আপনার মতামত         


প্‌ + র্‌ + এ + ম্‌ + অ
চন্দ্রিল ভট্টাচার্য

প্রেম আবিষ্কৃত হয় ১১৭৪ সালে। ত্রুবাদুর-চূড়ামণি আন্দ্রিয়াস ক্যাপেলানাস সংজ্ঞা দেন, 'বিপরীত লিঙ্গের মনুষ্যের সন্দর্শন ও তাহার সৌন্দর্য্য সম্পর্কে অহোরাত্র চিন্তনের ফলে হৃদয়ে যে বিশেষ জন্মগত বেদনা অনুভূত হয়, তাহাই প্রেম। ইহার কারণে উভয় লিঙ্গের মনুষ্যেরই প্রধান আকাঙ্ক্ষা হইয়া দাঁড়ায় অপরের আলিঙ্গন ও পরস্পরের পূর্ণ সম্মতিক্রমে প্রণয়ের অন্যান্য প্রকরণ অভ্যাস'। অর্ক চট্টরাজের 'মধ্যযুগের চারণকবি' গ্রন্থে অনূদিত এই বিখ্যাত সংজ্ঞা নিয়ে পরে যখন ধুন্ধুমার সেমিনার হল 'অ্যাকাডেমিক সেন্টার'-এর ব্যবস্থাপনায়, মনীশ পাড়ুই বললেন, 'জন্মগত হলে সে অনুভূতিকে আবার বিপরীত লিঙ্গের 'সন্দর্শন'-এর অপেক্ষা করতে হল কেন? টীকাকার নিলয় ঘোষ 'পরস্পরের পূর্ণ সম্মতিক্রমে' কথায় আপত্তি তুলে বৈষ্ণব পদাবলী উদ্ধৃত করে এবং রাজস্থানী মিনিয়েচার পেন্টিং স্লাইডে দেখিয়ে বোঝালেন, যখন নায়িকা মুগ্ধা থাকে, অর্থাৎ প্রেমিকের অধরস্পর্শে চমকিতা, লজ্জাড়ষ্টা হয়ে মুখ সরিয়ে নেয় ও প্রত্যালিঙ্গন দেয়না, তখন তার সম্মতি ব্যতিরেকেই স্পর্শন স্তম্ভন প্রয়োগ করে তাকে 'হ্লাদিনী' স্তরে আনয়ন করতে হয় (যখন সে স্ব-উদ্যোগে নখরচিহ্ন খচিত করে প্রিয়ের দরাজ বক্ষে ও নির্লাজ বিপরীতরতাতুরা হয়ে পড়ে দ্বিতীয় প্রহরে), নইলে লীলা পূর্ণতা পায় না। 'বিপরীত লিঙ্গ' কথাটা নিয়ে প্রবল হোমো-আপত্তি তো ছিলই, সুনীতি ঘোষাল আবার বললেন প্রাচীন আইরিশ ভাষা সম্যক না বুঝেই অনুবাদ করা হয়েছে, 'লিঙ্গ'-এর পর 'মনুষ্য' কথাটি আদৌ মূল লেখায় নেই, ওটা 'লিঙ্গের সন্দর্শনে' লেখার সাহস অনুবাদকের হয়নি কেন? এই বারোয়ারি তুলোধোনার মধ্যে অর্কবাবুর ইংরিজি ও আবছা এক লাইনের জবাবী ভাষণ (' We must learn not to be bitter ') উড়ে গেল, এবং বোঝা গেল, প্রেম প্রবন্ধের স্কোপ এখনও অনন্ত।(১)

'কিনসে সেক্সোলজি রিসার্জ ও তিনটি জার্মান পরিসংখ্যান সংস্থা মিলে ইউরোপ জুড়ে ৬৪৮৯৩৬ দম্পতির মতামত নিয়ে 'বিশ্ব ইতিহাসে সবচেয়ে বড় স্যাম্পল সার্ভে' করে জানাল, প্রেম বলতে লোকে বোঝে, 'যে কোনও সমস্যা সন্ধেবেলা দোসরের কোলের কাছে নিশ্চিন্তে উজাড় করে দেওয়া'। আর যায় কোথায়, হাসাহাসি পড়ে গেল। মার্লিন থম্পসন একে 'সেফ ফ্যান্টাসি সিনড্রোম' ('সেলসম্যানের কাছে লোকে সত্যি স্বপ্নটা বলে না, বরং আন্ডারওয়্যার পরিস্কার রাখে') বলে দুরমুশ করলেন, 'গ্রো আপ ম্যান, ফ্রয়েড ইজ ডেড' প্রবন্ধে মার্টিন নাগেরওয়ালা বললেন, 'আর কতদিন সারোগেট ফাদার / মাদার সার্চ বলে এই ধোঁকার টাটি চালাবেন ? তার চেয়ে ভালো চুমু খেতে শিখুন, বুঝবেন প্রেম মানে শুধু গুটিশুটি বাৎসল্য নয়', 'প্লেবয়' পত্রিকা কার্টুন আঁকল এক মহিলা সন্ধেবেলা স্বামীর কোলের কাছে ভ্যানিটি ব্যাগ খুলে ভাইব্রেটর উজাড় করে দিচ্ছে, সিমন সনট্যাগ তাঁর স্বভাবসিদ্ধ স্টাইলে ঠোঁটে সিগার পিষে বললেন, 'নরওয়েতে তো ছ'মাস সন্ধে হয় না, তাহলে বেচারারা প্রেম করে কী করে'?

এর মধ্যেই বেরোল 'দ্য ক্রিশ্না প্রমিস', বুকার-এর শর্টলিস্টে ঢুকে বেষ্টসেলার হল। শ্রীকৃষ্ণের বৃন্দাবন-জীবন আদতে এক ছদ্মবেশী (ভিন্ন ফর্মে লেখা) লাভ-সেক্স ম্যানুয়াল এই দাবী করে সুজাতা হাজরা প্রেমের মূল তিনটি পুরুষ-প্রতিশ্রুতি লিপিবদ্ধ করলেন। ১ . তব অঙ্গের কাঁচুলি মম করাঙ্গুলি। ২ . তুমি ঘুমঘোরে পাশ ফিরলে আমি মানভয়ে ভীত। ৩ . তোমার চর্ব্বিত তাম্বুল আমি খাব, দরিদ্রের ধনের মতো তোমায় কোথায় থুই ভেবে না পেয়ে অঙ্গে অঙ্গে ফিরাব, আগালি ঘাটে তুমি স্নান করলে পিছালি ঘাটে আমি নাইব – যাতে তব পরশিত জল আমার গায়ে বয়। আর কিছু না হোক, এর মাধুর্যে বশ হবে না এমন পাষণ্ড কম। অতএব বেশ কিছুদিন হুল্লোড়, সেমিনার, বৈষ্ণব সংগঠনগুলোর খোল-কত্তাল লাঞ্ছিত প্রতিবাদ মিছিল এবং প্রেমঘন দম্পতির আগালি-পিছালি চানের স্পেশাল শাওয়ার বিক্রি(২) পুরোদমে চলল। কিন্তু অবিনাশী চিত্রকল্প এক, যুক্তিমথিত তত্ত্ব আর এক। বুকার সিজন অতিক্রান্ত এবং সুজাতার পক্ষে বাজি-ধরিয়েরা বিভ্রান্ত হওয়ার পর হুজুগ মিটল।

ভালোবাসার একটা প্রখর অবজেক্টিভ বিশ্লেষণ এ বার করলেন অসামান্য বাঙালি সমাজতত্ত্ববিদ প্রবাল সমাজদার। 'দ্য অ্যামবিগুইটি প্রিন্সিপ্‌ল্‌ বইয়ে তিনি দাবি করলেন, প্রেম জিনিসটাকে আমরা ইচ্ছে করে নিরন্তর ধোঁয়াটে আবছায়ায় রেখে যেতে চাই। কারণ, এই চিন্তাদীর্ণ বিশ্বে আমাদের অন্তত একটা যায়গা চাই যেখানে মস্তিষ্কের আলস্যকে আমরা এই বলে প্রশ্রয় দিতে পারি যে, 'এখানে ভাবনা চিন্তা বৃথা' বা 'একে বিশ্লেষণ করার চেষ্টাটাই অপরাধ'। এই 'রিফিউজ'টি অতি যত্নে আমরা তৈরি করেছি। মহাকবিও বলে গেছেন, 'প্রেম কীসে যে হয় কেউ কি জানে। কখনও চোখে চোখে, কখনও মনে মনে, কখনও আনমনে-এ-এ'। এভাবে আমরা দেশকালনির্বিশেষে এক অলিখিত 'চক্রান্ত' করে 'বাপ রে, মাথাটা তো এমনিতেই ভাবনার চোটে ভোঁ ভোঁ করছে, অন্তত এই কনসেপ্টের স্পেসে হাত-পা ছেড়ে জিরিয়ে নেওয়া যেতেই পারে', ভেবে কেবলই কুয়াশা বপন ও লালন করেছি। কিন্তু যেহেতু 'যে কোনও আবেগকে বাঁ হাতের তালুতে রেখে ধীরে ব্যবচ্ছেদ করাই সভ্যতার অভিজ্ঞান', সমাদ্দার তাঁর বইয়ের ষোলোখানি চ্যাপটারে (ডেভিড লেটারম্যান তাঁর টক-শো তে ব্যঙ্গ করে বলেছেন, 'হি ইজ সিক্সটিন গোয়িং অন সেভেনটিন') প্রেমকে স্ক্যালপেল দিয়ে চিরলেন। প্রথমে দেখালেন, বিজ্ঞান বহুদিন আগেই প্রেমকে দ্বিবিধ হরমোনের ('সেরোমোন' ও 'রক্সিটোসিন') ক্রিয়ার ফল বলে জানিয়েছে।

এর মধ্যে সেরোমোন প্রথম দর্শনের পর পুং-স্ত্রীর আকর্ষণের ধড়াসধড়াস ইমপালস্‌টি তৈরি করে। পার্টিতে অনেক দূর থেকে সম্পূর্ণ অচেনা নীল সালোয়ারকে দেখে আর তার পর তার সিঁথিতে লাল রক্তদাগটি বুঝে আপনার যে মরে যাওয়ার মতো বেদনা হয়, তার মূলে এই সেরোমোন। এর বশেই প্রেমিক-প্রেমিকা দেখা হলেই হাসে ও বিদায় নেওয়ার সময় বারে বারে পিছন ফিরে দ্যাখে সে-ও দেখছে কি না। সোজা কথায় তীব্র অপ্রতিরোধ্য প্যাশনটা তৈরি করে সেরোমোন। কিন্তু এই অবিশ্বাস্য টান, সারা দিন দয়িতের জন্য আকুলিবিকুলি, এ তো আর বেশি দিন থাকে না, থিতিয়ে আসে। তখন, সম্পর্ক হয়ে যাওয়ার কিছুদিন পর থেকে কাজ করে রক্সিটোসিন ; সে দেয় 'অভ্যাসের আরাম'। মুদ্রাদোষগুলোসুদ্ধু আমাকে এক জন মেনে নিয়েছে, ডান পায়ের কড়াটার কথা ও জানে, থাইয়ে শুকনো ফোঁড়ার কেলটে দাগ, ঢেকুরের উৎকট আওয়াজেও কিচ্ছু মনে করে না, এ ছাড়া 'আমার বাঁ পায়ের আঙুল নড়লেই আর কেই বা বুঝতে পারবে কফি-তেষ্টা পেয়েছে' – এই অনন্ত নির্ভর ও অপরিসীম স্বাচ্ছন্দ্য, সম্পর্কের প্রাথমিক উত্তেজনা চলে যাওয়া সত্ত্বেও সেটিকে টিকিয়ে রাখে এবং একটি সিমেন্টের গাঁথনি দেয়। (আবারও লেটারম্যান : 'সো লাভ ইজ আ জার্নি ফ্রম ফ্রাংক ফ্লার্ট টু ফ্রাংক ফার্ট')!(৩)

সমাদ্দার দেখালেন, সেরোমোন-এর কাজপদ্ধতিটি নিয়ে যে রহস্যটি ছিল, তা এ যুগে আর প্রযোজ্য নয়। কারণ 'মিডিয়া' ('ক্লোজ এনকাউন্টার উইথ দ্য থার্ড হরমোন') ও অনবরত কলেজে-ক্যান্টিনে-কিচেনে-কচুবনে প্রেম বিষয়ে রসালো 'গসিপ' (মিডিয়া 'আউটার স্পেস' হলে এটি 'ইনার স্পেস') মিলে মানুষকে বাধ্যতামূলক ভাবে 'স্টিমুলাস-প্রোন' (উদ্দীপকের জন্য 'অলওয়েজ-অলরেডি' প্রস্তুত) করে রাখে। কলেজ-ফেস্টে আচমকা আলাপ হওয়ার পর সেলফোনে নাগাড়ে ফোন করলে মেয়েটি ধরছে না, বাগুইআটির বুথ থেকে ফোন করলে ধরে 'হাই আমি অরিন্দম' শুনে কেটে দিচ্ছে, বান্ধবীকে বলছে 'ইউ নো কী অসুব্য' – এর সরল মানে দাঁড়ায় মেয়েটি ছেলেটিকে পাত্তা দেবে না, অর্থাৎ মেয়েটির আদৌ ছেলেটিকে দেখে বা ভেবে সেরোমোন নি:সৃত হচ্ছে না। কিন্তু তার চারপাশের আঠালো মিউজিক ভিডিও, গোলাপি বর্ডার ইংরিজি গ্রিটিংস কার্ডের কোম্পানি, অটোয় চলতে থাকা পরিত্রাহি এফ এম, বান্ধবীদের সাথে ফিসফিসিয়ে প্রণয়-উত্তেজনার বিভিন্ন কাহিনি এবং পাড়ার কাকিমার সদ্য ফুলশয্যা-আখ্যান তাকে অচেতনে তীব্র ভ্যালন্টাইনকামী করে তুলছে এবং সেরোমোন নি:সৃত হচ্ছে ইচ্ছা-নিরপেক্ষ ভাবেই। অতএব ধীরে কিন্তু নিশ্চিত টানে, অজগরের দিকে ধাবিত পাখির মতো, প্রেমের 'কনস্ট্রাক্ট' তাকে 'প্রেম হচ্ছে' এই অনুভূতির সন্ধান দিচ্ছে, অরিন্দমের প্রতি লোভ সুলসুলোচ্ছে। তাই এখন প্রেম ইচ্ছে মতো নির্মাণ করা যায়, যা, সমাদ্দারের মতে, প্রমাণ করে, ভালবাসা কোনও স্বর্গীয় রহস্য নয়। অবশ্য উনি যোগ করেছেন : এই অনুভূতিটি নির্মিত বলে (স্বত:স্ফূর্ত নয় বলে) এর গুরুত্ব বা কৌলীন্য কিছুই কমে যায় না। (এ প্রসঙ্গে উনি উল্লেখ করেছেন পোল্যান্ডের বিশ্ববিখ্যাত সায়েন্স-ফিকশন লেখক স্তানিসোয়াভ লেম-এর কথা, যিনি পৃথিবীর কানে পই পই করে আওড়েছেন : আর্টফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স-এর ফলে একজন রোবট একজন মানুষের মতই তাব্‌ৎ মৌলিক অধিকার ডিজার্ভ করে। আমি যদি কিছু যান্ত্রিক কেরামতির ফলে তাকে মস্তিস্ক দিই, অনুভূতি দিই, আবেগ দিই, তাহলে তাকে আমার সমস্ত অধিকারগুলো না দেওয়ার অধিকার আমার নেই। সে যন্ত্র, বা অযোনিসম্ভব তো কী হয়েছে, 'নির্মিত' তো সব কিছুই। কতকগুলি মোটর-নিউরোটিক ইমপালস দিয়েই কি আমি বা রবীন্দ্রনাথ নির্মিত না?)(৪)

সমাদ্দার পিয়ার-প্রেসারের (পেয়ার-প্রেসারের) কথাটাও বলে নিচ্ছেন। প্রেম হওয়া এখন আশ্চর্য দৈব বিদ্যুচ্চমক নয়, তা কম্পালসরি। পুজোয় একলা ঠাকুর দেখতে যে বেরোয়, সে ক্যবলা। একা = বোকা। আগে যেমন নাক দিয়ে অনিবার সিকনি গড়ালে বা ইংরিজি মিডিয়াম ছেড়ে বাংলা মিডিয়ামে ভর্তি হলে তাকে খেলায় নেওয়া বারণ ছিল, এখন যে লাভার জোটাতে পারে না, তার সঙ্গে মেশা বন্ধ। বন্ধুদের ঠেক-এ বিয়ের কার্ড দিয়ে তার ওপর বড় করে লেখা থাকে উৎপল+শ্রেয়সী, সৌগত+রিমি, শুভেন্দু+অহনা, নির্মাল্য একা। অতএব একলা ছেলে / মেয়েটি হড়বড় করে, স্রেফ নাগাড়ে আনস্মার্ট চিহ্নিত হবার ভয় থেকেই, 'অ্যাভেলেব্‌ল্‌'কে 'কাঙ্ক্ষিত' ভেবে নিজের মনকেই জপিয়ে নেয়। সামাজিক সম্মান রক্ষার্থে স্রেফ তার আকুল ইচ্ছাশক্তিতেই তখন সেরোমোন (সমাদ্দারের কয়েনেজ : 'উইলপাওয়ার-সেরোমোন') নি:সৃত হতে থাকে। এই বাধ্যতামূলক প্রেম-আবহে অভ্যাস-হরমোন রক্সিটোসিন কাজে নেমে পড়ে খুব তাড়াতাড়ি। এবং নিজের মনকে স্বল্প চোখ ঠারার ফাঁকফোকরগুলি অসম্ভব দ্রুত ভরাট করে একটি বইয়ে-পড়া প্রেমের তুরীয় স্তরেই নিয়ে যায়। তখন এর ঠোঁট ফুললে ঐ বুক স্বতই উপচে ওঠে। এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ প্রায় সমস্ত চলতি প্রণয়-আখ্যান, যেখানে ছেলেটি প্রোপোজ করায় মেয়েটি হতবাক, 'আমি তো ওর সম্পর্কে এরকম ভাবিইনি! 'তার পর ছেলেটির লাগাতার কান্না ও কষ্টের প্রদর্শনী ('হ্যালো, কাল কিচ্ছু খাইনি, পরশু ঘুমোইনি, তরশু ঠিক মরে যাবো) দেখে সে অবাক হয়ে ক্লাসে জানলা দিয়ে তাকিয়ে ভাবে, 'আমি এতটা মূল্যবান? আমার জন্য ওর এমন অসম্ভব অবর্ণনীয় কষ্ট হচ্ছে?' (এটা ভুলবেন না, ছেলেটির এই কষ্টগুলো কিন্তু একটু পর থেকে সত্যি সত্যিই হচ্ছে। তার এই রেসপন্সগুলো তো আউটার স্পেস ও ইনার স্পেস থেকে শেখা ও আত্মীকরণ করা, বন্ধু ও সিনেমার নায়ককে দেখে প্রতিটি লক্ষণ তার মুখস্থ, এবং কিছু ক্ষণ পর থেকেই সে অটো-সাজেশন মোডে নিজেকেই বিশ্বাস করিয়েছে যে, তার বুক মুচড়ে কান্না পাচ্ছে ও মেট্রোর থার্ড রেল তাকে বাস্তবিক ডাকছে। অতএব তার হাহাকারে ও প্রার্থনায় মেয়েটি সমূলে আলোড়িত হচ্ছে, এ আশ্চর্যের নয়)।

এর পর বেশ কিছু দিন রেজিস্ট করা সত্ত্বেও ছেলেটি-র ক্রমেই-বেড়ে-চলা প্রেম দেখে মেয়েটি প্রায় ছেলেটির কষ্ট লাঘবার্থেই সম্মতি দিল, এবং 'কে প্রথম কাছে এসেছি' বেমালুম ভুলে যাওয়া গেল ছ'মাসের মধ্যেই। সপ্তম মাসে যখন ছেলেটি সম্পর্ক ভাঙতে চাইছে, মেয়েটির হৃদয় খানখান হয়ে ভেঙে যাচ্ছে, সে গলায় দড়ি দেওয়ার আগে লিখছে 'ওকে ছাড়া আমার অস্তিত্ব একেবারে অর্থহীন', এবং এ সবের পিছনে ন্যূনতম চেষ্টাকৃত নির্মিতি নেই। অর্থাৎ, ছেলেটির প্রতি যার এতটুকু প্রাথমিক আকর্ষণ ছিল না, তার সেরোমোন ও রক্সিটোসিন এখন এতটাই কাজ করছে যে, ঐ ছেলেটির জন্য সে নিজেকে লোপ করে দিচ্ছে। এটা সম্ভব একমাত্র তখনই, যখন প্রেম 'নির্মিত' অনুভূতি। সমাদ্দার লেখেন, প্রেসিডেন্সির করিডোরে মেয়েটিকে এক দিন দেখেই ঠাউরে নিলুম যে, সে আমার ঈশ্বরী ; এটা অট্টহাস্যকর। কিন্তু সেই আবেগ থেকেই যদি পরে অকল্পনীয় ঐশ্বরিক লাইনসমূহ লিখি, তা সাহিত্যের পরম প্রাপ্তি, সুতরাং মহৎ। কিন্তু তাই বলে আবেগটিকে দৈব, বা প্রচলিত অর্থে 'সত্য' ভাবার কোনও কারণ নেই। এগ রোল-এর মতোই, তা এক নিপুণ নির্মাণ।

(এ পড়ে 'পরভৃৎ' লিটল-ম্যাগ গোষ্ঠী সমাদ্দারের নাকতলার বাড়িতে পুরীষ ছোঁড়ে ও চেঁচায়, 'এই নির্মাণগুলো পরখ কর হারামজাদা' এবং 'ফিরে এসো এগ রোল' বিশেষ সংখ্যায় 'ললাট' পত্রিকা লেখে, পাতি কথাকে অতি শক্ত কচকচিতে ঘিরলেই যদি পোস্টমর্ডান হওয়া যেত, ফেরেব্বাজির সঙ্গে তার কোনও ডিফারঁস থাকত না। সমাদ্দারের চাবি যতই 'মা মা বাঁ চা রে' বলে চেঁচাক, সাহেব-চাটা ভেগোলজির বশে কবিতার শহিদকে অপমানের জন্য তার গণধোলাই গোকুলে বাড়িছে।' উত্তরে সমাদ্দারবাবু চশমার কাচ মুছতে মুছতে বলেন, 'আমি বিনয় বুঝি দুর্বিনয় নয়।'

হরমোন দিয়ে প্রেমকে ব্যাখ্যা করার সঙ্গে সঙ্গেই সেই পুরনো তর্ক চাগিয়ে ওঠে, শরীরী আকর্ষণই প্রেম কি না। অনন্যা গঙ্গোপাধ্যায় বলেন, 'সেক্স আর প্রেম যদি আলাদা জিনিস হয়, ওয়াটার ও জলই বা ভিন্ন বস্তু নয় কেন?' অমূল্য গুহ মনে করিয়ে দেন ভলত্যারের অমর উক্তি – 'সঁ ঝুর প্যর্স ত্রিকোলি আভোয়া মত্যাঞ ভ্রুর্ল' : যৌনচেতনার মধ্যে থেকে বীর্যের মতো সহসা উৎক্ষিপ্ত হয় প্রেম, রাগমোচনের মতৈ তা কুলপ্লাবী, বিস্ফোরক, তাৎক্ষণিক ও অকিঞ্চিৎকর (ঈশোপনিষদে ৩ : ১২৪ : ৩২ নং শ্লোকে প্রায় আক্ষরিক এই কথাই বলা আছে দাবি করে বরুণাংশু মিত্র সম্পূর্ণ অন্য ধারার আলোচনার জন্ম দিতে চেয়েছিলেন ; সম্ভবত বিদ্বানদের সংস্কৃত-অজ্ঞানতার জন্য তা ধোপে টেকেনি)। এক বাজারি পত্রিকায় প্রকাশিত অনন্যার নিবন্ধে 'পূর্বরাগ'কে ফোরপ্লে এবং 'মাথুর'কে পোস্ট-কয়টাল অবসাদ হিসেবে চিহ্নিত করার পর যে তুমুল হইচই হয়, তাতে ইন্ধন জোগায় চিত্রকর দিগা মালহোত্র-র উক্তি : 'বাজি ফেলে বলছি, পুরুষের প্রেম নারীর স্তনের সাইজের সমানুপাতিক। চিঠির ঢল নামে। কেউ বলেন, নিতম্বকে অবহেলা করা হল কেন? পূর্ণ ফ্ল্যাট-চেস্টেড জ্যাকলিন কেনেডির দুর্দান্ত স্তাবকপূর্ণ জীবন(৫) তবে আমাদের কী শেখায়? অবশ্যই 'শরীর বনাম হৃদয়' লড়াইটি প্রাধান্য পায়। খবরকাগজের 'সেরা পত্র' প্রাইজ পায় জনৈক গৃহবধুর লেখা 'সবটাই শরীর হলে স্টিফেন হকিং-এর প্রেম হল কী করে?'

এর মধ্যে লাফিয়ে পড়েন বিখ্যাত লেখিকা নির্মলা শী। তিনি বলেন, 'প্রেম মানেই শরীর কদাপি নয়, কিন্তু পুরুষের কাছে প্রেম মানেই শরীর। একমাত্র নারী প্রেমের মানে বোঝে। অবশ্য পুরুষ যৌনতারও মানে বোঝে না। প্রতিটি পুরুষই আসলে ধর্ষক'। লেসবিয়ান সমিতি তক্ষুনি দৌড়ে এসে তাঁকে মেগা-সংবর্ধনা দেয়। অসংখ্য ফেমিনিস্ট সংগঠন প্রতিটি সেমিনারের আগে নির্মলার নামে জয়ধ্বনি কম্পালসারি করে। কিশোরী-যুবতীরা পুরুষ দেখলেই সুর করে 'ধর – শোক, ধর – শোক' বলে টোন কাটতে থাকে। বহু চুপচাপ পুরুষের মধ্যে থেকে বিজয়কৃষ্ণ কাব্যতীর্থ একমাত্র এর তীব্র প্রতিবাদ করে লেখেন, 'এই অমানবিক, সাম্প্রদায়িক ও সর্বোপরি ইতর মন্তব্যের চেয়ে একটুও বেশি অপমানজনক কি এই বিশ্বাস যে, প্রতিটি নারীই স্বৈরিণী?' নির্মলা দেবীর নেতৃত্বে বিজয়বাবুকে তক্ষুনি নাম দেওয়া হয় 'শভিনিস্ট শূকর' এবং পাঁচমাথা মোড়ে তাঁর পাঁচটা কুশপুত্তলিকা দাহ করা হয় (ডান হাতের প্রতিটি পাপী আঙুলের প্রতিনিধি এক একটি পুতুল)। একমাত্র 'জনয়িত্রী' ফেমিনিস্ট-এন জি ও থেকে নির্মলা কে দায়ী করা হয় তাঁর 'পীনোন্নত জঙ্গিপনা'কে বলা হয় 'পিরিটেটিংলি এটি'! (উল্লেখ্য, ষাটের দশকে আমেরিকান টিভি-র কিংবদন্তী অ্যাংকর জেম্‌স স্টিলার মেয়েদের সম্পর্কে কথা উঠলেই নানা কৌতুক শেষে অবধারিত মন্তব্য করতেন, মেয়েরা ' irritatingly petty '। মার্কিন ফেমিনিস্টরা রসিকতায় শোধ নিতে তাঁর নাম দেয় ' pirittatingly etty '। এটা এত জনপ্রিয় হয় যে 'কলোকাল অক্সফোর্ড ডিকশনারি'র ১৯৬৬ সংস্করণে ঢুকে পড়ে, যদিও পরের বছর রক্ষণশীল নয়া-সম্পাদক এটিকে ব্যাখ্যাহীন ভাবে ছেঁটে দেন। বর্তমান নিবন্ধকারের 'অভিধানের রাজনীতি' দ্রষ্টব্য. )।

নির্মলা দেবী এই প্রথম কোনও নারীসংগঠনের কাছ থেকে গাল শোনায় প্রথমটা মুষড়ে পড়েন। বিশেষত 'পীনোন্নত' ব্যাপারটায় ('ভাবতে পারছি না, আমার ভগিনীরা কী করে আমাকে একটি স্পষ্ট পুরুষতান্ত্রিক খিস্তি দিলেন - সমস্ত দৈব, পৌরাণিক ও মহাকাব্যিক নারীনির্মাণে এই বিশেষণটি কি আমাদের নিয়ত পীড়িত করে না?' এবং তারপর একাদিক্রমে তেরোটি সেমিনার করেন, যার প্রতিটিতে বক্তৃতার আগে তিনি দর্শকদের দিকে পিছন ফিরে বক্ষাবরণ সরিয়ে অন্তর্বাস খুলে ফেলেন ও ঘুরে সেটিকে টেবিলের ওপর সাজিয়ে রেখে কথা বলা শুরু করেন যাতে দর্শকদের নজর বারে বারে স্ফীত ব্যবহৃত কাঁচুলি ও উত্তুঙ্গ কাঁচুলিহীন (কিন্তু লো-কাট ব্লাউজাবৃত) অঞ্চলের দিকে যেতে থাকে ও তিনি হেসে বলতে পারেন 'হ্যাঁ, বিশেষণটি বায়োলজিক্যালি ট্রু, কিন্তু আপনাদের ঐ 'মেল গেজ'টি এথিকালি ফল্‌স। বিভিন্ন ঠুলি খুলে ফেলার এই প্রয়াস যদি জঙ্গি হয়, তবে তা-ই সঙ্গত ভঙ্গি।'(৬)

ব্যাপারটা গোদা লেভেলে চলে যাচ্ছে দেখে 'স্প্যারো পাবলিকেশন্স' ব্রিটেন থেকে উড়িয়ে আনে সুনেত্রা স্পিনোজা সেনগুপ্তকে, যিনি 'বর্তমান সোশিও-ইকনমিকো-রিলিজিও-কালচারো-হিস্টোরিও-পোস্টমডার্নো-পোস্টকলোনিয়ালো-পোস্টপর্নো কনটেক্সটে লভ' বিষয়ে ঠাসা কক্ষে দুর্দান্ত বক্তৃতা দেন ; যার পর অসম্ভব হাততালি পড়লেও, পরের দিন কোনও রিভিউ বেরোয় না। কারণ, কেউ এক অক্ষরও বোঝেনি। ফিরে গিয়ে তিনি খুব রেগে ছোট্ট ই-মেল পাঠান : খাজুরাহোর দেশ প্রেম বোঝে না আর শপকিপার্স নেশন-এ সিনেমা হলে পপকর্ন ছুঁড়লেও তা 'ইডিপাল ট্র্যাজেক্টরি' মেনে উদ্দিষ্টের মাথায় পড়ে। এর মানে বুঝতে পারেন শুধু অলক্ত নাগ (দেরিদা কলকাতায় আসার সময়েও তিনি কী সব বুঝতে পেরেছিলেন)। তিনি লিটল ম্যগাজিনে নাতিদীর্ঘ একটি প্রবন্ধ লখেন, 'ক্যান দ্য স্যাভেজ লাভ?' যার প্রতিপাদ্য খুবই সোজাসাপ্টা : ওনলি দ্য স্যাভেজ ক্যান লাভ --

'আমরা নিয়ত লাথি খাই, কিক। আমাদের তুলে নিয়ে যায় তোমাদের ভ্যান, তোমাদের ক্লিন-শেভ্‌ড্‌ দারোগা আমাদের মা-বোন বউদির আ-শরীর হাতড়ায়, যায় সূর্য যায় দুর্ঘটনা, গরাদে ও টর্চারচেম্বারে আমাদের ঘিলু লেগে থাকে, চুঁইয়ে যায় তোমাদের বুটের ডগায়, থ্যাঁতলানো কান নিয়ে নিজের রক্ত চেটে আমরা ছুটে যাই অ্যাপো করতে ল্যাম্পপোস্টের তলায়, বাল্ব ভেঙে দিই, গেলে দিই তোমাদের ক্যামেরার চোখ, পাতানো বউয়ের আলজিভসুদ্ধু শুষে নিই এক সমুদ্রচুম্বনে, ঘুমঘোরে অদিতি এসে বলে যায়, যুবক নষ্ট কোরো না বীজ। হ্যাঁ, আমরা, এই তৃতীয় বিশ্বের লাথখোর কুত্তার বাচ্চারা তোমাদের ফ্যাকাশে আত্মাকে শেখাব প্রেম, লভ, থাবায় ও শ্বদন্তে স্বেচ্ছাহারেমবন্দি-র বন্দনা, বালিগঞ্জ পাড়ার বেহ্মপনায় এক পা তুলে আমরা ইয়ে করি,আমাদের বিচ্ছিরি শ্বাস আর ঘেমো গেঞ্জি বুকে নিয়ে মোটা বউ উবু হবে টিউকলে, জানলা দিয়ে আমরা তাকিয়ে দেখব আর বলব আয় খুকি টুকি খেলব শৈশবপাড়ায়, আমাদের পারফিউম নেই ললিপপ নেই মোনোপলি নেই ন্যাকা মোনোগ্যামি নেই শুধু আছে গতরজোড়া ঘা, এঁটুলি, উন্ড : অলঙ্কার। উই ক্যান ওয়েট, উই ক্যান থিংক, উই ক্যান ফাস্ট। এন্ড হেন্স, উই ক্যান লাভ।'

অলক্ত-র গদ্য চিরকালই দুরন্ত। তার ওপর গরিবদরদ বড়লোকবিরোধ তাঁকে লিটল-ম্যাগের নয়নমণি করেছে। এই প্রেম-ডিসকোর্স ক'দিন খুব শহর মাতায়। সুনেত্রা স্পিনোজা বিনীত ভাবে জিজ্ঞেস করেন, কোনও সুলিখিত কবিতাকে প্রবন্ধ নাম দেওয়া যায় কি না। এ তরজা কিছুদিন পরে শুকিয়ে আসে, কারণ একজনের পক্ষে ছিল স্রেফ নীরস বিদ্বৎসমাজ আর একজনের পক্ষে আবেগসর্বস্ব গাড়লরাশি। বহু পরে অবশ্য তুলনামূলক সাহিত্য বিভাগের এক অধ্যাপক আত্মহত্যা করলে তাঁর জার্নাল ঘাঁটতে গিয়ে পুলিশ আন্দাজ করে, তিনি সুনেত্রার বক্তৃতার কিছুটা বুঝতে পেরেছিলেন। কিন্তু সেই বুঝতে পারাটাই তাঁর সত্তায় প্রেম সম্পর্কিত ভয়াল বিবমিষা তৈরি করেছিল ও 'এই চৈতন্যের কর্কশ আলোক হতে অন্ধকারে লইয়া যাও' সূচক অয়দিপাউসীয়-আত্মহননে নিয়ে গিয়েছিল, এই সন্দেহে পুলিশ ডাইরিটি পুড়িয়ে দেয়। কারণ সুনেত্রা সম্পর্কে কোনও ঋণাত্মক মন্তব্যই রাজ্যের পক্ষ থেকে করা যাবে না।(৭) তবে কিনা, প্রাগৈতিহাসিক বিলুপ্তিরও চিহ্ন রয়ে যায়। অধ্যাপকটি যে বন্ধুকে প্রতি সপ্তাহের মঙ্গলবার সন্ধ্যায় তাঁর ডাইরি পড়তে দিতেন, তাঁর স্মৃতি থেকে কিছুটা উদ্ধার করা যায় - সুনেত্রা বোধহয় লাকাঁ-র 'মিরর স্টেজ'-এর থিওরিকে প্রেমিক-প্রেমিকার পরস্পরের চোখের আয়নায় নিজেদের বুঝে নেওয়ার মাহেন্দ্রক্ষণে কনভার্ট করতে চেয়েছিলেন --

সংক্ষেপে : বুকের-দুধ-খাওয়া ছেলে প্রথম প্রথম ভাবে মা আর সে এক-ই, একই শরীর ও সত্তা। তার পর যখন মা ছেলেকে আয়নার সামনে তুলে ধরেন, সে বোঝে, তারা আলাদা, স্বতন্ত্র দু'জন (বাজে কোম্পানির আয়না হলে অবশ্য গোড়ায় অতটা বুঝতে পারে না)। তাতে তীব্র বিচ্ছেদের যন্ত্রণা তো হয়ই, সঙ্গে থাকে ফের মায়ের সঙ্গে একীভূত হওয়ার আকাঙ্ক্ষা। এই কামনা কিন্তু যৌনতায় জারিত। তখন এই দুইয়ের মধ্যে ঢুকে পড়েন বাবা, বজ্রগর্ভ স্বরে বলেন 'না!' অর্থাৎ ভাষা ঢুকে পড়ল। ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, তার মধ্যে নিহিত আছে সামাজিক বিন্যাস, অনুশাসন, নিষেধাজ্ঞা, প্রথা, ক্ষমতার মেরুকরণ। ছেলেটি অগত্যা বাবার শাস্তির ভয়ে, মা ছড়া অন্যান্য মা-জাতীয় প্রাণীর দিকে তার লালায়িত নজর ঘুরিয়ে দেয়।(৮)

সুনেত্রা বলছেন, প্রেমের প্রথম পর্যায়ে প্রণয়ীরাও ভাবে, তারা একই সত্তা। প্রেমিকের পাঁচটা পাঁচে ভিতরটা উছলে উঠলে, আলাদা উড়াল পুলে থেকেও সে নিশ্চিত জানে, প্রেমিকারও ঐ মুহূর্তেই রঙিন ফোয়ারা বার্স্ট করছে। বাসে ওঠার সময় ওর মনটা দপ করে বসে গেলে, পেছন না ফিরেও জানে, এরও মুখটা নিভে গেল। কিছুদিন গড়ালে, দুজনে যেই না একে অন্যের শ্বাসের কাছে ঝুঁকে পড়েছে -- পরস্পরের চোখে নিজেদের উদ্যত ও ব্যক্তিগত প্রতিবিম্ব দেখতে পায়, আচমকা বুঝতে পারে, তারা আলাদা মানুষ। তখন আগের একাত্মতায় ফিরতে, 'আমি তোমায় ভালবাসি' এই শব্দগুচ্ছ দুজনেই বার বার আকুল আবৃত্তি করতে থাকে। কিন্তু এই যে স্রেফ একটা চাহনিতে ওর বুকের এক্স রে-টা নিজের বুকের টের পাওয়ার ইন্দ্রজালকে সরিয়ে, সভ্যতা-নির্মিত ভাষা ঢুকে পড়ল, এতে এক পৃথিবীর ভুলচুক ঘটে যায়। কারণ ভাষা হল চিন্তার অনুবাদ, প্রকৃত অনুভূতি ও তার মাঝখানে একটা তেরছা ছায়া লম্বালম্বি পড়ে আছে। 'ব ¤ক মু চ ড়ে উ ঠ ছে' ধ্বনিগুলো শুনে কি মোচড়ানির মরণ টের পাওয়া যায়? প্রেম কি প+ র + এ + ম + অ? যেমন একটা ক্যাসেট থেকে আর একটা ক্যাসেটে রেকর্ড করলে, তারপর আর একটায়, ক্রমেই আসল গানটার ঔজ্জ্বল্য কমে আসে, তেমনি আমাদের অনুভূতির চরম ও পরম টান সামাজিকতা-ব্যাকরণ-বাগ্মিতার ফিল্টার চুঁইয়ে উচ্চারিত কথার প্রকাশে দূরাগত ঘণ্টাধ্বনির মতো দুর্বল দ্যোতক হয়ে মিটমিট করে মাত্র। আর, ভাষার থাকে তাব্‌ৎ লৌকিক ব্রণ : অস্বচ্ছ স্বেচ্ছা-অস্পষ্টতা, 'ওর কী শুনলে ভালো লাগবে' তার আন্দাজে আপোসী বয়ান।

কিছু পরে যুগল এই ধোঁকার টাটি-ও বুঝে পায় এবং এবার আক্ষরিক অর্থে একাত্ম হবার জন্য, শারীরিক মিলনে ব্যস্ত হয়। এ ওর মধ্যে প্রবিষ্ট হয়ে গেলে তো আর আড়াল থাকবে না। কিন্তু হায় এ হল পোস্ট-পর্নো সমাজ। এখানে যৌনতার সকল 'ডু' ও 'ডোন্ট', পারফেক্ট পারফরম্যান্স-এর খুঁটি ও নাটি, অঙ্গের উত্তেজক বিন্দু ও বলয় ; ধাপ, মাপ, তাপ, ক্রিয়া ও কলাপ পইপই করে হলুদ বই নীল ছবির ফ্রেমে শেখানো আছে, মগজে খচিত। মানুষের পাশবিক ভাবে মিলনে রত হওয়ার অপূর্ব অশ্লীল লাইসেন্স হৃত। তাই এই বন্য আকুলতাও আগের সেন্সরগুলোর মধ্য দিয়েই বয়ে, গ্রহণযোগ্য হয়ে আসে। গলা দিয়ে শুয়োরের শীৎকার নির্গত হতে চাইলেও তা বের করা যায় না, ঝরঝর করে যে খিস্তি করে উঠতে ইচ্ছে হয় তাকে সহসা উদ্‌গত মলের মতো, চেপে ভেতরে ঢুকিয়ে দিতে হয়। অর্থাৎ, এক বার ভাষা উচ্চারিত হয়ে যাওয়ার পর, এমনকী নৈ:শব্দ্যও ভাষার মতৈ প্রথাসিদ্ধ কোড ও কড়ার নিয়ে প্রেমকে এক মশারির মতো ঘিরে দেয়। নিষ্পাপ বাতাস আর কখনও ঢুকবে না জেনে, প্রণয়ীরা আইনক্সে হাত ধরে সিনেমা দ্যাখে। সুনেত্রা থিওরিটির আংশিক আভাস দেওয়ার জন্য 'লাস্ট ট্যাংগো ইন প্যারিস'(৯) ছবিটির উদাহরণ দেন, যেখানে পরস্পরের নাম-পরিচয় কিচ্ছু-না-জানা নায়ক-নায়িকা ভাড়া করা অ্যাপার্টমেন্টে নিয়মিত সেক্স করে ও তাদের মধ্যে প্রেম উপজাত হয়। যে মুহূর্তে আরও ঘনিষ্টভাবে 'জানতে' ইচ্ছে যায়, গ্রিড ফেলে সামাজিক কো-অর্ডিনেটগুলো বুঝে নেওয়ার উপক্রম ঘটে, ভালবাসা হুমড়ি খেয়ে নিহত হয়। (এই ছবির কিছু উত্তেজক নগ্নদৃশ্য যে সুনেত্রার বক্তৃতাকালীন দেখানো হয়েছিল, সেটা ঐ সভাস্থ অনেকের মনে পড়ে গেছে)।

স্বাভাবিক ভাবেই, এই জাঁদরেল তত্ত্বের চেয়ে 'লাথখোরের মহিমা'বাচক কাব্য সকলেরই বেশি পছন্দ হয়েছিল। এবং ব্যাপার এক বার কবিতায় গড়ালে রক্ষে নেই, রসভাণ্ড উপচে পড়ে। 'কে বি সি'র পর ভারতে সর্বাধিক জনপ্রিয় গেম শো 'ইনভার্টেড কমা -- দ্য কোটেশন কনটেস্ট' (এটিও অমিতাভ বচ্চন সঞ্চালিত) পর পর চারটি এপিসোডে তাদের বিষয় রাখল 'প্রেম'। খেয়াল রাখতে হবে এটি ইতিহাসে একমাত্র গেম-শো যা না দেখে অমর্ত্য সেন ডিনার খেতেন না। জাজের প্যানেলে সুনীল, গুলজার, অরুন্ধতী রায়। কলকাতার সেমিফাইনালিস্ট শীলভদ্র 'বাজিমাত রাউন্ড'-এ নিক্ষেপ করলেন সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় : 'আমাদের তো চেষ্টা করতে হবে পরস্পরের প্রেমে পড়তে, যদি আমরা তা পারি সেই হবে আমাদের প্রেম। আমাদের সময় লাগবে এবং সফল হব কিনা আমরা জানি না। এ-ভাবে প্রেম না হলেই ছিল ভালো, তবু আমরা দুজনে কাছাকাছি এসেছি কিছু আশা করে ; আমাদের দুজনেরই তা না-হলে আর চলে না বলে। তবে কেন তুমি এত passionately এগিয়ে আসছ? আমাকে এমনভাবে চুম্বন করতে দাও যা হবে কিছুটা মৃতদেরও।'
রজত শাহ চোস্ত প্রতিদ্বন্দ্বী, বাঙালির আঁতলেমো আন্দাজ করেই তিনি শানিয়ে রেখেছিলেন উইট-ধাঁধানো উডি অ্যালেন : 'ভালবাসলে বেদনা পেতে হবেই। বেদনা এড়াতে না-ভালবাসা উচিত। কিন্তু তখন আবার থাকে না-ভালবাসার বেদনা। অতএব ভালোবসলে বেদনা পাববেন, না-ভালবাসলে বেদনা পাবেন। বেদনা পেলে দু:খী হবেন। এ দিকে ভালবাসার প্রতিশব্দ হচ্ছে সুখ। তার মানে সুখী হতে গেলে বেদনা পেতে হবে। কিন্তু বেদনা পেলে দু:খী হয়ে যাবেন। অতএব দু:খী হতে গেলে হয় ভালবাসতে হবে, অথবা বেদনাকে ভালবাসতে হবে, অথবা অতিরিক্ত সুখভোগের বেদনায় কাতরাতে হবে। আশা করি এগুলো আপনারা টুকে নিচ্ছেন।' প্রবল হাততালির মধ্যে ঐ এপিসোডের নির্দিষ্ট 'অ্যান্টি-ক্লাইম্যাক্স পার্সন'-এর হাতে দান যেতে, তিনি 'প্রেমপ্রেমাপ্রেম-প্রেমা, ঘরের মধ্যে এ মা!' বলে ব্রেক দিয়ে দিলেন।(১০)

তবে এ সবকিছুকে ঢেকে পশ্চিমবঙ্গে উদিত হল শম্ভুচরণ চক্রবর্তীর 'একটি সাধারণ মানুষের ডায়েরি'। কোনও বাংলা বই নিয়ে আজ অবধি এত উস্তমখুস্তম হয়নি, সেমিনার থেকে চৈত্রসেল অবধি বচ্ছরভর থরথর করে কাঁপেনি, কফিহাউসের সামনে রক্তারক্তি হয়নি, কোনও লেখক একই সঙ্গে গোপাল ভাঁড় আর অঁদ্রে জিদ বিশেষণে ভূষিত হননি। একটা বড় অংশ উদ্ধার করার লোভ সামলানো গেল না :

ফের মুন্ডু ঝুলিয়ে বসে আছে। ফোঁত ? ফোঁত ? দীর্ঘশ্বাস আর্ট ফিলিম স্টাইলে। প্রথমটা ভেবেছিলাম, ডিপ্রেশন মানাচ্ছে। ডিস্টার্ব নিষেধ। এতো আর আমাদের জমানা নয় যে গোমড়া-কাটিং লোক দেখলে 'মোলো যা, এর হল কী! রোদ উঠছে হিম পড়ছে শুক্কুরবার শুক্কুরবার ফিলিম রিলিজ করছে, জোয়ান ছেলে মিছরির মতো বিষাদ চুষছিস! চ, রুমালি রুটি দিয়ে এগ-তড়কা পেঁদিয়ে আসি!' বলে পিঠে সপাট স্নেহরদ্দা কষিয়ে বাড়ির বাইরে নিয়ে যাব? এখন ডিপ্রেশন হচ্ছে মারকাটারি ফ্যাসন স্টেটমেন্ট। আঁতেলদের বাড়ি ফোন করলে আগে শোনা যেত 'বাথরুমে'। এখন কাজের লোক বলে, 'দিদি এট্টু ডিপ্রেশনে আছেন, আপনি তিন মাস বাদে ফোন করুন'। তবু তুতো-ভাই বলে কথা। ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করলুম। বললে 'ইয়ে হয়েছে, প্রেম কেটে গেছে'। তা কে কাটলে? 'আমিই।' কেন? 'ফ্রিজিড ছিল।' অ্যাঁ! একেবারে ইংরিজি জানি না তা নয়। কিন্তু এমন চকিত অমানবিক দড়াম, প্রেমের ব্যাপারে, কস্মিনে শুনিনি। ফারদার বজ্রপাত নেমন্তন্ন করতে সাহস হচ্ছে না, ফ্র্যাংকতাকে কে না ডরায়! ফ্রিজিড মানে কি রেস্তোরাঁর কেবিনে / ফাঁকা লিফটে / আঁধার দোতলা বাসে খুচরো উত্তেজনায় স্ট্রিক্ট নারাজ, না রোববার দুপুরে নির্জন বৈঠকখানায় পিছন থেকে সিংহ-ঝাঁপালে 'ই-মা' বলে কবাডি-ভঙ্গিতে পিছলে যায়? কীসে ফিটফাট প্রণয় জমবে? এস এম এস-এ ডার্টি জোক এনজয় করতে জানতে হবে? রাত্তিরে ফিসফিসে ফোনে বলবে, 'এই জানো, ঐ সব সাইট সার্ফ করছিলাম'? এরা হায় কোন অশালীন ল্যান্ডিঙে এসে দাঁড়াচ্ছে? আমরা কি এত স্থূল দাগে ভেবেছি কখনও? ফ্ল্যাংক চেঞ্জ করে জিজ্ঞেস করলাম, তো চুপ করে আছিস কেন? দু:খ হচ্ছে? ছুঁচলো গিল্ট? 'আরে না না, ভাবছিলাম ক'দিন রেস্ট নেব। দেখছি আর একটা সিড়িঙ্গেপানা মেয়ে পেছনে ছোঁকছোঁক করছে। কিন্তু এখন আবার মিহি চাউনি চিঁহি হ্রেষা হিহি চুটকি এফর্ট দিতে ইচ্ছে করছে না।' রেগে গেলাম। এরম বিচ্ছিরি করে প্রেম নিয়ে কথা বলাটা কি স্মার্টনেস? অবাক হয়ে তাকাল কিছু ক্ষণ। হেসে বলল, 'মেজদা, ন্যাকামি খুব ভালো জিনিস, কিন্তু সবসময় না। নিজের মনের সঙ্গে নেকুয়াছকুয়া না করলে দেখো অ্যাসিডিটিও কম থাকবে। সত্যি বলো দেখি বাপ, রাত্তিরে মশারির চালের দিকে তাকিয়ে বলোনি, 'এই অ্যাফেয়ারটা কেটে গেছে ভালোই হয়েছে, এবার কেউ প্রোপোজ করলে ভাইটালস্ট্যাট-টা দেখে নেব'? সন্দীপন পড়োনি, 'যৌনতা প্রেমের মহাজন'? সর্বক্ষণ উদয়াস্ত তাকে ট্যাক্স শুধে যেতে হচ্ছে, বোঝো না? অতটা অশিক্ষিত নই যে বলব, যৌনতাই প্রেম। কিন্তু এতটা গামবাটও নই যে জানব না, মগজ বডিরই এক্সটেনসন। প্রণয়ে শরীরের চেয়ে মনের কৌলীন্য বেশি – ও সব সকালবেলার খ্যাঁচাকল,সভ্যতার জ্যালজ্যালে মলাট, চটচটে লেবেল। রাত্তিরের ব্যাকরণ আলাদা। এবং তা-ই তাব্‌ৎ ভণ্ডামির মুখে লাথ মারা, কাঁচা ব্যাকরণ। আঁধার বালিশে ব্রেন আর বাথরুমে ঢুকে সিভিলাইজেশনের নাকের উপর দরজা বন্ধ করে দিয়ে যা ভাবো, যা নিজে ছাড়া কারো কাছে স্বীকার করোনি, সে-ই সত্য। আঁশটে কিন্তু সত্য। অ্যান্ড দেয়ারফোর পবিত্র। শুধু তাই পবিত্র, যা ব্যক্তিগত। ও পরমধন দিয়ে রচনা লেখা যায়না ঠিকই, ' Aim in Life '-এ হারেম রাখব লিখলে রামধোলাই অবশ্যই, কিন্তু প্রেমে অন্তত সেই সততার ইস্তমাল করো হে মানবক! সাগরসেঁচা মানিকটিকে তো আর বাঁধানো দাঁতের জলে ভিজিয়ে রাখতে পারো না। অফিসে-ইউরিনালে সামাজিক থাকতে হচ্ছে, এ দুর্ভাগ্য যথেষ্ট নয়? লেপের তলায়ও ন্যাজে রিবন লাগিয়ে রাখছ? রোজ সকালে আচমন করবে দু'লাইন যুগান্তর চক্রবর্তী দিয়ে, 'তোমার বুকের জামা তুমি খুলে দেবে নিজ হাতে, / আমি চাই। আমার নশ্বর হাত অন্যত্র রয়েছে।' বক্তিমেটি শুনে, কী বলব, ডবল-আঁক।

শুধু শম্ভুবাবুর চটুল ও দুর্ধর্ষ 'আঁক' ও 'ডবল-আঁক' কষার জন্য নয়, গুলিয়ে যাওয়া হাফ-দর্শনের জন্য এ বইকে শাহিদুল হক তাঁর বিখ্যাত রিভিউতে যে তুলোধোনা করেছিলেন, আমাদের মনে আছে নিশ্চয়ই। বিশেষত তাঁর অনবদ্য হুল-ফোটানো মন্তব্য : 'এ বই perversion -এর perfect version ' এক সময় মুখে মুখে ফিরেছে। তবু, বঙ্গীয় প্রেমতর্ক-কে ছোঁ মেরে কাঁটাওলা (ও আনুষঙ্গিক গোলাপ-সমন্বিত) সত্যের জমিতে নামিয়ে আনায় এ বইয়ের অবদান জোড়করে মনে রাখতে হবে।(১১)

প্রেমের ব্যবহারিক প্রয়োগ নিয়ে আলোচনা ও নিজস্ব শিবির পত্তনের জন্য এবার বিতান বাগচি ('কলি-কালকেতু' ভাষায় : প্রেম বিতানে সাক্ষাৎ মহিষ) খুললেন 'সোসাইটি ফর পলিগ্যামাস রাইটস'। সমাদ্দারের তত্ত্বকে চ্যালেঞ্জ করে বলা হল, রক্সিটোসিন বলে কোন হরমোনের অস্তিত্ব নেই। ঐ 'অভ্যাসের আরাম' আসলে সিভিলাইজেশনের দুরন্ত দাপট, সভ্যতার দাবড়ানি। ভালোবাসা চলে যায় একমাস সতেরো দিন পরে, অর্থাৎ সেরোমোনের প্রভাবটুকু উবে গেলেই। তার পর তা স্বীকার করে বর্তমান প্রণয় ছেড়ে পরবর্তী প্রেমের দিকে এগিয়ে যাওয়াই সত্যিকারের প্রবৃত্তি, প্রকৃত সভ্যতা। কিন্তু আমাদের বিকৃত সমাজ বলে, তা দূষণীয়। এ ছাড়া মঙ্গলবার মিনতিকে দেখে সেরোমোন নির্গত হয়েছে বলে বুধবার প্রণতিকে দেখে সে নি:সৃত হবে না, তা তো হতে পারে না। অতএব একই সময় একই সঙ্গে একাধিক ভালোবাসাই আমাদের স্রষ্টার কাঙ্ক্ষিত আচরণ। সমস্ত মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে গিয়ে সমাজের চাপিয়ে দেওয়া মোনোগ্যামি-ই উদ্ভট, অশ্লীল। পলিগ্যামি চললে কে কার সন্তান ঠিক মতো নির্ধারণ করা যাবে না এবং সুতরাং সম্পত্তি-বন্টনের অসুবিধে হবে –
শুধুমাত্র এই কারণে মানুষের উপর এক অ-মানবিক শর্ত চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে, যা তাকে করে তুলেছে অন্য সব জন্তুদের চেয়ে পরাধীন। রাষ্ট্রের সুবিধে হবে বলে আমরা কোটি কোটি প্রজন্মের পর প্রজন্ম আমাদের অসম্ভব ভাললাগাকে গলায় পা দিয়ে মারব? আমরা যা চাই তার একদম উল্টোদিকে গিয়ে গোটা জীবনটা বাঁচব? যদি সত্যভাষণের মুরোদ থাকে, তবে বুঝব, যে কোনও প্রেমসম্পর্কে ছ'মাস এক বছর যেতে না যেতেই দেখা যায়, একজন হয়তো তখনও ভালবাসছে, অন্য জনের অবশিষ্ট আছে শুধু একটু মায়া, কিছুটা ভদ্রতা। সম্পর্ক ভাঙছে না শুধু এই মানবিকতার খাতিরে যে, আমি চলে গেলে ওর মরে যাওয়ার মতো কষ্ট হবে। সইতে পারবে না।' এছাড়া আছে সভ্য মানুষের সহজাত ও হাড়হিম ভয়, স্থিতাবস্থা ভেঙে দেওয়ার। এই তো দিব্যি চলছে, আবার সেই অসহ্য একলা লাগার অকূল পাথারে পড়ব? সবচেয়ে বড় কথা, এ তো তবু জুটেছিল, আর একটা প্রেম আদৌ হবে তো? এবং দাঁত খিঁচিয়ে হাঁ করে আছে সোশ্যাল স্ক্যান্ডাল। এ বাড়ি ও বাড়ি সমস্ত জানাজানি হয়ে গেছে, মা বিয়ের দিন ঠিক করতে চাইছেন মে মাসে, রোববার দুপুরে ও এসে মাংস-ভাত খায়, সমস্ত বন্ধু 'কী রে, বউ কী রকম আছে' চেঁচিয়ে জিজ্ঞেস করে। এখন সম্পর্কটা ভাঙি কোন মুখে? যদি জাদুবলে প্রেম থেকে এই সামাজিক দায়গুলো (যার মধ্যে 'মানবিকতা'ও পড়ে, যা সামাজিক মূল্যবোধ অনুযায়ী নিজেকে শ্রদ্ধা করার আবশ্যিক শর্ত) মাইনাস করে দেওয়া যেত, জাস্ট তোমার পাস্ট-টা রবার দিয়ে মুছে দেব, কোনও অস্তিত্বই থাকবে না, কে কে বর্তমান সম্পর্কটা হাপিস করে দিতে চাও? ক'টা হাত উঠত? বিতান বলছেন, সব ক'টা। অর্থাৎ যে কোনও সম্পর্ক প্রাথমিক বার্স্ট-টার পর, টিকে থাকে প্রেম থেকে নয়, প্রেমের চেয়ে বহুগুণ শক্তিশালী ফোর্স যৌনতা থেকেও নয় (কারণ একটা শরীর সে সোফিয়া লরেনের / মার্লন ব্র্যান্ডোর হলেও, মোটামুটি নিয়মিত তালুবন্দি ও ঠোঁটস্থ হয়ে যাওয়ার পর তার চার্ম অন্যের ঈর্ষা থেকে খুঁটে নিতে হয়), স্রেফ অপরাধবোধ থেকে। যে এ ম্যা, লোকে আমায় কী বলবে? নিজেই বা আমাকে কী ভাবব? ছি:! আমি কি ঐ রকম? এ দিকে এফ টিভি দেখে, বন্ধুর বউয়ের উতরোল শাড়ি দেখে, রাস্তায় কমলা টপ দেখে দীর্ঘশ্বাসের স্রোত বয়ে যাবে। তখন ভাবা, এটাই ভালবাসা। এই ও অন্যের সঙ্গে ফ্লার্ট করলে হিংসে, ওর জন্মদিন মনে রেখে জয় গোস্বামীর বই উপহার। আবডালে 'তিতির' বলে ডাকা। পুরোটা এক 'অটো-হিপনোটিজম'-এ চলছে। প্রতিটি লোক জানে, ভণ্ডামি করছে। তবু নিজের মনকে চোখ ঠেরে, ঠকে যাওয়া। সতীত্ব। এর চেয়ে বড় পারভার্শন হয় কি? আমাদের ধারণার 'প্রেম' আসলে পৃথিবীর সবচেয়ে 'প্রেম-বিরোধী' কনসেপ্ট।(১২)

আরতি গুহরায় (প্রাথমিক ভাবে বিতানবাবুর সমিতিরই সদস্যা, পরে বেরিয়ে আসেন) এই মতকে সামান্য শোধন করলেন। বিতানবাবুর তীক্ষ্ম সত্যভাষণকে ভূয়সী শ্রদ্ধা জনিয়ে উনি বললেন, ঠিকই, আমাদের সভ্য সমাজের সংস্কার আমাদের শিখিয়েছে গায়ের জোরে একটা প্রেম টেনে নিয়ে যেতে অনন্তকাল, কারণ তা-ই নাকি সত্যিকারের প্রেমের ধর্ম। নি:সন্দেহে প্রেমের এর চেয়ে বড় অপমান হতে পারে না। কিন্তু শুধু তত্ত্ব দিয়ে তো জগ্‌ৎ চলবে না, সমাজকে তো একটা ব্যবস্থা নিতেই হবে তার ভিত পাহারা দেওয়ার। বিতানবাবুদের সভাগুলি যে ডানপন্থী-বামপন্থী নির্বিশেষে ঢিল ছুঁড়ে ভণ্ডুল করেছে, এক ইংরেজি দৈনিকের 'ওপিনিয়ন পোল'-এ সাধারণ মানুষ যে তাঁকে 'ভিলেন অব দ্য সেঞ্চুরি' নির্বাচিত করেছেন হিটলারকে পিছু হটিয়ে, সে আসলে শুধু অশিক্ষিতের আক্রোশ নয়, সমাজের স্তম্ভগুলি সুরক্ষিত রাখার একটা ডিফেন্স-মেকানিজম। এ ব্যাপারটিকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করে, স্রেফ আনন্দের (উনি ব্যবহার করেছিলেন একটু জটিল ইংরাজি শব্দ : ' hedonism ' – আনন্দবাদ) ভিত্তিতে একটি জগ্‌ৎ গড়া যায় না। তা হলে তো এই যুক্তিতে সমগ্র সভ্যতা-নিগড়কেই অস্বীকার করতে হয়। হঠাৎ ইতিহাসের গতি ঘুরিয়ে 'দাও ফিরে সে আদিম সভ্যতাহীনতা' চেঁচানি নিশ্চয়ই সুবিধের হবে না।(১৩) ১৯৯৫ সালে জোসেলিন মুরহাউস নির্মিত 'হাউ টু মেক অ্যান অ্যামেরিকান কুইল্ট' (একটি মার্কিন কাঁথা কীভাবে তৈরি করতে হয়) ছবিটি থেকে একটি সংলাপ-সূত্র গ্রহণ করে আরতি বললেন, শ্যাম ও কূল উভয়েই থাকবে এমন একটি অপটিমাম-উপায় হল : সিরিয়ালাইজড মোনোগ্যামি। 'একই সঙ্গে একাধিক সম্পর্ক (অর্থাৎ দ্বিচারণ, বা ত্রিচারণ বা n -চারণ) আমি করব না' এটুকু সংযম অভ্যাস করতেই হবে। তা প্রেমের নীতির দিক থেকেই সত্য। কারণ যতক্ষণ আমি ভালবাসছি, ততক্ষণ তো ওর কষ্ট আমাকেও কষ্ট দেবে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, আমার প্রেম ফুরিয়ে গেলেও আমি বলিপ্রদত্ত। এই সম্পর্কটি ভেঙে বেরিয়ে যাওয়ার অধিকার যে কোন মুহূর্তে আমার আছে এবং তা অন্য সম্পর্কের জন্যও হতে পারে। বিতানবাবুর সঙ্গে আরতি একমত যে, মিরাক্‌ল্‌-মার্কা ব্যতিক্রম ছাড়া প্রেম কখনঐ দেড়-দু'বছরের বেশি স্থায়ী হতে পারে না। যেটাকে আমরা প্রেমের প্রথম (প্যাশনেট) স্তর বলি, আসলে সেটুকুই প্রেম। শেষ হলে, অন্য একটি সম্পর্ক করা, এবং এ ভাবে, সমগ্র জীবন ধরে বেশ কয়েকটি সম্পর্কের মধ্য দিয়ে যাওয়া-ই এক সমৃদ্ধ ও স্‌ৎ জীবনে প্রণয়প্রক্রিয়া।

আরতি দেখিয়েছেন, সভ্যতা অনবরত স্ব-সংশোধনের মধ্য দিয়ে কিন্তু অন্ধ ও নিখুঁতভাবে এই জায়গাতেই পৌঁছেছে। এক বিস্তৃত গবেষণায় সারা বিশ্বের ৪৩৮২ টি বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্যাম্পাস-ইন্টারভিউ পরিচালনা করে (এর মধ্যে কোনও ইসলামী রাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয় ধরা হয়নি কেন, তা নিয়ে ধুন্ধুমার করেন নাজেস ওয়াজেফ, সমর্থনে এগিয়ে আসে 'আল-হায়বাদার' গোষ্ঠী, প্রায় গোটা বঙ্গীয় বিদ্বৎসমাজ, এবং শেষ অবধি আরতি 'বেশ করেছি, কারণ শুধু মুক্তমনাদের নিয়ে আমার কারবার' উক্তি করায় হাঙ্গামা তুঙ্গে ওঠে, তাঁর 'ধারাবাহিক মোনোগামিতা ফোরাম' থেকে একটি বড় অংশ বেরিয়ে যায় কবি উল্লাস রাহুত ও অ্যাক্টিভিস্ট রেশমি মল্লিকের নেতৃত্বে, এক নামী দৈনিকে সম্পাদকীয় বেরোয় 'মুক্তমনা প্লাস সাম্প্রদায়িক : অক্সিমোরন না শুধু মোরন?')(১৪) তিনি দেখান, সমস্ত সংস্কৃতিতেই অধিকাংশ যুবকযুবতী মনে করেন, একটা সম্পর্ক 'কেটে' যাওয়া দুর্ভাগ্যজনক হলেও, তা স্বাভাবিক এবং মেনে নেওয়াটাই উচিত। কিন্তু দ্বিচারণ মেনে নেওয়া যায় না। কেউ যদি 'একদা আমায় প্রেম করেছিলে তবে আজি ভাঙিলে কেন' অভিযোগে অ্যাসিড বাল্ব ছোঁড়ে, তা কোনও মতেই সমর্থিত হয় না। কিন্তু 'আমার অজান্তে একই সময় ওকেও উষ্ণ লালা দিচ্ছিলে কেন' প্রশ্নের বিষ সম্পূর্ণ সঙ্গত। (প্রেম ছাড়িয়ে বিবাহে গেলে অবশ্য এশীয় ছাত্রছাত্রীদের মত একতম সম্পর্কের বৃত্তে ফিরে যায়, কিন্তু বিবাহে যে প্রেমের মৃত্যু, তা প্রমাণে কোন বুদ্ধিমানই বা এনার্জি ক্ষয় করবে?)

আরতি কানাডায় অভিবাসী হয়ে চলে যাওয়ার পর, হঠাৎ পশ্চিমবঙ্গে প্রণয়-আন্দোলনের স্রোত ঝিমিয়ে পড়েছে, সন্দেহ নেই। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় চম্‌ৎকার বলেছেন, 'সবাই আবার পাহাড়ি সান্যালের মতো ভালো হয়ে গেছে, কালাপাহাড়ি মেজাজটা কই?' সহসা ঢেউ-তোলা বঙ্গীয় প্রেমতর্ক নিয়ে অনেকেই মুখ বেঁকিয়েছেন। বিদেশে এমন কথা শোনা গেছে : 'যে কথা আমরা পঞ্চাশ বছর আগে জানতাম, তা আজ আবিষ্কার করে তোমাদের আত্মপ্রসাদ কেন?' অনেকেরই মতে, পূর্ব-ইয়োরোপ বা লাতিন আমেরিকার তুলনায় আমদের ডিসকোর্স পাতি ও হাস্যকর। কিন্তু সাধারণ বাঙালির চিন্তন ও মননের জগতে এ লাগাতার ধাক্কার প্রভাবে অন্য মতচর্চার ও তার প্রশ্রয়ের যে ধারা সূচিত হয়েছে, তা অন:স্বীকার্য। উপরন্তু, প্রবালবাবুর তত্ত্ব সারা বিশ্বে গৃহীত হওয়ায় আমাদের হোলসেল হেলাফেলা করা যাচ্ছে না। অবশ্য অনেকেই বিতানবাবুকে প্রকৃত বিপ্লবী মনে করেছেন ('দ্য রিয়্যাল রাডিক্যাল : দ্য কারেজ টু গো বিয়ন্ড প্রিটেনশনস' – লুই থরো। মান্থলি রিভিউ, ২০০৪ জুলাই সংখ্যা, দ্রষ্টব্য ), এখানেও সত্যজিৎ-ঋত্বিকের মতো শিবিরভাগ রয়েছে। বিতান মাথার হ্যামারেজের (এক আর এস এস সমর্থকের অতর্কিত আঘাতে) পর স্বেচ্ছানির্বাসনে যাওয়ায় তাঁর গ্ল্যামারও বেড়েছে। শম্ভুবাবুর বই তো এখন সাতটি ভাষায় অনূদিত। তা থেকে রোমান পোলানস্কি ছবি করতে চাইছেন, তাঁকে 'বাঙালি ফ্লবেয়ার' আখ্যা দিয়ে ফ্রান্স নিয়ে যেতে চাইছে নিজের দেশের নাগরিক করে। তাঁর এক বিখ্যাত উক্তি দিয়েই নিবন্ধটি শেষ করা যুক্তিযুক্ত : 'আরে বাবা, ভালবাসা শেষ পর্যন্ত একটা খুব বেশি পাত্তা পেয়ে যাওয়া চার অক্ষর বই তো নয়।'



ফুটনোট
১ . অর্ক চট্টরাজের বইটির ইংরাজি অনুবাদ The Wandering Poets of the Medieval Times: Knights in Their Shining Lyrics -এর ৪৭তম সংস্করণে (সেমিনারের পরের বছর প্রকাশিত) বিশেষ নোট-এ লেখা হয় : (ক) বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথের মতো, বাংলা প্রেমচিন্তায় এ বইকে টপকে নতুন ভাবনা আসাটাই একটা খবর, (খ) পৃথিবীতে আর কোনও বইয়ের দুটি লাইন নিয়ে একটি পণ্ডিত-অধ্যুষিত বিতর্কসভার আয়োজন হয়েছে বলে প্রকাশকদের জানা নেই, (গ) আর কোনও সাম্প্রতিক মানুষ অমন তীব্র আক্রমণের পর মাত্র এক লাইনের অনবদ্য, অতলান্ত, সংযত জবাবের মহত্ত্ব ধারণ করেন কি না, ভাববার। পরে, 'মেনসা টি-শার্ট কোং' এই কোটেশনটির সত্ত্ব কিনে নেয় মোটা দামে, এবং 'পাই'-এর মান লেখা গেঞ্জির পরেই, এই লিখনওলা বেনিয়ান সর্বোচ্চ বিক্রির রেকর্ড করে।
২ . শাওয়ারটির অভিনব ডিজাইনের পেটেন্ট নেয় 'জাগুয়ার'। এই স্যানিটারি গুডস সংস্থার বাৎসরিক টার্নওভার বাড়ে এক লাফে ৪ . ২৭ % , কিন্তু এর কোনও লভ্যাংশই তারা লেখিকাকে দিতে আদৌ রাজি নয়। এ নিয়ে মামলা চলে এবং আদালত রায় দেয়, উক্ত বাথরুমসামগ্রীর ধারণা ঐ গ্রন্থ থেকেই এসেছে, এ অনুমানের ভিত্তি নেই। যদি বা তা হয়ও, লভ্যাংশ পাবেন বিদ্যাপতি-চণ্ডীদাসের পরিবার, যা আর সম্ভব নয়।
৩ . 'জে লেনো শো'-তেও বইটির উল্লেখ করা হয় কৌতুকসহ বেশ কয়েকবার। কিন্তু তাতে আক্রমণের আভাস ছিল কম। হয়তো তৃতীয় বিশ্বের প্রতি জে-বাবুর বিশেষ বিদ্বেষ নেই। স্মর্তব্য, টক-শোগুলি প্রবালবাবুকে নিয়ে উত্তেজিত হয়ে ওঠে। একটি ভারতীয় লেখকের নন-ফিকশন মার্কিন ও ইউরোপীয় বেস্টসেলারে এবং সাহেববোদ্ধামহলে সপ্তাহের পর সপ্তাহ উচ্চতম জায়গা ধরে রাখছে বলে নয়, এই লেখক ডাঁট দেখিয়ে ওপরা উইনফ্রে-র শো'র আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করতে পেরেছেন বলে। 'আমি বই লিখি, ব্লার্ব নয়' – প্রবালের এই স্পর্ধিত উক্তি তাঁকে অনেকের শত্রু / বন্ধু করে। ওরহান পামুক বলেন, 'বইটা আগে পড়ার উৎসাহ বোধ করিনি। এবার না-পড়ে থাকব না।'
৪ . লেম সম্প্রতি প্রয়াত। তাঁর সম্পর্কে উৎসাহীরা পড়ে নিন মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুবাদে 'পৃথিবী কী করে বাঁচলো' (ছোটগল্প সংকলন) ও 'মুখোশ ও মৃগয়া' (দুটি উপন্যাস), দুটিই দে'জ থেকে প্রকাশিত। উল্লেখ্য লেম-এর উপন্যাসের ভিত্তিতেই তৈরি হয় আন্দ্রেই তারকভস্কি পরিচালিত চলচ্চিত্র 'সোলারিস'। লেম এ ছবি একেবারে পছন্দ করেননি।
৫ . ইনি পৃথিবীর দুই সবচেয়ে শক্তিশালী পুরুষ মার্কিন রাষ্ট্রপতি জন এফ কেনেডি ও পরে গ্রিক ধনকুবের অ্যারিস্টটল ওনাসিস-এর স্ত্রী। অনাবৃত অবস্থায় রৌদ্রস্নানকালে এঁর প্রায় অস্ফুট স্তনদ্বয়ের মধ্যাঞ্চলেই ওনাসিস বিবাহপ্রস্তাবসূচক হীরকাঙ্গুরীয়টি রাখেন। ফ্যাশন নির্মাণ ও নির্ধারণের এক দেবী হিসেবে এঁকে নিয়ে নিদেন ২৫টি জনপ্রিয় গান রচিত হয়েছে। গানগুলি পুরুষের লেখা।
৬ . এতদ্বারা তিনি বাল ঠাকরে-র তৃতীয় ফতোয়াটি অর্জন করেন।
৭ . 'সুনেত্রা আমাদের সম্ভাব্য নোবেল-প্রাপকদের বারে বারে পৌঁছে দিচ্ছেন সুচারু অনুবাদের সেতু বেয়ে কমিটির দোরগোড়ায়। এ অবদান কী সাংঘাতিক, বোঝেন? ভারতরত্ন পাওয়ার মতো নয়? বোঝেন, সুনেত্রা আগে জন্মালে আমরা বিভূতিভূষণ, মানিক, জীবনানন্দ, আরও তিন-চার জন নোবেল-লরিয়েট পেয়ে যেতে পারতাম? ... হ্যাঁ, সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়কে আমরা জমি দিয়েছি ও তাঁর নামে আবাসন করেছি, সুনেত্রার নামে করিনি, এ আমাদের ত্রুটিই নির্দেশ করে। গণমুখী হলেই চলবে না, জনগণের মুখ ঠিক দিকে ঘুরিয়ে দেওয়াও আমাদের কাজ। ... শি ইজ ইন্ডিয়া, হ্যাঁ, ফরেনের কাছে, শি ইজ ইন্ডিয়া।' - শারদীয় 'সুমেরু' পত্রিকায় মুখ্যমন্ত্রীর দেওয়া সাক্ষাৎকারের অংশ।
৮ . এ প্রসঙ্গে চর্চাকারী মহলে অবধারিত ভাবে লুচিও মেচানোত্তি-র 'অতিনির্ণীত প্রতিবিম্বায়ন'-এর কথা এসে পড়ে। বাবা ছেলের মধ্যে নিজের প্রতিবিম্ব দেখছেন আবার প্রতিবিম্বের মধ্যে ছেলেকে দেখছেন। এর ফলে 'ইদ ও ইগোর মধ্যবর্তী সূক্ষ্ম ঝিল্লিটির সাহায্যে (অধি)চেতনে অভ্যন্তরীণ পূর্ণ প্রতিফলন' ঘটার সমূহ সম্ভাবনা, এবং সেক্ষেত্রে লাকাঁ-কথিত এই প্রক্রিয়ার বদলে, আলোচ্য বাবাটি নিজ পিতার আদল (স্মৃতির আবরণে যা কেবল স্নেহশীল রূপে প্রক্ষেপিত) মনে করে সে মহিমামণ্ডিত বেদীতে নিজেকে অধিষ্ঠাতা দেখার এষণায় ('অয়েল পেন্টিং এফেক্ট') আদৌ পুত্রের প্রতি শাসনবার্তা না-ই উচ্চারণ করতে পারেন, নিজের আইডিলিক ঔজ্জ্বল্যে বিচরণের মহড়ায় এই দ্বন্দ্ব থেকে প্রস্থান করতে পারেন। অবশ্য অনুভূতির প্রতিসরণের ক্ষেত্রে (মূল কারণ : ইমোশনাল কোশেন্ট ১ / ২২-এর অনধিক), দ্বন্দ্বসম্পর্ক জটিলতর, এ প্রবন্ধের পরিসরে তার আলোচনা সম্ভব নয়। মেচানোত্তির তত্ত্বটি সুনেত্রার মতো বাঘা-বিদূষী উল্লেখই করবেন না, এ প্রায় অবিশ্বাস্য। তবে এ বিবরণও তো, লিয়ঁ মেকাসঁ-এর ভাষায় 'কোয়াড্রুপলি রিমুভড' (স্পিনোজার বক্তব্য শুনছেন অধ্যাপক, তিনি ডাইরিতে তা লিখছেন, বন্ধু তা পড়ছেন, স্মৃতি থেকে উদ্ধার করছেন), অতএব এই কথাগুলিকে প্রমার মর্যাদা না দিয়ে, বিদগ্ধ এক গূঢ়ভাষের ইশারা হিসেবেই দেখা ভাল।
৯ . বারনার্দো বার্তোলুচি পরিচালিত এই ছবি প্রকাশকালে (১৯৭২) প্রবল আলোড়ন ফেলেছিল। মাখনমথিত পায়ুকামের দৃশ্যের জন্য নিষিদ্ধও হয়েছিল। আজও এর থিম অনুসরণ করে বহু ছবি তৈরি হয়ে চলেছে। মানুষ-মানুষী যত ক্ষণ শুধুই দেহলিপ্ত অচেনা প্রাণী, জন্তুর মতন, তত ক্ষণ সুখী। যেই পরস্পরকে সামাজিক অবস্থানে চিনতে উৎসাহী (ও সুতরাং অধিকারবোধে প্রণোদিত), সম্পর্ক ভাঙছে। সাম্প্রতিক 'ইন্টিমেসি' (হানিফ কুরেশির একাধিক গল্পের উপর আধারিত ও প্যাট্রিশ শেরিউ পরিচালিত) ও 'ল'এন্যুঈ' (রচনা : আলবার্তো মোরাভিয়া, পরিচালনা : সেড্রিক কান) দেখুন। এগুলিতে অবশ্য পায়ুকাম দেখানো হয়নি।
১০ . রজত শাহ জিতে যাওয়ার পর বাঙালির প্রবল প্রতিবাদের কথা অনেকেরই মনে পড়বে। বিশেষত 'এই বিচারকরা গভীরতার তুলনায় ওপরচালাকিকে প্রশ্রয় দিয়েছেন বেশি'র উত্তরে অরুন্ধতীর 'অ্যালেন ইজ নো লেস অ্যান ইন্টেলেকচুয়াল দ্যান এনি বেঙ্গলি' বিস্ফোরক উক্তিও। কিন্তু লক্ষণীয়, যেখানে টেলি-ট্রান্সলেটরের সাহায্যে বিচারকসহ অধিকাংশ মানুষ অনুষ্ঠান বুঝছেন, সেখানে রজতের লাগাতার ইংরাজি উদ্ধৃতি-নির্বাচন ও অস্কার ওয়াইল্ড, স্যামুয়েল বেকেট, জাক কেরুয়াকের মতো আন্তর্জাতিক আইকন বাছাই তাঁকে অনেক এগিয়ে রেখেছিল, শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়-জর্জ বাতাই-ভবভূতি নির্ভর শীলভদ্রের চেয়ে।
১১ . শম্ভুবাবুর পর পর চার বছর এম টিভি পরিচালিত ভোটে 'গুরু অব দ্য ইউথ' নির্বাচিত হওয়া এটুকু বোঝায়, তিনি অন্তত যাঁদের নিয়ে লিখেছিলেন, তাঁদের কাছে নায়ক। তাঁর সিনিক ও নিয়মিত প্রাণায়াম করতে ভুলে যাওয়া প্রোটাগনিস্টকে নিয়ে কমিক্স সিরিজও প্রকাশিত হয়েছে। তাঁকে নিয়ে তৈরি পনেরোটি ইন্টারনেট সাইট-এ দৈনিক 'হিট'-এর গড় ১১৩৭।
১২ . সম্প্রতি ভাস্বর দীর্ঘাঙ্গী তাঁর "বিতান কী তানে বেজেছেন' পেপারে বলেছেন, বিতানবাবু আসলে প্রেমের অনস্তিত্বে ও শুধুমাত্র যৌনতার জান্তব তাড়নায় বিশ্বাসী ; কিন্তু সেই তরল ও বহুচর্চিত যুক্তিটিকেই সাজিয়েছেন বহু ভড়ং ও শক্ত শব্দের আলপনায়। তাই তাঁকে আমরা সহসা অনন্যা ও শম্ভুর চেয়ে আলাদা করে চিনতে পারি না। অতএব যদি কোনও কিছু সবচেয়ে 'প্রেম-বিরোধী' হয়, তা তাঁর তত্ত্ব। তিনি আসলে চাইছেন 'দ্য রাইট টু ইটার্নাল অর্জি'। তাঁর মস্তিষ্ক নয়, লিঙ্গ কথা বলছে।
১৩ . পার্থপ্রতিম সরকার 'তা হলে মা তুমি অ্যানার্কিস্ট কীসে?' ('অপর' ছোটপত্রিকাতেই প্রকাশিত) নিবন্ধে বলেন, বিতানবাবুর বিরুদ্ধে শুধু নয়, জান্তে / অজান্তে অ্যানার্কিজমের বিরুদ্ধে গিয়ে আরতি দেবী যে অপরাধ করলেন, তা অক্ষমণীয়। আরতি অ্যানার্কিস্ট হতে চান কি না, সে প্রশ্ন আলাদা (উনি যদি নিজের কাজের মানে না জানেন তবে বাথরুমে গিয়ে বসে থাকুন), কিন্তু তিনি কেন এই সভ্যতার একটিও মূল স্তম্ভকে সমর্থন করবেন, যেখানে আন্দোলনটা আসলে সভ্যতার কুশলী ঘাঘু বিন্যাসটারই বিরুদ্ধে? তাঁর বক্তব্যের এই 'অর্ডার / ডিসিপ্লিন ছাড়া জগ্‌ৎ হয় না' মর্মার্থই সবচেয়ে পচা, বুর্জোয়া, ক্ষতিকর এবং যুগ যুগ ধরে শুয়োর-রাষ্ট্রের শক্তিশালীতম আয়ুধ। সচেতন ভাবে 'কেঅস' উদযাপন করে যেটুকু বিতানবাবুরা কাঠামো ভেঙে এনেছিলেন, তা দ্বিগুণ মজবুত করে জুড়ে দেওয়ার অভিযোগে মহিলার কোর্ট মার্শাল হওয়া উচিত। ক্যাঙারু কোর্টে।
১৪ . মোটামুটি সকলেই আরতির এই সাম্প্রদায়িক মন্তব্যে ('মুসলিমরা মুক্তমনা হয় না' মর্মে) প্রবল কুপিত হলেও এবং এর জন্য তাঁকে অসম্ভব তিরস্কার করলেও, আরতির মূল তিন সহকারী বার বার বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলি বাছা হয়েছিল 'র‌্যান্ডম স্যাম্পলিং' পদ্ধতিতে, একটা বৃহ্‌ৎ 'পপুলেশন'-এর মধ্য থেকে, এবং বাছার সময় আরতি দেবী সেখানে ছিলেনও না। বরং নাজেস একটি সম্পূর্ণ 'নন-ইস্যু'কে নিয়ে হঠাৎ হইচই শুরু করেন স্রেফ একটা গোলমাল বাধিয়ে জনপ্রিয়তা অর্জন করবেন বলে, এবং এতে আরতি দেবী অনুচিত রকমের মাথা-গরম করে বেফাঁস কথাটি বলে ফেলেন। কথাটি সমর্থনযোগ্য নয়, এটি আরতি দেবীর মনোভাবও প্রতিফলিত করে না। কিন্তু এটিকে একটি প্রধান কাণ্ড হিসেবে প্রোজেক্ট করা হলে আরতির মূল কাজটা থেকে অহেতুক ফোকাসটা সরিয়ে নেওয়া হবে।



কৃতজ্ঞতা : অপর (ষোড়শ)