বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

মহিলাদের স্বাস্থ্য এবং সবার জন্য স্বাস্থ্য

পুণ্যব্রত গুণ -- শ্রমজীবী স্বাস্থ্য উদ্যোগ / সবার জন্য স্বাস্থ্য প্রচার কমিটি

এই রচনাটি কৃষ্ণা ট্রাস্ট এবং ক্যালকাটা রিসার্চ গ্রুপ আয়োজিত তৃতীয় কৃষ্ণা স্মৃতি বক্তৃতায় লেখকের বক্তব্যের লিখিত রূপ।


প্রথমেই কৃষ্ণা ট্রাস্ট এবং ক্যালকাটা রিসার্চ গ্রুপ-কে ধন্যবাদ জানাই তৃতীয় কৃষ্ণা স্মৃতি বক্তৃতা দিতে আমাকে আহ্বান করার জন্য। যদিও আপনারা ব্যক্তি আমাকে আহ্বান করেছেন, আমি কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে আসিনি, এসেছি শ্রমজীবী স্বাস্থ্য উদ্যোগ ও সবার জন্য স্বাস্থ্য প্রচার কমিটির পক্ষ থেকে। আমি যে তথ্যগুলি আপনাদের সামনে তুলে ধরছি, সেগুলি পেয়েছি ডা. কে শ্রীনাথ রেড্ডি, ডা. সঞ্জীব মুখোপাধ্যায়, ডা. কাঞ্চন মুখোপাধ্যায় এবং সবার জন্য স্বাস্থ্যের লক্ষ্যে সংগ্রামরত অনেক সহযোদ্ধার কাছ থেকে। তাঁদের কৃতজ্ঞতা জানাই।

মেয়ে বলতেই যোনি-জরায়ু-স্তন সবর্স্ব এক ব্যক্তির রূপ আমাদের সামনে হাজির করা হয়। ভুলে যাওয়া হয় তার বাইরেও তার একটা সচল হৃৎপিন্ড আছে—আছে ক্ষুধাভরা জঠর—সবার ওপরে আছে এক সৃজনশীল মস্তিষ্ক।

রাষ্ট্র সংঘের হিসেব বলে:

  • বিশ্বের মোট কাজের ঘণ্টার ৬৭% করেন মেয়েরা
  • কিন্তু বিশ্বের মোট ব্যক্তিগত আয়ের ১০% মেয়েদের।
  • বিশ্বের মোট অশিক্ষিতের ২/৩ মেয়েরা।
  • বিশ্বের মোট সম্পত্তির ১%-এরও কমের ওপর মেয়েদের অধিকার।

স্বাধীন ভারতে নারীর স্বাস্থ্য নিয়ে প্রকল্প নেওয়া মানেই নারীর জনন-স্বাস্থ্য নিয়ে পরিকল্পনা করা হয়েছে :
  • ১৯৮০ মা ও শিশু স্বাস্থ্য (MCH—Maternal & Child Health)
  • ১৯৯২ শিশু সুরক্ষা ও নিরাপদ মাতৃত্ব (CSSM—Child Security & Safe Motherhood)
  • ১৯৯৭ প্রজনন ও শিশু স্বাস্থ্য (RCH-I—Reproductive & Child Health)
  • ২০০২ প্রজনন ও শিশু স্বাস্থ্য (RCH-II)

দেশের সবার্ঙ্গীণ উন্নতির সঙ্গে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণকে সমার্থক করে দেখানো হয়। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ মানে পরিবার পরিকল্পনা, পরে নাম দেওয়া হয়েছে পরিবার কল্যাণ। পরিবার পরিকল্পনা বা কল্যাণ মানে জন্ম নিয়ন্ত্রণ, তাতেও গুরুত্ব পেয়েছে মেয়েদের ব্যবহারের জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতিগুলি, বিশেষত মেয়েদের বন্ধ্যাকরণ অপারেশন। অথচ ৭০ দশকের শুরু থেকে ৮০ দশকের মাঝামাঝি অবধি ১ লাখ ৮০ হাজার মহিলার মৃত্যু হয় বন্ধ্যাকরণ শিবিরগুলিতে।

সরকারি স্বাস্থ্য পরিষেবার কেন্দ্রে থেকেছে পরিবার পরিকল্পনা। নবম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা (১৯৯৭-২০০২)-র ব্যয়বরাদ্দ যদি দেখি, দেখব পরিবার কল্যাণ দফতরের বাজেট যেখানে ১৫,১০০ কোটি টাকা, সেখানে স্বাস্থ্য দফতরের বাজেট মাত্র ৫,১০০ কোটি টাকা।

সহস্রাব্দ শুরুর আগে বিভিন্ন বিষয়ে নানান লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়েছিল। ৫ নং মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোল ছিল ১৯৯০ থেকে ২০১৫-র মধ্যে মায়েদের মৃত্যুর হার (maternal mortality rate) ৭৫% কমিয়ে ফেলা।

কিন্তু কী হল মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোলের? সারা পৃথিবীর মায়েদের মৃত্যুর হার ১৯৯০ থেকে মাত্র ৪৭% কমেছে। প্রতিদিন প্রায় ৮০০ মহিলা গর্ভাবস্থা ও প্রসবসংক্রান্ত নিবারণযোগ্য কারণে মারা যান। এই মৃত্যুগুলোর ৯৯% ঘটে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর মাত্র ৫৮% মহিলার প্রসব দক্ষ ব্যক্তি দ্বারা হয়।

রাষ্ট্র সংঘের পূবর্তন মানবাধিকার হাইকমিশনার মেরী রবিনসন মায়েদের মৃত্যুকে এক মানবাধিকার সংকট আখ্যা দিয়েছিলেন—“The scale of maternal mortality is an affront to humanity . . . The time has come to treat this issue as a human rights violation, no less than torture, disappearances, arbitrary detention, and prisoners of conscience.”মায়েদের মৃত্যু বা maternal mortality-র মানে: গর্ভাবস্থায় বা গর্ভাবস্থা শেষ হওয়ার ৪২ দিনের মধ্যে মহিলার মৃত্যু।

২০১৩-এ দেখা যায় সারা পৃথিবীতে ২৮৯০০০ মহিলা মাতৃত্বঘটিত কারণে মারা যান। এর মধ্যে ৯৫% আফ্রিকা ও এশিয়ায়। মোটামুটি ৫০,০০০ ভারতে। প্রতি একজন মায়ের মৃত্যু পিছু ৩০জন আঘাত, জীবাণুসংক্রমণ এবং পঙ্গুত্বে ভোগেন।

মায়েদের মৃত্যুর প্রধান কারণগুলি এরকম:
  • রক্তক্ষরণ ৩৪%
  • উচ্চরক্তচাপ ১৮%
  • জীবাণুসংক্রমণ ৮%
  • গর্ভপাত ১০%
  • এম্বলিজম ১%
  • অন্যান্য প্রত্যক্ষ কারণ ১১%
  • অপ্রত্যক্ষ কারণ ১৮%

মায়েদের মৃত্যুর পেছনে যে আর্থ-সামাজিক কারণগুলি রয়েছে, সেগুলি হল দারিদ্র, অশিক্ষা, বাল্য-বিবাহ, জাত-পাত এবং চিকিৎসাপরিষেবার অভাব।

“তিনটে বিলম্ব”-এর কারণে মাতৃত্বজনিত মৃত্যুর হার বাড়ে--চিকিৎসা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে বিলম্ব, যথাযথ চিকিৎসা কেন্দ্রে পৌঁছোতে বিলম্ব এবং চিকিৎসা কেন্দ্রে পৌঁছে যথাযথ চিকিৎসা পেতে বিলম্ব।

স্বাধীনতার পর মায়েদের স্বাস্থ্যের জন্য এতসব গালভরা নামের প্রকল্প হলেও ভারতের মায়েদের মৃত্যু-হার প্রতি ১০০০০০ জীবিত শিশু জন্মে ২১২। অথচ জাতীয় লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত হয়েছিল ২০১৫-র মধ্যে মায়ের মৃত্যুর হার ১০০০০০-এ ১০০-তে নামিয়ে আনা।

দক্ষ ব্যক্তি দ্বারা কতজন নারীর প্রসব হয় অন্য দেশের সঙ্গে তার তুলনা করলে দেখা যায় ভারতে মাত্র ৪৭% প্রসব দক্ষ ব্যক্তির তত্ত্বাবধানে হয়। সেখানে চীন, শ্রীলংকা, ব্রাজিল ও থাইল্যান্ডে যথাক্রমে ৯৬%, ৯৭%, ৯৮% ও ৯৯% প্রসব দক্ষ ব্যক্তির তত্ত্বাবধানে হয়।

গর্ভাবস্থা এবং পরিবার পরিকল্পনার কথা যদি বলেন তার কারণেই মহিলাদের স্বাস্থ্যপরিষেবার প্রয়োজন পুরুষদের চেয়ে বেশি। একজন মহিলা যদি দু-টি সন্তান চান তাহলে মোটামুটি ৫বছর কাটে গর্ভবতী হওয়ার প্রচেষ্টায়, গর্ভাবস্থায় বা প্রসব-পরবর্তী অবস্থা থেকে সেরে উঠতে। আর ৩০বছর কাটে অবাঞ্ছিত গর্ভসঞ্চার থেকে রক্ষা পাওয়ার প্রচেষ্টায়।

অধিকাংশ ক্ষেত্রে মায়েরাই শিশুদের চিকিৎসার প্রয়োজন মেটানোর মূল দায়িত্ব নেন। অথচ পরিবারে আর্থিক নিয়ন্ত্রণ মহিলার হাতে থাকে না।

অধিকাংশ মহিলা স্বাস্থ্যবীমার সুযোগ পান স্বামীর সূত্রে। স্বামীর কর্মচ্যুতিতে তাঁরা বীমার সুবিধা হারান। সুবিধা হারান বিবাহ-বিচ্ছেদেও।

স্বাস্থ্যপরিষেবা দেওয়ার কাজে মহিলাদের ভূমিকা পুরুষদের চেয়ে বেশি। প্রতিষ্ঠান-বহির্ভূত ভাবে বিনামূল্যে (অর্থাৎ হাসপাতালের বাইরে পরিবারে) যাঁরা রোগীর যত্ন নেন তাঁদের ৫৯%-এরও বেশি মহিলা। পরিবারের অসুস্থ, পঙ্গু ও বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের যত্ন পুরুষের তুলনায় মহিলারা বেশি নেন। তার ফলে অনেকক্ষেত্রে মহিলা আংশিক সময়ের জন্য অর্থকরী কাজ করতে বাধ্য হন। পুরুষদের তুলনায় বেশি সময়ের জন্য অর্থকরী শ্রম থেকে মহিলাদের বিরতি নিতে হয়।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের একনম্বর শক্তিশালী দেশ। দেখা যাক কেমন আছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মহিলারা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রজননক্ষম মহিলাদের মৃত্যুর হার কানাডা, পোল্যান্ড, গ্রিস, আইসল্যান্ড, ফিনল্যান্ড ও বেলোরুশের চেয়ে বেশি। ২০১৩-এ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মায়েদের মৃত্যুর হার ছিল কানাডার দ্বিগুণ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রই একমাত্র উন্নত দেশ যেখানে সবার জন্য স্বাস্থ্য নেই, সরকার সমস্ত নাগরিকের স্বাস্থ্যের দায়িত্ব নেয় না।

কেবল কি প্রজনন-স্বাস্থ্য? ভারতের প্রায় অর্ধেক ডায়াবেটিস রোগী মহিলা। আর অনুমান করা হয় ২০১০ থেকে ২০৫০-এর মধ্যে অধিকাংশ ডায়াবেটিস রোগীই হবেন মহিলা । মেয়েদের অপুষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি—সবচেয়ে শেষে, সবচেয়ে কম খাবার জোটে তাঁদের। হার্ট এটাকে তাঁরা মারা যান ছেলেদের চেয়ে বেশি। তাঁরা অবসাদ ও উদ্বেগে ভোগেন ছেলেদের চেয়ে বেশি। যৌন রোগের প্রভাব মেয়েদের ক্ষেত্রে বেশি মারাত্মক। গেঁটে বাতের প্রকোপ মেয়েদের মধ্যে বেশি। মূত্রনালীর জীবাণুসংক্রমণ তাঁদের বেশি হয়।

শুধু তাই নয় ক্রমাগত কম পারিশ্রমিক—অতিরিক্ত কাজের চাপ—অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ—স্বাস্থ্যপরিষেবার ন্যূনতম সুযোগের অভাব—জীবনধারণের অন্যান্য উপাদানগুলির অভাব মেয়েদের স্বাস্থ্যকে প্রভাবিত করে এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার মধ্যে বৈষম্য সৃষ্টি করে।

সবার জন্য স্বাস্থ্যই একমাত্র উপায় যা দিয়ে মহিলাদের সমস্ত স্বাস্থ্য সমস্যার সমাধান হতে পারে। সবার জন্য স্বাস্থ্য চালু থাকলেই কেবল গরিব পরিবারগুলি অত্যাবশ্যক প্রাথমিক পরিষেবাগুলি পেতে পারেন, যা তাঁদের পক্ষে কেনা সম্ভব নয়। এই ব্যবস্থাতেই কেবল প্রয়োজনীয় পরিষেবাগুলির মধ্যে সমন্বয় সাধন (service integration) করা যায়। সুস্থ গর্ভাবস্থা, প্রসব এবং শিশুর জন্য প্রয়োজনীয় প্রসব পূর্ব ও প্রসব-পরবর্তী ভিজিটগুলি এই ব্যবস্থায় পাওয়া যায়।

সবার জন্য স্বাস্থ্যের কর্মসূচী ৫ রকম ভাবে কাজ করে—এতে অত্যাবশ্যক পরিষেবাগুলির এক প্যাকেজ পাওয়া যায়। সহজে নির্ভরযোগ্য পরিষেবা পাওয়া যায়। পরিষেবা পাওয়ায় কোনো আর্থিক বাধা থাকে না। সামাজিক বাধাগুলি কমে আসে। পরিষেবার মানের ওপর নজর রাখা হয়।

মেক্সিকোর Seguro Popular  (জনপ্রিয় স্বাস্থ্য বীমা)-এর অভিজ্ঞতা দেখুন। ’৯০-এর দশকে সে দেশে ৫০%-এরও বেশি স্বাস্থ্য-সংক্রান্ত খরচ নিজের পকেট থেকে করতে হত। ইউনিভার্সাল হেলথ কেয়ারের বর্তমান প্যাকেজে স্তন-ক্যানসার, সারভাইকাল ক্যানসার, এইচ আইভি/ এডস সহ ২৫০টি পরিষেবা প্যাকেজের অন্তর্ভুক্ত। স্বাস্থ্য বাজেটে বছরে জিডিপি-র মাত্র ১% বাড়িয়েই এমনটা করা গেছে।

আফগানিস্তানে ২০০৩-এ অত্যাবশ্যক পরিষেবাগুলির এক প্যাকেজ চালু করা হয়। তার আগে ১০ জনের মধ্যে ৯জন মহিলারই দক্ষ ব্যক্তির সাহায্য ছাড়া প্রসব হত। কয়েকশ’ দাই এবং কয়েক হাজার কমিউনিটি হেলথ ওয়ার্কারকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। আগে যেখানে জনসংখ্যার ১০% প্রাথমিক পরিষেবা পেতেন তা বেড়ে হয় ৬০%। ১লক্ষেরও বেশি কমে শিশু মৃত্যু। পরিবার-পরিকল্পনার আওতায় প্রায় দ্বিগুণ পরিবার আসেন। মায়েদের মৃত্যুর হার কমে যায়।

২০১০-এ যোজনা কমিশন সবার জন্য স্বাস্থ্যের লক্ষ্যে এক উচ্চস্তরীয় বিশেষজ্ঞদল (HLEG on UHC—High Level Expert Group on Universal Health Coverage) গঠন করে। ২০১১-এ বিশেষজ্ঞদল তার সুপারিশগুলি পেশ করেন। তাঁরা এক হেলথ এনটাইটেলমেন্ট কার্ডের কথা বলেন যা দিয়ে প্রত্যেক নাগরিক অত্যাবশ্যক প্রাথমিক, মধ্যম ও অন্তিম স্তরের আউটডোর ও ইনডোর পরিষেবার এক জাতীয় প্যাকেজের সুবিধা পাবেন। তাঁরা বলেন এই পরিষেবার টাকা আসবে ট্যাক্স থেকে। পরিষেবা যেখানে দেওয়া হবে সেখানে পয়সা লাগবে না। ইউজার ফি তুলে দেওয়া হবে। তাঁদের মত ছিল Contributory social insurance ভারতের মতো দেশের জন্য উপযুক্ত নয়, যেখানে প্রায় ৯৩% শ্রমজীবী মানুষ অসংগঠিত ক্ষেত্রে কাজ করেন। এক বিশাল সংখ্যক মানুষ দারিদ্রসীমার নীচে।

বিশেষজ্ঞ দল বলেন—
প্রথমেই স্বাস্থ্যখাতে সরকারি ব্যয় বাড়াতে হবে। কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার মিলে দ্বাদশ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার শেষে জিডিপি-র ২.৫% খরচ করবে, ত্রয়োদশ পঞ্চবার্ষিকীর শেষে জিডিপি-র ৩%। দ্বিতীয়ত চিকিৎসক ও চিকিৎসাকর্মীদের সংখ্যা ও গুণমান বাড়াতে হবে। তৃতীয়ত সব সরকারি কেন্দ্রে বিনামূল্যে অত্যাবশ্যক ওষুধ ও পরীক্ষানিরীক্ষার ব্যবস্থা থাকবে। পাশাপাশি মজবুত রেফারেল ব্যবস্থা ও রোগী পরিবহনের মাধ্যমে প্রাথমিক, মধ্যম ও অন্তিম স্তরের স্বাস্থ্য পরিষেবাকে সমন্বিত করতে হবে।

কিন্তু ২০১২-এ যোজনা কমিশন তার প্ল্যান ডকুমেন্টে কী বলছিল দেখুন—
স্বাস্থ্যখাতে বাজেটের ২.৫% নয়, ব্যয়বরাদ্দ বাড়িয়ে করা হবে ১.৫৮%। কেন্দ্রীয় বরাদ্দ হবে স্বাস্থ্যখাতে রাজ্যের ব্যয়ের চেয়ে কিছু বেশি। সরকার স্বাস্থ্য পরিষেবায় কেন্দ্রীয় ভূমিকার পরিবর্তে মূলত ম্যানেজারের ভূমিকা পালন করবে। বেসরকারি স্বাস্থ্য পরিষেবা ও স্বাস্থ্য-বীমার ভূমিকা হবে প্রধান। লাভজনক তৃতীয় স্তরের পরিষেবাকে তুলে দেওয়া হবে কর্পোরেট হাসপাতালের হাতে। যেটুকু সরকারি ব্যবস্থা আছে, তাও গুটিয়ে ফেলা হবে। সরকারি অনুদানে বেসরকারি স্বাস্থ্য ব্যবসায়ীরা ও অসরকারি সংস্থাগুলো নতুন চিকিৎসা পরিকাঠামো গড়ে তুলবে। প্রতি পরিবার নিজের পছন্দমতো বেসরকারি হাসপাতাল বেছে নেবেন, সরকার একটা সীমা অবধি তার মূল্য চুকিয়ে দেবে। জাতীয় স্বাস্থ্য প্যাকেজের উল্লেখ ছিল না এই দলিলে। চিকিৎসকের অভাব মেটানোর জন্য প্রাইভেট হাসপাতাল ও মেডিক্যাল কলেজ গড়ে তোলার জন্য সরকার উৎসাহ দিতে মোট খরচের ২০% অবধি অনুদান দেবে—এমনটা বলা হল। তাদের আয় বাড়ানোর জন্য কর ছাড় দেওয়া হবে। বাস্তবত সরকারি অর্থে গড়ে তোলা বেসরকারি হাসপাতালে ইউজার ফি সবই নেওয়া যাবে।

তারপর মোদী সরকার ক্ষমতায় এসে স্বাস্থ্য খাতে সরকারি ব্যয় প্রায় ২০% কমিয়ে দিয়েছে। ২০% মানে ৫০০০ কোটি টাকা। এখন জিডিপি-র ১.০৪% সরকার স্বাস্থ্য খাতে খরচ করে।

যোজনা কমিশনের স্থান নিয়েছে নীতি আয়োগ—NITI (National Institution for Transforming India) Aayog। ২০১৫-র খসড়া স্বাস্থ্যনীতিতে জনস্বাস্থ্যে জোর দেওয়া, সরকারি খরচ বাড়ানো, বিনামূল্যে ওষুধ ও পরীক্ষানিরীক্ষার যে কথা বলা হয়েছে—তার বিরোধিতা করেছে নীতি আয়োগ। তাদের মতে সরকারের পক্ষে জিডিপি-র ১%-এর বেশি স্বাস্থ্যখাতে খরচ করা সম্ভব নয়। তাদের সুপারিশ জনস্বাস্থ্য-ব্যবস্থায় বেসরকারি ক্ষেত্র ও বীমাকোম্পানিগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হোক, নাগরিক পয়সা দিয়ে স্বাস্থ্যপরিষেবা কিনবেন।

২৭শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৬-এ সেন্ট্রাল কাউন্সিল অফ হেলথ অ্যান্ড ফ্যামিলি ওয়েলফেয়ার রাজ্যের প্রতিনিধি এবং জনস্বাস্থ্যবিদদের নিয়ে এক মিটিং-এ বসেছেন খসড়া স্বাস্থ্যনীতি নিয়ে আলোচনা করতে। সেখানে স্বাস্থ্যখাতে সরকারের জিডিপি-র ২.৫% খরচ করার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু সরকারের যা ট্র্যাক রেকর্ড তাতে না আঁচালে বিশ্বাস নেই।

১৯৩৬-এ ডা. নর্মান বেথুন বলেছিলেন—
“The best form of providing health protection would be to change the economic system which produces ill health, and to liquidate ignorance, poverty and unemployment. The practice of each individual purchasing his own medical care does not work. It is unjust, inefficient, wasteful and completely outmoded . . . In our highly geared, modern industrial society, there is no such thing as private health—all health is public. The illness and maladjustments of one unit of the mass affects all other members. The protection of people's health should be recognised by the Government as its primary obligation and duty to its citizens.”—স্বাস্থ্য সুরক্ষার সবচেয়ে ভালো উপায় হল যে আর্থিক ব্যবস্থা কুস্বাস্থ্যের জন্ম দেয় তাকে বদলে ফেলা, সঙ্গে সঙ্গে অজ্ঞানতা, দারিদ্র ও বেকারি লোপ করা। প্রত্যেকে নিজের নিজের চিকিৎসা কিনবেন এই প্রথা কাজ করবে না। এমনটা অন্যায়, অদক্ষ, সম্পদ নষ্ট হয় এতে, এমনটা এ যুগের জন্য নয়।...প্রবল গতিসম্পন্ন বর্তমান শিল্প সমাজে ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য বলে কিছু হয় না, সমস্ত স্বাস্থ্যই সামূহিক স্বাস্থ্য। একজনের অসুস্থতা বা মানিয়ে নিতে না পারা সমাজের অন্য সবাইকে প্রভাবিত করে। সরকারের উচিত জনস্বাস্থ্য সুরক্ষাকে নিজের প্রাথমিক দায়িত্ব এবং নাগরিকদের প্রতি কর্তব্য হিসেবে স্বীকার করা।

আমাদেরও দাবি সরকার সমস্ত নাগরিকের স্বাস্থ্যরক্ষার দায়িত্ব নিক।



311 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

কোন বিভাগের লেখাঃ বুলবুলভাজা 
শেয়ার করুন



আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন