বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

ছবি দেখা - দর্শকের কল্পনা – বারবার দেখার অনুভূতি – যোগেন চৌধুরীর (অ)সাধারণ ফুলদানি

বিষাণ বসু

ভারমিয়েরের ছবি নিয়ে কিছু লেখালিখি দেখছিলাম, এই গুরুচন্ডা৯-র পাতাতেই। চমৎকার কিছু কথাবার্তা উঠে এসেছে সেখানে। (নামগুলো ব্লগের পাতায় যেমন পেয়েছিলাম, তেমনই রাখলাম। পুরো নাম জানার সুযোগ হয় নি।)

ভারমিয়েরের অনবদ্য সৃষ্টি, আ গার্ল অ্যাস্লিপ, ছবিটি দেখার অভিজ্ঞতা নিয়ে কৃষ্ণকলি বলেন,
“অনেক দিন যাবৎ এই ছবি দেখে আমি ভাবতাম যে মেয়েটি কারুর আসার অপেক্ষা করতে করতে ঘুমিয়ে পড়েছে। দেখুন, দরজার পাশে ঝোলানো ভুস্কো মতন কোট, মলিন দেওয়াল, চেয়ারের পিঠে চটা উঠে যাওয়া দেখে মনে হয়না এখনও খুব ঝাঁ চকচকে বিলাসবহুল রয়েছে এই বাড়ি। কিন্তু মেয়েটির পরণের গাউনের রং,তার ফ্যাব্রিক বেশ দামী বলেই মনে হচ্ছে। আমার মনে হতো, নিশ্চয়ই কোন স্পেশ্যাল অকেশনের সাজ। স্পেশ্যাল কেউ আসবে বলে। ওর গালের লালচে আভাও তাই। স্বাভাবিকের থেকেও বেশি মনে হয়, হয়তো যত্ন করে একটু প্রসাধন করা। বিশেষ কেউ আসবে বলেই। তাই আমি কেবলই ভাবতাম,ও অপেক্ষা করছে,কোথাও যেন কিছুটা "কি জানি সে আসবে কবে" সেন্স দেখতাম।পরে এই ধারণা বদলে গেছে। কেন বদলে গেছে বলি। অন্য চেয়ারটিই মূল কারণ, ধারণা বদলানোর। চেয়ারের অবস্থানটা লক্ষ্য করুন। কারুর আসার অপেক্ষায় থাকা চেয়ার ওভাবে থাকেনা। বরং বেশ বোঝা যাচ্ছে চেয়ার থেকে কেউ উঠে গেছে। হঠাৎ। স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে,যাবার কথা ছিলোনা,কিন্তু উঠে যেতে হয়েছে। হঠাৎ। একই কথা বলছে কুঁচকে থাকা টেবিল রানার। টেবিলে রাখা ফলগুলো দেখুন। সযত্নে সাজানো হয়েছিলো, তখনো খাওয়া শুরু হয়নি। কেউ এসেছিলো, সেই বিশেষ জন। এসেছিলো, বসেছিলো টেবিলে। নাড়াচাড়া করেছিলো এটা সেটা। তারপরে কোন কারণে 'আসছি' বলে উঠে গেছে। কিন্তু আসেনি আর বহুক্ষণ হলো। আপনার কল্পনাকে ভীষণ ভাবে প্রোভোক করছে না কি? ঐ খোলা থাকা দরজা, ঐ বেঁকে থাকা চেয়ার, ঐ কোঁচকানো টেবিল রানার।আপনি মনে মনে গল্পটার খানিকটা বানিয়ে ফেলেননি কি?”



অসামান্য বর্ণনা, নিঃসন্দেহে। ন্যারেটিভ-ধর্মী ছবি দেখার সাথে দর্শকের অনুভব-কল্পনা মেলানো এমন চমৎকার বিশ্লেষণ পাঠের সুযোগ, বাংলাভাষায়, কমই হয়। (ইনি যে কেন আরো বেশী লেখেন না, আমাদেরই দুর্ভাগ্য!!)

আর, আরো একটা ব্যাপার লক্ষ্য করুন। বর্ণনায় ছবিটি একাধিকবার দেখার অভিজ্ঞতা উঠে এসেছে। আর, বারবার দেখার ফলে, ছবিটির অর্থ, কোনো এক জায়গায়, বদলে গিয়েছে। ছবি দেখার ক্ষেত্রে, এই পৌনপুনিক দর্শনের অভিজ্ঞতার গুরুত্ব প্রসঙ্গে পরে আসছি।



দর্শকের ব্যক্তিগত অনুভব – ভারমিয়ের এবং আরো ভারমিয়ের

কৃষ্ণকলির এই লেখার রেশ ধরেই, শুচিস্মিতা, ভারমিয়েরের আরেক মাস্টারপিস, দ্য লিটল স্ট্রীট দেখার অভিজ্ঞতা নিয়ে বলেন,

“লিটল স্ট্রীট ছবিটা দেখার পর থেকে যেমন সারাদিন ধরে আমার আমাদের পুরোনো বাড়িটার কথা মনে হচ্ছিল। সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। আমি মটকা মেরে পড়ে আছি। বড়ো দালানের কড়িকাঠের চড়ুইগুলো খালি পিড়িং পিড়িং করে যাচ্ছে। আমি অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি ছোটো কাঁটাটা কখন চারের ঘরে পৌঁছাবে আর আমি শুয়ে থাকার যন্ত্রনা থেকে মুক্তি পাবো। লিটল স্ট্রীট দেখে কেন যে বাড়ির কথা মনে পড়লো বুঝতে পারছিলাম না।”



বাঃ!! আবারও মোহিত হলাম। আর, ভারী সুন্দর কথা। ছবি দেখে নিজের সাথে, নিজের জীবনের সাথে মেলানো, মেলাতে পারা - এর মধ্যেই লুকিয়ে থাকে ছবি ভালোবাসার রহস্য।

সাড়ে তিনশো বছর আগে, সাগরপারের এক ওলন্দাজ শিল্পীর আঁকা ছবি দেখে আমার শহরের ঘিঞ্জি গলি, পুরোনো বাড়ি, শৈশব-কৈশোর মনে পড়ে যায়। ছবির ম্যাজিক এইখানেই।

কিন্তু, তার ঠিক পরের কথাটাতেই খটকা লাগলো। কৃষ্ণকলির লেখা প্রসঙ্গেই, শুচিস্মিতা আবার বলেন,
“তোমার লেখা পড়ে বুঝলাম সব ছবির পেছনেই একটা গল্প থাকে। সেই গল্পটাকে খুঁজে বেড়াতে হয়। ভবিষ্যতে ছবি দেখতে হলে আমি সবসময় এই কথাটা মনে রাখবো।”


ছবি এবং ছবির ভেতরের গল্প

শুচিস্মিতার এই কথাটুকু শুনে ধন্দে পড়ে গেলাম। সব ছবির মধ্যেই গল্প খুঁজবো? ছবিমাত্রেই গল্প থাকবে? থাকতেই হবে?

না থাকলে? জোর করে খুঁজবো? নিজের গল্প চাপিয়ে দেবো? নাকি, সেই ছবি এড়িয়ে যাবো?

যাঁরা ইতস্তত ছবি দেখেন, তাঁদের মধ্যেও অনেকেই যে আধুনিক ছবি এড়িয়ে যান, সেই রহস্য কি লুকিয়ে এখানেই? অনেক চেষ্টার পরেও, এই গল্প খুঁজে না পাওয়ায়?

নাকি গল্প থাকে, কিন্তু আমরাই খুঁজে পাই না? বা, সময় দিয়ে দেখিনা বলে খুঁজে পাই না? অথবা, বলা ভালো, খুঁজে নেওয়ার শ্রমটুকু এড়িয়ে যাই?


ছবির ধারাবদল - আগেকার ছবি থেকে আধুনিক ছবি, থুড়ি মডার্ন আর্ট

কারণ যা-ই হোক - আশা করি কেউই খুব বেশী দ্বিমত পোষণ করবেন না - মোদ্দা কথা এই, যে, আগেকার ছবির তুলনায় আধুনিক চিত্রকলায় (সচেতনভাবেই, সময়টি নির্দিষ্ট করলাম না, কেননা সময় দিয়ে আধুনিকতাকে সংজ্ঞায়িত করা কঠিন, এবং কাকে দিয়ে পশ্চিমী চিত্রকলায় আধুনিকতার শুরু ধরবো, সেই তর্ক আপাতত এড়াতে চাইছি), এই গল্পটি খুঁজে পাওয়া আয়াসসাধ্য, এবং হয়তো সেই কারণেই, আধুনিক চিত্রকলা অনেকের কাছেই কিঞ্চিৎ দুরূহ ঠেকে।

আধুনিক কালে অনেকখানিই বদলে গিয়েছে ছবির ধাঁচ, অতএব খানিক বদলেছে ছবি দেখার অভিজ্ঞতাও। আদতে, এই বদলে যাওয়াটির সাথে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত শিল্পসৃষ্টির মূলগত ভাবনা এবং পদ্ধতি। শিল্পভাবনার এবং শিল্পীমানসের এই বাঁকবদলটি ছোট্টো কথায়, বুঝিয়েছেন শিল্পী জ্যাসপার জন্স, “Sometimes I see it and then paint it. Other times I paint it and then see it.” লক্ষ্য করুন, এতাবৎ কাল চলে আসা ভাবনা থেকে আধুনিক শিল্পী সরে আসছেন প্রায় একশো আশি ডিগ্রি। স্বাভাবিকভাবেই তাঁর সৃজন যাবে বদলে, আর অবশ্যম্ভাবীভাবে, সেই ছবি দেখতে আমরা নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হবো। ভাবনার এই বদলটি একটু ভালো করে বোঝা প্রয়োজন।

জন্স-এর এই এতো সংক্ষিপ্ত মন্তব্য হেঁয়ালি মনে হলে, ছবি নিয়ে ধ্যানধারণার ক্রমবিবর্তনটি বুঝতে সাহায্য করতে পারে, আমার খুব প্রিয় শিল্পী ডেভিড হকনী-র প্রথমজীবনের অভিজ্ঞতা। গত শতকের পঞ্চাশের দশকের শেষ দিকে, তখনও পর্যন্ত মুখ্যত বাস্তবানুগ এবং ফিগারেটিভ অঙ্কনপদ্ধতিতে অভ্যস্ত হকনী, প্রথমবারের জন্যে, পরিচিত হন অ্যাবস্ট্রাক্ট এক্সপ্রেসনিস্ট ধারার ছবির সাথে। তার অভিঘাত হয় আশ্চর্য। হকনী অনুভব করেন, একটা বাস্তব বা কল্পচিত্রকে সামনে রেখে ছবি আঁকার পরিবর্তে, আদত কল্পনাটিকেই ক্যানভাসে মূর্ত করা, এবং সেই অনুভূতিকে দর্শকের কাছে পৌঁছে দেওয়া, এ এক উলটপুরাণ। প্রচলিত ভাবনাকে আগাপাশতলা উলটে দেওয়া। ক্যানভাস আর বাস্তব বা কল্পনার কোনো দৃশ্যকে দর্শকের চোখে পৌঁছে দেওয়ার একটি প্রতিফলক মাত্র নয়, শিল্পীর আবেগ সক্রিয়ভাবে দর্শকের হৃদয়ে সঞ্চারিত করার মাধ্যম হয়ে উঠেছে সেই ক্যানভাস। জ্যাসপার জন্স-এর আগের মন্তব্যটি লক্ষ্য করুন, Other times I paint it and then I see.

আরেকটু বিশদে বলি। অবশ্য, ভাষার উপর সীমিত দখল নিয়ে গুছিয়ে বলতে পারা দুষ্কর। ধরুন, লিওনার্দো যখন লাস্ট সাপার এঁকেছিলেন, তিনি সেই দৃশ্য চাক্ষুষ প্রত্যক্ষ করেছিলেন, এমন বলছি না। কিন্তু, তাঁর কল্পনায় ইমেজ-টি ছিলো, যেটা তিনি ম্যুরালে আনেন। অন্যদিকে, এক্সপ্রেশনিজমে, শিল্পীর বিশুদ্ধ আবেগ বা অনুভূতিটাকেই ছবির মাধ্যমে দর্শকের মনে ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হলো। এবং, এই শিল্পী থেকে দর্শক, অনুভূতির এই হাতবদলে, মাধ্যম হলো ছবিটি। কিন্তু, সেই মাধ্যম হওয়ার জন্যে ছবিটির বাস্তবানুগ কোনো দৃশ্যের প্রতিরূপ হওয়ার প্রয়োজন হলো না।

এমন বলছি না, যে, ক্লাসিকাল বা অনুরূপ ধারায় শিল্পীরা বাস্তবের প্রতিচ্ছবি মাত্র এঁকেছিলেন বা সেই আঁকার মধ্যে শিল্পীর অনুভবের কোনো গুরুত্বই ছিলো না। ভারমিয়েরের কথা দিয়েই লেখা শুরু করেছি। আর, আমরা দেখেছি, তাঁর ছবির এমনই গুণ, যে, আপাত-আটপৌরে দৃশ্যও দর্শকের মনে বিচিত্র অনুভূতির জন্ম দিতে পারে। কাজেই, আগেকার ছবিতে শিল্পীর অনুভবের জায়গা ছিলো না, এমন অবান্তর দাবীর কোনো প্রশ্নই ওঠে না। বলতে চাইছি, এই এক্সপেশনিস্ট ধারায়, দর্শকের কাছে শিল্পীর আবেগ পৌঁছে দেওয়ার জন্যে, আগেকার ছবির মতো করে, কোনো বাস্তবানুগ দৃশ্যের অবতারণার প্রয়োজন হলো না। না, এক্সপ্রেশনিস্ট মাত্রেই বিমূর্ত ছবি এঁকেছেন এমন নয়, কিন্তু বাস্তবানুগ হওয়ার দায় আর ছবির রইলো না। (এইখানে একটু বিধিসম্মত সতর্কীকরণও জুড়ে দিই। মডার্নিজম মানেই এক্সপ্রেশনিজম নয়। আপাতত এক্সপ্রেশনিজমকে সামনে রেখে চিত্রশিল্পে আধুনিকতার ধারাটিকেই বোঝার চেষ্টা করছি।)


এক্সপ্রেসনিজম – এডওয়ার্ড মুঞ্চ ও তাঁর ভুবনজয়ী আর্তনাদ

এই প্রসঙ্গে, এডওয়ার্ড মুঞ্চ-এর দ্য স্ক্রীম ছবিটির কথা বলা যায়। রক্ত-লাল আকাশের প্রেক্ষাপটে মানুষের মতো দেখতে একটি ফিগারের মর্মভেদী আর্তনাদ। বিমূর্ত নয়, কিন্তু বাস্তব মানবতুল্যও নয় ছবির ফিগারটি। অথচ, দর্শক ছবির সামনে দাঁড়ালে আর্তনাদটি অনুভব করবেনই, একথা নিশ্চিতভাবে বলা যায়।



নব্য চিত্রধারার ক্ষেত্রে ধারণার এই বাঁকবদলটি খুব সংক্ষেপে, কিন্তু স্পষ্ট করে বললেন শিল্পী ভাসিলি কানদিনস্কি,
“The sequence is: emotion (in the artist) » the sensed » the work of art » the sensed » emotion (in the observer). The two emotions will be like and equivalent to the extent that the work of art is successful. In this respect painting is in no way different from a song : each is a communication. The successful singer arouses in listeners his emotions; the successful painter should do no less.”

শিল্পীর অনুভূতি দর্শক-শিল্পানুরাগীর হৃদয়ে পৌঁছানোর মাধ্যম হলো শিল্পকর্ম। দুই হৃদয়ে একই অনুভূতি জাগলে, শিল্পকৃতি সফল।


এক্সপ্রেসনিজম এবং ছবির মধ্যে লুকিয়ে থাকা গল্পের সন্ধান

কিন্তু, এমন ছবিতে কি গল্প থাকে না? থাকতে পারে না? মানে, শিল্পী না-ই বা আঁকলেন সে গল্প, কিন্তু, সেই চিত্রজনিত আবেগ থেকে দর্শকের মনে যদি কিছু গল্পের মতো দৃশ্যাবলী ভেসে ওঠে, সে কি ভ্রান্তি বলে গণ্য হবে?

উপরে উদ্ধৃত কানদিনস্কির কথাটিতে গানের সাথে ছবির সাযুজ্য টানার ব্যাপারটা খুব ভাবায়। দেশের উদাহরণ টানতে চাইলে, ভারতীয় রাগসঙ্গীতে, ধ্রুপদ বা খেয়ালে, বাণী অপ্রধান। কিন্তু, রাগরূপ? সেইখানে তো দৃশ্যকল্পকে মান্যতা দেওয়া রয়েছে। তাহলে?

আরেকবার না হয় মুঞ্চের ছবিতে ফেরা যাক। মুঞ্চের নিজের ভাষায়, এই ব্রীজ ধরে হেঁটে যাওয়ার মুহূর্তে, তিনি শুনেছিলেন, প্রকৃতি থেকে ভেসে আসা সেই আর্তনাদ। এখন, আমরা যদি ছবির মধ্যে থেকে খুঁজে নিই এক অতিপ্রাকৃত আর্তনাদ, আর পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা ঝাপসা মানুষ বা ব্রীজটির মধ্যে খুঁজে পাই বাস্তবের সাথে ক্রমবিলীয়মান শেষ সংযোগটুকু, সে কি আমাদের বোঝার ভুল?

মনে রাখতে হবে, এই ছবি যখন মুঞ্চ আঁকছেন, তখন তাঁর বোন ভর্তি রয়েছেন অ্যাসাইলামে। মুঞ্চ আশঙ্কিত নিজের মানসিক ভারসাম্য বিষয়ে। আর, পরবর্তী কালে, তিনি নিজেই বলেছেন, হ্যাঁ, একজন উন্মাদই পারেন এমন ছবির জন্ম দিতে। সেক্ষেত্রে, একটা বিশেষ মানসিক অবস্থা থেকেই এই ছবির জন্ম। কিন্তু, সেই অবস্থার পেছনেও তো একটা ঘটনা-বাস্তব-পরিবেশ রয়েছে। গলা-চেপে-ধরা এক মর্মন্তুদ আর্তনাদ, যা কিনা আপনার রোজকার আহার-নিদ্রা-মৈথুনের বেঁচে থাকাটিকেই বিপর্যস্ত করে, তার থেকে আপনি যদি পৌঁছে যান কল্পনায়, তাকে কি “সব ঝুট হ্যায়” বলে দাগিয়ে দেওয়া যাবে?

কথায় কথায় বড্ডো বেলাইনে চলে যাচ্ছি। আসুন, আবারও আধুনিক চিত্রকলা দেখার অভিজ্ঞতা প্রসঙ্গে ফিরি।


আঁকাআকির ধ্যানধারণায় বদল - পল ক্লী-র ভাবনা

আধুনিক চিত্রকলার উদ্দেশ্য তথা দর্শন বিষয়ে, গত শতকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিল্পী, এবং প্রভাবশালী শিল্পতাত্ত্বিকও বটে, পল ক্লী-র কথাটি এখানে প্রণিধানযোগ্য।

“Formerly, we used to represent things visible on earth, things we either liked to look at or would have liked to see. Today we reveal the reality that is behind visible things, thus expressing the belief that the visible world is merely an isolated case in relation to the universe and there are many more other, latent realities.”

আগে, পৃথিবীতে যা যা দেখা যায়, বা যা যা দেখতে চাইতাম, বা দেখতে পেলে ভালো হতো, তা-ই আঁকা হতো। কিন্তু এখন আঁকা হয়, দৃশ্যমান জগতের পেছনে লুকিয়ে থাকা বাস্তবতাকে।

সাধারণ চোখে লুকিয়ে থাকা আরো অনেক বাস্তবতার খোঁজ ছবি থেকে মেলে, মেনে নিলাম। অন্তত আধুনিক শিল্পীর প্রয়াস তেমনই। কিন্তু, সেই পরাবাস্তবতা কি শিল্পপ্রেমীর মনে কোনো বাস্তবানুগ গল্পের জন্ম দিতে পারে না?

আসুন, একবার দেখি, মহাজন মহাজ্ঞানীরা কেমনভাবে এমন ছবি দেখার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন। আমরাও না হয় সেই পথেই চলার দুঃসাহস করবো।


পল ক্লী, অ্যাঞ্জেলাস নোভাস আর ওয়াল্টার বেঞ্জামিন

একটা উদাহরণ নেওয়া যাক। ক্লী-র একটি পেইন্টিং, অ্যাঞ্জেলাস নোভাস, দেখে ওয়াল্টার বেঞ্জামিন বলেন, “A painting named Angelus Novus shows an angel looking as though he is about to move away from something he is fixedly contemplating. His eyes are staring, his mouth is open, his wings are spread. This is how one pictures the angel of history.” হ্যাঁ, ছবিতে এইটুকু স্পষ্ট। যদিও, শেষের ওই ইতিহাসের দেবদূত বিষয়টা নিয়ে ধন্দ শুরু হয়। আর এর পরে?



এরপর বেঞ্জামিন যা বলেন, তার মধ্যে রয়েছে এক আশ্চর্য উড়ান। ইতিহাসের দেবদূতের (Angel of History) এই যাত্রা নিয়ে বেঞ্জামিন যেমন বলেন, আমাদের যুগপৎ স্তম্ভিত ও চমৎকৃত হওয়া ভিন্ন পথ থাকে না।

“His face is turned toward the past. Where we perceive a chain of events, he sees one single catastrophe which keeps piling wreckage upon wreckage and hurls it in front of his feet. The angel would like to stay, awaken the dead, and make whole what has been smashed. But a storm is blowing from Paradise; it has got caught in his wings with such violence that the angel can no longer close them. The storm irresistibly propels him into the future to which his back is turned, while the pile of debris before him grows skyward. This storm is what we call progress.”

এই ঝড়, এই ধ্বংসস্তূপ ছবিতে কোথায়? অতীতের ভগ্নাবশেষ বা স্বর্গ থেকে বয়ে আসা ঝড়ে আটকে পড়া দেবদূতের ডানা? নাঃ, খুঁজে পাই না কিছুই।

তাহলে কি, এসবই সমকালের এক শ্রেষ্ঠ শিল্পীর প্রতি এক শ্রেষ্ঠ শিল্পসমালোচকের কষ্টকল্পিত, বা সোজা কথায় ফাঁপানো প্রদ্ধাঞ্জলি? পুরোটাই বেঞ্জামিন সাহেবের মেশানো আপন মনের মাধুরী মাত্র?

নাকি, একখানা নির্বিষ ছবিকে ঘিরে নিজস্ব অ্যাজেন্ডা প্রতিষ্ঠার প্রয়াস? এই প্রশ্নও উড়িয়ে দেওয়া যায় না একারণেই, যে, বেঞ্জামিনের এই লেখার পরে, বাম ভাবধারায়, বিশেষত বামঘেঁষা ঐতিহাসিক বিশ্লেষণে এই ছবি বিশিষ্ট একটি স্থান অধিকার করে।

দুটো প্রশ্নের কোনোটিরই নৈর্ব্যক্তিক উত্তর দেওয়া, অন্তত আমার পক্ষে, সম্ভব নয়। আমরা, কিছু প্রাপ্ত এবং যাচাইযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে, এমন বিশ্লেষণ এলো কোন পথে, সেইটুকু অনুমান করতে পারি মাত্র।


ওয়াল্টার বেঞ্জামিন ও অ্যাঞ্জেলাস নোভাস

এই ছবি পল ক্লী ঠিক কবে এঁকেছিলেন, জানা যায় না। আর, না, এইটা তো প্রচলিত অর্থে পেইন্টিং-ও নয়। এইটা অয়েল ট্রান্সফার টেকনিকে সৃষ্ট একটি মোনোপ্রিন্ট। এই টেকনিকের উদ্ভাবন ক্লী-র হাতেই। মোটামুটিভাবে বলতে গেলে, এই পদ্ধতিতে, একটি ট্রেসিং কাগজের উপর ছাপার কালি লেপে নিয়ে, তার উপরে ছুঁচলো কিছুর মাধ্যমে চাপ দিয়ে নীচে রাখা একটি ড্রয়িং পেপারে ছাপ আনা হয়। ক্লী ঠিক কবে এই শিল্পকর্মটি সৃষ্টি করেন জানা না থাকলেও, এটি প্রথমবার প্রদর্শিত হয় ১৯২০ সালে। পরের বছরেই এটি কেনেন ওয়াল্টার বেঞ্জামিন।

১৯২১ সালে এইটি কেনার পর থেকে মৃত্যুর প্রায় আগে পর্যন্ত, বেঞ্জামিন এই ছবিটি কাছছাড়া করেন নি। কখনো বাসাবদলের সময় অন্যের কাছে গচ্ছিত রাখতে বাধ্য হলেও, ছবিটি নিজের কাছে আনিয়ে নিয়েছেন যথাসাধ্য দ্রুততায়। মনে রাখতে হবে, নাৎসি তান্ডবে বেঞ্জামিনকে পালিয়ে বেড়াতে হয় শেষের বেশ কয়েকটি বছর, এবং একদম শেষে, পালানো অসম্ভব এমন পরিস্থিতিতে তিনি আত্মহত্যা করেন ১৯৪০ সালে। ছবিটি নিয়ে বেঞ্জামিনের এই আশ্চর্য লেখাটিও সেই ১৯৪০ সালেই, প্রকাশিত হয় মৃত্যুর পরে। প্রসঙ্গত, পল ক্লী-ও মারা যান ওই ১৯৪০-এই, বেঞ্জামিনের মাসতিনেক আগে।

ক্লী-র এই বিশেষ শিল্পকৃতি বিষয়ে বেঞ্জামিন সারাজীবনে অনেকবারই লিখেছেন, প্রসঙ্গে-অপ্রসঙ্গে। বলেছেন, যে মানবতা নিজেকে ধ্বংস করা ভিন্ন নিজেকে প্রমাণ করতে পারে না, (এক বৃহত্তর অর্থে “কাদম্বরী মরিয়া প্রমাণ করিলো, সে মরে নাই”??) তার স্বরূপ চিনতে তাঁকে সাহায্য করেছে এই অ্যাঞ্জেলাস নোভাস। প্রবাদপ্রতিম এক দার্শনিক-চিত্রসমালোচকের একটি ছবি ঘিরে এমন পুনরাবৃত্ত বিশ্লেষণ শিল্পের ইতিহাসে নজিরবিহীন।

নিজের কল্পনাকে ছবির উপরে চাপানোই হোক, বা ছবিকে উপলক্ষ্য করেএক বিশেষ দর্শনকে সামনে আনার প্রয়াস, এর দুই অনুমানের বাইরে একটি সুনিশ্চিত নৈর্ব্যক্তিক সত্যি রয়ে যায়। হ্যাঁ, এই শিল্পকর্মটি বেঞ্জামিনের বারবার দেখার সুযোগ ঘটেছিলো। নিজের কাছে থাকার সুবাদে, প্রায় অবসেসিভের মতো কখনও কাছছাড়া না করার সুবাদে।


ছবি দেখা – পুনরাবৃত্ত দর্শনের গুরুত্ব

ছবির ক্ষেত্রে, শিল্পকৃতির ক্ষেত্রে এই পৌনপুনিক দর্শনে অত্যন্ত জরুরী।

লেখার শুরুতেই আমরা দেখেছি, কৃষ্ণকলি ভারমিয়েরের ছবি দেখার অভিজ্ঞতা বর্ণনা প্রসঙ্গে জানাচ্ছেন, ঠিক কেমন করে, গভীরতর নিবিষ্ট দর্শনে, তাঁর চোখে ছবিটির অর্থ বদলে গিয়েছে। বেঞ্জামিনের সংগ্রহে পল ক্লী-র ছবিটি ছিলো, কৃষ্ণকলির সংগ্রহে, নিশ্চিতভাবেই ভারমিয়েরের মূল ছবিটি ছিলো না এবং নেই। তদসত্ত্বেও, ছবিটি তিনি বারবার দেখেছেন। বড়ো প্রিন্ট বা বইয়ের আর্টপ্লেট বা নিছকই কম্পিউটারের পর্দায়। কিন্তু, বারবার দেখার প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ, দুইক্ষেত্রেই। বা, বলা যেতে পারে, , সাধারণভাবেই, ছবির অন্তঃস্থিত রসাস্বাদনের জন্যে এই বারবার দেখার ব্যাপারটি খুব জরুরী।

আর্ট এক্সিবিশন বা গ্যালারী, সাজিয়ে রাখা অনেক ছবির মধ্যে দিয়ে একটি ছবিতে একঝলক নজর দেওয়ার সাথে, ছবি দেখা, বা গভীরভাবে ছবি দেখার ফারাক বিস্তর। প্রসঙ্গত, গোদারের ব্যান্ড অফ আউটসাইডারস (মূল, Bande a Part) ছবির ল্যুভ দৃশ্যটি ভাবা যেতে পারে। আমাদের অনেকেরই গ্যালারি দর্শনের অভিজ্ঞতা খুব ভিন্ন কি? যেখানে ঘড়ি মেপে চলা সময়ের মধ্যে, প্রায় চলমান শকটের জানালা দিয়ে পার হওয়া দৃশ্যের মতো করে আমরা দেখে নিই কিছু মাস্টারপিস?


চেয়ার এবং ছবি দেখা - ফীউরবাখ এবং ক্লী

না, আধুনিক যুগের কোনো আভা গার্দ উত্তরাধুনিক শিল্পীর কথা বলছি না, দুই শতক আগের জার্মান ক্লাসিকাল শিল্পী অ্যানসেম ফীউরবাখ বলেছিলেন, ছবি দেখার জন্যে মাননীয় দর্শককে আমরা ঠিক কী সাহায্য করতে পারি? হ্যাঁ, ছবি বোঝার জন্যে একখানা চেয়ার তো দিতেই পারি।

ফীউরবাখের এই কথা উদ্ধৃত করে পল ক্লী বলেন, “And the beholder, is he through with the work at one glance? (Unfortunately, he often is.) Does not Feuerbach say somewhere that in order to understand a picture one must have a chair? Why the chair? So that your tired legs won't distract your mind. Legs tire after prolonged standing. Hence, time is needed.” হ্যাঁ, ছবির নিবিষ্ট অনুধাবনের জন্যে ছবির সামনে সময় কাটানো জরুরী। এক নজর দেখার মধ্যে দিয়ে, আর যা-ই হোক, ছবি দেখা হয় না।

ক্লী-র পরের কথাটি আরো গুরুত্বপূর্ণ। “The (beholder's) eye is made such a way that it focuses on each part of picture in turn; and to view a new section, it must leave the one just seen. Occasionally, the beholder stops looking and goes away - the artist often does the same thing. If he thinks it worthwhile, he comes back - again like the artist.” এই কথাটিও ভাবা জরুরী। শিল্পসৃষ্টির অভিজ্ঞতা এবং শিল্প-অনুভবের অভিজ্ঞতা মিলেমিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে। শিল্পী, সবসময়ই, একটানা বসে মাস্টারপিস সম্পূর্ণ করেন এমন তো নয়। কাজের মধ্যেই অসম্পূর্ণ অবস্থায় তিনি ছেড়ে যান, আবার ফিরে এসে ভালো লাগলে কাজটি সম্পূর্ণ করেন, নচেৎ সেই কাজ অসম্পূর্ণই রয়ে যায়। শিল্পের প্রতি দর্শকের আচরণও তেমনই। বারবার ফিরে আসা, দুজনের ক্ষেত্রেই অবশ্যম্ভাবী।

কিন্তু, এই বারবার ফিরে আসার সুযোগ তো হাতের নাগালে ছবিটি না থাকলে হওয়া সম্ভব নয়। না, এমন দাবী করছি না, যে, আমাদের মধ্যে এমন ধনকুবের লুকিয়ে আছেন, যারা ইচ্ছেমতন মাস্টারপিস কিনে এনে দেওয়াল আলো করতে পারেন। কিন্তু, ঘরের দেওয়ালে মাস্টারপিসের প্রিন্ট রাখা কোনো বড়ো সমস্যা নয় আজকাল। অনলাইনে উচ্চমানের প্রিন্ট, এমনকি ক্যানভাস প্রিন্ট, কেনা কোনো ব্যাপারই নয়। ছবি দেখতে, বারবার ফিরে যাওয়ার জন্যে, বাড়ির দেওয়ালে ঝোলানো ছবির কিন্তু কোনো বিকল্প নেই। আর, আপনার হাতে রাখা নতুন মডেলের স্মার্টফোনের দামেই পাওয়া যেতে পারে আমাদের দেশীয় মাস্টারদের ছোটখাটো পেইন্টিং বা মাইনর ড্রয়িং, অথবা উঠতি শিল্পীর প্রতিভার সেরা বিচ্ছুরণ।

বিশ্বাস করুন, অতো কথায় কথায় পশ্চিমমুখো হওয়ার প্রয়োজন নেই। আমাদের দেশীয় চিত্রকরদের কাজ কিন্তু যথার্থই বিশ্বমানের। আর, আপনি যখন সেই ছবির সাথে নিজের কল্পনা মিশিয়ে ছবি-গল্প একাকার করতে চাইবেন, দেশীয় মাস্টাররা অনেক সহজে আপন হতে পারেন। তাঁদের, এমনকি, মাইনর কাজই বলুন অথবা নতুন প্রজন্মের তরুণ শিল্পীর তারুণ্যের চোখধাঁধানো আবেগভরা কাজ - শিল্পকৃতির নিবিষ্ট দর্শনে পাওয়া যেতে পারে এক আশ্চর্য আলো।

তবে, তার জন্যে, আগে যেমন বলেছি, প্রয়োজন ছবির কাছে বারবার ফিরে যাওয়া, নিবিড় দর্শনের অভিজ্ঞতা।


“ছবির সাথে সহবাস”

ঘরের পাশে, প্রকাশ কর্মকার, খুব সহজ কথায় বলেছিলেন, ভায়া, ছবি শুধু দেখলেই হবে? ছবি বোঝার জন্যে, ছবির সাথে সহবাস করতে হয়।

হ্যাঁ, শুচিস্মিতা, সবধরণের ছবির কথা বলতে পারবো না, তবে অধিকাংশ ছবির মধ্যেই একটা গল্প খোঁজার চেষ্টা করা যেতে পারে। সম্পূর্ণ নৈর্ব্যক্তিক দৃষ্টিতে ছবি দেখতে পারলে নিশ্চয়ই ভালো হয় - ফর্ম, লাইন, স্পেস, রঙ, কম্পোজিশন নিয়ে ছবির বিচার করতে পারলে তো কথাই নেই - কিন্তু আমাদের আমজনতার ছবি দেখা তো সাব্জেক্টিভ, ওই গল্প খোঁজার প্রয়াস, বা একটা অন্য অনুভব পাওয়ার আশা। আর, এ-ও তো জেনেছি, বিশ্বখ্যাত শিল্পতাত্ত্বিক, তিনিও ছবি দেখার মুহূর্তে নিজের কল্পনাকে দূরে ঠেলেন নি। কিন্তু, আবারও মনে করিয়ে দিই, এই গল্পটি খুঁজে পেতে হলে, ছবির সামনে অনেক বেশী সময় কাটানো জরুরী, ছবিকে মনের মধ্যে নাড়াচাড়া করা জরুরী, ছবির সাথে সহবাস অনিবার্য।

শিল্পের সাথে কল্পনা বা অনুভূতির সম্পর্কটি অতি নিবিড়। বন্ধুর মুখে শোনা, ল্যুভ-এ গিয়ে অনেক ছবির মধ্যে, তার শিশুপুত্রটি, সব ছবি ছেড়ে, জ্যাকসন পোলকের সম্পূর্ণ বিমূর্ত ছবির সামনে থেকে নড়তে চাইছিলো না। দশ বছরের সেই ছেলে পোলকের নাম শোনে নি তার আগে, অ্যাবস্ট্রাক্ট এক্সপ্রেসনিজম খায় না মাথায় মাখে তা জানার তো প্রশ্নই ওঠে না। প্রশ্ন করলে সে উত্তর দেয়, ছবিটা দেখে তার মধ্যে কেমন একটা ব্যাপার হচ্ছে, সেইটা বলতে পারা যাবে না।

মোদ্দা কথা, ছবি দেখার অভিজ্ঞতা, বা অনুভূতি, অন্তত আমাদের মতো আমজনতার ক্ষেত্রে (অনেকসময়, বিশেষজ্ঞদের ক্ষেত্রেও), আবারও বলি, সাব্জেক্টিভ। গল্পটি মনে না ধরলে মাস্টারপিসকেও অপছন্দের তালিকায় ফেলার ঝুঁকি সত্ত্বেও, আমরা ব্যক্তিগত অনুভূতি বা নিজস্ব গল্প মিলিয়েই ছবি দেখি।

কিন্তু, সেই গল্প খুঁজে নেওয়ার মতো গভীর অনুসন্ধিৎসু কজন? পৌনপুনিক দর্শনের ধৈর্য নিয়ে কজন ছবির সামনে দাঁড়ান?


একান্ত নিজস্ব স্পেসের দেওয়ালটিতে ছবি

বারবার একই কথায় ফিরে আসছি, ছবির সেই গল্প খোঁজার জন্যে “ছবির সাথে সহবাস”-এর প্রয়োজন। দিনের অনেক সময়, বারবার যাতে চোখ যায়, এমন জায়গায় ছবিটি থাকা প্রয়োজন। যাঁদের বাড়ির দেওয়ালে ছবি রয়েছে (আবারও বলি, এইখানে ছবি বলতে প্রিন্ট বা ওরিজিন্যাল সবকিছুকেই বোঝাতে চেয়েছি), তাঁদেরকে এই বিষয়টি আলাদা করে বোঝানোর কিছু নেই। এইটা অনেকাংশেই, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতানির্ভর। কিন্তু, যাঁদের বাড়িতে ছবি নেই, তাঁরা একবার চেষ্টা করে দেখুন। আগেই বলেছি, অনলাইন স্টোরে বেশ উঁচু মানের প্রিন্টের দাম তো তেমন কিছু নয়। শুধুই পশ্চিমের নয়, ভারতীয় মাস্টারদের ছবির প্রিন্টও পাওয়া যায় সেইখানে। আর, ওরিজিন্যাল ছবি ঝোলাতে পারলে তো কথা-ই নেই।

বারবার বাড়ির দেওয়ালের কথা বলছি, কেননা, অনেকের অফিসের দেওয়ালে ছবি ঝোলানো থাকে। অফিসের আধুনিক অন্দরসজ্জার উপকরণ হিসেবে ছবি ইদানিং জনপ্রিয় হচ্ছে। কলকাতার, অন্তত দুটি, প্রাইভেট হাসপাতালের দেওয়ালে যে মানের এবং যে সংখ্যার ছবি দেখেছি, শহরের কোনো গ্যালারির দেওয়ালে একসাথে তেমন দেখিনি। কিন্তু, ছবি দেখার জন্যে যে উদ্বৃত্ত সময়, অনুভব করার জন্যে যে মানসিক অবস্থান বা ল্যাদ বা বলে-বোঝানো-যায়-না-এমন-একটা-ব্যাপার, সেইটা তো বাড়ি বাদ দিয়ে আসে না।


যোগেন চৌধুরীর ফুলদানি – দৃষ্টিবিভ্রম, নাকি অসাধারণ

একটু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা বলি?

আমার ঘরের দেওয়ালে একখানা যোগেন চৌধুরীর আঁকা ফুলদানি আছে। অনলাইন নীলাম থেকে বেশ সস্তায় কেনা। ছবির যে দাম আন্দাজ করা হয়েছিলো, তার এক-চতুর্থাংশ দামে ছবিটা পেয়েছিলাম। অনলাইন নো-রিজার্ভ নীলামে, মাঝেমধ্যে এমন বরাতজোর হয়।

তা ছবি যেদিন বাড়িতে এলো, একটু নিরাশ হলাম। একখানা ব্রাউনপেপারের ওপর চারকোলে আঁকা ছবি। একথা জেনেই কিনেছিলাম, যে, এ ছবি যোগেনবাবুর জীবনের সেরা একহাজার ছবির তালিকায় কোনোদিন আসবে না। তবুও, এতো সাধারণ হবে, তেমনও আশঙ্কা করিনি।
এমনিতেই যোগেনবাবু হিসেবী মানুষ, দামী ছবি বাদ দিয়ে পুরো নাম সই করেন না। এইটাতে তো সংক্ষিপ্ত সই ‘'যো”, সাথে বছরটুকুও জোড়েন নি। ব্রাউনপেপারের খয়েরির ওপর চারকোলের আঁচড়টিও বড়ো ম্লান মনে হলো।



প্রসঙ্গত, আমার কাছে শিল্পী হিসেবে যোগেন চৌধুরী প্রায় ঈশ্বরতুল্য। ছবি দেখার সময়ে দর্শকের কল্পনার গুরুত্ব বা যুক্তি বিষয়েই এই লেখা। সেই দর্শক-কল্পনার স্পেসটিকে যোগেনবাবুর মতো করে কজন ব্যবহার করেছেন, সংখ্যাটা হাতে গুণে বলা যায়। মূলত রেখার ম্যাজিক, ন্যূনতম রঙের ব্যবহার - বাকিটুকু ভরে নেবেন দর্শক - শিল্পী হিসেবে তাঁর আত্মবিশ্বাস বা দর্শকের উপর তাঁর আস্থা, নাকি দর্শকের কাছে তাঁর প্রত্যাশা প্রায় আকাশচুম্বী।

যাক সে কথা, ছবিতে ফিরি।

ছবিটি সাধারণ এক ফ্রেমে বাঁধিয়ে দেওয়ালে ঝোলালাম। প্রত্যেকদিন সকাল-সন্ধ্যে চা খাওয়ার সময় ছবিটার দিকে চোখ পড়তে থাকলো। আর, ছবিটাও বদলে যেতে থাকলো। প্রথম দর্শনে যা মনে হয়েছিলো একান্ত সাদামাঠা, পৌনপুনিক দর্শনে তা-ই ফুটে উঠতে থাকলো অসামান্য হয়ে। লক্ষ্য করতে পারলাম, এই ছবির পক্ষে খয়েরী ব্যাকগ্রাউন্ড কেমন অব্যর্থ। কালো চারকোলের রেখার উপরে জায়গায় জায়গায় সাদা চারকোল বুলিয়ে, রেখাটির মধ্যেই যোগেনবাবু এনেছেন আলোআঁধারি-অনিশ্চয়তার আভাস, যা একেবারেই আশ্চর্য।

মধ্যবিত্ত জীবনে সাধ আর সাধ্য তাল মিলিয়ে চলে না। ভ্যান গগের সূর্যমুখী দেখার সুযোগ হয়নি (ভারমিয়ের-ও না)। যাঁরা দেখেছেন, তাঁদেরকে বুকভরা হিংসে বাদ দিয়ে কিছুই জানানোর নেই।

কিন্তু, আমার সামনে, যোগেনবাবুর চারকোল ড্রয়িং প্রতি মুহূর্তে রঙীন হয়ে উঠলো। দুপাশে দুই নুইয়ে পড়া পাতা। আরেকটি ফুল ও পাতাও অস্তাচলের পথে। মাঝখানে একখানা উদ্ধত ফুল, তার পাশ দিয়ে ছাপিয়ে যাওয়া সতেজ সজীব একখানা পাতা। কী আশ্চর্য সবুজ!! ক্লান্ত শেষবেলার পাতাসমূহের মাঝে এই তারুণ্য, আমাকে উজ্জীবিত করে নাকি ঈর্ষানুভব হয়, নিজেই বুঝতে পারি না।

বাস্তবিক, ধন্দ কাটে না। সবই কি কষ্টকল্পনা? নিজের মনের প্রোজেকশন, একখানা সাধারণ, অতিসাধারণ ছবির ওপরে?

নাকি, এই-ই ম্যাজিক? ছবির ম্যাজিক!!

নাকি, এসব-ই সেই জাদুকাঠির অস্তিত্বের প্রমাণ - যে জাদুকাঠি থাকতে পারে একমাত্র এক মাস্টার শিল্পীর হাতেই - যার ছোঁয়ায়, এমনকি শিল্পীর নেহাত আনমনে আঁকা চটজলদি ছবির মধ্যেও স্বপ্নের গুঁড়ো ভরা হয়ে যায়, হয়তো শিল্পীর অচেতনেই?



589 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

কোন বিভাগের লেখাঃ বুলবুলভাজা 
শেয়ার করুন


Avatar: প্রভাস চন্দ্র রায়

Re: ছবি দেখা - দর্শকের কল্পনা – বারবার দেখার অনুভূতি – যোগেন চৌধুরীর (অ)সাধারণ ফুলদানি

বিষাণ বসুর প্রতিটি লেখাই, কেবল লেখার গুণে নয়, বিষয়ের গভীরতার জন্য অসম্ভব মনযোগ দাবি করে। এ লেখাটাও বার দুয়েক পড়ার পর বুঝলাম কোথাও একটা ভুল হচ্ছে। লেখার সঙ্গে ছবিগুলো না দেখলে বিষয়টা ঠিক মাথায় ঢুকবে না। অতএব ঘরে ফিরে প‍্যাডের বড় পর্দায় পড়তে বসলাম।
আ গার্ল অ্যাস্লিপ, ছবিটি দেখতে দেখতে মনে হলো, তাইতো, কৃষ্ণকলি যেমনটি বলেছেন, ছবিটিতে সেটা অত্যন্ত স্পষ্ট।
ভারমিয়েরের দ্বিতীয় ছবিটি, দ‍্য লিটল স্ট্রীট দেখতে গিয়ে শুচিস্মিতার মতো আমারও অনুভূতি একই রকম।
এই ধরণের ছবিগুলো আমাকে ভীষণ স্মৃতিকাতর করে তোলে। তার কারণ হয়তো, আমার ছেলবেলার দিনগুলো। পাহাড়ের কোল ঘেঁষে ছোট্ট শহর, অধিকাংশ বাড়িই কাঠের, উত্তরে মহানন্দার লোহার সেতু পার হয়ে ফাঁকা বড় রাস্তা ছেড়ে, দুপাশে পাম গাছের সারির শেষে, ছবির মতো নির্জন এক জংশন স্টেশন। । আরও উত্তরে মাথায় বরফের মুকুট পড়ে দাঁড়িয়ে আছে নীল পাহাড়। শীতের উঠোনে শুকনো পাতার ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা।
ঠিক একই কারণে ক্লদ মোনে বা অন‍্যান‍্য ইম্প্রেসনিষ্টদের আঁকা আবছায়া ছবিগুলো ভীষণ আকর্ষণ করে। ঠিক ছেলবেলার দৃশ‍্যগুলো স্বপ্নের মতো, পুরোনো ছবির মতো পরপর ধরা দেয়।
আবার এডোয়ার্ড মুঞ্চের দ‍্য স্ক্রীম, একজন মানুষের ভয়কাতর মুখ, পিছনে নির্লিপ্ত দুজন মানুষের আবছায়া চেহারা, সেতুর নীচে বহমান জলে অথবা পিছনের বদ্ধ জলাশয়ে, আকাশের রক্ত লালের প্রতিবিম্বের বদলে অন্য রংয়ের ব‍্যবহার। সমস্তটা যেন সমকালের প্রতিচ্ছবি।
পল ক্লীর যে কথাটি বিষাণ লিখেছেন, সেটা প্রাথমিক ভাবে আমার ক্ষেত্রেও খাটে। মূলত আমিও রিয়ালিস্টিক ছবিই দেখতে পছন্দ করতাম। ছবি দেখতে দেখতে এখন পছন্দের রকমফের হয়েছে। পেইন্টিং আর ফটোগ্রাফ এক নয়,সেটা বুঝতে শিখেছি। আবার ছবি দেখে কিছু কল্পনা করতে অপারগ হলে, তখন মনে মনে নিজের শিক্ষার সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে নিশ্চিত হই। অ্যাঞ্জেলাস নোভাস নিয়ে বলতে গিয়ে, ওয়াল্টার বেঞ্জামিন, পরবর্তীতে যা বলেছেন,ছবিটি বারংবার দেখেও তার সামান্য অংশই বুঝতে পারলাম।
মানতে বাধ‍্য, উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত বারবার শুনতে শুনতে গানের সুর না বুঝলেও ভালো লাগে। আজন্ম রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, অতুলপ্রসাদ বা ডিএলরায়ের গানে অভ‍্যস্থ কানে, গানের প্রাণ আপনি ধরা পরে।
ছবি দেখার জন্য চেয়ারের ব‍্যবস্থা থাক বা না থাক, ছবি ভালোবাসতে গেলে বুঝতে হবে এবং বুঝতে গেলে দেখতে হবে, একবার দুবার নয়, বারবার।
যোগেন চৌধুরীর সাদাকালোয় সামান্য কিছু কাজ দেখেছি।
বিষাণ বসুকে অসংখ্য ধন্যবাদ এমন চমৎকার বাংলায়, পরপর, এমন অসাধারণ সব লেখার জন্য। অসীম আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষায় থাকবো পরবর্তী লেখার জন্য। আকাঙ্ক্ষা কিন্তু বেড়েই চলেছে।
Avatar: শঙ্খ

Re: ছবি দেখা - দর্শকের কল্পনা – বারবার দেখার অনুভূতি – যোগেন চৌধুরীর (অ)সাধারণ ফুলদানি

ভালো লাগছে ছবি নিয়ে বিষাণ বাবুর লেখাগুলি।
Avatar: i

Re: ছবি দেখা - দর্শকের কল্পনা – বারবার দেখার অনুভূতি – যোগেন চৌধুরীর (অ)সাধারণ ফুলদানি

বিষাণ বসুর লেখা প্রতিবারই মন দিয়ে পড়ি। এত যত্নে লেখা। এবারও খুবই ভালো লাগল । কৃষ্ণকলির লেখা, শুচিস্মিতার বক্তব্য চমৎকার ব্যবহার করেছেন ধরতাই হিসেবে।

কানদিনস্কির যে উক্তি- কমিউনিকেট করা-শুধু গান কেন ( একাকী গায়কের নহে তো গান/ মিলিতে হবে দুইজনে), যে কোনো শিল্প সাহিত্যই কি কমিউনিকেট করা নয়? এই কমিউনিকেট করাটা দুই দিক দিয়েই হতে হয়। দর্শক বা পাঠক কিন্তু শিল্পী বা সাহিত্যিকের দাস নন। স্রষ্টা যা বলবেন সেটাই ঠিক, সেভাবেই পড়তে হবে বা ভাবতে হবে বা ছবি দেখতে হবে -তা তো নয়- যেমন ধরুন, ছবির একটি নাম দেওয়া আছে -এবার দর্শক সেই নামের অর্থের অধীন হয়ে পড়লেন-ছবিটাকে নামের অর্থ দিয়ে বুঝতে চাইলেন-এবং সে ছবির উৎস সন্ধানে চলে গেলেন মনে মনে -মানে শিল্পী কি ভেবেছেন সৃষ্টির সময়ে ইত্যাদি- এই ব্যাপারটা প্রকৃত কমিউনিকেশনে সম্ভবত একটা বাধা।
পার্বতী মুখোপাধ্যায় কে এর আগেও কোট করেছি। যদি বিরক্ত না হ'ন, তো এই ছবি দেখার ব্যাপারে উনি যা বলছেন, একটু বলি? মানে টুকি? আসলে, ওঁর এই বক্তব্য লেখালেখির ব্যাপারে আমার ভাবনার সঙ্গে খুব মেলে। টুকছি..
...'যা আছে, তার সঙ্গে আমার আমিত্ব যোগ করে মানে করব। যেমন আয়রন ইজ হেভি-এটা হল অ্যানালিটিকাল, কিন্তু আয়রন ইজ রেড বললে কালই অন্য একজন এসে বলবে আয়রন ইজ ইয়েলো, অর এতা যত বলবে, ছবিটা তত রূপ পাবে। একটা ছবি অসংখ্য ছবি হয়ে যাবে... অ্যানালিটিকাল বিশ্লেষণ, রিভার্স প্রসেসে যাওয়া, ছবির উৎসে যাওয়া, অ্যারিস্টটলিয়ান পদ্ধতিতে অনুসন্ধান-তার সামাজিক ও ঐতিহাসিক মূল্য আছে, ব্যক্তিগত মূল্যও কারো কারো কাছে আছে। কিন্তু শিল্প হয় কি, নিজেকে উত্তীর্ণ করে যায়, নিজেকে ছাপিয়ে যায়...ছবি যখন নিজের দুকূল ছাপিয়ে যায়, নদী যখন নিজের দুকূল ছাপিয়ে যায়, বান নিয়ে আসে-তখন সে আর নদী থাকে না। তখন যে ডায়ালগিং টা হয়-এটা তাকে অন্য সৃষ্টির দিকে ঠেলে দেয়।'
আরো সব কথা আছে এদিক ওদিক। এইটুকুই থাক।

আপনি যা লিখেছেন যথার্থ লিখেছেন। আমি তার কোনো বিরোধিতা করছি, ভাববেন না যেন। আপনিও লিখেছেন অন্য অনুভবের কথা, নিজের কল্পনাকে দূরে না ঠেলার কথা। তবু, যেহেতু ছবি দেখার সময়ে দর্শকের কল্পনার গুরুত্ব বিষয়েই এই লেখা, দর্শকের স্বাধীনতার ব্যাপারটা পার্বতীবাবুর ভাষা ধার করে একটু হাইলাইট করলাম এই আর কি।

নমস্কার ও ধন্যবাদ জানবেন।
Avatar: রাম শঙ্কর ভট্টাচার্য

Re: ছবি দেখা - দর্শকের কল্পনা – বারবার দেখার অনুভূতি – যোগেন চৌধুরীর (অ)সাধারণ ফুলদানি

বহুদিন পর গভীর একটি বিষয় নিয়ে ঝকঝকে এবং ঋজু লেখা পড়লাম।
Avatar: Bishan Basu

Re: ছবি দেখা - দর্শকের কল্পনা – বারবার দেখার অনুভূতি – যোগেন চৌধুরীর (অ)সাধারণ ফুলদানি

সবাইকে অনেক ধন্যবাদ, লেখাটা পড়ার জন্যে, মতামত দেওয়ার জন্যে। গুরুচন্ডা৯-তে লেখার এইটাই সুবিধে যে বেশকিছু সিরিয়াস পাঠক রয়েছেন, এবং তাঁদের মন্তব্য নতুন করে শেখায়, আর ভাবায়।

বিরক্ত হওয়ার বা কিছু মনে করার প্রশ্নই নেই, কেননা শিল্পীর শিল্পবোধ আর দর্শকের অনুভব মিলেই পুরো ব্যাপারটা। বাগীশ্বরী শিল্প প্রবন্ধাবলীতে অবনীন্দ্রনাথও তেমনই বলেছেন। শিল্পীর সৃজন এবং শিল্পরসিকের রসাস্বাদন, দুইই সাধনা।

পল ক্লী-র কথাও তার থেকে দূরে নয়। একই কাজ করার সময় শিল্পী বারবার ঘুরেফিরে আসেন, দর্শকও তাই। কিন্তু, সমস্যা এইটাই, দর্শকের কাছে ছবিটি বা তার কপি না থাকলে বারবার ফিরে আসার সুযোগ থাকে না।

শিল্পী কী ভেবে এঁকেছেন, দর্শকের কাছে তা বিচার্য হতেও পারে, না-ও পারে। অন্তত, সেই বিচার তো চূড়ান্ত কখনোই নয়, তাই না? সেই বিচার চূড়ান্ত হলে কয়েকশো বছর আগের ক্লাসিকাল ইউরোপীয় ছবি বা আমাদের অজন্তা গুহাচিত্র তো শুধুই ঐতিহাসিক দলিল হয়ে রয়ে যেতো, জলজ্যান্ত শিল্প হিসেবে আমাদের সামনে আসতে পারতো না।

অ্যাঞ্জেলাস নোভাস নিয়েও বেঞ্জামিনের যে কথা, সেই ভাননা পল ক্লী ভেবেছিলেন কিনা, কে জানে!!

বাংলা ভাষায় ছবি নিয়ে লেখালিখি ইদানিং খুব কম। আগে বেশ কিছু লেখা হয়েছে। কিন্তু, বইগুলো পাবো কোত্থেকে? খুব মুশকিল এইটা। পার্বতীবাবুর বই কোথায় পেতে পারি, বলবেন একটু? দেশে সন্দীপবাবুও, শুনেছি, একসময় চমৎকার লিখতেন। সে-ও কি পাওয়া যায়? জানাবেন কেউ? ছবি নিয়ে বাংলায় যেসব বই বাজারে এখন পাওয়া যায়, যেমন অশোক মিত্রের বইগুলো, সেইগুলোর মধ্যে পান্ডিত্য থাকলেও, সেইসব পড়ে ছবি ভালোবাসা কঠিন হয়ে যায়।

Avatar: Bishan Basu

Re: ছবি দেখা - দর্শকের কল্পনা – বারবার দেখার অনুভূতি – যোগেন চৌধুরীর (অ)সাধারণ ফুলদানি

সবাইকে অনেক ধন্যবাদ, লেখাটা পড়ার জন্যে, মতামত দেওয়ার জন্যে। গুরুচন্ডা৯-তে লেখার এইটাই সুবিধে যে বেশকিছু সিরিয়াস পাঠক রয়েছেন, এবং তাঁদের মন্তব্য নতুন করে শেখায়, আর ভাবায়।

বিরক্ত হওয়ার বা কিছু মনে করার প্রশ্নই নেই, কেননা শিল্পীর শিল্পবোধ আর দর্শকের অনুভব মিলেই পুরো ব্যাপারটা। বাগীশ্বরী শিল্প প্রবন্ধাবলীতে অবনীন্দ্রনাথও তেমনই বলেছেন। শিল্পীর সৃজন এবং শিল্পরসিকের রসাস্বাদন, দুইই সাধনা।

পল ক্লী-র কথাও তার থেকে দূরে নয়। একই কাজ করার সময় শিল্পী বারবার ঘুরেফিরে আসেন, দর্শকও তাই। কিন্তু, সমস্যা এইটাই, দর্শকের কাছে ছবিটি বা তার কপি না থাকলে বারবার ফিরে আসার সুযোগ থাকে না।

শিল্পী কী ভেবে এঁকেছেন, দর্শকের কাছে তা বিচার্য হতেও পারে, না-ও পারে। অন্তত, সেই বিচার তো চূড়ান্ত কখনোই নয়, তাই না? সেই বিচার চূড়ান্ত হলে কয়েকশো বছর আগের ক্লাসিকাল ইউরোপীয় ছবি বা আমাদের অজন্তা গুহাচিত্র তো শুধুই ঐতিহাসিক দলিল হয়ে রয়ে যেতো, জলজ্যান্ত শিল্প হিসেবে আমাদের সামনে আসতে পারতো না।

অ্যাঞ্জেলাস নোভাস নিয়েও বেঞ্জামিনের যে কথা, সেই ভাননা পল ক্লী ভেবেছিলেন কিনা, কে জানে!!

বাংলা ভাষায় ছবি নিয়ে লেখালিখি ইদানিং খুব কম। আগে বেশ কিছু লেখা হয়েছে। কিন্তু, বইগুলো পাবো কোত্থেকে? খুব মুশকিল এইটা। পার্বতীবাবুর বই কোথায় পেতে পারি, বলবেন একটু? দেশে সন্দীপবাবুও, শুনেছি, একসময় চমৎকার লিখতেন। সে-ও কি পাওয়া যায়? জানাবেন কেউ? ছবি নিয়ে বাংলায় যেসব বই বাজারে এখন পাওয়া যায়, যেমন অশোক মিত্রের বইগুলো, সেইগুলোর মধ্যে পান্ডিত্য থাকলেও, সেইসব পড়ে ছবি ভালোবাসা কঠিন হয়ে যায়।

Avatar: i

Re: ছবি দেখা - দর্শকের কল্পনা – বারবার দেখার অনুভূতি – যোগেন চৌধুরীর (অ)সাধারণ ফুলদানি

বিষাণবাবু,
আমাকে সিরিয়াস পাঠক ভাববেন না দয়াকরে। কিছু বিষয় আছে যাতে এক কালে আগ্রহ ছিল, হয়ত কিছু পড়েওছি শখ ক'রে; ছবি প্রদর্শনী, ভাস্কর্য দেখি নি এমন নয়, দেশ বা খবরের কাগজে ছবির প্রদর্শনীর সমালোচনা নিয়ম করে এখনও পড়ি-কিন্তু সিরিয়াস চর্চা করি নি। আপনার এক একটা লেখা কিছু মনে করায় তখন ঘাপটি মোড ভেঙে বলে যাই।
পার্বতীবাবুর বইটা হ'ল ওঁর সঙ্গে কিছু কথোপকথন। বইটার নাম-পার্বতীর কথা; রাজেশ দে; নান্দীমুখ সংসদ;২০০৯

সন্দীপ সরকারের ইংরিজি বই আছে যতদূর জানি। বাংলা বই ও আছে -একটি সম্ভবতঃ প্রতিক্ষণ থেকে বেরিয়েছিল-নৈরাজ্যের নীলিমা। বস্তুত এই নামে সন্দীপ সরকারের একটি লেখা ছিল দেশে।
আমার কাছে সন্দীপ সরকারের কোনো বই নেই এই মুহূর্তে। তাই সম্পূর্ণ ভুলভাল বলছি এমনও হতে পারে। ডিডি বা অন্য কেউ নিশ্চয়ই জানাতে পারবেন।
প্রতিক্ষণ থেকে চিত্রকলা নিয়ে অনেক বই বেরিয়েছে জানি। আনন্দ থেকেও।
Avatar: Abhirup Ganguly

Re: ছবি দেখা - দর্শকের কল্পনা – বারবার দেখার অনুভূতি – যোগেন চৌধুরীর (অ)সাধারণ ফুলদানি

Vermier এর little street ছবিটি একটি বইতে দেখে ভীষণ রকম উত্তর কলকাতা মনে হয়..

যে online no reserve auction এর কথা লিখেছেন সেটা কোন site এ হয়?
Avatar: Bishan Basu

Re: ছবি দেখা - দর্শকের কল্পনা – বারবার দেখার অনুভূতি – যোগেন চৌধুরীর (অ)সাধারণ ফুলদানি

প্রতিক্ষণ থেকে যেগুলো বেরিয়েছিলো, তার আদ্ধেক আর পাওয়া যায় না। মৃণালবাবুর বইয়েরই বেশীরভাগই আর পাওয়া যায় না বাজারে।

আনন্দ থেকে অশোক মিত্রের বইগুলো বা গণেশ পাইনের বইটি বাদ দিয়ে আর কোনো বই আছে কি??

কেউ জানাবেন একটু?
Avatar: Bishan Basu

Re: ছবি দেখা - দর্শকের কল্পনা – বারবার দেখার অনুভূতি – যোগেন চৌধুরীর (অ)সাধারণ ফুলদানি

অনলাইন No-Reserve auction এর মধ্যে দুটি জনপ্রিয় সাইট, StoryLtd আর Astaguru.com

তাছাড়া সস্তায় ছবি কেনার জন্যে সিমা গ্যালারির বার্ষিক আর্ট মেলা তো রয়েছেই। এবছর সাধ্যের মধ্যেই রবীন মন্ডল বা লালুপ্রসাদ সাউ-এর রীতিমতো ভালো কাজ ছিলো। নতুনরা তো ছিলেনই।

সম্প্রতি মায়া আর্ট স্পেসে যোগেন চৌধুরীর যে সোলো এক্সিবিশন হয়ে গেলো, তাইতে ছবির দাম ছিলো আঠেরো হাজার থেকে শুরু করে চল্লিশ হাজার পর্যন্ত। এর মধ্যে কিছু কাজ ছিলো সত্যিই তাকলাগানো।
Avatar: অভিরূপ

Re: ছবি দেখা - দর্শকের কল্পনা – বারবার দেখার অনুভূতি – যোগেন চৌধুরীর (অ)সাধারণ ফুলদানি

ধন্যবাদ বিষাণ বাবু


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন