আপনার মতামত         


কৃষ্ণপক্ষ
মিঠুন ভৌমিক



ডাইনিং টেবিলে একটা মাছি লেপ্টে আছে। আধঘন্টা আগে ওখানে আমার চায়ের কাপটা ছিলো। মাছিটাও ছিলো বোধহয় একই জায়গায়। এখন কাপ নেই, মাছির মৃতদেহ পড়ে আছে। আমি তখনও এই চেয়ারটাতেই ছিলাম, এখনও আছি। সেই থেকে ঠায় তাকিয়ে আছি মরা মাছিটার দিকে। কাজ না থাকলে যা হয় আর কি! হাতে সত্যিকারের কাজ না থাকলে একসঙ্গে অনেক কিছু করা যায়।
ফুরিয়ে আসা টম্যাটো সসের বোতলের ভেতরকার চালচিত্রটা লক্ষ করা যায়, কার্পেটের কোথায় কোথায় কালো ছোপ পড়লো খুঁজে নেওয়া যায়। আর এইসবই করা যায় চেয়ার থেকে একবিন্দু না সরেই। আবার, সিলিং এর দিকে তাকিয়ে বুঝে নেওয়া যায় কোথায় কোন মহাদেশ জল ঠেলে উঠে দাঁড়ালো, কোথায়ই বা জল সরে গিয়ে গুহাকন্দর বেরিয়ে পড়েছে। তার জন্য তো নড়তেও হয় না। বিছানায় চিৎ হয়ে শুয়ে মায়াহীন চোখে তাকিয়ে থাকলেই চলে।

এখন গভীর রাত। নিকষ গাঢ় অন্ধকারে ঢেকে আছে সবকিছু। এমনকি আকাশও, যেখানে নাকি আলোকিত উৎসসমূহের বাস। বাইরে শুকনো পাতা জমে স্তুপ, তার ফাঁকে সরীসৃপ নড়েচড়ে বেড়াচ্ছে মনে হলো। প্রতি মুহুর্তে ভয়, প্রতি পদক্ষেপে জাল গুটিয়ে আসার ইঙ্গিত নিয়ে পথ চলতে হয়, এই সময়টা এরকমই। তবে এমন মিঠে অন্ধকারে পথ চলা খুব আরামের। চারিদিকে ঝুপসি মতন হয়ে আছে, দূরে দূরে একেকটা আলো, যেরকম আলো অন্ধকারকে চতুর্গুণ করে তোলে সেইরকম। সেই আলো আধাঁরিতে গা ডুবিয়ে হাঁটতে থাকা। আচমকা জেগে উঠে বলি, ""ওহে পথিক, তুমি ক্লান্ত হও না""? উত্তর নেই। চোখের পাতায় ঘুম নেমেছে। রাত নেমেছে।

রাতের দিকে আজকাল আর ঘুম আসে না। চোখ বন্ধ করলেই বুবানকে দেখি। মুখ আধখোলা, বুক হাপরের মত উঠছে নামছে, শরীরটা মাঝে মাঝেই দুমড়ে মুচড়ে কুন্ডলী পাকিয়ে যাচ্ছে .....।
নাহ, এসব আমি দেখিনি। বানিয়ে বললাম। বুবান আইসিইউ তে ছিলো। পাড়ার বারোয়ারি কলতলায় জল খেতে গিয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে ছিলো বুবান। ওর শরীরে তখন বত্রিশটা ট্যাবলেট খেলে বেড়াচ্ছে। তখন রাত সাড়ে নটা।

এইরকম এক রাতেই সেন্টুদা ছাদ থেকে পড়ে যায়। ওকে কোনদিন জিগ্যেস করা হয়নি, কেন এত নাম থাকতে ওর নাম সেন্টু। সেন্টু সাঁপুই। বজবজ থেকে জোগাড়ের কাজ করতে এসে থেকে গিয়েছিলো এখানেই। শহরে তখন বহুতলের মাস্তানি। সেন্টুদা স্বপ্ন দেখতো একদিন ফ্ল্যাটের কেয়ারটেকার হবে। প্রায় হয়েও গিয়েছিলো। কিন্তু তপনবাবুর মেয়ের বিয়ের দিন শেষরাতে ছাদের আলসে ভেঙ্গে পড়ে গেল। পুলিশ এসে লাশটা নিয়ে গেল পরের দিন। কোনো ডায়রি হয়নি। রক্ত যা একটু আধটু এদিকে ওদিকে লেগেছিলো, ততক্ষণে সেসব উধাও। ভয় আর মাছি, এদের তাড়ালেও যায় না। তাই মাছিটাকে মরে যেতে দেখে অবাক হই নি। এরা সব রক্তবীজের বংশ, ফিরে ফিরে আসে।

তবে সবার স্বপ্ন যে সত্যি হয়না , তা নয়। গুরুপদর ভাগ্যটা ভালো-ই ছিলো। নামী চিত্রতারকার গাড়ি ধুতে ধুতে একদিন স্টিয়ারিং এ বসার সুযোগ পেয়ে গেছিলো। এখন সে বাঁধা মাইনের ড্রাইভার। আজকাল পার্টিরা মোবাইলে কখনও সখনও গুরুপদকেই ধরে। একসময় সে স্বপ্নের পেছনে ধাওয়া করতো। আর এখন, স্বপ্নরা ওর নাগাল পায় না। যেদিন প্রথম গাড়ি চালিয়ে মালকিনকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলো গুরুপদ, সেদিন ছিলো শুক্রবার। আজকের মতই সেদিনও মেঘলা ছিলো। আকাশ মেঘলা থাকলে রাত জলদি নেমে আসে। রাত বিরেতে মালকিনকে কাঙ্খিত গন্তব্যে পৌঁছে দিয়ে কপাল ফিরিয়ে নিয়েছিলো গুরুপদ।

শুভজিতকে সবাই শুভ বলত না। ওদের পাড়ায় দুটো শুভ ছিলো। শুভংকর আর শুভজিত। তাই কেউ কেউ শুভজিতকে শুভান ডাকতো। একদিন সকালে শুভজিত বেরিয়ে আর ফিরলো না। সাইকেলটা অঙ্ক স্যারের বাড়িতে পার্ক করে দিয়ে সে হারিয়ে গেল। সেদিনও এমনই রাত করে টেলিফোন বাজছিলো ঘরে ঘরে। অবশ্য সেদিনটা এমন মেঘলা ছিলোনা। সেদিন সকাল থেকে রোদ ঝলমলে দিন ছিলো। রোদ মুছে দিন নিভে গেলে দেখা গেল সব পাখী ঘরে ফেরেনি। কিছু পাখী তারা ছুঁতে চায়। কিছু পাখী তারা হয়ে যায়।

বিশ্বজিৎ পাখিরা কে দূর থেকে দেখলেই ছেলেরা চড়াই পাখীর ডাক শুরু করতো। কেউ বা অশ্লীল অঙ্গভঙ্গী করে বাকিদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতো, যাতে বিশ্বজিৎ পড়াতে না পারেন। বিশ্বজিৎ পৃথিবী জয় করেও তোত্‌লামির কাছে হেরে গেলেন। সাহেবদের গল্ফ খেলার সবুজ ঢেউ খেলানো মাঠের ধারের সারি সারি গাছের একটায় বিশ্বজিৎ ""চড়াই"" পাখিরার মৃতদেহ ঝুলছিলো। গলায় ফাঁস দেওয়া ছিলো, পরনে সবুজ ফুলশার্ট আর নস্যি রং এর প্যান্ট। কাগজে সামনের পাতায় খবর হয়েছিলো, তবে তদন্তে জানা যায়নি খুন না আত্মহত্যা। সেদিন রাতে পাশের বাড়ির মনা জানলা দিয়ে গল্ফ ক্লাবে অদ্ভুৎ আলোর খেলা দেখেছিলো। সেই থেকে সারা বিকেল সে খালি হাঁটতো আর বিড়বিড় করে কিসব বলতো নিজের মনে। খেলার মাঠের পাশ দিয়ে, ভাঙা মন্দির পেরিয়ে, যে রাস্তাটা দু এক টুকরো শাখা এদিক সেদিক ছড়িয়ে আবার ফিরে এসে ঘাড় গুঁজেছে নিজের ছায়ায়, সেখান দিয়ে একলা হেঁটে যেত এক সদ্য কিশোর, তার অস্থির পদক্ষেপ আমাদের তাড়া করে ফিরতো সর্বক্ষণ।

এসবই ঘনঘোর গভীর রাতের কথা ছিলো। এসমস্তই অনেক পরের কথা। রাত বাড়ার আগে, সন্ধ্যের মুখে একদিন পল্লবের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়েছিলো অনি। সেটা ছিলো সরস্বতী পুজোর তিনদিন পরের কথা। পল্লবদের বাড়ির ছাদের পাশে একটা নারকেল গাছ ছিলো। সেই সন্ধ্যেটা বড়ো চমৎকার ছিলো। হাওয়ায় একটু আধটু হিমেল ভাব, একটা দুটো করে আলো জ্বলে উঠছে সামনের চওড়া রাস্তায়। অনির গাল বেয়ে অতি ধীরে, প্রায় অলক্ষ্যে, নেমে আসছিলো একে একে আলোকণা। শেষ হ্যালোজেনটা তখনও জ্বলেনি বলে পল্লব দেখতে পায়নি কিছু। পরে, রাত গভীর হলে, আলোরা আবার ঘরে ফিরেছিলো, তবে সে অন্য গল্প, সেসব গভীর রাতের কথা।

এইভাবে এক রাত্রি থেকে অন্য রাত্রি, নিরন্তর পথ চলা। সূর্য্য পাটে বসে, বাকিরা কাজে। একটা দ্বিঘাত সমীকরণ সমাধান করা হতে না হতেই, এরিয়া আন্ডার দ্য কার্ভ এসে পাশে দাঁড়ায়। হে পথিক, রাস্তাটা আরেকটু বাঁকাচোরা করে নাও। জমিতে আরো গত্তি লাগুক।
অতএব, জমির আলপথ ধরে হাঁটতে থাকি। ঝকঝকে রোদে ভেসে যাচ্ছে চারপাশ। কোনো কোনো মাঠ গাঢ় সবুজ, কোনোটা হলদেটে। তার মধ্যে দিয়ে ফাঁক ফোকর খুঁজে চলে গেছে পথ। আর খানিক পরেই বাইরের আলো কমবে। ঘরে ঘরে শুরু হবে আলোক অর্চনা। সন্ধ্যার শিরশিরে হাওয়ায় ধুলোমাখা চুল উড়িয়ে ফিরবে অশ্বারোহী। সূর্য্য এখন শান্ত, ভোরের প্রতীক্ষায়।

************


তারপর এলো অন্য এক রাত্রি। অন্ধকার যখন ঘোলাটে, আকাশ যখন বর্ণহীন,কখনও বা আশ্‌চর্য ফ্যাকাসে। রাত অবশ্য গভীরই ছিলো। নস্করপাড়ার মোড়ে অমূল্যদের দল রাতপাহাড়ার টহলে ব্যস্ত ছিলো। অন্য এলাকায় কাজ সেরে ফেরার পথে ভীষ্ম আর তার দুই সহচর হঠাৎ সামনে পড়ে যায় ওদের। ন্যাতানো বোমা আর শস্তা ওয়ান শটার কাজ করেনি। প্রায় শ'দুয়েক লোক জড়ো হয়ে যায় কয়েক মিনিটেই। বহুদিনের অত্যাচারের বদলা। ব্যাঙ্ক ম্যানেজার দেবাশীষ, সদ্য গ্র্যাজুয়েট প্রমিত আর নি:স্বার্থ সমাজসেবী বনবিহারী মিলে ওদের চোখগুলো তুলে নিয়েছিলেন। অবশ্য ভীষ্মর বাঁ হাটুর মালাইচাকি ঘুরিয়ে দিলো কে, এইটা পুলিশ অনেক জেরা করেও বের করতে পারেনি। তখন সদ্য সরকারী আপিসে চাকরি পেয়েছিলো অভিজিৎ। তার বাড়িতে আর কেউ চাকরি করেনা।

সদ্য পাওয়া চাকরিটা নিয়ে অবশ্য অরিন্দমের অনেক আপত্তি ছিলো। অথচ এইরকম একটা চাকরি পাওয়ার জন্যই সবাই বাক্সে ঢুকতে চায়। লাল-নীল-হলুদ-নানারং এর বাক্সেরা দেওয়াল থেকে অপলক তাকিয়ে থাকে। দিন যায়। একদিন বাক্সবাছাই করে সবাই যে যার সীমানায় ঢুকে পড়ে। বাক্সের গায়ে আল্পনা, বাক্সের বাইরে দামী আচ্ছাদন। অরিন্দমের বাক্সটা রীতিমত দামী ছিলো। কত বাবা-মায়েরা ওকে দেখিয়ে দেখিয়ে বলতো, ঐরকম হতে হবে। কতজন ওর মত হয়েছে কে জানে, তবে অনেকে ওকে ছাড়িয়ে গিয়েছিলো। ময়ূখ ইতিহাসেও একশোয় একশো পেয়েছিলো। আরো কে কে যেন ... অন্ধকারে মনে পড়েনা। তবে অন্ধকার না হলেও ময়ূখরা ঝোপের আড়ালে সিরিঞ্জ নিয়ে বসে যেতো। জায়গাটা পার্কের একপাশে, ক্রিকেট ক্যাম্পের সাজসরঞ্জাম রাখার ঘরের পেছনে। অরিন্দমের খবর তখন কেউ রাখতো না বোধহয় আর। রাত বাড়লে কারুর হুঁশ থাকেনা।

সাদা পালতোলা নৌকো ভেসে আসে। অন্ধকার, তাও সাদা বলে দেখা যায়। কেমন যেন আবছা ভাব, আছে কিনা বোঝার আগেই এসে পড়ে সে। নদীর ধারে বুনোফুলের ঝোপ থাকার কথা ছিলো, ঘাটে নৌকা বাঁধার দড়িও নেই, আসলে অন্ধকারে ঠাহর হয় না, আছে না নেই। হয়ত সবই আছে নিজের মত করে। রাত আরো একটু বাড়লে কুয়াশা নামবে। সৌভিকের ঠাকুমা মারা যাওয়ার আগেরদিনও বড়োছেলের কাছে ধমক খেয়ে এই ঘাটে এসে বসেছিলেন। তখনও অবশ্য সন্ধ্যে। আরো কদিন পরে এই ঘাটেই বাজার সেরে এসে উঠবেন সমরেন্দ্র বসাক, সেদিন তাঁর ছেলে অমরের বিয়ে। ঘাট পুরোনো হয়, নহবতকে নকল করে ঝুটো সানাই বাজতে থাকে একটানা একঘেয়ে সুরে। ঘাটের ফাটলে তখন কীটেরা বাসা বেঁধেছে। কুয়াশা নামলে অবশ্য দুহাত দূরের জিনিসও দেখা যায় না। তখন ফাটল থাক আর যাক, কে ভাবতে যাচ্ছে? রাতের পরতে পরতে কুয়াশা নামে, সাবধানে।


বুবানের কথায় ফিরে আসি। বুবান চার-পাঁচজনকে কাটিয়ে গোল দিতে পারতো। আদরের ডাকনাম, ""আর্মান্দো""। ঝরঝর করে ইংরেজী বলতে বলতে টাই খুলতো বুবান, স্কুল থেকে ফেরার পথে। আরো কত কি করতো সে, ক্যাপ্টেন বুবান। কেউ মারা গেলে পাড়া হঠাৎ চুপচাপ হয়ে যায়। বুবানের দাদু মারা যাওয়ার দিন পূর্ণিমা ছিলো। ফিনিক ফোটা জোছনায় সব দেখা যাচ্ছিলো, কালো রং এর কাচঢাকা গাড়ি, গম্ভীর মুখের আত্মীয়স্বজন, স-ব। বুবানের পকেটে রাঙতামোড়া কিসব ছিলো, ঠিক বুঝিনি। নাহ, মিথ্যে কথা। ও-ই দেখাতে চাইছিলো, দেখতে চাইনি আমরাই। এত অন্ধকারে দেখা যায়?

প্রসূন যেদিন মৌমিতাকে শুভময়দের ছাদে হঠাৎ দেখে ফেললো, সেদিন অনেকক্ষণ টানা লোডশেডিং ছিলো ওদের পাড়ায়। নিচে পৃথিবীর বুকে অন্ধকার দলা পাকিয়ে উঠলেও আকাশ হাসছিলো তারাদের সাথে। এমন সুযোগ ওদের আসে না। আজকাল কারেন্ট প্রায় যায়ই না এই শহরে। এখন এখানে অদ্ভুত আঁধার ঘনায় না । আঁধার নামে ধীরে, মনের অগোচরে।

কার থেকে জেনে বুবান পাঁউরুটিতে আয়োডেক্স লাগিয়ে খেতে শুরু করেছিলো সে এক রহস্য। তবে তখন শহর আরো ঘিঞ্জি হয়েছে, বাস-ট্রাম-ট্রেন মিলিয়েও সময়মত কোথাও পৌঁছনো যাচ্ছে না। সব্বাই দৌড়ে দৌড়ে বাসে উঠে, একলাফে বাস থেকে নেমে, একছুটে এখানে সেখানে ঢুকে পড়ছে। ততদিনে বাক্সগুলো সব সাইনবোর্ড হয়ে নিয়ন আলোয় জ্বলছে পাড়ার মোড়ে। সে এক দুর্দান্ত সাফল্যের কাহিনি। আর, কে না জানে, নিয়নের আলো রাতেই বেশি খোলতাই হয়? নিয়নের আলোয় লেখা হল নতুন নাম, ""পাতা-বুবান""। আহা, বড়ো চমৎকার নাম ছিলো!

তারপর, যেমন হয়, পুজো এসে গেল। চারিদিকে আলো থই থই, ঘামে মিশছে পারফিউম, রক্তে নেশার ছোঁয়া। উৎসবের নেশা। নবমীর ভোগ রান্না হওয়ার সময় হাঁড়িতে একটা কাক পড়লো। পাগলাটে বুলু ছিলো, তাই কাক ছাড়া আর কিছু ফেলা যায় নি। সম্পাদক সৌগতবাবু নিজে দাঁড়িয়ে থেকে বুলুকে খাওয়ালেন, টাকাও দিলেন। অন্ধকারে কাজে লাগবে সে টাকা। অন্ধকার কাছেই থাবা গেড়ে বসেছিলো। পায়ে পায়ে এগিয়ে এলো সে। শুধু বিসর্জনের দিন মন্টুর মেয়েটা বড্ড কাঁদছিলো। পেশাদার কশাই মন্টু লক্ষ্মী-সরস্বতীকে আগলে রাখতে গিয়ে কিভাবে যেন লরি থেকে পড়ে গেছিলো। শহরের রাস্তায় প্রচুর ক্ষত। ঠিক যেমন চাঁদের গায়ে আছে, সেইরকম। রাত বাড়লে চোখে ঘোর লেগে যায়। তখন চেনা রাস্তাও অচেনা লাগে।

বুবানের ব্যাপারে থানা-পুলিশ হয়েছিলো অনেক। আমরা কিছু জানতেই পারিনি। আবার ভুল। আসলে, জানতে চাইনি। জানলার গ্রিলের ফাঁকে আঙুলগুলো ঢুকিয়ে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকতো
বুবান, ব্যস্তভাবে হেঁটে গেছি পাশের রাস্তা দিয়ে। বুবান দাঁড়িয়েই থাকে, বিস্ময়ে আধখোলা মুখ, চোখে শূন্যতা।

*********



এর মাঝেই আলোছায়ার খেলা চলে। একসময় তো আলো-ই ছিলো চারদিকে, তখন কেউ অন্ধকারের কথা ভাবেনি। অথচ, প্রতিদিন বিদ্যুৎ বিভ্রাটে আলো নিভে যেতো আশিষ রায়ের বাড়িতে। আরো পাঁচজনের মতই অভ্রও বেরিয়ে পড়তো, বাইরে তখন খুশির ফোয়ারা। ছোটো ছোটো দল বেঁধে ওরা ঘুরে বেড়াতো পাড়ার অলিগলিতে, নির্বিকল্প আড্ডা দিতে দিতে কখন কেটে যেত সন্ধ্যে, পড়ার সময়টাও। সিইএসসির সাথে ওদের ষড়যন্ত্র ছিলো, পড়ার সময় পেরিয়ে গেলেই আলো জ্বলে উঠতে দেরী হতো না, চোখগুলো সেঁটে যেতো টিভির পর্দায়। অন্ধকারের এত আয়োজনেও আলোর নিবিড় হাতছানি টের পাওয়া যেত, এ সেই সময় যখন আলো সরলরেখায় চলতো, জাদুকাচে ফেলে তাকে কেউ বাঁকাপথে চালায় নি।


ফি বছর শীতে মাঠে আসতেন রিচার্ড, সবাই বলতো রিচিখুড়ো। খেলার মাঠে ঘুরে ঘুরে সবাইকে জড়ো করে রঙচঙে ছবিওয়ালা বাইবেল দিয়ে যেতেন। আর আসতো এক অদ্ভুৎ পোষাকের জাদুকর। মাথায় গোলমতো টুপি আর ঝলমলে জোব্বাপরা একজন, সাথে জনা দুই অল্পবয়সী সাগরেদ। একটা সাদা চাদরচাপা দিয়ে জলজ্যান্ত মানুষ ভ্যানিশ করে দিতো, কখনও বা তুলে দিতো শূন্যে। আমরা ভয়ে ভয়ে দূর থেকে দেখতাম। তখনও আমাদের ম্যাজিকে অগাধ বিশ্বাস ছিলো। তখনও অতিবৃদ্ধ সাদাচুল এক বুড়োর কাছে জাদু শেখার স্বপ্ন দেখতো কেউ কেউ। অন্যেরা দিনরাত ব্যায়াম আর খেলাধুলো করতে চাইতো,ওরা জানতো, শুধু জাদুবিদ্যায় সব সমস্যার সমাধান হয় না।

দেবব্রত সেন পুজোর নাটকের অভিনেতা বাছাই করতে গিয়ে প্রতি বছর সমস্যায় পড়তেন। অনেকেই অভিনয় করতে চাইতো না, অনেকে আবার ভাবতো সময়ের অপচয়। শেষমেষ বুবানকে কৃষ্ণের রোল দেওয়া হলো। ভারি চমৎকার মানিয়েছিলো, স্বীকার করতেই হবে। তবে তাত্ত্বিকেরা নাক কুঁচকে বললেন, "" একি! কৃষ্ণ এত ফর্সা?"" অভিনয় ভালো হওয়ার পরে অবশ্য খুব একটা আপত্তি ওঠেনি। সেই বছর পুজোর পর থেকে বুবান কষ্ণ আর বাবু ভীম হয়ে গেল। ভীমের সদ্য পরিচিতা বান্ধবীকে অদ্ভুৎ সব নামে ডাকা হতে লাগলো, সবাই তখন ধীরে ধীরে বড়ো হয়ে উঠছে। কেউ জানতো না সামনে অন্ধকার হাঁ করে আছে। কেউ জানতে চায়নি। অন্ধকারের পাশেই আলোকিত বাক্সসমূহ রাখা ছিলো। একদল দূরপাল্লার পাখি উড়ে যেতে যেতে পেতে রাখা ফাঁদে ধরা পড়ে গেল। ওদের সাথে মেঠো ইঁদুরের পরিচয় ছিলো না। কেউ জাল কেটে দিলোনা যত্ন করে, ওদের পায়ে ধীরে ধীরে ফাঁস দৃঢ় হতে লাগলো, দূরে পাহাড়ের গুহায় ব্যাধ দিবানিদ্রায় ব্যস্ত ছিলেন। সূর্যাস্তের পরে এসে পেলেন অঢেল রসদ। সামনে তখন তাঁর অনেক যুদ্ধ বাকি ছিলো, সামনে তখন অনেক তপস্যা। ঈশ্বর সায় দিলেন,তাঁর আশ্বাসে ছায়া নামলো বনে। অস্ত্রের শব্দ হলো না, চাঁদের আলো ঠিকরালো না। অস্ত্রে কালো রং করা ছিলো।

অনির বাড়িতে ফিরতে রাত হলেও চিন্তা করতো না কেউ। ওদের বাড়িতে সবাই গভীর রাত অবধি জেগে থাকতো। কেউ বই পড়তো, কেউ ছোটোপর্দায় সেঁটে, কেউবা গল্পগাছা করতো রোয়াকে বসে। রাত বারোটা বেজে যেত খাওয়া সারতে, তারপর আবার গল্প। অমাবশ্যাগুলো টেরই পাওয়া যেত না, মনে হতো চারদিকে কত আলো। আসলে সে চাঁদের আলো না, হাসি আর গানেরা আলোকণা হয়ে আসতো। তখন বৃষ্টি নামতো না। তখন জলবিন্দু শিশির হয়ে জমে থাকতে চাইতো। সেই জল ছিলো অন্যরকম, সে জলে নুনের স্বাদ ছিলোনা।

তখনো কিন্তু ঘুম ভেঙ্গে যেত প্রায়ই। গভীর রাতে ঘুম ভাঙ্গলে অবশ্য বুবানকে দেখতাম না। জানলার বাইরে একরাশ তারা হাঁটু গেড়ে প্রার্থনারত, শিউলিরা নেমে পড়েছে বাগানে, সে বড়ো সুখের সময়। আর কিছুক্ষণ পরেই আজানের শব্দ আসবে ভেসে, সেই ভরসায় জোর করে জেগে থাকা। বুবানের কথাও ভাবতাম। আর কিছুক্ষণ পরেই কাক ডাকবে, সাইকেলটা কথা বলে উঠবে কোথাও, শিশিরভেজা মাঠ ডাকবে আমাদের।

হ্যাঁ, এরকমও তো হয়। আলোর বন্যায় ভেসে যাচ্ছে চরাচর, নীল আকাশে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে একটা আলোকস্তম্ভ। এত আলো চারিদিকে, যে রাতেও ওর দিকে ভুলেও তাকায় না কেউ। দিক চিনে জাহাজেরা বন্দরে থামে, সব কাজ মিটে গেলে ভেসে পড়ে জলে। আলোটা অপেক্ষায় থেকে থেকে ঘুমিয়ে পড়ে একদিন। পরে যখন সত্যিই অন্ধকার, আলো দেখানোর কেউ নেই। কে ডেকে দেবে ওকে? অন্ধকারে হাতড়ে হাতড়ে খুঁজতে থাকি আলোঘরের সিঁড়ি। যত ভালো করে খুঁজি, ততই আরো দূরে সরে সরে যায় কি সে? অন্ধকারে সমুদ্রের জল তোলপাড় হয়ে ওঠে, ফসফরাসের দীপ্তি হিংস্র হয়। ধীরে ধীরে এগিয়ে যাই অন্যরকম সে আলোর দিকে। ওর পেছনে রাখা অন্ধকার এসে হাত ধরতেই ঘুম ছুটে যায়। বুবান কই? আজানের শব্দটা এখনও শোনা যায় না কেন? উৎকণ্ঠা নিয়ে স্তব্ধ হয়ে বসে থাকি। অপেক্ষা, এখন শুধুই অপেক্ষা।



ভোর হওয়ার অবশ্য অনেক দেরী ছিলো। সন্ধ্যের শাঁখের আওয়াজ কমে এলে, বাগানের আনাচে কানাচে অন্ধকার গাঢ়তর হলে, প্রভাবতী আঁচলের নিচে কিসব জানি নিয়ে ভয়ে ভয়ে খিড়কির দোর খুলে বেরিয়ে পড়তেন। ঝিঁঝিঁর ডাকে পুকুরপারে কান পাতা দায়, হাওয়ায় ধুলোর আভাস, একে একে দত্তদের বাগান, শিবমন্দির আর চৌধুরিদের পোড়ো বাড়িটা পেরিয়ে এসে যেতো একটা খড়ের ছাউনি। পর্ণকুটীরের সামনে অফুরান রত্নভান্ডার নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতো রথ। সারথির দীনবেশ, মুখে স্মিতহাসি। কে ভিক্ষুক, বোঝা যায় না। রথস্থ অশ্ব বড়ো দুরন্ত, তাদের খুরে আকাশে মেঘ করে আসে। পরে যখন সুপারি গাছের মাথায় চাঁদ নেমে আসে, তখনও সে মেঘ কাটে না। এই মেঘ, এই অন্ধকারে ঘেরা অস্ফুট সময়, এসবই সন্ধ্যেরাতের কথা।

রাত বারোটার আগে রমেশবাবু বাড়ি ফিরতে পারেন না কোনোদিনই। আপিস থেকে বেরিয়ে তিনটে টিউশানি সেরে বাড়ি ফিরতে হয়। চওড়া রাজপথ তখন আশ্চর্য নি:স্তব্ধ। উজ্জ্বল আলোয় দিগ্বিদিক ভেসে যাওয়া রাস্তা ধরে একা হাঁটতে থাকেন তিনি। এখানে অবশ্য রাত বোঝার উপায় নেই। তীব্র আলোয় চশমার কাচ ঝলসে ওঠে। মিনিট দুই-তিন পর পর একেকটা ট্রাক চলে যায়। এখানেও ধুলোর ঝড় ওড়ে, এখানে কোনো গাছ নেই কিনা, তাই খুব ধুলো হয়। পথ চলতে চলতে একঘেয়েমি কাটাতে নিজের মনেই বিড়বিড় করে অঙ্কের ফর্মুলা, উপপাদ্যর প্রমাণ বলতে থাকেন রমেশবাবু। কখনও বা প্রকৃতি বিজ্ঞানের কয়েকটা সূত্র মনে করিয়ে দেন অদৃশ্য কোনো পথচারীকে। অনেকটা পথ কেটে যায় বিষয় থেকে বিষয়ান্তরে যেতে যেতে। অবশ্য বড়ো রাস্তা ছেড়ে গলিতে ঢুকে এলে একপাল কুকুর সঙ্গ দেয় ওঁকে রোজ। সবকটাই চেনা কুকুর, ঐ পাড়াতেই বাস। বিশ্বস্ত কুকুরেরা অঙ্ক আর প্রকৃতিবিজ্ঞানের পাঠ নিতে নিতে ওঁকে ক্রমশই স্বর্গের দিকে এগিয়ে দেয়। অ্যাসবেস্টসের ছাউনি দেওয়া স্বর্গদ্বারে পায়ের শব্দ হলেই স্টিলের বাসনের ঝনঝনি বাজতে থাকে। আরো একদিনের যুদ্ধ শেষ হয়। রণাঙ্গণে মশালের আলো ছুটে বেড়ায়, প্রিয়জনের মৃতদেহ কাঁধে কেউ, কেউ নিজেই নিজের শুশ্রূষায় ব্যস্ত। এখন গভীর রাত, এখন যুদ্ধবিরতি।

সন্ধ্যে থেকে কথা কাটাকাটি শুরু হয়ে অরিন্দম আর সুচরিতার ঝগড়ার তীব্রতা শীর্ষে পৌঁছলেই সবাই বুঝতে পারে, রাত হয়ে এলো। এরকমটা রোজই হয়। অভ্যেস হয়ে গেছে সবার। কোনোদিন ঝগড়ার শব্দ না পেলেই প্রতিবেশীরা ভাবনায় পড়ে যায়। যেদিন সুমন আর বাড়ি ফিরলো না, সেদিনও ঝগড়া হয় নি ওদের। একেবারে দিন তিনেক বাদে জিআরপির ফোন পেয়ে একটু চাঞ্চল্য জেগেছিলো। নির্বিঘ্ন দীঘির জলে একটুকরো পাথরের অভিঘাত। সে ঢেউ মিলিয়ে গেছে। এখন আবার সব আগের মতই, এখন সবাই আশ্বস্ত হয়ে কথাকাটাকাটি শোনে। শহর হলে কি হয়, এখানেও চাঁদ ওঠে। তবে, অরিন্দমের নতুন কেনা রূপালী গাড়ির বনেটে চাঁদের ছায়া পড়েনা। বাইরে ঝকঝকে রাত, গ্যারেজে একা জেগে থাকে গাড়িটা। তার শরীরে কোনো দাগ নেই। ভুল করে যুদ্ধবিরতিতে জন্ম হয়েছে যার, তাকে কি যোদ্ধৃবেশে মানায়?

এবং বুবান। এই রাতে তার গায়ে জ্বর। জ্বরের ঘোরে স্বপ্নের মত লাগে চারপাশ, ছায়া ছায়া পরিবেশে বালিশ আঁকড়ে জেগে থাকে সে। জানলার গ্রিলের ফাঁক গলে নেমে আসে তরল জ্যোৎস্না, কাঠের চেয়ারটা হিংস্র শ্বাপদের আকার নেয়। দেওয়ালে চাঁদের আলোয় ঝিলিমিলি লাগে। দূরে কোথাও, কোনো স্কুলে টিফিনের ঘন্টা পড়ে। একদল ছেলেমেয়ে উল্কাবেগে ছুটে আসে এক চিলতে উঠোনে। কাল থেকে তাদের গ্রীষ্মের ছুটি পড়বে। আজ তাই বাঁধনভাঙ্গা উচ্ছ্বাস। আজকে স্কুলের পরে ওদের দেখে চেনা যাবে না, কাদামাখা একদল ভুতূড়ে সেনার মত একছুটে ঝাঁপিয়ে পড়বে ওরা, গনগনে ছুটিরা ছায়া পেতে আছে। বুবানেরও ছুটি হয়। হাসপাতালের বন্ডে সই করে ওকে বাড়িতে নিয়ে আসেন কে যেন। বুবান এখন মাঝে মাঝেই কাউকে চিনতে পারে না। মাথার দুপাশে রগের কাছটাতে ব্যথা, উষ্ণ কপালে কার যেন ছোঁয়া পেতে ইচ্ছে করে, শীতটা চারপাশ থেকে ক্রমশই অজগরের মত জড়িয়ে ধরে, একটা ঝিমধরা ভাব ঘিরতে থাকে ওকে, আরো কি কি যেন হয়, সময় ছিলোনা বলে শোনা হয় নি। কালো জমাটবাঁধা রাত ক্রমশ তরল হয়ে এগিয়ে আসে, জ্যোৎস্নার শেষবিন্দুটুকু শুষে নিয়ে ঘেরাটোপ নামিয়ে দেয়। সেই কালো থকথকে চেতনাহীন অন্ধকারে আস্তে আস্তে ডুবে যায় বুবান।
শিবির ছেড়ে বেরিয়ে আসেন বিজয়ী বীর। সমবেত সেনাদের জয়ধ্বনিতে আকাশ মুখরিত হয়, সেনাপতি কিন্তু উদাসীন। আজ থেকে তাঁর অহর্নিশ পুত্রশোক। তবু যুদ্ধ হয়, পুরোহিত মন্ত্র পড়ে জয়তিলক এঁকে দেন, সারি সারি দলবদ্ধ প্রাণী ছুটে চলে সম্মুখসমরে।

এইসময়, স্বপ্ন দেখে আচমকাই জেগে উঠি। বাইরে তাকিয়ে বুঝতে পারিনা সময়। স্বপ্নের মুখগুলো ঘোরাফেরা করে চারিদিকে। কাউকে কাউকে চিনতেও পারি, পুরোনো বন্ধু সব। কেউবা নতুন। আমি এখনও অপলক, অর্থহীন দৃষ্টিতে দেখছি মাছিটাকে। একটাই মাছি। টেবিলের ঢাকনার ফুলে তার মৃতদেহ। ঝর্নারা শান্ত হয়েছে। আগের মত দুরন্ত তালে পাথরের খাঁজে খাঁজে ছুটে বেড়ায় না। তিরতিরে একটা ধারা বয়ে চলে, বড়ো চাপা, বড়ো শব্দহীন সে দিনযাপন। আকাশ তারাদের উপুর করেছে সমতলে। তবুও অন্ধকার। পাহাড়ে রাত নামলো, আজ চন্দ্রগ্রহণ।