আপনার মতামত         




রাজাকার হয়ে ওঠার গল্প বা ঠাকুর বাড়ির কিস্‌সা


সামরান হুদা



আগের পর্ব


-১৩-


না যান, না যান, না যান মাহুত রে,
মাহুত বাড়িতে বহেন রে হাল।
ভালে না হয় হাতীর চাকিরি, সাথে সাথে কাল।।


বাপো ভাইয়ে নাই শিখায় কইন্যা রে, হালো বহিবারে।
কেনং থাকিমো কইন্যা, তোমার বাসরে।।


না কান্দো, না কান্দো কইন্যা কইন্যা হে, ভাঙ্গিবে অসের গালা।
খোদায় যদি ফিরিয়া আনে, সোনায় বন্দিম গালা।।


তোরষা নদীর পারে পারে রে মাহুত, তোমরা চরন হাতী।
তুই মাহুতের গুণো শুনিয়া আমরা দিলাম জাতি।।


জাতি দিনু কুলো দিনো রে মাহুত, তোমার নাগিয়া।
এলায় কেনে ছাড়িয়া যাচ্ছেন নিদয়া হইয়া।।


ছয়ো মাসো থাকো কইন্যা হে, বাপে ভাইয়ের ঘরে।।
ফিরিয়া আসিমো কইন্যা হে ছয়ো মাসো পরে।।

                                                               (ভাওয়াইয়া, রংপুর)


জাহাঁ আরা'র বাপের বাড়ির অবস্থা খুব ভাল না হলেও সরকারী চাকুরে মৌলভি আব্দুল গফুরের সংসারে অভাব ছিল না। একমাত্র মেয়ে জাহাঁ আরা'কে কোনদিন হাতে করে কুটোটি নাড়তে দেননি মা নূর জাহাঁ। নাবালিকা অবস্থায় মেয়ের বিয়ে দেওয়াতে প্রবল আপত্তি ছিল নুর জাহাঁর, কিন্তু মৌলভিবাড়ির রেওয়াজ মেনে ন'বছর বয়েসে জাহাঁ আরা'র বিয়ে হয়ে গেলেও প্রথম কয়েক বছর সে বাপের বাড়িতেই ছিল। এবং তারপরেও যখন জাহাঁ আরা শ্বশুরবাড়ি গেল, তখনও জাহাঁ আরা বছরে ন'মাস বাপের বাড়িতে থাকত। কখনও তো আবার দু'বছরে একবার শ্বশুরবাড়ি যেত, যখন সাত্তার আসত কলকাতা থেকে। একে একে জাহাঁ আরা তিন ছেলের মা হল, ছেলেরা বড়ও হতে লাগল। সেই দু'বছরে একবার সাত্তার বাড়ি এলে জাহাঁ আরা নরাইলে আসে, কখনও সাত্তারের চিঠি পেয়ে মৌলভি সাহেব মেয়ে আর নাতিদেরকে নরাইলে পৌঁছে দিয়ে যান আবার কখনও সাত্তার নারায়ণগঞ্জে এসে জাহাঁ আরাকে নিয়ে যান। মাস দুয়েক সাত্তার থাকেন, আবার ফিরে যান কলকাতায়, তাঁর কাজের দুনিয়ায়। জাহাঁ আরা গর্ভবতী হয়। তিন-চার মাস কেটে গেলে মৌলভি সাহেব মেয়ের খোঁজ নিতে এসে মেয়েকে সঙ্গে করেই নিয়ে যান। এযাবৎ এরকমটাই হয়ে এসেছে।


সে বছর প্রথম ব্যতিক্রম হল। জাহাঁ আরা'র চতুর্থ ছেলে জন্মের আট মাস পরে হঠাৎ একদিন ডিপথেরিয়ায় মারা যায়। ফর্সা নাদুস-নুদুস ছেলেটি যেন জাহাঁ আরা'র চোখের মণি ছিল। চলে যাবে বলেই বোধ হয় শিশুটি অদ্ভুত এক মায়ায় জড়িয়েছিল সকলকে। জাহাঁ আরাকে সে এক মুহূর্তও ছাড়ত না, নানা-নানী যার কোলেই থাকুক না কেন, মা চোখের আড়াল হলেই হাত পা ছুঁড়ে কাঁদতে শুরু করত। বড় তিনছেলের দায়িত্ব একরকম মায়ের পরে ছেড়ে দিয়ে জাহাঁ আরা ব্যস্ত থাকত কোলের ছেলেকে নিয়ে। আধো আধো বোলে ছেলের মম্মা মম্মা ডাক শুনে জাহাঁ আরা জগৎ সংসার ভুলে যেত। কি হয়েছে না হয়েছে বুঝতে পারার আগেই একদিন মায়ের কোলেই ঢলে পড়ল আট মাসের শিশুটি। বেশ কয়েকদিন জাহাঁ আরা বিশ্বাসই করতে চাইত না যে ছেলে তার মারা গেছে। পাগলের মত ছুটে ছুটে বাড়ির পাশের কবরস্থানে গিয়ে বসে থাকত, যেখানে তার কোলের শিশু ঘুমিয়ে আছে। জাহাঁ আরা'র অবস্থা দেখে মৌলভি সাহেব চিঠি লিখে সাত্তারকে বাড়ি আসতে বলেন, পত্রপাঠ সাত্তার চলেও আসেন। নিজের অদেখা শিশুপুত্রের কবরের পাশে বসে সাত্তার যেন হিসেব মেলানোর চেষ্টা করেন, এই বছরের পর বছর কলকাতায় থেকে ব্যবসা করে তিনি কি পেলেন আর কি হারালেন।


জাহাঁ আরা নরাইল যেতে না চাইলেও মৌলভি সাহেব একরকম জোর করেই তাকে সাত্তারের সাথে পাঠান, বছর দশেকের খোকন আর সাত বছরের ছোটন থাকে নারায়ণগঞ্জেই, নানার কাছে, তারা ওখানকার মক্তবে পড়ে, আর কিছুদিন পরেই মৌলভি সাহেব ওদেরকে মাদ্রাসায় ভর্তি করবেন বলে মনস্থ করেছেন। ছোটছেলে রোকনকে সাথে নিয়ে জাহাঁ আরা নরাইল আসে। ঠাকুরবাড়ির সকলে ভীড় করে এসে দাঁড়ায় জাহাঁ আরাকে দেখতে। আর জাহাঁ আরা? সে যেন বোবা পুতুল। কে এলো, কে গেলো সেদিকে কোন খেয়ালই নেই তার, রোকনকে কোলে নিয়ে বসে শুধু একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে দেওয়ালের দিকে। তার আব্বা বলতেন, শোক নাকি করতে নেই, শোক করা গুনাহ। আল্লাহ'র মাল আল্লাহ নিয়ে গেছেন, বান্দা কেন শোক করবে? সে এতদিনেরই আয়ু নিয়ে এসেছিল, এখন বেহেশতে আছে, জাহাঁ আরা যদি শোক করে, তবে তো বেহেশতে ঠাঁই হবে না, ওইটুকু শিশুকেও আল্লাহ শাস্তি দেবেন, কেন পৃথিবীতে সে এত মায়া বাড়িয়ে এসেছে, যার জন্যে লোকে শোক করে! জাহাঁ আরা যেন ধাক্কা দিয়ে নিজেকে তুলে উঠে দাঁড়ায়, চেষ্টা করে শোক ঝেড়ে ফেলার, সত্যিই তো! মুর্শেদ তো তার বেহেশতে আছে, আল্লাহর কাছে! উঠে গিয়ে ঠাকুরবাড়ির হেঁসেলে ঢোকে নিয়মমত। স্বস্তির নি:শ্বাস ফেলেন সাত্তার।


সে বছরটাই অন্যরকম ছিল জাহাঁ আরা'র জন্যে। সেই প্রথম সাত্তার ছ'মাস দেশে থাকলেন জাহাঁ আরা'র কাছে, জাহাঁ আরা'র জন্যে। এ যেন অন্য সাত্তার। গৃহস্থ সাত্তার। ভোর ভোর উঠে ক্ষেত দেখতে যান সাত্তার, সাথে যায় জলিল। বেলা মাথায় ওঠার আগেই বাড়ি ফিরে ভরপেট নাশতা করে বাজারে যান, কোনদিন নরাইলের বাজারে, কোনদিন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বড় বাজারে কোনদিন বা আরেকটু দূরের ভৈরবে। পাইকারী ব্যবসায়ী সাত্তার যাই কেনেন, বস্তা হিসেবে কেনেন। সেবছর ভৈরবে বাজার করতে গিয়ে শুনলেন, এলাচ খুব সস্তায় পাওয়া যাচ্ছে, বিদেশ থেকে আসা সেই এলাচ সাত্তার কিনে ফেললেন আড়াইমণি বস্তায় এক বস্তা। জলিল মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ে বাজারেই, এই এক বস্তা এলাচ দিয়ে কী হবে ভেবে না পেয়ে। বাড়ি ফিরেও একই প্রতিক্রিয়া পেলেন সাত্তার, রাহেলা বিবি ঘোষণা করে দেন, যদ্দিন বাড়িতে আছে, সাত্তার আর বাজারে যাবে না! চাল মাপার বেতের গোল সেরে করে রাহেলা বিবি সেই এলাচ বিলি করলেন গোটা পাড়ায়। সাত্তার বললেন, &হয়ষঢ়;দেহ তো, তুমরা হগ্গলে মিল্যা আমারে কত কি কইলা, অহন এই যে আম্মায় সবেরে এলাচি বিলি কইরা দিল, না আনলে কই থেইক্যা দিত?' তাই তো!


বিয়ের পরে সেই প্রথমবার যখন নরাইল এসে জাহাঁ আরা তিনমাস সাত্তারের সঙ্গে ছিল, সেই দিনগুলো যেন আবার ফিরে এল জাহাঁ আরা'র জীবনে। ছেলের শোক মনের ভেতরে চেপে রেখে জাহাঁ আরা ফিরে আসে দৈনন্দিন জীবনে। দুপুরবেলা খেয়ে উঠে ঘুমিয়ে পড়া সাত্তারের বুকের পরে মাথা রেখে শুয়ে শুয়ে ভাবে জাহাঁ আরা, এভাবেই যদি জীবনটা কেটে যেত! কিন্তু না। কাটে না। একসময় সাত্তার ফিরে যাওয়ার জন্যে তৈরি হন, আর কতদিন ব্যবসা-বাণিজ্য ফেলে রেখে বসে থাকা যায়! সাত্তার যখন ফিরে যান, জাহাঁ আরা তখন আবার গর্ভবতী। সাত্তার নিজে এবার গিয়ে জাহাঁ আরাকে নারায়ণগঞ্জে রেখে আসে, আর খোকন, ছোটনকেও তো একবার দেখার দরকার, যদিও তারা এর মধ্যে বেশ কয়েকবার নানার সঙ্গে এসে নরাইল ঘুরে গেছে। কয়েকমাস পর জাহাঁ আরা একটি মৃত কন্যাসন্তানের জন্ম দেয়। মৌলভি বাড়িতে সকলেই বলে, জাহাঁ আরা'র উপর জ্বীনের আসর হয়েছে, নইলে এমন সোনার ছেলে মরে যায়, আর এবার দেখো, মেয়েটাকে তো পেটেই মেরে ফেলল! জাহাঁ আরা'র সর্বাঙ্গ ভরে ওঠে তাবিজে-মাদুলীতে। জাহাঁ আরা এবার আর শোক করে না। মেয়ে তো তার জন্মানোর আগেই আল্লাহ'র কাছে গেছে, সে কেন শোক করবে!
 
বাড়ির সকলে চোখে চোখে রাখে রোকনকে, বলা তো যায় না, জ্বীনের আসর বলে কথা, এই ছেলেটাকেও যদি কিছু করে বসে জাহাঁ আরা'র কোল খালি করার জন্যে! এদিকে দিনে দিনে বদমাইশের ধাড়ি হয়ে উঠছে ছোটন। কারোর কথা শোনে না, সারাক্ষণ মাঠে মাঠে ঘুরে বেড়ায়, মাদ্রাসায় পাঠানোর জন্যে তাকে খুঁজেই পাওয়া যায় না। জাহাঁ আরা তাকে শাসন করতে গেলে মাঝখানে এসে পড়েন নূর জাহাঁ, একে একে দুটো ছেলে তো গেল, যে আছে তাকে কি জাহাঁ আরাই মেরে ফেলবে! এদিকে মৌলভি আব্দুল গফুর অবসর নিয়েছেন চাকরি থেকে। সংসারে টানাটানি শুরু না হলেও খরচের হাত ছোট করতেই হয় মৌলভি সাহেবকে। পেনশনের টাকায় সংসার চালাতে হিসেব করতেই হবে। দেখাশোনা করতে পারবেন না বলে জমি-জমাও তো করেননি চাকরি করা কালীন। এত বছর মেয়েকে নিজের কাছে কাছে রেখেছেন, কোনদিন মেয়ে-নাতিদের খরচের জন্যে জামাইয়ের কাছ থেকে একটি পয়সাও নেননি আব্দুল গফুর, কিন্তু এখন বোধ হয় আর চলবে না। নাতিগুলো বড় হচ্ছে, তাদের পড়াশুনোর একটা খরচ আছে। দুশ্চিন্তায় ভারী হয়ে থাকে তাঁর মাথা। চিন্তা হয় নূর জাহাঁরও, মেয়ে তো তাঁর আলা-ভোলা, এতগুলো ছেলের মা হল, এখনও সংসার বুঝল না! মেয়েকে কিছু বলতেও পারেন না আর ভেবে কোন কূল- কিনারাও পান না।


মৌলভি সাহেবের দুশ্চিন্তার ভার কমাতেই যেন সাত্তার এসে হাজির হন, এমনিতেও তাঁর আসার সময় হয়ে এসেছিল। মৃত সন্তানের জন্মের পর মৌলভি সাহেব নিজেই চিঠি লিখে আসতে বারণ করেছিলেন, সবে তো এই সেদিন জামাই বাবাজী গেলেন, তিনি যেন তাঁর সময়মতই আসেন, জাহাঁ আরা'র জন্যে চিন্তা করতে হবে না, সে ভাল আছে। এবারেও সাত্তারই আসেন নারায়ণগঞ্জে, জাহাঁ আরাকে নিয়ে যেতে সাথে আসেন ঠাকুর আব্দুল গাফ্‌ফারও। ছ'মাসে-ন'মাসে তিনি একবার করে এমনিতেও আসেন, ভাইপোদের দেখতে, জাহাঁ আরা'র খোঁজ খবর নিতে। পত্র মারফত জাহাঁ আরা'র মৃত কন্যাসন্তানের খবর পেয়েও এসে দেখে গিয়েছিলেন গাফ্‌ফার সাহেব। আন্তরিক দু:খিত ছিলেন। ঠাকুরবাড়িতে এই প্রজন্মে এখনও পর্যন্ত কোন কন্যাসন্তান নেই কারোর, মোমিনের তিন ছেলে, বিলুরও পরপর শুধু ছেলেই হয়ে যাচ্ছে বছর বছর, হান্নুর যাও বা মেয়ে হল, সে পৃথিবীর আলো দেখবার আগেই পৃথিবী থেকেই চলে গেল! গফুর সাহেব তাঁকে বুঝিয়েছেন, মৃত কন্যার জন্যে  যেন আফসোস না করেন, আল্লাহ তাতে নারাজ হন। আল্লাহ দেবার মালিক, আল্লাহ'র মর্জিতে জাহাঁ আরা আবার নিশ্চয়ই কন্যাসন্তানের জননী হবে, মালিকের ঘরে অভাব তো কিছুরই নেই, বান্দাকে শুধু চাইতে হয়, মালিক তো দেওয়ার জন্যে বসেই আছেন!


সাত্তারের সাথে মৌলভি বাড়িতে এসে জাহাঁ আরাকে নিয়ে যাওয়ার কথা গাফ্‌ফার সাহেবই পাড়েন। মৌলভি সাহেবকে বলেন, &হয়ষঢ়;তালই সাব, এত বছর তো হান্নু'র বউ-বাচ্চা আপনের বাড়িতে থাকল, এইবার লইয়া যাইতাম চাই, ভাতিজাগোরে লইয়া গিয়া ইস্কুলে ভর্তি করাইয়া দেই আর মেজবউয়েরেও লইয়া যাই। আপনে তো অনেক করলেন, আর কত। আর আপনেরও তো বয়স হইসে, অহনে বিশ্রাম নেন, আরাম করেন, নাতি-নাতকনের দায়িত্ব এইবার আমাগোরে দ্যান, আর মেজবউয়েরও তো সংসার বুইঝা লওনের দরকার। আম্মার বয়েস হইসে, অহনে যদি নিজেরটা নিজে না বুইঝা লয় তবে ভবিষ্যতে অসুবিধা মেজবউয়েরই অইব।' দুই ভাইকে একত্রে আসতে দেখে মৌলভি সাহেব বুঝতে পেরেছিলেন, এরা বোধ হয় তাঁর মেয়েকে বরাবরের মতই নিয়ে যেতে এসেছে! গাফ্‌ফার সাহেবের কথা শুনতে শুনতে বুকের ভেতরটায় মোচড় দিয়ে ওঠে গফুর সাহেবের। তাঁর নাতিরা সব চলে যাবে? এতকাল ধরে সুখে-দু:খে যাদেরকে বুকের ভেতর আগলে রেখেছিলেন, কখনও কোনকিছুর অভাব বুঝতে দেননি, মেয়েকে তো বুক দিয়ে আগলে রেখেছে তার মা। এরা সব সত্যিই চলে যাবে? তিনি বাঁচবেন তো এরপর? 


প্রত্যেকবারেই বাপের বাড়ি থেকে বিদায় নেওয়ার সময় জাহাঁ আরা হাপুস নয়নে কাঁদে, একবার মা'কে জড়িয়ে ধরে, একবার চাচিকে জড়িয়ে ধরে তো একবার বাপের বুকের 'পরে । দু'দিন আগে থেকেই তার কান্না শুরু হয়, নূর জাহাঁ মেয়ের জিনিসপত্র গুছিয়ে দেন আর নীরবে আঁচলে চোখ মোছেন। মৌলভি সাহেব সরবে কাঁদেন না কিন্তু খানিক পর পরই তাঁকেও দেখা যায় পাঞ্জাবীর খুঁটে চোখ মুছতে। কিন্তু এবারের বিদায় যেন অন্যরকম, জাহাঁ আরা প্রকৃত অর্থেই এবার বাপের বাড়ি থেকে বিদায় নিচ্ছে। আশে-পাশের গ্রাম থেকে আত্মীয়-স্বজনেরা আগের দিন থেকে বাড়িতে এসে ভীড় জমিয়েছে, চাচিরা কেউ ফুল পিঠে বানাচ্ছেন তো কেউ পোয়া পিঠে, কেউ বা রোদে পাঁপড় শুকোচ্ছে সাথে দিয়ে দেবে বলে। এ যেন জাহাঁ আরার বিয়ের সময়কার দৃশ্য ফিরে এসেছে মৌলভি বাড়িতে। খোকন, ছোটন মুখ চুন করে ঘুরে বেড়াচ্ছে নানার আশে-পাশে, এতদিন তারা এ'বাড়িকেই নিজের বাড়ি বলে ভেবে এসেছে, যদিও ঠাকুরবাড়িতে মাঝে মাঝেই গেছে কিন্তু ওই বাড়িকে কখনোই নিজেদের বাড়ি বলে ভাবেনি তারা। ছোট্ট রোকন কিছু বুঝতে না পারলেও নানার কোলে চেপে বরাবরের মত নানার পাকা দাড়িতে আঙুল ঢুকিয়ে চুপটি করে কাঁধে মাথা রেখে এলিয়ে আছে। বিদায় তো শুধু জাহাঁ আরা'র নয়, বিদায় যে এদের সকলের...


-১৪-


নাও বাইচ দেইখা কার ঝিয়ারী
ভাছকি ভুছকি পারে।
উই যে দ্যাখ বেড়া ভাইঙ্গা
কেমনে ফুচকি পারে।।
মন দিও না,মন দিও না, সোনার বাইচালে।।


আমরা তো ভাই বাইচের মাঝি,
দ্যাশে দ্যাশে ঘুরি।
একলা একলা থাইকপা ঘরে
পীরিত আগুনে পুড়ি রে।।
মন দিও না,মন দিও না, সোনার বাইচালে।।


চর দ্যাশের বাইচাল আমরা চইরা বইরা খাই।
গরীব গরীব মানুষ আমরা,
জাগা-জমিন নাই রে।।
মন দিও না,মন দিও না, সোনার বাইচালে।।


আমরা হইলাম জাত বাইচাল,
নদীর পানিত বাসা।
বাইচাল দেইখা মন দিলি কন্যা
তোমার হইবে সর্বনাশা রে।
মন দিও না,মন দিও না, সোনার বাইচালে।।


তুমি তো কন্যা গেরস্থের মাইয়া
আছও মহাসুখে।
বাইচাল দেইহা পীরিত করিলে
যাইব জীবন দু:খে রে।।
নাও বাইচ দেইখা কার ঝিয়ারী
ভাছকি ভুছকি পারে।
উই সে দ্যাখ বেড়া ভইঙ্গা
কেমন ফুচকি পারে।।

                                                               (নৌকা বাইচের সারি গান, পাবনা)


গ্রামের নাম নোয়াপাড়া। মেঘনা পেরিয়ে মফস্বল টাউন ভৈরবের নিকটবর্তী গ্রাম কিন্তু যাতায়াতের কোন রাস্তাঘাট তখনও পর্যন্ত তৈরি হয়ে ওঠেনি। বর্ষায় নৌকো আর শুকনো মরশুমে ফসলের মাঠের আলপথই যাতায়াতের একমাত্র পথ। বর্ষাকালে নোয়াপাড়া একেবারেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে আশেপাশের সমস্ত এলাকা থেকে। কয়েক মাইল দূরেই মেঘনা আর তার পারে মফস্বল টাউন ভৈরব। গ্রামের লোক ফসল-আনাজ আর তরি-তরকারি কেনা-বেচার জন্যে ভৈরবেই যায়। ছোট্ট গ্রাম, কয়েকঘর নিম্নবিত্ত চাষীদেরই বাস মূলত নোয়াপাড়ায়। ছোট ছোট কয়েকটা মুদীখানা, আর খড়ের চালার নিচে কিছু অস্থায়ী দোকান নিয়ে বাজার একটা আছে বটে নোয়াপাড়ায় আর তাতে তেল, নুন, মশলাপাতি, কেরোসিন ইত্যাদি সবই পাওয়া যায়।  আছে একটা ছোটখাট মাছের বাজারও। গ্রামের আশে পাশের খাল-বিল, পুকুর থেকে ধরা মাছ নিয়ে বসে কয়েকজন মেছো, স্থানীয় ভাষায় &হয়ষঢ়;মাচ্ছা'। বড় কোন মাছ থাকে না সেই বাজারে কারণ কেনার লোক নেই। জালে কোন বড় মাছ ধরা পড়লে সেই মাছ নিয়ে মেছো চলে যায় ভৈরবে। গ্রামে কোন স্কুল-পাঠশালা নেই, নেই কোন মাদ্রাসাও। মসজিদ একটা আছে যাতে সকালবেলায় বসে মক্তব। জুম্মার দিন ছাড়া সেই মসজিদে নামাজীও বড় হয় না। ইলেকট্রিসিটি ভৈরব অব্দি এলেও কবে যে নোয়াপাড়ায় আসবে তা কেউ জানে না। মসজিদে তাই কোন মাইক নেই, টিনের বেড়া, টিনের ঘরের এই মসজিদের মুয়াজ্জিন আজান দেন মসজিদের সামনের উঠোনে। খালি গলার সেই আজানের ধ্বনি খুব বেশিদূর যায় না। সারা সপ্তাহ নামাজের সময়েও ছোট্ট এই মসজিদ থাকে ফাঁকাই। সকালবেলাটাই খানিক সরগরম থাকে মসজিদ ও তার সামনের উঠোন। সমবেত কচি কন্ঠের সুর করে পড়া আমপারা ও কলমার শব্দ অনেকদুর যায়। বেলা বাড়লেই আবার সব নীরব।
 
ভাগচাষী মুহম্মদ রফিকের বাস এই নোয়াপাড়ায়। জমির মালিকের ফসলের আড়ত ভৈরবে। নিজেও থাকেন ভৈরবেই। বেশ কিছু জমির মালিক তিনি, নোয়াপাড়ার বেশির ভাগ মানুষই তার জমিতে ভাগের চাষী। ফসল ঘরে উঠলে বরাবর মেপে অর্ধেক পৌঁছে দিতে হয় ভৈরবে, মালিকের আড়তে। এমনিতে জমির মালিকেরা ফসল কাটার দিনে মাঠেই তাদের নিজস্ব মুনিষ  পাঠিয়ে দেয়, রোজের হিসেবে জন খাটা আরও কিছু মুনিষ ভাড়া নিয়ে সে আসে ক্ষেতে কাটা ধানের আঁটি বয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্যে  আর তারা কাটা ফসলের আঁটি গুণে অর্ধেক ফসল মাঠ থেকেই নিয়ে যায় কিন্তু যে সব জমিমালিক বাইরে থাকে তাদেরকে ফসল পৌঁছে দিতে হয়। তার জন্যে কিছু মূল্য ধরে দেওয়া হয়, ধান ঝাড়াই-বাছাই করে সেদ্ধ করা, শুকিয়ে জায়গামত পৌঁছে দেওয়ার খরচ হিসেবে। সেই মূল্য কখনো টাকার হিসেবে দিয়ে দেয় মালিক, কখনো বা বস্তা কয়েক ধান।  রফিক মিঞাকেও ধান নিয়ে যেতে হয় ভৈরবে, মালিকের আড়তে। গরুর গাড়ি ভাড়া করে তাতে ধানের বস্তা চাপিয়ে রফিক মিঞা পৌঁছে যায় ভৈরব, মালিকের আড়তে।  এই ধান ঝাড়াই বাছাই করার মূল্য হিসেবে বরাবরই সে টাকা নিয়ে নেয় মালিকের কাছ থেকে। সেই টাকায় সে বাজার করে ভৈরব থেকে, বউয়ের জন্যে ডুরে শাড়ি, মায়ের জন্যে সরু কালো পাড়ের দশহাতি থান, নিজের জন্যে লুঙ্গি, গামছা আর মফিজের জন্যে শার্ট। কেনে মেয়েদের জন্যে ফ্রক। না। মালিকের দেওয়া টাকায় এত বাজার হয় না। নিজের ভাগের কিছু ধানও মালিকের আড়তেই বেচে দেয় রফিক মিঞা। প্রতিবারের মত এবারও মালিক তাকে জিজ্ঞেস করে, &হয়ষঢ়;কি ও মিঞা, ধান ঠিকমতন আনছ তো? কম টম দ্যাও না তো?' প্রতিবারেই একই উত্তর দেয় রফিক মিঞা, &হয়ষঢ়;উফরে খুদা নিচে আফনে, বেঈমানী কার লগে করুম সাব!'


মাঠে রফিক মিঞা তার দুই ছেলেকে নিয়ে কাজ করে, একটি দশ আর একটি ছেলে বছর বারোর, রোগা চেহারায় তাদেরকে দেখায় আরও ছোট। পরিশ্রমের কাজ তারা করতেই পারে না। তবু রফিক মিঞা তাদের মাঠে নিয়ে যায়, &হয়ষঢ়;অহন থেইকা না শিখলে আর কুন সময় করব!  সে নিজেও তো ক্ষেতে কাজ করতে এসেছিল ওই বয়সেই, বাপজানের লগে' ভাবে রফিক মিঞা।  পিঠে করে ধানের বড় বড় আঁটি বাড়িতে নিয়ে আসে আর হালের শুকনো হাড়জিরজিরে আধমরা গরু তিনটেকে দিয়ে মাড়াই করে দেয়। দুপুর থেকে মাঝ উঠোনে কাটা ফসলের আঁটি পরপর রেখে গোল এক চক্রের মত বানায় রফিক মিঞা। ভেতরটাও ভরাট করে দেয় ধানের আঁটি দিয়ে আর তার উপর পরপর ধানের আঁটি রেখে বেশ উঁচু করে দেয়। দেড়-দু'হাত মত উঁচু হয়ে গেলে সেই মরাইয়ে আর ধানের আঁটি দেয় না রফিক মিঞা, বেশি হয়ে গেলে ওই হাড়জিরজিরে গরুগুলো মাড়াতে পারবে না বলে। হালের বলদের সাথে রফিক জুড়ে দেয় গাভীটিকেও। খানিকটা ফাঁক রেখে চারটি গরুর গলাতেই দড়ি দিয়ে বেঁধে  মরাইয়ের উপর তুলে দেয় রফিক। গরুগুলোর মুখে পরিয়ে দেয় বেতের জালি জালি &হয়ষঢ়;খুপা', নইলে মাড়াইয়ের সময় খড় খেতে গিয়ে ধানও যে খেয়ে ফেলবে গরুতে! হাতে লাঠি নিয়ে গরুগুলোকে ধানের বোঝার উপর গোল গোল ঘোরায় রফিক, নিজেও ঘোরে গরুর পেছন পেছন। কোন গরু  মরাইয়ের উপর থেকে নেমে যেতে চাইলে তাকে হাতের লাঠি দিয়ে হালকা বাড়ি দিয়ে তুলে দেয় মরাইয়ে। কোন গরু আবার ভীষণ অলস, মরাইয়ে হাঁটতেই চায় না। তাকে খানিক পরপরই খোঁচাতে হয় নইলে ওর জন্যে অন্য গরুগুলোও থমকে থমকে যায়, এগুতে চায় না। ক্রমাগত একইভাবে ঘুরতে থাকা গরুর পায়ের চাপে বাঁধা আঁটিগুলো খুলে যায় ধীরে ধীরে, খড় থেকে ধান ঝরে পড়তে থাকে মাটিতে। খানিক পরে রফিক নেমে যায় ধানের মরাই থেকে, গরুগুলো তবু ঘুরতেই থাকে একইভাবে। ছায়ায় বসে রফিক হুঁকো খায় আর মাঝে মাঝেই গরুগুলোর উদ্দেশ্যে হাঁক পাড়ে, &হয়ষঢ়;এই, নামিস না য্যান!'


উপর দিককার খড়ে যখন আর ধান থাকে না তখন রফিক এসে গরুর মুখের &হয়ষঢ়;খুপা' খুলে দেয়, চিবোক এবার গরুগুলো কিছু খড়। লাঠির খোঁচায় উপর -নিচ করে দেয় ধানের আঁটি। ততক্ষনে মরাই ছড়িয়ে পড়ে গোটা উঠোন জুড়ে। ঝাঁটা হাতে মর্জিনা এগিয়ে আসে, চারপাশে ছড়িয়ে পড়া ধানগুলোকে ঝাঁট দিয়ে মরাইয়ের গায়ে তুলে দেয়। রফিকের মেয়ে দুটি সারাক্ষণই থাকে মরাইয়ের উপর, গরুর পেছন পেছন। মরাই থেকে নেমে যেতে চাওয়া গরুর উদ্দেশ্যে হাঁক দেয়, &হয়ষঢ়;এই গরু, নামিস না য্যান!' রফিক ছায়ায় বসে তৃপ্তি করে চা খায়। দুধ চিনি ছাড়া চা, নুন দেওয়া।  সোনালী হয়ে আসা সবুজ ধানগাছ আর পাকা সোনারঙা ধানের গন্ধে ম ম করে উঠোন-বাড়ি। বুক ভরে শ্বাস নেয় রফিক, আমেজে বুজে আসে চোখ। উঠোন জুড়ে নানা রকম শব্দ। গরুর হাম্বা রব, একভাবে মরাইয়ে ঘুরে যাওয়ার তাদের পায়ের শব্দ, কাঁচা খড়ের অদ্ভুত মাদক খসখস খসখস আওয়াজ, মরাইয়ের চারপাশে ধান খুঁটতে জমা হওয়া মুরগিদের কোঁকর কোঁ, হাঁসেদের কোঁয়াক কোঁয়াক, ছোট মেয়ে দুটির খিলখিল হাসি আর অপ্রয়োজনীয় সব কথা, মর্জিনার ঝাঁটার শব্দ, গাছতলায় বেঁধে রাখা ক্ষুধার্ত বাছুরটির হাম্বা। সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত শব্দরাজ্য যেন! রফিক চোখ বুজে উপভোগ করে সম্মিলিত এই শব্দের খেলা।


বাকি কাজ রফিক মিঞার স্ত্রী মর্জিনার । ধান সেদ্ধ করা, ঝাড়াই-বাছাই করা আর রোদে শুকোনোর কাজে অবশ্য হাত লাগায় বুড়ি শাশুড়িও। ধানের ভারী ঝাঁকা তুলতে পারে না বুড়ো শরীরে কিন্তু সেদ্ধ করার সময় সকাল থেকে সন্ধে অব্দি তিনমুখো চুলোয় জ্বাল ঠেলে মর্জিনার শাশুড়ি। নিভে আসা হুঁকোতে ছাই তোলার লম্বা লোহার হাতায় করে খানিকটা আগুন তুলে হুঁকোর মুখে বসানো কল্কেতে দেয় বুড়ি, তামাকপোড়া গন্ধে চাঙ্গা হয়ে ওঠে বুড়ি, হুঁকোতে টান দেয়, শব্দ হয় ফুরুর্‌র ফুর্‌র। ধানের ঝাঁকা মাথায় করে চুলোয় বসানো পুরনো কেরোসিনের টিনে এনে ঢালে মর্জিনা, আন্দাজমত পানি ঢালে কলসী থেকে। ধানে ভাপ এলে গোছা করা খড়কে ন্যাকড়ার মত ধরে চুলোয় বসানো টিনের নিচের দিককার কোণায় এক হাত আর অন্যদিকে টিনের উপর দিককার কোণায় এক হাত দিয়ে ধরে ধানের টিন নামায় মর্জিনা, শাশুড়ি তখন জ্বাল ঢিমে করে দেয়, মর্জিনার হাত যেন না পোড়ে। সেদ্ধ ধান সোজা উঠোনে ঢালে মর্জিনা, হেঁটে  হেঁটে ঢালে, উঠোনের এ'মাথা থেকে ও'মাথা অব্দি। ভাপ ছড়ায় সদ্য উনুন থেকে নামানো ধান। মর্জিনা আবার উনুনের ধারে গিয়ে আগুনের পরে টিন বসায়, পানি দেয়, ধান দেয়। উঠোনে ফেলা ধান ততক্ষণে ঠান্ডা হয়ে আসে, দু'হাত দিয়ে হাঁটুর কাছে শাড়ি তুলে ধরে মর্জিনা, পায়ে পায়ে ধান ছড়িয়ে দেয় উঠোনে, সমানভাবে। পায়ে গরম লাগে বলে ঝটপট পা চালায় আর তারপর দৌড়ে গিয়ে দাঁড়ায় ছায়ায়। উনুনের গরম, সেদ্ধ ধানের গরম আর মাথার উপর সূর্যের অকৃপণ তাপে মর্জিনার কালো মুখ আরো কালো দেখায়, ঘামে চকচক করে মুখ, শরীরের অনাবৃত অংশ, মুখে তবু লেগেই আছে উজ্জ্বল এক হাসি। মাঝে মাঝেই গুনগুন করে গেয়ে ওঠে এক গীত।


মাঝারি গড়নের শক্তপোক্ত মর্জিনাকে দেখতে আর দশটি কৃষক রমণীর মত হলেও দেখে বোঝা যায় না যে সে ছয় সন্তানের জননী। অভাবের সংসারে মর্জিনার পেটানো স্বাস্থ্য যেন এক রহস্য! শ্যামলা রং রোদে পুড়ে কালো। সায়া-ব্লাউজবিহীন শরীরে জড়িয়ে থাকে ভৈরব বাজারের দশহাতি তাঁতের শাড়ি। দু জোড়া শাড়িতে বছর চালায় মর্জিনা। গায়ে গয়না বলতে ব্রোঞ্জের উপর সোনা বসানো দু'খানি সরু চুড়ি আর নাকে একখানি নোলক। যা কিনা বিয়ের সময় বাপের বাড়ির দেওয়া গয়নার অবশিষ্টাংশ। এটুকুও থাকত না যদি না শাশুড়ি দরবার করতেন, বাড়ির বৌয়ের হাত- নাক খালি থাকা অলক্ষণ বলে। কালো মুখে ওই একমাত্র গয়নাটি জেল্লা ছড়ায়, ঝকমক ঝকমক করে, শাশুড়ি তাকিয়ে তাকিয়ে দেখেন মাঝে মাঝেই। সংসারের হাল যদি শক্ত হাতে বউ ধরে না রাখত তবে কি যে হত সে এই ছানি পড়া চোখেও পরিষ্কার দেখতে পান বুড়ি।


উঠোনের পুবধারে পরপর তিনখানি ঘর, একটি ঘরে তারা স্বামী-স্ত্রী থাকে মেয়ে তিনটিকে নিয়ে। অন্য ঘরটিতে তিন নাতিকে নিয়ে থাকে বুড়ি দাদী আর তৃতীয় ঘরটি গোয়াল, হালের তিনখানি বলদ আর বাছুর সহ একটি গাভী থাকে সেখানে। তর্জার বেড়ার উপর খড়ের ছানি দেওয়া। কোন ঘরেই  বারান্দা বলে কিছু নেই, দরজার সামনে শুধু একটুখানি  উঁচু করে মাটি ফেলে পা'দানি মতন করা, তাও তার উপরে চাল নেই। বৃষ্টি এলেই মাটি ভেঙে  লেপাপোছা ওই পা'দানি ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে যায়। রোদ উঠলে মর্জিনা আবার গামলায় মাটি আর গোবর মিশিয়ে ঘর লেপে, তর্জার বেড়ায় থুপে থুপে মাটি লাগায় আর হাত দিয়ে সমান করে লেপে দেয়, গরমকালটা যেন তেন কেটে গেলেও শীত এলেই হিম বাতাস যেন হাড়ে কামড় বসায়, বেড়ায় মাটি থাকলে খানিকটা হলেও বাঁচা যায় ঠান্ডার কামড় থেকে। মর্জিনা উঠোন লেপে আর আবার বানায় পা'দানি। কতবার বড় ছেলে মফিজকে বলেছে মর্জিনা স্কুল থেকে ফেরার পথে কয়েকটি ইঁট তুলে আনতে মেঘনার পারের ইঁটভাটা থেকে, পা'দানির জায়গায় ইঁট রেখে তার উপর মাটি দিয়ে লেপে দেবে মর্জিনা, ছেলে তার আনবে আনবে বলেও আজ অব্দি আর এনে দিল না! উঠোনের উত্তরদিকে একচালা রান্নাঘর মর্জিনার। খুঁটির উপর শুধু খড়ের চাল। দু'খানি মাটির উনুন সেখানে, একটি একমুখো আর অন্যটি দু'মুখো। ধান সেদ্ধ করার বড় উনুন তার এই একচালা রান্নাঘরের পাশেই।


ধান সেদ্ধ করার বড় চুলোর উপরে কোন চাল নেই। বৃষ্টি বাদলার সময় হাতে বানানো বাঁশের চাটাই বিছিয়ে দেয় মর্জিনা আর সেই চাটাইয়ের উপর বিছিয়ে দেয় ছেঁড়া চট। যদিও ভরা বর্ষায় ওই ছেঁড়া চট আর বাঁশের চাটাইয়ের ঢাকায় উনুন বাঁচে না। ভেঙে গুঁড়িয়ে উনুনের গর্তের ভিতরেই পড়ে যায় খাড়া উনুনের মাটি। বর্ষা কেটে গেলেই মর্জিনা নদীর ধার থেকে শক্ত আঠালো মাটি আনায় ছেলেকে দিয়ে। খলুই ভরা সেই মাটিতে মর্জিনা মেশায় পুকুরপার থেকে তুলে আনা ঝুরঝুরে বেলে মাটি আর গোবর, নতুন করে বানায় চারমুখো উনুন। প্রথমে থুপে থুপে মাটি বসিয়ে উনুনের আকার বানিয়ে এক-দু'দিন রেখে দেয় মাটি শক্ত হওয়ার জন্যে। তারপর বঁটি দিয়ে চেঁছে চেঁছে উনুনের গা থেকে ফেলে দেয় বাড়তি মাটি, কলসীর ভাঙা মুখ দিয়ে বানায় উনুনের মুখ। গোবর আর মাটি গোলা জল দিয়ে মসৃণ করে লেপে উনুন আর তার চারধারের জায়গাটুকুও। মাঝে মাঝেই শাশুড়িকে ডেকে জিজ্ঞেস করে, &হয়ষঢ়;দ্যাখেন তো আম্মা, চুলার মুখটা বেশি বড় হইয়া গেল না তো!'


উঠোনের অন্য দুই ধার ফাঁকা। একদিকে ছোট্ট এক ডোবা, মর্জিনারা যাকে পুকুর বলে, অন্যদিকটায়, দক্ষিণে একটু জঙ্গলমত। বেশ কিছু গাছপালা সেখানে, আর সেই গাছপালার আড়ালে বাড়ির ঢালে কয়েকটি কাঠের তক্তা খানিকটা উঁচু করে বেঁধে তাদের পায়খানা। কোন বেড়া-ফেড়ার বালাই নেই সেখানে। গাছের আড়ালই ওই পায়খানার আব্রু। পাশের ডোবা থেকে বদনায় পানি ভরে পায়খানায় যাওয়া আর আবার সেই ডোবাতেই হাত-পা ধুয়ে বাড়িতে ঢোকা। বৃষ্টি-বাদলে বড় কষ্ট হয় এই ছাদহীন, দেওয়ালহীন প্রাকৃতিক পায়খানা নিয়ে কিন্তু এই কষ্টকে কষ্ট বলে ভাবতে শেখেনি এ'বাড়ির মানুষেরা। মর্জিনার শাশুড়ি মাঝে মাঝেই ওই খোলা পায়খানার ঘিরে কঞ্চি বেঁধে তাতে ঝুলিয়ে দেয় কলাপাতা, সুতলী দিয়ে বেঁধে আটকে দেয় কলার পাতাগুলোকে, বাতাসে যেন উড়ে না যায়। কিছুদিন বাদে বাদেই অবশ্য কলাপাতার এই বেড়া আর থাকে না। হয় রোদে শুকিয়ে ভেঙে পড়ে যায় নয় বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে পচে ঝরে যায়। বুড়ি আবার বেড়া বাঁধে। এভাবেই সে তার বউকে খানিকটা আব্রু দেওয়ার চেষ্টা করে। যদিও তার খুব একটা প্রয়োজন নেই, কারণ বাড়ির শেষ মাথার এই ঢাল নেমে গেছে সোজা এক বাঁজা জমিতে, যাতে কোন চাষ-বাস হয় না আর লোকজনের যাতায়াতও নেই।


কয়েকখানি ইঁটের জন্যে মর্জিনা মাঝে মাঝেই গজগজ করে নিজের মনে, ছেলের পরে রাগও হয় মাঝে মাঝেই কিন্তু রাগ পড়ে এলেই আবার ভাবে, আহারে; ছাওয়াল আমার করবেডা  কী! ভোরবেলায় নাকে মুখে দু'টি পান্তা গুঁজেই বেরিয়ে যেতে হয় সেই ভৈরবে, স্কুলে, আর ফেরে সেই সন্ধে পার করে। হবে না? অতখানি পথ রোজ পায়ে হেঁটে সেখানকার সরকারী হাইস্কুলে পড়তে যায় ছেলে তার। এই তো এ'বছরই ক্লাশ নাইন হয়ে গেল, সামনের বছরটা শেষ হলেই ছেলে তার ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেবে! ইশকুলের মাষ্টার নাকি বলেছে মফিজের বাপকে, &হয়ষঢ়;ছেলে তোমার ফার্ষ্ট ডিভিশনে পাশ করবে দেখো!' মর্জিনা জানে, ছেলে তার লেখাপড়ায়  ভাল, ফি বছর তো ক্লাশে প্রথম হয় মফিজ তবেই না ইশকুলের বেতনও মাফ হল! ছেলের জন্যে গর্বে বুক ভরে ওঠে মর্জিনার। সে জানে, একদিন এই ছেলে তার বিরাট বিরাট সব পাশ দেবে, বড় চাকরী করবে শহরে গিয়ে! মর্জিনা তো যখন তখন দেখতে পায় সেই দৃশ্য!


কিন্তু পরীক্ষা কি মফিজ আদৌ দিতে পারবে?  দুশ্চিন্তায় কালো হয়ে থাকে মর্জিনার মুখ। মেজ আর সেজ দুই ছেলেকেই তো তাদের বাপ ক্ষেতের কাজে লাগিয়েছে একলা পেরে উঠছিল না বলে, এখন বাপ ছেলে তিনজনেতে মিলে ক্ষেতে কাজ করে। আর বছর মর্জিনার কোলে আবার মেয়ে এল, তিন ছেলের পরে দুটি মেয়ে তো ছিলই। ছোট মেয়েটি যদিও এখনও ভাত খায় না কিন্তু তা হলেও তো শাশুড়ি, পাঁচ ছেলে-মেয়ে আর তাদের স্বামী স্ত্রীকে নিয়ে ভাত খাবার পেট আটটা, কী করে কুলোয় ওই কয়েক বিঘা জমিতে ভাগের চাষ দিয়ে! তাও যদি ফি বছর ঠিকঠাক ফসল হত! প্রায় প্রতি বছরই প্রথমে খরা আর তারপর বন্যা এসে ভাসিয়ে দিয়ে যায় মেঘনার পারের এই ছোট গ্রামটিকে। মর্জিনার বরাবরের স্বপ্ন, তাদের নিজস্ব জমি হবে কয়েক বিঘে, রফিক মিঞা যাতে চাষ দেবে আর অর্ধেক ফসল দিয়ে আসতে হবে না মহাজনকে, পুরো ফসলটাই থাকবে তাদের ঘরে। একখানি টিনের চালের ঘর, একটা বাঁধানো পায়খানা, পুকুরটাকে নতুন করে কাটানো, মফিজের জন্যে একটা সাইকেল, গরুগুলোর জন্যে একটা ভাল গোয়াল। কত কত কী যে করবার আছে মর্জিনার!


নিজের সুখ-দু:খ, কষ্টের কথা ভাবে না মর্জিনা, কিন্তু ছেলেগুলো পড়ল না এই দু:খ মর্জিনাকে কুরে কুরে খায়। মেয়ে দু'টিকে স্কুলে দেওয়ার কথা মর্জিনা ভাবেও না। গ্রামে মেয়েদের স্কুলে যাওয়ার চলও নেই, স্কুলও নেই কাজেই সেই চিন্তাও নেই কিন্তু ছেলেগুলোর কি হবে? ওরাও কি ওদের বাপের মত সারাজীবন অন্যের জমিতে চাষ দেবে? এই তো সংসারের হাল! নুন আনতে পান্তা ফুরায় অবস্থা বারোমাস। পোয়াতী শরীরেও তাকে সংসারের কাজ করতে হয় আঁতুড়ঘরে যাওয়ার আগ পর্যন্ত। সে নিয়ে অবশ্য কোন দু:খ নেই মর্জিনার, শরীরে যতক্ষণ কুলোচ্ছে, খাটতে তার আপত্তি নেই। কিন্তু ছেলে হবার পরে কয়েকদিন বুড়ি শাশুড়িকে সংসারের সব কাজ করতে হয়, ছানি পড়া চোখে আদ্ধেক জিনিস তো বুড়ি দেখতেই পায় না কিন্তু তবু সকাল থেকে নিয়ে সেই রাত পর্যন্ত বুড়ি খাটে! মর্জিনার পথ্যি বানিয়ে দেওয়া, মফিজের ইশকুলের ভাত, সানকিতে বাপ-ব্যাটা তিনজনের দুপুরের ভাত বেঁধে দেওয়া আর সেও ওই সকালবেলাতেই। বুড়ি শাশুড়ি ওফ টুকু করে না কিন্তু মর্জিনা জানে, শাশুড়ির কষ্ট হয়।


-১৫-


কেমনে পোহাইব রজনী, ও প্রাণের বন্ধু রে,
কেমনে পোহাইব রজনী।।
বন্ধু রে, যয়বনে পীরিত মিঠা,
পান মিঠা চুনে।
তোমার সাথে প্রেম করিয়া
অন্তর কাটে ঘুণে।।
বন্ধুরে, অস্ত যখন যায় রে ভানু,
আনন্দ হয় মনে।
অভাগিনীর দু:খের নিশা
আসে রে সামনে।।
বন্ধু রে, সিঁথির সিন্দুর, নাকের বেসর
কে দেখবে নয়নে।
কখন উথি, কখন লুটি,
নিশি জাগরণে।।
বন্ধু রে, বসন্তে ভোমরার আসে
ফুল ফুটে বনে।
আমার যয়বন কলি আফোট রইল,
তুই বন্ধুর বিহনে।।

                                                               (ভাটিয়ালী, ময়মনসিংহ)


সাত্তার যখনই কলকাতা থেকে বাড়ি আসেন চামড়ার দু'খানা স্যুটকেস ভর্তি করে বাজার করে নিয়ে আসেন। জাহাঁ আরা'র জন্যে ধনেখালি শাড়ি, মায়ের জন্যে চওড়া পাড়ের ঢাকাই শাড়ি, বড়ভাইয়ের জন্যে কোহিনূর টেলার্স থেকে সেলাই করানো আদ্দির পাঞ্জাবী, মেয়ে সঔদার জন্যে রঙ্‌বাহারী ফ্রক। সবই তিনটে তিনটে করে। শাড়ি আসে মোমিনের বউ রাবেয়া আর বিলুর বউ জারিনার জন্যেও। বাদ পড়ে না দুই বোনও। সাথে থাকে মায়ের কিছু ফরমায়েশি জিনিসও। ছেলেদের জন্যে সাত্তার কলকাতা থেকে কিছু আনেন না কারণ প্রত্যেকবারই গিয়ে দেখেন ছেলেরা মাথায় অনেকখানি করে লম্বা হয়েছে আর সাথে করে নিয়ে যাওয়া শার্ট-প্যান্ট কোনটাই গায়ে হচ্ছে না। ওদেরকে তাই সাথে করে নিয়ে যান ভৈরবে, কাপড় কিনে সেখান থেকে তৈরি করে দেন ওদের মাপমত শার্ট-প্যান্ট। সেও প্রত্যেককে তিনটে করে। একটা করে শার্ট-প্যান্ট পায় বিলু আর মোমিনের ছেলেরা। বাদ যায় না ভাগ্নেরাও।


বরাবর সাত্তার কলকাতা থেকে বাড়ি এসে আগে মায়ের ঘরে ওঠেন। সঙ্গে করে নিয়ে আসা স্যুটকেসগুলোও ওঠে মায়ের ঘরেই। দিনের খাওয়া-দাওয়া , খাওয়ার পরে গড়ানো সবই মায়ের ঘরে। ঠাকুরবাড়ির সীমানায় ঢোকামাত্রই প্রথমে যার চোখ তাঁর উপর প্রথমে পড়ে, সে তীরবেগে ছুটে যায় বাড়ির ভেতরে। মুহূর্তেই সাড়া পড়ে যায়, একে একে প্রায় সকলেই ছুটে আসে বাড়ির সিংহদরজায়। এমনকি রাহেলাবিবিও গিয়ে দাঁড়ান ছেলেকে দেখার জন্যে, এগিয়ে নিয়ে আসার জন্য। দক্ষিণের দালানের বারান্দায় শুধু থামের আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকেন জাহাঁ আরা। একছুটে গিয়ে বাপকে জাপটে ধরে সঔদা, &হয়ষঢ়;আব্বায় আইসে, আমার আব্বায় আইসে!'


খানিকটা যেন হিংসেই হয় রাহেলা বিবির, যখন সাত্তার বাড়ি আসা মাত্রই হান্নুর ছেলে-মেয়েরা এসে জাপটে ধরে বাপকে, ঘরে নিয়ে যাওয়ার জন্যে টানাটানি করে। হান্নুকে অন্তত তিনি নিজের সন্তানের মতই ভালবাসেন, যদিও স্বার্থহীন নয় সে ভালবাসা, সেটা তিনি নিজের মনে অন্তত অস্বীকার করেন না কিন্তু ভালও যে বাসেন এ তো আর মিথ্যে নয়! নিজের মনকেই যেন বোঝান রাহেলা বিবি। সেই কতকাল আগে যেদিন বিয়ের পরে এ'বাড়িতে এসে ছোট ছোট দুটি ছেলেকে পেয়েছিলেন সৎ ছেলে হিসেবে, সেদিন থেকেই হান্নুকে তিনি ভালবেসেছিলেন তার গুণের জন্যে, মায়ের প্রতি তার নি:স্বার্থ ভালবাসার জন্যে। মন্নু যদিও কোনদিন তাঁর কথা অমান্য করেনি কিন্তু এরা বড় হওয়ার পরে সব কেমন যেন ওলট-পালট হয়ে গেল। সম্পর্কগুলোই কেমন যেন ঘেঁটে গেল। ছেলে দুটি তার আগের পক্ষের সন্তানদেরও নিজের বোন বলে মেনে নিয়েছিল, আর মোমিন, তার আরও তিন মেয়ে যারা কিনা হান্নু-মন্নুর সৎ ভাই-বোন, কোনদিনও এদেরকে সৎ ভাই-বোন বলে ভাবেনি, যতখানি হান্নু ভালবাসে তার বড়ভাইকে, তার চেয়ে বেশি বই কম ভালবাসে না মোমিনকে। এসবই রাহেলা বিবি জানেন, মানেন, নিজের মনে স্বীকারও করেন। কিন্তু তবুও... তবুও যেদিন থেকে হান্নুর বিয়ে হল, একে একে হান্নুর ছেলে-পুলে হল, সেদিন থেকে হান্নুকে কেমন তার পর পর বলে মনে হতে থাকে, এত বছর পরে হঠাৎ করে মনে হতে লাগে, হান্নু তাঁর নিজের ছেলে নয়!


আর এখানেই রাহেলা বিবি যেন নিজের কাছেই হেরে গেলেন। হান্নুর &হয়ষঢ়; আম্মা' থেকে তিনি যেন ক্রমে ক্রমে তার সৎমা হতে লাগলেন। যতখানি পারা যায় অধিকার খাটানো, নিজের কর্তৃত্বÄ বজায় রাখার জন্যে যা যা করণীয় সবই করলেন তিনি, জাহাঁ আরাকে নিজের প্রতিদ্বন্দী ভাবতে লাগলেন, এই মেয়েটি যদিও শাশুড়ি হিসেবে তাকে যথেষ্টরও বেশি মান্যগণ্য করে কিন্তু তার সবেতেই যেন রাহেলা বিবি খুঁত দেখতে পান। আর এই যে জাহাঁ আরা বছরের পর বছর বাপের বাড়িতেই কাটিয়ে দিল এও যেন তাঁর নিজেরই হার। কোথায় জাহাঁ আরা এ'বাড়িতে বরাবর থাকবে, তার হুকুম মত সর্বদা চলবে, সংসারের সমস্ত দায়িত্ব নিয়ে তাঁর সেবা যত্ন করবে তা নয়, হান্নু এলো তো তিনিও এলেন! এতে দোষ অবশ্য বৌয়ের থেকেও বৌয়ের বাপের বেশি, মৌলভি দু'দিন বাদে বাদেই মেয়ের খোঁজে এসে হাজির হয়, যেন তার মেয়ে পানিতে পড়েছে! আর সবচাইতে বেশি দোষ তো মন্নুর, কি দরকার ছিল বাপের এক বেটিকে বৌ করে আনার? বাপসোহাগী মেয়ে ত্যাঁদোড় কম নয়! মুখে কিছু বলে না কিন্তু তার বেয়াদপি তো রাহেলা বিবি উঠতে বসতে দেখতে পান! ত্যাঁদোড় মেয়েকে সোজা করে বশে রাখার জন্যে যা যা করা দরকার রাহেলা বিবি সে সবই করেন। কিন্তু। ভাবনার মাঝখানে এসে হাজির হয় এই &হয়ষঢ়;কিন্তু'। সবেতেই যেন নিজের হারই দেখতে পান তিনি। হান্নুর বাচ্চাগুলোকে তো সত্যিকারের ভালবাসেন রাহেলা বিবি, কিন্তু এরা যেন হান্নুর নয়, শুধুই জাহাঁ আরা'র ছেলে-মেয়ে! একটার থেকে একটা বেশি ত্যাঁদোড় হয়েছে। যতবার রাহেলা বিবি নিজের মনকে বুঝিয়ে শুনিয়ে এদেরকে হান্নুর ছেলে-মেয়ে বলে নিজের কাছে টানতে যান, ঠিক তখনই, ঠিক তখনই ওই ছোটন এমন একটা কিছু করে যে সব কটাকে ধরে মন্নুর শিকারের বন্দুক দিয়ে গুলি করতে ইচ্ছে হয় রাহেলা বিবির!


এই যে পরপর হান্নুর দুই দুইটা বাচ্চা মারা গেল, এতে কি তাঁর কম দু:খ হয়েছিল? আহারে, ছাওয়লডিরে আমার হান্নুয় তো দেখলই না! মাইয়া নাহয় পেটের থেকে মরা জন্মাইসিলো কিন্তু পোলা? সে তো আটমাসের ছিল? বাপসোহাগী মেয়ে তো ছেলে কোলে শ্বশুরবাড়িই এল না, ঠাকুরবাড়ির ক'টা লোক দেখেছে মুর্শেদকে? নেহাত মন্নু দু'দিন বাদে বাদে ভাদ্দরবৌকে দেখতে যায়, ভাইপোদের দেখার নাম করে, তাই শুধু মন্নুই দেখেছিল নাতিটাকে। এমনকি ঠাকুরদের বাড়ির পোলা হয়ে ঠাকুরদের মাটিও পেল না ছাওয়ালডা, বাপের বাড়িতেই সামলে সুমলে দিয়ে এল বৌ! মৌলভি নিশ্চয়ই তাঁর নাতিকে সময়মত ডাক্তার-কবিরাজ দেখায়নি, নিজের ঝাড়-ফুঁক করা পানি খাইয়েই কাজ চালানোর চেষ্টা করেছিল, নইলে ছাওয়াল মরে? আর ডাক্তার বদ্যি করবেই বা কোথা থেকে? ম্যারিজ রেজিষ্টরি তো সেই কবেই গ্যাছে, এখন তো খায় পেনশন আর মানুষকে দেওয়া মাদুলী-তাবিজের দু-চার পয়সা! &হয়ষঢ়; পোলা-পাইনগো যে রকম-সকম, কী খেইল দেহাইব আল্লায়ই জানে, হান্নুয় আগুন খাইত্যাসে, আঙরা হাগব, পরে বুঝবনে ঠ্যালা, যা খুশি করুক গিয়া, আমার কী..!' মরুক গিয়া। বেশি ভাবতে বসলেই তাঁর আবার মাথা ধরে যায়, আফিমের গুলি দুটো বেশি নিতে হয়।


যতক্ষণ সাত্তার পশ্চিমের দালানে থাকেন কাছছাড়া হয় না ছোট্ট সঔদা। বাপের কোলে বসে বাপের হাতে দাদীর ঘরে খায়, কোলের মধ্যে গুটিসুটি শুয়ে থাকে সাত্তার যখন খাওয়ার পরে খানিক গড়িয়ে পথের ক্লান্তি দূর করেন। ইতিমধ্যেই রাহেলাবিবির কাছে শোনা হয়ে যায় বাড়ির হাল-হকিকত, নিজের ছেলেদের গুণপনা আর গাফ্‌ফার সাহেবের রাজনীতির খবর। মাঝে মাঝেই সাত্তারের চোখ যায় দক্ষিণের বারান্দায়, যতবারই চোখ যায় দেখতে পান, জাহাঁ আরা দাঁড়িয়ে আছে থামের আড়ালটিতে। উসখুশ করেন ঘরে যাওয়ার জন্যে। মায়ের কথা ঠিকমত কানে যায় না। রাহেলা বিবির বুঝতে অসুবিধে হয় না ছেলের মনের ভাব, বলেন, &হয়ষঢ়; দুই দিনের রাস্তা আইস বা'জান, আরাম কর।' সাত্তার শুয়ে পড়েন মেয়েকে কোলে নিয়ে। এরই মাঝে ছোটন আসে, বলে, &হয়ষঢ়;আব্বা, ঘরে চলেন, ঘরে গিয়া আরাম করবেন।' রাহেলাবিবি ছোটনকে রীতিমত সমঝে চলেন, কোন কথা বলেন না। বোঝেন, তাঁর দিন শেষ হয়ে এসেছে, সেদিন আর নেই, যখন দু-তিন দিনও তিনি হান্নুকে নিজের ঘরে যেতে দিতেন না, বলতেন, ঘরে গেলে বাচ্চাদের ক্যাচোর-ম্যাচোরে হান্নুর ঘুম হবে না, এ'ঘরেই ঘুমোক হান্নু, দু'দিন জিরোক! সাত্তারের হাত ধরে ছোটন ঘরে নিয়ে যায়, সঔদা ধরে থাকে অন্য হাতটি।


সাত্তারের নিয়ে আসা স্যুটকেসদুটি থাকে রাহেলাবিবির ঘরেই, তাঁর রেলিং দেওয়া খাটের আড়ালে। রাহেলাবিবি তাঁর সময়মত খুলবেন আর যার যার জিনিস তার তার হাতে দেবেন দু-চারদিন পরে। সাত্তার এসব জানেন বলেই নিজের পরনের জামা-কাপড় নিয়ে আসেন একটা আলাদা ঝোলায় করে, দু'খানা নতুন শার্ট, একটা নতুন পাঞ্জাবী, দুটো নতুন লুঙ্গি আর একটা প্যান্ট। কলকাতায় বারোমাসই সাত্তার পরেন পাড়ার দর্জিকে দিয়ে করানো কলার দেওয়া খাটো ঝুলের পাঞ্জাবী আর ধুতি। দু জোড়া ধুতি-পাঞ্জাবীতে তাঁর বছর চলে যায় তবে বাড়ি আসার আগে প্রত্যেকবারই নিজের জন্যে নতুন জামা-পাঞ্জাবী করান, এই পুরনো, হলদে হয়ে আসা সিন্থেটিকের পাঞ্জাবী নিয়ে তো দেশে যাওয়া যায় না  আর দেশে গিয়ে ধুতিও পরেন না সাত্তার, সেখানে তো আর রঙচটা কাপড়ের ঝোলা কাঁধে নিয়ে সকাল থেকে দুপুর অব্দি বড়বাজারের অলিগলি চষে বেড়ানো আর তারপর চাঁদনি চক মার্কেটের হার্ডওয়ারের দোকানের ছোট্ট কাঠের টুলে বসে সন্ধে পর্যন্ত দোকানদারি করা কোন বাবু নন, সেখানে তিনি ঠাকুর আব্দুল সাত্তার।  কলকাতা  ফিরে যাওয়ার আগে সঙ্গে  করে নিয়ে আসা নতুন জামা-কাপড়গুলো মায়ের হাতে দিয়ে এককাপড়ে ফিরে যান কলকাতায়, সেখানে তো রয়েছে তাঁর বারোমাস্যা ধুতি-পাঞ্জাবী। রাহেলাবিবি সাত্তারের এই জামা-কাপড়গুলোই দেন তার দুই জামাইকে। দেওয়ার সময় প্রত্যেকবারই বলেন, &হয়ষঢ়; হগ্গলের লাইগ্যা তো নতুন কাপড় আনতে পারে না আমার হান্নু, তুমরা এইডি লও, বাড়িত আওনের আগেই হান্নুয় বানাইসে, পুরান না!'


সাত্তার নিজের ঘরে চলে গেলে রাহেলাবিবি স্যুটকেস খোলেন, স্যুটকেসের চাইনীজ তালার চাবি আগেই চেয়ে রেখেছিলেন। স্যুটকেস খুললেই তিনি বুঝতে পারেন, কোন স্যুটকেসে কাদের জন্যে জিনিসপত্র আছে। জাহাঁ আরা'র জন্যে আনা শাড়ি তিনি দেখলে চিনতে পারেন, গাঢ় আকাশনীল, গোলাপী আর পীচফলের রঙের শাড়িগুলো থাকে স্যুটকেসের একেবারে উপরদিকে। এরপর অন্য জিনিসপত্রগুলো আর না নামালেও হয় কিন্তু রাহেলাবিবি নামান। ঘেঁটে ঘেঁটে দেখেন সঔদার জন্যে আনা কুঁচি দেওয়া ফ্রক, জাহাঁ আরা'র জন্যে আনা শাড়ির সাথে রং মেলানো ব্লাউজ-পেটিকোটের কাপড়। এমনকি খুলে দেখেন ভেতরজামাটিও। স্যুটকেসেই থাকে জাহাঁ আরার জন্যে আনা কাঁচের চুড়ি। নেড়ে চেড়ে দেখেন পুরনো খবরের কাগজে মুড়ে আনা চীনেদের দোকানের রঙিন জুতোজোড়া। বরাবরের মতই মেজাজ চটে গেলে স্যুটকেসের ডালা বন্ধ করে একপাশে সরিয়ে রেখে অন্য স্যুটকেসটি খোলেন। নিজের পছন্দের রঙের শাড়ি জামা দেখে মন খানিকটা শান্ত হয়, একই রঙের একই ছাপার দু'খানা সিল্ক শাড়ি দেখে বুঝতে পারেন, এগুলো মেয়েদের। স্যুটকেসের একেবারে তলার দিকে থাকে পলিথিনে মোড়ানো এক প্যাকেট শুকনো খেজুর । রাহেলাবিবি জানেন, ওই খেজুরে বিচির বদলে আছে তাঁর আফিম। আগেরবারে পাঠানো আফিম বেশ কিছুদিন আগেই ফুরিয়েছিল, মেজাজ তাই সারাক্ষণই চড়ে থাকত রাহেলাবিবির। আফিমের জন্যে হান্নুকে দু'বার চিঠিও লেখা হয়ে গেছিল কিন্তু পাঠানোর মত বিশ্বাসযোগ্য লোক সব সময় পাওয়া যায় না বলে হান্নু পাঠাতে পারেনি, ফেরত চিঠিতে জানিয়েছিল, কয়েকটা দিন অপেক্ষা করতে, বাড়ি আসার সময় নিজেই সাথে করে নিয়ে আসবে। খেজুরের প্যাকেটটা বের করে নিয়ে বাদবাকি জিনিস আবার ভেতরে যেন তেন ভাবে রেখে দিয়ে স্যুটকেসের ডালা ফেলে খাটের তলায় ঢুকিয়ে দেন। এখন আপাতত আর কোন চিন্তা ভাবনা নয়। এখন শান্তি!


-১৬-


কি আশায় ফকির হলি রে মন,
সে কথা বল শুনি।
রংমহল কোঠা রেখে মদনের বাধ্য তুমি।
ও তার ধর্মকর্ম সব গিয়েছে
কেবল হাওয়া বদ শুনি।।
হাওয়ার আসা, হাওয়ার যাওয়া
হাওয়ার খবর কেউ করলে না।
বার মাসের এই কারখানা
মনের মানুষ কেউ চিনলে না।।
ফকির চাঁদ দরবেশে বলে,
হাওয়া ধরা গেল না রে।
যদি কেহ ধরতে পারে আপনার শক্তি জোরে।।
আবের পর আতসের গরমে
তার উপরে আবের মোকাম
তার উপরে চলছে হাওয়া
তিন তারে করা মিলন।
কি করবে তার শ্মশান-শমন।।

                                                               (দরবেশী গান, ফকির চাঁদ)


মুখে কিছু না বললেও মফিজের পড়া চালিয়ে যাওয়ার চিন্তা সব সময়েই মাথায় ঘোরে মুহম্মদ রফিকের। কিন্তু কী করবে, কী করে করবে কিছুই ঠিক করতে পারে না রফিক মিঞা। মফিজ নিজে কিছু বলে না কিন্তু রফিক মিঞা জানে, মফিজ পড়তে চায়। এই ছোট্ট গ্রাম পেরিয়ে, নদী পেরিয়ে কাছের ওই গঞ্জশহর ভৈরব পেরিয়ে দূরের বড় শহর ঢাকায় যেতে চায়, কলেজে পড়তে চায়। রফিক মিঞাও তাই চায়, কিন্তু কিভাবে? চিন্তায় চিন্তায় মাথা খারাপ হওয়ার যোগাড়, কিন্তু তারপরেও কোন কূল কিনারা দেখতে না পেয়ে একদিন নরাইলে এসে হাজির হয় নবম শ্রেণীতে পড়া মফিজকে সঙ্গে নিয়ে। নরাইলের ঠাকুরদের কথা সে শুনেছে তার দুর সম্পর্কের ভাইঝি নাহারের কাছে। নাহারের বিয়ে হয়েছে নরাইলের গোলাম রব্বানীর সাথে আর সে এখন কলকাতায় বাস করে। একদিন নাহারই বলে, &হয়ষঢ়;চাচা, জায়গীর দিয়া দ্যাও মফিজেরে, পড়াল্যাখাও চলব আর খাওন পিন্ধনের চিন্তাও তোমার করন লাগত না।' জায়গীর দেওয়ার চিন্তা যে রফিক মিঞা করেনি তা নয়, কিন্তু কোথায় দেবে, কার কাছে দেবে, যাদের বাড়িতে দেবে তারা পড়াশোনাটা করাবে নাকি শুধু বাড়ির কাজকর্মই করাবে এই সব নানা রকম শঙ্কা -ভয়ে এখনও কোথাও পাঠায়নি । কিন্তু এবার যে মফিজের পড়াই বন্ধ করে দিতে হয়! &হয়ষঢ়;কই দিমু, কার কাছে দিমু?' &হয়ষঢ়;মফিজেরে লইয়া ঠাউরবাড়িত যাও না একবার, হেরা ভালা মানুষ, তুমি একবার গিয়াই দ্যাহো না, দরকার পড়লে আমার কথা কইও ঠাউর সাবেরে!'


বেশি কিছু বলার প্রয়োজন পড়েনি ঠাকুর আব্দুল গাফ্‌ফারকে। তিনি এককথাতেই মফিজকে আশ্রয় দিয়েছেন আর পড়াশোনা করানোর নিশ্চয়তাও দিয়েছেন। বলেছেন, &হয়ষঢ়;তুমি নিশ্চিন্ত মনে বাড়িত যাও, এই বাড়িতও তো পুলাপান আছে, একসাথেই থাকব নে সব আর যদি পারে তো একটু হেগো পড়াডা দেহাইয়া দিব নে।' নিশ্চিন্ত মনে রফিক মিঞা বাড়ির পথে এগোয়। মফিজের দিকে তাকিয়ে ভাল করে দেখেন গাফ্‌ফার সাহেব। রোগা লিকলিকে চেহারার এক ছেলে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে তাঁর সামনে, হাতে সাদা কাপড়ের একটি পুঁটুলি, তাতে বোধ হয় তার বইপত্র, জামাকাপড়! মফিজকে সঙ্গে করে বাংলা ঘরের ভেতর দিয়ে ভেতর বাড়িতে আসেন গাফ্‌ফার সাহেব। পশ্চিমের দালানের বারান্দায় পেতে রাখা হাতলওয়ালা কাঠের চেয়ারটিতে গিয়ে বসেন তিনি, আর ভেতরবাড়ির  উদ্দেশ্যে আওয়াজ দেন, &হয়ষঢ়;বিলুর বউ অ বিলুর বউ।' পুত্রবধূ জারিনা হন্তদন্ত হয়ে এসে দরজার আড়ালে দাঁড়ায়, খাটের উপর আধশোয়া হয়ে থাকা রাহেলা বিবিও মাথা বাড়ান খাটের পাশের জানালা দিয়ে। গফ্‌ফার সাহেব বলেন, &হয়ষঢ়;ওর নাম মফিজ, কলিকাতা'ত আমাগো বাসাত যে থাহে গোলাম রব্বানী, হেই রব্বানীর বউয়ের বাপের বাড়ির মানুষ, আজ থেইকা আমাগো বাড়িত থাকব, ইশকুলে পড়ব আর বাড়ির পুলাপাইনগো পড়াইব, মফিজেরে টাইম মতন খাওন দাওন দিবা।' মফিজকে উদ্দেশ্য করে বলেন, &হয়ষঢ়;খাওনের সময় ভিতর বাড়িত আইয়া খাইয়া যাইবা আর থাকবা বাংলা ঘরে। কাইল তুমারে আমি ইশকুলে লইয়া যামু ভর্তি করনের লাইগ্যা।' এই রকম একটি ছেলে গাফ্‌ফার সাহেবও মনে মনে খুঁজছিলেন, যে বাড়িতে সর্বক্ষণ থাকবে, নিজেও পড়বে আর বিলুর ছেলেগুলোকেও পড়াবে! নিশ্চিন্ত গাফ্‌ফার সাহেব বাড়ির মুনিষ জলিলকে ডেকে বলে দেন বাংলা ঘরে যেন মফিজের থাকার ব্যবস্থা করে দেয়।


ঠাকুরবাড়িতে এসে প্রথম কয়েকদিন কোন কথাই ফুটল না মফিজের মুখে। এক তো নতুন জায়গা, নতুন সব মানুষ তায় এই মানুষেরা সব থাকে পাকা দালানবাড়িতে। আর এদের কত চাকর বাকর! ইঁটের দেওয়ালের উপর টিনের চাল দেওয়া এল শেপের দু'কামরা ঘর নিয়ে ঠাকুরদের এই বাংলাঘর। একটি ঘরের দরজা তালা দিয়ে বন্ধ করা। বাইরের ঘরটিতে পাশাপাশি দুটো তক্তাপোষ, একটা ছোট কাঠের আলনা আর দেওয়ালের গায়ে লাগানো একটা টেবিল, যার তিনপাশে তিনখানা চেয়ার। একটা তক্তাপোষ দেখিয়ে জলিল বলে,&হয়ষঢ়;এই চৌকিত তুমি ঘুমাইবা।' তক্তাপোষে পেতে রাখা বিছানায়, কাঠের আলনায় আর টেবিলে মফিজ হাত বুলিয়ে বুঝে নিতে চায়, সত্যিই ওগুলো ওখানে আছে কিনা। মাটির মেঝেতে তার মায়ের হাতের পাতা বিছানা, বেড়ার ফাঁক-ফোকর দিয়ে ঢুকে পড়া ঠান্ডা হাওয়ায় হি হি কাঁপুনি যেন এখানে, এই ঘরে বসেও টের পায় মফিজ। কাঁদতে চায় না মফিজ কিন্তু তাও কেঁদে ফেলে নিজের বাড়ির কথা মনে করে।


সন্ধেবেলায় বড় ঠাকুর ভেতরবাড়িতে ডেকে পাঠিয়ে ছোট ছোট দুটি ছেলেকে দেখিয়ে দেন। বলেন এদেরকে তুমি পড়াবে এখন থেকে। কী সব নামও যেন বলেন কিন্তু মফিজ মনে রাখতে পারে না সে সব নাম। ছোট এই বাচ্চা দু'টি যে বড় ঠাকুরের নাতি এটা মফিজ বুঝতে পারে। মফিজ দেখে, উঠোনের ওধারের দালানের বারান্দায় দাঁড়িয়ে তাকেই দেখছে একটি ছেলে। বড় ঠাকুর ডাকেন ছেলেটিকে, &হয়ষঢ়;রোকন, এদিকে আয়।' মফিজ শোনে, রোকন তার থেকে এক ক্লাস উঁচুতে পড়ে আর রোকনের স্কুলেই মফিজ আগামীকাল ভর্তি হবে। রোকনকে ডেকে বড় ঠাকুর বলে দেন, বইপত্র নিয়ে রোকনও যেন বাংলাঘরে মফিজের সাথেই বসে পড়ে। আরও বলে দেন, ছোটনকেও যেন ডেকে নেয় তারা পড়ার সময়। মফিজ বুঝতে পারে, এরা তার পড়ার সাথী।


রোকনের সঙ্গে বন্ধুত্ব জমে যেতে সময় লাগে না মফিজের। মেজ ঠাকুরের এই ছেলেটি যেন ঠাকুরবাড়ির আর সব ছেলেদের চেয়ে একটু আলাদা যদিও পড়াশোনায় মন নেই তারও। বছর বছর যদিও ফেল করে না কিন্তু দুটো-তিনটে বিষয়ে নিয়মিতই ফেল করে সে। কোনমতে ডিঙিয়ে যায় শুধু একটার পর একটা ক্লাস। অবশ্য দু-চার বছর পরপরই এক ক্লাসে দু'বছর করে থাকতে হয় রোকনকে। মফিজের মজা লাগে এ'সব দেখে-শুনে। এদের এত টাকা-পয়সা, ধান চাল, এত এত জমি এদের মাঠে, বাড়ির কোন ছেলেকে কোনদিন মাঠে যেতে হয় না, এমনকি মেজ ঠাকুরানির ছেলেদের ছাড়া সে ঠাকুরবাড়ির আর কোন ছেলেপুলেকে কোন কাজই করতে দেখে না তবু এরা স্কুলে ফেল করে কী করে মফিজের মাথায় কিছুতেই ঢোকে না।


জাহাঁ আরা'র সেজ ছেলে রোকনকে দেখতে একেবারেই অন্যরকম তার অন্য সব ভাইদের থেকে। মায়ের গড়ন, মায়ের গায়ের রং পেয়েছে একমাত্র রোকনই। টকটকে ফর্সা রং, মাথায়ও সকলের চাইতে অনেকটা লম্বা। বড় খোকন, মেজভাই ছোটন আর আর ছোটভাই টোকনকে দেখতে একই রকম, তাদের বাবার মত, শ্যামলা গায়ের রং, মাঝারি উচ্চতা আর শক্তপোক্ত গায়ের গড়ন। একই রকম মুখ-চোখ, একটু উঁচু কিন্তু চওড়া কপাল দেখে যে কেউ বলে দিতে পারবে যে এরা সব ভাই কিন্তু রোকনকে দেখতে একেবারেই আলাদা। স্বভাবেও সে শান্ত অন্য ভাইদের থেকে। প্রায় সারাদিনই সে মায়ের কাছে কাছে থাকে, করে ঘরের যত খুঁটিনাটি কাজ। ঘর গোছানো থেকে নিয়ে হ্যারিকেন পরিষ্কার করা, হাত লাগায় এমনকি মায়ের আনাজ কোটাতেও। পড়া-শোনা করতে রোকনের ভাল লাগে না, মাথায়ও ঢোকে না, ওর বরঞ্চ ভাল লাগে বসে বসে মফিজের পড়া দেখতে, মায়ের সাথে বসে গল্প করতে, সঔদাকে কোলে করে ঘুরে বেড়াতে, যদিও সঔদা এখন আর কোলে নেওয়ার মত ছোট নেই, কিন্তু রোকন তাকে কোলে নিয়ে হেঁটে বেড়ায়। মফিজের দিকে তাকিয়ে অবাক হয় রোকন, কী রকম মন লাগিয়ে পড়ে! সে মাঝে মাঝেই এটা ওটা নিয়ে কথা বলতে চাইলেও মফিজ শুধু হেসেই সমস্ত জবাব দেয়। ছেলেটা ক্লাসে ফার্ষ্ট হয় কী করে রোকনের তো মাথায় ঢোকে না। আর এত পড়েই বা কী করে লোকে?


রোকনকে নিয়ে জাহাঁ আরা'র কোন চিন্তা নেই, সোনা ছেলে তাঁর, শুধু পড়াতেই যা মন নেই। একদমই পড়তে চায় না কিন্তু মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে তবু বই নিয়ে বসে থাকে। পরীক্ষার ফল বেরুলে চোখে জল নিয়ে এসে মায়ের সামনে দাঁড়ায়, জাহাঁ আরা ছেলের মুখ দেখেই বুঝে যান ছেলের পরীক্ষার ফল কিন্তু রোকনকে তিনি বকেন না। এমনিতেই চুপচাপ, শান্ত ছেলেটা মায়ের বকুনি খেলে হয়তো আরও দমে যাবে, যেটুকু পারছে, সেটুকুও হয়তো আর করতে পারবে না। রোকনকে বলেন, &হয়ষঢ়;বা'জান, তুমি যে লাইগ্যা রইস, এইডাই আমার লাইগ্যা যথেষ্ট!' রোকন বলে, &হয়ষঢ়;খাড়ও আম্মা, তুমার লাইগ্যা চা জ্বাল দিয়া আনি!' হেসে ফেলেন জাহাঁ আরা, রোকন জানে যে তিনি চা ভালবাসেন না কিন্তু তবু মা'কে খুশি করার জন্যে সে চা করে মা'কে খাওয়াবে! আজকাল রোকন আর চায়ের জন্যে কারো ঘরে যায় না বা মা'কেও বলে না চা করতে, নিজেই পাটখড়ি দিয়ে একমুখো চুলোয় আগুন দিয়ে বসে বসে চা বানায়, আর মা খেতে না চাইলেও জোর করে খাওয়ায়। &হয়ষঢ়;পোলায় তো চা'র অভ্যাসই বানায়া দিল আমার!' দিনের বেলা যখন তখন দক্ষিণের জানালা দিয়ে ওপাশের বাড়ির উদ্দেশ্যে হাঁক দেয়, জাহেদী'বু অ জাহেদী'বু! হাতের কাজ ফেলে উঠোন পেরিয়ে ঠাকুরবাড়ির দিকে এগোয় জাহেদর মা, বলে &হয়ষঢ়;খাড়ও বাই, আইত্যাসি।' যতবারই সে চা করে বা তার চা খেতে ইচ্ছে হয়, জাহেদার মা'কে সে ডেকে আনে চা করে দেওয়ার জন্যে বা তার করা চা জাহেদী'বুকে খাওয়ানোর জন্য। অদ্ভুত এক সখ্যতা অসমবয়েসী এই দুটি মানুষের মধ্যে,বাঁধনটা যে কোথায় তার টের কিন্তু পায় না কেঊ।


-১৭-


উনুর ঝুনুর বাজে নাও আমার,
নিহাইল্যা বাতাসে রে।
মুর্শিদ রইলাম তোর আশে।।
উত্তরে সাজিল ম্যাঘ রে, দেওয়ায় দিল রে ডাক।
ছুটিল হস্তের বৌঠা, নৌকায় খাইল পাক রে।।
মুর্শিদ রইলাম তোর আশে।।
আগা দিয়া ওঠে ঢেউ রে পাছা দিয়া যায়।
কত হিরামন জহুরীর ভরা, দইরায় ভেসে যায় রে।।
মুর্শিদ রইলাম তোর আশে।।
একে ত নিহাইলেরে বাওরে, পালে দিলরে টান।
গলুইয়া কাঁদিয়া বলে হারইলাম পরাণ।।
মুর্শিদ রইলাম তোর আশে।।

                                                               (মুর্শিদি গান, ফরিদপুর )


প্রত্যেকবার সাত্তার বাড়ি যাওয়ার সময় ভাবেন, এবার তিনি জাহাঁ আরাকে সাথে করে কলকাতা নিয়ে আসবেন। কোনবারেই তা আর হয় না। সে বছর প্রথম বাধ সাধল মোমিন। সাত্তার বাড়ি যাওয়ার ঠিক আগেই বায়না ধরে বসল, রাবেয়াকে সাথে করে যেন সাত্তার কলকাতা নিয়ে আসে। মনের ইচ্ছা মনেই চাপা দিয়ে মুখে মলিন একটা হাসি ধরে রেখে সাত্তার বাড়ি যান। আব্দুল গাফ্‌ফারকে যখন তিনি জানান মোমিনের ইচ্ছের কথা, খানিক চিন্তিত হন গাফ্‌ফার সাহেব, বলেন, &হয়ষঢ়;হ, মোমিনে তো যাওনের আগেই কইসিল, তয় আমি জানি না, তুমি বুইজঝা দেহ কী করবা, বাসাডারে তো মোমিনে একটা আখড়া বানাইসে, বউ থাকব কেমনে গিয়া। বড়বিবিরে কও, দেহো, তাইনে কী কয়।' বড়বিবি বলতে রাহেলাবিবি। গাফ্‌ফার সাহেব বরাবর এই নামেই ডাকেন রাহেলাবিবিকে। সেবার রাহেলাবিবি বাধ সাধলেন, নতুন বৌকে কলকাতা পাঠাতে। রাহেলাবিবি জানেন, একবার কোন বৌ কলকাতা গেলে সে আর ফিরে এসে এই ঠাকুরবাড়িতে থাকতে চাইবে না, বরাবর সেখানেই থেকে যেতে চাইবে। তাছাড়া এরপরেই প্রশ্ন উঠবে জাহাঁ আরাকে কলকাতা পাঠানো নিয়ে, এত বছর তার বিয়ে হয়েছে কিন্তু আজ অব্দি তাকে কলকাতা পাঠানো হয়নি আর কাল বিয়ে হয়ে এসে আজকেই যদি ছোটবউ কলকাতা যায় তো দু'দিন বাদে জাহাঁ আরাও যে বায়না ধরবে না সেকথা কে বলতে পারে! সাত্তারের বলতে ইচ্ছে হয়, ছোটবউ যদি না যায় তো তিনি জাহাঁ আরাকে নিয়ে যেতে চান কিন্তু মায়ের কাছে সেকথা বলতে পারেন না সংকোচ কাটিয়ে। চুপচাপ উঠে যান সেখান থেকে।


রাহেলাবিবি সেবারে বাধ সাধলেও ছোটবউ রাবেয়ার কলকাতা যাওয়া তিনি আটকাতে পারেননি। মোমিন আশা করেছিল ভাই বোধ হয় তার বউকে সঙ্গে করে নিয়েই আসবে। ভাইকে একা ফিরতে দেখে মোমিনের এক রকম মাথাই খারাপ হয়ে যায়। মুখে যা আসে তাই বলে গালাগাল করে ভাইকে, মা'কে আর সংসারের কর্তা আব্দুল গাফ্‌ফারকেও। স্বার্থপর, কৃপণ বলে ভাইকে। বলে, বউ এলে খরচ বেশি হওয়ার ভয়ে সাত্তার তার বউকে নিয়ে আসেনি। সাত্তার চুপ করে শোনেন, ভাবেন,  বউ না আসায় রাগ হয়েছে তাই উল্টোপাল্টা বলছে, রাগ কমলে নিশ্চয়ই বুঝতে পারবে, রাবেয়াকে নিয়ে আসা বা না নিয়ে আসায় তাঁর কোন হাত নেই, সম্পূর্ণই মায়ের ইচ্ছে আর হুকুমের ব্যপার। দু'দিন না খেয়ে দেয়ে শুয়ে থাকে বিছানায়, তারপর আবার স্বমূর্তি ধারণ করে ফিরে আসে রোজকার নিয়মে।  রেসের মাঠ, বিকেল হলেই গোলাম রব্বানীর দোকান আর তারপর কামিনীর আখড়ায় বোতল হাতে হাজিরা।


এক এক সময় সাত্তারের মনে হয়, মোমিন বোধ হয় ইচ্ছে করে এই সব অনাচার করছে, যাতে করে সাত্তার তাকে তাড়াতাড়ি বাড়ি পাঠিয়ে দেন। আবার এক এক সময় মনে হয়, বোধ হয় ইচ্ছে করে নয়, মোমিন হয়ত ভালই বাসে এই রেস-জুয়া, সিনেমা আর রব্বানীর সাথে অ'জায়গা-কু'জায়গায় যাওয়া। রব্বানীর কাজ-কর্ম, তার নেশা, তার মেয়েমানুষ নিয়ে সাত্তারের খুব একটা মাথাব্যথা নেই। মোমিনের কারণে এই বাড়িতে এসে জুটেছে আর চালাকি করে স্থায়ী ঠিকানাও বানিয়ে নিয়েছে তাঁর বাড়িতে। সাত্তার তাকেও বোঝানোর চেষ্টা করেননি এমন নয় কিন্তু রব্বানী মুখ বুজে শোনে আর আর একটিও কথা না বলে উঠে যায়। হাল ছেড়ে দিয়ে রব্বানীকে কিছু বলাই ছেড়ে দিয়েছেন সাত্তার। কিন্তু মোমিন? মোমিনের বেলায় তো হাল ছেড়ে দেয়া যায় না। মা যে তাঁকেই মোমিনের দায়িত্ব দিয়েছিলেন!


ভেবে চিন্তে একদিন মোমিনকে ডেকে বলেন, &হয়ষঢ়;যা, বাড়িত যা, বউ লইয়া আয় গিয়া, রব্বানীর বউও তো থাহে না কলিকাতা, বউ আইয়া ভিতরের ঘরে থাকব নে, রব্বানী কয়দিন কষ্ট কইরা আমার লগে থাকব নে। কি কও ভাতিজা?' শেষের প্রশ্নটি রব্বানীর উদ্দেশ্যে। রব্বানী মুখের পরে না বলতে পারে না সাত্তারকে, বলে, &হয়ষঢ়;হ চাচা, আমার কি, একলা মানুষ, এট্টু ঘুমানের জাগা পাইলেই হইল, যাইন ছোডচাচা, চাচিরে লাইয়া আইয়েন গিয়া।' &হয়ষঢ়;কিন্তুক আম্মায়? আম্মায় তো আইতে দিত না বউয়েরে!' দুশ্চিন্তায় মাথা প্রায় ঝুলে পড়ে মোমিনের। সাত্তারের অভয়বাণী মায়ের নামে লেখা চিঠি নিয়ে মোমিন রওনা হয় দেশে, ভাইকে বলে যায়, বউ যদি না আসে তবে সে কলকাতায় ফিরছে না। সাত্তার হাসেন ভাইয়ের ছেলেমানুষিতে, বলেন, &হয়ষঢ়;আম্মায় পাডাইয়া দিব বউয়েরে, তুই চিন্তা করিস না, আর তুইও তাড়াতাড়িই আইয়া পড়িস।' দিন পনের পরেই মোমিন ফিরে আসে কলকাতায়, সাথে দু'বছরের শিশুপুত্র কোলে রাবেয়া। ভেতরের ঘর থেকে রব্বানী নিজের জিনিসপত্র সরিয়ে নিয়ে সামনের ঘরে চলে আসে আর মোমিনের বিছানায় নিজের ঠাঁই করে নেয়। দরজার পাশে তার রান্নার সরঞ্জাম রাখে, যেমনটি আগে ছিল, ভেতরের ঘরের দখল নেওয়ার আগে। মোমিনের ছেলেকে দেখে সাত্তারের বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে ওঠে, নিজের ছেলের কথা মনে পড়ে, জাহাঁ আরা'র কথা মনে পড়ে।


ভেতরের ঘরে মোমিন থাকে তার বউ-বাচ্চা নিয়ে। বউটি ভাশুরের সামনে আসে না বা কথা বলে না কিন্তু যবে থেকে এসেছে, রান্নার দায়িত্ব নিজের হাতে তুলে নিয়েছে। বাইরের খোলা রান্নাঘরে বসে রান্না করে রাবেয়া, একচিলতে সরু পথের উপর, এবাড়ির লোকে যাকে উঠোনে বলে সেখানে মাদুর বিছিয়ে খাবারের থালা সাজিয়ে দিয়ে লম্বা ঘোমটা টেনে ঘরের ভেতর চলে যায়। সাত্তার ভাইপোকে সঙ্গে নিয়ে বসে দু'বেলা খান। জীবনে এই প্রথম কলকাতায় বসে অন্যের হাতের রান্না করা খাবার খান সাত্তার। রাবেয়া কলকাতায় আসার পর থেকে বেশিরভাগ দিনই মোমিন দোকানে যায় না। বউকে নিয়ে কোনদিন ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল, কোনদিন গড়ের মাঠ তো কোনদিন সিনেমা দেখতে বেরিয়ে যায়। সকাল সকাল খেয়ে দেয়ে বেরিয়ে বাড়ি ফেরে সন্ধের পর। ছুটির দিনে, যেদিন সাত্তার বাড়িতে থাকেন সেদিন বেশিরভাগ সময়েই মোমিনের ঘরের দরজা থাকে ভেতর থেকে বন্ধ। দেয়ালের ওপাশ থেকে কানে আসে ফিসফাস কথার শব্দ, চুড়ির রিনঝিন, খিলখিল হাসির আওয়াজের সঙ্গে উড়ে আসে এমন কিছু শব্দও যাতে সাত্তার অস্বস্তি বোধ করেন, কখনও উঠে গিয়ে রান্নাঘরের ছাদে বসে থাকেন তো কখনও জামা কাপড় পরে বাড়ি থেকেই বেরিয়ে যান। মনে মনে ভাবেন, এ তো আরেক উৎপাত হল!


-১৮-


আয় রে আয় মিনি
খোকার দুধে চিনি
দুধ খাবে না রাগ করেছে
আমার যাদুমনি
এই তো খোকন খাইল দুধ
আচ্ছা বেটা বাপের পুত।

                                                               (দুধ খাওয়ানোর ছড়া, যশোহর)


যে ধারালো চিবুকখানি তাঁর মুখটিকে নিখুঁত পানপাতার মত আকার দিয়েছিল সে যে কবে কোথায় হারিয়েছে জাহাঁ আরা নিজেও জানেন না। কখনও সখনও ছোট আয়নায় নিজের মুখখানি দেখতে গিয়ে চিবুকের পাশে, সরু লম্বা গলার উপর পড়া ভাঁজগুলি দেখে এক একসময়  নিজের মুখকেই যেন চিনতে পারেন না জাহাঁ আরা। অযত্নে-অবহেলায় মাথার একঢাল লালচে রেশমী চুল কবে থেকে যে ঝরে গিয়ে  পাতলা হতে শুরু করেছে। সারাদিনের শেষে করা বিনুনীখানি  ক্রমশই হয়ে যাচ্ছে সরু , আরও সরু। ছিপছিপে চেহারার কিশোরী জাহাঁ আরা এখন মোটাসোটা চেহারার ভারিক্কি এক রমণী। অনেকখানি লম্বা বলে তাঁকে যদিও খুব একটা মোটা দেখায় না কিন্তু নিজের দিকে তাকালে জাহাঁ আরা দেখতে পান, কোমরে বেশ বড়সড় দু'খানি ভাঁজ। শরীরের বাঁধন, যা এই সেদিনও ছিল বেশ আটোসাঁটো, সে যে দিনে দিনেই আরও ঢিলেঢালা হচ্ছে তা তিনি বেশ বুঝতে পারেন। দিন তারিখ গুনলে বয়েস তো হয়েইছে কিন্তু যে কালচে ছাপ তার মুখে পড়েছে সে বুঝি শুধু বয়েসের নয়। দুধসাদা সুডৌল দু'খানি হাতের কনুইয়েরও খানিকটা উপর পর্যন্ত যে ছোপ ছোপ কালচে দাগ তার আসল রঙকে লুকিয়ে দিয়েছে সে যে বয়েসের দাগ নয় এ জাহাঁ আরা নিশ্চিত জানেন। হাতের আঙুলগুলো তার আকার হারিয়ে কেমন যেন চ্যাপ্টা বেঢপমত হয়েছে। হলুদের ছোপ বারোমাস লেগে থাকে ক্ষয়ে যাওয়া নখগুলিতে। না। কোন দীর্ঘনি:শ্বাস পড়ে না জাহাঁ আরা'র নিজের দিকে তাকিয়ে। এসব নিয়ে ভাবারও সময় নেই জাহাঁ আরা'র। শুধু সাত্তার যখন বাড়ি থাকেন আর নিশীথ রাতে ঘনিষ্ঠ হতে চান তখন বেশিরভাগ দিনই নড়েচড়ে খানিকটা দূরত্ব সৃষ্টি করে নিয়ে পাশ ফিরে শোন আর তখনই কেবল পুরনো দিনের কথা মনে পড়ে। স্মৃতিরা ঘুম ভেঙে সজাগ হতে চায় কিন্তু জাহাঁ আরা তাদের ঘুম ভাঙাতে চান না। নিজেকে বলেন,&হয়ষঢ়;অহনে ঘুমাও জাহাঁ আরা, ফজরে উইঠ্যা চাল বাডন লাগব, নাশতা বানানের লাইগা, অহনে তুমি ঘুমাও।'


সাত্তারের অভাব এখন আর সেভাবে অনুভব করেন না জাহাঁ আরা। এই জীবনেই অভ্যস্ত গেছেন সেই কবে থেকে। এখন এটাকেই স্বাভাবিক বলে মনে হয় জাহাঁ আরা'র। দু'বছরে একবার বাড়ি আসবেন সাত্তার, কোনবার দেড় মাস তো কোনবার দু'মাস বাড়ি থাকবেন। এখন সাত্তার বাড়ি থাকলেও জাহাঁ আরার শরীরে মনে কোন শিহরণ জাগে না। সারাদিন ব্যস্ত থাকবেন জমি-জিরাত, মা, ভাই আর সংসারের আরও নানা রকম কাজে-ঝামেলায়। প্রায় মধ্যরাতে যখন জাহাঁ আরা নিজের সব কাজ মিটিয়ে শোওয়ার অবসর পান তখন বেশির ভাগ দিনই সাত্তার ঘুমিয়ে কাদা। কোনদিন বা জেগে থাকেন তিনি জাহাঁ আরা'র জন্যে কিন্তু আজকাল সাত্তার কাছে এলেই তাঁর  কিরকম একটা অস্বস্তি হয়। সাত্তারের শরীর ঘামের গন্ধ বড় উৎকট লাগে জাহাঁ আরা'র। মিলনে আজকাল প্রবল অনীহা, কেবলই মনে হয়, ও'ঘরে ছেলেরা বোধ হয় জেগে আছে, পাশে ঘুমন্ত সঔদা বুঝি এই জেগে উঠল। অথচ একসময় সাত্তারের এই ঘামগন্ধই শরীরে কাঁপন ধরাত। বয়েস হয়েছে বুঝি! এক এক সময় নিজেকেই যেন বলেন জাহাঁ আরা।


জাহাঁ আরা'র সবচাইতে শান্ত ছেলে রোকন। ঠাকুরবাড়ির সকলে বলে, &হয়ষঢ়;বাপের চেহারা-সুরত না পাইলে কি হইব, মেজাজ আর স্বভাব কেউ পাইলে একমাত্র রোকনেই পাইসে।' জাহাঁ আরাও জানেন এবং মানেন তাঁর স্বামীর শান্ত স্বভাব আর ঠান্ডা মেজাজ একমাত্র রোকনই পেয়েছে। বড়ছেলে খোকনকে নিয়েও খুব একটা অভিযোগ বা দুশ্চিন্তা নেই জাহাঁ আরা'র। রীনার সাথে সেই এক প্রেমপর্ব ছাড়া খোকনের নামে আর কেউ কোন কথা এযাবৎ বলেনি। পড়াশোনায় খোকন বরাবরই কমজোর ছিল কোনমতে ম্যাট্রিকের আই এ টাও সে পাশ করে ফেলায় জাহাঁ আরা'র সব স্বপ্ন না হলেও একটি স্বপ্নের অর্ধেক হলেও পূর্ণ হয়েছে। বিয়ে হয়ে নরাইল থেকে বিদায় নিয়েছে রীনা আর জাহাঁ আরা'র মাথা থেকেও নেমে গেছে খোকনকে নিয়ে যাবতীয় দুশ্চিন্তার ভার।
 
মায়ের বাধ্য ছেলে খোকন বাজার হাট করা থেকে করে বাইরের সমস্ত কাজ। মায়ের গায়ের পুরনো ব্লাউজ পেটিকোট ঝোলায় করে নিয়ে গিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া'র দর্জিকে দিয়ে সেলাই করিয়ে আনে মায়ের জন্যে নতুন সায়া-ব্লাউজ। ছিট কাপড়ের ব্লাউজের গলা কোনটা চৌকো তো কোনটা পেছনদিকে বেশ বড় আর সেইসব ব্লাউজের হাতার ঝুলও হয় বেশ ছোট। এইরকম সব ডিজাইনার ব্লাউজ জাহাঁ আরা কোনদিন পরেননি। জোর গলায় আপত্তি জানান ছেলের কাছে, &হয়ষঢ়;ইতা কিতা রে বাপ? আমি কেমনে পিন্দুম এই বেলাউজ?' খোকন পারে তো নিজেই পরিয়ে দেয় মা'কে ব্লাউজ, পরিয়ে দেখিয়ে দিতে চায়, কী করে মা পরবে এইসব ব্লাউজ। বলে, &হয়ষঢ়;তুমি একবার পিন্দা তো দ্যাহো , কি সুন্দর যে লাগব তুমারে আম্মা!' আনন্দে মুখ ঝলমল করে জাহাঁ আরা'র। একগাল হাসি মুখে নিয়ে বলেন, &হয়ষঢ়;অহনে রাইখা দে বা'জান, পরে পিন্দুমনে।' খোকন মানে না। জোরাজুরি করে মা'কে পরিয়েই ছাড়ে লালের উপর সাদা ফুলছাপ চৌকো গলার ব্লাউজ। ব্লাউজ যেমনই হোক, জাহাঁ আরা'র বুক ভরে যায় শান্তিতে। মনে মনে হাজার শুকরিয়া আদায় করেন তিনি খোদাতালার।


যবে থেকে খোকন কলেজে পড়তে গিয়েছে তবে থেকেই সংসারের দায়িত্ব একটু একটু করে নিজে কাঁধে নিতে শুরু করে সে। প্রতিমাসে কলকাতায় বাবাকে চিঠি লেখে সে, চিঠিতে জানিয়ে দেয়, তাদের কার কী প্রয়োজন, এ'মাসে কত টাকা লাগবে, কোন জমিতে কতটা ফসল হল, এবার থেকে কিছু জমিতে &হয়ষঢ়;ইরি' চাষ দেওয়াবে সে, নতুন ধান এটা, চাল যদিও একটু মোটা কিন্তু ফলন খুব ভাল হয় বলে শুনেছে সে। দু'বেলা অবশ্য জমিতে জল দিতে হয় তবে সদ্য সদ্য মাঠে পাম্প বসিয়েছে সরকার, টাকা জমা দিয়ে এলে সরকারী লোক দু'বেলা জল দিয়ে দেবে, বড়চাচার জমিতে তো সেই কবে থেকেই ইরিচাষ হচ্ছে, এবার তারাও করবে, তাই আব্বা যেন টাকা একটু বেশিই পাঠায়। টাকার একটা হিসেবও চিঠিতে লিখে দেয় খোকন। আব্বা কবে বাড়ি আসবেন এই প্রশ্নটি  থাকে সব চিঠিতেই। নিজেদের কুশল জানিয়ে আব্বার কুশল-মঙ্গল কামনা করে চিঠি শেষ হয় খোকনের। আজকাল আর সাত্তারকে চিঠি লেখেন না জাহাঁ আরা। সংসার সামলে, ইবাদত-বন্দেগি করে সময়ও পান না খুব একটা আর তাছাড়া এখন বসে সাত্তারকে চিঠি লিখতে রীতিমত লজ্জাই লাগে তাঁর। ছেলেরা সব বড় হয়ে গেছে, যা সব লেখার তারাই লেখে, বিশেষ করে খোকন। খোকন যখন চিঠি লেখে বাপের কাছে জাহাঁ আরা তখন সামনে বসে থাকেন হাতে কোন একটা সেলাই বা অন্য কোন কাজ নিয়ে। কী লিখতে হবে সেগুলো বলে বলে দেন। নিজের মত করে বলেন জাহাঁ আরা, খোকন লেখে তার মত করে। চিঠি লেখা শেষ হলে খোকন মায়ের হাতে দেয় চিঠিটা, পড়ে জাহাঁ আরা অনেক সময় বুঝতে পারেন না এ চিঠির বয়ান তাঁরই! &হয়ষঢ়;সোন্দর লেখে আমার খোকনে' ভাবেন জাহাঁ আরা।


-১৯-


প্রেমের সন্ধি আছে তিন।
সরল প্রেমিক বিনে জানা হয় কঠিন।।
প্রেম প্রেম বললি কিবা হয়,
না জানলে সে প্রেম পরিচয়;
আগে সন্ধি করতে প্রেম মজ রে
আছে সন্ধিস্থানে মানুষ অচিন।।
পঙ্ক জল পল সিন্ধু বিন্দু,
আদ্য মূল তার শুষ্ক সিন্ধু;
ও তার সিন্ধু মাঝে আলেক পেচবে
উদয় হচ্ছে রাত্রিদিন।।
সরল প্রেমিক হইলে
চাঁদ ধরা যায় সন্ধিমূলে;
অধীন লালন ফকির পায় না ফিকির
হয়ে সদাই ভজন-বিহীন।।

                                                               (লালন শাহ)


শুধু এই নয়, নতুন উৎপাত এসে জুটেছে সাত্তারের কপালে। দেশ থেকে গাফ্‌ফার সাহেবের চিঠি নিয়ে এসে হাজির হয়েছে রফিকুল্লাহ নামের একজন। রফিকুল্লাহ তাঁদের গ্রামেরই লোক। সাত্তার তাকে চিনতেন না এমন নয়, নরাইল জায়গাটা খুব একটা বড় নয়, প্রায় সকলেই সকলকে চেনে। আর রফিকুল্লাহ প্রাইমারী স্কুলে মোমিনের সাথে পড়ত। মোমিন যখন বাড়ি থাকে তখন মোমিনের সঙ্গে ঘুরে বেড়ায়, বয়সে যদিও মোমিনের থেকে বেশ অনেকটাই ছোট। তেল দেওয়া চুল পরিপাটি করে আঁচড়ানো, পরনের লুঙ্গি আর শার্টখানি সদাই পরিষ্কার। রফিকুল্লাহ যেদিন রোজগারের আশায় কলকাতা এসে হাজির হয়, সাত্তার তাকে ফেরাতে পারেন না। ভাইয়ের চিঠি সাথে করে না আনলেও সাত্তার তাকে ফেরাতেন না। রফিকুল্লাহ'র বাড়ির অবস্থা তিনি জানেন। হতদরিদ্র অবস্থা। মা আর বেশ ক'টা ছোট ভাইবোন আছে রফিকুল্লাহ'র । কোন জমি-জমা নেই, পরের জমিতে জন খেটে সকলের অন্ন জোটাতে হয় রফিকুল্লাহকে। এহেন রফিকুল্লাহ যেদিন এক কাপড়ে তাঁর কাছে এসে দাঁড়ায়, তিনি বুঝে উঠতে পারেন না, কী করবেন। বলেন, &হয়ষঢ়;থাহনের জা'গার তো অসুবিধা রফিক, দেহ, কেমনে কী করবা!' রফিকুল্লাহ  দেখে নেয় আর সেইমত ব্যবস্থাও করে নেয়, রাতে সাত্তারের পায়ের কাছে খালি মেঝেতে গিয়ে শুয়ে পড়ে। পরদিন রফিকুল্লাহকে সাত্তার নিজের দোকানে নিয়ে যান। বলেন, &হয়ষঢ়;কই গিয়া ঘুরবা কামের লাইগ্যা, আপাতত আমার দোহানই থাহো, কাম কাজ কর, পরে দেহন যাইব নে।' কলকাতায় এসে মোমিনের সাথে সখ্যতা গাঢ় হয় রফিকুল্লাহ'র। বিকেল হতে না হতেই সে মোমিনের সাথে দোকান ছেড়ে বেরিয়ে যায়। প্রথম প্রথম মোমিন ভাইকে বলত, &হয়ষঢ়;রফিকেরে লইয়া যাই, একটু কলিকাতা টাউন ঘুইরা দেহামু।' রফিকও সাত্তারের মুখের দিকে তাকিয়ে অনুমতির অপেক্ষা করত কিন্তু এখন আর কেউ তাঁর অনুমতির ধার ধারে না। দুপুরের পর থেকেই মোমিন হাই তুলতে থাকে, আড়মোড়া ভাঙতে থাকে আর এক সময় বেরিয়ে যায়। পিছন পিছন যায় রফিকুল্লাহও।


নাহারকে কলকাতা নিয়ে আসার পর থেকে গোলাম রব্বানী কিছুদিন কামিনীর কাছে যায়নি। মন দিয়ে দোকানদারী করে, সন্ধের সাথে সাথেই বাড়ি ফিরে আসে, মেয়েটাকে নিয়ে সময় কাটায় আর তাড়াতাড়ি খেয়েদেয়ে শুয়ে পড়ে। সংসার পেয়ে রব্বানী কামিনীকে ভুলে গেলে কি হবে, কামিনী ভোলে না রব্বানীকে। সে মাঝে মাঝেই দোকান বন্ধের সময় এসে হাজির হয় রব্বানীর দোকানে, চুপটি করে ফুটপাথের একধার ধরে দাঁড়িয়ে থাকে। রব্বানী তাকে দোকানে  আসতে বারণ করলে সে বলে, &হয়ষঢ়;তুমি ঘরে আসো না বলেই তো আমাকে এখানে আসতে হয়।' দোকান বন্ধ হওয়া অব্দি দাঁড়িয়ে থাকে এই আশায়, রব্বানী আজ হয়ত তার সঙ্গে যাবে, আজ হয়ত তাকে ফেরাবে না। খুব বেশিদিন অপেক্ষা করতে হয় না কামিনীকে। একদিন রব্বানী &হয়ষঢ়;দুত্তোর, মাগী লগে না লইয়া গিয়া ছাড়তই না দ্যাখতাসি' বলে হাঁটা দেয় কামিনীর সাথে। খুব বেশিদিন লাগে না রব্বানীর সাথে আবার কামিনীর ঘরে মোমিনেরও যাওয়া শুরু হতে। তবে সান্ধ্য আসরে এবার লোক তিনজন, রব্বানী আর মোমিনের সাথে কামিনীর ঘরের নতুন মেহমান রফিকুল্লাহ। রফিকুল্লাহ খুব বেশিদিন সাত্তারের হার্ডওয়্যারের দোকানে টিকে থাকে না। চেরাগ আলী নামের এক লোকের সাথে জুটে গিয়ে ইঁদুর ধরার কল বানাতে শুরু করে। চেরাগ আলীও নরাইলেরই লোক, রফিকুল্লাহর দূর সম্পর্কের আত্মীয়, থাকে বুন্দেলগেটের কাছে এক বস্তিতে। সেও এক সময় কাজের সন্ধানেই এসেছিল কলকাতায়, কি করে যেন জুটে যায়  বস্তিবাসিনী এক মাঝবয়েসী রমণীর সাথে, তাকেই বিয়ে করে এখন বস্তিতে তারই ঘরে থিতু চেরাগ আলী। রফিকুল্লাহর জানা ছিল চেরাগ আলী কোথায় থাকে, ঠিকানা পত্তরও সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিল দেশ থেকে, এক ছুটির দিন দেখে খুঁজে খুঁজে গিয়ে হাজির হয় চেরাগ আলীর ডেরায়। চেরাগ আলী ইঁদুর ধরার কল বানায়, আর ঘুরে ঘুরে সেগুলো বিক্রি করে চাঁদনী চক মার্কেট, নিউ মার্কেট আর আশে-পাশের সব মার্কেটগুলিতে। ব্যবসা মন্দ হয় না।
 
গলির ভেতরকার এক কাঠের কারবারীর কাছ থেকে  প্যাকিং বাক্স খুলে সরু সরু যে কাঠ বেরোয় তাই কেনে চেরাগ আলী, কাঠ চেরাইয়ের ঝামেলা থাকে না আর সস্তাও হয়। বস্তির লোক, খাবারের দোকানদারেরা এই কাঠই কেনে কয়লার উনুনে আগুন ধরানোর জন্যে। চেরাগ আলী শুধু খানিকটা র‌্যাঁদা মেরে পালিশ করে নেয় কাঠগুলোকে। রফিকুল্লাহ প্রথমে চেরাগ আলীর বাড়িতে গিয়ে তার কাছে কাজ শেখে, কিছুদিন ওখানে বসেই ইঁদু¤রের কল বানায়। খুব অল্পদিনেই চেরাগ আলীর বানানো  ইঁদুরের কলের সাথে সে নিজের বানানো ইঁদু¤রের কলের তফাৎ বুঝতে পারে, চেরাগ আলী নামমাত্র র‌্যাঁদা চালায়, কলগুলোর গা থাকে খসখসে, ছিবড়ে ওঠা, আর সে নিজে যে কল বানায়, সে একেবারে ঝকঝকে পালিশ করা মত দেখতে হয় কারণ সে র‌্যাঁদা চালিয়ে চালিয়ে কাঠগুলোকে একেবারে ফাইন করে দেয়। বাজারে যে তার তৈরি কল বেশি দামে বিকোয় সেটাও জানতে-বুঝতে খুব বেশিদিন লাগে না রফিকুল্লাহর।
 
একদিন সন্ধে সন্ধেয় বাড়ি ফিরে সাত্তারের কাছে গিয়ে বসে রফিকুল্লাহ, সাত্তার সবে বাড়ি ফিরে রান্নার যোগাড় করছিলেন। রফিকুল্লাহ বলে,&হয়ষঢ়; ভাইসাব, জানেনইতো চেরাগ আলীর লগে ইন্দুর ধরনের কল বানাই, তয় চেরাগ আলী চালু মাল, আমার কল বেশি দামে বেচে কিন্তুক আমারে হেই বেশতি দামডা দেয় না, আমি নিজের আলগা কারবার খুলতাম চাই।' সাত্তার জানতে চান, &হয়ষঢ়;আলগা কারবারটা ' সে কিভাবে খুলবে। রফিকুল্লাহ জানায়, দোতলায় ওঠার সিঁড়ির তলায় যে ফাঁকা জায়গাটা পড়ে আছে সেখানে সে বসে ইঁদুরের কল বানাতে চায়, ওখানকার পড়ে থাকা সব ফালতু জিনিসপত্র সরিয়ে। সাত্তার খানিক ভাবেন, তারপর বলেন,    &হয়ষঢ়;দেহ, কাম করতা চাও, বালা কতা, কর। তয় জিনিসপত্র ফ্যালানের আগে একবার দেখাইয়া লইও আমারে, কি ফ্যালাইতাস।' পরদিন সকালেই মহা উৎসাহে কাজে লেগে পড়ে রফিকুল্লাহ, সিঁড়ির তলাটা পরিষ্কার করে প্রথমে নিজের বসার জন্যে একটা পিঁড়ি বানায় সে। কলুটোলার এক প্যাকিং বাক্সের দোকান সে আগেই দেখে রেখেছিল আর কথাও বলে রেখেছিল, নগদ পয়সায় মাল কিনবে, ধার-বাকির কোন গল্প নেই। সাত্তারের কাছ থেকে চেয়ে নেওয়া পুরনো কাপড়ের ঝোলায় করে পছন্দমত কাঠ নিয়ে এসে বসে পড়ে কাজে, ছোট একখানি র‌্যাঁদা, হাতুড়ি, করাত তো সে আগেই কিনেছিল, চেরাগ আলীর সাথে কাজ করবার জন্যে। সাত্তারের বাড়িতে শুরু হয়ে যায় রফিকুল্লাহর ইঁদুর কলের কারখানা। সকাল থেকে হাতুড়ি বাটালের ঠুকঠুক শব্দের সাথে রফিক গুনগুন করে গান করে, সদ্য দেখা হিন্দি সিনেমার গান, মুহম্মদ রফি'র গান।


খুব ভোরে উঠে স্নান সেরে বাসী জামা-কাপড় কেচে নিয়ে রান্নাঘরের ছোট ছাদে মেলে দিয়ে আগের দিনকার কাচা শার্ট-লুঙ্গি পরে নিয়ে পরিপাটি করে চুল আঁচড়ায় রফিকুল্লাহ, মুখে, গায়ে, হাতে পায়ে মাখে সস্তার ক্রীম, তারপর রব্বানীর চায়ের ক্যানটি নিয়ে বেরিয়ে যায় মোড়ের ওড়িয়া হোটেলের উদ্দেশ্যে। গরম ডালপুরি, হালুয়াপুরি, জিলিপি নেয় শালপাতার ঠোঙায়, ক্যানভর্তি করে চা নিয়ে ফিরে আসে ঘরে। ততক্ষণে ঘুম থেকে উঠে পড়েছে রব্বানী, কলঘর থেকে তার কাপড় কাচার শব্দ আসে। &হয়ষঢ়;ও রব্বানী ভাই, চা-নাশতা আইয়া পড়সে, তাড়াতাড়ি করেন।' রফিকুল্লাহ আসার পর থেকে রব্বানীর সকালের চা-নাশতা রফিকই নিয়ে আসে, সে হিসেব করে পয়সা দিয়ে দেয়। ক্যানের চায়ের থেকে এক কাপ চা শুধু মোমিন খায়, আড়মোড়া ভাঙতে ভাঙতে। রান্না-খাওয়া সেরে মোমিনকে তাড়াতাড়ি দোকানে যেতে বলে বেরিয়ে যান সাত্তার। যে যার মত বেরিয়ে গেলে সিঁড়ির তলায় বিছানো চটের উপর পিঁড়ি পেতে কাজে বসে রফিক। ঠুকঠুক শব্দের সাথে তাল মিলিয়ে চলে গান, কখনো মৃদু স্বরে, কখনো উঁচুগলায়।


সারাদিন কাজ করে রফিকুল্লাহ। মাঝে মাঝেই বেরিয়ে গিয়ে ক্যানভর্তি চা নিয়ে আসে, কাজ করতে করতে খায় ঠান্ডা হয়ে যাওয়া চা, সাথে টানে বিড়ি। সাত্তার যতক্ষণ সামনে থাকেন বিড়ি-টিড়ি সে টানে না কিন্তু সারাদিন বাড়িতে কেউ থাকে না, দিনের বেলায় সেই পাহারাদার, সেই এই বাড়ির মালিক । ভেতরের বড় ঘর, যাতে রব্বানী থাকে সে বরাবরই তালা দিয়ে বেরোয়, পরে বেরোয় বলে সামনের ঘরে তালা দেয় মোমিন, যদিও বেশির ভাগ দিনেই সে তালা দিতে ভুলে যায়, চাবিটা পড়েই থাকে বিছানার উপর। রফিকুল্লাহ তখন চাবি খুঁজে কাঠের ফ্রেমে লোহার শিক বসানো জালি দরজায় দরজায় তালা দিয়ে চাবিটা রেখে দেয় চটের তলায়, সন্ধেয় বেরুনোর সময় চাবি সাথে করে নিয়ে গিয়ে দোকানে সাত্তারের হাতে পৌঁছে দেয়। সন্ধেয় দোকানে এসে দাঁড়ানো মানে মোমিনকে সাথে নিয়ে বেরুনো যদিও সাত্তারের হাতে চাবি দিয়েই সে &হয়ষঢ়;যাই গিয়া, মাল সাপ্লাই দেওনের আছে আমার' কথাটি আওড়ায়। তখন মোমিন তাকে বলে, &হয়ষঢ়;খাড়াও না মিঞা, আমিও অহনেই বাইরমু।' সাত্তার জানেন, তার বারণ মোমিন শুনবে না, আজকাল তাই ভাল-মন্দ কিছুই বলেন না তিনি মোমিনকে। মোমিন বেরিয়ে যায় রফিকুল্লাহর সাথে, গন্তব্য-মেট্রো সিনেমার সামনের ফুটপাথ, রব্বানীর দোকান আর তারপর চাঁদনীর এক অন্ধকার গলির আলো-আঁধারীতে ভরা এক টালির ঘর, যেখানে কামিনী থাকে।


শনিবার শনিবার করে গন্তব্য বদলে যায় মোমিন আর রফিকুল্লাহর, সেদিন তারা রেসের মাঠে যায়, আর রবিবারে যায় সিনেমা দেখতে। একই সিনেমা দুজনে কতবার করে যে দেখে সে তারা নিজেরাও জানে না। রফিকুল্লাহর গানের গলা ভাল, বারবার করে দেখার ফলে গানগুলোও তার মুখস্থ হয়ে যায়, একলা বাড়িতে কাজ করার সময় একরকম গলাই সাধে সে। সন্ধেয় কামিনীর ঘরে এখন আর রেডিও বাজে না তার বদলে গান করে রফিকুল্লাহ। তার গলা যে মুহম্মদ রফির গলার চেয়ে কোন অংশে কম নয় এ'কথা বারে বারেই বলে শ্রোতারা। আর নামটাও তার &হয়ষঢ়;রফিক'। নেহাত সে ইঁদুরের কল বানায়, একবার বোম্বাই চলে যেতে পারলে ওই রফিক হালে পানি পাবে না। মোমিন বা রব্বানীর কাছে মুহম্মদ রফি বরাবরই &হয়ষঢ়;রফিক'। কামিনী বরাবরই সায় দেয় মোমিনের কথায়, রফিকুল্লাহ প্রত্যেকবারে কানে হাত দেয়, এমন কথা শোনাও পাপ! কোথায় তিনি গুরুদেব আর কোথায় সে! দেশী মদের মৌতাতে ঝুমতে শুরু করা শ্রোতারা রফিকুল্লাহর এই কানে হাত দেওয়াকে বিনয় বলেই ধরে নেয়, বলে, &হয়ষঢ়;হইসে, এইবার একখান গান ধর।'


সময় গড়ায় একভাবে। কখন যেন বছরও শেষ হয়ে যায়, সামনে বড়দিন। নাহারের কলকাতা আসার সময় হয়ে এল। রব্বানী ভেবেছিল, এভাবেই কেটে যাবে জীবন। বছরে একবার করে নাহার আসবে, মাসখানেক থেকে আবার চলে যাবে, কোনবছর সে গরমের সময় দেশে যাবে, দোকানে লোক কম থাকলে কোনবছর হয়ত যাওয়াই হল না। বেশ কেটে যাচ্ছিল জীবন। পয়সাকড়ি যথেষ্ট কামিয়েছে সে, এক কামিনী ছাড়া আর কোন দোষ সে তার নিজের মধ্যে খুঁজে পায় না। দেশে কিছু জমি-জমা কিনেছে, নতুন বাড়ি বানিয়েছে। সংসারী বউ তার গুছিয়ে সংসার করছে দেশে। একটা মেয়ের পরে আর কোন ছেলে-পুলে হল না তার। এ নিয়ে তার নিজের যে খুব আপসোস আছে তা নয়। তার নিজের ছেলে হয়নি তো কি হয়েছে, ভাইয়েদের ছেলে-পুলে হয়েছে, যাদেরকে সে নিজের ছেলেই ভাবে। দেশের সংসার ওরাই দেখে নিতে পারবে সেই ভরসা আছে রব্বানীর, তাই ছেলে না হওয়া নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামায় না সে। হলে ভাল হত, হয়নি যখন কী আর করা যাবে।



এবছরও মেয়ের পরীক্ষার জন্যে নাহার এল না কলকাতায়। নাহার না এলে যে রব্বানী খুব দু:খ পায় এমন নয় কিন্তু কেমন যেন একটা অপেক্ষা থাকে বছরের শেষদিকটায়। বড়দিনের এই সময়টায় কাজের চাপ থাকে রব্বানীর, সকালবেলায় ঘুমোনোর সুখ বিসর্জন দিয়ে ভোর ভোর চৌবাচ্চার হিম ঠান্ডা জলে স্নান করে ঝোলা কাঁধে একবার বেরোলে ফিরতে সেই মাঝরাত পার। সিজন বলে কথা। জাহাজঘাটায় গিয়ে প্রায় রোজই মাল তুলতে হয়, তারপরও খদ্দেরের চাহিদা মেটানো যায় না। দুপুর থেকেই শুরু হয়ে যায় দেশী-বিদেশী সাহেব-মেমসাহেবদের আনাগোনা, যারা গোটা বছরে হয়ত দু-একবার আসে মালের জন্যে তারাও রোজ আসে আর কোনরকম দর-দস্তুর না করেই মাল নিয়ে যায়। রব্বানীর অবশ্য একটা ফিক্সড রেট আছে, খুব বেশি দাম সে বাড়ায় না বড়দিন-নিউ ইয়ারেও, যার জন্যে আশে পাশের অন্যদের চেয়ে তার খদ্দের বেশি। ডিসেম্বরের শুরু থেকেই রব্বানী প্রস্তুতি নিতে থাকে বছর শেষের এই দুটো সপ্তার জন্যে, আব্দুল সাত্তারের ভয়েতে সে বাড়িতে মালের ষ্টক রাখতে পারে না, লোকটা এমনিতে যতই নরম আর সিধে-সাদা হোক, ভেতরে ভেতরে বহুত শক্ত, মোমিনচাচার মাল খাওয়া নিয়ে বরাবরকার জন্যে খচে আছে, যদি জানতে পারে সে বাড়িতে মালের ষ্টক রাখে তাইলে সব ভদ্রতা ছেড়ে দিয়ে ওই বাড়ি থেকে তাড়াবে নিশ্চিত! অতবড় রিস্ক সে নিতে রাজী নয়, তার চাইতে রোজ জাহাজঘাটায় গিয়ে মাল তুলে আনা অনেক ভাল! কামিনীর ঠেকে কিছু মাল সে রেখে দেয় ইমার্জেন্সির জন্যে, দোকানের মাল ফুরিয়ে গেলে ঝপ করে গিয়ে নিয়ে এসে খদ্দের বিদেয় করে, কিন্তু খুব বেশি মাল তো সেখানে রাখা যায় না, মাগীকে বিশ্বাস কি, হয়ত লোভে পড়ে তার মাল সব হাপিস করে দিল!  সকালে তো সে বরাবর চা-ডালপুরি খেয়ে বেরোয় কিন্তু মাঝরাতে বাড়ি ফিরে আবার রান্না করতে বসাটা এই সময়ে তার পোষায় না, ফেরার পথে মোড়ের দোকানের ঠান্ডা রুটি-মাংস খেয়েই সে বাড়ি ঢোকে আর দুপুরে খাওয়ার তো কোন ঠিক থাকে না এই একটা মাস। কোনদিন সময় পেল তো খেল নইলে সন্ধেবেলায় একখানা বীফরোল। ব্যাস! বউ থাকলে সকালেও গরম নাশতা খেয়ে বেরুনো যায়, সে যত ভোরেই বেরোক না কেন, আর দুপুরে তো গরম ভাত- ডাল- তরকারি তিন থাকের অ্যালুমিনিয়ামের টিফিন ক্যারিয়ারে করে পাঠিয়ে দেয় রফিকুল্লাহকে দিয়ে, অবশ্য রফিকুল্লাহকে দুপুরে খাওয়াতে হয় এই কাজটুকু করে দেওয়ার জন্যে আর নাহার সেটা খুশি হয়েই করে, মানুষটা নিজের কাজ গুটিয়ে রেখে টিফিন বয়ে বয়ে নিয়ে গিয়ে দিয়ে আসছে, এটা কি কম নাকি!


সন্ধেবেলায় রোজকার মত কামিনীর ডেরায় যায় রব্বানী। কিছুদিন ধরেই কামিনীর মধ্যে একটা পরিবর্তন দেখছে সে। কেমন যেন ঝিমিয়ে থাকে মাগী। এতকাল ধরে কামিনীর কাছে সে আসছে, একইরকম দেখে আসছে কামিনীকে। সময় যেন আটকে আছে কামিনীর লম্বা কালো শরীরটায়। এতটুকুও পরিবর্তন নেই কোথাও, একই রকম পেটানো স্বাস্থ্য, মেদহীন নিভাঁজ শরীর আর একই রকম তার যত কলা-কৌশল। ছোলা ভাজা, বাদাম ভাজা আর চানাচুর তৈরি রাখে সে, দেশী মদ নিয়ে আসে রব্বানী। রফিকুল্লাহর গানের সাথে সে কখনো শরীরও দোলায়। মদ খেয়ে গড়িয়ে পড়তে সময় লাগে না মোমিন আর রফিকুল্লাহর। আর তারপর পর্দার ওপারে চারপাইয়ের উপর টেনে নেয় সে রব্বানীকে। এই চলে আসছে বছরের পর বছর ধরে। প্রথম প্রথম সে যে রব্বানীর জায়গায় মোমিনকে টানার চেষ্টা করেনি এমন নয় কিন্তু মোমিন কোনদিনও সে ডাকে সাড়া দেয়নি, কামিনীকে মোমিনের পছন্দ নয়। আর এখন এমনকি কামিনীও ভাবতে পারে না রব্বানীর বদলে অন্য কাউকে সে নিজের চারপাইয়ে নিয়ে যাওয়ার কথা। মায়া পড়ে গেছে তার রব্বানীর পরে। আজকাল রফিকের গানের সাথে শরীরও দোলায় না কামিনী আর অনেকদিন মদের গেলাসেও চুমুক দেয়নি। এবং বেশ কিছুদিন ধরে রব্বানীকে সে নিজের বিছানায়ও ডাকে না। রব্বানী উসখুস করে, শরীরে জাগে আদিম ক্ষুধা, কামিনীর শরীরের জন্যে রব্বানী উত্তপ্ত হয়, হাত ধরে কামিনীকে আড়ালে নিয়ে যায় কিন্তু শরীর ঠিক নেই বলে কামিনী হাত ছাড়িয়ে নিয়ে পর্দা সরিয়ে ফিরে এসে বসে নিজের জায়গায়। খানিক বাদেই বলে, &হয়ষঢ়;তোমরা সব উইঠে পড়, আমার শরীর ঠিক নেইকো, আমি ঘুমুবো।' এবং এভাবেই চলছে বেশ কিছুদিন ধরে। রব্বানির চোখ এড়ায় না কামিনীর শরীরের পরিবর্তন। কেমন যেন ভরাট হয়ে আসছে শরীর, &হয়ষঢ়;হইত না কেমনে,কাম-কাজ সাব ছাইড়া দিয়া ঘরো বইয়া রইসে, খায় আর সারাদিন পইড়া পইড়া ঘুমায়, তেল হইসে মাগীর, জাহান্নামে যা!' বলে বেরিয়ে পড়ে রব্বানী।


-২০-


ওকি বাওই রে,
ওরে ঝাকে উড়াই ঝাকে পড়ে রে।।


বাওই তাকসেন বলো রে পাকী,
একা হয়া দালে পড়ো
সেই না দুক্কে মরি হে বাওই, সেই না দুক্কে মরি।।
ওকি বাওইরে,
ওরে গুয়া খায়া পিক ঢালিচো রে বাওই,
ঠোট বা করিচো আংগা,
ঠোটের ওপর মানিক অতন, বাওই তিল্ফোটা।
ওকি বাওইরে,
নলের আগে নলখাগেড়া রে বাওই,
বাঁশের আগায় রে টিয়া,
সইত্য করি কও কতা বাওই, কইরচো নাহিন বিয়া রে।।

                                                               (কামরূপী ভাওয়াইয়া)


ঠাকুরবাড়ির বারোমাস্যা মুনিষ জলিল তার ভাগ্নে মাজনকে নিয়ে এসেছিল জাহাঁ আরা'র কাছে। বছর কুড়ি বয়েস মাজনের কিন্তু ক্ষেতের কাজ নাকি সে সব জানে, বিবিসাবে মাজনকে রাখুক এখন, দরকার পড়লে সে তো আছেই সব সময়। মাজন খুব তাড়াতাড়িই ক্ষেত-খামারের দায়িত্ব নিয়ে নেয়, ফসল রোয়ার সময়, কাটার সময় রোজ হিসেবে লোক নেয়, বাদবাকি সময় জাহাঁ আরা'র সমস্ত কাজ সে নিজেই করে। খুচ-খাচ বাজার করে দেওয়া, ভৈরব গিয়ে সেখানকার ঘানি থেকে সর্ষে ভাঙিয়ে তেল নিয়ে আসা, হালের বলদ আর দুধের গরুটির যাবতীয় দেখাশোনার কাজ। তিনবেলা সে জাহাঁ আরা'র ঘরেই খায়, বিবিসাবে নিজে তাকে বসে থেকে বেড়ে খাওয়ান। রাতে মেজঠাকুরের ভাগের বাংলাঘরে সে শোয়, যদিও জলিল তাকে নিজের বাড়িতেই রাখতে চেয়েছিল কিন্তু জাহাঁ আরা'র হুকুমমত তার রাতের শোয়ার ঠিকানা হয়েছে ঠাকুরবাড়ির জায়গীর ছাত্র মফিজের সাথে, ঘরের দু'খানা কাঠের চৌকির একটিতে। বিকেল থেকেই যেঘরে এসে বসে রোকন, মফিজের সাথে পড়বে বলে। মাঝে মাঝেই ঘরের দখল নেয় ছোটন তার সঙ্গী-সাথীদের নিয়ে, তবে সে রাত গভীর হলে, রোকন যখন পড়া শেষ করে ঘুমুতে চলে যায় পশ্চিমের দালানে, মফিজ যখন রাত জেগে কষছে কঠিন কোন অংক বা লিখছে ইংরেজীতে কোন রচনা, সারাদিনের কাজের পরে ক্লান্ত মাজন যখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। রাত জেগে মফিজের সাথে পড়বে বলে ছোটন এসে হাজির হয় বাংলাঘরে, একে একে আসে তার সাথীরা। মফিজ বুঝতে পারে, আজ আর তার পড়ার কোন চান্স নেই, বই-খাতা বন্ধ করে চুপটি করে গিয়ে শুয়ে পড়ে ঘুমন্ত মাজনের পাশটিতে, কারণ বরাবরই তার বিছানার দখল নেয় ছোটন।


জাহাঁ আরা'র স্বামী বারো মাস কলকাতায় থেকে রোজগার করলে কী হবে, জাহাঁ আরা কখনওই অঢেল টাকা পয়সার মুখ দেখেননি। এ'বাড়ির কর্তৃত্বÄ বরাবর ঠাকুর আব্দুল গাফ্‌ফার তথা বকলমে রাহেলাবিবির কাছে থাকাতে কলকাতা থেকে যখন যা কিছু আসে সবই আগে পড়ে তাঁদের হাতে। পরনের শাড়ি ছিঁড়ে গিয়েছে সেই কবে। সঔদার নতুন জামা লাগবে, পুরনো জামা পরে স্কুলে যেতে চায় না মেয়ে। বছর ঘুরে এল খোকন, ছোটন, রোকন আর টোকনের দু জোড়া জামা-প্যান্টের। সাত্তারকে চিঠি লেখা হয়েছিল, তাও বহুদিন। চিঠি পেয়ে জামা-কাপড় সাত্তার পাঠিয়ে দিয়েছেন বলে চিঠিও এসে যায় জাহাঁ আরা'র কাছে। জিনিসপত্র ভর্তি ব্যাগ রাহেলাবিবির খাটের তলা থেকে বেরিয়ে পশ্চিমের দালানে পৌঁছুতে মাসখানেক লেগে যায়, কখনও বা আরও বেশি। হেঁসেল যখন এক ছিল, তখন অন্তত খাওয়া-পরা নিয়ে চিন্তা করতে হত না জাহাঁ আরাকে। কিন্তু এত বড় সংসারের দায়িত্ব আর শাশুড়ির সার্বক্ষণিক ইচ্ছা-অনিচ্ছার খেয়াল রাখতে গিয়ে জাহাঁ আরা নিজের ছেলে-মেয়ের দিকে তাকানোরও সময় পেতেন না। ছেলেগুলো বছরের পর বছর স্কুলে ফেল করে, নানা রকমের নালিশ আসে চারপাশ থেকে, বড় ঠাকুর যদিও কোনদিন তাঁকে কোনরকম দোষারোপ করেননি কিন্তু রাহেলাবিবি উঠতে বসতে খোঁটা দিতেন, সে নাকি ছেলে মানুষ করার ক্ষমতাই রাখে না। মুখ বুজে জাহাঁ আরা সেসব শুধু শুনেই যেতেন, যেদিন খুব রাগ হত, ছেলেদের ধরে বেধড়ক পেটাতেন, কখনও চ্যালাকাঠ দিয়ে তো কখনো পাটকাঠির আঁটি দিয়ে আর তারপর নিজেই গড়িয়ে পড়ে হাউমাউ করে কাঁদতেন। অনেক ভেবে চিন্তে একদিন তিনি হাজির হন হেঁসেল আলাদা করার দাবী নিয়ে, বড়সাবের কাছে। গাফ্‌ফার সাহেব তার দাবী মেনে নিয়েছেন রাহেলাবিবির প্রবল আপত্তি সত্বেও, জাহাঁ আরা'র রান্নাঘর আলাদা হয়েছে, সংসারের চাপ কমেছে। মাসকাবারে হিসেব করে টাকা দিয়ে দেন গাফ্‌ফার সাহেব, বস্তা করে ধান-গম-সর্ষে ইত্যাদি দিয়ে দিতেন প্রথম প্রথম, পরে সাত্তারের নামের জমি-জমার দায়িত্বও দিয়ে দেন, জমিতে চাষ দাও, নিজেরটা বুঝে নাও আর করে খাও। ছেলেরা বড় হয়েছে, সংসার তারাও বুঝুক-শিখুক, আমি আর কতকাল!


খোকনের হাতে মাসকাবারি খরচের জন্যে যে টাকা তুলে দিতেন ঠাকুর আব্দুল গাফ্‌ফার, পাঁচ সন্তান আর একজন কাজের লোক নিয়ে সাত জনের সংসারে তা ফুরিয়ে যায় পনের-কুড়ি দিনেই। প্রথম প্রথম খোকন দু-একবার গিয়েছিল আরও কিছু টাকা চাইতে, গাফ্‌ফার সাহেব টাকা দিলেও ভেতরের ঘর থেকে রাহেলাবিবির উড়ে আসা টিপ্পনী গিয়ে পৌঁছুত জাহাঁ আরা'র কানে। এরপর থেকে দরকার পড়লেও জাহাঁ আরা দ্বিতীয়বার টাকা চাইতে পাঠতেন না খোকনকে। হাতে টাকা থাকলে বাজার করান, মাছ, আনাজ-তরকারী কিনে আনান নইলে আলুর ভর্তা, শুটকির ভর্তা, ডালই দু'বেলা ছেলেদের খেতে দেন। ছেলেগুলো খেতে ভালবাসে, মাশাল্লাহ খেতেও পারে। পেঁয়াজ, কাঁচালংকা আর কাঁচা সর্ষের তেলে মেখেও দু'থাল ভাত মুখ বুজে খেয়ে উঠে যায়, একমাত্র ছোটছেলে টোকন ছাড়া খাওয়া নিয়ে আর কেউ কখনও নালিশ জানায় না বা জাহাঁ আরাকে উত্যক্ত করে না। প্রায় প্রতিদিনই খাওয়ার সময় ঝামেলা করে টোকন, কান্নাকাটি করে এটা খাব না ওটা খাব না বলে। বুঝিয়ে শুনিয়ে খেতে বসান জাহাঁ আরা। পছন্দমত খাবার না পেলে টোকনের যেন মাথা খারাপ হয়ে যায়, একদিন ভাতের থালা ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিল কলতলায়। প্রচন্ড মেরেছিলেন জাহাঁ আরা সেদিন ছেলেকে। এরপর থেকে ছুঁড়ে না ফেলে দিলেও ঘ্যানঘ্যানানি লেগেই আছে। যেটা সবচেয়ে বেশি অপছন্দ জাহাঁ আরা'র টোকন সেটাই করে। খাওয়ার সময় কোনদিন দাদির ঘরে তো কোনদিন ফুফুর ঘরের দরজায় গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, উদ্দেশ্য, খানিকটা মাছ বা মাংসের তরকারী নিয়ে আসা। মেজাজ ভাল থাকলে রাহেলাবিবি তাকে ডেকে খেতেও বসিয়ে দেন এক একদিন, তবে বেশিরভাগ দিনই বিলুর বউকে ডেকে বলে দেন, টোকনকে খানিকটা মাছের তরকারী দিয়ে দিতে। জাহাঁ আরা'র শত বারণ টোকন মানে না, মার খেলে দু-একদিন চুপচাপ ঘরে বসে যা পায় তাই দিয়ে খেয়ে নেয় তারপর আবার যে কে সেই।


হাতে টাকা থাকুক বা না থাকুক বছরভর জাহাঁ আরা সকালের নাশতায় পিঠে বানান। আদ্ধেক ধান তিনি আতপ রেখে দেন শুধু ছেলেদের পিঠে খাওয়ানোর জন্যে। রোজ ভোরবেলায় উঠে ফজরের নামাজ সেরে যখন  তিনি চাল বাটতে বসেন, অন্ধকার তখনও কাটে না। সকালের আলো ভালো করে ফুটতে ফুটতে সের খানেক চাল বাটা হয়ে যায় জাহাঁ আরা'র। কোনদিন চিতল পিঠে, কোনদিন ছিটেরুটি তো কোনদিন গুড় দিয়ে মিষ্টি পোয়া পিঠে বানান। তবে চিতলটাই বেশি বানান, ওতে তেল-চিনি কিছুই লাগে না বলে। খানিকটা গুড় পাতে দিয়ে দেন, কোনদিন বা দু'খানা ডিম ভেজে ভাগ করে দেন পাঁচজনের পাতে, কখনও আগেরদিনকার বাসী তরকারী। যেদিন যেমন হয়। মাটির খোলায় বড় বড় চিতল বানান জাহাঁ আরা, মাজন খেতে পারে না দু'খানার বেশি কিন্তু তাঁর ছেলেরা তিন-চারটে করে খেয়ে উঠে যায়। রান্নাঘরে বসে যখন তিনি ছেলেদের খাওয়ান, দরজাটা ভেজিয়ে রাখেন নইলে তাঁর ছেলেদের খাওয়ায় নজর লেগে যাবে লোকের, এমনিতেই তো টোকনকে এ'বাড়ির লোকে &হয়ষঢ়;দু'সেরি পেট' বলে। সামনেই কলপাড়, যেখানে সারাক্ষণই ঠাকুরবাড়ির কাজের লোকেরা হয় বাসন মাজছে নয় কলসীতে খাওয়ার জল ভরছে বা  বিবিসাহেবদের স্নানের জল তুলছে । সকালবেলাটায় দু-তিনজন একসঙ্গে বসে বাসন মাজে আর গজল্লা করে। ঠাকুরবাড়ির উত্তরে আর পশ্চিমে দু-দুখানা পুকুর থাকা সত্ত্বেও বাসন মাজতে কেউ পুকুরে যেতে রাজী নয়, গোটা কলতলাটায় হাঁড়ি বাসন ছড়িয়ে রেখে কল টিপে টিপে জল তুলে তারা সব বাসন ধোয় আর কার মালকিন কি রান্না করল, কার ঘরে কি কথা হল সে নিয়ে ফিসফিসিয়ে আলোচনা করে। খানিক কান পাতলে ঠাকুরবাড়ির সমস্ত খবর এই কলপাড় থেকেই পাওয়া যায়। জাহাঁ আরা'র রান্নাঘরে বসে জাহেদী যেটা অহরহই করে, কখনও বা জাহাঁ আরা'র ছোট অ্যালুমিনিয়ামের কলসীটা নিয়ে নিজেও গিয়ে দাঁড়ায়, জল আনবার  অছিলায় ।  আর যে সরু রাস্তাটা দিয়ে তাঁর রান্নাঘরের একেবারে সামনে দিয়ে ঠাকুরবাড়ির উত্তর আর দক্ষিণের বাসিন্দারা যাতায়াত করে, যাকে জাহাঁ আরা বলেন মিউনিসিপালিটির সড়ক, সেই মিউনিসিপালিটির সড়ক দিয়ে সারাক্ষণই কেউ না কেউ যাচ্ছে-আসছে আর একবার হলেও তাঁর রান্নাঘরে সকলেই উঁকি দিয়ে যায়, কেউ দাঁড়িয়ে দু দন্ড কথা বলে, কেউ বা এমনিতেই শুধু খোঁজ নেয়, আজকে কি রান্না হল। সকালবেলায় যেই এসে দাঁড়ায়, হাতে একখানা পিঠে তো সে না চাইলেও পায়। লোকজনকে দিতে বা খাওয়াতে আপত্তি নেই জাহাঁ আরা'র, কিন্তু লোকে তাঁর ছেলে-মেয়ের খাওয়ায় নজর দেবে, খাওয়া নিয়ে মশকরা করবে, এটা তাঁর পছন্দ নয়, আজকাল তাই জাহাঁ আরা দরজা ভেজিয়ে ছেলেদের খেতে দেন।


সকালবেলায় চায়ের কোন পাট নেই জাহাঁ আরা'র ঘরে। নিজে তিনি চা খান না কোনকালেই। সংসার একত্রে থাকতে ভোরবেলায় চা এক হাঁড়ি ফোটাতেই হত, শাশুড়ি-ননদদের আবার চা না হলে চোখ থেকে ঘুমের রেশ কাটে না, একপ্রস্থ¹ চা আর ডিমসেদ্ধ খেয়ে নিয়ে বেলা ন'টার সময় তাঁরা সব নাশতা করেন, ভোরের চা খান গাফ্‌ফার সাহেবও। কী করে যেন এই চায়ের অভ্যেসটা রোকনেরও হয়েছে, জাহাঁ আরা সকালে চা করেন না বলে সে গিয়ে বরাবরই বসে থাকে দাদি রাহেলাবিবির কাছে, চায়ের জন্যে। জাহাঁ আরা বহুবার বলেও অভ্যেসটা ছাড়াতে না পেরে চা-চিনি নিজের ঘরেও রাখতে শুরু করেছেন, রোকনের জন্যে। একপ্রস্থ  পিঠে সকলের পাতে দিয়ে খানিকটা চায়ের জল চাপিয়ে দেন, রোকন নাশতার মাঝে একবার আর শেষে একবার চা খেয়ে উঠে যায়। এই সময়টায় এসে জোটে রোকনের চায়ের সঙ্গী জাহেদার মাও। ভেজানো দরজা ঠেলে ঘরে ঢোকে জাহেদার মা, ছেলেদের সকলের জাহেদী'বু,&হয়ষঢ়;মৌলভির বেডি কী করে।' হাঁড়ি থেকে খানিকটা চা ঢেলে নেয় একটা কাপে আর গিয়ে বসে উনুনের ধারটিতে, উনুনের কাছ থেকে উঠিয়ে দেয় জাহাঁ আরাকে, বলে, &হয়ষঢ়;উডেন গো, আমি এট্টু বই।' এক হাতে চায়ের কাপটা ধরে রেখে একের পর এক পিঠে নামায় জাহেদী, সকলের পাতে পাতে একটার পর একটা পিঠে দিতে থাকে, জাহাঁ আরা'র দিকেও থালি বাড়িয়ে দিয়ে বলে, &হয়ষঢ়;খাইয়া লইনগো চাচি, বেলা আটটা জানি বাইজজা গেসেগা।'


কোনরকমে আই এ টা পাশ করার পর জাহাঁ আরা কিছুতেই খোকনকে আর কলেজে পাঠাতে পারেননি বি এ পড়ার জন্যে। খোকন বলে, &হয়ষঢ়;যদ্দূর হইসে, বহুত হইসে, আমার এই ল্যাহা-পড়া ভালা লাগে না আম্মা।' শত বুঝিয়েও জাহাঁ আরা খোকনকে রাজী করাতে পারেননি আবার কলেজে যাওয়ার জন্যে। অবশেষে যেন হাল ছেড়ে দিয়েই খোকনকে জিজ্ঞেস করেন, এরপর খোকন কি করতে চায়। খোকন বলে, সে কলকাতা যেতে চায়, বাবার সঙ্গে দাঁড়িয়ে ব্যবসা করতে চায়, বাবা যে দায়িত্ব এত বছর ধরে পালন করে আসছেন, তা খানিকটা ভাগ করে নিতে চায়, নিজের সংসারের ভার নিতে চায়। কলকাতায় গিয়ে বাপের ব্যবসার দায়িত্ব খোকন নিজের কাঁধে নিক, এ জাহাঁ আরা কখনওই চান না, তিনি জানেন, ওখানে একবার গিয়ে ঢুকে গেলে খোকন আর কখনওই ফিরবে না, সেও তার বাপের মতই ভিনদেশী হয়ে যাবে। কিছুতেই জাহাঁ আরা রাজী হন না খোকনকে কলকাতায় পাঠাতে। উপায়ান্তর না দেখে খোকন চিঠি লেখে আব্দুল সাত্তারকে, তিন পাতার চিঠিতে নিজের মনের ইচ্ছা যতটুকু পারে সাত্তারকে খুলে লেখে সে, আম্মায় যে তাকে কলিকাতা পাঠাতে রাজী নয় এও লেখে খোকন।
 
ফেরত চিঠি আসে জাহাঁ আরা'র নামে কলকাতা থেকে, সাত্তার লেখেন, একবার যেন জাহাঁ আরা খোকনকে কলকাতা পাঠিয়ে দেয়, ব্যবসা করার জন্যে নয়, ক'দিন বেড়িয়ে খোকন আবার ফিরে যাবে দেশে, তার মায়ের কাছে, জাহাঁ আরা যেন কোন চিন্তা না করে। চিঠি আসার পর আর সাত্তার কি লিখেছেন সেটা জানার পর খোকনকে ধরে রাখা দায়। মায়ের নামে আসা বাবার চিঠি হাতে করে নিয়ে ছুট্টে গোটা ঠাকুরবাড়ি একপাক ঘুরে আসে খোকন, সকলকে পড়ে পড়ে শোনায়, আব্বায় কি লিখেছেন চিঠিতে। হাপাতে হাঁপাতে আবার মায়ের কাছে ফিরে আসে, বলে, &হয়ষঢ়;আম্মাগো, আর তুমি না করতে পারবা না, আব্বায় লেখসে আমারে কলিকাতা যাওনের লাইগ্যা।' জাহাঁ আরা বলেন, &হয়ষঢ়;না বা'জান, আর না করতাম না।'


-২১-


ও ভাই কানাই রে, নিদয়া ক্যানে হলি রে।।


কোথায় রহিলি রে ভাই, কোথাই তোরে পাই।
ভাই বলে ডাকপো কারে, আর তো লক্ষ্য নাই।।
ও ভাই কানাই রে, নিদয়া ক্যানে হলি রে।।


রাখাল গুণতে গিয়ারে কানাই, কোথায় যাইয়্যা রলি।
কি বইলে কালিদয়ে ঝাঁপ দিয়া প্রাণ হারইলি রে।।
ও ভাই কানাই রে, নিদয়া ক্যানে হলি রে।।


এই না কথা নন্দরাণী যখন শুনিবে,
প্রাণ গোপাল বইলে মায়ের প্রাণ বাহির হইয়্যা যাবে রে।।
ও ভাই কানাই রে, নিদয়া ক্যানে হলি রে।।

                                                               (সারি গান, ঢাকা)


ছোটনকে নিয়ে চিন্তার অবধি নেই জাহাঁ আরা'র। জুয়োখেলায় দিন-রাত মেতে থাকে ছোটন। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কলেজে যায় ছোটন, বি এ পড়ছে কিন্তু কলেজে কোনদিন যায় আর কোনদিন গিয়ে জুয়োর আখড়ায় বসে থাকে জাহাঁ আরা তার হদিস পান না। মাঝে মাঝেই ঠাকুরবাড়ির লোকজন এসে ছোটনের তারিফ করে যায় জাহাঁ আরা'র কাছে, ছোটনকে জুয়োয় হারাতে পারে এমন লোক নাকি এ তল্লাটে নেই! তারিফের আড়ালে মুখ লুকিয়ে থাকা খোঁচাটা ভালই টের পান জাহাঁ আরা। কিন্তু তিনি নিরুপায়, ছোটন তাঁর কোন কথা শোনে না। এমনিতে মুখ দেখে বোঝার উপায় নেই ছোটনের, তার ভেতরে কি চলছে আর মায়ের কাছে ছোটন কখনই স্বীকার করে না তার জুয়ো খেলার কথা, বলে, আম্মাগো, ঠাকুরবাড়ির মাইনষেরে তুমি চিনো না? কেডায় কি কইলো আর তুমি হুনলা আর বিশ্বাসও করলা? সরল আর নিষ্পাপ চোখে মায়ের চোখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয় ছোটন। জাহাঁ আরা ক্ষণিকের তরে যেন বিশ্বাসও করতে চান ছোটনের কথা কিন্তু নিজের ছেলেকে খুব ভাল করেই চেনেন বলে ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে ভেতরটা যতই পুড়ুক মুখে তার প্রকাশ করেন না। বলেন, &হয়ষঢ়;হ। সারা দুনিয়ার মাইনষে খালি মিছা কতা কয় আর যত সত্য কতা সব তুমি কও।' আব্দুল সাত্তারের নাম করে ছোটনকে বোঝানোর চেষ্টা করেন জাহাঁ আরা। বরাবরের মত। বলেন, &হয়ষঢ়;বাজানরে, তোমার বাপের মিসাল দেয় এই দ্যাশ থেইকা লইয়া কইলকাতার মাইনষে পর্যন্ত, হেই মাইনষের পোলা হইয়া তুমার কা শুভা দেয় জুয়া খেলা? জুয়ার ট্যাহায় ফুর্তি করন? তুমার কিয়ের অভাব বাজান? কিয়ের লইগা কর তুমি? আমার কতা হুন না, ভাইগো কতা হুন না, কিয়ের লাগি বা'জান, কিয়ের লাগি?'


ছোটন চুপ করে থাকে। এমন সব সময়ে সে মায়ের কোলে মাথা রেখে চুপ করে শুয়ে থাকে। তার কাঁদতে ইচ্ছে করে। কিন্তু সে কাঁদে না। ভেতরে জমে থাকা রাগটা আরও বাড়ে এমন সব সময়ে। প্রচন্ড রাগে ভেতরে ভেতরে সে শুধু গজরায়। রাগ তার বড়চাচার পরে। রাগ তার দাদির পরে। আর সবচাইতে বেশি রাগ তার নিজের বাবার পরে। সারাটা জীবন বাপ তার শুধু কলকাতায় বসে বসে টাকা রোজগার করে গেল কিন্তু কোনদিন খোঁজ নিল না সে টাকা তার নিজের বউ-ছেলে-মেয়ের কতটা কাজে লাগল! যখন থেকে বুঝতে শিখেছে তখন থেকেই দেখে এসেছে তাদের সংসারে অভাব। মায়ের পরনে ছেঁড়া শাড়ি, দু'খানার বেশি তিনখানা ফ্রক কোনদিন তার একমাত্র বোন পরতে পায় নি আজ পর্যন্ত। নানা'র বাড়ির উপর তার মায়ের সর্ব বিষয়ে নির্ভরতা সে দেখে এসেছে জ্ঞান হওয়া ইস্তক। বেশিরভাগ দিনই তারা ভাত খায় শুধু শুটকির ভর্তা-ভাজা আর ডাল মেখে। অথচ সে জানে, এই ঠাকুরবাড়ির যত রমরমা সব তার বাপের টাকায়। রাগে এক এক সময় অন্ধ হয়ে যায় ছোটন, কিছুই দেখতে পায় না, শুনতে পায় না সে। কাকে মারবে, কাকে ধরবে দিশা খুঁজে পায় না সে।


মাঝে মাঝেই নিজের ভেতরের জমতে থাকা রাগটাকে উগরে দেয় ছোটন মাঝউঠোনে দাঁড়িয়ে। অকথ্য ভাষায় গালি-গালাজ করে ঠাকুরবাড়ির এক একটি মানুষের নাম ধরে ধরে। &হয়ষঢ়;পুঙ্গির পুত গাফ্‌ফাইরা' বলে ডাকে বড়চাচাকে, &হয়ষঢ়;খানকি মাগী' &হয়ষঢ়;ক্যান্সাইরা মাগী' বলে দাদি রাহেলা বিবিকে আর নিজের বাপকে বলে &হয়ষঢ়;ভেড়ুয়া'। ঠাকুরবাড়ির উঠোন জুড়ে দাপিয়ে বেড়ায় ছোটন । উঠোনে শুকোতে দেওয়া কাঠ, পাটখড়ির আঁটিগুলোকে ছুঁড়ে ছুঁড়ে মারে পশ্চিমের দালানকে উদ্দেশ্য করে। ছোটনের মুখের গালি আর ছোঁড়াছুঁড়ির শব্দ ছাড়া আর কোন শব্দ থাকে না গোটা ঠাকুরবাড়ি জুড়ে। কাজের লোকেরা সব যে যার হাতের কাজ ফেলে ভিড় করে এসে উঠোনের একধারে দাঁড়ায়। সিংহদরজা দিয়ে উঁকি দেয় পথচলতি মানুষ। নি:শব্দে বসে থাকে এমনকি ছাদের উপর বসে থাকা কাকটিও। ঘরের ভেতর চুপচাপ মাথা নিচু করে বসে থাকেন ঠাকুর আব্দুল গাফ্‌ফার। মৃদু গলায় শুধু গজগজ করেন রাহেলা বিবি কিন্তু সেই শব্দ ঘরের দেওয়াল-দরজা ভেদ করে বাইরে পৌঁছয় না। জাহাঁ আরা এসে জাপটে ধরে ছেলেকে শান্ত করার চেষ্টা করেন, বুকে করে আগলে নিয়ে যান দক্ষিণের দালানে, তাঁর ঘরে। একমাত্র জাহাঁ আরা'ই পারেন এরকম সব সময়ে ছেলেকে শান্ত করে তাকে ঘরে নিয়ে যেতে। ডাক ছেড়ে কাঁদে ছোটন। সারাদিন বিছানায় শুয়ে শুয়ে গুমরে গুমরে কাঁদে। মাথায় হাত বুলোন জাহাঁ আরা, বলেন, &হয়ষঢ়;আল্লাহ'রে কও বা'জান, আল্লাহ'রে কও।'


কয়েকদিন চুপচাপ বাড়িতে শুয়ে থাকে ছোটন। এমনকি চান করতে পুকুরেও যায় না। ঘর থেকে বেরোয় শুধু পায়খানায় যেতে হলে। জাহাঁ আরা'র মনে হয়, ছেলে বোধ হয় শুধরালো! ঘরের পোষা মুর্গীটা জবাই করে রেঁধে খাওয়ান ছেলেদের। নামাজে বসে দু'হাত তুলে প্রার্থনায় মগ্ন হন,&হয়ষঢ়;ইয়া আল্লাহ, আমার পোলারে সুমতি দ্যাও আল্লাহ, সুমতি দ্যাও।' দু'চারদিন চুপচাপ ঘরের ভেতর শুয়ে বসে কাটিয়ে দেয় ছোটন। প্রতিদিন কলেজে যাওয়ার সময় তাকে ডাকে সেজভাই রোকন, ভাই, চলেন না, কলেজ যাই। ম্যাট্রিক পাশ করে এবছরই রোকনও ভর্তি হয়েছে কলেজে। একদিন ছোটন উঠে বসে বিছানা থেকে, পুকুরে গিয়ে স্নান করে আসে আর তারপর বড়ভাইয়ের পুরনো শার্ট-প্যান্ট পরে রওনা দেয় কলেজে। গতবছর খোকন কলকাতায় গিয়েছিল বাবার কাছে, বেড়াতে,  যাওয়ার সময় নিজের পুরোনো জামাপ্যান্টগুলো দিয়ে দিয়েছিল ছোটনকে। জামা-কাপড়ের ব্যপারে জাহাঁ আরা'র বড়ছেলে খোকন যেমন সৌখীন, অন্যেরা তেমন নয়। ছোটন, রোকন বরাবরই খোকনের ছোট হয়ে যাওয়া বা খানিকটা পুরনো জামাকাপড় পরে এসেছে, ছোটন বা রোকন কারোরই কোনো বায়নাক্কা নেই।


ছোটন তৈরি হয়ে কলেজে যায় কিন্তু জাহাঁ আরা নিশ্চিন্ত বোধ করেন না। এ নিয়ে কম তো হল না ছোটনের এই রাগ করে চেঁচামেচি করা, বাড়ি থেকে বেরুনো বন্ধ করা আর তারপর দু-চার দিন চুপচাপ থেকে আবার কলেজে যায় আর দু-এক দিনের মধ্যেই আবার বাড়ি থেকে পালিয়ে সারারাত জুয়োখেলা। জাহাঁ আরা এও জানেন যে সেখানে শুধু জুয়োখেলাই হয় না, শহর থেকে যাত্রার মেয়ে আনিয়ে সারারাত নাচনা গানাও হয়। আরও যা সব হয় সেসব জাহেদার মা মুখে বলে না কিন্তু তার মুখচোখের ভাব আর চোখ নাচিয়ে ইঙ্গিত করা থেকে জাহাঁ আরা বুঝে যান। শুধু যে জাহেদীর কাছ থেকে শুনেছেন তা নয়, একদিন নিজের চোখেও দেখেছেন বাংলাঘরের জানলার ফাঁক দিয়ে শুধু সায়া-ব্লাউজ পরা একটি মেয়ে ঢলাঢলি করছে বসে থাকা একদল ছেলের সাথে, সকলের মধ্যমণি ছোটনকে দেখে একটিও শব্দ না করে ফিরে এসেছিলেন বাংলাঘর থেকে। জাহেদীর মুখের কথা বিশ্বাস হয় না বলে নিজে একদিন মাঝরাতে ডিম করা হ্যারিকেনটা সাথে করে দেখতে গিয়েছিলেন ছেলে কী করছে। উৎকট একটা গন্ধ বেড়ার ফাঁক দিয়ে নাকে এসে লাগাতে মুখে আঁচল চাপা দিয়ে সরে এসেছিলেন ওখান থেকে।  কী করবেন, কাকে বলবেন ভেবে ভেবে রাত কখন কেটে গেছে বুঝতে পারেননি। ভোরের আলো ফুটতে দেখে আবার বাংলাঘরের দিকে গিয়ে দেখেন আসর শেষ হয়ে গিয়েছে, সকলে যে যার মত চলে গেছে, ছোটন ঘুমোচ্ছে মফিজের বিছানায়।


ছোটন জাহেদার মা'কে ডাকে বিবিসি বলে। সারা নরাইল আর তারও আশেপাশের সমস্ত খবর সকলের আগে জাহেদীই জানতে পারে আর সকলের আগে সেসব খবর পৌঁছে দেয় জাহাঁ আরা'র কানে। মুখের উপরই জাহেদীকে বিবিসি বলে ডাকে ছোটন আর মায়ের আড়ালে যখন তখন যা মুখে আসে তাই বলে গালিও দেয় কিন্তু জাহেদী পরোয়া করে না ছোটনের গালির। জাহেদী ভয় করে এমন লোক নরাইলে কমই আছে বরং জাহেদীকেই সকলে সমঝে চলে সকলের হাঁড়ির খবর জাহেদীর কাছে থাকে বলে। কার গোপন খবর যে সে কখন সকলের সামনে ফাঁস করে দেবে তার তো কোন ঠিক নেই!


প্রথমবার ছোটন যেদিন জাহেদীকে বিবিসি বলে ডাকে, জাহেদী বুঝতে পারে না তাকেই বলা হল কিনা বা কী বলা হল। কিন্তু যখন তখন ছোটনের &হয়ষঢ়;বিবিসি ও বিবিসি' হাঁক শুনে নিশ্চিন্ত হয় যে তাকেই ছোটন বিবিসি বলে ডাকছে, তখন একদিন ছোটনের মেজাজ বুঝে তাকেই জিজ্ঞেস করে, ও ছোডভাই, বিবিসি বিবিসি যে কর, বিবিসিডা কি জিনিস? হো হো করে হাসতে হাসতে ছোটন বলে, &হয়ষঢ়;ঠাউরবাড়ির বড়সাবেরে গিয়া জিগাও, সারাদিন দ্যাহো না রেডিও কানের কাছে লইয়া বইয়া থাহে, তাইনেই কইব নে তুমারে, বিবিসি কি জিনিস!' জাহেদী যদিও বড়সাহেবকেও ভয় পায় না কিন্তু সমঝে তো বিলক্ষণ চলে। বড়ঠাকুর বলে কথা। তাঁকে গিয়ে ছোটনের কথার মানে জিজ্ঞেস করবে অতবড় বেয়াদপ জাহেদী তো নয়! সে রোকনের কাছে জানতে চায় বিবিসির মানে কি। রোকন বলে,&হয়ষঢ়;বিবিসি হইল গিয়া খবরের কম্পানি, বড়চাচায় যে সারাদিন খবর হুনে রেডু কানের কাছে লইয়া? তুমার মতন একজন আছে হেই রেডুর ভিতরে, যের নাম বিবিসি। সারা দুইন্যার সব খবর হেগো কাছে থাহে, যেমুন তুমার কাছে থাহে নরাইলের হগ্গলের খবর! বুচ্চনি?' খানিকটা বোঝে জাহেদী খানিকটা বোঝে না কিন্তু তাকে নিয়ে যে ছোটন মশকরা করে সেটা ভালমতনই বুঝতে পারে।


সময়ে সবই বদলায়। সারা নরাইল দাঁপিয়ে বেড়ানো জাহেদার মায়েরও চালচলন খানিকটা ঢিমে হয়েছে। এখনও সে ভোর ভোর উঠে গোটা পাড়াটা একটা চক্কর দিয়ে ঠাকুরবাড়িতে এসে ঢোকে। কিন্তু ঢোকে বড় ধীরপায়ে। পর পর পাঁচ পাঁচটি মেয়ের পরে যেদিন জাহেদার মায়ের এক ছেলে জন্মালো, সেদিন সে খোদার কাছে লক্ষ-কোটি সালাম জানিয়েছে, কৃতজ্ঞতা জানিয়েছে, তার বাপের মত তাকেও খোদা &হয়ষঢ়;আপুত্রা' রাখেননি বলে, শেষমেষ একটা ছেলে তার হয়েছে বলে। আর হল তো হল পরপর দু'বছরে দুটো ছেলে হল জাহেদার মায়ের। বাপের একমাত্র মেয়ে হওয়ার সুবাদে ঠাকুরবাড়ির পেছনকার এই আড়াই বিঘা জমির উপর বাড়িটির একছত্র মালিক সে। বিয়ে হয়ে গেলেও শ্বশুরবাড়িতে সে শুধু এক আধ বেলার জন্যে বেড়াতেই যায় বরাবর, কোনদিন গিয়ে থাকেনি সেখানে। তার স্বামীকে লোকে ঘরজামাই বললেও তাতে জাহেদার মায়ের কিছু যায় আসে না, লোকে তো কত কথাই বলে। বাঁশ-বেতের কাজ করে তার স্বামী, বাড়িতেই বসে বসে কাজ করে সারাদিন। মানুষটি সজ্জন, কখনও তার উঁচু গলার আওয়াজ কেউ শোনেনি, বাড়িতে জাহেদার মায়ের সব সময়কার চেঁচামেচিতে কাক-চিলেতে বসতে না পেলেও একমুখ চাপদাড়ি, পিঠ পর্যন্ত লম্বা চুলের মানুষটা নিজের মনেই কাজ করে যায়, বউয়ের সাতেতে পাঁচেতে কোন কিছুতে সে নেই। বছরে নয়ের বড় ছেলেটা যেদিন বঁড়শী দিয়ে বাড়ির পেছনের পুকুরে মাছ ধরতে গিয়ে সাপের কামড় খেয়ে ঘরে ফিরে এল, সেদিনকার জাহেদার মায়ের আহাজারিতে গোটা নরাইল এক হয়েছিল। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরকারী হাসপাতালে গিয়ে যখন সে ছেলেকে নিয়ে পৌঁছুল, তখন আর কারোর কিছু করার ছিল না। হাসপাতালের মেঝের উপর আছড়ানো জাহেদার মাকে সেদিন কেউ সামলাতে পারেনি, সারা বিকেল, সারা রাত মেঝেতে পড়ে পড়ে মাথা ঠুকে ঠুকে জাহেদার মা যখন হুঁশ হারালো তখন ছোট্ট ছেলেটার শরীর থেকে বেরিয়ে গেছে তার প্রাণবায়ু। ছেলের লাশ আর অচেতন বউকে নিয়ে পাড়ার লোকের সাথে বাড়ি ফিরে এল শুকুর আলী।


ছোট ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে জাহেদার মা শোক ভোলার চেষ্টা করে, মুখের হাসি ফিরে আসে না জাহেদার মায়ের। ছেলে মারা যাওয়ার পর থেকে জাহেদার মা কেমন যেন ঝুঁকে যায়, বাড়ি থেকে বেরোয় না,  নিজে থেকে যেচে প্রায় কোন কথাই বলে না, কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলে মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে, যেন বুঝতে পারছে না। প্রথম প্রথম জাহাঁ আরা ক'দিন সকাল-বিকেল জাহেদার মায়ের কাছে গিয়ে বসে থাকতেন, জাহেদার মা &হয়ষঢ়;ও চাচিগো' বলে জাহাঁ আরার উপর ঝাপিয়ে পড়ত। জাঁহা আরা কখনও কথা বলে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করেন, কখনও বা শুধু জাহেদার মায়ের মাথাটা কোলে নিয়ে চুপ করে বসে থেকে তার গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দেন।  কবে থেকে যেন জাহেদার মায়ের কিশোরী মেয়েটি সংসারের দায়-দায়িত্ব সব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে জাহেদার মা জানে না। সারাদিন ঝুম মেরে বসে থাকে জাহেদার মা, কখনও বাঁশঝাড়ের তলায় কখনও পুকুরপারে, যেখানে তার ছেলে সাপের কামড় খেয়েছিল । মুখটা গোঁজা থাকে হাঁটুদুটির মাঝে।


এক সময় পুত্রশোকও সহ্য হয়ে যায়। জাহেদীর একটু বেশি সময় লাগে কিন্তু এক সময় ফিরে আসে স্বাভাবিক জীবনে। ছেলের মৃত্যুতে জাহেদার মায়ের বয়েস যেন হঠাৎ করে বেড়ে যায়, এতদিন যা থমকে ছিল। শরীর ভেঙে যায় অনেকটা, সোনার মত উজ্জ্বল ঝকঝকে গায়ের রঙ অনেকটাই ম্লান, মুখে গলায় যে নীলচে শিরার আভাস রঙের ঔজ্জ্বল্য বাড়িয়েছিল, চোখ-মুখ ভেঙে সেই শিরা উজিয়ে উঠে চেহারায় নিয়ে এসেছে এক স্থায়ী রুক্ষ ভাব, তেল না পড়া রুক্ষ চুলে জটার আভাস । পানের রসে সিক্ত, রঞ্জিত ওষ্ঠ কবে থেকে যেন শুকিয়ে গিয়েছে, পান এখনও খায় জাহেদার মা, কিন্তু ঠোঁটের লাল আভা এখন আর মুখে-চোখে ছড়ায় না। গভীর কালো চোখে এক অসীম শূন্যতা।


-২২-


ও আমার আন্ধার ঘরে বত্তি জ্বলে না, ওরে আমার কেলেসোনা
ও আমার কপালের উপরে কপাল তুমি দিও না, ওরে আমার কেলেসোনা
ও আমার কপালে আছে মানান টাইরাখানা, ওরে আমার কেলেসোনা
ও আমার ছিঁড়ে যাবে কপালের টাইরাখানা, ওরে আমার কেলেসোনা
ও আমার বদ্দোমানের গড়ানি আর টাইরা হবে না, ওরে আমার কেলেসোনা


ও আমার হাতের উপর হাত তুমি দিও না, ওরে আমার কেলেসোনা
ও আমার হাতে আছে সোনা গড়া বালাখানা, ওরে আমার কেলেসোনা
ও আমার বেঁকে যাবে সোনাগড়া বালাখানা, ওরে আমার কেলেসোনা
ও আমার বোলপুরের গড়ানি আর বালা হবে না, ওরে আমার কেলেসোনা


ও আমার পায়ের উপর পা তুমি রেখো না, ওরে আমার কেলেসোনা
ও আমার পায়ে আছে চাঁদির তোড়াখানা, ওরে আমার কেলেসোনা
ও আমার ভেঙ্গে যাবে তোড়ার নক্সাখানা, ওরে আমার কেলেসোনা
ও আমার কলকাতার গড়ানি আর তোড়া আর হবে না, ওরে আমার কেলেসোনা


ও আমার কোমরের উপরে কোমর তুমি দিও না, ওরে আমার কেলেসোনা
ও আমার কোমরে আছে গোটবিছাখানা, ওরে আমার কেলেসোনা
ও আমার ছিড়ে যাবে বিছার টানাখানা, ওরে আমার কেলেসোনা
ও আমার বুম্বায়ের গড়ানি আর বিছা হবে না, ওরে আমার কেলেসোনা

                                                               (মুসলিম বিয়ের গান, বর্ধমান জেলা)


কলকাতার ব্যবসায়ী গোলাম রব্বানী দেশে কিছু জমি কিনেছে, ইঁটের দেওয়ালের উপর টিনের চাল দিয়ে নতুন ঘর বানিয়েছে, যে ঘরে নাহার থাকে। বেশ বড়সড় সংসার নাহারের সেখানে। শাশুড়ি, দেওর, ননদদের নিয়ে নাহার সংসার করে। নিজের পছন্দমত মেয়ে দেখে দুই দেওরের বিয়ে দিয়েছে, জায়েরা তাকে বড় জা নয় শাশুড়ির মত মান্য-গণ্য করে। একটা ছেলের বড় সাধ নাহারের কিন্তু আল্লাহ'র বোধ হয় সেটা মর্জি নয়, এক মেয়ের পরে নাহারের আর কোন সন্তানই হল না। এই দু:খবোধ সব সময় তাড়া করে নাহারকে। ভয় পায়, ছেলে হয়নি বলে রব্বানী যদি আবার একটা বিয়ে করে! শাশুড়ি তো যখন তখন ছেলে হয়নি বলে খোঁটা দেয় নাহারকে, যেন ছেলের জন্ম দিতে না পারাটা নাহারের অপরাধ। বুড়ি যখন তখন নাতির জন্যে বসে আহাজারি করে। ছেলের জন্যে নিজের আপসোস নাহার নিজের মনেই চেপে রাখে, শাশুড়ি-দেওর বা ননদদের সামনে কখনও প্রকাশ করে না। কে জানে, বুড়ি হয়ত ছেলেকে আরেকবার বিয়ে করানোর কথাও ভাবে, নাতির মুখ দেখবে বলে! আর রব্বানীকে তো নাহার একটুও বিশ্বাস করে না। কামিনীর কথা নাহারের অজানা নয় যদিও রব্বানী যখন তখন নাহারের মাথায় হাত রেখে কসম খায়, কামিনীর সাথে তার আর কোন সম্পর্ক নেই বলে। দেশের বাড়ির এই সংসার, এই বাড়ি, জমি-জমা সব তার। শাশুড়ি যতই আহাজারি করুক নাতির জন্যে, সাংসারিক কোন বিষয়ে কখনই নাক গলায় না, নাহার যা বলে, যা করে, সেটাই চূড়ান্ত¹, সেটাই হয়। ছেলের বৌয়ের উপর বুড়ির সর্ব ব্যাপারে নির্ভরশীলতা নাহারকে স্বস্তি দেয়, নিজেকে থিতু বলে মনে হয় তার। নাহারের যা কিছু সংশয়, ভয় সব রব্বানীকে নিয়ে।


আজকাল ফজরের নামাজ পড়তে মসজিদে আসে গোলাম রব্বানীও। সারাদিনে আর একবারও মসজিদমুখো না হলেও ভোরের নামাজটা রব্বানী সময়মতই পড়ে যদিও নামাজের পরে আবার ঘরে ফিরে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। ঘন্টা দুই আরও ঘুমিয়ে নিয়ে উঠে গিয়ে গলির মুখের হোটেল থেকে কিনে আনে ডালপুরি, হালুয়াপুরি, জিলিপি আর ছোট অ্যালুমিনিয়ামের ক্যানে করে দু কাপ চা। প্রতিদিনই খাওয়ার সময় রব্বানী সাত্তারকে বলে, &হয়ষঢ়;ও চাচা, খাইন না এট্টু চা-পুরি।' সাত্তার হেসে বলে,&হয়ষঢ়;না ভাতিজা, তুমি খাও, আমার এই ডাইলপুরি-চা হজম হয় না।' রব্বানী খেয়ে দেয়ে হাঁটু পর্যন্ত ঝুলের সাদা পপলিনের হাফপ্যান্ট পরে, তার উপরে পরে সাদা ধুতি। শার্টও রব্বানী বরাবর সাদাই পরে। জামা কাপড় পরে নিয়ে নিজের হাতেই সেজে নেওয়া পান মুখে গুঁজে নিয়ে হাতে ঝোলানো চিটেপড়া কাপড়ের বড় ব্যাগটি নিয়ে বেরিয়ে পড়ে দোকানের উদ্দেশ্যে। হাতের ব্যাগটিতে থাকে নানা রকম সিগারেট আর দোকানের আরও নানান জিনিস। এগুলো সে রাতে বাড়ি ফেরার আগে ঘুরে ঘুরে যোগাড় করে নিয়ে এসেছে পরদিন দোকানে নিয়ে যাবে বলে। মেয়ে নার্গিস স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর থেকে নাহার বছরের বেশিরভাগ সময়ই দেশে থাকে মেয়েকে নিয়ে। বছরে একবার নাহার কলকাতায় এলেও মাসখানেকের বেশি সে থাকে না। বড়দিনের ঠিক আগে নাহার আসে মেয়েকে নিয়ে, মেয়ের স্কুলের বাৎসরিক পরীক্ষা শেষ হলে, জানুয়ারীর মাঝামাঝি আবার ফিরে যায়, মেয়ের স্কুল খুলে যায়, নতুন ক্লাসের পড়া শুরু হয়ে যায় বলে।


প্রায় দুই বিঘা জমির উপর বাড়ি গোলাম রব্বানীদের। একসময়কার অবস্থাপন্ন গৃহস্থ পরিবার ছিল রব্বানীদের, সে তার দাদার আমলের কথা। রব্বানী জ্ঞান হওয়া অব্দি নুন আনতে পান্তা ফুরায় হাল দেখে এসেছে। অত বড় বাড়িতে দু'খানা ছনের ঘর আর গোটা বাড়ি জুড়ে আগাছার জঙ্গল। খানিকটা জায়গা পরিষ্কার করে তরি-তরকারির গাছ লাগাত রব্বানীর মা। মাঠের জমি সব বেচে বেচে খেয়েছে রব্বানীর অকর্মণ্য বাপ। অন্যের বাড়িতে কাজ করতে বেরুনো শুধু বাকি ছিল রব্বানীর মায়ের। অল্প বয়েসে রব্বানী রোজগারের সন্ধানে কলকাতা না গেলে হয়ত তাই করতে হত। এসবই জানা কথা নাহারের। বিয়ে হয়ে এবাড়িতে আসা ইস্তক শাশুড়ির কাছে সে কম শোনেনি এসব গল্প। তবে এখন এই বাড়ি দেখে লোকে চিনতে পারে না এই সেই জঙ্গুলে বাড়ি কিনা। তিন ভিটেয় তিনখানা বড় বড় টিনের ঘর তার মধ্যে নাহার যে ঘরটিতে থাকে সেটি আবার পাকা দেওয়ালের। একচালা রান্নাঘরের পাশে বিশাল খড়ের গাদা যার ধারেই দিনভর বাঁধা থাকে হালের গরু আর দুধেল গাভীটি। বাড়ির সীমানা ঘিরে রেখেছে আম, জাম আর কাঁঠালের বড় বড় গাছ। ছোট ছোট ছেলে-মেয়েদের ছোটাছুটি আর তাদের হই হল্লাতে বাড়ি যেন ভরে থাকে সব সময়। এত সবকিছুর মাঝেও একটি পুত্রসন্তানের অভাব কুরে কুরে খায় নাহারকে।
 
নাহারকে বাড়ির লক্ষ্মী বলে মানে তার শাশুড়ি। ক্ষোভ-দু:খ, অভাব শুধু একটা নাতির। বুড়ি রাতদিন খোদার কাছে হাজারবার করে বলে, &হয়ষঢ়;খুদা, একটা নাতি দ্যাও, একটা নাতি দ্যাও খুদা।' নাতি হলে কোন কোন পীরের দরগায় গিয়ে খাসি জবাই করে ফকির খাইয়ে আসবে সেও বুড়ি ঠিক করে রেখেছে। আজমীর শরীফের খাজা বাবার দরগায় একবার যাওয়ার জন্যে নাহারকে বহুবার বলেছে তার শাশুড়ি। প্রত্যেকবারেই কলকাতা যাওয়ার সময় নাহারকে বলে দেয়, রব্বানীকে সাথে করে এবার যেন অবশ্য যায় সেখানে। কত লোকের সেখানে গিয়ে মানত পুরা হয়েছে, কত বাঁজা মেয়েছেলেরও ছেলে-পুলে হয়েছে, কত লোকের মামলায় হেরে যাওয়া জমি-জমা-সম্পত্তি ফিরে এসেছে সে সব গল্প বুড়ির মুখস্থ, চাইলে এমনকি নাম-ঠিকানাও বুড়ি দিয়ে দিতে পারে, এক তার ছেলের বউই শুধু কলকাতায় থেকেও আজমীর গেল না!


খাড়া নাক আর লম্বাটে মুখের নাহারকে লোকে সুন্দরী না বললেও বলে, দেখতে ভালো। নাহারের কালো গায়ের রঙকে টেনেটুনেও শ্যামলা বলা যায় না। বড় বড় চোখদুটি চঞ্চল আর উজ্জ্বল। ঝকঝকে চোখের দৃষ্টি যেন সারাক্ষণই কিছু একটা খুঁজে বেড়াচ্ছে। চোখে-মুখে একটা আলগা শ্রী আছে যা একবার তাকালেই চোখে পড়ে। লোকের সাথে ব্যবহারটা ভাল করে বলে লোকে ভালোও বাসে। স্বামী কলকাতার ব্যবসায়ী বলে খানিকটা দেমাক থাকলেও এমনিতে মিশুকে নাহারের আত্মীয়-বন্ধুর অভাব নেই। বেশ খানিকটা মোটা হয়ে নাহারের চেহারায় একটা ভারিক্কি ভাব এসেছে। সর্বক্ষণ পান খায় বলে ঠোঁটদুটো সব সময়েই লাল, দাঁতের ফাঁকে ফাঁকে পানের ছোপ। ঠাকুরবাড়ির বড়বিবির মত না হলেও সোনায়-রূপোয় মিলিয়ে মোটামুটি গা ভর্তি গয়নাই পরে থাকে নাহার। গলায় মোটা রূপোর চেন লকেট, কানে সোনার বড় বড় কানপাশা, নাকে একখানা বড় মুক্তোর নাকছাবি আর একখানা নোলক, দু'হাতে ব্রোঞ্জের উপর সোনা বসানো মোটা রুলি আর পায়ের রূপোর নুপুর। এগুলো নাহারের রোজকার গয়না। কোথাও বেড়াতে গেলে তখন হাতে গলায় আরও কয়েকটা চুড়ি-বালা, চেন পরে নেয়। উজ্জ্বল চড়া রঙের রুবিয়া ভয়েলের ছাপা সব শাড়ি পরে নাহার, যা সবই কলকাতা থেকে কেনা। আজকাল আর বাড়ির সব কাজ নাহার করে না, ছোট জায়েরাই করে। নাহার শুধু তদারকি করে। মাঝে মাঝেই সন্ধের পরে নাহার ঠাকুরবাড়ি যায়, বড়বিবির সাথে রুটিন সাক্ষাৎ করে এসে বসে জাহাঁ আরার কাছে। প্রায় সমবয়েসী জাহাঁ আরা'কে নাহার ডাকে &হয়ষঢ়;আম্মা' বলে। সাত্তারকে &হয়ষঢ়;আব্বা' ডাকার সুবাদে জাহাঁ আরা তার &হয়ষঢ়;মা'। ঠাকুরবাড়িতে আসার উদ্দেশ্য অবশ্যই রব্বানীর হাল-হকিকত জানা, কেউ কলকাতা থেকে এলে তার কাছ থেকে খবরাদি জানা বা কেউ কলকাতা যাওয়ার থাকলে তার কাছে নিজের সংবাদ দিয়ে দেওয়া। চিঠি একটা অবশ্যই দেয় নাহার যেই কলকাতা যায় তার হাতে, সম্ভব হলে দিয়ে দেয় ঘরে বানানো পিঠে, খানিকটা আতপ চাল, ক্ষেতের সর্ষের তেল ইত্যাদি।


মেয়ে নার্গিসের মুখে যেন নাহারেরই মুখখানা কেটে বসানো শুধু ফর্সা গায়ের রঙটা পেয়েছে বাপের কাছ থেকে। উজ্জ্বল ফর্সা নার্গিসের মুখের দিকে তাকিয়ে নাহার মনে মনে ভাবে, &হয়ষঢ়;আল্লার যে কি রহমত আমার উপরে, মাইয়ায় যদি আমার মতন কালা হইত তয় কুন মুখে গিয়া বিয়ার কতা কইতাম মৌলভির বেটির কাছে!' তবে মেয়েও হয়েছে তার তেমনি, না করে কোন সাজগোজ, না পরে কোন গয়নাগাঁটি। বলে বলে হয়রান হয়ে এখন আর কিছু বলে না নাহার। মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে নাহারের মন ভরে যায়, &হয়ষঢ়;কি সোন্দর ঝি আমার!' একদৃষ্টিতে মুখের দিকে তাকিয়ে দেখে , অনেক সময় নার্গিস জিজ্ঞেস করে, &হয়ষঢ়;কি দেহ আম্মা?' থতমত খায় নাহার, নিজে নিজেই বলে, &হয়ষঢ়;আমারই নজর লাগব আমার ঝিয়েরে!' মেয়ে যদ্দিন ছোট ছিল ঠাকুরবাড়িতে সেও আসত মায়ের হাত ধরে, এখন আর আসে না। স্কুলের শেষ ক্লাসে পড়ে নার্গিস, ক'দিন বাদেই তার ম্যাট্রিক পরীক্ষা। জাহাঁ আরা'র কাছে বসে ইনিয়ে বিনিয়ে মেয়ের গল্প করে নাহার। মেয়ে তার পড়ালেখায় দারুণ ভাল, সংসারের কাজেও দারুণ পটু আর মাতৃভক্তিতে তো তার জুড়ি মেলা ভার! ঠাকুরবাড়িতে যখনই আসে নাহার, খোঁজ নেয় খোকনের। ঠোঁটকাটা ছোটনকে তার একটুও পছন্দ নয় কিন্তু এমনি কপাল তার, প্রায় দিনই সে সামনে পড়ে যায় ছোটনের। এমনকি রাস্তায় দেখা হলেও সে ঠাকুরবাড়ি আসছে বুঝতে পারলে সঙ্গ নেয় নাহারের, এসে মায়ের কাছটিতে বসে আর নার্গিসের কথা জানতে চায়। নাহার সোৎসাহে মেয়ের গল্প শুরু করে কিন্তু ছোটনের মুখের মিচকি হাসি দেখে থমকে যায়, বুঝতে পারে, ছোটন মশকরা করছে তার সাথে।


ইদানিং নাহারের যাতায়াত একটু বেড়েছে ঠাকুরবাড়িতে। সন্ধের পর প্রায়ই এসে হাজির হয় সে। হাতে করে প্রায় দিনই নিয়ে আসে বাড়িতে বানানো কোন পিঠে বা সযত্নে তুলে রাখা নিজের পোষা মুর্গীর কয়েকটা ডিম। জাহাঁ আরা'র বারবার নিষেধ সত্ত্বেও সে কিছু না কিছু একটা হাতে করে নিয়েই আসে, বলে, &হয়ষঢ়;ও আম্মা, আপনে না নিলে মনে কষ্ট পামু, পর পর লাগব আমার নিজেরে, আমি না আপনের ঝি!'  সাত্তারকে আব্বা আর জাহাঁ আরা'কে আম্মা ডাকার সুবাদে ঠাকুরবাড়ির এই ঘরটি তার বাপের বাড়ি, যদিও জাহাঁ আরা'র ছেলেরা সকলেই তাকে ভাবী বলে ডাকে তবু সে বারে বারেই জানাতে ভোলে না যে এরা তাকে ভাবী বলে ডাকলেও সে কিন্তু আব্দুল সাত্তারকে বা জাহাঁ আরাকে নিজের মা-বাপ বলেই জানে-মানে। শ্বশুর-শাশুড়ি বলে কোনদিন ভাবে না। জাহাঁ আরা যখন বলেন, &হয়ষঢ়; হ, তুমি তো আমার ঝিই, বউ কেডা কয় তুমারে' তখন খানিকটা যেন ভরসা পায় নাহার। নার্গিসকে ঠাকুর আব্দুল সাত্তারের বড়ছেলে খোকনের সাথে বিয়ে দেবার গোপন বাসনা যা সে বহুকাল ধরেই মনের গহন কোণে সঙ্গোপনে লুকিয়ে রেখেছে, তা যেন খানিকটা করে বাতাস পায়, ডালপালা মেলে মনের ভেতরেই, অবশ্য জাহাঁ আরা'র সদা গম্ভীর মুখের দিকে তাকালেই তার মনের ইচ্ছে মনেই গুটিয়ে যায়, বাড়ি থেকে বহুবার করে নিজেই নিজেকে জোগানো সাহসটুকু যেন এক লহমায় ধুলোয় মিশে যায়, জাহাঁ আরা'র কাছে একবার বিয়ের কথাটা পাড়বার শত চেষ্টা সব জলে যায় ছোটনের মশকরাতে।


ছোটন হঠাৎ একদিন নাহারকে &হয়ষঢ়;গান্ধী ভাবী' বলে ডাকতে শুরু করে। হঠাৎ করে নিজের নামের পাশে এই বিশেষণে নাহার খুশি হবে কি রাগ করবে বুঝে উঠতে পারে না। ইন্দিরা গান্ধীর নাম তার অজানা নয়, নেহরুর বেটি ইন্দিরা গান্ধী ইন্ডিয়ার প্রাইম মিনিষ্টার একথা সে জানে কিন্তু তার নাম কেন গান্ধী হল সে কিছুতেই বুঝতে পারে না। বুঝিয়ে দেয় ছোটনই, বলে,&হয়ষঢ়; আপনে কি কম নিহি অ্যা? রব্বানী ভাইসাবেরে কেমনে ইশারায় নাচাইতেসেন, বেচারা এট্টু-আধটু ফুর্তি-ফার্তা করত কামিনীরে লইয়া, হেইডা কেমনে আপনে আওনের লগে লগেই বন্ধ করাইসেন আর রব্বানী ভাইসাবের বাড়িডাও তো আপনেই শাসন কর্ত্যাসেন, তয় আপনে গান্ধী'র চেয়ে কম নিহি!' নাহার খুশি হবে না রাগ করবে তারপরও ভেবে পায় না । মনে মনেই বলে, &হয়ষঢ়;ছোডনেরে চেতাইয়া লাভ নাই, যদ্দিন নার্গিসের বিয়াডা খোকনের লগে না হইসে তদ্দিন চুপ থাহনই মঙ্গল!'


বহুদিনের বহু চেষ্টার পরেও যখন নাহার জাহাঁ আরা'র কাছে নিজের মেয়ের বিয়ের কথা পাড়তেই পারল না তখন ঠিক করল, কলকাতা যাবে সে মেয়ে নিয়ে, আর আব্দুল সাত্তারের কাছেই বিয়ের কথা তুলবে। &হয়ষঢ়;আব্বায় তো এত আদর করে আমারে, নার্গিসেরেও জন্মের থিক্যা দেখসে আর কত আদর করসে, বিয়ার কতা তুললে আব্বায় না করত না।'  বছর দুই নাহার কলকাতা যায়নি নার্গিসের ম্যাট্রিক পরীক্ষার জন্যে, সামনেই পরীক্ষা আর পরীক্ষা শেষ হলেই মেয়েকে কলকাতার কলেজে ভর্তি করবার বাহানায় সে মেয়ে নিয়ে কলকাতা যাবে বলে মনে মনে ঠিক করেছে। মেয়েকে শুধু বলেছে, &হয়ষঢ়;মন দিয়া ল্যাহাপড়া কর, তরে কলিকাতা লইয়া গিয়া কলেজ ভর্তি করুম।' মেয়ে বড় হয়ে গেলেও নাহারের মন থেকে একটি পুত্রসন্তানের আকাঙ্ক্ষা যায়নি। নিজের দিকে তাকিয়ে নিজেকেই বলে নাহার, &হয়ষঢ়;বয়েসডাই কিতা হইসে আমার, আল্লায় চাইলে বাচ্চা তো আমার অহনেও অইতে পারে।' আজমীরে গিয়ে খাজা বাবার দরবারেও সে এবার যাবে, সেখানে গিয়ে দুটো মানত করবে, এক তো নিজের এক পুত্রসন্তানের জন্যে দ্বিতীয় নার্গিসের বিয়েটা খোকনের সাথে হওয়ার জন্যে। খাজা বাবা এত লোকের এত কথা শোনেন, লোকের এত উপকার করেন আর তার জন্যে এটুকু করবেন না? নিশ্চয়ই করবেন! এটুকু ভরসা আছে নাহারের, একবার গিয়ে পড়লেই হল। শাশুড়ি তো সেই কবে থেকেই বলছে, সেই শুধু মেয়ে আর সংসার নিয়ে এখানে পড়ে থাকল, একবার নিজে গিয়ে সেখানে যদি সে মানতটা করে আসত তবে অ্যাদ্দিনে নিশ্চিত তার ছেলেও হত আর নার্গিসেরও একটা হিল্লে হয়ে যেত! যাক আর দেরি নয়, এখন অপেক্ষা শুধু মেয়ের পরীক্ষা শেষ হওয়ার।


-২৩-


অধীন পাগল কানাই কয়,
চইড়া পোড়া প্রেমের নায়,
রাত্রদিন বৈসা ভাবি হায়রে হায়।।
ডুব ডুব ডুব সাধের তরী,
কখন যেন ডুবিয়া মরি,
কখন যেন হ্যাঁচকা টানে আমার প্রাণ যায়।।
একে তো মোর জীর্ণ তরী,
পাপের বোঝায় হইছে ভারি;
কেমনে যে দিব পাড়ি, আমার পারের সম্বল নাই।
এই ভাঙা নৌকা বাইতে বাইতে আমার দিন যায়।।
শোন ওরে মন-বেপারি,
এ ভব-নদী দিবি পাড়ি;
শ্রীগুরু যার আছে কান্ডারী, তার পারের ভয় নাই।
অনায়াসে সে পাড়ি দিয়ে পারে চলে যায়।।

                                                               (বাউল গান)


রাহেলাবিবি অসুস্থ। বাঁ দিকের বুকে একটা চাকামত কিছু হয়েছে, শক্ত আর গোল একটা কিছু। উপর থেকে হাত দিয়েও সেটা বেশ বোঝা যায়। প্রথম প্রথম আমল দেননি রাহেলাবিবি কিন্তু দিনে দিনে চাকাটা যেন বেশ বড় হচ্ছে আর ব্যথাও বাড়ছে। সর্বক্ষণ একটা চিনচিনে ব্যথা থাকে ওই গোলমত চাকাতে। ব্যথাটা প্রথমে শুধু ওই শক্তমত চাকাতেই ছিল কিন্তু ধীরে ধীরে সেটা এখন বাঁদিকে গোটা স্তন জুড়েই ছড়িয়ে পড়েছে। রাহেলাবিবির কথামত বিলুর বউ বসে বসে রাবারের হটব্যাগে করে গরম জলের সেঁক দেয়। খানিক আরাম বোধ প্রথম প্রথম হলেও এখন যেন আর কোনকিছুতেই আরাম বোধ হয় না। ছটফট ছটফট করেন তিনি শুয়ে শুয়ে। শহর থেকে জয়নারায়ণ ডাক্তারকে এনে দেখিয়েছেন গাফ্‌ফার সাহেব। হোমিওপ্যাথির ডাক্তার এসে প্রথমবার দেখেই গম্ভীর মুখে গাফ্‌ফার সাহেবকে বলে গেছিলেন, &হয়ষঢ়;লক্ষণ ভাল নয় ঠাকুর সাব, পারলে কলিকাতা নিয়া চইলা যান।' রাহেলাবিবি কলকাতা যেতে রাজী হন না, বলেন &হয়ষঢ়;চিকিৎসা যা করনের ইহান থেইকাই কর, আমি কুনহান যামু না।' তাঁর সেই &হয়ষঢ়;না'কে কেউই &হয়ষঢ়;হ্যাঁ' করাতে পারেনি।


জাহাঁ আরা এসে বসে থাকেন শাশুড়ির পাশে। চুপচাপ বসে বসে শাশুড়ির ব্যথার জায়গায় হাত বুলিয়ে দেন। আজকাল আর গায়ে জামা পরেন না রাহেলাবিবি। শাড়ি সরিয়ে স্তনের দিকে তাকাতেও যেন ভয় পান জাহাঁ আরা। দিনে দিনে যেন লাল হয়ে ফুলে উঠছে স্তন, গোটা স্তনটিকেই একটি পাকা ফোঁড়া বলে মনে হয় জাহাঁ আরা'র। বিলুর বউ এখন আর বসে বসে সেঁক দেয় না দাদিশাশুড়িকে। সংসারে তার হাজারো কাজ। বছরবিয়োনি জারিনার সাত সাতটি ছেলে তার উপর এই ঠাকুরের গুষ্ঠির হাঁড়িটাও তো তাকেই ঠেলতে হয়, বাদবাকি সব তো নিজের নিজের ঘরের মহারানী! শাশুড়ির পাশে বসে জারিনার গজগজানি মাঝে মাঝেই কানে আসে জাহাঁ আরা'র। রাহেলাবিবির পাশে দিনে একবারের বেশি এসে বসে না এবাড়িতেই থাকা তাঁর নিজের দুই মেয়ের এক মেয়েও। সকালবেলায় একবার করে এসে হাজিরা দেয় দুজনেই খানিকক্ষণের জন্যে। কখনও দাঁড়িয়ে থেকেই মাতৃদর্শনের দায় সারে তারা, কখনও বসেও যায় মিনিট কয়েক। জারিনার কাছে খবর নেয় মায়ের ওষুধ পথ্য সব ঠিকঠাক চলছে তো? সময়মত যেন মা'কে ওষুধ পথ্যি সব দেওয়া হয় এই ফতোয়া জারী করে যে যার ঘরের দিকে পা বাড়ায়।


জয়নারায়ণ ডাক্তারের কাছ থেকে সপ্তায় সপ্তায় গিয়ে ওষুধ নিয়ে আসে খোকন। কাঁচের শিশিতে লাল রঙের ওষুধ, বোতলের গায়ে সাদা কাগজ দিয়ে চিহ্নিত করা। ছোট ছোট সব শিশিতে সাদা ছোট ছোট সব গুলি। এক এক ঘন্টা পর পর এক একটা শিশিতে চারটে করে গুলি। বোতলের ওই লাল ওষুধ সারাদিনে এ'বেলা ও'বেলায় দু বার। ঘন্টায় ঘন্টায় এসে শাশুড়িকে ওষুধ খাওয়ান জাহাঁ আরা। বুকের আঁচল সরিয়ে শাশুড়ির ফুলে ওঠা লাল শক্ত স্তনে হাত বুলিয়ে দেন ধীরে ধীরে। রাহেলাবিবি মুখে কোন কথা বলেন না শুধু চোখ দিয়ে ধারা গড়িয়ে পড়তে থাকে অবিরত। হয়ত নিজের শেষ দেখতে পান তিনি কিংবা আফসোস হয় নিজের কৃতকর্মের। অথবা হতে পারে এ শুধুই রোগযন্ত্রণায় চোখ দিয়ে বেরিয়ে আসা পানি। জাহাঁ আরা বুঝতে পারেন না রাহেলাবিবির এই নি:শব্দ কান্নার অর্থ। 


কলকাতার হোমিওপ্যাথি স্কুল থেকে পাশ করা ডাক্তার জয়নারায়ণ কম দিন ডাক্তারি করছেন না। বেশিরভাগ রোগীর মুখ দেখেই তিনি রোগ ধরতে পারেন। নিজের দোতলা বাড়ির একতলাতে রোগী দেখেন তিনি। একটি কামরা নিয়ে চেম্বার শুরু হলেও এখন গোটা একতলাটাই রোগীদের দখলে থাকে ভোর থেকে। দূরদূরান্ত থেকে মানুষ আসে তার কাছে। বাচ্চা থেকে  বুড়ো, সব বয়সের মানুষ তার রোগী। নরাইলের ঠাকুরবাড়ির লোকজনও যেকোন ছোটবড় অসুখে আগে তাঁর কাছেই আসে। বেশ কয়েকবার ঠাকুরবাড়িতে রোগী দেখতে যাওয়ার সুবাদে ঠাকুর আব্দুল গাফ্‌ফারকেও তিনি ভাল করেই চেনেন। গাফ্‌ফার সাহেবের সুনাম-দুর্নাম সবই তাঁর জানা যদিও তিনি বাস করেন বেশ অনেকটাই দূরে। একদিন খুব সকালে ঠাকুর সাহেবকে নিজের চেম্বারে দেখে খানিকটা চমকেই যান জয়নারায়ণ, ঠাকুর সাহেব তো কোনদিন আসেন না! শুনলেন মা'য়ের কী একটা হয়েছে, একবার যেতে হবে। দ্বিতীয় কোন বাক্যব্যয় না করে ব্যাগ গুছিয়ে সেদিনকার মত সব রোগী দেখা বাতিল করে গাফ্‌ফার সাহেবের সাথে রওয়ানা হলেন ডাক্তার জয়নারায়ণ। 


ঠাকুর আব্দুল গাফ্‌ফার চিঠি লেখেন ছোটভাই সাত্তারকে মায়ের অসুখের কথা জানিয়ে। জয়নারায়ণ ডাক্তার কি বলে গেছে সেটাও লিখে জানান। পত্রপাঠ ঠাকুর আব্দুল সাত্তার দেশে আসেন দোকানপাট সব ছোটভাই মোমিনের হাতে ছেড়ে দিয়ে। রাহেলাবিবিকে দেখে চোখে জল ধরে রাখতে পারেন না ঠাকুর আব্দুল সাত্তার। এই রাহেলাবিবি? এই তার মা? এ কাকে দেখছেন তিনি? বিছানায় শুয়ে আছে যেন রাহেলাবিবির প্রেত। কোথায় সেই গাভর্তি গয়না, চওড়া পাড়ের শাড়ি আর থ্রী কোয়ার্টার জামা পরা ঠাকুরবাড়ির দোর্দন্ডপ্রতাপ গিন্নি রাহেলাবিবি আর কোথায় এই বিছানার সঙ্গে লেপ্টে থাকা খালি গায়ের রুগ্ন, কালো, কঙ্কালসার এক রমণী। এই তাঁর মা। যাঁর আদেশ-নিষেধ বরাবর একটিও কথা না বলে মেনে এসেছেন সাত্তার। নিজের মাকে কোনদিন দেখেননি সাত্তার, যদি নিজের মা থাকতেন তাঁকে এতখানি ভালবাসতেন কিনা সাত্তার জানেন না। মায়ের শত অন্যায় অবিচার মুখ বুজে সয়েছেন সাত্তার, কোনদিন কোন কথার জবাব চাননি, প্রতিবাদ করেননি। সেই মা'য়ের আজ এই অবস্থা। মুখে কথা সরে না সাত্তারের। পাশে বসে থাকা জাহাঁ আরা উঠে গেলে মায়ের পাশে বসেন সাত্তার। &হয়ষঢ়;হান্নু আইস বা'জান।' গর্তে ঢুকে যাওয়া চোখদুটো উজ্জ্বল হয়, খানিকটা যেন পুরনো জ্যোতি ফিরে আসে রাহেলাবিবির চোখে সৎছেলেকে দেখে। বলেন, &হয়ষঢ়;মন্নু আবার তুমারে পেরেশান করল কিয়ের লাইগ্যা।' &হয়ষঢ়;তুমি কলিকাতা আইয়া পরলা কেরে আম্মা? কত বর বর ডাক্তর আছে, তুমি দুই দিনে বালা অইয়া যাইবা, চল আমার লগে, তুমারে লইয়া যাইতে আইসি।' রাহেলাবিবি উঠে বসতে চাইলে সাত্তার বলেন, &হয়ষঢ়;শুইয়া থাহ, উডন লাগত না, ভাই'সারে কইতাসি, তুমারে লইয়া কাইল-পরশুই আমি ফেরত যামু।'  রাহেলাবিবি কিছুতেই কলকাতা যেতে রাজী হলেন না। বলেন, &হয়ষঢ়;না বা'জান, নারায়ণ ডাক্তরে কি কইসে হুনছই তো, রোগ বালা না, ক্যান্সার অইসে, ক্যান্সার। দিন শ্যাষ হইয়া আইসে, আর টানাটানি কইর না, ঠাউরবাড়িতই থাকতে দ্যাও, শ্যাষকালে কলিকাতা আর যাইতাম চাই না।' মাথা নিচু করে নি:শব্দে বসে থাকেন সাত্তার মায়ের পাশে। কিই বা বলার আছে আর কিই বা বলবেন।


(চলবে)