আপনার মতামত         


১৯৯ দিন
দীপ্তেন

"আক্রমণই ক্ষমতার স্তম্ভ, প্রতিরক্ষা নয় ' - হিটলার

১৯৪১ সালের বাইশে জুন - নাৎসী জার্মানী সোভিয়েত রাশিয়ার উপর ঝাঁপিয়ে পড়লো। ইউরোপের অন্যান্য দেশে গত দু বছর ধরে যেমনটি যুদ্ধ হয়েছিলো এখানেও তার কোনো ব্যতিক্রম হলো না। বাঁধভাঙা বন্যার মতন নাৎসী বাহিনী এগিয়ে চললো। একের পর এক নগর তাদের হাতে। বছরও শেষ হলো না, প্রায় ৪৫ লক্ষ রাশিয়ান হতাহত হয়েছিলো। যুদ্ধের আকস্মিকতায় স্তালিন এমনই বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন যে প্রথম এগারো দিন তিনি সম্পূর্ণ নিশ্চুপ ছিলেন। ঐতিহাসিক জন এরিকসনের মতে স্তালিনের স্নায়ু বিপর্যয় হয় এবং তিনি ক্যাটাটনিক হয়ে পড়েন।

৪১-এর শেষে আর ৪২-এর প্রথমে যখন সোভিয়েত রাশিয়ায় জাঁকিয়ে শীত পড়েছে তখন নাৎসী বাহিনীর বিজয় দৌড় কিছুটা স্লথ হয়ে এলো। শীতের প্রকোপ আর তাছাড়াও লজিস্টিক্সের সমস্যা। তাছাড়া রাশিয়ান সেনারাও আর অতোটা অসঙ্ঘবদ্ধ নন। ক্রেমলিনের অদুরে ঘাঁটি গেঁড়ে বস®ৎলা জার্মান সেনানী।

জার্মান রণকৌশল চিরকালই ছিলো শত্রুর দুর্বল জায়গায় আক্রমণ করে দ্রুত এগিয়ে যাওয়া। নগর দখলের দীর্ঘস্থায়ী ও রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম মোটামুটি তারা এড়িয়ে যেতেন।

৪২-এর মাঝামাঝি তাই হিটলার তার বিখ্যাত ৪১ নং নির্দেশ জারি করলেন। জার্মান সেনার কাছে দুটি লক্ষ্য। এক তো ককেসাসের তৈলখনিগুলি দখলে আনা আর মধ্যভাগে স্তালিনগ্রাদের সংযোগ ব্যবস্থাকে ভেঙে দেওয়া। ভলগা নদী দিয়েই জাহাজে ও ফেরীতে রাশিয়ার মধ্য ও উত্তরাঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগের ব্যবস্থা ছিলো। স্তালিনগ্রাদ বিধ্বস্ত হলে ঐ যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ চূর্ণ হবে। মনে রাখবেন স্তালিনগ্রাদ দখল করাটা তাঁর অভীষ্ট নির্দেশ ছিলো না।

স্তালিনগ্রাদের ইতিহাস বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। ১৯১৮তে এটি ছিলো ভলগা নদীর পশ্চিম পাড়ের এক ছোটো শহর। তখন ঐ ছোটো শহরটির নাম ছিলো স্তারইতসিন ( Tsarittsyn )। মার্শাল স্তালিনের নেতৃত্বে লাল ফৌজ ওখানে লড়াই করে বিপ্লব বিরোধী দলের বিরুদ্ধে। ঐ লড়াইতে স্তালিনের অধীনে ছিলেন চুইকভ। এই লড়াই জিতেই স্তালিন খুব নাম করেন। ক্ষমতায় এসে ঐ ছোটো শহরকেই নিজের নামে নামকরণ করেন। বেশ কিছু ভারী কারখানাও গড়ে তোলেন। যার মধ্যে বিখ্যাত ছিলো ব্যারিকেড- ট্র্যাক্টর ফ্যাক্টরী আর রেড অক্টোবর - ট্যাঙ্ক বানানোর কারখানা। এই সময়েই থমকে যাওয়া নাৎসী বাহিনীতে কিছুটা চিন্তা ভাবনা শুরু হয়েছে। অনেকেই বলতে শুরু করেছেন যে নাৎসী বাহিনী বড় বেশি এগিয়ে গেছে। জারা ধীরে চলো। এই সময়ে কোনো বড় আক্রমণের ঝুঁকি নিতে চাইছেন না সেনাপতিরা।

হিটলারের মেগ্যালোম্যানিয়ার এটাই বোধহয় শুরু। এই সময় থেকেই তিনি সব ফ্রন্টেই নিজে নিজেই লড়াই পরিচালনায় ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। প্রথম ধাক্কায় দূর করলেন তৎকালীন সেনানায়ক লিস্টকে, পরে হটিয়ে দেবেন চীফ অফ স্টাফ হলডারকেও। হিটলার বেছে নিলেন পউলাসকে। ফ্রেইডরিশ পউলাস। পরিচ্ছন্নতার বাতিকগ্রস্থ এই সেনানায়কের সম্বন্ধে তাঁর উর্ধ্বতন অধিকর্তা একবার লিখেছিলেন "পুরানো জমানার স্টাফ অফিসার। দীর্ঘদেহী এবং সাজসজ্জায় নিখুঁত। বোধহয় একটু বেশিই বিনয়ী, সামাজিক ভদ্রতায় দারুণ পটু,কাউকেই আঘাত দিতে চাননা। ....অনেক চিন্তা ভাবনা করার পরে এবং সবকিছু বিচার বিবেচনা করার পরেই ইনি সিদ্ধান্তে আসতে পারেন'। আরেক উর্ধ্বতন অফিসার পউলাস সম্পর্কে মন্তব্য করেন "সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষমতা এর নেই '।

তুলনায় সাধারণ কৃষক ঘরের ছেলে চুইকভ ছিলেন সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুর বাসিন্দা। সাধারণ সেনানীদের সাথে ওঠা বসা করা, ফ্রন্টলাইনে থেকে নিজে চটজলদি সিদ্ধান্ত নেওয়া - এইসবে উনি সিদ্ধহস্ত ছিলেন।

পরবর্তী রক্তাক্ত ১৯৯ দিনের ইতিহাস এদের হাতেই লেখা হবে।

আক্রমণ নয়, প্রতিরক্ষাই যুদ্ধের বেশি শক্তিশালী অংশ। শত্রুর পরাজয় এতেই সুনিশ্চিত হয়। - ক্লসুইৎজ

স্তালিনগ্রাদ তখন প্রায় পঁচিশ মাইল লম্বা আর খুব বেশি যেখানে সেখানে পাঁচ মাইল চওড়া, ভলগা নদীকে পিছনে রেখে একটা চ্যাপটা মতন শহর। নগরের বাড়ি ঘর প্রায় সব কটাই কাঠের তৈরী। নগরীর পিছনে দ্রুতগামী ভলগা প্রায় এক মাইল চওড়া।

স্তালিনগ্রাদের পথে সোভিয়েত প্রতিরোধ এতোই কম ছিলো যে অনেক জার্মান সেনাই তাদের ইউনিফর্ম খুলে ডন নদীতে স্বচ্ছন্দে সাঁতার কেটেছিলেন। ঠিক এক বছর আগে নীপার নদীতে যেমন তারা হুল্লোড় করেছিলেন।

তেইশে অগাস্ট - বিকেল তিনটে থেকে অবিরল বিমানহানা দিয়ে নাৎসী আক্রমণ শুরু হলো। মাঝরাত পর্যন্ত প্রায় একটানা চললো গোলা ও বোমার হানা। স্রেফ পুড়ে গেলো স্তালিনগ্রাদ। কাঠের বাড়িগুলি ছাই হয়ে গেলো। রাস্তার ধারের ল্যাম্পপোস্টগুলিও দেশলাই কাঠির মতন জ্বলে খাক হয়ে গেলো। প্রায় চল্লিশ হাজার লোক প্রাণ হারালেন - অধিকাংশই অসামরিক। গুঁড়িয়ে যাওয়া বাড়ি ঘরের ইঁট পাথরে পুড়ে যাওয়া আস্তানার ছাইতে ভরে গেলো স্তালিনগ্রাদ। নদীর পাশে রাখা তেলের ট্যাঙ্কগুলির উপর বোমার আঘাতে ভলগা নদীতেও দাউ দাউ করে জ্বলে উঠলো আগুন।

প্রথম দিনের হানাতেই স্তালিনগ্রাদ চূর্ণ।

দগ্ধ বিচূর্ণ কিন্তু পরাজিত নয়।
*******************************************

যুদ্ধের প্রথম দিনেই পউলাস কিন্তু হিটলারের নির্দেশিত লক্ষ্যে পৌঁছে গেছিলেন। স্তালিনগ্রাদকে ঘিরে ফেলে দূর থেকে বোমা গোলা দাগিয়ে স্তালিনগ্রাদের যোগাযোগ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত করে ককেসাসের দিকে পুরো ফোকাস করতে পারতেন। লেনিনগ্রাদ বা মস্কো আর কোনো শহরেই নাৎসীরা দখলের লড়াই চালায়নি।

কিন্তু - ঐ, বোধহয় স্তালিনগ্রাদ নামেই জাদু ছিলো। সেটা হাতের মুঠোয় না আনতে পারলে হিটলার আর পউলাস,কারুরই শান্তি হচ্ছিলো না। তাছাড়া তখন উত্তর আফ্রিকাতে ক্রমাগত হেরে যাচ্ছিলো জার্মানী। তাঁদের একটা বড়সড় বিজয়ের খুব দরকার ছিলো এবং প্রথম দিনের যুদ্ধের ফলাফলে তাদের আত্মতুষ্টি আরো বেড়ে গেছিলো। তাই শুরু হলো স্তালিনগ্রাদের লড়াই।

লড়াইয়ের প্রথমেই নাৎসী বাহিনী স্তালিনগ্রাদকে তিনদিক দিয়ে ঘিরে ফেললেন। শুধু নগরের পিছনে ভলগা নদী ছিলো শহরের একমাত্র খোলা পথ। যতদিন না পউলাস আত্মসমর্পণ করছেন ততোদিন ফেরী ও ছোটো জাহাজে করেই স্তালিনগ্রাদকে রসদ, গোলাগুলি ও নতুন সৈন্য যোগান দিয়েছে এই ভলগা নদীর ফেরী। আহত লোকেদের নিয়েও গেছে ফিরতি পথে, ভলগার ঐ পাড়ে।

সাঁজোয়া গাড়ি নিয়ে খুব সহজেই দ্বিতীয় দিনে নাৎসী বাহিনী পৌঁছে গেলো স্তালিনগ্রাদের শহরতলীতে। এর আগে কোনো শহর দখলের লড়াই করেনি এই সেনারা। "জিতেই গেছি' এই মনোভাব নিয়ে লরীভর্তি জার্মান সেনারা খুব ফুর্তি করে শহরে ঢুকলো। বিজয়ের মোচ্ছব শুরু হয়ে গেছে।

প্রায় বিনা বাধায় এতোটা পথ এগিয়ে এসেছেন। পউলাসের অধীনে আছে কিংবদন্তীর ষষ্ঠ আর্মি। এই সেনারাই বেলজিয়াম দখল করেছে হেলাফেলায়, ফ্রান্স থেকে ব্রিটিশ বাহিনীকে দূর করেছে অবহেলে। তাদের ঠেকায় কে?

ঠেকালো চুইকভ। আর লক্ষ রাশিয়ান সেনা। সে সময়ে স্তালিনগ্রাদের দায়িত্বে ছিলেন জেনারেল লোপাটিন। তার ভীত সন্দিগ্ধ দোনামনা ভাব দেখে তৎক্ষনাৎ তাঁকে বিতাড়িত করে আনা হলো চুইকভকে। চুইকভ দায়িত্ব নিয়েই শহরের রক্ষীদের জানালেন আর পিছু হটা নেই।

প্রথম দিকের লড়াই? জেনারেল অরলভ (তখন ১৯ বছরের এক তরুণ ট্যাঙ্ক কমান্ডার) তাঁর স্মৃতিকথায় বলেছেন শহরের উত্তর ভাগে নাৎসীরা পৌছে গেছে এবং এতো দ্রুত তারা এগিয়ে এসেছে যে সোভিয়েত প্রতিরক্ষা তখনো দানা বাঁধতে পারেনি। চটজলদি ট্যাঙ্ক বিধ্বংসী কামান নিয়ে পথে নামলেন অরলভ। যথেষ্ট সেনা নেই তো কি আছে? ট্র্যাক্টর ফ্যাক্টরীর শ্রমিকদের নিয়েই লড়াই শুরু করলেন। কিছু পরে যোগ দিলেন ফেরী ঘাটের নাবিকেরা। এই জোড়াতাপ্পি দেওয়া লোকেদের নিয়েই নাৎসী আক্রমণ রুখে দিলেন অরলভ। অন্তত সেদিনকার মতন।

প্রথমেই জার্মানেরা একটি ভুল করলেন। তাঁরা অহেতুক বোমাবর্ষণ করে গুঁড়িয়ে দিলেন স্তালিনগ্রাদকে। তাতে হয়তো খুব দাদাগিরি হয় কিন্তু প্রতিরক্ষী সেনার সুবিধে হয় আরো বেশি। ইঁট পাথর আর কংক্রিটের চাঁইতে ভর্তি, বোমার আঘাতে তৈরী খন্ড বিখন্ড রাজপথ, গভীর গর্ত, এ সবই জোরদার প্রতিরক্ষার অমোঘ অস্ত্র। জার্মান সেনাদের সাহায্যে এলো স্টুকা ডাইভ বম্বার। প্যানজারের ট্যাংকেরা অচল হয়ে পড়লো ঐ ভগ্নস্তুপের ভরা শহরের পথে। একেকটি বাড়ি একেকটি দুর্গ। রাশিয়ান সেনারা সেইরকম হাজার দুর্গ গড়ে তুললেন স্তালিনগ্রাদে।

আরেকটি ভুল, মানে মারাত্মক ভুল - জার্মানরা স্তালিনগ্রাদ শহর গোলায় বোমায় ভরিয়ে তুললেন কিন্তু ভলগা নদীর ফেরী, যেটি স্তালিনগ্রাদ শহরের লড়াইয়ের লাইফলাইন- সেটি একবারও আক্রমণ করলেন না। ভলগার পূর্ব পাড় থেকে সোভিয়েতের ভারী কামান জার্মান সেনাদের ব্যস্ত রাখতো কিন্তু জার্মান স্টুকা বম্বার শুধু পদাতিক আর সাঁজোয়া বাহিনীর প্রতিরক্ষীর ভূমিকাতেই আটকে থাকলো।

আসলে এই শহুরে স্ট্রীট ফাইট, এরকম জীবনপণ লড়াই জার্মানদের বিভ্রান্ত করেছিলো। তারা বারবারই "হাতুড়ির ঘা' দিয়ে স্তালিনগ্রাদ শহর চূর্ণ করতে চাইছিলো। এই চিন্তাধারার দৈন্য, লীডারশিপের সংকট - এ নিয়ে মন্তব্য করেছিলেন চুইকভ স্বয়ং।

১১ই সেপ্টেম্বার, হিটলার ডেকে পাঠালেন পউলাসকে। "কেন এত দেরী হচ্ছে স্তালিনগ্রাদ দখলের?" পউলাস নির্ভয়ে জানলেন ৪৮ ঘন্টার মধ্যে তিন প্যানজার ডিভিশন আর আরো আটটি পদাতিক ডিভিশন (ডিভিশন মানে দশ থেকে বারো হাজার সৈন্য, মোটামুটি) নিয়ে তিনি ঝাঁপিয়ে পড়বেন স্তালিনগ্রাদের উপর। আরো জানালেন যে রাশিয়ানদের হাতে রয়েছে মাত্র তিনটি পদাতিক ডিভিশন আর চারটি ডিভিশনের অল্প স্বল্প লোক, ভগ্নাংশ।

পউলাসকে খুব দোষ দিয়ে লাভ নেই। জার্মানেরা আগাগোড়াই বিশ্বাস করে এসেছেন স্তালিনগ্রাদের যুদ্ধ প্রায় তারা জিতেই গেছেন। এর একমাস পরেও, ১৩ ই অক্টোবরে এক গোপন বার্তায় জার্মান হাই কম্যান্ডকে জানানো হয় যে রাশিয়ানদের কাউন্টার অ্যাটাক করবার ক্ষমতা ও জনবল আর কিছুই নেই। যে সব জেনারেল এসব বিশ্বাস করতেন না, হিটলার তাঁদের সরিয়ে দিতেন।

আর যখন হিটলার আর পউলাস স্তালিনগ্রাদ দখলের আলোচনা চালাচ্ছেন প্রায় ঠিক তখনই স্তালিন আর জুকভ তাদের রণকৌশল ঠিক করছেন। জুকভ জানালেন স্তালিনগ্রাদকে তিনদিক দিয়ে ঘিরে ধরা জার্মান ষষ্ঠ আর্মিকে তিনি ঘিরে ধরবেন এক বিশাল ব্যুহের বেষ্টনীতে। এই পরিকল্পনার সফলতার জন্য চাই স্তালিনগ্রাদের টিঁকে থাকা। স্তালিনগ্রাদের টোপ দেখিয়েই আটকে রাখতে হবে ষষ্ঠ আর্মিকে। এ শুধু ইজ্জতের লড়াই নয়, এ লড়াই বাঁচার লড়াই।

"ভলগা নদীর ওপাড় বলে কিছু নেই'

এই ১৯৯ দিনের যুদ্ধকে মোটামুটি তিনটি স্তরে ভাগ করা যায়। প্রথম পর্যায় হচ্ছে ১২ই সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রথম তিন সপ্তাহের লড়াই। এইসময় জার্মান সেনারা মোটামুটি স্তালিনগ্রাদের শহরতলীতেই দখলদারি নিয়েছিলো এবং বড় রকমের জোরালো আক্রমণ তখন শুরু করেনি।

বারোই সেপ্টেম্বরে চুইকভ দায়িত্ব নিলেন আর পরের দিনই পউলাস তাঁর প্রথম বড় রকমের আক্রমণ শুরু করলেন। এই দিন থেকে ১৯শে নভেম্বর - প্রায় পাঁচ সপ্তাহ হলো তুমুল লড়াই। এর একেবারে শেষ দিকে চুইকভের হাতে ছিলো মাত্র এক চিলতে স্থান। স্তালিনগ্রাদের ৯০% ছিলো জার্মানদের হাতে। এটি দ্বিতীয় পর্ব।

আর তৃতীয় পর্ব শুরু হলো ১৯ নভেম্বর মার্শাল জুকভ তাঁর কাউন্টার অ্যাটাক শুরু করলেন। সেই লড়াই শেষ হলো যখন পউলাস আত্মসমর্পণ করলেন।

চুইকভ যখন দায়িত্ব নিয়ে প্রথম স্তালিনগ্রাদে পা রাখলেন তখন তাঁর গাইড তাঁকে নিয়ে গেলো তাঁর "হেডকোয়র্টারে'। মাটির নিচে গর্ত করে একটা ট্রেঞ্চের উপর বাখারি দিয়ে ছাদ বানিয়ে পুরু করে মাটির আস্তরণ দেওয়া আছে। চুইকভ তাকিয়ে দেখলন তাঁর সচিবালয়! মাটি দিয়ে ঠেসে এককোনে একটা খাট, আর ঐ রকমই মাটির টেবিল ও একটি বেঞ্চ। কাছা কাছি বোমা বা গোলা পড়লে ছাদের থেকে ঝুর ঝুর করে মাটি এসে পড়ে ঘরের ভিতর। টেবিলের উপরে রাখা ম্যাপের উপর থেকে মাটি ঝেড়ে ঝুড়ে সেনাপতিদের সাথে আলোচনা শুরু করলেন চুইকভ।

চুইকভ দায়িত্ব নিয়েই জানিয়ে দিলেন ভলগা নদীর ওপার বলে কিছু নেই। অর্থাৎ বাঁচা মরা যুদ্ধ জেতা সবই এইখানে, এই মাটির উপর। আর পিছু হটা নেই।

" মানুষ নয়, ওরা রাক্ষস '

তো শুরু হলো সঙ্কুল যুদ্ধ।

মরণপণ লড়াই । প্রতিটি বাড়ি নয় প্রতিটি ইঁটের জন্য লড়াই। চুইকভের একটাই লক্ষ্য - কোনো রকমে এক চিলতে জমি হলেও টিঁকে থাকা। জার্মান বাহিনীর কাছ থেকে ছিনিয়ে নিতে হবে সময়। নভেম্বরের শেষ নাগাদ ভলগা নদী পুরো জমে যাবে। সেই পুরু বরফের উপর দিয়ে রাশিয়ান রসদ ও সেনা পাঠানো সম্ভব হবে। এবং স্তালিনগ্রাদের পিঠ তখন দ্রুতগামী ও একমাইল চওড়া ভলগা নদীতেই আটকে থাকবে না।

স্তালিনগ্রাদের কয়েকটি অঞ্চলে লড়াইটা আরো জমাট হচ্ছিলো। একটি হচ্ছে মামায়েভ কুরগান ,শহরের কেন্দ্রস্থলে এটি একটি ঘাসে ঢাকা ছোটো টিলা। একটি হচ্ছে রেল স্টেশন। কংক্রিটের বিরাট সাইলো, যেখানে নগরীর শস্য মজুদ থাকে সেই গ্রেইন এলিভেটর। আর অবশ্যই শহরের শেষ প্রান্তে ভলগা নদীর ধারে তিনটি বড় ফ্যাক্টরী।

চুইকভ প্রতিরক্ষায় মন দিলেও পাল্টা আঘাত দিতেও ছাড়েননি। ১৪ তারিখে তিনি শুরু করলেন প্রতিআক্রমণ। সেইদিন সারাদিনে বেচারার খাওয়াই জুটলো না। ব্রেকফাস্ট খেতে বসেছেন তো একটি বোমা এসে পড়লো। তাঁর প্রাতরাশ উড়ে পুড়ে ছাই। রাত্রেও সবে ডিনারের আয়োজন করছেন এ সময় একটি মর্টারের গোলা এসে সেই পরিকল্পনা ভেস্তে দিলো।

জার্মান সেনারা কিন্তু প্রথম দিকের সাফল্যে খুব উৎফুল্ল হয়ে উঠেছিলো। চুইকভ লিখেছেন "লরি ভর্তি জার্মান সেনারা হৈ হৈ করে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তারা তখন বিজয়ের স্মারক সংগ্রহে ব্যস্ত। মদ্যপ সেনারা লরি থামিয়ে লাফিয়ে নামছে, মাউথ অর্গান বাজাচ্ছে,পাগলের মতন রাস্তায় নাচানাচি আর হুল্লোড় করছে '।

কিন্তু লড়াই তখনো ভালো করে শুরুই হয়নি। শুধু রেল স্টেশনটি তিন দিনে পনেরোবার হাত বদল হবে। কেউ কাউকে ছাড়েনি। হাড্ডাহাড্ডি লড়াই দুই পক্ষেই। সৈন্য কম পড়লে চুইকভ রণাঙ্গনে পাঠিয়ে দিয়েছেন শহরের দমকলকর্মী,পুলিশ আর ফ্যাক্টরীর কর্মীদের। হাতাহাতি লড়াইতে কোনো পক্ষই এক কদমও পিছোয়নি।

সারাদিন মার্চ করে ক্লান্ত নতুন সৈন্য স্তালিনগ্রাদে পা রাখা মাত্রই তাঁদেরকে পাঠানো হয়েছে ফ্রন্টে। অনেকের বন্দুকও নেই, গুলি বারুদ কম। তাও ঝাঁপিয়ে পড়েছেন সবাই।

জার্মানরা কিন্তু একটু একটু করে এগিয়েই চলছিলো।

এক জার্মান সেনানীর অভিজ্ঞতা - "সারাদিন হাতাহাতি লড়াই করে আমরা এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত অবধি রাস্তা দখল করবো , মেশিনগানের ঘাঁটি আর ফায়ার পয়েন্ট খাড়া করবো একবারে শেষ প্রান্তে। কিন্তু পরেরদিন ভোর বেলাতেই দেখবো রাশিয়ানরা পিছনে এসে গেছে। রাশিয়ানরা ছাদের চিলেকোঠায় আর ছাদের টালির নিচে গর্ত করে লুকিয়ে থাকতো ইঁদুরের মতন। সকাল হতেই চিমনি বেয়ে বা কোনো জানলা খুলে নিচে নেমে আসতো'।

গ্রেইন এলিভেটরের লড়াইও এমনি ছিলো। কখনো জার্মানরা দোতলা দখল করে তো রাশিয়ানরা একতলায়। পরেরদিন আবার উল্টো চিত্র। এক জার্মান সেনা সখেদে উক্তি করে, "মানুষ না, স্রেফ রাক্ষসেরা লড়াই করছে ওখানে'। আরেকজন লিখলেন "রাশিয়ানরা যদি সব বিল্ডিংয়েই এমন ভাবে লড়াই করে তাহলে আর কোনো জার্মান সেনাই ঘরে ফিরে যাবে না'।

তবে জার্মান পক্ষেও বীরত্ব কিছু কম ছিলো না। সেনার ঘাটতি পড়লে তারাও রণাঙ্গনে পাঠিয়েছেন বিমান বাহিনীর অসামরিক কর্মচারী ,পুলিশ এবং ইঞ্জিনীয়ারদের।

এবার হার্ডওয়ার নিয়ে কথা। সোভিয়েত সব আগ্নেয়াস্ত্রই ছিলো ৭.৬২ মিলিমিটার ক্যালিবারের। ফলে একই কার্তুজ তারা সব আগ্নেয়াস্ত্রেই ব্যবহার করতে পারতেন। সেই সুবিধা জার্মানদের ছিলো না।

এছাড়া এসে গেছিলো রাশিয়ান রকেট লঞ্চার ক্যাটুশা। ভলগার অপর পাড় থেকে এই ট্রাক বাহিত রকেট এর আক্রমণ ছিলো ভয়াবহ। এই সময় দিয়েই রাশিয়ান ইয়াক ৯, নতুন ফাইটার প্লেন এসে যায় এবং জার্মান বিমানের যে একছত্র দখল ছিলো স্তালিনগ্রাদের আকাশে সেটা তারা প্রতিহত করেন। বিমান আক্রমণের আঘাত এবার জার্মানরাও ভোগ করতে লাগলেন। জার্মান সেনারা তাঁদের KAR রাইফেলের বদলে রাশিয়ান PPsh M1941 সাব মেশিনগানই বেশি পছন্দ করতেন। সুযোগ পেলেই তাঁরা লুটে নেওয়া রাশিয়ান বন্দুক নিয়েই লড়াই করতেন।

২০ সেপ্টেম্বর। গ্রেইন এলিভেটরের এক রাশিয়ান সেনার জবানবন্দী - "দুপুরবেলা বারোটা জার্মান ট্যাঙ্ক আমাদের দুদিক দিয়ে আক্রমণ শুরু করলো। আমাদের অ্যান্টি ট্যাঙ্ক কামানের গোলা ফুরিয়ে গেছিলো। ট্যাঙ্কগুলি কামান দাগাতে শুরু করলো। কিন্তু আমরা কেউই নিজের জায়গা ছাড়িনি। আমাদের তিনটে ভারী মেশিনগান, একের পর এক বিধ্বস্ত হলো। শুধু একটা লাইট মেশিনগান আর কিছু গ্রেনেড ও হ্যান্ডগান, আর কিছু রইলো না আমাদের কাছে।

একটানা বিস্ফোরণের আওয়াজ। জ্বলে যাচ্ছে মজুত রাখা শস্যদানা । এতো ধুলো আর ধোঁয়া যে আমরা পরস্পরকে দেখতে পাচ্ছিলাম না। কিন্তু আমরা চেঁচিয়ে এক অপরকে উৎসাহ দিয়ে যাচ্ছিলাম।

খুব সন্তর্পণে জার্মানে সেনারা তাদের টমিগান নিয়ে প্রবেশ করলো। আমরা তাঁদের দেখতে পাচ্ছিলাম না কিন্তু তাঁদের নি:শ্বাসের আওয়াজ, পা ফেলার আওয়াজ পেয়েই গুলি ছুঁড়তে শুরু করলাম। ওদের ছোঁড়া গ্রেনেড গুলো লুফে নিয়ে ওদের দিকেই ছুঁড়ে দিলাম।'

মাসের শেষ নাগাদ নতুন সাইবেরিয়ান সেনারা আসে স্তালিনগ্রাদের প্রতিরক্ষায়। তাঁদের বীরত্ব ছিলো কিংবদন্তীর মতন। নতুন সাইবেরিয়ান সেনারা, যারা শহরের যুদ্ধ কখনো লড়েননি তাঁদেরকে স্ট্রীট ফাইট নিয়ে বুঝাতে গেলেন চুইকভ। লম্বা বক্তৃতার মধ্যে বাধা দিলেন সাইবেরিয়ান ডিভিশনের নেতা বাট্যুক। বললেন "আমরা এখানে লড়াই করতে এসেছি, প্যারেড করতে নয়। আমরা সাইবেরিয়ান।' চুইকভ আরো বাক্যব্যয় করলেন না। তাঁদেরকে ফ্রন্টে পাঠিয়ে দিলেন।

অবশেষে গ্রেইন এলিভেটর জার্মানরা ছিনিয়ে নেন। তাঁদের দখলদারি কিন্তু চলতেই থাকে। মামায়েভ কুরগানও দখল করে নিলো জার্মান সেনারা। ব্যারিকেড ফ্যাক্টরীতেও তাঁরা ঢুকে পড়লেন। চুইকভ স্বগতোক্তি করেছিলেন "এমন লড়াই চললে আমরা সবাই ভলগায় গিয়ে পড়বো।'

জার্মান বোমারু বিমানের আধিপত্য অব্যাহত থাকলেও সমস্যা অন্যখানে। ২৯ সেপ্টেম্বর জার্মানদের বোমার মজুত শেষ। অগত্যা তারা হাতের কাছে যা পেলেন , ট্রাক্টরের টায়ার, লোহার টুকরো এই সব দিয়েই বোমা ঠাসলেন।

প্রায় পনেরো দিন একটানা হাত বদলের পর মামায়েভ কুরগান আর কারুর দখলেই রইলো না। ওটা নো ম্যান্স ল্যান্ড হয়ে রইলো।

" স্তালিনগ্রাদ আর শহর নেই '

"মাত্র আধ ঘন্টাও হাতাহাতি লড়াই করেছে এমন সব সেনাই জানে কি ভয়ঙ্কর সেই অভিজ্ঞতা আর আমরা আশি দিন ধরে একটানা হাতাহাতি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছি ..... স্তালিনগ্রাদ আর শহর নেই। দিনের বেলা জ্বলন্ত বাড়ি ঘরের ধোঁয়ার মেঘে ঢাকা এক ফার্নেস, আর রাতের বেলা দগ্ধ, রক্তাক্ত, আর্তনাদে অস্থির.... জন্তু জানোয়ারেরা শহর ছেড়ে পালিয়েছে, শক্ত পাথরেও এতো সহ্য করতে পারে না, শুধু মানুষে পারে।'

অক্টোবরের শুরুতে পউলাসের সেনারা রেড অক্টোবর ফ্যাক্টরীও প্রায় দখল করে নিলো। তেলের রিজার্ভার বোমায় ধ্বস্ত হলে ভলগা নদীর বুকে আগুন জ্বলে উঠলো। হাল্কা রাশিয়ান ট্যাঙ্কগুলি ভারী প্যানজার ট্যাংকের মোকাবিলা করতে পারছিলো না। আর ফেরী দিয়ে রাশিয়ান টি ৩৪ ট্যাঙ্ক এ পাড়ে আনাও সম্ভব ছিলো না।

স্তালিনগ্রাদের কমিউনিস্ট পার্টির হেড কোয়ার্টারেও তখন উড়ছে নাৎসী পতাকা। বড় ল্যান্ডমার্ক বলতে বাকি শুধু ট্র্যাক্টর ফ্যাক্টরী। ২ অক্টোবরে পউলাস তাঁর শেষ শক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লেন স্তালিনগ্রাদের শেষ দুর্গের উপর। তাঁদের মুখোমুখি সাইবেরিয়ান সেনা। হাতাহাতি লড়াইতে তাঁদের সমকক্ষ কেউ নয়। বেয়নেট তো দুরের কথা ,তাঁরা স্রেফ ঘেঁটি ধরে জার্মান সেনাদের ছুঁড়ে ফেলে দিতেন।

কিন্তু বারংবার হিটলারের নির্দেশ ও উৎসাহ থাকলেও ট্র্যাক্তর ফ্যাক্টরীর দখল পউলাস নিতে পারলেন না। তাঁর রিজার্ভও ফুরিয়ে এসেছে। কাগজে কলমে তার কাছে প্রায় সাড়ে তিন লাখ সৈন্য থাকলেও লড়াই করতে সক্ষম এমন সৈন্যের সংখ্যা সত্তর হাজারেরও কম।

১৪ই অক্টোবর, ১৯৯ দিনের স্তালিনগ্রাদের যুদ্ধের বোধহয় সবথেকে রক্তক্ষয়ী দিন। চুইকভের বিবরণীতে - "১৪ তারিখে জার্মানেরা আক্রমণ হানালো। সেদিনটি ছিলো পুরো যুদ্ধের মধ্যে সবথেকে রক্তক্ষয়ী এবং হিংস্র দিন। চার কি পাঁচ কিলোমিটার লম্বা সরু ফ্রন্ট জুড়ে জার্মানেরা পাঁচটি ইনফ্যা¾ট্রী আর দুটি ট্যাঙ্ক ডিভিশন নিয়ে নেমে পড়লো। সাথে অজস্র কামান ও বিমান .... দুই হাজারের উপর বিমান সর্টি ঐ একদিনেই হয়েছিলো। সেদিন আলাদা আলাদা করে আর গুলি ছোঁড়ার বা কামান দাগানোর শব্দ পাওয়া যাচ্ছিলো না, সব আওয়াজ মিলে মিশে একটানা একটা কান ফাটানো গর্জন। ধোঁয়া আর ধুলোর এমনই ভারী আস্তরণ হাওয়ায় ভেসে ছিলো যে পাঁচ গজ দুরেও কোনো কিছু স্পষ্ট ভাবে নজরে আসছিলো না।... চার পাঁচঘন্টা ধরে অমন নিদারুণ ব্যারাজের পর জার্মান ইনফ্যা¾ট্রী আর ট্যাঙ্ক লড়াই শুরু করলো'।

সেদিনই জার্মানেরা দখল করে নিলো রেড অক্টোবর ফ্যাক্টরীর পুরোটা, আর ব্যারিকেড ও ট্র্যাক্টর ফ্যাক্টরীর কিছুটা অংশও জার্মানদের হাতে চলে এলো। ভলগা নদী থেকে মাত্র তিনশো গজ দুরে পৌছে গেলো পউলাসের সেনারা।

তবে ঐ পর্যন্তই। ওটাই জার্মান সেনার সবথেকে বেশি দখলদারি। ১৯শে নভেম্বরের প্রতি আক্রমণ ও জার্মানদের পিছু হটা অব্দি ওটাই চরম সীমা। এর বেশি আর এগোতে পারেনি তারা।

জার্মান আর সোভিয়েত - এই দুই সেনা পরস্পরের টুঁটি টিপে লড়ই চলিয়ে যাবে বাকি জমিটুকুর জন্য।

একটা সময় (১৫ অক্টোবর) চুইকভের কম্যান্ড অফিস ধ্বংস হলে তিনি ভলগা নদীর পূর্ব পাড়ে তাঁর কম্যান্ড অফিস সরিয়ে নেবার জন্য অনুমতি চান। কিন্তু হেড কোয়ার্টার বলেন : না, এতে সৈন্যদের মনোবল ক্ষুন্ন হবে। চুইকভ তাই লড়াইএর শেষদিন পর্যন্ত রণাঙ্গনেই থাকবেন। কখনো কখনো তাঁর কম্যান্ড অফিসের পাঁচশো গজের মধ্যেই তুলকালাম যুদ্ধ চলেছে - কিন্তু চুইকভ স্তালিনগ্রাদ ছেড়ে নিরাপদ দূরত্বে সরে যাননি।

" শত্রুকে জাপ্টে ধরো '

স্টুকা ডাইভ বম্বারের হাত থেকে পরিত্রাণের জন্য চুইকভ নির্দেশ দিলেন "শত্রুকে জাপ্টে ধরো'। মানে যতটা পারো কাছে গিয়ে হাতাহাতি লড়াই শুরু করো। অমন সঙ্কুল যুদ্ধ চললে স্টুকা ডাইভ বম্বারও কাজে আসবে না কেননা শত্রু আর মিত্র দুজনেই বড় কাছাকাছি।

সে সময় রাশিয়ান সেনাদের পক্ষে কোনো কেন্দ্রীয় নির্দেশও আসা সম্ভব ছিলো না। চুইকভ বলেছিলেন "প্রতিটি সেনাই তাঁর নিজের জেনারেল। শুধু লড়ে যাও। '

অক্টোবরের পনেরো তারিখে পউলাস আবার একবার কোমর বেঁধে নামলেন। ট্র্যাক্টর ফ্যাক্টরী চাইই চাই। ভোর থাকতেই জার্মান আর্টিলারী তাদের ব্যারাজ শুরু করলো কিন্তু বেশিক্ষণ টানতে পারলো না কেননা পর্যাপ্ত সংখ্যক গোলা তাঁদের ছিলো না। প্রত্যুত্তরে রাশিয়ান ব্যারাজ শুরু হলো ভলগা নদীর পূর্ব পাড় থেকে। কামান আর কাট্যুশা রকেট। সারা দিন বোমারু বিমান হানা দিয়ে গেলো। অবিশ্রান্ত বোমা বর্ষণ। প্রায় তিনশো জার্মান ট্যাঙ্ক ঘিরে রেখেছে ট্রাক্টর ফ্যাক্টরীর তিন দিক। কিন্তু দিনের শেষে প্রায় তিন হাজার জার্মান সেনার মৃতদেহ পড়ে রইলো। নাৎসী বিজয় পতাকা উড়লো না। ট্র্যাক্টর ফ্যাকটরী অধরাই থেকে গেলো। উড়লো না নাৎসী পতাকা।

"পাভলভের বাড়ি" - এই অক্টোবর মাসেই স্তালিনগ্রাদের আরেক কিংবদন্তী হয়ে ওঠে। ঐ ধ্বংসস্তুপের মধ্যেই খাড়া ছিলো এক চারতলা বাড়ি, সার্জেন্ট জ্যাকভ পাভলব আর প্রায় জনা পঞ্চাশেক সেনা কোনো রকম রসদের যোগান ছাড়াই প্রায় একমাস দখলে রেখেছিলেন - অবিশ্রান্ত জার্মান আক্রমণের মুখোমুখী হয়ে। বাড়িতে টিঁকে রইলেন। দিনে অথবা রাতে - গোলা আর বোমার বিরাম নেই। ঘুম নেই বিশ্রাম নেই। কিন্তু পাভলভ আর তার সঙ্গীরা শেষ পর্যন্ত অজেয়ই থেকে গেলেন। আরো উল্লেখযোগ্য ঘটনা যে পাভলভের দলে প্রায় তেরোটি ভিন্ন ভিন্ন জাতি ও উপজাতির মানুষ ছিলেন।

আরেক কিংবদন্তী তখনকার স্নাইপারেরা। বিশেষত: জিকান ( zikan ) যিনি নাকি ২২৪ জন জার্মান সেনার প্রাণহরন করেন। Zaitsev হত্যা করেন ১৪৯ জন জার্মান সেনাকে।

তবে হিটলার কিন্তু খুবই আশাবাদী ছিলেন। স্তালিনগ্রাদ যে জার্মানদেরই দখলে সে নিয়ে তাঁর সংশয় ছিলো না।

এই ভাবেই অক্টোবার মাস শেষ হলো। স্তালিনগ্রাদকে ভেঙ্গে টুকরো টুকরো করে দিয়েও পুরো কব্জা করতে পারলো না জার্মানেরা। তাঁদের সাপ্লাই লাইন ক্রমশই বিপজ্জনক ভাবে দীর্ঘ হচ্ছে। হতাহত সেনাদের বদলে নতুন ট্রুপ আনাও দু:সাধ্য হছে আর তার সাথে সব সময়েই আসন্ন শীতের আতঙ্ক।

এক সমস্যা মিটতেই তাই অন্য সমস্যা দেখা দেয়। প্রায় দেড় লাখ ঘোড়া,বলদ আর উটকে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সরিয়ে নিলেন জার্মান কর্তৃপক্ষ। কেননা এই ভারবাহী জানোয়ারদের জন্য খাবার যোগাড় করা অসম্ভব হয়ে পড়েছিলো। এর ফলে জার্মানদের ভারী কামান টেনে নেওয়ার জন্য কোনো সহকারী জন্তু আর রইলো না।

" জার্মানরা লড়তেই জানে না '

রেড অক্টোবর ফ্যাক্টরী সব সময় চালু রাখা সম্ভব ছিলো না। কিন্তু ওরই মধ্যে যখনই কোনো টি ৩৪ ট্যাঙ্ক তৈরী হয়েছে তখনই ফ্যাক্টরী থেকে সরাসরি ফ্রন্টে চলে গেছে সেই ট্যাঙ্ক। যদি হাতের কাছে না থাকে ট্যাঙ্ক চালক,ক্ষতি নেই। শ্রমিকেরাই ট্যাঙ্ক চালিয়ে হাজির হয়েছেন লড়াইতে।

হিটলার ভেবে এসেছিলেন রাশিয়া একটি পচে যাওয়া আস্তানা, একটি জোরদার লাথিতেই হুড়মুড় করে ভেঙে পড়বে। হয়তো প্রথম দিকের লড়াই তাঁর আত্মতুষ্টিকে বাড়িয়ে দিয়েছিলো। তার সেনানায়কেরা কিন্তু গ্রাউন্ড রিয়ালিটি বুঝতে পারছিলেন। তারা বারবারই সাবধান করে দিচ্ছিলেন হিটলারকে।

আত্মবিশ্বাসের কিছু কমতি ছিলো না চুইকভেরও। তাঁর তিনদিকে ঘিরে রয়েছে পউলাসের ষষ্ঠ আর্মি আর চুইকভ বলছেন, দূর। জার্মানরা লড়াই করতেই জানে না।

চুইকভের মেময়র্স থেকে : "আমি ভেবেছিলাম নাৎসী বাহিনীর গোলন্দাজ আর পদাতিক সেনার একটা চমৎকার সুসঙ্ঘবদ্ধ অপারেশন দেখবো, পদাতিক আর গোলন্দাজ বাহিনীর সঠিক বোঝাপড়া, বিদ্যুদ্‌গতির আক্রমণ আর সাঁজোয়া বাহিনী ও কামানের এক যুগলবন্দী। কিন্তু দেখলাম তারা ঐ একটি একটি করে ট্রেঞ্চ দখলের স্লথগতির সেই পুরানা জমানার ট্যাকটিক্স নিয়েই পড়ে রয়েছে।

পদাতিক সেনারা পাশে এবং বিমান বাহিনী আকাশে হাজির থাকলে, তবেই জার্মান সাঁজোয়া বাহিনী রণাঙ্গনে আসে। আর বিদেশী খবরের কাগজে জার্মান ট্যাঙ্ক বাহিনীর যেসব প্রশংসা শুনেছিলাম, তাঁরা না কি দারুণ যোদ্ধা, সাহসী ও দ্রুত গতি- কই, সে সব তো কিছু দেখলাম না। বরং এরা স্লথগতি, সবেতেই দোনামনা করেন এবং অত্যন্ত বেশি রকমের সাবধানী। জার্মান পদাতিক সেনারা অটোমেটিক অস্ত্র ভালই চালান তবে দূর থেকে। কাছে এসে সামনা সামনি লড়াই করার হিম্মত এদের নেই '।

"যথেষ্ট বিনয়ের সাথেই জানাচ্ছি। স্তালিনগ্রাদ? ও তো আমরা জিতেই গেছি।' - হিটলার, মিউনিখ, ৮ই নভেম্বর

সাতই নভেম্বর অক্টোবর বিপ্লবের বার্ষিকী দিবসে রাশিয়ান কসমোসল সদস্যদের স্মরণ করিয়ে দেওয়া হলো - তোমাদের ১৬৯৭ জন সদস্যের মধ্যে এখনো ৬৭৮ জন সদস্য রয়ে গেছে যারা একজন জার্মান সেনারও প্রাণ নেয়নি।

রাশিয়ান শীত তখন ক্রমে জাঁকিয়ে বসতে শুরু করেছে। তাপমান নেমে গেছে মাইনাস ১৮ ডিগ্রীতে। এটাই চুইকভের কাছে সবথেকে ক্রিটিকাল সময়। ভলগা নদীতে শুরু হয়েছে আইস ফ্লো। ভাসমান বরফের চাংড়া। এই সময়ে ভলগার পূর্ব পাড় থেকে কোনো যোগান সম্ভব নয়। এই বরফ পুরু হয়ে জমে গেলে তখন ট্রাক চালিয়েও চলে আসা যাবে কিন্তু প্রবহমান নদী আর জমে থাকা পুরু বরফের আস্তরণ - এই দুইয়ের মাঝামাঝি এক সপ্তাহ সময়টাই সবথেকে বিপজ্জনক।

জার্মান সেনাবাহিনী নিয়ে এসেছে তাঁদের কম্যান্ডো দলকে - নাম তাঁদের পাইওনীয়ার। দশই নভেম্বর প্রায় ৬০০ পাইওনীয়ারের দুটি দল ব্যারিকেড ফ্যাক্টরী আক্রমণ করলো - তখন রাত সাড়ে তিন। ফ্যাকটরের দুটি "দুর্গ" দখল করতে হবে - একটি হচ্ছে কমিসারের বাড়ি আর দ্বিতীয়টি সেই কারখানার ওষুধের দোকান। ওষুধের দোকান ঝট করে দখল করে নিলো পাইওনীয়াররা কিন্তু কমিসারের বাড়ি অজেয়ই থেকে গেলো।

ওপাড় থেকে যোগান বন্ধ। ছিন্নবিচ্ছিন্ন ভাবে ভাবে রাশিয়ান সেনারা কিছু পকেটে তাঁদের অস্তিত্ব বজায় রেখেছেন। কানাঘুষোয় নিশ্চয়ই শুনেছেন বিশাল এক প্রতিআক্রমণের কথা। সে আশায় বুক বেঁধে লড়ে যাচ্ছেন। ঐ এগারো তারিখেই জুখভের পাল্টা আক্রমণ শুরু হবার কথা ছিলো কিন্তু লজিস্টিকের সমস্যা। যথেষ্ট রসদ বিশেষত: তেল ও গোলাবারুদ মজুদ হয়নি, মার্শাল জুখভ তাই আরো দশদিন পিছিয়ে দিলেন। শঙ্কিত সবাই। আরো দশদিন স্তালিনগ্রাদের প্রতিরক্ষা অটুট থাকবে তো ? আর ঐ ছোট্ট পকেটে যেখানে রাশিয়ান সৈন্যরা কোনোরকমে টিঁকে আছে সেখানে বিমান থেকে রসদ পাঠানও অসম্ভব। ১৪ তারিখ থেকে ফেরী দিয়ে জোগান সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেলো।

কিন্তু রাশিয়ান সেনারা,তাঁদের অমন ডেসপারেট অবস্থাতেও মানসিক দিক দিয়ে ভেঙে পড়েননি, যতটা ঘটেছিলো জার্মান সেনার ক্ষেত্রে। হয়তো তাঁদের খুব সহজেই এই যুদ্ধ জেতার আকাঙ্ক্ষাটা বেশি ছিলো। আসন্ন শীতের কথা ভেবে তাঁরা আরো কাবু হয়ে পড়েছিলেন। যুদ্ধ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা ক্রমশই বাড়ছিলো।

রাশিয়ান সেনারা লাউডস্পীকারে ক্রমাগত প্রচার চালাচ্ছিলো যে দলত্যাগী জার্মানদের উপর কোনো অত্যাচার হবে না। সে সময়কার কম্যান্ডিং অফিসার ব্যারন ভন গ্যাবলেঞ্জের মেমো পড়লে বোঝা যায় পরাজয়ের মনোভাব জার্মান বাহিনীকে কিরকম আচ্ছন্ন করে রেখেছিলো। "আলস্য একেবারেই বরদাস্ত করা হবে না।.... ফ্রন্ট লাইনে ঘুমিয়ে পড়লে তার শাস্তি মৃত্যু। অস্ত্র,ঘোড়া, যন্ত্রপাতি,নিজের শরীর এইসবের ইচ্ছাকৃত অবহেলাকেও ঐ চোখে দেখা হবে। পুরো শীতটাই এখানে কাটানোর জন্য মানসিক ভাবে প্রস্তুত হতে হবে'।

মরালের সমস্যা কঠিন হয়ে উঠছিলো জার্মানদের পক্ষে। রিচোফেন, জর্মান বিমান বাহিনীর লোকাল কম্যান্ডার তাঁর নভেম্বরের ডায়ারীতে লিখলেন "স্তালিনগ্রাদের কম্যান্ড্যার আর সৈনিকেরা এতোই নিরুৎসাহ হয়ে পড়েছেন যে নতুন করে কিছু উদ্দীপনা আমদানি করতে না পারলে আমাদের আর কোথাও যাবার জায়গা থাকবে না।'

আর খবর তো আসছিলোই যে রাশিয়ানরা তাদের কাউন্টার অ্যাটাকের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। যদিও কোনো ডিটেইলই জার্মানরা জানতেন না। এমনকি চুইকভকেও জানানো হয়নি।

অবশেষে ১৯শে নভেম্বরের ভোর বেলায় চুইকভ আর তাঁর সেনারা শুনতে পেলেন সোভিয়েত কামানের বজ্রনির্ঘোষ। "এক নতুন ও ভয়ানক আওয়াজে রণাঙ্গন ভরে উঠলো'। শুরু হলো মার্শাল জুখভের প্রতি আক্রমণ।

"এসে গেছে যুদ্ধের দেবতারা'

রাশিয়ানরা তাঁদের কামানকে বলতেন যুদ্ধের দেবতা। এখানে টীকা আবশ্যক : জার্মান সেনার ট্যাকটিক্স ছিলো দ্রুতগতির ট্যাঙ্ক ও গ্রাউন্ড সাপোর্ট বোমারু বিমান নির্ভর। তুলনায় রাশিয়ান সমরকৌশল চিরকালই ভারী কামান নির্ভর। একটানা প্রচন্ড গোলা বর্ষণের ছাতার তলায় আসতো সেনাবাহিনী ও ট্যাঙ্কের যূথ। তাই ঐ রোলিং ব্যারাজের আওয়াজ পেলেই টের পাওয়া যেতো আসন্ন সোভিয়েত আক্রমণের নিশানা।

স্তালিনগ্রাদ যুদ্ধের তৃতীয় ও শেষ পর্ব শুরু হলো। পউলাসের শেষের শুরু।

স্তালিনগ্রাদ দখল করতে গিয়ে জার্মানেরা তাঁদের সর্ব শক্তি নিয়োগ করেছিলো আক্রমণে। তাঁদের প্রতিরক্ষা বলতে কিছুই ছিলো না। পউলাসের মূ¤ল সেনাব্যুহের পাশে ছিলো হাঙ্গারিয়ান, রুমানিয়ান ও দলছুট রাশিয়ান সেনা দিয়ে তৈরী ফ্ল্যাংক। জন কীগান বলেছিলেন ফ্র্যেজাইল শেল।

হিটলারকে তাঁর চীফ অফ স্টাফ Zeitzler অনুরোধ করলেন অবিলম্বে পউলাসের সিক্সথ আর্মি যেন পিছু হটে আসে। কিন্তু হিটলারের এক গোঁ। ভলগা ছেড়ে আমরা এক পাও পিছিয়ে আসবো না। তাঁর একগুঁয়েমি ও হঠকারী নির্দেশ জারির কিছুটা দায়িত্ব অবশ্য তাঁর বিমান বাহিনীর উপরও বর্তায়। পউলাসের দৈনিক প্রয়োজন ছিলো ৭০০ টন রসদের। খুব দর কষাকষি করে ঠিক হলো লুফৎওয়াফ দৈনিক ৩০০ টন রসদ পাঠাবেন। কিন্তু সেই ব্যাপারে তারা চূড়ান্ত অসফল হন।

ইঁদুরযুদ্ধ

মাত্র দুদিনের আক্রমণেই পউলাসের দুই প্রান্তই সোভিয়েত শক্তির কাছে পর্যুদস্ত হল। যেন ঝড়ের মুখে ঝরা পাতা,এমনি ভাবে দুই ফ্ল্যাংকের রুমানিয়ান সেনারা লাল ফৌজের দাপটের কাছে সম্পূর্ণ ভাবে হেরে গেল। এই প্রথম দিকের অভাবনীয় সাফল্যের পিছনে রাশিয়ান মেঠো ইঁদুরের অবদানও কম ছিল না। রুমানিয়ানদের (এবং ইতালিয়ান) সেনাদের শোচনীয় অবস্থা দেখে জেনারেল ফার্দিনান্দ হেইমের জার্মান ৪৮ প্যানজার বাহিনী ফ্রন্টে এগিয়ে আসতে প্রস্তুত হল। এবং আতঙ্কের সাথে দেখল তাদের অধিকাংশ মার্ক ফোর ও প্যানথার ট্যাঙ্ক অচল হয়ে গেছে ইঁদুরের আক্রমণে!! ইঁদুরের দল ইন্সুলেশন,ইলেকট্রিক তার সব চিবিয়ে খেয়ে ফেলেছে।

২১শে নভেম্বর, পউলাসের হেড কোয়ার্টার (গলুবিনস্কয়া) দখল করে নিলো লাল ফৌজ। নেহাৎ কপালের জোরে পউলাস তার মাত্র দু ঘন্টা আগেই পালিয়ে যেতে পেরেছিলেন।

পুরোপুরি ঘিরে ফেলবার আগেই ১০০ মাইল পিছিয়ে যেতে চাইলেন পউলাস। হিটলার আদৌ রাজী হলেন না। ঠিক আছে পিছিয়ে না আসি - পাশে পশ্চিম দিকে অন্তত: সরে যাই- পউলাসের এই কাকুতিও হিটলার অগ্রাহ্য করলেন। কিছুটা আঁচ পেয়ে মার্টিন ফাইবিগ, লুফ্‌তওয়াফের কম্যান্ডার, আগেভাগেই পউলাসকে জানিয়ে দিলেন যে এয়ার ড্রপ করে সোভিয়েত ব্যুহ বন্দী ষষ্ঠ আর্মিকে রসদ জোগানো সম্ভব নয়। কিন্তু হিটলারের অমননীয়তা সেই দিকেই ঠেলে দিচ্ছিলো ঘটনাচক্রকে।

২৪শে নভেম্বর হিটলার,বিমান বাহিনীর হেড গোয়েরিং ও চীফ ওফ স্টাফ জেইত্‌জ্‌লারের মিটিং পউলাস ও ষষ্ঠ আর্মির কফিনে শেষ পেরেকটি পুঁতে দিলেন। গোয়েরিংকে প্রশ্ন করলেন হিটলার কতটা রসদের যোগান দিতে হবে সেটা তিনি জানেন কিনা। গোয়েরিং জবাব দিলেন যে তিনি না জানলেও, তার অধস্তন কর্মীরা ঠিকই জানেন। জেইত্‌জ্‌লার ক্ষেপে গিয়ে চেঁচিয়ে উঠলেন "মিথ্যা কথা'। হিটলার তর্কের শেষ করলেন এই বলে যে আমার রেইখমার্শাল (গোয়েরিং) আমায় কথা দিয়েছেন এবং তাকে আমি বিশ্বাস করি। ব্যাস।

ততদিনে পউলাসের বাহিনীকে সম্পূর্ণ ঘিরে ফেলেছে লাল ফৌজ। সড়ক পথে আর কোনো জোগান আসা সম্ভব নয়। পউলাসের সম্বল বলতে মাত্র ৬ দিনের খাদ্য ভান্ডার। আর পেট্রল,গোলা বারুদ,ওষুধ এসবের অবস্থাও ঐ রকমই। সঙ্গীন। সে সময়কার সেরা আর্মি - ক্ষুধার্ত, শীতে কাতর, অস্ত্রহীন হয়ে মারা যাবে। এটাই হিটলারের নির্দেশিত ভবিতব্য।

পউলাসের চাহিদা ছিলো দৈনিক পাঁচশো টন রসদ। লুফ্‌তওয়াফ জানালো মেরে কেটে দৈনিক ৩০০ টন তারা যোগান দিতে পারবেন। তাইই সই। কিন্তু তারা গড়ে মাত্র ৭০ টন সাপ্লাই করেতে পেরেছিলেন এবং মাত্র তিনদিন, শুধু মাত্র তিনদিন তারা ৩০০টন সাপ্লাই করেছিলেন। ওটাই ম্যাক্সিমাম। রেকর্ড।

যথেষ্ট প্লেনই ছিলো না। ক্রীটের যুদ্ধে অনেকগুলি পরিবহনকারী জে ইউ ৫২ বিমান ধ্বংস হয়েছে। তাছাড়া রাশিয়ান শীত- সেও এক বড় কারণ।

দিনের পর দিন, বিধ্বস্ত বিমানের সংখ্যা বেড়েই চললো। প্রায় অর্ধভুক্ত অবস্থাতেই রইলো জার্মান সেনারা। কিন্তু তাদের বীরত্ব ও শৃঙ্খলাবোধে ঘাটতি পরেনি একটুও। তারা সমানে লড়াই চালিয়ে গেছেন। গোলাবারুদের স্টক এতোই কমে গেছিলো যে ঐ সময়ে এক জার্মান সার্জেন্ট তার হাউইটজার দাগিয়ে এক রাশিয়ান আক্রমণকে সাফল্যের সাথে প্রতিহত করলেও তাকে তার উর্ধ্বতন অফিসার বেদম বকুনি দিয়েছিলেন - বেশি গোলা খরচ করে ফেলার জন্য।

তবে ঐ মৃত্যু উপত্যকায় একবার আশার হাওয়া বইলো যখন ব্যুহবন্দী ষষ্ঠ আর্মি খবর পেলো তাদেরকে উদ্ধার করতে আসছে স্বয়ং ম্যানস্টেইন। দক্ষিণ-পশ্চিম থেকে শুরু হলো অপারেশন উইন্টার স্টর্ম। তাদের পরিকল্পনা, ঘিরে ফেলা রাশিয়ান চক্রকে ভেদ করে স্তলিনগ্রাদে আটকে থাকা পউলাসের সেনাদের উদ্ধার করা হবে।

কিন্তু এই পরিকল্পনার সবথেকে বড় বাধা ছিলেন হিটলার - আর কেউ না। তিনি একবার ম্যানস্টেইনকে নির্দেশ দিচ্ছেন যে তার সেনারা বাইরে থেকে আক্রমণ শুরু করলেই ব্যূহের ভিতর থেকে পউলাসও ব্যুহ ভেঙে বেরিয়ে আসবার চেষ্টা করবে আবার তার সাথে সাথেই পউলাসকে আদেশ দিয়েছেন খবরদার। যেখানে আছো সেখানেই থাকো।

এর আগে ম্যানস্টেন আর পউলাসের একটা বোঝাপড়া হয়ে গেছিল। ম্যানস্টেইন তার কোড ওয়ার্ড থান্ডারস্টর্ম পাঠালেই পউলাস তার স্তালিনগ্রাদের ঘাঁটি ছেড়ে ম্যানস্টেইনের বাহিনীর সাথে মিলিত হবার প্রচেষ্টা চালাবেন। কিন্তু হিটলারের নির্দেশ মেনে তিনি পরে এই প্রচেষ্টার থেকে বিরত হন। কী ছিল পউলাসের মনে? প্রায় তিন লক্ষ সেনার অবধারিত পরাজয় ও মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও তিনি সৈনিকের দায় পালন করে গেলেন? পারলেন না হিটলারের পাগলামির বিরোধিতা করতে? শত্রুসেনার অলাতচক্রের মধ্যে অসহায় ক্যাসাবিয়াংকার মতন দাঁড়িয়ে রইলেন অনুগত পউলাস।

স্তালিনগ্রাদের এই লড়াইকে জার্মানরা নামকরণ করেছিলো ইঁদুর যুদ্ধ। ভাঙা চোরা বাড়িঘর গলি ঘুপচি, গর্ত আর বেসমেন্টে লুকিয়ে থেকে টিঁকে থাকার লড়াই। যুদ্ধ শেষ টের পাওয়া গেলো স্তালিনগ্রাদ ছিলো এক ইঁদুরকল। যাতে ধ্বংস হলো জার্মান ষষ্ঠ আর্মি।

আমাদের শেষ বুলেট টিও আর নেই।

অসুস্থ আহত জার্মান সেনাদের প্লেনে করে উড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হতো নিরাপদ স্থানে। ক্রমশই আহতের সংখ্যা বাড়তে লাগলো। তখন প্রায়রিটিও বদলে গেলো। যারা খুবই জখম এবং চিকিৎসাতেও তারা আর রণাঙ্গনে ফিরতে পারবেন না, সেই গুরুতর আহতদের আর নেওয়া হতো না। যারা স্বল্প জখম ,চিকিৎসার ফলে আবার লড়াই শুরু করবেন - তারাই বিমানে উঠবার অনুমতি পেতেন।

আশ্চর্যের বিষয়, ম্যানস্টেইন আর পউলাস কখনো সরাসরি কথা বলেননি। তাঁদের যোগাযোগ ছিলো শুধু টেলিটাইপের মাধ্যমেই।

এসে গেলো ৪২-এর খ্রীস্টমাস। স্তালিনগ্রাদের আটকে থাকা জার্মান সেনারা প্রায় অনাহারে রয়েছেন। যে কটি ঘোড়া ছিলো জার্মান সেনাদের কাছে সেগুলি জবাই করা হলো। এক আধ টুকরো মাংস- সেটাই এক ভোজ। নয়তো খাদ্য বলতে এক বাটি পাতলা স্যুপ আর মাত্র ১০০ গ্রাম রুটি।

হিটলার একটু নড়ে চড়ে বসলেন। লুফ্‌তওয়াফের ফীল্ড মার্শাল মিল্‌চকে পাঠানো হলো স্তালিনগ্রাদে - সরেজমিন তদন্তে। মিল্‌চ নিজের চোখে সব দেখে একবার শেষ চেষ্টা করলেন। যে খানে যতগুলি বিমান ছিলো। কুড়িয়ে বাড়িয়ে স্তালিনগ্রাদে জোগাড় করলেন। কিন্তু বড় দেরী হয়ে গেছে। এয়ারপোর্টগুলিও পতনের মুখে। জানুয়ারীর আবহাওয়া বড়ই খারাপ আর ততদিনে রাশিয়ান ফাইটার প্লেনেরাও অনেক বেশি সচল।

হিটলারের মত বদলানোর জন্য পউলাসের শেষ চেষ্টা - তিনি দুত হিসাবে পাঠালেন তার অধস্তন উইৎজেউইৎজকে ( Witzewitz )। হিটলারের মুখোমুখি তিনি বারবার বলেতে লাগলেন স্তালিনগ্রাদে আটকে থাকা সেনাদের দুর্দশা। হিটলার জানিয়ে দিলেন শেষ বুলেট পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যেতে হবে। উইৎজউইৎজ তার অন্তিম সাহসটুকু সম্বল করে জানালেন ,হে ফ্যুরার। ঐ সেনাদের আর শেষ বুলেট পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার মতন পরিস্থিতি নেই, কেননা আমাদের কাছে শেষ বুলেটটিও আর নেই।

এই অভাবনীয় অভূতপূর্ব সাহসী উত্তরে হিটলার পাশ কাটিয়ে গেলেন। পউলাসের সামনে আর কোনো পথ খোলা রইলো না।

"পউলাস অমর হতে শেখেনি'

ডিসেম্বরের চব্বিশ তারিখ ম্যানস্টেইন পিছু হঠলেন। স্তালিনগ্রাদকে বাইরে থেকে "মুক্ত' করার চেষ্টা ব্যর্থ হলো।

লাল ফৌজের সামনে কচুকাটা হচ্ছে রুমানিয়ান হাঙ্গারিয়ান আর ইতালিয়ানের দল। উদ্বিগ্ন ইতালিয়ান মন্ত্রী সিয়ানো প্রশ্ন করলেন খুব বেশি হতাহত হয়েছে কি ইতালিয়ান অষ্টম আর্মিতে? তাকে নিশ্চিন্ত করলেন এক অফিসার "কোথায় হতাহত? আমরা তো সবাই পালিয়েই গেলাম '।

৮ই জানুয়ারী - সোভিয়েতরা পউলাসকে আত্মসমর্পণের সুযোগ দিলেন। সম্মানজনক শর্তে। হিটলার নাকচ করলেন পউলাসের আবেদন।

২৪শে জানুয়ারী - সোভিয়েত সেনা আবার আত্মসমর্পণের সুযোগ দিলেন পউলাসকে। পউলাস বার্তা পাঠালেন হিটলারকে : "কোনো গোলা বারুদ নেই, বা খাবার,... লড়াই আর সম্ভব নয় .. আঠারো হাজার গুরুতর জখম ,কোনো চিকিৎসা নেই .... অবশ্যম্ভাবী পরাজয়। আত্মসমর্পণের অনুমতি চাই'।

হিটলরের উত্তর : "আত্মসমর্পণ কখনো নয়। ৬ষ্ঠ আর্মি শেষ সৈনিক ও শেষ কার্তুজ অব্দি লড়বে, তাদের বীর আত্মত্যাগে উদ্বুদ্ধ হয়ে জন্ম নেবে এক প্রতিরক্ষী ফ্রন্ট যা পশ্চিম দুনিয়াকে মুক্ত করবে'।

পশ্চিম দুনিয়ার মুক্তি !! এই ষষ্ঠ আর্মিই জিতে নিয়েছিলো ফ্রান্স ও বেলজিয়াম।

আটাশে জানুয়ারী। লড়াইয়ের কিছু নেই। স্তালিনগ্রাদের এক ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের বেসমেন্টে পউলাস এক অন্ধকার ঘরে ক্যাম্প খাটের উপর বসে। এইই তার হেড কোয়ার্টার।

৩০শে জানুয়ারী স্তালিনগ্রাদের পিটোম্নিক এয়ারফিল্ড থেকে শেষ জে ইউ ৫২ বিমান উড়লো। কিছু আহত সেনা, ষষ্ঠ আর্মির ওয়ার ডায়ারী, পউলাসের উইল। যাত্রী এরাই। কিছু পরেই লাল ফৌজ ঐ বিমানপোত দখল করে নিলে পউলাসের কাছে আর কোনো এয়ারপোর্টও রইলো না।

তিরিশে জানুয়ারী গোয়েরিং বার্লিন থেকে এক রেডিও বক্তৃতায় বললেন "আজ থেকে হাজার বছর পর জার্মানরা এই যুদ্ধের কথা বলবে বিস্ময় ও শ্রদ্ধার সাথে, জানবে শত প্রতিকূলতা স্বত্তেও এই রণাঙ্গনেই জার্মানীর অন্তিম বিজয় সূচিত হয়.....এই মহান যুদ্ধের কথা ...... ' ইত্যাদি ইত্যাদি।

হিটলারও পিছিয়ে নেই। তারই নির্দেশে মৃত্যদন্ডে দণ্ডিত এই সেনাদের তিনি অকাতরে বিতরণ করলেন প্রোমোশন ও পুরস্কার। ফ্রেইডরিখ পউলাস হলেন ফীল্ড মার্শাল। হিটলার জনান্তিকে বলেছিলেন জার্মানীর ইতিহাসে কোনো ফীল্ড মার্শাল কখনো আত্মসমর্পণ করেনি ,অতএব ...।

জানতেন পউলাসও। এই ফীল্ড মার্শালের সোনার বেটন কোনো পুরস্কার নয়, আসলে এ এক মৃত্যু পরোয়ানা।

পউলাস ,অন্তত একবার হিটলারের ইচ্ছাকে অমান্য করলেন। পরের দিনই তিনি আত্মসমর্পণ করলেন।
হিটলার সখেদে বললেন "পউলাস অমর হতে শেখেনি'। পরে আরো বলেছিলেন "আরে,শান্তির সময়েও জার্মানীতে প্রতি বছর কুড়ি পঁচিশ হাজার লোক আত্মহত্যা করে আর পউলাস বীরের মৃত্যু বরণ করতে পারল না?'

" চড়াই পাখীদের জানিও আমার ভালোবাসা '

স্তালিনগ্রাদে আবার উড়লো লাল নিশান। সারা দুনিয়া জানলো জার্মানী আর অজেয় নয়। জার্মানী আর জিতবে না। একটানা হেরে যাওয়া শেষ হবে সেই বার্লিনের পতনের পর। যুদ্ধের আগে স্তালিনগ্রাদে প্রায় সাড়ে আট লক্ষ অসামরিক নাগরিক বাস করতেন। কত জন প্রাণ হারালেন? কতজন পালিয়ে গেলেন? যুদ্ধের পরেই এক সেন্সাস রিপোর্টে দেখা যায় মাত্র ১৫০০ বাসিন্দাকে।

এদের অনেকেই হয়তো ভলগা নদীর নিরাপদ পূর্ব পাড়ে পালিয়ে যেতে পেরেছিলো। কতজন পেরেছিলো জতুগৃহ ছেড়ে চলে যেতে? কেউ হিসাব রাখেনি।

আর সামরিক ক্ষয় ক্ষতি? খুব দায়সারা হিসেব কিছু আছে। যেমন চার লাখ জার্মান, প্রায় সোয়া লক্ষ মতন ইতালিয়ান ও হাঙ্গারিয়ান, দু লাখ রুমানিয়ান, পঞ্চাশ হাজার দলছুট রাশিয়ান। আর পাঁচ লাখ সোভিয়েত সেনা।

যে ৯০ হাজার জার্মান সেনা পউলাসের সাথে আত্মসমর্পণ করেছিলেন, তাদের মাত্র ৫০০০ ঘরে ফিরেছিলেন।

এই দশ এগারো বারো লক্ষের নিধন মেলায় কিছু ব্যাক্তিগত ট্র্যাজেডিও ঠাঁই পেয়েছে।

আর্টিলারী রেজিমেন্টের লেফটেনান্ট চারনোসভ, তার স্ত্রী শুরাকে লিখলেন: "আমার ছোট্টো পাখী দুটোকে আমার চুমু দিও ,স্লাভিক আর লাইডুসিয়া। আমি ভালো আছি। দু বার আহত হয়েছি ঠিকই কিন্তু সেগুলো নেহাৎতই আঁচড়। আমি আমার গোলন্দাজের দলকে ঠিকঠাকই চালাচ্ছি। স্তালিনের শহরে আজ বড় দু:সময় চলছে। আমার জন্মভূমি স্মলেনেস্কের প্রতিশোধ আমি এখানেই তুলছি। রাত্রে যখন বেসমেন্টে শুতে যাই তখন দুটো বাচ্চা আমার কোলে এসে বসে। ঠিক যেন আমাদের স্লাভিক আর লাইডা।' না, এই চিঠি আর পোস্ট করা সম্ভব হয়নি। তার মৃতদেহের পকেট থেকে এই চিঠি উদ্ধার হয়েছিলো।

" স্তালিনগ্রাদের জন্য নতুন গান '

হিংস্রে ফেনার একটি টুকরো জমিয়ে রেখো আমার জন্য
ওরা যেন আমার কবরে বিছিয়ে রাখে
একটি রাইফেল আর একটি লাঙল
তোমার জমির ফসল - একটি বাদামী শস্যদানা
যদি কখনোও অবিশ্বাস করো আমায়
জেনো,আমার মৃত্যু হলো তোমাকে ভালোবেসে
তোমাকেই ভালোবেসে

আর যদি, কখনো লড়াই না করে থাকি
তাহলে সসম্মানে তোমার কোমরে বেঁধে দিলাম
এই কালো গ্রেনেড
এইই আমার ভালোবাসার গান , ও স্তালিনগ্রাদ
.....

(পাবলো নেরুদা)