আপনার মতামত         




মরা সাহেবের  টেবিল এবং অন্যান্য ভয়ঙ্কর ভয়ঙ্কর গল্প


বিক্রম পাকড়াশী



মরা সাহেবের টেবিল দিয়েই সেদিন শুরু হয়েছিলো - আসলে কি, অফিসে পরপর দুজন বড়সাহেব একই ঘরে মরে যাওয়ার পর প্রাণে ধরে এমনিতেই ওখানে আর কেউ ঢুকতে চাইছিলো না। প্রথম জন টিকলো একটি গোটা মাস, মরলো শনিবার, অফিস ছুটি হলো মঙ্গলবার। দ্বিতীয়জন বড়দিনের ঠিক আগে জিমখানায় দৌড়তে গিয়ে হাঁসফাঁস করে মাটিতে ঘামতে ঘামতে মরে গেলো, সে ছিলো হপ্তাখানেক। দুর্ঘটনার এখানেই শেষ নয়, এক ভরদুপুরে উড়ো খবর এলো যে ওপরের তলায় ডানদিকের ঘরের সাহেব নাকি ছুটিতে ছিলো,বউবাচ্চা সমেত গাড়ি অ্যাক্সিডেন্ট করে সেও নাকি মারা গেছে। খবরটা সত্যি। এই অবস্থায় যে ওর টেবিলে কেউ বসলো না, তাতে আশ্চর্য কি? আর আমি যখন ওর জায়গায় নতুন অফিসে ঢুকলাম তখন ওরা যে আমাকে মরা সাহেবের টেবিলে বসতে দিলো, কিন্তু অ্যাক্সিডেন্ট নিয়ে রা কাড়লো না, এমনকি ভয়ের চোটে তার টেবিলের ড্রয়ার অবধি সাফা করলো না তাতেই বা আশ্চর্য কি?


অফিস জুড়ে তখন একেবারে মানুষ আর প্রেতাত্মা প্রায় সমানে সমানে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে, মাথার পেছনে দীর্ঘনি:শ্বাস ছাড়ছে। কখন কার দিকে নজর লেগে যায় তার ঠিকানা পাওয়া ভার। আমার সাদা মনে কাদা নেই, ড্রয়ার খুলেছি, দেখি একরাশ জিনিস পড়ে আছে। মরা সাহেব মরার আগে ওর টেবিল ঠিক যে অবস্থায় রেখে গেছিলো, তারপরে এই প্রথম মানুষের, মানে আমার হাত পড়লো। ছুটিতে যাবার অব্যবহিত আগে সে একটি বিস্কুটের প্যাকেট হাফ খেয়ে রেখে গেছিলো, তার থেকে একগাদা গুঁড়ো পড়ে আছে। বাকি বিস্কুটগুলো ভালোরকম নেতিয়েছে। টেবিলের সামনে বেশ গোটা গোটা অক্ষরে পরের দু মাসের কাজ লিখে রেখেছে। সেগুলো আমাকেই করতে হবে বোধ হলো। টেবিলের ওপরে ইতস্তত: পোলিশ ভাষায় কিছু বাজার হাটের ফিরিস্তি, ঠিকানা আর ফোন নম্বর। কলম টলম রাখার খোপে সিলভারমিন্ট বলে একটা পেপারমিন্টের খালি কৌটো, দুটো মাইক্রোটিপ পেন, একটা কাটা পেন্সিল, একটা টেপা পেন্সিল, পেন্সিল কাটার কল, কাগজ সাঁটার জন্য একতাল ব্লু ট্যাক (ঐ যে চটচটে মাটির তালের মতো যেগুলো), একটা ছোটো একটা বড়ো সেলোটেপ, জেমসের মতো দেখতে এক বাক্স পিন, অজস্র খুচরো পয়সা - গুনে দেখেছিলাম বোধ হয় সাতাশি পয়সা না কতো যেন, আরো কিসব। মন দিয়ে এতো কিছু দেখতে গিয়ে আমার মাথা ভোঁ ভোঁ করতে লাগলো, চোখ ব্যথা করতে লাগলো। কেমন একটা ঝিম ধরে গেলো। আমি পয়সাগুলো সাজিয়ে রাখলাম, পেন পেন্সিলগুলো নিজের মনে করে নিয়ে নিলাম, যে খাতাগুলো মোটের ওপর ফাঁকা আছে সেগুলোও নিলাম ও তার সদ্ব্যবহার করলাম। এইসময়ে অন্তত তিনজন খুব ভয়ে ভয়ে আমাকে মরা সাহেব নিয়ে গোপন খবর দেওয়ার মতো যা যা জানার কথা তা জানালো।


সব শুনে, মানে মরা সাহেবের মরে যাওয়া আর অফিসের লোকের ভয় শুনে, আমার বেশ কৌতূহল হলো। শুধু তাই নয়, কদিন পরেই এও মনে হতে লাগলো যেন আমিই মরা সাহেব হয়ে আবার ঐ টেবিলে এসে বসেছি। একই কাজ, একই টেবিল চেয়ার, খাতা, খালি হাতের লেখা দুরকম।  আমিই যখন সে, তখন আমাকে আমার পূর্বজন্ম নিয়ে কিছু জানতে হবে না? আমি খুঁজতে লাগলাম। পাগলের মতো। সকালে আসি, মরা সাহেবের বিষয়ে নানান তথ্য খোঁজাখুঁজি করি আর রোজই ভাবি যে এইবারে চাকরি লাটে উঠলো বলে। কিন্তু খুঁজে লাভই হচ্ছিলো। লোকটার একটা ছবিও খুঁজে পেলাম - আমার থেকে অনেকটা আলাদা দেখতে। বেশ মোটা, চোখ দুটো অস্বাভাবিক কটা, শয়তানের ভুরু আছে। আমার দিকেই চেয়ে মিচকি মিচকি হাসছে। বোধ হয় বেশ ধার্মিক, কারণ ব্লু ট্যাক দিয়ে টেবিলের সামনে মেরির, মানে যীশুর মেরির একটা পাসপোর্ট সাইজ ছবি লাগানো ছিলো। সেটাকে ভালো করে লক্ষ করে তার ওপরে মরা সাহেবের বুড়ো আঙুলের ছাপ আবিষ্কার করলাম। একদম ঝকঝক করছে, ফ্রেশ। একটাই আঙুলের দুটো ছাপ এমনভাবে পড়েছে যে পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে  প্রথমবার ছবিটা ঠিক ভালো করে লাগে নি। পড়ে যাচ্ছিলো, তখন অন্য হাতে ওটাকে আটকে, ঠেসে বুড়ো আঙুল দিয়ে দ্বিতীয়বার চেপে ধরতে তবে ঠিক করে লেগেছে। আমি ভাবলাম যে ওর জ্যান্ত জীবনে যখন এতই উঁকি দিচ্ছি, আর আমি নিজেই যখন ও, তখন একটা দাগ রেখে যাই। এই ভেবে আমিও আমার বুড়ো আঙুলের একটা ছাপ মেরে দিলাম। দেখলে মনে হবে, একটাই বুড়ো আঙুল কিন্তু তিনটে ছাপ। আর তাই-ই তো! আমি আতসকাঁচ দিয়ে পরে মিলিয়ে দেখেছি, আলাদা করা যাচ্ছে না, একই লোক।


এরপরে আমি ঠিক করলাম যে মরা সাহেবকে পুরোপুরি মরতে দেওয়া ঠিক হবে না, ওকে অল্প করে বাঁচিয়ে রাখা উচিত। বাঁচাতে গিয়ে আমি পড়লাম মহা ফ্যাসাদে। মরা সাহেব দুপুরে যেখানে যেখানে গিয়ে যা খেতো মোটামুটি তাই খাই, যেখান থেকে বাজার করতো সেখানে গিয়েই সপ্তাহের বাজার করি। চারটে গানের সিডি কিনবে বলে ঠিক করে রেখেছিলো, সেগুলো কিনলাম এবং বহুবার শুনলাম। মাঝে মাঝে তো এও ইচ্ছে হতো যে ওর বৌকে একটা ফোন করে দেখি, কিন্তু সেইসব কথা থাক। মোট কথা, অল্প কেন, ওর জীবন আমার কল্যাণে বেশ রমরম করেই চলছিলো। আসলে ওর সম্বন্ধে যতটা জানা ছিলো, তার চেয়ে অজানার রহস্য তো অনেক বেশী, তাই সেই ঘনীভূত রহস্যের দরুণ রোজ ওকে পেঁয়াজের খোসার মতো অল্প করে ছাড়িয়ে ছাড়িয়ে বড়ো আনন্দ পাওয়া যেত। দ্রৌপদীর শাড়ির মতো সেই খোসার প্যাঁচ অসীম, তাই যত খুলি তত খোলার ইচ্ছেটা বেড়ে যায়।


এই অবস্থায় হঠাৎ একদিন ওরই কি একটা পুরনো কাজ আমার ঘাড়ে এসে পড়লো। মরা সাহেব নাকি কাকে কি একটা নাম ঠিকানা ইমেলে দিয়ে সেটা ফাইল না করেই মরে গেছে, এখন আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এমতাবস্থায় অনেক আলাপ আলোচনার পর অফিসের কাজের চাপকে প্রাইভেসির ওপরে বসিয়ে আমার জন্য ওর গত তিন বছরের সমস্ত ইমেল খুলে দেওয়া হলো। তার থেকে নাকি সেই চিঠি উদ্ধার করতে হবে। আর কি সে চিঠি সহজে উদ্ধার হয়? আমি আছি আমার তালে, নাওয়া খাওয়া ছেড়ে ঘন্টার পর ঘন্টা চিঠি খোঁজার নাম করে ওর সম্বন্ধে পড়ে চলেছি। ওর জীবনের প্রত্যেকটা খুঁটিনাটি আমার সামনে একেবারে সিনেমার মতো চলছে। তারপরে জানতে জানতে জানতে জানতে একেবারে শেষে একটা খুব খারাপ ব্যাপার হলো। যত সময় যেতে লাগলো, মরা সাহেব ততই অসাধারণ থেকে ভীষণ সাধারণ হয়ে যেতে লাগলো, ওর চোখের জ্বলজ্বলে দ্যুতিটা কমে যেতে লাগলো, ওর আর আমার আঙুলের ছাপ অবধি আলাদা হয়ে যেতে লাগলো। যতক্ষণে সব চিঠি পড়ে শেষ করলাম ততক্ষণে মরা সাহেবের ভূত আমায় ছেড়ে একেবারে চলে গেছে। বেচারার জীবনটা এবারে সত্যিই একেবারে মরে গেলো। এই অবধি বলে চুমুক দেবো বলে চুপ করেছি কি করিনি, উপস্থিত জনতা বড়ো চঞ্চল হয়ে উঠলো। এই গল্পে আবার ভয়ের কি আছে? অবশ্য, মরা সাহেবের টেবিলে যারা বসেনি, তারা এসব বুঝবেই বা কি করে।


যাইহোক, লোকজনের বক্তব্য অনুযায়ী, এর চেয়ে অনেক ভয়ঙ্কর ঘটনা হাল হামেশা ঘটে থাকে। এই তো, মানকুণ্ডু না কোথায় যেন একজন ডোম ছিলো, মানে আছে, তার বিশেষত্ব ছিলো যে সে রিক্সা ভ্যানে চড়িয়ে মড়া নিয়ে যেত। এখনও নিয়ে যায়। মড়া নিয়ে তো কত রকম যানবাহনই যায়, তাতে চিন্তার কারণ নেই। কিন্তু কানাঘুষোয় নাকি শোনা যায়, যে সেই মড়া যদি জোয়ান মদ্দ মেয়ে হয়, তবে নাকি লুকিয়ে সেই মড়া রেপ করে তবে আগুনে চড়ায়। কি করে সেই মেয়ে মড়া  রিক্সাভ্যানে ওঠে, আর কি করেই বা মিনিট পনেরো গোপনে পাওয়া যায় সেই নিয়ে কেউ উচ্চবাচ্য করলো না। এরকম সিচুয়েশান নাকি রোজ রোজ হয় না। তবে মানুষে সব জেনেও ওকে ডাকে। ডোমের নাকি বড়ো আকাল।


জোয়ান মেয়ে মড়া পাওয়া বেশ কঠিন, ঠিক কথা। অপঘাতে ছাড়া বড়ো একটা দেখা যায় না। আর আমাদের তো অপঘাতে মরে সব রাস্তায়। এখন তবু খবরের কাগজে আসে, আগে বাস ফাস না উল্টোলে খবরে অবধি আসতো না। এই তো, বছর দশেক আগে একজন বৌ বাচ্চা নিয়ে গাড়ি চালিয়ে পাহাড়ে বেড়াতে গেছিলো, বাঙালি। পাহাড় অবধি আর যেতে হলো না, সোজা রাস্তা দিয়ে শাঁ শাঁ করে গাড়ি চলছে, হঠাৎ কোনও কথা নেই বার্তা নেই, গাড়ি ছিটকে উল্টে দুটো পাক দিয়ে মাটিতে আছড়ে পড়ে স্থির হয়ে গেলো। তিনজনের ফ্যামিলি বুঝলেন, বৌ ছোটো বাচ্চা আর বর। বৌ স্পট ডেড, বাচ্চাটা আশ্চর্যজনকভাবে রিলেটিভলি আনহার্ট, কিন্তু কিছু বুঝতে না পেরে পরিত্রাহি কেঁদে চলেছে, ওদিকে বৌকে কোলে নিয়ে ভদ্রলোক &হয়ষঢ়;স্বাতী!স্বাতী!&হয়ষঢ়; বলে চিৎকার করছেন।


এই ঘটনাটা ভয়ের বটে, কিন্তু মনে রাখার মতো না। শুকতারায় ঠিক এইরকম গল্পগুলোই দাদুমণির বিবেচনায় স্মৃতি পুরস্কার পেত। হয় অ্যাক্সিডেন্টের গল্প, নয়তো শ্রমিক ভাইয়ের গল্প। শ্রমিক ভাই বড়লোকের বাড়ি তৈরি হবে বলে কনস্ট্রাকশান সাইটে বড়ো সততার সঙ্গে কাজ করছে, কিন্তু হা হতোস্মি, একদিন সেই জ্যান্ত মানুষ ভারা থেকে পা পিছলে একটা তিনতলা সমান গর্তে পড়ে গেলো আর কয়েকটন ভারী একটা হাতুড়ির ঘা তাকে একেবারে চ্যাপ্টা করে দিলো। তার কোনও দেহাবশেষ পাওয়া গেলো না, তার অসহায় দশ বছরের শিশুটি কাঁদতে কাঁদতে তার বাবার জীবনের বিনিময়ে সামান্য কিছু টাকা হাতে নিয়ে মায়ের স্তব্ধ মুখের দিকে তাকিয়ে নিষ্ক্রান্ত হলো। শ্রমিক ভাইয়ের দেহ সেই প্রচণ্ড চাপে একেবারে যন্ত্রের গায়ে স্টিকারের মতো সেঁটে গেছিলো, তাকে আর আলাদা করা যায় নি।


যে কোনও আড্ডাতেই, চাই বা না চাই, কলেজ পড়ুয়া ছেলে থাকে আর তারাও, চাওয়া না চাওয়ার ঊদ্ধ্বে Ñ - ভীষণ গুল মারে। শুধু গুল মারে না, মারতে মারতে কিছুদিন বাদে নিজেও বিশ্বাস করে যে গল্প হলেও সত্যি। তেমনই একজন, সবে কলেজ ছেড়েছে, কিছু বলার জন্য উদ্বেল হয়ে উঠলো। বলাই বাহুল্য, যে চট করে একটু ছোটো বাইরে হয়ে আসার এই প্রশস্ত সময়। ছেলেও যেমন, কলেজও তেমন, দুটো মাত্র পলিটিকাল পার্টি। খুব বেশী হলে লাঠির আগায় পেরেক গেঁথে টুকটাক মারপিট হয়। কিন্তু একবার একটি ছেলেকে তুলে নিয়ে খুন করে ফেলার পর বছরখানেক কেউ আর ট্যাঁ ফোঁ করতে পারে নি। খুনটা নাকি পুরোটা রাজনৈতিক ছিলো না, প্রেমেরও একটা অ্যাঙ্গেল ছিলো। যাই হোক, রেললাইনের পাশে ধানক্ষেতের অনেক ভেতরে একটা ফাঁকা বাড়িতে ছেলেটাকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিলো। তারপরে তার আঙুলগুলো সারা রাত ধরে কুচিয়ে কুচিয়ে কাটা হয়েছিলো। এমনকি সেই চিৎকার নাকি পথচলতি হাতে গোনা কয়েকটি লোক শুনেওছিলো, এখন সকলেই তাদের নাম জানে, কিন্তু পুলিশ টুলিশে খবর দেবার সাহস কারো হয় নি।


প্রোফেসার সাহেব অনেকক্ষণ চুপ করে শুনছিলেন বা ঘুমোচ্ছিলেন, পুলিশে খবর দেবার কথা শুনে গলা খাঁকারি দিলেন। কলেজে তো এসব হয়েই চলেছে, পড়াশুনা করতে তো আর এরা আসে না, আর খবরের কাগজ কি টিভিতেই যা গুরুপাক ব্যাপার দেখাচ্ছে তার কাছে এসব ঘটনা নস্যি। আমি বরং অন্য একটা ঘটনা বলি। বছর দুতিন আগে আমার কাছে পোস্টডক্টরেটে একটি মেয়ে জয়েন করেছিলো। তার বর বেশ কাছেই, এই প্রায় ঘন্টা তিনেকের ড্রাইভিং ডিস্টেন্সে পোস্টডক করতো।তা বরটি শনি রবিবার গাড়ি চালিয়ে বৌ এর কাছে আসে আর বৌকে সন্দেহ করে। যে সে সন্দেহ নয় - ওর ধারণা, যে পাঁচদিন ও বৌ এর সঙ্গে থাকে না, সেই সময়ের সদ্ব্যবহার করে বৌ অন্য অন্য বহু ছেলের সঙ্গে শুয়ে বেড়ায়। শুয়ে না বেড়ালে ওর বৌ অন্য ছেলেদের সঙ্গে ঐরকমভাবে হেসে হেসে কথা বলে? লিপস্টিক পরে বাড়ির বাইরে বেরোয়? বাড়িতে অন্য ছেলেদের ফোন আসে? এরকম হাজার হাজার প্রশ্ন জমে যে কি ঘটছিলো সেটা প্রথমে বোঝা যায় নি। তারপরে মেয়েটা একদিন গালে পরিষ্কার কালশিটে পড়া পাঁচ আঙুলের দাগ নিয়ে ডিপার্টমেন্টে ঢুকতে জিজ্ঞেসবার্তা করে জানা গেলো যে ফি শনি রোববার ও মার খায় কিন্তু ভয়ের চোটে কাউকে বলতে পারে না। ওদিকে পুলিশেও যাবে না।  আর বৌ পেটানোর নিয়ম তো  লোকে শেখে বই পড়ে, খবরের কাগজ পড়ে আর টি ভি দেখে। চুল ছিঁড়ে ফেলা থেকে, সিগারেট টিগারেট, আর যা যা সব আমরা জানি সবই চলছে। মেয়েটা হয়তো কাজ করছে, ওর বরের মনে হলো নির্ঘাৎ ছেলেদের জড়িয়ে ধরে চুমু খাচ্ছে, ফস করে ফোন করে দিলো &হয়ষঢ়;আমি বাড়িতে এসেছি আর তুমি রাস্তায় মজা করছো?&হয়ষঢ়;। রাস্তায় যে ঘুরছে না, সেটা প্রমাণ করতে মেয়েটা সব জেনেও তক্ষুণি বাড়ি দৌড় দিতো। ওর তো কাজের বারোটা বাজছেই, আমারও কাজের ক্ষতি। একদিন ঠিক এইরকম একটা ফোন পেয়ে দৌড়ে বাড়ি গিয়ে দেখে ওর বর চোখ লাল করে একটা স্ক্রু ড্রাইভার নিয়ে সিঁড়ির মুখে বসে আছে। ওদিকে মেয়েটা সেই দেখে ভীষণ ভয় পেয়ে আমার নাম্বারটা ডায়াল করে ফোনটা খোলা রেখেছে আর ভাবছে এবারে কি করবে। আমি বেগতিক থেকে পুলিশ ডাকলাম, কিন্তু ততক্ষণে উত্তেজনা থিতিয়ে গেছে। পুলিশকে ও বললো যে সব নাকি ঠিক আছে, এমনি একটু ঝগড়া হচ্ছিলো, ভুল করে রাগের মাথায় ডেকে ফেলেছে। ওরই দোষ। কিন্তু আমি ছাড়লাম না, জোরজার করে একটা রেস্ট্রেনিং অর্ডার জারির ব্যবস্থা করলাম। বেঁচে থাকলে তবে না ডিভোর্স হবে। এরপরে যে কাণ্ডটা হলো, তার জন্য কিন্তু কেউই রেডি ছিলো না। যেটা হলো, যে মেয়েটার সঙ্গে সবাই কথাবার্তা, এমন কি যেকোনও যোগাযোগ বন্ধ করে দিলো। একদল বললো - ওর এতো সাহস যে ভারতীয় পরম্পরায় নিজেদের ঝগড়া নিজেরা না মিটিয়ে পুলিশ ডাকতে গেছে! মেয়েটা একেবারেই ইতর। বাকিরা বললো - বেচারা মেয়েটা, ওর সঙ্গে আমরা যদি কথা বলি তাহলে ওর বর ওকে আরও মারবে। আমরা আর কিছু না পারি, ওর অন্তত: এই উপকারটুকু তো করতে পারি।


এমন একখানা গল্প শুনে, সেই একজন, যে কিনা বীয়ার খেয়ে অল্প অল্প মাতাল হয়ে উঠেছিলো, সে অত্যন্ত সরব হয়ে সম্পূর্ণ অন্য রাস্তায় চলে গেলো। - আমিও তো তাই বলছি, মানুষ যে কতকিছু দেখে তার সীমা নেই। বানানো গল্পের চেয়ে এসব ঢের বেশি ভালো। সে প্রায় কুড়ি বছর আগের কথা বলছি। আমি ইলেকট্রিকের অফিসে চাকরি করি। তখনও সাহেবসুবোর গন্ধ পুরো উবে যায় নি, রাতে কাজের জন্য থাকলে বাবুর্চি মিলতো। সে যা রান্না করতো তা ভাষায় বোঝানো যাবে না ভাই। এই আমি যে স্বনামধন্য বিরিয়ানিটা বানাই, সেটা তো ঐ বাবুর্চির থেকেই শেখা। মোট কথা যেটা বলতে চাইছি সেটা হলো যে তখনকার মেশিন সব অন্যরকম আর লোকজনও খোলতাই- ভাবা যায়, একটা বয়লার বসানো হচ্ছে, সেটা কাঁটায় কাঁটায় সোজা হচ্ছে কিনা দেখার জন্য গফুর ঐ বয়লারটার ওপরেই চড়ে একটা স্পিরিট লেভেল হাতে নিয়ে ডাইনে বাঁয়ে ব্যালান্স করতে করতে বাকিদের বলছে কোনদিকে হেলাতে হবে! ওখান থেকে পড়লে ওকে আর হাসপাতালে নিয়ে যাবার দরকার পড়বে না। যাই হোক, একদিন রাতে হলো কি গঙ্গার ওপারে পাওয়ারে ঘাটতি পড়েছে, সমস্যা হচ্ছে, আমাকে আরেকটা লাইন চালু করে ওদিকে কিছু পাওয়ার দিতে হবে। সে বীভৎস হাই ভোল্টেজ লাইন। আমি সব চেক টেক করে পাওয়ার দিয়েছি, একেবারে ট্রিপ করে গেলো। আমি একটু অবাক, ফোনটোন করলাম, ওরাও বুঝতে পারছে না। আবার পাওয়ার দিলাম, আবার ট্রিপ করলো। বুঝলাম যে আজ রাতে অফিস থেকে বেরোতেই হবে। গাড়ি নিয়ে যেখানে ঝামেলা হচ্ছিলো সেখানে পৌঁছোলাম। পুরো সুড়ঙ্গ, আর ওতে কদাচিৎ পাওয়ার দেওয়া হয়। এমনিই পড়ে থাকে। এর মধ্যে রাতবিরেতে যত উপদ্রব। ভেতরে ঢুকে দেখি মেশিনের একটা চাপা শব্দ শোনা যাচ্ছে। সর্বনাশ - ওখানে কারা ঢুকেছে? কি মেশিন চালাচ্ছে? শব্দটাকে ফলো করে এগোলাম, একটু বোধ হয় বোকামিই হয়েছিলো, সঙ্গে তো আর আত্মরক্ষার কিছু ছিলো না। ঐ অন্ধকারে আলো ফেলতে শব্দের উৎস খুঁজে পেলাম, একটা লোক শুয়ে পড়ে আছে আর তার মুখ থেকে অদ্ভুত কুৎসিত শব্দ বেরোচ্ছে। মনে হচ্ছে যেন ঢাকাচাপা দেওয়া একটা মেশিন চলছে। আমরা আসার একটু পরেই লোকটা মরে গেলো বটে, কিন্তু ভাববার বিষয় যে দু দু খানা ওরকম মারাত্মক শক খেয়েও ও বেঁচে ছিলো কি করে? আমার নিশ্চিত ধারণা যে ও জানতো ঐ লাইনে পাওয়ার দেওয়া হয় না। চুরির ধান্দায় এসে অ্যাক্সিডেন্টে খামোখা প্রাণটা খোয়ালো। মাঝখান থেকে পুলিশ এসে প্রশ্ন উত্তর করে একাকার অবস্থা। কিন্তু এ তো শুধু হাই ভোল্টেজ। আরেকটা হলো সুপার হাই ভোল্টেজের গল্প। এইসবে হাত দেবার আগে শুধু অন অফ না,আর্থ হয়েছে কিনা সেটা শিওর না করে কিছুই করা উচিৎ নয়। তা আমরা সেদিন কাজ করবো বলে দাঁড়িয়ে আছি,বেশ রাত হয়েছে। যে ব্যক্তি ওদিকে লাইনটা অফ করবে, আর্থ আছে কিনা চেক করবে তাকে প্রথমে ফোন করে নাইট ডিউটির ঘুম থেকে তুললাম। লোকটি এমনিতে করিৎকর্মা, একবার তুলে দিলে লাইন ফাইন চটপট অফ করে দেয়। পাঁচ মিনিট বাদে ফোন করলাম, কি রে, আর্থ করেছিস? তাতে সে বললো, এক্ষুণি করছি। অল্প বকাঝকা দিয়ে, ফোনটা রেখে কাজটা করতে যাবো, আমার কলিগ, মানে আমাদেরই ব্যাচমেট, বললো একবার ফোন করে নিলে হতো না? আবার ফোন করলাম, এবারে সে আর ধরে না। বোঝাই যাচ্ছে যে কাজ শেষ করে হিসি টিসি করতে গেছে। আমিই বললাম যে অতো নিয়ম মানলে তো ওর ফোন পাওয়া অবধি অপেক্ষা করতে হবে। ওকে পাবি কোথায়? তোর সন্দেহ নিরসন করতে না হয় আমিই তোকে লাইনে হাত দিয়ে দেখাচ্ছি, এটা এখন একটা দড়ি, আর কিচ্ছু না। আমি হাত দেবার আগেই আমার বন্ধু ওতে হাত দিলো। একটা প্রচণ্ড বিস্ফোরণের সঙ্গে ছেলেটা এক সেকেণ্ডে ছাই হয়ে গেলো। আর্থ হয়নি। আমি মাটিতে। শব্দ শুনে আরেকজন ইঞ্জিনীয়ার দৌড়ে এলো, কিছু রিয়্যাক্ট করতে পারছে না, হাঁ করে বোকার মতো তাকিয়ে আছে। এক সপ্তাহে তার সব চুল সাদা হয়ে গেলো। এই বলে উনি আবার বীয়ারে মন দিলেন।


আমাদের মধ্যে এক মহিলা ছিলেন, উনি বললেন যে সবই বুঝলাম, কিন্তু আমার কাছে এমন একটা ভয়ঙ্কর গল্প আছে যার জুড়ি নেই। স্বভাবতই সকলে পীড়াপীড়ি করতে লাগলো। 'আমাদের এক আত্মীয়ের হঠাৎ বড় ঠাণ্ডা লাগলো। সর্দিতে একেবারে ঢ্যাবঢ্যাব করছে, নাক দিয়ে কাঁচা জল গড়াচ্ছে। সর্দি আর সারে না, এ ডাক্তার সে ডাক্তার করতে করতে সে একদিন ঘোরতর অসুস্থ হয়ে পড়লো। বড়ো ডাক্তারের কাছে গিয়ে জানা গেলো, যে তার আর আয়ু নেই। ঐ যে সর্দি হচ্ছিলো আর নাক দিয়ে কাঁচা জল পড়ছিলো, ওটা মোটেই সর্দি নয়। সর্দির মতন করে ভদ্রলোকের ব্রেনটা আস্তে আস্তে অল্প অল্প করে লিকুইড হয়ে বেরিয়ে যাচ্ছিলো। এটা একটা খুব রেয়ার রোগ'। এবারে আর কেউ সামলাতে পারলো না। সকলে হো হো করে হেসে উঠলো।