আপনার মতামত         




একটা এমনি রাত


শ্রাবণী



আজ অনেকদিন পরে এমনটা হল। এই মাঝরাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে যাওয়া। অন্ধকারে কিছুক্ষণ চুপচাপ শুয়ে থাকে চোখ বন্ধ করে। ঘুমের আমেজ যেন চোখের পাতা ছেড়ে পালিয়ে না যেতে পারে! চোখ খোলা যাবেনা কোনোমতেই, তাহলেই ঘুমের দফারফা। রাত এখন কটা কে জানে? ইস, কমপক্ষে ছ ঘন্টা না ঘুমোলে কাল সারাদিন টানতে পারা যাবে না। অফিসে সীটে বসলেই ঘন ঘন হাই উঠবে, কাজে বিরক্তি আসবে। আধা অন্ধকার ঠান্ডা কনফারেন্স হলে, মিটিং এ দু চোখ জড়িয়ে আসবে ঘুমে, জোর করে চোখ টেনে খুলে রাখতে হবে। সব মিলিয়ে বিরক্তিকর, বিতিকিচ্ছিরি! জনে জনে দাঁড় করিয়ে জিজ্ঞেস করবে, &হয়ষঢ়;এত ক্লান্ত লাগছে তোমায়, শরীরটরীর ঠিক আছে তো?'


না:, ঘুমটাকে ফিরিয়ে আনতেই হবে! জোর করে ঘুমোনোর চেষ্টা শুরু করে। কতবার রিভার্স কাউন্টিং হয়ে গেল, কিন্তু হায়, যতবার গোনা ততবার আরো বেশী করে জেগে ওঠা। আর পারা যায় না, কি যে করে! একটু ঘাড়ে মাথায় জল দিয়ে এসে জল খাবে? শুধু বেড সাইডের রিডিং ল্যাম্পটা জ্বালিয়ে তার আলোতে ডাইনিং স্পেসে গেল। অন্ধকার হাতড়ে ওয়াশ বেসিনটার কাছে গিয়ে ট্যাপ খুলল। মুখেচোখে ঘাড়েমাথায় ভালো করে ঠান্ডা জলের ঝাপটা দিয়ে পাশে রাখা টাওয়েলটা টেনে নিয়ে অন্ধকারেই আয়নার দিকে তাকাল। কিছু দেখা গেল না, শুধু আবছা একটা মুখের আভাস, একটু অন্যরকম মুখ!


কোনো ঘড়ি বা মোবাইলের দিকে না তাকিয়ে আবার ফিরে গেল বিছানায়। পাশে সাইড টেবিলে জল রাখা ছিল। এক ঢোকে অনেকটা জল খেয়ে ফেলল। তারপর আলো নিভিয়ে শুয়ে শুয়ে অন্ধকারে সিলিংএর দিয়ে চেয়ে থাকল। একদম সকালে ঘুম থেকে উঠলে যেরকমটা হয় সেরকম ফ্রেশ লাগছে। ক ঘন্টাই বা ঘুমিয়েছে? জানালার বাইরে এখনো নিশ্ছিদ্র অন্ধকার, ভোর হতে দেরী আছে!


সে জানে এই চনমনে ভাব ক্ষণস্থায়ী, সকালে যখন সবার ঘুম ভাঙবে তখন আবার ধীরে ধীরে তার চোখে ঘুম নেমে আসতে চাইবে। আর তখনই ঘুমটাকে জোর করে তাড়িয়ে তাকে নিত্যকর্মে মন দিতে হবে!


***********


কিন্তু জীবনটা যদি ছকে বাঁধা না হত? তবে তো এভাবে মাঝরাত্তিরে ঘুম ভেঙে যাওয়ার জন্য মন খারাপ করতে হত না।
তাহলে কি করত সে?
হয়ত উঠে এককাপ কফি নিত, আর বুককেস থেকে একটা গল্পের বই। স্ট্রং ক্যাফেনের স্বাদে গন্ধে বুঁদ হয়ে ডুবে যেত প্রিয় কোনো গল্পে বা উপন্যাসের ছকে, ততক্ষণ,যতক্ষণ না আবার ঘুম আসত।
হয়ত বা এসব কিছুই করত না, সেরেফ কোলবালিশটাকে ভাল করে জড়িয়ে উপুড় হয়ে একটা কোনো প্রিয় ভাবনা নিয়ে খেলতে থাকত। সময় তার হাতে হত, সে সময়ের হাতে নয়।
যদি এমন হত?
সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে আরো কিছুটা সময় চলে গেল জীবন থেকে এই রাতদুপুরে।
বড্ড লোভ হতে লাগল, করবে নাকি নিজেকে মুক্ত সময়ের দাসত্ব থেকে? নেবে নাকি এককাপ কড়া কফি আর বুকশেল্ফ থেকে একটা নতুন বই? না পড়া আনকোরা তিনটে বই পড়ে আছে, কিনেছে বেশ কিছুকাল হল, খুলে পাতা ওলটাবার সময় পায়নি। অবশ্য আরো খানদশেক না ছোঁয়া বই পড়ে আছে,অফিস, ট্রেনিং ইত্যাদি থেকে পাওয়া ম্যানেজমেন্ট এসবের হাবিজাবি বই। খুব দরকার বা স্ট্রং রেকমেন্ডশন ছাড়া এসব বই খুলে দেখেনা ও। গতবারে ট্রেনিংএর থীম ছিল রবিন শর্মার একটা বই, তাই সেই বইটা পড়তে হয়েছিল। খারাপ লাগেনি খুব একটা। ওর ওপরে প্রেজেন্টেশন দিয়ে প্রথম প্রাইজ পেল রবিনেরই আর একটা বই, সেটা ছুঁয়েও দেখেনি, আছে কোথাও পড়ে।


আচ্ছা কাল যদি অফিসটা না যায় (জোর করে প্রবল অনিচ্ছা সত্ত্বেও মনটা নিয়ে যায় কালকের কাজের ফিরিস্তিতে। জরুরী একটা ফাইল পড়ে আছে, কালকে কমেন্ট করে পাঠাতে হবে সকালেই! )? তাহলে তো এই রাতের নিস্তব্ধ নির্জন মুহূর্তগুলোতে সে যা খুশী তাই করতে পারে, যা ইচ্ছে তাই হতে পারে! চোখ বন্ধ করল আবার। চারদিক থেকে একটা মনখারাপের অন্ধকার ওকে গ্রাস করতে আসছে। ও: ভগবান! নিমেষে চারধার কেমন ফাঁকা হয়ে এল। একটা অস্ফুট কান্না বুকের ভিতর থেকে গুমরে উঠতে থাকল। সবই তো আছে তার, তবু এই অপ্রাপ্তি কেন, কি ভাবে, কি করে আসে এ জীবনে?  তার কাম্য নয় এই একাকিত্ব, তার প্রাপ্য হতে পারেনা এই শূন্যতা!


ধীরে বিছানা থেকে উঠল,অন্ধকারে হাতড়ে আলমারি খুলল। বহুব্যবহারে কোথায় কি আছে চোখ বুজেই খুঁজে নিতে পারে। বাঁদিকের ড্রয়ারটা খুলে বার করে আনল একটা রাজস্থানী মীনাকারীর জুয়েলারী বক্স। আস্তে আস্তে ডালা খুলতেই একরাশ শিউলি আর চন্দনের গন্ধ। শুকনো হয়ে যাওয়া ফুল আর একটা চন্দনকাঠের চাবিকাঠি এখনও এত বিশ্বস্ত!


সমস্ত মেলগুলো সেই কবেই ডিলিট করে দিয়েছে। ফোল্ডারটার নাম ছিল বি এ এফ। ঐ নামের বইয়ের সূত্রেই প্রথম আলাপ দুজনের। এই মেলের আর ফোনের যুগেও চিঠি লেখা ছিল দুজনেরই পছন্দ। সুন্দর কাগজে ততোধিক সুন্দর ঝরঝরে হস্তাক্ষরে লেখা চিঠিগুলো, সবুজ মনের দলিল। সে যেন কতযুগ আগেকার কথা। কতদিন খোলা হয়নি এই বাক্স। ছিঁড়ে ফেলতে পারেনি, তাই বন্ধ করে চাবি দিয়ে রাখা মনের বাক্সে।


আর অন্ধকারে নয়, এবার আলো জ্বালায়, কম পাওয়ারের নরম হলুদ আলোটা। মনের আলোও। হলদে হয়ে এসেছে কাগজ, কোথাও কোথাও লেখনী অস্পষ্ট। অনেকক্ষণ ধরে তাকিয়ে রইল পাতাগুলোর দিকে। সংখ্যায় কতগুলো হবে, দুবছরে শতখানেক কি? জানে না, জানতে চায়ও না। একবার একটু লোভ হল। পড়ি, পড়ে দেখি? রোলটা খুলে টেনে সোজা করতে চাইছিল, হচ্ছিল না, বারবার গুটিয়ে যাচ্ছিল। মোবাইলটা চাপা দিল চিঠির তাড়ার ওপর। উল্টেপাল্টে দেখে মোটামুটি গুছনো, তারিখের হিসেবে। শেষে সবথেকে শেষ চিঠিটি!


তুলে নেয় শেষ চিঠির প্রথম পাতা। কিন্তু না:, একটা শঙ্কা হিলহিলে কালো সাপের মত পা থেকে মাথায় উঠে আসে। আজ এই এত বছর পরে সেই মন নেই, সেই বোধ নেই, কিছুই যে আর আগের মত নেই! যদি সেই মানেগুলো বদলে যায়? আজকের এই হিসেবী মনে যদি নতুন করে জমা খরচ করতে বসে, আর শেষে যদি কূল না পায়! দরকার নেই, বেশ তো আছে। মোবাইলটা সরিয়ে নিতেই গুটিয়ে গেল কাগজগুলো, একেবারে খাপে খাপ। রিবনটা দিয়ে বেঁধে, বাক্সের মধ্যে রাখার আগে আর একবার ভাল করে ছুঁয়ে যাওয়া। কে জানে আবার কবে দেখা হবে তোমাদের সঙ্গে?


আলোটা চোখে লাগছে, বাইরে এখনও আঁধার। আলো নিভিয়ে, আরেকবার গন্তব্য বিছানা, আবার নিদ্রাদেবীর উপাসনা! কিন্তু কোথায় তিনি? সেই পরীক্ষার দিনগুলোর রাতজাগা মনে পড়ে। প্রহরে প্রহরে চার্চের ঘন্টা বাজত। এক একটা ঘন্টার আওয়াজে মনের অস্থিরতা বাড়ত, সময় নেই যে, কত্তগুলো চ্যাপটার শেষ করতে হবে, শিরে সংক্রান্তি! তারপরে কোনোদিন মনে রাখার মত রাত কি আর জেগেছে? ও হ্যাঁ, সেই দিনগুলোতেও বোধহয় রাতে ঘুমোতে পারত না তবে তা কি মনে রাখার মত ছিল? সেভাবে কিছু মনে নেই , একটা আচ্ছন্নভাব ঘিরে থাকত তাকে সবসময়।  বাইরে থেকে সবই ঠিকঠাক ছিল, অফিস যাওয়া, বন্ধুদের সাথে ঘুরতে যাওয়া, কিছুই তো বাদ পড়েনি। সত্যি কথা বলতে কি কেউ বোধহয় জানেই না সেইসব দিনগুলোতে ওর ঠিক কি অবস্থা হয়েছিল। হয়ত বাড়িতে থাকলে, আপনার জনেদের মাঝে, ধরা পড়ে যেত। কিন্তু পরবাসে ব্যস্ত নতুন সহকর্মী বন্ধুদের মধ্যে, কে বুঝবে! সবে তো তখন চেনাজানার শুরু সবার সঙ্গে। আলাপের গভীরতা যখন বাড়তে শুরু করল, ততদিনে সে সামলে নিয়েছে। নিজের সঙ্গে নিজের বোঝাপড়াটাতেই যে সবচেয়ে বেশী সময় লেগেছিল। বাকিটা তো সোজা, একটা মাউসের ক্লিক, ডিলিট অল!


**********


অনেকদিন ভুলেই গেসল যে ট্র্যাশ খালি করা হয়নি। পুরনো চাকা লাগানো ভারী ভিআইপি স্যুটকেসটা দাদা কিনে এনেছিল নিউমার্কেট থেকে, প্রথম চাকরী জয়েন করতে যাবে সেই সময়। নিজেকে রাজা মনে হয়েছিল তখন, এতবড় একখানা স্যুটকেসের একার মালিকানা, কম কথা! পরে চলাফেরা করতে গিয়ে অসুবিধায় পড়েছে, বড্ড বেঢপ। শেষমেষ সেটা বাতিলের দলে পড়েছিল অনেককাল, অদরকারী কাগজপত্রে ভরা হয়ে লফটে তোলা ছিল।  নতুন বাড়ীতে শিফ্‌ট করতে গিয়ে ওটা ফেলে দেওয়া সাব্যস্ত হল। এক রবিবারের শান্ত দুপুরে, বাড়িতে সেদিন একা। ঝড় উঠেছিল, জানালা দরজা ভাল করে বন্ধ করল, তাও শোঁ শোঁ হাওয়ার আওয়াজ আসছিল। জিনিসপত্র এদিক ওদিক ছড়ানো ছিল, প্যাকাররা কাজে আসেনি। ওদের রাখা একটা বাক্সে বইপত্র দেখে দেখে গুছিয়ে তুলতে গিয়ে চোখ গেল একপাশে রাখা স্যুটকেসটার দিকে। কত স্মৃতি ভেসে এল, কতদিন আগের মায়ের সেই চিন্তাক্লিষ্ট মুখ, স্যুটকেস গোছাতে গোছাতে। মেয়ে প্রথম বাইরে যাচ্ছে একদম একা! নতুন বাড়ীতে একটা ঘর শুধু মায়ের কথা ভেবেই বানানো হচ্ছিল। সেটাকে এখন স্টাডি হিসেবে ব্যবহার করা হয়। মা এত খোঁজ নিত বাড়ী তৈরীর সময়, কি হচ্ছে, কেমন হচ্ছে!


চোখদুটো বোধহয় ঝাপসা হয়ে এসেছিল মাকে মনে করে। তাড়াতাড়ি বইয়ের স্তুপ ছেড়ে ও স্যুটকেসটায় হাত দিয়েছিল। একগাদা কাগজপত্র। অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটারের ফোটোকপি, কতগুলো বাতিল অ্যাকাউন্টের পাসবই, ট্রেনিং ক্লাসের নোট, ম্যানুয়াল, অনেক পুরনো কার্ড, স্কুলের অটোগ্রাফ বই। একেবারে শেষে কতগুলো পুরনো খবরের কাগজে মোড়া হেলাফেলায় পড়ে আছে একতাড়া চিঠি রোল পাকানো, লাল রিবন দিয়ে বাঁধা!  ট্র্যাশ! বন্ধ দরজা জানালা দিয়ে ধুলো এসে সারা ঘর ভরে দিচ্ছিল, ভাদ্রমাসে যেন কালবোশেখীর ঝড়! আর সে যেন সেদিন নিরাপদ ছাতের নীচে নয়, কোনো খোলা মাঠে বসে ছিল। ঝোড়ো হাওয়া তার ভেতর বাইরে সব ওলটপালট করে দিচ্ছিল। দেহে বিস্ফোরক বাঁধা এক স্যুইসাইড বম্বার। হয়ত এক্ষুণি পৃথিবীকে তোলপাড় করে কাঁপিয়ে দিয়ে নিজেও নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে!


না: কিচ্ছু হলনা, কলিংবেল বাজল। কাজের মেয়ে ঢুকল কলকল করতে করতে। ঝড় থেমে গেছে। হাতে একগুচ্ছ কাগজ, আস্তে আস্তে উঠে শোবার ঘরে এসে কাবার্ড খুলল। প্রায় খালি, সমস্ত প্যাক হয়ে গেছে, অনেক কিছু নতুন বাড়ীতে চলেও গেছে। নীচের তাকে রাখা গৃহপ্রবেশের দিন পাওয়া উপহার গুলোর মধ্যে একটা মীনাকারি গয়নার বাক্স। উপহারটা পাবার সময় একটু হেসেছিল, মজায়। বাক্সে রাখার মত গয়না তার বাড়ীতে নেইই, না সোনার না অন্য কিছুর, ও বাতিকই যে নেই। তখন জানতনা, যে দিয়েছিল তার অনুভব এত আন্তরিক সত্যি হবে । দুদিন পরেই তার হাতে হীরামাণিক, পরম যত্নে রাখল নতুন বাক্সে, খুদে তালা লাগিয়ে চাবি পার্সের গভীরে!


**********


খাস জার্মান ট্রেনিং ইন্স্‌ট্রাকটরটির বোঝানোতে আন্তরিকতার অভাব নেই, তবু তড়িঘড়ি একটু অন্যরকম উচ্চারণে বলা ইংরাজী ফলো করতে বেশ অসুবিধায় পড়েছিল সে। তারা দুজন নতুন ট্রেনী, মাত্র এক সপ্তাহ হল এসেছে এখানে সাইট ট্রেনিংএ। আর আসা মাত্রই এই সাতদিনের স্পেশাল ট্রেনিং প্যাকেজে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে তাদের দুজনকে। সঙ্গী আরো দশজন, সবাই তাদের চেয়ে বেশ সিনিয়র, ওদের মধ্যে শুধু দুজনকে দেখলে অতটা সিনিয়র মনে হয় না, বছর দু তিনেকের হবে, তারই একজন ওর একপাশে বসেছে। অল্প মুখচেনা সব, আলাপই হয়নি সেরকম কারো সাথে। তাদের দেখলেই মুখটা সিনিয়রোচিত গম্ভীর হয়ে যাচ্ছে প্রায় প্রত্যেকেরই। এয়ার কন্ডিশনড ঘরে গোল কনফারেন্স টেবিলকে ঘিরে বসে সবাই। দুই সাহেব ট্রেনিং দিচ্ছে। প্রোজেক্টর অন আছে, ঘরের আলো মৃদু করা আছে। সামনে পেন, রাইটিং প্যাডের সঙ্গে মোটা দুখানা ট্রেনিং ম্যানুয়াল। কখনো এটার থেকে রেফারেন্স দ্যায়, কখনো ওটার থেকে, তাল রাখতেই প্রাণ যায়। সব মিলিয়ে প্রচন্ড অস্বস্তিকর। পাশে বসা ছেলেটি হয়ত ওর অবস্থাটা অনুমান করতে পারে, তবে সাহায্য করার কোনো চেষ্টাই করে না। ওরা নতুন দুজন ছাড়া প্রত্যেকেই কাজ করছে বা করেছে ট্রেনিং এর সাবজেক্টে, তাদের প্রশ্ন অনেক, মতামতও প্রচুর। এইসব আলোচনায় কোনো অংশ নিতে না পারায় বড়ই বোর হয় সে।


লাঞ্চটাইমে তাড়াতাড়ি খাওয়া শেষ করে বাইরে লাউঞ্জে সোফায় বসে গল্পের বইয়ের পাতা খুলে, একঘন্টা সময় আছে, একা একা আর কোথায় যাবে! সঙ্গী অন্য ট্রেনীটি লাঞ্চ করতে করতে যেচে গিয়ে সিনিয়রদের কথার মাঝখানে ঢুকে পড়ছে, কোথাও নীরবতার ধাক্কা খাচ্ছে, কোথাও আবার হাল্কা উৎসাহ পাচ্ছে। বইতে ডুবে গিয়েছিল বেশ কিছুক্ষণ, চারপাশের খেয়ালই ছিলনা। হঠাৎ একটা নরম গলায় প্রশ্ন ভেসে এল, &হয়ষঢ়;আপনি  ....... পড়েন? পছন্দ করেন?'


তাকিয়ে দেখে ট্রেনিং-এ ওর পাশে বসা ছেলেটি দাঁড়িয়ে সামনে, চোখ ওর হাতের খোলা বইয়ের দিকে। বইয়ের জগৎ থেকে বাস্তবে ফিরে আসতে একটু সময় নিল, তারপরে ভাল করে তাকালো সামনের ব্যক্তিটির দিকে। অত্যন্ত সাধারণ চেহারা, বৈশিষ্ট্য বলতে কিছুই চোখে পড়ে না, ভীড়ে দেখলে দাগ কাটবে না। বইটা বন্ধ করে এবার সরাসরি তাকায় আর তখনই নজর পড়ে সামনের জনের অন্য ধরণের চোখ দুটিতে। বুদ্ধিদীপ্ত, উজ্জ্বল অথচ শিশুর দৃষ্টি। কড়া করে উত্তর দেবে ভেবেও পারেনা, একটু যেন সংকোচের সঙ্গেই ঘাড় নাড়ে।


আর একটা বইয়ের নাম করে &হয়ষঢ়;ওটা পড়েছেন?' তাতেও ইতিবাচক উত্তর পেয়ে উৎসাহিত হয়ে পাশে বসে পড়ল, আশেপাশে দু একজন একটু অবাক হয়ে ইঙ্গিতপূর্ণ দৃষ্টিতে যে তাকাল ওদের দিকে তা খেয়ালই নেই!


সোলমেট!  সাইট ট্রেনিং শেষে বিচ্ছেদ, কিন্তু তাতেও ছিল একটা সুখের অনুভূতি। দুই জায়গায় দুজনে, মাঝে কয়েকশ মাইলের দুরত্ব। দিন শুরু হত চিঠির অপেক্ষায়, শেষ হত চিঠির উত্তর লিখে।  চিঠি লেখা অভ্যেসে দাঁড়িয়ে গেছিল, ই মেল শুরু হলেও চিঠি লেখা হতই। ক দিন মাস বছর যেন? অনন্ত! কতগুলো চিঠি? অগুন্তি! কালির লাল বা নীল রঙে আর সব রঙই ফিকে হয়ে গেছিল সেই সময়! আশেপাশে কিছু আর চোখে পড়ত না বা পড়লেও মনে ধরত না।


এমনি করে দিন যদি যায় যাক না&হয়ষঢ়;, কিন্তু সত্যিই তো আর দিন যেমন চায় সবাই তেমন করে যায় না। অন্তত চিরদিন তো নয়ই।


তাই কবে যেন একটু একটু করে চিঠির ভাষা বদলাতে শুরু করল। আসলে হাওয়ায় ভাসতে ভাসতে কখন পা দুটো ডাঙায় ঠেকছিল একটু একটু করে, টের পায়নি কেউই।  মিলের গুনতি শেষ হয়ে একদিন অমিলের পাতা খুলে গেল । আর গোণা শুরু হতে দেখা গেল সে ও কম নয়, ভাষা, সংস্কৃতি, বেশভূষা, ধর্ম, আচার, সে আরো কত কি, লিস্ট ফুরোতেই চায়না! তাই শেষ অবধি চিঠির পাটই ফুরোল।


শেষ চিঠি এল মেলে,চিঠিটা একটু অন্যরকম। শুরুতে ছবি, সোনালী জমির ওপর কালচে মেরুনে ছাপা, অমুক দিনে অমুকের ছেলে অমুকের মেয়ে এইসব আর কি! চি: সৌ: গণপতির ছবি! আর কিছু ফুটনোট, সেও আসলে একটা লিস্ট। ভাবনায় কি কি ভুল ছিল তার বিশ্লেষণ!


এরপরে কি হয়? ভুলে যেতে হয়, যার মনে সে নেই তাকে কি করে মনে ধরে রাখে! মেল দেখেই ডিলিট। আরে, কি যেন নাম মেয়েটার? খেয়ালই করা হয়নি। ফোন করে স্মার্টলি অভিনন্দন জানিয়ে দেবে কিনা এ সম্বন্ধে দিন দুয়েক চিন্তা ভাবনা চলেছিল, পরে কি ভেবে আর করা হয়নি। দিন কয়েক পরে একদিন বোধহয় রাত্রে জেগে উঠে বেশ কিছুক্ষণ কেঁদেও ছিল। পরের দিন যার সঙ্গে ফ্ল্যাট শেয়ার করে, তার মনে হয়েছিল ও অসুস্থ, ঠান্ডা লেগে গেছে। অফিসে যেতে মানা করছিল। ও শোনেনি, গেছিল অফিসে, মন দিয়ে কাজও করেছিল।


যখন একটা দুয়ার বন্ধ হয়ে যায় আরো অনেক খুলে যায়, ওর জীবনে এর মত সত্যি আর কিছুই নেই। এতদিন থাকত চিঠি দিয়ে বানানো এক অন্য ছায়াজগতে। এখন যেন ঘুম ভাঙল, অনেকটা সেই সোনার কাঠি রুপোর কাঠির ছোঁয়া রাজকন্যার মত। চারিদিকে এই প্রথম ভাল করে তাকাল, মানুষজন প্রকৃতি সবার দিকে। এতদিন মনে হত,এ জায়গায় থাকা তো দুদিনের জন্যে, তাই কোনো আত্মিক যোগাযোগ হয়নি। এবার সব দেখেশুনে আস্তে আস্তে ভাল লাগাতে শুরু করল এখানকার সব কিছুকে। কিছুটা পরিবেশ, কিছুটা নতুন বন্ধুদের সাহচর্য্য, অনেকটা কাজ ,ব্যস এটুকুই, আর দরকার ছিল ইরেজেবল মেমরী, মুছে গেল সব !


**********


এই দীর্ঘ পনেরো বছরে সব কত বদলে গেছে, চেনা হয়ে গেছে অচেনা। কত নতুন অজানার সাথে হয়েছে জানাশোনা। স্থান কাল পাত্র সবই পাল্টে গেছে এই জীবননাট্যমঞ্চের। সেও তো বদলে গেছে কত, অন্তত বাইরে থেকে। লোকে তো তাই বলে। তবু সেদিন লাঞ্চ ব্রেকে টহল মেরে ফেরার সময়ে অফিসের মেনগেটের সামনে দাঁড়ানো ছাইরঙা সোয়েটারে একজনের সাইড প্রোফাইল দেখে সেই অতীতের চব্বিশ বছর বয়সী হৃদয় যেন ধুকধুক করে ওঠে। রেলিং ধরে সামলে নেয় কোনোক্রমে। কাছে এসে মুখ ঘোরাতেই ভরা শীতে কুলকুল ঘামের আভাস সারা শরীরে। পরিচিত স্বরে নিজের নাম কানে শুনেও যেন বিশ্বাস হয় না। ভুলে যায়, এই মুহূর্তের জন্য কতভাবে নিজেকে তৈরী করেছে কতদিন ধরে, এয়ারপোর্টে, স্টেশনে, কত হঠাৎ দেখার কল্পনায়, নিজের সংলাপ রিহার্স করেছে কতবার। অথচ যখন সত্যিই পর্দা উঠল তখন সে নীরব, অ-প্রস্তুত।
ওদিকের সেই দৃষ্টির উজ্জ্বলতাও আর নেই। সময় যেন তার সমস্ত রং শুষে নিয়েছে।  সবচেয়ে বড় খবর হল এখন থেকে তার নতুন ঠিকানা, এই শহরেই,কাছেই! একা তো নয়, আছে আরও বন্ধু সাথে। সবারই অনেক কথা আছে, আছে অনেক কিছু জানার। সে শুধু নি:শব্দে সামনের খালি ধূ ধূ মাঠের পানে তাকিয়ে থাকে। 


&হয়ষঢ়;তুমিও সেই আমিও সেই, তবুও নই সে আগের কেউ!'


কেন এমনটা হয়? কেন কোন গল্পে কাহিনীতে জীবনের সত্যি ঘটনা লেখা হয়না? কেন জীবনের কাহিনীর শেষগুলো গল্পের মত হয়না? এতকাল পরে রাতদিন সব ওলোটপালট হয়ে যাচ্ছে, সমস্ত বিশ্বাস ধারণা চুরমার হয়ে যাচ্ছে। অথচ সেই ভাঙনের যন্ত্রণা সে উপলব্ধি করতে পারছেনা কেন? 


এতদিন কিছু মনে হয়নি, তবে আজ রাতে কেন, কেন, কেন? ইরেজেবল না স্লিপিং মেমরী? না:, এ প্রশ্নের মীমাংসা না করলে হয়ত আরো অনেক রজনীই বিনিদ্র কাটবে এবার থেকে। উঠে বসে অন্ধকারে একবার ভাল করে সেই পনেরো বছর আগেকার প্রতিটা মুহূর্ত মনে করতে লাগল, চিঠি না পড়েও চিঠির শব্দগুলো চোখের সামনে ভেসে উঠছে। কখানাই বা ছিল, হাজার দুহাজার তো আর নয়! কেনই বা রেখেছে ঐ সুন্দর মীনাকারির বাক্সে সুগন্ধ মাখিয়ে যত্নসহকারে? ভাল করে ভাবতে বসে সে আজ এই রাতে, এত অসংখ্য রাতের পরে। চেনা শহর, এয়ারপোর্টে, স্টেশন প্ল্যাটফর্মে, ট্রেনে বা প্লেনে, উৎসুক হয়ে কিছু না ভেবেই যখন অন্য যাত্রী বা পথচলতি লোকেদের দিকে তাকিয়েছে, মনের গহীনে মন তখন কাকে খুঁজেছে! প্রতিদিন সকালে অফিসে এসে যখন মেল খুলেছে, তখনও কোন পরিচিত মেল অ্যাড্রেস সেন্ডারে দেখতে চেয়েছে? কে জানে! আবার কখনও কমন বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হলে,কথোপকথনে তড়িঘড়ি বিষয় থেকে বিষয়ান্তরে গেছে, কেন?


এই রাতের নির্জনতায় অন্তরমহলের দরজাটা হাট করে খুলে দিতে চায় সে, অন্তত: নিজের কাছে। তবে কি যা গেছে তা যাবারই ছিল, যা রয়ে গেছে তাই চিরন্তন!  এই তো আছে সে, তার মত করে, হৃদয় ভরে নিয়ে শিউলি আর চন্দনের গন্ধে! আর যা যেভাবেই থাক তার কিছু এসে যায় না!


এখনও সকাল হল না, ঘুমটা পুরোপুরি উধাও। স্বপ্নও দেখা হয় না আজকাল, আসেই না, এমনকি এক আধটা দু:স্বপ্নও নয়! চোখ বন্ধ করে রাতের আওয়াজ শুনতে থাকে। সবচেয়ে জোরে শোনা যায় দেওয়াল ঘড়ির টিকটিক আর একটু কম জোরে তার হার্টবীটের শব্দ, একেবারে এক অন্য সুরে! শুয়ে শুয়ে আস্তে আস্তে অনুভব করে চারিদিকের অন্ধকার তার মধ্যে প্রবেশ করছে, একটা ঘন কালো যেন গ্রাস করতে থাকে তার সমস্ত সত্তাকে। প্রথমটায় ভয়ে চোখ বুজে ফেলে, কিন্তু এভাবে বেশীক্ষণ থাকা যায় না। বুকের ওপর দুটো হাত আড়াআড়ি রেখে প্রাণপণ চেষ্টা করে চোখ খোলে, তখনই চোখ চলে যায় সামনের জানালার ওপারে, আকাশপানে। একঝাঁক তারা টিমটিম করে জ্বলছে, আগে কেন চোখে পড়েনি! তারাদের আলোতে অন্ধকার টা কেটে আসে। এখন শুধু অপেক্ষা, এই মনখারাপের রাত শেষ হওয়ার অপেক্ষা। সে নিজেকে তৈরী করতে থাকে ভোরের আলোর জন্য!


************