আপনার মতামত         




দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আকাশ লড়াই


দীপ্তেন



I have a mathematical certainty that the future will confirm my assertion that aerial warfare will be the most important element in future wars, and that in consequence not only will the importance of the Independent Air Force rapidly increase, but the importance of the army and navy will decrease in proportion.

— General Giulio Douhet, 'Command of the Air,' 1921


প্রথম বিশ্বযুদ্ধে লড়াইটা ছিল সাগরে ও মাটিতে। এবং মূলত: সেটি ছিল জমিরই লড়াই। লক্ষ লক্ষ ইনফ্যা¾ট্রী। আর তাদের পিছনে ভারী কামান। আর সাগরযুদ্ধেও কামান। কেননা নৌ যুদ্ধ ব্যাট্‌ল্‌শিপ নির্ভর। মুখোমুখি জাহাজে জাহাজে লড়াই। কামানের পাল্লার উপর যুদ্ধের ফলাফল অনেকটাই নির্ভর করত। আর যুদ্ধবিমান? তারা নেহাৎই অকিঞ্চিৎকর। যুদ্ধের ফলাফলে হেলদোল করতে পারত না সেই পুঁচকে আকাশচারীরা।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হল কিন্তু যুদ্ধবিমানের হাত ধরেই। যতদিন গেছে ততই বিমানেরা আরো অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। সাগর যুদ্ধ তো পুরোটাই বিমান নির্ভর আর স্থল যুদ্ধও হয়ে উঠল বিমানের উপর খুব নির্ভরশীল। ইতালিয়ান সেনানায়ক গুইলিও দউহেট ও আমেরিকান বিলি মিচেল - এঁরা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরেই বিমান যুদ্ধের তাত্ত্বিক নেতা হিসাবে খুব নাম করেন। এঁরা দুজনেই বোমারু বিমানের উপর জোর দিয়েছেন। তাঁদের ধারণা ছিল বিমানবিধ্বংসী কামান যতই থাকুক না কেন, এক ঝাঁক বোমারু বিমান পাঠালে কয়েকটি অন্তত: লক্ষ্যস্থলে ঠিকই বোমা ফেলে আসতে পারবে। সেই মতন হিসাবও কষা হত এত স্কোয়ার ফীট জায়গা চূর্ণ করতে কটি বিমানের দরকার। মনে রাখবেন, প্রথম বিশ্বযুদ্ধে যে প্রায় ৮৫লক্ষ মানুষ মারা গেছিলেন তাঁদের মধ্যে মাত্র ৯০০০ ছিলো বোমারু বিমানের শিকার। কিন্তু এই স্ট্র্যাটেজিস্টরা তখনই ভবিষ্যতের বোমারু বিমানের প্রচন্ড বিধ্বংসী  ভূমিকা কল্পনা করতে পেরেছিলেন।

আর বোমারু বিমানের লক্ষ্যটা কি ? মিচেলের মতে, "কলকারখানা, রাস্তা, সেতু,রেল জংশন' আর দউহেট বলেন "নির্বিচার শহর আক্রমণ। প্রচুর অসামরিক লোকে মারা গেলে ভয় পেয়ে যুদ্ধ বন্ধ হয়ে যাবে।' সাফাই গেয়েছেন, "এই ভয়ে তাড়াতাড়ি যুদ্ধ শেষ হবে এবং আখেরে কম লোকই মারা পড়বে!'
আর এই বোমারু বিমানের প্রতিরক্ষা? মিচেল তাও স্বীকার করেছেন যে, "যতগুলি বোমারু বিমান তার দ্বিগুণ ফাইটার বিমানের পার্শ্বরক্ষী চাই।' আর দউহেটের উত্তরটি খুব মজার - তিনি বললেন "আরে আকাশে কি আর ট্রেঞ্চ খুঁড়ে মাইন বসিয়ে প্রতিরক্ষা করা যায়? বিমান হচ্ছে শুধুই আক্রমণের অস্ত্র, প্রতিরক্ষার কোনো দরকারই নেই। '

একই সাথে জার্মান রণনীতি কিন্তু ছিল অন্যরকমের। তারা বিমানকে ইনফ্যা¾ট্রীর সহায়ক বলেই সাব্যস্ত করেছে। তাই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ যখন শুরু হল, তখন জার্মানীর স্টুকা ডাইভবম্বার আর স্বল্পপাল্লার ফাইটার প্লেন ছিল দুনিয়ার সর্বোত্তম, আমেরিকা আর ব্রিটেন  তখনো লম্বা দৌড়ের বোমারু বিমান বানাতেই ব্যস্ত।


১৯৩৯ :

The bomber will always get through. The only defense is in offense, which means that you have to kill more women and children more quickly than the enemy if you want to save yourselves.

— Stanley Baldwin, British Prime Minister, House of Commons speech 10 November 1932


ব্লিৎসক্রীগ বা ঝটিকাযুদ্ধ কথাটি প্রচলিত হতে আরো একবছর লাগবে। এক পশ্চিমা সংবাদপত্রের দেওয়া ঐ নামকরণ চালু হয় ১৯৪০'এ। যাই হোক, পয়লা সেপ্টেম্বর জার্মানী অঘোষিত আক্রমণ করল পোল্যান্ডকে। জার্মানী যুদ্ধ শুরুই করল একটানা বিমান আক্রমণ দিয়ে। বোমায় বিধ্বস্ত করে দেওয়া হল এয়ারপোর্ট,সেতু,রেলওয়ে জাংশান। এই বিমান হানার পরই ইনফ্যা¾ট্রী আর সাঁজোয়া বাহিনী পোল্যান্ডে ঢুকল। মূলত: ইনফ্যা¾ট্রী নির্ভর পোল্যান্ড লড়তেই পারল না। তিন সপ্তাহেই যুদ্ধ শেষ। প্রায় দুই হাজার আধুনিক জার্মান বিমানের বিরুদ্ধে ছিল প্রায়-অবসরপ্রাপ্ত ৪০০টি পোলিশ বিমান। যুদ্ধের প্রথম দিনের হানাতেই সেগুলি ধ্বংস হয়। সারা আকাশ জার্মানীর হাতে। বিমান আক্রমণ  করে তারা সব পথ-ঘাট-সেতু-রেলইয়ার্ড ভেঙে দিলে পোলিশ সেনাবাহিনী বহুক্ষেত্রে রণাঙ্গনেই পৌঁছতে পারল না। ঐ যুদ্ধেই স্টুকা ডাইভ বোম্বারের কেরামতি টের পেল সারা দুনিয়া। ইনফ্যা¾ট্রী আর সাঁজোয়া বাহিনীর সাথে হাতে হাত মিলিয়ে আক্রমণ। এমনটি আর দেখা যায় নি।

স্টুকা অর্থাৎ জাংকার৮৭ বিমান প্রথম ওড়ে ১৯৩৫-এ। জার্মানীর ব্লিৎসক্রীগ যুদ্ধকৌশলের সাথে একেবারে মিশে আছে এই বিমান। এর প্রধান অ্যাডভান্টেজ ছিল এর অটোপাইলট। সেই লিভার চাপলে প্লেনটি নিজে থেকেই ডাইভ শুরু করে এবং বোমা ফেলবার পর ঐ অটো পাইলটই প্লেনটিকে আবার আকাশমুখী করে, ফলে পাইলট ঐ ডাইভ দেবার সময় লক্ষ্যভেদেই পুরো মন:সংযোগ করতে পারেন। স্টুকা খুব অল্প দৌড়েই টেক অফ করতে পারতো, তাই ফ্রন্টলাইনের কাছে তৈরী যেমন তেমন আধাখেঁচড়া রানওয়ে থেকেও দিব্যি উড়তে পারতো এই প্লেন। রণাঙ্গনে একই দিনে দশবার হানা দিতেও অসুবিধে হতো না। আর হিটলারের পরামর্শ মতন স্টুকায় লাগানো হলো একটা সাইরেন। ডাইভ দিয়ে পড়ছে স্টুকা তার সাথে কান ফাটানো চিল চিৎকার। অনেক বিমানবিধ্বংসী  গোলন্দাজ ভয়েই কামান ছেড়ে দৌড়ে পালিয়ে যেতেন।

তুলনায় ভারী বম্বারের চাই একেবারে পাক্কা রানওয়ে এবং যেহেতু তখন বম্বসাইটের নিতান্ত শৈশব, তাই অনেকটা উপর থেকে নিক্ষিপ্ত বোমায় লক্ষ্যভেদ হত খুবই কম। রেল সেতু, কালভার্ট ,সড়কের চৌমাথা - এই ধরনের ছোটো লক্ষ্যবস্তুকে আঘাত করতে তাই স্টুকার মতন ডাইভ বম্বার ছাড়া গতি নেই। তবে স্টুকার গতি ও ক্ষিপ্রতা দুটোই বেশ কম ছিল। তাই সেই সময়ের অন্য কোনো ফাইটারের সাথে ডগ ফাইট হলে স্টুকা এঁটে উঠতে পারত না।

রাশিয়াও সেই পথেই হেঁটেছিল। কোনো ভারী বোমারু তার ছিল না। বিশ্বযুদ্ধের আগাগোড়াই রাশিয়া শুধু তার পদাতিক সেনার জন্য গ্রাউন্ড সাপোর্ট বিমান (মুখ্যত:) বানিয়ে এসেছে। আর বানিয়েছিল অতিকায় পণ্যবাহী বিমান। এগুলির সাহায্যে দূরের ফ্রন্টলাইনেও রসদ সরবরাহ অব্যাহত রাখতে পারত।


১৯৪০ :

. . . when I look round to see how we can win the war I see that there is only one sure path . . . and that is absolutely devastating, exterminating attack by very heavy bombers from this country upon the Nazi homeland. We must be able to overwhelm them by this means, without which I do not see a way through.

— British Prime Minister Winston Churchill in a letter to Minister of Aircraft Production, Lord Beaverbrook, July 1940.

এই সালটি বিমান বনাম বিমানের আকাশযুদ্ধের। এত বেশীসংখ্যক বিমানের ডুয়েল এত দীর্ঘদিন ধরে ,আর কোন যুদ্ধেই হয় নি - হবেও না। বছরের মাঝামাঝি হিটলার আয়োজন করছেন ব্রিটেন অভিযানের। তাঁর পয়লা নম্বর অ্যাজেন্ডা ছিল ব্রিটেনের বিমানবাহিনীকে ধ্বস্ত করার। ফ্রান্স,নেদারল্যান্ড,বেলজিয়াম,পোল্যান্ড,চেকোস্লোভাকিয়া - একের পর এক দেশকে নিমেষে হারিয়ে জার্মানী তখন আত্মবিশ্বাসের তুঙ্গে, তায় বিমান বাহিনীর সর্বাধিনায়ক ছিলেন গোয়েরিং, যাঁর আত্মতুষ্টি প্রায় খোয়াব দেখার মতই ছিল।

হিটলার যতোটা ট্যাঙ্ক বা জাহাজ নিয়ে মাথা ঘামাতেন ততোটা বিমান বাহিনী নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন না। যার ফলে জার্মানীর বিমান বাহিনী কোনোদিনই খুব স্ট্র্যাটেজিক ভূমিকা পালন করতে পারে নি। এক তো উপযুক্ত বিমানের অভাব। দূরপাল্লার এবং আধুনিক প্রযুক্তির ভারী ও মাঝারী বিমান তখন জার্মানীর ছিল না। দূরপাল্লার ফাইটারও নয়। উত্তর ফ্রান্সের বিমানপোত থেকে ইংলন্ডে আঘাত হেনে ফিরে যেতে সময় লাগে প্রায় এক ঘন্টা আর তখনকার এম ই ১৯০ ফাইটার নাগাড়ে উড়তে পারত মাত্র আশী মিনিট। অর্থাৎ ব্রিটেনের আকাশে লড়বার সময় থাকত মাত্র কুড়ি মিনিট, আসলে আরো কম - বড় জোর মিনিট দশেক। সেই কারণেই ব্যাট্‌ল অফ ব্রিটেনের জার্মান হানাদারী লন্ডন শহর ও ইংলন্ডের দক্ষিণ পূর্ব কোণেই সীমাবদ্ধ ছিল।
ব্যাট্‌ল অফ ব্রিটেনকে যুদ্ধ না বলে ক্যামপেন বলা উচিৎ। একটা সরকারী শুরু ও শেষ আছে , কিন্তু সেটা সর্বজনগ্রাহ্য নয়।

ব্রিটেনের এয়ার চীফ মার্শাল ডাওডিং ছিলেন খুব দূরদর্শী। চার্চিলের অনুরোধ সত্ত্বেও তিনি ফ্রান্সের যুদ্ধে খুব কিপটেমি করে তাঁর ফাইটার প্লেন ছেড়েছিলেন। এমন কি জাহাজের কনভয় রক্ষার জন্যও তিনি আদৌ দরাজহস্ত ছিলেন না। এর ফলে যুদ্ধের শুরুতেই ব্রিটেনকে ফাইটার বিমানের সঙ্কটে পড়তে হয়নি। অগাস্ট নাগাদ যুদ্ধ বেশ জমে উঠলো। ক্ষয়ক্ষতি জার্মানীরই বেশী। যুদ্ধশেষে দেখা যাবে যে, প্রতিটি ভূপাতিত ব্রিটীশ বিমানের তুলনায় প্রায় দুটি করে জার্মান বিমান ধ্বংস হয়েছে।

এর একটি প্রধান কারণ ছিল রেডার। ব্রিটেনের উপকূল ঘেঁষে এইরকম বাহান্নটি রেডার স্টেশনের প্রহরামালা ছিল, যার সাহায্যে প্রায় ৭০ মাইল দূর থেকেই ব্রিটীশরা শত্রুবিমানের আগমনবার্তা পেয়ে যেত এবং উচ্চতা ও বিমানের সংখ্যাও মোটামুটি আন্দাজ করতে পারত। সেইসময় জার্মানীতে রেডার নিতান্ত শৈশবে, তাঁরা রেডারের সাথে বিমানের যোগাযোগ ভালো করে বুঝতে পারেন নি। আর এর সাথে ছিল গোয়েরিং-এর দূরদৃষ্টির অভাব। তিনি এক নির্দেশনামায় রেডার স্টেশনগুলিকে আক্রমণ করা নিষিদ্ধ করলেন। ফলে এই প্রযুক্তির সুফল ব্রিটেন স্বছন্দেই ভোগ করল। যে স্টুকা ডাইভবোমারু বিমান আগের বছর ইওরোপ কাঁপিয়ে দিয়েছিল, সেই বিমানটি এই দূরপাল্লার আকাশযুদ্ধে নেহাৎই অচল। অগাস্ট মাসেই এই বিমানটিকে তুলে নেওয়া হল। এর ফলে জার্মানীর হাতে বোমারু বিমানের সংখ্যাও প্রায় এক তৃতীয়াংশ কমে গেল।

সেপ্টেম্বরের প্রথমেই ব্রিটেন পরপর তিন রাত বার্লিনে বোমা ফেলে এল। মেঘে ঢাকা আকাশে অনেক উপরে ওড়া ব্রিটীশ বিমানগুলিতে আঁচড়ও পড়ল না, কেননা বিমানবিধ্বংসী কামানের গোলারা অতদূর যেত না। বার্লিনের ক্ষতি হল সামান্যই। কিন্তু এর ফলে জার্মানীর প্রতি আক্রমণ শুরু হয়ে গেল লন্ডনের উপর। সাতই সেপ্টেম্বর প্রায় হাজার খানেক বিমান উত্তর ফ্রান্সের বিমানবন্দর থেকে উড়ান শুরু করল। ডাউডিং প্রমাদ গুনছেন - এত বড় আক্রমণ সামাল দেবেন কি করে? রেডারে দেখলেন ঐ  বিমানের বিশাল আর্মাডা লন্ডনের দিকে মোড় নিয়েছে। ডাউডিং নিশ্চিন্ত হয়ে বললেন "এটা একটা মির‌্যাকল।'

সন্ধ্যা পাঁচটা নাগাদ লন্ডন আক্রান্ত হল। নগরীর পূর্ব প্রান্ত ও মাইলের পর মাইল জুড়ে বন্দর জ্বলে খাক হয়ে গেল। টেমস নদীতেও আগুন জ্বলল,পেট্রলের ট্যাঙ্কার পুড়ে। প্রায় দুই হাজার মানুষ হতাহত। রাতের বেলায় দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকা লন্ডনের উপর আবার হানা দিল প্রায় আড়াইশো বোমারু।

এবং ব্রিটেন বেঁচে গেল। কেননা আর বেশীদিন টানবার মতন যথেষ্ট বিমান ও বৈমানিক ব্রিটেনের ছিল না। এর আগে জার্মানী ব্রিটেনের বিমানপোত, এই যুদ্ধের অপারেশন কেন্দ্রগুলি, কভে¾ট্রীর কলকারখানা - এই সব সামরিক দিক দিয়ে তাৎপর্যপূর্ণ লক্ষ্য টার্গেট করেছিল। খোদ লন্ডন শহরে পার্লামেন্ট হাউস আর বাকিংহাম প্যালেসে বোমা পড়লেও সেগুলির সামরিক মূল্য কিছুই ছিল না।

একটানা লন্ডন শহরে বোমা ফেলবার জন্য জার্মানীর বোমারু বিমানের ক্ষতি এতই বেড়ে গেল যে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি থেকেই জার্মান বিমান দিনের বেলা লন্ডন আক্রমণ ছেড়েই দিল। রাতের আক্রমণে লক্ষ্যভেদ কিছুই হত না,আন্দাজে আনতাবড়ি বোমা ফেলা হত। তাতে লোকজন মারা যেত ঠিকই, কিন্তু কোন স্ট্র্যাটেজিক সুবিধা হত না। জেনারেল এডল্ফ গ্যালান্ড ছিলেন গোয়েরিং-এর বিশ্বস্ত অধস্তন। লন্ডন শহরে বোমা আক্রমণের  কারণ হিসাবে বলেছেন সার্বিক অজ্ঞতা। পরবর্তীকালে জার্মান শহরে যেরকম বোমাবর্ষণ হয়েছিলো সেই তুলনায় লণ্ডনে বোমাবর্ষণ নিতান্তই হাল্কা ধরণের। কোনো বড় নগরীর উপর এইরকম বোমারু আক্রমণও ইতিহাসে প্রথম। যার ফলে জার্মান বাহিনী জানতই না কত তাড়াতাড়ি লন্ডন আবার উঠে দাঁড়াতে পারবে। কত টন বোমা ফেললে একটি নগর ধ্বংস হয় - এই সহজ প্রশ্ন আর তার সুবিদিত উত্তর জানা ছিল না নাৎসীদের। গ্যালান্ড এও স্বীকার করেছেন যে সামরিক লক্ষ্যবস্তুর উপর আঘাত হেনে যেতে থাকলে ব্রিটেনের লড়াইয়ের ফলাফল অন্যরকম হত।

এই যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী এক ব্রিটীশ বৈমানিকের বিবরণ: "আমার হ্যারিকেন বিমানের মার্লিন ইঞ্জিন তীক্ষ্ম চিৎকার করে উঠল আর আমি ঝাঁপিয়ে পড়লাম আমার শিকার জার্মান হেইনকেল১১১ বোমারু বিমানটির উপর। আকাশে চারদিকেই বিমানগুলো উড়ছে, কিন্তু আমার সমস্ত লক্ষ্য ঐ বোমারুটির উপর। আমার ডাইভ একবারে সরলরেখায় বোমারুটির উপর এসে পড়ল - আমার জানলা প্রায় সবটাই ঐ বোমারুর দেহে ঢাকা পড়েছে। আমি অবাক হয়ে দেখলাম বোমারুটির যেন কোনো ভ্রূক্ষেপই নেই। পিছনে এক ফাইটার রক্ষককে নিয়ে সে দিব্যি একই গতিতে উড়ে চলেছে। আমিই ভাবলাম এই বোকাটা কেন পালিয়ে যাচ্ছে না? আমি মেশিনগানের ঘোড়া টিপলাম। আটটা মেশিনগানের গুলির ফোয়ারা একবারে বেরিয়ে এল আমার প্লেনটিকে ঈষৎ দুলিয়ে। দুসেকেন্ড ধরে গুলি চালালাম। আমার ককপিট কর্ডাইটের ধোঁয়ায় ভরে গেল। গরম তেলের গন্ধের সাথে মিশে এক  কটু মিশ্রণ। আমি দেখলাম আমার প্রথম ঝাঁকের গুলি বোমারুটিকে বিঁধেছে। আমি এবার পাশ কাটাবার জন্য দ্রুত ঘুরবার সময় দেখতে পেলাম বোমারুটির থেকে আগুনে শিখা বেরিয়ে আসছে এবং ঘুরতে ঘুরতে সেটি মাটিতে আছড়ে পড়ছে। .. দূর দিগন্তে বিলীয়মান দুটি শত্রু বিমানকে তাড়া করে আমি খোদ লন্ডন শহরের উপরে এসে পড়লাম। স্পষ্টই দেখছিলাম রাস্তাগুলি। কেনসিংটন গার্ডেনের সবুজ প্রান্তরও চোখে পড়ল। সেই সময় আকাশে এক অদ্ভুত উড়ন্ত " মিছিল ' চোখে পড়ল। একটি জার্মান হেইনকেল১১১ বোমারু আর তাকে পিছন থেকে তাড়া করে আসছে আমাদের এক হ্যারিকেন ফাইটার আর ঠিক তার পিছনেই পরপর দুটি জার্মান এমই১০৯ ফাইটার। সামনের বোমারু টের পায় নি তার পিছনের শিকারী হ্যারিকেনকে আর হ্যারিকেনটিও বুঝতে পারেনি তার পিছনেই দুই শিকারী ফাইটার। জার্মান ফাইটার দুটির গতিপথ আমার থেকে একটু তেরচা ভাবে। আমি একটু ঘুরে ডাইভ দিলাম আর মেশিনগান চালালাম। আটটি মেশিনগানের বুলেটের স্রোতের ভিতর দিয়ে চলে গেল প্রথম এমই১০৯ এবং মুহূর্তে টুকরোটুকরো হয়ে ভেঙে গেল। দ্বিতীয় এমই১০৯টি একেবারে শেষ মুহূর্তে অসাধারণ ক্ষিপ্রতায় পাশ কাটিয়ে চলে গেল নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে। আর এই সময়েই কপালগুণে আমার চোখ পড়ল আমার বিমানের রিয়ারভিউ মিররের উপর। দেখি একটা ঘাতক জার্মান ফাইটার একেবারে আমার ঘাড়ের উপর এসে পৌঁছেছে । একনিমেষেই আমি যথাসম্ভব দ্রুততায় বিমানকে উপরে তুলে আনলাম আর দেখলাম শেষ মুহূর্তে সেই জার্মান ফাইটারের বুলেটের ঝাঁক এক চুলের জন্য আমার বিমানকে স্পর্শ না করেই চলে গেলো। '

আকাশে প্রায় হাজার খানেক বিমানের দাপাদাপি। মুহূর্তের মধ্যেই শিকার হয়ে যায় শিকারী। 

স্ট্র্যাটেজিক বম্বিংয়ের এটাই শুরু। তখনো পর্যন্ত রণপন্ডিতেরা বিশ্বাস করতেন যে বোমারুদের বিরুদ্ধে কোনোভাবেই ১০০% প্রতিরোধ গড়া সম্ভব নয়। "the bomber will always get through"।  ব্রিটীশ বিমানগুলি জার্মানীর ভূখন্ডে রাত্রিবেলা যে বোমা ফেলে আসতো, বৈমানিকেদের বিশ্বাস ছিল সেগুলো লক্ষ্যের তিনশো গজের মধ্যেই পড়ত। পরে ছবি তুলে বিশ্লেষণ করে দেখা গেল যে, মাত্র এক-তৃতীয়াংশ বোমা টার্গেটের পাঁচ মাইলের মধ্যে পড়েছে, কোন কোন অঞ্চলে মাত্র এক-দশমাংশ পড়েছে মাইলে পাঁচেকের মধ্যে। অর্থাৎ ছোটোখাটো-শহরের-থেকে-আয়তনে-কম টার্গেটের উপর বোমাবর্ষণ বেশীর ভাগ সময়েই নিষ্ফল। সমস্যাটা বম্বসাইটের নয়, বৈমানিকদেরও নয়, সমস্যাটা নেভিগেশনের। শুরু হলো রেডিওবীমের সাহায্যে গন্তব্য নির্ণয়। একের পর এক নতুন ও উন্নততর প্রযুক্তি এসেছে। এবং নতুন পদ্ধতি কখনোই বন্ধ হয় নি।

এই যুদ্ধের হীরো ছিলো ব্রিটীশ ফাইটার স্পিটফায়ার। এর প্রোটোটাইপটি তৈরী হয়েছিল ১৯৩৬ সালে। এর ককপিট ছিল সে সময়ের সেরা। খুব দ্রুত উঠতে পারতো এবং এর ঘন্টায় ৩৬০ মাইল গতিও সে সময়ের রেকর্ড। দোষের মধ্যে একটি ছিল যে ফ্যুয়েল ইনজেকশনের বদলে কার্বুরেটর ব্যবহার করার ফলে মাঝ আকাশে রোল করতে গেলে প্লেনের ইঞ্জিন থেমে যেত, কিন্তু জার্মান ১০৯ বিমানে সেই সমস্যা ছিল না।

জার্মান এমই১০৯ হয়তো সমান সমানই ছিল, কিন্তু তারা যখন ইংলন্ডের আকাশে, তখন তাদের ফিরে যাবার তাড়া থাকত। অপেক্ষাকৃত দূরপাল্লার ফাইটার এমই১১০ খুব দ্রুতগতির ছিল না।


১৯৪১ :

Offense is the essence of air power.

— General H. H. 'Hap' Arnold, USAAF

Air power may either end war or end civilization.

— Winston Churchill, House of Commons, 14 March 1933



রাশিয়া ,আমেরিকা আর জাপান - এই তিন দেশ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মূল রণাঙ্গনে যোগ দিলো এই বছর। রাশিয়ার বিমানচিন্তাও ছিল জার্মানীরই মত। তাঁরা বিমানকে দেখতেন পদাতিক ও সাঁজোয়াবাহিনীর প্রতিরক্ষী হিসাবে। যুদ্ধের শুরুতে তাই রাশিয়ার হাতে যাও বা কিছু ডাইভবম্বার ও ফাইটার বিমান ছিল, বোমারু বলতে প্রায় কিছুই ছিল না। পুরো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধই রাশিয়া কাটাবে কোনো রকমের উন্নতমানের দূরপাল্লার বোমারু ছাড়াই।

১৯৪১ সালের জেনের সামরিক বিমানের ইয়ারবুকে কোনো জাপানী বিমানের কথা ছিল না। কিন্তু জাপান সেইসময়েই অনেকের মতে সেই সময়ের সেরা ফাইটার জিরো বানিয়ে ফেলেছে। সব ফাইটার বিমানের পরিকল্পনায় কতকগুলি পরষ্পরবিরোধী গুণাবলীকে ব্যালেন্স করতে হয়। যদি বর্ম ভারী হয়, তবে গতি কমবে। যদি ডানায় কামান লাগানো থাকে, তবে আক্রমণের সুবিধে, কিন্তু মধ্য আকাশে রোল করতে অসুবিধে। যদি দূরপাল্লার করতে হয়, তাহলে বিমানে বেশী কামান নেওয়া যাবে না। গতি বেশী বাড়ালে ম্যানুভেরাবিলিটি কমবে, দূরগামী করতে গেলে বড় তেলের ট্যাঙ্ক চাই অর্থাৎ আয়তন বাড়বে। জিরোর এই ব্যালানসিং ছিল দারুণ। ম্যানুভেরাবিলিটিতে সে যুগের সর্বোত্তম, দুটি মেশিনগান আর দুটি কুড়ি মিমির কামানে সজ্জিত, গতিও ভালো। ফিলিপাইনসের যুদ্ধে আকাশে জিরো ফাইটার দেখে তাজ্জব বনেছিলেন আমেরিকানরা। এত দূর আসতে পারে ঐ ছোট্টো বিমান? জাপানী বিমানকে সব সময়েই দূরপাল্লার হতে হয়েছে, আর জার্মান আর রাশিয়ান বিমান মোটামুটিভাবে ব্যবহার হত স্থলযুদ্ধের সহায়কের ভুমিকায়। আমেরিকানদের আক্রমণের মুখ্যস্তম্ভ ছিল দূরপাল্লার, অনেক-উঁচুতে-উড়তে-সক্ষম ভারী বম্বার। এছাড়া আমেরিকানরা বৈমানিকদের নিরাপত্তা নিয়ে অন্য দেশের তুলনায় বেশী চিন্তিত থাকত, তাই তাদের ফাইটার প্লেনের আদর্শ ছিলো "বুম অ্যান্ড জুম' অর্থাৎ গোলা দেগেই পালিয়ে যাও। মুখোমুখি দ্বন্দ্বযুদ্ধে এরা খুব পারদর্শী ছিল না।

অস্ত্রেও একটা তফাৎ ছিল। রাশিয়ান ফাইটার বিমানরা রকেট মেরে ট্যাঙ্ক ধ্বংস করতে পারদর্শী ছিল। আমেরিকান বিমান এয়ারাকোবরা - যেটি ল্যান্ডলীজে সোভিয়েত রাশিয়াকে দেওয়া হয়েছিল, সেটি ঐ রকেটের গুণে রাশিয়ান বৈমানিকদের হাতে একটি মোক্ষম অস্ত্র হয়েছিল। এয়ারাকোবরা কিন্তু নিজের দেশে, মানে আমেরিকায়, কল্কে পায় নি। আমেরিকান ফাইটার বিমানে সব সময়েই ভারী মেশিনগান থাকত এবং কামান প্রায় থাকতই না। জার্মান বিমানে ছিলো কামানের ছড়াছড়ি। জার্মান ফক উল্ফে ছিলো দুটো ভারী মেশিনগান, দুটি হাল্কা কামান আর দুটি ভারী কামান - যেগুলি থেকে মিনিটে সাতশো রাউন্ড গোলা ছোঁড়া যেত। তুলনায় স্পিটফায়ারের ছিল আটটি মেশিনগান। দুসেকেন্ডের বার্স্টেই যে কোনো বোমারু বিমান ধ্বংস হত।

এই বছরে নতুন বিমান এল জার্মান ফাইটার ফক উল্ফ১৯০। এমই১০৯য়ের থেকে দ্রুতগতি, উড়তেও পারে আরো বেশী দূরত্ব। ব্যস! ১৯৪৫ পর্যন্ত জার্মানী আর নতুন বিমান কিছু বানাবে না। একেবারে যুদ্ধের শেষ সময়ে নামাবে জেট ফাইটার ও বম্বার। আর অন্য মেরুতে জাপান বিশ্বযুদ্ধের পাঁচ বছরে প্রায় একশোটি নতুন মডেল এনেছিল। তবে একটা কথা - সব দেশই তাদের কয়েকটা বেসিক মডেল খাড়া করে ক্রমাগতই নানা উন্নতি করে যেত। জার্মানীও কারিগরী ও বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবন বন্ধ রাখে নি।
 
আর নতুন "আবিষ্কার' জাপানী জিরো ফাইটার। ডিসেম্বর মাসে পার্লহার্বারে জাপানী বিমান হানার পর পশ্চিমী দুনিয়ার চোখ খুলল জাপানী বিমানশক্তিকে বুঝতে পেরে। মাত্র নব্বই মিনিটের মধ্যে দুই ঝাঁকে উড়ে আসা জাপানী বিমান ডুবিয়ে দিল আঠারোটি জাহাজ যার মধ্যে পাঁচটি ব্যাট্‌্‌লশিপ। প্রায় আড়াই হাজার আমেরিকান নিহত হলেন,বারোশোর মতন জখম। বিমানের কার্যকারিতা নিয়ে আর কোন সন্দেহের অবকাশ থাকল না।


১৯৪২ - ৪৩:

Hitler built a fortress around Europe, but he forgot to put a roof on it.

— Franklin D. Roosevelt


বলা যায় বিমানের স্বর্ণযুগের শুরু, কেননা আমেরিকা এসে পড়েছে রণাঙ্গনে । তার পুরনো জমানার বিমানের বদলে নতুন প্রযুক্তির নতুন বিমান এসে পড়ল। এই দুই বছরে বহু নতুন বিমান আসবে। আর পুরনো বিমানগুলির যেগুলির সম্ভব, অনেক উন্নত সংস্করণ বার হবে। ৪২য়ের শুরুতেই আমেরিকার হাতে ফাইটার প্লেন তেমন ভালো না থাকলেও দূরপাল্লার বোমারু বিমান ছিল তুরুপের তাস। বি২৪ লিবারেটর যেতে পারত বহু দূর আর প্রায় সাত-আট টনের বোমা বহন করতে পারত। প্রয়োজনে দশ টনও। অ্যাটলান্টিকের সাগর যুদ্ধে কনভয় প্রহরায় এই লিবারেটরের ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য।

সেই তুলনায় বলা যায় মাঝারী বম্বার ছিল বি২৫ মিচেল। বোমারু হিসাবে ১.৮ টন পর্যন্ত বোমা বইতে পারত। এই বিমানের একটা সম্পূর্ণ আক্রমণাত্মক সংস্করণও ছিল। তাতে থাকত একটা ৭৫ মিমি কামান যা তখনকার দিনের ভারী ট্যাঙ্কে থাকত, এ ছাড়া ছিল আটটা ভারী মেশিনগান। ভিয়েতনাম থেকে শুরু করে আফঘানিস্তানের যুদ্ধে ব্যবহৃত গানশিপের জনক বলা যায় এই ভার্শনটিকে।।

 ৪২-এর জুন মাসে ষোলটি মিচেল বোমারু বিমান উত্তর প্রশান্ত মহাসাগরের বিমানবাহী জাহাজ থেকে উড়ে গিয়ে টোকিয়োতে বোমা ফেলে চীনে অবতরণ করে। এর আগে মনে করা হত টোকিয়ো সম্পূর্ণভাবে আমেরিকার বোমারুদের আওতার বাইরে। জাপানের আত্মবিশ্বাস টলিয়ে দিয়ে এই হানাদারি ছিল জেমস বন্ডের অ্যাডভেঞ্চারের মতই চমকপ্রদ।

কিন্তু এই দূরপাল্লার বিমানের সাথে উড়ে যাবার মত প্রহরী ফাইটার কই? এই সময়েই চিন্তা শুরু হল স্বয়ংসম্পূর্ণ বোমারু বিমানের। "নিজের প্রতিরক্ষা নিজেই করুন' এই থিওরী মত ১৯৪৪ সালে আসবে সুপারফর্ট্রেস বি২৯ বোমারু বিমান। আমেরিকা মন দিল ভালো ফাইটারের উপর। যেহেতু আমেরিকার লড়াই ছিল জাপানের সাথে সাগরযুদ্ধে এবং জার্মানীর সাথে ভূখন্ডের উপর, তাই আমেরিকার জাহাজ থেকে উড়ানে সক্ষম ফাইটার প্রয়োজন ছিল, প্রয়োজন ছিল ল্যান্ডবেসড ফাইটারও। যুদ্ধের শুরুতে আমেরিকান  নৌবহরের ছিল ওয়াইল্ডক্যাট ফাইটার যা জাপানী জিরোর ধারে কাছে যেতে পারত না। ৪২'এ তাই এসে গেল হেলক্যাট। ৪৩ সাল থেকে নেভীতে এবং যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত এটাই ছিল আমেরিকান নৌজঙ্গী বিমানের মূল স্তম্ভ। আমেরিকানদের হাতে শেষ তিন বছরে ভূপাতিত প্রায় সাড়ে ছয় হাজার জাপানী বিমানের মধ্যে প্রায় পাঁচ হাজার বিমানের মৃত্যু হয়েছিল এই হেলক্যাটের "হাতেই'।

এর সাথে সাথে তৈরী হচ্ছিল করসেয়ার জঙ্গী বিমান। জাপানীরা বলত "মৃত্যুর শিস'। এর ডানাগুলি ছিল অদ্ভুত। অনেকটা সীগাল পাখীদের ডানার ঠিক উল্টোটা অর্থাৎ প্রথমে নীচু হয়ে আবার উঁচু হয়েছে। করসেয়ার ছিল সেই সময়ের দ্রুততম বিমান যেটি প্রথম ঘন্টায় ৪০০ মাইলের বেশী গতি অর্জন করে। তবে এর দুর্বলতা ছিল যে খুব বেশী উচ্চতায় এটি তেমন লড়তে পারত না। আর অদ্ভুত ডিজাইনের জন্য এর "নাক' সব সময়েই উঁচু হয়ে থাকত যার ফলে টেকঅফ ও ল্যান্ডিং-এর সময় বৈমানিকের দৃষ্টি অনেকটা ব্যাহত হত। তাই বিমানবাহী জাহাজের পক্ষে এটি অনুপযুক্ত ছিল। কিন্তু এই বিমানটির নাকউঁচু হবার যথেষ্ট কারণ ছিল। মাত্র ১৮৯টি করসেয়ার বিমান ধ্বংস হয়, বিনিময়ে এই বিমানের বৈমানিকরা ২১৪০টি শত্রু বিমান ধ্বংস করেন। এইরকম "কিল রেশিও' আর কোন বিমান অর্জন করতে পারে নি।

পি৩৯ এয়ারাকোবরার ইতিহাসও খুব চিত্তাকর্ষক। এটি বেশ ওজনে ভারী এক জঙ্গী বিমান। না পারত দূরে যেতে, উপরে উঠবার (ক্লাইম্বিং রেট) ক্ষমতাও ছিল খুব কম এবং খুব উঁচুতে উড়তেই পারত না। আমেরিকা এই বিমান প্রায় হাজার পাঁচেক  ধরিয়ে দিল রাশিয়াকে। ল্যান্ডলীজ প্রোগ্রাম। আর পূর্ব ফ্রন্টের লড়াইতে দারুণ কেরামতি দেখাল এই বিমান। রাশিয়ানরা বরাবরই লড়াই করেছেন ইনফ্যা¾ট্রী ও সাঁজোয়া বাহিনীর সাথে গ্রাউন্ড-সাপোর্ট বিমান নিয়ে। সেই মত তাঁরা এয়ারাকোবরায় লাগালেন ৩৭ মিমির এক কামান - সেই সময়ে অত বড় কামান আর কোনো ফাইটার বিমানে ছিল না। তাছাড়াও দুটি হাল্কা আর দুটি ভারী মেশিনগানও মজুত থাকত। ফ্লাইং আর্টিলারীর একেবারে হদ্দমুদ্দ।

এ ছাড়াও রাশিয়ার হাতে ছিল কিংবদন্তীর ইলিউশিন দুই। যার পোষাকী নাম ছিল প্রচুর। রাশিয়ানরা বলত "উড়ন্ত ট্যাঙ্ক'। আরো বলা হত "কংক্রীট বম্বার', "লৌহ গুস্তাভ', "কালো মৃত্য'¤ বা স্রেফ "কসাই'। প্রায় আধইঞ্চি পর্যন্ত পুরু লৌহবর্মাবৃত এই বিমানের মুখ্য অস্ত্র ছিল তার ভারী কামান। রকেটও থাকত কিন্তু রাশিয়ান রকেট তখনও খুব নির্ভরযোগ্য হয়ে ওঠে নি। মাটির থেকে মাত্র শ দেড়েক ফীট উঁচুতে উড়ে যেত এই বিমান। শ্লথগতির জন্য জার্মান ফাইটারের ছিল সহজ শিকার - ক্বচিৎ কখনো ডগ ফাইটে জিতেছে শত্রু ফাইটারের সাথে। কিন্তু ট্যাঙ্ক শিকারে ছিল অনন্য। এক ঝাঁক ইলিউশিন টু কার্স্কের লড়াইতে ৭০টি জার্মান ট্যাঙ্ক ধ্বংস করেছিল মাত্র কুড়ি মিনিটে। কুড়ি থেকে তিরিশটি ইলিউশিনটু বিমান একসাথে ঝাঁক বেঁধে টহল দিত - শত্রু ট্যাঙ্ক সামনে পড়লে রেহাই দিত না।

এই বিশ্বযুদ্ধের সেরা ফাইটারের স্বর্ণপদক? বিতর্ক চলতেই থাকবে, কিন্তু সব থেকে বড় দাবীদার বোধহয় পি৫১ মুস্টাং। ১৯৪০ এপ্রিল মাসে বৃটীশ পার্চেজ কমিশন আমেরিকার নর্থ আমেরিকান কম্পানীতে হাজির হলেন। উদ্দেশ্য ব্রিটেনের জন্য সেসময়ের আমেরিকান ফাইটার পি৪০ কার্টিস ফাইটার বিমান তৈরী করে দিতে হবে। এমন আউটসোর্সিং সেকালে খুবই চলত!  নর্থ আমেরিকান কম্পানীর প্রধান জে এইচ কিন্ডেলবার্গার জানালেন কার্টিস কেন? তার থেকেও অনেক ভালো বিমান তাঁরা গড়ে দেবেন। ব্রিটীশরা তাতে রাজী, কিন্তু তাঁদের আব্দার মাত্র তিন মাসেই প্রোটোটাইপ করে দিতে হবে। এবং সেই আমেরিকান কোম্পানী অসম্ভবকে সম্ভব করলেন ১১৭ দিনে মডেল তৈরী করে। বেশ কয়েকটি টেস্ট ফ্লাইটে তেমন আশানুরূপ ফল পাওয়া গেল না। চাই শক্তিশালী ইঞ্জিন। ব্রিটীশ জঙ্গী বিমান স্পিটফায়ারে থাকত রোলস রয়েসের মার্লিন ইঞ্জিন, এটি লাগাতেই মুস্টাং হয়ে গেল অপ্রতিরোধ্য। বেশ কয়েকটি মডেলের পর যেটি আকাশ কাঁপাল সেটি ৪২-এর সেপ্টেম্বরের পি৫১বি। সর্বোচ্চ গতি ঘন্টায় ৪৪০ মাইল। ২০০০০ ফীট উচ্চতায় উঠতে সময় নিত ছয় মিনিটেরও কম এবং ৩০০০০ ফীট উচ্চতায়ও স্বচ্ছন্দে উড়তে পারত - সে সময়কার হিসাবে একেবারে অদ্বিতীয়।

আরেকটি আমেরিকান ফাইটার বম্বার খুব নাম করে, সেটি থান্ডারবোল্ট। Size does matter ! বিশ্বযুদ্ধের সব থেকে বড় ও ভারী সিঙ্গল পাইলটের বিমান। এক বৈমানিক বলেছিলেন "মনে হচ্ছে, একটি বাথটাব নিয়ে আকাশে উড়ছি!' কিন্তু বোমা রকেট আর আটটি মেশিনগানে সজ্জিত এই বিমান ইওরোপে অজস্র ট্যাংক,রেলওয়ে ইঞ্জিন,কোচ,সাঁজোয়া গাড়ী ধ্বংস করে ট্যাঙ্কবাস্টার নাম অর্জন করে। মুখোমুখি আকাশ লড়াইতে থান্ডারবোল্ট অবশ্য খুব পটু ছিল না।

এই সময়ে ব্রিটেন দুটি নতুন বোমারু বিমান আনল। আর বাদ দিয়ে দিল পুরনো জমানার স্টার্লিং আর ওয়েলিংটন বিমান।
একটি হল অ্যাভ্রো ল্যানকাস্টার। সব থেকে বেশী বোমা নিয়ে যেতে পারত এই বিমান। সেই সময়ে ব্রিটীশ বম্বার কম্যান্ড মাথা ঘামাচ্ছেন খুব ভারী বোমা নিয়ে। তৈরী হয়েছে সাড়ে পাঁচ টনের টলবয়। সেখানেই থেমে নেই - আরো তৈরী হলো দশ টন ওজনের গ্র্যান্ডস্ল্যাম বা ভূমিকম্প বোমা। তত্ত্ব ছিল বড় সেতু বা বাঁধ ভাঙতে হলে হিসাব কষে একটু দূরে এই দশটনী ভূমিকম্প বোমা ফেলতে হবে। মাটির কিছুটা নীচে গিয়ে এই বোমা ফাটলে ফলাফল হবে ঠিক একটা ছোটখাট ভূমিকম্পের। বাস্তবে হয়েও ছিল তাই। ৪৩ সালে রুর উপত্যকায় এই "ড্যামবাস্টার' বোমা অনেকগুলি ড্যামকে ধ্বংস করেছিল। এই সব ভারী বোমার জন্য জরুরী ছিল ল্যান্‌কাস্টারের। তবে এই অত্যন্ত শ্লথগতির বিমানটির গড়পড়তা আয়ু ছিল বেশ কম। সেই সময়ের সবথেকে সেরা নেভিগেশনাল প্রযুক্তি (এইচ টু এস) এই বিমানে ছিল।

এই ৪২ সালেই একটি নতুন মাঝারী বম্বার - নাম মসকুইটো - এল ব্রিটীশ বম্বার কম্যান্ডে। কোন প্রতিরক্ষী গোলন্দাজ নেই, তাই বেশ হাল্কা। ক্ষিপ্রতা প্রায় ফাইটার বিমানের মত। তবে যেখানে ল্যান্‌কাস্টার প্রায় দশ টন বোমা বইতে পারত, মসকুইটোর ক্ষমতা ছিল দুই টনেরও কম। রাতের বেলা বম্বিং রেইডে এই বিমান ছিল সব সেরা। কেন না জার্মান নাইটফাইটারদের তুলনায় এর স্পীড বেশী ছিল। তাই পুরো যুদ্ধেই মসকুইটোর ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল সব থেকে কম। কিন্তু পাত্তা পায় নি মসকুইটো। আসলে ব্রিটীশ বম্বার কম্যান্ড তখন শুধু কত বেশী বড় বোমা ফেলে আসতে পারবে এই প্রতিযোগিতায় মেতেছে। ব্রিটীশ ভারী বোমারুদের প্রচুর সংখ্যক জার্মান শিকার হলেও তাঁরা সিদ্ধান্ত পালটান নি, মসকুইটো তাই কামান দাগাতে প্রথম সারিতে পাত পায় নি।

প্রশান্ত মহাসাগরের লড়াই শুরু হয়ে গেছে জোর কদমে। প্রথমে কোরাল সীর যুদ্ধ যেখানে জাহাজে জাহাজে যুদ্ধ হবে শুধুই দুই পক্ষের বিমানের। সেই প্রথম। জুন মাস নাগাদ হল মিডওয়ের লড়াই যেখানে দুনিয়া কাঁপানো পাঁচ মিনিটের মধ্যে তিনটি (এবং অবশেষে আরো একটি) জাপানী বিমানবাহী জাহাজের সলিলসমাধি হবে। অতিকায় জার্মান ব্যাট্‌লশিপ বিসমার্ক সম্মুখ সমরে মাত্র তিন মিনিটে ডুবিয়ে দিল ব্রিটীশ রণতরী হুডকে। নয় মাইল দূর থেকে দাগা কামানের গোলায় টুকরো হয়ে গেল ব্রিটীশের গর্ব। হুডের সঙ্গী রণতরী প্রিন্স ওফ ওয়েল্‌স সেই যাত্রায় পালালেও অচিরেই সেও জাপানী বোমায় ডুবে যাবে। বাঁচবে না বিসমার্কও। তার মৃত্যুবাণও বিমানের হাতেই। ছোট্টো বিমান সোর্ডফিশ থেকে নিক্ষিপ্ত টর্পেডোয় মারাত্মক জখম হয়ে যাবে বিসমার্ক। এক এক করে আর যতো সাগরদূর্গ ছিলো - মুশাশী, ইয়র্কটাউন, আকাগী, কাগা, টির্পিৎজ  - সব কটি, সকলে, সকলেই বিমান থেকে নিক্ষিপ্ত বোমা ও টর্পেডোতে ডুবে যাবে। জাহাজ ও বিমানের লড়াই ছিল নেহাৎই একপেশে।


 ১৯৪৪ :

It is not possible . . . to concentrate enough military planes with military loads over a modern city to destroy that city.

— US Colonel John W. Thomason Jr., November 1937.

We are going to scourge the Third Reich from end to end. We are bombing Germany city by city and ever more terribly in order to make it impossible for her to go in with the war. That is our object, and we shall pursue it relentlessly.

— Arthur "Bomber" Harris, RAF.

War is a nasty, dirty, rotten business. It's all right for the Navy to blockade a city, to starve the inhabitants to death. But there is something wrong, not nice, about bombing that city.

— Marshal of the Royal Air Force Sir Arthur "Bomber" Harris


বিশ্বযুদ্ধের শেষ দুই বছর বোমারুর। আকাশে তাদেরই রাজত্ব।  দূরপাল্লার বোমারুর রাজা ছিল আমেরিকা। তাদের বি১৭, বি২৪ সিরিজের চার ইঞ্জিনের বিমানগুলির নাম ছিল ফ্লাইংফর্ট্রেস। কিন্তু নিছক নগরবিধ্বংসী বিমানের নামে দূর্গ কেন? কেন না এই বিমানগুলিতে ছিল অনেকগুলি ভারী মেশিনগান। বি১৭তে থাকত তেরোটি। ভাবা হত যে শত্রুপক্ষের ফাইটার বিমানদের এই মেশিনগান দেগে উড়িয়ে দেওয়া যাবে। সেই মত বিমানের "নাকে', মাথার উপরে,বম্ব বে'র পাশে মানে বিমানের তলপেটে, বিমানের একেবারে পিছনে, বিমানের কোমরে, সজারুর কাঁটার মত এই প্রতিরক্ষী গোলন্দাজেরা থাকত। আর বি২৯ সুপারফর্ট্রেস? এক ডজন ভারী মেশিনগান ছাড়াও ছিল একটি কুড়ি মিমির কামান। এই বিমান তৈরী হয়েছিল অনেক উঁচু থেকে দিনের বেলার বোমারু হানার জন্য, কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল অত উঁচু থেকে ফেলা বোমা খুবই লক্ষ্যভ্রষ্ট হচ্ছে জোরালো হাওয়ার জন্য। এর জন্য বি২৯ অনেক কম উচ্চতা থেকেই বোমাবর্ষণ করত। নাগাসাকি ও হিরোসিমায় পারমাণবিক বোমা এই সুপারফর্ট্রেস থেকেই নিক্ষিপ্ত হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে এগুলি নেহাৎই সাহস যোগানোর উপাদান ছিল। বিমানের প্রতিরক্ষী সেনারা শত্রু ফাইটারের বিরুদ্ধে একেবারেই অসফল ছিল। বিমানের রূপকারেরা বারবারই বলেছেন এই কামান ও গোলন্দাজ সেনাদের বাদ দিয়ে দিতে। এর ফলে বিমানের গতি বাড়বে, ক্ষিপ্রতাও। কিন্তু কোন পাইলটই এই গোলন্দাজদের বাদ দিতে রাজী হন নি। তাই যুদ্ধের শেষদিন পর্যন্ত এই গোলন্দাজরা বহাল ছিল। আর কেমন ছিল এই বৈমানিকরা? নেহাৎই বাচ্চাছেলের দল। এই সুবিশাল মারণযন্ত্র চালাতো যারা, তারা বেশীরভাগই পঁচিশের নীচে। আঠারো উনিশ বছরের তরুণও ছিল যথেষ্ট সংখ্যায়।

জার্মানীর নগরে নগরে শুরু হল মিত্রপক্ষের বিমানহানা। একসাথে হাজার বোমারুর হানা। বিমানগুলি উড়ত একঝাঁকে। পাশাপাশি উড়ে যাওয়া দুই বিমানের পাখার প্রান্ত ছুঁয়ে যেত পরষ্পরকে। হ্যাঁ, মাঝেমাঝেই ঠোকাঠুকি লেগে যেত দুই বিমানে, বিশেষত: মেঘলা দিনে। খুব কড়া ফর্মেশনে উড়ে যেত ঐ ঝাঁক। কেননা তখনকার দিনের রণনীতি অনুযায়ী বোমারু হানার সাফল্য নির্ভর করত ঐ ফর্মেশনে উড়ে চলার উপর। আসলে তখনো প্রিসিশন বম্বিং খুব উন্নত হয় নি, তাই লক্ষ্যভেদের জন্য ঐ রকম ঝাঁকে ঝাঁকে বোমার উপর নির্ভর করতে হত। এর পোষাকী নাম ছিল কার্পেটবম্বিং।  লক্ষ্যস্থলের কাছে এলেই শুরু হতো নীচ থেকে বিমানবিধ্বংসী  কামানের গোলাবাজি। তখন সব বোমারু বিমানই চাইতো কত তাড়াতাড়ি বোমা ফেলে পালিয়ে আসা যায়। কিন্তু ফর্মেশন ভাঙার উপায় ছিল না। ধীরগতিতে উড়ে যেত বিমানের দল। যেন আকাশে বিমানের প্যারেড চলছে। পাইলট নয়, বোমা চালক (bombardier) সেইসময়ে বিমানের অধিনায়ক। বোমা ফেলবার পর পাইলট আবার মুখ্য বৈমানিকের দায়িত্ব পাবেন। এই বিশাল মৃত্যুদূতদের জীবন কিন্তু দীর্ঘ ছিল না। গড়ে পঁয়ত্রিশবার উড়তে পারত। বিমানবিধ্বংসী গোলা বা শত্রু পক্ষের ফাইটার বিমান - কেউ না কেউ ছিনিয়ে নিত বোমারু আর তার বাসিন্দাদের।

বছরের শুরুতে ফেব্রুয়ারী মাসে আমেরিকা তাদের প্রথম একটা বড় রকমের বোমারু হানা দিল খোদ জার্মানীতে। ছয়দিনের এই আক্রমনের নাম ছিল "বিগ উইক'। তো এই বড় সপ্তাহেই প্রথম আমেরিকান বোমারু বিমান জার্মান ফাইটারের মুখোমুখি হল - তাও আবার জার্মানীর বুকের উপরেই। প্রায় আড়াইশো আমেরিকান বোমারু বিমান ধ্বংস হল প্রায় পাঁচশো জার্মান ফাইটারের বিনিময়ে। জার্মানীর উৎপাদনক্ষমতা বিপর্যস্ত হল ঠিকই, কিন্তু সেটা নেহাৎই সাময়িক। আমেরিকান বোমাগুলি খুব ভারী ছিল না। তাই নতুন করে উৎপাদন শুরু করতে দেরী হয় নি। কিন্তু জার্মানীর পক্ষে সবথেকে বড় লোকসান হল তার পাইলটদের মৃত্যু। এই অভিজ্ঞ পাইলটদের বদলে নতুন প্রশিক্ষিত বৈমানিকদের দ্রুত রণাঙ্গনে নিয়ে আসবার ব্যবস্থা তখন জার্মানীর আর ছিল না।

পূর্ব ফ্রন্টে রাশিয়া আর জার্মানীর লড়াই কিন্তু মূলত: ছিল ট্যাঙ্কের লড়াই। বিমানের ভূমিকাও ছিল ট্যাঙ্ক বিধ্বংসীর।  ইওরোপে বিমানের এই "ট্যাঙ্কবাস্টার' হিসাবে আত্মপ্রকাশ হবে '৪৪ সালে নরম্যান্ডি ল্যাণ্ডিংয়ের পর। দক্ষিণ ফ্রান্সে ঘন ঝোপ ও উঁচুনীচু জমি ট্যাঙ্ক লড়াইয়ের পক্ষে আদর্শ ছিল না, যেমন ছিল রাশিয়ার বিস্তীর্ণ তৃণভূমি। যুদ্ধ শেষে দেখা যাবে বেশীরভাগ জার্মান ট্যাঙ্কই ধ্বস্ত হয়েছে ব্রিটীশ আর আমেরিকান বিমানের হাতে। প্রায় জার্মান ১৫০০ ট্যাঙ্কের মধ্যে লড়াই শেষে বেঁচে ছিল মাত্র শ'খানেক ট্যাংক।

এই বছরে বিমানযুদ্ধে নতুন অবদান অবশ্য বিমানের নয়, বোমার। ব্রিটেন খুব ভারী বোমা, যেমন সাড়ে পাঁচ টনের টলবয় বা ভূকম্পনবোমার সাহায্যে বিভিন্ন জায়গায় বোমা ফেলে দারুণ সাফল্য অর্জন করে। নরম্যান্ডী ল্যান্ডিংয়ের পর যখন জার্মান সেনারা দ্রুত ছুটে আসছে প্রতি আক্রমণের জন্য, তখন তাঁদের লয়েরে অঞ্চলে একটি সুড়ঙ্গ পার হয়ে আসতে হত। এই সউমুর (Saumur) টানেল ছিল যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ল্যানকাস্টার বিমান থেকে ফেলা টলবয় বোমার আঘাতে সম্পূর্ণ ভাবে চূর্ণ হয়ে যায় এই টানেল। প্যানজার বাহিনী আর রণাঙ্গনে  পৌঁছতেই পারে নি। অনেক উপর থেকে - প্রায় আঠারো হাজার ফীট উচ্চতা থেকে - এই বোমাগুলি ফেলা হত। যাতে লক্ষ্যভ্রষ্ট না হয়, সেই জন্য এদের আগে থাকত পথপ্রদর্শক বিমান (প্রথমে মসকুইটো এবং পরে কখনো কখনো মুস্টাং বিমান)। এই দ্রুতগামী বিমানগুলি খুব নীচু থেকে লক্ষ্যবস্তুর চারিদিকে হয় ধোঁয়াবোমা (দিনের বেলা) বা ইন্ডিকেটর (রাতের বেলা) ফেলে আসত । অনেক উপর থেকে ভারী ল্যানকাস্টার বিমান এই নির্দেশ দেখে তাদের বোমানিক্ষেপ করত। ফল হত আশাতীত। বোমাগুলিতে পনেরো মিনিট থেকে আধ ঘন্টা পর্যন্ত ফিউস লাগানো হত। অত উপর থেকে অত ভারী বোমা পড়ে মাটির ভিতর ঢুকে যেত। তারপর বিস্ফোরণে ফল হত ছোটখাট ভূমিকম্পের। তাই এর নাম ছিল ভূমিকম্পবোমা। এই টলবয়ের আঘাতে ডুবে যাবে টির্পিৎজ - জার্মানীর অতিকায় ব্যাট্‌লশিপ। বম্বার কম্যান্ড আরো চূর্ণ করে দেবে রুর উপত্যকার Mohene dam। এই থেকেই ৬১৭ স্কোয়াড্রনের আদুরে নাম হয় "ড্যামবাস্টার'। ৪৪ সাল থেকে শুরু করে যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত এই টলবয় ও সবথেকে ভারী দশটনী ওজনের গ্র্যান্ডস্ল্যাম বোমা ফেলে জার্মানীর বিশাল বিশাল কংক্রীটের (কখনো প্রায় তেইশ ফীট পুরু) ঢাকনা দেওয়া ঘাঁটিগুলো ধ্বংস করা হয়েছিল। জার্মানরা ভেবেছিল সে সময়ের কোন প্রযুক্তিতেই অত পুরু ফেরোকংক্রীটের সুরক্ষা বিনষ্ট হবে না। সেই মতন ভিটু রকেট ওই বোটের ঘাঁটি করে রেখেছিল এই ছাতার নীচে। কিন্তু টলবয়ের আঘাতে ঐ বিশাল ফেরোকংক্রীটের স্ট্রাকচারগুলি ভেঙে চুরমার হয়ে যায়, একটিও রক্ষা পায়নি। প্রথম দশটনী বোমা ফেলা হয় আর্নসবের্গের ভায়াডাক্টের রেলওয়ে সেতুর উপর। জলাভূমির উপর তৈরী করা ঐ কংক্রীটের সেতুটি ছিল বিশাল অনেকগুলি খিলানের উপর। বার বার টলবয় ফেলেও কিছু ক্ষতি করা যায় নি। অবশেষে একটি গ্র্যান্ডস্ল্যাম বোমা ফেলা হল। মাটির প্রায় একশো ফীট নীচে ঢুকে সেটি বিস্ফোরিত হলে অনেকগুলি খিলানের ভিত মাটিতে ঢুকে যায় - সেতুটি ধ্বংস হয়।

এই বছরের জুনমাসে এই বিশ্বযুদ্ধের শেষ ফাইটারের লড়াই হল। প্রশান্ত মহাসাগরের সাইপান দ্বীপ দখল করে নিল আমেরিকান নৌবহর। তাদের হাতে, ছোটো বড় মিলিয়ে পাঁচশো জাহাজ আর প্রায় হাজার খানেক যুদ্ধ বিমান। জাপানের ভাঁড়ার তখন প্রায় শূন্য হয়ে এসেছে। অ্যাডমিরাল ওজোয়া দেখলেন আমেরিকান ফাইটারের তুলনায় তাঁর একটিই অ্যাডভান্টেজ - আমেরিকান বিমানেরা বর্মাবৃত বলে তাদের যুদ্ধের দৌড় ২০০ মাইল পর্যন্ত ,তুলনায় জাপানী বিমানেরা আদৌ বর্মে সুরক্ষিত ছিল না, হাল্কা এই বিমানেরা ৩৫০ মাইল পর্যন্ত উড়তে পারত। ওজোয়া, তাই তাঁর সবেধন শপাঁচেক বিমানকে রাখলেন তিনশো মাইল দূরে। আমেরিকান বিমানের হাতের বাইরে। প্ল্যান ছিল জাপানী বিমানেরা আমেরিকান ফ্লীট আক্রমণ করে ফিরতি পথে গুয়াম দ্বীপে নেমে আবার তেল ভরে ফিরে আসবে। পরিকল্পনা তো ভালোই ছিল। কিন্তু শেষরক্ষা হল কই? রেডারের মারফৎ এবং জাপানী কোড পড়ে ফেলবার দরুণ জাপানীদের আক্রমণের জন্য প্রস্তুতই ছিল আমেরিকানরা। তাদের নতুন ফাইটার হেলক্যাট এবং তার বৈমানিকেরা ছিল সুশিক্ষিত। তুলনায় জাপানী বৈমানিকদের না ছিল অভিজ্ঞতা না ছিল ভালো প্রশিক্ষণ। আমেরিকানদের হাতে ছিল আরেকটি নতুন অস্ত্র। সেটি বিমান বিধ্বংসী কামানের প্রক্সিমিটি ফিউজ। গায়ে লাগানোর দরকার নেই - শত্রু বিমানের কাছে এলে আপনা থেকেই বিস্ফোরিত হবে এমন গোলা। এই দুই কারণে জাপানী আক্রমণ বৃথা গেল। এত সহজে জাপানী বিমানগুলো ভূপাতিত করা হল যে এই লড়াইয়ের নাম হয়ে গেল "দ্য গ্রেট মারিয়ানা টার্কী শুট'।  ঘায়েল হওয়া আমেরিকান বিমানের তুলনায় বারো গুণ জাপানী বিমান ধ্বংস হল। ৪৭৩টি নৌ বিমানের মধ্যে মাত্র ৩৫টি বিমান অক্ষত ছিল। এর কিছুদিন পরে জাপান ও আমেরিকার শেষ নৌসংঘাতে জাপান তার কিছু বিমানবাহী জাহাজ নিয়ে হাজির ছিল বটে, কিন্তু সেটা নেহাৎই লোক দেখানো। কেননা ঐ জাহাজগুলি থেকে উড়বার মত বিমান আর জাপানের ছিল না।

আর এই বছরের অনারেব্‌ল মেনশন? সেটি ব্রিটীশ ট্যাঙ্কবাস্টার হকার টাইফুনেরই পাওনা। প্রথম থেকেই নানান টেকনিক্যাল সমস্যা ছিল এই দ্রুতগামী বিমানটির। শেষ পর্যন্ত টিঁকল ফাইটার বম্বারের ডিজাইনটিই। দুটো পাঁচশো পাউন্ডের বোমা, আটটা রকেট আর দুটো কামান নিয়ে এই বিমানটি জার্মান সাঁজোয়াগাড়ী শিকারে পটু ছিল। তবে ঐ আরপিথ্রী রকেটের বিস্ফোরণ ক্ষমতা দারুণ হলেও লক্ষ্যভেদে সাফল্য ছিল বেশ কম। যুদ্ধের শেষে,হিসেব কষে দেখা গেছিল যে বিমানবিধ্বংসী জার্মান ট্যাঙ্কের মাত্র চার শতাংশ রকেটে ঘায়েল হয়েছে। এই টাইফুন বিমানগুলি নরম্যান্ডীর রণক্ষেত্রে সামান্য দূরে অপেক্ষমান ট্যাক্সির মত দাঁড়িয়ে থাকত। ইনফ্যা¾ট্রীর তলব হলেই ছুটে গিয়ে আক্রমণ করত।


১৯৪৫ :

I am purely evil;
Hear the thrum
of my evil engine;
Evilly I come.
The stars are thick as flowers
In the meadows of July;
A fine night for murder
Winging through the sky.

— Ethel Mannin, 'Song of the Bomber'


সেই গত বছর থেকেই সারা জার্মানী জুড়েই একটানা টেরর বম্বিং চলছে। শুধু আতঙ্ক,ধ্বংস আর মৃত্যু। শহরের পর শহরে - একটানা আকাশ থেকে আগুন ঝরে পড়া। চার্চিল বললেন "আমাদের সাগরপারের অভিযানের ভিত্তিই এই বিমান হানা। দুই যুযুধান দেশই এই বিমানশক্তিকেই তাদের বিজয়ের সবথেকে ভারী অস্ত্র হিসাবে গণ্য করেছে। এই পথেই তারা শত্রুদেশকে পদানত করতে চেয়েছিলো। আমি এই হানাদারীকে কোনভাবে যুক্তিগ্রাহ্য করবার চেষ্টা করব না, শুধু বলব এ নেহাৎই কাব্যিক প্রতিশোধ।' সেটাই শেষ কথা। জার্মানীর শহরগুলিতে যুদ্ধের শেষ তিনমাস যে তান্ডব চলেছিল প্রধানত: অসামরিক লক্ষ্যবস্তুর উপর সেটি নিছকই প্রতিহিংসা,প্রতিশোধ। যুদ্ধ জেতার জন্য কোন সামরিক কর্ম নয়।  এই একটানা নগরধ্বংসী বোমারু হানা, এই নিয়ে লেখালেখি কম হয় নি। বস্তুত: বম্বার কম্যান্ডের প্রধান আর্থার হ্যারিস, যাকে বলা হত "বম্বার হ্যারিস' এবং অবশেষে "কসাই হ্যারিস', যুদ্ধ চলাকালীনই যথেষ্ট সমালোচনার মুখোমুখি হয়েছেন। শুধু মানবিক কারণেই নয়, নৌ এবং ভূমিসেনারাও আপত্তি জানিয়েছেন এই অসামরিক লক্ষ্যের উপর বোমা ফেলায়। কেননা তাঁরা রণাঙ্গনে যথেষ্ট বিমান পাচ্ছিলেন না।  প্রায় ছাপ্পান্ন হাজার ব্রিটীশ বৈমানিক মারা যান এই হানাদারীতে। বার্লিনের উপর প্রতিটি রেইডে ব্রিটীশ বিমানবাহিনী গড়ে শতকরা ৫ ভাগ বিমান হারাত, আমেরিকানরা সাড়ে ছয় ভাগ। ব্রিটীশ বৈমানিকদের প্রতিজনের ৩৫ বার হানা দেওয়ার দায় ছিল,আমেরিকানদের ছিল মাথাপিছু পঁচিশ বার। খুব একটা বড় গণিতজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন নেই। বোঝাই যায় যে গড়ের হিসাবে বার্লিন হানাদারী বিমান ও বৈমানিকের মৃত্যু অবধারিত ছিলো। ফাঁকা মাঠে গোল কখনই দেয়নি মিত্রপক্ষের বৈমানিকরা। একটি রক্ত হিম করা পরিসংখ্যান: প্রতি একশো জন ব্রিটীশ বৈমানিকের (তাদের রেগুলেশন পঁয়ত্রিশটি উড়ানের পর) ৫১ জন নিহত হতেন, আরো নয় জন প্রাণ হারাতেন তাদের দেশের মাটিতেই, তিন জন মারাত্মক জখম হতেন,বারোজন বন্দী হতেন, একজন শত্রুদেশে ক্র্যাশল্যান্ড করেও পালিয়ে আসতে পারতেন আর মাত্র চব্বিশ জন কোনমতে তাদের পুরো অপারেশন সমাপ্ত করতেন হতাহত না হয়ে। যুদ্ধ শেষের তিন মাস আগে সম্পূর্ণ অরক্ষিত ড্রেসডেন নগরী পুড়িয়ে দেওয়ার জন্য নিউরেমবার্গে অন্যান্য যুদ্ধাপরাধীদের সাথে হ্যারিসের বিচারও দাবী করেছিলেন অনেকে।

এই সব হানা সত্ত্বেও জার্মানীর উৎপাদন বিশেষ কমে নি। সত্যি সেটি হোঁচট খেল যখন শেষ তিনমাসে মিত্রপক্ষের বিমান জার্মানীর তৈল শোধনাগারগুলিকে টার্গেট করেছিল। এর সাথে ছিল পূর্ব ফ্রন্টে রাশিয়ার একটানা অগ্রগতি, যার ফলে অনেক কাঁচামাল যোগান বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল।

ইওরোপে যুদ্ধের শেষ দু'তিনমাস আবার সেই ইনফ্যা¾ট্রীর। কি ইওরোপ কি জাপান - আকাশ তখন পুরোপুরি মিত্রপক্ষের হাতে। প্রায় বিনা বাধায় যথেচ্ছ বোমা ফেলে আসছে বোমারু বিমানেরা। জার্মানীর একের পর এক শহর জ্বালিয়ে, গুঁড়িয়ে দিচ্ছে দৈত্যাকার বিমানেরা। জ্বলছে জাপান। কোলন গুঁড়িয়ে গেল। জ্বলে খাক হয়ে গেল ড্রেসডেন আর টোকিয়ো। জাপান তার শেষ বিমানগুলি নিয়ে কামিকাজে বাহিনী গড়ে তুলেছে। আকাশের রাজপুত্র ছিল সেই সব বিমানগুলি, এখন শুধু একেকটি আগুনে বোমা, লক্ষ্যবস্তুর উপর আছড়ে পড়া ছাড়া আর কোনো কাজ নেই।

আটই মে জার্মানী আর তার চার মাস পরে জাপান আত্মসমর্পণ করলে আনুষ্ঠানিকভাবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হল। তবে এই খন্ড বছরেও বিমানযুদ্ধে কিছু যুগান্তকারী উদ্ভাবন ঘটে গেল। জেট বিমান। সব দেশই চেষ্টা করছিল, কিন্তু দৌড়ে প্রথম হল জার্মানী। জেট ফাইটার আর বম্বার নিয়ে যখন তারা মাঠে নামল তখন যুদ্ধ প্রায় শেষ।
ঐ সময়েই জার্মানী আরো নিয়ে এল বিশ্বের প্রথম (এবং সফল) এয়ার-টু-এয়ার রকেট। এর পটভূমিটা বলি - বোমারু বিমানের গতি বাড়ছিল ও তাদের গায়ের বর্মও আরো সহনশীল হচ্ছিল। কিন্তু বিমানের কামান বা মেশিনগানের ক্ষমতা সেই তুলনায় পিছিয়ে ছিল। আমেরিকান "উড়ন্ত দুর্গ' বি১৭ বোমারু বিমানকে আকাশ থেকে মাটিতে ফেলতে জার্মান ২০মিমির কামানের অন্তত ২৩টা গোলা লাগত। সেটা সম্ভবও ছিল না। ২৩টি গোলা দাগার সময় পাওয়া যেত না, তাছাড়া আমেরিকান বোমারু বিমানের গোলন্দাজরা তাদের আওতায় পেয়ে যেত জার্মান ফাইটারদের। তো সমাধান কি? আরেকটু ভারী কামান, ৩০ মিমির কামান কাজে দিল না। কারণ এই কামান ছিল অত্যধিক ভারী আর এর পাল্লাও ছিল স্বল্পদূরত্বের। মোক্ষম জায়গায় লাগলে একটি গোলাই যথেষ্ট, কিন্তু তার সম্ভাবনা বিরল। না:, আরো ভারী কামান লাগিয়ে এই সমস্যার সমাধান হয় না।

উত্তরটা হল আর৪এম রকেট। জার্মানী চিরকালই রকেট বিজ্ঞানে অন্য সব দেশের তুলনায় এগিয়ে ছিল। এ ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম হল না। এই রকেটের ওজন বেশী (প্রায় সোয়া তিন কেজি) হলে কি হবে,কামান তো আর লাগছে না। কিন্তু এই ম্যাজিক অস্ত্র এল বড্ড দেরী করে। যুদ্ধের ফলাফল তখন লেখাই হয়ে গেছে, না হলে জেট বিমান আর এই রকেট নিয়ে জার্মানী অনেকটাই এগিয়ে যেতে পারত। আর বিমানবিধ্বংসী কামান? প্রযুক্তিগত উন্নতি সেখানেও হয়েছে। যুদ্ধের প্রথম থেকেই একটি প্রতিযোগিতা চলছিল বিমান ও কামানের। বোমারু বিমান ক্রমশ: আরো উপরে ওড়ার প্রযুক্তি খুঁজছিল প্রধানত: কামানের আওতার থেকে দুরে থাকার জন্যই। আর বিমানবিধ্বংসীকামানও তার রেঞ্জ বাড়িয়ে যাচ্ছিল। জার্মানদের হাতে ছিল তাদের বিখ্যাত ৮৮মিমি কামান যেটিকে রোমেল ট্যাঙ্কবিধ্বংসীকামান হিসাবে ব্যবহার করে দুর্দান্ত ফল পেয়েছিলেন। এই কামানের প্রক্ষিপ্ত গোলার গতিবেগ দারুণ হলেও  ফায়ারিঙ রেট খুব ভালো ছিল না। যুদ্ধের শেষদিকে ব্রিটেন তাদের ৩.৭ ইঞ্চির কামানের নলের সাথে তাদের ৪.৫ ইঞ্চির কামানের দেহ জুড়ে যে হাঁসজারু কামান তৈরী করেছিল তার গোলা তখনকার দিনে সব থেকে বেশী উচ্চতায় যেতে পারত। দু:খের বিষয়,ততদিনে জার্মানীর বোমারু বিমানবহর প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। তাই এই কামানটি খুব একটা কেরদানী দেখানোর সুযোগই পায় নি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ যেমন ট্রেঞ্চ লড়াইয়ের যুগ শেষ করল, দ্বিতীয় যুদ্ধ তেমনই শুরু করল বিমানের যুগ, যার একটি সম্ভাবনার দিক ছিল হেলিকপ্টার। এই সময়েই এয়ারমোবিলিটি তত্ত্বের শুরু হয় যেখানে বিমাননির্ভর সেনারা কোনো ঘাঁটি ছাড়াই যত্রতত্র লড়াইকে নিয়ে যেতে পারবেন। সেটা অবশ্য দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে প্রয়োগ করার সুযোগ মেলেনি। কারণ বিশ্বযুদ্ধ তখন শেষ।

তবে বিশ্বযুদ্ধ শেষ হলেও যুদ্ধের তো শেষ নেই। অনেকদিন অপেক্ষার পর ভিয়েতনামের যুদ্ধে ১৯৬৫ সালে প্রথম এই তত্ত্বের প্রয়োগ হবে।  সেখানেও শেষ নয়। তারপরেও আসবে আরও নতুন নতুন বিমান। নতুন তত্ত্ব। মানুষের বিহঙ্গবাসনার অদম্য সৃষ্টিশীল তাড়নায় বিমান নামক যে উড়ানযন্ত্রটির  আবিষ্কার হয়েছিল, সে, ধ্বংসের কাজে ব্যবহৃত হয়ে চলেছে, এবং চলবে। যে ধ্বংসের কোনো শেষ আছে কিনা আমাদের জানা নেই।