বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

অন্য ভোট (পর্ব ৩) -- আকাশে ছড়ানো মেঘের কাছাকাছি দেখা যায় তোমাদের বাড়ি

মৌসুমী বিলকিস

আমাদের স্বপ্ন একটা বাড়ির। যে বাড়িতে দমকা বাতাস খেলে যাবে লুকোচুরি। দক্ষিণের বারান্দায় বসে হাওয়া খেতে খেতে চা পান করা যাবে। হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যাবে মেঘেদের দঙ্গল। রাতের অন্ধকারে হওয়া যাবে চাঁদের মুখোমুখি।

হাতুড়ি ও কোদালের কাব্য

সাত সকালেই চড়া রোদ। গুমোট হয়ে আছে বাতাস। ঘাম মুছে শেষ করা যাচ্ছে না। ক্ষণে ক্ষণে চশমার কাচে জমছে বাষ্প। মাথায় গামছা চাপিয়ে ছাতা ছাড়াই বেরিয়ে পড়েছি। ঘুরছি মুর্শিদাবাদ জেলার ডোমকলের কয়েকটা গ্রামে। কোথায় বাড়িঘর তৈরি হচ্ছে, কোথায় পাওয়া যাবে নির্মাণ শ্রমিকদের, খোঁজ নিচ্ছি লোকজনের কাছে।   

এই জেলার নির্মাণ শ্রমিকের বেশিরভাগই পরিযায়ী। কাজ করতে যান ভিন রাজ্যে। মূলত কেরলে। ভিন রাজ্যের যে কোনও দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্থ হন এঁরাও। প্রবল বন্যায় কেরল ভেসে গেলে হাহাকার পড়ে যায় মুর্শিদাবাদের ঘরে ঘরে। কখনও বা ঘরে ফেরে শ্রমিকের কফিনবন্দী লাশ। কলকাতায় উড়ালপুল ভাঙলে চাপা পড়েন এই জেলার নির্মাণ শ্রমিকরাই। কোনও পরিসংখ্যান না থাকাই কখনও কখনও খুঁজে পাওয়া যায় না অনেক শ্রমিককে। পরিযায়ী শ্রমিকদের জীবন এভাবেই এগিয়ে চলে।

শেষে বাবলাবোনা গ্রামের এক ছোট্ট বাগানের ভেতর তিনজনের দেখা পেলাম। ঘর ঢালায়ের জন্য বিভিন্ন সাইজের লোহার ফ্রেম বানাচ্ছেন বাগানে বসে। বাগানের পাশেই নির্মীয়মাণ একতলা ছোট্ট বাড়ি। জালালুদ্দিন (৩১), মিজান সেখ (২৯) এবং হাবুল সেখ (৩৪)। এই গ্রাম ও আশেপাশের গ্রামের বাসিন্দা। বাগানের মধ্যেই ইলেকট্রিক পয়েন্ট টেনে লোহা কাটছেন। শব্দ উঠছে ঘরঘর। চেরা হাতুড়ির ভেতর লোহা ঢুকিয়ে ‘কোণ’ তৈরি করছেন হাবুল। জালালুদ্দিন ও মিজান সটান লোহার গায়ে বাঁকানো লোহাগুলি তার দিয়ে জুড়ে জুড়ে বানাচ্ছেন লম্বা খাঁচা। বাগানের ছায়ায় গুমোট ভাব নেই। স্বস্তিদায়ক হাওয়া।       

কেরলের জীবন কিরকম?

মিজান, “কষ্ট! প্রথমে দুমাস ছিলাম। খুব কান্নাটান্না করতাম। তবুও অভাবের জন্য থাকতে হত। উপায় নাই। সরকারি কোনও হেল্প পাইনা আমরা। যে বাড়িতে কাজ করছিলাম সেই বাড়ির ছাদের ওপর ত্রিপল টাঙিয়ে থাকতাম। নোট যখন বন্ধ হল আমাদের কাজও বন্ধ ছিল। যা টাকা ছিল সব শেষ হয়ে গিয়েছিল। প্রচণ্ড কষ্ট হয়েছে খাওয়ার। বাড়িতেও কষ্ট হয়েছে। টাকা পাঠাতে পারিনি।”

এখনও কি কেরল গেলে ত্রিপল টাঙিয়ে থাকেন?  

“না। ছ’সাত জন মিলে একটা ঘর ভাড়া নিই। নিজেদেরকে থাকার জায়গা যোগাড় করতে হয়। প্রথম দিকে রাস্তার ধারে বা কোনও জায়গায় ত্রিপল টাঙিয়ে থাকতে হত। ওখানে মোটামুটি মাসে পুনোরো হাজার ইনকাম আছে। এখানে (গ্রামের কাছাকাছি) সাত/আট হাজার হয়।”

হাবুল, “ওখানে যাওয়া মানে নিজে রান্নাবান্না করে খেতে হয়। হোটেলে খেতে গেলে অনেক খরচ। সারাদিন খেটে এসে হাড়ি-থাল মাজা, বাজার করে লিয়ে এসে তরকারি কুটা... মানে... বিরক্ত লাগে। বিরক্ত ল্যাগেও উপায় নাই। সংসার চালাতে হলে কাজ করতে হবে। আবা সকালে ভোর রাতে উঠে রান্না করতে হয়। দুবার রান্না। রান্না করে দুপুরের খাবার লিয়ে কাজে যাই।”

কী রান্না করেন?

“ওই আলু সিদ্দ ভাত। কুনুদিন মাছ লিয়ে আননু তো মাছ।”

অত ভোরবেলায় মাছ?

“মাছ বুলতে সন্ধ্যেয় কাজ থেকে ফিরার সুময় আনি। দুবার হয়ে যায়।”

গরমে খাবার ঠিক থাকে?

“লষ্ট তো হবেই। ফ্রিজ নাই। অনেকদিন খাবার ফেলে দিতে হয়।”

ভোট দেন?

“দিই তো।”

কী মনে করে দেন?

“কী মনে করে দিব... দিই।”

উন্নতি হল?

“কী উন্নতি হবে? আমার টালির ঘর। একটা পার্টি ঘর দিব বুলে কদিন ঘুরিয়ে লিল। দিল কই?”

জালালুদ্দিন, “আমরা তো আর বড় লেভেলের নেতা না। আমরা ভোটার আমাধের আর উন্নতি কী হবে? পঞ্চায়েত ছিল তখন উন্নতি ছিল। এখন পৌরসভায় উন্নতি নাই মানুষের। এই একটা সমস্যা। পঞ্চায়েতে লোক ঘরবাড়ি পায়েছে, এই একশ দিনের কাজগুলা পায়েছে। এখন তো ওগুলা পাছে না।” (ডোমকল পৌরসভা হয়েছে বেশ কিছু বছর।)

কেরলে গিয়ে কাজ করা বেশি পছন্দ না গ্রামে থেকে কাজ করা?

মিজান, “গ্রামে থেকে যদি কাজ পাই তো খুবই ভালো। সেই আশাই তো করি... দেশে (গ্রামে) থাকবো, কাজ করবো, গ্রামের পাঁচ জনকে দেখবো, ভালো লাগবে... দেশে একটা আনন্দ আছে। বিদেশে যেয়ে তো সেই আনন্দটা পাই না, সেখানে কষ্ট।”

নোটবন্দীর সময় কী হল?

জালালুদ্দিন, “বিশাল সমস্যা। সেই সময় কাজ বন্ধ হয়ে গেলছিল, মানুষ তো পয়সা ব্যাগোরে কাজ করাতে পারেনি। টাকা থ্যাকেও কাজ করাতে পারেনি। ধারদেনা করে সংসার চালাতে হয়েছিল।”

ধরুন বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় এলো...

হাবুল, “বিপদই হবে।”

কেন?

“কেন হবে বলতে... আমরা তো গরুর মাংসডা খাই। আর গরু আমাধের খাবার মধ্যে টপেই পড়ে। সব মাংসর কত্তে গরুর মাংস ভালোলাগে আমাধের। ছাগলের বলেন আর মুরগির বলেন, তার কত্তে ভালো। তো গরু যদি বাদ দিয়ে দেয় মুসলিম জাত আর কী খাবে?”

মিজান, “বিজেপি ক্ষমতায় এলে আমাদের কষ্ট হবে... আমরা চাই না।”

কেন কষ্ট হবে?

“খাওয়া দাওয়া, কাজে কামে সবদিক দিয়েই কষ্ট হবে। গরু বন্ধ হলে খাওয়ার কষ্ট।”

কাজে কেন কষ্ট হবে?

“বিজেপি তো এরকমভাবেই চলছে... হুট করে টাকা বন্ধ করে মানুষের কষ্টডা করলো। আস্তে আস্তে যদি করতো... এতডা কষ্ট হত না।”


বহুতলে ঝুলন্ত মিস্ত্রিরা

মশলা বইছেন সনাতন

সনাতনের সহকর্মী

জালালুদ্দিন, “সুবিধা হওয়ার মতন আপাতত কিছু দেখছি ন্যা। যদি করে সুবিধা তাহলে হবে। বিজেপি সরকার আসে আমাধের... কই সুবিধা আসেনি তো এখন পর্যন্ত। আগে যা ছিল তাই আছে। উল্টে নোটবন্দীর ফলে অসুবিধাই হয়েছে। মোদী সরকার কিছু কাজ... মানে গরু যেগ্যালা পাচার করে সেগ্যালা ধরলে ঠিক আছে। আর খাবার ব্যাপারে যার যেডা পছন্দ সে সেডা খাক... ভুল করছে বন্ধ করে... রুচির ব্যাপার। আমরা তো কাজ করতে যায়ে অন্য রাজ্যগুলানেও দেখছি... এরকম অসুবিধা হয় না... শুধু মোদীর রাজ্যগুলানেই...”

পরের দিন টুকটুক ভাড়া করে বেরিয়ে পড়া গেল অন্য কয়েকটা গ্রামের উদ্দেশে। একজন পরিচিত হেডমিস্ত্রি ফোন করে জানালেন কোথায় কোথায় কাজ চলছে। এদিনও কড়া রোদ আর গরম। এদিনও মাথায় গামছা। একে তাঁকে জিজ্ঞেস করে তরুণ টুকটুক চালক হেডমিস্ত্রির নির্দেশিত জায়গায় পৌঁছে দিয়ে অপেক্ষা করছেন।

একটা বাড়ির দোতলায় কাজ হচ্ছে। এখানে কাজ করা শ্রমিকদের মধ্যে সবথেকে বয়স্ক সনাতন কর্মকার (৪১)। বাজিতপুর গ্রামে বাড়ি। সাত বছর কাজ করেন। ছেলেমেয়ে, বউ নিয়ে সংসার। মশলা মেখে মাথায় তুলে আদ্ধেক সিঁড়ি ভেঙে মিস্ত্রিদের দিয়ে আসছেন। মিস্ত্রিরা তার মাখা মশলা দিয়ে ইঁটের পর ইঁট গাঁথছেন। গামছায় ঘাম মুছতে মুছতে সামনে এসে দাঁড়ালেন সনাতন। মুখে পূর্ব পরিচিতির হাসি। অন্য এক কাজের জায়গায় তাঁর সঙ্গে দেখা হয়েছিল বছর খানেক আগে। মনে রেখেছেন।   

যোগাড়ের কাজ করা শুরু করলেন কেন?

“সংসারে অভাব।”

বাইরের রাজ্যে কাজ করতে যান?

“বছর তিনেক কেরলে কাজ করেছি। এখন শরীল ভারি হয়ে গিছে, মাজার পব্‌লেম, চারিদিকে পব্‌লেমের জন্যে আর যেতে পারি ন্যা। দেশেই কাজ করি।”

কোমরের সমস্যা কতদিন?

“মোটামুটি বছর চারেক থেকে পব্‌লেম।”

ডাক্তার দেখান?

“দেখাই। কিন্তু ওই... একইরকম।”

নোটবন্দির সময় কী করলেন?

“ওই চলেছে... কাজ কম ছিল একটু... অভাবেই চলেছে।”

ভোট দেন?

“ভোট তো আমরা আজীবন কাল দিছি। আমরা চাই যে আমাদের দেশের সাধারণ নাগরিকরা ভালো থাকুক, কিছু পাক। যে আমাদের দেশের কাজ করবে, আমাদেরকে দেখবে তাঁকে আমরা চাই... আমি তাঁকেই ভোট দিব।”

যদি বিজেপি আবার ক্ষমতায় আসে?

“কই? ও তো বহু কথাই বলিছে, মানুষকে কী দিল? কিছুই তো দেয়নি। কিছুদিন আগে শুনলাম যে মানুষের অ্যাকাউন্টে অ্যাকাউন্টে টাকা দিছে... হ্যান দিছে, ত্যান দিছে... কেহুই তো পায়নি... বহু প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল কিছুই তো হয়নি। খাটছি, আনছি, খাছি... এভাবে চলছে।”

ডোমকল তো পৌরসভা হয়ে গেছে। কাজের কিছু সুবিধা হল?

“না, কিছুই হয়নি। বরঞ্চ আরও আমাদের কঠিনই হল। এই আমি হয়তো ঘর করবো বলে দু হাজার, তিন হাজার করে জমিয়ে জমিয়ে রাখলাম... নিজে ঘর করবো তাও হতে দিছে না, বাধা পড়ছে। পৌরসভায় কী এমন সুখ সুবিধা বুঝতে পারছি না। সবই তো চার্জ ডবল ডবল হয়ে গেছে, আমাদের পক্ষে তো অসম্ভব হয়ে গেছে, ঘরদোর করা অসুবিধা হয়ে গেছে। ঘর করতে গেলে পারমিশনের জন্যি পয়সা লাগছে। আট হাজার না দশ হাজার লাগছে। একটা গরীব মানুষ যদি ঘর করতে যায় তো দশ হাজার দিতে হবে। আগে তো তা লাগেনি আমাদের।”

কাজে ফিরলেন তিনি। যার বাড়ি কাজ হচ্ছে তিনি চা খাওয়াতে চায়লেন। সবিনয়ে প্রত্যাখ্যান করে সবাইকে বিদায় জানিয়ে আবার টুকটুকে উঠলাম। সেখপাড়া-কাহারপাড়া ছেড়ে চালক নাসির নিয়ে চললেন বাজিতপুরে। আবার লোকজনকে জিজ্ঞাসা করে পৌঁছানো গেল আর এক কাজের জায়গায়। দোতলা একতলা মিলে বড় একটা বাড়িতে কাজ চলছে।  

লক্ষ্ণন ঘোষ (৫৮) এই দলের সবথেকে বয়স্ক শ্রমিক। ভারি হাতুড়ি দিয়ে একতলার একটা দেয়াল ভাঙছেন। সঙ্গে আরও কয়েকজন শ্রমিক। ন’বছর কাজ করেন। বাইরের রাজ্যে যান না। প্রথমে বেশ সন্দেহ নিয়ে নানান প্রশ্ন করলেন। কয়েকজন কমন পরিচিত মানুষের নাম করে তাঁকে কথোপকথনে রাজি করানো গেল।  

এই বয়সে ভারি কাজ?

“উপায় তো নাই, কাজ করি। যতদূর পারি ব্যাটাকে টেনে দিই। নাহলে ছেলে একলাই কাজ করবে আর আমি বাড়িতে বসে থাকবো...এ হবে না”

নোটবন্দির সময় কি হল?

“ওই তো টাকা থেকে খেতে পাইনি। কাজ করেও টাকা পাইনি। যারা টাকা দিবে ব্যাঙ্ক থেকে টাকা তুলতে পারেনি। মাস খানেক এরকম চলেছে। চার/পাঁচ হাজার টাকা দেনা হয়ে গেছিল। পরে টাকা পেয়ে শোধ হল।”

ভোট দেন?

“হ্যাঁ।”

কী আশা করেন?

“নাগরিক হিসাবে ভোট দিই। আমার কুনু আশা নাই, কেহু কিছু দিবে, পাবো- অ্যাসব আশা নাই। আমার দেহু বজায় থাকলেই হবে। আর রাস্তাঘাট ছাড়া কিছু উন্নতি চোখে পড়ছে না।  যে-ই লঙ্কায় আসবে সে-ই রাবণ সাজবে। আমাকে সেই কুদাল আর গামছা লিয়ে বার্‌হাতে হবে... মাঠে হোক, যেখানে হোক কাজ পাবো খাটবো। নাহলে খ্যাতে পাবো না।”

মাঝে মাঝে তো দাঙ্গা বেঁধে যাচ্ছে বা বাঁধানো হচ্ছে?

“শোন, আমাদের কোনও জাত নাই। আমরা প্রত্যেকের ঘরে খাই, একসাথে কাজ করি। একটা জিনিসই মানি, আমি হিন্দুর ছেলে- যেটা আমার সমাজে চলবে না। তাছাড়া কুনু হিংসা নাই, কুনু রাগ নাই, কুনু ঘিন্না নাই।”

মোদী সরকার অনেক জায়গায় গরু বন্ধ করেছে।

“আমরা চোখ থাকতেও কানা। কুথায় কী ঘটলো আমাদের দেখে লাভ নাই। চাষাতে (বোঝাতে চায়ছেন নিম্ন বর্গের মানুষ) গরু খায় ঠিকই আছে। চাষায় গরু না খালে গরু ফুরাবে কুথায়? জাগা দিতে পারবে না। আমাধের পশ্চিমবঙ্গে যত গরু চাষ হয়, ভারতের বাহিরে যদি না যায়, যদি গরু না খায় মুসলিমে তো গরু রাখভে কুথায়? আমি নিজিই গরু একটা পুষছি। গরুডা যখন অচল হয়ে যাবে, বিয়ান টিয়ান বন্ধ হয়ে যাবে তখুন তো গরু পুষবো না। কাশিম ভায়া, অমুক ভায়া আসে লিয়ে যায়। হাড়-চামড়া হয়তো দশ হাজার টাকা হবে, বুললো তিন হাজার টাকা। তো যা, লিয়ে চলে যা, ওটায় আমার লাভ। আমারও হল, অরও লাভ হল।”

  বহুতল ও সুপারম্যান

এবারে মাথার ওপর ছাতা। শহরের পথে পথে বহুতলগুলিতে ঢু মারা। কয়েকটা বহুতল ঘুরে ঘুরে ভেতরে ঢোকার বা শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলার পারমিশন পাওয়া গেল না। অগত্যা নিরাশ হয়ে বাইরে থেকে কয়েকটা ছবি তুলে ফেরত আসতে হল।   

শহরের বহুতলে দড়িতে ঝুলে ঝুলে কাজ করেন রং মিস্ত্রিরা। দেখলে মনে হবে কোনও সুপার ম্যান কুড়ি/বাইশতলা বিল্ডিং-এর গা বেয়ে ঝুলে পড়েছেন। তাঁদের বেশিরভাগই আসেন দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার ডায়মণ্ড হারবারের দিকের গ্রামগুলি থেকে। একটাই দড়িতে ঝোলে দোলনা। ‘দোলনা ভারা’। দোলনার পিঁড়িতে দুদিকে ঝোলে ‘রঙের চটা’ মানে রঙের বালতি। যখন যেদিকের দেয়াল রং করা হয় সেদিকের রঙের চটা থেকে রং নিয়ে ব্রাশ করা হয় দেয়ালে। রঙের চটায় রং শেষ হয়ে গেলে ছাদের ওপরে থাকা সহযোগিকে হেঁকে বললে তিনি ছাদ থেকে দড়িতে বেঁধে রং পৌঁছে দেন। শূন্যে ঝুলতে থাকা মিস্ত্রি রং ঢেলে নেন রঙের চটায়।

     

অনেক চেষ্টার পর কলকাতা শহরে পাওয়া গেল এরকম দুজনকে। প্রশান্ত হালদার (৩৩) এবং নূর ইসলাম মণ্ডল (৫২)। দক্ষিণ কলকাতায় একটা তিনতলা বাড়ি রং হচ্ছে। এদিন বাঁশের ভারা বাঁধা হয়েছে। তার ওপর উঠে দেয়ালে প্রাইমার বোলাচ্ছেন মিস্ত্রিরা। 

শহরেই থাকেন?

প্রশান্ত, “আমরা রোজ যাতায়াত করি। ভোরবেলার ট্রেন ধরতে হয়। ডায়মণ্ড হারবার লাইন। স্টেশন থেকে এটুকু হেঁটে আসি। আমরা না খেয়ে বার হই বাড়ি থেকে। তো টেশনে নেমে টিফিন মিফিন খেয়ে আটটা দশ পনেরো, আটটা এরকম সময়ে কাজে লেগে পড়ি। একটানা কাজ করি। মাঝখানে কিছু খাই না। দেটটা, পোনে দুটো অব্দি। বাড়ি গিয়ে খাই। কন্টাক্টারের আণ্ডারে কাজ করি। বারো মাস কাজ দেয়। কলকাতায় যত রং মিস্ত্রি থাকুক না কেন আমাদের মগরাহাট আর বারপোয়ার আগে কেউ নেই। রঙের আদি কাজ কিন্তু এই দুই গ্রাম থেকে শুরু হয়েছে।”

ডায়মণ্ড হারবারের জোকতবেলা গ্রামে বাস নূর ইসলামের। নব্বই সাল থেকে কাজ শুরু করেছেন।   

আগে কী করতেন?

“আগে আমার চালের বিজনেস ছিল। তখন কংগ্রেস ছিল তো কারবারটা ভালো চলছিল। সিপিএম এসে কারবারটা খরা মার্কেট হয়ে গেল। কলকাতার মধ্যে চাল আনা যেতনি, হাল্লাফাল্লা ধরতো। চুরি চামারি করে আমাদের চাল আনতে হত। রোডে গেলে পুলিস ধরত। আমি কোনদিন ধরা পড়িনি। কারবারে আর সুবিধে হচ্ছে না বলে রঙের লাইনে চলে এলাম। ছেলেমেয়ে তো মানুষ করতে হবে। ওই হাজরার মোড় থেকে পিজি পর্যন্ত ফ্ল্যাটে ফ্ল্যাটে চাল দেওয়া হত। তখন ব্ল্যাক মার্কেট ছিল। এই যেমন অশোক বোস, মণি বোস, কে জি বোস, শচীন সেন, জ্ঞানেশ মুখার্জি সিনেমার ডাইরেক্টর... সবাইকে চাল দিতাম। মমতা ব্যানার্জির টালির ঘরেও দিয়েছি, এখন কি আর আমাদের চিনবে? চিনবে না। গরীব মানুষ ছিল। আমাদের থেকে চাল নিয়ে খাওয়াদাওয়া করেছে। অবশ্য পয়সা দিয়েছে। এই পঞ্চাশ কিলো, ষাট কিলো চাল আনতাম।”

সর্বোচ্চ কত তলায় কাজ করেছেন?

প্রশান্ত, “হায়েস্ট সাতচল্লিশ তলায়, চেন্নাইতে। মাস খানেক মতো ছিলাম। থাকার কোয়ার্টার দিয়েছিল। বাড়িতে পব্‌লেমের জন্য পুরো কাজ করতে পারিনি।”


সনাতনের সহকর্মী

জালালুদ্দিন ও মিজান

সাতচল্লিশ তলা! ঝুলে ঝুলে কাজ করতে ভয় হয়?

“অসুবিধা নাই। সাহস করলেই হয়। কাজ করতে করতে যখন প্যাকটিস হয়ে যাবে তখন সাতচল্লিশ কেন বাহান্ন তলাও কোনও ব্যাপার না। আর পড়ার কোনও রিস্ক নেই, সেফটি বেল্ট তো ওর সাথে আছে। বাঁশের ভারা হলে পড়ার রিস্ক। বাঁশের ভারায় হামেশাই ছেলে পড়ে মরে যায়। দোলনা ভারায় এখন অব্দি কোনও দুর্ঘটনার খবর শুনিনি। বাইরের কাজের ‘রোজ’ অনেক, ষোলশ টাকা রোজ। কলকাতায় ছ’শ টাকা।”

নূর ইসলাম, “বাঘাযতীনে আটাশ তালা বিল্ডিং-এ ‘দোলনা ভারা’য় কাজ করেছি। ছোটখাট বিল্ডিং হলে বাঁশের ভারা হয়। আমদের ভয় নেই। পথম পথম উঠতে গেলে একটু ভয় হবে। একবার দেখে নিলে আর ভয় থাকে না। পথম আমি দশতালা বিল্ডিং-এ কাজ করি। ছাতের উপর উঠলাম। একজন মিস্ত্রি দেখিয়ে দিল দড়িটা এইভাবে হবে, পিড়েটা এইভাবে বাঁদবে, এইভাবে না্বতে হবে... একবার দেখে নেওয়ার পর আমি নেবে গেলাম। আর কোন ভয়ের কারণ নেই। সেখান থেকে আমার সাহসটা এসে গেল। হ্যাঁ, জীবনের ঝুঁকি আছে। দড়ি যদি একবার কাটে তার মিত্যু বাঁধা আছে। দড়ি মজবুত হলে ভয় নেই। দড়িটা আস্তে আস্তে ছাড়তে হবে। একবারে ছেড়ে দিলে ধপ করে নীচে পড়বে। দুর্ঘটনা সিওর। বাসের ব্রেকের মতোন।”

রোদে-গরমে কাজ করেন আপনারা।

নূর, “ওই... আধঘণ্টা পর রোদ গায়ে বসে গেলে আর মালুম হয় না। আধঘণ্টা কি ঘণ্টাখানেক... সয়ে নেব রোদটা... গায়ে সয়ে নিয়ে আট ঘণ্টা ডিউটি করা যায়।”

পানি খাওয়ার দরকার হলে?

নূর, “একঘরা দড়িতে লিচে নেবে এসে দু তিন মিনিট রেস নিয়ে, জল খেয়ে আবার ভারায় উঠতে হবে। ছাতে উঠে আবার দোলনা লামাবে।”    

ভোট দেন?

প্রশান্ত, “ভোট দেব না? তবে সত্যি কথা বলতে কোনও পাটি করি না। খেটে খাই। যখন ভোট আসে ভোট দিই।”

কী আশা করে ভোট দেন?

প্রশান্ত, “আমাদের কোনও আশা নেই। কী বলুন তো, যে জিতবে সে আম খাবে। কিন্তু গরীব মানুষরা আমের আঁটি খাবে। সেই ব্যবস্থা করে রাখছে, যে কোনও সরকার আসুক। যে জিতবে তাঁর তো কাজ করা উচিত। কিন্তু আমরা যদি বলি যে মানুষের জন্য কাজ কর, আমাদের কথা কি শুনবে? গণতান্ত্রিক দেশ, ভোটার হয়েছি, ভোট দিতে হবে। নাহলে ভোটটা বেকার। ধরেন আমার রেশন কার্ডের জন্যি গেলাম। হাঁটে হাঁটে পা চলিক হয়ে যাবে, দশ জোড়া জুতা ক্ষয়াবে, কিন্তু হবে না জিনিসটা... ও বেকার। দেশেগায়ে তো সমস্যা। ধরুন খাল দূষণ হচ্ছে, পরিষ্কার হচ্ছে না। তবে আমাদের ওদিকে রাস্তাঘাট ভালো।”


লোহা কাটা

হাবুল সেখ

নূর, “কী আশায় ভোট দেব... মানে... একটা নাগরিক হিসেবে তো ভোট দিতে হবে। ঝেমন, গ্রাম পঞ্চায়েত অঞ্চলে যে প্রার্থীকে ভোট দিলে আমাদের কাজের সুবিধা হবে সেই প্রার্থীকে আমরা ভোট দিই। আমাদের রাস্তাঘাট থেকে অনেক সুবিধে হয়েছে। ঝখন থেকে টিএমসি সরকার এসছে, প্রচুর হারে কাজ করছে। এমনকি আমরা মোহামেডানরা যেসব জিনিস পাইনি টিএমসি সেসব জিনিস আমাদের এনে দিয়েছে।”

কীরকম?

“ঝেমন ধরুন... আমাদের মসজিদের ইমাম সাহেব আছে। তার মাইনে বার করে দিয়েছে। বাড়িঘর, বাথরুম... আমি পাইনি...কিন্তু বিভিন্ন জিনিস আমাদের গ্রামের লোকরা পেয়েছে। মানে ঘর ঘর বাথরুম দিয়েছে। প্রচুর হারে দিয়েছে।”

‘স্বচ্ছ ভারত’ প্রকল্প থেকে?

“তা জানি না। পঞ্চায়েত থেকে দিয়েছে। আমরা শিক্ষিত না তো, ঠিক জানি না। খাঁটি খাই এই পজ্যন্ত। ওই আপনার ন’শ টাকা করে নিয়েছে। দেওয়াল টেওয়াল তুলে, ছাউনি টাউনি করে বাথরুম করে দিয়েছে।”

বাঁশের ভারায় উঠে আবার কাজে লেগে পড়েন প্রশান্ত ও নূর। সারা গায়ে প্রাইমারের ছিটে। বিদায় নিয়ে আমিও মিশে যাই শহরের ভিড়ে। রাস্তায় রাস্তায় রাজনৈতিক চিহ্নওয়ালা পতাকা ওড়ে। দেয়ালে দেয়ালে রঙিন লেখন। মোড়ে মোড়ে বাজে লাউড স্পিকার। বাতাসে ওড়ে ভোট চাওয়ার আবেদন। আর এই চড়া রোদের গায়ে একাকার হয়ে যায় শ্রমিকদের দিনলিপি।


ছবি: লেখক
অন্যান্য পর্ব

235 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

কোন বিভাগের লেখাঃ বুলবুলভাজা 
শেয়ার করুন


Avatar: বিপ্লব রহমান

Re: অন্য ভোট (পর্ব ৩) -- আকাশে ছড়ানো মেঘের কাছাকাছি দেখা যায় তোমাদের বাড়ি

চমৎকার লেখা, স্পষ্ট বয়ান। "যে যাবে লংকায়, সেই হবে রাবন। ভোট দিতে হয়, তাই দেই"। ব্যাস
Avatar: দ

Re: অন্য ভোট (পর্ব ৩) -- আকাশে ছড়ানো মেঘের কাছাকাছি দেখা যায় তোমাদের বাড়ি

এই সিরিজটা অসাধারণ হচ্ছে।


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন