বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

অরণ্যের অবিচার

সৌমিত্র দস্তিদার

আপাতত কিছুদিনের জন্য স্থগিতাদেশ পেলেও সারাদেশের অন্তর্গত ১৬টি রাজ্যের আদিবাসী বনবাসীরা যে নিজেদের বাসস্থানকে উচ্ছেদ করছেন তা এখন আর কোনো গোপন এজেন্ডা নয়। ব্যাঙ্গালোরের স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন যারা মূলত ওয়ার্ল্ড লাইফ নিয়ে কাজ করেন তাদের আবেদনের ভিত্তিতে সুপ্রিমকোর্ট এক রায়ে সাফ সাফ জানিয়ে দিয়েছিলেন - অরণ্যের স্বার্থেই রাজ্য সরকারগুলোর উচিৎ জংগল থেকে শুধু বেআইনী ভাবে স্থাপিত আদিবাসীদের সরিয়ে দেওয়াই নয়, জংগলকে অরণ্যবাসী পশুদের জন্যও সংরক্ষিত করা।

এটা আজ নয় মাঝে মধ্যেই এই জংগল সংরক্ষণ, পশুদের চারণভূমি বাঁচাও ইত্যাদি বিষয়গুলি সামনে আসে। নানা কারণে তা ধামাচাপা পড়েও যায়। বস্তুত এ ব্যাপারে যে জংগল সংরক্ষণ আইন নিয়ে মাননীয় বিচারপতিরা কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তাও বেশ পুরানো। দু হাজার ছয় সালে ইউ পি এ অর্থাৎ কংগ্রেস জামানায় তৈরী। এতদিন তা হচ্ছে হবে করে বাস্তবে কিছুই হয়নি। এখন বিজেপি আমলে প্রশ্নটি নতুন করে সামনে এসেছে।

আইনের চুলচেরা বিশ্লেষণ করবো না। সব আইনেরই কিছু ইতিবাচক নেতিবাচক দিক থাকে। এই আইন বাস্তবায়িত হলে কত সংখ্যক আদিবাসী বনবাসী সত্যি সত্যি তাদের অধিকার হারাবে তা নিয়ে আপাতত কথা বলবো না। কারণ এইটা সবাই বিশ্বাস করবেন সংখ্যাতত্ত্ব দিয়ে সবকিছুর বিচার করা ঠিক না। বরুণ সরকার বলছেন, কয়েক লাখ অধিকার আন্দোলনের কর্মীরা বলবেন অনেক বেশী, কয়েক কোটি। এসব চাপান উতোরে চাপা পড়ে যাবে আদিবাসী জনজাতিদের সম্পর্কে ভারত রাষ্ট্রের, সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি কি? প্রশ্নটা কখনো শুধু সংখ্যায় নয়, সংখ্যাটা যদি ১০০ জনের হয় তাও গণতান্ত্রিক ভারতে তাকে এড়িয়ে যাওয়া যায় না। পাশাপাশি সাধারণত সরকারি তথ্য যে কোনো সময়ে কোনো ক্ষেত্রেই ঠিক থাকে না তা ভুক্তভোগী মাত্রই জানেন। যে ট্রেন দুর্ঘটনায় মৃতের সংখ্যাই হোক অথবা তথাকথিত সার্জিকাল স্ট্রাইকে পাকিস্থানের ভেতরে ঢুকে জমি দখলই হোক।

এমনিতেই সত্যি সত্যি ইতিমধ্যেই আদিবাসী অধিকার লঙঘন হবে কতজনের তা নিয়ে রাজ্যে রাজ্যে বিভ্রান্তি ছড়িয়েছে। ছত্রিশগড়ে বলা হচ্ছে মাত্র কুড়ি হাজার ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। কিন্তু সমাজ কর্মীদের অনেকেই জোরের সংগে বলছেন, কম করে চার লাখ লোকের বিপদ হবে। অন্যান্য রাজ্যেও এই সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক চলবে। আমার মনে হয় সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক চলুক। আমাদের বুঝতে হবে এদেশের শাসকদের দৃষ্টিভঙ্গি।

আসামের এন. আর.সি তে চল্লিশ লাখ লোকের নাগরিক তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া আর আদিবাসী জনজাতির বংশ পরম্পরায় অরণ্যের অধিকার কেড়ে নেওয়ার পেছনে উদ্দেশ্য ও দর্শন একই। যে উদ্দেশ্যের কথায় পরে আসছি তার আগে অন্য দু একটি বিষয় বলে নি। ঘটনাক্রমে জংগল অধ্যুষিত নানা রাজ্যে যাওয়ার সুযোগ হয়েছে। ছত্রিশগড়, উড়িষ্যা,আসাম, মধ্যপ্রদেশ ইত্যাদি। কোরাপুট হয়ে লাসাইপুট বিস্তীর্ণ পাহাড়ি রাস্তার দুধারে কয়েকবছর আগেও যে বিপুল চন্দন গাছ ছিল তা যেতে যেতে চমৎকার গন্ধে আপনাকে মোহিত করে রাখতো। এখন যান, একটিও চোখে পড়বেনা। কোনো সংগঠন বা ব্যক্তি কিন্তু প্রশ্ন তোলে না যে দুষ্প্রাপ্য গাছগুলো, তাদের আমূল কাঠ কোথায় কিভাবে কারা অদৃশ্য করে দিল। বস্তার আজো মাওবাদীদের শক্ত ঘাঁটি। খোঁজ খবর নিন দেখবেন সেখানে চোরা শিকার কমেছে না বেড়েছে! জংগল কতটা ধ্বংস হয়েছে।

আসলে আমি আপনি সবাই জানি যে জংগল বাঁচিয়ে রাখে আদিবাসী জনজাতিরাই। অরণ্য তাদের মা। সন্তানের ভালোবাসায় সে যাবতীয় বিপদ থেকে মাকে আগলে রাখেন। অথচ মাঝেমধ্যেই এদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয় বন্যপ্রাণী মারা ও বড় গাছ কেটে জংগল নষ্টের। কারণ পরবর্তী দেশে যে নয়া অর্থনীতি ও বিশ্বায়নের সুবাতাস বইতে লাগল, তখন থেকে আদিবাসী উচ্ছেদ এক নতুন মাত্রা পেল। আমরা ভুলে যাই অরণ্যের আদিম আদিবাসী কারা। এও মনে রাখি না বৃটিশ সময়ে সময়ে নিজেদের স্বার্থে আদিবাসীদের জংলের মধ্যে বসতি স্থাপনে উৎসাহ দিয়েছিল। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ভূমি ব্যবস্থায় যেমন খাস জমি পতিত জমির নামে কৃষকের জমির অধিকার কেড়ে নব্য ভূস্বামীদের মধ্যে বিলি বন্টন করা হয়েছিল, এখনও তেমন লগ্নিপুঁজির স্বার্থে জংগল সংরক্ষণের নামে আদিবাসীদের বঞ্চিত করে নতুন নতুন আইন আনা হচ্ছে দেশী বিদেশী পুঁজির স্বার্থে।

ঝাড়খণ্ড, ছত্রিশগড়, মধ্যপ্রদেশ সর্বত্র সোনার চেয়েও দামী খনিজ সম্পদ সমৃদ্ধ আদিবাসী ভূমি বেচে দেওয়া হচ্ছে তথাকথিত উন্নয়নের নামে। কয়েকবছর আগে বস্তারে বাইলাভিলা খনি বেসরকারিকরণে কত শত ভূমিপুত্র জীবিকা, জমি হারিয়েছে তার কোনো হিসেব নেই। বস্তুত ভারতের স্বাধীনতার পর থেকে তথাকথিত নগরায়ণ, উন্নয়নের নামে প্রান্তিক মানুষজন উচ্ছেদ হয়েছেন আজও। তার কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যা সরকারী হিসেব নেই।

অনেকেই বলবেন, পুনর্বাসনের মধ্য দিয়ে এ সমস্যার সমাধান সম্ভব। প্রশ্নটা নিছক সমস্যা বা সমাধানও নয়, আগেই বলেছি প্রশ্নটা আসলে রাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গির। সুপ্রীমকোর্ট প্রত্যক্ষভাবে জমি থেকে ঊচ্ছেদেরও কথা বলেনি। কথা উঠেছে জমির মালিকানা নিয়ে। জমির উপর ভূমিপুত্রের অধিকার নিয়ে। এসব ভারী ভারী বোলচালে হারিয়ে যাচ্ছে অরণ্য নির্ভর অর্থনীতি ধ্বংস হয়ে গেলে আদিবাসী কোন বিকল্প জীবিকা অবলম্বন করে বেঁচে থাকবে?

যেখানে যেখানে আদিবাসী বাস্তুচ্যুত হয়ে ভারি শিল্প গড়ে উঠেছে, জলাধার তৈরি হয়েছে, ট্যুরিস্ট হাব বা নগরায়ণ হয়েছে সর্বত্র আদিবাসী জনবসতি দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হতে বাধ্য হয়েছে। সস্তার শ্রমিক হয়ে কর্পোরেট পুঁজি বৃদ্ধির সহায়ক হয়েছে। আর একটা প্রবণতাও ইদানীং বিভিন্ন রাজ্যে, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে বাড়ছে। ডেলি দু টাকা কেজি দরে চাল দিয়ে আদিবাসীদের ভিখারিতে পরিণত করা। সব জায়গায় গেলে ট্যুরিস্ট হয়ে দেখবেন সন্ধ্যে হতে না হতে শহর থেকে যাওয়া মুক্ত অর্থনীতির দৌলতে জন্ম নেওয়া আর্বান এলিট, নব্যবাবুদের মনোরঞ্জনে আদিবাসী তরুণ তরুণী মনোরঞ্জনে ব্যস্ত। মদের গ্লাস হাতে বাবুদের প্রেম জেগে ওঠে প্রাচীন সভ্যতাকে চোখের সামনে নাচতে দেখে।

নতুন অরণ্য আইন চালু হওয়ার ক্ষণে আদিবাসী, বনবাসীদের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হয়।স্বাধীন অর্থনীতির বিকল্পে সে সস্তার শ্রমিক হতে বাধ্য হবে। তাই স্রেফ একটা আইন নয় প্রতিবাদ করা দরকার শাসকদের দৃষ্টিভঙ্গির।



127 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

কোন বিভাগের লেখাঃ বুলবুলভাজা 
শেয়ার করুন



আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন