আপনার মতামত         




জ্যাঠামশায় ও শ্রীবিলাস


বৈজয়ন্ত চক্রবর্তী



সন্ধ্যার অন্ধকার ক্রমে গাঢ় হইয়া আসিতেছে। তাঁহার ক্ষুদ্র কামরাটির এক কোণে একটি সেজবাতি জ্বালাইয়া জ্যাঠামশায় পড়িতেছিলেন। এমন সময় দরজার সম্মুখে একটি ছায়ার অনুভব হইল। মুখ তুলিয়া দেখেন শ্রীবিলাস দাঁড়াইয়া আছে। জ্যাঠামশায়ের মুখ স্মিতহাস্যে ভরিয়া উঠিল। হাসিয়া বলিলেন, &হয়ষঢ়;দেখে যেন মনে হয় চিনি উহারে'।

শ্রীবিলাস । অনেকদিন আপনার সাথে দেখা করা হয় নি। আজ নববর্ষের প্রণাম করতে এলাম।
জেঠামশায়। কেন বল তো শ্রীবিলাস? শ্রদ্ধেয়কে প্রণামের প্রথার বিরুদ্ধে আমি আর কিছু বলি না। কিন্তু বাংলা নববর্ষের প্রণাম কেন? বাঙালীর নববর্ষ এখনও কি তোমার কাছে খুব অর্থবহ মনে হয়?
শ্রীবিলাস । অতশত জানি না, কিন্তু আপনাকে প্রণাম আমি করবই।
জেঠামশায়। তা অবশ্যই করবে, হাত খুলে করবে, প্রাণ ভরে করবে।

শ্রীবিলাস জ্যাঠামশায়কে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করিল।

জেঠামশায়। দামিনীর ডায়েরিতে একটা কথা লেখা ছিল শ্রীবিলাস । তোমার প্রণাম পেয়ে হঠাৎ সেই কথাটা মনে পড়ল।
শ্রীবিলাস । কোন কথাটা জ্যাঠামশায়?
জেঠামশায়। আমরা আমাদের ধারণ করি।
শ্রীবিলাস । অর্থাৎ?
জেঠামশায়। এই যে তোমাদের রবিবাবু- ভদ্রলোকের স্ত্রী পুত্র কন্যা একের পর এক মারা যাচ্ছেন। অথচ ভদ্রলোক দমছেন না। লিখছেন, গাইছেন, স্কুল বসাচ্ছেন, থেমে থাকছেন না এক মুহূর্তের জন্য। কেন বল তো?
শ্রীবিলাস । উনি তো মৃত্যুকে জয় করার কথাই বলতেন জ্যাঠামশায়। &হয়ষঢ়;তবুও শান্তি, তবু আনন্দ, তবু অনন্ত জাগে'।
জেঠামশায়। ঠিকই বলেছ। ভদ্রলোকের একটা প্রবল আস্তিক্যবোধ ছিল। কিন্তু মার্ক্সের ব্যাপারটা? ১৮৪৯ সালে ভদ্রলোক সস্ত্রীক লন্ডনে গিয়ে ডেরা বাঁধলেন। তারপর একদিকে হতদরিদ্র অবস্থা, অন্যদিকে ক্রমাগত ছেলেমেয়েদের মৃত্যু। সেই সময় ভদ্রলোক বৃটিশ লাইব্রেরি গিয়ে দিনের পর দিন পড়ছেন আর লিখছেন। কেন?
শ্রীবিলাস । প্যাশন।
জেঠামশায়। তাড়না? না হে শ্রীবিলাস, ঐ সময় যে বইটির খসড়া তৈরি হচ্ছে সেই বইটির নাম জানলে তুমি আর এই কথা বলতে না। স্রেফ প্যাশনের ভরে &হয়ষঢ়;ফিরে এসো চাকা' হয়, &হয়ষঢ়;ডাস কাপিটাল' লেখা যায় না।
শ্রীবিলাস । তাহলে?
জেঠামশায়। ধর্ম।
শ্রীবিলাস । আপনার মুখে ধর্ম?
জেঠামশায়। এ ধর্ম সে ধর্ম নয় শ্রীবিলাস ।
শ্রীবিলাস । তাহলে কি আপনি বলছেন মার্ক্সবাদও হিন্দু-মুসলমান ধর্মের মত আর একটা ধর্ম, মানে অনেকে যেমন বলে?
জেঠামশায়। না শ্রীবিলাস, আমি বলছি ব্যক্তির ধর্মের কথা। স্বভাববৈশিষ্ট্য, যা ধারণের পাত্র, এবং নৈতিকতা, যা আমরা ধারণ করি। যুধিষ্ঠিরের যুগে ধর্ম এই অর্থেই বোঝানো হত। আর এখন আমরা যাকে ধর্ম বলি, তা হল cultus deorum- ঈশ্বরের পূজা।
শ্রীবিলাস । মার্ক্স নিজে কিন্তু &হয়ষঢ়;নৈতিক কর্তব্য' নিয়ে পরিহাস করেছেন, বলেছেন "bourgeois prejudices"
জেঠামশায়। মার্ক্স অনেক কিছু নিয়েই পরিহাস করেছেন। মতাদর্শ নিয়েও পরিহাস করেছেন। মার্ক্সের মৃত্যুর পরে এঙ্গেল্‌সের লেখা কিছু চিঠি পড়ে দেখো। কিন্তু নৈতিক কর্তব্য বলে যদি কিছুই না থাকে, তাহলে এত কষ্টের সাধনা কেন? মার্ক্সের প্রিয় আপ্তবাক্য ছিল- "Nihil humani a me alienum puto - I consider that nothing human is alien to me", এবং "De omnibus dubitandum- you must have doubt about everything" । এটা নৈতিকতা নয়? তবে মার্ক্সকেও এই কথা কেউ জিজ্ঞাসা করেন নি, আর মার্ক্সের নিজেকে নিয়ে এত ভাববার সময়ও ছিল না। আমাদের মত মানুষের হাতে অখন্ড অবসর, তাই এই সব উল্টোপাল্টা কথা ভাবি।
শ্রীবিলাস । কিন্তু ধর্ম বা নৈতিক কর্তব্য ইত্যাদি শব্দের পিছনে একটা অযৌক্তিক absolute -এর ছায়া দেখি। আপনি তো নিজে যুক্তি ছাড়া কিছুতে বিশ্বাস করেন নি।
জেঠামশায়। দেখো, কি অনায়াসে তুমি যুক্তি আর বিশ্বাস- শব্দ দুটি পাশাপাশি বসিয়ে দিলে! ফরাসী বিপ্লবের সময় কিন্তু সত্যি সত্যিই যুক্তির দেবীমূর্তি কল্পনা করে তাকে পূজা করার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। এ যুগের ক্রিস্টোফার হিচেন্স বা রিচার্ড ডকিন্সের লেখায় যুক্তিপূজার যুগের ছায়া দেখতে পাবে। ধর্ম শব্দটিতে যখন তোমার কিন্তু-কিন্তু লাগছে, তখন জীবনদৃষ্টি বা জীবনবোধ শব্দটি ব্যবহার করলে কেমন হয়?
শ্রীবিলাস । জীবনের জন্য জীবনদৃষ্টির কি একান্তই প্রয়োজন?
জেঠামশায়। বেঁচে থাকা আর টিঁকে থাকার মধ্যে একটা বড়ধরণের তফাৎ আছে যে শ্রীবিলাস । টিঁকে থাকার জন্য বস্তুত: বিশেষ কিছুরই প্রয়োজন নেই। তুমি ওরহান পামুকের লেখা পড়েছ?
শ্রীবিলাস । কিছু কিছু। বেশি না।
জেঠামশায়। দাঁড়াও, বইটা নিয়ে আসি।

তাঁহার অতিপুরাতন দেরাজ হইতে জ্যাঠামশায় একটি বই লইয়া আসিলেন।

জেঠামশায়। পামুক যখনই ইস্তানবুল নিয়ে লেখেন, একটি শব্দ বারবার ফিরে আসে- হুজুন। হুজুন মানে বিষাদ। প্রাচ্যের অটোমান সাম্রাজ্য ভেঙে গেছে, আতাতুর্কের স্বপ্নের পশ্চিমী রিপাবলিক গড়ার কাজ চলছে। ইস্তানবুল তাই একটা আজব শহর। আধা এশিয়া, আধা ইউরোপ; আধা পূর্ব, আধা পশ্চিম; আধা সেকুলার, আধা ধর্মীয়; আধা অটোমান, আধা আতাতুর্ক। এই টানাপোড়েনের মাঝের শূন্যতার হুজুন শহরটাকে ঢেকে রাখে। দাঁড়াও, তোমায় পড়ে শোনাই পামুক &হয়ষঢ়;ইস্তানবুল' বইটিতে &হয়ষঢ়;ধর্ম', মানে সাবেকী ধর্ম, " religion" নিয়ে কি লিখছেন,- "...but in the secular fury of Ataturk's new republic, to move away from religion was to be modern and Western; it was a smugness in which there flickered from time to time the flame of idealism. But that was in the public; in private life, nothing came to fill the spiritual void. Cleansed of religion, home became as empty as the city's ruined yalis and as gloomy as fern-darkened gardens surrounding them" এর আর একটু পরে পামুক লিখছেন - "Everyone talks openly about mathematics, success at school, football and having fun, but they grapple with the most basic questions of existence- love, compassion, religion, the meaning of life, jealousy, hatred- in trembling confusion and painful solitude"
শ্রীবিলাস । সার্ত্র?
জেঠামশায়। শুধু সার্ত্র কেন? হেগেল,মার্ক্স, কিয়ের্কগার্ড, হাইডেগার- সার্ত্রর néant , মার্ক্সের alienation , কিয়ের্কগার্ডের angst । বেচারি ঈশ্বর মারা গেছেন। পড়ে আছি &হয়ষঢ়;আমি'। আগে ঈশ্বরতদ্‌গতচিত্ত হয়ে বেশ নিশ্চিন্ত ছিলাম। এখন এই একলা &হয়ষঢ়;আমি' নিয়ে কি করব বুঝে পাই না। অস্তিত্বের যন্ত্রণা। কিয়ের্কগার্ড লিখলেন "Sickness Unto Death" । তবে দার্শনিকদের শূন্যতার উচ্চারণে খামতি থেকে যায়। আইরিস মার্ডক যেমন বলেন "At the level of "human life begins on the other side of despair" we are hearing the voice of cheerful spectator" . এ যেন বিষাদকে গ্যালারি থেকে দেখা। রোমান্টিকরা এই সর্বনাশটি করেছেন। ক্লাসিকদের বিষাদবিলাসও ছিল না, মর্ষকামও ছিল না। ইডিপাস যখন জানেন যে তিনিই তাঁর গর্ভধারিণীর শয্যাসঙ্গী ও প্রেমিক, সেই বীভৎস শূন্যতার সামনে এ যুগের বিষাদবিলাস লজ্জায় মুখ ঢাকে। এখন বিষাদও একটা ঘোর জ্বরাচ্ছন্ন শরীরের নেশাতুর ভালোলাগার মত।
শ্রীবিলাস । বুদ্ধও শূন্যতার কথা বলেছেন।
জেঠামশায়। পশ্চিম শূন্যতাকে দেখেছে বিষাদের কেন্দ্রস্থলে, জীবনের অর্থহীনতায়। সেখানে ব্যাধি-জরা-মৃত্যু থেকে শূন্যতার জন্ম। বুদ্ধ শূন্যতাকে দেখেছেন অস্তিত্বের কেন্দ্রবিন্দুতে, জীবনের অর্থপূর্ণতায়। তিনি শূন্যতাকে ব্যবহার করছেন ব্যাধি-জরা-মৃত্যুর দু:খের বিরুদ্ধে আয়ুধরূপে। যে নিজের দু:খ নিয়েই আজীবন গুমরে মরল, সে অন্যের দু:খ নিয়ে ভাববে কখন? সে নিজেকে যদি ভুলতে পারে, সে নিজের দু:খকেও ভুলতে পারবে। রবিবাবু মোদ্দা কথাটি নিজের মত করে বুঝিয়ে দিয়েছেন- 'আমি যে আছি সেই থাকার মূল্যই হচ্ছে অহংকার। এই মূল্য যতক্ষণ নিজের মধ্যে পাচ্ছি ততক্ষণ নিজেকে টিঁকিয়ে রাখার সমস্ত দায় সমস্ত দু:খ অনবরত বহন করে চলেছি। সেইজন্য বৌদ্ধরা বলেছে, এই অহংকারটাকে বিসর্জন করলেই টিঁকে থাকার মূল মেরে দেওয়া হয়, কেননা তখন আর টিঁকে থাকার মজুরি পোষায় না।' তখন বরং টিঁকে থাকার মজুরি জোগাড় করার থেকে বেঁচে থাকার সামান্য প্রাপ্তিকেই বেশি মূল্যবান মনে হয়। বেঁচে থাকার প্রাপ্তি কিভাবে পাবে মানুষ? বুদ্ধ বললেন, তোমার নিকটজন, তোমার সমাজ ও তোমার পৃথিবীর জন্য কিছু ন্যূনতম কর্তব্যপালন কর। সেটাই হল ধম্ম।
শ্রীবিলাস । তাতে লাভ?
জেঠামশায়। ডাস কাপিটাল লিখে মার্ক্সের যে লাভটুকু হয়েছিল।
শ্রীবিলাস । না জ্যাঠামশায়, আমি ঠিক তা বোঝাতে চাই নি। আমি বলছিলাম, গোটা ব্যবস্থাই যখন ভ্রষ্ট, তখন এককের নৈতিক কর্তব্যপালনে কি লাভ?
জেঠামশায়। অসম্ভাব্যতার কথা ভেবেচিন্তে কেউ তো কর্তব্যপালন করে না শ্রীবিলাস । তোমার পিতা বা মাতা যখন কোনো মারণরোগের শিকার হয়েছেন, তখন কি তুমি তাঁদের সেবা করবে, নাকি &হয়ষঢ়;যাই করি মরবেই তো' ভেবে শ্মশানযাত্রার বন্দোবস্ত করবে? ব্যক্তিগত নিষ্ঠার কথা উঠলে সিস্টেমের দোহাই পাড়াটা আমার মনে হয় একরকমের ফাঁকিবাজি। একজন বুদ্ধ অজাতশত্রুর নিষ্ঠুর সাম্রাজ্যবিস্তার বন্ধ করতে পারেন না ঠিকই, কিন্তু সমাজে শুধু একশজন অজাতশত্রু থাকলে সেই সমাজটাও খুব একটা শান্তিপ্রিয় গণতন্ত্র থাকে না।
শ্রীবিলাস । কিন্তু যখন এক শ্রেণী অন্য শ্রেণীকে ক্রমাগত শোষণ করে, তখন ব্যক্তিগত ধর্মপালনের মূল্য কতটুকু?
জেঠামশায়। দেখো শ্রীবিলাস, মার্ক্স এ কথা কখনই বলেন নি, যদি বিপ্লবে যোগ দাও, তাহলে তোমার চুরি-জোচ্চুরি-খুন-ধর্ষণ সব সাতখুন মাপ। বরং তাঁর বিরোধীদের অসতততা বা নিষ্ঠুরতা দেখলেই কলম হাতে বাঘের মত ঝাঁপিয়ে পড়তেন। তাঁর লেখার অনেক অসম্পূর্ণতার মত ব্যক্তিগত নৈতিকতা নিয়ে আলোচনার অনুপস্থিতিও অন্য আর এক অসম্পূর্ণতা। কিন্তু এই অনুপস্থিতিকে নৈতিকতার বিরোধিতা বা না-নৈতিকতার পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে অনেক পরে, বিংশ শতাব্দীতে। এই রাজ্যেরই এক নকশাল নেতা দীপাঞ্জনবাবু তাঁর স্মৃতিচারণায় লিখছেন- 'অপরিণতবুদ্ধি, ক্ষুদ্রহৃদয়, সংকীর্ণ স্বার্থবেষ্টিত আমার মতো অনেক ছেলেমেয়েই [....] ছাত্রযুব আন্দোলনের সংস্পর্শে এসে মনুষ্যত্বের বাতিঘরের আলোয় দেখতে পেয়েছে জীবনজিজ্ঞাসার উত্তর খোঁজার পথ। ' আমাদের মত বৃদ্ধ ভাববাদীরা &হয়ষঢ়;মনুষ্যত্বের বাতিঘর', &হয়ষঢ়;জীবনজিজ্ঞাসা' শব্দগুচ্ছ না হয় ব্যবহার করতে পারে, কিন্তু বস্তুবাদে দীক্ষিত একজনের লেখায় শব্দগুলো অদ্ভুত ঠেকছে না? যতই বেমানান ঠেকুক, যে নিজেকে অতিক্রম করে বৃহত্তর লক্ষ্যে পৌঁছাতে চায়, তার পথ ঠিক-ভুল যাই হোক না কেন, তাঁকে তো তাঁর স্বধর্মে স্থিত হতেই হবে। ব্যক্তিগত নৈতিকতার কোনোরকম উচ্চারণ ছাড়া তো সামাজিক নৈতিকতা তৈরি হয় না। ভাস্লাভ হাভেলের একটা বইতে পড়েছিলাম- "...such a change will have to derive from human existence, from the fundamental reconstitution of the position of the people in the world, their relationships to themselves and to each other, and to the universe. If a better economic and political model is to be created, then perhaps more than ever before it must derive from profound existential and moral changes in society"
শ্রীবিলাস । জ্যাঠামশায়, আজকের কম্পিটিটিভ পলিটিক্সে আপনার কথাগুলো কিন্তু বেখাপ্পা শোনাচ্ছে। বলা যায় না, কোনো দুর্বিনীত হয় তো বলেই বসল, জ্ঞান দেবেন না মশায়।
জেঠামশায়। ঐ বেমানান ব্যাপারটা আমি স্বীকার করেই নিয়েছি শ্রীবিলাস । ধরে নাও ওটাই আমার স্বধর্ম। যে যুগে যে রাজ্যে স্বধর্ম মানেই দলধর্ম, সে যুগে সে রাজ্যে না হয় জলজ্যান্ত ইডিওসিনক্রেসি হয়েই বেঁচে রইলাম। &হয়ষঢ়;ফল ফলাবার আশা আমি মনেই রাখি নি রে'।
শ্রীবিলাস । কিন্তু এখন তো দলধর্মের বিরুদ্ধেও প্রতিবাদ হচ্ছে?
জেঠামশায়। স্বধর্মপালন তো আত্মপ্রসাদ লাভের জন্য নয় শ্রীবিলাস । একশ পীরে দরগায় ঢিল বাঁধা ছেড়ে মায়ের থানে হত্যে দিলে প্রতিবাদধর্ম পালন করছি বলে আত্মপ্রসাদ লাভ হতে পারে বটে, কিন্তু তার সাথে জাতির বৃহত্তর মঙ্গলাকাঙ্খার যোগ সামান্যই। ইদানীং প্রতিবাদ দেখে আমার চন্দ্র সওদাগরের জেহাদ মনে পড়ে যায়। শিব ছেড়ে মনসা, মনসা ছেড়ে শিব। অন্ধ বোঝে না এই ধরা-ছাড়ার নাগরদোলার মধ্য দিয়ে সে ক্ষমতার সিংহাসনে আষ্টেপৃষ্টে নিজেকে বেঁধে ফেলেছে। এই অন্ধকার চম্পকনগরীতে আবার নববর্ষ কেন শ্রীবিলাস?

বাহিরে তখন সন্ধ্যার আকাশ গাঢ় অন্ধকারে ঢাকিয়া গিয়াছে। ঘরের বাতিটির তেজ ক্রমে মৃদু হইয়া আসিল। কিয়ৎক্ষণ নীরবতার পরে শ্রীবিলাস বৃদ্ধকে পুনরায় সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করিয়া দরজার দিকে পা বাড়াইল। বৃদ্ধ আশীর্বাদের ভঙ্গীতে দক্ষিণহস্ত প্রসারিত করিয়াও হাত গুটাইয়া নিলেন, চক্ষু বুজিয়া ফেলিলেন। শ্রীবিলাস দরজা অবধি পৌঁছিয়া কি মনে করিয়া ফিরিয়া দাঁড়াইল। বলিল- 'জ্যাঠামশায়, দামিনীর ডায়েরিতে আরও একটি কথা লেখা ছিল - &হয়ষঢ়;আমাদের ঈশ্বর হাসেন'। '




সূত্রাবলী:

চতুরঙ্গ- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
কালান্তর- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ষাট সত্তরের ছাত্র আন্দোলন- সম্পাদনা: অনিল আচার্য
Istanbul: Memories of a City- Orhan Pamuk
Marx- Andrew Collier
Metaphysics as a Guide to Morals- Iris Murdoch
Living in Truth- Vaclav Havel