বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

মরণখোর

মাহবুব লীলেন

সুন্দরবনের শীত ভোরে গলায়-পিঠে ক্যামেরা ঝুলিয়ে কাদা ভেঙে হাঁটছে ফটোগ্রাফার দলটি। কারো পায়ে বুট- কারো স্যান্ডেল। সবাই হাঁটছে জুতায়-পায়ে কাদাঠাণ্ডার উহুআহা অনুভূতি নিয়ে। দলের সামনে নির্লিপ্ত বনপ্রহরী রতন আর পেছনে তার তরুণ সহকর্মী মাজেদ। বেতনের বাইরে ভাতা আর বখশিশের আকর্ষণ ছাড়া এই বন তাদের কাছে পুরোটাই বিরক্তিকর। তারা হাঁটছে সুন্দরবনের যে কেনো গার্ডের মতো বারবার বনের বেশি গভীরে না যাবার সতর্কতা জানিয়ে। অক্লান্তভাবে তারা জানাতে জানাতে যাচ্ছে বনের গভীরেও বন ছাড়া কিছু নেই। একই রকম কাদা- একই রকম গাছ। কিন্তু বন যত গভীর ভয় তত বেশি। তাই বেশি ভেতরে যাবার কোনো দরকার নেই...

সাধারণ সতর্কীকরণের পরে সুন্দরবনের যে কোনো বনকর্মীর মতো মাজেদ বেছে নেয় ভয়ের গল্প। চোখেমুখে ভয় জড়ো করে জানায়- গতকাল এখানে এসে বাঘ শিকার ধরে নিয়ে গেছে…

কিচ্ছু বলে না কেউ। কথা কানেও তোলে না কেউ। তরুণ বনকর্মী মাজেদ এবার জনে জনে গিয়ে গতকালের বাঘের শিকার কাহিনী শোনায়। ফটোগ্রাফার দলের সদস্য নয়ন সেই কাহিনী শুনে হাসে- গতকাল যদি বাঘ এখানে শিকার ধরে থাকে তবে আগামী চার দিন এই বনে সবাই নিরাপদ…

বনকর্মী মাজেদ একটু হকচকিয়ে গলায় উঁচায়- আপনি কীভাবে জানেন?
- জানি। কারণ বাঘ মানুষের মতো নয় যে ঘরে খাবার রেখে আবার খাবার কাড়তে বেরোবে। সুন্দরবনে একটা বাঘ এক হরিণ পাঁচ দিন ধরে খায়। সুতরাং বাঘ এইখানে গতকাল শিকার ধরলে আপনার রাইফেল আগামী চারদিন শুয়োর খেদানো ছাড়া আর কোনো কাজেই লাগবে না...

এরকম উত্তরে তরুণ বনকর্মী প্রবীণ সহকর্মীর সামনে গিয়ে বিড়বিড় করে- সবকিছু তারা জানে। আমরা এখানে আছি বাল ছিঁড়তে…

তরুণ বনকর্মীটি পিছিয়ে আবার নিজের জায়গায় আসতে আসতে অন্য কৌশল ধরে। নাকে মুখে আঙুল দিয়ে মাটিতে বাঘের পায়ের ছাপ দেখিয়ে ঘোষণা করে- একটু আগে এইখান দিয়ে বাঘ হেঁটে গেছে। ব্যাস। খটাখট ছবি উঠে বাঘের ছাপের। কেউ কেউ তার কথা গিলেও ফেলে- এই বুঝি এলো বাঘ...

কিন্তু ছবি তোলা হয়ে গেলে ফটোগ্রাফার নয়ন জুতা খুলে পায়ের গোড়ালি দিয়ে কাদায় একটা আধা গর্ত করে সামনের দিকে আঙুল চেপে আরো দুই তিনটা দাগ বসিয়ে সবাইকে দেখায়- এই দেখো। বাঘের পায়ের ছাপ কিন্তু বানানো যায়…

কেউ হাসে- কেউ সাহস পায়- কেউ ছবি তোলে আর বনকর্মীরা হতাশ হয়ে হাঁটে। বিড়বিড় করতে করতে মাজেদ আবার নয়নের সামনে পড়ে গেলে সে আরেকটু আঙুল ফোঁটায়- আপনারা ফিরে যান। এই বনে বাঘ নেই…

অতক্ষণ চুপচাপ থাকা প্রবীণ বনকর্মী রতন সরকার এবার সত্যি সত্যি আতঙ্ক নিয়ে সকলের সামনে দাঁড়িয়ে অনুনয় করে- আপনারা হরিণ দেখেন। শুয়োর দেখেন। বাঘের পায়ের ছাপ দেখেন। কিন্তু এই বনে বাঘ নেই এই কথা দয়া করে মুখেও আনবেন না কেউ...

- যতদিন তুমি বাঘকে ভয় পাবে ঠিক ততদিনই তুমি সুন্দরবনে বেঁচে থাকবে। আর যাই করো বাঘের সাথে কোনো মাতব্বরি না…

কথাটা বাঘশিকারি পচাব্দী গাজীর। এই দলের গাইড গাজী সদরুল যখন একেবারে শিশু এবং বনের দিকে একবারও পা দেয়নি তখন সুন্দরবনের কাহিনী বলতে গিয়ে কথাটা পচাব্দী গাজী তাকে বলেছিলেন। গাজী সদরুল ফটোগ্রাফার দলকে কথাটা স্মরণ করিয়ে দেয়। কেউ কেউ কথাটা শোনে। কেউ শোনে না। কেউ পাশ কাটিয়ে যায় আর কেউ উৎসাহী হয়ে জানতে চায় এর কারণ…

সুন্দরবনের মানুষ গাজী সদরুল ঝিমাতে ঝিমাতে হাঁটে- দুনিয়ায় এত কষ্টে অন্য কোনো বাঘকে বাঁচতে হয় না। এইভাবে নিত্য জোয়ার ভাঁটা প্লাবন আর জলোচ্ছ্বাসের সাথে তাল মিলিয়ে কোনো বাঘকে থাকতে হয় না। এই বাঘ দিনে একবেলা কুমির হয়ে গলা পর্যন্ত পানিতে ডুবিয়ে কাটায় তো আরেক বেলা কাটায় বানর হয়ে গাছে নাক ভাসিয়ে…

ফটোগ্রাফার দলটা হাঁটে। তাদের সাথে সাথে হাঁটে গাজী সদরুল- এক বনে দুই বাঘ না থাকার কথা সবাই জানে কিন্তু সুন্দরবনে বাঘেরা মাঝে মাঝেই দল বেঁধে হাঁটে। একাধিক পুরুষ কিংবা একাধিক নারী বাঘও এখানে একসাথে দেখা যায়। খাবার রেখেও এই বনের বাঘেরা মাঝে মাঝে দুঃসময়ের জন্য খাবার সংগ্রহ করে...

গাজী সদরুলের কথায় নয়ন হেসে উঠলে সে গলা চড়ায়- এই বাঘ টেলিভিশনের বাঘ না দাদা। এই বাঘ সুন্দরবনের বাঘ। এরে সব সময় ভয় করা লাগে...

সামনে আগাতে থাকে সবাই। ছবি তুলতে তুলতে আগায় ফটোগ্রাফারের দল। ঝিমাতে ঝিমাতে আগায় গাজী সদরুল। বিরক্ত হতে হতে আগায় বনকর্মী দুজন। কিন্তু সকলেই হাঁটে। হাঁটতে হাঁটতে বনকর্মীরা বাঘের পায়ের ছাপ দেখায়। গাজী সদরুল হরিণ টেনে নেবার চিহ্ন দেখায়- শঙ্খচূড় সাপ দেখায়। কিন্তু ফটোগ্রাফার নয়নের চোখে পড়ে আব্দুল ওহাবের খালি পায়ের ছাপ...

বাঘের পায়ের কাছে আব্দুল ওহাবের খালি পায়ের ছাপ। হরিণের পায়ের কাছে আব্দুল ওহাবের ছাপ। সামনে পেছনে গার্ড নিয়ে ফটোগ্রাফার দলের ভিন্ন ভিন্ন জুতার ছাপ। কাদার উপর অনভ্যস্ত পায়ের এলোমেলো ছাপগুলো ফটোগ্রাফারদের। কিন্তু কাদার উপর বাঘ কিংবা হরিণের মতো মানুষের যে অভ্যস্ত ছাপ নগ্ন-সটান-আত্মবিশ্বাসী- একটানা এবং মোড় ঘোরার আগে পর্যন্ত একই সরল রেখায় ধাবমান; ওই ছাপ আব্দুল ওহাবের পায়ের...

ছবি তোলা বাদ দিয়ে ঘোরের মধ্যে পড়ে যায় নয়ন। যেখানে বাঘ এসে কাল হরিণ নিয়ে গেছে। যেখানে গাছের গোড়ায় শঙ্খচূড়। সেখানে খালি পায়ে একা একা আব্দুল ওহাব কোথায় গেছে?

ফটোগ্রাফাররা কুয়াশা কাটার অপেক্ষা করে। ফটোগ্রাফাররা সূর্য আরেকটু কড়া হবার অপেক্ষা করে। ফটোগ্রাফাররা কাজের উপযোগী ছবির জন্য আরেকটু আলোর অপেক্ষা করে। অপেক্ষা করতে করতে টুকটাক অদরকারি ছবি তোলে সবাই; গাছের সঙ্গে মানুষ- কাদার ভেতরে মানুষ- বনের মধ্যে স্মৃতি। শীতে- কুয়াশায়- কাদায় সকলের দুরবস্থা আর ফটোগ্রাফারদের কঠিন পরিশ্রমের ছবি উঠতে উঠতে কুয়াশা কেটে যায়। ডালপালার ফাঁক দিয়ে সূর্য যথেষ্ট মাত্রায় কড়া হয়ে আসে…

কেউ কেউ প্রায় ভিডিও করে বসে প্রত্যেকটা ফ্রেম। একেক ক্লিকে দশ বারোটা ছবি। অন্তত একটা হলেও শার্প ফোকাস তো পাওয়া যাবে। কেউ সাবজেক্টের ডানে বামে উপরে নিচে নড়েচড়ে ফ্রেম ঠিক করতে না পেরে যেন গাছকেই বলে বসে- বাবা একটু ডান দিকে সরলে আলোটা ভালো করে পাবি। কেউ পাখির ছবি তোলার জন্য পাখির কাছে যেতে যেতে পাখিটাই উড়িয়ে দেয়। কেউ সতর্কভাবে খেয়াল রাখে অন্যদের আবিষ্কার করা পজিশন আর ফ্রেমে; তারপর সেখানে গিয়ে মারে কয়েকটা ক্লিক। কেউ কনফিউজড। কারো দৃষ্টি সুন্দরবনের ক্ষুদ্রপ্রাণ; ক্ষুদ্র কীট- এক আংটাওয়ালা ক্ষুদ্র লাল কাঁকড়া- লাফানো মাছ- শামুক। কেউ বারবার এর তার মনিটরে চোখ দিয়ে মিলিয়ে নেয় অন্যের ছবির সাথে নিজের ছবির ভালোমন্দত্ব। কারো ক্যামেরা বিশাল বনকে ঝাপসা রেখে শুধু তুলে আনে কয়েক ইঞ্চি দৈর্ঘ্য প্রস্থের একেকটা টুকরা...

শুধু নয়নের কোনো তাড়াহুড়া নেই। ফ্রেম খোঁজে না। সাবজেক্ট খোঁজে না। ক্যামেরা গলায় ঝুলিয়ে সে আশপাশে তাকায়। দেখে। হাঁটে। তার চোখে ধরা পড়ে গাছের পাতার ফাঁকে বসে থাকা ছোট পাখি। তার চোখে ধরা পড়ে দূরে কেওড়া গাছের নিচে হরিণের নড়াচড়া। তার চোখে ধরা পড়ে কাদার মধ্যে মিশে থাকা থাবা খাওয়া হরিণের রক্ত। ক্যামেরা গলায় ঝুলিয়ে নয়ন শুধু দেখে আর হাঁটে আর কী যেন খোঁজে...

হাঁটতে হাঁটতে সে গার্ডদের চোখ এড়িয়ে বনের ভেতরে গিয়ে আবিষ্কার করে ফেলে একটা গ্রাম্য বাড়ি আর গ্রামের রাস্তা। একেবারে সুনসান একটা বাড়ি। একটু নুয়ে গাছের গোড়ার ফাঁকে চোখ দিলে বহু দূরের বাড়িটার ভিটে দেখা যায়। মনে হয় যেন বাড়ির ওইপাশে বাঁশঝাড় আর ডানপাশে পুকুর। নয়ন হাঁটতে থাকে সেই বাড়ির মতো বনের দিকে। এই তো এই যে বাঁক। এ তো নয়নের গ্রামেরই সেই রাস্তা। এই রাস্তা দিয়ে হাটুরেরা গ্রাম থেকে হাটে যায় আর হাট থেকে সওদা নিয়ে গ্রামে ফেরে। সেই রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে দাঁড়িয়ে পড়ে নয়ন- এটা সুন্দরবন। এই রাস্তায় সওদা নিয়ে বাড়ি ফেরার জন্য হাঁটার কথা নয় কারো...

দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সে রাস্তাটাকে দেখে। রাস্তাটা বনের ভেতরে কোথাও চলে গেছে। সে আবার গুটিগুটি পায়ে হাঁটতে শুরু করে। মাটিতে হরিণের ছাপ- কাঁকড়ার দাগ- বাঘের ছাপ আর সারা রাস্তা জুড়ে আব্দুল ওহাবের পায়ের চিহ্ন। আব্দুল ওহাব এদিকেও একা একা হেঁটে গেছে। হয়ত ওই গ্রামের রাস্তার মতো রাস্তা ধরে কোথাও গেছে। আব্দুল ওহাব কোথায় গেছে? কী আছে ওখানে?

আব্দুল ওহাবের পায়ের ছাপ দেখে দেখে নয়ন এগোতে থাকে। হাঁটতে হাঁটতে রাস্তা ছেড়ে পাশে চলে যাওয়া একটা পায়ের রেখা ধরে চোখ কুঁচকে সামনে তাকায়। কিছুদূর একটা কেওড়া গাছের গোড়া পর্যন্ত গিয়ে পায়ের ছাপগুলো আবার ফিরে এসে রাস্তায় উঠে অন্য দিকে চলে গেছে। কী করতে আব্দুল ওহাব ওই গাছ পর্যন্ত গিয়ে আবার ফিরে এসেছে? গাছ কাটতে গেলে তো গাছ থাকার কথা না এখানে। হরিণ ধরলে তো হরিণ টেনে নেয়ার চিহ্ন পাওয়া যেত। বাঘ মারলে কিংবা বাঘে মারলে দুজনেরই কোনো না কোনো ছাপ থাকত কাদায়। কিন্তু আব্দুল ওহাব কেন ওই গাছের গোড়ায় গেলো আর ফিরে এসে চলে গেলো অন্য কোথাও?

আব্দুল ওহাবের চিহ্নের পাশে বুটের আরেকটা চিহ্নরেখা তৈরি করে নয়ন গাছের গোড়ার দিকে আগায়। কী আছে ওখানে? বনের অত গভীরে গাছের গোড়ায় কী?

গাছের গোড়ায় দাঁড়িয়ে নয়ন চারপাশে তাকায়। চারপাশে অক্ষত শ্বাসমূল- লকলকে ঘাস- আইলায় ভাঙা গাছের পচা ডাল- গুঁড়িগুঁড়ি লাল কাঁকড়ার দাগ। কোনো ধস্তাধস্তির চিহ্ন নেই- কোনো কাটাকাটির চিহ্ন নেই। সুনসান কাদা। এর মধ্যে হঠাৎ ঘাসের ফাঁকে কাদার ভেতরে নয়ন পেয়ে যায় আব্দুল ওহাবের চিহ্ন। একটা ছোট্ট বাঁশের খাঁচা; ভেতরে কাঠিতে গাঁথা তিন ইঞ্চি লম্বা একটা মাছ আর মাছ খাবার লোভে খাঁচায় ঢুকে আটকে পড়া মাঝারি সাইজের চারটি কাঁকড়া...

সূর্য ওঠারও আগে। কিংবা আগের দিন সূর্য ডোবার আগে আব্দুল ওহাব একা একা এই বন চষে বেড়িয়েছে কাঁকড়ার ফাঁদ নিয়ে। বাঘের ছাপের পাশে পাশে পা ফেলে দূরে দূরে নিয়ে বসিয়েছে কাঁকড়ার ফাঁদ। আবারও হয়ত একটু পরে কিংবা বিকেলে সে আসবে কাঁকড়াগুলো নিতে। একেকটা ফাঁদে ধরা পড়বে তিনটা চারটা কিংবা দশটা কাঁকড়া। সারা বন থেকে কয়েক কেজি কাঁকড়া বস্তায় ভরে আবাও একা একা বাঘের-সাপের রাস্তা দিয়ে গিয়ে উঠবে নিজের নৌকায়...

নয়নের ভাবনা এই পর্যন্ত এসে থেমে যায়। সে বিড়বিড় করে- বাঘের সাপের রাস্তা দিয়ে গিয়ে উঠবে নিজের নৌকায়... কিংবা... কিংবা হয়ত নৌকায় উঠার আগেই সামনে এসে দাঁড়াবে বাঘ- চল ভাগিনা মামাবাড়ি যাই...

নয়ন একা একা হাসে। বনবিবি ছাড়া সুন্দরবনে সকলেই পুরুষ। এখানে সব বাঘ মামা। বাঘের সব থাবাই পুরুষালি মামার থাবা। বাঘেরাও সবাই পুরুষবাদী। মানুষখেকো নয়; এরা সবাই পুরুষখেকো বাঘ। এই বনের গভীরে কোনো নারীই মারতে কিংবা মরতে আসে না বলে বাঘেরা যাদের হাতে মরে আর যাদের মারে তারা সকলেই পুরুষ। সুন্দরবন মূলত এক পুরুষালি বন...

পায়ের ছাপ দেখে নয়নকে খুঁজতে খুঁজতে গাজী সদরুল তাকে আবিষ্কার করে কেওড়া গাছের গোড়ায়। খিস্তি খেউড় করতে করতে দুই বনকর্মীও এসে হাজির হয়। নয়ন গার্ডদের দিকে তাকিয়ে হাসে- বাহ। কী নিশ্চিন্ত মনে হচ্ছে নিজেকে এখন। আমাকে পাহারা দিচ্ছে ফরেস্টের দুই দুইজন সশস্ত্র গার্ড...

গাজী সদরুল খিটখিট করে উঠে- সবাই মরে আপনার টেনশনে আর আপনি করেন মস্করা?

নয়ন এইবার হো হো করে হাসে- মস্করা না সদরুল ভাই। সত্যি সত্যি বলছি বাঘ আমাদের কোনো ক্ষতি করবে না। কারণ তারা জানে আমরা সবাই প্রকৃতিবাদী এবং বাঘবাদী। আমরা চাই সারা সুন্দরবন আবার বাঘে বাঘে বাঘময় হয়ে যাক। একটা বাঘ মারলে আব্দুল ওহাবকে এখন যে পঞ্চাশ লাখ টাকা জরিমানা গুণেও সারাজীবন জেলের ঘানি টানতে হবে এই আইনের আমরা ঘোরতর সমর্থক…
- আব্দুল ওহাব কিডা?

নয়ন থমকে দাঁড়িয়ে যায়। হো হো করে হেসে উঠে আবার- আব্দুল ওহাব কেউ না। একটা ফালতু লোক...

গার্ডরা তাড়া দেয়। এটা বিপজ্জনক স্থান। যত দ্রুত এখান থেকে যাওয়া যায় ততই মঙ্গল। সামনে পেছনে গার্ড নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে গাজী সদরুল গজগজ করে- বাঘ মারলে পঞ্চাশ লাখ টাকা জরিমানা আর যাবজ্জীবন জেল শুনে আপনরা যেমন খুশি তেমনি আমরা সুন্দরবনের মানুষেরাও খুশি। কারণ এখন বাঘের থাবায় কেউ মারা গেলে তার বিধবা বৌ পাবে এক লক্ষ টাকা। জীবিত মানুষ যেখানে একসপ্তা কাঁকড়া ধরে হাজার টাকা বাঁচাতে পারে না সেখানে শুধু বাঘের একটা থাবা খেতে পারলেই তার দাম এক লাখ টাকা। হা হা হা...

-কাউকে বাঘে থাবা দিলে সেই প্রমাণ কি আপনি দেবেন?

নয়নের এই খোঁচায় গাজী সদরুল দাঁড়িয়ে যায়- কেন? আপনারা আছেন না? বাঘে সুন্দরবনের মানুষ খাচ্ছে সেই ছবি তুলে আপনারা সরকারের ঘরে পাঠাবেন। আর যদি নিতান্ত সেটা করা না যায় তবে তো আপনাদের প্রিয় সুন্দরবনের বাঘেরা আছেই। তাদেরকে সমন দিয়ে আদালতে দাঁড় করালেই তারা জবানবন্দি দেবে- মাননীয় আদালত আমি সুন্দরবনের কেওড়াশুটির বাঘ। আমি স্বীকারোক্তি দিচ্ছি যে স্বজ্ঞানে এবং আন্তর্জাতিক বাঘাধিকারে মরহুম আব্দুল ওহাব ভাগিনাকে ক্ষিদা নিবারণের উদ্দেশ্যে ভক্ষণ করিয়াছি; তাই আমার ক্ষতিগ্রস্ত ভাগিনাবধূকে আইন মোতাবেক এক লক্ষ টাকা প্রদান করার আদেশ দেওয়া হউক...
- আব্দুল ওহাব কেডা?

নয়নের এই প্রশ্নে গাজী সদরুল এবার থতমত খেয়ে যায়। তারপর হো হো করে হেসে উঠে- আব্দুল ওহাব কেউ না। আব্দুল ওহাব সুন্দরবনের এক ফালতু মানুষ...

  'সাকিন সুন্দরবন' গ্রন্থের গল্প।



255 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

কোন বিভাগের লেখাঃ মোচ্ছব  অপার বাংলা  গপ্পো  বুলবুলভাজা  উৎসব ইস্পেশাল ২০১৮ 
শেয়ার করুন


Avatar: Nahar Trina

Re: মরণখোর

প্রশ্নটা আমারও, আব্দুল ওহাব কেডা?
গল্প ভালো লেগেছে লীলেনদা।
Avatar: শঙ্খ

Re: মরণখোর

আব্দুল ওহাব সরকারকে চিনতে হলে এই গল্পটার প্রথম পর্ব বনমজুর থেকে শুরু করুন।
www.guruchandali.com/default/2016/04/14/1460604859168.html
আর পুরো বইটা পড়ে ফেললে তো কথাই নেই।
Avatar: প্রতিভা

Re: মরণখোর

সত্যি তো, আব্দুল ওয়াহাব কে ! শঙখএর দেওয়া লিংকটা পড়তেই হচ্ছে।


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন