আপনার মতামত         


খোলা পাতা, খোলা কোড - শেষ পর্ব (পেটেন্ট যুদ্ধ)
অরিজিৎ মুখোপাধ্যায়

যুদ্ধের পটভূমি

তর্ক শুরু আশির দশকে। তর্ক পেরিয়ে যুদ্ধের জমি তৈরী হতে শুরু করে নব্বইয়ের দশকে। আমেরিকাতে। ইউরোপে আরও কিছুদিন পরে।

সত্তরের দশকে সফটওয়্যার মানে ছিলো একগুচ্ছ গাণিতিক অ্যালগরিদম, বা নিয়ম - যেগুলোর পেটেন্ট নেওয়া সম্ভব নয়। আমেরিকাতে সুপ্রীম কোর্ট ওইসময় ডেসিমাল থেকে বাইনারী সংখ্যা তৈরীর এক অ্যালগরিদমের জনকের পেটেন্টের দাবি খারিজও করে দেয়। তার বছর দশেকের মধ্যে ওই একই সুপ্রীম কোর্টের এক রুলিং সফটওয়্যার পেটেন্ট বিতর্কের জন্ম দেয় - Diamond vs. Diehr মামলায়। সিন্থেটিক রাবার থেকে কিছু জিনিস তৈরীর এক যন্ত্র নিয়ে মামলার শুরু - যাতে অ্যারেনিয়াস ইক্যুয়েশন বলে একটি ফরমূলা ব্যবহৃত হত। পেটেন্ট পরীক্ষক প্রথমে পেটেন্টের আবেদন নাকচ করে দিলেও সুপ্রীম কোর্ট পরে পেটেন্টের আবেদনকে বহাল রাখে - জাস্টিস রেনক্যুইস্ট লেখেন যে সমস্ত দাবীগুলোকে একযোগে দেখতে হবে। এই মামলার রায় থেকে বেরিয়ে আসে যে এই রাবার মোল্ডিংএর যন্ত্রে ব্যবহৃত অ্যালগরিদম কোনো অ্যাবস্ট্র্যাক্ট আইডিয়া হিসেবে সুরক্ষিত নয়, কিন্তু রাবার মোল্ডিং প্রসেসে এর প্রয়োগ হিসেবে সুরক্ষিত। অর্থাৎ, আলাদা করে সফটওয়্যার পেটেন্টযোগ্য না হলেও তার প্রয়োগ বা অ্যাপ্লিকেশনের দিকটা নিয়ে বিতর্কের জন্ম হল। শুরু হল সফটওয়্যারকে পেটেন্টের আওতায় আনার লম্বা প্রচেষ্টা।

এর বছর দশেক পর ফেডারেল সার্কিটে আরেকটি মামলা সফটওয়্যার পেটেন্টের আইনকে প্রায় মান্যতা দেয় - In re Alappat - যার মূল কথা হল - "a novel algorithm combined with a trivial physical step constitutes a novel physical device. Therefore, a computing device on which is loaded a mathematical algorithm is a 'new machine', which is patentable under traditional patent law."

সফটওয়্যার পেটেন্টের আইডিয়া আমেরিকাতে জাঁকিয়ে বসে State Street v. Signature Financial মামলায় - যখন ফেডারেল সার্কিট রায় দেয় যে - যে কোনো গাণিতিক অ্যালগরিদম যদি "useful, concrete and tangible" রেজাল্ট তৈরী করে, তখন সেটি পেটেন্ট নেওয়ার যোগ্য।

প্রথম ঘটনা বাদ দিলে সুপ্রীম কোর্ট এই সময় এই বিতর্কে চুপচাপই ছিলো। ১৯৯৪ সালে ক্লিন্টন প্রশাসন মাঠে নামায় ব্রুস লেম্যানকে পেটেন্ট অ্যাণ্ড ট্রেডমার্ক আপিসের কমিশনার হিসেবে - আগের কমিশনারদের মতন এই ভদ্রলোক পেটেন্ট লইয়ার ছিলেন না, ছিলেন পরিচিত সফটওয়্যার কোম্পানি লবিয়িস্ট। এবং ১৯৯৫ সাল থেকে পেটেন্ট অ্যাণ্ড ট্রেডমার্ক অফিস বিভিন্ন ক্ষেত্রে সফটওয়্যার পেটেন্ট ইস্যু করতে শুরু করে। এবং ধরে নেওয়া হয় আমেরিকান কংগ্রেসের ইচ্ছাও কতকটা এই দিকেই - কারণ কংগ্রেস সরাসরিস অফটওয়্যার পেটেন্টের পক্ষে মুখ না খুললেও ১৯৫২ সালের পেটেন্ট আইনের কোনো পরিবর্তন আনেনি, আনতে চায়ওনি। এবং মোটামুটি এই সময় থেকেই কোর্টও পেটেন্টের পক্ষে ঝুঁকতে শুরু করে।

ইউরোপে বিতর্ক অমিমাংসিত থাকলেও মোটের ওপর সফটওয়্যারকে tangible hÙ ¹¤ হিসেবে দেখা হয় না, তাই সফটওয়্যারের ওপর পেটেন্ট আনার প্রচেষ্টাগুলো প্রতি বছর ধামাচাপা পড়ে যায়।

সাথীদের খুনে রাঙা পথে দেখো, হায়নার আনাগোনা...

প্রায় দশ বছরের আশংকাকে সত্যি করে ২০০৬ সালে ছোট-বড় কিছু সফটওয়্যার কোম্পানি ওপেন সোর্সের বিরুদ্ধে কোমর বেঁধে যুদ্ধে নামে - তাদের অন্যতম হাতিয়ার সফ্‌টওয়্যার পেটেন্টকে সম্বল করে। যুক্তিটা অনেকটা সেই গ্যাটের আমলের - বলা ভালো গ্যাটের শুরুর দিকে যে আশংকা করা হত, সেই আশংকাকেই সত্যি প্রমাণ করেছে এই কোম্পানিগুলোর এখনকার যুক্তি - অর্থাৎ (a + b)2 ফর্মূলার পেটেন্ট নেওয়া আরকি। ক্যুইক সর্টের অ্যালগরিদমের পেটেন্ট যদি কেউ নিয়ে নেন, তার ফল দাঁড়াবে ওই (a + b)2 ফর্মূলার পেটেন্ট নেওয়ার সমান সমান।

অনেক ঘটনার মধ্যে থেকে বাছাই করা দুটো ঘটনা এখানে তুলে দেওয়া বেশি এফেক্টিভ (১) -

রেডহ্যাটের বিরুদ্ধে অভিযোগ যে তারা তাদের হাইবারনেট ফ্রেমওয়ার্কেএকটি পরিচিত অবজেক্ট রিলেশনাল ম্যাপিং অ্যাক্টিভরেকর্ড প্যাটার্ন (ইউএস পেটেন্ট নাম্বার ৬,১০১,৫০২) ব্যবহার করেছে - যার "আবিষ্কারক' নাকি ফায়ারস্টার সফটওয়্যার। অবজেক্ট ওরিয়েন্টেড ডেটাবেজ টেকনোলইজ একটি পরিচিত টেকনোলজি, যার ব্যবহার বেশ কিছু বছর ধরে হয়ে চলেছে - অবজেক্ট-রিলেশনাল সি®Ùটেম নিয়ে অনেক কাজও আছে - এমনকি অর‌্যাকলেরও। কাজেই ফায়ারস্টারের পাথব্রেকিং হওয়ার যুক্তি ধোপে টেঁকে না - হয়তো ফায়ারস্টারের পেটেন্টটি কোনো ইনোভেশনের জন্যে নয়ও - ১৯৬৭ সালে তৈরী সিমুলার সময় থেকে অবজেক্ট ওরিয়েন্টেশনের কনসেপ্ট সফটওয়্যার দুনিয়ায় ব্যবহৃত হয়ে চলেছে। রেডহ্যাট কি করবে সেটা বড় প্রশ্ন। ওপেন সোর্সের সমর্থকেরা আশা করেন রেডহ্যাট লড়ে যাবে - কারণ পেটেন্টের এই মামলা যদি "সেট্‌ল' করা হয়, সেটা শুধু ওপেন সোর্স নয়, গোটা সফটওয়্যার দুনিয়ার ওপর বড় ধাক্কা হিসেবে নামবে - কারণ এই পেটেন্টের দৌলতে অবজেক্ট-রিলেশনাল ম্যাপিং ব্যবহার করার সময় সকলকে ফায়ারস্টারকে রয়্যালটি দিতে হবে। মানে (a + b)2 ব্যবহার করার আগে রয়্যালটি দিতে হলে যা অবস্থা দাঁড়াবে তাই প্রায়। এই অবস্থায় পেটেন্ট আইন বাঁচিয়ে এই মুহূর্তে নতুন কোনও প্রোগ্রাম/সফটওয়্যার লেখা আদৌ সম্ভব নয়। ২০০৪ সালের একটি সার্ভেতে দেখা গেছিলো লিনাক্স কার্নেলে প্রায় তিনশোর কাছাকাছি "সম্ভবত: আমেরিকান পেটেন্ট ভাঙা' এলিমেন্ট আছে - আর সেতো শুধু লিনাক্সের একটা প্রোগ্রাম। ফায়ারস্টারের সাথে মামলায় রেডহ্যাট লড়ে গেলেও কতদিন টানা সম্ভব তাদের পক্ষে? যদি এই তিনশো পেটেন্ট সংক্রান্ত মামলা শুরু হয়?

দ্বিতীয় উদাহরণ আরেক ওপেন সোর্স ডেভেলপার বব জেকবসনের - ইনি একটি মডেল ট্রেন কনট্রোলের সফটওয়্যার তৈরী করে ওপেন সোর্স হিসেবে সোর্সফোর্জে রেখেছিলেন। এক কোম্পানি তাঁকে দুই লাখ ডলারের একটি বিল পাঠিয়েছে, সোর্সফোর্জ থেকে ডাউনলোড হওয়া প্রতি কপি পিছু ১৯ ডলারের হিসেবে। এক্ষেত্রেও মডেল ট্রেনের সফটওয়্যার নিয়ে কাজ সেই ১৯৬০-এ এমআইটির রেলরোড ক্লাবের সময় থেকে শুরু। কিন্তু জেকবসন দেউলিয়া হতেই পারেন - একটা পেটেন্ট রক্ষার খরচ একজন ওপেন সোর্স ডেভেলপারের চেয়ে ঢের বেশি। ওপেন সোর্স সিস্টেমের ক্ষেত্রে ঝুঁকি বেশি - যেহেতু ওপেন সোর্স তৈরী হয় অনেক সাধারণ মানুষের কাজের মাধ্যমে - যাদের পিছনে দাঁড়ানোর মতন কেউ নেই। অল্প পরিমাণের রয়্যালটিও ওপেন সোর্সের সামনে বড় বাধা তৈরী করতে পারে। পেটেন্টের আইনী চোখ রাঙানো দিয়ে ওপেন সোর্সের দুনিয়ায় একটা ভয়ের পরিবেশ তৈরী করা হয় - যার তুলনা একমাত্র করা যায় স্বৈরতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থাগুলোর সাথে। ব্রুস পেরেনস লিনাক্সওয়ার্ল্ডে লিখেছিলেন - " as Linux and open source software gain new capabilities that infringe on current patents, patent-holders will gain the power to hold (open source) systems back---potentially up to 20 years behind proprietary software. '

পেটেন্টপন্থীদের দাবি পেটেন্ট ছোট কোম্পানিগুলোর পক্ষে উপকারী, কারণ তারা তাদের আইডিয়াগুলোকে রক্ষা করতে পারে। উল্টোদিকটা এঁরা (পেটেন্টপন্থীরা) কখনো দেখান না - যে অন্য বড় কোম্পানিগুলো সেই আইডিয়ার ব্যবহার বন্ধ করে দিতে পারে পেটেন্ট নিয়ে - যেমন জিফ ফরম্যাটের ছবির ক্ষেত্রে যে লসলেস ইমেজ কমপ্রেসন অ্যালগরিদম ব্যবহার করা হয়, তার সমস্ত রয়্যালটি দিতে হয় ইউনিসিসকে - যদিও এই অ্যালগরিদম তৈরীর ক্ষেত্রে ইউনিসিসের বিন্দুমাত্র অবদান নেই। "Normally, the largest companies own most of the patents, and use them to force other companies, both large and small, to cross-license with them" (২) - বড় কোম্পনিগুলো আরো শক্তিশালী হয়, বড় মাছ ছোট মাছকে খেয়ে ফেলে। ওপেন সোর্সের বন্ধু হিসেবে পরিচিত বেশ কিছু বড় কোম্পানিও সফটওয়্যার পেটেন্টের সমর্থনে দাঁড়িয়ে গেছে - ওপেন সোর্সের "ডিসরাপ্টিভ টেকনোলজি'-কে আটকানোর জন্যে - চিরাচরিত " big company vs. little guy fight ' - ব্রুস পেরেনসের কথায় - " Despite the fact that the "little guy" represents most of the economy and the main sources of innovation, the big companies have the political connections and thousands of full-time lobbyists, and they are winning. (১)'

শেষ করি পেরেনসের একটা লেখা থেকে একটু অংশ তুলে দিয়ে (১) -

" Over the past decade, Open Source has shown itself to be a better paradigm for supporting software innovation than a software patenting system ever could be. Open Source developers share both principles and the actual implementation, and allow anyone to build upon their work. The Linux kernel development, just a single example of Open Source success at innovation, has been the fastest and most broad-ranging of any operating system project ever attempted, and has achieved many capabilities that are unmatched by proprietary operating systems.
But we should not be confident that we will continue to have the right to use and develop Open Source software. A coordinated patent attack by a few companies, or even one large company, could completely destroy Open Source in the United States and cripple it in other nations. Funds and patent portfolios that have been established to help defend Open Source would not be sufficient to defend it. Only legislative changes to the patent system can fully protect Open Source and maintain it as a viable source of innovation for our future. '

উৎসাহী পাঠক সফটওয়্যার পেটেন্ট বিরোধী এই সাইটটা দেখতে পারেন আরো বিশদে জানার জন্যে - নোসফটওয়্যারপেটেন্টস ডট কম

তথ্যসুত্র

(1) The Monster Arrives: Software Patent Lawsuits Against Open Source Developers
(2) Irlam, Gordon and Ross Williams. ``Software Patents: An Industry at Risk.'' 4 May 1994. The League for Programming Freedom. 26 Apr. 1999 http://lpf.ai.mit.edu/Patents/industry-at-risk.html