বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

প্রদীপের ‘বিসর্জন’ অথবা লঘু’র লঘু’র উৎসব

ষষ্ঠ পাণ্ডব



প্রদীপরা যে এলাকাটাতে থাকে সেটা ঠিক শহরের মধ্যে নয়, শহরের এক প্রান্তে মাসদাইরে। অবশ্য প্রদীপদের পারিবারিক যে পেশা তাতে শহরের মধ্যে থাকলে ওদের ভারি অসুবিধা হতো। প্রদীপের বাবা, কাকারা, মামারা, পিসেরা, মেসোরা, প্রতিবেশিরা সবাই পেশায় ধোপা। এর মানে এই না যে তারা লোকের বাড়ি বাড়ি থেকে কাপড় এনে ধোলাই করে। ওরা মূলত শহরের শিল্পএলাকার হোসিয়ারীগুলো থেকে কোরা গেঞ্জির কাপড় (গ্রে কটন জার্সি) এনে ধোলাই করে, রঙ করে। এর বাইরে আবাসিক হোটেল, ক্লিনিক, ডেকোরেটরের বেডশিট, টেবিলক্লথ, পর্দা, চেয়ার-সোফা-বালিশের কাভার ধরনের কাপড়ও ধোলাই করে। কাপড় ধোলাই করা, রঙ করা, মাঠে বাঁশ পুঁতে তার টানিয়ে শুকানোর জন্য অনেকটা খোলা জায়গার দরকার হয়। এ’কারণে শহরের এক প্রান্তে মাসদাইর এলাকায় এই ‘ধোপাপট্টি’ গড়ে উঠেছে। এলাকার লোকজন নিজেদের পরনের কাপড় ধুতে নিয়ে এলে প্রদীপরা একটু বিরক্ত হয় বটে, তবে তা মুখে প্রকাশ করে না। কেউ কেউ নিরুৎসাহিত করার জন্য বলতো, ‘অ্যাতোসব বড় কাপোরের মইদ্যে ছোট কাপোর দিলে ছিরা যায়’। তবু কিছু মানুষ নিজ এলাকার ভেতরে থাকা ধোপাপট্টিতে কাপড় ধুতে দিতে পছন্দ করতো।

ধোপাপট্টিটা মাসদাইরেরও এক প্রান্তে। সেখানে পরিষ্কার জলের দুটো বড় বড় পুকুর, ময়লা জল ফেলার তিনটা ছোট ডোবা, কাপড় শুকানোর জন্য বন বিভাগ আর ব্রিক ফিল্ডের ফেলে রাখা বড় মাঠ আছে। তাছাড়া শহরের ভেতরে যাবার প্রধান রাস্তাটাও ঠিক পাশে। সব মিলিয়ে পাড়াটার অবস্থান বেশ সুবিধাজনক। আরেকটা কারণে ধোপাপট্টির অধিবাসীদের কাছে জায়গাটা বেশ পছন্দ, সেটা হচ্ছে ধোপাপট্টি মাসদাইরের অংশ হলেও সেটা পুকুর-ডোবাগুলো দিয়ে বিচ্ছিন্ন — যোগাযোগটা করতে হয় বেশ একটু ঘুরপথে। ফলে ধোপাপট্টি কার্যত একটা স্বতন্ত্র পাড়া হয়ে গেছে।

মুসলিম প্রধান এই শহরে জনসংখ্যার শতকরা হারে হিন্দুরা কতভাগ সেটা নিয়ে তর্ক করা যেতে পারে, কিন্তু এখানে হিন্দুদের প্রভাব নিয়ে কারো সন্দেহ নেই। বেশির ভাগ বাড়ি, বাজার-সুপার মার্কেট, দোকান, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, শিল্প-কারখানার মালিক হিন্দুরা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ম্যানেজিং কমিটি বা শিক্ষকদের মধ্যে প্রভাবশালীরা হিন্দু। সাংস্কৃতিক অঙ্গনের বড় অংশ হিন্দু শিল্পী-কলাকুশলী-কর্মীর দখলে। খেলার মাঠেও হিন্দু খেলোয়ারদের বাদ দিয়ে শক্তিশালী ফুটবল, ক্রিকেট বা অ্যাথলেটিক টিম গঠন করা সম্ভব না। ফলে শহরের সব এলাকাতে দু’চারটা প্রভাবশালী হিন্দু পরিবার মিলবেই। এই বিচারে মাসদাইর এলাকাটা ব্যতিক্রম। এখানে প্রভাবশালী দূরে থাক এক ঘর ‘ভদ্রলোক’ হিন্দু পরিবার নেই। খান দশেক রোমান ক্যাথলিক পরিবার, এক ঘর বৌদ্ধ ছাড়া আর সবাই মুসলিম। ধর্ম বিশ্বাসে হিন্দু হলেও ধোপাপট্টির অধিবাসীরা এই শহরের সবার কাছে শুধুই ‘ধোপা’। একটা বিচ্ছিন্ন পাড়ায় থাকাটা তাই ওদের জন্য স্বস্তির।



বাইরে থেকে ধোপাপট্টির অধিবাসীদের দিনমান খাটাখাটুনি করতে দেখা গেলেও ওদের আয় অসম্ভব রকমের কম। হোসিয়ারী হোক বা হোটেল বা ক্লিনিক কেউই ধোলাইয়ের বিল নিয়মিত পরিশোধ করে না। একেক জনের নামে বাকির খাতায় লম্বা হিসাব আছে, কিন্তু অপরিশোধিত বিলের কথা বলে কারো কাজ ফিরিয়ে দেয়া যায় না। কাজ করতে গেলে নানা প্রকারের ডিটারজেন্ট, ব্লিচিং এজেন্ট, ডি-স্টেইনিং এজেন্ট, ইমালসিফায়ার, ব্রাইটনার, ফেব্রিক কন্ডিশনার আর স্টার্চের মত জিনিস লাগে। কাপড় রঙ করতে গেলে আরও কয়েক ডজন রকমের কেমিক্যাল লাগে। এসবের কোন কিছুই টানবাজারের কেমিক্যালের দোকানগুলো থেকে বাকিতে পাওয়া সম্ভব না। বয়লার আর কাপড় সেদ্ধ করার উনুনগুলো চালানোর জন্য গ্যাসের কানেকশন পেতে গেলে গ্যাস কোম্পানীর অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরকে যে পরিমাণ টাকা ঘুষ দিতে হবে সেটা ওদের সবার স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বেচলেও হবে না। তাই ওসব চালানোর জন্য আলীগঞ্জের কয়লার ডিপো থেকে নগদে কয়লা কিনতে হয়। এভাবে ওদের আয়ের বড় অংশ পরবর্তী কাজের জন্য জিনিস কিনতে চলে যায় কিন্তু নিজেদের পাওনা ঠিকমতো মেলে না।

অনেক প্রতিষ্ঠান আছে যারা ওদের বিল পরিশোধ না করে পাততাড়ি গুটায়, তখন পুরো টাকাটা মার খায়। কেউ কেউ দাবিকৃত পাওনার অংকের সাথে একমত হয় না — নিজেদের খেয়ালখুশিমতো পরিশোধ করে। কেউ কেউ আবার মুখ ঝামটা মেরে বলে, ‘যা! যা! এক পয়সাও পাবি না’। কেন ‘এক পয়সাও পাবে না’ তার কারণ ব্যাখ্যা করার প্রয়োজনটাও তারা বোধ করে না। তারা জানে পুরো টাকা মেরে দিলেও ধোপাপট্টির কেউ কিছু করতে পারবে না। তাই এখানে ধর্মীয় পরিচয় নির্বিশেষে ঊচ্চবর্গের লোকজন নিম্নবর্গের ধোপাদের টাকা মেরে দেয়।



আরও একটা কারণে ধোপাপট্টির বাসিন্দাদের অভাব মেটে না। পলেস্তারাছাড়া নয় ইঞ্চি ইটের, মাটির মেঝের ধোপাপট্টির একচালা ঘরগুলো, তার বয়লার, কাপড় সেদ্ধ করার উনুনগুলো, তিনটা চাপকল, কাপড় নিংড়ানোর রোলারগুলো, রঙের চৌবাচ্চাগুলো, ধোলাইয়ের ঘাটগুলো, দুইটা পুকুর, তিনটা ডোবা মায় ডোবার পাশের বিচিকলার ঝাড় পর্যন্ত সব কিছুর মালিক হচ্ছেন সলিম উল্লাহ্‌ চৌধুরী, প্রদীপদের বাবা-কাকারা নয়। প্রতি মাসে এই প্রত্যেকটা জিনিসের ভাড়া তাকে পাই পাই করে বুঝিয়ে দিতে হয়। চাপকল-চৌবাচ্চা-পুকুর ঘাটের যে মাসিক ভাড়া হতে পারে সেটা এই ধোপাপট্টি না গেলে বোঝা যাবে না। সেই ভাড়া আবার বছর বছর বাড়ে – কোন নির্দিষ্ট হারে না, চৌধুরী সাহেবের খেয়াল খুশিমতো। এটা নিয়ে কোন অনুরোধ, অনুযোগ, আবেদনে তিনি কান পাতেন না।

প্রতি মাসের শেষে ধোপাপট্টির লোকজন আতঙ্কে থাকে — নতুন মাসের শুরুতে ভাড়াটা পরিশোধ করতে পারবে তো! কোন মাসের ভাড়া দশ তারিখের মধ্যে দেয়া না হলে চৌধুরী সাহেবের মেজো ছেলে আবদুল হক চৌধুরীর আগমন ঘটে। আবদুল হক চৌধুরী ঊচ্চস্বরে অশ্রাব্য গালিগালাজ করতে করতে পাড়ায় ঢুকে ধোপাপট্টির নেতৃস্থানীয়দের ডাকতে থাকে। আরও দশটা গালি সহযোগে সে ভাড়া না দেবার কৈফিয়ত তলব করে, এবং জানিয়ে দেয় আগামী দুই/তিন দিনের মধ্যে ভাড়া না পেলে ‘ছোটলোক’, ‘মালাউন’ ধোপাগুলোকে পশ্চাতদেশে লাথি মেরে বিদায় করা হবে। চৌধুরী সাহেব রাজনীতি না করলেও বড় রাজনৈতিক দলগুলোকে নিয়মিত ‘খাইখরচা’ যোগান, তার মেজো ছেলের কোমরে কালো রঙের একটা ছয় ঘোড়ার পিস্তল গোঁজা থাকে। সুতরাং ‘ধোপা’রা দূরে থাক মাসদাইরের ‘ভদ্রলোক’দেরও সাহস নেই তাদের মুখের ওপর কিছু বলে।



ধোপাপট্টির কেউ কেউ পারিবারিক পেশার বাইরে অন্য কিছু করে খরচ মেটানোর চেষ্টা করেন। যেমন, বিকেল-সন্ধ্যায় অনন্ত বাদাম, মটর, ছোলা, শিমবিচি ভাজা, তার ভাই দিলীপ ঘুঘ্‌নি আর তার শ্যালক অলোক চিংড়ির মাথা ভেজে বেচেন। উত্তম কাগজের ঠোঙ্গা বানিয়ে বেচেন, ভোরবেলা রেল লাইনের উপরের বাজারে কার্তিক সবজি আর নারায়ণ মাছ বেচেন, অখিলের বউ পাড়ায় পাড়ায় ছাই আর কালাসাবান বেচেন। এর বাইরে অন্যেরাও শীতকালে, মেলাতে, উৎসবের সময় এটাসেটা বিক্রি করেন। এতেও যে খুব লাভ হয় তা নয়। পথচলতি লোকজন অনন্তের টুকরি থেকে মুঠোভরে বাদাম বা অন্য কিছু নিয়ে যায় – কিছু না বলেই, কিছু মূল্য না দিয়েই। ‘ঐ হালা! ঘুগনিত্‌ কাউট্টার গোস্ত দ্যাছ নাই ত’ বলতে বলতে এক থাবা ঘুঘ্‌নি তুলে নিলে অথবা একটা চিংড়ির মাথা ভাজার দাম না দিলে একদিনের লাভের টাকার অর্ধেকটা চলে যায়। সবজি, মাছ, ছাই, কালাসাবান লোকে মাসকাবারি বাকিতে কিনতে ভালোবাসে। মাস শেষে সেই বাকির টাকা খুব কম জন নিয়মিত পরিশোধ করেন। ফলে শত চেষ্টাতেও ধোপাপট্টিবাসীদের অভাব ঘোচে না।



এই শহরের আমলাপাড়া, পালপাড়া, নন্দীপাড়া, উকিলপাড়ার মত ধনী পাড়ার দুর্গাপূজার বেশ নামডাক আছে। ব্যবসাকেন্দ্র হিসাবে পরিচিত কালীর বাজার, দ্বিগুবাবুর বাজার, প্রেসিডেন্ট রোড, চেম্বার রোড, নিমতলী, জমিদার কাচারী, বংশাল, ভগবানগঞ্জ বা মণ্ডলপাড়ার পূজাও যথেষ্ট জাঁকজমকের সাথে হয়। আর রামকৃষ্ণ মিশনের পূজা তো জাতীয় পর্যায়ের খবর হয়। যে সব পাড়ায় বিশ-ত্রিশ ঘর হিন্দু আছে সেসব পাড়ায়ও একটু ছোট আয়োজনে দুর্গাপূজা হয়। ধোপাপট্টিতে ত্রিশ ঘরের মতো হিন্দু থাকলেও সেখানে দুর্গাপূজার আয়োজন হয় না। কারণটা উদ্যোগের অভাব নয়, অর্থের অভাব। কোন বছরে পূজার আয়োজন করার মতো টাকা হাতে থাকলেও করা হয় না পরের বছরের কথা ভেবে। কারণ পরের বছর পূজার আয়োজন করার মতো সঙ্গতি নাও থাকতে পারে। আর একবার মায়ের বাৎসরিক পূজা চালু করার পর সেটা আয়োজন না করার সাহস কারো নেই। এজন্য শারদীয় দুর্গোৎসবের দিনগুলোতে ধোপাপট্টির লোকজন শহরের বিভিন্ন জায়গার পূজায় ভাগাভাগি হয়ে যায়।

এই ব্যাপারটা প্রদীপের কখনোই ভালো লাগে না। অন্য পাড়ার মণ্ডপে নিজেকে কেমন যেন অনাহুত লাগে। তাছাড়া সেখানে যদি কোন সহপাঠীর সাথে দেখা হয়ে যায় তাহলে সাড়ে সর্বনাশ! কখনো কেউ তার দিকে তাকিয়ে মুখ টিপে হাসে, কখনো কেউ সরাসরি বলেই বসে, ‘ধোফার পো ধোফারা আইসে রে! ফকিন্নিগিলি নিজেগো পারাত মা’র পূজাটা পজ্জন্ত করতে পারে না’। এমন কথা শুনলে প্রদীপের মরে যেতে ইচ্ছে করে। একবার এমন এক অপমানের ঘটনায় সে মায়ের হাত ধরে টেনে বলে, ‘মা! চল্‌ এই জাগাত্তে যাইগা। অন্য ঠাকুর দেহি’। এক ঝটকায় মা হাত ছাড়াতে ছাড়াতে বলেন, ‘চুপ কর্‌! এই বিটলাগিলির লেইগা ইট্টু শান্তি মতোন পূজাটাও করোন যায় না’। পরে দেখা গেলো অভিযোগটা কেবল প্রদীপের একার নয় — প্রদীপের দাদা হারাধন আর দিদি মালতীও একই প্রকার অভিযোগ করছে। সব শুনে বাবা একটু ভেবে সমাধান দিলেন — এমনিতে কুমারী পূজার জন্য রামকৃষ্ণ মিশনে যেতেই হয়, তাই পরের বছর থেকে অন্য দিনগুলোতেও পূজাপাঠ রামকৃষ্ণ মিশনে সারা হবে।

এটা আংশিক সমাধান হলো বটে, পুরোটা নয়। রামকৃষ্ণ মিশনের পূজায় সারা শহর তো বটেই শহরের বাইরের লোকজনও আসে। কখনো কখনো জটাপড়া চুল, গলায় রুদ্রাক্ষের মালা, হাতে লোহার বালা, ময়লা কাপড় পরা, ক্যামেরা হাতে সাদা চামড়ার সাহেব-মেম্‌রাও আসে। অমন বারো জাতের মানুষের ভীড়ে প্রদীপের মনে হয় পূজা করতে নয়, মেলা দেখতে এসেছে। তাছাড়া রামকৃষ্ণ মিশনের পূজায় ঠাকুর বিসর্জনের অংশে মিশনপাড়ার লোকজনের দাপটে বাইরের লোকজন পাত্তা পায় না। অন্যদেরকে ওরা ট্রাকে উঠতে দিতে চায় না, শীতলক্ষ্যায় বিসর্জনের সময় নৌকায় উঠতে দিতে চায় না। তাই ওদের সাথে গেলে বিসর্জনের মজাটা আর থাকে না। শেষ প্রান্তে যে সমস্ত স্ত্রী-আচার থাকে তাতে মিশনপাড়ার দামী শাড়ী ভারি গয়না পরা এয়োতি ‘ভদ্রমহিলা’দের চাপে মিলের শাড়ীপরা প্রায় নিরাভরণ ‘ধোপানী’দেরকে দূরে সরে যেতে হয়। ওদের সাথে রঙ খেলা যায় না, নাচা যায় না। তাই অমন পূজা নিয়ে ধোপাপট্টির নারীদেরও আক্ষেপ আছে।



প্রথম বার মৃত সন্তান জন্মানো, দ্বিতীয় সন্তান ধনুষ্টঙ্কারে মারা যাওয়ার পর তৃতীয় সন্তান জন্মালে তার নাম রাখা হয় ‘হারাধন’। স্বাভাবিকভাবে এই পুত্র হয়ে উঠলো বাবামায়ের আদরের ধন। শিশুকালে একবার নিমোনিয়ায় মারা যাবার হাত থেকে জোর বেঁচে গেলে তার ওপর বাবামায়ের স্নেহ আরও উপচে পড়তে থাকে। সেই তুলনায় পিঠেপিঠি জন্মানো মালতী আর প্রদীপ আদর-প্রশ্রয় একটু কমই পায়। আদর পেলেও হারাধন বাঁদর হয়ে ওঠেনি, বরং ছেলেবেলা থেকে ধোপাপট্টির অন্য অনেক বাচ্চার মতো পড়াবিমুখ না হয়ে বই পড়াতে মনযোগী হয়।

ধোপাপট্টির শিশুরা স্কুলে যায় বটে তবে তাদের লেখাপড়া নিয়ে বাবা-মাদের বিশেষ ভাবনা নেই। ফলে ক্লাস ফাইভের চৌকাঠ ডিঙিয়ে হাইস্কুলে ওঠার শিশুর সংখ্যা বেশি নয়। এই ঝরে পড়ারা নির্বিকারভাবে ধোলাইয়ের কাজে লেগে যায়। মেয়েগুলোর বয়স ষোল হতে না হতে বিয়ে দেবার তোড়জোর শুরু হয়ে যায়। কী করে যেন হারাধন, মালতী আর প্রদীপ তিন ভাইবোনই একে একে ক্লাস ফাইভ পাশ করে হাইস্কুলে উঠে যায়। হতে পারে হারাধন মেধাবী ছাত্র বলে ছোট দুই ভাইবোন তাকে দেখে পড়াশোনায় মনযোগী হয়েছে। হতে পারে হারাধণের কাছে হাইস্কুলের গল্প শুনে তারা ভেবেছে হাইস্কুল মজার জায়গা, সেখানে যেতে হবে। হতে পারে মালতী আর প্রদীপও আসলে মেধাবী। কারণ যাই হোক এক সময় এই তিন ভাইবোন হাইস্কুলে যথাক্রমে ক্লাস এইট, সেভেন আর সিক্সে উঠে গেলো।

ক্লাস সেভেন থেকে এইটে ওঠার সময় ফলাফলে দেখা গেলো হারাধন ক্লাসের প্রথম দশজনের মধ্যে চলে এসেছে। এটা নিয়ে ক্লাসের ভালো ছাত্র যথা, সুমিত, নিয়াজ, মামুন, অনির্বাণ, ইউসুফের কোন মাথাব্যথা ছিল না। একটা সময় ক্লাসের শীর্ষস্থান নিয়ে প্রতিযোগিতাটা শুধু নিয়াজ আর মামুনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। পরে অধ্যাপক বাবামায়ের সন্তান সুমিত একটু একটু করে এগিয়ে এসে শীর্ষে জায়গা করে নেয়। সুমিতের এগিয়ে আসাটাকে নিয়াজ আর মামুন প্রতিযোগিসুলভ মনোভাব নিয়ে সামলায়, যেমন গণিতে অনির্বাণ বা সাহিত্যে ইউসুফের সর্বোচ্চ নাম্বার পাওয়াটা তারা স্বাভাবিক বলে ধরে নেয়।

ক্লাস এইটে ‘জুনিয়র স্কলারশিপ’ পরীক্ষায় স্কুল থেকে সাধারণত প্রথম পনের জনকে পাঠানো হতো। হারাধন এই তালিকায় অবধারিতভাবে ঢুকে পড়ায় এটা নিয়ে বিশের মধ্যে থাকা বাকিরা তো বটেই শিক্ষকদের কেউ কেউও একটু নড়েচড়ে বসলেন। ফলে এক সময় নোটিশ আসলো এই বছর ক্লাস এইটে যারা জুনিয়র স্কলারশিপ পরীক্ষা দিতে আগ্রহী তাদের সবাইকে ‘বাছাই পরীক্ষা’তে বসতে হবে। বাছাই পরীক্ষার মেধাতালিকায় দেখা গেলো হারাধন ষষ্ঠ হয়েছে। তার মানে হারাধনের জুনিয়র স্কলারশিপ পরীক্ষায় বসা ঠেকানো যাচ্ছে না। পরের নোটিশে বলা হলো নির্বাচিত পনের জনকে পরবর্তী ছয় মাস স্কুলে বিশেষ কোচিং করতে হবে, এবং এই ছয় মাসের কোচিং ফি প্রথমেই একবারে জমা দিতে হবে। এক বিকালে হারাধনের মা কে বি সাহা রোডে বুলু মল্লিকের ‘মা জুয়েলার্সে’ একটা সরু চুড়ি বিক্রি করতে গেলেন, পরদিন হারাধন কোচিং ফি সমুদয় পরিশোধ করলো।

স্কুলের সবার ধারণা ছিল সুমিত আর নিয়াজ তো ‘ট্যালেন্টপুল’-এ স্কলারশীপ পাবেই সাথে মামুন, আনির্বাণ আর ইউসুফ ট্যালেন্টপুলে না পেলেও ‘জেনারেল গ্রেড’-এ অবশ্যই স্কলারশীপ পাবে। শিক্ষকদের ধারণাও এমন ছিল যে কোন কারণে ছেলেরা যদি ভালো ফলাফল করে তাহলে এর পরের মুস্তাফিজ, ইমরান, বিজয়, মিল্টন, তৌহিদ-এরাও ‘জেনারেল গ্রেড’-এ স্কলারশীপ পাবে। অর্থাৎ দুই গ্রেড মিলিয়ে দশ জন স্কলারশীপ পেতে পারে। হারাধন স্কলারশীপ পেতে পারে এমনটা গোটা স্কুলের কারোর বিবেচনাতে ছিল না। কিন্তু যেদিন পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হলো সেদিন সারা স্কুলের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ার যোগাড় হলো। মাত্র তিনজন স্কলারশীপ পেয়েছে – সুমিত আর মামুন জেনারেল গ্রেডে, আর হারাধন ট্যালেন্টপুলে। স্কুলের মেধাতালিকার চৌদ্দ-পনেরতে থাকা জাভেদ বা স্বপন ট্যালেন্টপুলে স্কলারশীপ পেলেও বোধহয় সবাই এতোটা অবাক হতো না যতোটা অবাক হয়েছে হারাধন পাওয়ায়।

স্কলারশীপ পরীক্ষায় স্কুল খারাপ ফলাফল করার প্রতিক্রিয়াটা বেশ কড়া হলো। স্কুলের ম্যানেজিং কমিটি হেডমাস্টার সাহেবকে ডেকে তাদের অসন্তোষের কথা জানালেন। হেডমাস্টার সাহেব আবার সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের ডেকে ঝাড়লেন। সবচে’ বেশি ঝাপটা গেলো ক্লাস টিচার সাঈদুল হক সাহেবের ওপর দিয়ে। হেডমাস্টার সাহেবের তিরস্কার শুনে তিনি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারেন না। স্কলারশীপ পরীক্ষার্থী বাকিদের বলেই বসেন, ‘তগো শরম করে না! ধোফার পুতে ট্যালেন্টপুলে বিত্তি পায় আর তরা ভদ্রলোকের পোলা অইয়া কিসুই করতে পারলি না’! নিয়াজ, অনির্বাণ, ইউসুফ নিজেরা স্কলারশীপ না পাওয়ায় যতোটা দুঃখিত ছিল তারচেয়ে বেশি অপমানিত বোধ করে হারাধন ট্যালেন্টপুলে স্কলারশীপ পাওয়ায়। ক্লাস টিচারের বকুনিতে তাদের মনের আগুন আরও বেশি করে জ্বলে ওঠে।



ক্লাসের বখে যাওয়া ছেলেদের মধ্যে দীর্ঘদেহী বাদল আর কূটবুদ্ধির পলাশের সাথে সবার সদ্ভাব না থাকুক বিবাদ ছিল না। আসলে ওদের সাথে বিবাদ করার সাহস বাকিদের ছিল না। তাছাড়া পলাশ স্থানীয় কমিশনারের ছেলে, সুতরাং শিক্ষকরাও পারতপক্ষে তাকে ঘাঁটাতেন না। নিয়াজদের দুঃখের দিনে পলাশ আসে শান্তির প্রলেপ দিতে। পলাশ বলে, ‘ধোফার বাচ্চারে একটা শিক্ষা দেওন লাগবো। এমুন শিক্ষা যে হালায় জন্মেও ভোলতে না পারে’।

নিয়াজ বলে, ‘কিয়ের শিক্ষা দিবি! মাইরপিট করলে শেষে হেড সারে সবতেরে গরুপিটা করবো’।

‘আরে মাইরপিট করমু ক্যা। এমুন টিরিক্সে কাম সারোন লাগবো যে কেঐ বোজতেই পারব না’।

‘কী করবি’?

‘হেইটা চিন্তা কইরা তগো কমুনে। তরা খালি কতাটা পাচকান করিস না’।

সবাই সম্মতিসূচক মাথা নাড়ে। পলাশ জানায় ঠিক এখনই কিছু করা ঠিক হবে না। তাতে ওদের ওপর সবার সন্দেহ এসে পড়বে। পরিস্থিতি একটু ঠাণ্ডা হবার পরে কাজটা করতে হবে। তাতে প্রতিশোধটা নেয়া হবে কিন্তু অন্যরা কিছু বুঝতে পারবে না।



স্কুলের প্রথম সাময়িক পরীক্ষা হয়ে গেছে। সাপ্তাহিক ছুটির সাথে আগে-পরে দিন মিলিয়ে পাঁচ দিনের একটা ছুটি পাওয়া গেছে। এই সময় স্কুলে ইন্টারক্লাস ফুটবল প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হলো। খেলতে ইচ্ছুক ছাত্রের সংখ্যা বেশি হওয়ায় ঠিক করা হলো প্রতি ক্লাসের প্রতি সেকশন থেকে একটা করে টিম নেয়া হবে। হারাধন ফুটবল খেলা দেখতে পছন্দ করলেও সে সাধারণত ফুটবল খেলে না। কিন্তু ক্লাসের টিম বানানোর সময় দেখা গেলো কয়েক জন তাকে ঠেললো টিমে নাম দেবার জন্য। এমন প্রতিযোগিতায় খেলোয়ার হিসাবে নামার একটা সূক্ষ্ম ইচ্ছা হারাধনের যে ছিল অমনটা নয়, তবে নিজের ফুটবল দক্ষতার কথা চিন্তা করে সে আর আগাতে সাহস করেনি। এখন সহপাঠীদের কথায় তার মধ্যে দোনোমনা ভাব দেখা দিল। বখা বাদলের সহচর শাকিল বল্ল, ‘দ্যাখ হারা, কেলাসে তুই আর আমি সবতের থেইকা বেশি লাম্বা। তুই আর আমি যুদি বেগি অই তাইলে অন্যগো স্টাইকাররা আর গোল দেওনের চান্স পাইব না’। শাকিলের কথায় হারাধনের সংশয় কেটে যায়, সে ফুলব্যাক হিসাবে টিমে যোগ দেয়।

প্রতিযোগিতায় উত্তেজনা চরমে ওঠে যেদিন ক্লাস নাইনের সেকশন-এ’র সাথে সেকশন-বি’র খেলা পড়লো। সেকশন-বি অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী টিম। ওদের স্ট্রাইকার জাকারিয়া স্কুলের সেরা ফুটবলার। তার সাথে আরেক স্ট্রাইকার দীর্ঘদেহী বখা বাদল, যাকে সামলাতে প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগের ফুটবলারদের ঘাম ছুটে যায়। তাছাড়া বাদল বড্ড বেশি ফাউল করে। এই ব্যাপারে স্কুলের গেম টিচার বাদলকে শাসিয়েছেন, কিন্তু সে এসবের থোড়াই পরোয়া করে। খেলা শুরু হবার মিনিট দশেকের মধ্যে সেকশন-বি’র জাকারিয়া একটা গোল দিয়ে ফেললো। গোল খাবার জন্য দলের সবাই গোলকিপার উজ্জ্বল, ফুলব্যাক শাকিল আর হারাধনকে দোষারোপ করা শুরু করলো, যদিও জাকারিয়ার দূরপাল্লার শটের বিপক্ষে ওদের কিছু করার ছিল না। হারাধনের নিজের কাছেও নিজেকে একটু অপরাধী মনে হলো। সে যথাসাধ্য চেষ্টা করতে লাগলো প্রতিপক্ষকে ঠেকাতে।

বিরতির সময় পলাশের সাথে দুই সেকশনের কয়েক জন খেলোয়ারের মধ্যে কী কথা হয়েছে সেটা হারাধন জানে না। কিন্তু খেলা আবার শুরু হবার পর থেকে দেখা গেলো বল বার বার তার প্রান্তে চেপে আসছে। হারাধন প্রাণপনে বল ফেরাতে থাকে। একপর্যায়ে বলের দখল নিয়ে সৃষ্ট এক জটলায় কেউ একজন হারাধনকে খুব জোরে ধাক্কা মারে। তাল সামলাতে না পেরে সে পড়ে যেতে হঠাৎ কে যেন তার বাঁ হাতের উপর লাফিয়ে পড়ে। সেটা কি সেকশন-এ’র মোটকা সাদমান নাকি সেকশন-বি’র বখা বাদল সেটা বোঝা যায় না, তবে হারাধনের কবজিতে কড়াৎ করে একটা শব্দ হয়। তারপর তীব্র ব্যথায় তার আর কিছু মনে থাকে না।



খেলার মাঠের ঘটনায় হারাধনের বাঁ হাতের কবজির (কারপাল) হাড়গুলোর মধ্যে তিনটা হাড় — স্ক্যাফয়েড, ক্যাপিটেট আর ট্রাইকুয়েট্রাম ভেঙে গুড়িয়ে যায়। হয়তো হাড় ভেঙে গেছে এমন আশঙ্কায় প্রথমে সবাই তাকে শহরের একমাত্র অর্থোপেডিক সার্জন ডাঃ আবদুল বারী’র কাছে নেয়ার কথা ভাবে। কিন্তু কয়েকজন সাম্প্রতিক একটা ঘটনা মনে করিয়ে দেয়ায় ডাঃ বারী’র কাছে না গিয়ে শহরের জেনারেল হাসপাতালে যাওয়াটা সাব্যস্ত হয়।

এক কালে গরিব দেশগুলো থেকে কিছু শিক্ষার্থী তাদের দেশের বাম দলগুলোর কোটায় পাওয়া স্কলারশীপের আওতায় সোভিয়েত ইউনিয়নে ঊচ্চ শিক্ষা নিতে যেতো। স্কুল-কলেজ জীবনে আবদুল বারী ভালো ছাত্র না হলেও অমন এক রাজনৈতিক স্কলারশীপের আওতায় ইউক্রেনের এক মফস্বলের মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস ডিগ্রি নিয়ে আসেন। দেশে ফিরে সরকারী চাকুরিতে ঢুকতে না পেরে তিনি নিজের শহরে অর্থোপেডিক চিকিৎসার চেম্বার খুলে বসেন।

হারাধনের ঘটনার কয়েক মাস আগে স্কুলের ক্লাস সেভেনে পড়ুয়া টোটন তাদের জামতলার বাসায় সিঁড়ি দিয়ে নামতে পা পিছলে পড়ে ডান হাত ভেঙে ফেলে। তাকে ডাঃ আবদুল বারীর কাছে নেয়া হয়েছিল। ডাক্তার টোটনের হাত টিপেটুপে দেখে এক্স রে না করেই ব্যান্ডেজ করে আর কিছু ব্যথানাশক ট্যাবলেটের নাম লিখে দিয়ে এক সপ্তাহ পরে আসতে বলেন। পাঁচ দিনের মধ্যে টোটনের হাত ফুলে ঢোল হয়ে যায়, আর ব্যথার তীব্রতায় সে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। তাকে রাজধানীর পঙ্গু হাসপাতালে নিয়ে গেলে দেখা যায় সারা হাতে ইনফেকশন ছড়িয়ে পড়েছে। শেষ পর্যন্ত টোটনের ডান হাতটা কনুই পর্যন্ত কেটে ফেলতে হয়। জামতলার লোকজন একদিন মিছিল নিয়ে ডাঃ আবদুল বারীর চেম্বারে একটু ভাঙচুর করে। পুলিশ হস্তক্ষেপ করায় সবাই পিঠটান দেয়। এই ঘটনা নিয়ে আর কোন কিছু হয় না, শুধু টোটনের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়।

টোটনের ঘটনা সবার মনে পড়ায় হারাধনকে আর ডাঃ বারীর চেম্বারে না নিয়ে জেনারেল হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া, এক্স রে করা ইত্যাদির জন্য জুনিয়র ডাক্তার থাকলেও গুরু সিদ্ধান্ত দেবার মতো বিশেষজ্ঞ উপস্থিত ছিলেন না। বিশেষজ্ঞর সপ্তাহে পাঁচ দিন উপস্থিত থাকার কথা থাকলেও তিনি আসেন দুই দিন — রবিবার আর বুধবার, তাও আবার ঘন্টা চারেকের জন্য। হারাধনকে যেদিন হাসপাতালে আনা হয় সেদিন ছিল বৃহস্পতিবার, অর্থাৎ বিশেষজ্ঞের দেখা পেতে আরও তিন দিনের ধাক্কা। সবার পীড়াপীড়িতে জুনিয়র ডাক্তার শুক্রবার বিকালে বিশেষজ্ঞকে ফোন করলে তিনি হারাধনকে তার রাজধানীস্থ ক্লিনিকে নিয়ে আসতে বলেন। রাজধানীতে যেহেতু যেতেই হবে তাই হারাধনের পরিবার বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের ব্যক্তিগত ক্লিনিকের পরিবর্তে জাতীয় পঙ্গু হাসপাতালে যাবার সিদ্ধান্ত নেয়। ঐ ক্লিনিকের ব্যয় যে তারা বহন করতে পারবে না সেই জ্ঞান তাদের ছিল।

১০



সবার ভয় ছিল হারাধনের অবস্থা যেন টোটনের মতো না হয়। পঙ্গু হাসপাতালে একটু লম্বা সময় থাকতে হলেও ঠিক মতো সার্জারি হওয়ায় অমনতর ভয়ের কারণ দূর হয়ে যায়। একদিন আর্ম স্লিং-এ হাত ঝুলিয়ে হারাধন বাবার সাথে বাড়ি ফেরে। স্কুলে তার ঘটনাটা নিয়ে আলোচনা হয়, কিন্তু কোন অভিযোগ ওঠে না। এই ব্যাপারে গেম টিচার আর ক্লাস টিচার দুই দলের সবাইকে ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন বটে কিন্তু কেউই নিশ্চিত করে বলতে পারে না ঘটনাটার জন্য কাউকে দোষী বলা যায় কিনা। তাছাড়া সাদমান এবং বাদল উভয়ে প্রবলভাবে অস্বীকার করে যে তাদের কেউ হারাধনের হাত মাড়িয়ে দেয়নি। হারাধনের পরিবার নিজেদের অবস্থান ও সামর্থ্যের কথা বিবেচনা করে ব্যাপারটিকে দুর্ঘটনা হিসাবে মেনে নেয়।

১১



দুর্ঘটনার দিন থেকে হারাধনের বাড়ি ফেরা পর্যন্ত তার মা মিনতি’র সময় কেটেছে মনে মনে ঠাকুরের কাছে মাথা কুটতে কুটতে। হারাধন বাড়ি ফেরার পরও তার ভয় কাটে না। তার কেবলই মনে হয় বাইরে বের হলেই কেউ না কেউ তাদের ক্ষতি করবে। এই দুশ্চিন্তা তাকে ঘুমের মধ্যেও তাড়া করতে থাকে। ফলে প্রায়ই মাঝরাতে তিনি দুঃস্বপ্ন দেখে চীৎকার করে উঠতেন। হারাধনের বাবা একবার ঘরে একটু শান্তি-স্বস্ত্যয়নের কথা ভাবলেও খরচের কথা ভেবে পিছিয়ে যান — এমনিতেই ছেলের চিকিৎসা করতে গিয়ে বেশ কিছু ধার-দেনা হয়ে গেছে। এমন এক সকালে মিনতি ঘোষণা করেন স্বয়ং মা কালী তাকে স্বপ্নে দর্শন দিয়ে তাঁর পূজা করার নির্দেশ দিয়েছেন। কথাটা মুহূর্তের মধ্যে গোটা পাড়ায় ছড়িয়ে পড়ে। পাড়ার বয়োজ্যেষ্ঠরা বিষয়টাকে গুরুত্বের সাথে নেন এবং ঠিক করেন সবার মিলিত উদ্যোগে ছোটখাটো আয়োজনে ‘রক্ষাকালী’ পূজা করা হবে।

রক্ষাকালী পূজা আয়োজনের কথা শুনে প্রদীপ, হারাধন, মালতী আনন্দে নেচে ওঠে। নাই বা হলো দুর্গাপূজার মতো বড় আয়োজনের উৎসব, নাই বা আনা হলো বড় আকারের ঠাকুর — এটা একেবারে নিজেদের পাড়ার নিজেদের পূজা। প্রদীপের চিন্তা ঠাকুর বিসর্জন হবে কোথায়! যদি খুব ছোট আকারের ঠাকুর হয় তাহলে তো আর ট্রাক লাগবে না সাইকেল ভ্যানে করে শীতলক্ষ্যায় নিয়ে বিসর্জন দেয়া যাবে। এই ব্যাপারে বাবাকে জিজ্ঞেস করতে ধমক খেতে হলো, কারণ পুরো আয়োজনের জন্য টাকাপয়সা যোগাড় করতে আয়োজকদের তখন হিমশিম খেতে হচ্ছে।

এক শনিবার সকালে ঠাকুর আনা হলো। সেদিন মধ্যরাত থেকে লগ্ন শুরু হবে, বিসর্জন হবে রবিবার দুপুরে। এই ঠাকুর আগে থেকে রঙ করা থাকে না। বেদীতে স্থাপন করার পর রঙ করা হয়। তাকে পরানো হয় শোলার ডাকের সাজ আর গলায় জবা ফুলের মালা, সাজানো হয় চাঁদমালা দিয়ে। প্রতিমার আকার দেখে প্রদীপের মন খারাপ হয়ে যায় — এতো ছোট ঠাকুর! মালতী সান্ত্বনা দেয়, ‘আরে, ছোড অইলে কী অইবো, আমাগো ঠাহুর দ্যাখতে কত সোন্দর’! প্রদীপ মালতীর যুক্তি অগ্রাহ্য করতে পারে না। তবে কী এটা তো দুর্গা, লক্ষ্মী বা সরস্বতী ঠাকুর নয় যে নয়নজুড়ানো সৌন্দর্য। এই ঠাকুর সৌম্যরূপী, তবু কালী ঠাকুর তো! তাই শিবের বুকে বাম পা তুলে দেয়া রূপ দেখলে মনে মনে একটু ভয়ই লাগে। প্রদীপ আরেকটা ধাক্কা খায় যখন শোনে ঠাকুর বিসর্জন হবে শীতলক্ষ্যায় নয়, তাদেরই বড় পুকুরটাতে। আসলে এত ছোট ঠাকুর নিয়ে অত দূর শীতলক্ষ্যায় নিয়ে যাবার কোন মানে নেই। তাছাড়া অত দূরে গেলে পাড়ার মেয়েরা যেতে পারবে না। যারা যাবে তাদের যাওয়া-আসার রিকশা ভাড়ার খরচ আছে। এজন্য বাড়িওয়ালা সলিম উল্লাহ্‌ চৌধুরীর অনুমতি নিয়ে বড় পুকুরে বিসর্জন দেয়া হবে।

শনিবার সন্ধ্যা হতে পাড়ার শিশু-কিশোরদের আনন্দ-উল্লাসের চোটে পাড়া সরগরম হয়ে ওঠে। আজকে পড়তে হবে না এবং আজ সারা রাত জাগা যাবে এ’কথা ভেবে প্রদীপরা তিন ভাইবোন আনন্দে বাকিদের সাথে জুটে যায়। পূজার লগ্ন যখন শুরু তার অনেক আগেই ছেলেপিলেদের হইচই কমে যায়। অপেক্ষাকৃত ছোটরা ঘুমে ঢলে পড়ে। জোড় আমলীতলা শ্মশান মন্দির থেকে আনা পুরোহিতের মন্ত্রোচ্চারণে নিস্তব্ধ রাতের পরিবেশ ভারি হয়ে ওঠে। মাটিতে বসে পাশের একটা দেয়ালে ঠেস দিয়ে মন্ত্র শুনতে শুনতে প্রদীপ এক সময় ঘুমিয়ে পড়ে।

১২



মাঝ পুকুরে নিয়ে বিসর্জন দেয়ার জন্য ডোবার পাশের বিচিকলার ঝাড় থেকে গাছ কেটে ছোট একটা ভেলা বানানো হয়েছে। সেটাতে উঠে একজন লগি ঠেলবে আর দুইজন ঠাকুর ধরে রাখবে। অমন ছোট ভেলায় প্রদীপের ঠাঁই হবার কোন সুযোগ নেই। তবু প্রদীপ মরিয়া হয়ে একবার বিসর্জনের দায়িত্ব নেয়া নরেন কাকাকে অনুরোধ করে। নরেন কথা একটু ঘুরিয়ে বলে ‘না’ করে দেন। তিনি বলেন, ‘এইডা পোলাপানের কাম না, বড় অইলে হেসু’ম ঠাহুর ডুবাইতে যাইস’। প্রদীপ মনে মনে ভিন্ন পরিকল্পনা করে।

ঠাকুর নিয়ে ভেলা যখন পুকুরে ভাসলো তখন পাড়ার নারীরা কাঁদতে কাঁদতে উলুধ্বনি দিতে লাগলো। শিশু-কিশোরেরা কার কাছে যেন শেখা শ্লোগান দিতে লাগলো — ‘কালী মাঈ কি জয়’! মালতী বড়দের মতো কাঁদছে না তবে বড়দের মতো ঠোঁট গোল করে উলু দেবার চেষ্টা করছে। স্লিং বাঁধা বাঁ হাত গায়ের সাথে চেপে ধরে মুষ্টিবদ্ধ ডান হাত উপরে তুলে ধরে হারাধন ছেলেদের সাথে ‘কালী মাঈ কি জয়’ শ্লোগানে গলা মেলাচ্ছে। ভেলা পুকুরের মাঝামাঝি পৌঁছাতে প্রদীপ হঠাৎ পুকুরে ঝাঁপিয়ে পড়ে দ্রুত ভেলার দিকে সাঁতরাতে থাকে।

প্রদীপের হাতে সময় কম। ঠাকুর পানিতে ফেলার আগেই তাকে ভেলায় উঠতে হবে। বোধ হবার পর থেকে প্রতি বিজয়া দশমীতে যে আনন্দ থেকে তাকে বঞ্চিত করা হয়েছে আজ তার কিছুটা মেটানোর সুযোগ এসেছে। অন্য পাড়ার ছেলেরা বা বয়োজ্যেষ্ঠরা বিসর্জন নিয়ে তাকে যে অপমান করেছে, কথা শুনিয়েছে আজ তার একপ্রকার শোধ নেবার সুযোগ এসেছে।

প্রদীপ প্রাণপনে সাঁতরাচ্ছে। ভেলা ক্রমেই কাছিয়ে আসছে। কানে ভেসে আসছে নারীদের কণ্ঠের উলুধ্বনি। ভেসে আসছে শিশু-কিশোরদের কণ্ঠের শ্লোগান — কালী মাঈ কি জয়!



264 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

কোন বিভাগের লেখাঃ বুলবুলভাজা  গপ্পো  মোচ্ছব  উৎসব ইস্পেশাল ২০১৮ 
শেয়ার করুন


Avatar: দ

Re: প্রদীপের ‘বিসর্জন’ অথবা লঘু’র লঘু’র উৎসব

সংখ্যালঘুরও সংখ্যালঘু হারাধন, প্রদীপ। প্রাণে মারে নি বাঁচতে দিয়েছে এই না কত! তাদের আবার খেলা! তাদের আবার উৎসব!
হা:
Avatar: ষষ্ঠ পাণ্ডব

Re: প্রদীপের ‘বিসর্জন’ অথবা লঘু’র লঘু’র উৎসব

দেশে এখন ত্রিশ হাজারের বেশি মণ্ডপে দুর্গাপূজা'র আয়োজন করা হয়। এটা হয়তো মধ্য আয়ের পথে যাত্রা করা দেশের মানুষের আর্থিক সঙ্গতির উন্নতির এক প্রকার প্রতিফলন। কিন্তু তার পরেও কি প্রদীপ-হারাধন-মালতীদের মতো 'ধোপা'রা নিজেদের দুর্গোৎসব পায়? সমস্যাটা তো কেবল আর্থিক সঙ্গতির নয়। দেশ ঊচ্চ আয়ের হলেও কি প্রদীপদের পাড়া থেকে একটু দূরের মেথরপট্টির কালী-রূপারা অথবা পঞ্চবটির কাছে চাঁড়ালপাড়ার সুবল-সাধনারা তাদের দুর্গোৎসব পাবে?
Avatar: প্রতিভা

Re: প্রদীপের ‘বিসর্জন’ অথবা লঘু’র লঘু’র উৎসব

কেন জানি না শবরীমালার কথা মনে পড়ে গেল। সমানাধিকারের এই জেদ। প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মকে নষ্টের গোড়া মনে হয় আমার।
Avatar: ষষ্ঠ পাণ্ডব

Re: প্রদীপের ‘বিসর্জন’ অথবা লঘু’র লঘু’র উৎসব

শবরীমালা'র মতো নিষেধাজ্ঞাটা যেখানে ব্যক্ত, প্রকাশ্য সেখানে সেটার প্রতিবাদ করা যায়, আইনী লড়াই করা যায়। কিন্তু নিষেধাজ্ঞাটা যেখানে অব্যক্ত, অপ্রকাশ্য সেখানে প্রতিবাদ বা লড়াই করার সুযোগ নেই।

সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে প্রথমে সমস্যাটিকে স্বীকার করা আবশ্যক। ক্ষমতাকাঠামো ও কর্তৃত্বকাঠামো সংশ্লিষ্টরা সমস্যাগুলোকে স্বীকার করে না বলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী সব ব্যাপারেই মার খায়।

ধর্মীয় বিধান যদি অসাম্য ও অন্যায়কে প্রতিষ্ঠা করে তাহলে সেই বিধানের সংস্কার হওয়া দরকার। কয়টা ধর্ম তার বিধান সংস্কারের পথ উন্মুক্ত রেখেছে? কোন ধর্ম যদি মনে করে - মানুষের জন্য ধর্ম নয়, বরং ধর্মের জন্য মানুষ - তাহলে সেই ধর্মের মানুষ কোন প্রকার সংস্কারের আশা করতে পারে কি?
Avatar: arpita

Re: প্রদীপের ‘বিসর্জন’ অথবা লঘু’র লঘু’র উৎসব

ইয়োনা সোরস্কুর লড়াইয়ের কথা মনে পড়ে।লড়াই চলেছে
অসাধারন লেখা
Avatar: arpita

Re: প্রদীপের ‘বিসর্জন’ অথবা লঘু’র লঘু’র উৎসব

না নামটা ইয়োনা নয় ওটা এতোয়া মুন্ডা হবে। মহাশ্বেতা দেবীর লেখা।


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন