আপনার মতামত         


ন্যানো বিষয়ক
সৈকত বন্দ্যোপাধ্যায়

ভূমিকা
----------
ন্যানো একটি গৃহপালিত গাড়ি। ইহার চারটি চাকা, একটি স্টিয়ারিং, একটি ইঞ্জিন। লেজ বা ডিকি নেই। বসার জায়গা চারজনের হলেও বসতে পারবেন মিনিমাম পাঁচজন জনতা, এই জন্য একে জনতার গাড়ি বলা হয়। জনতা মানে জনতা পার্টি নয়, জনতা মানে মুষ্টিবদ্ধ হাত। জনতা মানে গোবিন্দার ছবি। জনতা মানে রক্তের রঙ লাল, ওয়েভ লেংথ চারশো ন্যানোমিটার। জনতা মানে ক্ষমতা। জনতা মানে ইতিহাস।

ন্যানোর ইতিহাস সুপ্রাচীন। ন্যানো একটি তৎসম শব্দ। "অ-ন্যানো' শব্দটি থেকেই বাংলা ভাষায় "অন্যান্য' শব্দটির উদ্ভব। "অন্যান্য'কে এই জন্য তদ্ভব শব্দ বলে, এবং ন্যানো ব্যতীত বাকি গাড়িগুলিকে অন্যান্য বলা হয়। আজ পর্যন্ত মানবজাতির অগ্রগতির ইতিহাস হল ন্যানোর কাছে অন্যান্যর পরাজয়ের ইতিহাস। চাকা আবিষ্কারের পর গ্রামবাংলায় সুপুরির খোল উঠে গেছে, দেশলাই এর পর চকমকি। স্টিম ইঞ্জিনের পর গরুর গাড়ি। আর ন্যানো আবিষ্কারের পর অন্যান্যরা উঠে যাবে। ইহাই ইতিহাসের শিক্ষা। গ্রাম থেকে শহর হবে, কৃষি থেকে শিল্প, মিনি থেকে মাইক্রো, মাইক্রো থেকে ন্যানো, ইহাই অগ্রগতির পথ। অ্যাদ্দিন ভুখা জনতা শপিং মলে আর টেনিস কোর্টে মিনি আর মাইক্রো (স্কার্টের) খেলা দেখে আঙুল চুষেছে,এবার নিজের ন্যানো নিজে চড়বে। ন্যানো যার রাস্তা তার। এই গাড়ি গ্রাম-শহরের ব্যবধান ঘুচিয়ে দেবে যাবে। ধনী-দরিদ্রের তফাত মুছে দেবে। মানবের চিরমুক্তি হবে। শত পুষ্প বিকশিত হবে। সাইকেল-বাইক-ভ্যান-রিক্সা দেহ রাখবে, অটো উঠে যাবে লাটে,ধদ্ধড়ে বাসগুলো রিটায়ার করে হাঁফ ছেড়ে বাঁচবে, অফিস টাইমের বনগাঁ লোকাল খাঁখাঁ করবে,হাটে-মাঠে জলে-জঙ্গলে শুধু চরে বেড়াবে লক্ষ লক্ষ ন্যানো।

ভবিষ্যতের সুখকল্পনা নয়, এর নাম ইতিহাসের বীক্ষা। যুক্তিবাদী দৃষ্টিভঙ্গী। ইতিহাস মানে শুধু বস্তাপচা অতীতের গালগল্প না, ইতিহাস হল অতীতের উপর ভর রেখে ভবিষ্যত দেখার বিজ্ঞান। একে ন্যানোটেকনোলজি বলে। এই বিজ্ঞান আয়ত্ব করা সহজ না। করতে গেলে প্রচুর কাঠখড় পোড়াতে হয়। তপস্যা করতে হয়। ন্যানোটেকনোলজি ব্যবহার করেই রামের জন্মের আগেই রামায়ণ লিখেছিলেন বাল্মীকি, পাঁচশ বছর আগেই হিটলারের কথা বলে গেছেন নস্ট্রাডামুস। এই বিদ্যা প্রয়োগ করে, প্রাচীন ভারতের মুনিঋষিরা বলেছিলেন ন্যান্যো: পন্থা। অর্থাৎ ন্যানো ছাড়া পথ নাই। রাস্তাই একমাত্র রাস্তা। এই কারণে তাঁদের মহর্ষি বলা হয়।

আজ মহর্ষিরা নেই। কিন্তু তাঁদের অধীত দিব্যজ্ঞান পড়ে আছে। ন্যানোবিষয়ক স্বপ্ন পড়ে আছে। তাঁদের জ্ঞান আমাদের ভিত্তি। তাঁদের স্বপ্ন আমাদের ভবিষ্যত।

ন্যানোর স্বপ্ন
--------------
ন্যানো তাই শুধু গাড়ি নয়। চড়ে বসে স্বপ্ন দেখার এক ডিভাইসের নাম। ন্যানোর স্ত্রীলিঙ্গ ন্যানি। যে মহিলারা ছানাপোনাদের কোলে চড়িয়ে স্বপ্ন দেখান, স্বপ্ন দেখিয়ে ঘুম পাড়ান, এই কারণে তাঁদেরও ন্যানি বলা হয়। ন্যানি বলেছেন, ন্যানো এক জঙ্গী কার / দিন বদলের অঙ্গীকার। ন্যানির কোলে চড়ে এবার বিপ্লব আসবে জগতে। অটোমোবাইল সেক্টরে মহাপ্লাবন হবে, কম্পিটিশানের চূড়ান্ত হবে, সস্তা গাড়িতে ছেয়ে যাবে দুনিয়া। জলের দরে পেট্রল পাওয়া যাবে, আর ভাঙা সাইকেলের দামে চার চাকা গাড়ি। ব্যাঙ্কগুলো ঝুলি উপুড় করে দেবে, ফিন্যান্স কোম্পানির টাই-পরা এক্সিকিউটিভ দুপুর-রোদে ঘামতে-ঘামতে গাঁয়ের রিক্সাওয়ালাকে "একটা গাড়ি নেবেন স্যার' বলে হাতেপায়ে ধরাধরি করবে, চাষিভাই গাড়ু নিয়ে ভোররাতে মাঠে যাবে গাড়ি চড়ে, "দেরি হল কেন' বলে কাজের লোককে ধমকালে সে তেরিয়া হয়ে "কি করব মাসীমা, ন্যানোটা ব্রেকডাউন হয়ে গেল যে' উত্তর দেবে। আকাশে দেখা যাবে মেরুন রামধনু, চাঁদ উঠবে, ফুল ফুটবে,আকাশ থেকে একদিন পুষ্পবৃষ্টি হবে, ধরাধামে হেনরি ফোর্ডের পুনর্জন্ম হবে। চাঁদের আলোয় জনতা "আমার স্বপ্ন যে সত্যি হল আজ' বলে হাত-ধরাধরি করে কোরাস গাইবে।

শুধু আশা নয়, এ এক প্রতিজ্ঞা, যে, পোড়া দেশে একদিন রামরাজ্য হবে। পাড়ার মোড়ে-মোড়ে ম্যাকডোনাল্ডস হবে, হাফ প্যান্ট আর বিকিনি টপ পরে রকে বসে ছেনালি করবে টেঁপিসুন্দরী। দেশজুড়ে ছয় লেনের রাস্তা হবে, সাঁইসাঁই করে গাড়ি চলবে, হুডখোলা লাল টুকটুকে ফেরারি চালিয়ে সক্কালে মাথাভাঙা থেকে লং ড্রাইভে সন্ধ্যের আগেই পৌঁছে যাওয়া যাবে বঙ্গোপসাগরতীরের রিসর্টে। "সাগরের তীরে হবে সৈকতাবাস/জলকেলি করবে জুলিয়া রবার্টস। চামড়া সেঁকবে শ্যারন স্টোন/বকখালি হবে বৃন্দাবন।' কবির এই স্বপ্ন একদিন সত্যি হবে। এ আমাদের দৃঢ় অঙ্গীকার।

সামাজিক প্রভাব
-----------------
শুধু সুখস্বপ্ন নয়, ন্যানির স্বপ্ন সামাজিক ক্ষত নিরাময়ের এক অব্যর্থ পদ্ধতিও। একে ইউন্যানি পদ্ধতি বলা হয়। এ নিয়ে অনেক থিয়োরি আছে। শুধু নিজে স্বপ্ন দেখলেই হবেনা, জনতার সঙ্গে কমিউনিকেট করতে হবে, ফর্ম থাকলেই হবেনা, কনটেন্ট চাই, এই মর্মে ন্যানোপন্থী এক মহাপুরুষ অনেক বক্তৃতা দিয়েছেন, যা ইয়েন্যান বক্তৃতাবলী নামে খ্যাত। তাঁর শিষ্যরা ব্যাখ্যা করে বুঝিয়েছেন, যে, ফর্মে ইঁদুর সাদা হোক, বা কালো, তাতে কিছু আসে যায়না, আসল কথা হল কনটেন্ট দিয়ে সে বেড়ালের পেট ভরাচ্ছে কিনা। এই কারণে ইউন্যানি পদ্ধতিকে ম্যাওপন্থাও বলা হয়।

ন্যানো তাই ক্ষত নিরাময়ের এক সামাজিক অঙ্গীকার। মূর্খ ভারতাসী, দরিদ্র ভারতবাসী, মুচি-মেথর-চন্ডাল-চাষাভুষো ভারতবাসী, ন্যানোর ভাই। কবি বলেছেন "এইসব চাষা/ইহাদের ম্লানমুখে দিতে হবে ভাষা। এরা কাঁদে ক্যানো/এদের চড়িতে দাও ন্যানো।' ন্যানো তাই শুধু স্বপ্ন নয়, এক সামাজিক আন্দোলন। অন্যান্য বাজারি গাড়িগুলির সঙ্গে ন্যানোর প্রধান পার্থক্য হল, তারা লাভের জন্য চলে, আর ন্যানো চলে পেট্রলে। ন্যানোর লক্ষ্য জনকল্যাণ। মুনাফা নয়, জনসেবা। সংঘর্ষ নয়, নির্মান। অন্ধকার নয়, আলো। ব্যবসা ও সমাজকল্যাণের ধারণায় ন্যানো এক বিপ্লব এনেছে। যার নাম শিল্পবিপ্লব। ইতিপূর্বে সরকারি জিনিসপত্রেই শুধু ভরতুকি দেওয়া হত, তাতে প্রচুর চুরিচামারি হত। সরকারের টাকা, জনতার রক্তজলসম্পদ, খেয়ে নিত মধ্যসত্ত্বভোগী পিঁপড়েয়। ন্যানো এই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে এক সুতীব্র প্রতিবাদ। ন্যানোমডেলে ভরতুকির বদলে আনা হয়েছে এক বৈল্পবিক ধারণা, যার কেতাবী নাম ইনসেন্টিভ। আর ভরতুকি নয়, সরকারি পয়সায় আমলাদের হরির লুট নয়, এখন টাকা যাবে সোজা নিচের তলার সবহারা মানুষের কাছে। এখন জনকল্যাণ করবেন শিল্পপতি, আর লাগে-টাকা ইনসেনটিভ দেবে গৌরি সরকার। হরগৌরীর মিলন হবে, এক-দেহে-হল-লীন অর্ধনারীশ্বর হবে, চিরুনি থেকে স্পুটনিক, মালপোয়া থেকে জামদানি, সবই তৈরি হবে সস্তায়, পাতপেড়ে চেটেপুটে খাবে সর্বহারা, সরকারি পয়সায় সব্বাই সস্তায় ন্যানো চড়বে।

এই বৈপ্লবিক থিয়োরিটি আনয়ন-পূর্বক ন্যানো এক সামাজিক বিপ্লব সম্পন্ন করেছে। সুশীল সমাজে এটি ন্যানোর এক মৌলিক অবদান। মারদাঙ্গা চরমপন্থা এখন ইতিহাস। এখন ধীরে চলুন। ন্যানোস্টেপ মেপে পা ফেলুন। শান্তিপূর্ণ উত্তরণে বিশ্বাস রাখুন। শ্রেণীসংগ্রামের মুর্গিলড়াই নয়, মার্কেট ইকনমির ঘুড়ি-কাটাকাটি নয়, এ এক হাইব্রিড পদ্ধতি। এখন ভক্ত-ভগবানের লীলাখেলা হবে। বাজার-সরকারের ম্যাজিক রিয়েলিজম হবে। যুদ্ধুযুদ্ধু খেলা হবে, উলুখাগড়ার জমি যাবে, আর ভত্তুকি পাবে গাড়ি কোম্পানি। আবার বছর দুশো পরে এই পুণ্য ভারতভূমে হবে শিল্পবিপ্লবের রিপিট শো। এ ন্যানোতরঙ্গ রোধিবে কে?

দেশে ও বিদেশে
-----------------
শুধু দেশে নয়, ন্যানোতরঙ্গ এখন বিদেশেও। বিলেত-আমেরিকায়। বিলেত-আমেরিকাকে ইংরিজিতে ফার্স্ট ওয়ার্ল্ড বা উত্তম দুনিয়া বলা হয় এবং সেখানকার লোকেদের বলা হয় ফার্স্ট পারসন বা উত্তম পুরুষ। উত্তম পুরুষদের স্বীকৃতি ছাড়া পৃথিবীতে কোনো মহৎ কার্য হয়না। তাঁরা নোবেল দিয়েছিলেন বলে রবিঠাকুর বোলপুরে খাটা পায়খানা বানাতে পেরেছিলেন। তাঁদের হাততালি পেয়েই বিবেকানন্দ স্বামীজি হয়েছিলেন। আর স্বীকৃতি না পেয়ে মনোকষ্টে জগদীশ বোস রেডিও বানানো ছেড়ে দিয়েছিলেন। উত্তম পুরুষরা অহরহ মার্সিডিজ, ফোর্ড, টয়োটা ইত্যাদি হাইফান্ডা গাড়ি চালান, ভারতীয় গাড়ির নাম শুনলে নাক সিঁটকান। মঙ্গলকাব্যেও তাঁদের নাক উঁচু ভাবের হিন্টস পাওয়া যায় -- "যেই হাতে পুজি আমি টয়োটা সিয়েনা/ সেহাতে পুজিব ঐ চ্যাং মুড়ি কানা?' উত্তম দুনিয়া এক বিচিত্র জায়গা। সেখানে রাস্তায় লোক দেখা যায়না, সবাই একশ মাইল স্পিডে গাড়ি চালায়, সকালে নিউ ইয়র্ক থেকে বেরিয়ে সন্ধ্যেয় নায়াগ্রায় হাওয়া খেতে যায়। লোকে কথায় কথায় ডিভোর্স করে, বিকিনি পরে বেলেল্লাপনা করে, জলের মতো বিয়ার খায়, মুদির দোকানে ওয়াইন কিনতে যায় বিএমডাব্লিউ চড়ে,ভারতীয় গাড়ি নিয়ে "ডিকির জায়গায় ইঞ্জিন আর এসির জায়গায় হাতপাখা' বলে ঠাট্টা-ইয়ার্কি করে।

ন্যানো এই অবজ্ঞার যোগ্য জবাব। কবির অশ্রুজল মুছে দেবার প্রতিজ্ঞা। ন্যানোতরঙ্গ হেলায় কালাপানি পার করেছে। "ন্যানি স্টেট' নিয়ে ঠাট্টাতামাশা অতীত, বিলেত-আমেরিকায় এখন ন্যানো ঝড়। মাত্র আড়াই হাজার ডলারে নতুন গাড়ির কথা শুনে নাক-উঁচু সায়েবদের পিলে চমকে গেছে। বিলিতি কাগজে ন্যানো নিয়ে রীতিমত ভারিভারি প্রবন্ধ বেরিয়েছে, আমেরিকান নিউজে বাস্কেটবলের পরেই ন্যানো নিয়ে পাঁচ মিনিট আলোচনা হয়েছে। সে দেশের সুপারহিট মেগাসিরিয়ালের নাম এখন "সুপারন্যানি'। সিএনএনে দেখা গেছে ন্যানোর ঝিলিক, আলোকের এই ঝর্ণাধারায় ধুইয়ে দাও। দাম শুনে চোখ কপালে তুলেছে সাদা চামড়ার তরুণী। বিবিসির জায়েন্টস্ক্রিনে ন্যানোশরীরে ন্যানোবস্ত্রা সুন্দরীদের পাশে দেখা গেছে স্লিক ও স্লিম পুচকে গাড়িখানা। স্টেজের উপরে দেখা গেছে লাল-নীল লোডশেডিং আলো। ডানাকাটা পরীদের নৃত্য। আজ ন্যানোনামের বান ডেকেছে দূর আমেরিকায়। টাইটানিক ডুবুডুবু ইস্টকোস্ট ভেসে যায়।

এই স্বীকৃতি এনারাইদের গর্ব, চিনেদের ঈর্ষা। এতদিন চিনেরা সস্তায় মাল সাপ্লাই করে নাম কিনেছে, আজ ন্যানোর যুগ। আজ আমাদের গর্বের দিন। আনন্দের দিন। আমাদের তনুমন রোমাঞ্চিত, গায়ে কাঁটা, ঠোঁটে শিহরণ। কবি বলেছেন "এই বর অঙ্গ মম বঁধুয়া ছুঁয়েছে। মিডিয়া দেখেছে এ স্তনতিল।' গর্বে আমাদের এই ন্যানো ছাতি ফুলে ছত্তিরিশ, নাকে জল, চক্ষে আনন্দাশ্রু।

তবে শুধু স্বীকৃতিতে থেমে গেলেই চলবেনা। অনেকেই বলছেন শুধু স্বীকৃতিতেই তাঁরা সন্তুষ্ট নন। যেমন আইটিওয়ালা গণ। আইটিওয়ালারা আমাদের স্তম্ভ। তাঁরা কথায় কথায় বিলেত-আমেরিকা যান, টপাটপ ফ্ল্যাট কেনেন, হাইফান্ডা ইংরিজি বলেন,শুধু শয়ন ও রমনটুকু বাড়িতে সেরে দিনে আপিসে চোদ্দ ঘন্টা ডিউটি দেন। পাঁচে সিএমএম, ছয়ে সিগমা, সাতে সামুরাই, এইসব হিংটিংছট বকে পাড়ার মোড়ে ল্যাপটপ খুলে রেলা নেন। ন্যানো নিয়ে উচ্ছ্বসিত হলেও বিদেশী স্বীকৃতি নিয়ে তাঁদের বিশেষ মাথাব্যথা নেই। আইটির ভাষায়, স্বীকৃতি ভালো জিনিস, কিন্তু তা ধুয়ে খাওয়া যাবেনা, আসল কথা হল অর্থাগম। ভারতীয় আইটি একদিনে দেশের মুখোজ্জ্বল করেনি, তার জন্য অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। আত্মসন্তুষ্টির কোনো অবকাশ নেই, সে পর্যন্ত পৌঁছতে হলে ন্যানোকে অনেক পথ হাঁটতে হবে। ফুল ফুটুক না ফুটুক, ডলার এখনও আটতিরিশ। শুধু সস্তায় গাড়ি বানালেই হবেনা, আমেরিকায় এক্সপোর্ট করতে হবে। বাজার ধরতে হবে। বেচতে গেলে গায়ের চামড়া মোটা করতে হবে। মনে রাখতে হবে, ওরা আপিসবাবু আমরা হকার। ওরা ফ্ল্যাটবাড়ির মেজোকত্তা আমরা ফিরিওয়ালা। ওরা বনেদী ফিরিঙ্গী আমরা ফোতো কাপ্তান। ওরা অ্যাটম বোম বানায় আর আমাদের পান বিড়ির দোকান। দরকার হলে পায়ে পড়ে যেতে হবে। বডিশপিং, অর্থাৎ দেহব্যবসায় নামতে হবে। "বাবু দুটো টাকা দিন,দুটো পান এনে দিই,আর দুটো ছেলেকে অনসাইট পাঠাই, আপনার ন্যানোটা একটু মালিশ করে দিয়ে আসুক' বলে হাত কচলাতে হবে। তবেই মোক্ষ আসবে। লক্ষ্যে পৌঁছানো যাবে। তবেই ন্যানো জগৎসভায় শ্রেষ্ঠ আসন লবে।

ন্যানো ও কৃষকসমাজ
-----------------------
দু:খের বিষয়, এই কৃষিভিত্তিক দেশের আপামর কৃষকসমাজে ন্যানো নিয়ে তেমন আলোড়ন লক্ষ্য করা যাচ্ছেনা। অশিক্ষা এবং চেতনার অভাবই এর মূল কারণ, যে জন্য কৃষিসমাজ ন্যানোর প্রকৃত তাৎপর্য উপলব্ধি করতে অক্ষম। দেশের গরিষ্ঠ মানুষ এখনও অজ্ঞানতা ও অচেতনতার অন্ধকারে পড়ে আছেন, ন্যানোবিপ্লব নিয়ে তাঁদের বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা নেই। সারা দেশ মশা-মাছি-হকারে একশা,পঙ্গপালের মতো লোক গিজগিজ করছে, শহরের রাস্তায় বর্ষাকালে নৌকো আর বাকি সিজনে প্যাটন ট্যাঙ্ক চালালে ভালো হয়। অতএব ন্যানোর জন্য চাই হাইটেক রাস্তা, আর হাইটেক রাস্তার জন্য চাই জমি, এই সহজ সত্যটি তাঁরা বুঝতে পারছেননা। শুভকাজে জমি নিতে গেলেই তাঁরা কাজকর্ম ছেড়ে উচ্চফলনশীল ভূমিরক্ষাকমিটি ফলাচ্ছেন, শাবল-গাঁইতি-বোমা-বন্দুক নিয়ে তাড়া করছেন, রক্তারক্তি নন্দীগ্রাম করে দিচ্ছেন। নিজের ন্যানো নিজের ট্যাঁকে গুঁজে রাখো, চালাতে হলে নয়াচরে গিয়ে চালাও, এইসব বলছেন। নিজের মঙ্গল তাঁরা নিজেরা বুঝছেন না। এই পিছিয়ে পড়া মানসিকতার ফসল তুলছে কিছু দেশবিরোধী ও বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তি। তারা সুকৌশলে জনতার ক্ষোভে ইন্ধন দিচ্ছে, গোলমাল পাকিয়ে তুলছে, আমেরিকায় বসে ন্যানো নিয়ে ফক্কুড়ি করছে, দেশের উন্নতির সামনে বাধা তৈরি করছে।

এই চাপের কাছে নতিস্বীকার করলে হবেনা। ন্যানোবিরোধীদের মধ্যে অনেকে আছেন, যাঁরা অপপ্রচারের শিকার। অশিক্ষার অন্ধকারে ডুবে থেকে তাঁরা কুপ্রচারের সহজ লক্ষ্য হয়েছেন। এরা নিজের ভালো নিজেরা বোঝেননা, বয়সে আঠারো হলেও এরা চেতনায় অপ্রাপ্তবয়স্ক, তাঁদের ধরে বেঁধে নিজের ভালো বোঝাতে হবে। বোঝালেই অনেকে পথে আসবেন। বাকিরা, চক্রান্তকারী। দেশ ও দশের শত্রু। তাঁদের উচিত শিক্ষা দিতে হবে। কালো হাত ন্যানোর চাকার তলায় ভেঙে দিতে হবে।

কৃষককুলের অশিক্ষার সঙ্গে গোদের উপর বিষফোঁড়ার মতো আছে কিছু বুদ্ধিজীবীদের অকালপক্কতা। এই বুদ্ধিজীবীরা সর্বত্রগামী। এঁরা যা জানেন না সেইসব ব্যাপারে নাক গলান। দালি থেকে মাকালী, নন্দন থেকে নলবন, নিকারাগুয়া থেকে নন্দীগ্রাম, সর্বত্র তাঁদের জিরাফের মতো বড়ো গলাটি বাড়িয়ে দেন, এই কারণে তাঁদের চোরের মা বলা হয়। ন্যানো নিয়ে এঁদের নাক কুঁচকেই আছে। কৃষকরা যখন বৃহত্তর না ব্যক্তিস্বার্থ কোনটা আগে বুঝতে না পেরে নিজের জমি নিয়ে কনফিউশনে ভুগছেন, তখন এই বুদ্ধিজীবীরা ইনফিউশনে চুমুক দিয়ে সেই আগুনে ফু দিচ্ছেন। এঁরা বই না পড়েই রিভিউ লেখেন, ইতিহাসের বিজ্ঞান আয়ত্ত্ব না করেই রামায়ণ লিখতে যান, এবং ছড়িয়ে ছিটিয়ে লাট করেন। দেশে শিল্পায়নের অশ্বমেধ যজ্ঞ হচ্ছে বুঝেও "চাষার জমি নিয়ে নিলরে' বলে চেঁচামেচি করেন। ইতিহাস না পড়ার ফলে এঁরা জানেননা, যে, বড়োবড়ো কাজে ছোটোখাটো ক্যাজুয়ালটি হয়েই থাকে। লোকাল ট্রেনে উঠলেই বসার জায়গা পাওয়া যায়না। জয়েন্ট দিলেই সবাই ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হয়না। বোম্বে গেলেই সিনেমার অফার আসেনা। ইতিহাসের ভাষায় একে বলে কোল্যাটারাল ড্যামেজ।

ইতিহাসের গতি অমোঘ। ভবিষ্যৎবাণী অব্যর্থ। ইতিহাসে লেখা আছে জমি দিলেও সব চাষা গাড়ি চড়বেনা। ন্যানোপুজোর অশ্বমেধ যজ্ঞ শেষ হলে কারো কারো হাতে পড়ে থাকবে হারিকেন। কবি বলেছেন ওরা তখন কাজ করবে। নগরে বন্দরে। লালবাতি ভাটিখানায়। কাজ না পেলে ফ্যাফ্যা করে ঘুরবে। মানবকল্যাণের বিরাট যুদ্ধে এরা হল খুচরো ঝরাপাতা। আনফরচুনেট, বাট ইনেভিটেবল। দেশের জন্য ক্ষুদিরাম-প্রফুল্ল চাকী প্রাণ দিয়েছিলেন। কৃষককুলের এই আত্মত্যাগের কাহিনীও ইতিহাস বইয়ে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।

উপসংহার
---------------------
দেশময় অশিক্ষা এবং অচেতনতার এপিডেমিক, বুদ্ধিজীবীদের উন্নাসিকতা, কৃষিজীবীদের পিছিয়ে পড়া মানসিকতার অভিশাপ সত্ত্বেও ন্যানো দেশের সামনে ঘুরে দাঁড়ানোর এক সুযোগ এনে দিয়েছে। আজ সে সুযোগ কাজে লাগাতে হবে। আজ কথা নয়, শুধু কাজের সময়। ডু ইট নাও। আজ আমাদের প্রতিজ্ঞা করতে হবে, শুধু দেশে নয়, আমরা লঙ্কা জয় করব। পৃথিবীকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাব। আমরা ভোট দিয়ে তাজমহলকে সপ্তম আশ্চর্যের লিস্টিতে ঢুকিয়েছি, টিভির কম্পিটিশানে এসএমএস পোলে নিজের ক্যান্ডিডেটকে জেতাতে চুলোচুলি করে হাত পাকিয়েছি। এবার কেউটে ধরতে হবে। অলরেডি ওয়ার্ল্ড নিউজে হেডলাইন, এবার ন্যানোকে দুনিয়ার সেরা গাড়ি বানাব। ইন্টারনেটে ভোট হবে। পুরো একশ কোটি লোক ভোট দেবে। এক-জাতি-এক-প্রাণ। দরকার হলে চিনের সঙ্গে যুক্তফ্রন্ট গড়ব। ইন্টারনেটে দেয়াল লিখব। প্রক্সি দেব, সার্ভার জ্যাম করব। আমরা করব জয়।

কবি বলেছেন, বলো বীর বলো উন্নত মম শির। আজ এ ন্যানোতরঙ্গ রুধিবে কে?



কৃতজ্ঞতা : রোয়াক বইমেলা সংখ্যা ২০০৮