বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

পুজোর কবিতা

তৃতীয় পর্ব

পুজোর কবিতা - প্রথম পর্ব | দ্বিতীয় পর্ব | তৃতীয় পর্ব


মঞ্চে প্রবিষ্ট অভিনেতার ওপর কবি তো আলো ফেললেন, সে আলো পাঠককে চিনে নিতে সাহায্যও করলো কী সেই অদম্য প্রকাশবাসনার উৎস, কী সে বক্তব্য যা না বলে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়েছে কবির পক্ষে। কিন্তু সেখানেই কি কাজ শেষ হলো? এই জায়গায় এসেই সম্ভবত সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে যায় আত্মজিজ্ঞাসা। সাধারণভাবে কবিতা কেন লেখা হচ্ছে এই বিষয়ে আমরা কথা বললেও এখনও পর্যন্ত একটি বিশেষ কবিতা কেন লেখা হচ্ছে সেকথায় আসিনি। "নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ" সৃষ্টি সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন চোখের ওপর থেকে পর্দা সরে যাওয়া, লিখেছিলেন "বিষাদের আচ্ছাদন" ভেদ করে আলোর প্রবেশের কথা (জীবনস্মৃতি)। নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী এই ঘটনার উল্লেখ করে লিখেছিলেন ঐ বিষাদের আবরণ বাইরে থেকে চাপিয়ে দেওয়া - কবির এই উপলব্ধির কথা মনে রাখলে “নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গের” বিস্ফোরণ বহুগুণে স্পষ্ট হয়। এই চমৎকার উদাহরণে আমাদের কাছে দুটো ব্যাপার স্পষ্ট হয়। কবিতা লেখার প্রেক্ষাপট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তা আমাদের চোখ খুলে দেয় অন্যতর অর্থের দিকে। দ্বিতীয় বিষয়টি হলো আত্মজিজ্ঞাসা ও সততা। যে বিষাদ বা আনন্দের প্রকাশে কবিতা লেখা হচ্ছে, সেই প্রকাশ কতখানি কবির নিজস্ব, কতখানি আরোপিত সেই অস্বস্তিকর সত্যের মুখোমুখি না হয়ে তাঁর উপায় নেই। উপায় নেই কবিতা যে ব্যাপ্তি দাবি করে তা এড়ানোর। প্রজন্মের পর প্রজন্ম যে কবিতা নিয়ে উদ্বেল হবে সেই কবিতা লিখতে গেলে নিজের মধ্যে যেমন ডুব দেওয়া চাই, তেমনি নিজের বাইরে বেরোনোরও দরকার আছে। দরকার আছে আবেগের সাথে দূরত্ব তৈরি করে, ধীরভাবে সেই আবেগের বহিঃপ্রকাশের। আমাদের আশা প্রথম দুই পর্বের মত তৃতীয় পর্বের কবিতা সংকলনেও সেই বহিঃপ্রকাশ পাঠক আবিষ্কার করবেন।

লিখেছেন - শৌভ চট্টোপাধ্যায়, মজনু শাহ, বোধিসত্ত্ব সেন, রামিজ আহমেদ, শাকিলা তুবা, তনুজ সরকার, ঈশিতা ভাদুড়ী, অনিকেত মৃণালকান্তি, অর্পিতা আচার্য্য, বুবুন চট্টোপাধ্যায়, দুর্জয় আশরাফুল ইসলাম, রুদ্রদীপ চন্দ, মাজুল হাসান, শ্ব, মিঠুন ভৌমিক।

এবং, উৎসব সংখ্যার কবিতা বিভাগের উল্লেখযোগ্য সংযোজন প্রতি পর্বের মুখবন্ধগুলি, - লিখেছেন মিঠুন ভৌমিক।


মৃত্যু
শৌভ চট্টোপাধ্যায়


খুব মনে পড়ছে, গণেশ পাইনের আঁকা দু-তিনটে ছবি। নিকষ কালো, কিংবা কালচে-নীল জমির ওপর, একটা জ্বলন্ত প্রদীপ। একটা মানুষ (কখনো পশু), যার শরীরের ভেতর থেকে উঁকি দিচ্ছে হাড়ের কাঠামো, বিচিত্র কঙ্কাল। টেম্পেরার প্রয়োগ এমনই অব্যর্থ, যে মনে হয় লোকটার শরীর ফুঁড়ে আলো বেরোচ্ছে। একটা ভৌতিক, চাপা আলো। তবে কি, লোকটার মধ্যেও, আরেকটা প্রদীপ জ্বলছে, আর আস্তে আস্তে পুড়িয়ে ফেলছে তাকে? মাংস আর চামড়া গলিয়ে, মেলে ধরছে তার অবয়ব?
প্রদীপের জ্বলে-থাকা আর তার ক্ষয়, বস্তুত অভিন্ন। অর্থাৎ, মৃত্যু মানে, দন্ড-পল-মুহূর্তের এই জীবন, তার যোগফল, আর বেঁচে-থাকার চূড়ান্ত অনিবার্যতাটুকু। বন্ধ-দরজার ওইপাশ থেকে, যে-লোকটি আমাকে ডাকছে, আমি তার সঙ্গে একবার কথা বলতে চাই। আমি জানতে চাই, আমি কোথায়।
প্রদীপ জ্বালানোর আগে যে-অন্ধকার, আর নিভে-যাওয়ার পরে, তাদের মধ্যে আসলে ঠিক কীসের ফারাক?


তিনটি কবিতা
মজনু শাহ


শশী-কুসুম

আমাকে বলো না নিতে আর শশী-কুসুমের ভার,
পড়ন্ত পাতার সঙ্গে মৃতদের ভেবে উঠতে দাও।
সব সারাৎসার বেজে ওঠে যেন তোমার বীণায়,
সেসব ধ্বনিবিদ্যুৎ আর এক পাপনাশিনীর
মুছে যাওয়া অবয়ব মনে করতে করতে লাজারাস,
লাজারাস কাম ফর্থ! ভাসো গান-সহ, নিশ্চেতন!
দৈত্যের হাতের 'পরে একটি তৃণের ঠাট্টা হয়ে
রহো রহো ওগো জাদু ওই আসছে অঙ্গার-মদিরা
খেজুরগাছের তলে লাল পিঁপড়েরা আসছে ক্রমে,
স্তূপাকার মেঘ, প্রশ্ন, সেইসব পৌরাণিক ক্রৌঞ্চ
আর শিকারির ফাঁদ ভেসে উঠছে বাল্মীকির পাশে
শোনা যাচ্ছে মৃদুতম সেই অন্ধ ধ্বনির অপেরা
এখন পড়ন্ত পাতা আর একটি নীরব জলাশয়
যে-সম্পর্কে লিপ্ত হয়, আমি তার ব্যাখ্যায় অধীর।
~~~~

তোমার শরৎকাল

তোমার শরৎকাল অতি ব্যক্তিগত কথাগুলো
বয়ে আনে, সে কি ট্রমা, এতখানি হলুদ, বঙ্কিম!
পথে পথে দাঁড়ি কমা ড্যাশ আর অনেক শূন্যতা,
সারাদিন মাথার ভিতরে ঢোকে শাদা যত মেঘ
পাখিদের রক্তচোখ সারাবেলা এখানে ওখানে—
আর এক কুঞ্জ নর্তকীর ধীরে পায়ে ফিরে আসা,
দীপ বন্ধু ঘাস খণ্ড খণ্ড মেঘ ফের দীপ বন্ধু...
হয়ত আদিম কোনো রসায়ন থেকে এই দীপ
ঊর্ধ্বনেত্র যত ঘোড়া পাখি গাছ কবি আছে বিশ্বে
নোনা অঙ্ক জানা কুঞ্জ নর্তকীর তারা আজ বন্ধু!
ঝড় তাকে বয়ে নেয় এক লীলাকক্ষ থেকে তুলে
অন্য কোনো তামাশায়, সারাক্ষণ দারুস্পর্শে বুঁদ
আর অন্ধ হয়ে খেলে চলে দৈত্যাকৃতি এই ঘরে
যেখানে ঘুমায় বামনেরা চন্দ্রব্যর্থতার পরে।
~~~~

শব্দের অঙ্গার

কাঠের বাক্সে সে গুছিয়ে রাখছে কৃষ্ণচূড়া, বিড়বিড় করে বলছে,
আ হর্স! আ হর্স! মাই কিংডম ফর আ হর্স...
গ্রহণ করো আমার এই রক্তবসন্ত, আর যত ট্র্যাজেডি,
তুমি হে কোন্‌ খাঁচাপলাতক পাখি দেখা দিচ্ছ হাওয়ায়,
রাজা সিমুর্গ তোমাকে চেনে? পাখিদের ভিড়ে তোমার
নৌটংকিবাজি মুছে যায়। ময়দানে, সারি সারি কবর,
ধরে নাও এরাই কোনো শিল্পের চূড়ান্তে পৌঁছেছে। তোমার মুখ থেকে
সরে যাচ্ছে ক্রমে হ্যালোজেন ফগ, জ্বলে উঠছে শব্দের অঙ্গার।
তবু কেন আজ কৃষ্ণচূড়ার মধ্যে ফিরে গেলে তুমি,
আজ কেন আমার কবিতার পাশে বসে থাকে জল্লাদ!


একটি কবিতা
বোধিসত্ত্ব সেন


কাল রাত্রে বাবার সাথে দেখা হল।
অদ্ভুত বৃদ্ধ। বাইরে বৃষ্টির শব্দ, জলের আওয়াজ
ঘরের ভিতরে টেবিল চেয়ার তেলচিটা খাট ওষুধ খাদ্যের অবশেষ
সবকিছু উপচিয়ে অবিন্যস্ত অ্যালবামের পর অ্যালবাম ।
এই দ্যাখ
তুই হাঁটছিস ইস্কুলের পথে, ক্লাস সিক্স, রাস্তায় ভীষণ রোদ, কুকুরটা গাছের ছায়ায়।

আমি, ক্রমশ বিরক্ত হই। প্রতিবারের মত।
দাড়ি কামাও না নাকি? ঘর দোর এত্ত অপরিষ্কার? থাকো কি করে?
মাথা নেড়ে বুঝে যাই এই কেস সারবার নয়
কালকে সন্ধ্যার ঝোঁকে ডাক্তারকে ফোন করে
একবার কথা বলে নেবো
এসব ভাবতে ভাবতে বাড়ি ফিরি ছেলেটা
টলমল করতে করতে কোলে ওঠার জন্যে হাত বাড়ায়।

আমি, ছবি তুলতে থাকি,
বাইরে বৃষ্টির শব্দ, জলের আওয়াজ


স্টেশন
রামিজ আহমেদ


স্টেশন আসলে একটা ঝুলবারান্দা
যেখানে রোদের কুণ্ডলী কুকুরের আমেজ শোঁকে,
যেখানে চট আর পলিথিনের স্নেহে ফুটে ওঠা সংসারের
নক্সা মিলিয়ে -- ক্ষণজন্মা উমনো ঝুমনোদের
কাঁথায় বসানো রূপকথার পাড়,
বিষাদ ল্যাম্পপোস্টদের সারি,
এদের ফেলে রেখে যাবো কোথায়?
যেখানে ধুয়ে যাওয়া জলদাগ, মিশে যাওয়া আঙুলছাপ
আঁকড়ে, পার্বণী বিকার একলা হাঁটে।
পরিণত বাৎসল্য ঘুমন্ত শাবকের ঠোঁটে গুঁজে দেয়
ভালোবাসার টুকরো।
আরো যা কিছু অপ্রকাশিত আদর, নিংড়ানো বিচ্ছেদ
সব মিশিয়ে নিয়ে যেখানে
কান্নার গল্পে মুহূর্তজীব হয়ে বেঁচে থাকা।


বাসন্তিক বিষুবন
শাকিলা তুবা


আলোরা কষ্ট পাচ্ছে, কষ্ট পাচ্ছে
পাখা ছাড়া উড়তে উড়তে পুড়ে যাচ্ছে
হাজারো সূর্যাস্ত
দখিনের রাস্তায় ঘুরে যাচ্ছে দীর্ঘ নিঃশ্বাস
ফুলে ধর্ণা দেয়া মৌমাছিগুলো
ফিরে যাচ্ছে, ফিরে যাচ্ছে দেখেশুনে এসব, কষ্ট হচ্ছে।

বিগত জীবন থেকে বেরিয়েছে এই দেখো
একটা পাথর, রঙচঙে কি?
দেখে মনে হয় কারো কিছু হয়েছে কোথাও।
কোথায় কি হয়েছে? ভুল?
ভুল হয়েছে?
জীবনে কিছু ভুল হয়েছে ভুল থেকে জীবন কষ্ট পেয়েছে।

ভুল জানতে ভাল লাগে, সুন্দর লাগে।
একরের পর একর জীবন পার হতে হতে
মখমল জুতা প্রথমে সিল্ক, সিল্ক থেকে
জলীয় হয়ে খুলে যাচ্ছে বাকল সব খুলে যাচ্ছে
নষ্ট জীবন অনুতাপে পুড়ছে, পুড়তে পুড়তে
আলোগুলোর কষ্ট হচ্ছে, আলোরা নষ্ট হচ্ছে।


দুটি কবিতা
তনুজ সরকার


আমার খোচর প্রত্যয় আমার মতন স্বাস্থ্যে

দমাদম।শ্বাসের হাপর।কালো জানালা।সচকিত ধোঁয়ার এককালীন গ্রাহক আমরা এখন আমি লব্জে বিস্তারিত।পরে স্থায়ী।আমি হয় রোজ উত্তীর্ণ জার্গন।যেমন দূরভাষ সময়ের নাভি ফাটিয়ে শ্লা শ্লা আনন্দ কারবাইন।কনসেপ্টের আমি সবান্ধব আমন্ত্রিত কুয়োতলায়।বারবার এনকোর।বালতিতে রশিঝোলা বসে জলজানে ফ্রি ক্রমশ,যা কিছুই বোঝায় না।কথা শেষ হলেই বিভীষিকার সিন্দুক খুলে যায় অবস্থানের গ্রাম্যতা গ্রহণ করার ঢকাঢক পানীয় আবিষ্কার উল্লাসে আমি হয় আমার ছায়ার অন্তরীপ এবং আমার খোচর আমার মতন স্বাস্থ্যে আজ ভোর থেকে নির্ধারিত চাক্কাজ্যাম যা ছিল তা নেই সে বহুদূরে চলে যেতে সক্ষম নয় বন্ধনসৌরিক,বন্ধনে সৌগত কই?

তোমার চোখে বর্ষশেষের আতঙ্ক,পেডলার
তুমি শিশুর ভ্রমণ অভিজ্ঞতা নিয়ে আমার কাছে আসো
আমি পশুর বিরাম নিয়ে ফিরে আসি মানুষের বৈরাগ্যে
বিধবামাসির কাঠআঠা চুল বেঁধে দিই
ওহো,তার মুখের ভেতর আস্ত দরবেশী নাচছে যেমন!এত আনন্দ বৈরাগ্যে!
আমি দরবেশকে একান্ত নিজের মতো করে পেতে চাই।তবে।খানকিবাড়ির উনুন ঘিরে সভ্যতা প্রাচী থেকে পাশ্চাত্য হয়ে মিলনান্তক চারুকলা হয়ে আমাদের সুষুম্নাগতি।মানে,ফাউল বাউল হবে।পরিচিত জার্গন।
দুর্বোধ্য সচেতনতা।যে আমার লিঙ্গ আছে এবং তা শিল্পের চেয়ে মাপে ছোটো

সুতরাং,আমার আপৎকালীন কাজ মন্তব্য রেখে যাওয়া
আমার নেই পর্যাপ্ত মুগ্ধতা,সৌরভযুক্ত ফুল কে আমি খসে যেতে দেখেছি
আমার অভিযানের মাঝে মাঝে অরণ্য ছিল
লাস্যে মুখর দেবী হবিষ্যাহার ঠুসে দিয়েছিল আমার এ অরণ্যযাপনে
আমিও একদিন মানুষের অন্তরঙ্গতায় পরিপূর্ণ হেজে যাব

বিরল জ্যোতিষ্কেরা হেডলাইনবিভাসহকলাআলোচিত।আর কথা শেষ হলেই বিভীষিকার সিন্দুক খুলে যেতে থাকে। মর্মন্তুদ ফেলাইন সন্দর্ভে জোছনাহুতাশের কাপালিক ড্রিমার আমি মানুষের ধবল প্রসঙ্গে উত্থাপিত হই,পিছলে পড়ি মানুষের গিরিখাতে,সমীক্ষা রগড়ে

প্রতিকল্পে,আমার খোচর প্রত্যয় আমার মতন স্বাস্থ্যে দিনদুপুরে ছোরা মেরে রৌরবস্ট্রীটে ফুটে যায়।
‘আমি মানুষকে ভালোবাসব!’ ‘আমি মানুষের সরব করাত বাঞ্চোৎ,ভালোবাসব!’
~~~~

আমার কিছুতেই আর হয় না এখন

তিনখণ্ডে পড়ে থাকে ক্যাপিটাল,
লুটিয়ে

আমার ঘুম ভাঙ্গে স্বপ্নে
ইঁদুরেরা তৈজস নাড়ে
প্রান্ত ধরে টানে ঘুমের বয়েস
আর পুলিশের ঘন কালো গাড়ি ধূলা উড়িয়ে কাছে চলে আসে

ককিঁয়ে ওঠে অন্ত্রবিনুনি রাত আরও স্পষ্ট হয় টলমলে পা
একপক্ষকাল তারা ঘরের উদ্দেশ্যে রোমবহ বা রোমহীন হয়ে উঠছিল

ঘরের দুদিক থেকে ঘরের উদ্দ্যেশ্যেই বয়ে চলেছে নহর
যতি ভাসছে আস্তে শিকারায় অনন্ত পরমাণু শব
মশারি বনবন ঘুরছ ঘোরে পোর্টেবল সমাধি তখন
তিমিতেল পিচ্ছিল করে রাখে প্ররোচনার শিয়র
পানপাত্র জেগে থাকে বিষয়াধিক মাথায়
বিষয়ান্তর নিয়ে যাচ্ছ গুপ্ত চিঠির সংকেতে

না

আমার হয় না কিছুতেই আর হয় না এখন
প্রাত্যহিকতার এক ডিগ্রি বদলে দৃশ্যপট

এত কাছে চলে আস মৌনি প্রহরা
মনে হয় ভাঁড় বনে ছিলাম একশ বছর মাঝে ক‘ বছর পাহাড়ের ঋতু
মনে হয় হেটে যাই ভ্রমণের বুক ছুঁতে স্খলিত নিখাদ ছুঁয়ে ছুঁয়ে
মনে পড়ে উচ্চতার ভয় স্নেহপসারিণীর কাছে প্রথম সহজ করেছিল
মনে হয় তাবৎ প্রস্তাবেই কেঁদে ফেলতে পারি ভালোবেসে

মা,তুমি নয় মাসকাল পেটে লিঙ্গ ধরে উভকামী ছিলে
প্রতিফলিত মহিমায় আজ তোমাকে দেখি নিরাপত্তা হারায়ে পর্ণমোচী
জঙ্গল চিরে বীতশোক মর্ম ফিরোজা থানে গুটিয়ে আনছো আমাকে আবার
কর্ডনিং লাইনের ভেতর ভর্তুকি সংগ্রহ কামে

দর্শকের হাততালি কুড়োতে কুড়োতে আমি যখনই পোডিয়ামে উঠলাম
ফ্রকপড়া মেয়েরা প্রস্তরীভূত হলো।হাওয়ায়।আমি তাদের জন্যে
কামনা করে চলেছি যৌথ আগুন ও জলাতঙ্ক
মা,আমি তোমাকে দেখাব স্যুরিয়াল ব্যাঙ্কনোটে রাষ্ট্রপিতার পাউট,
তার ভ্রাতৃকল্প

তবে এসব কিছুও করি না ত
তীব্রতর আনন্দে ঞ ঞ মুচড়ে যাই
মুখ বেকিয়ে সূর্য মুখী ফুল খেতে খেতে
মুকুর নিবদ্ধ করি দৃষ্টিকোণে আটকে রাখা চির অনিমেষে

হিমশৈলচূড়ায়
সমগ্র একতায়
আমার স্বপ্নে ভাঙ্গে ঘুম
ফাঁকা মাঠে
অখণ্ড পুলিশের ঘন ঘন গাড়ি ধূলা উড়ায়
উড়াচ্ছে কলিজার ধুম

নীরব আড়ত থেকে অচেনা আনাজ তুলি ঘরে

ইঁদুরেরা স্থির
হীরক বস্তা মুটিয়ে

না

আমার কিছুতেই আর হয় না এখন
বড়ো উদাসীন চুষে গাছ হয়ে আছ মাটির ভাতার


অন্য কান্না
ঈশিতা ভাদুড়ী


মায়াবৃক্ষ থেকে দূরে
যে সব নুড়ি পাথর পড়ে থাকে জলে,
সেইখানে বেড়ে ওঠে অন্য নদী,
অন্য জন্ম কোনো?

ইচ্ছেসুতো ছিঁড়ে
বেড়ে ওঠে যে অনন্ত আকাশ
সেই শূন্যে রয়ে যায় কি অন্য জীবন,
অন্য কান্না ভীষণ?


পরিবর্তনবিষয়ক কবিতা
অনিকেত মৃণালকান্তি


স্কচের পরে কচু খাবেন না
চুলকানিসূত্রে আপনার মনে পড়তে পারে
মিউকাস ও সাইট্রিক অ্যাসিডের শত্রুতার কথা
এরপর অনিবার্যভাবে আপনি
লেবু খেতে খেতে ভাববেন
স্বাদবদলের আশায় কচু না খেলেও চলত


পরকীয়া
অর্পিতা আচার্য্য


দেখা হয়েছিল কোন আদি অন্তহীন নৌকা বিহারে –
জম্পুই পাহাড়ে সদ্য ফুটে ওঠা
কমলালেবুর ঘ্রাণ তোমার দু ঠোঁটে
রিসর্টের সিঁড়িতে শ্যাওলা জমাট ঘাসেরা...
মোরামের অভ্রকুচি, রঙ্গন ফুলেতে কাঁপছে ভীরু
প্রজাপতি
বাতাসে বে আব্রু পর্দা , খুলে দিল চুলের বিনুনি
শ্রোণীদেশে ক্লান্ত মুখ রেখে আমি কেঁদে উঠি
আজন্মের তীব্র দহনে
মা বলে ডাকতে ইচ্ছা করে
আঁচলের সংবৃত বিন্যাসে
বারান্দায় দু পেয়ালা শ্যাম্পেনের আহত সংলাপ
আড় চোখে মেপে নেয় হোটেল বালক
ভালোবেসে পাপ করি –
পাপ করে ভালবাসি
অথচ ভালোবাসার সঙ্গে মোহ ও পাপের কী তীব্র
সহগতি
পাঁজর ফাটিয়ে জাগছে ভঙ্গুর এক মহীরুহ
পরাবাস্তবের মত হাতছানি দিয়ে যায়
আকাশ দেওয়ালে ঘেরা অবসন্ন বাড়ি ।

চল, সন্ধ্যায় সন্ধ্যায় ফিরে যেতে হবে
অনন্ত নৌকার মধ্যে
বিপরীতমুখী শুধু আমরা দুজন।


দহন
বুবুন চট্টোপাধ্যায়


একটা ভালোবাসার কথা উড়ছে শহরে।
আমি নাকি ওকে ভালোবাসি খুব।
প্রতিটি ল্যাম্পপোস্ট জানে।
প্রতিটি ট্রামলাইন জানে।
প্রতিটি আধো আলো রেস্তোরাঁ জানে।
ও নাকি আমাকে ভালোবাসে খুব।

শুধু বৃষ্টিদিন জানে কোন অতলে ঘূর্ণি মিশে আছে।

ভালোবাসার মতো একটা বিকেল দাও।
আমি তোমায় দেব পুরোনো অ্যালবাম, কবিতার খাতা, যা কিছু গোপন চিঠি।
ভালোবাসার মতো একটা বিকেল দাও।
যাতে ইচ্ছেমতো কামড় দিতে পারি।

গাছের ছায়ার কাছে যাই।
সবুজ রোদ্দুর ভরে নিই পকেটে।
চিঠিগুলোয় আগুন জ্বেলে ভাবি
এ হাওয়া স্পর্শকাতর খুব।


আত্মকেন্দ্রিকতা
দুর্জয় আশরাফুল ইসলাম


কথা না রাখার সমস্ত শিখে গেছি আমিও;
আজ মধ্যদুপুরের কাছে পৌঁছে যাবার
যে ফন্দিফিকির করেছি সারা সকাল
তা এড়িয়ে সজ্ঞানে আমি ডুবেছি -
আকাশকুসুম।

পুরনো বন্ধুর মুখ। বহুদিনের আশ্রয় ঘিরে
যে ডাক আসে সূর্যপ্রখর দিনের মতো
অতিরশ্মি ভেবে আমি এড়িয়ে গিয়েছি,
বৃন্তচ্যুত মানুষ।

শুভ্র ফুল ঝরে যায়। ভীষণ বাতাসের আগে
চিরকুট আর কাগজের নৌকোর সহমিলন
যে ভয় আমাকে দেখায় তা বুকে নিয়ে
খুঁজেছি নদীগর্ভ...

নিজেকে দেয়া যত কথা, যত প্রতিশ্রুতি -
ভুলে ভুলে থাকি, ঘুড়ি উড়াই আকাশে
থাকি নিজেরই কাছে।

আকাশ এসে প্রতিফলন ঘটায় নদীতে,
আমারই পাশে।
~~~~

কবে আসছো হে

পুরোনো ক্যানভাস থেকে কোজাগর রাত্রি জাগার একটুকরো
উড়ে আসে দারুণ হাওয়ার তোড়ে ;
নির্মোহ জানলার পাশে সকাতর মুখ বাড়িয়ে থাকে আচ্ছন্নতা
বন্ধুর মতো, বিগত কুয়াশায় জবুথবু মুখ
কবে আসছো হে, স্মৃতিঘোর অন্ধকার ভেঙে হাসিখুশি দেশ
উত্তাল তরঙ্গ বুকে জেগে থাকে বসুন্ধরা আজও।
কিছুই অস্পষ্ট নয়। ঝিঁঝিঁ নাচন নিয়ে আরও যারা বেরিয়েছিল
এপাড়া ওপাড়া থেকে নিকটবর্তী প্রত্নের সন্ধানী,
তাদের শোরগোল আজও শোনা যায় তিতাসের পাড় ধরে
প্রান্তরে আবার এসে দাঁড়িয়েছে যদি অমল জ্যোৎস্নার পীড়ন
হৃদয়ের গভীরে ওঠে ঢেউ, শান্ত দিঘল জলে উত্তাপ।
কবে আসছো হে রাত্তিরের নীরবতা না-ভাঙা ফিসফিসানি,
আকাশে খণ্ড মেঘ বারংবার করে জিজ্ঞাসা চোখের নাচুনিতে,
আবছা ছায়ার তোরণ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মৌন বৃক্ষের সারি,
মৌনব্রতে দাঁড়িয়ে রবো আমিও ঠিক, শোরগোল শেষের 'পর


বৃত্তাকার
রুদ্রদীপ চন্দ


আমি ভালো নেই; কথাটা ক্লিশে অথচ
সততা এই তিন শব্দের মধ্যেই শুয়ে আছে
ভালো নেই কেউ, শিকার এবং বিশ্বাসঘাতক
দাতা ও ভিক্ষার পাত্র পৃথক পৃথক গণ্ডীবদ্ধ

একাকীত্বের দিনগুলো এক একজন অভুক্ত অতিথি
আঘাত প্রিয়তম পদ। অতিথি বর্গ গোল হয়ে বসে

দেখি,
দুপুরের জল আঘাতে আঘাতে ভালো না থাকার গণ্ডী হয়ে যায়


অ্যানিমেল প্লানেট
মাজুল হাসান


মানুষ; একাকী; নীরব ঘণ্টা বাজে স্বশব্দে। ডানা ছাড়াই এখন সে সাঁতরাতে পারে মেঘ। সন্দেহ নেই, এখন সে টিকে থাকা একমাত্র বাঘ ক্ষয়িষ্ণু ম্যানগ্রোভে। অবসম্ভাবীভাবে এখন সে বানাতে পারে কাচের সমুদ্র, শরীরের ঘ্রাণে নিজেরই একলা রাজ্যপাট

হ্যাঁ এটা ১৩ জুলাই, ৩০৩০ খ্রিষ্টাব্দ

কচ্ছপের মতো দেখতে একটা মন্থর ট্রেনের নিচে ঘুমিয়ে আছে বাঘের হুংকার; নিহত ৬শ ৩০ কোটি, সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে গেছে আগ্নেয়গিরি, জ্বালামুখে টলটলে জল...


তিনটি কবিতা
শ্ব


বৈড়াল # ৩১

মুহূর্ত স্থির , যেন
রাংতার শুঁওপোকা ,
প্রজাপতি হবে না কখনো -

বিকেল মথের মত,
ন্যাপথালিনের দেশে,
কাবার্ড
ধূসরে ভুলে
থেকে যাওয়া নামহীন ধুলো ।

বিড়ালিটি থাবা তোলে ,
শুঁও নিয়ে খেলে
কিছু ,
মুহূর্ত ; স্থির হয়ে দেখে ।।
~~~~

বৈড়াল # ৩২

দুইটি মাত্রা হলে চলে যেত
বিলাইজিনির, জামা
পাল্টাতে গেলে যেটুকু আব্রু

লাগে , ঘনসাপ , পোয়াতি
গাছের ;
তৃতীয়টি সেইজন্যে রাখা ।

এরপরে যাহা কিছু ,নিজেই
সে, আমাকে ডাকেনি -

বিলাইটি বড় মাটি,
পলিনোমিয়াল বোঝে,
পলিমাটি-আঁচড় বোঝেনা ।।
~~~~

বৈড়াল # ৩৫

প্রাকারের পাশে সেই ফুলগাছ,
সবুজ কুটীর আর
লালচে ইঁদারা,

ছবির বিড়াল আহা দোল খায়
খবরের বুগেনভিলিয়া !

আমোদিনী ছানা ক'টি, তারই মাঝে
নাসদীয় জলে ,
ঘুরে চলে -

পশমের ক্রোধে ;

শান্তির লোম ওড়ে ,
আর,ছবির বিড়াল খুব দোল খায়
খবরের বুগেনভিলিয়া ।।


বিস্মৃতি
মিঠুন ভৌমিক


শমশেরগঞ্জের কথা আমার মনে নেই-
রোদে জ্বলা হলুদ ঘাসের বন, শুখা নদী
ধোঁয়াওঠা টিলা থেকে বয়ে আসা হাওয়া
মাঠঘাট ফুলসাজ সব স্মৃতি অতল কুয়োয়
শিশুর পাঁজরে যেন জমে উঠে ডুবে যায়
কথা, পাখীডাক, আদরের ঘ্রাণ।
সেই ঘাসবন, টিলার পাথরে আঁকা তীক্ষ্ণ আঁচড়
হ্রদের জলের মাঝে জেগে থাকা দলছুট জমি
সেখানে বসেছে মেয়ে আঁচলে গোছানো দুটি টাকা
জল থেকে ভাপ ওঠে, মাছরাঙা শ্বেতির মতন
দাগ নিয়ে চেয়ে থাকে। ক্রমশ অন্ধকার হবে
গঞ্জের আলোগুলো তাপ দেবে খুব
তক্ষুণি হাওয়া দেবে, একে একে অতল কুয়োয়
সুখচ্ছবি টাকাকটি জমা দেবে শ্যামলা সে মেয়ে
বাড়িতে পূর্ণিমা আজ, বসন্তশ্বাস ঘন আলো
পথঘাট ধুয়ে যাচ্ছে ক্রমাগত সেরে উঠছে নদী
দাওয়ায় ভাতের গন্ধ ফুলের মতই শ্বাসরোধী
শুধু শমশেরগঞ্জের কথা কিছু মনে নেই-
হয়ত বা সেইখানে অবশিষ্ট চাঁদটুকু ডুবেছে এখন।


পুজোর কবিতা - প্রথম পর্ব | দ্বিতীয় পর্ব | তৃতীয় পর্ব



329 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

কোন বিভাগের লেখাঃ মোচ্ছব  কাব্যি  বুলবুলভাজা  উৎসব ইস্পেশাল ২০১৮ 
শেয়ার করুন


Avatar: কুশান

Re: পুজোর কবিতা

নানা স্বাদের কবিতাসমূহ। ভালো লাগল শব্দপ্রয়োগের নানান কৌশল। সিন্ট্যাক্স ভাঙার মায়াপ্রকল্প।

কিছু কিছু পংক্তি তো বাঁধিয়ে রাখার। এমন সব দুঃসাহসী
অলৌকিক ড্রিবল কবিরাই দেখাতে পারেন।

পারলে বিশদে পরে লিখব। সময় এখন বড় কম।
Avatar: i

Re: পুজোর কবিতা

অদীক্ষিত পাঠক আর কি বলবে? শব্দগুলি মাথার মধ্যে ফাটে-অদেখা এক জগৎ তৈরি হতে থাকে- আসলে একটা ইলিউসন-

এরকম কবিতা খুব কম পড়েছি-


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন