বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

বিজ্ঞান ও অনুসন্ধান – স্বাধীন নির্মোক, পরাধীন গবেষণা

জয়ন্ত ভট্টাচার্য

 

১৯৪৪ পরর্তী আমেরিকা – বিজ্ঞানের নতুন চেহারা

১৯৪৪-এর ১৭ নভেম্বর তারিখে প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট-এর নির্দেশে ও অনুরোধে ভ্যানেভার বুশ (তৎকালীন Director of the Office of Scientific Research and Development) একটি রিপোর্ট প্রস্তুত করে পাঠালেন রুজভেল্ট-এর কাছে। ১৯৪৫-এর জুলাই মাসে প্রকাশিত প্রায় ২৫০ পৃষ্ঠার সে বিখ্যাত ঐতিহাসিক রিপোর্টের নাম Science – The Endless Frontier (A Report to the President on a Program for Postwar Scientific Research)। সে রিপোর্ট একসময়ে বিস্মৃতিতে চলে যাবার অবস্থায় ছিল। কিন্তু “full attention to these matters was stimulated primarily by the Russian sputnik. Immediately after its successful launching, the post of Special Assistant to the President for Science and Technology was created; and the President's Science Advisory Committee — which had been established under the Office of Defense Mobilization in 1950 — was reconstituted and placed directly under the President.” অর্থাৎ, রাশিয়ার স্পুটনিক অভিযান সবকিছু গন্ডগোল করে দিলো। বিজ্ঞান এবং এর ফলিত চেহারা, সামাজিক গঠন ও তার বিস্তৃতি নিয়ে আবার নতুন করে গোড়ার থেকে ভাবনা চিন্তা করা শুরু হল আমেরিকায়। বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক গবেষণায় এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রচুর আর্থিক অনুদান পেতে শুরু করলো। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এসময় থেকে প্রকৃতপক্ষে গবেষণাগার হয়ে উঠলো।

 প্রসঙ্গত, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি দিয়ে যুদ্ধ জয় করা যায়, উপনিবেশ গড়া যায়। কিন্তু তা দীর্ঘকালীন হবার সম্ভাবনা কম। বিশেষ করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চোখে আঙ্গুল দিয়ে এ সত্যকে দেখিয়ে দিয়েছে। ফলে মানসিক, বৌদ্ধিক ও চিন্তার উপনিবেশ তৈরি করাও সমধিক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠলো। পরিণতিতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং চিন্তার ইতিহাস সংক্রান্ত তত্ত্ব নির্মাণেরও কারখানা হয়ে গেলো। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, এডওয়ার্ড সইদ তাঁর সুবিখ্যাত বহু আলোচিত Orientalism গ্রন্থে দেখিয়েছেন কি বিপুল পরিমান অর্থের বিনিয়োগ হয়েছে শুধুমাত্র ওরিয়েন্টালিজম-এর ধারণা নির্মাণের জন্য। আমাদের জন্য এ আলোচনায় এটা খুব প্রাসঙ্গিক নয়। শুধু উল্লেখমাত্র।

 ১৯৭০-এর দশক অব্দি বলা যায় উচ্চশিক্ষায় কর্পোরেটের অনুপ্রবেশ মোটের উপর একটা লক্ষ্মণরেখার মধ্যে ছিলো। যদিও ১৯১৮ সালেই থরস্টাইন ভেবলেন বলেছিলেন – জ্ঞান জগতের ও বিদ্যাচর্চার আদর্শবোধগুলো বাণিজ্যিক চাপের কাছে, এর জরুরী চাহিদার কাছে ক্রমশ নতিস্বীকার করছে (“The run of the facts is, in effect, a compromise between the scholar's ideals and those of business, in such a way that the ideals of scholarship are yielding ground, in an uncertain and varying degree, before the pressure of businesslike exigencies.” – Thorstein Veblen, The Higher Learning in America: A Memorandum On the Conduct of Universities By Businessmen , 1918, p. 142) ১৯৭০ থেকে আজ অব্দি একদিকে যেমন আমেরিকায় সরকারের অনুদান ও অর্থসাহায্য ক্রমহ্রাসমান, অন্যদিকে তেমনি কর্পোরেটের অনুপ্রবেশ এবং বাড়বাড়ন্ত ক্রমবর্ধমান। সোজা কথায় বললে – বাজারকে সবকিছু নির্ধারণ করতে দাও (let market decide)। রাষ্ট্র হাত গুটিয়ে নেবে, বাজার ও কর্পোরেট সংস্থা হাত বাড়িয়ে দেবে – যেমনটা আমাদের দেশে গত তিন দশক ধরে জোর কদমে শুরু হয়েছে। ভালো-মন্দের বিচার না হয় এ মুহূর্তে তোলা থাক, বাস্তব অবস্থা সামনে আসুক। চোমস্কির একটি পর্যবেক্ষণ স্মরণ করা যেতে পারে এখানে – গ্লোবালাইজেশন আমাদের অফুরান সুযোগ দিয়েছে, সমৃদ্ধির আলো আমাদের চোখ ধাঁধিয়ে দিচ্ছে, কিন্তু এর সাথে রয়েছে “growing inequality, as some lack the skills to enjoy the wondrous gifts and opportunities”. (Chomsky, “A World without War”, in The University, State, and Market: The Political Economy of Globalization in America , ed. Robert Rhoads and Carlos Alberto Torres, 2006) সবমিলিয়ে ১৯৭০-এ যেখানে কর্পোরেট সংস্থাগুলোর গবেষণার কাজে ২.৩% আর্থিক দায়িত্ব বহন করতো, ২০০০-এ এসে তার পরিমান দাঁড়ালো ৮%, ২০১৬-তে প্রায় ১৫% বা আরো বেশি – যেহেতু কিছু তথ্যবিভ্রাট রয়েছে। (Derek Bok, Universities in Marketplace: The Commercialization of Higher Education, 2003)

 ১৯৮০ সালে প্রেসিডেন্ট হিসেবে রোনাল্ড রেগানের নির্বাচন বোধ করি “big pharma”-দের উত্থানের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে। এসময়ে কেবলমাত্র রাষ্ট্রনীতিতে নয়, সসামাজিক ক্ষেত্রেও প্রবলভাবে pro-business shift হল। ১৯৮০-তেই রচিত হল বি/কু-খ্যাত Bayh-Dole Act (Pub. L. 96-517, December 12, 1980)। ইন্ডিয়ানার ডেমোক্র্যাট সেনেটর বার্চ বে এবং কানসাসের রিপাব্লিকান সেনেটর রবার্ট ডোলের যৌথ উদ্যোগে জন্ম নিল এ আইন। পুঁজির অবাধ বিচরণের জন্য যাহা ডেমোক্র্যাট তাহাই রিপাবলিকান। টেকনোলজি ট্রান্সফারের নামে – “Bayh-Dole enabled universities and small businesses to patent discoveries emanating from research sponsored by the National Institutes of Health (NIH), the major distributor of tax dollars for medical research, and then to grant exclusive licenses to drug companies.” (Marcia Angell, The Truth about the Drug Companies: How They Deceive Us and What to Do about It , 2004, p. 7)  

অস্যার্থ, সরকারি সংস্থাগুলোর টাকায় মৌলিক গবেষণাসমূহ হবে বিশ্ববিদ্যালয় বা অন্য কোন ল্যাবরেটরিতে আর এর ফল ভোগ করবে শক্তিমান বহুজাতিক কোম্পানি। এখানে একটি তথ্য জানিয়ে রাখি। মার্সিয়া আঞ্জেল ১৯৮০ থেকে ২০০০ সালের মে মাস পর্যন্ত নিউ ইংল্যান্ড জার্নালের প্রধান সম্পাদক ছিলেন। নীতিগতভাবে জার্নাল পরিচালনার সাথে অমিল হবার দরুন তিনি পদত্যাগ করেন এবং তার পরে এ বইটি লেখেন।

১৯৮০ পরবর্তী কর্পোরেট দুনিয়া এবং বিশ্ববিদ্যালয়-অ্যাকাডেমিয়া যোগাযোগ

কৃষি ও রাসায়নিক পদার্থের দুনিয়াজোড়া ব্যবসার আলোচনার শুরুতে একটা তথ্যে আমরা নজর রাখবো। Iowa – আমেরিকার কৃষক অঞ্চল বলে পরিচিত – ডেমোক্রাটদের শক্ত ঘাঁটি বলে পরিচিত। এবং আইওয়ার ভোট আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে বেশ খানিকটা প্রভাবিত করে। ওবামা ২০১২-তে ওখানে ইলেক্টোরাল ভোট পেয়েছিলেন ৫.৮। এবার ডোনাল্ড ট্রাম্প রিপাব্লিকান হয়েও পেয়েছেন ৬টি ইলেক্টোরাল ভোট। ২০১৭-র ৪ঠা জানুয়ারির নিউ ইয়র্ক টাইমস পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্য হুবহু তুলে দেওয়া যাক।

Candidate Party Votes Pct.   E.V.
Donald J. Trump   Republican   800,983   51.1%   6
Hillary Clinton   Democrat   653,669   41.7   —
Gary Johnson   Libertarian   59,186   3.8   —
Others   Independent   19,992   1.3   —
Others   32,201   2.1   —

এর পেছনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাস আছে। Washington Times পত্রিকায় ১৭ মে, ২০১৫-তে সাংবাদিক এস এ মিলার একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন - Hillary’s agribusiness ties give rise to nickname in Iowa: ‘Bride of Frankenfood’। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট পদের শক্ত দাবিদার হিলারি ক্লিন্টন, যার নিজের সামাজিক এবং প্রশাসনিক ওজনও যথেষ্ট নজরকাড়া, যেন ফ্রাঙ্কেনফুড বা GM food (genetically modified food)-এর কনে! কেন এমন কথা? কারণ এ বিশেষণ হিলারির হয়ে যারা প্রচারাভিযান চালাচ্ছিলেন তাদের মুখে ঘন কুঞ্চনরেখা তৈরি করেছিলো। এদের জানা ছিলো আয়ওয়ার কৃষকেরা নিজেদের শস্যের ব্যাপারে স্পর্শকাতর। এরা ঘোরতর GM food বিরোধী। “A large faction of women voiced strong support for Mrs. Clinton ’s candidacy until the GMO issue came up.” GM food-এর ব্যাপারটা প্রচারে আসার পরেই পরিস্থিতি আমূল বদলে যেতে থাকে। পরে আর হিলারির পক্ষে সামাল দেওয়া সম্ভব হয়নি। আইওয়াতে হিলারির মুখপাত্র জেমস বার্জ বলেন – ““It’s quite a big issue. There’s people who are just wild about all the use of GMOs.”

GM ফুড নিয়ে এতো সমস্যা কেন? একটি সহজবোধ্য কারণ হল স্বাভাবিকভাবে যে খাদ্য উৎপাদন হয় GM ফুডের উৎপাদনের হার তার তুলনায় অনেক বেশি, মুনাফাও বেশি। এই মুহূর্তে আমেরিকার ৫৪% খাদ্যদ্রব্য জেনেটিক্যালি মডিফায়েড। এবং ৭০% খাদ্যের অন্তত একটি উপাদান জেনেটিক্যালি মডিফায়েড। আরো একটি প্রাসঙ্গিক কারণ হল GM ফুডের উৎপাদন কেন্দ্রীভূত কয়েকটি হাতে গোনা দৈত্যকায় বহুজাতিক কোম্পানির হাতে। তার মধ্যে প্রধানতম হল মনসেন্টো (Monsanto)। বোধ করি সবাই এর নাম জানে। ২০১৪ সালে GM ফুড থেকে এদের বিক্রীর পরিমাণ ১৫.৯ বিলিয়ন ডলার, ২০১৩-র বিক্রীর পরিমাণের থেকে ১০%-এরও বেশি। এরকম এক বাজার কে হাতছাড়া কে করে? আর এখানেই আইওয়ার কৃষকদের সাথে গোল বাধে Monsanto-র মদতদাতা হিলারির। এখানে দু-একটি প্রসঙ্গ বিবেচনায় চলে আসে – প্রথম, এরকম একটি উচ্চ প্রযুক্তির খাদ্যকে বাজার-জাত করতে হলে এর জন্য সাহায্যকারী বৈজ্ঞানিক গবেষণাপত্রের সাহায্য  নিতেই হবে; দ্বিতীয়, মানব শরীরে এরকম নতুন খাদ্য কি কি সমস্যার জন্ম দিতে পারে সে সম্পর্কে অবহিত হতে হবে। বিশেষ করে আমেরিকায় GM ফুডের কোন লেবেলিং বা চিহ্নিত করে বাজারে ছাড়া এরকমটা কম হয়। তাহলে মুনাফা এবং প্রয়োজনীয় বৈজ্ঞানিক গবেষণা একসাথে এক যৌগপদ্য তৈরি করলো।  

[এখানে আমরা স্বচ্ছন্দে ওবামার জায়গায় ট্রাম্প, ক্লিন্টন বা বুশ-কে বসিয়ে দিতে পারি।]

এবার একটি ভেন ডায়াগ্রাম দিয়ে বিষয়টি বোঝার চেষ্টা করবো।

এই ভেন ডায়াগ্রাম ভালো করে দেখলে পরিষ্কার হয় যে Monsanto একটি swinging door-এর মতো কাজ করে। ডেমোক্র্যাটিক বা রিপাব্লিকান, কোন ধরনের সরকার হবে সেটা এদের আদৌ কোন বিবেচ্য বিষয় হয়না। যে সরকার-ই হোক না কেন এদের নির্বাচিত এবং নির্ধারিত প্রতিনিধি সে সরকারে থাকবে, এবং গুরুত্বপূর্ণ নীতি-নির্ধারক হিসেবে থাকবে।

উপরের কার্টুনে যেমন দেখিয়েছে, আর কেঊ নয় খোদ বিদায়ী প্রেসিডেন্ট ওবামা আমেরিকা তথা গোটা বিশ্বের ওষুধ, কৃষিজাত বিষয় এবং বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থের গুণাগুণ ও মাত্রা নিয়ে যে নির্ধারক সংস্থা সবকিছু ঠিক করে সেই FDA-তে (Food and Drug Administration) ২০১৫ সালে সরকারের প্রতিনিধি করে পাঠিয়েছিলেন ডঃ রবার্ট ক্যালিফকে (Robert Califf)। রবার্ট ক্যালিফ-এর এফ ডি এ-তে পদ ছিলো Commissioner of Food and Drugs।  FDA-তে আসার আগে তিনি ছিলেন ডিউক ইউনিভার্সিটিতে কার্ডিওলজি-র প্রফেসর। ডিউক-এ থাকার সময় Eli Lilly, Merck, Novattis-এর মতো বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানীর কাছ থেকে তিনি কয়েক মিলিয়ন ডলার গবেষণা অনুদান এবং মাইনে হিসেবে নিয়েছিলেন। যেসময়ে ক্যালিফ ক্যালিফের সাথে বিভিন্ন ফার্মাসিউটিকাল কোম্পানীর যোগাযোগ নিয়ে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়। কিন্তু সিদ্ধান্ত বহাল থাকে। AntiMedia পত্রিকা ২০১৫-র ১৫ অক্টোবর সংখ্যায় মন্তব্য করছে - whose sole purpose is to help pharmaceutical companies evade and manipulate FDA regulations. ক্যালিফের আগে মাইকেল টেলর-কে FDA-র Deputy Commissioner for Food করে পাঠানো হয়েছিলো ওবামার আমলে। টেলর ডেপুটি কমিশনার হবার আগে Monsanto-র ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন। আমরা বুঝতে পারি কিভাবে Monsanto-র মতো অতিকায় বহুজাতিক সংস্থা আমেরিকার সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নীতি-নির্ধারক সংস্থায় ততোধিক গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকে। শুধু সরকারি সংস্থায় নয় একেবারে পার্লামেন্টে পর্যন্ত এদের প্রতিনিধিরা কাজ করে। ফলে প্রায় সবধরণের নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে এদের বিশেষ ভূমিকা থাকে।

এরকম এক পরিস্থিতিতে যেসব সংস্থা গবেষণাপত্রের মান নির্ধারণ করে তারা প্রভাবিত হয় এসব বৃহৎ বহুজাতিক সংস্থার চাহিদা ও প্রয়োজনানুযায়ী। এমনকি নিউ ইংল্যান্ড জার্লান অব মেডিসিন বা অন্য গুরুত্বপূর্ণ জার্নালের ক্ষেত্রেও এ ঘটনা ঘটে। তথ্য হিসেবে বলা যায়, ২০১৬-র হিসেবমতো, নিউ ইংল্যান্ড জার্লান অব মেডিসিন-এর ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এ জার্নালের ইম্প্যাক্ট ফ্যাক্টর প্রায় ৬০। পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি দেশের ৬,০০,০০০ স্কলার, চিকিৎসক, এমনকি অনেক অনুসন্ধিৎসু মানুষও প্রতি সপ্তাহে এ জার্নাল পড়ে। ফলে পৃথিবী জুড়ে এসমস্ত জার্নালে প্রকাশিত গবেষণাপত্রের প্রভাব বিপুল। এবং প্রেস্ক্রিপশন, ওষুধ বিক্রী ও জাতীয় ওষুধনীতি নির্ধারণ করার ক্ষেত্রে এদের অসীম প্রভাব। এ সত্যটি হৃদয়ঙ্গম করতেই হবে।

Marion Nestle-র সাড়াজাগানো বই Food Politics: How the Food Industry Influences Nutrition and Health (2013) থেকে আমরা জানতে পারি ২০১০ সালের হিসেব অনুযায়ী খাদ্য-সংক্রান্ত বিবিধ অনুষঙ্গের আন্তর্জাতিক ব্যবসার পরিমাণ ১০০০ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি। মারিওন নেসলে ১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে FDA-এর Food Advisory Committee-র সদস্য ছিলেন। তিনি সেসময়ে দেখেছিলেন কিভাবে Monsanto-অর্থপুষ্ট বিজ্ঞানীরা FDA-কে প্রভাবিত করার চেষ্টা করে যে কোন খাদ্যদ্রব্যে G M food লেবেল লাগানোর প্রয়োজন নেই। (Marion Nestle, “Corporate Funding of Food and Nutrition Research”, Journal of American Medical Association [JAMA], November 23, 2015, pp. E1-E2) অথচ, এই লেবেলিং না করলে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে অসুবিধেও আছে। কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, জাপান-এর মতো বেশ কয়েকটি দেশে “G M food” লেবেল না থাকলে খাবার বিক্রী করতে দেবেনা। ২০১৫ সালের মার্চ এবং অক্টোবরের মাঝে নেসলে ৭৬টি “industry-sponsored studies” চিহ্নিত করেন। এর মধ্যে ৭০টির ক্ষেত্রে দেখা যায় স্পনসর যেমন চাইছে তেমনভাবে গবেষণাপত্রের ফলাফল তৈরি হচ্ছে, অর্থাৎ নিতান্ত অনুকূল গবেষণাপত্র বা স্টাডি।

ট্রাম্প পরবর্তী আমেরিকার খাদ্য, ওষুধ, কৃষিজাত পদার্থ নিয়ে নতুন নীতি কি হবে তা এখুনি বলা মুসকিল। কিন্তু মৌলিকভাবে নীতির কোন পরিবর্তন হবেনা এটা ধরেই নেওয়া যায়।

 ওবামার আমলে সেনেট কর্পোরেটদের চাপে ও প্রভাবে আমেরিকার পার্লামেন্টের দুটি House থেকেই একটি আইন পাস করায় – “that would ban states from adopting laws that require the disclosure of food produced with genetically modified ingredients .” এই রিপোর্ট করেছেন নিউ ইয়র্ক টাইমেস-এর সাংবাদিক এরিক লিপটন ৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৫-তে “Food Industry Enlisted Academics in G. M. O. Lobbying War, Emails Show” শিরোনামে। শুধু FDA নয়, অন্যান্য সরকারি সংস্থা যেমন American Society for Nutrition বেওং Academy of Nutrition and Dietetics বারংবার জনস্বাস্থ্য নেতৃত্বের তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে কারণ এরা প্রায় সময়েই Kraft Foods, McDonald’s, PepsiCo এবং Hershey’s-এর মতো অতি বৃহৎ বহুজাতিক সংস্থার সাথে গাঁটছড়া বেঁধেছে। এর প্রভাব পড়েছে গবেষণার ওপরে, নীতি নির্ধারণে।

এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উল্লেখ করা দরকার। Monsanto এদের জিন প্রযুক্তিতে তৈরি কৃষিখাদ্যে “Roundup” নামে একটি কীট ও আগাছা-নাশক কেমিক্যাল ব্যবহার করে। এতে গ্লাইফসেট এবং অন্যান্য মারাত্মক ক্ষতিকারক রাসায়নিক পদার্থ থাকে। ২০১৩-র ২৩শে জুন তারিখে Journal of Environmental and Analytical Toxicology পত্রিকায় প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে “Teratogenic Effects of Glyphosate-Based Herbicides: Divergence of Regulatory Decisions from Scientific Evidence” জানানো হল – The study, along with others indicating teratogenic and reproductive effects from glyphosate herbicide exposure, was rebutted by the German Federal Office for Consumer Protection and Food Safety, BVL, as well as in industry-sponsored papers. These rebuttals relied partly on unpublished industry-sponsored studies commissioned for regulatory purposes , which, it was claimed, showed that glyphosate is not a teratogen or reproductive toxin. (teratogen হল সেসব রাসায়নিক পদার্থ যারা ভ্রূণাবস্থায় দেহে বিপজ্জনক রূপান্তর ঘটায়, এমনকি ক্যানসার পর্যন্ত)

 অর্থাৎ, FDA-র মতো নিয়ামক সংস্থা এসমস্ত রিপোর্টকে সম্পূর্ণত অগ্রাহ্য করে এবং industry-sponsored অপ্রকাশিত ও অপ্রমাণিত রিপোর্টের ওপরে ভিত্তি করে এ ধরণের রাসায়নিক পদার্থের ব্যবহারের অনুমোদন দিয়েছে। এসব রাসায়নিক পদার্থের ভয়াবহ প্রভাবের দুটি উদাহরণ অন্তত বলা যায়। জন স্যান্ডারস এবং ফ্র্যাঙ্ক ট্যানার নামে দুজন ক্যালিফরনিয়ার কৃষকের non-Hodgkin lymphoma হয়েছে দীর্ঘদিন ধরে এই রাসায়নিক পদার্থগুলো ব্যবহারের জন্য (শ্যারন লার্নার, “ New Evidence About the Dangers of Monsanto’s Roundup ”, The Intercept , May 17, 2016)। একেবারে হালে আরেকটি গবেষণাপত্র অন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে – Co-Formulants in Glyphosate-Based Herbicides Disrupt Aromatase Activity in Human Cells below Toxic Levels ( International Journal of Environmental Research and Public Health , 26 February, 2016)। এ গবেষণাপত্রটিও গবেষণা হিসেবে উচ্চমানের হওয়া সত্বেও নিয়ামক সংস্থা বা Monsanto-র কার্যকলাপে কোন প্রভাব-ই ফেলতে পারেনি। উপকৃত হয়েছি আমরা – সাধারণ মানুষ ও স্কলারেরা। দ্বিতীয় গবেষণাপত্রটিতে জোর দিয়ে বলা হল - It was demonstrated for the first time that endocrine disruption by GBH could not only be due to the declared active ingredient but also to co-formulants. These results could explain numerous in vivo results with GBHs not seen with G alone; moreover, they challenge the relevance of the acceptable daily intake (ADI) value for GBHs exposures, currently calculated from toxicity tests of the declared active ingredient alone. (পাঠকদের কাছে একান্ত অনুরোধ, গবেষণাপত্রের এ বৈজ্ঞানিক পরিভাষা ও নির্ভুল প্রকাশভঙ্গিমার ভালো বাংলা করা সম্ভব নয়। এজন্য এটা ইংরেজিতেই রইলো)

 নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর সাংবাদিক অ্যান্ড্রু পোলাক ১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০০৯-এ রিপোর্ট করেছিলেন – Crop Scientists Say Biotechnology Seed Companies Are Thwarting Research। এ প্রতিবেদনে পোলাক আমেরিকার Environmental Protection Agency (EPA)-কে লেখা ২৬ জন বিজ্ঞানীর স্বাক্ষরিত একটি চিঠির উল্লেখ করেন। সে চিঠিতে বিজ্ঞানীরা তাঁদের বেদনা ও আশংকা ব্যক্ত করেন – “বহু ক্রিটিক্যাল ইসুতে কোন সত্যিকারের স্বাধীন গবেষণা করা আইনত সম্ভব নয়”। বিজ্ঞানীরা – দু-একজন ছাড়া নিজেদের নাম প্রকাশ করেননি এই ভয়ে যে গবেষণার জন্য কোন ফান্ড পাওয়া যাবেনা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরির জন্য প্রয়োজনীয় tenure পাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়বে। আমেরিকার মতো তথাকথিত মুক্ত চিন্তার দেশে কোন অদৃশ্য শক্তিকে এতো ভয় পাচ্ছেন এ বিজ্ঞানীরা? বহুজাতিক কোম্পানির চাপ, এদের প্রভাবে সরকারি সংস্থার নেকনজর? অবিশ্বাস্য এক পরিস্থিতি স্বাধীন গবেষণার জন্য। University of Minnesota-র পতঙ্গ-বিশারদ কেন অসলি (Ken Ostlie) – যিনি পূর্বোক্ত চিঠিতে স্বাক্ষর করেছিলেন – জানান, “If a company can control the research that appears in the public domain, they can reduce the potential negatives that can come out of any research”। কর্নেল ইউনিভারসিটির পতঙ্গ-বিজ্ঞানী এলসন জে শিলডস এ পরিপ্রেক্ষিতে বলেন, “আমরা যেসব তথ্য EPA-কে দিই সেগুলো নিয়ে নয়ছয় করার ক্ষমতা কোম্পানীগুলোর আছে।” ভাবুন কি অসহায় অবস্থা বিজ্ঞান গবেষণার ও বিজ্ঞানীর। তিনি আরও বলেন - People are afraid of being blacklisted ... If your sole job is to work on corn insects and you need the latest corn varieties and the companies decide not to give it to you, you can’t do your job.

 ৯ জুন, ২০০৫ সালে Nature-এর মতো পত্রিকায় প্রকাশিত হল একটি রিপোর্ট – “Scientists behaving badly”। সে রিপোর্টে প্রতিবেদকেরা জানালেন – The modern scientist faces intense competition, and is further burdened by difficult, sometimes unreasonable, regulatory, social, and managerial demands. এ রিপোর্টে সংখ্যাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ করে দেখানো হল যেসব বিজ্ঞানী তাঁদের ক্যারিয়ারের মধ্য-জগতে রয়েছেন তাঁরা তাদের নিজস্ব স্টাডির ডিজাইন, মেথডলজি অথবা গবেষণার ফলাফল অর্থলগ্নীকারী সংস্থার চাপে প্রভাবে ২০.৬% ক্ষেত্রে একেবারে পরিবর্তিত করে ফেলেন। কি বলবেন একে? প্রায় ৪০০০ বিজ্ঞানীর স্যাম্পল স্টাডি হয়েছিলো নেচার-এর এই গবেষণাপত্রে। পরিসংখ্যানের ভাষায় যথেষ্ট বড় স্যাম্পল বলা যায় একে।

 ১৩ আগস্ট, ২০১৫-তে নেচার পত্রিকায় আরেকটি রিপোর্ট প্রকাশিত হল – Anti-GM group expands probe into industry ties। রিপোর্টের প্রথম বাক্যটিই হছে – Activists seek release of records from 40 researchers at US public universities। অনেক কারণের অন্তত একটি হল সাউথ ডাকোটা ইউনিভারসিটির প্রেসিডেন্ট David Chicoine ২০১৬ সালে Monsanto-র কাছ থেকে মাইনে ও অন্যান্য উপরি পাওনা মিলিয়ে ৪০০,০০০ ডলার আয় করবেন ( Global Research , 18 May, 2015 – “Relationship between Monsanto, SDSU president questioned”)। কোন যোগ্যতায়? যেখানে ২৬ জন বিজ্ঞানীর চিঠি থেকে আমরা জানতে পারি যে গবেষণার স্বাধীন ফলাফল প্রকাশ করলে ব্ল্যাকলিস্টেড হয়ে যাবার, টেনিউর খোয়ানোর এবং গবেষণার টাকা না পাবার ভয় ও অনিশ্চয়তার মাঝে এরা বাস করছেন।

 ২০১০ সালে ওবামা প্রশাসন আফ্রিকার অন্নকষ্টে কাতর হয়ে এক “মানবিক” পদক্ষেপ নেয় - while the ideals of this program are admirable, the execution presents an incredible opportunity to agro-business conglomerates like Monsanto. In order to solve the hunger problem in Africa, the Obama administration has partnered with large industrial farming and GMO operations, under the aegis that these organizations can produce large amounts of food quickly. আফ্রিকার খাদ্য-বাজার এভাবে Monsanto-র আওতায় আসবে। আফ্রিকার ক্ষুদ্র কৃষকেরা ধীরে ধীরে উৎসন্নে যাবে। কারণ কম দামে অনেক বেশি খাদ্য সরবরাহ করার ক্ষমতা এর আছে। এর সাথে প্রবেশ করবে জি এম ফুড, দেশীয় কৃষি ক্রম-বিলীন হবে। আফ্রিকার কৃষি ব্যবস্থার চরম রূপান্তর ঘটবে। উল্লেখ্য, PLoS-এর মতো জার্নালে ১৫ ডিসেম্বর, ২০১৬-তে গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে – Conflicts of Interest in GM Bt Crop Efficacy and Durability Studies। নিউ ইংল্যান্ড জার্নালে প্রকাশিত হচ্ছে – A Randomized Study of How Physicians Interpret Research Funding Disclosures (NEJM, September 20, 2012)।

দু-একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। University of California, San Francisco-র গবেষক বেটি ডং গবেষণা শুরু করেন থাইরয়েড হরমোনের সমস্যার জন্য নতুন তৈরি একটি ওষুধ Synthroid (levothyroxine sodium tablet) বাজারে চালু কম দামের জেনেরিক নামের ওষুধের আদৌ বিকল্প হতে পারে কি না এ নিয়ে। তিনি Synthroid-এর কোন ঔকর্ষ খুঁজে পাননি। ফলাফল? University of California ডং-এর গবেষণাপত্র প্রকাশের কোন অনুমতি দেয় না। সাত বছর পরে এ গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়। সাত বছরে Synthroid প্রয়োজনীয় মুনাফা করে নিয়েছে। আরেকজন বিজ্ঞানী ন্যান্সি অলিভিয়েরি কানাডার University of Toronto-তে Apotex কোম্পানির “আবিষ্ক্রৃত” থ্যালাসেমিয়ার নতুন ওষুধ নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। তিনিও স্বাধীনভাবে ওষুধ কোম্পানির অভিপ্রেত ফলাফলের অতিরিক্ত গবেষণালব্ধ কোন বিষয় প্রকাশ করতে পারেননি। ইউনিভারসিটিও একইসাথে বাধা দেয়। সে ওষুধ পরে বাজার থেকে উঠে যায়। কিন্তু অলিভিয়েরিকে বাধা দেবার কারণ ছিলো University of Toronto ওষুধ কোম্পানির কাছ থেকে multimillion-dollar gift পেয়েছে। (Derek Bok, University in Marketplace, 2003)

আমাদের দেশে যেমন কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় আমেরিকাতে তেমনি “land-grant universities”। এদের মধ্যে বিশেষ পরিচিত হল ক্যালিফরনিয়া ইউনিভারসিটি, পেন্সিলভ্যানিয়া স্টেট ইউনিভারসিটি, আইওয়া এবং টেক্সাস এগ্রিকালচারাল অ্যান্ড মেকানিকাল ইউনিভারসিটি। আমেরিকার প্রতিটি স্টেটে এবং অঞ্চলে এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো রয়েছে। এদের সর্বোচ্চ নিয়ামক সরকারি সংস্থা হল U.S. Department of Agriculture (USDA)। ২০১২-র হিসেব অনুযায়ী এ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিভিন্ন শাখা কিংবা ল্যাবরেটরি পাওয়া যায় দেশের ১০৯টি অঞ্চলে। ২০১৭-তে এসে সংখ্যা আরো বাড়তে পারে। ওদেশে কৃষি উৎপাদন এতটাই লাভজনক যে প্রতি ১ ডলার বিনিয়োগ করলে ১০ ডলার পাওয়া যায় মুনাফা হিসবে। এহেন উৎপাদনশীল এবং লাভজনক কৃষিক্ষেত্রের জায়গায় ২০০১ থেকে ২০১০-এর মধ্যে সরকারি funding কমেছে ১২%-এরও বেশি। সে জায়গায় প্রবল গতিতে funding বেড়েছে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর। ২০০৯-এর হিসেবে USDA-র বিনিয়োগ ৬৪৫ মিলিয়ন ডলার, আর কর্পোরেট সংস্থাগুলোর বিনিয়োগ ৮২২ মিলিয়ন ডলার। মজার বিষয় হল, ক্যালিফরনিয়া ইউনিভারসিটির department of nutritionএর গবেষণার একটি প্রোজেক্ট হল চকোলেট খেলে কি কি লাভ হতে পারে, এবং এ প্রোজেক্ট-কে fund করে candy উৎপাদক ৩৩ বিলিয়ন ডলারের অতিবৃহৎ বহুজাতিক কোম্পানি Mars। এ কোম্পানিটি কোকো খেলে কি কি উপকার হতে পারে এ মর্মে ইতিবাচক গবেষণাপত্র তৈরি করার জন্য ক্যালিফরনিয়া ইউনিভারসিটির Nutrition Department-কে ১৫ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি funding করেছে। ১৯৮৭ সালে কর্নেল ইউনিভারসিটি জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং-এর উন্নত রূপ আবিষ্কার করে। কিন্তু ১৯৯০ সালে এ পদ্ধতির সত্ব বিক্রী করে দেয় DuPont বহুজাতিক কোম্পানিকে।

 Food and Water Watch নামে একটি সুপরিচিত অ-সরকারি সংস্থার ২০১২-র রিপোর্টে মন্তব্য করা হয়েছে – “Industry-sponsored research effectively converts land-grant universities into corporate contractors , diverting their research capacity away from projects that serve the public good. Agribusinesses use sponsored land-grant research — with its imprimatur of academic objectivity — to convince regulators of the safety or efficacy of new crops or food products.” অর্থাৎ, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অ্যাকাডেমিক ও গবেষণা জগতে এবং সামাজিক জীবনে গ্রহণযোগ্যতাকে ব্যবহার করে কর্পোরেটগুলো এদের প্রোডাক্টগুলোর আন্তর্জাতিক স্তরে বিক্রী বাড়ায়। কর্পোরেটসংস্থা এবং ইউনিভারসিটির মধ্যেকার নিবিড় যোগসূত্র নীচের টেবিল থেকে সহজবোধ্য হবে।

Corporate Representatives Department and School Academic Role
Monsanto, Chiquita, Dole, United Fresh Center for Produce Safety, University of California at Davis Advisory Board
Taylor Farms, Produce Marketing Association Center for Produce Safety, University of California at Davis Executive Committee
Dole, Sysco, Earthbound Farms Center for Produce Safety, University of California at Davis Technical Committee
Tyson, Walmart Sam W. Walton Business College, University of Arkansas Advisory Board
Novartis (now Syngenta) University of California Research Board (1998–2003)
Cargill, ConAgra, General Mills, Unilever, McDonald’s, Coca-Cola Center for Food Safety, University of Georgia Board of Advisors
Monsanto, Pioneer Hi-Bred Plant Sciences Institute, Iowa State University Board of Advisors
Iowa Farm Bureau, Summit Group Iowa State University University Board of Regents
Dole Food University of California University of California Regents
Kraft Foods Cornell University Cornell University Board of Trustees

এ সংক্রান্ত আলচনা শেষ করবো এটুকু জানিয়ে যে কর্নেল ইউনিভারসিটির একজন অধ্যাপক Monsanto-র বেতনভোগী ছিলেন। তিনি rBGH বা genetically engineered bovine growth hormone নিয়ে গবেষণা করেছেন এবং ইতিবাচক রিপোর্ট তৈরি করেছেন। অধ্যাপকের নামাঙ্কিত রিপোর্ট FDA-র কাছে Monsanto জমা দেয় অনুমোদন পাবার জন্য। যদিও ইউরোপীয় ইউনিয়ন, কানাডা, জাপান অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ড-এ বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের জন্য rBGH কোন অনুমতি পায়নি। কিন্তু FDA-র অনুমোদনের ফলে পৃথিবীর অন্তত ১৫০টি দুর্বল বা মাঝারি অর্থনীতির দেশে rBGH বিক্রীর পথ প্রশস্ত হয়েছে।

শেষ নাহি যে শেষ কথা কে বলবে

Bodenheimer-এর (NEJM, 18 May, 2000) গবেষণাপত্র থেকে দেখা গেছে কোম্পানীর অর্থপুষ্ট গবেষণায় কোন কোম্পানীর প্রোডাক্ট, বিশেষ করে ক্যানসারের ওষুধের ক্ষেত্রে, মাত্র ৫% ক্ষেত্রে নেতিবাচক অন্যরকম ফলাফল দেয় বলে জানানো হয়। অথচ ঐ একই ওষুধ নিয়ে কোন non-profit সংস্থার স্টাডিতে দেখা যাচ্ছে নেতিবাচক ও বিপজ্জনক ফলাফল ৩৮%। আমেরিকার ক্লিনিক্যাল ড্রাগ ট্রায়ালের মাত্র ১৫-২০% আসে ওদেশের সরকারি সংস্থা National Institute of Health (NIH) থেকে। ৭০%-এরও বেশি অর্থের যোগান আসে বিভিন্ন কর্পোরেট সংস্থা থেকে। ফলে এই ট্রায়ালগুলো কি প্রমাণ করতে পারে এবং কিভাবে পারে তা সহজেই অনুমান করা যায়। এজন্য মার্সিয়া অ্যাঞ্জেল বুঝি লেখেন – Is Academic Medicine for Sale? (NEJM, 18 May, 2000) এর সাথে যুক্ত করুন “ghost writing” বা “ভুতুরে লেখক”-এর বিষয়টি। লেখে কোন commissioned লেখক, ছাপা হয় নামী অধ্যাপকের নামে। এ নিয়ে আলোচনা পরে কখনো হবে।

Boston Review পত্রিকা থেকে ২০১০ সালের ৫ মে তারিখে মার্সিয়া অ্যাঞ্জেলের একটি সাক্ষাৎকার নেয়া হয়েছিলো। সেটা প্রকাশিত হয় “Big Pharma, Bad Pharma” শিরোনামে। সে সাক্ষাৎকারে অ্যাঞ্জেল তিনটি নজর দেবার মতো বিষয় জানান – (১) ২০০ এক্সপার্ট প্যানেলের (যারা বিভিন্ন গাইডলাইন তৈরি করে) এক সার্ভেতে দেখা গেছে অন্তত ৭০ জনের ওষুধ কোম্পানির সাথে কোন না কোন আর্থিক স্বার্থে জড়িত, (২) ২০০৪-এ NIH যখন National Cholesterol Education Program-এ তথাকথিত “খারাপ” কোলেস্টরলের গ্রহণযোগ্য মাত্রা অনেকটা কমিয়ে দেয় তখন অন্তর্তদন্তে দেখা যায় ঐ কমিটির ৯ জনের মধ্যে ৮ জন-ই কোলেস্টেরল কমানোর ওষুধ বানায় যে কোম্পানিগুলো তাদের সাথে আর্থিক স্বার্থে আবদ্ধ (গ্রহণযোগ্য মাত্রা কমিয়ে দিলে আরো অনেক বেশি মানুষ উচ্চ কোলেস্টেরলের ওসুখে ভুগছে বলে প্রমাণ হবে আর cholesterol-lowering ওষুধের বিক্রী বহুগুণ বেড়ে যাবে), এবং (৩) মানসিক চিকিৎসার বেদ- বাইবেল- কোরান- বা ত্রিপিটক-তুল্য DSM-IV বা American Psychiatric Association’s Diagnostic and Statistical Manual of Mental Disorders-এর ১৭০ জন কন্ট্রিবিউটরের মধ্যে ৯৫ জনেরই ওষুধ কোম্পানির সাথে আর্থিক লেনদেন রয়েছে, বিশেষ করে যারা mood disorder বা schizophrenia নিয়ে লিখেছেন। মজার ব্যাপার হল, mood disorder বা schizophrenia-র জন্য তৈরি ওষুধগুলোর বিক্রী অন্য ওষুধের চেয়ে অনেকগুণ বেশি। এর সাথে মাথায় রাখতে হবে কম্পোজিসনের সামান্য হেরফের করে বাজারে আনা “me-too” ওষুধগুলোর কথা। এ ওষুধগুলোও বিপুল মুনাফা দেয়।

প্রশ্ন উঠবে এরকম এক গবেষণা ও গাইডলাইন তৈরির দুনিয়ায় যারা পৃথিবী জুড়ে পড়াশুনো করছেন, মেডিক্যাল প্র্যাকটিস করছেন, কৃষি নিয়ে অধ্যয়ন ও অধ্যাপনায় যুক্ত, যুক্ত রয়েছেন ফলিত বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায়, তারা কোন আন্তর্জাতিক গবেষণাকে নির্ভর করবেন। প্রতিদিন একটু একটু করে অ্যাকাডেমিক মেডিসিন – মেডিক্যাল স্কুল, হাসপাতাল-নির্ভর শিক্ষাক্রম এবং তাদের ফ্যাকাল্টি – এবং ওষুধ কোম্পানির মধ্যেকার সীমারেখা মুছে যাচ্ছে, সীমারেখা অস্পষ্ট হয়ে উঠছে। তেমনি সীমারেখা মুছে যাচ্ছে ক্যালিফরনিয়া বা কর্নেল বা আইওয়া বিশ্ববিদ্যালয় এবং Monsanto-র (একটি নমুনা মাত্র) মধ্যেকার গবেষণালব্ধ ফলের সীমারেখা। ফলে আরো নজর রেখে জানা-বোঝা-পড়াশুনো নিতান্ত জরুরী।

অধুনা শিক্ষিত মহলে বিশেষ চালু দুটি শব্দ – মিলিটারি-ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্স এবং মেডিক্যাল-ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্স। জন পারকিনস একজন economic hit hitman ছিলেন। বিভিন্ন দেশে মনস্যান্টো, MAIN, United Fruits-এর মতো কোম্পানির ব্যবসা এবং পরবর্তীতে একটি global empire গড়ে তোলার জন্য যেসব আইডিয়া ফেরি করতে হয় ইউরোপ আমেরিকা বাদ দিয়ে অন্যান্য দেশের কর্তাদের মাঝে এবং একে বাস্তবায়িত করে তুলতে যা করণীয় তার প্রথম ধাপে থাকে এসব economic hit hitman-রা। তারপরে CIA আসে, আসে কোম্পানিগুলো, ঘটে ক্যু দে তা, বিরোধী রাষ্ট্রপ্রধানদের ‘রহস্যজনক’ মৃত্যু হয়। শেষ অব্দি বিশ্ব সাম্রাজ্যের প্রসার ঘটে। জন পারকিন্সের নতুন সাড়াজাগানো বই – The New Confession of an Economic Hitman – How America Really Took Over the World (2017)। এ বইয়ে তিনি বলছেন – “we establish embassies around the world is to serve our own interests, which during the last of the twentieth century meant creating history’s first truly global empire – a corporate empire supported and driven by the US government.” (The New Confession of an Economic Hitman, p. 28)



252 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

কোন বিভাগের লেখাঃ বুলবুলভাজা 
শেয়ার করুন


Avatar: কৌশিক সাহা

Re: বিজ্ঞান ও অনুসন্ধান – স্বাধীন নির্মোক, পরাধীন গবেষণা

একটা বিকল্প ব্যবস্থা দিন না? এই নাকী কান্না আর কতদিন শুনব? এ সকল কথা তো thalidomide কাণ্ডের যুগ থেকেই সকলে জানে।
Avatar: ষষ্ঠ পাণ্ডব

Re: বিজ্ঞান ও অনুসন্ধান – স্বাধীন নির্মোক, পরাধীন গবেষণা

লেখাটা পড়েছি আরও দিন দুই আগে, সাথে কৌশিক সাহার মন্তব্যটিও। তারপর ভেবে কূল পাবার চেষ্টা করলাম।

একজন স্বাধীন চিন্তার মানুষ একটি বিশেষ বিষয় নিয়ে ভাবলেন এবং এটি নিয়ে গবেষণার পরিকল্পনা করলেন। গবেষণা করতে গেলে গবেষণাগার, উপকরণ, ব্যবস্থা, পরীক্ষণ, নিরীক্ষণ, পর্যবেক্ষণ, পর্যালোচনা ইত্যাদি লাগবে। বিষয়টি আলকেমিদের মতো অতি গোপনীয় নয়, সুতরাং আরও অনেক মানুষের সহযোগিতাও লাগবে। এই সব কিছুর জন্য অর্থের প্রয়োজন, ক্ষমতার প্রয়োজন, সংযোগের প্রয়োজন। তো গবেষক যদি সেসব যোগাড় করতে মাঠে নামেন তাহলে এই জীবনে আর গবেষণা করে উঠতে হবে না। তাছাড়া এখনকার সব গবেষণা এক একটি চলমান প্রক্রিয়া যেখানে বহু মানুষ, বহু স্থানে প্রক্রিয়াটির এক একটি অংশ নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন। আলোচ্য গবেষকের কাজটিও অমন কোন না কোন (এক বা একাধিক) গবেষণা প্রক্রিয়ার অংশ বিশেষ।

সুতরাং এটি স্পষ্ট যে, এটি একটি স্বাভাবিক সামাজিক ব্যবস্থা যেখানে কেউ অর্থ যোগাবেন, কেউ ক্ষমতার ঠেকনা দেবেন, কেউ সংযোগ ঘটাবেন আর কেউ গবেষণা করবেন। এখানে এক ব্যক্তি একাধিক ভূমিকাতেও থাকতে পারেন। সমস্যা হয় তখনই যখন কাঠামোটির গবেষণাভিন্ন অন্য অংশসংশ্লিষ্ট কেউ গবেষণাটিকে স্বীয় লক্ষ্যানুসারে চালিত করার চেষ্টা করে অথবা গবেষণার ফলটি নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করেন। এই ব্যাপারটি বেশি ঘটে যে সব গবেষণার ফলাফল সরাসরি ভোক্তাপর্যায়ে বাজারজাত করা যায় সে সব ক্ষেত্রে। হার্ডকোর মৌলিক বিজ্ঞানের গবেষণার ফলাফল সরাসরি ভোক্তাপর্যায়ে বাজারজাত করা যায় না বলে সেখানে চাপটা অনেকটাই কম।

আমরা যতই বিকল্পের কথা বলি, সংস্কৃতি পরিবর্তনের কথা বলি, সচেতনতার কথা বলি - লাভ হবে না। শাস্তির ভয় বা পুরস্কারের লোভ মানুষকে যদি সত্যিই সর্বাংশে প্রভাবিত করতে পারতো তাহলে সমাজ থেকে অপরাধ বিলুপ্ত হয়ে যেতো। সেটি যখন হয় না সেখানে গবেষকের কাজ, গবেষণার ফলাফল ইত্যাদি কৌশলে বা চাপ প্রয়োগে মহাজনের স্বার্থের অনুকূলে আনার প্রক্রিয়াটিও পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হবে না।

যদি জনবান্ধব, গণমুখী, মানবকল্যানকামী একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলা যেতো; এবং কিছু গবেষণাকে ঐ রাষ্ট্রের আওতায় আনা যেতো তাহলে গবেষকের কাজের স্বাধীনতা ও গবেষণার স্বাভাবিক গতিপ্রবাহ অব্যাহত রাখার ব্যাপারটি কিছুটা হলেও সম্ভব হতো।
Avatar: সুকি

Re: বিজ্ঞান ও অনুসন্ধান – স্বাধীন নির্মোক, পরাধীন গবেষণা

এই প্রবন্ধটা পড়ে বুঝতে পারলাম না লেখক ঠিক কি বলতে চেয়েছেন। আর তা ছাড়া ইংরাজী - বাংলা মিশিয়ে পড়তে বেশ বেগ পেতে হল


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন