বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

ভারত রাষ্ট্রের স্বাস্থ্যনীতি ও সাধারণ নির্বাচন – আমজনতা কোথায় দাঁড়িয়ে

জয়ন্ত ভট্টাচার্য

সতীনাথ ভাদুড়ী “ঢোঁড়াই চরিত মানস”-এ জব্বর ভোটের অর্থাৎ আমাদের সাধারণ নির্বাচনের বর্ণনা দিয়েছেন। সম্ভবত উপনিবেশিক ভারতের প্রথম ভোটের কথা বলেছেন সতীনাথ – ১৯৩৪ সালে। ঢোঁড়াইয়ের অনুভূতি হয়েছিল – “অদ্ভুত জিনিস এই ‘বোট’। হঠাৎ টাকা পেলে লোকের ইজ্জত বাড়ে, এর অভিজ্ঞতা ঢোঁড়াইয়ের জীবনে আগে হয়ে গিয়েছে। বোটও সেই রকম রাতারাতি লোকের ইজ্জত বাড়িয়ে দেয়, কেবল যে বোট দেবে তার নয়, সারা গাঁয়ের।” এরকম তাড়নায় “ঝাঁপিয়ে কেড়ে নেয় ঢোঁড়াই পাশের বলান্টিয়ারের হাতের চোঙাটা; গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে।

মাগনা কচুরি পাও খেয়ে নিও
মাগনা গাড়ি পাও চড়ে নিও
পয়সা পাও বটুয়াতে ভরে নিও
কিন্তু ভোটের মন্দিরে গিয়ে বদলে যেও ভাই হামারা
সাদা বাক্স’ মহাৎমাজীকা শাডা বাক্স!
বাবুসাহেবের পাহারাদার বজ্রবাঁটুল তিলকুমাঝি ছুতো করে তাঁবুর বাইরে এসে ঢোঁড়াইকে ইশারা করে জানিয়ে যায় যে, তারা ঠিক আছে।” এ অব্দি পড়ার পরে স্তব্ধতা গ্রাস করে যেন! সতীনাথ বাস্তবিকই ক্রান্তদর্শী। আমাদের সময়কার ‘বোট’ বা ভোট দেখতে পেয়েছেন বুঝি নিজের চোখে অন্তত ৬০-৭০ বছর আগে।

ভোট, মানে যাকে বলা হয় গণতন্ত্রের বৃহত্তম উৎসব, একদিকে যেমন আমাদের দেশের পাঁচ বছরের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, বিদেশনৈতিক, সামরিক এবং জনতোষিনী ইত্যাদি বিভিন্ন কার্যক্রমের বিচার-বিশ্লেষণ, তেমনি আরেকদিকে মানুষের ভাবনা-জগৎ, বীক্ষা, সামাজিক পারস্পরিকতা ইত্যাদির নতুন উদয়, নতুন নির্মাণও বটে। ৭২ বছরের গণতান্ত্রিক দেশে গণতন্ত্র তার শেকড় সামাজিক জীবনের অনেক গভীরে, অনেক বিস্তারে ছড়িয়েছে। যে যে স্বাধীন, সবাক, স্বরাট প্রতিষ্ঠানগুলো গণতন্ত্রের স্তম্ভ, রক্ষাকবচ, সেগুলো সুরক্ষিত রয়েছে কিনা মানুষ তো তার মতো করে হিসাব বুঝে নেবেই। এরকম ক্ষমতাসমৃদ্ধ বলেই বহু ক্ষুণ্ণতা, ক্লিন্নতা, অসম্পূর্ণতা সত্ত্বেও এদেশে গণতন্ত্র বেঁচে থাকে। সমাজের যে যে স্তর, স্বর ও বিষয় রাষ্ট্রের ভাষ্যে কোন পরিসর পায়না সেগুলো গ্ণতন্ত্রের আন্দোলনের জোরে জায়গা করে নেয়। রাষ্ট্র এবং সমাজের, প্রশাসন এবং নাগরিকের, ভোটার এবং ভোটের মেশিনারির পারস্পরিক সম্পর্ক কখনোই একমাত্রিক নয়, দ্বান্দ্বিক। এই দ্বান্দ্বিকতার ভারসাম্য, সুষম সুস্থিতি গণতন্ত্রের elan vital তথা জীবনীশক্তি। এটা যেদেশে নেই সেখানে দেশটি রাষ্ট্রের বিচারে failed state – এক ব্যর্থ প্রক্রিয়ার সাক্ষী। সে পাকিস্তান কিংবা অন্য যেকোন রাষ্ট্র হতে পারে। তবে যেসব ঐতিহাসিক প্রক্রিয়াগুলোর স্বচ্ছন্দ ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ায় জীবিনীশক্তিসম্পন্ন জনগণের রাষ্ট্র হতে পারে – যেখানে ঢোঁড়াইও থাকে দানা মাঝিও থাকে, আসিফাও থাকে নীতা আম্বানিও থাকে, নির্ভয়াও থাকে গৌরি লঙ্কেশও থাকে, যেখানে আমিও থাকি আপনিও থাকেন – সে প্রশ্নগুলোর বিচার করা, ভেবে দেখা জরুরি। একটি রাষ্ট্র একসময়ের failed state বলে আবার গণতান্ত্রিক ভোর দেখবেনা এমনটা নাও হতে পারে। আবার গণতন্ত্রের পরীক্ষায় ৭২ বছর ধরে পরীক্ষিত একটি রাষ্ট্রের ইতিহাসের কোন এক মুহূর্তে fail করবেনা এরকম কোন নিশ্চয়তাও ভবিতব্য আমাদের দেয়নি। পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোর দিকে আমরা তাকালে দেখতে পাবো এরকম ইতিহাস।

এ ভোটের বর্ণময় উৎসবে কি চাইবো আমি? কিই বা চাইতে পারে আমার মতো এককসত্তাসম্পন্ন, রাজনৈতিক- প্রশাসনিক-সামরিক ক্ষমতাহীন একজন মানুষ? চাইতে পারে “আমার সন্তান যেন থাকে দুধে-ভাতে”, নিদেন পক্ষে ফ্যানে-ভাতে। চাইতে পারে নদী-অরণ্য-বৃক্ষ-অরণ্যের সন্তানদের হত্যা বন্ধ হোক। আবার প্রায়-মৃত নদীগুলো বেগবান উঠুক। নদী মরে যাচ্ছে বলে খোদ আমেরিকায় ১৫০০-এর বেশি বাঁধ ভেঙ্গে দেওয়া হয়েছে, ফাটিয়ে দেওয়া হয়েছে। কলোরাডোর সহ অনেক ছোট নদী আবার বেগবান হয়ে উঠেছে, হারিয়ে যাওয়া মাছ আর শৈবালেরা ফিরে আসছে ধরিত্রীর বুকে। এই সাধারণ নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর বিস্তর ঢালাও প্রতিশ্রুতির বন্যায় আমরাও একটু-আধটু চাইতে পারি। চাইতে পারি জীবন যাত্রার সুস্থ-স্বাভাবিক সমস্ত ধরনকে রাষ্ট্র এবং এর পরিচালকেরা মমতা নিয়ে স্বীকৃতি দিক। কোন একটি name tag-এ যেন তাদের দাগিয়ে দেওয়া না হয়। হাঙ্গর সদৃশ কর্পোরেটরা নয়, ভারতের অর্থনীতি নির্মিত হোক নিজস্ব সম্পদ ব্যবহার করে।

আরেকটা ছোট্ট বিষয়ও আমরা চেয়ে ফেলতেই পারি – সবার জন্য স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং সম্মান নিয়ে বেঁচে থাকার অধিকার স্বশক্তিতে মান্যতা পাক। পণ্য এবং শব্দ যেন আমাদের চিন্তাকে শুষে না নেয়! “আমাদের শুকনো ভাতে লবণের ব্যবস্থা হোক!”

এই শেষের চাওয়াগুলো নিয়েই গোল পাকিয়ে যায় – বিশেষ করে সকলের জন্য স্বাস্থ্যের অধিকার বা অন্য কথায় বললে স্বাস্থ্যকে ভারতের হাতে গোণা কয়েকটি মৌলিক অধিকারের অন্যতম করে তোলার দাবী। গুরুচণ্ডালীর পাতাতেই ডঃ বিষাণ বসু অনতিপূর্বে প্রকাশিত তাঁর একটি প্রবন্ধে যথাযথভাবে দাবী করেছেন বহু সংগ্রামের মধ্য দিয়ে এবারের নির্বাচনে বড়ো জাতীয় দলগুলোর নির্বাচনী ইস্তাহারে সম্ভবত স্বাস্থ্য নিয়ে কথা ৪ ফন্ট সাইজের কোন চোখে না পড়ার মতো ফুটনোট না হয়ে ১২ ফন্ট সাইজের প্রতিশ্রুতি হিসেবে এসেছে (যদিও আমার মতো এতো খারাপ ভাষায় বিষাণ বলেননি)।

আমি দুটো দলের ইস্তাহার বিষাণের লেখার পরে পড়েছি – ভারতের জাতীয় কংগ্রেস এবং ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। কংগ্রেস দুটি মূল কথা বলেছে – প্রথম, ভারতের জিডিপি-র ৩% স্বাস্থ্যখাতে ব্যয় করা হবে; দ্বিতীয়, স্বাস্থ্যপরিষেবার অধিকার বা Right to Health Care-কে স্বীকৃতি দেওয়া হবে। ভারতের জাতীয় স্বাস্থ্যনীতি (২০১৭)-তে যা বলা হয়েছে যেমন জিডিপি-র ২.৫% স্বাস্থ্যখাতে ব্যয় করা হবে (প্রাথমিকভাবে, পরবর্তীতে ৪%-ও হতে পারে), সংহত প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা বা comprehensive primary health care-কে ভিত্তি ধরে বিস্তৃত করতে হবে। সেক্ষেত্রে AYUSH একটি বা বলা চলে অনেক ক্ষেত্রে একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। এর সাথে রাষ্ট্রের তরফে দারিদ্র্য সীমার নীচে থাকা একটি বড়ো অংশের জনতার ইন্সিউরেন্সের আংশিক দায়িত্ব সরকার নেবে। পরের কথাগুলো বিজেপির ইস্তাহারে আছে।

আমার আলোচনায় দু-তিনটে জায়গা ধরে আলোচনা করবো। (১) ইস্তাহারের বয়ান অনুযায়ী Right to Health Care কিংবা Right to Health, কোনটা বেশি কাম্য আমাদের কাছে এবং কেন Right to Health Care-এর কথা বলা হয়েছে বা বলা হয়? এ কি নেহাতই আপতিক না সুচিন্তিত। (২) সংহত প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা বা comprehensive primary health care-এর গোড়ার ধারণা কি? কেন এ প্রসঙ্গ এরকম গুরুত্ব নিয়ে WHO-র তরফে প্রাথমিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিয়ে প্রথম আন্তর্জাতিক সম্মেলনে (আলমা-আটা, ১৯৭৮) এত গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা করা হয়েছিল। সেখানে comprehensive primary health care বলতে যা বোঝানো হয়েছিল এখানেও কি এক কথাই বলা হচ্ছে – শব্দগুলো বাদ দিয়ে। (৩) AYUSH কিভাবে স্বাস্থ্য পরিষেবা পৌঁছে দেবার নির্ভরযোগ্য মাধ্যম হতে পারে? আধুনিক জনস্বাস্থ্য এবং চিকিৎসার সবটাই গড়ে উঠেছে অ্যানাটমির জ্ঞান, রোগের উৎপত্তির অঙ্গ স্থানিকতা, স্যানিটেশন, হাইজিন এবং জীবানু-পরজীবী-ভাইরাস সম্পর্কে নিরন্তর বিকাশমান জ্ঞান ও বোধ নিয়ে। এগুলোকে বাদ দিয়ে কি করে প্রকৃত রাস্তায় স্বাস্থ্যের সুরক্ষা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব?

আমি প্রথমে বিজেপির ঘোষিত সংহত প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা বা comprehensive primary health care নিয়ে দু-এক কথা বলি। ১৯৭৮-এর আলমা-আটা সনদের ১০ নম্বর ধারায় বলা হয়েছিল – পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের জন্য একটি গ্রহণযোগ্য মানের স্বাস্থ্য ২০০০ সালের মধ্যে অর্জিত হতে পারে, যদি পৃথিবীর সম্পদকে পরিপূর্ণ চেহারায় আরো ভালোভাবে ব্যবহার করা যায়। এ সম্পদের এক বড়ো অংশ এখন ব্যয় করা হয় সমরসম্ভার গড়ে তুলতে এবং যুদ্ধের জন্য। আন্তরিকভাবে স্বাধীনতা, শান্তি, দ্বিপাক্ষিক বোঝাপড়া (détente) এবং নিরস্ত্রীকরণের নীতি প্রণয়ন অতিরিক্ত সম্পদ উৎপাদনের রাস্তা উন্মুক্ত করবে। এ সম্পদসম্ভারকে ব্যবহার করা সম্ভব আর করা উচিৎও শান্তির লক্ষ্যে এবং বিশেষ করে সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য, যার মধ্যে একটি আবশ্যিক অংশ হিসেবে প্রাথমিক স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে এর অংশ দিতে হবে।”

অস্যার্থ, পৃথিবীর দূরতম প্রান্তের স্বাস্থ্যের সুযোগহীন মানুষটির জন্যও প্রাথমিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা সুরক্ষিত করতে হবে এবং এজন্য স্বাধীনতা, শান্তি, দ্বিপাক্ষিক আলাপ-আলোচনা এবং নিরস্ত্রীকরণের নীতি গ্রহণ করতে হবে যার মধ্য দিয়ে একটি দেশের সুষম বিকাশের জন্য আরো বেশি মানবসম্পদ সৃষ্টি হতে পারে। এবার বর্তমান যুদ্ধোন্মত্ততার পরিস্থিতিতে কিভাবে তৈরি হবে মানব সম্পদ? কিভাবে নির্মিত হবে স্থানীয় সম্পদ, পারস্পরিক বিশ্বাস, যূথ চেতনার উপর ভিত্তি করে জনস্বাস্থ্যের চেহারা? জনস্বাস্থ্যের চেহারা তো কোন প্রাতিষ্ঠানিক কিছু নয়, বড়ো বড়ো বিল্ডিং-ও নয়, নয় হোমরা চোমরা কেউকেটা আমলা এবং কর্তাদের দল। এখানে প্রয়োজন একেবারে প্রান্তিক স্তরে জনতার অংশগ্রহণ এবং পারস্পরিক সম্প্রীতি ও বোঝাপড়ার ভিত্তিতে স্বাস্থ্যের বনিয়াদ তৈরি করা। আলমা-আটা সনদের ৪ নম্বর ধারায় বলা হয়েছিল – “individuals have a right and duty to participate individually and collectively in the planning and implementation of their healthcare”। আমাদের এখানে স্বাস্থ্যের যে ধারণা এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থা বিরাজমান তা প্রধানত ভার্টিকাল – পিরামিডের গঠনের মতো। ওপরে সব মাথাভারী প্রশাসনিক কর্তারা বসে রয়েছে, তাদের ভার বহন করছে নীচের তলার সম্পদহীন, অধিকারহীন (entitlement), সম্বলহীন প্রায় ৯০ কোটি বা তার বেশি ভারতবাসী। কিভাবে comprehensive primary health care-এর বার্তা পৌঁছুবে এদের কাছে? উত্তর নেই। ইস্তাহার নিশ্চুপ।

১৯৫০-৭০-র দশক জুড়ে বিশ্বরাজনীতিতে দ্বিমেরু বিশ্বের জীবন্ত উপস্থিতি ছিল। প্রবল পরাক্রান্ত, আগ্রাসী ও মুক্ত পুঁজি এবং সাম্রাজ্যবাদের মুখোমুখি দাঁড়ানোর মতো ভিন্ন একটি আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার অস্তিত্ব – সমাজতান্ত্রিক বলে যার উপস্থিতি ছিল জনমানসে। দ্বিমেরু বিশ্বের উপস্থিতির জন্য রাজনৈতিক এবং সামাজিক একটি পরিসর তৈরি হয়েছিল যাকে বলতে পারি “তৃতীয় পরিসর”। বিশ্বের মানুষের স্বাভাবিক আশা-আকাঞ্খা এবং দাবী নিয়ে দর কষাকষির ক্ষমতা বেশি ছিল। পরবর্তীতে একমেরু বিশ্বের উদ্ভব এসবকিছুকে পরিপূর্ণভাবে বিনষ্ট করে দেয় – আজকের ভারত এর একটি প্রোজ্জ্বলন্ত উদাহরণ। এ সময়েই পৃথিবী জুড়ে শ্লোগান উঠেছিল – স্বাস্থ্য আমার অধিকার।

অল্পকথায়, জনস্বাস্থ্যের কিংবা জনতার স্বাস্থ্যের দর্শন একটি বহুল পরিমাণে ভিন্ন অবস্থান। এটা কোন একক ব্যক্তিকে পণ্য হিসেবে বিক্রী করা চকমকে মোড়কে মোড়া “finished product” স্বাস্থ্য পরিষেবা বা “হোল বডি চেক আপ” নয়, মেডিক্যাল শিক্ষার বুদবুদের বাজার নয় (New England Journal of Medicine বা NEJM-এ প্রকাশিত একটি প্রবন্ধ থেকে ধার করা) বা এখানে কোন লুকনো শিক্ষাক্রমও নেই। প্রসঙ্গত, NEJM-এ সেপ্টেম্বর ২৯, ২০০৫-এ প্রকাশিত একটি প্রবন্ধে – “Learning from the Dying” – মন্তব্য করা হয়েছিল – “Unfortunately, the “hidden curriculum” of contemporary medicine – especially the hurried, disease-centered, impersonal, high-throghput clinical years – still tends to undermine the best intentions of students and faculty members and the best interests of patients and families.”। অর্থাৎ, বর্তমান মেডিসিনের একটি “লুকনো পাঠ্যসূচী” রয়েছে, বিশেষ করে ত্বরায় শেষ করা, রোগ-কেন্দ্রিক, নৈর্ব্যক্তিক, চাপের মধ্যে যেকোন কাজ দ্রুত, সময়ে সেরে ফেলতেই হবে এরকম আবহাওয়ার রোগীকে চেনার বছরগুলো ছাত্রদের, ফ্যস্কাল্টি সদস্যদের সর্বশ্রেষ্ঠ আকাঙ্খা এবং রোগীদের এবং পরিবারের সর্বোচ্চ স্বার্থের হানি ঘটায়। আপনারা বিচার করুন পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ মেডিক্যাল শিক্ষার জগৎ আমেরিকায় ২০০৫ সালে এরকম সংকটের জন্ম হচ্ছে, যা এখন বেড়েছে বই কমেনি। কোথায় যাত্রা করবে নৈর্ব্যক্তিক চিকিৎসার তরণী কর্পোরেট সমুদ্র বেয়ে? মানুষ তো এখানে একটি সংখ্যা বা অবজেক্ট মাত্র।
জনস্বাস্থ্যের কিংবা জনতার স্বাস্থ্যের দর্শনে কোন “লুকনো শিক্ষাক্রম” থাকেনা। এখানে সবকিছুই অবারিত খোলা এবং পরস্পরের প্রতি দায়বদ্ধ। নিজের নিজের সমাজ, সংস্কৃতি, ধর্মীয় বিশ্বাস, দৈনন্দিন জীবন-চর্যা এবং সর্বোপরি পড়শি-চেতনা ধরে আছে ভারতের মতো আরো বহু দেশের অসমসত্ত্ব বিপুল জনসমষ্টিকে। এখানে টিবির মতো নিঃশব্দে মারণান্তক রোগের বাস, কৃমিতে ক্ষয়াটে চেহারার সমাহার, এখানেই থাকে আন্তর্জাতিক জগতে আলোচিত “tropical neglected diseases” – যার জন্য ব্যয়বরাদ্দ কিছু নয় বললেও বেশি বলা হয়। এই বিশেষ অবস্থান বুঝতে না পারলে মেডিক্যাল কলেজের প্রশিক্ষণ শেষ করা মাত্র জনস্বাস্থ্যের জন্য উপযোগী চিকিৎসক হয়ে ওঠা যায় না। মুক্ত বাজারের অর্থনৈতিক ও সামাজিক দর্শন, বিশেষ করে এর উপজাত social psyche, একদিকে clinical health ও public health; অন্যদিকে, health এবং হেল্‌থ কেয়ার-এর মধ্যেকার প্রভেদ মুছে দিতে বদ্ধ পরিকর। আরও বেশি সংখ্যক প্রাইভেট মেডিক্যাল কলেজ তৈরির ঢালাও অনুমতি, মুক্ত বাজারের অর্থনীতির নিয়ম মেনে উচ্চ মূল্যে মেডিক্যাল শিক্ষার কেনাবেচা – কোনওটাই primary health care-এর উপযোগী চিকিৎসক তৈরি করবেনা।

আমাদের মেডিক্যাল শিক্ষাক্রম কি এর উপযুক্ত করে তৈরি করা হয়েছে? কিংবা ভবিষ্যৎ কোন পরিকল্পনা রয়েছে এভাবে মেডিক্যাল শিক্ষা ও তার উপযুক্ত মেডিক্যাল শিক্ষাক্রম তৈরি করার? দুটোরই স্পষ্ট উত্তর হচ্ছে – না। রাষ্ট্রের তরফে মানুষমুখী মেডিসিন (যেমন আমেরিকা বা ইউরোপে “মেডিক্যাল হিউম্যানিটিজ” বা “narrative medicine” কিংবা “patient-centered medicine”-এর মতো শিক্ষাক্রম) তৈরি করার কোন উদ্যোগ কি আছে? যদি কাগজে কলমে থেকে বাস্তবে না থাকে তাহলে কিভাবে সম্ভব comprehensive primary health care-এর বাস্তবায়ন বা এর জন্য স্বপ্ন দেখা? এ বিষয়গুলোকে স্পর্শ করা হয়নি রাজনৈতিক ইস্তাহারে। এরকম সময়ে বুঝি এলিয়টের কথা ধার করে বলতে হয় –
“Between the idea
And the reality
Between the motion
And the act
Falls the Shadow”
এর সাথে আরো বিপজ্জনক বার্তা বহন করে নিয়ে আসছে মেডিক্যাল কাউন্সিল অব ইন্ডিয়া-র নতুন মেডিক্যাল শিক্ষক্রমের জন্য সুপারিশ। ৩৫ বছর পরে মেডিক্যাল শিক্ষাক্রম পরিবর্তিত হতে চলেছে। এই সুপারিশে family practitioner কিংবা primary care physician জাতীয় কোন শব্দই নেই। এমবিবিএস পাশ করা general practitioner-রা কেবলমাত্র স্পেশালিস্টদের অনুসারী, পুরনো দিনের কম্পাউন্ডার গোছের, হয়ে থাকবে। এ বিষয়ে Journal of Family Medicine and Primary Care-এর সম্পাদক রমন কুমার একটি চমৎকার সম্পাদকীয় লিখেছেন “The tyranny of the Medical Council of India’s new (2019) MBBS curriculum: Abolition of the academic discipline of family physicians and general practitioners from the medical education system of India” শিরোনামে (Journal of Family Medicine and Primary Care 8, 2 (2019): 323-325)।
তিন খণ্ডে ৮৯০ পাতা জুড়ে লেখা এই বিশাল সুপারিশপত্রে মোট ২৯৩৯টি দক্ষতা অর্জনের কথা বলা হয়েছে শিক্ষারত এমবিবিএস ছাত্রছাত্রীদের জন্য। কিন্তু এত সুপারিশের মাঝে একবারের জন্যও “General Practice”, “Family Medicine” বা “Family Physician” গোত্রের অতি-পরিচিত শব্দগুলো নেই। রমন কুমার মন্তব্য করছেন – “The absence of the discipline of family medicine/general practice within the MBBS curriculum is not inadvertent. It has been deliberately blackened out.” পরবর্তীতে তিনি আরও কড়া ভাষায় বলছেন – “Keeping out family physicians and general practitioners from the health system means a free flow of patients from community to expensive tertiary care facilities in the absence of any structured referral system. Family medicine and general practice are independent medical disciplines/specialties across world. The curriculum neither meets the national public health aspirations nor the GOI policies on medical education. If implemented, it will be disastrous to the healthcare delivery system and public good in general.” রমন খুব খোলাখুলি নিজের অভিমত ব্যক্ত করেন – “The new MBBS curriculum deserves to be outright rejected for the inherent fallacies – আভ্যন্তরীন নিজস্ব দুর্বলতার জন্য নতুন এমবিবিএস শিক্ষাক্রমকে এখুনি প্রত্যাখ্যান করা উচিৎ।”

খোদ আমেরিকায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার উপযুক্ত চিকিৎসক নেই বলে হাহাকার পড়ে যাচ্ছে। NEJM-এ প্রবন্ধ প্রকাশিত হচ্ছে – “Transforming Primary Care – We Get What We Pay for” (NEJM 374, 24 (2016): 2390-92)। ঐ প্রবন্ধে বলা হচ্ছে – “Primary care is the foundation of effective health care systems ... primary care physicians, patients and physicians value continuity in their primary care relationships, which can last many years.” বেভেরলি ঊ “Primary Care – The Best Job in Medicine?” প্রবন্ধে জানাচ্ছেন – “There is an urgent need to reverse current trends. Although the line of students signing up for a career in primary care medicine is getting shorter, the line of patients in need of primary care doctors is getting longer every day. ” (NEJM 355, 9 (2006): 864-866)। এরকম এক আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক আবহে যেখানে মুক্ত বাজারের হাতে সমর্পিত হচ্ছে স্বাস্থ্য এবং স্বাস্থ্য পরিষেবার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যখন এমন নতুন সিলেবাস তৈরির প্রস্তাব আসছে খোদ মেডিক্যাল কাউন্সিল অব ইন্ডিয়ার তরফে যেখানে ফ্যামিলি মেডিসিন, সাধারণ (বিশেষজ্ঞ নয়) প্র্যাক্টিশনার কিংবা ফ্যামিলি ফিজিশিয়ান বা পারিবারিক চিকিৎসক ইত্যাদি শব্দের নামোচ্চারণও করা হয়না, যেখানে রাষ্ট্রীয় সুরক্ষার পরিবর্তে ইন্সিউরেন্সের হাঙ্গর সদৃশ বহুজাতিক কোম্পানিগুলো প্রবেশ করে, সেখানে সংহত প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা বা comprehensive primary health care কার্যকরী হবে কিভাবে? ভারতবর্ষের প্রায় ১৩০ কোটি মানুষের কাছে আজ এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। আর আমাদের মতো শিক্ষিত বা ভয়ঙ্করী অল্পবিদ্যার আকরদের কাছে নৈতিক এবং দার্শনিকভাবে ভেবে দেখার মতো ঐতিহাসিক মুহূর্ত।

১৯৪৭-এ ব্রিটিশরা এদেশ ছেড়ে যাবার আগে একটি পরস্পর-বিরোধী স্বাস্থ্যের প্রবণতার জন্ম দিয়েছিলো। প্রতি ৬৩৩০ থেকে ৭২০০ জন ভারতবাসীর জন্য তখন একজন মাত্র আধুনিক চিকিৎসক ছিলো (যখন ইংল্যান্ডে এ অনুপাত ছিলো প্রতি ১০০০ জনে ১ জন)। সেসময় ভারতে মেডিক্যাল কলেজগুলো থেকে পাশ করা আধুনিক চিকিৎসকের সংখ্যা ছিলো ৪৮,০০০-র মতো। এরকম পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের আর্নল্ড-এর বক্তব্য বুঝতে হবে - Nor was India completely converted to allopathy. Even in the 1920s and 1930s there remained a far larger number of practitioners of the “traditional” systems of Indian medicine (principally Āyurveda and Unani) than of western medicine. The latter's failure to penetrate large areas of the countryside was one factor in this; no less important was the preference for a more familiar system of medicine and a way of understanding disease, health, and the body that was perceived to be more effective, sympathetic, or simply cheaper. (ডেভিড আর্নল্ড, “The rise of Western medicine in India”, Lancet (348) 1998, পৃঃ 1075-1078)
এখানে উল্লেখ করা দরকার, বর্তমানে প্রতি ১১,০৮২ জন ভারবাসীর জন্য ১ জন “অ্যালোপ্যাথিক” ডাক্তার। AYUSH-এর অন্তর্ভুক্ত ডাক্তারদের হিসেব ধরলে এ অনুপাত এসে দাঁড়ায় ৯৮২-তে ১ জন, যা WHO নির্ধারিত সীমার (১০০০ জনে ১ জন) থেকেও ভালো। একে রাষ্ট্র AYUSH-এর সাফল্য বলে সহজেই দেখাতে পারে। ব্যাপারটা আরও চিত্তাকর্ষক হয় যখন তথ্য থেকে জানি যে এইমস-এর মতো একাধিক “এলিট” শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ৫৪% মেডিক্যাল গ্র্যাজুয়েট পাশ করার পরে আমেরিকা বা ইউরোপে পাড়ি দেয়।

Right to Health Care কিংবা Right to Health
বর্তমান সময়ে জনস্বাস্থ্যের দুনিয়ায় অতি মান্য গবেষক স্যার মাইকেল মার্মট ল্যান্সেট-এ প্রকাশিত তাঁর প্রবন্ধ “Universal health coverage and social determinants of health”-এ বলছেন – “আলমা-আটায় এটা স্বীকৃতি পেয়েছিল যে জনসাধারণের স্বাস্থ্য বা population health-এর উন্নতির জন্য প্রাথমিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ছাড়াও আরও কিছু প্রয়োজন।” (ল্যান্সেট ৩৮২, অক্টোবর ১২, ২১০৩, পৃঃ ১২৭৭-১২৭৮) মার্মটের ভাষায় – “Health care is just one determinant of population health. Other inputs to health, such as social protection, good employment, and early years care, should not be forgotten, but they have been. ” অর্থাৎ, মার্মট খুব প্রাঞ্জলভাবে বললেন জনস্বাস্থ্যের উন্নতির জন্য স্বাস্থ্য পরিষেবা সামাজিকক্ষেত্রে নির্ধারক উপাদানগুলোর (social determinants of health) কেবলমাত্র একটি উপাদান। বাকী উপাদানগুলোর মধ্যে পড়ে সামাজিক সুরক্ষা (মব লিঞ্চিং-এ ইচ্ছেমতো মেরে ফেলা নয় বা নারীদের জন্য খাপ পঞ্চায়েত নয়), ভালো কর্মসংস্থান এবং জীবনের প্রথম বছরগুলোতে সামাজিক যত্ন ইত্যাদি। তিনি সখেদে জানাচ্ছেন যে এগুলো রাষ্ট্রের ভুলে যাবার কথা নয়, কিন্তু ভুলে যায়। এরপরে আমাদের নজরে আনেন – “If health and health care are to be universal human rights , then we need to understand how unfair the distribution is of both health status and health services.” অর্থাৎ, স্বাস্থ্য এবং স্বাস্থ্য পরিষেবার প্রসঙ্গ ২০১৩ সালে এসেও সার্বজনীন মানবাধিকারের বিষয় বলে বিবেচিত হবার জোরালো দাবী জানাচ্ছে। এপ্রিলের ১৮ তারিখে (২০১৯) প্রকাশিত WHO থেকে প্রকাশিত Public Health and Environment e-News-এ বলা হচ্ছে – “One in four health care facilities worldwide lacks basic water services.” কোন কর্পোরেট সংস্থা বা ইন্সিউরেন্স কোম্পানি মেটাবে এই সমস্যা? রাষ্ট্রকেই তো নিতে হবে এর দায়িত্ব।

মাত্র কদিন আগে, মার্চ মাসের শেষের দিকে, PAHO (Pan American Health Organization, 2019) এদের রিপোর্ট প্রকাশ করেছে “Universal Health in the 21st Century” 40 Years of Alma-Ata – Report of the High-Level Commission” শিরোনামে। সে রিপোর্টে মিশেল ব্যাচেলেট জেরিয়া (United Nations High Commissioner for Human Rights) জানাচ্ছেন যে স্বাস্থ্যের সুরক্ষার দায়িত্ব নেওয়া রাষ্ট্রের একটি প্রাথমিক ও স্বাভাবিক কর্তব্য এবং “they have primary responsibility in the defense of human rights, including the right to health .” ঐ রিপোর্টেই বলা হচ্ছে যে স্বাস্থ্য এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিয়ে আলমা-আটায় গৃহীত সংজ্ঞা প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিষেবা-কে “as a political strategy”-র মতো বোঝাপড়ার জায়গায় নিয়ে এসেছে। ফলে স্বাস্থ্যের মতো এমন একটি বিষয় যে রাজনৈতিক ইস্তাহারে স্থান পাবে এটাই স্বাভাবিক। এতদিন স্থান পায়নি সেটা অস্বাভাবিক।
এখানে সবার মনে পড়বে রুডলফ ভির্শ (Rudolf Virchow)-র বিখ্যাত উক্তি – “Medicine is a social science, and politics nothing but medicine at a larger scale.” PAHO-র রিপোর্টে প্রাঞ্জল ভাষায় বলা হলো – “It is important to emphasize that inequalities in our societies refer not only to inequalities in income , access to productive and financial resources, and property, but to countless disparities that we have discussed and system¬atized, namely: socioeconomic; gender-based, ethno-racial; territorial and environmental impact”।
আরেকটি কথা এখন বলা যায়। অমর্ত্য সেন তাঁর দুটি প্রধান গ্রন্থে – Commodities and Capabilities (1985) এবং Development as Freedom (1999) – দেখিয়েছেন যে আয়ের ক্ষেত্রে আপেক্ষিক ভিন্নতা (difference) সামর্থ্যের ক্ষেত্রে চরম (absolute) ভিন্নতায় অনুদিত হয় (translated)। সেনের যুক্তি অনুযায়ী, যে যুক্তি আন্তর্জাতিকভাবে গৃহীতও বটে, সামর্থ্য বা capabilities ভীষণভাবে প্রভাবিত ব্যক্তির স্বাস্থ্যর অবস্থা দিয়ে। এসব বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিয়ে দেখে কানাডার স্বাস্থ্য মন্ত্রী মার্ক লালদেঁ ১৯৮১ সালে একটি রিপোর্ট প্রকাশ করলেন – A New Perspective on the Health of Canadians. এই রিপোর্টে আলমা-আটার সনদ, মার্মটের মতো ব্যক্তিত্বদের বিচার-বিশ্লেষণ এবং অমর্ত্য সেনের মতো অর্থনীতিবিদদের ব্যাখ্যা ইত্যাদি সবকিছুই একীভূত করে নেওয়া হল। মোদ্দা কথা হচ্ছে বিশ্বের সর্বত্র স্বাস্থ্যের এবং স্বাস্থ্য পরিষেবার বিষয়টি নিয়ে জীবন্তভাবে চর্চা চলছে। হয়তো বা ভারতই খানিকটা ব্যতিক্রম হয়ে রয়েছে এখন অব্দি। American Journal of Public Health-এর মতো পত্রিকায় প্রকাশিত হচ্ছে এরকম মতামত – “a joint resolution by WHO and the United Nations Children’s Fund (UNICEF) in 1981 had stated that private medical care led to inflated medical expenditures, an excessive cost for foreign pharmaceuticals, and negative influences on medical education and primary care, all of which were directly contrary to the spirit of Alma-Ata.” (Elizabeth Fee and Theodore Brown, “A Return to the Social Justice Spirit of Alma-Ata”, APJH 105, 6 (2015): 1096-1097)

স্বাস্থ্যে ইন্সিউরেন্সের ছোট্ট ইতিকথা
১৯৬০ সালে প্রকাশিত হল ফ্রেডেরিখ হায়েকের লেখা অতি বিখ্যাত গ্রন্থ The Constitution of Liberty (২০১১ সালে শিকাগো ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে পুনঃপ্রকাশিত)। এ গ্রন্থে তিনি রাষ্ট্রের তরফে দেওয়া বিনামূল্যের স্বাস্থ্যের সুযোগ-সুবিধে এবং পরিষেবাকে সরাসরি আক্রমণ করলেন। এমনকি ব্রিটেনের সফল National Health Service (NHS)-ও বাদ গেলোনা। তাঁর কথায় – “Beveridge scheme and the whole British National Health Service has no relation to reality.” (p. 422) তাঁর যুক্তি অনুযায়ী – “The case for a free health service is usually based on two fundamental mistakes.” (p. 421) তাহলে এ থেকে উত্তরণের উপায় কি? উপায় স্বাস্থ্যকে বোঝার এবং দেখাশোনার দায়িত্ব মুক্ত বাজারের হাতে তুলে দেওয়া – “There is little doubt that the growth of health insurance is a desirable development.” (p. 421)
এর তিনবছর পরে ১৯৬৩ সালে প্রকাশিত হল কেনেথ অ্যারো-র সমধিক বিখ্যাত গবেষণা প্রবন্ধ – “Uncertainty and the Welfare Economics of Medical Care”। এখানেও ভিন্ন যুক্তিতে সমধর্মী বিষয় অত্যন্ত জোর দিয়ে প্রতিষ্ঠা করা হল – বিনা মূল্যে স্বাস্থ্য মিলবেনা, চাই ইন্সিউরেন্স।
১৯৪০-এর দশক থেকেই শুরু হয়ে গেছে কাঞ্চন মূল্যে স্বাস্থ্যকে নির্ধারণ করার প্রক্রিয়া। এ প্রসঙ্গে একটি নির্ভরযোগ্য ভালো নিবন্ধ হল হার্বার্ট ক্লারম্যান-এর “Health Economics and Health Economics Research” (Milbank Memorial Fund Quarterly – Health and Society 57, 3 (1979): 371-379) ক্লারম্যান বলছেন স্বাস্থ্যের অর্থনৈতিক গুরুত্ব এবং ইন্সিউরেন্স সংক্রান্ত বিষয়ে সবচেয়ে আগ্রহী ছিলো ফোর্ড ফাউন্ডেশন – “The Ford Foundation paid for it and The Johns Hopkins University sponsored it.” (p. 375) এটা ১৯৬০-এর দশকের কথা।
আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটছিলো ১৯৬০-৭০-৮০-র দশক জুড়ে। ১৯৭৬-এর সেপ্টেম্বর মাসে আলমা-আটা কনফারেন্সে প্রাথমিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা সংক্রান্ত বিখ্যাত সনদ গৃহীত হবার পরে আন্তর্জাতিক পুঁজির স্বাস্থ্যে বিনিয়োগ নিয়ে কৌতুক করে বললে “গেল গেল রব” পড়ে গিয়েছিল। কারণ? (১) জনসাধারণের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণে স্বাস্থ্যনীতি নির্ধারিত হবে, (২) স্বাস্থ্যের বিকাশ সম্ভব অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক বিকাশের মধ্য দিয়ে এবং এর দায়িত্ব রাষ্ট্রের, (৩) যুদ্ধে ব্যয়বরাদ্দ কমিয়ে স্বাস্থ্যে এবং জনসাধারণের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে রাষ্ট্রের তরফে খরচা বাড়াতে হবে, (৪) স্বাস্থ্য একটি সার্বজনীন, মৌলিক মানবাধিকার, (৫) এতদিন অব্দি জনস্বাস্থ্য সংক্রান্ত যেসব প্রোগ্রাম গৃহীত হয়েছে যেমন ডিডিটি দিয়ে ম্যালেরিয়া নিধন (আদৌ যা সফল হয়নি, সফল হয়নি পোলিও নির্মূল করার প্রোগ্রামও) ইত্যাদি সবগুলোই ছিল ভার্টিকাল প্রোগ্রাম অর্থাৎ ভেক্টর তথা রোগ-কেন্দ্রিক, (৬) জনস্বাস্থ্যের জন্য প্রয়োজন হরাইজন্টাল বা সর্বাত্মক প্রোগ্রাম, এবং, সর্বোপরি, (৭) রাষ্ট্র জনসাধারণের স্বাস্থ্যের দায়িত্ব নিলে প্রাইভেট ইন্সিউরেন্সের আর কোন ভূমিকা থাকেনা।

এরকম একটা আবহাওয়া যদি বিশ্বব্যাপী জন্ম নেয় তাহলে পৃথিবীর অর্থনীতির নিয়ন্ত্রক এবং শাসক কর্পোরেটরা যাবে কোথায়? ওদের কোষাগার তো শূণ্য হয়ে যাবে! বেশি দিন সময় নেয়নি ওরা। .১৯৭৯-র এপ্রিল মাসে রকফেলার ফাউন্ডেশনের প্রেসিডেন্ট জন নোলস ইতালির বেলাজিও-তে “Health and Population in Development” নামে একটি কনফারেন্স সংগঠিত করলেন। এখানে যেসব গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়েছিল সেগুলোর নির্যাস হিসেবে J A Walsh এবং K S Warren-এর গবেষণাপত্র প্রকাশিত হল NEJM-এ (“Selective Primary Health Care: An Interim Strategy for Disease Control in Developing Countries”, NEJM 301, 18 (1979): 967-974)। এখানে Interim Strategy বলা হলেও শেষ অব্দি এটাই চূড়ান্ত স্ট্র্যাটেজি হয়ে গেল। জনস্বাস্থ্য আবার ফিরতে শুরু করলো ভার্টিকাল প্রোগ্রামের দিকে। শুরু হল প্রাইভেট ইন্সিউরেন্স, স্বাস্থ্যের পরিবর্তে স্বাস্থ্য পরিষেবা এবং মুক্ত বাজারে স্বাস্থ্যের উপকরণকে তুলে দিয়ে রাষ্ট্রের ক্রমাগত হাত গুটিয়ে নেওয়া। “স্বাস্থ্য আমার অধিকার” – এই দাবী বদলে গেলো ব্যক্তির স্বাস্থ্যের জন্য দামী স্বাস্থ্য পরিষেবা পাবার জন্য আদেখলাপনায়। মেডিক্যাল পভার্টি ট্র্যাপ-এর মতো শব্দবন্ধ তৈরি হলো – বছরে ইংল্যান্ডের জনসংখ্যার প্রায় সমান (সাড়ে ৬ কোটি মানুষ) জনসংখ্যা তলিয়ে যেতে থাকলো দারিদ্র্যের অতলে।

এর বিকল্প একটা ইতিহাসও ছিল। এখনো তৈরি হয়ে চলেছে। আমাদের মনোযোগী হতে হবে, বিতর্কে আসতে হবে। আমাদের গলায় যতোটুকু আওয়াজ জন্ম নিতে পারে সেটুকু দিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোকে, রাষ্ট্রকে বলতে হবে –

  • *সংহত প্রাথমিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার বিকল্প অন্যকিছুতেই আমাদের কোন প্রয়োজন নেই
  • *স্বাস্থ্যকে মৌলিক অধিকারের স্বীকৃতি দিতে হবে
  • *স্বাস্থ্যের দায়িত্ব রাষ্ট্রের, কোন ইন্সিউরেন্স কোম্পানির নয়
  • *আমাদের স্বাস্থ্যের প্রয়োজন, স্বাস্থ্য পরিষেবার নয়



717 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

কোন বিভাগের লেখাঃ বুলবুলভাজা 
শেয়ার করুন



আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন