আপনার মতামত         


জলছবি
পারমিতা চট্টোপাধ্যায়

শ্রীমতীদের শোবার ঘরের জানলার গ্রিলের জাল দিয়ে এক ফালি আকাশ ধরা যায় রোজ। আজ ধরা পড়েছে দুটো কালো পাখি। কাক না চিল কে জানে। পাখিদুটো আকাশে কাটাকুটি খেলে পাখা মেলে। দুরে দুরে বিন্দু হয়ে আবার ফিরে আসে। যায় আর আসে।তারপর হারিয়ে যায় কখন যেন , থেকে যায় শুধু শ্রীমতীর মনের পাতায় অন্যমনস্ক আঁকিবুকি।
সুখের , দু:খের , ভালোবাসার , ঘেন্নার। প্রথমের , শেষের।
কতদুর , আর কত দিন ?
এই একটা কথাই কেবল মাথার মধ্যে ঘুরে ঘুরে প্রশ্ন করে। ডাক্তার পাত্র বলেছেন বছরখানেক। এক বছর ঠিক কতটা সময় ? যথেষ্ট ? কিসের জন্যে যথেষ্ট ? আর এই এক বছর কাটবে কেমন করে ? জ্বালা-যন্ত্রণা ? নাকি এখন যেমন আছে সেরকমটাই। বেশ তো ছিল শ্রীমতী। পরিপাটী সংসার। বুঝতেও তো পারে নি , শরীরের লুকোনো কোন্দরে ছড়াচ্ছে মৃত্যু। বিষিয়ে যাচ্ছে সব।রোজদিন যখন নিজের মসৃন ত্বকে আলতো হাতে ছোটো ছোটো বৃত্ত করে মাখত অ্যান্টি-রিংকল ক্রীম ,মৃত্যু জয়ঘোষনা করে বেড়াত কোষে কোষে। শ্রীমতীকে জানতেও দেয় নি ওরা।শুধু বিউটিশিয়ান রীতা ফেসিয়াল করার সময় বলেছে দু-একবার "আপনার গলার তিলটা দিনকে দিন বড় হয়ে যাচ্ছে" ।
কৈ শ্রীমতী তো খেয়াল করে নি। আর সোম ? তার তো বড় প্রিয় ঐ লালচে লম্বাটে তিলটা। ডান কানের লতির ঠিক নীচ বরাবর।বিয়ের পরে পরে শ্রীমতীর চুলের গোছা সরিয়ে সোম ঠিক খুঁজে নিত মাঝরাতের অন্ধকারেও। আর তারপরে ঘন চুমু।
দেখিয়েওছিল সোমকে কদিন আগে। বলেও ছিল অল্প ব্যাথার কথা।তিলটা সত্যিই বড় হয়েছে অনেক। হয়েছে একটা গোলালো মেরুন-রঙ্গা আঁচিল। তাতেই বাসা বেঁধেছিল কোটী কোটী বিষানুগুলো। তারপর একদিন কয়েকফোঁটা রক্ত , আরো একটু ব্যাথা। শ্রীমতী ভাবেও নি। তিনদিন পরে আরো কয়েক ফোঁটা । তারপর খুঁজে পেয়েছিল কটা নতুন তিলও । শরীরের আনাচে-কানাচে।
ডাক্তার পাত্র বললেন ও কেটে ফেলাই ভালো। বেশ মনখারাপ হয়ে গেছিল। সোমের বড় প্রিয় তিল ছিল ওটা। এমনিই কেটে দেবে। সোম কিন্তু বেশ বোঝে। ছেলেরা বুঝি এরকমই হয়। আলতো , অস্পষ্ট সব ভাললাগা। কেমন ঝিম হয়েছিল শ্রীমতী। মনখারাপ সামান্য একটা তিলের জন্যে। কাউকে বলতেও পারে নি মন খুলে। সোমকেও না।
তারপর তো বায়োপসিও হল। সন্ধ্যেবেলায় সোম এল। নাকি সোমের মত অন্য কেউ। সে সোমকে শ্রীমতী চিনতেও পারে না।তার সুপুরুষ স্বামীর খোলসে এল হেরে যাওয়া নুব্জ এক খবরবাহক। মৃত্যুর ডাকটুকু বয়ে এনে দিল শ্রীমতীর জন্যে। বড় কঠিন কাজ। সোম পেরেছে। শুধুই কি শ্রীমতী অমন করে ভালোবেসেছিল। সোম অন্যরকম। তার সুন্দর পুরুষ। রোজ সকালে অফিস রওনা দেবার আগে শ্রীমতীকে খালি করে দিয়ে যেত। আর কদিন পরে শ্রীমতী শোধ নেবে সেই সব একলা মুহুর্তের। চিরদিনের মত।
আরো একজনকে খালি করে দিয়ে যাবে শ্রীমতী। তার আর এক প্রিয় পুরুষ। অবশ্য সে এখোনো পুরুষ হয়ে ওঠে নি এখনো। ছোট্টো একটি মানুষ। শ্রীমতীর সন্তান । সোহম। আমিই সেই। কিম্বা আমরা। তাদের দুজনার ভালবাসার নির্যাসটুকু দেখতে দেখতে তিন বছরের হয়ে গেল। মায়া মাখানো মুখ। কোঁকড়া চুলের রাশ। শ্রীমতী রোজ রাতে ঘুমপাড়ায় গান গেয়ে গেয়ে। সোহম ঘুমিয়ে পড়লে তাকিয়েই থাকে তার দিকে , যেন এক ফালি চাঁদ পড়ে আছে আলুথালু বিছানায়। শ্রীমতীর দুচোখ দিয়ে মায়া-মমতা-ভালবাসা চুঁয়ে পড়ে টিপ টাপ। সোহমের চুলে নাক ডুবিয়ে নেয় বাসটুকু।এটুকু মনে মনে ভাবতেই বুক ভরে ওঠে। চোখও। ডুকরে কাঁদে শ্রীমতী একা একা। চুপি চুপি।

সোম ফিরলো সেই সন্ধ্যেবেলা। কোন এক ডাক্তারের কাছে গিয়েছিল সব রিপোর্ট-টিপোর্ট নিয়ে। সেকেন্ড ওপিনিয়ান , থার্ড ওপিনিয়ান।
সোম মানতেই চায় না। শ্রীমতীর বুকে মুখ গুঁজে কাঁদে রোজ রাতে। সোহম ঘুমিয়ে যাবার পর। শক্ত করে ধরে রাখে শ্রীমতী। আর নিজে ভেসে যায়। চোখের নোনা জল গাল বেয়ে , গলা বেয়ে গড়িয়ে পড়ে সোমের পাতলা হয়ে আসা চুলের মধ্যে হারিয়ে যায়। তারপর কখন যেন দুজনেই ক্লান্ত হয়ে শ্রান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। আবার সেই ভোর। তখন দুজনাই অনেক স্বাভাবিক। রাতের কান্নাটুকু যেন ছিল এক দু:স্বপ্ন।সোহমকে স্কুলে ছেড়ে সোম যায় ডাক্তারের দুয়ারে দুয়ারে আর শ্রীমতী একা একা আঁকে ভাবনার জলছবি। সাদা-কালো-রামধনু রং।

শ্রীমতী প্রথমে বুঝেই উঠতে পারে নি পুরোটা। কেমন যেন সব ঘেঁটে গিয়েছিল মাথার মধ্যে।
স্কিন ক্যানসার। মেলানোমা।
শুধু এই শব্দগুলো ই ঘুরছিল শ্রান্তহীনভাবে। লাস্ট স্টেজ। কিছুদিন আগে হলে আটকানো যেত।
কি করে জানব ডাক্তার। কিছু যে বুঝি নি। কেন জানান দেয় নি রোগ বাসা বাঁধছে শরীরে। কেন কেন। শ্রীমতী হিসহিসিয়ে প্রশ্ন করেই গেছে ডাক্তার পাত্রকে। সোমও। ডাক্তার কিছুর জবার দিয়েছে কিছুর দেয় নি।
শ্রীমতী অস্থির হয়ে গেছিল......একটা বছর। একটা বছরে তো সোহমকে একা একা খওয়াটুকুও শেখানো যাবে না। সোমই বা কি সামলাবে। আফিস , সোহম , আমার না-থাকা-টুকু। আমিই বা কি করে সামলাবো আমার-না-থাকা-টুকু।
শ্রীমতীর সব ইন্দ্রিয় আজকাল বড় প্রখর হয়ে গেছে।এই ফ্ল্যাট , কমলা রঙ্গা পর্দাগুলো , বিকেলবেলার এক টুকরো সোনারোদ সামনের বারান্দায় । ছোটো ছোটো সবেতেই তার বড় মায়া। বড় লোভ। ইচ্ছে করে জড়িয়ে থাকি সবটুকুতে , কিছু যাতে যেতে দিতে না হয়। কিম্বা ছেড়ে যেতে না হয়।একেক সময় আর বোঝে না শ্রীমতী। একা একা বুক ফাটিয়ে চিৎকার করে , আমি ই কেন। তার জীবন তো মডেল জীবন ছিল। কি করে ছেড়ে যাবো। কেনই বা যাবো। ভগবান।তারপরেই চুপটি করে শুনতে চায় মৃত্যুদুতের কোলাহল। তারা শুনতে পেল কি ? ভয় পেল কি? তার রেশমী ত্বকের আড়ালে সবকিছু বিষাক্ত হয়ে যাচ্ছে। শ্রীমতী কান পেতে শোনে। শোনার চেষ্টা করে জয়োল্লাস।

শ্রীমতী হেরে যায়। বারে বারে , প্রতিদিন....।।


ক্যানসার আক্রান্ত শুধু এক জনকেই কাছ থেকে দেখেছে শ্রীমতী।
মেজো পিসেমশাই।
শ্রীমতীর তখন বছর চোদ্দ। সব বিয়ে-পৈতে বাড়িতে আসতেন মেজো পিসে। স্থুলাঙ্গী মেজো পিসীকে সাথে নিয়ে। সুপুরুষ ছিলেন না তবে গড়পড়তা বাঙ্গালীর পুরুষের থেকে লম্বায় আর চওড়ায় দুটোতেই বেশি। আর ছিল তাঁর সেই হাসি। মনখোলা। ছদের আলসে থেকে পায়রা ওড়ানো হাসি। সেই পিসেমশাই হয়ে গেলেন এক আধো-ভৌতিক ছায়া। বিছানায় মিশে থাকা শরীরটা দিনকে দিন কুঁকড়ে ছোটো হয়েই গেল। মাথার চুল সব ঝরে গেল দুটো কেমোতেই। কালো কোটরে ঢোকা দুটো সাদা চোখের অর্থহীন দৃষ্টি কেউ দেখতে এলে একবার দেখেই মুখ ঘুরিয়ে নিতেন দেওয়ালের দিকে। হাল ছেড়ে দিয়েছিলেন মেজো পিসে।কি চরম নীরব ঔদসীন্য জীবনের প্রতি।
শ্রীমতী ভাবতেই পারে না ওরকম একটা মৃতদেহ হয়ে বাঁচার কথা। তিলে তিলে কুৎসিত হয়ে যাওয়া।ভাবতে ভাবতেই আয়্‌নার সামনে এসে দাঁড়ায় শ্রীমতী। খুলে ফেলে যত আবরণ এক এক করে। আঁতি পাঁতি করে খোঁজে ধ্বংসের চিহ্ন সারা শরীরে।খুঁজেই চলে।যতক্ষণ না কাজের মাসী এসে পড়ে সকালের ঘর ঝাঁট মোছা করতে।

শ্রীমতী তার ভাবনাগুলোকে দুভাগে ভাগ করেছে । ডেস্ট্রাকটিভ আর কন্সট্রাকটিভ। ডেস্ট্রকটিভ লিস্টি জুড়ে আছে শুধু একটা ধারণা , গুঁড়ি মেরে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাওয়ার চেয়ে একবারে হঠাৎ করে শেষ করে দেওয়া নিজেকে। ভেবেওছে অনেক উপায়।
তাদের সাততলার বাড়ির বারান্দা থেকে পাখীর মত উড়ে যাওয়া। কিম্বা পড়ে যাওয়া। ঘুরতে ঘুরতে , নীচে ,আরো অনেক নীচে।কিন্তু তারপর , থ্যাঁতলানো একটা মাথা, জড়িয়ে-দুমড়ে থাকা একটা দেহ ,তার বিষ রক্ত অক্টোপাসের মত অজস্র আঙ্গুল মেলে মিশে যাবে সুইমিং পুলের নীল জলে।শিউরে ওঠে শ্রীমতী।চোখ বন্ধ করে দুহাতে মাথা চেপে ধরে যতক্ষণ না ধ্বংসের ছবিটা মিলিয়ে যায় পুরোপুরি।
কিম্বা অষুধের দোকান ঘুরে ঘুরে অল্প অল্প করে জোগাড় করা ঘুমের অষুধ। এইটাই সবচেয়ে আকাঙ্খিত। ঘুমের মধ্যে চলে যাওয়া। যন্ত্রনাহীন এক নীরব নি:শব্দ মৃত্যু।
আর কন্সট্রাকটিভগুলো হল বেশ মজার। কয়েকটা আবার তার নিজের নয় , এখান ওখান থেকে পাওয়া। যেমন কুছ কুছ হোতা হ্যায় থেকে পাওয়া সোহমের জন্যে চিঠি লিখে যাওয়ার আইডিয়া।কিম্বা ওপরা দেখিয়েছিল যে মা টির কথা। ক্যানসার আক্রান্ত জানতে পেরে যিনি নিজেকে বন্দী করে গেছিলেন ভিডিও টেপে , নানা ভাবে ,তাঁর এক বছরের মেয়ের জন্যে। যাতে মেয়ে বড় হয়ে মাকে চিনতে পারে।শ্রীমতী এটা দেখেছিল এক অলস দুপুরে । আকুল হয়ে দেখেছিল যে সেই ছোট্ট মেয়েটি কিভাবে বেড়ে উঠেছে নিজের মতন করে মাকে ছাড়া কিম্বা মায়ের সাথেই।
সেদিন দুপুরে টিভি দেখতে দেখতে শ্রীমতী একা একা কেঁদেছিল হাপুস নয়নে। দু:খে নয়। আনন্দেও নয়। কি এক যেন এক দুর্বোধ্য ভালো-মন্দ-লাগায় বুঁদ হয়েছিল। আর কেঁদেছিল। রাতে আলো-আঁধারির জাফরি কাটা বিছানায় গুনগুনিয়ে বলেওছিল সোমকে গল্পটা। সোম শুনেওছিল আধো-ঘুমে , আধো-জাগরণে।
রাতগুলো বরাবরই শ্রীমতীর খুব প্রিয়।এতদিন তাদের সাড়ে আটশো স্কোয়ার ফিটের ফ্ল্যাটে রাত আসতো মিটি মিটি হেসে, তার যত হুরী-পরী-সহচরীদের নিয়ে। সোহাগ-অনুরাগ-অভিমানের যাদুছড়ি নিয়ে। শেষে জড়িয়ে-মড়িয়ে ঘন হয়ে ঘুম। সোমের ঘুম আসতে সময় লাগে না , শ্রীমতীই একা একা জাগত। সোমের পাতলা নরম কোঁকড়ানো চুলের মধ্যে আলতো আঙ্গুল চালিয়ে ভাবতো সকালের ব্রেকফাস্টের কথা।
এমন মায়াময় রাত আর আসে না। শ্রীমতী বা সোম কেউই পারে না অমন করে ঘুমোতে। ভালবাসাময় তৃপ্তির নিরাপদ ঘুম।

শ্রীমতী কখোনো সখোনো ভাবে তার মেয়েবেলার কথা।তার বেড়ে ওঠা। মেয়ে থেকে মানুষ হয়ে ওঠার কথা। শ্রীমতী বরাবর থাকতো তার নিজের চৌহদ্দির মধ্যেই। কখোনো কি ইচ্ছে করে নি পাখা মিলে নিজেকে ছাপিয়ে যেতে ? হয়তো করেছে কিন্তু তা তীব্র ছিল না কোনো সময়েই। শ্রীমতী ভালো ছিল শ্রীমতী হয়েই। বাবা-মাকে নিয়ে তাদের ছোট্ট সংসারটুকু , রবিবার আঁকার স্কুল , বুধবার কত্থক আর কখোনো সখোনো দীপালীর বাড়িতে গিয়ে দু-একটা গান শেখা। লিখতো ও। প্রথম লেখা শুরু হয়েছিল স্কুলের রচনা লেখা দিয়ে। সেই যে ক্লাশ এইটে কল্পনা দিদিমনি ক্লাশে এসে বললেন আজ রচনা লেখ "একটি উৎসবের বর্ণনা"। সবাই লিখলো দুর্গাপুজো, কালীপুজো , বড়দিন। শ্রীমতী লিখলো কোলকাতা ময়দানে দেখা ফ্লাওয়ার শো। গুছিয়ে , যত্ন করে লেখা ফুলের গল্প। আর লিখেছিল বনসাই য়ের কথাও। কল্পনা থেকে এনে।জোর করে একটা প্রাণকে প্রতিবন্ধী করার গপ্প। তারপরে তো স্কুলে শ্রীমতী ফেমাস। টীচার্স রুমে , অন্য ক্লাশে কল্পনাদি পড়ে শোনাতে লাগলেন তার রচনা। অত:পর স্কুল ম্যাগাজিনে শ্রীমতী লেখা বাঁধা।
কতকাল লেখে না শ্রীমতী।ইচ্ছে করে কিন্তু ইচ্ছেটা সেরকম দানা বাঁধার আগেই হয় সোহমকে খাওয়ানো নয় রজতের বিবাহবার্ষিকীর গিফট কিনতে বেরতে হয়। অথচ একটু একা হলেই কালো কালো পিঁপড়ের মত ছোট্ট ছোট্ট শব্দগুলো মাথার মধ্যে নড়তে-চড়তে থাকে। কাগজ পর্যন্ত আর পৌঁছয় না।
সবকিছুই শ্রীমতী যত্ন দিয়ে করত। আঁকাতেই সবচেয়ে বেশি। জল রং ই বেশি। উজ্জ্বল , পেলব ছবি আঁকতো একের পর এক। গর্বিত বাবা-মা বাঁধিয়ে টাঙ্গিয়ে রাখতো ঘরের কোনায় কোনায়। বিয়ের পরে আর আঁকে নি সেরকম। না , একবার এঁকেছিল। সোমের পীড়পীড়িতে। যামিনী রায়ের আদলে আঁকা একদল নর্তকী। আজও সে আঁকা টাঙ্গানো আছে শ্রীমতীর যতনে সাজানো বসার ঘরে। প্রতি বছরে শ্রীমতী বদলে দেয় বসার ঘরের সাজসজ্জা , শুধু ঐ ছবিটাই সরে না দেওয়াল থেকে। সোম সবাইকে ডেকে ডেকে দেখায়।
আরো কি আঁকতে পারতো না শ্রীমতী। সোমের জন্যে , সোহমের জন্যে ? সোহম দেখাতো সবাইকে , "আমার মায়ের আঁকা। আমার মা খুব ভালো আঁকতো।কবিতাও লিখতো আর ছোটো ছোটো গল্প। আমার মা গানও গাইত"।
বড় হয়ে কি সোহমের মনে থাকবে শ্রীমতীর গাওয়া গানগুলো ?
স্কুল থেকে ফিরে সোহমকে গান শেখায় শ্রীমতী। নিজেই গায় , সোহম কচি রিনরিনে গলায় ধুয়ো ধরে। শ্রীমতী গায় "ছোটো ছেলেটার ছিল এক্কা গাড়ি" সোহম গায় "তগবগ আহা হা তগবগ"....................

খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে শ্রীমতী। হাসতেই থাকে দুলে দুলে। আর গায় ও। "আজ ছুটি আহা হা আজ ছুটি"। গায় আর হাসে। শ্রীমতীর বুকের কান্নার ঢেউ এসে ধাক্কা মারে দুই চোখে। উপচে পড়ে নোনা জল। ভাসিয়ে দেয় শ্রীমতীকে , গুঁড়িয়ে দেয় শ্রীমতীকে। সোফার ওপর উপুড় হয়ে ফুলে ফুলে কাঁদে শ্রীমতী।

শ্রীমতীর জন্যে শরশয্যা রচিত হচ্ছে। আসানসোল থেকে আসছেন সোমের বাবা-মা। শ্রীমতীর দেখাশোনা করতে। নাকি নিজেদের সাথে সোহমকে মানিয়ে নিতে ? শ্রীমতী বোঝে সোম হাল ছেড়ে দিচ্ছে। বাবা-মাকে আনার কথা বলতে গিয়ে চোখ নামিয়ে নেয় শ্রীমতীর চোখের থেকে। সব বোঝে , কিন্তু হাসিমুখে সায় দেয়। বেহালা থেকে মা ও আসে দুদিনে একবার।একদিকে ভালো ই হয়েছে বাবা তাড়াতাড়ি চলে গিয়ে। শ্রী ছিল বাবার মনের গোটাটি জুড়ে, আর বাবাও শ্রীমতীর তাই। বাবা চলে যেতে কেমন দপ করে নিভে গিয়েছিল জীবনের যত রং , যত আলো। বহুদিন পর্যন্ত বাবার ছবির দিকে তাকাতে পারতো না শ্রীমতী। বাবা বেঁচে থাকলে কিছুতেই মেনে নিতে পারতো না সন্তানের এই অসহ্য ধ্বংস। একটি প্রাণবন্ত প্রাণের এমনি অপচয়।

হঠাৎ করে ভীড় বেড়ে গেছে চারদিকে। বড্ড ভীড়। দমচাপা এক হুতাশ ভীড়ের। মা, সোমের বাবা-মা , মিতালী-দীপক , রজতদা-সৌমিলিবৌদি , পিসতুতো দাদারা সব। সবাই আসে। সবাই কাঁদে। স্তব্ধ হয়ে থাকে। ভালো লাগে না শ্রীমতীর। নি:শ্বাস বন্ধ হয়ে যায়।একটু একা থাকতে পারলে ভালো হত , একটু একা। সোহমের সাথে। সোমের সাথে। নিংড়ে নিতে ইচ্ছে করে বাকী মুহুর্তগুলো। হাসপাতালের সোফায় বসে ডাক্তার পাত্রর প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে বড় দেরী হয়ে যাচ্ছে শ্রীমতীর। টুপ টাপ ঝরে যাচ্ছে সময় । কেউ বুঝতে পারছে না।


একটু একা হলেই সোহমকে নিয়ে বন্ধ ঘরে শ্রীমতী। গল্প শুনবি সোহম, গান শিখবি সোনা আমার। আয় তোর ঘোড়া হই আমি। "টগবগ আহা হা টগবগ"....
সোহম ঐটুকুনি মানুষ বড় ব্যস্ত। কখোনো মায়ের সথে খেলে কখোনো বা বাইরে যেতে চায়। কার্তুন নেতোয়ার্ক দেখতে চায়। গান শেখার মুডই হয় না।জোর করে ধরে রাখে শ্রীমতী তারপর কখন যেন ছেড়ে দেয়। সোহম টিভি চালিয়ে হাঁ করে দেখে পুতুলমানুষের লাফালাফি আর খিলখিলিয়ে হাসে বারবার। মাকেও ডাকে মজার ভাগ দিতে।শ্রীমতী কোলে বসিয়ে চটকে-মটকে আদর করে সোহমকে। গালে ঘষে গাল। শ্রীমতীর জীবনের নাম সোহম। কেন ছেড়ে যাবো , কেন যাবো।
শ্রীমতী ভাবে অনাগত দিনগুলির কথা ? সোহম কি কোনোদিন চিনবে মাকে ? সোম কি সোহমকে শোনাবে শ্রীমতীর গল্প ?
"জানিস সোহম তোর মা না একটু পাগলী ছিলো, রাতেরবেলা অন্ধকারে কেউ দাঁত বের করে হাসলে ভয় পেতো।"
"তোর মা তোকে বড় ভালো বাসতো,রোজ রাতে তোকে ঘুম পাড়িয়ে ঝিম হয়ে চেয়ে থাকতো তোর মুখের দিকে।"
"জানিস তোর মা আর আমি রোজ সন্ধ্যেবেলায় তোকে দেখে ঝগ্‌ড়া করতাম তুই কার মতো দেখতে।সবাই বলতো তুই নাকি আমার মতো , তোর মা কিছুতেই মানতো না"।
সোমের কি মনে থাকবে শ্রীমতীর গল্প ? কেমন হবে ওদের দুজনের জীবন ? সোম কি বুঝবে সোহমকে ? সোহমের বড় হবার দিনগুলিতে ? শ্রীমতীর মতন করে কি বুঝবে ? শ্রীমতীর খুব ইচ্ছে করে নিজেকে ছড়িয়ে দিয়ে যায় চারিদিকে , সোহম একটু একটু করে যেন আবিষ্কার করে পুরোনো ছবির মায়ের হাসির পেছনে আর কি ছিলো । সোম বড় ভুলো , সোমের হাতে সব ছেড়ে দিয়ে যাবে না শ্রীমতী। নিজেকে ছড়িয়ে দিয়ে যাবে হেতায় সেথায়। সোহমকে চেনাতে , সোহমকে জানাতে।
গতরোববার সন্ধ্যেবেলায় সোম লিস্টি মিলিয়ে এনে দিয়েছে প্রতিটি ফরমায়েশী জিনিষ। শ্রীমতীর পছন্দের মেরুন রঙ্গের হ্যান্ডমেড কাগজে বাঁধানো লেখার খাতা। কালো কালির ফাউন্টেন পেন। এসেছে তুলি-রং -আঁকার কাগজ। নরম চারকোল। টুবি-ফোরবি পেন্সিল।
আবার আঁকবে শ্রীমতী। লাল-নীল-সবুজ জলছবি। লিখবেও। নিজের কথা , তার সোমের কথা আর সোনার কণা সোহমের কথা। আগত সর্বনাশের কথাও। নিজেকে উজাড় করে।
লিখছেও বেশ কপাতা। তাদের মেদিনীপুরের তিনতলা বাড়ির কথা। স্যঁতস্যঁতে ঠান্ডা ঠাকুরঘরে বসে ঠাম্মির গান গেয়ে দুলে দুলে পুজো করা , বড়কা-বড়মার শোবার ঘরের তাকে রাখা বাবুসোনার মালা পরানো ছবি , প্রায়ই যার সামনে দাঁড়িয়ে বড়মার চোখ দিয়ে দরদর জল পড়তে দেখতো ছোট্টো শ্রী। তারপর সব কেমন একে একে ফাঁকি দিয়ে চলে গেল। প্রথমে ঠাম্মা , বড়মা , শেষে বড়কা। তিনতলা বাড়িটা আরো ফাঁকা হয়ে গেল। এককালের চকচকে লাল মেঝের ফাটলে সাদাটে ধুলো জমতেই লাগলো রোজ সবার অলক্ষ্যে। শুধু পেছনের বাগানের ঝাউগাছটা রোজ রাতে বুক কাঁপিয়ে হুতাশ করে যেত ।

তারপর একদিন বোধয় বাবা-মা আর পারে নি , ট্র্যন্সফার নিয়ে কোলকাতা। বেহালাতে ছোট্ট বাড়ি ,তিনজনে মিলে বেশ গায়ে-গায়ে লেগে থাকা। নতুন বন্ধুরা সব। সারারাত ঘুরে ঘুরে ঠাকুর দেখা। মাইনের দিন সন্ধ্যেবেলায় রেস্তোরাতে খেতে যাওয়া মায়ের পাতলা-নরম সিল্কের শাড়ী পরে। কেবল মাঝে মাঝে বৃষ্টির দুপুরে মনে পড়ে যেত মেদিনীপুরের বাড়ির ছাদে বসে লংকার আচার খেতে "মানবজমীন" পড়ার কথা।

শ্রীমতী ভুলেই গেছিলো সেই স্বাদ। লিখতে বসে সব মনে পড়ে যায়। চোখ বন্ধ করলে গায়ে এসে লাগে বাগানের ঝাউগাছটার ঠান্ডা বাতাস , কামিনী ফুলের মদির গন্ধ আর ঝুমঝুমে বৃষ্টির আওয়াজে মিশে যায় বড়কার গলা। দোতলার টিভির ঘরে বড়কা গান করছে একা একা "ও গো কাজল নয়না হরিণী....."

ভাগ্যে লিখতে শুরু করল শ্রীমতী। এমন কত মুহূর্ত নইলে হারিয়ে যেত চিরতরে। সোহম তো জানতো ই না , এমন কী শ্রীমতী ও জানতে পারতো না কত প্রিয় ছিল ঐ দিনগুলো।
সব রেখে যাবে। নিজেকে , নিজের জীবনকে। তুলোট কাগজ উল্টে তার মাকে দেখবে সোহম।

সব শব্দগুলো হুড়মুড়িয়ে আসছে মনের মধ্যে। কত কথা ,কত হাসি , কত কান্না ......


ভাবতে ভাবতেই তাক থেকে নামায় খাতাখানা আবার। বালিশে বুক রেখে আধশোয়া হয়ে গুছিয়ে বসে খাটের ওপর।
লিখে চলে একমনে , আনমনে।


বিকেলের বারান্দার সোনা-রং যাবো যাবো তখন। অন্ধকার হয়ে এল বলে।