বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

সিঙ্গালিলা ন্যাশানাল পার্কে স্বনির্ভর অভিযান

গৌতম মিস্ত্রি


“তোমার সুর শুনায়ে যে ঘুম ভাঙাও সে ঘুম আমার রমণীয়
জাগরণের সঙ্গিনী সে, তারে তোমার পরশ দিয়ো॥
অন্তরে তার গভীর ক্ষুধা, গোপনে চায় আলোক-সুধা,
আমার রাতের বুকে সে যে তোমার প্রাতের আপন প্রিয়॥
তারি লাগি আকাশ রাঙা আঁধার-ভাঙা অরুণরাগে,
তারি লাগি পাখির গানে নবীন আশার আলাপ জাগে।
নীরব তোমার চরণ-ধ্বনি শুনায় তারে আগমনী,
সন্ধ্যাবেলার কুঁড়ি তারে সকালবেলায় তুলে নিয়ো...”

দুহাজার আঠারোর প্রাক বর্ষার খানদানি ট্রেকের শারীরিক প্রস্তুতির আর নিজেকে যাচাইয়ের জন্য একটা ছোটখাটো অ্যালপাইন ট্রেক, মানে যাকে স্বনির্ভর অভিযান বলা চলে, তেমন একটা হাওয়া উঠে ছিল গত বছরের শেষের দিকেই। ঘরের কাছেই আছে সিকিম। পশ্চিমবঙ্গ-সিকিমে ভাগাভাগি করে হিমালয়ের যে অংশটি আবহকাল ধরে বাঙ্গালি অভিযাত্রীদের হাতছানি দেয় সেটা হল সান্দাকফু-ফালুট-সিঙ্গালিলা ন্যাশানাল পার্ক, বাঙ্গালির পাহাড়ে গা গরম করার পাঠশালা। খামোকা মাথা না খাটিয়ে গন্তব্যস্থল স্থির হয়েই গেল। কেবল সঙ্গত হল না দিনক্ষণের ব্যাপারে। ফলে দুটো দল হল। আমরা দ্বিতীয় দফায় গেলাম। আরও সঠিক করে বলতে গেলে, আমাদের দলেও দুটো ভাগাভাগি হল। একই পথে পাঁচ জনের একটি দল লটবহর, মালবাহক, গাইড, রাঁধুনি, রাঁধুনির সহায়ক (যিনি বাসনপত্র মাজেন, শিবিরে পানীয় জল নিয়ে আসেন) ইত্যাদি সহ হাঁটবেন। কেবল আমরা দুজন, মানে অনুরণ ও আমি নিজেদের পিঠের ব্যাগে জামাকাপড়, শীত-পোশাক, ক্যামেরা ইত্যাদির সাথে একটি পাঁচ কিলো ওজনের সদ্য কেনা তাঁবু ও সাত দিনের খাবার-দাবার বোঝাই করে হাঁটব। আমাদের সাথে একটি তুষার-গাঁইতিও ছিল। বাড়ি থেকে বেরোনোর সময়ে আমার পিঠের ব্যাগের ওজন মেপে দেখলাম আঠারো কিলো। অনুরণের ব্যাগটা একটু বেশি ভারি ও হ্যাঁ, দলে-ভারি দলে তিন তিনটি ইয়াকও ছিল ওদের তাঁবু ও রেশন বইবার জন্য।

প্রথম তাঁবু পড়ল ‘আচলে’র জঙ্গলে


দুহাজার আঠারো সালের মার্চ মাসের ২০ তারিখে আমরা উত্‌রে পৌঁছে গেলাম। পেমা শেরপার হোম-স্টেতে একদিনের রাত্রিবাস। আমাদের হাঁটা শুরু একুশে মার্চ উত্‌রে থেকেই। উত্‌রের হোম-স্টের মালিক পেমা থাপাকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারি গ্রামের নাম-মাহাত্ম্য। হিমালয় থেকে সমতলে নামার সময় সব নদীই দক্ষিণ-মুখী হয়। এখানে উল্টো। উত্‌রের উপত্যকায় নদী কিছুক্ষণের জন্য উত্তর-মুখী। উত্‌রের কিছুটা পরে নদীটি সম্বিত ফিরে, ইউ-টার্ন নিয়ে আবার দক্ষিণ-মুখী হয়েছে।  প্রথম দিনে হাঁটা শুরু হল  উত্‌রের পাকা রাস্তার সামনের একটা খোলা মাঠে নেমে,  মাঠের ওপারের পাকা রাস্তায় ওঠা গ্রামের ঘরবাড়ির পেছন দিয়ে, কখনো বা বাড়ির উঠোন দিয়ে। ছোট্ট গ্রামটা পার করে রাস্তাও শেষ। এর পরে জঙ্গলের চড়াইয়ের পথ।  আজ আমাদের একটা পাহাড়ের গিরিশিরার মাথায় চরতে হবে। পরের দিনগুলো ঐ গিরিশিরা ধরে তিনদিন চলে পৌঁছে যাব সিঙ্গালিলা পাসের মাখায়। দ্বিপ্রহরে পৌঁছে গেলাম উত্তর-পানি নামে জঙ্গলের মাঝে একটি খোলা জায়গায়। অল্প নীচে একটি পাহাড়ি ঝর্না বলে এখানেই খাবার খাওয়ার জন্য সবাই থামে। আমরাও আমাদের রেশনের ঝোলা বার করলাম। এর পরে আর একটি জলের যোগানের কাছে অবশ্য থামা যায়। নাম তার হাগে-পানি। এই নামের মর্মার্থ কাউকে জিজ্ঞাসা করা হয় নি। সন্ধ্যার মুখে প্রথম দিনের শিবির, আচলে পৌঁছে গেলাম।


আমার আর তর সইছিল না। পিঠের ব্যাগ নামিয়ে সবার আগে সদ্য কেনা নতুন তাঁবুটি ব্যাগ থেকে বের করে তাঁবু খাটাতে শুরু করে দিলাম, যেন এ এক নতুন খেলনা। তাঁবুর পাশে তুষার-গাঁইতি দিয়ে গর্ত খুঁড়ে, পাশে পাথর সাজিয়ে রান্নার উনুন তৈরি হল। জঙ্গল থেকে গাছের শুকনো ডাল আর পাতা কুড়িয়ে আগুন জ্বালা হল। মেস-টিনে জল চড়িয়ে কফি তৈরিও হল। তবে এর মধ্যে একবার জল আনতে যেতে হয়েছিল দেড় কিলোমিটার দূরের এক পাহাড়ি ঝর্নায়। পথপ্রদর্শক না থাকলে এই পথে জলের সন্ধান মিলবে না। আকাশ আমাদের অনুকূল নয়, সারা আকাশ মেঘে ঢেকে গেছে। না হলে এখানেই পাহাড়ের রানি কাঞ্চনজঙ্ঘার দেখা মিলত। রাতে সাথে-চলা দলের লোক-লস্কররা মাঠে আগুন জ্বেলেছিল গা গরম করার জন্য। আমরাও জড় হলাম আড্ডা আর উষ্ণতার লোভে। কেবল আজ রাতের জন্য আমাদের রাতের খাওয়া-দাওয়ার নিমন্ত্রণ ছিল বড় দলের সদস্যদের কাছ থেকে। সেই কারণে আমরা আমাদের রান্নার পাটও গুটিয়ে দিয়েছিলাম। খাবার পরিবেশনের সময়ে বোঝা গেল, রাঁধুনি আমাদের জন্য বাড়তি রান্না করেননি। অতএব অনুরণের জন্য চিঁড়ে-ছাতু আর আমার জন্য স্রেফ চারটে খেজুর।

শহরে বেলা এগারোটা অবধি ঘুমনোর ক্ষমতা থাকলেও পাহাড়ে সাঁঝের আলো নিভলে ঘুমিয়ে পড়া ছাড়া আর কোন উপায় থাকে না। তাঁবুর বাইরে তারার আলো থাকলেও হাড় কাঁপানো ঠাণ্ডার কারণে তাঁবুর ভেতরে ঢুকতেই হয়। কেবল তাঁবুর ভেতরে ঢুকলেই হয় না, ঠাণ্ডার কামড় এড়াতে তাঁবুর চেইন বন্ধ করে দিতে হয়। গুটি গুটি করে স্লিপিং ব্যাগের চুম্বক তার ভেতরে টেনেই নেয়। সারা দিনের খাটুনির আশীর্বাদ স্বরূপ নিমেষে ক্লান্তিহরা ঘুম চোখের পাতায় আসন পাতে। সকাল পাঁচটার এক ঝটকায় চোখ খুলে যায়। এর পরে তাঁবুর ভেতরে থাকা এক শাস্তি বলে মনে হয়। সকালের বড় কাজটার আগে চা লাগেনা। টিসু পেপার বা জলের বোতল নিয়ে এক দৌড়ে ঝোপের আড়ালে কাজটি সেরে ফেলতে হয়।

ঘুঁটে


প্রথম দিনে আগুন জ্বালানোর সময়েই খেয়াল হয়েছিলো যে আগুন জ্বালানোর শুরুটায় একটা লড়াই থাকে। সেই লড়াই হল ভিজে কাঠের সাথে আর বাতাসের বেগের সাথে। আগুন একবার ধরে গেলে আর সমস্যা থাকেনা। তখন ভিজে কাঠও জ্বলে, উত্তাপ দেয়। প্রথমের লড়াইয়ে কেরোসিন বেশ কাজের। চার-পাঁচ চামচ কেরোসিন পাওয়া গেলে আনাড়িও আগুন তৈরি করে দেয়। অনুরণের সাথে গত রাতেই কাঠ পাওয়া যায়না এমন জায়গায় জ্বালানির বিকল্প নিয়ে কথা হচ্ছিল। অনেক সময়ে আশেপাশে জংলি জানোয়ারের বাসি শুকনো মল পাওয়া গেলে সেটা কাঠের একটা উৎকৃষ্ট বিকল্প হতে পারে। আমাদের অ্যালপাইন ট্রেকের প্রথম রাত শেষ হল। সকালে ঝোপের আড়ালের অবশ্য কর্তব্যটা সেরে ফেরার পথে অনুরণ এক আঁচলা ছাগল জাতীয় পশুর শুকনো মল নিয়ে এলো। বলল, বেশ ভালো ঘুঁটে হবে পরের ক্যাম্পে। বিনা বাক্যব্যয়ে কাগজে মুড়ে আমি আমার রাকস্যাকের পকেটে চালান করে দিলাম। পরের ক্যাম্পে ঝাল-সুজি বানানোর সময়ে প্রচণ্ড বেগের হাওয়া স্বত্বেও সেটা চটপট আগুণ তৈরি করে দিয়েছিল। সেই দ্বিপ্রাহরিক খাবার আমাদের অ্যালপাইন ট্রেকের সবচেয়ে সুস্বাদু ও শেষ গরম খাবার ছিল। তারপর বাকি চারদিনে তীব্র হাওয়ায় কারণে আমরা আর আগুন জ্বালাতে পারিনি।

দ্বিতীয় শিবির, থুলাধাপ


“আজি ঝড়ের রাতে এ কার অভিসার!

বল কী হে! ভল্লুক নাকি?”

দ্বিতীয় শিবিরের পথ ছোট। দু’ঘণ্টা হেঁটেই পৌঁছে গেলাম থুলাধাপে। তারপর তো বড় মনোরম পরিবেশে দুপুরে ঝাল সুজি পাকানো হল আগুন জ্বেলে। এই শিবিরটা দুটো পাহাড়ের ঢালের মাঝে এক বিশাল ময়দানের মত। মাঝখান দিয়ে একটা ঝর্না বয়ে চলেছে। দুইদিন পরে হাতের নাগালে জল পেয়ে সবাই সাফসুতরো হয়ে নিলাম। দুপুরের পরে হাওয়ায় বেগ হয়ে উঠল তীব্র। আগুন জ্বালানো দায়। আগুন জ্বেলে নুডল্‌স ফোটানোর ক্ষীণ ইচ্ছেটায় শেষমেশ জল ঢেলে বিকেল থেকে শুরু হল বৃষ্টি। আমরা অবশ্য রাতের জন্য যথেষ্ট জ্বালানি শুকনো কাঠ জোগাড় করে রেখেছিলাম। কাজে লাগল না। তাঁবুর মধ্যে সেঁধিয়ে গেলাম। আবহাওয়া পরিষ্কার থাকলে এখানে তাঁবুর মধ্য দিয়েই কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে পাওয়ার কথা। আমরা এখানে তার আভাস পেলাম না। অগত্যা চিঁড়ে ছাতুর বোঝা একটু হাল্কা করে স্লিপিং ব্যাগে ঢুকে পড়লাম।

একটু তন্দ্রা মতন এসেছিল। প্রচণ্ড এক বজ্রপাতের শব্দে তন্দ্রা ছুটে গেল। আমি ভাবলাম আমি আছি আমার পরিচিত বেডরুমে। ভাবলাম, বোধহয় কালবোশেখি একটু আগেই বুঝিবা এসে পড়লো। দেখি মাথার উপরে আকাশ আর আকাশের বিভিন্ন কোণে বিদ্যুতের আলোর ঝলকানি। তন্দ্রা ছুটে যাবার পর মালুম হল আমরা ঘন জঙ্গলের মাঝখানের একটা মাঠে হিমালয়ের খামখেয়ালিপনার স্বাদ নেবার স্পর্ধা দেখাতে এসেছি। হিমালয় আমাদের গ্রাহ্যের মধ্যে আনেনা, সেটা জানতাম। এইক্ষনে সেটা হাড়ে হাড়ে বুঝে নিতে হচ্ছে। অন্য উপায় নেই। থুলাধাপ-এর সেই রঙ্গমঞ্চে মেঘের দল দলে দলে এসে জড় হয়ে তাদের কেরামতি দেখানোর প্রতিযোগিতায় নেমেছে। একসাথে এতো বজ্রপাত আগে কোথাও দেখেছি মনে পড়ছে না। আমাদের তাঁবুটা টিকবে তো? তাঁবুটাও নতুন, পেশাদার স্থানীয় গাইড ছাড়া স্ব-চেষ্টায় তাঁবু খাটানোও এই প্রথম বার। প্রথম বারেই বড় কঠিন পরীক্ষা নিচ্ছে হিমালয়।


হঠাৎ মনে হল তাঁবুর ’পরে বৃষ্টির ফোঁটার শব্দটা কেমন কর্কশ শোনাচ্ছে। মাথার দিকের জাল লাগানো তাঁবুর জানালার পর্দাটা তুলে আবছা আলোয় দেখি থুলাধাপ-এর ময়দানটা সাদা হয়ে গেছে। বড় নকুলদানার আকারের শিল পড়ছে। সাথে ঝোড়ো হাওয়া। আমাদের কম্পমান তাঁবুটা হাওয়ার বেগের সাথে এক অসম যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। অনুরণকে ব্যাপারটা জানাতে ও ধড়মড় করে উঠে তাঁবুর জানালায় চোখ রেখে দৃষ্টি বিনিময় করল। ওর চোখে ছিল আমাদের ঘিরে থাকা প্রকৃতির এই বীভৎস প্রলয় রূপ দর্শনের আনন্দ আর আমাদের সুরক্ষা বিপন্ন হওয়ার আশঙ্কার অসহায়তা। স্লিপিং ব্যাগে ঢোকার আগে আকাশে শেষ সূর্যের আলো বিদায় বেলার মোহময় নাইট বাল্বের মত আলো ছিল।  চারপাশের জঙ্গলে এখন নিকষ কালো আঁধার। একটু আগেই অন্ধকার থুলাধাপ-এর ময়দানে প্রকৃতির আপন খেলার মাঝে অনাহুত দর্শকের মত অকিঞ্চিৎকর নগণ্য মানুষগুলো শীর্ণ কম্পমান তাঁবুর আচ্ছাদনে স্লিপিং ব্যাগের মধ্যে ঠাণ্ডার আর অনিশ্চিতের আশঙ্কায় তাঁবুর মতোই কাঁপতে কাঁপতে ঘুমানোর চেষ্টায় ছিল। আমাদের তাঁবুটা একটা ঘাসে ঢাকা ঢালে খাটানো হয়েছিল। সেই ঢালের দৌলতে তাঁবুর তলায় জল জমা থেকে আমরা সে যাত্রা রেহাই পেলাম।

প্রকৃতির এমন বীর-রসে ভরা প্রলয়নৃত্য ঘণ্টা দুয়েক পরে সয়ে গেল। ভেবে নিলাম দর্শক-আসনে আমরা এ যাত্রা অক্ষত অবস্থায় রেহাই পেয়ে গেলাম। একসময়ে ঘুমিয়ে পড়লাম। মাঝ রাতের পরে একসময়ে ছোট বাইরে পেল। তাঁবুর বাইরেটা তখন আশ্চর্য রকমের শান্ত। টর্চ জ্বেলে দেখি রাত তিনতে। তাঁবুর বাইরের ‘আউটার’-এর (দুই পরতের তাঁবুর আচ্ছাদনের বাইরেরটা) একটি কোণা হাওয়ায় উড়ছে। কী সর্বনাশ! বাইরে বেরোতেই হচ্ছে। অনুরণও বেরোল। বাইরের ময়দানটা তিন-চার ইঞ্চি সদ্য পড়া তুষারে ঢেকে গেছে। তাঁবুর একটা খোটা উপড়ে গেছে। তার পাশে বরফের উপরে চারপেয়ে কোন এক জন্তুর মল। ইয়াকের গোবর নয়। তার মানে বরফ পড়া শেষ হবার পরেই জন্তুটি এসেছিল। অনুরণ বলল, ও ঘুমের মাঝে অচেনা কোন জন্তুর ডাক শুনেছে। তাঁবুর খোটা উপড়ানো তার কীর্তি নয় তো? এ অঞ্চলে ভাল্লুক ও ছোট বাঘ আছে বলে শুনেছি। বাথরুম সারতে তাঁবু থেকে বেশিদূর যাওয়ার প্রয়োজন নেই। একে অপরের পাহারায় থেকে কাজকর্ম সারলাম।

হাওয়া মহল


সকালবেলা থুলাধাপে ঝলমলে রোদ্দুর। কে বলবে গতরাতে বৃষ্টি মেঘের গর্জন আর বিদ্যুতের চমকে আমরা কি ভীষণ চমকে ছিলাম। তাঁবু শুকানোর সমস্যা নেই। তাঁবুর ’পরে পড়া তুষার গলে, শুকোতে আধঘণ্টা যথেষ্ট। দ্বিতীয় শিবির থুলাধাপ থেকে কালিজোরের পথ বড় নির্দয় ভাবে একনাগাড়ে খাড়া ভাবে উপর-পানে উঠে গেছে। সরু পায়ে চলার শুঁড়ি-পথ। পথের ’পরে গত রাতের অবিরাম তুষারপাতের নরম ধবধবে সাদা বরফের আস্তরণ। চলে ফিরে বেড়ানোর জন্য গাড়ির রাস্তায় আসা-যাওয়ার বন্দোবস্ত থাকলে হাতের নাগালে বরফ আমাদের মন্দ লাগেনা। কিন্তু একমাত্র পায়ে চলার পথে বরফের প্রলেপ সুখকর নয় মোটেই। পা পিছলে যায়, পথের কাদায় জুতো ভিজে যায়। তার উপরে অসভ্য ইয়াকের যাওয়া আসার ফলে রাস্তাটা সভ্য মানুষের উপযুক্ত নেই। আমরা কাদা বাঁচিয়ে, আছাড় খাওয়া সামলে, হাঁপাতে হাঁপাতে উপর-পানে গুটি গুটি চলেছি। সেই ক্লেশের পথে মনোহরণ বিরাম হিসাবে পথের দু'ধারে লাল হয়ে যাওয়া রডোডেন্ড্রনের সারি না থাকলে হিমালয়ের অন্দরমহলে পাগল পানা লোকজন আধপেটা খেয়ে ঘুরে মরত না।


তৃতীয় দিনের হাঁটা শুরু করার একটু পরেই একদল ফিরতি পথের অভিযাত্রীদের সাথে দেখা হল। এনারা একই পথে উপর-পানে তৃতীয় শিবিরের স্থান কালিজর অবধি গিয়ে ফেরত আসছেন। এ-তো আর কোলকাতার এসপ্ল্যানেড নয় যে মুখ গোমড়া করে বিলাইতি কায়দায় আকাশপানে বুড়ো আঙ্গুল খাড়া করে, ‘হাই-হ্যালো’ বলে, শুকনো মুখের হাসির ইমোজি মেখে মানুষ যে যার পথে গতিবেগ না কমিয়েই চলে যাবে। এ হল হিমালয়। হিমালয়ে উন্নাসিক মানুষ আত্মীয় বনে যায়। অপরিচিতের সাথেও দু’দণ্ড দাঁড়িয়ে সুখ-দুঃখের কথা হয়। ল্যাবঞ্চুস বিনিময় হয়। তারা যেটা বললেন সেটা একটু অভিনব। বললেন, কালিজর-এ জলের সমস্যা আছে। জল সংগ্রহ করার ব্যাপারটা নিজেই একটা স্বতন্ত্র অভিযান। তাঁরা নীচের ক্যাম্প, ‘থুলাধাপ’ থেকে জল ঘাড়ে করে নিয়ে যাবার জন্য পীড়াপীড়ি করলেন। অবশ্য বললেন, ওনারা নিজেরা অবশ্য জল আনতে যাননি। মানে জল সংগ্রহ করার কাজটা ওদের মাল-বাহকরাই করেছেন। তবে ব্যাপারটায় একটা গেঁড়ো আছে এটা বেশ বোঝা গেল। আমরা নিজেদের শক্তির উপরে যতোটা আস্থা রাখি তার চেয়ে বেশি ভরসা করি অল্পে মানিয়ে নেবার ক্ষমতায়ই। সেই রোমান্টিকতার সমীকরণে আমরা কেবল আগামী শিবিরের জলের সমস্যার ব্যাপারটা আপাতত কোল্ড-স্টোরে পাঠালাম। মনের উপরে চাপ বাড়তে দিলাম না। চাপ বাড়া-কমার নিয়ন্ত্রণ আজকাল সাবলীল হয়ে গেছে। আলাদা করে মাথা ঘামাতে হয় না।

দলে-ভারি দলটা, মানে যে দলে মাল-বাহক আর ইয়াক আছে, তারা এগিয়ে গেছে। আমরা দু’জনা পিঠের বোঝার পিছনপানের টান টেনে শম্বুক গতিতে চলেছি। আজ ঘণ্টা চারেকের পথচলা। এই চলার মুহূর্ত গুলি তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করব বলেই কিনা এতোটা পথ আসা! আমাদের তাড়া নেই। সান-বার্ড আর পাহাড়ি ময়নার কলতান শুনতে শুনতে, রডোডেন্ড্রনের রঙে মন রাঙিয়ে নিতে নিতে এগিয়ে চলেছি। পথের ধারে বেঞ্চির মত পিঠের বোঝার সাথে নিজেকে ঠেকা দেওয়ার পাথরের স্তূপ পেলে দু’দণ্ড বিশ্রাম নিয়ে নিচ্ছি। আবার কখনো কখনো অল্পবিস্তর উৎরাইয়ের পথে পেলে দু’কলি গানও গেয়ে নিচ্ছি। সূর্য যখন ঠিক মাথার উপরে তখন আমরা চলে এলাম একটা প্রায় অনুভূমিক গিরিশিরার উপরে। আমাদের বাম দিকে তখন একটা স্বল্প উঁচু পাথরের ঢিবি আর ডানদিকে অতলস্পর্শী খাদ। মধ্য উচ্চতার লম্বা গাছপালা এইখানে উধাও। চারধারে কেবল নুড়ি পাথরের মাঝে সোনালি রঙের ঘাস। উত্তর দিকের সেই খাদের ওপারে অপেক্ষাকৃত কম উচ্চতার গিরিশৃঙ্গ। তারও দূরে উত্তর দিগন্তে ডানপাশে পান্ডিম ও দু’ধারে অন্যান্য গিরিশৃঙ্গ সহ কাঞ্চনজঙ্ঘা স্বমহিমায় উঁকি মারছে। আমরা তাহলে পোঁছেই গেলাম হিমালয়ের অন্দরমহলে। ডানদিকে বেশ খানিকটা নীচে দুটো পাশাপাশি ফৌজি শিবির ভারত ও নেপালের আন্তর্জাতিক সীমানা পাহারা দিচ্ছে। নৌকার গলুইয়ের মত একটা গিরিশিরার অংশে তাঁবু খাটানোর জায়গা। অগ্রগামী দলের তিনটা তাঁবু খাটানো হয়ে গেছে। শীর্ণ গিরিশিরার এই পথে কেবল এইখানটায়ই কোনমতে রাত কাটানো যায়। উত্তর দিকে দিকে প্রচণ্ড বেগে হাওয়া এই গলুইয়ের মত জায়গাটা তাক করে ধেয়ে এসে তাঁবু কাঁপিয়ে দক্ষিণ দিকে বয়ে যাবার সুযোগ পায়। এখানে তাঁবু পাতার জায়গা নির্বাচন একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বটে। অনুরণ বিস্তর খোঁজাখুঁজি করে কচ্ছপের পিঠের মত একটা চৌকাকার জায়গা খুঁজে পেল অন্য তাঁবুগুলির থেকে কিছুটা দূরে। বৃষ্টির জল তাঁবুর তলায় ঢুকবেনা বলে এই জায়গাটা আমাদের দু’জনেরই পছন্দ হল। জায়গাটার নাম কালিজর। আমাদের চলার পথের শিবির গুলোর মধ্যে তাঁবুর সাথে মল্ল-যুদ্ধে হাওয়া এখানেই খানিকটা তাঁবুকে প্রায় পেড়ে ফেলেছিল। দয়া করে শেষে হাওয়া রেহাই দিয়েছে তাঁবু সহ তাঁবুর মধ্যের নগণ্য জীব দু’টিকে। নাম পাল্টানোর ক্ষমতা থাকলে এই জায়গাটার আমি নাম দিতাম হাওয়া-মহল।


তৃতীয় শিবির কালিজর-এ তাঁবু খাটানো গেল বিস্তর খাটাখাটনি করে। হাওয়ায় দাপটের সাথে যুঝবার জন্য তাঁবুর দু’ধারের প্রতিটি দড়ি বাঁধার খুঁটি বা ‘পেগ’-এর উপরে একাধিক ভারি পাথর চাপালাম। আসলে বোঝা হাল্কা করার জন্য আমি তাঁবুর পেগ অর্ধেক সঙ্গে নিয়েছিলাম। এই পাথর চাপানোর বন্দোবস্তের ব্যাপারে একরকম নিশ্চিন্ত ছিলাম। কালিজরে পৌঁছানোর আধ ঘটার মধ্যে ডান দিকের সেনা ছাউনি থেকে চারজন জওয়ান এসে হাজির। প্রথাগত খোঁজ খবর করা জন্য। কারণ কাছেই নেপাল সীমান্ত। আমরা ভারতেই ঘোরাঘুরি করব শুনে ফিরে গেলেন। যাবার সময় সিঙ্গালিলা-পাসের রাস্তার হদিস দিয়ে গেলেন।

জলকে যাওয়া


এরপরে একটা কঠিন কাজ অপেক্ষা করে ছিল। একটু বেখাপ্পা ঠেকলেও বুঝে গিয়েছিলাম, আমাদের সঙ্গে আমাদেরই বন্ধু বান্ধব প্রয়োজনীয় লটবহর ও লোক লস্কর নিয়ে আমাদের সাথে সাথে চললেও তাদের কাছ থেকে এক গ্লাস পানীয় জল পাবার উপায় নেই। এই পথে পানীয় জল একটি মহার্ঘ বস্তু। ঐটি দান-ধ্যান করা নাও যেতে পারে। সেটা দোষের নয় মোটেই। ওনাদের একজন মালবাহক জল আনতে যাচ্ছেন। আমরা তার পিছু নিলাম। ‘উত্‌রে’ থেকে ‘ফালুট’ অবধি পায়ে চলার পথটা গিরিশিরা বরাবর, যেখানে প্রাকৃতিক ভাবে নদীনালা থাকার করা নয়। সচরাচর ট্রেকের পথে উপত্যকা পড়লে বা কোন পাহাড়ি নদী বয়া ঝর্না বরাবর চলার পথ হলে জলের যোগানের জন্য ভাবতে হয় না। কালিজর-এ জলের জন্য শিবিরের দক্ষিণ দিকে আশি ডিগ্রি বিপদসংকুল ঢাল বেয়ে একটা ক্ষীণকায়া পাহাড়ি ঝর্নার সন্ধানে আর একটা অভিযানে যেতে হবে। সদ্য তুষারপাতের ফলে সে পথে কাদার পুরু প্রলেপ। চারটে খালি জলের বোতল নিয়ে আমরা দু’জন ঐ পথ-প্রদর্শকের পিছু পিছু গুঁড়ি মেরে নামতে লাগলাম। আগুন না হলেও আমাদের আজকের দিন চলে যাবে। পানীয় জল না হলে চলবে না। দু’একজন অত্যুৎসাহী অন্য দলের সদস্য আমাদের সঙ্গ দেবার জন্য আমাদের পিছু পিছু নামতে লাগলেন। অল্প সময়ের মধ্যেই পথের দুর্গমতা তাদের নিরস্ত করল। ভাঙ্গা গাছের গুঁড়ির তলা দিয়ে, আশেপাশের গাছপালার ডাল ধরে, চার হাত-পায়ে আমরা কেবল নেমেই চললাম একটা পাহাড়ের গর্জকে নিশানা করে। আওয়াজে বুঝলাম, ঐ পাহাড়ের গর্জের পাথরের নিচে কোন অদৃশ্য পাহাড়ি ঝর্নার লুকোচুরি খেলা চলেছে। আমরা শিকারির মত আক্ষরিক অর্থে হামাগুড়ি মেরে ঝর্নার জল বোতল-বন্দি করার আশে সন্তর্পণে চলেছি, কারণ আমাদের সোজা হয়ে হাঁটার উপায় ছিলোনা। এইক্ষনে এই শব্দগুলো নিশ্চিন্তে লিখে চলেছি ধীর লয়ে, সেই মুহূর্তে অতলস্পর্শী ঢাল বেয়ে নামার সময়ে অনিশ্চয়তা ছিল, ঝুঁকি ছিল, অল্পবিস্তর ক্লেশ ছিল, আর সর্বোপরি ফেরার পথে উপরে ওঠার দুর্ভাবনাও ছিল। সেই অনিশ্চয়তার রোমাঞ্চ, ক্লেশ, ঝুঁকি, অনিশ্চয়তা আর সবশেষে সাফল্যের অফুরান আনন্দ আমাদের ব্যক্তিগত প্রাপ্তি। সেটা অনুভবের আভাস বোঝানো কঠিন, সেই অনুভবের আনন্দ চাইলেই দান-ধ্যান করা যায় না।


আমরা তখন গোয়েন্দার চোখে গিরিখাত বা পাহাড়ের গর্জ বরাবর নেমে চলেছি। ঝর্না কোথাও ক্ষণিকের জন্য হলেও আত্মপ্রকাশ করবে। আর সেখানেই চার বোতল প্রাণবারি যাঞ্চা করব। একটা জায়গায় বরফ-কাদা বেয়ারা রকমের পিছল। আমরা দুজনে অধোপানে নামতে বেশ সময় নিয়ে ফেলেছি। ঘন জঙ্গলে ঢাকা, দিবসে-অন্ধকার সেই গিরিখাতে এবার রাস্তা কোনপানে সেটা ঠাওর করার জন্য পথপ্রদর্শককে হাঁকাহাঁকি করছি। অদৃশ্য ঝর্নার আর হাওয়ায় আওয়াজ সাথে আমাদের আওয়াজ বেশিদূর আপন বৈশিষ্ট্য রক্ষা করতে পারছেনা। বার চারেকের প্রচেষ্টায় আমারা নিশ্চিত হারিয়ে যাওয়া অবস্থা থেকে কোনমতে রক্ষা পেলাম। পথপ্রদর্শকের আওয়াজ পেলাম অনেক অনেক নীচে। শিবির থেকে এই মিনিট কুড়ি ধরে যতোটা নেমেছি তার চেয়েও বেশি নীচ থেকে এলো সেই ডাক। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামার সময় হয়ে এলো। আমরা অনেকটা নেমে এসেছি। যদিও বেশ বুঝতে পারছি, ওঠার সময়ে বেশ কসরত করতে হবে। তবুও নেমে চলেছি এলো অন্ধকারময় পাহাড়ের গর্জে, এক অচেনা সন্ধ্যায়। অনুরণ আমাকে ফিরে যেতে বলল। ও একাই নাকি ম্যানেজ করে নেবে। ধ্যাত, তাই হয় নাকি!

এবারে সোজাসুজি নামার উপায় নেই। ডায়ে-বাঁয়ে জিগজ্যাগ করতে করতে কোনমতে যখন জলের উৎসে পৌঁছলাম, দেখলাম তিন ফুট বাই চার ফুট অগভীর একটা গর্ত। অমায়িক হাসি হেসে, পথপ্রদর্শক বলল গত রাতের বৃষ্টির দরুন বেশ উপরেই জল পাওয়া গেল। নইলে এর চেয়ে দ্বিগুণ পথে নীচে নেমে জলের সন্ধান মিলত। ভদ্রলোক বলেন কি! গর্তের মাঝে নিকষ কালো জলের উপরে ঝরা পাতা, তলার দিকে শ্যাওলা। গর্তের উপরের দিকে একটা চোরা জলের ধারা হয়তো বা আছে, কারণ গর্তের সামনের দিকটায় একটা পেট কাটা প্লাস্টিকের বোতলের উপরের দিকটা ফিট করা আছে। তার মুখ থেকে টপ টপ করে জল পড়ছে। আগে আরাম করে মাটিতে থেবড়ে বসে নিতে হবে। কারণ ঐ জলের ধারা থেকে বোতল ভরতে যথেষ্ট সময় লাগবে। চারটা বোতলে আমরা ছয় লিটার জল ভরে উপর-পানে চললাম। এতেই আমাদের দুজনের একরাতের জলের প্রয়োজন মিটে যাবে। তাঁবুতে ঢোকার সময়ে হিসেব করে বুঝলাম, পানীয় জল সংগ্রহের জন্য আমরা ঘণ্টা দুয়েক সময় দিয়েছি।

বিনা আগুনে মহানন্দে কাটল যে দিন


কাঞ্চনজঙ্ঘার দেওয়াল থেকে হিমশীতল হাওয়া উত্তরের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ফাঁকা পেয়ে শক্তি বৃদ্ধি করে যেভাবে আমাদের শিবিরের অঞ্চলটা দিয়ে বয়ে চলেছে সেখানে কেতাদুরস্ত কিচেন টেন্ট ছাড়া আগুণ জ্বালানোর উপায় নেই। আমাদের দুজনের কারোরও চায়ে আসক্তি বা নির্ভরশীলতা নেই। সকালে চিঁড়ে-ছাতু খেয়ে একটানা চড়াই চরেছি। তারপর জলের জোগাড়ে জলাঞ্জলি দিতে হয়েছে আরও কিছুটা জান। সন্ধ্যে বেলায় পেটে ছুঁচো ইঁদুরের টান। অগত্যা বাদ পড়ে যাওয়া লাঞ্চকে একটু ঠেলে আর ডিনারকে একটু টেনে একসাথে করে এ বিষয়ে মনোযোগ দিতে হল। বারো হাজার ফুট উচ্চতায় মেঘেদের দেশে আমাদের ক্ষণিকের অনধিকার প্রবেশ। মেঘের দল আকাশ কালো করে সেজে-গুজে তৈরি হচ্ছে তাদের প্রতিরাতের বারিবর্ষণের যাত্রাপালার জন্য। প্রচণ্ড হাওয়ায় কারণে টেন্টের বাইরে দু’দণ্ড থাকার উপায় নেই। শিবিরের সবকটি প্রাণী তাঁবুতে সেঁধিয়ে স্লিপিং ব্যাগের ওম নিচ্ছে। ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি শুরু হল। আজ রাতে গরম খাবার বা ট্রেকারদের ভাষায় হট মিল-এর ভাবনাও মাথার নাগালে আনা যাছে না। সকালে খেয়েছি চিঁড়ে-ছাতু। অনুরণ বলল এবেলায় একটু বৈচিত্র্য হোক, মানে ছাতু-চিঁড়ে। এই না হলে তাঁবু-সঙ্গী! আমার কথায় ব্যঙ্গের সূর শুনে সিরিয়াস মুখে বলল তা কেন? সকালে চিনি দিয়ে খেয়েছি এবেলায় পিঁয়াজ কাঁচা লঙ্কা দিয়ে খাই। এই পাহাড়ি রাঁধুনিগুলো রাঁধলে যতোটা খাই তার চেয়ে একটু বেশিই খাওয়া হল। শেষ পাতে খেজুর, আমসত্ত্ব আর কিসমিসের ডেজার্ট। ইতিমধ্যে গুরুগম্ভীর মেঘের দামামা সহ বিদ্যুতের ঝলকানি নিয়ে শিলাবৃষ্টি আছড়ে পড়ল তাঁবুর উপরে। তাঁবুর ভেতরের আমরা গা ঘেঁষাঘেঁষি করে বসলাম। সবশেষে কাপড়ের ছাকনি দিয়ে ছেঁকে নেওয়া সন্ধ্যার অভিযানে সংগ্রহ করা পাতা-পরা জল পানে করে দু-চারটি তৃপ্তির ঢেকুর। ক্লান্তিতে চোখে তখন একশ-হাজার ঘুম-পরীদের অভিসার। তাঁবুর ’পরে শিলাবৃষ্টির ঘুমপাড়ানি তানে, স্লিপিং ব্যাগের ওমে ক্লান্তিহরা তৃপ্তির ঘুমের দেশে এক নিমেষে পৌঁছে গেলাম। মিনিট পনেরো পরেই বাইরে একটা শোরগোল। সঙ্গী দলের গাইড আমাদের তাঁবুর পেছনের দিকে হাঁকাহাঁকি করছে। বলছে আমাদের তাঁবু নড়বড়ে হয়ে গেছে, কোলাপ্স করে যাবে। অনুরণ দৌড়ে বাইরে গেল। দশ মিনিট পরে কাক-ভেজা হয়ে কাঁপতে কাঁপতে ঢুকে বলল তাঁবুর সবকটা বাঁধন (পেগ) অন্তত দুই ইঞ্চি করে আলগা হয়ে গেছিল। ভাগ্যিস ঐ গাইড দেখেছিল। কী করে এমন হল? হাওয়ার চক্রান্ত কি? বাকি রাতে আর কোন উপদ্রব হয়নি। আমাদের কাঁচা হাতের খাটানো স্বদেশী ভারি পুরানো স্টাইলের (A style) তাঁবু সেই দুর্যোগের রাতে আমাদের নিশ্চিন্তের ঘুম উপহার দিল।


সকালবেলা কালিজরে মেঘলা আকাশ। রাতের তুষারপাতে তাঁবু ভিজে ভারি হয়ে গেছে। শুকানোর উপায় নেই। অগত্যা পিঠের ব্যাগের ওজন দুই কিলো বাড়ল। কালিঝর থেকে সকাল ন’টায় পরের শিবির ফালুটের উদ্দেশ্যে পথ চলা শুরু। সকালের মৃদুমন্দ মনোরম সমীরণ, মেঘ ছেঁড়া রোদ আর উত্তর দিগন্তে মেঘ-মালায় শোভিতা কাঞ্চনজঙ্ঘা গত রাতের উপদ্রবের কালিমা ঘুচিয়ে দিল। আমরা গত চার দিনে কাঁচা খাবারে বেশ অভ্যস্ত হয়ে গেছি। সকালে চায়ের প্রয়োজনও হচ্ছে না। চাইলেও আড়াল আবডাল-হীন কালিঝরের গিরিশিরার উপরে ভিজা কাঠ জ্বালানো অসম্ভব ছিল। পশ্চিম দিকে অল্প ঢালে উঠে পড়া যায় ‘ফুক্টেধারা’ নামে এক পাহাড় চূড়ায়। ওটাই নাকি এখানের চারপাশটা দেখার খানদানি ‘ভিউ পয়েন্ট’। কিন্তু সকালের আকাশ তো তখন সাদা মেঘের দখলে। তারা আড়াল করে রেখেছে উত্তর দিগন্তের কাঞ্চনজঙ্ঘা সহ সহচরী তুষার শৃঙ্গের সমাহার। হিমালয়ের পাহাড় চূড়ার মধ্যে এই কাঞ্চনজঙ্ঘাই একমাত্র রানি, বাকিসব সহচর, সখা। সেই রানির মাথায় মেঘের অবগুণ্ঠন দেখে মন খারাপ করতে নেই। প্রাণের আকুতি নিবেদন করে অপেক্ষায় থাকতে হয়। ক্ষণিকের জন্য হাওয়ায় রানির আঁচল একটুখানি উড়ে গেলে সেই চোখাচোখির রোমাঞ্চই আলাদা। সেই রোমাঞ্চের স্বাদ পেলাম খানিকটা পরেই।

আমাদের নীচেও মেঘ, উপরেও মেঘ। সেই মন ভার করা সকালে খামোকা ‘ফুক্টেধারা’র খাড়াই বেয়ে উপরে চড়ার কোন মানে হয় না। আজ আমাদের পথ বড় লম্বা। উত্তরে নেপালের সীমান্ত। ফালুটে যাবার পথ পশ্চিমে, ফুক্টেধারার দক্ষিণ দেওয়ালের গায়ের এক শীর্ণ পদ-রেখা ধরে। চড়াই-উৎরাই বিহীন এই পথ ধরে মিনিট পনের যাবার পরই শুরু হয়ে গেল ম্যাজিক। আমরা তখন দুই পাহাড়ের দেওয়ালের মধ্যে একটা সংযোগ রক্ষাকারী ছোট ঘাসে ঢাকা জমিতে পৌঁছে গেছি। আকাশের মেঘ-বালিকার দল বোধহয় বাতাস-বন্ধুর হাত ধরাধরি করে অন্য কোন আকাশে খেলতে গেছে। সখা-সখি সহ পাহাড়ের রানি  উত্তর দিগন্তে খসিয়ে দিয়েছে মেঘের উত্তরীয়। কাঞ্চনজঙ্ঘার বাম দিকে আরও খানিকটা পেছনে ওটা কী? চোখ কচলিয়ে ভালো করে আবার দেখি।  আরে, ইনিই তো তিনি। কেউ না বলে দিলেও এনাকে চিনি। ইনি রাজাধিরাজ এভারেস্ট। বাচ্চা-বুড়ো সবাইই এভারেস্টকে চেনে, এভারেস্টের অবয়ব ভুল হবার নয়।


এরপর পাতলা হাওয়ায় চড়াই চড়ার পালা। ডায়ে-বাঁয়ে পাহাড়ের দেওয়াল খাড়া ভাবে অনেকটা নীচে নেমে গেছে। শীর্ণ গিরিশিরার উপরে পায়ে চলার রেখা সাপের মত এঁকে-বেঁকে আকাশের দিকে উঠে গেছে। সাথের বড় দলটা ইয়াকের পিঠে মালপত্র চাপিয়ে অনেকটা এগিয়ে গেছে। আমরা চলেছি দুলকি চালে, পিঠের বোঝার কারণে বেশ খানিকটা সামনে ঝুঁকে। দৃষ্টি কেবল পথের ’পরেই। সামনের পথের দিশার সন্ধান করতে হলে দাঁড়িয়ে পড়ে মুখ তুলে দেখতে হচ্ছে। হাঁপাতে হাঁপাতে, পথের ধারে বিশ্রাম নিতে নিতে একসময় চড়াই চড়া শেষ। একরকম হঠাৎই চড়াই শেষ হয়ে গেল। বুঝতে সময় লাগলো যে, আমরা সিঙ্গালিলা পাসের মাথায় পৌঁছে গেছি। এত তাড়াতাড়ি পাসের মাথায় পৌঁছে যাব ভাবিনি। সামনে ফালুট যাবার পথ নেমে গেছে। এইখানে পিঠের বোঝা নামিয়ে বাম দিকে একটু বরফে গড়িয়ে নেওয়া দস্তুর। কারণ বাম দিকেই সিঙ্গালিলা টপ - যেখানে ফটো তোলা, চকলেট বিনিময় বা ধুপকাঠি জ্বালানোর জন্য পাথর ও পতাকা সাজানো আছে। আমরাও আমাদের ছবি তুললাম - বিভিন্ন পোজে। সিঙ্গালিলা পাস থেকে এই চূড়াটা মাত্র শ’খানেক ফুট উঁচুতে যার চারপাশে তখন নরম তুষারের গালিচা বিছানো ছিল।

সন্ধ্যে বেলায় পথ হারালাম



সিঙ্গালিলা পাসের মাথা থেকে ষাট-সত্তর ডিগ্রি ঢালের দেওয়ালের রাস্তা নেমে গেছে এক নদীগর্ভে। সোজা হয়ে নামার উপায় নেই। কালো রঙের চুলের কাঁটা এখন বিলুপ্ত হয়ে গেলেও ‘হেয়ার পিন বেন্ডের’ পথ পাহাড়ে এখনও টিকে আছে। এমন খাড়া পাহাড়ের দেওয়ালে সেই ‘বাঁকা চুলের কাঁটার’ মতো পথে ডায়া-বাঁয়া করে নামা শুরু। ঘটনাচক্রে আমিই তখন দলের পুরোভাগে। ডান দিকের কচি বাঁশের ঝোপ থেকে হঠাৎ সেকেন্ডের জন্য লাল রঙের গোলার মতো কিছু একটা এক লাফে আমার সামনে রাস্তার উপরে লাফিয়ে পড়ল। ভালো করে বুঝে ওঠার আগেই আর এক লাফে বাম দিকের ঝোপে অদৃশ্য হয়ে গেল। রেড পাণ্ডার সেনসাস চলছিল এই সময়ে। ওইদিনই বিকেলে ফালুটে দেখলাম, সেনসাসের কর্তাব্যক্তিরা কেবল প্লাস্টিকের পট-এ রেড পাণ্ডার পটি সংগ্রহ করতে পেরেছেন। আমার সাথে মুহূর্তের জন্য এই লাজুক প্রাণীটির চোখাচোখি হয়ে গেল।

নদীগর্ভ থেকে আবার চড়াইয়ের পথ। সিঙ্গালিলা থেকে ফালুটের রাস্তা অনেকটা লম্বা। তার উপরে উচ্চতার কারণে বাতাসে অক্সিজেন কম। সকালের চিঁড়ে-ছাতুর মণ্ড পেট থেকে পেট খালি করে কবেই নেমে গেছে! সিঙ্গালিলা পাসের মাথায় সাথী দলের কাছ থেকে দুটো লজেন্স পাওয়া গেছিল অভীষ্ট-সিদ্ধিলাভের উল্লাসের প্রসাদ হিসাবে। ভুলক্রমে আমাদের রেশনের লিস্টে ঐ বিলাসিতার বস্তুটি বাদ পড়ে গেছে। তবে লজেন্স দুটিকে এখন আর বিলাস-সামগ্রী বলে ভ্রম হচ্ছে না। একটি চুষতে থাকলাম, অপরটি সযত্নে পকেটে রেখে দিলাম পরে পেট ঠাণ্ডা করার জন্য। দিন গড়িয়ে বিকেল হল। আগুয়ান দলটি মাল-বাহক, ইয়াক সহ চোখের আড়ালে অনেকটা দূরে চলে গেছে। শেষমেশ ওদের গাইড বলল, “হোই নীচে ফালুট — সিধা রাস্তা।” বলেই সেওও জোর কদমে পাথরের আড়ালে অদৃশ্য হয়ে গেল। আমরাও দেখলাম নীচে একটা নেড়া পাহাড়ের মাথায় গা ঘেঁষাঘেষি করে খান কতক ছাউনি। স্থানীয় ভাষায় ‘ফালুট’ শব্দের অর্থ নাকি ‘বুড়োর নেড়া মাথা’। আমরা দু’জন একদম নিশ্চিন্ত মনে এই ছাউনিকে নিশানা করে নামতে লাগলাম। খেয়াল করলাম না, আমাদের সামনে আর কেউই হাঁটছেন না।


পাহাড়ের খোলা জায়গায় রাতের আস্তানা দূর থেকে দেখতে পেলেও দূরত্বের অনুমানে ভুল হয়ে যায়। ধুলিকণামুক্ত পরিমণ্ডলে স্বচ্ছ দৃশ্যমানতায় দূরের পাহাড় তত দূরে মনে হয় না। আমাদেরও সেই ভুল হল। একরকম ধরেই নিয়েছিলাম সামনেই ফালুটের রাতের আস্তানা। আজ আর তাঁবু খাটাতে হবে না। ক্লান্তি সয়ে, বিশ্রাম না নিয়ে আমরা একনাগাড়ে নেমে যেতে লাগলাম ঐ ছাউনিগুলোর পানে। অনুরণকে আগে গিয়ে বিছানার দখল করতে বললাম। অনুরণ এগিয়ে গেল।

ও কী? অনুরণ আবার রাস্তা ছেড়ে পাহাড়ের মাথায় চড়ছে কেন? এখান থেকে আমার ডাক পৌঁছবে না। অনুরণ আর ছাউনির মাঝামাঝি পথ ধরে আমি এগোতে লাগলাম। অনুরণ তখন বাম দিকের পাহাড়ের মাথায়। চেঁচিয়ে আর ইশারা করে কিছু একটা বলতে চাইছে। মিনিট পনের পরে কাছাকাছি পৌঁছলে বলল, সামনের ছাউনিটা সেনাবাহিনীর, কাঁটাতারে ঘেরা। ফালুটের ভ্রমণার্থীদের থাকার যায়গা আলাদা কোথাও হবে। যাচ্চলে! চোখের নাগালে কোন লোকজনের আভাস নেই। এমনিতেই জায়গাটা ঘাসে ঢাকা কয়েকটি নেড়া পাহাড়ের সমষ্টি। দৃষ্টির বৃত্তে দু’একটা ঝোপঝাড় আছে বটে, কিন্তু আড়াল আবডাল করে এমন লম্বা গাছপালা নেই। মানে কাছে পিঠে আস্তানার অস্তিত্ব নেই এটা বেশ বোঝা গেল। এখন যাই কোথা? চেঁচিয়ে লাভ নেই, কারণ পাহাড়ের শব্দের যাতায়াত হাওয়ায় কাছে সহজেই হার মেনে যায়। অগত্যা খোঁজাখুঁজি করতে হবে। পেছন পানে ফেরা হল। দশ মিনিট পরে পথ দু’ভাগ হয়েছে। একটা পথ আমাদেরই নেমে আসার পথ, এই পথেই আমরা সিঙ্গালিলা পাস থেকে নেমে এসেছি। আর একটা পথ বাম দিকে নীচের দিকে নেমে গেছে। বেশ খানিকটা নীচে দু’টো পাকা বাড়ি। ওটাই কী তবে আমাদের থাকার জায়গা? পথ বলে দেবার কেউ নেই। নিশ্চিত না হয়ে ভারি পিঠের ব্যাগ নিয়ে নেমে যাওয়ার মত পায়ে জোর নেই। আবার যদি উঠতে হয়? অনুরণ পিঠের ব্যাগ আমার জিম্মায় রেখে খোঁজাখুঁজি করতে নেমে গেল। ওর গলার ‘হ্যালো’, ‘হেঁই’, ‘কোই হ্যাঁয়’ ইত্যাদি আর্তি ক্রমশ মিলিয়ে গেল নীচের জঙ্গলে। রাতের আস্তানায় পৌঁছে হিসেব করলাম, রাস্তা গুলিয়ে আমরা সেদিন চার কিলোমিটার বেশি হেঁটেছি। অন্য দলের সদস্য, মাল-বাহক, রাঁধুনি সহ ইয়াক গুলো তখন দানাপানি খেয়ে বিকেলের মিঠে রোদ পোহাচ্ছে।


ফালুটে কুল্লে একখানি সরকারি আস্তানা। আমাদের সঙ্গে তাঁবু থাকলেও সেটা খাটাতে দেবেনা বাংলোর লোকজন। বলে নিয়ম নেই। অন্য সময়ে তাঁবু প্রতি বিন-রসিদে একশ টাকা নজরানা নিয়ে তাঁবু পাততে দেয়। আজ নাকি কোন বড় সাহেব আসবেন। বড় সাহেবদের জন্য অবশ্য পাশেই ভিন্টেজ পয়েন্টে আলাদা বাসা আছে। তবুও ফালুটে নিজস্ব তাঁবু পাততে দেয় না কেন বোঝা গেল না। তেমন হলে ফালুটের আগেই কোথায়ও জঙ্গলে থাকতে হত। সেখানে অবশ্য জল কোথায় পাওয়া যাবে জানা ছিল না। ফালুটের বাংলোতে আগের থেকে বুকিং করা নেই বলে বাংলোর চৌকিদার বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত আমাদের ঝুলিয়ে রাখল। বলল বুকিং করা লোকজন এসে পড়লে আমাদের মাটিতে শোবার বন্দোবস্ত হবে। তাই সই। মানেভঞ্জন থেকে ল্যান্ড-রোভার ভাড়া করে একটা বাঙ্গালি পরিবারের ছেলে-বুড়ো এসে দেড়খানা ঘরের বিছানা দখল করেছেন। বাকি আধখানা ঘরে আপাতত আমরা উদ্বাস্তুর ভূমিকায়। দুখানা বিছানায় সাময়িক থাকার অনুমতি পেয়েছি। অনুরণ একটা বিছানা পছন্দ করে তার বিছানায় বিশাল ব্যাগখানা শুইয়ে দিয়ে আমাদের দখলদারি রক্ষার চেষ্টায় আছে। আমাদের ঘরটায় জানালা থেকে সব চেয়ে দূরের বিছানায় আপাত-মস্তক ডাবল লেপ মুড়ি দিয়ে গভীর ঘুমে কোন এক পর্যটক। ঘরে আমাদের প্রবেশ ও সশব্দ কর্মকাণ্ডে তার কিছুমাত্র নড়াচড়া চোখে পড়ল না। ঘণ্টা খানেক পরে তার ঘুম ভাঙলে দেখি বছর পঁচিশের এক যুবক। সান্দাকফু থেকে গাড়ি করে এসে কিঞ্চিৎ ক্লান্ত। গাড়ি করে ফালুটে গেলে ক্লান্তি আর মাউন্টেন সিকনেস হওয়াটা মোটেই বিচিত্র নয়। ঐ রাস্তায় হেঁটে পৌঁছনো কম খাটুনির বলে আমার মনে হয়। মানেভঞ্জনে এখন এজেন্সির ছড়াছড়ি। সান্দাকফু-ফালুট-টংলু এই প্যাকেজটা ভালো বিকোচ্ছে। গাড়ি, বাংলোয় থাকার বন্দোবস্ত - সব মিলিয়ে প্যাকেজ। তবে দিনেদুপুরে লেপ মুড়ি দিয়ে ঘুমের ব্যাপারটা বোধহয় নিজের বাড়িতেই জমে। ঘুমানোর জন্য ফালুটে আসা ফালতু বলেই মালুম হয়।

ফালুটে কিঞ্চিৎ লাক্সারি


পাশেই রেস্ট্যুরেন্ট থাকলে ছাতু খাবার কোন মানে হয় না। অতএব চারদিনের মাথায় আমাদের স্বপাক অথবা বিনা-পাকের ভোজনের সাময়িক বিরতি। ধোঁয়া-ওঠা ন্যুড্‌লস স্যুপ খাবার আগে খাবার বাটি সহ বিভিন্ন পোজে শেল্ফি নেওয়া হল। ইতিমধ্যে ফালুটের পাহাড় কুয়াশার চাদর পড়তে শুরু করেছে। সামনের মাঠে কয়েকটা খচ্চর দেখে আমরা ক্যামেরা নিয়ে বাংলোর এক খোলা জানালা দিয়েই বেড়িয়ে পড়লাম। ফালুটের বিখ্যাত সূর্যাস্তের দৃশ্যের বদলে সান্ধ্য-আলোয় কুয়াশা আর খচ্চরের ছবি মন্দ হল না।

ছবির মত সেই গ্রামগুলো, যেখানে গাড়ির চাকা এখনও পৌঁছায়নি



ফালুট থেকে গোর্খে গ্রামের উৎরাইয়ের পথে পাইন, বাঁশ আর রডোডেন্ড্রনের ঘন জঙ্গল। রেড পাণ্ডার আর দেখা মিলল না। একনাগাড়ে উৎরাইয়ের পথে হাঁটু আর পায়ের পেশির বেশ খাটুনি হচ্ছে। পায়ে চলার আরামের রাস্তা একটা আছে বটে, তবে সবার তখন শর্ট-কাটের পাকদণ্ডির পথই পছন্দ। এখানের সেই সর্ট-কার্টের শুঁড়ি পথ গুলো অন্য জায়গার থেকে আলাদা। বর্ষার সৃষ্ট জলধারা নরম মাটির জমিতে নর্দমার মতো কোমর সমান গভীর নালা করে নেমে যায়। বর্ষা বিদায় নিলে থেকে যায় শুকনো নালাটি যেটা প্রস্থে বড়জোর দুই ফুট। অর্থাৎ আমরা যখন নামছিলাম তখন পাস থেকে দেখলে কেবল আমাদের মাথাসহ ধড় গুলোই দেখা যাচ্ছিলো। পাহাড় চূড়া থেকে নামার সময়ে হাঁটু আর পায়ের পেশি সহায় হলে বেশ ফুরফুরে লাগে। হাঁফ ধরার সমস্যা নেই, ঘেমে নেয়ে একাকার হবার বালাই নেই, বেশ একটা কিছু কষ্টসাধ্য সাধনের আত্মতৃপ্তি আছে। এমন সময়ে উদাত্ত গলায় গান গেয়ে নেওয়া যেতে পারে। বেসুর হলেও কেউ মানা করে না। সঙ্গী দলের পুরুলিয়ার একজন ভূমিপুত্র ছিল। নাম দিনেশ। ওর আবার বাঁশের বাঁশি বানানোর আর বাজানোর প্রতিভা আছে। বলল, কচি বাঁশে ভালো বাঁশি হয়। পথের পাসের জঙ্গল থেকে লম্বা এক বাঁশ কেটে নিলো। দুপুর বেলা আমরা একটা খোলা জায়গায় এসে পড়লাম। সামনে কিছুটা নীচে একটা ছবির মত গ্রাম - সামানদিন। আমাদের লক্ষ্য ওরও নীচের গ্রাম গোর্খে, যেটা এখান থেকে দেখা যাচ্ছেনা। যাত্রাপথের সমাপ্তির ইঙ্গিত পেয়ে এখানে সবার খিদে চাগাড় দিয়ে উঠলো। গত রাতে ফালুটে রাতের খাবার সময়ে পরের দিনের ব্রেকফাস্টের জন্য হ্যাংলার মত পুরি-আলুর দমের আবদার করেছিলাম রেস্তোরাঁর মালিককে। সবটা আজ সকালে পেটে ঠেসে নিতে পারিনি। পলিথিনের প্যাকেটে পিঠের ব্যাগের দড়িতে বেঁধে নিয়ে এসেছি। এখানে চিঁড়ে-ছাতুর একঘেয়ে স্বাদের বদল হবে। রেড পাণ্ডার আবাসস্থল সিঙ্গালিলা জাতীয় উদ্যানের জঙ্গলের প্রেক্ষাপটে, পটে আঁকা ছবির মত সামানদিন গ্রামের একটু উপরে সবাই হাত পা ছড়িয়ে বসে পড়ল। আর কোন তাড়া নেই। আহ্‌হা, হাত-পা ছড়িয়ে আচার আর কাঁচা লঙ্কা দিয়ে দিয়ে সকালের বাসি পুরি যেন অমৃত সমান।


প্রায় ত্রিশ বছর পরে একটি অপেক্ষাকৃত অকিঞ্চিৎকর কিন্তু স্বনির্ভর, অর্থাৎ অ্যালপাইন ট্রেকের সমাপ্তি রেখা সামনে দেখতে পাচ্ছি। গত পাঁচ দিনের কৃচ্ছ সাধনের সাথে সাথে নিজের ’পরে আস্থার ঝুলি ফিরে পাওয়া এক অমূল্য প্রাপ্তি বলে মনে হল। আমার জীবনের শেষ প্রান্তের এই প্রাপ্তির সাথে আমার তাঁবু-সঙ্গীর একই স্বাদের হিমালয়ে অভিসারের শুরু দেখতে পেলাম। এই ক’দিনে আনন্দ আর শারীরিক ক্লেশের মিশেল মিলে আমাদের এক দৃঢ় বন্ধনে জুড়ে দিল। আগামী ও তার পরের মরসুমগুলোতে আমাদের স্বনির্ভর অভিযানের খিদে বেশ জোরালো হয়ে উঠল। এর পরে আমাদের স্থূল শরীর আমাদের সূক্ষ্ম মনকে হাওয়ায় ভাসিয়ে কখন যে সামানদিনের সামনের নদী-গর্ভে সামানদিন গ্রামের চেয়েও অন্তঃপুরবাসিনী আর এক ছোট্ট গ্রামের রাস্তায় আমাদের পৌঁছে দিল সেটা টের পাইনি। ফালুটের রেস্তোরাঁর মালিক একটু নিষ্পাপ ব্যবসায়িক প্রচার ও ব্যবস্থাপনা করে এক হোম-স্টের কথা পই পই করে নিবেদন করেছিল। আমাদের দু’জনের জন্য, কেবল আমাদের দু’জনের জন্য, অর্ধেক রেটে থাকা-খাওয়ায় ব্যবস্থা ফালুটের সরকারি ওয়ারলেস ফোন থেকেও নাকি পাকা করে রেখেছিল। সভ্য জগতে পদার্পণের সময়ে সেই ‘শান্তি’ হোম-স্টে সবার প্রথমেই দেখতে পেলাম। একদম বেসিক বন্দোবস্ত। আমরা হয়ত ওখানেই থেকে যেতে পারতাম। কিন্তু সাথে চলা বড় দলের সঙ্গে একসাথে থাকতে চাওয়ার জন্য আমরা এগিয়ে গোর্খের সবচেয়ে লাক্সারিওয়ালা হোম-স্টেতে পিঠের ব্যাগ নামালাম। সস্তার শান্তি হোম-স্টের পাশেই আমাদের শহুরে মানসিকতার দরদামের কৌশলে বেশ সস্তায় লাক্সারি হস্তগত করে ফেললাম। একটু আগেই খাওয়া পুরি তখনও পেটের আরাম দিচ্ছে। হোমস্টের মালিক বলল খিদে না থাকলে ছাং পরখ করে দেখতে পারেন। প্রস্তাবটা মন্দ নয়। ভাত থেকে তৈরি, পাতনের মাধ্যমে ভিটামিন বর্জিত নয়, এক গ্লাস হাল্কা নেশার সেই “রাইস বিয়র” মাত্র কুড়ি টাকা। সে মোটেই  বিলাইতি লিকারের মত ‘এম্পটি ক্যালোরি’ নয় - ক্যালোরির সাথে ভিটামিন ফ্রি। স্বাদেও অতুলনীয়। রাতে গোর্খের আস্তানার সামনে আগুণ জ্বলল। আমরা সবাই আগুণকে ঘিরে আড্ডায় মাতলাম। এই মুহূর্তগুলো ট্রেকারদের এক্সক্লুসিভ লাক্সারি। পয়সা দিয়ে এই অ্যাম্ববিয়েন্স কিনতে পাওয়া যায় না। গল্প ছিল, গান ছিল, ছাং ছিল আর ছিল পাহাড়ের গন্ধ মেশানো নিষ্পাপ তিনটি স্থানীয় কিশোরের চপলতার স্বতঃস্ফূর্ত ঝলক। একশ ষাট টাকার বিনিময়ে রাতের খাবারের সাথে ফ্রি হিসাবে ছিল শিশুর চপলতা সুলভ গৃহস্বামী ও তার সহধর্মিণীর হাসি ও ঐ দিনই গোর্খের নদী থেকে ধরা মাছ ভাজা।

শেষের দিনের হাঁটার পথটি ছিল সযত্নে পাকা রাস্তার স্পর্শদোষ এড়ানো সিকিমের অন্দরমহলের কিছু গ্রামের মধ্য দিয়ে। গোর্খের হোমস্টের আয়োজনে ব্রেকফাস্ট। ওদের ভাঁড়ারে আটা বাড়ন্ত। ভাগে রুটি কম পড়ল। ওইদিন সতেরো কিলোমিটার চলে  সামানদিন - রাম্মাম - রিম্বিক ছুঁয়ে সিরিখোলা পোঁছে গেলাম বিকেল বেলায়। হাল্কা বৃষ্টি শুরু হল। এসব জায়গায় টুকটাক খাবার মহার্ঘ। গরম জলে ফোটানো ম্যাগি পঞ্চাশ টাকায় বিকোচ্ছে। আমাদের চিঁড়ে-ছাতু ছিলই। রাতে হোমস্টেতে পেট-চুক্তির  নিরামিষ খাবার জনাপ্রতি ১৮০ টাকা। খাবার পাতে পড়া মাত্রই - “হাপুস হুপুস শব্দ, চারিদিক নিস্তব্ধ, পিঁপড়ে কাঁদিয়া যায় পাতে।”  পরদিন ভাড়া করা গাড়িতে ছয় ঘণ্টা চলে নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশন। স্টেশনের পাশে কিঞ্চিৎ দরদাম করে যেভাবে মুরগির ঝোল দিয়ে ভাত খেলাম, পরে আবার কোনদিন গেলে হোটেলের মালিক নিশ্চয় দ্বিগুণ দাম নেবে।

প্রয়োজনীয় তথ্য



নিউ জলপাইগুড়ি থেকে শেয়ারের জীপে জোরথাং গিয়ে আর একটা শেয়ারের জীপে উত্‌রে পৌঁছাতে আট ঘণ্টা সময় লাগে। মোট খরচ জনাপ্রতি ৩৫০ টাকা। এক্সক্লুসিভ সাতজনের বসার উপযোগী গাড়ির ভাড়া ৪৫০০ টাকা, ছ’ঘটায় পৌঁছানো যায়। উত্‌রেতে বেশ কিছু হোম-স্টে আছে। থাকা খাওয়া সহ জনাপ্রতি দৈনিক খরচ ৭০০ টাকা। পেমা শেরপা ওখানে পুরানো ব্যবস্থাপক। ওনার হোম-স্টে আছে আর প্রয়োজন হলে ওখানেই গাইড, মালবাহক, রেশন, ইয়াক, তাঁবু ও রান্নার যাবতীয় সরঞ্জাম ভাড়ায় মেলে। সবকিছুর দায়িত্ব ওনাকে দিলে উত্‌রে থেকে সিঙ্গালিলা ফালুট হয়ে গোর্খের পাঁচ দিনের ট্রেকের জন্য ৭৫০০ টাকায় বন্দোবস্ত করেন। সে ক্ষেত্রে কেবল নিজের পায়ে হেঁটে গেলেই হবে। নিজে নিজের ব্যাগ বইতে না চাইলে আলাদা মালবাহক ভাড়া পাওয়া যায়।

উত্‌রে থেকে যে ‘এ’ টাইপের তাঁবুগুলি পাওয়া যায় তার গড়ন আমাদের তাঁবুর থেকে আলাদা। ওদেরগুলোর ঢাল বেশি, ফলে এই পথের শিবিরগুলোতে বৃষ্টি আর তুষারপাতের বেশি নিরাপত্তা দেয়। তাঁবুর দুই প্রান্তে একটি খাড়া পোলের বদলে দুটো পোল ‘A’ -এর ভঙ্গিতে পোঁতা থাকে। তাঁবুতে ঢোকা-বেরোনোর পথে কসরত করে পোল এড়িয়ে ঢোকার প্রয়োজন হয় না। তবে সব মিলিয়ে তাঁবু বেশ ভারি হয়, ইয়াকের দরকার হয় সেটায়।




250 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

কোন বিভাগের লেখাঃ মোচ্ছব  বুলবুলভাজা  উৎসব ইস্পেশাল ২০১৮ 
শেয়ার করুন


Avatar: avi

Re: সিঙ্গালিলা ন্যাশানাল পার্কে স্বনির্ভর অভিযান

অনবদ্য।
Avatar: শঙ্খ

Re: সিঙ্গালিলা ন্যাশানাল পার্কে স্বনির্ভর অভিযান

বাহ।
Avatar: dd

Re: সিঙ্গালিলা ন্যাশানাল পার্কে স্বনির্ভর অভিযান

বেশ লাগলো।

মানে এই যে ট্রেকের চার পাঁচদিন সে শুধুই চিঁড়ে ছাতু খেয়ে কাটাতে হয়? তো সাহেবরা কী খায়?


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন