আপনার মতামত         


রাজাকার হয়ে ওঠার গল্প বা ঠাকুর বাড়ির কিস্‌সা
সামরান হুদা

( গত সংখ্যার পর )

-৭-


আজব শহর কলকেতা
রাড়ী বাড়ী জুড়ি গাড়ী মিছে কথার কি কেতা।
হেথা ঘুঁটে পোড়ে গোবর হাসে
বলিহারি ঐক্যতা;
যত বক-বেড়ালে বেহ্মজ্ঞানী বদমাইশের ফাঁদ পাতা।
পুঁটে তেলির আশা ছাড়ি শুঁড়ি সোনার বেণের কড়ি
খ্যামটা খানকির খাসা বাড়ি ভদ্রভাগ্যে গোলপাতা।।

( সঙের গান, হুতোম পাঁচার নকশা )




তিনমাস জাহাঁ আরা'র সাথে কাটিয়ে কলকাতা ফিরে এল আব্দুল সাত্তার ঠাকুর। জাহাঁ আরার আকুল কান্না তার কানে যেন সর্বক্ষণ বাজে। কোন কাজে মন বসে না সাত্তারের। চোখের সামনে নানা আকারে ঘুরে বেড়ায় জাহাঁ আরা। কখনো সে এইটুকুনি ছোট্ট এক মেয়ে হয়ে যায়, যে কিছুতেই নতুন শাড়িটিকে সামলাতে পারে না। এদিক গোঁজে তো ওদিক খুলে যায়, আঁচল সামলায় তো পিঠ বেরিয়ে যায়। কখনও ছোট্ট কোন এক রসিকতায় লম্বা ঘোমটার আড়ালে হাসিতে ভেঙে পড়ে জাহাঁ আরা, হাঁটুতে মুখ গোঁজা অভিমানের গমকে কেঁপে কেঁপে ওঠা জাহাঁ আরা'র শরীর ঘুমোতে দেয় না সাত্তারকে রাতের পর রাত। কেমন আছে জাহাঁ আরা? আসার সময় দেখে এসেছে সদ্য গর্ভবতী জাহাঁ কিছুই খেতে পারে না, খাবার দেখলেই ওয়াক তোলে। এখন কেমন আছে সে? কী করে দিন কাটছে তার একলা একলা? এপাশ ওপাশ করে রাত ভোর হয়, সুউচ্চ স্বরে আজানের ধ্বনি ভেসে আসে বাড়ির লাগোয়া মসজিদ থেকে, পরপর আজান হয় আশে পাশের সমস্ত মসজিদগুলিতে একের পর এক। সাত্তার উঠে পড়ে বিছানা থেকে, কলঘরে গিয়ে চৌবাচ্চা থেকে জল তুলে স্নান করে, অজু করে চলে যায় মসজিদে, নামাজ পড়তে। দিন শুরু শেষের সাথে ভাবনার শুরু বা শেষের কোন সম্পর্ক নেই। নানান কাজের ভাবনার পাহাড়ের আড়ালেও মাঝেমাঝে ঝিলিক মারে ভাবনার সূর্য।


সাত্তার কলকাতায় না থাকলে সবচাইতে সুবিধে হয় মোমিনের। তাকে বকা-ঝকার কেউ থাকে না, মাঝরাতে বাড়ি ফিরলেও কেউ জিজ্ঞেস করে না, সে কোথায় গিয়েছিল এত রাত কেন হল বাড়ি ফিরতে, সে বড় ঝক্কির কাজ বটে! সে যে ভাবে দিন কাটায়, তার ইচ্ছেমত, তাতে কারই বা কী বলার থাকতে পারে? তবে বড়রা উপদেশ দেয় গুচ্ছের। নিজের কাজ করার চাইতে সেটা করতেই তারা বেশি ভালবাসে। আর যারা রঙীন নকশার ভুলভুলাইয়ার আসল পথটা মেলে ধরে সঙ্গে তারা হল বন্ধু। তাদের দর্শনে মন উৎফুল্ল হয়, কথায় রঙীন বেসাতি জ্বলে। আব্দুল সাত্তার ঠাকুর কোনদিনই তার বন্ধু হতে পারেনি। তার না থাকায় কোন অভাব সে বোধ করে না, বরং ভাল। হ্যাঁ, একটু ঝামেলা হয় বটে খাওয়া-দাওয়া নিয়ে, রান্না টান্না করা, সে এক বিষম ঝামেলার কাজ! সে তার পোষায়ও না। তবে দেশ থেকে এসে তাদেরই বাড়ির একটা ঘরে আশ্রয় নেওয়া গোলাম রব্বানী থাকাতে তাকে এ নিয়ে বেশি ভাবতেও হয় না! চৌরঙ্গীর উপরে মেট্রো সিনেমার সামনের ফুটে গোলাম রব্বানীর ছোট্ট দোকান, দেশী-বিদেশী সিগারেট, পারফিউম, লাইটার, নানা রঙের রোদচশমা ইত্যাদি দিয়ে সে তার পসরা সাজায় ফুটপাথের উপর ছোট্ট এক টেবিলে। যা সে পসরায় সাজায় না তা হল, চোরাই মদ। নানা রঙের বোতলে নামী-দামী সব লেবেল লাগানো বিদেশী মদ সে কিনে আনে জাহাজঘাটায় গিয়ে।

শনিবার শনিবার সে দুপুর দুপুর জাহাজঘাটায় চলে যায় বড় কাপড়ের ঝোলাটি কাঁধে ঝুলিয়ে, ব্যাগে থাকে তার পরনের জামা-কাপড়, ধুতি, পাঞ্জাবী, শার্ট, হাফপ্যান্ট। সেখানে চেনা খৈনিওয়ালার কাছ থেকে বোতল সংগ্রহ করে গোলাম রব্বানী, খৈনির বাক্সে চটের তলা থেকে বেরোয় মদের বোতল, চারদিক দেখে নিয়ে সাবধানে ব্যাগ খুলে জামা-কাপড় বের করে রব্বানী, কাপড়ে মোড়ানো বোতল ব্যাগে ঢোকে চোখের পলকে। কোমরে গোঁজা থলে থেকে পয়সা বের হয়, খৈনিওয়ালা ঝটপট টাকা গোনে, সামনে বিছানো চটের তলায় টাকা চলে যায়, মুহূর্তেই। পুলিশকে প্রতি হপ্তায় মোটা টাকা দিতে হলেও তার পুষিয়ে যায়, আন্দাজ করা
যায় ভালই রোজগার হয় সিগারেট আর চোরাই মদের ব্যবসায়। সন্ধ্যেবেলায় ধুতি-পাঞ্জাবী পরা দেশী বাবু, স্যুট-টাই পরা বিদেশী সাহেবরা তার এই চোরাই মদের খদ্দের, ডালহৌসী, ধরমতলার আপিস ফেরত বাবু-সাহেবরা এসে দাঁড়ায় গোলাম রব্বানীর টেবিলের সামনে, পকেট থেকে আগে টাকা বেরোয় বাবু-সাহেবদের, টেরচা চোখে টাকার দিকে তাকিয়েই বুঝে যায় সে কত আছে। খরিদ্দার তো চেনা হয়েই যায়। টেবিলের ধারে রাখা কাঠের বাক্সের ঢাকনা খুলে কার্টুন কার্টুন সিগারেট সরিয়ে কাঙ্খিত বোতল বের করে বাক্সের মধ্যেই রাখা পুরনো খবরের কাগজে মুড়ে কেনা দামের ডবল টাকার বিনিময়ে বোতল তুলে দেয় খদ্দেরের হাতে। খদ্দের শুধু মদই কেনে না, বিক্রি হয় বিদেশী সিগারেট, রং বেরঙের বিদেশী লাইটারও। কখনও বা বিদেশী বোতলে দিশি পারফিউম। তবে এই পারফিউম বিক্রি গোলাম রব্বানীর উদ্দেশ্য নয় আর কী বিক্রি হল না হল তা নিয়ে সে মাথাও ঘামায় না। দোকানে রাখতে হয় তাই রাখে। তার আশে পাশের সবকটি দোকানেই একই রকম জিনিসপত্র বিক্রি হয় কাজেই তাকেও রাখতে হয় এ'সব জিনিস, ব্যবসার নিরাপত্তার জন্যে!


এহেন গোলাম রব্বানীর সাথে মোমিনের গলায় গলায় ভাব হতে সময় লাগেনি। গোলাম রব্বানী নরাইলের পাশের গ্রামের লোক, আশ্রয়ের জন্যে একদিন এসে হাজির হয়েছিল আব্দুল সাত্তারের কাছে। গোলাম রব্বানী সাত্তারের মুখচেনা ছিলই, তবুও নিরাপত্তার জন্যে দেশ থেকে আব্দুল গাফ্‌ফারের লেখা চিঠি নিয়ে এসেছে সাথে করে, বড়ভাই লিখেছিলেন, রব্বানী কলিকাতায় কিছু কাজকর্মের সন্ধানে যাচ্ছে, যতদিন সে তার নিজের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করে অন্যত্র উঠে না যেতে পারে, তদ্দিন যেন তাকে সাত্তার নিজের কাছে রাখে। সাত্তার একতলার সামনের ঘরটি ছেড়ে দেয় গোলাম রব্বানীকে, যেখানে সে রান্না-খাওয়া করত। ঘরের সামনের সরু চিলতে খোলা আঙিনায় সরিয়ে নিয়ে যায় নিজের বাসনপত্র, কেরোসিনের ষ্টোভ আর ছোট্ট মিটসেফখানি, যাতে সে রান্না করে খাবার দাবার রাখে। রান্না করতে গিয়ে মাথার উপর খোলা আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবে, এখানটায় একটা টিন কিনে এনে চালমত করে নিতে হবে, রব্বানী কবে যাবে কে জানে! বর্ষা আগে আসবে না রব্বানী আগে যাবে সেটা প্রথম প্রথম মাথায় এলেও এখন বর্ষা সামলানোই তার প্রধান উদ্দেশ্য। দুপুরে সে যখন মসজিদের দাওয়ায় বিশ্রাম নিতে আসে, তখন চোখের সামনে ভাসে দুনিয়ার যত কালো মেঘ। দুশ্চিন্তা হয় মোমিনটার জন্যেও।


গোলাম রব্বানী যা রোজগার করে, চাইলে যে কোন সময় সে একটা গোটা বাড়িই ভাড়া নিয়ে এখান থেকে উঠে যেতে পারে, কিন্তু তা সে চায় না। সাত্তার দেশে থাকালীন সে মোমিন ঠাকুরের সাথে কথা বলে দশ টাকা ভাড়ায় এখানেই থেকে যাওয়ার চুক্তি করে। মোমিন প্রথমে কিন্তু কিন্তু করছিল বড়ভাইয়ের অনুপস্থিতিতে এ'রকম কোন চুক্তিতে আসায়, কিন্তু গোলাম রব্বানীর তোয়াজ, সন্ধেবালায় তার সাথে ফুর্তি করার সুযোগ পেয়ে মাথা থেকে সব ভাবনা চিন্তা সরিয়ে দিতে সময় লাগে না মোমিনের। রব্বানী প্রত্যহই তার জীবনে ঢেলে দিতে থাকে বিভিন্ন রঙ ও সুগন্ধ। ঠিক যেন রব্বানী তার দোকানের মত বিভিন্ন পারফিউমের শিশি দিয়ে সাজিয়ে দিতে থাকে মোমিন ঠাকুরের জীবন। সকালবেলা উঠে রান্না করা বা রাতে বাইরে থেকে খেয়ে ফেরার ঝক্কি গেছে এখন মোমিনের, সে সব খরচা পাতিও রব্বনীর। সুতরাং দশ টাকার চুক্তি আর দশ টাকায় আবদ্ধ থাকে না বরং দশ দিকে ছড়িয়ে পড়ে। সকালবেলায় রব্বানী রান্না করে মোমিনকে ডেকে তোলে, থালায় ভাত সাজিয়ে দেয়, বলে, খাইয়া দাইয়া দোকানে যাও মিঞা, ব্যবসাডাও তো রাখন লাগব! মোমিন ওঠে, প্রাত:কৃত্য সারে ধীরে সুস্থে, স্নান করে খেয়ে দেয়ে যখন বাড়ি থেকে বেরোয় বেলা তখন প্রায় দুপুর।

আধবেলা পার করে দোকানে গিয়ে পৌঁছুলে দেখতে পায় কর্মচারিরা সব দোকানের বাইরে এদিক ওদিক ঘোরাঘুরি করছে, ম্যাজম্যাজে শরীরে হাঁই তুলতে তুলতে মোমিন বলে, নে চাবি, তালা খোল, কাম -কাজ শুরু কর, খালি ঘুইরা ঘুইরা আড্ডা দিলে চলবো? বিকেলটা কোনমতে পার করে মোমিন, উসখুস শুরু হয়ে যায় সন্ধে লাগতে না লাগতেই, অন্য সব দোকানে যখন পুরোদমে ব্যবসা চলে মোমিন তখন দোকানের ঝাঁপ ফেলে, বলে, শরীলডা বেশি বালা না, আইজকা যাইগা এট্টূ তাড়াতাড়ি! এ এখন রোজকার ঘটনা, তাই কর্মচারিরা কিছু বলে না। তারা কেবল মুখ টিপে হাসে আর ভাবে সাত্তার ফিরে এলে কী হবে মোমিনের!
চাবি শার্টের পকেটে ফেলে লম্বা লম্বা পা ফেলে এগোয় বড় রাস্তার দিকে, গন্তব্য মেট্রো সিনেমার সামনের ফুটপাথের দেশী-বিদেশী সিগারেট আর পারফিউমের দোকান, আর তারপরে গোলাম রব্বানীকে সঙ্গে নিয়ে ফেরত রাস্তায় চাঁদনীর অন্ধকার ঘুপচি গলির ভেতর ততধিক অন্ধকার এক ঘর, যেখানে থাকে কামিনী। কোন কোনদিন গোলাম রব্বনীর দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে আপেক্ষা করতে হয়। কারণ এটাই বাবুবিবিদের সুরা সংগ্রহের উৎকৃষ্ট সময়। মোমিনের মত রব্বানী তার নিজের ব্যবসা নিয়ে হেলাফেলা না করলেও কামিনী তাকে টানে। বারেবারে টাকা গোনে আর একসময় ব্যস বলে উঠে পড়ে ব্যবসা গুটিয়ে।


কামিনী গোলাম রব্বানীর বাঁধা মেয়েমানুষ। কিন্তু রব্বানীর দরাজ দিল তাই সে মোমিনকেও সেখানে নিয়ে যায়, ভাগাভাগি করে নেয় সঙ্গ। দেশি মালের বোতল মজুতই থাকে কামিনীর কাছে, ছোলাসেদ্ধ, ভাজা বাদাম বা চানাচুর রব্বানী নিয়ে যায়। পুরনো ট্রানজিষ্টারে আকাশবাণী চালিয়ে দেয় কামিনী। নতুন নতুন এ'পথের পথিক হয়েছে মোমিন, দেশি মদ খেয়ে গড়িয়ে পড়তে তার সময় লাগে না, তারপর কী হয়, কে কী করে সে সব সে দেখে না, দেখার মত হুঁশও থাকে না। না। রব্বানীর মেয়েমানুষের দিকে সে হাত বাড়ায় না, কামিনীকে তার পছন্দও নয়। লম্বা, পেটানো স্বাস্থ্যের কামিনীকে দেখতে ব্যাটাছেলের মত লাগে মোমিনের । কামিনীর প্রতি কোন আকর্ষণ বোধ করে না সে। তার পছন্দ শহরের রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো খাটো ফ্রক পরা বিদেশিনী। মেমসাহেব পছন্দ মোমিনের। শনিবার শনিবার রেসের মাঠে যাওয়ার আরেক আকর্ষণ ওই বিদেশিনী মেমসায়েবরা। সেখানে দেশি মেয়েমানুষ থাকেই না বলতে গেলে কিন্তু যে ক'টা সায়েব আসে রেস দেখতে, জুয়ো খেলতে, তাদের প্রায় সকলের সঙ্গেই থাকে একটি করে সঙ্গিনী। ঘোড়ার দৌড়ের সময় তারা যখন বসা থেকে উঠে দাঁড়ায়, চীৎকার করে বাজীর ঘোড়ার জন্যে তখন স্থান-কাল ভুল হয়ে যায় মোমিনের। ঘোড়া-টোড়া সব ভুলে গিয়ে সে তখন মেয়েমানুষ দেখে, মেমসায়েব মেয়েমানুষ!

কামিনী বেশ্যাপাড়ায় থাকে না বা সেই অর্থে সে বেশ্যাও নয়। সে এক মেমসাহেবের বাড়িতে চাকুরী করে, দেশী মেমসাহেব। সকাল ছ'টা থেকে সন্ধে ছ'টা তার ডিউটি। বনগ্রামের কাছে এক গ্রমে তার মা আর ছোট দুটি ভাই-বোন থাকে, মাসের শেষে সে দু'দিনের জন্যে বাড়ি যায়, টাকা-পয়সা দিয়ে আসে মা'কে। কামিনীর মেমসাহেব বাড়িতে একলা থাকে, ভবানীপুরের এক পুরনো বনেদী বাড়িতে। কামিনী শুনেছে, মেমসায়েবের স্বামী নাকি বিদেশে থাকে, আর মেয়ে বোর্ডিংএ থেকে পড়াশোনা করে। এ সব গল্প দিয়েই শুরু হয় সান্ধ্য আসর। কামিনী নিজের হাতে মদ ঢেলে দেয় আর নিজের জীবনের গল্প বলে। মাঝে মাঝে ঠোনা মারে রব্বনীকে আর আড় চোখে দেখে মোমিনকে, এই দু'য়ের মাঝে কখন যেন চোখ ঘুরে যায় শাড়ির তলা থেকে বেরিয়ে আসা ব্লাউজে ঢাকা বুক বা তার টানটান পেটের উপর। কোন এক দিন কাজ সেরে ভবানীপুরের বাড়ি থেকে বেরুতে দেরি হয়ে গেলে কামিনী দেখতে পায়, মেমসায়েব স্নান করে সাজ-গোঁজ করছে, আর কামিনীকে তাড়া দেয়, কাজ সেরে বেরো এখান থেকে! এক একদিন কামিনী ইচ্ছে করেই দেরি করে, দেখে, এক সাহেব এসে ঢুকল বাড়িতে। পরপর কয়েকদিন কামিনী ইচ্ছে করেই দেরি করে বেরোয়, দেখতে পায়, এক একদিন একজন সাহেব আসে, শুধু দিশি সায়েব নয় আসে সাদা চামড়ার বিলিতি সায়েবও! কামিনীর বেশ মজা লাগে,অ! তাইলে এই কারবার!


গোলাম রব্বানীর সাথে কামিনীর দেখা হয় তার নিজের দোকানেই। এক মেমসাহেবের সাথে একদিন তার দোকানে আসে কামিনী, মেমসাহেবের মাল চাই, বিদেশী মাল। মেয়েছেলে এসে তার দোকান থেকে মদ কিনছে আর সেও দেশি মেয়েছেলে, সে একটু ঘাবড়ায়, ফেউ নয়তো! পেটকাটা ছোট জামা আর পাতলা নাইলনের শাড়ি পরা মেমসাহেব তাকে নিশ্চিন্ত করে তারই এক খরিদ্দারের নাম করে, বলে, আমাকে মিষ্টার ঘোষ পাঠিয়েছেন তোমার কাছে, এখান থেকেই তিনি নিয়ে যান বরাবর। গোলাম রব্বানী দোনামোনা করে বোতল বার করে দেয়। নজর পড়ে খানিকটা দূরে দাঁড়িয়ে থাকা কমিনীর উপর। এভাবে মাঝে মাঝেই তার দোকানে এসে হাজির হত মেমসাহেব, কামিনীকে সাথে করে। একদিন রব্বানী বলে, মেমসাব, আপনি থাকেন কোথায় সেই ঠিকানা দিলে আমি মাল পৌঁছাইয়া দিয়া আসতে পারি! ঠিকানা জেনে নেয় আর একদিন দুপুরবেলা গিয়ে হাজির হয় ভবানীপুরের বাড়িতে। কামিনীর সাথে তার কোন কথা বা আলাপ-পরিচয় না হলেও চোখে চোখে কথা হত, কামিনী নানা রকম অঙ্গ ভঙ্গী করত একটু দূরে দাঁড়িয়ে থেকে। মাল পৌঁছে দিতে গেলে কামিনী একটা কাগজের টুকরো ধরিয়ে দেয় রব্বানীর হাতে, চাঁদনীর এক ঠিকানা লেখা তাতে।


এদিকে কলকাতা ফেরার পর দিন কতক এক ঘোরের মধ্যে কাটল সাত্তারের। কাজ-কর্ম সব সে করছিল নিয়মমত কিন্তু কী করছে সে নিজেও জানে না, অভ্যেসবশত করে যায় শুধু। হপ্তাখানেক কেটে যেতে সে একদিন হিসেবের খাতা নিয়ে বসে, রোজকার বিক্রির হিসেব, সপ্তাহান্তে মাল কেনার হিসেব, লাভের হিসেব এমনকি লোকসানেরও হিসেব খাতায় লিখে রাখে সাত্তার। খাত খুলে দেখতে পায় মোমিন এই তিনমাস কোন হিসেবই লেখেনি, সর্বশেষ যা লেখা আছে সে তার নিজের হাতের লেখা! ক্যাশবাক্স খুলে দেখে এলোমেলো রাখা আছে কিছু টাকা। সাত্তারের ক্যাশবাক্সে টাকার খোপ বানানো আছে, আলাদা আলাদা খোপে সে রাখে আলাদা আলাদা নোট, চওড়া বড় খোপ শ'য়ের নোটের জন্যে, কয়েনের জন্যে একটা ছোট টিনের বাক্স আর ছোট ছোট খোপে দশ-পাঁচের নোট থাকে। সাত্তার দেখতে পায়, কোথাও টাকা গুঁজে রাখা আছে তো কোথাও এমনি ফেলে রাখা আছে। মোমিনকে জিজ্ঞেস করলে মোমিন বলে, যা বিক্রি-বাট্টা হয়েছে, টাকা সব এখানেই আছে আর আমি অত হিসাব-টিসাব ল্যাখতে পারি না, ভাল্লাগে না!

সন্ধেয় মোমিন বেরিয়ে গেলে দোকানের বৃদ্ধ কর্মচারী শংকর বলে, ছোটবাবুর কি ব্যবসায় মন আছে গো বড়বাবু, সে তো তোমাদের দেশের রব্বানীর সাথে ফুর্তিতে ব্যস্ত! সাত্তার ঠারে-ঠোরে জানান পায়, মোমিন নাকি বেশ্যাবাড়িও যায়! সাত্তার রাতে বাড়ি ফিরে রোজকার মত রাঁধে, সারাদিনের নামাজ পড়ে, খেয়ে দেয়ে বাতি নিভিয়ে শুয়ে পড়ে। অনেকক্ষণ জেগে থাকে মোমিনের জন্যে, মোমিন আসে না। ঘরে ফেরেনি গোলাম রব্বানীও। অপেক্ষা করে ছোটভাই মোমিনের, ঘরবার করে বারে বারে। ঘর থেকে বেরিয়ে গলির মুখ অব্দি যায় বেশ কয়েকবার, না রব্বানী না মোমিন কারোর দেখাই পায় না,ফিরে আসে ঘরে। সদাশয় চরিত্রের সাত্তার এই লালবাতির জগতের সম্পর্কে সঠিক ধারণা না থাকায় আকাশ-পাতাল ভাবতে থাকে যদিও কানাঘুষোয় কত কীই না শুনেছে। সেটা নাকি জগতের সবথেকে অন্ধকারতম জায়গা। রমণী শরীরে ঢাকা পড়ে যায় সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত। এ'সব এলাকায় পুলিশ একবার ধরলে বাপ-দাদা কেউ রক্ষা পাবে না। ঠোঁটে লিপষ্টিক মেখে শাড়ির আঁচল সরিয়ে বুক বার করে দাঁড়িয়ে থাকে সারসার মেয়েরা। একবার সেখানে ঢুকলে চক্রব্যূহ-তে নি:স্ব হয়ে বেরোতে হয়। আরও আছে রংবাজ-তোলাবাজ, জগতের যত মস্তান, নেশাখোর, জুয়াড়ী সব আরশোলার মত থিকথিক করছে ওই মহিলাদের চারপাশে। আসতাগফিরুল্লাহ। তাইলে কী মাথা খারাপই হয়ে গেল মোমিনের। অবিন্যস্ত টাকার বাক্স দেখে যেরকম বুক মোচড় দিয়ে উঠেছিল সাত্তারের সেইরকমি ব্যাথা অনুভব করে নিজের বুকে। বিছানায় এসে বসে কিন্তু ভাবনা থামে না। ভাবনা একসময় রূপান্তরিত হয় ঘুমে। বহুকালের অভ্যাসবশত ভোরবেলাতে ঘুম ভাঙে সাত্তারের, দেখে পাশের বিছানায় ঘুমিয়ে আছে মোমিন। মোমিনকে ডাকতে গিয়ে পিছিয়ে আসে মদের উৎকট গন্ধে। মুখ দিয়ে লালা গড়াচ্ছে মোমিনের, রাতের জামা-প্যান্টও ছাড়েনি এমনকি খোলেনি পায়ের মোজাও। মোমিনকে দেখে সাত্তার ভাবে, তাদের উপর কী কোন অভিশাপ আছে কারোর, মোমিনটা কেন এমন হল!

নামাজ সেরে মসজিদ থেকে ফিরে সাত্তার দেখতে পায় সকালের প্রাত্যহিক কাজকর্ম করছে গোলাম রব্বানী, তার চোখে পড়ে, এর মধ্যেই রান্নার সব সরঞ্জাম কিনে বেশ গুছিয়ে নিয়েছে রব্বানী। অ্যালুমিনিয়ামের ছোট-বড় কয়েকটা হাড়ি, কেরোসিনের ষ্টোভ, ভাতের থালা, গেলাস আর একচিলতে কাঠের উপর বসানো ছোট এক বটি, যা সে নিশ্চিত শেয়ালদা থেকে কিনে এনেছে। রান্নার তোড়জোড় করছে রব্বানী। ঘরে গিয়ে রব্বানীর বিছানায় বসে সাত্তার, বলে, তোমার কাম-কাজ কেমুন চলে রব্বানী? রব্বানী বলে, ভালই চাচা, কাজ কাম ভালই চলে। সাত্তার বলে, তাইলে তুমি বাবা এই বার নিজের ঘর ভাড়া কইরা উইঠা যাওনের ব্যবস্থা করো, এইখানে আর কতদিন থাকবা! রব্বানী যেন বেশ খানিকটা অবাক হয়, বলে মোমিন চাচায় আপনেরে কয় নাই, আমারে যে ঘর ভাড়া দিছে? আমি তো যাইতেই চাইতেছিলাম, মোমিন চাচায় কইলো, যাইবা কই ভাতিজা, এই খানেই থাহো, দ্যাশের মানুষ! দুই মাস ধইরা আমি তো ভাড়া দেই দশ ট্যাহা কইরা, মোমিন চাচায় আমারে রসিদও দিছে তো! খানিক চুপ করে বসে থাকে সাত্তার তারপর উঠে যায়। নিজেকেই যেন বলে, দ্যাশে ভাইসা'র কুকীর্তি কী কম আছিল যে মোমিনে এইখানে শুরু করছে! রব্বানীর হাতা-খুন্তি নাড়ার খুটখাট শব্দ ভেসে আসে পেছন থেকে।



-৮-

হলদি বাটিলে খঁড়ে বাটিবু, সাঙাতুনি মেনে গো
গাধাই যাইনে বারে ডাকিবু।।
ঐ যে আসুছি গ্রীষ্মদিন।
নদী পঁহরারে যাইতা দিন।।
ঐ যে আসুছি জোছনা রাতি।
কৌড়ী খেলারে পুহিতা রাতি।
ঐ যে আসুছি চড়ক মেলা।
টেশনারি দোকানে বুড়িতা বেলা।।
গুঁড়ি পিঁয়াজ বহুত রাগ।
আজ ঠুরু মোর ছাড়িলা সাঙ্গ।।

( কাঁদনা গীত )



জাহাঁ আরার সংসার জীবনে তাঁর পিতা মৌলভি আব্দুল গফুরের অবদান অপরিসীম। বিয়ের পরে যখন সংসার করতে এ'বাড়িতে এলেন তখন প্রথমবার ছ'মাস ছিল জাহাঁ আরা। আব্দুল সাত্তার সেবার তিন মাস ছিলেন বাড়িতে। সেই তিন মাস যেন স্বপ্নের ভেতর দিয়ে গেছে জাহাঁ আরার। সে না ঘুম না জাগরণের স্মৃতি জাহাঁ আরা যখন তখন চোখ খুলে রেখেও দেখতে পায়। সদ্য যুবতী জাহাঁ আরা স্বামীর আদরে সোহাগে ভুলে বসেছিল জগৎ সংসার এমনকি সদ্য ছেড়ে আসা বাবা, মা, বড় আটচালা ঘরের সেই কোণটি, যেখানে তার শৈশব কেটেছে। সে ভুলেছে তার বাক্সভর্তি পুতুল, খেলার সাথী চাচাতো বোন টুকু, ছায়াঘেরা সেই পুকুরপাড়, যেখানে সে কাটিয়েছে কত না অলস দুপুর। শ্বশুরবাড়ি সম্পর্কে যে ভয় তার ছিল বিশেষ করে শাশুড়ি সম্পর্কে, সাত্তারের সাথে ঠাকুরবাড়িতে এসে সে বুঝতে পারে, তার ভয় নিতান্তই অমুলক ছিল। ঠাকুরবাড়িতে সাত্তার দাঁড়িয়েছিল যেন এক ছায়াদানকারী বিশাল বটবৃক্ষ হয়ে। এতটুকু রোদের আঁচ তার গায়ে লাগতে দেয়নি সাত্তার সেই তিনমাস। নানান রঙের তাঁতের শাড়ি, রং-বেরঙের রেশমী চুড়িতে সাজত সে যখন তখন। কোন কাজে সাত্তার বাড়ির বাইরে গেলে জাহাঁ আরা দরজায় চোখটি রেখে বসে থাকত ঘরের ভেতর। সাত্তারের গায়ের ঘেমো গন্ধটি যেন লেগে থাকত জাহাঁ আরার সর্ব অঙ্গে। কী এক নেশায় বুঁদ জাহাঁ আরা।

নেশা কাটতে সময় লাগেনি জাহাঁ আরার। তিন মাস ফুরিয়ে গেল গেল যেন তিন দিনে, সাত্তারের কলিকাতা যাওয়ার সময় কেঁদে আকুল হল জাহাঁ আরা। শাশুড়ি-ননদেরা মুখে আঁচল দিয়ে হাসল, জাহাঁ আরা সে সব দেখতেই পেল না। সাত্তার চলে গেল। রাতের বেলা একা বিছানায় শুয়ে জাহাঁ আরা অনুভব করল, এটা তার শ্বশুরবাড়ি আর এখানে সে একা, ভীষণ একা। জাহাঁ আরা'র যেন বিশ্বাস হচ্ছিল না সাত্তার তার পাশে নেই, চলে গেছে কলকাতা। এখুনি যেন সাত্তার তার আঁচল ধরে টানবে, বলবে, অ বউ, কান্দ ক্যান, এইতো আমি! মাঝে মাঝেই সন্ধ্যা একটু গাঢ় হলে সাত্তার তাকে নিয়ে চুপিচুপি বেরিয়ে পড়ত বাড়ি থেকে। হ্যারিকেনের আলোর সেই যুগে সন্ধ্যা মানেই গভীর রাত। রাস্তায় কদাচিত কাউকে দেখা যেত। ফুটফুটে জ্যোৎস্নার আলোয় দু'জনে হেঁটে যেত খালপাড়ে, বসত গিয়ে বুড়ো বটের তলায়। সাত্তার কলকাতার গল্প শোনাত, হাওড়া ব্রীজের গল্প,ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল আর তার সাদা পরীর গল্প। হাঁটুর পরে চিবুক রেখে জাহাঁ আরা বিভোর হয়ে শুনত, তার বড় ইচ্ছে করত সেও যাবে সাত্তারের সাথে কলকাতা, সেও দেখবে ভিক্টোরিয়ার মাথার উপরের সেই সাদা পরীকে, যে নাকি বাতাসের সাথে সাথে ঘোরে, যেদিকে বাতাস বয় পরীও সেদিকে যায়! কিন্তু লজ্জ্বায়, সংকোচে বলতে পারত না তার কলকাতা যাওয়ার ইচ্ছের কথা। কখনও বা ওরা হেঁটে যেত গ্রাম ছাড়িয়ে একেবারে সেই ফসলের মাঠের কাছে। হাত তুলে দূরে দেখিয়ে বলত, ওই দ্যাখ বউ, ওইগুলা আমাদের ক্ষেত, এইডা ভাইসা'র। ওইডা আম্মা'র আর আর ওই যে দেখত্যাছ, ওইডা আমার ক্ষেত। রাতের অন্ধকারে জাহাঁ আরা বোঝার চেষ্টা করত, সাত্তার কোন জমিটা দেখাল কিন্তু বুঝতে পারত না। জাহাঁ আরা এখনও যেন শুনতে পায় সাত্তারের কন্ঠস্বর, গমগমে ভারি আওয়াজের সেই "অ বউ' ডাক। ফুলে ফুলে কাঁদল জাহাঁ আরা, সারা রাত কাঁদল। এই প্রথম কেউ এল না তার চোখের জল মোছাতে। শ্বশুরবাড়িকে তার নির্বান্ধব এক শত্রুপুরী বলে মনে হল, নিজের ঘরখানিকে বন্দীশালার কুঠুরী। পরদিন সকালবেলাতেই শাশুড়ি এসে হুকুম করলেন, নবাবের বেটি, "পাকঘরে যাও!'

আরও তিনমাস পরে মৌলভি আব্দুল গফুর এলেন জাহাঁ আরাকে "নাইওর' নিয়ে যেতে। চারমাসের অন্ত:সত্বা জাহাঁ আরা যেন খানিকটা বাতাস পেল নি:শ্বাস নেওয়ার জন্যে। বাপের বাড়িতেই প্রথম সন্তান ভূমিষ্ট হল, ছেলে এল জাহাঁ আরার কোলে। এর মাঝে আব্দুল গাফ্‌ফার দু'বার ঘুরে গেছেন নারায়ণগঞ্জ, মা পাঠিয়েছেন, বউকে শ্বশুরবাড়ি নিয়ে যেতে। মৌলভি সাহেব বলেছেন, আসন্নপ্রসবা মেয়েকে তিনি নিজের কাছেই রাখতে চান আর জামাইও তো বাড়িতে নেই, সেখানে মেয়ে একলা থাকবেই বা কী করে! গাফ্‌ফার সাহেব বুঝতে পারেন, জাহাঁ আরার প্রতি মা রাহেলা বিবির বৈমাতৃক মনোভাবের কথা মৌলভি সাহেবের কানে এসেছে। গফুর সাহেব যদিও মুখে কিছুই বলেননি কিন্তু সাত্তার না এলে তিনি যে মেয়েকে পাঠাবেন না এ তিনি পরিস্কার বলে দিয়েছেন। গাফ্‌ফার ফিরে যান, জাহাঁ আরার খবর যেন পত্র মারফত জানানো হয় এই প্রার্থনা জানিয়ে।

সন্তান জন্মের সময় কিছু জটিলতা দেখা দেয় জাহাঁ আরার। তলপেটে সার্বক্ষণিক একটা ব্যাথা হাঁটা চলাতে তো কষ্ট হয়ই এমনকি শুয়ে থাকলেও ব্যথা হয় জাহাঁ আরার। মৌলভি সাহেব জাহাঁ আরাকে নিয়ে যান শহরের মিশনারী হাসপাতালে, যেখানে ডাক্তার তো বটেই মায় নার্সরাও সাদা চামড়ার মেম। হাঁটু অব্দি লম্বা ফ্রক পরা মেম ডাক্তার জাহাঁ আরাকে দেখেন, আর পরিস্কার বাংলাতে বলেন, বেবি উল্টো হয়ে আছে জাহাঁ আরার পেটে, এখনও সময় আছে হয়ত ঘুরে ফিরে সে সোজা হয়ে যাবে প্রসবের সময় নাগাদ, চিন্তার কিছু নেই, পনের দিন পর পর যেন পরীক্ষার জন্যে জাহাঁ আরাকে নিয়ে আসা হয়। মৌলভি সাহেব চিন্তিত হন, জামাই এখানে নেই, মেয়ে বা বাচ্চার কিছু হলে একটা জবাবদিহির দায় যেন অনুভব করেন তিনি। তিনি মুখে কিছু না বললেও তার থমথমে মুখ চিন্তা বাড়ায় সকলেরই।


ভোরবেলায় ফজরের নামাজ পড়তে বসার আগে লম্বা, মোটা একগাছা কালো সুতো নিয়ে বসেন, আগের দিন বিকেলে বাজার থেকে নিয়ে এসেছিলেন চকচকে কালো বিলিতি নাইলন সুতোর এই কাড়। নামাজের পরে জায়নামাজে বসেই দোয়া পড়তে থাকেন হাতের আঙুলে গুনে গুনে, একচল্লিশ বার পড়া হয়ে গেলে একটা করে ফুঁক দেন কালো কাড়ে আর যেখানটায় ফুঁ দিলেন সেখানটায় একটা করে গিঁট দেন শক্ত করে। এভাবে ন'খানা গিঁট পড়ে কালো কাড়টিতে, বিশাল লম্বা কালো সুতোর গোছাখানি গিঁটের পরে গিঁট দেওয়াতে গজখানেক মত লম্বায় এসে দাঁড়ায়। গিঁট দেওয়া শেষ হলে সবটুকু কাড়কে মুঠোয় নিয়ে আরেকবার ফুঁক দেন সর্বরোগ উপশমকারী সূরা ফাতিহা পড়ে। কই গো, গেলা কই বলে আওয়াজ দেন স্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে। নূর জাহাঁ, জাহাঁ আরার মা এলে আল্লাহ'র প্রতি পরম বিশ্বাস আর ভরসা বুকে নিয়ে মন্ত্রপূত কাড়খানি তাঁর হাতে দিয়ে বলেন, মেয়ের তলপেটে এটি বেঁধে দাও আল্লাহ'র নাম নিয়ে। গিঁটগুলো যেন পেটের উপর থাকে, ইনশাল্লাহ, আল্লাহ পাক সব মুশকিল আসান করবেন।

ঠিক ন'মাসের মাথায় জাহাঁ আরা একটি পুত্র সন্তান প্রসব করে। প্রসব যন্ত্রণা শুরু হলে মৌলভি সাহেব দৌড়ে যান মিশন হাসপাতালে, মেম ডাক্তারকে বাড়িতে নিয়ে আসবেন বলে। মেমসাহেব ডাক্তার এক বয়স্ক আর অভিজ্ঞ নার্সকে সাথে নিয়ে আব্দুল গফুরের সাথে আসেন। জাহাঁ আরাকে পরীক্ষা করে মৌলভি সাহেবকে জানান, চিন্তার কোন কারণ নেই, নার্সই প্রসব করিয়ে দেবে। কালো ব্যাগ হাতে করে মেমসাহেব বেরিয়ে যান, মৌলভি সাহেবও এগোন ডাক্তার সাহেবাকে হাসপাতালে পৌঁছে দেওয়ার জন্যে। বাড়ি ফিরে এসে স্ত্রী নূর জাহাঁ'র কাছে খোঁজ নেন মেয়ের, কূয়োর পাড়ে গিয়ে বালতিতে করে অজুর পানি তোলেন, অজুর বদনায় ঢালেন বালতির জল, কূয়োর ধারে বাঁধানো চাতালে বসে হাত ধোন, কুলি করেন, মুখ ধোন, আবার হাত ধোন কনুই অব্দি, ভিজে হাতে মাথা মোছেন, ভিজে হাত বুলিয়ে নেন কানে, গলায়, সবশেষে গোড়ালি অব্দি পা ধুয়ে কাঠের খড়ম পায়ে বারান্দায় এসে নামাজের ছোট শীতল পাটিখানি বিছিয়ে নামাজে বসেন। বিশেষ নামাজ পড়েন মেয়ের জন্যে। বুকের সামনে দুই হাত ছাড়িয়ে রেখে বসে থাকেন চোখ বন্ধ করে, যেন ভিক্ষে চাইছেন খোদার কাছে। কতক্ষণ এভাবে বসেছিলেন নিজেও জানেন না, সম্বিৎ ফেরে নবজাতকের চীৎকারে। সাথে সাথে দরজায় দেখা যায় নূর জাহাঁ'র মুখ, বলেন, আল্লাহ নাতি দিছে আপনেরে!

নাতির জন্মের ছ'দিনের দিন মৌলভি আব্দুল গফুর দুটো তাগড়া খাসী জবাই করে নাতির আকীকাহ করেন। নামকরণ আর নবাগত শিশুর মঙ্গল কামনার এই অনুষ্ঠানে ছেলের নাম রাখে জাহাঁ আরা। আল্লাহ'র একশত নামের এক নাম "জব্বার' রাখে সে তার ছেলের নাম। বাপের নামের সাথে মিলিয়ে সে ছেলের নাম দেয়, আব্দুল জব্বার ঠাকুর। ডাকনামও জাহাঁ আরাই দেয়, খোকন, জাহাঁ আরা'র উচ্চারণে "খুকন'। মৌলভি বাড়ির সকল মানুষ সেদিন নিমন্ত্রণ পায় আব্দুল গাফুরের ঘরে। বাড়ির সকল ছেলে-বুড়ো হাজির হয় দুপুরবেলা। ডজন খানেক মুর্গি আর দুটো বিশালাকারের খাসী দিয়ে মৌলভি সাহেব দাওয়াৎ খাওয়ান আত্মীয়-স্বজনদের। চীনামাটির ডিম্বাকৃতি বিশাল খঞ্চা'য় পোলাও সাজিয়ে তার উপরে নুর জাহাঁ রাখেন গোটা মুর্গ মুসল্লম। ছ'খানা বাটিতে ছয় রকমের মাছ ভাজা সাজিয়ে সেই খঞ্চা এনে রাখেন ছেলে কোলে জাহাঁর সামনে বিছানো দস্তরখানের উপর। মাছের বাটিগুলো সাজিয়ে দেন মুর্গ মুসল্লাম সহ পোলাওয়ের খঞ্চার সামনে। আসে আরো ছয় খানি বাটিতে ছয় রকমের সব্জি। কোনটাতে তেতো, কোনটাতে ভাজা তো কোনটাতে কাটা পেঁয়াজ-কাঁচালংকা সহযোগে গোল করে কাটা চাকা চাকা শসা। আসে ছয় রকমের শাক। আসে খাঁটি সর্ষের তেলে কালোজিরে ফোঁড়ন দেওয়া বাটা হলুদ, একটুখানি তেলে হালকা সেঁকে নেওয়া বাটা কালোজিরে। ছেলে কোলে নিয়ে জাহাঁ আরা সবকটা বাটি থেকে একটু একটু করে করে খাবে আজ। খঞ্চায় সাজানো পোলাও আর মুর্গ মুসল্লম খেতে জাহাঁ আরার সাথেই বসেছে জাহাঁ আরার চাচাতো-ফুপাতো বোনেরা, বসেছেন জাহাঁ আরা'র দাদিও। মাছ, মাংস, শাক-সব্জি জাহাঁ আরাকে দেওয়া হয়েছে যাতে জাহাঁ আরা যাই খাক না কেন ছেলের যেন কোন অসুবিধে না হয়। ষষ্টির এই দিনে যা'ই খাবে জাহাঁ আরা ছেলের পেটে সেটা সয়ে যাবে, পেটে ব্যাথা, পেট ফাঁপা বা পেট খারাপ হবে না ছেলের। ফোঁড়ন দেওয়া বাটা হলুদে জাহাঁ আরার নাড়ি শুকোবে তাড়াতাড়ি আর বাটা কালোজিরেতে কোলের ছেলে দুধ পাবে অঢেল!

এই ক'দিন খুব সাদা-সিধে খাবার খেয়ে কেটেছে জাহাঁ আরা'র। সকালে পরোটা সাথে ছোট বাচ্চা মুর্গির ঝোল, দুপুরেও সেই একই ঝোল আর ভাত আর রাতে সাবুর পায়েস দু'খানা রুটি দিয়ে। হলুদ বাটা অবশ্য সেই প্রথম দিন থেকেই থাকে ভাতের সাথে। জাহাঁ আরা'র একটুও ভালো লাগে না এই হলুদ বাটা কিন্তু আম্মা বলেন, না খাইলে নাড়ি শুকাইব কেমনে? তো খেতেই হয়। আম্মা অবশ্য হলুদটাকে খুব ভাল করে ভাজেন তেলে, গোটা গোটা এলাচ দেন সুগন্ধ হবে বলে। নাড়ি শুকানোর জন্যে আম্মার নিজস্ব পদ্ধতিরও প্রয়োগ হয়েছে ছেলে হওয়ার পরদিনই। ঘরে তোলা গাওয়া ঘী গরম করে এক গেলাস এনে দিয়েছেন আম্মা, বলেছেন চোখ বন্ধ করে একটানে গরম গরম খেয়ে নিতে! জাহাঁ আরা আঁতকেই উঠেছিল, ঘী! এবং সেটাও খেতেই হয়েছে, খেতে গিয়ে যতই গা গুলোক। এতে করে জাহাঁ আরা নাকি আবার খুব শিগ্গিরই হেঁটে দৌড়ে বেড়াতে পারবে। ছেলে হওয়ার সব ধকল এক গেলাস ঘীয়েতেই পার!

বাড়ির লোকজন যারাই এসেছেন জাহাঁ আরা'র ছেলে দেখতে, সকলেই হাতে করে কিছু না কিছু নিয়ে এসেছেন। বেশির ভাগই সোনার আংটি, ছোট গলার চেন, ছোট ছোট শার্ট-প্যান্ট, আবার কেউ এনেছেন হাতে সেলাই করা ছোট ছোট কয়েকটি কাঁথা। আগের দিন বিকেলে মৌলভি সাহেবও বাজারের সোনার দোকান থেকে নিয়ে এসেছেন বড়সড় এক সোনার চেন, জাহাঁ আরা'র ছেলে হওয়ার আগেই তিনি বায়না দিয়ে এসেছিলেন, নাতি-নাতনি যাই হোক না কেন, মুখ দেখাই তো লাগবেই! ছেলের জন্মের পর থেকে নিয়ে এই পাঁচদিন মৌলভি সাহেব কেবল দরজা থেকে নাতিকে দেখেছেন, মেয়ের সাথে কথা বলেছেন, ঘরের ভেতর ঢোকেননি বা নাতিকে কোলে নেননি। নূর জাহাঁ নাতিকে কাঁথায় জড়িয়ে তাঁর কাছে নিয়ে এসেছিলেন জন্মের পরেই, তিনি নাতির মুখ দেখে মাঝঘরে দাঁড়িয়ে দরাজ গলায় আজান দিয়েছেন, আল্লাহু আকবার ।। আল্লাহু আকবার।। নাতির কানে শোনা পৃথিবীর প্রথম শব্দ যেন আজানের ধ্বনি হয়। তারপর বিবি'কে বলেছেন, একটু শক্ত হউক তারপরে কোলে নিমু! আকীকার দিনে সকাল সকালই নাপিত এসে মাথা ন্যাড়া করে দিয়ে যায় খোকনের, ছোট্ট আঙুলের ডগা থেকে কেটে দেয় পাতলা স্বচ্ছ নখ আর তারপর চুল আর নখের ওজনের সমপরিমাণ দক্ষিণা নেয় রূপোর টাকায়। নূর জাহাঁ বাড়ির পেছনের জমিতে খানিকটা মাটি খুঁড়ে পুঁতে দিয়েছেন কাগজে মোড়া খোকনের মাথার চুল, নখ। মাতৃজঠর থেকে নিয়ে আসা চুল, নখ মাটিতেই মিশিয়ে দেওয়া হয়, এমনটিই বরাবর দেখে আসছেন নূর জাহাঁ। ছোট্ট শরীরে সর্ষের তেল মাখিয়ে গামলায় রাখা ইষদুষ্ণ জলে নাতিকে স্নান করান নূর জাহাঁ। ন্যাড়া মাথার খোকনের চোখে জাহাঁ আরা পরিয়ে দেয় ঘরে তোলা কাজল। সর্ষের তেলে সলতে পুড়িয়ে সেই ধোঁয়া থেকে রূপোর কাজলদানীতে সন্ধেবেলায় বসে কাজল তুলেছেন নূর জাহাঁ। খোকনের কপালের একপাশে জাহাঁ আরা পরিয়ে দেয় কাজলের বড় এক টিপ, কারও নজর যেন না লাগে ছেলেকে। মৌলভি সাহেবের কিনে আনা নতুন ঢাকাই শাড়ি পরে খাটের পরে ছেলে কোলে রাজরাণীর মত বসে আছে জাহাঁ আরা।

নাতির জন্মের সংবাদ গফুর সাহেব পত্রদ্বরা জানিয়ে দেন আব্দুল গাফ্‌ফারকে। পত্র যায় কলকাতাতেও,পত্রে থাকে একটি জিজ্ঞাসাচিহ্ন, কবে আসবেন সাত্তার? চিঠি লেখে জাহাঁ আরাও। একই প্রশ্ন থাকে সেই চিঠিতেও। ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে জাহাঁ আরার বুকের ভেতর হু হু করে ওঠে। ছেলে যেন সাত্তারের প্রতিরূপ। শ্যামলা গায়ের রং, বড় বড় চোখ, গোলগাল নাদুস-নুদুস চেহারায় এ যেন ছোট সাত্তার। জাহাঁ আরা আবার সব ভোলে। ছেলেকে নিয়ে কাটে তার দিন-রাত। সকাল বেলায় মাটির বারান্দায় পাটির উপর পা লম্বা করে বসে জাহাঁ আরা, হাঁটুর উপর শাড়ি তুলে পায়ের উপর ফেলে ছেলেকে সর্ষের তেল মালিশ করে। প্রথম প্রথম এই তেল মালিশ করতে গেলে ছেলে গলা ছেড়ে চীৎকার করত কিন্তু এখন সে খলবল করে হাসে, হাত পা ছোঁড়ে। তেল মালিশ হয়ে গেলে জাহাঁ আরা পাটির একধারে বিছানা পাতে ছেলের, বিছায় ছোট্ট কাঁথা, রাখে গোল সর্ষের বালিশ, ছেলেকে শুইয়ে দেয় সেই বিছানায়। হাতে সেলাই করা তেকোণা কলোট পরা খালি গায়ের খোকন হাত-পা ছুঁড়ে খেলে। শীতের মিঠে রোদে পাশে বসে জাহাঁ আরা ফুল তোলে ছোট্ট কাঁথায়। রঙীন সুতোয় ছোট ছোট ফোঁড়ে জাহাঁ আরা স্বপ্ন বুনে চলে ভবিষ্যতের। শীতের বেলা যখন মাথার উপরে ওঠে জাহাঁ আরা ছেলেকে নিয়ে ঘরে ঢোকে, চান করায়, ছেলে বুকে নিয়ে শুয়ে পড়ে পার্টিশন দিয়ে আলাদা করা সেই ছোট্ট কোণটিতে, তার ছোট্ট খাটে, যেখানে তার শৈশব কেটেছে।


-৯-

ঘেঁটু রাজার মেয়ে দেখতে যায় ষোল আনা
ফতেপুরের ক'নে সে যে নামটি বাসনা
( সেথা ) ঘেঁটুর শাউড়ী কপাটের আড়ে,
কইছে কথা ঠারে ঠুরে,
গা ভরা না গয়না দিলে মেয়ে দেবেনা।
ঘেঁটু রাজার মেয়ে দেখতে যায় ষোল আনা।।
মেয়ে আমার অতি সুন্দরী, হাতে দিও স্বর্ণউড়ি
কানে দিও পার্শে মাকড়ী, নতুন নথের টানা।
ঘেঁটু রাজার মেয়ে দেখতে যায় ষোল আনা।।
মেয়ের আমার লম্বা গলা, তায় দিয়েছে মটরমালা,
মটরমালা না দিলে ঐ বাহার হবে না।
ঘেঁটু রাজার মেয়ে দেখতে যায় ষোল আনা।।

( ঘেঁটু গান )




দিন যায়, মাস যায়। সাত্তারের দিন কাটে একই নিয়মে। মোমিন ব্যস্ত সিনেমা, রেস আর সন্ধের পরে রব্বানীর ঠেকে বসে মদ খাওয়া নিয়ে। সাত্তারের দিন কাটে সকাল থেকে রাত্রি দোকানের কাজ করে। বাড়ি ফিরে নামাজ পড়া, রান্না খাওয়া করা আর মোমিনের খাবার ঢাকা দিয়ে রেখে শুয়ে পড়া। পরদিন সকালে আবার সেই একই রুটিন। সময় তবু থেমে থাকে না, সাত্তারের নামে চিঠি আসে তার শ্বশুর মৌলভি আব্দুল গফুর সাহেবের। পুত্রসন্তানের সুসংবাদ দিয়ে চিঠি লিখেছেন মৌলভি সাহেব। সাত্তারকে দোয়া জানিয়েছেন, আকীকাহ করে ছেলের নাম আব্দুল জব্বার রাখা হয়েছে তাও জানিয়েছেন। কন্যা এবং নাতি দুজনেই সুস্থ আছে তাও জানিয়েছেন। সাত্তার কবে দেশে যাবে সেই প্রশ্ন করে চিঠি শেষ করেছেন। চিঠি হাতে বসে থাকে সাত্তার। ছেলে! তার ছেলে হয়েছে আর জাহাঁ আরা হয়েছে আম্মা! কেমন দেখতে হয়েছিল জাহাঁ আরা'কে? খুব কী কষ্ট হয়েছে জাহাঁ আরা'র? আহারে, একবার যদি দেখতে পারতাম অহন, ভাবে সাত্তার। মোমিনকে ডেকে সুসংবাদ জানায়, বলে মিষ্টি কিন্যা আন, আর হগ্গলেরে মিষ্টিমুখ করাইয়া দে!

দেশ থেকে চিঠি আসে, আম্মা মোমিনের জন্যে পাত্রী পছন্দ করেছেন, কন্যা ময়মনসিংহের, রাহেলাবিবির দূর সম্পর্কের আত্মীয়। মেয়েটি দেখতে নাকি ভারি সুন্দরী। পত্রপাঠ যেন মোমিন দেশে যায়। ইতিমধ্যে দেশে গিয়ে বিয়ে করে বউ নিয়ে এসেছে গোলাম রব্বানী। অল্পবয়েসী একটি মেয়ে, বছর চৌদ্দ হবে বড়জোর বয়েস। সাত্তারকে সে আব্বা বলে ডাকে। সাত্তার খুব বিপদে পড়ে যেদিন কাওকে কিছু না জানিয়ে রব্বানী বউ নিয়ে দেশ থেকে ফেরে। এই ব্যাটাছেলেদের মেসবাড়িতে কি করে এই মেয়েটি থাকবে, সামনের ঘরে থাকবেই বা কি করে, যেখানে ভেতরের ঘরে সে আর মোমিন থাকে। রব্বানী জানায়, কোন অসুবিধা হইব না চাচা, আমরা পর্দা টাঙাইয়া লমু! সাত্তার নিজের জিনিসপত্র সব বাইরের ঘরে নিয়ে আসে, রব্বানীকে বলে, তুমি বউ লইয়া ভিতরের ঘরে যাও, যদ্দিন বউ থাহে, ভিতরের ঘরেই থাহো তুমি। রব্বানী তার নতুন বউ আর গেরস্থালী গুটিয়ে ভেতরের ঘরে চলে যায় সাত তাড়াতাড়ি, চাচায় যদি আবার মত বদলায়! সাত্তার নিশ্চিন্ত হয়, মাইয়া মাইনষের নেশা এইবার যাইব রব্বানীর!

মোমিন দেশে যায় বিয়ে করতে। আম্মার লিষ্টি মতন সাত্তার ঘুরে ঘুরে বাজার করে, মোমিনের বিয়ের বাজার। তার মনে পড়ে, ভাইসা'র সাথে ঘুরে ঘুরে নিজের বিয়ের বাজারের কথা। ঠিক তেমনি করেই সে বাজার থেকে জিনিসপত্র কেনে, যেমনটি আব্দুল গাফ্‌ফার কিনেছিল জাহাঁ আরা'র জন্যে। মেজবোন চিনুর স্বামী ঠাকুরদের বাড়ির ঘরজামাই এ টি এম শামসুজ্জামানকে আম্মা পাঠিয়ে দিয়েছেন কলকাতা, বিয়ে করতে মোমিন দেশে গেলে হান্নু একলা হয়ে যাবে, কাজ-কাম সামলাবে কি করে একা হাতে। বাণিজ্যও তো মাশাআল্লা এখন আর ছোড নাই! সাত্তারও ভাবছিল, বড়ভাইকে বলবে, কাওকে পাঠিয়ে দিতে, অন্য দোকানগুলোতে নিজেদের লোক কেউ নেই বলে লাভ যেন ঠিক বোঝা যায় না! চিঠি লিখে বড় জামাই ইসমাইল মির্জাকেও কলিকাতা পাঠিয়ে দিতে বলে সাত্তার, দুই জামাই অন্য দোকানদুটিতে বসলে সাত্তার খানিকটা মন দিতে পারে ব্যবসা বাড়ানোতে!

বড় ভাই চিঠি লেখেন, বাড়ির খবর, মায়ের খবর ইত্যাদি দেওয়ার পরে চিঠিতে অবশ্যই থাকে টাকার কথা। অমুক বিলে কিছু ধানজমি বিক্রি হচ্ছে, সস্তায় পাওয়া যাচ্ছে, হান্নু যেন সত্বর টাকা পাঠায়, নইলে হাতছাড়া হয়ে যাবে জমি। সাত্তার টাকা পাঠিয়ে দেয়। ইলেকশনের আগে চিঠি আসে, তিনি পার্লামেন্টের ইলেকশনে নামছেন, মুসলিম লিগের টিকিট পেয়েছেন, জয়ের নিশ্চিত সম্ভাবনা। হান্নু যেন শিঘ্রই টাকা পাঠায়। টাকার অংকের উল্লেখ থাকে চিঠিতে। ইলেকশনে হারের খবরও আসে চিঠিতেই, কারা যেন বেঈমানী করল নইলে হারের তো কোন সম্ভাবনাই ছিল না! দলের উচ্চ পর্যায়ের নেতারা বলেছেন, পরেরবারও তাঁরা টিকিট দেবেন আব্দুল গাফ্‌ফারকে, গাফ্‌ফারের মতন লোক অত্র এলাকায় আছে নাকি! অতএব আগে থেকেই সাত্তার যেন প্রস্তুত থাকে, টাকা এবারে একটু বেশি লাগবে!

চিঠিতে খবর আসে, মোমিনের বিয়ে হয়ে গেল। বছর ঘুরে আসে, মোমিনের পুত্রসন্তান জন্মানোর সংবাদও পত্র মারফতই পায় সাত্তার। বড়ভাই আব্দুল গাফ্‌ফারকে চিঠি লেখে সাত্তার, সে দেশে যেতে চায়, মোমিন যেন পত্রপাঠ কলকাতা আসে। জাহাঁ আরা চিঠির পরে চিঠি লেখে, সাত্তার কবে আসবে বাড়ি? খোকন যে খালি তার আব্বাকে খোঁজে। বুকের ভেতর কেমন শূণ্য শূণ্য লাগে সাত্তারের। বুকের পরে জাহাঁ আরা'র চিঠি নিয়ে শুয়ে থাকে রাতের পর রাত। ঠিক কত বড় হল খোকন? কার মত দেখতে লাগে খোকনকে? জাহাঁ আরা অবশ্য লিখেছে, খোকন নাকি একেবারেই ছোট সাত্তার! কল্পনায় অনেক চেষ্টা করেও সেই ছোট সাত্তারকে দেখতে পায় না সাত্তার। বড়বাজার থেকে কিনে আনা খেলনাগুলো রাখা আছে দেওয়াল আলমারীতে, চাকা লাগানো অ্যারোপ্লেন, নানা রকমের গাড়ি আর রংবাহারি সব বেলুন। বছর ঘুরে গেল, মোমিন এখনো এল না। মোমিন ফিরলে ঘুরে আসতেই হবে এবার। আগেরবার মোমিনের হাতে ব্যবসা দিয়ে যা ফল পেয়েছেন, মাঝে মাঝে মনে পড়ে সেই সব কথাও। তবু খোকনের কথা ভেবে বুকটা ভরে ওঠে। যেতেই হবে এবার।

এর মাঝেই গোলাম রব্বানীর কিশোরী বউ একটি কন্যাসন্তানের জন্ম দিল। রব্বানীর বউকে দেখতে কালো হলেও চেহারাটি ভারী সুশ্রী। মেয়েটি মায়ের মুখের গড়ন পেয়েছে, ভারী মিষ্টি দেখতে হয়েছে মেয়েটাকে। দোকান থেকে ফিরেই রব্বানীর মেয়েকে নিয়ে পড়ে সাত্তার। ওইটুকু মেয়ে সাত্তারকে দেখলেই খলবল করে হাত পা ছোঁড়ে, আ আ করে মুখ গোল কোরে কিছু যেন বলতে চায়। দাঁতহীন ফোকলা মুখে হাসে। সাত্তারের বুক ভরে যায়। ভাবে, খোকনও তো এমনি করেই বড় হয়েছে। এখন তো খোকন সক্কলকে ডাকে, কথা বলে! জাহাঁ আরা'র চিঠিতে থাকে খোকনের কথা। খোকন নাকি "আম্মা' বলতে পারে না, বলে "মম্মা'। "পানি'কে বলে "মানি' আর "নানা'কে বলে "নান্না'। সাত্তার ভাবতে চেষ্টা করে খোকন কিভাবে কথাগুলো বলে, যেন বাতাসে কান পেতে চেষ্টা করে সেই কথাগুলো শোনার। নিজে নিজেই উচ্চারন করে "নান্না' "মানি' "মম্মা'। নিজের হেড়ে গলার এই শিশু বোলে বিরক্ত হয় নিজেই। রব্বানীর ছোট্ট মেয়ে নার্গিসকে সে যখন নিজের কাছে রাখে তখন চেষ্টা করে মেয়েটাকে কথা বলাতে। মুখ গোল করে নার্গিস চেষ্টা করে কথা বলতে কিন্তু ও ও ছাড়া আর কোন শব্দ বেরোয় না ছোট্ট নার্গিসের মুখ থেকে। সাত্তার বলে, বল "নান্না' বল! নার্গিস বলে "ও' "ও'। রব্বানীর বউ নাহার হাসে সাত্তারের এই কথা বলানোর চেষ্টা দেখে। বলে, আব্বাগো, অত ছোড বাচ্চায় কী কথা কইতে পারে! দন্তহীন মুখে নার্গিস তখনও বলেই চলেই চলেছে ও ও ও।

একদিন সন্ধেবেলা বেজার মুখে হাজির হয় মোমিন। আম্মা তাকে জোর করে পাঠিয়েছেন, সে কিছুতেই কলকাতা আসতে চায় না। ভাই বাড়ি যাক, আসার সময় যেন বউকে নিয়ে আসে সাথে করে, নইলে মোমিন ঠিক হাওড়া ব্রীজ থেকে ঝাঁপ দেবে! সাত্তার হেসে ফেলে মোমিনের কথা শুনে, বলে, বউকে তুই নিয়ে এলি না কেন? মোমিন বলে, ভাইসা'য় দিল না তো, কইলো হান্নুরে পাডা গিয়া, তোর বউয়ের অহন যাওন লাগত না কলিকাতা! সাত্তার বলে, বউ আইলে থাকব কই? তুই তো ঘর ভাড়া দিয়া দিছস, দোতালাত থাকে দুই জামাই, বউ কই তুলবি? মোমিন বলে, আমি জানি না, আপনে আমার বউয়েরে না লইয়া কলিকাতা আইয়েন না! সাত্তার কিছু বলে না মোমিনকে, জাহাঁ আরাকে সে সাথে করে নিয়ে আসবে ভাবছিল। বুক খালি করে সব বাতাস যেন বেরিয়ে যায় সাত্তারের। বাক্স গোছায় সাত্তার। আর একদিন ভোরবেলায় শিয়ালদহ ষ্টেশন থেকে ট্রেনে চেপে বসে বাড়ি যাওয়ার উদ্দেশ্যে।


-১০-

যখন পাখীরা ডাকে নিশি হয় ভোর, গো।
সে সময়ে কার বাঁশি করে হেন সোর, গো।
বাঁশি শুনি অন্তরে অনল জ্বলে মোর, গো।
দিনে নাহি শুঝে দিশি যেন নিশিঘোর, গো।
সময়জানি প্রাণচুরি করে কোন চোর, গো।
ভবপ্রীতা কহে রাধা তোর মন-চোর, গো।
কত খেলা জানে সেই নন্দকিশোর, গো।

( ঝুমুর গান)


অত:পর যখন খোকনের দু'বছর হতে চললো, জাহাঁ আরা চিঠি পায়, সাত্তার আসছে। চিঠি আসে মৌলভি সাহেবের নিকটও, তিনি যেন পত্রপাঠ জাহাঁ আরাকে নরাইলে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। মৌলভি সাহেব জানেন জাহাঁ আরাকে শ্বশুরবাড়ি পাঠাতেই হবে, কিন্তু খোকন তাঁকে ছেড়ে চলে যাবে ভাবলেই হাত, পা যেন অবশ হয়ে আসে মৌলভী সাহেবের। দু বছরের খোকন হেঁটে দৌড়ে বেড়ায় গোটা বাড়িময়। দপ্তর থেকে তিনি কখন ফিরবেন তা যেন জানা ছোট্ট খোকনের, সে ঠিক ওই সময়েই প্রতিদিন বার বাড়িতে এসে দাঁড়িয়ে থাকে। মৌলভি সাহেবকে আসতে দেখলেই নান্না নান্না বলে ছুট লাগায়। খোকন পড়ে না যায় সেই ভয়ে তিনিও দৌড়ে এগোন নাতির দিকে। খোকন ঝাপিয়ে পড়ে নানা'র কোলে। ম্যারেজ রেজিষ্টার আব্দুল গফুর অফিস থেকে ফেরার পথে প্রতিদিনই বৈকালিক বাজার থেকে তাজা তরি-তরকারি, মাছ থলেতে নিয়ে বাড়ি ফেরেন। একহাতে থাকে বাজারের থলে অন্যহাতে রোদ-বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচার জন্যে থাকে ছাতা। খোকনকে কোলে নিয়ে হাতের ছাতাটি তিনি নাতির হাতে দেন অন্যহাতে বাজারের থলে নিয়ে বাড়ি ঢোকেন মৌলভি আব্দুল গফুর। এক হাতে নানার কাঁধ জড়িয়ে রাখে খোকন অন্যহাতে ছাতা ঝুলিয়ে আম্মা আম্মা বলে ডাক পাড়ে। হাতের কাজ ফেলে দরজায় এসে দাঁড়ায় জাহাঁ আরা, বাবার হাত থেকে বাজারের থলে নেয়, ছেলের হাত থেকে ছাতা।

জাহাঁ আরা আবার নরাইলে আসে বাবার সাথে। শ্বশুরবাড়িতে এ তার তৃতীয় সফর। ঠাকুরবাড়ির সিংহদরজায় একে একে সকলেই এসে হাজির হয় জাহাঁ আরার আসার খবর পেয়ে। কালো বোরখায় আপাদমস্তক ঢাকা জাহাঁ আরা ধীরপায়ে বাড়ি গিয়ে ঢোকে। আব্দুল গাফ্‌ফার হাত ধরে মৌলভী সাহেবকে ভেতরবাড়িতে নিয়ে যান। ভাইপোকে কোলে নিতে গেলে সে নানার কোলে মুখ লুকায়, অচেনা মানুষের কাছে যায় না খোকন। ঠাকুরবাড়িতে ততক্ষণে ভিড় জমে গেছে। আশে পাশের বাড়ি থেকেও লোকজন এসে হাজির, জাহাঁ আরার ছেলেকে দেখতে, জাহাঁ আরাকে দেখতে। কালো স্বচ্ছ নেকাবের ভেতর দিয়ে জাহাঁ আরা দেখতে পায় জাহেদার মা এসে দাঁড়িয়েছে গেটের কাছে, এগিয়ে এসে দাঁড়ায় জাহাঁ আরার সামনে, বলে, অ চাচি, ক'দ্দিন পরে আইলাইন গো! মৌলভী সাহেবের কোলে জাপটে থাকা খোকনের দিকে তাকিয়ে বলে, আপনের পুলা তো দেহি চাচার মতন, এক্কেরে মেজঠাউর গো!

ভাইপো'র জন্মের সংবাদ পত্র মারফত পেয়ে গাফ্‌ফার সাহেব নারায়ণগঞ্জে এসেছিলেন ভাইপো'কে দেখতে। সঙ্গে ছিলেন সৎমা রাহেলা বিবি। নাতির মুখ দেখে নিজের গলার মোটা হার খুলে নাতিকে পরিয়ে দিয়েছিলেন রাহেলা বিবি। খোকনের তখন দিন দশেক বয়েস। গাফ্‌ফার বলেন চিঠি পেয়ে সঙ্গে সঙ্গেই তারা এসেছেন, মাত্র গতকালই চিঠি পেয়েছেন। তাড়াহুড়োয় কিছু আনতে পারেননি, মিষ্টির দোকান থেকে মাত্র সের কুড়ি মিষ্টি আনা হয়েছে, আত্মীয়-স্বজন সকলের মিষ্টিমুখের জন্যে! রাহেলা বিবি ভেতরবাড়িতে এসে গায়ের চাদর খুলে রেখে জাহাঁ আরা'র কাছে গিয়ে বসেন, নাতি কোলে নেন। নূর জাহাঁ'র দিকে তাকিয়ে দেখেন, বৌয়ের মা বৌয়ের থেকেও বেশি সুন্দরী! গায়ের লালচে ফর্সা রং যেন ফেটে পড়ছে, মাথায়ও অনেকখানি লম্বা, রাহেলাবিবি বুঝলেন, ওই লম্বাটে গড়ন আর অমন গায়ের রং জাহাঁ আরা কোথা থেকে পেয়েছে! নূর জাহাঁর সামনে নিজেকে তাঁর বেঁটে বলেই মনে হল। নাতির গায়ের শ্যামলা রং দেখে রাহেলা বিবি বলে ওঠেন, ঠাউরবাড়ির পুলা ঠাউরগো মতনই হইছে! নূর জাহাঁ দেখেন, ঘী রঙা চওড়া পাড়ের বেনারসী পরা বেঁটে খাটো গোলগাল শেষবয়েসের এই মহিলা সর্বাঙ্গে পরে আছেন অজস্র গয়না। রাহেলাবিবির চোখের দিকে তাকিয়ে কেমন অস্বস্তি হয় নূর জাহাঁ'র, চোখ দুটো সারাক্ষণ যেন নাচছে, ঘুরছে দিক ওদিক, এক মুহুর্তের জন্যেও স্থির হয় না চোখের দৃষ্টি, অত চঞ্চল আর অস্থির চোখ জীবনে দেখেননি নূর জাহাঁ। তাঁর মনে পড়ে যায়, জাহাঁ আরা যখন প্রথমবার শ্বশুরবাড়ি থেকে এসেছিল, তখন সকলের বারংবার জিজ্ঞাসার জবাবে বলেছিল, আম্মায় খালি গোল গোল চোখ কইরা চাইয়া থাহইন, কথা ক'ন না! মেয়ের জন্যে চিন্তিত হন নূর জাহাঁ।

মৌলভি সাহেব নরাইলে দু'দিন থেকে বিদায় নিলেন। দু-এক দিনের মধ্যেই সাত্তারের বাড়ি আসার কথা। ছেলে নিয়ে নরাইলে এসে জাহাঁ আরা পড়ল বিপদে। দুরন্ত খোকন এক মুহুর্ত এক জায়গায় স্থির থাকে না, সারাক্ষণ ছুটে বেড়ায় এদিক ওদিক। প্রথম দু'দিন নানার কোলে কোলেই ছিল, নানা'র চলে যাওয়ার সময় গলা ছেড়ে কেঁদেছে, কিছুতেই নানা'কে যেতে দেবে না, কোল থেকে নামবে না। জোর করে মৌলভি সাহেবের কোল থেকে তাকে নিয়ে বাড়ির বাইরে চলে যায় গাফ্‌ফার সাহেবের মুনিষ জলিল। সেদিন প্রায় সারাদিনই কেঁদেছে খোকন, কিছুতেই চুপ করে না। চোখের জলে ভাসে জাহাঁ আরাও। প্রায় আড়াই বছর টানা বাপের বাড়িতে থেকে এসেছে জাহাঁ আরা, ঠাকুরবাড়িতে এসে কিছুতেই মন বসছে না তার। এদিকে ছেলের দৌরাত্বে জেরবার জাহাঁ আরা। যখন তখন ঘর ছেড়ে বেরুতে হয় খোকনের পেছন পেছন। ঠাকুর বাড়ির যে সব পুরুষেরা জাহাঁ আরাকে কখনই দেখেনি তারা এখন নিজেদের ঘরে বসে বসেই দেখে, দেড় হাত লম্বা ঘোমটা টানা জাহাঁ আরা ছেলের পেছন পেছন দৌড়ুচ্ছে। চোখের সামনে থাকলে মানুষের ফুট কাটতে ইচ্ছা হয়। তাই তাকে নিয়ে চালু হয় নানা গল্প। সে কবে বে-পর্দা হয়ে দৌড় দিয়েছিল,তার গল্প এখন সকলের মুখে। ঠাকুরবাড়ির লোকজনের সাথে মিশে যেতে সময় লাগে না খোকনের। সকালবেলা বড়চাচার কোলে চেপে বারবাড়িতে চলে যায়, বেলা প্রায় দুপুর হয়ে আসে যখন সে চাচার কোলে চেপে আবার ভেতরবাড়িতে আসে।

জাহাঁ আরা এবার নরাইলে আসার পর শাশুড়ি তাঁর পাশের ঘরে থাকতে বলেছেন, ছেলে নিয়ে একলা ঘরে থাকতে অসুবিধে হবে ব'লে। বলেছেন, হান্নু আইলে তুমি তোমার ঘরে যাইও গিয়া! আব্বা ফিরে যাওয়ার দু'দিন বাদেই সাত্তার আসেন। দুপুরবেলা জাহাঁ আরা রান্নাঘরে শাশুড়ির মায়ের ফাই ফরমাশ খাটছিল। মোড়ায় বসে রাহেলাবিবি তদারকি করছেন, উনুনের ধারে বসে জ্বাল ঠেলছে জলিলের বউ। মোড়ায় বসে থেকেই রাহেলাবিবি রান্না করান জৈল্যার বউকে দিয়ে, কোন তরকারিতে কতটা মশলা পড়বে, উচ্ছেটা একদম যেন ভাজা ভাজা না হয়, কাঁচা কাঁচা থাকবে একদমই, লাউয়ের তরকারিটা হাল্কা আঁচে হবে, ঢাকনা যেন একদম না খোলা হয় লাউয়ের হাঁড়ি থেকে, ধীমে আঁচে, ভাপে সেদ্ধ হবে লাউ! বরাবরই মোড়ায় বসে থেকে সব কটা রান্নার তদারকী করেন রাহেলাবিবি। জাহাঁ আরা আসার পর থেকে জৈল্যার বউয়ের কাজ একটু কমেছে, কাটা-বাছাগুলো সব জাহাঁ আরা করে শাশুড়ির হুকুমমত। করলাগুলি অত পাতলা কাইট্যো না বউ, কড়াইত পড়লেই তো মিশ্যা যাইব গা, মোডা মোডা কাটো, খাইতে গেলে যেমুন কচকচ করে! এমনি সব ফরমায়েশ আর পরামর্শ চলে সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত।

দুপুরবেলায় শাশুড়ির হুকুমমত আনাজ কুটছিল জাহাঁ আরা, জলিল দৌড়ে এল ভেতরবাড়িতে, চিল চিৎকারে গোটা বাড়ি মাথায়, মেজ ঠাউর আইছে গো কলিকতার থেইক্যা, মেজ ঠাউর আইছে! সঙ্গে সঙ্গে যে যার হাতের কাজ ফেলে ভোজভাজীর মত যেন উবে গেল! জাহাঁ আরা দেখল, রান্নাঘরে সে একাই আছে, বাড়িতে যে যেখানে ছিল সক্কলে গিয়ে দাঁড়িয়েছে সিংহদরজার কাছে। বটি শুইয়ে রেখে পিড়ি ছেড়ে উঠল জাহাঁ আরা, রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে শাশুড়ির ঘরে এসে দাঁড়াল, দেখল, শাশুড়ি আম্মা দাঁড়িয়ে আছেন বারান্দার থামে হাত দিয়ে, দৃষ্টি বাড়ির গেটের দিকে। যে ঘরে এই ক'দিন আছে জাহাঁ আরা, সে'ঘরের জানালায় গিয়ে দাঁড়াল, তার জানালা জুড়ে মানুষের একমুখী আনাগোনা, যারা যাচ্ছে সাত্তারকে দেখতে, অনেকক্ষণ বাদে বাড়ির সকলের মাঝখানে দেখতে পেল সাত্তারকে, গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকছে, দুই হাতে দু'টি চামড়ার স্যুটকেস নিয়ে। জলিল হয়তো রাস্তার মোড়েই সাত্তারকে দেখতে পেয়ে ভেতরবাড়িতে খবর দিয়ে গিয়েছিল!

রাতে সকলের খাওয়া দাওয়র পাট চুকলে জাহাঁ আরা ভাবল এবার সে ছেলে নিয়ে নিজের ঘরে, দক্ষিণের দালানে যাবে। শুনতে পেল শাশুড়ি বলছেন, অত দূরের পথ আইছ বা'জান, আইজকা আর দইখণের ঘরো গিয়া কাম নাই, পোলায় এমনেই সারা রাইত কান্দে তুমি ঘুমাইতে পারবা না, আমার বিছনাতই হুইত্যা থাহো, দুই-চাইর দিন আরাম করো এরপরে নিজের ঘরো যাইওনে! এবং স্তম্ভিত জাহাঁ আরা দেখল, শাশুড়ি হাত-পা ছাড়িয়ে শুয়ে পড়েছেন, সাত্তার খানিক চুপ করে বিছানায় বসে থাকল তারপর গুটি-সুটি মেরে মায়ের
পায়ের দিকটায় শুয়ে পড়ল। দরজার আড়ালে জাহাঁ আরা দাঁড়িয়ে আছে সাত্তার তা জানে, বারে বারেই এদিক পানে তাকিয়েছে কিন্তু মায়ের হুকুম! আম্মা যখন হুকুম করছিলেন তখন সাত্তার বলার চেষ্টা করেছিল যে ছেলের কাছে গিয়ে শোবে সে, ছেলে কাঁদলে তার অসুবিধে হবে না কিন্তু রাহেলাবিবি যেন শোনেননি এমনভাবে ছেলের দিকে বালিশ এগিয়ে দিয়ে শুয়ে পড়েছেন! অনেক অনেকক্ষণ জাহাঁ আরা দাঁড়িয়ে রইল দরজার আড়ালে, এতটাই বিস্মিত জাহাঁ আরা যে তার বিশ্বাসই হচ্ছিল না শাশুড়ি এমন হুকুম করতে পারেন প্রায় তিন বছর বাদে ঘরে ফেরা ছেলেকে!

সমস্ত রাত জাহাঁ আরা এমনকী বিছানায় শুলো না পর্যন্ত। ঠায় বসে রইল খাটের বাজুতে পিঠ ঠেকিয়ে। ছেলে এখনও বুকের দুধ খায় জাহাঁ আরা'র। একটু পর পরই সে নড়ে চড়ে উঠে মা'কে খোঁজে, দুধ খোঁজে, জাহাঁ আরা ছেলেকে কোলে টেনে নিয়ে দুধ দেয় ছেলের মুখে, দু-এক টান খেয়েই খোকন আবার ঘুমিয়ে পড়ে। ডিম করে রাখা হ্যারিকেনের আলোয় জাহাঁ আরা বসে থাকে ভুতের মতন। একবার উঠে দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়, দেখে, যেভাবে শুয়েছিল সাত্তার সেভাবেই এখনও আছে, একটুও নড়েনি, পাশ ফেরেনি। হয়তো তাইনেও ঘুমায় নাই, ভাবে জাহাঁ আরা। আবার গিয়ে বসে খাটে। ভাবনা আসে নানা রকম। আগেরবার যখন সে শ্বশুরবাড়িতে ছিল তখন প্রথম তিনমাস সাত্তার সাথে ছিল। নতুন বৌকে ছেড়ে সে সহজে কোথাও যেত না, সারাক্ষণই সঙ্গে থাকত বা বাইরে কোথাও গেলেও খুব তাড়াতাড়িই ফিরে আসত। সাত্তারের এই সারাক্ষণ বৌ আগলে থাকা নিয়ে ননদদের হাসি-ঠাট্টা তার কানে আসত কিন্তু সাত্তার বলত, "অমন তো একটু কইবই, তুমি কান দিও না।' শাশুড়ি প্রথম থেকেই একটা দুরত্ব বজায় রেখে চলেন জাহাঁ আরা'র সাথে, মাঝেমধ্যে দক্ষিণের ভিটের দালানে এলেও কথা-বার্তা যা বলার বলতেন ছেলের সঙ্গেই, জাহাঁ আরা'কে রীতিমত উপেক্ষা করে। সংসারের কাজকর্মের জন্যেও তাকে কেউ ডাকত না। সাত্তার চলে যাওয়ার পর থেকে দিনের বেশির ভাগ সময়ই তার রান্নাঘরে কাটত কিন্তু যেটুকু সময় সে পেত নিজের জন্যে সেই সময়টুকু সে কাটাত তার নিজের ঘরে দোর দিয়ে। সময় কাটাত নামাজ পড়ে, হেফজ করা কোরান শরিফ নিজের মনে পড়ে আর চিঠি লিখে। এবার ঠাকুরবাড়ি আসার পর শাশুড়ি যখন তাকে নিজের ঘরের লাগোয়া ঘরে থাকতে বললেন তখন থেকেই একটা অস্বস্তিতে ছিল জাহাঁ আরা। শাশুড়ি যেন একটা কিছু ভেবে চিন্তেই তাকে এ'ঘরে থাকতে দিয়েছেন। আর আজ সাত্তারকে নিজের বিছানায় ঘুমোতে বলে ঘুমিয়ে পড়লেন!



"বাত্তি নিভলে ঠাউর বাড়িত সম্পর্ক থাহে না কেউর লগে কারোর' কথাটি শুনে প্রথমে তার মানে বোঝেনি জাহাঁ আরা। বোকার মত তাকিয়েছিল জাহেদীর মুখের দিকে। জাহেদী তখন এগিয়ে আসে জাহাঁ আরা'র দিকে, একদম গা ঘেঁষে বসে, কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিসিয়ে বলে, বড় ঠাউরের লগে তো তাইনের সৎমা'র অসৎ সম্পর্ক, আপনে জানেন না? ধীরে ধীরে মাথা নাড়ে জাহাঁ আরা, জানে না। একটু ঘাবড়ায় জাহেদী, বলে ও চাচি, কাওরে য্যান কিছু কইয়েন না, ঠাউরাইনে হুনলে আমার ঠাউরবাড়িত আওয়া বন্ধ! জাহাঁ আরা বলে, থাউক জাহেদার মা, এইগুলান তুমি কইও না আমার কাছে, আমার বমি আইতেছে হুইন্যা! ঘাবড়ে গিয়ে জাহেদী বলে, ও চাচি, অহন তো মাগী বুঢ়া হইছে, আকাম-কুকাম অহন আর কী করব, যুয়ানকালে করছে এইসব, মাইনষে কয়! আর ঠাউরবাড়ি কী, সারা নরাইলের মাইনষে জানে, সারা দ্যাশের মাইনষে জানে! ধীরে ধীরে জানতে পারে জাহাঁঁ আরাও। জানে জাহেদীর কাছ থেকেই। অদ্ভুত চোখে তাকিয়ে থাকে জাহাঁ আরা নয় বছরের ছেলে বিলুর দিকে। রোগা-পটকা এই পোলাডা আম্মার প্যাডের? বড়সাবের পোলা এইডা! ছি:!


জাহেদার মা তখন পাশের বাড়ির কিশোরী মেয়ে, যখন তখন এসে বসত জাহাঁ আরা'র কাছে। জাহাঁ আরা'কে তার ভারী পছন্দ! প্রায় হাঁটুর কাছে তোলা বাবুরহাটের ডুরে তাঁতের শাড়িখানি আটপৌরে করে পরে আঁচলখানি কোমরে গুঁজে দপদপিয়ে ঠাকুরবাড়ি সহ গোটা পাড়ায়, গোটা গ্রামে ঘুরে বেড়ায় জাহেদী। তার ফর্সা পায়ের গোছায় পড়ে থাকে জগৎ-সংসার, পরোয়া করে না জাহেদী, পুরুষ দেখলেই তার হাঁটার গতি বাড়ে। ছোঁকছোঁকানো পুরুষের অভাব নেই এই ঠাকুরবাড়িতে বা নরাইলে, কিন্তু সকলেই জানে, কিছু বলতে গেলেই "গোখরা'র মতন ফোঁস করে ওঠে জাহেদী, ছোবলও খেয়েছে অনেকেই কিন্তু সে'সব সকলে জানে না, আজকাল তাই দুর থেকে জাহেদীর পায়ের গোছা দেখেই নয়নসুখ প্রাপ্ত করে পুরুষেরা, কাছে আসার সাহস করে না। ঠাকুরবাড়িতে ঢুকে গোটা বড়িটা একটা পাক দিয়ে নেয় জাহেদী, সকলের ঘরে একটা উঁকি দিয়ে তারপর আসে জাহাঁ আরা'র কাছে। যদিও সমবয়েসী কিন্তু ঠাকুরবাড়ির সম্পর্ক ধরে চাচি বলে জাহাঁ আরা'কে। টকটকে ফর্সা জাহেদীর গায়ের রং, এতটা ফর্সা যে চামড়ার নিচের নীলচে শিরা-উপশিরা দেখা যায়। এহেন জাহেদী মঝে মাঝেই জাহাঁ আরা' র হাত টেনে নিয়ে নিজের হাতের রঙের সাথে মেলায়, বলে, আপনে অত সাদা অইছেন কেমনে? জাহাঁ আরা হেসে ফেলে যতবার এই প্রশ্ন শোনে, বলে, তুমি নিজে অত সাদা হইলা কেমনে? প্রশ্ন শুনে এদিক ওদিক তাকিয়ে ভাল করে দেখে নেয় কেউ কোথাও আছে কিনা, তারপর বলে, কেমনে জানি চাচি, আমার বাপে তো কালা তয় মাই এই র'ম সাদা, আমার মতন। তয় কইতে পারি না, যোয়ান কালে মাই'য়ে কুনো আকাম-কুকাম করছে কী না করছে! বাড়িডা তো ঠাউর বাড়ির এক্কেরে লগে, গ্র্যান্টি নাই কুনু! বলে আর হেসে গড়িয়ে পড়ে নিজেই। জাহাঁ আরা'র গায়ে কাঁটা দেয় ভাবতে গিয়েও।


বাইরে নিকষ কালো অন্ধকার। খাটের তলায় রাখা হ্যারিকেনের নিভু নিভু আলোয় ঘরে এক অদ্ভুত আলো-ছায়া বিরাজ করে। ও'ঘর থেকে রাহেলাবিবির নাসিকাগর্জনের শব্দ আসে। বিদ্যুৎ চমকের মত প্রশ্ন জাগে জাহাঁ আরা'র মনে, তবে কী তাইনের লগেও আম্মার ...?? সোজা হয়ে বসে জাহাঁ আরা, অস্থির লাগে তার। উঠে দাঁড়ায়, অস্থির পায়ে হেঁটে বেড়ায় ঘরের এ'মাথা থেকে ও'মাথা। সেই দুফরে আইছেন তাইনে, অহন রাইত পোয়াইতে আইল, অহনও পর্যন্ত একবারও তাইনে আইল না আমার কাছে! আম্মায় কইল আর তাইনে শুইয়া পড়ল? আগেও কি তাইনে আম্মার কাছেই ...? তাইলে কি খালি বড়সাবের লগে না তাইনের লগেও আম্মার...? আল্লাহ...! আর ভাবতে পারে না সে । ধপ করে বিছানায় বসে পড়ে ক্লান্ত জাহাঁ আরা। অপেক্ষা করে সকালের।


-১১-

মারবেন না মারবেন না মাস্টার নয়নকে,
নয়নকে মারলে প্রাণে লাগে ব্যথা।
আমায় মারিলে নয়ন পাবে ব্যথা,
মারবেন না মারবেন না নয়নকে।

পিতা জানতে পারলে আমাকে ছাড়বে না,
দুইজন আমরা একই সাথে,
চইল্যা যাব গভীর রাতে,
আকাশে চাঁদ সূর্য সাক্ষী রেখে,
পিতা-মাতাকে ছাড়িয়া,
চলেছি, পিতা যেন জানেন না,
ইতি আমরা। তুমি আমি দুইজনা।

তুমি আমায় ভুলিয়া যাও না,
ভাই ছাড়লাম বোন ছাড়লাম,
তোমার প্রেমে মজিলাম।
ইতি আমরা দুইজনা।

( খুঁটি পোঁতার সারিগান )



প্রায় প্রতি বছর ক্লাশে ফেল করে করে ম্যাট্রিক পরীক্ষা যখন দিতে গেল খোকন তখন তার বয়েস কুড়ি পার। তার সঙ্গী ছেলেরা কবেই স্কুল ফাইন্যাল পাশ করে শহরের কলেজে পড়ছে। খোকনের পড়তে ভালো লাগে না। কবে থেকেই সে আব্বাকে বলছে, তাকে যেন কলকাতা নিয়ে যান নিজের কাছে, সে সেখানে ব্যবসা করবে। কিন্তু কে শোনে কার কথা! জাহাঁ আরার এক কথা, পড়াশোনা তো খোকনকে করতেই হবে। বয়েস নাহয় একটু বেশি হয়ে গেছে তাতে কী? বড়ছেলে খোকন যদি পড়াশোনা না করে, বি এ, এম এ পাশ না করে তবে বাকিগুলো ও তো সেই পথ ধরবে! খোকনের এই না পড়বার বায়না তাই জাহাঁ আরা কানে তোলেন না একদম। বাবা-সোনা করে বুঝিয়ে বলেন। বি এ এম এ পাশ দিয়ে খোকন তার মুখ উজ্জ্বল করবে সেকথা বোঝানোর চেষ্টা করেন, খোকন কতটা বুঝল সে বিষয়ে নিজেই সন্দিহান থাকেন যদিও। সামনেই পরীক্ষা কিন্তু খোকন বই নিয়ে বসে কদাচিৎ। কলকাতা থেকে কিনে আনা ইউনিয়ন শার্টের চওড়া কলার উঁচু করে উপর দিকের আদ্ধেক বোতাম খুলে টেরিকাটা চুলে সে ঘুরে বেড়ায় গ্রামের এ'মাথা ও'মাথা। বিকেল হলেই খালপাড়ে বসে ফোঁকে ক্যাপষ্টেন সিগারেট। জানে, যে কোন সময় এদিকে এসে পড়তে পারেন বড়চাচা আব্দুল গাফ্‌ফার ঠাকুর কিন্তু পরোয়া করে না। মাঝে মধ্যে গাফ্‌ফার সাহেব এসেও পড়েন আর ভাইপোকে সিগারেট হাতে বসে থাকতে দেখে মাঝপথ থেকেই নি:শব্দে ফিরে যান। খোকন সেটা কখনো বুঝতে পারে কখনো পারে না। পাশের বাড়ির রীনার কথা ভাবে বসে বসে খোকন।

রীনা খোকনের দূর সম্পর্কের ফুপাতো বোন। থাকে মামা বদরুদ্দিন ঠাকুরের বাড়িতে। বিধবা মা আর বড়ভাই জাকেরও বদরুদ্দিন ঠাকুরের আশ্রিত। স্কুলে তারই ক্লাশে পড়ে রীনাও বয়েসে যদিও অনেকটাই ছোট। গাঢ় সবুজ পাড়ের সাদা শাড়ি, সাদা ব্লাউজ পরা ছিপছিপে শ্যামলা রীনা ক্লাশে বসে যখন নোট লেখে, খোকনের স্থান-কাল গুলিয়ে যায়। কোকড়ানো কালো চুলের দু-একটা গোছা যখন তখন এসে পড়ে মুখে-চোখে । বিনুনীতে আটকায় না ছোট ছোট ওই চুলগুলো। রীনা বারে বারেই চোখের উপর থেকে হাতে করে চুল সরায় আর খোকনের বুকের ভেতর ধুকপুকুনি বেড়ে যায়। লম্বাটে গড়নের মুখে বড় বড় টানা টানা ঘন কালো চোখ রীনার। ঘন পাপড়িতে ঢাকা চোখের দিকে তাকালে কাজল পরে আছে বলে ভুল হয় খোকনের। ইদানিং খোকন আর স্কুল ফাঁকি দেয় না, প্রতিদিনই স্কুলে আসে যদিও স্কুল আর বেশিদিন নেই, সামনেই টেষ্ট পরীক্ষা আর তারপর টানা তিনমাস স্কুল বন্ধ, পরীক্ষার আগে পর্যন্ত।

আর সব গ্রামের স্কুল যেমন হয় এই স্কুলটিও তেমনি। বিশাল এক মাঠের একধার ধরে লম্বা টানা এক বাড়ি, হলদে চুনকাম করা ইটের দেওয়ালের ঢেউটিনের চাল। পরপর সব দরজা, খয়েরি রঙের। লম্বা টানা বারান্দার দু'ধারে দু'খানি ঘন্টা ঝুলছে, স্কুল শুরুর আর শেষের ঘন্টা বাজে ঢন ঢন ঢন। প্রথম ঘন্টাটি বাজে একটু ধীরে তারপর দ্রুতলয়ে একের পর এক ছোট ছোট ঘন্টা। ক্লাস শেষের ঘন্টা বাঝে একটিবার শুধু, ঢন্‌ন্‌ন! নরাইল অন্নদা উচ্চ বিদ্যালয়ে মেয়েদের জন্যে আলাদা কোন ক্লাশঘর বা বাড়ি নেই, ক্লাশঘরের একদিকে বসে মেয়েরা অন্যদিকে ছেলেরা। লম্বা টানা এই বাড়িটির পাশে, ডানধারে আরেকটি ছোট বাড়ি, এ'ও লম্বা টানা কিন্তু আকারে একটু ছোট। বড় স্কুলবাড়িটির পরে ছোট এই স্কুলবাড়িটিকে দূর থেকে দেখতে লাগে বিশাল বড় এক "এল'। ছোট বাড়িটিতে বসে প্রাথমিক স্কুল, প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণী অব্দি ক্লাশ। বড় বাড়িটি হাইস্কুল, ষষ্ঠ শ্রেণী থেকে দশম শ্রেণী অব্দি ক্লাশ এই বড় বাড়িটিতে। বড় বাড়িটির প্রথম পরপর কয়েকটি ঘরে স্কুল অফিস, প্রধান শিক্ষকের কামরা, স্কুলের লাইব্রেরী। স্কুলের অফিসঘরেই মাঝে মধ্যে এসে বসেন স্কুল সেক্রেটারি আব্দুল গাফ্‌ফার ঠাকুর।

মেয়েদের জন্যে একটি সম্পূর্ণ আলাদা স্কুল করার ইচ্ছে গাফ্‌ফার সাহেবের অনেকদিনের কিন্তু এখনও পর্যন্ত প্ল্যান মঞ্জুর করাতে পারেননি তাঁর রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী দেওয়ান মনসুর আলীর কাছ থেকে। দেওয়ান সাহেব বর্তমান এম পি। যাঁর কাছে বারে বারেই হারেন গাফ্‌ফার ঠাকুর। দেওয়ান সাহেব যে স্কুল বা নরাইলের উন্নতি চান না তা নয়, মেয়েদের জন্যে আলাদা স্কুলবাড়ি বিষয়ে তাঁর বক্তব্য, ক'টি মেয়ে আর স্কুলে আসে যে এখনই মেয়েদের জন্যে একটি আলাদা স্কুলবাড়ি বানাতে হবে। কথাটি সত্যি, স্কুলের ছাত্রীসংখ্যা পঁচিশ শতাংশও নয়! দমে যাওয়ার পাত্র নন ঠাকুর আব্দুল গাফ্‌ফার, তিনি বলেন, মেয়েদের জন্যে স্কুল হলে অনেক বেশি মেয়ে স্কুলে আসবে, কিন্তু দেওয়ান সাহেব শোনেন না সে'কথা। নিজের কাছে নিজেই প্রতিজ্ঞা করেছেন ঠাকুর আব্দুল গাফ্‌ফার, যে বছর তিনি নির্বাচন জিতবেন, মেয়েদের স্কুলবাড়ি সেই বছরই হবে! কিন্তু হায়, গত কুড়ি বছরে তো শুধুই হার। আলাদা স্কুলও আর হয়ে ওঠে না।


স্কুল মাঠের তিনদিকে বিশাল বিশাল সব গাছ। নানা রকম সব ফলের গাছ সেখানে, আম, জাম, জামরুল এমনকি আছে কাঁঠাল গাছও। টিফিনছুটির সময়ে আর স্কুল শুরুর আগে ছেলে-মেয়েরা সব জটলা করে এই গাছগুলির ছায়ায় বসে। গাছ থেকে ফল পেড়ে খায়, যখন যে ফল থাকে গাছে। ফল ছিঁড়তে প্রধান শিক্ষকের কোন মানা নেই, শুধু কাঁচা ফল ছিঁড়তে বারণ করেন তিনি। এই গাছতলাতে এসে বসে রীনা ও তার সঙ্গী মেয়েরা। কাছেই ঘুরঘুর করে খোকন। মেয়েরা একে অন্যের গা টেপাটেপি করে, মুখ মিচকে হাসে কখনও বা খোকনের সামনেই হেসে গড়িয়ে পড়ে একে অন্যের উপর। খোকন তখন চলে যায় অন্যদিকে, সে জানে, বয়েস বেশি বলে এই সব মেয়েগুলো হাসাহাসি করে তাকে নিয়ে কিন্তু খোকন পরোয়া করে না শুধু ক্ষণিকের তরে সরে যায় সেখান থেকে। ফাঁক খোঁজে রীনাকে একলা পাওয়ার কিন্তু স্কুলে অন্তত রীনাকে একলা পাওয়ার সুযোগ পায় না খোকন। মেয়েগুলো যেখানেই যায় দল বেঁধে যায়, এমনকি টিফিন কিনতে স্কুলের পাশের দোকানে গেলে সেখানেও দল বেঁধেই যায় মেয়েরা। রাগ হয় খোকনের, কেন রীনা অমন করে তার সাথে! দূরে স্কুলের বারান্দায় প্রধান শিক্ষক প্রেমেন্দ্রবাবু'র উপর চোখ পড়লেই অবশ্য সব রাগ ঠান্ডা হয়ে যায় খোকনের। স্কুল শুরু হওয়ার আগে আর টিফিনের এই আধ ঘন্টা সময়ের গোটাটাই জুড়ে প্রেমেন্দ্রবাবু টহল দেন বারান্দায়, ক্লাশ শুরুর ঘন্টা বাজলে তবেই তিনি নিজের ঘরে যান!

স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার এই পথ যেন ফুলে ফুলে ঢাকা। সরু পিচরাস্তার দু'ধারেই বিশাল বিশাল সব গাছ গোটা পথ ধরে। কৃষ্ণচূড়া আর রাধাচূড়া, শিউলি, পলাশ আর বকুলেরা বিছিয়ে থাকে সারা বছর গোটা পথ ধরে। নানান বর্ণের, গন্ধের নানান সময়ের ফুলে এই পথ ঢেকে থাকে বছরভর। ফুল কুড়োতে কুড়োতে হাঁটে স্কুলযাত্রী সব ফুলকিশোরীরা। ছুটির পরে বাড়ি ফেরার সেই পথে ছোটন সঙ্গী হয় রীনার। বেশ অনেকটা পথ। দেওয়ান পাড়া পেরিয়ে থানা আর থানার মাঠ পেরিয়ে গ্রামের শেষ মাথায় এই স্কুল। রীনা, খোকনের সাথে একই ক্লাশে পড়ে জাহাঁ আরার মেজছেলে ছোটনও, পরীক্ষা দেবে সেও। ছোটন যদিও বয়েসে খোকনের চেয়ে অনেকটাই ছোট কিন্তু প্রতিবছর পাশ করে বলে সে এখন খোকনের সহপাঠি। রীনার সাথে খোকনের চোখ চাওয়া-চাওয়ি, ইশারায় কথা বলা চোখ এড়ায় না ছোটনের। বেঁটেখাটো গাট্টা গোট্টা দেখতে ছোটনকে বোকা-সোকা লাগলেও বোকা সে মোটেই নয়। আড়চোখে তাকিয়ে পেছনটা দেখে নেয় ছোটন, দেখে, ঠিক আসছে ভাই'সা খানিকটা দূরত্ব বজায় রেখে তাদের পেছন পেছন। চিমটি কাটে ছোটন রীনাকে, ওই দ্যাখ, মজনু ঠিক আইত্যাছে! রীনা হাসে। হাসলে রীনার একটা গজদাঁত বেরিয়ে পড়ে বলে রীনা সহজে মুখ খুলে হাসে না, ঠোঁট টিপে হাসে সে, বলে, এই পিছে পিছে আর কত হাঁটব মজনু, তুই যা না এখান থেইকা, তাইলে যদি এট্টু সাহস পায় লগে আওনের! ভয় দেখায় ছোটন, বদুচাচারে কমু নি ভাগ্নী তোমার ইশারা করে ভাইসা'রে? সত্যিকারের ভয় পায় রীনা, জোরে হাঁটা দেয় বাড়ির পথে।

বেশিদিন এই লুকিয়ে চুরিয়ে রীনাকে দেখে চুপ করে থাকতে পারে না খোকন, চিঠি লেখে রীনাকে। এক ফাঁকে সেই চিঠি সে গুঁজেও দেয় রীনার হাতে। এদিক ওদিক চোরাচোখে তাকিয়ে রীনা টুক করে চিঠি লুকিয়ে ফেলে হাতে ধরে রাখা বইপত্রের ভেতরে আর তারপর জোরপায়ে হেঁটে চোখের আড়াল হয় খোকনের। সাহস করে চিঠি তো লিখে ফেলে খোকন আর সে চিঠি রীনার হাতে দিয়েও দেয় কিন্তু ভয়টা পায় চিঠি দেওয়ার পর। রীনা যদি চিঠি বদুচাচাকে দেখিয়ে দেয়? তাইলে তো সেই চিঠি সোজা চলে আসবে বড়চাচার হাতে! চোখ বন্ধ করে ইয়া আল্লাহ ইয়া আল্লাহ জপতে জপতে খোকন বাড়ি পৌঁছায়। কিছুই ভাল লাগে না খোকনের। পড়তে তো কোনকালেই ভাল লাগে না তার। এখন এই বাড়ি-ঘর, মাঠ এমনকি প্রিয় ওই খালপাড়ও ভাল লাগে না আর। ইচ্ছে করে কলকাতা চলে যেতে, আব্বার কাছে। বড়চাচার শাসন, আম্মার মুখের ওই বাবাসোনা ডাক, সবই যেন ফাঁস হয়ে চেপে বসতে থাকে খোকনের গলায়। দমবন্ধ লাগে তার, কান্না পায়। কী হয় পরীক্ষা না দিলে? কেন পাশ করতেই হবে ম্যাট্রিক? রাগে দু:খে কষ্টে চোখ উপচে জল গড়িয়ে নামে গাল বেয়ে।

বিকেলবেলা বড়চাচা যখন বারবাড়ির বৈঠকে বসে বৈকালিক আড্ডা দেয় গ্রামের মুরুব্বিদের সাথে তখন মাঝে মাঝেই সেখানে গিয়ে বসে খোকন। প্রথম প্রথম বড়চাচা জিজ্ঞেস করত তাকে, কিছু চাই? মাথা নেড়ে না বলত খোকন কিন্তু সেখান বসেই থাকত। এখন বড়চাচা আর কিছু বলে না। খোকন চুপ করে বসে থাকে, শোনে, কোন কথা বলে না কখনোই। বদুচাচা মশকরা করে, কিরে ব্যাটা খোকন, পলিটিক্স করবি নি? জবাব দেয় না খোকন। পলিটিক্স খোকন করতে চায় না কিন্তু এই পড়াশোনা করা পরীক্ষা দেওয়ার চাইতে সেও বরং ভাল। তবে তার ভালও লাগে এখানে বসে থাকতে, লোকজনের কথা-বার্তা শুনতে। সেদিন হঠাৎ এক কান্ড হল। রোজ যেমন বসে বৈকালিক এই আসর সেদিনও তেমনি বসেছিল। লাঠি ঠুকঠুক করে বৈঠকখানার দোরগোড়ায় এসে দাঁড়াল বুড়ি অন্ধ ভিখারিনীটি। খোকন এই বুড়ি ভিখারিনীকে ভাল করেই চেনে। প্রতি শুক্রবারে সে আসে এই ঠাকুরবাড়িতে, ভিক্ষে করার জন্যে। শুক্রবারেই আসে সে তার কারণ অন্যদিন হলে বড়আম্মার মর্জির উপরে নির্ভর করবে ভিক্ষে পাওয়া না পাওয়া। মর্জি হলে আধসেরি কৌটোয় দু কৌটো চাল বা চার কৌটো ধান দিয়ে দেবেন মর্জি আর না হলে হাঁকিয়ে দেবেন, যা ভাগ এখান থেকে বলে। বড়আম্মার দেখাদেখি অন্যসব ঘরগুলো, যেমন, ছোট বৌবিবি বা বড়আম্মার বেটিদের ঘর থেকেও হয়তো কিছুই পাওয়া গেল না কিন্তু শুক্কুরবার হলে সে ভয় থাকে না। সেদিন সব ঘর থেকেই ভিক্ষে নিশ্চিত।

শুধুমাত্র নিশ্চিত ভিক্ষে সে পায় মেজ বৌবিবির ঘর হতে, সে যেদিনই আসুক, শুক্কুরবার বা শনিবার দেখে না মেজ বৌবিবি। কিন্তু শুধু একটি ঘরের ভিক্ষের উপর নির্ভর করে সে এতদূর আসতে পারে না তাই শুক্রবারই আসে সে। লোকে তাকে বুড়ি কানি ফকিরনি বলে বটে কিন্তু বয়েস তার চল্লিশের খানিক ওধারে। বুড়ির একটা নামও আছে কিন্তু সে নামে কেউ তাকে কখনও ডাকে না। "ওই কানি' বলে ডাকলেই সে সাড়া দেয়, লাঠি ঠুকে ঠুকে এগিয়ে আসে ভিক্ষে নেওয়ার জন্যে। বৈঠকখানর দরজায় অন্ধ ভিখারিনীকে দেখে সকলেই বেশ অবাক, খোকনও। বুড়ি এসে জিজ্ঞেস করে, বড়সাব আছুইননি বড়সাব? কান্নার গমকে কেঁপে কেঁপে ওঠে বুড়ির শরীর। গাফ্‌ফার সাহেব শুধোন, কি হইছে তোমার কান্দ কিয়ের লাগি? বুড়ি আছড়ে পড়ে দরজার চৌকাঠে, বড়সাব আমারে আপনেরা মাইরা ফ্যালান আমি আর বাইচ্চা থাইকতাম চাই না। এই জীবন লইয়া আর বাচতাম চাই না বড়সাব, আমারে আপনেরা মাইরা ফ্যালান!

সকলেই একসাথে প্রশ্ন করতে থাকেন কি হইল তোমার? কান্দ ক্যান আর এই'রম কতা কইতাছ ক্যান? কি হইছে? বুড়ি ধীরে ধীরে বলে, আপনেরা আমারে ইনসাপ দিতে পাইরবেন? আমি বিচার চাই! কার বিচার কিসের বিচার জানতে চাইলে বুড়ি বলে আমার ইজ্জত মারছে মেজ ঠাকুরের পোলা ছোডনে, হের বিচার করেন গো বড়সাব হের বিচার করেন! ঘরে বাজ পড়লেও এতটা চমকাতেন না গাফ্‌ফার সাহেব। চেয়ার থেকে লাফ দিয়ে উঠা দাঁড়ান তিনি, বলেন, কি কইতাছ জাননি তুমি? জানি গো বড়সাব জানি আর জনই দেইখ্যাই আপনের কাছে আইছি, জবাব দেয় বুড়ি। খানিক চুপ থেকে গাফ্‌ফর সাহেব বলেন, তোমার মনে হয় ভুল হইতাছে, অন্য কেউ হইব, ছোটন হইতে পারে না! বুড়ি তখন ঘটনার বর্ণনা দেয়, কী করে ছোটন তাকে ঘরের দরজা থেকে হাত ধরে বার বাড়িতে নিয়ে যায় আর তারপর পুকুরপাড়ের খড়ের গাদায় ফেলে তাকে ধর্ষণ করে। বুক চাপড়ে চাপড়ে বুড়ি আহাজারি করে ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে।

সায়া-ব্লাউজহীন হাড্ডিসার শরীরে গিঁট দিয়ে পরা শাড়ির আঁচলখানি বুকের উপর থেকে সরিয়ে দেখায় কোথায় কোথায় আঁচড়েছে মাংসলোভী এক পশুতে। উরুর উপর কাপড় তুলে আঘাত দেখায় অন্ধ ভিখারিনি সকল চক্ষুষ্মানদের। খোকন বসে থাকে মাথা নিচু করে। ঘরে বসে থাকা দশ-বারোজন মানুষের কেউ একটিও শব্দ করে না। ভেতরবাড়ির দিকের দরজার দিকে তাকান গাফ্‌ফার, জাহাঁ আরা সেখানে এসে দাঁড়িয়ে আছে কখন থেকে যেন। জাহাঁ আরা একা নয়, দরজা ধরে দাঁড়িয়ে আছে বাড়ির সব মেয়েরা। বুড়ির বিলাপে বাতাস যেন থমকে গেছে, ভারী হয়ে চেপে বসেছে বৈঠকখানায় বসে থাকা সকলের উপর, দরজা ধরে দাঁড়িয়ে নি:শব্দ অশ্রুতে ভেসে যাওয়া জাহাঁ আরার উপর, গোটা ঠাকুরবাড়ির উপর। অনেকক্ষণ পর গাফ্‌ফার কথা বলেন, ডাকেন বাড়ির মুনিষ জলিলকে, জৈল্যারে তুই বুড়িরে হের বাড়িত পৌঁছাইয়া দিয়া আয়। বুড়ি ভিখারিনীকে বলেন, মাইয়ো, তুমি বাড়িত যাও, তুমি যা কইছো যদি হাছা অয়, যদি ছোটনে এই কাম কইরা থাকে তয় ছোটনের বিচার হইব, তুমি যেই বিচার কইবা হেই বিচার অইব, তুমি অহন যাও! জলিল এসে বুড়িকে তোলে চৌকাঠের উপর থেকে, হাত ধরে নিয়ে যায় বুড়ির বাড়ির উদ্দেশ্যে। খোকন উঠে এসে হাত ধরে জাহাঁ আরার, ডুকরে ওঠেন জাহাঁ আরা, ও আল্লাহ, এ আমার কী হইল! জাহাঁ আরাকে জড়িয়ে ধরে খোকন, নিয়ে যায় উঠোন পেরিয়ে নিজেদের ঘরের দিকে। গাফ্‌ফার সাহেবের গলা শোনা যায়, কেউ এট্টূ দেহ দিহি, হেই হারামজাদায় আছে কই!

কয়েকদিন আর কোন খোঁজই পাওয়া যায় না ছোটনের। আশে-পাশের সকল আত্মীয়-স্বজনের বাড়ি লোক যায় ছোটনের খোঁজে কিন্তু ছোটন কোথাও নেই। জাহাঁ আরা যেন মনে মনে জানেন, ছোটন হয়ত নারায়ণগঞ্জে আছে! কিন্তু মুখে কিছু বলেন না। দৈনন্দিন কাজ-কর্মের সাথে বাড়ে তার নফল নামাজের পরিমাণ। যখন তখন বেতের ছোট্ট পাটিখানি বিছিয়ে বসে পড়েন নামাজে, সেজদায় পড়ে থাকেন নিশ্চল। চোখের জলে ভিজে যায় নামাজের পাটি, পাটির তলার লাল মেঝে। রাহেলা বিবি বিরক্ত হন জাহাঁ আরার এই প্রায় সংসারত্যাগী মনোভাবে। ভারী শরীর নিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে পশ্চিমের ঘর থেকে এসে হাজির হন উত্তরের ভিটেতে, জাহাঁ আরার ঘরে, বলেন, অত কান্দাকাডির কি হইছে? বেডামাইনষে এট্টূ করেই এইগুলান। তুমি তো কাইন্দা কাইট্যা কিয়ামত কর্ত্যাছ বৌ! ক্ষ্যামা দ্যাও এইবার আর হান্নুরে য্যান চিডি-ফিডি লেইখ্যো না এইসব লইয়া। ফতোয়া জারী করে রাহেলা চলে যান আবার নিজের ঘরে। জাহাঁ আরা নীরব থাকে তারপরেও।

সকালের নাশতার পরে জাহাঁ আরা এসে ঘর গোছান নিজের। নারকোল কাঠির ঝাড়ু দিয়ে বিছানা ঝাড়েন, কাঁথা চাদর ভাঁজ করে পায়ের দিকটায় রেখে দেন, বালিশগুলোকে হাত দিয়ে থাবড়ে থাবড়ে সোজা করে জায়গায় রাখেন, পাশের ঘরে গিয়ে গুছিয়ে রাখেন ছেলে-মেয়ের বই-খাতা, পাটির উপরে পাতা বিছানা গুটিয়ে ঢুকিয়ে দেন খাটের তলায়, খাটের উপরে পাতা বিছানা ঝেড়ে-ঝুড়ে ঠিক করেন। এ'ঘরে তার চার ছেলে থাকে, ছোট দুটো খাটে আর বড় দু'জন মেঝেয় পাতা বিছানায়। দিনের বেলায় যদিও কারোরই টিকির দেখা পাওয়া যায় না, কোন দরকার পড়লে লোক দিয়ে খুঁজে বের করে ডেকে আনতে হয় কিন্তু তাদের রাতের ঠিকানা পূবের এই ঘর, জাহাঁ আরা যাকে বলেন "পূবের কোঠা'। ভোরবেলাতেই বাসি থালা, বাটি, গেলাস যা এদিক ওদিক ছড়ানো ছিটানো থাকে সেগুলো, রাতের বাসী হাঁড়ি-কুড়ি সব বড় অ্যালুমিনিয়ামের গামলায় জমা করে দেন, আশেদা এসে গামলা সুদ্ধু তুলে নিয়ে যাবে পুকুর, মেজে ধুয়ে আবার নিয়ে এসে গামলাসুদ্ধুই রেখে যাবে ছোট্ট কাঠের জালি আলমারীর সামনে। চায়ের কাপ-গেলাস জাহাঁ আরা তুলে রাখেন বুক সমান উঁচু জালি আলমারীর উপরে বানানো গোল গোল খোপে, আর বাদবাকি থালা, বাটি, গেলাস গামলা সুদ্ধু তুলে দেন গোল কাঠের টেবিলে, যখন যা দরকার হয় গামলা থেকেই তুলে নেবেন বলে, বরাবরই তাই করেন।

সকালবেলায় ঘরের কাজ সেরে সামনের বারান্দায় বসে আনাজ কোটেন জাহাঁ আরা। কাটা-কুটো ঘরের সামনের এই বারান্দাতেই বসে করেন। এই সময়টায় জাহেদী এসে বসে, পাশের ঘর থেকে রাবেয়াও এসে বসেন তার বাজারের থলে, বটি আর গামলা নিয়ে। হাত লাগায় জাহেদীও। জাহাঁ আরার মাছটা বরাবর জাহেদীই কুটে দেয়। এমন নয় যে জাহাঁ আরা মাছ কুটতে পারেন না বা ভালোবাসেন না মাছ কাটা কিন্তু জাহেদী বলে, ও মৌলবীর ঝি, আপনে আনাজটা কাডেন গো, মাছটা আমিই কাইট্যা দেই। প্রথম প্রথম আপত্তি করতেন, এখন যেন এটাই নিয়ম হয়ে গেছে, জাহেদীই এসে মাছ কুটে দেবে। কোনদিন যদি জাহেদী না আসে, জাহাঁ আরা ব্যস্ত হন, বরোমাস্যা মুনিষ মাজন আলিকে ডেকে বলেন, মাজন রে, দেখ দেহি জাহেদার মা'র কি হইল আইজ এখনো আইল না, শরীলডা খরাপ করল নিহি, একবার দেইখ্যা আয় দেহি বা'জান! মাজন যাওয়ার আগেই হন্তদন্ত হয়ে জাহেদী ঢোকে, হাঁপাতে হাঁপাতে বিবরণ দেয়, গরুতে কি করে তার লাউমাচা উপড়ে দিয়েছে। শাপ-শাপান্ত করে গরু আর গরুমালিকের। জাহাঁ আরা মন দিয়ে শোনেন তারপর মাজনকে আবার বলেন, জাহেদার মায়েরে পানির কলসীডা আইন্যা দে দেহি বাপ, পানি খাইয়া একটু ঠান্ডা হউক! মাজন টেবিলের উপর থেকে জাহাঁ আরার ছোট্ট কলসীটি নিয়ে আসে, এগিয়ে দেয় জাহেদীর দিকে, বলে, হ, পানি খাও আর ঠান্ডা অইয়া বও!

সেদিনও বসে আনাজ কুটছিলেন, জাহেদীর কথায় হুঁ হাঁ করছিলেন শুধু। আজ ক'দিন হল জাহাঁ আরা কথা খুব কম বলছেন। সব সময়েই চুপচাপ থাকেন, কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলে উত্তর দেন বা পারতপক্ষে তাও দেন না। অন্ধ ভিখারিনির কথা কারো অজানা নয় আর ছোটন যে লাপাত্তা সেও সবাই জানে। জাহাঁ আরা জানেন, সকলের্‌র আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু এখন ছোটন কিন্তু তার সামনে কেউ কিছু বলে না, ছোটনের নামও সকলে যেন সযতনে এড়িয়ে চলে তার সামনে। জাহাঁ আরা বোঝেন সবই কিন্তু কাকে কী বলবেন, তাঁর নিজের পেটের সন্তান এমন কুলাঙ্গার হবে এ তিনি স্বপ্নেও ভাবতে পারেন না। এখনও তাঁর বিশ্বাস হয় না, কিন্তু ছোটনের এভাবে নিখোঁজ হয়ে যাওয়া যেন তার অপরাধী হবারই সাক্ষ্য দেয়। মাঝে মাঝেই জাহাঁ আরার চোখ যায় বাড়ির সিংহদরজার দিকে, আনমনেই, যেন অপেক্ষা করে আছেন, কেউ আসবে বলে। বেতের মোড়ায় বসে পুঁইশাক বাছতে বাছতে চোখে পড়ে, আব্বা ঢুকছেন সিংহদরজা দিয়ে ছোটনের হাত ধরে। চমকে উঠে দাঁড়ান জাহাঁ আরা, অজান্তেই বলে ওঠেন, ছোটন আব্বার লগে!



-১২-

ও সোহাগী ননদিনী, নীমম্বরী পরবি?
খোঁপায় সাধের গেঁদা-ফুলের পেরজাপতি ধরবি?
হায়-হায়-হারে পরনে নাই টেনা,
ভাসুর ঠাকুর আঙ্গনেতে ছিঁড়া-কাঁথাটা দেনা।।
সরম ধরম রইবে কুথায় বিবির হাটে যাব-
কনডোলেতে নাইন দিয়ে চাল মাগিয়ে খাব।।
কনডোলেতে চাল নাইরে,
কপালে মার ঝাঁটা
পথের পাশে মানুষ মরে
কুকুর-বিড়াল-পাঁঠা।।

( ভাদু গান )



বদরুদ্দিন ঠাকুরের বাড়িটি যদিও ঠাকুরবাড়ির একেবারেই পাশে কিন্তু এদের আত্মীয়তা অতটা ঘনিষ্ট নয়। লতায়-পাতায় সম্পর্ক বেশ দুরেরই। "আমরা আসল ঠাকুর, আমাদের পয়সা কম থাকুক বংশমর্যাদা আর শিক্ষাগত যোগ্যতা বেশী' এ'ধরণের একটা মনোভাব খুব একটা চেপে রাখেন না বদরুদ্দিন ঠাকুর বা তাঁর বাড়ির লোকেরা। কথায়-বার্তায়, হাবে-ভাবে যখন তখনই তাঁরা প্রকাশ করেন বংশগৌরব আর উচ্চশিক্ষার আত্মাভিমান। বদরুদ্দিন ঠাকুর কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রীধারী, সারাজীবন অধ্যাপনা করে কাটিয়েছেন, ঘুরে বেড়িয়েছেন নানা জায়গায় কর্মসুত্রে। অবসর গ্রহণ করার পর থেকে দেশে এসে থিতু হয়েছেন গিন্নিকে সাথে নিয়ে। ঢাকায় বদর সাহেবের একটি ছোট বাড়ি আছে, বছরভর সেটি তালাবন্ধ থাকে যদিও। মাঝে মাঝে বদরগিন্নি ঢাকায় যান দিন কয়েকের জন্যে, বাড়ি ঘর সাফ-সুতরো করেন, আত্মীয়-বন্ধুদের সাথে দেখা সাক্ষাৎ করেন, আবার ফিরে আসেন গ্রামে, স্বামীর কাছে। তিন ছেলেই উচ্চশিক্ষিত, বিদেশে বাস করে, বছরে-দু'বছরে একবার দেশে পদার্পণ করে মাসখানেকের জন্যে। ঢাকাতেই থাকে, বদরুদ্দিন ঠাকুরের ঢাকাস্থ বাড়িতে, তখন বদরগিন্নি ঢাকায় গিয়ে থাকেন ছেলে-বউ নাতি-নাতনিদের সাথে। দেশের বাড়িতেও আসে তারা সব তবে সে অল্পদিনের জন্যে।

দুই বাড়ির মধ্যে যাতায়াতও খুব একটা নেই, ঈদে-কোরবানীতে বা বিয়ে-শাদী হলেই শুধু এক বাড়ির লোকেদের অন্য বাড়িতে দেখা যায়। বদরুদ্দিন ঠাকুরের বিধবা বোন রুনু'র সাথে জাহাঁ আরার বেশ সখ্যতা আছে। রুনু মাঝে মাঝেই এসে বসেন জাহাঁ আরার কাছে। গপ সপ করেন, হাসি মস্করায় কাটিয়ে যান অনেকটা সময়। রুনু বিধবা, রুনু বাপের বাড়িতে আশ্রিতা এসব কথা ভুলে গিয়ে মাতেন নানা রকমের খেল-তামাশায়। দু'বাড়ির মধ্যেকার চাপা প্রতিযোগীতাকে উপেক্ষা করেই। কখনো দেখা যায় ভোরবেলায় ঠাকুরবাড়ির সামনের রাস্তায় দৌড় প্রতিযোগীতা হচ্ছে, দৌড়চ্ছেন, জাহাঁ আরা, রুনু, জাহেদী আর মোমিনগিন্নি রাবেয়া। পাড়ার বয়স্করা ছাড়া অত সকালে কেউ ঘুম থেকেও ওঠে না। বয়স্ক পুরুষেরা ফজরের নামাজের পরে থাকেন তখনও মসজিদে আর মহিলারা নামাজ শেষে নামাজের পাটিতেই বসে পড়েন কোরআন শরীফ কেউ বা জপেন তসবীহ। নামাজ সেরে তসবীহ হাতে জাহাঁ আরা বারবাড়িতে বেরোন প্রায় ভোরেই, বাড়ির সামনেটায়, পুকুরধারে, সামনের সরু রাস্তা ধরে হেঁটে আসেন খানিকটা করে। এ তাঁর অনেকদিনের অভ্যেস, দিনের বেলা বাড়ি থেকে বেরুনোর জো নেই, সংসারের কাজকর্মের ফাঁকে সময় যদিও খানিকটা পাওয়া যায় ইদানিং কিন্তু বাড়িতে, সামনের রাস্তায় এত লোকের আনা-গোনা যে ইচ্ছে করলেই সীমানার ওধারের পুকুরপারে একটু হেঁটে আসার যো নেই। এই যে ভোরবেলায় বেরোন তা নিয়েও শাশুড়ি রাহেলা বিবি কম কথা শোনান না কিন্তু সে'সব কথা জাহাঁ আরা কানে তোলেন না। বাড়ির ঐ সিংহদরাজায় পৌঁছুনোর আগেই দেখতে পান জাহেদী আসছে, দুজনে হাঁটেন একসাথে। আরও খানিক এগোলেই সঙ্গী হন রুনুও। কখনও বা জাহেদী ডাক দেয়, ও রুনু'ফু, কই গো, চল গিয়া হাইট্যা আয়ি। কখনও রুনু নিজে থেকেই দাঁড়িয়ে থাকেন বাড়ির সামনেটায়।

সকালবেলার এই হাঁটাপর্বের মাঝে একদিন রুনু বলেন, ভাবী, চল তো দেখি, কে কত দৌড়াইতে পারে! নিজেই একটা সীমা নির্দিষ্ট করে দেয়, আর বলেন, চল শুরু কর, কেডা আগে পৌঁছায় দেখি! না না করেও জাহাঁ আরা রাজী হয়ে যান, আটপৌরে করে পরা শাড়ির আঁচল শক্ত করে কোমরে গোঁজেন, আর দৌড় শুরু করেন। ছিপছিপে বালিকা জাহাঁ আরা এখন রীতিমত ভারিক্কি গিন্নি। ছোটাছুটির অভ্যেস গেছে শ্বশুরবাড়ি আসা অব্দি। প্রথমটায় বেশ হাঁফিয়ে যান, দেখতে পান, রোগা শরীরে তিরের মত ছুটছেন রুনু, আর পেটানো স্বাস্থ্যের জাহেদীও কম যায় না। জেদ চেপে যায় জাহাঁ আরার, দৌড়ান জোরে, আরও জোরে। পৌঁছান ওদের সকলের শেষে। বুকের ভেতর দপদপ করছে হৃদপিন্ড, ভোরের ঠান্ডা হাওয়ায়ও ঘেমে ভিজে গেছেন দৌড়ুতে গিয়ে। দাঁড়িয়ে খানিকটা জিরিয়ে নেওয়ার ফাঁকে কোমর থেকে শাড়ির আঁচল খুলে আবার মাথায় তুলে দেন, জাহেদী আর রুনুকে বলেন, খাড়াও, কাইল দেখাইতেছি মজা! হে হে করে হাসে ওরা দুজনেই, বলে, হাইরা গিয়া ঠাউরের বিবিয়ে কয় মজা দেহাইব! এর পর থেকে মাঝে মাঝেই হয় এই দৌড় প্রতিযোগীতা, যোগ দেন মোমিনগিন্নি রাবেয়াও।

জাহেদী মারফত জাহাঁ আরার কানে এসেছে রীনার সাথে বড়ছেলে খোকনের মাখো মাখো প্রেমের কথাও। জাহেদী আমতা আমতা করে বলব না বলব না করেও ইতি-উতি তাকিয়ে এও বলে গেছে প্রায় দিনই দুপুরবেলা সক্কলে যখন ভাতঘুম দেয় তখন খোকন রীনাদের ঘরে যায় চোরের মতন আর রীনার ঘরের দরজাও থাকে ভেতর থেকে বন্ধ! বড় বড় চোখ করে প্রায় ফিসফিসিয়ে এও বলেছে, বেড়ার ফাঁকে চোখ রেখে সে নিজের চোখেই দেখেছে স্বামী-স্ত্রীর মতন মেলামেশা করে রীনা আর খোকন! রীনা যদি প্যাড বান্ধায় তখন কী হবে সেই দু:শ্চিন্তাও প্রকাশ করে জাহেদী। জাহাঁ আরা এও চুপ করেই শোনেন, একটিও শব্দ না করে। মুখটা শুধু কঠিন হয় তাঁর। জাহেদী দেখে চোখদুটি জ্বলজ্বল করে জ্বলছে জাহাঁ আরার। এই চোখে তো আর কম কিছু পড়ল না। কান্না এল, কান্না শুকিয়ে গেল। এখন তা শুধুই জ্বলে।


দুপুরবেলা ভাত খেয়ে সেদিন আর বিছানায় যান না জাহাঁ আরা। হাঁটতে হাঁটতে ঠাকুরবাড়ির চৌহদ্দি পেরিয়ে রাস্তার ও'ধারের বদরুদ্দিন ঠাকুরদের বাড়িতে গিয়ে পৌঁছন। বদরুদ্দিন ঠাকুরদের বাড়িতে কোন দালান-কোঠা নেই। বড় বড় টিনের ঘর এ ভিটেয় ও ভিটেয়। বাড়িতে প্রচুর গাছপালা, বিশাল বিশাল সব গাছ বাড়ির চারপাশে। আম, জাম, কাঁঠাল আর কামরাঙার গাছ। আছে বাতাবী লেবুর গাছও। বাড়ির চারপাশে কোন দেওয়াল নেই, গাছগুলো সব পরপর গায়ে গায়ে এমনভাবে দাঁড়িয়ে আছে যেন ওরাই দেওয়াল। ছায়া ছায়া এক অদ্ভুত ঠান্ডা ভাব গোটা বাড়ি জুড়ে। দিনে দুপুরে রোদ খুব একটা ঢুকতে পায় না এ'বাড়িতে। নিঝুম দুপুরে একটানা ঝিঁঝির ডাক ছাড়া আর কোন শব্দ নেই। ছোট ছোট সব ফুলগাছ দাঁড়িয়ে আছে বাড়িতে ঢোকার সরু একচিলতে রাস্তার দু পাশে, ফুটে আছে সাদা বেলফুল, বেগনে রঙের আরও কী একটা ফুল যেন, জাহাঁ আরা চিনতে পারেন না ফুলটাকে। অদ্ভুত একটা মাদক গন্ধ ছড়ায় নানা রকমের ফুলের গন্ধ মিলে মিশে। বাড়ির দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা কামিনী গাছেও ফুটে আছে অজস্র সাদা ফুল, গাছতলায় পড়ে আছে ঝরে যাওয়া বাসী ফুলেরা, শুকনো ঝরা পাতারা।

সহজে এ'বাড়িতে ঢোনে না জাহাঁ আরা। দুই বাড়ির দ্বন্দ্ব তাঁর অজানা নয়। ঈদের সময় বা কোন প্রয়োজনে ও'বাড়িতে গেলে বদরুদ্দিন সাহেব অবশ্যই একটা হাঁক দেন তাঁর উদ্দেশ্যে, "মৌলবীর বেটি কী করে গো' বলে। লম্বা ঘোমটা টেনে সামনে আসেন জাহাঁ আরা, দূর থেকে সালাম জানান, কুশল জিজ্ঞেস করেন তারপর ভেতরে গিয়ে শরবত পাঠিয়ে দেন ছেলেদের কারো হাত দিয়ে। পুরুষেরা যদিও বছরে দু-চার বার এ ওর বাড়িতে চলেও যান, বাড়ির বউয়েরা কদাপি নয়। যদিও খুব কম আসেন এদিকে তবুও এই বাড়িতে, এই উঠোনে এলে জাহাঁ আরার মন ভাল হয়ে যায়। ছায়া ছায়া এই বাড়িটা অনেকটা যেন তাঁর নিজের বাড়ির মত, নারায়ণগঞ্জের সেই বাড়ির মত। এই বাড়িতে একটা অদ্ভুত গন্ধ ভেসে বেড়ায়। অদ্ভুত একটা গন্ধ। ভেতরবাড়ির উঠোনের ধার ধরে লাগানো বড় বড় দুটো লেবুর গাছ, বারো মাস যাতে লেবু ধরে। গন্ধ ছড়ায় ছোট্ট সাদা লেবুফুল। বড় ঐ বাতাবী লেবুর গাছটায় ধরে থাকা বড় বড় কালচে সবুজ বাতাবী লেবু থেকেও ভেসে আসে মন কেমন করা এক গন্ধ। দোরগোড়ার কামিনী ফুল, সরু পায়ে চলা পথটার ধারে ফুটে থাকা বেলফুল, আর নাম না জানা বেগনে ওই ফুলের গন্ধ। সব মিলে মিশে একাকার হয়ে গিয়ে এক অদ্ভুত গন্ধ ভেসে বেড়ায় এই বাড়ির বাতাসে। খানিক দাঁড়ান জাহাঁ আরা। ভেতরে জমে থাকা রাগ, দু:খ আর কষ্টগুলো জল হয়ে নেমে আসে দুই গাল বেয়ে।

জাহাঁ আরা জানেন, এই সময়ে বাড়ির সকলেই ঘুমোচ্ছে। ধীরপায়ে বাড়িতে ঢুকে জাহাঁ আরা পেরিয়ে যান পরপর বড় বড় ঘরগুলি, উঠোন পেরিয়ে গিয়ে ঢোকেন শেষমাথার ছোট এক টিনের ঘরে, যেখানে রুনু থাকেন। ছোট্ট ঘরের মাঝখানে বাঁশের বেড়ার পার্টিশন দিয়ে বানানো হয়েছে দুটি ঘর, একটিতে থাকেন মা আর মেয়ে, অন্যটিতে থাকে জাকের, রীনার বড়ভাই। আসবাব বলতে পার্টিশনের এ'ধারে ও'ধারে দুটি কাঠের চৌকি পাতা আর ঘরের কোণে একখানা পদচালিত সেলাই মেশিন। এই সেলাই মেশিন রুনুর জীবিকা নির্বাহের উপায়। লোকের জামা কাপড় সেলাই করেন রুনু। সালোয়ার-কামিজ, ব্লাউজ, সায়া এমনকি ছেলেদের পাজামা-পাঞ্জাবীও। ছেঁড়া, পুরনো শাড়ি, পুরনো বিছানার চাদরে সুইয়ের বড় বড় ফোঁড়ে সেলাই করে দেন ছোট বাচ্চার কাঁথা। রুনু এমনকি নকশী কাঁথাও সেলাই করেন। তবে সে বড় কম। আজকাল লোকের সখের রকম পাল্টে গেছে, লোকে এখন নকশী কাঁথা সেলাই না করিয়ে কিনে আনে ফুল, লতা-পাতার ছাপ দেওয়া বিদেশী রঙীন পাতলা কম্বল। তবু বছরে দু-একটা কাঁথার অর্ডার পান রুনু। গ্রাহক নতুন দু'খানা একরঙা শাড়ি দিয়ে যায়, সুতো দেন রুনু নিজে। বাইরের সুতোয় কাঁথা সেলাই করেন না রুনু। নিজেই সুতো তোলেন জমিয়ে রাখা পুরনো তাঁতের শাড়ির পাড় থেকে। একটা পুটুলিতে থাকে নানা রঙের পাড়গুলি। যেগুলি থেকে রুনু বসে বসে তোলেন পছন্দসই সুত্র লাছি। তিনগাছি করে সুতো তোলেন রুনু আর সেই সুতোয় কাঁথায় রচনা করেন নানা রঙের নক্‌শা। আজকাল রীনা কলম দিয়ে কাপড়ে এঁকে দেয় ফুল-লতা-পাতা-নদী আর গাছপালা। আঁকে বাঁশী হাতে রাখাল ছেলে আর ছাগলছানার পেছনে ছুটন্ত বালিকার ছবি। রীনা আঁকে সাজু আর রূপাইকে। সবুজ ধানের ক্ষেত, সোনারঙা পাকা ফসল আর তার মাঝে খাটো শাড়ি পরা কালো এক কিশোরী মেয়ে, রূপাই। রুনুর হাতের সূক্ষ ফোঁড়ে প্রাণ পায় অমর এক কাব্যকথা। কাঁথা জুড়ে ফুটে ওঠে কবির কল্পনার সেই মাঠ। আগে কাঁথায় রুনু বানাতেন পাখা, কুলো, চরকি, বাড়ি-ঘর। রুনুর হাতের নকশী কাঁথার বেশ কদর নরাইলে। আত্মীয়-স্বজনেরা যারা বিদেশে বা শহরে থাকে, বায়না দিয়ে যায়, পরেরবার যখন আসবে কাঁথা নিয়ে যাবে বলে।

রুনুর ঘরে পাতা চৌকির সিঁথান বোঝা যায় বিছানার উপর রাখা বালিশ দু'খানা দেখে। পায়ের দিকটায় ডাই করে রাখা কাঁথা, লেপ, চাদর আর কিছু ভাঁজ করা কাপড়। বেড়ার দেওয়ালে বাঁধা দড়িতে ঝুলছে নিত্যকার পোষাক-আশাক। টিনের চালের তলায় সিলিং বলে কিছু নেই যদিও এই রকম টিনের চালের ঘরে মোটা মোটা যেন তেন প্রকারে তোলা বাঁশের বেত দিয়ে তৈরি তর্জার সিলিং থাকে, ঠান্ডা-গরমের হাত থেকে বাঁচার জন্যে। রুনু এই ঘরে সিলিং তৈরি করেছেন রং-বেরঙের টুকরো কাপড় দিয়ে বানানো বিশাল এক চাঁদোয়া দিয়ে। ছোট ছোট ছাঁট কাপড়, যেগুলো রুনু পান তার তৈরি জামা-কাপড়ের বেঁচে যাওয়া টুকরো-টাকরা, ছাঁট থেকে। কোন কোন কাপড় চৌকো তো কোনটা তেকোণা করে কাটা। সেলাইয়ের পরে চৌকোণা-তেকোণা যের'ম কাপড় বেঁচে থাকে সেইরকম শেপে পরপর সেগুলোকে জুড়ে দেওয়া। মাথার দিকে তাকালে সে যেন এক রঙের মেলা। লাল, নীল, সবুজ, হলুদ, ফিকে গোলাপী, সাদা, কালো কী রং নেই সেখানে! টুকরো কাপড় জুড়ে জুড়ে চাদরের মত্ন বানিয়ে চারদিকে লাল কাপড়ের বিঘৎ খানেক চওড়া কুঁচি দেওয়া ঝালর। বাঁশের খুঁটিতে পোঁতা পেরেকে দড়ি দিয়ে বেঁধে সিলিংএর মত করে ঝোলানো সেই চাঁদোয়ার চারধারে ঝুলন্ত ঝালর। বেড়ার ফাঁক দিয়ে ঢুকে পড়া সূর্যের ছিটে-ফোটা আলোতে ঘরের ভেতরকার আলো-আঁধারীতে এক রঙীন, মোহময় ঝিলিমিলি ঝিলিমিলি আলোর খেলা।


ভেজানো দরজা ঠেকে ঘরে ঢুকে খানিক থমকে দাঁড়ান জাহাঁ আরা ঘরে রুনু একা, চৌকিতে শুয়ে আধো ঘুমের মধ্যে ঘুরিয়ে চলেছেনে তালপাতার পাখাখানি। মাঝে মাঝেই হাত থেমে যায়, এলিয়ে পড়ে বিছানায় আবার হাত নড়ে ওঠে, পাখা ঘোরে। আস্তে করে জাহাঁ আরা ডাকেন, রুনু'বু, ঘুমাইতেছেন? জেগে ওঠেন রুনু, উঠে বসেন, বলেন, না ভাবী, ঘুমাই না, আইয়েন, ব'ন। খানিক অবাক হয়েই আবারও বলেন, কেমনে কেমনে আইলেন আইজকা! বিছানার ধারটিতে গিয়ে বসেন জাহাঁ আরা, বলেন, একটা কথা আছিল বুবু, দরকারী কথা। কী কথা, জানতে চান রুনু। জাহাঁ আরা জিজ্ঞেস করেন, রীনা কই? মনে মনে চমকেই ওঠেন রুনু, খোকনের সাথে রীনার নাম জড়িয়ে কিছু কথা তাঁর কানেও এসেছে বৈকি। রীনাকে জিজ্ঞেসও করেছেন, রীনা অস্বীকার করেছে সেকথা। চমকানো ভাবটা সামলে নিয়ে রুনু বলেন, বড়ঘরে আছে ভাবী, এই ঘরে গরম বেশি লাগে বইলা দুফরে রীনা বড় ঘরে যায় গিয়া, হেইখানেই বইসা পড়ে, সামনে তো পরীক্ষা! জাহাঁ আরা বলেন, বুবু, কিছু মনে নিয়েন না, রীনারে একটু বুঝাইয়া দিয়েন, খোকনের লগে বেশি যেন না মিশে, একটা অঘটন ঘটলে কাইন্দা কূল পাইতেন না আপনেরা কেউই। খানিক চুপ থাকেন রুনু তারপর বলেন, আমিও হুনছি কিছু কিন্তু রীনায় স্বীকার করে না। জাহাঁ আরা বলেন, আইজকা স্বীকার করে না, কিন্তু কাইল কী করব যদি কিছু হয়? জাহেদী নিজের চোখে দেইখ্যা গেছে খোকনের লগে রীনারে, আমার পোলারে আমি শাসন করুম, কিন্তু দুর্ঘডনা যদি ঘডে তয় বিপদে পরবেন আপনে বেশি। আর ঠাউর সাবেও তো খাতির করত না আপনেগো! বড়ভাই যে তাঁকে খাতির করবেন না সেটা রুনু খুব ভালো করেই জানেন, তবু বলেন, ভাবী, যেয় যাই কউক না ক্যান, আমার বিশ্বাস অয় না রীনায় কোন কুকাম করতেছে!

জাহাঁ আরা বলেন, বুবু, বয়েসটা বেশি ভালা না আর এই ঠাউর বাড়ির বাতাসও খরাপ। পাপ। পাপ। ঠাউর বাড়ির বাতাসে বাতাসে খরাপি আর পাপ। আপনে সাবধান থাইকেন আর পারলে মাইয়ার বিয়া দিয়া দ্যান, ঠাউর সাবের লগে কতা ক'ন, সম্মন্ধ দেখতে ক'ন। খানিক চুপ করে থাকেন রুনু, বলেন, সামনে পরীক্ষা ভাবী, এখনই সম্মন্ধ দেখুম? বিয়া দিয়া দিমু? রীনারে তো পড়াইতে চাইছিলাম ভাবী! অসহায়ের মত তাকিয়ে থাকেন রুনু জাহাঁ আরার দিকে। জাহাঁ আরা যেন খানিকটা বোঝেন রুনুর চোখের ভাষা, একাত্ম বোধ করেন এই বিধবা রমণীটির সাথে। অসহায় বোধ করেন ক্ষণিকের তরে। কিন্তু পরক্ষণেই বাস্তবে ফিরে আসেন, কঠিন করেন নিজেকে, বলেন, আমার পোলাগো আমি এই দ্যাশে বিয়া-শাদী করাইতাম না কোনো মতেই, পোলারে আমি কলিকাতা পাডাইয়া দিমু দরকার পরলে, আপনে মাইয়া সামলান! উঠে দাঁড়ান জাহাঁ আরা, দৃঢ় পায়ে বেরিয়ে যান ঘর থেকে। রুনু বসেই থাকেন বিছানায় মুর্তির মত।



(চলবে)
** কবিতাংশগুলির জন্য কৃতজ্ঞতা: সুমেরু মুখোপাধ্যায়