আপনার মতামত         


নিকোলাস সারকোজির আফ্রিকা
আচিয়ে মবেম্বে (অগাস্ট ৮ ২০০৭)
অনুবাদ -বোধিসত্ত্ব দাশগুপ্ত

লেখক ও রচনা পরিচিতি

গতবছর মাঝামাঝি সময়ে ফ্রান্সের নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতি নিকোলাস সার্কোজি, ডাকার বিশ্ববিদ্যালয়ে তরুণ ছাত্রছাত্রীদের সামনে একটি বক্তৃতা দেন। সার্কোজির রাজনৈতিক জীবনে বিতর্ক কোনদিনই কম পড়ে নি। তিনি গৃহমন্ত্রী থাকার সময়ে, ফ্রান্সে কৃষ্ণাঙ্গ অভিবাসীদের সমাজের "জঞ্জাল' ( ' rabble, scum or riff-raff(English) / voyous ,racaille(French) ' ) হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। তখন ফ্রান্সে রাষ্ট্রপতি ছিলেন চিরাক। এই মন্তব্যের জেরে রাস্তায় প্রচুর হাঙ্গামা হয়। জ্বলন্ত বা পোড়া গাড়ির ছবি দেশ বিদেশের সংবাদমাধ্যমে ছাপা হয়েছিল। সেই নিয়ে নতুন করে বর্ণ সংক্রান্ত বিতর্ক শুরু হয়। পরে সার্কোজি প্রথম সরকারি সফরে এসে ডাকার বিশ্ববিদ্যালয়ে বহু ঢাকঢোল পিটিয়ে একটি বক্তৃতা দেন। সেই প্রসঙ্গেই প্রখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী প্রোফেসর আচিয়ে মবেম্বের এই প্রবন্ধটি প্রথমে ক্যামেরুনের লে মেসাগের পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। ফ্রান্সের বা ফরাসীভাষী আফ্রিকার আভ্যন্তরীন রাজনীতির বিশদে না গিয়েও বিতর্কের প্রেক্ষাপট তুলে ধরেছেন এবং অনায়াসে প্রায় একশো বছরের ইউরোপে ও আফ্রিকায় রচিত কলোনির ইতিহাসের বিভিন্ন ধারার সঙ্গে পাঠকের পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। প্রফেসর মবেম্বে সম্পর্কে নতুন করে আমার মত সাধারণ পাঠক ও অনুবাদকের বিশেষ কিছু বলার নেই। তাঁর অন দ্য পোস্ট কলোনি পুস্তকটি বিশেষজ্ঞ মহলে বিশেষ প্রশংসিত। ফরাসী ভাষা না জানার কারণে মূল প্রবন্ধটি অবশ্যই ব্যক্তিগতভাবে আমার পাঠের আয়ত্তের বাইরে ছিল। আফ্রিকাসোর্স ডট নেট ওয়েবসাইট থেকে সাইট সম্পাদক বা অ্যাডমিনিস্ট্রেটরের অনুমতি নিয়ে, গত ১৮ অগাস্ট ২০০৭ এ প্রকাশিত মেলিসা থ্যাকওয়ের ইংরেজি অনুবাদটি ই এই প্রয়াসের ভিত্তি। আমাদের সৌভাগ্য যে স্বয়ং প্রফেসর মবেম্বেও ইমেল করে আমাদের রচনাটি অনুবাদ ও প্রকাশের প্রচেষ্টায় অনুমতি দিয়েছেন।

গুরুচন্ডা৯ র পাঠকদের মধ্যে যাঁরা ফরাসী ভাষা জানেন এবং তাঁদের মধ্যে যদি কেউ এই বিষয়ে আগ্রহ পান,তাঁরা মূল প্রবন্ধটি পড়ে আলোচনা ও সমালোচনায় সাহায্য করবেন এবং অনুবাদের ত্রুটি নিজগুণে মার্জনা করবেন আশা করি। উপনিবেশের ইতিহাস তথা সমাজবিজ্ঞান ও রাজনীতিচর্চা বাংলাসহ পৃথিবীর সর্বত্র একটি গুরুত্ত্বপূর্ণ আকাদেমিক বিষয়। সেই বিষয়ের সঙ্গে জড়িত পেশাদারী গবেষক তথা ছাত্রদের কাছে পৌঁছনোর কোন আগ্রহ অনুবাদক হিসেবে আমার নেই। অবিশেষজ্ঞ আগ্রহী পাঠকদের কাছে বাংলায় প্রফেসর মবেম্বে কে সামান্য ভাবে হলেও পৌঁছে দেওয়াই আমার উদ্দেশ্য।

এই ধরণের অনুবাদে অনেক পাঠকেরাই খুব বেশি আগ্রহ পাবেন এই আশা করি না, কারণ পাবেন না এটাই বাস্তব। যে অঙ্গরাজ্যে প্রধান ভাষায় প্রকাশিত জনপ্রিয়তম পত্রিকা,বিশ্বায়নের যুগে আত্মবিশ্বাসের তুঙ্গে উঠে বিশ্বপরিচয়ে আগ্রহী মহানগরে বিশাল বিলবোর্ডের বিজ্ঞাপণে শ্লোগান দেন "বালি তে বেল পাকলে বালিগঞ্জের কি?', সেখানে দৈনন্দিনের বাইরে জনগণের স্বেছায় উচ্চারিত অনাগ্রহটাই রিয়েলপোলিটিক। যে কয়েকজন আগ্রহ পাবেন তারা হয়তো অনেকেই সহজেই ইংরেজিতে বা ফরাসীতে প্রবন্ধটি পড়ে নিতে পারতেন। তবু অনুবাদ প্রচেষ্টা। কেন? ক্ষমতার রাজনীতির মজাটাই এই যে একমাত্র ক্ষমতা, বিশেষত রাষ্ট্র ক্ষমতা ও ক্ষমতাশীলেরাই বিষয় হয়ে ওঠেন। ভূখন্ড হিসেবে আফ্রিকা পৃথিবীর হতাশা, ঘৃণা এবং করুণার অংশের একটা গুরুত্ত্বপূর্ণ ভাগ পেয়ে থাকেন অনেক ক্ষেত্রেই। একটি অনুবাদে এ জিনিস বদলানোর নয়। তবু আমি ব্যক্তিগত ভাবে মনে করি বিচিত্র জ্ঞানচর্চার একটা ঐতিহ্য বাংলা ভাষায় যখন রয়েইছে তখন আফ্রিকার বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবি প্রোফেসর মবেম্বের একটি সংবাদপত্রে প্রকাশিত প্রবন্ধের অনুবাদে সেই ঐতিহ্যে বাড়তি কোন মাত্রা যোগ না হলেও তার অন্তত কোন ক্ষতি হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা কম, প্রাথমিক আশায় তাই ধরেই নিচ্ছি প্রচেষ্টাটি অন্ততপক্ষে মার্জনীয় হবে।



আক্রমণের ভাষা

ফ্রান্সের রাষ্ট্রপতি হিসেবে সাহারার দক্ষিণের আফ্রিকায় তাঁর প্রথম সরকারী সফরে সার্কোজি বেশ কিছুটা দুর্নামের বোঝা বয়ে এনেছিলেন। বিতর্কিত এই রাজনীতিবিদ সম্পর্কে মোটামুটি সাধারণের ধারণা হল তিনি অসম্ভব ক্ষমতামদমত্ত,পরমত অসহিষ্ণু,নিষ্ঠুর প্রকৃতির মানুষ। এবং বিশেষত আফ্রিকা ও সেই মহাদেশের (কৃষ্ণবর্ণ) মানুষের জন্য তাঁর কাছে অশ্রদ্ধা এবং তিক্ত করুণা ছাড়া আর বিশেষ কিছু নেই।
অবশ্য শুধু এভাবে দেখলে চিত্রটা অসম্পূর্ণ রয়ে যাবে। ব্যাপক দুর্নামের সমস্যা থাকা সত্ত্বেও অনেকেই কিন্তু তাঁর কথা শুনতে আগ্রহী ছিলেন। হয়তো তাঁর ক্ষুরধার রাজনৈতিক কুটবুদ্ধি এবং সাম্প্রতিক নির্বাচনী সাফল্যকে সঠিক ভাবে ব্যবহার করার ক্ষমতা, জনগণের একাংশের মধ্যে, তাঁর রাজনৈতিক বক্তব্য ও ব্যক্তিত্ত্ব সম্পর্কে একটা ঔৎসুক্য জাগিয়েছিল। সারকোজি সরকারে রাচিদা দাতি বা রামা ইয়াদের মত ব্যক্তিত্ত্বের অন্তর্ভুক্তি অনেক মানুষকেই বিস্মিত করেছিল, যদিও এমনকি ঔপনিবেশিক আমলের বিভিন্ন সরকারেও বর্তমান সময়ের তুলনায় আফ্রিকার মানুষের সংখ্যা অপেক্ষাকৃতভাবে বেশি ছিল। তাঁরা হয়তো জানতে চাইছিলেন এই সব নানা রাজনৈতিক চালের মধ্যে সারকোজির নিজের কোন সুপ্ত সৎ উদ্দেশ্য আছে কিনা। হয়তো খুব পরিস্ফুট ভাবে না হলেও অনেকেই হয়তো মনে করেছিলেন, রাষ্ট্র হিসেবে ফ্রান্স হয়তো শেষ পর্যন্ত সেদেশের বর্তমান সমাজের বহুসাংস্কৃতিক বা বর্ণবৈচিত্রময় চরিত্রটি স্বীকার করে নেবে।
এবং এই পরিপ্রেক্ষিতের কারণেই সার্কোজির সফর এবং বক্তৃতা সম্পর্কে জনমানসে একটা তীব্র ও ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছিল। যদি বলা যায় যে খানিকটা আশাভঙ্গ হয়েছে তাহলে সম্ভবত কিছুই বলা হবে না। অবশ্য প্রতিক্রিয়াশীল শাসকগোষ্ঠী (ওমর বঙ্গো, পল বিয়া, সাসু এনগুয়েসো থেকে আরম্ভ করে ইদরস ডেবি, ইয়াডেমা জুনিয়র ইত্যাদিরা) অবশ্য উৎফুল্ল। কারণ তাঁরা এই বক্তৃতার মধ্যেই সেই পুরোনো 'ফ্রান্স-আফ্রিক' নীতি সমূহকে অপরিবর্তিত থাকতে দেখছেন। ফ্রান্সের পূর্বাপর উপনিবেশগুলির স্বাধীনতা লাভের পর থেকে ফ্রান্সের শাসকদের সঙ্গে আফ্রিকার অপদার্থ তাঁবেদার শাসকদের সুন্দর পরষ্পর স্বার্থ রক্ষায় নিয়োজিত দুর্নীতিগ্রস্ত কূট-বোঝাপড়ার ব্যবস্থাকেই পররাষ্ট্রনীতির পরিভাষায় "ফ্রান্স-আফ্রিক' ( Franceafrique ) নীতি সমূহ বলে আখ্যা দেওয়া হয়ে থাকে।
অবশ্য সমস্ত ধরণের সংবাদমাধ্যমে, সম্পাদকীয় প্রবন্ধ গুলিতে বা পাঠকদের চিঠি, প্রাইভেটে রেডিয়ো স্টেশন গুলোতে বা ইন্টারনেটের বিতর্কে সারকোজির বক্তৃতার তীব্র ক্রুদ্ধ ও বিস্মিত প্রতিক্রিয়াকে যদি একটু খুঁটিয়ে দেখি, বিশেষত যুব সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রতিক্রিয়াকে খুঁটিয়ে দেখি, তাহলে অতটা হতাশ লাগে না। গোটা ফরাসীভাষী আফ্রিকা জুড়েই এই প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। খুব স্বাভাবিক ভাবেই যে কোন রাজনৈতিক সম্পর্কের মধ্যে যখন সাম্য অনুপস্থিত থাকে বা উভয় পক্ষে মতামত আদানপ্রদানের সম্পূর্ণ ও ব্যাপক স্বাধীনতা থাকেনা তখন অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় আক্রমণের সূচনা হয় ভাষার আধারে। বক্তার গভীর বিশ্বাসের অজুহাতে যুক্তিকে হত্যা করা হয় এবং এই তীব্র আক্রমণকে মাথা পেতে নিতে রাজনৈতিক ভাবে দুর্বল শ্রোতাকে বাধ্য করা হয়ে থাকে।

প্রাচীন অভ্যাসে প্রত্যাবর্তন

যাঁরা ফ্রান্সের কাছ থেকে কোন কিছুই আশা করেন না, তাঁদের মনে অবশ্য রাষ্ট্রপতি সারকোজির আলোচ্য বক্তৃতাটি অন্য নানা কারণে ঔৎসুক্য জাগায়। সচেতন এবং অসচেতন, পরোক্ষ বা সক্রিয় ক্ষতিসাধনের বিপুল ক্ষমতার একটি বিশিষ্ট উদাহরণ হল রাষ্ট্রপতি সারকোজির বিশেষ পরামর্শদাতা অঁরি গাইয়ানো রচিত এবং সেনেগালের রাজধানী ডাকারে ব্যবহৃত বক্তৃতাটি । আফ্রিকায় গত শতাব্দীর শেষ পঞ্চাশ বছরে প্রচুর নাটকীয় পরিবর্তনের সাক্ষী হওয়া সত্ত্বেও, আগামী দশ বছরে ফ্রান্সের নতুন শাসকগোষ্ঠীর এই প্রাচীন অভিভাবকসুলভ এবং বস্তাপচা দৃষ্টিভঙ্গির আসল চেহারা ক্রমশ: স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে। আন্তরিকতা এবং সত্যকথনের দাবী থাকা সত্ত্বেও এই বিশেষ বক্তৃতায় একটি বিশেষ তাৎপর্য আছে। এতদিন নিরুচ্চারিত থাকার পরে পরিষ্কার হয়ে গেছে, বিগত ঊনবিংশ শতাব্দী থেকে আফ্রিকা সম্পর্কে ফ্রান্সের শাসকদের মানসিকতার বিন্দুমাত্র পরিবর্তন হয় নি। অতএব সমসাময়িকের প্রয়োজনে সামান্য কয়েকটা কৃত্রিম পরিবর্তন ছাড়া এই বর্তমানে অচল চিন্তাদর্শটি মূলত: শতাধিক বর্ষপ্রাচীন।
ফ্রান্সের নতুন রাষ্ট্রপতির এই বক্তৃতাটি আফ্রিকার অবস্থান সমসাময়িক বাস্তবের প্রতিফলনে ব্যর্থ। বর্তমান আফ্রিকার সেরা ছাত্রদের কাছে বক্তব্য পেশ করতে গিয়ে অঁরি গাইয়ানো একেবারে শব্দের পর শব্দ চুরি করে আনছেন হেগেলের ' ইতিহাসে যুক্তির স্থান' নামক পুস্তকটি থেকে। এই গ্রন্থে আফ্রিকা সম্পর্কে একটি পরিচ্ছেদ রয়েছে। আমার উত্তর-উপনিবেশ সম্পর্কে (অন দ্য পোস্ট কলোনি) গ্রন্থে আমি এই পরিচ্ছেদটির ই তীব্র সমালোচনা করেছি। হেগেলের মতে আফ্রিকা-সত্ত্বা অপরিবর্তনীয় এবং গৌরবজনক নৈরাজ্যের স্বর্গ। এই নৈরাজ্যের অপূর্ব দুনিয়ায় স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার, প্রগতির কোন স্থান নেই। যিনি মানব প্রকৃতির সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক ও ভয়ানক দিকগুলির ব্যাপারে আগ্রহী তিনি শুধু আফ্রিকাচর্চা করলেই মোক্ষ লাভ করবেন। এবং খুঁটিয়ে দেখতে গেলে আফ্রিকার কোন ইতিহাস নেই। আফ্রিকা হল একটি অনৈতিহাসিক, অনুন্নত জগত যে কিনা নিজের প্রকৃতিগত বিশিষ্টতার কাছে নিজেই পরাজিত এবং বিশ্বজাগতিক ইতিহাসে র মূল মঞ্চে তার বিশেষ কোন জায়গা নেই।
ফ্রান্সের নতুন উচ্চ সমাজের সদস্যদের ধারণা হেগেলের এই আদি মুর্খামির চেয়ে খুব বেশি আলাদা নয়। এমনকি দ্য গল বা পম্পিদু বা ডি'এস্তাঁ বা মিতেরোঁ বা শিরাক দের মত পিতৃস্থানীয় প্রজন্মের সেনানায়করা অন্তত সাধারণ বুদ্ধি দিয়ে নিজেদের ধারণা কে কিছুটা ঢেকে ঢুকে রাখতেন , ফ্রান্সের নতুন শাসকদের সেই চক্ষুলজ্জার বালাই টুকুও নেই। কারণ চক্ষুলজ্জা থাকতে গেলে সম্ভবত অন্তত রাজনীতির ধারণার প্রথম পাঠ সম্পর্কে অবহিত থাকা দরকার। এই নতুন শাসকরা , সমসাময়িক নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির চলতি ফ্যাশন অনুযায়ী অতি-সংরক্ষণশীল মতামত প্রকাশে আর লজ্জিত নন। ঔপনিবেশিক অতীত সম্পর্কে ইতিহাসবোধ তাঁদের আর বাড়তি কোন শিক্ষা দেয় না। তাঁদের ধারণা আফ্রিকার সঙ্গে আলাপ চালানোর একটাই পন্থা আছে, সেটা হল যুক্তি এবং সুস্থচিন্তার উল্টো পথে হাঁটা, এবং এই রাস্তায় যদি প্রতি পদক্ষেপে অজ্ঞানতা ঠিকরে বেরোয়, তাতেও বিশেষ কিছু অসুবিধে নেই। কথার পিঠে কথা চাপাতে চাপাতে শব্দ ও রূপকল্পের একটি দমবন্ধ জাল তৈরী করাই তাঁদের উদ্দেশ্য। ঠিক এই পদ্ধতিটিই অতি ব্যবহৃত হয়েছে বলেই সারকোজির বক্তৃতাটিতে স্থূল বিচারশক্তির এরকম জঘন্য প্রকাশ ঘটেছে।
যতই উদার ও নিরপেক্ষ হওয়ার চেষ্টা করি না কেন, সারকোজির বক্তৃতায় উপস্থিত মতবিনিময়ের আহ্বানকে আমার নি:সার গালবাদ্য বলে বোধ হচ্ছে।শুধু তাই মনে হচ্ছে এই আলোচনার আহ্বানকে 'ডাকারের আত্মকথন' আখ্যা দেওয়া যেতে পারে। আত্মপ্রচার, সীমাহীন শ্লাঘা, ইচ্ছাকৃত অনুকম্পাপূর্ণ প্ররোচনা এবং ক্ষেত্র বিশেষে নির্লজ্জ স্তুতি সমস্ত কিছুরই মিশ্রণ চোখে পড়ছে রাষ্ট্রপতি সারকোজির বক্তৃতায়। ঔপনিবেশিক শ্লাঘার ও ইতিহাস ভূগোল থাকে। আমার ধারণা একমাত্র ডাকার, ইয়াউন্দে এবং লিব্রেভিলেই, আকাশছোঁওয়া ঔপনিবেশিক শ্লাঘা ও ঔদ্ধত্যের এরকম উৎকট প্রকাশ সম্ভব, এবং প্রিটোরিয়া বা লুয়ান্দায় অবশ্যই অসম্ভব।

