বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

মহাভারত ও ইন্টারনেট বিপ্লব - একটি অসম্পূর্ণ প্রস্তাবনা

অনমিত্র রায়

শুরুর চারকথা

প্রথমেই বলে রাখা যাক, লেখাটি অসম্পূর্ণ। সম্পূর্ণ মহাভারত রচনা কারও একার কম্মো নয়। এই লেখকেরও সেরকম সাধ্যি নেই। যুগে যুগে লিখতে হবে, মিলেমিশে লিখতে হবে; নাহলে তা আর মহাভারত হয়ে উঠবে কি উপায়ে! কিছুটা ভারতবর্ষের নানান বিদগ্ধ রাজনীতিকরা লিখেছেন মুখে মুখে, কিছুটা এই অকিঞ্চিৎকর লেখক প্রয়াস পাইলেন নিজের সীমিত জ্ঞানভাণ্ডার মাঝে চিরুনিতল্লাশি চালিয়ে। বাকিটা আপনারা লিখুন। আপনারা মানে যাঁরা প্রকৃতই সত্যানুসন্ধিৎসু, যাঁরা সোশ্যাল মিডিয়ায় খিল্লি হয়ে যেতে ভয় পান না বৃহত্তর স্বার্থের কথা মাথায় রেখে। জুড়তে থাকুন যে যার মতো, কারণ একমাত্র সেইভাবেই ভারত মহা হইয়া উঠিতে পারে। ব্লগে লিখুন, ডায়রীতে লিখুন, গদ্যে লিখুন, শায়রীতে লিখুন, ফাঁকা দেওয়াল পেলে লিখে দিন, বোকা বালক ধরে জিকে দিন; মোদ্দা কথা যেভাবে পারেন ছড়িয়ে দিন আমাদের গৌরবময় ইতিহাসের কথা।

রামের জন্ম অযোধ্যাতেই হয়েছিল। সেসব নিয়ে আমরা কোনো তর্কে যেতে চাই না। বাবরি মসজিদের ধ্বংসাবশেষ যেখানে, ঠিক সেখানেই অবস্থিত ছিল দশরথের বাড়ির আঁতুরঘর। কিন্তু মানুষ অনেক কিছুই মানেনা বা মানতে চায় না। এটা মানুষের সমস্যা। বিশেষত সে মানুষ যদি শিক্ষিত হয় তখন সে প্রমান চাইবে, জিজ্ঞেস করবে বিজ্ঞান এই কথার মান্যতা দেয় কিনা, পুরাতত্ত্ববিদরা এ বিষয়ে কি বলে; এইসব হাজারো টালবাহানা করে পেট ভরলে তবে সে ভেবে দেখবে যে একটা ব্যাপারকে সন্দেহ করা উচিত নাকি মেনে নেওয়া উচিত।

কিন্তু মানুষ যেটা জানেনা, সেটা হলো যে অনেককিছুই তাকে আসলে জানতে দেওয়া হয় না। তাই তার জ্ঞান বা ধ্যানধারণা সীমিতই থেকে যায় আজীবন। সেই সীমিত জ্ঞানের ভিত্তিতে মানুষ ফেসবুকে স্ট্যাটাস লেখে ও তার নিচে ঝগড়া করে। মহান ব্যক্তি, মানে যাঁরা আসলে সত্যিটা অনেক বেশি জানেন, তাঁদের খিল্লি ওড়ায়। নিজের কোনোকিছু পছন্দ না হলে স্ক্রিনশট নিয়ে ছড়িয়ে দেয় গ্রূপে গ্রূপে। এইভাবে নানারকম বাওয়ালি ও পারস্পরিক পিঠচাপড়াচাপড়ির মধ্যে মেতে থেকে কাটিয়ে ফেলে গোটা একটা জীবন। জানতেও পারে না যে জানলো না। মানুষ, ভেবে দেখলে, আসলে এতটাই অসহায় এবং তার যাবতীয় কচকচানি এতটাই অর্থহীন।

পৃথিবী ব্যতীত অন্যান্য গ্রহেও যে প্রাণ রয়েছে সে কথা আজ আর নতুন করে বলার কিছু নেই। দানিকেন সাহেব সেসব নিয়ে বইয়ের পর বই লিখে ফেলেছেন। এছাড়া রসওয়েল কাণ্ডের কথা যাঁরা শুনেছেন তাঁরা জানেন যে ভিনগ্রহীরা প্রায়ই নানা প্রয়োজনে পৃথিবীতে এসে থাকেন। মাঝে মাঝেই তাঁদের সাথে আমাদের সাক্ষাৎও হয় বৈকি। এই নিয়ে এফবিআই এর একটা প্রমান সাইজের দলিল পাওয়া যায়। দলিলটি ১৬ ভাগে বিভক্ত এবং প্রথম ভাগটিই ৬৯ পাতার। সেখানে মানুষের সাথে ভিনগ্রহীদের দীর্ঘকালীন লুকোচুরি সংক্রান্ত অজস্র ঘটনার উল্লেখ রয়েছে। শুরুতে এসব চেপে যাওয়া হয়েছিল। ২০১৪ সাল নাগাদ সাধারণ মানুষের জন্য এই জ্ঞানভান্ডারের দ্বার উন্মোচিত হয়। অথচ এরপরও আশেপাশে অনেক মানুষকেই আমরা দেখি যাঁরা ভিনগ্রহে প্রাণের অস্তিত্বে বিশ্বাস করতে চান না। আসলে নিজেদের সীমাবদ্ধ জ্ঞান ও ধারণায় তাঁরা অত্যাধিক আস্থা রেখে ফেলেছেন বলেই এরকমটা ঘটে থাকে। কূপনিবাসী ভেকবাহাদুর যে আকাশের আকৃতি গোল বলেই বিশ্বাস করবেন তাতে আর আশ্চর্য কি!

ঠিক সেইরকমই, মহাভারতের সময় ইন্টারনেট ছিল না এরকমটা যাঁরা বলেন তাঁদের আসলে কোনো দোষ নেই। তাঁরা জানেন না। কারণ তাঁদের জানতে দেওয়া হয়নি। একথা সবাই মানবেন যে দিল্লির পুরানা কিলা আসলে পাণ্ডবদের ইন্দ্রপ্রস্থ। ১৯৫৪-৫৫ এবং ১৯৬৯-৭২ দু'দফায় এই কেল্লার নিচে খোঁড়াখুঁড়ি চালিয়ে যীশুখ্রীষ্টের জন্মের ৬০০ থেকে ১২০০ বছর আগেকার জিনিসপত্র পাওয়া গেছে। এইসমস্ত দ্রব্যাদিকে পেন্টেড গ্রে ওয়ার বা পিজিডাব্লু নামে এক বিশেষ শ্রেণীভুক্ত ধরা হয়ে থাকে। পুরানা কিলা অঞ্চলে এই পিজিডাব্লু আবিষ্কার হওয়ার ফলেই তৎকালীন এএসআই ডায়রেক্টর শ্রী বি বি লাল নিশ্চিত হন যে পাণ্ডবরা আসলে দিল্লীতেই থাকতেন। ইন্টারনেটের ব্যাপারটাও হয়তো উনি বলে যেতে পারতেন কিন্তু ওনার নিজেরই এসব বিষয়ে কোনো ধারণা ছিল না। আধুনিক ভারতবর্ষে ইন্টারনেটের প্রচলন ঘটে ১৯৯৫ সালে। ফলত সত্তরের দশকে লৌহযুগের রাউটার হাতে পেয়েও তার তাৎপর্য না বুঝতে পারাটাই স্বাভাবিক। আজকে যদি সেইসময় পাওয়া সমস্ত বস্তুর ছবি পাবলিকের হাতে তুলে দিয়ে খুঁটিয়ে দেখার সুযোগ করে দেওয়া হয় তাহলেই দুধ কা দুধ আর পানি কা পানি হয়ে যাবে।

মহাভারতের সবচেয়ে ধুন্ধুমার পার্ট হলো গিয়ে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ। শোনা যায় এই কুরুক্ষেত্র নাকি হরিয়ানার থানেসর এর কাছে। একটা গোটা জেলারই সেই কারণে নাম রাখা হয়েছে কুরুক্ষেত্র। একটা টাউনও রয়েছে ওই নামে। তবে এই নামকরণের খেলার শুরুয়াত ১৯৪৭ সালে এবং এর গোটাটারই ভিত্তি হলো শোনা কথা। তা লোকের কোথায় কান দেওয়া তো আর খুব একটা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। জায়গা একটা ছিল বটে কুরুক্ষেত্র নামে। তবে সেটা ঠিক কোনো একটা জায়গা নয়, বরং একটা অঞ্চল। আরণ্যক-এ তার বিবরণ রয়েছে। তবে আমরা তার ভিতর ঢুকবো না। কারণ যুদ্ধটা আদেও ওখানে হয়নি। যুদ্ধটা হয়েছিল আসলে ফেসবুকে। মানে ঠিক ফেসবুক নয়, তবে ওইরকমই একটা সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইটে। সেই সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইটটির নাম ছিল কুরুক্ষেত্র ডট কম। পূর্বপুরুষকে শ্রদ্ধা করার খুব চল ছিল তখন। সেইজন্যেই কৌরবদের পূর্বপুরুষকে মাথায় রেখে সাইটটির ওরকম নাম রাখা হয়। বোঝাই যাচ্ছে, জন্মলগ্ন থেকেই এই সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইটের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল কৌরবদের অবিসংবাদিত লীলাক্ষেত্র তথা প্লেগ্রাউন্ড হয়ে ওঠা। এইজন্য কমিউনিটি গাইডলাইন নামক একগুচ্ছ নিয়মও চালু করা হয়েছিল। ধৃতরাষ্ট্র বা কৌরব ভাইদের বিরুদ্ধে কেউ মিথ্যাচার করলেই সেইসব পোস্ট ধরে ধরে উড়িয়ে দেওয়া হতো। গান্ধারীর চোখে ফেট্টি কেন, বা ভীষ্ম কেন ব্যাচেলর জাতীয় অর্বাচীন প্রশ্ন তোলার প্রচেষ্টাকে মোটেই বরদাস্ত করা হতো না। এছাড়াও রহস্যজনক একটা ব্যাপার চলতো যার সম্বন্ধে স্পষ্ট করে কিছু জানা যায় না। মাঝে মাঝেই আশ্চর্যভাবে একই ধরণের পোস্ট দেখা যেতো সবার হোম ফিড-এ। অথবা একটা পোস্ট রয়েছে, আপনি জানেন, যাঁর পোস্ট তাঁর ওয়ালে খুঁজতে গিয়ে দেখলেন পাচ্ছেন না, কিছুতেই পাচ্ছেন না। অথবা একটা কমেন্ট কোনোভাবেই পোস্ট করে ওঠা যাচ্ছে না। এগুলো কিসের ভিত্তিতে হতো তা জানা যায়নি। অনেকে বলেন এসব গুজব, কারণ এগুলো সবার সাথে ঘটতো না। খুব সীমিত সংখ্যক প্রোফাইলেই এই ধরণের অভিযোগ পাওয়া যায়। দানিকেন সাহেব এইসব সত্য আবিষ্কারের খুব কাছাকাছি পৌঁছেছিলেন, তারপরই ভিনগ্রহীরা ধরে ওনার মাথাটা চিবিয়ে দেয়। তারপর থেকেই উনি যাই পড়েন আর যাই দেখেন হয় পারমাণবিক বোম আর নয়তো ল্যান্ডিং সাইট বলে ঘেঁটে ফেলেন। এসবই ভিনগ্রহীদের চক্রান্ত। আসলে সেইসময়কার জাঁদরেল হিন্দু বীরদের সাথে এঁটে উঠতে না পেরে বেচারীরা এখন এক দুর্বলচিত্ত সাহেবকে বশ করে ধান্দা করছে যাতে সারা দুনিয়ার মানুষ ওদেরকেই বেশি উন্নত বলে ভাবতে শুরু করে। কিন্তু এভাবে সত্যকে চেপে রাখা যায় না। ব্রহ্মান্ডের উন্নততম প্রাণী মানুষ, যাকে কিনা ভগবান নিজের আদলে গড়েছেন। আর সেই মানুষের মধ্যে উন্নততম জাতি হলো হিন্দু। অতীতে আমরা বলে বলে অ্যান্টিম্যাটার বানাতে পারতাম বাড়ি বসে। সেই অ্যান্টিম্যাটার ব্যবহার করে আমরা বোমাও বানিয়েছি। এখন না হয় সেসব ফর্মুলা আমাদের আর মনে নেই, কিন্তু সেই ভয়েই তো ভিনগ্রহীরা লুকিয়ে লুকিয়ে যাতায়াত করে। ওরা তো আর জানে না যে এই হিন্দু আর আগের হিন্দু নেই।

যুদ্ধের মূল গল্পটা শরিকি বিবাদ সংক্রান্ত। পূর্বপুরুষের প্রপার্টির ভাগ নিয়ে ভাইয়ে ভাইয়ে ক্যাচাল। কৌরব আর পাণ্ডবদের মধ্যে জনমত নিজেদের দিকে টানার প্রতিযোগিতা। এর জন্য তারা নিজেদের ট্রোল আর্মি বানিয়ে যে যার শ্রেষ্ঠত্ব প্রমানে উঠে পরে লাগে। কৌরবদের ট্রোল আর্মি পাণ্ডবদের ট্রোল আর্মি-র চেয়ে অনেক বড় ছিল। কিন্তু মাইটি হিন্দু গড শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং পাণ্ডবদের পক্ষে শেপার্ড ট্রোল-এর ভূমিকা নেওয়ার ফলে তারা বিশেষ এঁটে উঠতে পারেনি। তাঁর হাতে নারায়ণী সেনা নামক যে প্রাইভেট ট্রোল আর্মিটি ছিল সেইটা অবশ্য কৌরবরা কান্নাকাটি করে বাগিয়ে নেয়। কিন্তু তাতে কি? কে না জানে যে লক্ষ লক্ষ শীপ ট্রোল অ্যাকাউন্ট-এর চাইতে একটি অথেন্টিক শেপার্ড ট্রোল অ্যাকাউন্ট অনেক বেশি হাঙ্গামা তৈরী করার ক্ষমতা রাখে। তিন লক্ষ ন্যাশনালওয়ারিয়ার_১৯৯৮ আর দু'লক্ষ ভারত_কা_সাচ্চা_বেটা_৩২৫ বস্তুত কিছুই করে ওঠার ক্ষমতা রাখে না যদি না পরেশ রাওয়াল জাতীয় কোনো অ্যাকাউন্ট থেকে একটা জব্বর টুইট বেরোয় মার্কেটে।

হ্যাশট্যাগের ধুন্ধুমার লেগে যায়। ব্রহ্মাস্ত্র আদতে একটি হ্যাশট্যাগ, যার আসল অর্থ "বর্ডারপে হামারে জওয়ান লড় রহে হ্যাঁয়..."

কিন্তু এই সবই ইতিহাসের গর্ভে হারিয়ে গেছে। কারণ আমরা সবাই জানি, সুপারহিট লেখক চেতন ভগৎ যেমন বলেছিলেন, ঐতিহাসিকদের কাজ কেবলমাত্র এখানে এই ঘটেছিলো আর ওখানে ওই ঘটেছিলো এসব বলে বেড়ানো। সিরিয়াস ব্যাপারস্যাপার নিয়ে তলিয়ে চিন্তাভাবনা করার মতন সময় বা গভীরতা কোনোটাই তাঁদের নেই।

মহাভারতের পাতায় নানারকম সৈন্যব্যূহের উল্লেখ পাওয়া যায়। এখন প্রশ্ন উঠতে পারে যে, যুদ্ধটা যদি সত্যিই ফেসবুকে তথা কুরুক্ষেত্রের প্রান্তরের বদলে কুরুক্ষেত্র ডট কম নামক একটি সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইট-এ হয়ে থাকে তাহলে এসব ব্যূহ-ফ্যূহ কি ঢপের কথা? --- একেবারেই না। প্রথমেই বুঝতে হবে যে সৈন্য বলতে বোঝানো হচ্ছে ট্রোল আর্মি। এবার ধরা যাক একটা লড়াই হচ্ছে যেখানে আপনি এবং আপনার শত্রু দুজনেই নিজেদের ট্রোল আর্মি নামিয়ে দিয়েছেন। আপনার থেকে আপনার শত্রু-র ট্রোল আর্মি অনেক বড়। তার ওপর আবার আপনার ট্রোল আর্মির হাতে যথেষ্ট তথ্য বা যুক্তি ইত্যাদি নেই। এইবার এই পরিস্থিতিতে কিভাবে সেনা সাজালে আপনি যুদ্ধটা তুড়ি মেরে জিতে যেতে পারবেন সেই কৌশলকেই ব্যূহ নামে ডাকা হয়। ধরুন আপনার শত্রু একা পরে গেছে, বা তার দলের একটি ট্রোল অ্যাকাউন্ট ঘুরতে ঘুরতে আপনার ওয়ালে এসে পড়েছে, তখন আপনি ব্যবহার করবেন সূচিব্যূহ। এই ব্যূহের নিয়মানুসারে সবাইকে একই কথা বলে যেতে হবে নানাভাবে। মানে একজন যদি বলে "এটা কিন্তু মেনে নেওয়া গেলো না" তাহলে আরেকজনকে বলতে হবে "তাই বলে আপনি এরকম বলবেন!" মানে অভিব্যক্তি আলাদা হলেও মোদ্দা বক্তব্যটা এক থাকতে হবে যতক্ষণ না সূঁচের ঘায়ে শত্রুপক্ষের ট্রোলটি ফালাফালা হয়ে রণে ভঙ্গ দিচ্ছে। এইরকমই মকরব্যূহ বা গর্ভব্যূহ সবেরই আলাদা আলাদা ব্যবহার রয়েছে। সাম্প্রতিক সময় থেকে চক্রব্যূহের একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ তুলে আনা যাক। এখানে শ্রী অনিন্দ্য সেনগুপ্ত সৃষ্ট এই মিমটি দ্রষ্টব্য।


এইভাবে হাজার লেখালিখি ও ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং-উত্তর চক্রাকারে একই যুক্তির বারংবার সম্মুখীন হয়ে চলার হতাশাতেই অর্জুনপুত্র অভিমন্যু নিজের কুরুক্ষেত্র অ্যাকাউন্টটি ডিঅ্যাক্টিভেট করতে বাধ্য হয়। তার পর মনের দুঃখে সে অধুনা হরিয়ানার আমিন গ্রামের কাছে দুর্গ বানিয়ে একা একা থাকতে শুরু করে। আর কোনোদিন সে কোনো সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইটে প্রোফাইল খোলেনি। প্রসঙ্গত মীম-এর জন্মও কিন্তু আজকালকার ব্যাপার নয়। শোনা যায় বহু কৌরববিরোধী মীম-এর স্রষ্টা হওয়ার ফলেই দ্বিতীয় পান্ডব ভীম নামটি অর্জন করেন। আগে ওনার অন্য নাম ছিল। অনেকে আবার বলে থাকেন, 'ভীম' আসলে 'মীম' শব্দেরই অপভ্রংশ। এ নিয়ে পন্ডিতদের মধ্যে রীতিমতো বিতর্ক রয়েছে।

সম্প্রতি, ত্রিপুরায় না কোথায় যেন, মহাভারতের আমলের একটি জাম্বো পেন ড্রাইভ পাওয়া গিয়েছে। স্বভাবতই এই নিয়ে হইচইয়ের অন্ত নেই। অনেকেই বলছেন, ওটি নাকি পেন ড্রাইভ নয়। হত্তেই পারে না! ওটি নাকি নিতান্তই ভিতরের লোহার কাঠামো বেড়িয়ে যাওয়া কোনো একটি পথপার্শ্ববর্তী বসবার জায়গা জাতীয় কিছু একটা। পুনরায় বলে নেওয়া যাক, না! যাঁরা এসব বলছেন তাঁদের দোষ ধরে কোনো লাভ নেই। এসব যুগ যুগ ধরে চলে আসা চক্রান্ত এবং অজ্ঞানতার ফল। মানুষকে ভাবতে শেখানো হয়েছে যে পুরাকালে হিন্দুরা নিতান্তই অনুন্নত ছিল। ফলে একথা স্বাভাবিক যে পেন ড্রাইভকে উন্নত প্রযুক্তি বলে মনে করে যে পিছিয়ে থাকা জনজাতি, তারা আজকের দিনে দাঁড়িয়ে মহাভারতের সময়কার প্রযুক্তিগত অগ্রগতির কথা কল্পনাও করতে পারবে না। কিন্তু আমরা হলফ করে বলতে পারি যে নিচের ছবির বস্তুটি শুধু একটি পেন ড্রাইভই নয়, ওটি একটি ফেলে দেওয়া অপ্রয়োজনীয় পেন ড্রাইভ।


কেন ফেলে দেওয়া? --- কারণ সেই সময় এইসব ব্যাপারে হিন্দুদের ঔৎকর্ষ এমন জায়গায় পৌঁছেছিল যে বাচ্চারাও আর পেন ড্রাইভ ব্যবহার করতে চাইছিলো না। বেশ কয়েকপ্রজন্ম ধরে ক্লাউডের মাধ্যমে ডাটা ট্রান্সফারে অভ্যস্ত হয়ে যাওয়ায় ওইসব তখন অপ্রয়োজনীয় মনে হতে শুরু করেছিল সবার। ধীরে ধীরে ফিজিক্যাল ড্রাইভের ব্যবহার কমে আসছিলো, যা কিনা একদিক থেকে ভালোই কারণ তাতে ইলেক্ট্রনিক ওয়েস্ট-এর ব্যাপারটা নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। আমাদের আলোচ্য পেন ড্রাইভটির সাইজ দেখেই অবশ্য বোঝা যাচ্ছে যে, যে সমাজে এই পেন ড্রাইভ ব্যবহার হতো সেই সমাজে তখনও মাইক্রো কি ন্যানো পর্যায়ে ইলেক্ট্রনিক্স-এর আর্কিটেকচার-এর ব্যাপারটিকে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। অর্থাৎ সেটি তথাকথিত সভ্যসমাজ বলতে আমরা যা বুঝি সেরকমটা নয়। সেদিক থেকে দেখলে একমত হওয়া যেতে পারে যে পান্ডব বা কৌরবদের মধ্যে কারুর এইধরণের কোনো পেন ড্রাইভ ব্যবহার করার প্রয়োজন পরবে না। এই পেন ড্রাইভটি অতএব, সম্ভবত হিড়িম্বা-র। এটি সেই সময়কার পিছিয়ে পড়া জনজাতির টেকনোলোজিকাল অ্যাডভান্সমেন্টের সাক্ষ্য বহন করে।

শুধু পেন ড্রাইভই নয়, সেইসময় কম্প্যাক্ট ডিস্কও আবিষ্কার হয়ে গিয়েছিলো। মানুষ আসলে মহাভারতকে বড্ড গোদাভাবে নেয়। যা লেখা আছে সেইটাই বলা হচ্ছে বলে ভাবে। ফলে তারা মেটাফরগুলি ধরতে পারে না এবং প্রকৃত সত্য অধরাই রয়ে যায় তাদের কাছে। অনেকেই জানেন কৃষ্ণের একটি সুদর্শন চক্র ছিল, যা ব্যবহার করে তিনি শিশুপালের মুন্ডুটি কচাৎ করে দেন। এইখানে বুঝতে হবে চক্রটিকে কেন সুদর্শন বলা হচ্ছে? --- খুবই সোজা ব্যাপার। কারণ চক্রটি চোখের সামনে তুলে ধরলে তার উপর আলো পতিত হয়ে বর্ণালীর সৃষ্টি করতো। আজকের দিনের একটি সিডি অথবা ডিভিডি তুলে ধরলে আপনিও সেই একই বর্ণালী দেখতে পাবেন। এই রং বিচ্ছুরিত হওয়ার জন্যেই কৃষ্ণের চক্রটিকে সুদর্শন বলে ডাকা হতো। এইবার শিশুপাল ছিল কৃষ্ণের একপ্রকার আত্মীয়। তার এমনিই চরিত্র বিশেষ সুবিধার ছিল না। মানে আপনি যদি নিতান্তই ভালো মানুষ হন তাহলে আপনার মা নিশ্চয়ই আপনার কাসিনকে ডেকে, "দেখিস বাবা, ওর একশো'খানা পাপ অন্তত ক্ষমা করে দিস" বলবেন না? তার উপর শিশুপালের নাকি চারটি হাত এবং তিনটি চোখ ছিল। তৃতীয় চক্ষু সাধারণত একটি দৈবিক রেফারেন্স। কিন্তু আমরা সবাই জানি যে শিশুপালের ওইসব ডিভাইন সাইড থাকার কথা কিছু শোনা যায় না। অতএব বলা যেতে পারে একটি অতিরিক্ত চোখ আসলে শিশুপালের ক্ষেত্রে ভয়ারিজমকে সিগনিফাই করছে। এইবার ধরা যাক চারটে হাতের কথা। অসাধু সরকারি আধিকারিকদের ক্ষেত্রে আমরা বলে থাকি "ও তো দুহাতে ইনকাম করে"। সেইদিক দিয়ে ভাবলে বোঝাই যাচ্ছে শিশুপাল আমাদের যুগের সরকারি অফিসারদের থেকেও অন্তত দ্বিগুন অসাধু এবং অর্থলোভী ছিল। এইবার এহেন শিশুপাল তার ১০১ নম্বর পাপটি করে ফেলে যুধিষ্ঠির আয়োজিত রাজসূয় যজ্ঞে কৃষ্ণকে "ধুর তুই তো গরু চরাস! তুই আবার রাজা হলি কবে থেকে" বলে। শ্রীকৃষ্ণ রেডিই ছিলেন। শিশুপালের এই বক্তব্যে ক্রোধান্বিত হয়ে তিনি আঙ্গুল থেকে খুলে তাঁর সিডিটি বড়পর্দায় চালিয়ে দেন। সেখানে দেখা যায় শিশুপাল তার তিনটি চোখ দিয়ে একসাথে তিনজন বৌদির ঘুলঘুলিতে উঁকি মারছে, তারপর পাবলিক রথে চেপে ভীড়ের মধ্যে চারহাতে চারজনকে কনুই মারছে; এইসব! রাজসূয় যজ্ঞের ভরা সভায়, যেখানে কিনা অনেক মান্যিগণ্যি ব্যক্তিরা উপস্থিত, এই ভিডিও সর্বসমক্ষে চলে আসায় লজ্জায় শিশুপালের মাথাকাটা যায়। সে সেই মুহূর্তে সভাত্যাগ করে চলে যায় এবং এরপর মহাভারতের আর কোনো মেজর ইভেন্টে স্বাভাবিকভাবেই তাকে দেখা যায়নি। এই ঘটনাকেই ওইভাবে লেখার ফলে আমরা শ্রীকৃষ্ণকর্তৃক শিশুপাল-এর মুণ্ডচ্ছেদ ও মৃত্যু বলে ধরে নিই। এই ঘটনায় কম্প্যাক্ট ডিস্ক এবং অডিওভিসুয়াল মাধ্যমের ভূমিকা এইভাবেই আমাদের ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছে।

উপসংহার

এইরকম আরও অনেক ঘটনার কথাই বলা যায়। যেমন, সঞ্জয় কোনো লাইভস্ট্রিমিং দেখছিলেন না। তিনি নিতান্তই কুরুক্ষেত্র ডট কম খুলে রেখে কে কি লিখেছে সেইসব পরে শোনাচ্ছিলেন ধৃতরাষ্ট্রকে। তারপর দুর্যোধনের ঊরুভঙ্গ তথা ভীমকর্তৃক সেই বিলো দ্য বেল্ট আঘাত আসলে "বাপের পয়সায় বিপ্লব হয় না। তুই আগে নিজে রাজা হ, তারপর এসব বাতেলা দিবি" জাতীয় কোনো যুক্তি। তারপর যেমন, অর্জুন আসলে কোনো যুদ্ধ থেকে সরে যেতে চাননি। তিনি নিজের কুরুক্ষেত্র অ্যাকাউন্ট ডিঅ্যাক্টিভেট করতে চেয়েছিলেন। তখন কৃষ্ণ তাঁকে, "ডিঅ্যাক্টিভেট কেন করবি রে পাগলা? তবে শোন" বলে নিজের ১০৮ খানি ফেক প্রোফাইলের নাম বলে দেন। এইসব।

কিন্তু সব যদি আমিই বলে দেব, তাহলে তো আর সেটা মহাভারত হবে না। ওই যে শুরুতেই লিখেছি, মহাভারত কারোও একা লেখার জিনিস নয়। আর তাছাড়া একা লিখলে কজনই বা পড়বে? তাই বলছিলাম আপনারাও এই গুরুদায়িত্ত্ব কাঁধে তুলে নিন। লিখতে থাকুন যে যার মতো। সেইসব লেখা একজায়গায় করেই একদিন প্রকৃত সত্যের সন্ধান পাওয়া যাবে। তদ্দিন নাহয় মূর্খরা ঝড় তুলুক ফেসবুকে। ওইসবে বিচলিত হবেন না। মনে রাখবেন, একদিন সত্যের ভোর আসবেই। সেইদিন বুঝে নেওয়া যাবে সব ব্যাটাকে।



112 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

কোন বিভাগের লেখাঃ বুলবুলভাজা  উৎসব ইস্পেশাল ২০১৮  কূটকচালি 
শেয়ার করুন


Avatar: Kushan

Re: মহাভারত ও ইন্টারনেট বিপ্লব - একটি অসম্পূর্ণ প্রস্তাবনা : শুরুর চারকথা

ভাল নেমেছে লেখা। মানে, ইয়ে, বেশ বিশ্বাসযোগ্য।
চালিয়ে যাও।
Avatar: Anamitra Roy

Re: মহাভারত ও ইন্টারনেট বিপ্লব - একটি অসম্পূর্ণ প্রস্তাবনা

সবই সত্যি, কোনও ঢপ নেই :)


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন