আপনার মতামত         



ডেরাইভার

সুমন মান্না



যা চলে, তাই গাড়ি - না, ভুরু কুঁচকে তাকানর কিছু নেই এতে। আরে না, তা বলে গালে হাত দিয়ে ভাবতেও বলছি না। বলার কিছু নেই, শোনার কেউ নেই, তবুও কাগজে ছেপে তো আর পরিবেশ দূষণ করছি না যে হুট করে কেউ চেপে ধরবে। এই অনবাদী, বাস্পীয় মায়াভূমি বিস্তারে বহু যোজন। আমি লিখব - চালাব - কখনো দাঁড়িয়ে যাব চড়ুই পাখি দেখে। মাঝে মাঝে চিৎকার করে বলে উঠব - যা চলে তাই গাড়ি।

আমি দিল্লিতে যত বাঙালি রিক্সাওয়ালা দেখেছি তত আমাদের কলকাতায় নেই। বিশুদ্ধ বাংলায় বাড়ি কোথায় জিজ্ঞেস করলে প্রথমে চুপ থাকে, গলা একবার খঁকারি দিলে জলের ওপর অনর্থক তৈরী হওয়া বুদবুদের মত ক্ষীণ আওয়াজে বলে মালদা। পদ্মার এপার না ওপার শুধোলে কিছু বলে না - মুচকি হাসে। ওরা গাড়ি বলে রিক্সাকে? জানিনা।

আর বেশি রং সাইডে যাওয়া নেই। চালান হয়ে গেলে খরচা আছে। ছোটো করে নীলপাত্তি গুঁজে না দিলে কাগজ চলে আসবে - তিস হাজারির গলি খুঁজিতে ঘুরে বেড়াও। সেখানে ভিডিও দেখিয়ে ক্লাস নেবে। মানে একদিনের অফিস নাগা।

যাচ্ছিলাম গাজিয়াবাদ ইন্ড্রাস্টিয়াল এরিয়াতে - এক চমৎকার জুনের দুপুরে। আকাশের রং খ্যাঁসটা - বুইলেন না তো? যে রং দেখে তার ভূত ভবিষ্যত জীববিজ্ঞান, পাটিগণিত - কিছুই বোঝা যায় না তাহাই খ্যাঁসটা। পড়শোনা কম করে রাস্তায় রাস্তায় উটমুখো হয়ে না ঘুরে বেড়ালে কি করে বুঝবেন? হঠাৎ করে আপনার সামনে ঘ্যাঁচ করে ব্রেক কষে দাঁড়ালো যে বাইকটা। তার চালকের উচ্চারিত প্রতি শব্দের পারিভাষা ঐ খ্যাঁসটা।

আবার রং সাইড - দেখুন, বেশি ভ্যাজর ভ্যাজর করবেন না তো। দেখলেন না সামনের রাস্তায় দুম করে সামনে এসে যাওয়া গাড্ডাটাকে টুক করে কিভাবে কাটিয়ে দিলাম? এর আগে কার্ণিক মেরে দেখেও নিয়েছি ডান দিক থেকে কোনো বুনো ষাঁড় তেড়ে আসছে কিনা। এই যান প্রায় অনেকটাই আমি। এর নীল রঙ। এর গায়ের প্রতিটি আঁচড় আমার চেনা। কবে চালাতে চালাতে ঝিমিয়ে ছিলাম আর সামনের জেন টা হঠাৎ ব্রেক কষে ডেড স্লো হওয়াতে সামনের চাকা ঢুকিয়ে দুয়েছিলাম তার বাম্পারের তলায়। জেন চালিকা বোঝেন নি এই গুঁতো। হাতে করে টানতেও বের হল না তক্ষুণি। যখন বুঝলাম জেন গীয়ার চেঞ্জ করে এবার এগোবে তখন সীট থেকে আলগা হয়ে গেছি। আহা টুক করে কেমন বেরিয়ে এলো সামনের চাকা। সাইড করে সামনের বাম্পার ঠুকে নিয়ে দেখে নি ডানদিক বঁদি ঘোরাতে অসুবিধা হয় কিনা। বেঁচে থাক আমার সকুটার - আজ্ঞে না, এবার আর বানাম ভুল নয়। এই প্রান্তে জনতা সকুলে যায়, সকুটারে চাপে - বুয়ে লিন না বাপধন।

চালাতে চালাতে ঘুম পেয়ে যাওয়া? সত্যি। পায়। আগের রাতে একটু বেশি অনিয়ম হলে পায়। একঈ রাস্তায় বছরে চারশো দিন যাতায়াত করলে পায়। তেমন কোনো কাজ না থাকলে পায়। না, বাহন চালানো তেমন কোনো কাজ না - গাড়ি তো চালায় প্রতিবর্ত আর আমি সব ছেড়ে দু-আঁজলা ঘুমে ডুব দিতে থাকি। যেন পৌঁছে গেছি গন্তব্য - যেন ভাতে পাশে লেবুর টুকরোটি হয়ে পড়ে আছি - যেন কোনোদিন আমার সিগারেটের প্যাকেট ফুরোবে না - আর সেই ঢিলে হয়ে যাওয়া প্রতিবর্ত স্কুটার নিয়ে উঠে যেতে থাকে ফুটপাথে। তখন চেঁচিয়ে উঠি আমি। গান গাই। কাঁচা খিস্তি মারতে থাকি - না অন্য কাউকে নয়।


যা বলছিলাম, গাজিয়াবাদ ইন্ডাস্ট্রিয়াল এরিয়াতে যাচ্ছি - বাইপস ধরে। তাপমাত্রা পঞ্চাশ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড প্রায়। না, এটা আর বাড়িয়ে বললাম না। আজকের দিনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা চুয়াল্লিশ দশমিক তিন ডিগ্রী সেলসিয়াস ঘোষণা করে যে ঘোষিকা ক্যাঁক করে মাড়ি দেখিয়ে দিল - জানিনা সেও জানে কিনা ওটা ছিল "ছায়াচ্ছন্ন অঞ্চলের উষ্ণতা" - পুরো ভূগোল বই থেকে টুক করে মেরে দিলাম দেখলেন। হ্যাঁ, ওটা পঞ্চাশ। বাইরের তাপমাত্রা যখন শরীরের চেয়ে বেশি বেড়ে যায় তখন একটা অদ্ভুত অনুভূতি হয়। শ্বাসের সাথে অগুন টেনে নি আমি। গাড়ি সাইড করি। হেলমেট খুলে তার মাথায় হাত রেখে দেখি একটা ডিম বেঙে দিলে পোচ হতে সময় বেশি লাগবে না। ঘাম তেমন হয় না। মুখের ওপর হাত দিলে সাদা সাদা নুন উঠে আসে। মুখ মুছে নি। হঠাৎ একটা কথা মনে আসতে বেশ মজা লাগে - ঠিক এই সময়টুকুর জন্য আমি শীতল রক্তের প্রাণী। বুকে হেঁটে যেতে থাকি রাজধানীর রাজপথে।

তার আগে একটা সিগারেট ধরিয়েছিলাম। দেশলাই জ্বালাতে হত না হয়ে্‌তা, শুধু দেখালেই কাজ হত - এতো বেশি দাহ্যবিন্দুর কাছে ছিল। পুরো আগেকার দিনের ঘি আগুন কেস। দাদার বন্ধুকে এক গ্লাস জল এগিয়ে দিতে গিয়ে আঙুল ছুঁয়ে গেলে সে কী মিউজিক - ঝ্যাং - তারপর মুখে আঁচল চাপা দিয়ে নায়িকা এক ছুটে সীন থেকে হাওয়া। আর নায়ক - ব্যাটাচ্ছেলের হাতের গেলাস হাতেই রয়ে গেল - ইচ্ছে করে.... না থাক। সে সব চুকেবুকে গেছে।

সঙ্গে একটা জলের বোতল থাকে। তেতে আছে। চুমুকে সেই উষ্ণতা বিস্বাদ। হেলমেট খুলে মাথায় খানিক ঢালি। চুলে বেয়ে কালচে তরল গড়িয়ে আসে গালে গালের পাশ দিয়ে - বোধ হয় এটা লিখতে হবে ভেবেই সেই তরলের রঙ দেখে নিয়েছিলাম আয়নায়। তারপরে সরীসৃপ হয়ে এগিয়ে যেতে থাকি। হেলমেটের সামনের কাচ তুলে দিলে ঠান্ডা লাগে সেই তরলের দ্রুত বাষ্পীভবনের প্রক্রিয়ায় - বেশিক্ষণ নয় তারপর আবার সব শুকিয়ে কিছু নুন থেকে যায় - লুচি কেসের মতো। সেই জলের গেলাস হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা বন্ধুর দাদা যেমন কয়েক সীন পরেই সারা সন্ধে জুড়ে কোমরে গামছা বেঁধে পরিবেশন করে একসময়ে টুক করে কেটে গিয়ে একা একা মেসে ফিরে যায় - আর নুনের গুঁড়ো চিড়বিড় করতে থাকে বাকি জীবনটা জুড়ে।

আমার নিজের শহরে গ্রীষ্ম এত সামনে আসতো না। অনুভূতিগুলো ব্যস্ত থাকতো বহুতর গুরুত্বপুর্ণ প্রস্তাবে। মনে পড়ে, একবার শিয়ালদা থেকে যাদবপুর পর্যন্ত ৪৫ নম্বর বাসে ঝুলে ঝুলে গিয়েছিলাম এমনই এক রমণীয় জুনে। বাসের জানলায় হাত বাড়িয়ে হাতের ফোলিও ব্যাগটাকে চালান করেছিলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এক মুখচেনা পরিচিতার দিকে। তাকে আগেও দেখেছিলাম ক্যামপাসে। তেমন কোনো ছুঁতো পাই নি আলাপ জমানর। হাসিটা বড্ড মিষ্টি ছিল তার। ওর পাতলা আঙুলগুলো আমার ফোলিও ব্যাগের গায়ে যে দখিনা বাতাস মেখে দিয়েছিল তার আবেশে পেরিয়েছিলাম সারা রাস্তা। কাঁধ থেকে ডানহাতটা ছিঁড়ে পড়তে পারতো। কিংবা ঘামে ভিজে গিয়ে হাতটা পিছলে গিয়ে হয়তো রাস্তায় পড়ে যেতাম যেকোনো সময়ে। তবুও। আসলে এসব কিছুই নয়। একলষেঁড়ের ঝক্কি আর তো আর কম নয়।

তখন দেখতাম পিচ গলে যায়। আমাদের বাসস্টপের সামনে পিচের দুটো ঢেউ ছিল প্রত্যেকবার গ্রীষ্মে গলে যাওয়া পিচ সেগুলো বানিয়ে দিতো নতুন করে। এদিকে এতো শুকনো চারপাশ যে পিচও বোধ হয় গলে যেতে ভয় পায়। সদ্য চাপা পড়া কুকুর চামড়া হাড় মাংসে জারিত হতে হতে কয়েক ঘন্টা বদে ঐ পথ দিয়ে ফিরে আসার সময়ে দেখি কাবাব বনে গেছে। দিল্লি ইউপি সীমান্তে সারি সারি ট্রাক দাঁড়িয়ে থাকে রাস্তার ধারে। মাছি ভনভন করতে থাকে ঝুপড়ি গোছের অপরিস্কার ধাবায়। দড়ির খাটিয়ায় ভোজন সারে ট্রাক ডেরাইভার মজবুত রুটি, ঢ্যাপসা কাঁচালঙ্কা আর কালো ডাল দিয়ে, সেলাড চাইলে কোয়ার্টার প্লেটে কিছু সাদা মুলোর টুকরো নিয়ে আসে খালিগায়ে হাফপ্যান্ট খুলে আসা কালো কালো ছে্‌ল - জনমতধর্ম নির্বিশেষে ওদের নাম ছোটু। দু'চাকার ঠেলাগাড়িতে অর্ধেক কাত হয়ে থাকা পিতলের বিরাট হাঁড়ি - তার সামনেও ভনভন করতে থাকে কিছু মানুষ।

ধুলো পাক খেয়ে খেয়ে ওঠে। মাতালের মতো পাক খাওয়া ধুলো চলে যেতে থাকে, আবার ফিরেও আসে খুচরো গুণে নিতে। জাতে মাতাল তালে ঠিক। বিনা নোটিসে ঘ্যাঁচ করে ব্রেক কষে থেমে যাওয়া ব্লু-লাইন বাসের পিছনে পোস্টার হতে যাওয়া কোনোমতে সামলে নি। পাশ কাটিয়ে বেরোতে গিয়ে হেলেমেটের কাচ সরিয়ে কিছু বাছা বাছা শব্দ হাওয়ায় উড়িয়ে দি। আর তারপরেই টক্কর শুরু হয়ে যায়। গতি বাড়িয়ে ছুটে আসতে থাকে উন্মত্ত বাস। হর্নের তীক্ষ্ণ শব্দ পিঠের ওপরে চামাড়ায় কেটে কেটে বসে যেতে থাকে। সকুটার মুখে রক্ত তুলে এগিয়ে যেতে থাকে। কোনোমতে সামনের কাটে ডানদিকের রাস্তায় ঢুকে যাই - পিছনের চাকা ধুলোর মধ্যে পিছলে যায় - কিন্তু ফেলে দেয় না তার ডেরাইভাকে।

এতে কারুর কিছু এসে যায় না - শুধু ঘুমের ধুমকিটা কাটে।