রাষ্ট্রপতি যখন একজন নৃতত্ত্ব-দার্শনিক


হেগেল ছাড়াও , ফরাসী শাসকগোষ্ঠীর মতাদর্শে আরেকটি ঐতিহ্য প্রকট, ইতিহাসের একটি পর্বের আফ্রিকার প্রাত্যহিকি সম্পর্কে এক ধরণের ভিত্তিহীন 'সাধারণ জ্ঞান' ই আপাতত ঊনবিংশ শতকে উদ্ভুত ঔপনিবেশিক নৃতত্ত্বের ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করেছে। এই বিচিত্র নৃতত্ত্বই আফ্রিকা সম্পর্কে প্রচলিত মতাদর্শ ও ধারাবিবরণী গুলিকে পুষ্টি যোগায়। ফরাসী বর্ণবৈষম্যবাদের দুটি বৈশিষ্ট্য রয়েছে, বিচিত্রবাদ(' ন:ষঢ়ভদভড়ল ') এবং দায়িত্তজ্ঞানহীন কৌতুহল। এই বৈশিষ্ট আলোচিত ঔপনিবেশিক নৃতত্ত্বে বিশেষ মাত্রা এনে দেয়।
লেভি ব্রুল একবার একটা চেষ্টা করেছিলেন, যাবতীয় ভ্রান্ত ধারণাকেই তাত্ত্বিক কাঠামোর মধ্যে এনে ফেলতে। 'আদিম' ও 'অসভ্য' ও 'প্রাচীন' সমাজ গুলি সম্পর্কে তাঁর দুটি প্রবন্ধ সংকলন রয়েছে। 'আদিম সমাজের মানবমনের গতিপ্রকৃতি(১৯১০)'
( Mental Functions in Primitive Societies ,১৯১০) এবং "আদিম মানসিকতা( 1921 )' (" Primitive Mentality 1921 ')। পশ্চিমের যুক্তি নির্ভর সভ্যতা ও যুক্তিবাদী মানুষের পাশাপাশি পশ্চিমের বাইরের সমস্ত নিরন্তর ভাগ্য-কালচক্রে আটকে পড়া মানব সমাজ ও জাতিসমূহ র ভিন্নতা প্রকট ভাবে উপস্থাপন করার প্রকল্প মূলত:।
লিও ফ্রবেনিয়াস ও যথারীতি নিজের পরিচয় দিতেন "আফ্রিকার বন্ধু' হিসেবে। যুগে যুগে এটি অতি ব্যবহৃত ও অতি পরিচিত পদ্ধতি। এই ফ্রবেনিয়াস লেভি ব্রুলের তাত্ত্বিক রত্নগুলির ব্যাপক প্রচারের দায়িত্ত্ব নেন এবং ক্রমশ: আফ্রিকার 'বিশেষ প্রাণশক্তি' র ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়। (ফ্রবেনিয়াসের তীব্র সমালোচনা করেছেন সাহিত্যিক ইয়াম্বো ওয়ুওলোগুএম, তাঁর ' Le Devoir de Violence ' গ্রন্থে।) মানছি ফ্রবেনিয়াস অন্তত 'আফ্রিকান সংস্কৃতি' নামক বস্তুটিকে যুক্তিবাদের সারল্যময় বাল্যকাল বলে ধরে নেন নি, কিন্তু তবু তিনি এক চরম বর্ণবিদ্বেষী মনোভাবের শিকার ছিলেন, তিনি মনে করতেন 'আফ্রিকার মানুষ' মূলত: একটু সরল প্রাণশক্তিময় শিশু মাত্র।বালখিল্য তার সংস্কৃতি। তাঁর সমসাময়িক লুডউইগ ক্লাগেস( যাঁর বিভিন্ন পুস্তকের মধ্যে রয়েছে, ' The Cosmognic Eros','Man and the Land','The Spirit as Enemy of the Soul ' প্রভৃতি) -এর মতই তিনি মনে করতেন পশ্চিমের মানুষের আত্মশক্তির ব্যাপক প্রাবল্য ই তার প্রকৃতিকে জয় করে নেওয়ার ক্ষমতার উৎস এবং এই একই কারণেই পশ্চিমে প্রাণশক্তির ক্ষয় হয়েছে এবং মানুষের মধ্যে যান্ত্রিকতার জন্ম দিয়েছে।
বেলজিয়ামের মিশনারি প্লাসিদে টেম্পেলস, "বান্টু দর্শন' সম্পর্কে প্রচুর আলোচনা করে গেছেন। তিনি মনে করতেন প্রকৃতি ও আফ্রিকার মানুষের মধ্যেকার মিথোজীবি সম্পর্কই আফ্রিকার প্রাণশক্তির উৎস এবং তার সত্ত্বার মূল পরিচয়। এবং এই বান্টু শক্তি র একটি পরিমাপযোগ্য মাননির্ণায়কের প্রস্তাবও করেছিলেন। সেই মানে মৃত্যু হল শুন্য আর বান্টু শক্তির সর্বোত্তম প্রকাশ হল গোষ্ঠীনেতার মধ্যে!

অজ্ঞতার নীতি

পিয়ের টেলার্দ চার্দঁÉ¡ সহ এই সব দার্শনিক বুদ্ধিজীবিরাই সারকোজির বক্তৃতা রচনাকারী অঁরি গাইয়ানোর অনুপ্রেরণার উৎস। গাইয়ানোর প্রেরণার মূলে সেঙ্ঘর ও রয়েছেন, তাঁকে অবশ্য যদ্দূর মনে হয় গাইয়ানো ব্যবহার করেছেন স্রেফ একটা স্থানীয় মানুষের ছোঁওয়া রেখে আফ্রিকার দর্শক শ্রোতা দের কাছে খানিকটা গ্রহণযোগ্যতা বাড়িয়ে নেওয়ার জন্য।গাইয়ানোর সম্ভবত জানা নেই সেনেগালীয় কবি সেঙ্ঘোর 'নিগ্রো বৈশিষ্টের' ধারণা, তাঁর সাংস্কৃতিক সত্ত্বা নির্মাণের প্রচেষ্টা, সভয়তা এমনকি সাংস্কৃতিক মিলনের তত্ত্ব সমূহ আসলে সমসাময়িক কালের সবচেয়ে বর্ণবৈষম্যবাদী, জৈবনিক তত্ত্ব গুলির অন্যতম।
সাম্রাজ্যবাদী নৃতত্বের মত শাসকসৃষ্ট ভুয়ো বিজ্ঞাণের মূল ভিত্তি হল এক কাল্পনিক অপর যে কিনা বহির্বিশ্বের সঙ্গে স্রেফ সংযোগহীনতার কারণে বিশিষ্ট ও পরিবর্তনহীন এক অন্য-মানব। মরিস ডেলাফোসের দ্য নিগ্রোজ অফ আফ্রিকা (১৯২১) বা রবার্ট ডেলাভিনের লে পেসাঁ নয়ার ইত্যাদি গ্রন্থে এক বিচিত্র এবং বাস্তবের সঙ্গে সম্পর্করহিত 'আফ্রিকার আত্মা' র ধারণা তৈরি করা হয়েছে। এই ধারণা আবার ফ্রান্সের উচ্চকোটীর লোকজনের খুব পছন্দের। এছাড়াও আফ্রিকা সম্পর্কে একটা সময় প্রায় প্রতিযোগিতামূলক ভাবে অতিরঞ্জিত ভ্রমণ কাহিনী লেখা হয়েছে। এই পর্যায়ের বিশিষ্ট উদাহরণ হল দু চালিউ বা মার্সেল গ্রিওল বা মিকেলে লেরিসের র ভ্রমণকাহিনী। আফ্রিকার আর্ট হঠাৎ যিনি 'আবিষ্কার' করেছিলেন সেই পাবলো পিকাসোর রাজনীতিকেও আমি একই গোত্রে রাখবো।
এই কৃত্রিম ধারণার সমষ্টি যৌথ ভাবে , হয়তো সচেতন ভাবে নয় সবসময়, একটা বৈষম্যবাদের সূচনা করে দেয় এবং সিনেমায়, ছবিতে, কমিক্সে, আলোকচিত্রে, বিজ্ঞাপনে সেটার ব্যাপকতম পুনরাবৃত্তি হতে থাকে এবং অবিচ্ছেদ্য যৌক্তিক ধারায় 'বেন চাচার' রাজনীতির, 'ইয়েস মাসা' র রাজনীতির জন্ম দেয়। অপরকে গ্রহণ করা বা শ্রদ্ধা করাকে উৎসাহিত করার বদলে এই ব্যাপক সাংস্কৃতিক উৎপাদন প্রক্রিয়া অপরকে একটা কৃত্রিম বিষয়ে পরিণত করে যার মূল আকর্ষণের কারণ ই হল সে উদ্দাম কল্পনার জন্ম দিতে সক্ষম।
ফরাসী রাষ্ট্র প্রধানের বিশেষ পরামর্শদাতা, নিজে অস্বীকার করলেও, এই প্রক্রিয়া থেকে মুক্ত নন। এই বৈষম্যবাদী ও সাম্রাজ্যবাদী জ্ঞানভান্ডার থেকেই তিনি তাঁর রেটোরিকের উপাদান ও মোটিফ সংগ্রহ করে নিয়েছেন। মজার ব্যাপার হল ফাবিয়েন এবুসি বুলাগা থেকে শুরু করেই আফ্রিকার অনেক সেরা দার্শনিকরাই এই চিন্তন প্রক্রিয়াকে বৈপ্লবিক চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছিলেন। এবুসি বুলাগার অসাধারণ ক্লাসিক কাজটির নাম হল লে ক্রিসে দু মুন্টু। খুব স্বাভাবিক এবং আশানুরূপ ভাবেই এই সব দার্শনিকদের কাজ রাষ্ট্র £য় পরামর্শদাতাদের পাঠ তালিকায় স্থান পায় নি। সারকোজিকে যদি একজন নৃতাত্ত্বিক দার্শনিক হিসেবে ধরে নিতে হয়, তাহলে বলতেই হবে তাঁর ব্যবহৃত আফ্রিকা ও আফ্রিকার মানুষের সংজ্ঞা মূলত নেতিবাচক। ফরাসী রাষ্ট্রপ্রধান প্রদত্ত সংজ্ঞায় 'আফ্রিকার মানুষ' এর মূল পরিচয় কয়েকটি নেতিবাচক বিশিষ্টতা। সে যে আধুনিক( পড়ুন শ্বেতাঙ্গ) নয় এবং সে যা হয়ে উঠতে পারেনি তাই হল তার মূল পরিচয়। অসম্পূর্ণতা এবং অক্ষমতার দ্বন্দ্বে জর্জরিত। আফ্রিকার মানুষ 'আধুনিক' হয়ে উঠতে পারে নি কেন? শাসকতত্ত্বে তার ব্যাখ্যা হল সে চিরকালীন শিশু, এক নাবালক সরল সাম্রাজ্যের নায়ক, যে জগত রাতের জগত, সরল সুখের জগত এবং সে অন্তহীন স্বণর্যুগের জগত। খুব স্বাভাবিক ভাবেই এই জগৎ নেহাৎ -ই কাল্পনিক। আর এখনকার শাসকদের কাছে আফ্রিকা হল গিয়ে ম্যাজিক , গ্রাম্যতা, প্রাচীন সংকেতময় অরণ্য, মৃত ও বয়োজ্যেষ্ঠদের প্রতি বিশেষ শ্রদ্ধা এই সব আদিম বৈশিষ্ট্য নিয়ে কিছুটা অসুস্থ এক কম্যুনিটি। মূলত কৃষিজীবি দের সমাজ এবং তাঁদের সকলের মধ্যে মূল যে ঐক্য সেই ঐক্যের কারণ পৃথিবীর ইতিহাসে তাদের প্রান্তীয় অবস্থান। সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার হল গত পঞ্চাশ বছরে কিন্তু এই সব ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে প্রচুর ভাল কাজ হয়েছে। সারকোজির বক্তৃতাটি এক অসাধারণ অজ্ঞতাকেই আধার করে রচিত। আমি কিন্তু শুধু আফ্রিকার বিভিন্ন বুদ্ধিজীবিদের কথা শুধু বলছিনা, তাঁদের ভাল কাজের কথা শুধু বলছি না, যে সব কাজে তাঁরা নিজেদের সংস্কৃতিকে বোঝার চেষ্টা করেছেন ক্রিটিকের দৃষ্টিতে। সেই ক্রিটিক কখনো কখনো সত্যি ই খানিকটা চাঁছাছোলা কিন্তু কখনো-ই মানবতা বর্জিত নয়। আমি বলতে চাইছি যে ফরাসী সরকারই তো প্রচুর অর্থ সাহায্য করেছেন এই সব কাজে। বিভিন্ন সময়ে। করদাতাদের টাকা প্রচুর গবেষণার কাজে লেগেছে। সেই বিপুল অর্থব্যয়ের পরেও শাসকেরা এই সব বস্তাপচা , সাধারণ জ্ঞানের অগম্য ,তত্ত্বকে আঁকড়ে পড়ে আছেন এটা দেখে বিস্মিত হতে হয়।
এই স্বেচ্ছা অজ্ঞতা এবং মুর্খামির সত্যিকারের কারণ কি? আমার সত্যি ই জানা নেই।
এই যে হঠাৎ করে একবিংশ শতাব্দীর গোড়ায় ডাকারে সিখ আন্টা দিওপ বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে এইরকম একটা বক্তৃতা দেওয়া হল এবং এমন ভাবে দেওয়া হল যেন "কৃষ্ণাঙ্গ আবেগ' বা 'শৈশবের সাম্রাজ্য' জাতীয় বিচিত্র ধারণাকে আফ্রিকার ভেতর থেকেই উঠে আসা তীব্র সমালোচনার মুখে কোনদিন পড়তে হয় নি। যেসব তত্ত্ব আফ্রিকার মানুষকে চিরতরে ভয়ার্ত, নিজেকে উপস্থাপন করতে অপারগ বলে মনে করে তাদের কে আদৌ কোন গুরুত্ত্ব দেওয়ার প্রয়োজন আছে কি? আফ্রিকার নিজের ইতিহাস বলে যে বস্তুটিকে চালানো হচ্ছে তাতে দ্বিমতের, বিবাদী স্বরের লড়াইয়ের ইতিহাসকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করা হ্‌চ্ছে, ফরাসী উপনিবেশের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সংগ্রামের বিপুল ঐতিহ্য এবং অধুনা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লড়াইগুলি কে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা হচ্ছে। আর উপেক্ষা করছেন কারা ? ফ্রান্স দীর্ঘকাল ধরেই এই স্বরগুলিকে উপেক্ষা করে এসেছে এবং বহুদিন ধরেই তারা স্থানীয় অপদার্থ শাসককের বা নেতাদের সমর্থন জানিয়ে এসেছে। আমার আশ্চর্য লাগে এই কথাটাই ভাবতে যে এখনো সত্যি, আফ্রিকায় এসে সম্পূর্ণ কাল্পনিক অবাস্তব 'ইউরাফ্রিকা' র স্বপ্ন দেখানো এবং আফ্রিকার নিজস্ব অর্থনৈতিক পরিকাঠামো গড়ে তোলার প্রচেষ্টাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা সম্ভব? এমন ভাবে বক্তৃতা টি রচনা করা হয়েছে যেন, ক্যাথেরিন ককারি-ভিদ্রোভিচ, জাঁ সুরাত কানালে, আলমিদা তোপোর ইত্যাদিরা ঔপনিবেশিক আমলের অর্থনীতির নানান সংকট নিয়ে কাজ করেন নি, যেন আফ্রিকার অনুন্নয়নের মূল কারণ হিসেবে যে আফ্রিকার 'বিচ্ছিন্নতা' কে দায়ী করা হয়েছে সে সব বাজে তত্ত্বকে যেন জা-ঁফ্রাসোয়াঁ বেয়ারের কাজ বা রেভ্যু পোলিটিক আফ্রিকানে পত্রিকা কোন তাত্ত্বিক চ্যালেঞ্জের সামনে দাঁড় করায় নি, যেন জাঁ-পিয়ের চার্তঁÉ¡ সহ অন্যান্য ভূগোলবিদ রা আফ্রিকার কৃষি পদ্ধতিগুলির দীর্ঘকালীন গুরুত্ত্ব নিয়ে কাজ করেন নি, যেন আলেন ডুব্রেসোঁ, আনিক ওস্মন্ট আফ্রিকার শহর গুলির নাগরিক মিশ্র চরিত্র নিয়ে গবেষণা করেন নি, যেন আলান মারি ব্যক্তি মানুষের লড়াইকে নিয়ে কাজ করেন নি, যেন পশ্চিম কামেরুনের অর্থনৈতিক ক্রিয়াকলাপ নিয়ে পিয়ের ওআর্নিয়ে কোন কাজ করেন নি।



দায় অস্বীকার

উপনিবেশ সম্পর্কে সেই পুরোনো সুর নতুন করে বাজছে আবার। পল ব্রুকনার, আলেন ফিংকেইলক্রাউট এবং ডানিয়েল লেফেব্রেরা হলেন এই নতুন পালার মূল সুরকার। উপনিবেশের ইতিহাসে প্রভু রাষ্ট্রগুলির আজকাল যে কোন দায় নেই, এই কথা কেউ ই বিশ্বাস করবে না। নতুন পৃথিবী তৈরি করতে গেলে সমস্ত বিবেক আর নীতিবোধ কে নাকি ছুঁড়ে ফেলে দিতে হবে, তার কারণ নাকি ইতিহাসের সঙ্গে সম্পৃক্ত অভিযোগের নাকি কোন বিচার হয় না- এই সব বাচন কে মেনে নেবে? একটা অসাম্যের ব্যবস্থাকে তার দায় মুক্ত করার জন্য, ফ্রান্স ও তার পূর্বাপর উপনিবেশ গুলির নতুন ইতিহাস লেখার প্রচেষ্টা হচ্ছে একটা। উপনিবেশ যেন শান্তির প্রসারের একটা উপায় মাত্র ছিল, নেতৃত্ত্বহীন অনুন্নত সমাজগুলিকে উজ্জীবিত করা এবং শিক্ষার,আধুনিক চিকিৎসাবিদ্যার,রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা ও সাধারণ পরিকাঠামোর প্রসার ইত্যাদিই যেন উপনিবেশ প্রতিষ্টার মূল উদ্দেশ্য ছিল। এ সেই পুরোনো ছক, উপনিবেশকে একটি মানবতাবাদী প্রকল্প বলে চালিয়ে দেওয়া, যেন এই প্রখর ফলিত মানবতাবাদ যদি না থাকত, তাহলে যেন অসংখ্য মানবগোষ্টীর সামনে আত্মহত্যা ছাড়া আর কোন রাস্তা থাকত না। আসলে এই পদ্ধতিতেই, কিছু মানুষ নিজেকে চোখ ঠারার ব্যবস্থা পাকা করতে চায়, একটা বিশাল অসাম্যময়, অত্যাচারী, সম্পূর্ণ স্বআরোপিত মাহাত্ম্যপূর্ণ প্রকল্পকে একটি মানবতাবাদী প্রচেষ্টা বলে চালিয়ে দেওয়া হয়। যাবতীয় যুদ্ধ অভিযান,গণহত্যা, আরোপিত শ্রম এবং সর্বোপরি প্রাতিষ্ঠানিক বর্ণবৈষম্যে জর্জরিত একটি আর্থ সামাজিক ব্যবস্থা যেন আসলে একটি মহান মানবতাবাদী প্রকল্পের সামান্য কিছু ত্রুটি বা অনিচ্ছাকৃত নিরুপায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থামাত্র।
আজ যদি আশা করা হয় উপনিবেশের আসল চরিত্রকে ফ্রান্স স্বীকার করে নেবে এবং যদি এও আশা করে নেওয়া হয়, সমসাময়িক ফ্রান্স রাষ্ট্র হিসেবে আফ্রিকার দুর্নীতিগ্রস্ত একনায়কদের সমর্থন করা বন্ধ করবে তাহলে এটা পরিষ্কার করে বোঝা দরকার যে তাতে ফ্রান্স কে আদৌ অসম্মান বা অশ্রদ্ধা করা হয় না। শুধু এইটুকু আশা করা যে ফ্রান্স তার
অতীতের দায় অস্বীকার করে নেবে এবং ফ্রান্স রাষ্ট্র হিসেবে অন্যান্য সার্বভৌম রাষ্ট্রের কাছে আন্তর্জাতিক ভাবে যে আচরণ আশা করে সেই আচরণ সে নিজে করবে। এই আশা তথা অনুরোধের গুরুত্ত্ব আজকের দিনে অপরিসীম। অতীতকে অস্বীকার করার মাত্রাহীন দায়িত্ত্বজ্ঞানহীনতাকে লক্ষ্য করে দৃঢ়, বুদ্ধিদীপ্ত এবং বিরামহীন সমালোচনা হওয়া জরুরী।
সর্বোপরি উপনিবেশ সম্পর্কে তত্ত্বের বহুচারিতা বন্ধ হওয়া দরকার। আজকাল দু ধরণের উপনিবেশ-সমর্থক ইতিহাস দেখতে পাই, একটা হল ফ্রান্সের অভ্যন্তরের পাঠক/দর্শকের জন্য আর আর একটা হল আন্তর্জাতিক পাঠক/দর্শক দের কাছে রপ্তানি করার জন্য। যদি ফ্রান্স সমান্তরাল ভাবে উপনিবেশকে পাপমুক্ত করার প্রচেষ্টা চালিয়ে যায় এবং ফিল্ড মার্শাল রাউল সালান সহ বাস্তিয়ে থিরি, রজার ডেগুলেদ্রে বা আলবার্ট ডোভেকার কিম্বা ক্লদ পিয়েগ্‌টস ইত্যাদি ইতিহাসের প্রাক্তন অভিযুক্তদের মরণোত্তর সম্মান দিয়ে স্মৃতিরক্ষায় ব্যস্ত হয় তাহলে কোন বোধবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ সম্ভবত ফ্রান্সের ডাকারে আউড়ানো বিভিন্ন উপদেশ বা সাহায্যের প্রতিশ্রুতিকে আদৌ গুরুত্ত্ব দেবেনা।

উপসংহার

আফ্রিকার অধিকাংশ মানুষ ফ্রান্সে বা ফ্রান্সের পূর্বাপর উপনিবেশগুলিতে বাস করেন না। এবং তাঁদের মধ্যে বেশির ভাগ মানুষ ই অন্তত ফ্রান্সে অভিবাসী হওয়ার কোন ইচ্ছা পোষণ করেন না। আফ্রিকার কোটি কোটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনটা ফ্রান্সের দয়ায় চলেনা এমনকি আফ্রিকার কোটি কোটি মানুষের জীবন উন্নয়নখাতে প্রদত্ত ফ্রান্সের রাষ্ট্রীয় অনুদানের উপর নির্ভরশীল নয়। এবং ফ্রান্সের নাগরিকরাও তাঁদের দৈনন্দিক জীবনের জন্য আফ্রিকার দেশ গুলির কোনোটির কাছে কোন কৃতজ্ঞতা পাশে আবদ্ধ নন। এই অবস্থাটাই প্রার্থনীয়।
অবশ্যই মনে রাখা দরকার ফ্রান্সের সঙ্গে আমাদের অনেকের-ই একটা গভীর বৌদ্ধিক ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগ আছে। আমাদের অনেকেরই শিক্ষার কিছুটা অন্তত এই দেশটিতে সম্পন্ন হয়েছে। ফ্রান্সের নাগরিক দের মধ্যে একটি সংখ্যালঘিষ্ট হলেও যথেষ্ট বড় একটি অংশ আফ্রিকার মানুষদের বংশোদ্ভুত, যাঁরা অনেকেই পূর্বাপর দাসদের বা ফ্রান্সের প্রাক্তন উপনিবেশগুলির প্রজাদের উত্তরসূরী, এবং অবশ্যই রয়েছেন ফ্রান্সে বেআইনি ভাবে ঢুকে পড়া কিছু আফ্রিকার মানুষ, হ্যাঁ তারা আইনভঙ্গ করেছেন ঠিক, কিন্তু তাঁদের আইনি সহযোগ ও মানবিক ব্যবহার পাওয়ার অধিকার রয়েছে, এবং এই জনগোষ্টীদের কারোর প্রতিই আমরা অমনোযোগী হ্‌তে পারিনা, অমনোযোগী হওয়ার অধিকার আমাদের নেই।
ফ্যাননের কাজের পর থেকেই আমরা জানি যে পৃথিবীর সম্পূর্ণ ইতিহাসকে আমাদের অধ্যয়ন করা প্রয়োজন, এবং আমরা অতীতকে গৌরবান্বিত করতে গিয়ে বর্তমান ও ভবিষ্যত থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিতে পারি না। এই "কৃষ্ণাঙ্গ আত্মা'র ধারণা একটি শাসক-শ্বেতাঙ্গ মস্তিষ্ক্‌প্রসূত আজগুবি ধারণামাত্র, কৃষ্ণাঙ্গ মানুষের অস্তিত্ত্বের গুরুত্ব শ্বেতাঙ্গ মানুষের অস্তিত্ত্বের গুরুত্বের তুলনায় বিন্দুমাত্র কম নয়, এবং আমরা নিজেরাই আমাদের সভ্যতার ও ইতিহাসের ভিত্তি।
আজকের ফরাসীভাষী আফ্রিকার অনেকেই যারা কারণে অকারণে হঠাৎ নিজেদের অত্যাচারিত/নিপীড়িত হিসেবে দেখতে ভালবাসেন, কিন্তু তাঁরা সকলেই জানেন যে এই মহাদেশটির ভবিষ্যত ফ্রান্সের উপরে নির্ভরশীল হতে পারে না। সরকারী ভাবে উপনিবেশ উৎখাতের অর্ধশতাব্দী পেরিয়ে যাওয়ার পরে আমাদের বোঝা দরকার প্রাক্তন প্রভুদের এবং বিশ্বশক্তি গুলির কাছ থেকে বিশেষ কিছু আশা করে লাভ নেই। নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে , নিজেদেরকে নিজেরাই বাঁচাতে হবে অথবা নিজেরাই ডুবতে হবে।
তাঁরা এটাও জানেন যে , আফ্রিকার নিজের বোধোদয়ের আলোকে এটা অন্তত জানা উচিত যে , এই শক্তিগুলি যতটা উপকার করতে পারে, তার থেকে ক্ষতি করতে পারে ঢের বেশি। ক্ষতি করার ক্ষমতাকে সীমিত করার চেষ্টাটুকু আমরা করতে পারি। আমি পরিষ্কার করে বলে নিতে চাই, এই মনোবৃত্তির মধ্যে কোন দ্বেষ নেই, হিংসা নেই, উল্টে একটা সকলের সমান ভাবে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়ানোর জন্য এ অবশ্যকর্তব্য, কারণ এই সাম্য ও ভারসাম্য ছাড়া এই সমস্ত মানুষকে এই পৃথিবীর অংশীদার করে তোলা অসম্ভব।
ফ্রান্স যদি রাষ্ট হিসেবে সত্যি ই চায় যে আফ্রিকার এই সকলের সমানাধিকারের নতুন পৃথিবী গড়ে তুলতে সে সদর্থক সহায়তা করবে, তাহলে প্রথমেই রাষ্ট্র হিসেবে তাকে তার যাবতীয় ভ্রান্ত প্রাচীন সংস্কার ত্যাগ করতে হবে। ফ্রান্সের নতুন নেতৃত্ত্বকে তাদের নীতি সম্পর্কে গভীর ভাবে মননশীল পর্যালোচনা করতে হবে। এবং তাঁরা যদি এই চিন্তার পর্যায়টিকে এড়িয়ে যান, তাহলে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত চটজলদি বন্ধুত্ত্বের প্রতিশ্রুতি, ঢক্কানিনাদ ও হাস্যাস্পদ আস্ফালনে পরিণত হবে, ডাকারে এই জিনিসটাই হয়েছে। বন্ধুত্বের প্রথম শর্ত হল সমতা,মৈত্রীর প্রধান শর্ত সাম্য। দেরিদা একটা কথা বলেছিলেন, বন্ধুত্বের যোগ্য হতে গেলে, বন্ধুর মধ্যে সম্ভাব্য শত্রুটিকেও সম্মান করতে হবে।
ফ্রান্সের বর্তমান শাসকবর্গ যে প্রিজমের মধ্যে দিয়ে আফ্রিকাকে দেখেন, সেটা যে শুধু পুরোনো ও বাতিল তাই নয়, প্রিজমটি বিশেষ ভাবে বন্ধুত্ত্বের, পারষ্পরিক শ্রদ্ধা ও ন্যায়ের সম্পর্কের পরিপন্থী। আপাতত এটুকু বলতেই হচ্ছে রাষ্ট্র হিসেবে ফ্রান্সের আফ্রিকাকে উপদেশ দেওয়ার স্রেফ কোন নৈতিক অধিকার নেই। এবং এই কারণেই নিকোলাস সারকোজির ডাকারে দেওয়া বক্তৃতাটিকে তাঁর উদ্দিষ্ট শ্রোতাদের কেউই বিন্দুমাত্র গুরুত্ত্ব দেবেন না।


কৃতজ্ঞতা
- আচেয়ে মবেম্বে
- আফ্রিকাসোর্স ডট নেট
- চিরশ্রী দাশগুপ্ত
- সোভি সামুর
- উর্বী মুখোপাধ্যায়