক্তিক-অযৌক্তিক বিষয় নিয়ে বোঝাপড়া শুরু হয়।
কে আগামী পাঁচ বছরে কতদূর যৌনতাকে অগ্রাহ্য করতে পারবে। চীন রুখে দাঁড়াবে না যোগ দেবে বস্তুতন্ত্রে। গাছকাটা কমবে না ডাইরী লেখা বাড়বে। বিবাহের যে ক'রকম সংজ্ঞা আছে তার মধ্যে কোনটা গ্রাহ্য হবে কোনটা বাতিল। তেলের দাম বাড়ার সঙ্গে ব্যক্তিজীবনের যোগ কতটা, ইত্যাদি।
এ সব কিছুর পরেও একটা প্রশ্ন থেকে যায় যেটা করে ওঠা হয় না। কিছু উত্তর থাকে যেগুলো দেওয়ার সুযোগ হয় না। এই প্রশ্নোত্তর গুলোর মাঝখানে একদিন দুম করে পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে।

৪।
আলতো, সরল, অলৌকিক, নচ্ছার, এই প্রতিদিনের আসামী জগৎ। একেক সময় বিছানায় মাধ্যাকর্ষণ কাজ করে না। শর্তহীন উড়ে চলার ইতিহাসে শরীরের শিকড় মাটি খুঁজতে খুঁজতে ক্লান্ত।অথচ মাতির স্বাদই তাকে উন্মুক্ত করেছে। উড়িয়ে নিয়ে চলেছে বিছানা থেকে জানালার পর্দায়। পর্দা থেকে মোমবাতিতে। মোমবাতি থেকে কলমে। কলম থেকে এয়ারপোর্টে।
হিসেব মিলছে না। সময় ফুরিয়ে আসছে। পাতা ফুরিয়ে আসছে। পরীক্ষা শেষের ঘন্টা বাজলো বলে।
পরীক্ষার শেষে অনির্দিষ্ট কোমা। বিষাক্ত অবসরের মাঝখানে পাঁচ মিনিটের রিফ্রেশমেন্ট ব্রেক। কোনটা যে সত্যি। কোনটাই বা মিথ্যে। কতগুলো মুখোশ, ক'টা মুখ, ক'টা ছায়া, ক'টা অবয়ব। এই হাওয়া চাম্‌ড়া তুলে নিচ্ছে। এতটা যন্ত্রনা শুধু দিতে পারে ভালোবাসাহীন জীবনের সঙ্গে ধারালো সঙ্গম।
অসময়ে ঘুমিয়ে পড়ে রাজকন্যা বারবার। সোনার কাঠি রুপোর কাঠি রয়ে গেছে সাত সমুদ্দুর পারের গোদরেজ আলমারিতে। এই সুরসিক চক্রান্তের দায় ঈশ্বর অথবা সরকার নেবে না। চক্রান্তের গন্ধে ম'ম করতে থাকা প্রিন্সেপঘাটকে কেউ বলবে মাকোন্দো, কেউ বলবে নক্‌শীকাঁথার মাঠ।


প্রবাসের দিনগুলিতে প্রেম -২


১।
হারানো চিঠিরা ট্যাবলয়েড হয়ে এখন ক্যাফে নেরোর জানলায় উদাসীন যুবকের নীল চোখে। পাতা ওলটাতেই ভ্যানিশ। পাতা ওলটাতেই সেক্সুয়াল হ্যারাসমেন্টের অভিযোগ করেছে নাওমি ক্যাম্পবেল। কেট মসের সোনালি বিকেল নিয়ে দর কষাকষি। যুবক চিঠি খোঁজে উলট-পালট। চিঠির জায়গায়- "হাউ টু অ্যারাউস আ ম্যান সাকসেসফুলি'।

চিঠিরা পাড়ি দিয়েছে এক জানলা ছেড়ে অন্য জানলায়। ট্যাবলয়েড থেকে ব্রডশিটে। কেট মস থেকে প্যারিসে দাঙ্গা থেকে টোনি ব্লেয়ার থেকে হিথরোয় টেররিজ্‌ম। কবে কে জানে তারা তোমার কাছে পৌঁছবে! পৌঁছবে কি?

২।
ফেরারী নদী তার চিঠি রেখে গেছে ম্যাজিশিয়ানের উদ্দেশ্যে। নদীতীরের কাদামাটির ওপর পড়ে আছে সেই চিঠি পদচিহ্নের মত। এখন তারা ফসিল। তাদের এথনিক ভ্যালু নিয়ে তর্কবিতর্ক চলে পন্ডিতমহলে। গ্রান্ট আসে। খোঁড়াখুঁড়ি শুরু হয়। উঠে আসে না কিছুই। সব পরিশ্রম পন্ড। প্রত্নতাত্ত্বিকের সানগ্লাস ছুঁয়ে চুঁইয়ে পড়ে বিরক্তি। তবে কি পুরোটাই মিথ? এই নদী, এই ম্যাজিশিয়ান, এই চিঠিদের সাংকেতিক আনাগোনা?

ওদিকে রূপকথার রাধাচূড়া তার শিকড়ের টানে তুলে আনে মাটির পরতে মিশে থাকা কিছু অক্ষর। ঝিরঝিরে হলুদ ফুলে ভরে যায় সাদার্ন এভিনিউ।

তবু সংশয়। ধরপাকড়। সি.আই.এ. চিন্তিত। কিভাবে যে পাচার হল চিঠি সংকেত! সাংকেতিক চিঠি। নদীর খোঁজে হেলিকপ্টার। ম্যাজিশিয়ানের বাড়ি তছনছ করে সিক্রেট এজেন্ট। খানিক খোঁজ মেলে। খানিক মেলে না। কখনো হঠাৎ পাওয়া কোনো ক্লু থেকে খোঁজ, খোঁজ.....পাহাড়, মরুভূমি, অয়েল মাইন। ক্লান্ত বিকেলে গুপ্তচর সূত্রের সঙ্গে সূত্র মেলায়, পথ খোঁজে, পথ হারায়। দিগন্তে তখন পাঁচমিশেলি রঙের সাংকেতিক সূর্যাস্ত।

ছক কষার খেলা চলে গভীর রাত অবধি। নদীর যাত্রা কি উৎস থেকে গন্তব্যে না গন্তব্য থেকে উৎসে? সূত্র বলছে হিমালয়। সূত্র বলছে পাহাড়ের শরীরে নদী ঠোঁট ছুঁইয়ে ফেরে বারবার। হিমালয় কি নদীর যাত্রাপথ না উৎস? অথবা দু'টোই। নদীর গন্তব্য কি চিরাচরিত সমুদ্র? না এর মধ্যেও কোনো গোপন ছল আছে? এখনো বোঝা যাচ্ছে না। পাহাড়ে পাহাড়ে পলাতক নদী মেঘের অপেক্ষায়। কোনো মেঘ নেই আকাশে।

৩।
আইরিস মারডকের "ব্ল্যাক প্রিন্স" থেকে হেঁটে বেরিয়ে আসা পাগলির সঙ্গে অফিস যাওয়ার পথে হঠাৎ দেখা। ধূসর চুল, সবুজ চোখ, রুক্ষ চামড়ার আঠেরো-উনিশ। একা জানলায় বসে রাস্তায় ছড়িয়ে দেয় ছেঁড়া চিঠির টুকরো। তোমাকে দেখলে সে তার আঙুলে বেঁধে রাখা বেলুনের সুতো কেটে দিত। নীল সবুজ পৃথিবীর আদলে তৈরি বেলুন। তুমি ফলো করতে বেলুনটাকে বহুদূর হয়তো রামধনু পর্যন্ত।

অথবা সে জ্যঁ রিসের "ওয়াইড সারগাসো সি"-র আন্তনিয়েত। আগুনরঙা আলুথালু মেয়ে। কার্ডবোর্ডের পৃথিবীতে মোমবাতি হাতে ঘোরে। তার ঘরে কোনো জানলা নেই।

কার্ডবোর্ডের শহরে আমিও ঘুরিফিরি। হাতে নেই বেলুন অথবা মোমবাতি। আছে নিউজপেপার। নদীর খবর খুঁজতে খুঁজতে দেখি মডেল এবং ক্ষুধার্তের নগ্নতা, জর্জ বুশ, সলমন রুশদি, ভূমিকম্পের নিথর চোখমুখ, মহম্মদের কার্টুন আর চীনে অলিম্পিক।

আরো দেখি এপাতা-ওপাতায় কিছু ভীতু চোখ, সেই পাগলিরা। কোনো না কোনো উপন্যাসের পাতা থেকে পলাতক। তুমি কি এদের প্রেমিক হতে পার না?

নদীর খবর নেই নিউজপেপারে। নেই বিলবোর্ডে অথবা লিফলেটে। সে কি সমুদ্রে পৌঁছল? না কি ধরা পড়ে গেল প্লাস্টিকের বোতলে? ওয়েদার রিপোর্ট বলছে আফগানিস্থানের কোনো কোনো এলাকা প্রায় সারা বছর মেঘ দেখে নি। ইংলন্ডে ক্রিসমাসের আয়োজন। তুষারপাতের সম্ভাবনা থেকে সাদা সাদা, ঝুরো ঝুরো, সহস্র টুকরোয় ঝরে পড়ে নদী সান্তা ক্লজের দাড়িতে। সান্তা ক্লজ, নাকি ম্যাজিশিয়ান?

৪।
কালাপানির গর্ভ থেকে উঠে আসা সংকেত ছাতা-উল্টে-ফেলা বৃষ্টিতে। আবার সেপ্টেম্বর। এয়ার ইন্ডিয়ার ফ্লাইট অপেক্ষা করছে। জানি না তোমার কাছে ফিরছি কতটা আর কতটা ফেলে যাচ্ছি তোমায়।

আজ ভোর হচ্ছে অন্যভাবে। শোনা যায় পৃথিবীর প্রত্যেক বন্দরে সূর্যোদয়ের অনাবিল ঘন্টাধ্বনি। যাত্রা শেষ অথবা শুরু। অথবা মাঝপথ। মাঝপথেই বিপদ। চোরাস্রোত। দিকভুল। ওয়াচটাওয়ারের আলোয় কাঁপা কাঁপা বিভ্রান্তি।

আর কোনো ঘন্টাধ্বনি শোনা যাচ্ছে না। সব চুপ। তবে কি পথ পাওয়া যাবে? ডাইনে-বাঁয়ে, ওপরে নীচে? ম্যাপের ওপর ঝুঁকে পড়ছে মাথাগুলো। হিসেব চলছে। স্যুপ ঠান্ডা হচ্ছে। এভাবেই কেটেও তো যাচ্ছে আলোকবর্ষ। তবে আর ভাবনা কি?

তবু পথ পেতেই হবে একটা। এগোবার অথবা পালাবার। তাই অনেকেই উদ্বিগ্ন। দূরবীন, কম্পাস, কি-বোর্ড। বন্দরের দিক্‌নির্ধারণ। চাঁদকে আর কারো ভরসা নেই। নক্ষত্ররা বহুদিন বিশ্বাসঘাতক।

ওরা অপেক্ষা করছে। কোনো সংকেত আসছে না। শুধু মাস্তুলের আশেপাশে উড়ে বেড়ায় একজোড়া হলুদ প্রজাপতি।

ক্যালেন্ডার বলছে এটা শীতকাল। অথচ বসন্তের গন্ধে উত্তাল ক্রমাগত পৃথিবীর সমস্ত বন্দর, নাবিক, মাঝিমাল্লা, জলদস্যু।

কে কাকে বিশ্বাস করবে? মহাকাশে ভেসে বেড়ায় কয়েক টুকরো পাথর। ছক কষা চলে। অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ। হাতের দশ আঙুলে প্রতিরক্ষা। তবু হাত কাঁপছে। সরলরেখা টানা যাচ্ছে না।

তাহলে ক্যামেরা। কুড়িয়ে আনা টুকরোগুলোয় সমুদ্রের প্রতিফলন। জগতের বিনোদনযজ্ঞে আমরা ট্র্যাজিক সিগাল কামনা করেছি সুবিশাল সমুদ্রতটে। সিগালের উদাসীন উড়ে চলা ধরে ফেলেছে চতুর ক্যামেরা। এরপর বিশ্লেষণ হবে। ভাঙ্‌চুর। ক্রিয়েশন। ডিলিউশন। ইভলিউশন।

আসলে সিগাল মাছ খুঁজছে। মাছ উদ্ভিদ খুঁজছে। উদ্ভিদ বায়ু খুঁজছে। আর আমরা এদের অনুসরণ করছি একটু দূর থেকে।

৫।
স্বপ্নে আমি হুইলচেয়ার ঠেলে ঠেলে এগিয়ে চলি। ইউনিভার্সিটির করিডোর ধরে হুইলচেয়ার এগোয়। করিডোর হয়ে ওঠে লেটন স্ট্রিট.....হয়ে ওঠে ট্রাফালগার স্কোয়ার.....নিমেষে হুইলচেয়ার মাদাম ত্যুসোর দরজায়। আমার সামনে চার্লি। এভাবেই করিডোরটা হয়ে গেল হিথরো এয়ারপোর্ট। রানওয়ে ধরে এগিয়ে চলে হুইলচেয়ার। দু'পাশে পরিত্যক্ত হেলিকপ্টার মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। তাদের গায়ে গজিয়ে উঠেছে সামুদ্রিক উদ্ভিদ। হুইলচেয়ার এগোতে থাকে। রানওয়ে হয়ে যায় সমুদ্রতট। হামলে পড়ে ঢেউ একের পর এক। কামনায় ছটফট করতে থাকা সমুদ্র কাতরভাবে ডাক দেয় বারবার। সমুদ্রের শরীর থেকে উথলে ওঠে হিমালয়। আমি উঠে দাঁড়াই। ছুট দিই সমুদ্র নাকি হিমালয়ের দিকে। বালির ওপর ফাঁকা হুইলচেয়ার পড়ে থাকে। একা।