বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

জলরং

পারমিতা দাস

চতুর্থী, ১৯৮২



প্রিয়দর্শিনীতে খুব ভিড় ছিল। অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে তপতী সালওয়ার কামিজের ডেলিভারি পেল। অরবিন্দ রোড়ের পুজোপ্যান্ডেল প্রায় পুরো রাস্তা জুড়ে তৈরী। বিকেলের ফেরিযাত্রীরা পাশের সরু রাস্তা দিয়ে বেরিয়ে পিলপিল করে গঙ্গার ঘাটের দিকে চলেছে। পাড়ায় ঢুকতেই দেখে লালবাড়ির সিঁড়িতে মন্তা-ডলি আড্ডা দিচ্ছে। তপতীকে দেখে ওরা উৎসাহিত হয় ছুটে আসে। কলরব করে প্রশ্ন জিগেশ করতে থাকে।

“পেলি ডেলিভারি?”

“দেখা দেখা কেমন বানিয়েছে!”

“বড়দিদিমণি তোকে সালওয়ার কামিজ পরার পারমিশন দেবে?” (বড়দিদিমণি, অর্থাৎ তপতীর মা, স্কুলের হেডমিস্ট্রেস)

“হলুদ একরঙা পিসটা দিয়ে কামিজ করে ছাপাটা সালওয়ার করলে বেশি মানাত।”

আপাতত এই মফস্বলে সালওয়ার কামিজ এ বছরের ফ্যাশন স্টেটমেন্ট। তপতীর প্রথম। মার ইচ্ছে অনুযায়ী ফুলভয়েলের ফ্রক বা এম্ব্রয়ডারিড হাতে বানানো জামার বিরুদ্ধে গিয়ে জয় ও প্রাপ্তি।

তপতীর পাড়ায় পুজো অনেক আগে আসে। ফেব্রুয়ারির শেষাশেষি সরস্বতী পুজো হয়ে গেলেই। বন্ধ গলি জুড়ে নন্দকাকু যখন খড়ের প্রতিমা তৈরী করতে শুরু করে। তপতীর বাড়ির ঠিক উল্টোদিকে কুড়ি পঁচিশ তিরিশটা মূর্তির কাঠামো তৈরী করা শুরু হয় একসঙ্গে।

তারপর মাটি পড়ে অবয়ব তৈরী হয় একদিন।

আরও মাটি পড়ে। শুকোয়।

প্রতিমার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সুডৌল হতে দ্যাখে তপতী।

বছরে অন্তত চারবার চক্রবর্তে এই ক্রিয়াকান্ড ঘুরে ফিরে আসে। সরস্বতী, বিশ্বকর্মা, দূর্গা-লক্ষী, কার্তিক পুজোর আগে। এই অবধি সব মোটামুটি এক থাকে, তবে মজাটা শুরু এর পর। মাটির কাঠামোয় রঙের পোঁচ পড়ে যখন। চেলি আর গয়না পরানো শুরু হয়। ঠাকুরের মুখের আদল আসে। ডাকের সাজ হয় যদি, তপতী খুব খুশি হয়। তবে ঠাকুরের শাড়ি পরানো দেখতে তপতী মোটেই পছন্দ করে না। যেন নাটকের সেট সাজানো। সামনে অমন সুন্দর কুঁচি, জরি পাড়, আঁচল, কিন্তু পেছনে খড়ের কাঠামো। ন্যাংটো লাগে কেমন। চতুর্থীর দিন সকালে উঠে প্রত্যেকবার সেই ম্যাজিক দেখা অভ্যেস হয়ে গেছে। আটচালা স্বস্থানে এসে গেছে। একটা কাজই বাকি যেটা কখনো পুরোনো হয় না। সেটা দেখার জন্য চতুর্থীর রাত বারোটায় গ্রিল ধরে তপতী দাঁড়িয়ে থাকে। রাস্তার আলো আর কুপি ধরে কাজটা হয় - নন্দ কাকু নিজে করে, কাউকে হাত দিতে দেয় না। একের পর এক ঠাকুরের চক্ষুদান হতে থাকে, তুলির ছোঁয়ায়। শাঁখ বাজায় নন্দকাকুর মা, ঠাকুমা। ব্যাস, প্রতিমা রেডি। নন্দ কাকুর প্রতিমার চোখ কখনো রাগী হয় না। অসুরদলনী মা তো কি? মা দুগ্গার সব সময় মায়াবী করুণ চোখ থাকা উচিত, ঠাকুমা বলেন।

পঞ্চমী আজ। সকাল থেকে ঠাকুর ডেলিভারি শুরু। ব্যানার্জী পাড়ার ওরা কখন এসে গেছে। ঢাক বাজিয়ে লরি করে একে একে বালক সংঘ, মিত্রপাড়া, গরিফার ঠাকুর চলে যায় প্যান্ডেলে। গলিটা ফাঁকা। শুধু লক্ষীঠাকুরেরা রয়ে গেলেন, ওনাদের টার্ন কদিন পর আসবে।

হলুদ সালোয়ারে ফিরে আসে তপতী। ষষ্ঠীর বিকেলে। দোকান থেকে নিয়ে এসেই ন্যাপথালিন দিয়ে রেখেছিলো, বিকেল নাগাদ আলমারি থেকে বের করে পরে। সিঁথি বিহীন একটা স্টাইল দেখেছে টিভিতে, সেটা নকল করে চুলটা উল্টোদিকে টেনে উঁচু করে গার্ডার দিয়ে  বাঁধে। (তাকে পরে কোনোদিন তপতী পনিটেল বলে জানবে।) নিজেকে বেশ বড় বড় লাগে।

বাড়ি থেকে পুজো অনেকটা দূরে। বাড়ির সামনের রাস্তায় বেরোয়। পাশের বাড়ির বাচ্চাটা রাস্তায় খেলা করছিলো, তাকে ডেকে তপতী অকারণে কথা বলতে থাকে। সন্ধে হয়ে এসেছে। কিন্তু হলুদ রংটা ঠিক চোখে পড়বে, এমন আলোটুকু এখনো আছে। এই গলি আর বড় রাস্তার বাড়ির যুবক-কিশোরের দল গুলতানি করতে ঠিক এই সময় বেরোয়। দল বেঁধে থাকলে ওরা দু একটা শুনতে ইন্টারেষ্টিং কমেন্ট করবে আর সেগুলো মা শুনলে খুব বকবে তপতীকেই। অন্যদিন তপতী তাই চোখ নামিয়ে চলে যায়, যেন কেউ কোত্থাও নেই। কিন্তু আজ তপতী তাদের জন্য অপেক্ষা করে। জুতোটায় হিল আছে, একটু উঁচু থেকে গলির ঠেকের সিঁড়িটাকে দেখছে পায়। বাচ্চাটা তপতীদিদির সঙ্গে কথা বলতে বলতে অধৈর্য হয়ে পড়েছে। বেকার তার ক্যাপ ফাটানোর টাইম নষ্ট।

তপতী চোখ তুলে দেখে, অল্প বয়সী ছেলেগুলোর দঙ্গল আসছে। বুকটা একটু ঢিপঢিপ করে।

হলুদ সালওয়ার ও হলুদ-সাদা প্রিন্টেড কামিজ দেখে বা না দেখে ওরা এক সময় পাশ দিয়ে চলেও যায়।

তপতী ভাবে, ছেলেগুলো নিশ্চয়ই ওর সুগন্ধি হাওয়াটা পেলো। গলিতে নন্দকাকুর পড়ে থাকা খড়, দূরে ঢাকের বাজনা আর প্রথম হলুদ সালোয়ার-কামিজ পরা - সবকিছু একসঙ্গে তপতী উপহার দিলো ওই যুবকদের। ওরা জানলো না।

অষ্টমী, ১৯৮৯



মাকে বিস্তারিত ও সন্তোষজনক কৈফিয়ত দিয়ে বেরোতে বেশ দেরী হয়ে গেলো আমার। শেয়ালদা মেইনের দোতলায় রুমি ঠিক আধঘন্টা আগে এসে দাঁড়িয়ে থাকবে। অপেক্ষা করবে। তবে টু বি অনেস্ট, আমার জন্য রুমির এই অপেক্ষাটা আমার ভালোই লাগে। আমার দেরি হলেও রুমি একটুও রাগ করে না। কিন্তু ড্যামিট, আমার ঠিক সময় আসা উচিত। কাল থেকে রোজ ঠিক সময় বেরোবো, নিজের কাছে জোরসে প্রমিজ করি। মুশকিল হচ্ছে, সাউথ ক্যালকাটা থেকে শেয়ালদা আসতে অনেকটা সময় লেগে যায় আমার। তবে রুমি যে কি করে শিমুরালি থেকে শেয়ালদা ঠিক সময়ে এসে যায়!

আজ রুমিকে নিয়ে পার্ক স্ট্রিট যাবো। ভালো চাইনিজ খাবো দুজনে।

ট্যাক্সির ভাড়া মিটিয়ে দুড়দাড় করে শেয়ালদা মেইনের দিকে এগোই। টিকেট কাউন্টারের কাছ থেকেই দেখতে পাই, দোতলায় রুমি দাঁড়িয়ে আছে। আমাকে দেখেই ওর মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে - আমাকে আর কষ্ট করে ওপরে উঠতে হয় না, ও-ই নেমে আসে নিচে। আরে, আজ দেখছি রুমি শাড়ি পড়েছে! নীল একটা শাড়ি, আর কোইন্সিডেন্টালি আমিও একটা নীল টিশার্ট। কলেজে ওকে কখনো শাড়ি পড়তে দেখি না। মন্দ লাগছে না, তবে একটু বয়স বেড়ে গেছে।

দুজনে পিপিং-এ ঢুকি। ওকেই জিগেশ করে নিই প্রথমে, “কি খাবি?”

“তুই যা অর্ডার দেবার দে না।” জানতাম এটাই বলবে। শি লেটস মি টেক দা কল।

“সুপ্ প্রথমে?”

“ওকে।”

দুটো চিকেন কর্ন  সুপ্ নিই। অপেক্ষা করতে করতে জিগেশ করি, “রুমি ঠাকুর দেখতে যাবি?” অবশ্য আমার ঠাকুর দেখা নিয়ে তেমন কোনো ইয়ে নেই। আবার রুমি চাইলে যেতেও আপত্তি নেই, তাই ওকেই চান্সটা দিলাম। সুপ্ এসে গেছে এরমধ্যে, আমি রুমির দিকে ওর বোলটা এগিয়ে দিই। রুমি প্রথম স্পুনটা মুখে দিয়েই মুখটা একটু কুঁচকে ফেলে। আমি জিগেশ করি, “ভালো লাগছে না, না কি রে?”

“ঠিক আছে।”, বলে অনেকটা সস আর ভিনিগারে ভেজানো কাঁচা লংকা ঢালতে থাকে।

“আসলে এই রকম সুপ্ কখনো খাই নি আগে।”, রুমি লজ্জিতভাবে বলে, “শিমুরালিতে কোনো চাইনিজ খাবারের দোকান নেই। সুরুচিতে অর্ডার দিই মাঝে মাঝে, প্যাকেট করে চাউমিন বাড়িতে নিয়ে আসি। আর রানাঘাট প্ল্যাটফর্মে  রেলের দোকান আছে, ওখানেও নুডল পাওয়া যায়। মাঝে মাঝে গিয়ে খাই।”

ভালো চাইনিজে হাতেখড়ি হোক আজ ওর। চিলি চিকেন, সুইট এন্ড সাওয়ার প্রন আর মিক্সড ফ্রাইডরাইস অর্ডার দিই। “খেয়ে দ্যাখ, একদম অন্য রকম চাইনিজ।”

চটপট খাবার আসে আজ।

“এতো খাবে কে? সব ফেলা যাবে।”

“যায় যাক। তুই সবগুলো একটু একটু করে টেস্ট কর।”

রুমিকে শেখাই। দুজনে খেতে এলে মুখোমুখি বসতে হয়। কার্টেসি। এসেই ধপ করে পাশে বসে পড়ছিলো। যা যা বলি, যে সিকোয়েন্স-এ খেতে বলি, রুমি মন দিয়ে শোনে। আমার ওকে নতুন করে তোলার ইচ্ছেটাকে বুঝেই যেন শুষে নেয়। একটুও যেন বাদ না যায়, এমন অতন্দ্র হয়ে শোনে।

“যাবি প্যান্ডেলে?” খাবার শেষে আবার জিগেশ করি। এখন আর রুমিকে শাড়ি পরে বয়স্ক লাগছে না। খেতে খেতে শাড়িটা এলোমেলো হয়ে যাওয়ায় বাচ্চাদের মতো লাগছে।

“তুই বল। আমার শুধু তোর সঙ্গে থাকতে ইচ্ছে করছে। প্যান্ডেলে তো খুব ভিড়, আর আমাকে কিন্তু ছটা চল্লিশের রানাঘাট ধরতে হবে।”

“আমি যা বলবো তাই?”

“হুঁ।”

“আইডিয়া! চল আমরা শিমুরালি যাই।”

শিমুরালিতে রুমির বাড়ি। দু-একদিন গেছি। বিরাট জয়েন্ট ফ্যামিলি, বাবা-কাকা-জ্যাঠারা সবাই একসঙ্গে থাকেন। কলকাতা থেকে বাড়ির মেয়ের বন্ধু এসেছে শুনলে সবাই কি করে আপ্যায়ন করবেন ভেবে পান না। এই আন্তরিকতাটা আমার খুব ভালো লাগে।

শিমুরালি স্টেশনে আজ আপের দিকেও বেশ ভিড়। দু মিনিট মাত্র ট্রেন থামার জন্য দেয়। কোনোমতে ভিড় কাটিযে নামলাম। রিক্সায় চেপে “জগন চৌধুরীর বাড়ি চলুন” বলতেই আমি রুমির হাত চেপে ধরি।

“না, আজ তোর বাড়িতে যাওয়া নয়।”

“তাহলে?”

“আনন্দনগর চল।”

রুমির কাছেই শুনেছি। রেলের এ পারটা বেশ গ্রাম গ্রাম। আর একটু ভেতরে ঢুকে গেলে নাকি সবুজে সবুজ, কলকাতার লোকেরা অমন রাস্তায় নাকি কখনো হাঁটতে পায় না। আনন্দনগরের দিকে গেলে সত্যিকারের বাংলার গ্রাম দেখা যায়, রুমি অনেকবার জানিয়েছে আমাকে। বড়রাস্তা উজিয়ে যেখানে মাটির রাস্তা হয়ে অর্ধেক চওড়া হয়ে গিয়েছে, সেখানে গিয়ে আমরা রিক্সাটাকে ছেড়ে দিই। “এবার একটু হাঁটা যাক রুমি।” রুমি আপত্তি করে না কারণ ওর হাতে অনেক সময়, ও তো বাড়ির কাছেই আছে। আমি ফিরে মাকে যাহোক কিছু একটা বলে দেব। আর কাছেই নাকি একটা আটার কল আছে, সেখান থেকে ফোন করা যায় কলকাতায়, একটা কল করে দিলে অল কাভার্ড। ম্যাক্সিমাম বলবে, “কমপ্লেক্সের পুজোয় অষ্টমীর দিন থাকলি না?” সেটা বিগ ডিল কিছু না।

হাঁটতে হাঁটতে আমরা মাইল দুই পেরিয়ে এসেছি। পথে দুটো পুজো পড়েছে। বাচ্চারা ক্যাপ ফাটাচ্ছে, মাইকে “আমরা অমরসঙ্গী ই ই” তারস্বরে, বড় বড় ড্রাম থেকে খিচুড়ি ভোগের গন্ধ বেরোচ্ছে আর তার চারপাশে বোঁবোঁ করে মাছি ঘুরছে। আমরা পুজোর দিকে ভ্ৰূক্ষেপ না করে এগিয়ে যাই। বাচ্চারা অপরিচিত মুখ দেখে ক্যাপ ফাটানো বন্ধ করে যে পেছন থেকে আমাদের দেখছে, তা বেশ বুঝতে পারি। বিকেল হয়ে এসেছে বলে নতুন জামা প্যান্ট শাড়ি পরে লোকজনের আনাগোনা রাস্তায় হঠাৎ বেড়ে গেলো। বড় বড় পা ফেলে এগিয়ে যাই।

হঠাৎ দেখি আর ছোটোবড়ো কোনো বাড়ী নেই দু পাশে। গ্রাম বসতি নেই। টিনের চালা, দোতলা পাকা বাড়ি, স্কুলের মাঠ, মন্দিরতলা কিচ্ছু নেই। আমরা দুজন কখন যেন একটা গ্রীন জোনে ঢুকে গেছি। দুদিকে লম্বা শীষওয়ালা যত-দূর-চোখ-যায় এতো বিশাল ধানক্ষেত, মধ্যে মাটির রাস্তা আর ধানক্ষেতের মধ্যে দিয়ে মাঝে মাঝে সরু আল, একজন মানুষের পায়ে হাঁটার মতো। আলো পড়ে আসছে। অল্প হাওয়ায় ধানের শীষ দুলছে। ত্রিসীমানায় কেউ কোথাও নেই, গলা ছেড়ে “হা রে রে রে” ডাক দিলেও কেউ শুনতে পাবে না। রুমিকে বলি, “চল, আল ধরে ধানক্ষেতে ঢুকে পড়ি।” এইবার রুমির চোখে একটু বিপন্নতা দেখি। তবে তাকে এক ফুৎকারে উড়িয়ে দিতে আমি জানি। ওর হাতটা টেনে আল ধরে হাঁটতে শুরু করে দিই। যত হাঁটতে থাকি, দুদিকের ধানগাছগুলো ততই লম্বা হয়ে ওঠে। স্পিড বাড়িয়ে দিই। ধানের চোরাবালিতে ডুবে যেতে থাকি দুজনে। এই ঘন সুবুজ জঙ্গলে হারিয়ে না যাবার জন্য একটাই নিশানা, এই আলের রাস্তা। দূরে আলতো করে একটা ঢাকের বাজনা হঠাৎ শুনতে পাই যেন, বা মনের ভুলও হতে পারে।

মাথানাড়া ধানগাছ থেকেও যে একটা শব্দের উৎপত্তি হয়, সেই প্রথম জানলাম। আরও জানলাম মাটিতে একটা গন্ধ থাকে। অনেকটা রুমির গায়ের গন্ধ। সেই শব্দ আর মাটির সেই বুনো গন্ধ ইন্দ্রিয়গুলোতে চেপে বসে যায়। তখনও জানতাম না, পরের বছর পুজোয় রুমিকে আমার আর ভালো লাগবে না। আমি গুটিয়ে নেবো নিজেকে আর রুমি খুব কষ্ট পাবে। তা হোক। কিন্তু আজ, এখন এই মোমেন্টটা পুরো ফ্রিজ করে গেলো। যখন ইচ্ছে ছুঁয়ে ফেলতে পারবো।

সপ্তমী-অষ্টমী, ২০১০



pronoyray.blogspot.com থেকে:

“একবার এসে কলকাতার পুজো দেখে যা, একদম ট্যারা, বুঝেছিস, ট্যারা হয়ে যাবি।”

“পৃথিবীর অষ্টমাশ্চর্য, এখনো দেখিস নি? ছ্যা ছ্যা ছ্যা ছ্যা।”

“ক্যামেরা, ভিডিও ক্যামেরা, ট্রাইপড, খাতা সব নিয়ে এসে একটা এন্ড টু এন্ড পরিক্রমা নিতে আয়, বাংলার পুজোশিল্প এখন একটা রিসার্চ টপিক হবার যোগ্য।”

“আটানব্বইতে লাস্ট পুজো দেখেছিস? থিমে থাক, থেমে নয়।”

বেশ কয়েক বছর ধরে আত্মীয়, বন্ধুদের কাছে এমন সব পুজো-প্রোপাগান্ডা শুনতে শুনতে এবার পুজোয় কলকাতা আসা গেলো। সপ্তমীর সকালে ল্যান্ড করলাম আর বাই সন্ধেবেলা আমরা রেডি - দুই মেয়ে, বৌ দীপিতা, শালী, শালিপুত্র, সবাইকে নিয়ে কলকাতার পুজো পরিক্রমা - চালাও পানসি সাউথ ক্যালকাটা!

ঢাউস একখানা গাড়ি ভাড়া করা হয়েছে। বিদেশে জন্মানো কন্যাদের গরম লাগতে পারে ভেবে এসি গাড়িই পছন্দ করা হয়েছে ভাড়ার জন্য। কিন্তু তাতে কি? গাড়িতে উঠেই আমার চার ও নয় বছুরে কন্যারা যারপরনাই উসখুসানি ও বিরক্তিপ্রকাশ শুরু করে।

“দিস ইন্ডিয়ান ড্রেস ইজ সো ইচি।”

“আই ওয়ান্ট টু গো হোম এন্ড ওয়াচ কার্টুন চ্যানেল।”

“ইউ প্রমিজড ফুচকা ইফ উই সি থ্রি ঠাকুরস। আই হ্যাভ অলরেডি সীন ফোর।”

ঠিক সময়ে গাড়িটাও জ্যামে থেমে যায় আর প্রবল বিরক্তির উদ্রেক করে। ড্রাইভার রেডিও চালিয়ে অমায়িকভাবে জানায়, “দাদা, ভালো গান হচ্ছে, শুনুন। আপনারা তো বাইরে রেডিও মির্চি পান না, না?”

ঘন্টাখানেক হয়ে গেছে। এখনো ব্যাক টু ব্যাক গাড়ি রাস্তায়। মেয়েরা ঘেমে নেয়ে আরও ঘ্যানঘ্যান শুরু করেছে। বারবার জানতে চাইছে, আর কতক্ষন রাস্তায় থাকতে হবে। ধুস। এইভাবে থিমপুজো দেখা যায় না। ড্রাইভারকে বললাম গাড়ি ঘুরিয়ে নিতে। বাড়ি ফিরে ঠান্ডা ঘরে টিভি চালিয়ে দিলাম। কার্টুন চ্যানেল দেখুক বসে। বিরিয়ানি মাংস আর বাচ্চাদের জন্য পিজ্জা হোম ডেলিভারি করিয়ে নিলাম। বাচ্চারা ঘুমিয়ে পড়লে আমি, দীপিতা, বাবা আর মা সোফায় বসে একসঙ্গে টিভিতে পুজো পরিক্রমা দেখে নিলাম।

dipitaray.blogspot.com থেকে:

আমি আজও একটা চান্স নেবো। থিমপুজো একটিবারের মতো ভালো করে না দেখে ফিরে গেলে লোকে বলবে কি? আর আমরাই বা কি গল্প শোনাবো সবাইকে? শুধু বিরিয়ানি, কাবাব আর মৌরলা মাছ ভাজা খেতে পুজোর সময় ছুটি নিয়ে দেশে এলাম? কভি নেহি।

আমার ভাই অর্ণব এসে সন্ধেবেলা বাচ্চাদের বেবিসিট করবে কথা দিয়েছে। এসেও গেছে ঠিক সময়। দুই মেয়ে মামুর কাছে ভালোই থাকবে। অর্ণব ক্যারমবোর্ড বের করেছে। মেয়েরা দৌড়ে এসে ক্যারোমবোর্ড নিরীক্ষণ করতে থাকে।

“হোয়াট ইজ দ্যাট?”

“ইটস লাইক আ ইনডোর গল্ফ গেম। লেট্ মি শো ইউ হাউ টু প্লে।”

ওরা ক্যারম খেলতে খেলতে জমে গেছে। টেবিলে খাবার সাজিয়ে দিদা ডাকলে সবাই ডিনার সেরে নেবে। মেয়েদের দুজনকে শুইয়ে দিয়ে আমি আর প্রণয় বেরোবো। ওরা ঘুমিয়ে পড়লে ভাই চলে যাবে।

বেরোতে বেরোতে এগারোটা হলো। উত্তর কলকাতা প্রণয়ের নখের ডগায় আর আমি প্রবাসে বড় হওয়া বাঙালি। কলেজের সময় থেকেই কলকাতায়, কিন্তু কলকাতার কিছুই এখনো তেমন চিনি না। বিশেষত: নর্থ ক্যালকাটার রাস্তা আমি কিছুই চিনি না। তাই বলতে পারবো না প্রণয় কোথায় গিয়ে গাড়িটা ছেড়ে দিয়েছিলো। বলেছিলো, গাড়ি এর থেকে বেশি পুজোর কাছে যাবে না। এবার কলকাতা হেঁটে দেখতে শিখুন ম্যাডাম। তাই সই।

গাড়ি থেকে নেমে অনেক স্বপ্নের আলোছায়ার মধ্যে দিয়ে গেলাম আমরা দুজন। কখনো বাংলার গ্রামের রাঙামাটি রাস্তায় হাঁটলাম একসংগে, যে রাস্তায় গরুর গাড়ি চলছে এক সারি আর ভেতরে সারদা মা আর রামকৃষ্ণ বসে আছেন। কখনো বা আমাজনের ঘন জঙ্গলে পৌঁছে গেলাম। বাগবাজার বলেছিলো বোধহয়। একটা প্যান্ডেলে ঢুকলাম, সেখানে পাখির আধিক্য। আর সেই সঙ্গে পাখির কিচিরমিচির দিয়ে গ্রীন হাউস এম্বিয়েন্স। পুজো থেকে পুজোয় যাওয়া। এক সময় প্রণয় বলে উঠলো, "ওই দ্যাখো সামনে!" সামনে তাকিয়ে দেখি, জলের মধ্যে আলোবাজী! কি সুন্দর লেকটা! আমি এই লেকের নাম জানি। কলেজ স্কোয়ার। কলেজ স্কোয়ারের শ্যান্ডেলিয়ারের দিকে আমি হাঁ করে তাকিয়ে থাকি। আলোয় আলোময় হয়ে রূপসী কলকাতা দাঁড়িয়ে আছে আমার সামনে।

পরের পুজোর নামটা মনে নেই। কিন্তু ঢুকতেই সারা পৃথিবীর পুতুল ভরা প্যান্ডেল। বাচ্চারা দেখলে পাগল হয়ে যাবে। এমনি এমনি পুতুল নয়, গল্প দিয়ে সাজানো পুতুলরাজ্য, যেন এক বিশাল ঝুলন চলছে এখানে। ছোট ছোট রাস্তা, কোথাও পুতুল বাচ্চারা মাঠে খেলছে। কোথাও পুতুল গ্রামবাসীর বাজার বসেছে। কোথাও পুতুল স্কুল চলছে পুরোদমে, শিক্ষকরা টেবিল চেয়ারে বসে বেঞ্চে বসা ছাত্রছাত্রীদের পড়াচ্ছেন। আমার মনে পড়ে গেলো, ইটস এ স্মল ওয়ার্ল্ড আফটার অল!

ডিজনিল্যান্ডকে কলকাতার থিমপুজো পাঁচ গোলে হারিয়ে দিতে পারে।

একের পর এক পুজো পেরিয়ে যাই আমরা। হাই হীল জুতোটা হাতে ঝুলিয়ে, শাড়ির আঁচল কোমরে গুঁজে খালি পায়ে হাঁটতে থাকি। রাস্তা ফাঁকা হয়ে এসেছে। অনেকক্ষণ হাঁটার পর এতো আলোর মাঝখানে মাথার ওপরেও হঠাৎ আলোর রেখা দেখতে পাই। ওপরে তাকিয়ে দেখি, ভোরের আলো! আর তারমধ্যে লালের একটা স্লাইট আভা। থিম পুজো এমন ভোরের আকাশ বানাতে পারে নি এখনো, ভেবে আশ্বস্ত হই। দিনের প্রথম পাখিটা ডেকে ওঠে। প্রণয় কোত্থেকে যেন নিয়ে আসে - মাটির খুরিতে গরম ধোঁয়া ওঠা চা। দুজনে একসঙ্গে রাস্তার পাশের বেঞ্চিতে বসে চায়ের ভাঁড়ে চুমুক দিই। আঃ! শীত করছিলো একটু একটু। কোথাও একটা আজান শুরু হয়ে গিয়েছিলো।



2478 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

কোন বিভাগের লেখাঃ বুলবুলভাজা  গপ্পো  উৎসব ইস্পেশাল ২০১৮ 
শেয়ার করুন


Avatar: দ

Re: জলরং

বাহ
Avatar: i

Re: জলরং

দুই আর দুইয়ে চার না হয়ে একটা তারাও হয়ে যেতে পারত। হ'ল না।
Avatar: Du

Re: জলরং

আরে বাহ!!


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন