বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

রুপিন নদীর পাশ দিয়ে, রুপিন পাস্ পেরোনো

সরসিজ দাসগুপ্ত

"আঃ" ! - প্রচণ্ড ব্যথায় মুখ থেকে বেরিয়ে এলো শব্দটা।

২১শে অক্টোবর, সন্ধ্যেবেলা। হিমাচল প্রদেশের “জাকা” নামের একটা ছোট্ট গ্রামে ছিলাম সেদিন, ৮,৭০০ ফিট উচ্চতায়। ট্রেকিংয়ের নিয়মানুসারে, যেহেতু প্রতিদিন আল্টিটিউড বা উচ্চতা পরিবর্তন হচ্ছে, তাই, সেই উচ্চতাতে শরীরকে মানিয়ে নেওয়ার জন্য, বিকেলের দিকে একটু হাঁটাহাঁটি প্রয়োজন। সেই সান্ধ্যকালীন ভ্রমণেই, আধো অন্ধকারে, পিছল রাস্তায়, একটু বেশি নিচু একটা পদক্ষেপ নেয়ার সময়েই, ডান পাটা একটু স্লিপ করলো, আর ডানদিকের খাদ থেকে বাঁচতে, বাঁদিকে হেলতে গিয়ে, টাল সামলাতে না পেরে, হঠাৎ টান ধরলো বাঁ পায়ের হাঁটুতে। সহজ ভাষায় যাকে বলে, 'মাসল পুল'। যারা অল্প খেলাধুলো করেছেন, তারা সকলেই জানেন, সমস্যা গভীর নয়, সমাধানও সহজ। ব্যথার ওষুধ, ব্যথা কমানোর স্প্রে এবং রেস্ট, এতেই মিটে যাওয়ার কথা। কিন্তু, তা হলোনা। কারণ, রেস্টের কোনো সুযোগ নেই, রোজ নিয়ম করে প্রায় ৮-১০ ঘন্টা হাঁটা, মাথায় ঘুরছে চিন্তা, বৃষ্টি আসবার আগেই পার করতে হবে, "রুপিন পাস"। অতএব, ওই ব্যথা নিয়েই পরের চারদিনে ৪০ কিলোমিটার রাস্তা পেরোতে হলো হেঁটে।

ছয়জনের যাত্রা শুরু হয়েছিল দিল্লী স্টেশন থেকে, ১৭ই অক্টোবর, অষ্টমীর রাতে। যাত্রা শুরু হওয়ার কথা ছিল শিয়ালদাহ স্টেশন থেকে, ১৬ই অক্টোবর, সপ্তমীর দুপুরে। সে এক মজার গল্প, আমাদেরই তিন বন্ধু সপ্তমীর দুপুরের কলকাতার জ্যাম এড়াতে যাদবপুর থেকে শিয়ালদাহ ট্রেনে আসবে ভেবেছিল। কিন্তু, ট্রেকিংয়ের সরঞ্জাম, এবং পেল্লায় রুকসাক নিয়ে, লোকাল ট্রেনের ভিড় ঠেলে আর উঠতেই পারেনি, এবং, ট্রেন মিস। অগত্যা, প্লেনে চেপে দিল্লি আসা এবং, সেখানেই আমাদের একত্রিত হওয়া। ১৮ই অক্টোবর, নবমীর ভোরবেলা আমরা পৌঁছলাম উত্তরাখণ্ডের দেরাদুনে। এবং, সেখান থেকে গাড়িতে চেপে ঐদিন সন্ধ্যেবেলা পৌঁছলাম উত্তরাখণ্ডেরই প্রায় বর্ডার সংলগ্ন "ধাউলা" নামের একটি গ্রামে। সেদিন রাতটা ঐখানেই কাটিয়ে, পরদিন সকাল থেকে শুরু হবে, আমাদের ট্রেকিং... "রুপিন পাস্"।


এই "রুপিন পাস্" ট্রেকরুট শুরু হচ্ছে উত্তরাখণ্ডের 'গোভিন্দ পশু বিহার ন্যাশনাল পার্ক' নামক অভয়ারণ্যের মধ্যে অবস্থিত "ধাউলা" গ্রাম থেকে, আর শেষ হচ্ছে, হিমাচল প্রদেশের 'কিন্নর' জেলার "সাংলা" নামের একটা ছোট্ট শহরে। দেরাদুন থেকে ধাউলা পৌঁছনোর মাধ্যম গাড়ি, এবং, ফেরবার পথে সাংলা থেকে সিমলা অব্দিও গাড়ি করেই যাতায়াত করে থাকে সবাই। "ধাউলা" উৎত্তরাখণ্ডের একটা ছোট্ট গরিব গ্রাম, যার উচ্চতা, ৫,৫০০ ফিট মাত্র। শহর থেকে খুব দূরে নয়, মাত্র কয়েক ঘন্টার ব্যাপার। সেই ধাউলাতেই ছিল, ট্রেকের মধ্যে আমাদের প্রথম এবং শেষ আমিষ খাওয়ার সুযোগ। আমিষ বলতে ডিমের ঝোল, এবং তার সাথে আরো কিছু তরিতরকারি মিলিয়ে প্রায় বনভোজনের অনুভূতি। চতুর্দিকে অন্ধকার, মাঝেমধ্যে হঠাৎ হঠাৎ দূর থেকে জোনাকির মতন আলো জ্বলছে, আবার নিভে যাচ্ছে। মোটের ওপর, উত্তরাখণ্ডের জঙ্গলের মধ্যে অবস্থিত একটি অনুন্নত পাহাড়ি গ্রাম। আর সেই পাহাড়ের কোলে বসে, সিগারেট ধরিয়ে আড্ডা চলছে, ঠাণ্ডা খুব বেশি না হলেও, ৭-৮ ডিগ্রি তো হবেই, মধ্যবিত্তের আক্ষরিক পর্বতাভিযান।

এমতবস্থায়, আবির্ভূত হলেন আমাদের ট্রেক গাইড, দেব ভাই। দেব বহুবছর ধরে হিমালয়ান রেঞ্জে ট্রেকিং করাচ্ছেন, আগে অন্যান্য গ্রুপের্ সাথে করতেন, এখন নিজেই নিজের গ্রুপ তৈরি করেছেন, "হিমালয়ান নোমাডিয়ান ট্রাইব" নামে। পাহাড়, জল, এবং আকাশপথের নানাবিধ এডভেঞ্চার স্পোর্টসের অভিজ্ঞতা লাভের ইচ্ছে হলে, এঁদের সাথে যোগাযোগ করতেই পারেন, এই ওয়েবসাইটের মাধ্যমে, http://himalayannomadiantribe.com, এবং হিমালয়ান রেঞ্জে, এডভেঞ্চার ট্যুরিজমে এদের থেকে বেটার সম্ভবত আর কোনো গ্রুপ নেই বর্তমানে। এই ট্রেক শুরু হওয়ার আগে, স্বাভাবিক নিয়মেই কিছু খোঁজ খবর আমরা সবাই নিয়েছিলাম, মূলত ইন্টারনেট থেকে। এটা আমার প্রথম ট্রেক নয়, বছর দুই আগে রূপকুণ্ডেও গেছি, এবং, এই সমস্তটা মিলে, অস্পষ্ট হলেও, ধারণা একটা ছিলই। দেব ভাইয়ের আবির্ভাবের পরে, উক্ত বেশিরভাগ ধারণাই ভুল প্রমাণিত হয়। ইন্টারনেটে পড়েছি, এবং আগেও দেখেছি যে অনেকেই সোলো ট্রেক করেন, বা গাইড ছাড়াই, দল বেঁধে নিজেরাই ট্রেক করেন। আমাদেরও দ্যাখা হয়েছে এমন ট্রেকারদের সাথে, এবারও। এতে প্রভূত এডভেঞ্চার থাকলেও, একথা নিশ্চিন্তে বলতে পারি যে, অক্টোবর মাসে, যখন বরফ পড়া সবে শুরু হচ্ছে, সেই সময়, এই রুপিন পাস্ ট্রেকে, গাইড ছাড়া আসা যথেষ্ট ঝুঁকিপূর্ণ, মুহূর্তের অসাবধানতায়, যেতে পারে প্রাণও। আমাদের সাথে চলার পথে আলাপ হওয়া প্রতিটা ট্রেকার শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়েছিল এইকথা স্বীকার করতে। অন্যান্য ট্রেক গুলির সাথে এই রুপিন পাস্ ট্রেকের একটা মূলগত পার্থক্য হলো, এখানে প্রথম কয়েকদিনের সাধারণ যাত্রার পর, হঠাৎ করেই অল্টিটিউড বা উচ্চতা বাড়তে শুরু করে, এবং, এর ফলে, একিউট মাউন্টেন সিকনেস, বা, এ.এম.এস.-এ আক্রান্ত হতে পারে যে কেউ। এর একমাত্র সমাধান প্রচুর পরিমানে জল খাওয়া। সেই মুহূর্ত থেকে নিয়ম তৈরি হয় দিনে, অন্তত চার থেকে পাঁচ লিটার জল আমাদের প্রত্যেককে খেতেই হবে এবং ধুম্রপানের বদভ্যাস ছাড়তেই হবে এই কয়েকটা দিন (বলা বাহুল্য এটা সম্ভব হয়নি, কিন্তু, কমে গেছিলো একদমই)। তিনদিন হাঁটবার পর, এমনস্থানে পৌঁছনোর কথা, যেখানে খচচরের পক্ষেও রাত্রিবাস সম্ভব নয়। অতএব, ওই প্রচন্ড শীতকে মোকাবিলা করবার মতন শীতবস্ত্র আমাদের সঙ্গে রাখতেই হবে। মোটের ওপর এইসমস্ত বিষয়, এবং, এর সাথে সাথে, কিছু হাঁটবার, বিশ্রাম নেওয়ার, ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক প্রক্রিয়ার ব্যাপারে অবগত হওয়ার পর, উনিশে অক্টোবর দশমীর সকালে, আরম্ভ হলো, আমাদের রুপিন পাস্ ট্রেক। এবং, ওই তখন থেকেই, সভ্যতার সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক শেষ!

ধাউলা থেকে হাঁটা শুরু হয় সকালে, এবং প্রায় ১০ কিলোমিটার হাটবার পর, বিকেলের আগেই আমরা পৌঁছে যাই উত্তরাখণ্ডের শেষ গ্রাম "সেওয়া"তে। ওই উনিশে অক্টোবর রাতে আমরা ছিলাম সেওয়াতেই। সাধারণ পাহাড়ি রাস্তা, এবং সেই রাস্তার লেজ ধরে হেঁটে যাওয়া, খুব বেশি চড়াই নেই, রাস্তার নাম, 'ধাউলা-সেওয়া রোড'। দু এক জায়গায় ছোটো-খাটো ঝর্ণা পেরোনো ছাড়া, নতুনত্ব কিছু ছিলোনা। কিন্তু, সেওয়া গ্রামটি খুব সুন্দর। একদিকে খাড়া পাহাড়, আরেকদিকে জঙ্গল। এরইমধ্যে বাচ্চারা চালাচ্ছে দশেরার প্রস্তুতি, যা উত্তরাখণ্ডের বড়ো উৎসব। ঠাণ্ডা আস্তে আস্তে বাড়ছে, এখনই সম্ভবত ৫ ডিগ্রি। অদ্ভুত ব্যাপার হলো, হঠাৎ দেখে বোঝা না গেলেও, শুধুমাত্র জনবসতির ভিত্তিতেই গ্রামটিকে আড়াআড়ি দুই ভাগে ভাগ করে ফ্যালা যায়, দলিত এবং উচ্চবর্ণ। গ্রামের একমাত্র মন্দিরটি উচ্চবর্ণ (অবস্থাপন্নও বটে) এলাকার মধ্যেই অবস্থিত এবং দলিত শ্রেণীর নেই সেই স্থানীয় মন্দিরে ঢোকবার অধিকার। উত্তরাখণ্ডের একটি বিস্তীর্ণ জায়গা জুড়েই রয়েছে এই সামাজিক ব্যাধি, কথায় কথায় জানতে পারলাম, এই অঞ্চলে অস্পৃশ্যতা এখনো কোথাও কোথাও বিদ্যমান। উত্তরাখণ্ড একটি নতুন রাজ্য, এবং, এখনো সর্বত্র বিদ্যুৎ এসে পৌঁছয়নি। ‘সেওয়া’ সেরমই একটা গ্রাম। দূরভাষের নেটওয়ার্কও নেই, রয়েছে জলের সমস্যাও। এবং, এত কিছু না থাকা সত্ত্বেও, উক্ত সমস্যাগুলি নিয়ে, আমাদের মতন বহিরাগতদের সাথে আলোচনা করবার মনোবৃত্তিও নেই কারোর। মানিয়ে নিচ্ছেন সবাই, ভবিতব্যের মতন। এইখানে ওই দলিত-অঞ্চলের একটি বাড়িতে থাকবার ব্যবস্থা ছিল আমাদের, যাকে বলা হয়, হোম-স্টে। রাত্রিবাসের পর, পরদিন, বিশে অক্টোবর একাদশীর দিন সকালে 'জাকা রোড' ধরে যাত্রা শুরু হলো, "জিসকুন" বলে একটি গ্রামের দিকে।

সেওয়া থেকে জিসকুনের পথে পেরোতে হয় উত্তরাখণ্ড এবং হিমাচল প্রদেশের বর্ডার। তফাৎ যেটা চোখে পড়বার মতন সেটা হলো, পাশাপাশি অবস্থিত রাজ্য হলেও, উন্নয়নের ছোঁয়া হিমাচলে অনেক বেশি, সম্ভবত পুরোনো রাজ্য হওয়ার দরুন। রাস্তার পাশে পাশে ল্যাম্পপোস্ট দেখে বোঝা যায় যে এই অঞ্চলে বিদ্যুৎ পৌঁছে গেছে। বর্ডার পেরোনোর সাথে সাথেই শেষ হয়ে গেছে উক্ত 'গোভিন্দ পশু বিহার ন্যাশনাল পার্ক'। এই অঞ্চলে রয়েছে বেশ কিছু ছোট ছোট গ্রাম, বা জনবসতি। এবং এখান থেকেই শুরু "রাধা স্বামী সৎসঙ্গ"! হিমাচলের গোটা কিন্নর জেলা জুড়ে প্রভাব রয়েছে এই রাধা স্বামী সৎসঙ্গের। এই গোটা অঞ্চলে মদ্যপান, ধূম্ৰপান এবং আমিষ প্রায় নিষিদ্ধ। তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে গত কয়েক বছর ধরে এখানে অপরাধও ঘটেছে খুবই কম, এবং প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন, রাধা স্বামী সৎসঙ্গ। জিসকুনের আরেকটা উল্লেখযোগ্য স্থান হলো এখানকার স্কুল। কিন্নর জেলার সব থেকে বড়ো স্কুলটি রয়েছে জিসকুনেই, আশেপাশের প্রায় সব গ্রামের বাচ্চা ছেলে মেয়েরাই এই স্কুলে আসে। যে পথে যাতায়াত করতে আমাদের লেগে যাচ্ছে কয়েক ঘন্টা, সেই একই পথ এই বাচ্চারা নাকি আধ ঘন্টায় পার ফেলে! বিশে অক্টোবর রাত জিসকুনেই কাটিয়ে, পরের দিন অর্থাৎ একুশে অক্টোবর আমরা রওনা হই "জাকা" নামের আরেকটি গ্রামের দিকে।

জাকা থেকেই এই লেখা শুরু হয়েছিল। রুপিন পাস ট্রেক রুট টাকে দুই ভাগে ভাগ করলে, জাকা অব্দি একটা ভাগে, আর জাকা পরবর্তী অঞ্চল আসবে অন্য ভাগে। আমাদের হাঁটা আরম্ভ হয়েছিল ৫,৫০০ ফিট থেকে এবং তিন দিন হেঁটে জাকায় পৌঁছই ৮,৭০০ ফিট উচ্চতায়। আমার ধারণা, ভবিষ্যতে এই ট্রেক শুরুই হবে জাকা থেকে, কারণ, ধাউলা থেকে জাকা অব্দি একটি রাস্তার অনুমোদন দিয়ে দিয়েছে হিমাচল প্রদেশ সরকার। জাকাতে অদূর ভবিষ্যতে তৈরি হতে চলেছে, ব্যক্তিগত রোপ-ওয়ে, অর্থাৎ বুঝতেই পারছেন, দৈন্য এখানে সেরম প্রকট নয়। উক্ত "হিমালয়ান নোমাডিয়ান ট্রাইব" এখানে শুরু করতে চলেছে আরো নানাবিধ এডভেঞ্চার স্পোর্টস। আপেল চাষ এখানকার খুব লাভজনক ব্যবসা, এবং, সাধারণ চাষ-বাসের ফলে, দৈনন্দিন প্রয়োজন মিটেই যায়। আসলে, পাহাড়ি মানুষদের চাহিদা খুব কম, এবং এই স্বল্প চাহিদার যোগান দেয়ার মতন ব্যবস্থা প্রকৃতি করে রেখেছে এই গোটা কিন্নর জেলা জুড়েই। পাহাড়ের গায়ে গায়ে কাঠের বাড়ি, সেই কাঠ পাওয়া যায়, পাশের জঙ্গল থেকে (পরিবার পিছু বছরে চারটে গাছ কাটা যায় আইনত)। অনেকটা সিঁড়ির ধাঁচে, পাথরের রাস্তা উঠে গেছে, পাহাড়ের বাঁক বেয়ে। শীতকালে এখানে বরফ পড়ে। আমরা যখন গেছিলাম, তখন সম্ভবত ২-৩ ডিগ্রি তাপমাত্রা ছিল। ট্রেকের জন্য প্রয়োজনীয় পোর্টার বা গাইড নেওয়ার শেষ সুযোগ থাকে জাকাতেই। বিকেলের দিকে এখানে পৌঁছে, যাতে গা ছেড়ে না দেয়, আর তাপমাত্রা এবং উচ্চতার সাথে মানিয়ে নিতে, বিকেলের পরে বেরিয়েছিলাম, আশেপাশের গ্রামে ঘুরতে। ফেরবার পথে, যেমনটা লিখেছিলাম ওপরে, আধো অন্ধকারে, পিছল রাস্তায়, একটু বেশি নিচু একটা পদক্ষেপ নেয়ার সময়েই, ডান পাটা একটু স্লিপ করলো, আর ডানদিকের খাদ থেকে বাঁচতে, বাঁদিকে হেলতে গিয়ে, টাল সামলাতে না পেরে, হঠাৎ টান ধরলো বাঁ পায়ের হাঁটুতে। হাঁটতে খুবই সমস্যা, এরম ব্যথা নিয়ে পাহাড়ি রাস্তায় চড়াইতে এগোনো মুশকিল। বাঁ পা তুলতে গেলেই টান লাগছে, বিকল্প বলতে ফেরত যাওয়া। এই দোটানার মধ্যেই আবিষ্কৃত হলো, আমাদের এক বন্ধু অনির্বাণের পায়ের তলায় কিভাবে জানি ফুটে রয়েছে একটি কাঁচের টুকরো। আমার দৈনন্দিন জীবনে হাঁটাহাঁটি বলতে হাইকোর্টের করিডোর, এবং আশেপাশের রাস্তাঘাট, সেখান থেকে প্রায় বিনা প্রস্তুতিতেই চলে এসেছি ট্রেকিংয়ে, অনির্বাণের অবস্থাও তথৈবচ। অগত্যা, সেদিন নৈশভোজনের পর, দুই বন্ধু, একে অন্যকে সাহস জুগিয়ে, শুতে গেলাম। পরদিন, অর্থাৎ, বাইশে অক্টোবর আবার হাঁটা আরম্ভ হলো, এবার গন্তব্য "ধানতেরাস থাছ"। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, অনির্বাণ এবং ওর দিদি সুচিস্মিতা এর আগে অনেকগুলো ট্রেক করেছে। আমি এবং সৌম্যজিৎ গেছি রূপকুণ্ডে। বিবেকানন্দ রূপকুণ্ড ছাড়াও নেপালেও ট্রেক করেছে। আর পার্থ করে এসে জংরি-গৈচালা, অর্থাৎ একদম নভিস কেউ নই, কিন্তু, শারীরিক সক্ষমতা কারোরই অসাধারণ নয়। এইছিল আমাদের টীম। চারজন আইনজীবী, একজন শিক্ষিকা এবং, একজন আর্টিস্ট।

জাকার পরে কিন্তু "সাংলা" অব্দি আর কোনো গ্রাম নেই। পাহাড়ের কোনো কোনে জনবসতি থাকতেও পারে, কিন্তু, রাস্তা আর সেভাবে চোখে পড়বেনা। এবার রাস্তা খুঁজে নেয়ার পালা। তাও যদিওবা, ধানতেরাস থাছ অব্দি একটা-দুটো দোকান পাওয়া যেতে পারে, তারপরে আর কিছুই নেই। এবং, এইজন্যই এইখানে প্রয়োজন হয় লোকাল গাইডের। যেহেতু দিন ছোট হয়ে আসছে, বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে, তাই ঠিক সময়ে ক্যাম্প-সাইডে পৌঁছনোই বুদ্ধিমানের কাজ, কিন্তু, রাস্তা হারিয়ে ফেললে সময় নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশংকা থাকে। একদম সকালে বেরিয়েও ধানতেরাস থাছে আমরা পৌঁছোই সন্ধ্যের ঠিক আগে। এর আগে কিছুটা বুগিয়াল বা, মাঠের মতন রাস্তা, সবুজের পরিমান খুব কম, আস্তে আস্তে গাছ কমে আসছে, বাতাসে কমছে অক্সিজেনের মাত্রা। এইবারে নিস্বাসের সময় টের পাওয়া যাচ্ছে। বাকিটা সম্পূর্ণ পাথুরে রাস্তা, হাঁটুর চোট টা বাড়ছে, প্রতিটা পদক্ষেপের সাথে সাথে। পাহাড়ের সরু ঢাল বেয়ে হেঁটে চলা, বাঁ হাতে পাহাড়, আর ডান দিকে কয়েকশ ফিট গভীর খাদ, একেকটা পদক্ষেপ দেখে না ফেললে, মৃত্যু অনিবার্য। কখনো খুব খাড়াই, আবার কখনো অল্প, কিন্তু, বিশ্রামের কোনো অবসর নেই। শুধুই হাঁটতে থাকা,জল তেষ্টা পেলে, পাশেই রুপিন যদি থেকে জল ভোরে নেওয়া। সেইদিন প্রায় ১৪ কিলোমিটার হেঁটেছিলাম। কখনো ঢাল বদল হচ্ছে, মাঝে মাঝেই কাদা মাটি, যা পিছল। এই কাদামাটি দেখেই সন্দেহটা প্রথম হয়। তাহলেকি বৃষ্টি ? রাস্তার যা আন্দাজ তৈরি হয়েছে, তাতে বুঝেছি যে একবার বৃষ্টি হলে, ওই সরু রাস্তা পুরো শুকনোর আগে আর এগোনো সম্ভব নয়, কারণ, ভেজা মাটিতে পা পিছলে যাবেই, আর, অনেক জায়গায়, পাশাপাশি দুই পা রাখবার জায়গায় নেই। অবশেষে, বিকেল সাড়ে পাঁচটা-ছটা নাগাদ এলো। নঃ,বৃষ্টি নয়, তুষারপাত ! ইহা আক্ষরিক অর্থেই আমার প্রথম অভিজ্ঞতা। আকাশ থেকে পেঁজা তুলোর মতন নেমে আসছে বরফের টুকরো, আর, ওই ঠাণ্ডার মধ্যেও, আমরা চলে এসেছি তাঁবুর বাইরে। জীবনের প্রথম তুষারপাতের অভিজ্ঞতা, অল্প বিস্তর ঠাণ্ডার থেকে অনেক বেশি রোমাঞ্চকর। প্রায় ঘন্টা দেড়েক চললো, আশপাশটা ঢেকে গেলো সাদা রঙে।তাঁবুর ওপর বরফ জমে গেলো। সামনেই বয়ে চলেছে রুপিন নদী, কিন্তু ওই জলে হাত দেওয়া দুষ্কর। তাপমাত্রা তখন শূন্যের নিচে। ওই ঠাণ্ডা আটকানোর একমাত্র উপায়, গরম জামা নয়, অনেক জামা, অর্থাৎ, লেয়ার্স। দুটি টি-শার্ট, থার্মাল, ফ্লিজ জ্যাকেট আর একটা হুডি। মাথায় একটা টুপি। অনেক গরম জামা পড়বার থেকে, এই পদ্ধতি অনেক বেশি সুবিধার। এতে শরীর গরম হয়না,অথচ, ঠাণ্ডা লাগবার সম্ভাবনা শূন্য। এদিকে তুষার পাতের পরিমান বাড়লে, ভয় থাকে তাঁবুর মধ্যে জল ঢুকে পড়বার। মনে তখন অন্য চিন্তা। তুষার এবং বরফের তফাৎ হলো, জমাট বরফে পা পেছলানোর ভয় থাকেনা, কিন্তু, তুষার পাতের বরফ, রোদ উঠলেই গলতে শুরু করবে, আর ওই বরফ গলা জলে, পাহাড়ি রাস্তা হয়ে যাবে আরো পিচ্ছিল, কাদা কাদা। মনের মধ্যের সেই ভয় নিয়েই শুতে যাওয়া। আমরা রয়েছি ১১,৬৮০ ফিট উচ্চতায়, একদিনে, তিন হাজার ফিট ওপরে চলে এসেছি। পরের দিনের গন্তব্য "আপার ওয়াটার ফল"।

তেইশে অক্টোবর সকালে যখন হাঁটতে আরম্ভ করি, তাপমাত্রা তখনো শূন্যের নিচেই। আপার ওয়াটার ফল মাত্র ছয় কিলোমিটার দূরেই, কিন্তু, সম্পূর্ণটাই খাড়া উঠতে হবে, প্রায়, ৫০-৬০ ডিগ্রি অ্যাঙ্গেলে। বরফ তখনো বিশেষ গলেনি। শুরু রাস্তায় হাঁটা শুরু করবার এক ঘন্টার মাথাতেই সামনে দেখি বেশ ভিড়। ভিড় বলতে, প্রায় জনা দশেক ট্রেকার আটকে গেছে, অপেক্ষা করছে আমাদেরই জন্য। আমরা ছাড়া, আরো একটি টীম ওই সময় এসেছিলো, আরো ছিল কয়েকজন সোলো ট্রেকার। এরা সব্বাই আটকে গেছে, একটি ঝর্ণার সামনে। রাস্তাটা প্রায় একটি খুব চওড়া এবং ফ্ল্যাট ইউ আকৃতির। ওই ইউএর ঠিক বাঁকের মুখেই ডান হাতে রয়েছে ঝর্ণার, সেখান থেকে, বরফ ভেঙে জল গড়িয়ে পড়ছে অনর্গল। প্রায় ৩০০ মিটারের মতন অংশ সম্পূর্ণ বরফে ঢাকা। ভুল হলো, বরফ নয়, আইস, বা তুষার। পা তো কোন ছাড়, আমাদের লাঠিও রাখা যাচ্ছেনা ওই বরফে, পিছলে যাচ্ছে। এদিকে, পিছলে গেলেই বাঁদিকে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে গভীর খাদ। রোমাঞ্চ-প্রিয় ওই দশজনের তখন আর সাহস হচ্ছেনা একা এগোনোর। এইখানে বোঝা গেলো লোকাল গাইডের প্রয়োজনীয়তা। মৃত্যুভয় ত্যাগ করে, আমাদের গাইডদের হাত ধরে, প্রায় চোখ বন্ধ করে, ওই অংশ পেরোলো এরা সবাই, তারপর আমরাও একে একে। এরই মধ্যে, আমাদের টিমের অসীম সাহসিনী সুচিস্মিতা, বাঁ হাতে গাইডের হাত ধরে, ডান হাতে ক্যামেরায় ছবি তুলতে তুলতে পেরোলো ওই একই অংশ, চোখের সামনে ট্রাপিজের খেলা চলছিল যেন। পরিত্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়া হিমালয়ান নোমাডিয়ান ট্রাইবের ওই দেব, সেই মুহূর্ত থেকেই তো আমাদের দেব ভাই হয়ে গেলো। ওই ছয় কিলোমিটার পেরোতে সেদিন প্রায় দশ ঘন্টা লেগে গেছিল। বিকেলের দিকেই পৌঁছই আপার ওয়াটার ফলে। অর্থাৎ কিনা,পাহাড়ি রুপিন নদীর সৃষ্টি হচ্ছে যেই ঝর্ণা থেকে, তার ঠিক সামনে, এখান থেকে আর মাত্র পাঁচ কিলোমিটার দূরেই, রুপিন পাস্!

চব্বিশে অক্টোবর সকালে বেরোনোর সময়, সত্যি বলতে কি, খুব ভয়েই ছিলাম। আমাদের প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই আশা ওই অন্য দশ বারো জন, আগেরদিন রাতে আপার ওয়াটার ফলে থাকেনি, তারা উঠে গেছে আরো ওপরে, একদম রুপিন পাসের পাদদেশে, সম্ভবত, সম্পূর্ণ শক্তি নিয়ে পাস পেরোনোর জন্যই। এদিকে, আমাদের আগে, প্রায় ৬০-৬৫ ডিগ্রি অ্যাঙ্গেলে চার কিলোমিটার উঠতে হবে, তারপর প্রায় ৭০-৭৫ ডিগ্রি অ্যাঙ্গেলে উঠে পেরোতে হবে, রুপিন পাস্, যা প্রায় দেড় কিলোমিটার আরো। ১৩,১২০ ফিট থেকে একধাক্কায় ১৫,২৫০ ফিট ওঠা। এর পর শেষ গন্তব্যস্থল হলো, "রন্টিঘাট"। যা, রুপিন পাসের পরে, আরো প্রায় আট কিলোমিটার দূরে। ঘন্টা দুয়েকের মধ্যেই পৌঁছলাম রুপিন পাসের পাদদেশে। এইখানে দ্বিতীয়বার বোঝা গেলো লোকাল গাইডের প্রয়োজনীয়তা। পাদদেশেই যারা রাতে ছিল, তারা না পেয়েছে পর্যাপ্ত জল, না পেয়েছে পর্যাপ্ত ঘুম, উপরন্তু অসহ্য ঠাণ্ডা সহ্য করতে হয়েছে। আপার ওয়াটার ফলেই ছিল -৭, এই পাদদেশে সম্ভব -১০, আর তার সাথে খোলা হাওয়া। ওরা ক্লান্ত থাকবার কারণে, আমরা দুই ঘন্টা পথ চলে ওই পাদদেশে পৌঁছে দেখি, তখনো ওদের কেউই পাস পেরোতে পারেনি। সকলেই, চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। জলের অভাবে কারোর কারোর শরীর খারাপ। জাকা গ্রামের লোকজন আমাদের বলেছিলো, এই দেড় কিলোমিটারের পাস পেরোতে ওদের লাগে, ২০-২৫ মিনিট। আর, আমাদের মতন ট্রেকারদের লাগতে পারে দেড়-দুই ঘন্টা। আমাদের সঙ্গে সঙ্গেই আসা অন্য টিমটার লেগেছিলো প্রায় তিন ঘন্টা, সোলো ট্রেকারদের লেগেছিলো প্রায় আড়াই ঘন্টা মতন। ওই একই রুপিন পাস্, ঘড়ির স্টপ ওয়াচ মিলিয়ে, আমরা পেরিয়েছি, ঠিক ৪৩ মিনিটে!

রুপিন পাস্ আমরা পেরোই ৪৩ মিনিটে। দুটো সমান্তরাল খাড়া পাহাড়ের ঠিক মাঝখান দিয়ে, পাহাড়ের পাদদেশ থেকে শুরু হচ্ছে রাস্তা এবং পাহাড়গুলোর চুড়ো সমান উচ্চতায় রয়েছে রুপিন পাস্। যা পেরিয়ে, উল্টোদিকে নেমে যেতে হবে, লোকালয়ের খোঁজে। এই পাহাড় পেরোনোর রাস্তার নাম রুপিন পাস্। ওপরে উঠলে, সামনে দেখতে পাওয়া যায়, কিন্নর কৈলাশের পাঁচটা শৃঙ্গ, বাঁ দিক এবং দেন দিকেও বিভিন্ন পর্বতশৃঙ্গ। চতুর্দিকে শুধুই সাদা। ... চোখ ধাঁদিয়ে যায় যেন! শুরুর কিছুক্ষন অসুবিধা না হলেও, খানিক্ষন পরেই ক্লান্তি ধরে নেয়, শ্বাসের কষ্ট আরম্ভ হয়। পর্যাপ্ত জল না খাওয়া হলে, এ.এম.এস. অনিবার্য। হুহু করে বাড়তে থাকছে উচ্চতা, পাল্লা দিয়ে ওমচে বাতাসে অক্সিজেনের মাত্রা। বিবেকানন্দের কাছে একটা ভিডিও ক্যামেরা ছিল, যার ব্যাটারি ঠিক পাসের মুখেই শেষ হয়ে যায়। শেষ কয়েক মুহূর্তে নিজেই নিজেকে মোটিভেট করা ছাড়া আর অন্য রাস্তাও নেই, এযেন নিজের সাথেই একটা ছোট খাটো যুদ্ধ। এইসবের পরে, সামনে ওই নৈসর্গিক দৃশ্য দেখলে,কার না মন ভালো হয়ে যায় ! তারপর আর কি ? অধপতনের শুরু। প্রথমে বরফে স্কিট করে খানিকটা নামা, তারপর উৎরাই, প্রায় ৮ কিলোমিটার। পাস্ পেরোনো অব্দি, উত্তেজনায়, বাঁ পায়ের ব্যথা টা ভুলেই গেছিলাম, কিন্তু, নাম শুরু হতেই, ওই পায়ে ভোর দেয়া মুশকিল হয়ে দাঁড়ালো। সেই গোটা দিন টা হেঁটে, সন্ধ্যে ৭ টা নাগাদ, পৌঁছলাম, রোন্টিঘাট ক্যাম্পসাইডে। সেখানেও তখন -৫ ডিগ্রি। এদিকে, পায়ে গরম কিছু দেওয়াও সম্ভব না। কোনো মতে রাতটা কাটিয়ে, পরেরদিন আবার প্রায় ৬ ঘন্টা হাঁটা, “সাংলা” অব্দি। পরদিন ২৫শে অক্টোবর সকালে দুই-আড়াই ঘন্টা হাঁটবার পর, আমার পা জবাব দিয়ে দিলো। পা সোজাই হচ্ছিলোনা, অসহ্য যন্ত্রনা,চোখ থেকে অজান্তেই জল বেরিয়ে আসছে ব্যথায়। আরো হাঁটলে পায়ের গোড়ালিতেও ব্যথা শুরু হয়ে যাচ্ছিলো। যেখানে থামলাম, সেই জায়গার নাম সাংলা কান্দা। সভ্যতার সঙ্গের আবার সম্পর্ক স্থাপন। এইখানে শুধু ফোন নয়, একেবারে ইন্টারনেটেরও নেটওয়ার্ক আসছে। ছোট দোকান রয়েছে, বিশ্রামের জায়গা রয়েছে। ট্রেক শেষের পথে, পরবর্তী গন্তব্যস্থল নির্ধারিত এখন থেকেই হয়।

আমাদের ট্রেক গাইড এখান থেকে আমার জন্য একটা গাড়ির ব্যবস্থা করে দে, সাংলা অব্দি। ওই দুই কিলোমিটার রাস্তা গাড়িতে যেতে আমার লাগে দেড় ঘন্টা, এবং টিমের বাকিরা দুই ঘন্টায় হেঁটেই সাংলা পৌঁছে যায়। ভবিষ্যতে, ওই রাস্তা টুকুতে একটা 'এডভেঞ্চার রোড ট্রিপ' শুরু করবার পরামর্শ দিয়ে এসেছি ওদের!



165 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

কোন বিভাগের লেখাঃ মোচ্ছব  বুলবুলভাজা  উৎসব ইস্পেশাল ২০১৮ 
শেয়ার করুন


Avatar: পারমিতা

Re: রুপিন নদীর পাশ দিয়ে, রুপিন পাস্ পেরোনো

লোভ হচ্ছে ট্রেক করার, লেখাটা পড়ে চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছিলাম রুটটা


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন