আপনার মতামত         


এই চার্চ, এই শহর
পারমিতা দাস

এদেশে আসার পর চার্চের ভেতরে ঢোকা আমার এই দ্বিতীয়বার। প্রথমবার এসেছিলাম গ্র্যাডস্কুলের বন্ধু ডায়ানার বিয়ের অনুষ্ঠানে। এই শহরের একটি ক্যাথলিক চার্চের শান্ত ও সাদার সমারোহে বিয়ে হয়েছিল ওর। কনের সাদা ওয়েডিং ড্রেস, মাথায় সাদা ফুল, টেবিলে টেবিলে সাদা ফুলের বোকে, ব্রাইডমেডের মাথায় সাদা টিয়ারা - সাদার ঔজ্জ্বল্যে কেমন চোখ ধাঁধিয়ে গিয়েছিল সেদিন। ছোটবেলা থেকে সাদা রঙকে যে শান্তি, পবিত্রতা, স্নিগ্ধতা এটসেটরা এটসেটরার প্রতীক বলে জেনে এসেছি, সাহেবি বিয়ের এই অনুষ্ঠানে সেই সাদাকে লাগছিল ভয়ঙ্কর প্রাচুর্যমন্ডিত। মুক্তো আর হীরের ঝিলিকে সাদার রূপটাই পাল্টে গিয়েছিল।

ডাইগ্রেস করছি। মনটাকে জোর করে ফিরিয়ে আনি আজকের দিনে। এই দ্বিতীয়বার চার্চে ঢোকা আমার, এদেশে। সেদিন একরকম ছিল আর আজ একেবারে আলাদা। যেন কোন গ্রাফিক্স শিল্পী তার ছবিতে কালার স্কিম নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করছে সেইদিন আর আজকের মধ্যে।। কালো পোশাকে সারি সারি মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। রিয়ার পরিবার, প্রতিবেশী, সহকর্মীরা। এমন দিনে কালো পোশাক পরাই দস্তুর। লম্বা পুরো হাতা গাউনে রিয়ার আমেরিকান বস (মহিলা) ওপাশে দাঁড়িয়ে। রিয়ার ফিউনেরালের কাজ অনেকক্ষণ শুরু হয়ে গেছে। এই অবস্থাতেও আমার মনে একটা অকিঞ্চিৎকর কথা ভেসে চলে যায়, এদের সকলের ওয়ারড্রোবে কি সিচুয়েশন উপযোগী এমন পোশাক সর্বদাই সাজানো থাকে? আমি আজ ইচ্ছে করেই দেরী করে এসেছি। এইরকম পরিস্থিতিতে স্পিচ দেওয়া, শোকপ্রকাশ এমনকি সান্ত্বনা দেওয়ার মত সমাজিকতাও আমার জানা নেই। কথা বলা বাহুল্য মনে হয় আর চুপ করে থাকা মানে সংবেদনশীলতার অভাব। তা সত্বেও চুপ করেই থাকি, এ আমার খামতি জানি আমি।

ঢুকে দেখি, বুবানকে দিয়ে প্রাথনা করানো হচ্ছে। দু বছরের ছেলে। চুলোয় যাক এইসব অদ্ভূত স্যাডিস্ট নিয়মকানুন, অন্যদিকে তাকিয়ে থাকি, দুবছরের ছেলেটাকে এক পাশে খেলনা নিয়ে খেলতে দিলে এমন কি ক্ষতি হত। বাংলা সিনেমার সেই দৃশ্য মনে পড়ে যায়(যে সময় আমরা ডাইনিং টেবিলে খাবার সাজিয়ে ব্রেক নিতাম আর হাসতাম চরম মেলোড্রামা দেখে) - করুণ গান গেয়ে শিশু পুত্র বাবা বা মায়ের মুখে আগুন দিচ্ছে। আজ বুঝি, কোনো উচ্চ বা ওঁচা শিল্পই এই দৃশ্যের যন্ত্রণাকে ধরতে যথেষ্ট নয়। কোটের বোতাম আলগা করে দিই, এই নভেম্বরের সকালেও বেশ গরম লাগছে। রিয়ার স্বামী স্মরজিৎ ছেলের হাত ধরে আছে। মেয়ের শেষকৃত্যে যোগ দেবার জন্য দেশ থেকে আমেরিকায় উড়িয়ে আনা হয়েছে রিয়ার বাবা ও মাকে। রিয়ার মা চোখে রুমালচাপা দিয়ে বসে। আমি ঝট করে উঠে পড়ি। এখানে দাঁড়ানো যায় না। স্মরজিৎ বা রিয়ার বাবা-মার সঙ্গে একটিও বাক্যালাপ না করে হোটেলে রওনা দিই।

রিয়ার সঙ্গে গত দু বছর আমার কোন যোগাযোগ ছিল না। তার আগে পনেরো বছরের নিরবচ্ছিন্ন বন্ধুত্ব সত্বেও। স্কুলের শেষভাগ থেকে এঞ্জিনিয়ারিং কলেজ পর্যন্ত একসঙ্গে, কাছাকাছি সময়ে এই বিদেশে আসা, এমনকি চাকরিও হলো একই শহরে। কলেজের বন্ধুরা সমানেই আমার ও রিয়ার জোড় মেলাবার চেষ্টা করতো। কিন্তু এতোদিনের বন্ধুত্ব সত্বেও আমাদের দুজনের মধ্যে প্রেমিকপ্রেমিকাসুলভ কেমিস্ট্রির আঁচ কোনদিন লাগেনি। লাগবেও না, দুজনেই জানতাম কিভাবে যেন। চাকরিতে ঢুকেই রিয়া বিয়ে করে ফেলল স্মরজিৎকে। মেধাবী ছাত্র, জমাটি আড্ডায় দুজনেঅরই সমান উৎসাহ ও পারদর্শিতা। রিয়া আর স্মরজিৎ আমার ঠিক দুমাস পর বিদেশে পাড়ি দিয়েছিল। একই শহরে, তাই আমরা তিনজনেই খুব উৎফুল্ল ছিলাম। শুধু আমি আর রিয়াই নই, এই শহরে কলেজের আরো অনেক অ্যালামনাই ছিল। সবাই মিলে অবিরত ক্যাম্পিং, হাইকিং আর আড্ডা চলত। সংসারের সুগভীর চক্রব্যুহে কেউ ঢোকেনি তখনও, সবাই ফ্রি বার্ড।

রিয়া সেইসব জমায়েতে আমাদের অলিখিত দলনেত্রী ছিল। ওর হাতে পুরো প্ল্যানিং আর অর্গানাইজেশনের দায়িত্ব ছেড়ে দিয়ে আমরা মস্তি করতাম। রিয়া এসবে খুব দক্ষ ছিল আর করতে ভালোওবাসতো। ওই সব ঠিক করত। কোথায় যাব, কোথায় থাকব, কি কি সঙ্গে নিতে হবে, কি খাওয়া-দাওয়া-অ্যাকটিভিটি হবে। একবার তো, হা হা হা, ভাবলেই হাসি পয়, ফিফটিন সিটার ভাড়া করে নিজেই চালিয়ে নিয়ে চলে এল রাত বারোটায়, সারপ্রাইজ! তারপর অতো রাত্তিরে ফোন করে করে সবাইকে খবর দেওয়া যে পরদিন সকালে আমরা লেক স্প্যারোতে ডে ক্যাম্পে যাচ্ছি। সাতজন দামড়া ছেলে - কারো আপিশের ডেডলাইন, কারো শরীরখারাপ, কেউ সদ্য চাকরিতে ঢুকেছে - সবার সব অসুবিধা বা অজুহাত নদীস্রোতে কুটোর মত ভেসে গেল রিয়ার ঠেলায়। যাওয়ার পর অবশ্য কেউ হাত কামড়ায় নি, চমৎকার ট্রিপ হয়েছিল সেটা। প্রতিবারই হত। ফেরার পথে সবাই তাই রিয়ার নমে থ্রি চিয়ার্স - মুচকি হাসি এসে পড়ে ঠোঁটের কোণে, এখনকর পরিস্থিতি ভুলে যাই।

সব মনে আছে রে রিয়া!

কাল বিকেলে এসে পৌঁছোনোর পর সেই ভয়ংকর হাইওয়ে ধরে আসছিলাম। যে হাইওয়েতে এক বীভৎস কার ক্র্যাশে রিয়া মারা গেছে। ওদের বাড়ির কাছের একজিটটার ঠিক আগে শোল্ডারে সাদা গোলাপ। কালও ছিল। একটু থমকে যাই। শোকপ্রকাশের, মনে রাখার এই রীতি এদেশে দেখেছি। দুর্ঘটনাস্থলে ফুল রেখে যাওয়া। কে রেখেছে? স্মরজিৎ? রিয়ার বন্ধুরা? রোজ রেখে যায় এইভাবে? শোল্ডারে গাড়ি দাঁড় করাই। একটা সিগারেট ধরাই। ওপাশে সিয়েরা মাউন্টেন। আমাদের সেই পুরোনো ট্রিপগুলোতে রিয়া এমনি করেই হঠাৎ করে ফিফটিন সিটার ভিড়িয়ে দিত শোল্ডারে। সবাইকে গাড়ি থেকে থেকে নামিয়ে প্রকৃতির সামনাসামনি দাঁড় করিয়ে দিত। ক্যামেরার ক্লিক বারণ। চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে আমাদেরও এক সময় সেই নিস্তব্ধতা ভালো লেগে যেত। কিছুক্ষণ পর ফ্লাস্ক থেকে বের করে রিয়া আমাদের দিত ধোঁয়া ওঠা গরম চা। ঠান্ডা গুঁড়িগুঁড়ি হিম ঝাপটা দিত মুখে। গ্লাভসগুলো খুলে ফেলে হাত দিয়ে ঠান্ডা ছুঁয়ে দেখতাম। .. সিগারেটটা শেষ হয়ে আসছে। গোলাপগুলো এই বিকেলেও ফ্রেশ। কাল এসে হয়তো আবার পাল্টে দিয়ে যাবে রিয়ার কোন প্রিয়জন। পরশু আবার অন্য কেউ। এমনি করে ওরা রিয়াকে মনে রাখবে।

দুবছর ধরে যে আমার রিয়ার সঙ্গে কোন যোগাযোগ নেই, সেটা আমার কছে খুব আশ্চর্যের। স্মরজিৎ-রিয়ার সঙ্গে আমার যে স্তরের ঘনিষ্ঠতা ছিল, তাতে করে খুব সিরিয়াস কিছু না ঘটলে বন্ধুত্ব হঠাৎ পিছিয়ে যেতে পারে না অতটা। কিন্তু গিয়েছিল, ঠিক আমার এ শহর ছেড়ে পড়ানোর কাজটা নিয়ে চলে যাবার আগে। আমি একটা খুব ভালো অফার পেয়েছিলাম ইউনিভারসিটি অফ মিনেসোটা থেকে। এখানকার বন্ধুরা হরিষে-বিষাদ সে খবর শুনে। তবে যুগটা প্রায়োরিটির - তাই খুশীমনেই বিদায় দিল সবাই। রিয়াই ডাকলো ফেয়ারওয়েল - খাদ্যমদ্য সহযোগে বন্ধুবর্গ সবাই হাজির ছিল। হাসি-ঠাট্টা-কৌতূকীর মাঝখানে হঠাৎ আমি এই শহরবাস সম্পর্কে, এদেশবাস সম্পর্কে কিছু নেগেটিভ কমেন্ট করে ফেললাম। কথায় কথা বাড়ে - পেটে দু পেগ পড়তেই শুধু হলো সেই চিরন্তন তর্কের বিষয়, ইমিগ্র্যান্টদের দেশে ও এদেশে টানাপোড়েনের বৃত্তান্ত। রিয়ার খুব প্রিয় টপিক ছিল এটা আর এই নিয়ে ও যা করত, আমার কাছে প্রায় দু:খবিলাসের মত মনে হত। সেই নিয়ে কিছু কটুক্তি করে ফেলেছিলাম। আর তারপর থেকেই সেভাবে যোগাযোগ রাখলো না রিয়া। আমিও যেন কাজের ব্যস্ততায় কবে ডুবে গেছি ইতিমধ্যে। বরং স্মরজিতের সঙ্গে সেলফোনে কথা হয়েছে বারকয়েক, স্মরজিৎ বিজনেস ট্রিপে ওখানে গেলে দেখাও হয়েছে। একসঙ্গে ডিনারে গেছি। কিন্তু রিয়া আস্তে আস্তে দূরে সরে গেছে আর আমিও জীবনের প্রায়োরিটি বুঝে বুঝে নিচ্ছি ক্রমশ:। খবর পেয়েছি রিয়া সেই উদ্যমেই মধ্যমণি হয়ে থাকছে উৎসবে, ব্যসনে এবং লং ড্রাইভে।

একমাত্র অধীর বাদে। পুরোনো বন্ধুদলের মধ্যে অধীরই বিয়ে করে এরপর প্রথম। ঘটনাটা শুনে মজাই পেয়েছিলাম। অধীরের বিয়ের পর কোন এক দলবদ্ধ ডিনারের ভেনু নিয়ে অধীরের স্ত্রী উর্বীএ সাথে রিয়ার মতান্তর হয়। রিয়া চায় নিজের বাড়িতে করতে, উর্বী কোন এক রেস্টোরেন্টে। রেস্টোরেন্টে যাওয়া যখন ঠিক, রিয়া অসুস্থ হয়ে পড়ে, ওর বাড়িতে সবাই আসে, খাওয়া দাওয়া ওখানেই সারা হয়। সব হয়ে-টয়ে যাওয়ার পর রিয়া হাসতে হাসতে বলে, কেমন দিলাম? গোল্ডেন বোল ভালো না আমার বাড়ির খাবার ভালো? আঅমার শরির খারাপ-টারাপ কিচ্ছু হয়নি! যাওয়া হলো না তো? উর্বী নাকি তারপর প্রচন্ড রেগে রিয়াকে ম্যানিপুলেটিভ বলে অভিহিত করে আর অন্য বন্ধুরা রিয়ার এই কৌতুকপ্রবণতাকে সহজে নিতে না পারার কারণ হিসেবে উর্বীর মেয়েলী ঈর্ষাপরায়ণতাকেই দায়ী করে। উর্বী-অরূপ এরপর বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় বাকি বন্ধুদের থেকে।

অতীত থেকে বাস্তবে ফিরে আসি। হোটেলে সারাদিন জাবর কেটেই গেছে। মাথা থেকে এ মৃত্যুকে তাড়ানো যায় না। ভনভন করে দুর্ঘটনার কথা মাথায় ঘুরতে থাকে। শুনেছি সোলো অ্যাক্সিডেন্ট, অর্থাৎ ঐ অ্যাক্সিডেন্টে অন্য কেউ যুক্ত ছিল না। রিয়ার গাড়ির ব্রেক কি ফেল করেছিল? অন্য কোন গাড়ি খুব কাছে চলে এসেছিল? যার হাত থেকে বাঁচতে গিয়ে হয়তো পাশের সাউন্ড ওয়ালে ভিড়িয়ে দেয়? কতটা আঘাত পেয়েছিল? ওর শরীরটা .. থেঁতলে যায় নি তো? স্মরজিৎকে এসব জিগেস করা প্রশ্নের বাইরে। কিন্তু ঘটনার ডিটেল, আরো গভীরে যাবার ইচ্ছে যায় না আমার। লজ্জাই করে। সকালে ওদের সঙ্গে ভালো করে কথাও বলে আসিনি। ঘটনার বীভৎসতা এই আমারই পিছু ছাড়ছে না, আর রিয়ার এক্কেবারে নিকটজন, বাবা-মা, স্বামী-সন্তান এদের প্রত্যেক মুহূর্ত কিভাবে কাটছে? তারা বেঁচে আছে কি করে? দু বছরের বুবান?

অনেকক্ষণ বেল বাজিয়েও কোন সাড়া পাইনা। কোথায় গেছে সবাই? আমার অতি পরিচিত এই গৃহ। ভেতরে ঢোকার সব শুলুকসন্ধানও জানা। গার্ডেনার যে পথে এসে লনের ঘাস ছেঁটে যায়, ব্যাকইয়ার্ডে ঢোকার মুখে সেই সাইডগেট খুলে ঢুকি ভেতরে। ওরা যদি বাইরে থাকে, রিয়ার নিজের হাতে লাগানো বোগেনভিলিয়া ঝাড়ের নীচে, সেই ভেবে। নাহ্‌, কেউ নেই। ওরা নেই বাড়িতে।

ব্যাকইয়ার্ডটা পেরোলেই ওদের টু-কার গ্যারাজ। খোলা। ওটা কি? রিয়ার লাল ভলভোটা দাঁড়িয়ে আছে আগের মতই। তাহলে ও অ্যাক্সিডেন্ট করেছে স্মরজিতের গাড়িসহ? স্মরজিতের গাড়িটা দেখতে পাই না কোথাও। কেন হঠাৎ স্মরজিতের গাড়ি নিয়ে বেরোতে গেল রিয়া? দুবছর আগে স্মরজিতের গাড়িতে উঠতেই চাইতো না রিয়া, চড়া তো দূরস্থান। ওর গাড়ি আর খাটালে নাকি কোন প্রভেদ নেই। অনেককিছু পাল্টানোর কথা এই দুবছরে। হয়তো ওরা নতুন গাড়ি কিনেছে। হয়তো স্মরজিত এই গাড়িটা ব্যবহার করে, চালকের হাতবদল হয়েছিল। হয়তো ওরা একটা গাড়ি বেচে দিয়েছে।

কাঁধের ওপর চাপ। - কখন এলি? স্মরজিৎ।
-এই তো।
-ভেতরে আয়।
দুজনে এসে লিভিং রুমে বসি।
-বাবা-মাকে এয়ারপোর্টে তুলে দিয়ে এলাম। বুবানকে রেখে এলাম এক বন্ধুর বাড়ি, খেলুক ওখানে একটু।
-মাসিমারা চলে গেলেন আজই? দেখা হবে ভেবেছিলাম।

ওপরে ফ্যান ঘুরছে। রিয়া এসির শুকনো ঠান্ডা পছন্দ করতো না বলে দেশী স্টাইলের ফ্যান লাগিয়েছিল। কিছু বলার খুঁজে পাই না দুজনে অনেকক্ষণ। একসময় দুজনে উঠে অভ্যেসমত দরজার বাইরে যাই। ড্রাইভওয়েতে দাঁড়িয়ে আগুন নিই স্মরজিতের কাছ থেকে।

-অনেক কাজ বাকি। বুবানের জন্য ভালো একজন বেবিসিটার খোঁজা। বাড়িটাকে সেলে দেওয়া। একটা গাড়ি বিক্রি করা।
-একটা গাড়ি!
-হ্যাঁ, ঐ তো আমার সাদা শেভ্রলেটা। ভলভোটা রাখবো।

আমি স্মরজিতের দিকে তাকাই। ওও তাকায়। কেউ কোনো কথা বলি না এখনো। ও যা ভাবছে আমি ভাবছি, তা ভেবে আর কিছুতেই জানা হয়না রিয়ার অ্যাক্সিডেন্টের ডিটেলস। রিয়া কোন্‌ গাড়ি নিয়ে অ্যাক্সিডেন্ট করেছে, এই প্রশ্ন এখানে কি খেলো, কি অকিঞ্চিৎকর শোনাবে! সেই ভেবে। কেন রিয়ার শেষ মুহূতের ছবিটাকে সম্পূর্ণ করার ইচ্ছে আমার মনে? আমি কি স্যাডিস্ট? না শুধুই উপন্যাসের শেষটা জানার কৌতূহল? নাকি আশাপূরণের খোঁজ - হয়তো রিয়া তেমন মৃত্যুযন্ত্রণা পায়নি, হয়ত শেষ সময়টা আসার আগেই ওর নার্ভগুলো আর তেমন কাজ করছিল না।

আমার কিছুই জিগেস করা হয় না, কোনো সান্ত্বনাই দেওয়া হয় না, আমি একসময় বিদায় নিই। সেই একই হাইওয়ে দিয়ে রওনা হই। আমাদের শহরে একটিই বড় হাইওয়ে। একজিটের ওপাশে উল্টোমুখে সেই সাদা গোলাপের তোড়া ইচ্ছে না থাকলেও চোখে পড়ে যায়।

গাড়ি ঘুরিয়ে নিই। আমাকে ছবিটা কমপ্লিট করতেই হবে। জানতেই হবে। আমার যেন গল্পের শেষ না জানা অবধি আজ নিস্তার নেই। একটা চেন ইমেলে রিয়ার কার ক্র্যাশের খবর - এটাই রিয়ার শেষ ছবি হতে পারে না। গত দুবছরের গ্যাপ পূর্ণ না করে এখান থেকে আমি যেতে পারব না। বুঝে গেলাম আমি। ইউ টার্ন করে গাড়ি ঘুরিয়ে নিই হাইওয়ে থেকে বেরিয়ে।

দরজা খুললো স্মরজিৎ। - জানতাম ফিরে আসবি তুই। আয়। দুদিন আগে পুলিশের ঝামেলা মিটেছে, ফাইনালি হাতে অঢেল সময়।

- পুলিশ?

আমাকে নিয়ে ওপরে যায় স্মরজিৎ। বেডরুমের ডাবল ডোর হাট করে খুলে দেয় আর ঠিক তখনই আমার চোখ খুলে যায়। কালো কালো দেওয়াল, আধপোড়া কার্পেট, লণ্ডভণ্ড জিনিস্পত্র।
- ডোমেসটিক ভায়োলেন্সের কেস যে নয় তা প্রমাণ করতে কম ঝামেলা হয়নি এ কদিন।
রিয়া। রিয়া ছেলেকে স্কুলে পাঠিয়ে এই ঘরে নিজের গায়ে আগুন লাগিয়ে মারা গেছে। পাশের বাড়ির নেবার আগুন দেখতে পেয়ে ৯১১ কল করে, ফোর্থ ডিগ্রি বার্ন ততক্ষণে।

স্মরজিতের গলা নিরুত্তাপ শোনায়।

- শেষদিকটায় কনট্রোল ফ্রিক হয়ে গিয়েছিল রিয়া। নিজের স্বামী, সংসার তো বটেই, বন্ধুবান্ধবের জীবন পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করত। নিজের পছন্দের বাইরে কোন ঘটনা ঘটলেই তাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়ে নিতো আর পাল্টানোর চেষ্টা করতো বাই হুক অর বাই ক্রুক।

আমার অফিস ছাড়া সমস্ত সামাজিকতা, এন্টারটেন্মেন্ট বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। বন্ধুবান্ধবরা বাড়িতে ফোন করা পর্যন্ত ছেড়ে দিয়েছিলো ওর ডমিনেটিং আচরণের কারণে।

স্মরজিত হাঁপায়। সিঁড়ির ধাপে বসে পড়ে। ওও কি অসুস্থ?

- জানিস তো আমি বই পড়তে ভালোবাসি। হঠাৎ হঠাৎ হাত থেকে বই কেড়ে নিতো। তুমুল রাগারাগি। তারপর কখনো বলতো, যাও আজ সারাদিন বই পড়ার ছুটি। আমার দমবন্ধ হয়ে আসতো। পান থেকে চুন খসলেই ফিজিক্যালি রিয়াক্ট করতো - ডিটেল জানতে চাস না। কাউন্সেলরের কাছেও নিয়ে যেতে পারিনি। শোনার পাত্রীই ছিল না।

- তুই তো জানিস অফিসে ম্যানেজার হিসেবে কেমন সুনাম ছিল রিয়ার - দা জব ওয়াজ হার আইডেন্টিটি। গত সপ্তাহে লেড অফ হয়ে যায়। এক পিয়ারের সঙ্গে বাজেট নিয়ে লেগেছিল, ডিরেক্টরের কাছে ও সেই পিয়ারের সম্বন্ধে মিথ্যে অ্যালিগেশন তোলে। মিথ্যে কথাও বলতো খুব আর তারপরই ফায়ারড হয়ে যায়। ওটাই লাস্ট স্ট্র ছিল বোধ হয় -

স্মরজিত বেডরুমের দরজা বন্ধ করে দেয়। হাওয়ায় পাশের ঘরের পর্দা নড়ে ওঠে। আমি দেখতে পাই, দুহাতে খাবারের ট্রে নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে উঠে আসছে রিয়া। দেখতে পাই, ভোরবেলা ফিফটিন সিটারের ট্রাঙ্ক ভর্তি করে ট্র্যাকসুট পরা রিয়া আমাদের তাড়া দিচ্ছে। আবার ঘাড় ঘোরালেই দেখি ক্যাম্পের আগুনের তাতে লাল লাল রিয়ার মুখটা। গান গাইছে কোন একটা। শীতের মধ্যে কম্বলমুড়ি রিয়া তাঁবু থেকে বেরোচ্ছে। হাজারটা রিয়াকে আমি কালো কালো ছাই-এর মধ্যে থেকে উঠে আসতে দেখি।

- ও মেন্টাল পেশেন্ট ছিল, আই শুড হ্যাভ সেন্ট হার ব্যাক লং এগো। স্মরজিৎ বলে চলে। এখানে নির্জনে, নিজের প্রাইভেসিতে ওর পাগলামিকে ও সযত্নে লালন করার চান্স পেয়েছে। দিস ইজ হোয়াট দিস কাϾট্র ডাজ টু ইউ।

রিয়ার সাইকো-অ্যানালিসিস এই মুহূর্তে আমি করতে চাই না, শুনতে চাই না। আমি তরতর করে নেমে আসি। গাড়িতে স্টার্ট দিই। হাইওয়ের উল্টোমুখী একজিটে যেতে হবে। হাইওয়েতে ওঠবার আগে এক গোছা সাদা গোলাপ কিনতে হবে। হাইওয়ের ধারে রিয়ারা চুপ করে শুয়ে আছে, ওদের জন্য।