বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

উৎসবে অনুভবে

সেখ সাহেবুল হক


চেতনা চৈতন্য করে…


কালীপুজো মানে আলোর রোশনাই, আতশবাজি, দু চারটে শব্দবাজি। রংমশাল, ফুলঝুরি, চরকি, তুবড়ির পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি টানে মন্ডপে বাজা শ্যামাসঙ্গীত।
সারাবছর ইউটিউবে, ফোনের মিউজিক প্লেয়ারে, খুব সকালে শ্যামাসঙ্গীতে ডুবে যাওয়ায় অনির্বচনীয় প্রশান্তি।

কলেজবয়সে কলকাতায় থাকার সময় রেডিও মির্চিতে প্রায়শই জগন্নাথ বসুর ‘কালীকথা’ সকালগুলোতে অন্য আমেজ এনে দিতো। কিন্তু কালীপুজোর আবহে গানগুলোর আলাদা আবেদন।

“আমি মন্ত্রতন্ত্র কিছুই জানি নে মা…”। বাস্তবে দেবীর প্রতি সন্তানসুলভ ভক্তি বা পৌত্তলিকতায় বিশ্বাস নেই। কিন্তু গানগুলো ছুঁয়ে যায় ভীষণভাবে। অপার ভক্তিতে গেয়ে ওঠা - “মায়ের পায়ের জবা হয়ে…” গুনগুন করতে করতে অদ্ভুতভাবে নিজের মায়ের মুখ ভেসে ওঠে। গেয়ে উঠি - “আমি আর জনমে মা হবো মা, তুই হবি মোর ছেলে...”।
কোন শ্যামলা সুন্দরীর রূপে বিমোহিত হয়ে অজান্তে মন বুকে পেতে দেয় - “কালো মেয়ের পায়ের তলায় দেখে যা আলোর নাচন…”। অবিরাম মুগ্ধতার উপত্যকা। এভাবেই শ্যামাসঙ্গীত শিল্পগত দিক থেকে শ্রদ্ধা আদায় করে নেয়।

একবার এক ফেসবুকতুতো দিদির সাউন্ডক্লাউডে গাওয়া - “আমার চেতনা চৈতন্য করে…” শুনতে শুনতে অনভ্যস্ত গলায় গেয়ে উঠেছি আচমকা। আব্বা শুনে গম্ভীরভাবে হেসে বলে উঠলেন - “নামাজ কালাম নেই, খালি আমার চেতনা চৈতন্য করলে হবে তো!”। আমি এমনই কতবার হেসে বলেছি গানটা তো গানই, আর শিল্পটা শিল্প।

আব্বা-মা ধর্মে মতি না থাকা নিয়ে যতোই অভিযোগ তুলুন এই কালচারাল আদানপ্রদানের ব্যাপারে কোনওদিন আটকানোর চেষ্টা করেননি। শ্যামাসঙ্গীত দিয়ে অন্য নজরুলকেও চিনতে শেখা।

শ্যামাসঙ্গীত মানে নিভৃতে উদাত্তকণ্ঠে - “চাইনা মাগো রাজা হতে…”। মনখারাপে - “পৃথিবীর কেউ ভালো তো বাসে না, এ পৃথিবী ভালো বাসিতে জানে না”।

কখনও মজার ছবি চোখে ভাসে। বেজায় রেগে প্রিয় নারী চেপে দাঁড়িয়েছেন বুকে। গোবেচারা সেজে চুপটি করে শুয়ে আছি মেঝেয় শ্যামাসঙ্গীতের আবহে। এই অনুভব লিখে বোঝানো, ব্যর্থ চেষ্টার নামান্তর। একটার পর একটা শ্যামাসঙ্গীত বেজে চলেছে সন্ধ্যা থেকে। সাথে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি...।


ভাইচারার ফোঁটা...

খুব ছোটবেলা থেকেই ছাতার সাথে মাথা, ব্যাঙের সাথে ঠ্যাং মিলিয়ে ফেলার রোগ ছিলো প্রবল। একবার অজানা আক্ষেপে মিলিয়েছিলাম - “সাহেবুল, রবিউল দুই ভাই / কিন্তু কোনো বোন নাই…”।

তারপর বাবার কর্মস্থলে ভাড়াবাড়ি ছেড়ে জায়গা কিনে নিজস্ব ছাদ হলো। ভাইয়ের সাথে উঠোনে প্লাস্টিক বলে ক্রিকেটে খেলতে খেলতে রুনুদের প্রথম দেখলাম। রুনু আর মাম, দুই বোন। কালক্রমে তারা আমাদেরও প্রতিবেশিনী বোন হয়ে উঠলো। অর্থনৈতিক দিক ছাড়াও খাওয়াদাওয়া এবং জীবনশৈলীতে বিস্তর হেরফের। তবু রুনুদের সাথে আত্মীয়তা গড়ে উঠলো ঈদের সিমুই, লক্ষ্মীপুজোর নাড়ুতে।

ভাতৃদ্বিতীয়ার এক সকালে মা জানালেন রুনুরা ডাকতে এসেছে ভাইফোঁটা দেবে৷ ওদের কোনো ভাই বা দাদা নেই।

তাড়াতাড়ি স্নান সেরে ধোপদুরস্ত পোশাকে মিষ্টিহাতে গেলাম রুনুদের বাড়ি। মাটির মেঝেতে আসন পেতে কপালে চন্দনের ফোঁটা দিয়ে মিষ্টিমুখ। মাথায় ধান এবং দূর্বা ঘাসের শীষ, শঙ্খধ্বনি, আশীর্বাদ, প্রণাম...। মুসলমানি পরিমণ্ডলের বাইরে ভিন্ন অভিজ্ঞতা সংগ্রহ করলাম প্রথমবারের ভাইফোঁটায়।

রুনুরা বিয়ের পর শ্বশুরবাড়িতে। ব্যক্তিগত হাজার ব্যস্ততায় ভাইফোঁটার সেই ব্যাপারগুলো নেই। কিন্তু ভিন্নধর্মী রীতির পারস্পরিক আদানপ্রদান থেমে থাকেনি।

দীপাবলীতে পরিচিতদের বাড়িতে আমন্ত্রিত হয়ে ছাদে কচিকাঁচাদের নিয়ে ফানুশ ওড়াতে ওড়াতে পরিবারের একজন হয়ে যাওয়ার মধ্যে যে প্রাপ্তি, জমিয়ে খাওয়াদাওয়ায় যে আত্মীয়তা, তা ধর্মের উর্ধ্বে অবস্থান করে। ভাতৃদ্বিতীয়ার মঙ্গলফোঁটা যমের দুয়ারে সত্যিই কাঁটা না দেয় কিনা সেই তর্ক উসকে দেওয়া আড্ডায় বসে দেখেছি, এইসব রীতি-রেওয়াজ সামাজিক মেলবন্ধনের জায়গা তৈরী করে দিয়েছে অজান্তেই। অর্থনৈতিক বৈষম্য, ধর্মীয় চিন্তাভাবনার পৃথক অবস্থানের মধ্যেই রুনুরা নিজের বোনের মতো হয়ে উঠেছে। #হককথা



353 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

কোন বিভাগের লেখাঃ মোচ্ছব  বুলবুলভাজা  উৎসব ইস্পেশাল ২০১৮ 
শেয়ার করুন


Avatar: Sayan majumder

Re: উৎসবে অনুভবে

Eta otota valo ny
Avatar: নাজনীন সুলতানা

Re: উৎসবে অনুভবে

লেখাটা সুন্দর। আসলে এগুলো মন থেকে উঠে আসা সাধারণ কিছু অনুভূতি বলেই এত ভালো লাগে পড়তে। তোমার লেখা পড়ে কখনও বোর হইনা। এভাবেই লেখালেখি চালিয়ে যাও,শুভেচ্ছা রইল।
Avatar: Prativa Sarker

Re: উৎসবে অনুভবে

স্বচ্ছ সুন্দর মানসিকতার ফসল এই লেখা। সহজ কথা এতো সহজ করে বলা যায় !
Avatar: aranya

Re: উৎসবে অনুভবে

সুন্দর


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন