বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

স্বাস্থ্যক্ষেত্রে দুর্নীতি বা চিকিৎসা ও দুর্নীতি-ডাঃ পার্থসারথি গুপ্ত স্মারক বক্তৃতা - দ্বিতীয় ও শেষ পর্ব

ডাঃ বিষাণ বসু

প্রথম পর্বের পর, অন্য আরেকটি ক্ষেত্রে বীমার অভিঘাতের বিষয়টি দেখতে চাইলে নিশ্চয়ই খুব অপ্রাসঙ্গিক হবে না।

কৃষিবীমা বা শস্যবীমার উদাহরণটি দেখা যাক।ম্যাগসেসে পুরস্কারজয়ী সাংবাদিক পি সাইনাথ রীতিমতো হিসেব কষে দেখিয়েছেন, ঠিক কীভাবে লাভের গুড় পৌঁছচ্ছে কর্পোরেট প্রভুর হাতে, কেমন করে আপনার আমার করের টাকা ঢুকছে কর্পোরেট প্রভুদের খাতায়। প্রধানমন্ত্রী বীমা ফসল যোজনায় বীমার দায়িত্বে রয়েছেন রিলায়্যান্স, এসার প্রমুখ বহুজাতিক।মহারাষ্ট্রের একটি অঞ্চলের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, দুলাখ আশি হাজার কৃষক সয়াবিনের চাষ করেছিলেন।একটি জেলায়, কৃষকেরা বীমার প্রিমিয়াম বাবদ দেন উনিশ কোটি টাকার কিছু বেশী, রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকার বীমার প্রিমিয়াম বাবদ জমা দেন সাতাত্তর কোটি টাকা করে। সব মিলিয়ে বীমা সংস্থা, এই ক্ষেত্রে রিলায়্যান্স, প্রিমিয়াম বাবদ পান একশো তিয়াত্তর কোটি টাকা। পুরো ফসল নষ্ট হয়ে গেলে, ক্ষতিপূরণ বাবদ রিলায়্যান্স দেন তিরিশ কোটি টাকা। একটি জেলায় এক বছরে মুনাফা একশো চল্লিশ কোটি টাকা। জেলার সংখ্যা দিয়ে গুণ করে দেখতে পারেন। আমি অঙ্কে তেমন দক্ষ নই। তবে, সব মিলিয়ে কয়েক হাজার কোটি তো হবেই, কী বলেন?

ফসল বীমার চাইতে আরো বড়ো মাপের এই যে আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্প, শুরুতেই না হলেও, যার আওতায় আসার সম্ভাবনা শেষমেশ দেশের প্রায় সত্তর কি আশি শতাংশ, নাকি তামাম ইচ্ছুক নাগরিকেরই, সেইখানে বীমাসংস্থার মুনাফার হিসেবটা একটু ভেবে দেখেছেন কি? আর, বাজেটে জেটলিসাহেব যখন এই প্রকল্পের ঘোষণা করছিলেন, ঠিক সেই মুহূর্তে কর্পোরেট স্বাস্থ্যব্যবসায়ীদের শেয়ারের দামের উর্ধ্বগতিটি যিনিই চাক্ষুষ করেছেন, তাঁদের নিশ্চয়ই বুঝিয়ে বলতে হবে না যে, এই প্রকল্পের ফলে লাভবান হবেন কারা।

ভেবে দেখুন, প্রাইভেট মেডিকেল কলেজের ঢালাও লাইসেন্স মিলছে কোন পথে? রীতিমতো নিয়ম বেঁধে দেওয়া হচ্ছে যে আদ্ধেক আসনে কতো টাকা নেওয়া হবে, সেই নিয়ে সরকারের মাথাব্যথা থাকবে না। সেইসব মেডিকেল কলেজ থেকে লাখ লাখ কি প্রায় কোটি টাকার বিনিময়ে ডিগ্রী পাবেন কারা? আমাদের বিশ্বাস করতে হবে, যে, তাঁরা আমজনতাকে স্বাস্থ্যপরিষেবা দেবেন, তা-ও ন্যায্যমূল্যে? তাঁরা তাঁদের কোটি টাকার শিক্ষার দাম উশুল করবেন কোন পথে? স্বাস্থ্যক্ষেত্রে দুর্নীতি বিষয়ে সরব হওয়ার মুহূর্ত, তাঁদের দোষারোপ করতে হলে, এই প্রশ্নও করুন, ডাক্তারিশিক্ষার এমন ফেলো কড়ি মাখো তেল ব্যবস্থাটি রেখেছেন কাঁরা, এবং কাদের স্বার্থে।

শুধুমাত্র প্রাইভেট মেডিকেল কলেজকে দোষ দিয়ে লাভ কী? আমাদের সরকারি মেডিকেল কলেজের পাঠ্যক্রমের কথা ভাবুন। দেশের মানুষের অপুষ্টি, অনাহার, পেটের গন্ডগোল, সাপে কাটা - কতোটুকু ঠাঁই পায় সেইখানে? এই পাঠ্যক্রমের প্রোডাক্টরা পাশ করামাত্র কর্পোরেট হাসপাতালের দক্ষ কর্মী হতে পারেন, কিন্তু সাধারণ গরীবগুর্বোর চিকিৎসা করতে গিয়ে অনেকসময়েই এঁরা অস্বস্তিতে পড়েন। দোষ এঁদের নয়, পাঠ্যক্রমই এরকম।এই পাঠ্যক্রমে প্রিভেন্টিভ মেডিসিনের গুরুত্ব কতোটুকু? অসুখের সামাজিক কারণ, মেডিকাল সোশিওলজি নিয়ে কতোটুকু আলোচনা হয় এমন শিক্ষাক্রমে? এই পাঠ্যক্রম এমনই এলিটিস্ট, যে, এমনকি প্রান্তিক অবস্থান থেকে আসা মানুষও এই পাঠ্যক্রমের শেষে শ্রেণীচ্যুত হয়ে নিজের গ্রামের মানুষের চিকিৎসা করতে অস্বস্তিতে থাকেন। আমাদের দেশের মানুষের উপযোগী, দেশের স্বাস্থ্যসমস্যার উপযুক্ত একটি শিক্ষাক্রম কেন থাকবে না আমাদের মেডিকেল কলেজে?

সমস্যা হচ্ছে এই যে, স্বাস্থ্যক্ষেত্রে দুর্নীতি নিয়ে কথা বলতে গেলে, এসব কথা নিয়ে ভাবার লোক কম। দুর্নীতি বলতেই আমাদের মাথায় ভাসে, ঘুষখোর বা কমিশনখোর চিকিৎসকের মুখ।

দেখুন, দুর্নীতি কী? দুর্নীতির সংজ্ঞাটা কী?

হ্যাঁ, একটা সনাতন সংজ্ঞা অবশ্যই, প্রাপ্ত ক্ষমতার অপব্যবহার করে ব্যক্তিগত লাভ বা স্বার্থসিদ্ধি। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল প্রমুখ সংস্থা, যাঁরা কিনা আন্তর্জাতিক স্তরে দুর্নীতির বিষয়টি নিয়ে ভাবছেন, তাঁরা মোটামুটিভাবে এমন ধরণের একটি সংস্থা নিয়ে দুর্নীতির বিচার করছেন। কিন্তু, সমস্যা হলো, এইখানে, দুর্নীতির পরিধি বা পরিসরটি কিছু সীমিত।এই নব্য-উদার অর্থনীতির যুগে, এই সীমিত সংজ্ঞা বোধহয় আর যথেষ্ট নয়।এইখানে মরিস সাহেবের সংজ্ঞাটি হয়তো বেশী প্রযোজ্য। দুর্নীতি মানে, ইলেজিটিমেট ইউজ অফ পাব্লিক পাওয়ার টু বেনিফিট আ প্রাইভেট ইন্টারেস্ট। জনগণ প্রদত্ত ক্ষমতার অপব্যবহার করে ব্যক্তিমালিকানাধীন পুঁজির স্বার্থরক্ষা। দুর্নীতি বলতে আপনি যদি এই দ্বিতীয়টা বোঝেন, তাহলে, একমাত্র তাহলেই, আপনি সমস্যার গোড়ায় পৌঁছাতে পারবেন।

আপনি যদি দুর্নীতির প্রথম সংজ্ঞায় বিশ্বাস রাখেন, অর্থাৎ, দুর্নীতিকে ব্যক্তিনিবদ্ধ ধারণায় আটকে রাখতে চান, তাতে কিছু ভুল হবে এমন নয়। কিন্তু, সেক্ষেত্রে সেই দুর্নীতির কারণ বা তার থেকে উত্তরণের পথ অনেক, এবং দুর্নীতির সামাজিক কারণ অনুসারে সমাধানও বিবিধ। পুরোটাই নির্ভর করছে, আপনি কেমনভাবে ভাবতে চাইছেন, তার উপরে।

আপনি যদি আধুনিকতাবাদী হন, তাহলে ভাবতে পারেন, সামাজিক দুর্নীতি একটি অনগ্রসর সমাজব্যবস্থার প্রতীক, বা সামন্ততান্ত্রিক সামাজিক কাঠামোর অন্তিম দীর্ঘশ্বাসতুল্য, এবং আধুনিক ভাবনার প্রসারই পারে এই দুর্নীতি রোধ করতে। কিন্তু, আধুনিক ছাড়ুন, একেবারে উত্তরাধুনিক সমাজেও, পশ্চিমী দেশ যেমন খাস আমেরিকাতেই, কর্পোরেটের ঢালাও দুর্নীতি নিয়ে আপনি কী বলবেন? এদেশেও, প্রচলিত অর্থে চূড়ান্ত আধুনিক চিকিৎসার ব্যবস্থা যেখানে রয়েছে, সেইসব ঝাঁচকচকে কর্পোরেট হাসপাতালগুলিতে দুর্নীতির যেভাবে প্রাতিষ্ঠানিকিকরণ ঘটেছে, তাই নিয়েই বা আপনি কী বলবেন?

আপনি যদি টেকনোক্র্যাট হন,তাহলে বলবেন,এই সমস্যার সমাধান আছে টেকনোলজির আরো বেশী প্রয়োগে,যেখানে মানুষের উপর নির্ভরশীলতা কম,এবং স্বচ্ছতা অনেক বেশী। কিন্তু, টেকনোলজি কোনও নিরপেক্ষ নিরবলম্ব বস্তু নয়, তার নিয়ন্ত্রক মানুষই। বাণিজ্যিক মুনাফা অর্জনের লক্ষ্যে টেকনোলজি ব্যবহৃত হলে, তার কাছ থেকে নিরপেক্ষ আচরণ আশা করার যুক্তি কতোটুকু?

আপনি যদি একটু দর্শনমনস্ক হন, তাহলে বলবেন, মানুষের নৈতিকতা ও মূল্যবোধের অধঃপতনই এই দুর্গতির মূলে।আপনার সাথে সহমত হয়েও বলি, আচমকা একধাক্কায় সমাজের সার্বিক নৈতিক মানের উন্নতি করা সম্ভব কি? ব্রিটিশ মেডিকেল জার্নালও নব্য চিকিৎসকদের উদ্দেশ্যে বলেছেন, ডাক্তারি পড়তে ঢোকার সময়ে যেমন করে এথিক্সে ভরসা রাখতেন, ডাক্তারি করার সময়েও তেমনই রাখুন। অর্থাৎ, তাঁরা মেনে নিচ্ছেন, ডাক্তারি পড়ার সময়ে একজন ছাত্রের নীতিবোধের পরিবর্তন ঘটছে। জানি না এইটা সত্যি কিনা। কিন্তু, রিসেন্ট আপডেটের নামে শুধুই কোম্পানি-স্পনসর্ড সেমিনারে যাওয়ার অভ্যেস হতে থাকলে, বা কনফারেন্স যাওয়ার সময় যাতায়াত-খাওয়াথাকার জন্যে ওষুধকোম্পানির দ্বারস্থ হওয়াটা স্বাভাবিক মনে হতে থাকলে, বা নিদেনপক্ষে কলেজ সোশ্যালের সময় কোম্পানির দাক্ষিণ্যের আশায় থাকলে সঠিক-বেঠিকের হিসেবটা গুলিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে বৈকি!! ইন্টার্ণশিপ থেকেই পেন কিনে লেখার অভ্যেস ভুলতে শুরু করেন প্রায় সব্বাই, তারপর অনেকেই অনেককিছু বিনেপয়সায় পেতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েন, বা তিনি যেইটা বিনেপয়সায় পাচ্ছেন, তাঁর হয়ে সেই মূল্য চোকাচ্ছেন কে, এই প্রশ্নটি করতেও ভুলে যান। কোনো এক জায়গায় তো লাইন টানা জরুরী। চারপাশের প্রলোভন, হট্টগোলে এই লাইনটি টানতেই তো ভুলে যাচ্ছেন অনেকে। এইবার প্রশ্ন এইটাই, আপনি সব ছাত্রের বা বৃহত্তর সমাজের নৈতিক মানের উন্নয়নে ব্রতী হবেন,নাকি এমন একটা ব্যবস্থা চাইবেন যেখানে কলেজ-হাসপাতালে এই ওষুধ কোম্পানির অবাধ বিচরণটিই আটকানো সম্ভবপর হয়।

আপনি যদি ভাবেন, সঠিক নিয়মকানুন বা নিয়মের প্রয়োগ বা নজরদারি দিয়ে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব, তাহলেও কিছু উদাহরণ দেওয়া যায়। স্বাস্থ্যপরিষেবাকে যদি প্রতিযোগিতার হাতে ছাড়া হয়, যা বাজারের অনিবার্য নিয়ম, তাহলে হাজার নিয়ম বা নজরদারি দিয়েও কি পরিস্থিতির বদল হতে পারে? ধরুন,একই ওষুধ পঞ্চাশটি কোম্পানি বিভিন্ন দামে বিক্রি করেন। তাহলে, চিকিৎসক ঠিক কোনটি বাছবেন?কোম্পানি চিকিৎসকের কাছে ঠিক কীভাবে বিপণন করবেন? হ্যাঁ, এখন চিকিৎসককে জেনেরিক নামে ওষুধ লেখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু, একই ওষুধ বিভিন্ন দামে বিক্রির বিরুদ্ধে কোনো নির্দেশিকা নেই। তাহলে, অনেকগুলো ব্র্যান্ডের মধ্যে বাছবেন কে? রোগী অর্থাৎ ক্রেতা তো বাছছেন না। তাহলে? আগে বাছতেন ডাক্তার, আর এখন বাছবেন ওষুধের দোকানদার। অধিকাংশ ডাক্তারবাবুই বাছতেন কোম্পানির বিশ্বাসযোগ্যতা মেনে, যেমন যে কোম্পানির রিসার্চের ফল হিসেবে এই ওষুধটি এসেছে ইত্যাদি ইত্যাদি, কয়েকজন বাছতেন হয়তো কোম্পানির সেলস রিপ্রেজেন্টেটিভদের পরামর্শ শুনে বা কোনো লাভের আশায়। কিন্তু, ওষুধের দোকানদার বাছছেন কোন নিক্তির হিসেবে? পাশাপাশি দুটো কর্পোরেট হাসপাতালে কাছাকাছি মানের পরিষেবা বিক্রি হয়, কিন্তু খরচের ফারাক অনেক। আপনি কোথায় যাবেন চিকিৎসার জন্যে? কীভাবে বিচার করবেন? বিজ্ঞাপন ছাড়া আর কোন নৈর্ব্যক্তিক হিসেব আপনার কাছে আছে? হ্যাঁ, নিশ্চিত জেনে রাখুন, বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় হাসপাতালগুলির যে র্র্যাঙ্কিং প্রকাশিত হয়, তা-ও একধরনের বিজ্ঞাপনই। তাহলে, আপনি বাছবেন, বা বাছছেন, কোন হিসেবে? এই প্রতিযোগিতা, বিপণনের এই ভূমিকা থাকলে, হাজার নজরদারি দিয়েও দুর্নীতি বন্ধ হবে কি?

অতএব, প্রথমেই স্পষ্ট করে বুঝুন, দুর্নীতির শিকড় লুকিয়ে এই চিকিৎসা ব্যবস্থাটারই গোড়ায়। স্বাস্থ্য-চিকিৎসা যে একটি পণ্য, চিকিৎসার মতো একটি অত্যাবশ্যক বিষয়কে যে মুনাফা অর্জনের প্রতিযোগিতার হাতে ঠেলে দেওয়া যায়, এমন ভাবনার মধ্যেই দুর্নীতির বীজটি লুকিয়ে। কয়েকশো ওষুধ প্রস্তুতকারক তাঁদের প্রোডাক্ট বিক্রির জন্যে প্রাণপণ বিপণন করে চলবেন, কয়েক হাজার ল্যাব বা ডায়াগনস্টিক সেন্টার একই পরীক্ষা করবেন এবং সেই পরিষেবার খরিদ্দার খুঁজবেন, পাশাপাশি অবস্থিত একই ধাঁচের দুই কর্পোরেট হাসপাতাল রোগী আকর্ষণের প্রতিযোগিতায় বিভিন্ন প্যাকেজের ব্যবস্থা করবেন বা ডাক্তারবাবুরা যাতে রেফার করেন সেইখানে তাঁদের জন্যে বিভিন্ন উপঢৌকনের ব্যবস্থা রাখবেন, আর আপনি ভাববেন, যে, স্রেফ নজরদারির কড়াকড়ি করলেই সমস্ত অনিয়ম বন্ধ হয়ে যাবে?

আবারও বলি, এই ব্যবস্থা বলবৎ রেখে কোনোভাবেই দুর্নীতি অনিয়ম বন্ধ করা সম্ভব নয়। যে ব্যবস্থায় ওষুধ কোম্পানির বার্ষিক বাজেটের প্রায় পঞ্চাশ শতাংশই মার্কেটিং-এর জন্যে বরাদ্দ, সেই ব্যবস্থা জিইয়ে রেখে দুর্নীতির মোকাবিলা সম্ভব নয়।যে ব্যবস্থায় বেসরকারি হাসপাতালকে মোটা টাকা মাইনে দিয়ে মার্কেটিং টিম পুষতে হয়, আর হাসপাতালের নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে সেই মার্কেটিং টিমের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে, সেই ব্যবস্থা বজায় রেখে দুর্নীতির মোকাবিলা সম্ভব নয়।

হ্যাঁ, যেহেতু স্বাস্থ্যব্যবস্থায় চিকিৎসক বাদ দিয়ে কোনো কাজই সম্ভব নয়, কেননা চিকিৎসকই স্বাস্থ্যব্যবস্থায় কেন্দ্রীয় ভূমিকায় থাকেন, সেহেতু, এই দুর্নীতি অন্তত একশ্রেণীর চিকিৎসকের প্রত্যক্ষ বা অপ্রত্যক্ষ সমর্থন বা সহায়তা ছাড়া সম্ভব নয়। কিন্তু, এই কথাটা বুঝে নেওয়া জরুরী, যে, চিকিৎসকদের ভূমিকা এইক্ষেত্রে সহায়কের, এবং সমাধান চাইলে আপনাকে সমস্যার মূলেই পৌঁছাতে হবে। ব্যক্তি চিকিৎসকের অনৈতিকতা নিশ্চয়ই নিন্দার্হ, এই নিয়ে প্রতিবাদ নিঃসন্দেহে জরুরী, বা চিকিৎসকদের সংগঠনদের নিশ্চয়ই এই নিয়ে সরব হওয়া প্রয়োজনীয়, শুধুমাত্র সব পেশায় কিছু ব্ল্যাক শীপ রয়েছে বলে এড়িয়ে যাওয়ার সময় আর নেই - তবুও বলি, শুধুমাত্র চিকিৎসকদের শুধরে সমস্যার সুরাহা হবে না।

তাহলে পথ কী?
না, এককথায় সমাধান দিতে পারবো না। কোনো জাদুকাঠির দিশা আমার কাছে নেই। তবে, কোথায়, কোন জায়গায় গলদটা, কোনটা ঠিক নয়, সেইটুকু জানাও জরুরী। সেইটুকু না জানলে উত্তরণের দিশা মিলবে কি? আমাদের প্রাচীন দর্শনেও তো নেতি নেতি করেই সত্যের সন্ধান স্বীকার করা হয়েছে।

রাষ্ট্র যতোদিন না সব নাগরিকের স্বাস্থ্যের দায়িত্ব নিচ্ছেন, বা সবার সামর্থ্যের মধ্যে একটি স্বাস্থ্যপরিষেবার ব্যবস্থা করছেন, ততোদিন সুরাহা মিলবে না। ইউনিভার্সাল হেলথ কেয়ার ছাড়া অন্য পথ নেই। ঠিক কেমন করে সেই জায়গাটায় পৌঁছানো যায়, সেই নিয়ে আলোচনা হোক না। সবাই মিলে আলোচনা করলে একটা সমাধানের পথ মিলবে না, এমনটা আমি বিশ্বাস করি না। অন্তত, আলোচনা, কথোপকথনটুকু তো শুরু হোক। এতো বিষয় নিয়ে সান্ধ্য টিভিতে বিতর্কের আসর বসে, দেশের সব নাগরিকের সামর্থ্যের মধ্যে স্বাস্থ্যপরিষেবা কোন পথে আসতে পারে, সেই নিয়েও একদিন বিতর্ক বা আলোচনা হতে বাধা কীসের?

আলোচনার ধরতাই হিসেবে, শুরুতে বলা অমর্ত্য সেনের কথাতেই ফিরি। প্রয়োজন, জনস্বাস্থ্য ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যে নজর। জাতীয় আয়ের এক শতাংশ বরাদ্দ দিয়ে জাতীয় স্বাস্থ্যোন্নতি সম্ভব নয়। বেসরকারি স্বাস্থ্যপরিষেবাকে শিরোধার্য করে, এবং যথেষ্ট তথ্য ছাড়াই বেসরকারি হাসপাতালে চালু মডেলটিকেই সেরা মেনে জাতীয় স্বাস্থ্যনীতি প্রণয়ন হলে ভরাডুবি অনিবার্য। আর, এই প্রসঙ্গগুলি মূলস্রোতের আলোচনায় না এলে, এই অনাচারের ট্র্যাডিশন চলতেই থাকবে।

সরকারবাহাদুর কর্পোরেট পুঁজির স্বার্থ অক্ষুণ্ণ রাখতে দূষণ-রাসায়নিকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবেন না, উন্নয়ন আর শিল্পায়নের নামে যথেচ্ছ গাছ কাটবেন, বনজঙ্গল নিশ্চিহ্ন করবেন, আর আপনার অসুখ হলে আপনি নিজের লাইফস্টাইলকে দুষে যাবেন। এই অন্যায়ের ছবিটা সামনে আসুক।

জানি একই কথা বারবার বলছি, আপনি নিশ্চিত বিরক্ত হচ্ছেন। কিন্তু, দেখুন, আপনাকে ভুলিয়ে রাখা কতো সহজ। স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করতে বসলেই ডাক্তারগুলো আজকাল ডাকাত বা সব ব্যাটা কমিশনখোর-অর্থপিশাচ ইত্যকার শব্দবন্ধ আপনার জিভের ডগায় চলে আসে। আর, আপনার সেই কথায় প্রশ্রয় দিয়ে প্রধানমন্ত্রী, ওষুধকোম্পানির অর্থে বিদেশযাত্রা করে, বিদেশের মাটিতে বসে, ডাক্তারদের আদ্যশ্রাদ্ধ করবেন। আপনাদের সেই কথায় সস্নেহ প্রশ্রয় দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলবেন, অতো টাকা দিয়ে ডাক্তারেরা কী করবেন, হীরের চচ্চড়ি খাবেন? আপনি হাততালি দেবেন, ভাববেন, একদম দারুণ বলেছেন, যাকে বলে একেবারে সলিড দিয়েছেন। এদিকে আপনার টাকায় তৈরী একখানা আস্ত হাসপাতাল তুলে দেওয়া হবে কর্পোরেটের হাতে, ন্যায্য মূল্যের দোকানের নামে সেই দোকানের বরাত পান বৃহৎ কনগ্লোমারেট, সেই কনগ্লোমারেট ওষুধ বিক্রয়কারী বরাত পাওয়ার অনতিবিলম্বেই পরিণত হন ওষুধপ্রস্তুতকারকেও, এবং তাঁদের প্রস্তুত ওষুধ কিনতে থাকেন সরকার। আর, সারা দেশের দিকে চেয়ে দেখলে, স্বাস্থ্যব্যবস্থাটাই তুলে দেওয়া হচ্ছে স্বাস্থ্যব্যবসায়ীদের-বীমাব্যবসায়ীদের হাতে।

এইবছর অক্টোবর মাসের শেষে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আবারও ঘোষণা করলেন সবার জন্যে স্বাস্থ্যপরিষেবার কথা। শুধু ইউনিভার্সাল হেলথ কেয়ার বা সবার জন্যে স্বাস্থ্যের স্লোগান বদলে গিয়ে হলো ইউনিভার্সাল হেলথ কভারেজ। প্রাথমিক স্বাস্থ্যের উপর গুরুত্ব স্বীকার করা সত্ত্বেও এই ছোট্টো শব্দের অদলবদলটির তাৎপর্য্য কিন্তু ছোটো নয়।

ইউনিভার্সাল হেলথ কভারেজ শব্দবন্ধের মধ্যেই মেনে নেওয়া আছে বেসরকারী স্বাস্থ্যব্যবসাকে।বলা হয়েছে, বেসরকারি ব্যবস্থার সাথে সরকারি ব্যবস্থাকে মেলানোর কথা। মেনে নেওয়া হয়েছে সরকারি ব্যবস্থার তুলনায় বেসরকারী ব্যবস্থার অধিকতর দক্ষতাকে। আপাতদৃষ্টিতে কথাগুলো সর্বজনগ্রাহ্য, এবং সর্বজনস্বীকৃত। কিন্তু, এই গ্রাহ্যতা আর স্বীকৃতিটুকুও কি এক বিশেষ পথে বিপণনের ফল নয়?

এই ধরুন, নব্বই দশক নাগাদ, মুক্ত অর্থনীতির আবির্ভাবের সাথেসাথেই আপনি জানতে শুরু করলেন, যে, সরকারি হাসপাতাল সাক্ষাৎ নরক, সেখানকার ডাক্তারেরা ফাঁকিবাজ দুর্ব্যবহারী ইত্যাদি ইত্যাদি - আর, হ্যাঁ, এখন কলকাতাতেই এসে গিয়েছে বিশ্বমানের চিকিৎসা, চিকিৎসাপরিষেবা, ওই পাঁচতারা হোটেলতুল্য হাসপাতালগুলিতে। এই একই সময়ে নেতামন্ত্রীরা ধীরে ধীরে নিজেদের চিকিৎসার জন্যে যেতে শুরু করলেন বেসরকারী হাসপাতালে।অর্থাৎ, বেসরকারী হাসপাতালই যে উন্নততর পথ, তা সামাজিক মান্যতা পেয়ে যেতে থাকলো।ঝাড়া সিকি শতকের মগজধোলাইয়ের পরে, আপনাকে যদি কেউ উল্টোটা বোঝাতে আসে, কেউ যদি বলেন আপনাকে , যে সংখ্যার চিকিৎসক মিলে যে সংখ্যার রোগী সামলানো হয় সরকারি স্বাস্থ্যকাঠামোয়, আর সেই চিকিৎসার রেজাল্ট অধিকাংশ অসুখের ক্ষেত্রেই বিশ্বের গড়ের চাইতে কম নয়, একে যদি আপনি সাফল্য না মানেন, একে যদি আপনি দক্ষতা বলে স্বীকার না করেন, তাহলে আপনার কাছে দক্ষতার সংজ্ঞা ঠিক কী, এই প্রশ্ন কেউ যদি সত্যিসত্যিই আপনাকে করে,আপনি তো তাঁর মস্তিষ্কের সুস্থতা নিয়েই সন্দেহপ্রকাশ করবেন, তাই না?

না, সরকারি ব্যবস্থা নিখুঁত নয়।এবং দুর্নীতিও সেইখানে অনেক।অন্তত এদেশে তো বটেই। কিন্তু, মুনাফার লক্ষ্যে চালিত বেসরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থায় বিভিন্ন ম্যালপ্র্যাক্টিস বা দুর্নীতিকে যেমন করে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়েছে, তেমনটি সরকারি ব্যবস্থায় হয় না।

সব নাগরিকের সামর্থ্যের মধ্যে স্বাস্থ্যকে আনতে হলে, জনস্বাস্থ্য আর প্রাথমিক স্বাস্থ্যে গুরুত্ব দিতে চাইলে সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে আরো মজবুত না করলে চলবে না।

স্বাস্থ্যক্ষেত্রে দুর্নীতি নিয়ে কথা বলতে চাইলে, সেই দুর্নীতির অবসান চাইলে স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিয়ে গভীর আলোচনা প্রয়োজন। সেই আলোচনাকে মূলস্রোতে নিয়ে আসা প্রয়োজন। না, ঠিক লোকাল ট্রেন বা পানের দোকানের গুলতানির পর্যায়ের আলোচনা দিয়ে হবে না, সত্যি বলতে কি, সেই অগভীর চটকদার আলোচনায়, আগেই বলেছি, ক্ষমতার স্বার্থসিদ্ধিই হয় আর স্থিতাবস্থা বজায় থাকে। একটু গভীরে যান। ভাবুন।

প্রশ্ন করতে শিখুন, কেন কোনো রাজনৈতিক দলের ইশতেহারে স্থান পায় না স্বাস্থ্যের বিষয়টি? স্বাধীনতার সাত দশক পার হওয়ার পরেও, দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিকের কাছে স্বাস্থ্যের ন্যূনতম ব্যবস্থাটুকু পৌঁছানো যায়নি। কিন্তু, তৎসত্ত্বেও, একটিও সাধারণ নির্বাচন লড়া হয়নি সবার সামর্থ্যের মধ্যে স্বাস্থ্যের দাবীতে।কেন? আমাদের জাতীয় স্বাস্থ্যের এই নড়বড়ে হাল কেন উঠে আসে না মিডিয়ায়? ঠিক কোন কায়েমী স্বার্থে এই জরুরী বিষয়টি রয়ে যাচ্ছে আপনার নজরের বাইরে? ঠিক কোন চুষিকাঠি হাতে পেয়ে আপনি ভুলে যাচ্ছেন, ভুলে থাকছেন এই জরুরী প্রশ্নগুলোকে?

অনেক দেরী হয়ে গিয়েছে। তবু, এখনও সচেতন হোন। রুখে দাঁড়ান। অন্তত, প্রশ্নগুলো করুন।

আর কিছুই বলার নেই। সব অর্থেই বলি, ঘুম ভেঙে উঠে বসুন। বব ডিলান অবলম্বনে সুমনের দুলাইন -

কতো হাজার মরলে তবে মানবে তুমি শেষে,
বড্ডো বেশী মানুষ গেছে বানের জলে ভেসে।।

প্রথম পর্ব:
http://www.guruchandali.com/default/2018/12/25/1545745500000.html?fbclid=IwAR1hE3qWwIyGMXetPYD2NQAMD0_cNHo7hsrZiBpqsKBUjwWwraMZpohdS7w



553 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

কোন বিভাগের লেখাঃ বুলবুলভাজা 
শেয়ার করুন


Avatar: dd

Re: স্বাস্থ্যক্ষেত্রে দুর্নীতি বা চিকিৎসা ও দুর্নীতি-ডাঃ পার্থসারথি গুপ্ত স্মারক বক্তৃতা - দ্বিতীয় ও শেষ পর্ব

খুবই জরুরী, খুবই ভালো লেখা।

এবং একদম ঝরঝরে ভাষা।

"এই ধরুন, নব্বই দশক নাগাদ, মুক্ত অর্থনীতির আবির্ভাবের সাথেসাথেই আপনি জানতে শুরু করলেন, যে, সরকারি হাসপাতাল সাক্ষাৎ নরক, সেখানকার ডাক্তারেরা ফাঁকিবাজ দুর্ব্যবহারী ইত্যাদি ইত্যাদি - আর, হ্যাঁ, এখন কলকাতাতেই এসে গিয়েছে বিশ্বমানের চিকিৎসা, চিকিৎসাপরিষেবা, ......"
এইটাতে আপত্তি আছে। নব্বই নয়, তারও অনেক আগেই, সে সেই সত্তর দশকেই হাড়ে হাড়ে টের পেতাম সরকারি হসপিটালের নরকাবস্থা।

আর কিছু নয়,সরকারি হাসপাতালে,যেরকম ডাক্তার, নার্স, আয়া, চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের কাছে থেকে দুর্ব্যবহার পেয়েছি তার সাথে শুধু থানা গারদের ব্যবহারেরই তুলনা হয়। কিন্তু আর কোথাও যাওয়ার উপায়ও ছিলো না।

নাঃ, খামোখাই অ্যাকেকডোট দেবো না।
Avatar: মনিরুল ইসলাম

Re: স্বাস্থ্যক্ষেত্রে দুর্নীতি বা চিকিৎসা ও দুর্নীতি-ডাঃ পার্থসারথি গুপ্ত স্মারক বক্তৃতা - দ্বিতীয় ও শেষ পর্ব

ঋদ্ধ হলাম


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন