আপনার মতামত         


আলো আমার
সায়ন্তন

রাত্রি
==

ঘুম ঘুম ঘুম ... তিরতিরে বয়ে চলা জলে ছায়া ভাসে ... জল থেকে কুড়িয়ে নেওয়া যায় ... এমন ছায়ার আড়ালে। এখন শান্ত সব। বনের সবুজ থেকে নেমে আসা সন্ধ্যের মত। অনেক অনেক উঁচুতে মরা চাঁদের একটুকু আলো ... পায়ের পাতায় বৃষ্টিমাখা অনুভূতি - লুকিয়ে দেখা লুটোপুটি জলোচ্ছ্বাস ... তারই মাঝে নাম ধরে ডাকলে সাড়া পড়ে যায় ... যেন বাতাসের শনশনে চুপিছোঁয়া বিষণ্নতা ... এবার পথ চিনতে ভুল হবে না বোধহয় ... রাত নামতে বেশী দেরী নেই ... আর ভয় নেই।



প্রেম
==

ভাঙাচোরা তট নদীর গভীরতার হদিশ পায়নি। জলের নীচে কান পাতলে হয়ত শুনতে পাওয়া যেত পাড় ভাঙার শব্দ। বন্যা এমন করেই ভাসিয়ে নিয়ে চলে। স্রোত মরে গেলে শস্যদানা অঙ্কুর মেলে। জন্ম নেয় প্রাণ। বৃষ্টির ঘ্রাণ মাখা মায়াটান। মাত্রাছাড়া ভালোবাসার মত অর্থহীন কিছু একটা ... শুধু ছুটে চলার প্রবণতা ... অনেক গভীরে লুকানো সুপ্ত ইচ্ছা ... বালিপাথরের কর্কশ অমসৃণ ত্বকের মত ... একরোখ স্রোতপরায়ণতা। মোম জ্বলে যায়। আকাশ কালো ক'রে মেঘ আসে। কিন্তু বৃষ্টি নামেনি তখনও।



উৎসব
====

ঢালু পথ ক্রমশ নীচের দিকে ... বুঝতে পারি গতি বাড়ছে ... অন্ধ চোখধাঁধানো আলো পায়ের নীচে ... পিষে যেতে থাকে কাঁকর, শুকনো পাতা, দিনরাত্রি - চারপাশের সবকিছু একমাত্রিক ক্যানভাস ... বর্ণ-সত্ত্বা-প্রাণহীন ... বড় গাছের গোপন ফোকরে লুকিয়ে আছে ভয় - গতির সাথে পাল্লা দিয়ে ... অনেক যত্নে বুকে করে আগলে রাখা আমিত্বের মৃত্যু-উৎসব আজ - মাতোয়ারা থ্রীলিং স্পীড - অসহ্য একরোখ বুনো রাগী জন্তুর মত ... রোমশ লাল চোখ ... সময় সব দিয়েছে ... কিন্তু রাশ হাতে নেই ... সময় সব দিয়েছে ... এ কোথায় এলাম! আর কিছু দেখা যায় না। এখানে জলের রং কালো ... পায়ে লোহা ঘষটানোর শব্দ ... পার হয়ে আসা অংশগুলো ধীরে ধীরে শাদা হয়ে যায়।



সময়
===

জনহীন স্টেশনের এককোণে দাঁড়ানো কতকালের পুরনো বুড়ো ইঞ্জিনটা ... গোটা গায়ে মাটি, আঁচড়ের দাগ ... বড় দেয়ালঘড়ি কথা বলে কখনও ... ডাউন লোকালটা ... যেটা থেমেছিল প্রতিদিন ... ঐ যে লালমাটি পথ - বৃষ্টি হ'লে কেউ মনখারাপ করে ... আমরা তখন ইচ্ছেডানা পরি ... আর দৌড় দৌড় দৌড় - হাতের মুঠিতে জল ধরতে পারবে তুমি ... পাগল একটা ... কাঁকণের সূক্ষ্ম ধ্বনি ... তোমার করূণা ছুঁয়ে দিলে শিহরণ জাগে সারা শরীরে ... দোলে কেতকীর ঝাড় ... ভ'রে প্রাচীণ দীর্ঘ হ্রদ হরিণ চোখ আর টালমাটাল সুড়ঙ্গের গলি ... তোমার হাতে তুলে দিতে পারি শার্টের প্রতিটা বোতাম ... তুমি সময় থামিয়ে রেখেছ ... তাই না?



ঘুম
==

ক্ষত সংক্রমণের ভয় শুনিয়েছি তোমাকেই। তুলে রাখো সেসব প্রতিটা দিন যখন আঙুলে আঙুলে স্তাবকতা ... ঠোঁটে চুলে প্রত্যয়ের সচ্ছ্বতা নিয়ে ... গোপন ক্ষত সংহত ক'রে ... ঝিমলি চুমকী - ঝুরি কানকলি - অভ্র টিপ - অনভ্র চাউনী ... আলোর বৃত্ত থেকে অহরহ গুছিয়ে তুলি কবোষ্ণ পালক। এই অরণ্য ঘিরে হলদেটে আলো মূল্যবোধের মত ... দিন প্রতিদিন ... যতক্ষণ পারো আমার কাঁধে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়ো ... আজ রাতে আমি তোমাকে একটা দারুণ সুন্দর রূপকথার গল্প শোনাবো।



ক্ষুধা
==

এভাবে দাঁড়ালেই ঘুরে-দাঁড়ানো হয় ... ধূ ধূ পথ ধরে জল নিরালা পান্থ জলাশয় ... আকাশের ভগ্ন তটরেখা ... বৃষ্টি ছোঁড়ে ভাসানের ডাক ... অবাক মেয়ে ... এভাবে সন্ধ্যে হয়! প্লাবনের সুরে ভাসিয়ে ভূকম্পণ, ভাঙচূর ... ফ্রেম ভেঙে পড়ে এইবার ... বসন্ত চোখে চোখ পুড়ে যায় ... দু'দিকে ডানার হাতে সূর্যক্ষুধা ... ক্যামেরায় বন্দী আকাশপাখী নীল নয়ছয় ... সাধ হয় ঐ ভাঙনের মুখে নি:শেষে ঝাঁপ দিতে ......

মনে হ'তে পারে কয়েকগুচ্ছ স্খলিত অন্ধকারে
ইটের টুকরোগুলোকে বটের শিকড় কুড়োতে পারে
তবুও এই উৎসব ছিল প্রার্থিত সংসারে



মৃত্যু
==

তোমার কান্না মাটির দু:খে মিশে দৈন্য বাড়ায় ... ভুল হয়ে যায় পথ চলা ... ভেবেছিলে, পৃথিবী ভ'রে যাবে পারিজাতে ... সব কথা বলা হয়ে গেলে। তবু শূণ্যতা ভ'রে থাকে সার্থকমূহূর্তে ... কার্যকারণহীন। পাতাগুলো পুড়ে যাচ্ছে। এ জলের দেশ শুষে নিতে পারে সব উদ্বেগ অস্থিরতা ... তৃতীয় প্রহরে রোদে একা দুলে দুলে ওঠে ভীমপলাশীর পীত ফণা। ভর দুপুরেও মাথা তো উঁচুই ... রিরংসু সূর্যের দিকে ... চুলে জল ... জলে হাসি। যাকে তুমি হৃদয় ভেবেছ, সুরক্ষিত রেখেছ, সে অন্ধকারের মত ক্ষয় ... অন্ধকারে অসংখ্য নক্ষত্রের মধ্যে সে বিশেষ ... যাকে তুমি ভালো চিনতেই পারোনি ......

হাওয়া দিচ্ছে।
হাওয়া দিচ্ছিল।
হাওয়া লেগে আরও জোরে দাউ দাউ জ্বলে উঠল চিতা।
পুড়ে গেল সমস্তই, যেটুকু পোড়ার মত ছিল।
ক্রমশ আগুন নিভল। এবং বিলাপও।
চিতাভস্ম খেয়ে মুখ মুছে শুয়ে পড়ল নদী।
তখনও হাওয়া দিচ্ছিল ...
জড়বুদ্ধি, নির্বাক, অন্ধ মাতৃহীন একটা হাওয়া।



ভয়
==

নাম ধরে ডাকতে নেই
নাম ধরে ডেকোনা - তাতে দু:খ বাড়ে
দু:খ বড় অবাধ্য
ডাকলেই চলে আসে হৃদয় দুয়ারে
হৃদয় নিংড়োতে নেই - ঝাঁপিতে বন্ধ রেখো স্মৃতি
স্মৃতি খুঁড়লে যত সব বিস্মৃত বেদনা
চোখ চিবুকের বাঁধ ভেঙে
অঝোর বর্ষার ধারাসারে
বন্যা হয়ে, জীবন ভাসিয়ে নেমে আসে
তোমার অত্যন্ত পাশে
ভয় কে কখনও তেমনি মনেও এনো না
ভয় কে ভাবলেই সে তো ভয়ংকর দৈত্যের মত
নির্জন দুপুর বলো, দু:স্বপ্নের রাত কিংবা
একাকী প্রহর
একপায়ে রক্তচক্ষু করবে এসে ভর
অরণ্যের পথ চলতে বিপন্ন আঁধারে
গাছেদের ডালপালা সরসরিয়ে ঠিক সেসময়
অশরীরী জাপটে ধরে
দু:খ, স্মৃতি, অশ্রুজল, ভয়