বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

৩৭৭ ধারার প্রতীকি রাজনীতি: অপরাধিকরণের অবসান?

অনিরুদ্ধ দত্ত

“যেকোনো ব্যাক্তি যিনি স্বেচ্ছায় কোনো পুরুষ, মহিলা বা পশুর সাথে প্রাকৃতিক নিয়মবিরুদ্ধ দৈহিক মিলন (carnal intercourse against the order of nature) করেন তাঁকে শাস্তি হিসেবে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দেওয়া হবে... এবং তাঁর ওপর জরিমানা লাগু হবে”
      - ভারতীয় দন্ডবিধি, ৩৭৭ ধারা

“৩৭৭ ধারা তো আমরা নিজেরাই নিজেদের গায়ে মেখে নিয়েছি!”
      - রায়না রায়, রূপান্তরকামী আন্দোলনকর্মী

ভূমিকা: রায়ের পর

ভারতের শীর্ষ আদালত ৩৭৭ ধারা নামক আইনটি আংশিক ভাবে বাতিল করার পর কিছু সময় পার হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের এই রায় অনুযায়ী প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে সম্মতিমূলক যৌন মিলনকে আর ৩৭৭ ধারার আওতার মধ্যে ধরা যাবে না, যদিও ধর্ষণ এবং পশু বা শিশুর সাথে যৌনাচার অবশ্যই আইনটির আওতায় থেকে যাবে। রায়ের পরবর্তী সময়ের মধ্যে রায়টিকে ঘিরে বিভিন্ন ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা গিয়েছে, যার মধ্যে কিছু প্রবণতা লক্ষনীয়। একদিকে অনেক উচ্চ- বা মধ্যবিত্ত সমকামী ও রূপান্তরকামী ব্যাক্তিদের উচ্ছসিত ভাবে বলতে শোনা গিয়েছে যে তারা এখন থেকে আর “অপরাধী” নয়, আজীবন অপরাধের বোঝা বহন করার পর শেষপর্যন্ত তারা বেআইনি হওয়ার তকমা থেকে মুক্ত। আরেকদিকে যৌনসংখ্যালঘু গোষ্ঠীদের মধ্যে যারা সবচেয়ে প্রান্তিক এবং অবহেলিত, বিশেষত নিম্নবিত্ত ও দলিত রূপান্তরকামী, হিজড়ে ও সমকামী মানুষেরা, তাদের মধ্যে বেশিরভাগের মানুষেরই জীবনসংগ্রাম আগের মতই কঠিন রয়ে গিয়েছে – এমনকি কিছু ক্ষেত্রে রায়ের পর তাদের ওপর সামাজিক এবং পুলিশী নির্যাতন অদ্ভূত ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে

প্রথমে অপরাধমুক্তির উচ্ছাস দিয়েই শুরু করা যাক। প্রান্তিক যৌনতা ও লিঙ্গপরিচয়ের মানুষদের সাংবিধানিক অধিকার এবং ব্যক্তিস্বাধীনতাকে জোরালো ভাবে সমর্থন করার জন্যে এই রায়টিকে প্রগতিশীল মানুষেরা স্বভাবতই স্বাগত জানিয়েছেন। রায়ের কিছু সুফল আমরা ইতিমধ্যেই দেখতে পেয়েছি – যেমন এই রায়ের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে কেরল এবং দিল্লির প্রাদেশিক আদালত কিছু সমকামী যুগলদের পারিবারিক অত্যাচার থেকে সুরক্ষা দিয়ে নিজেদের মত করে বাঁচতে সাহায্য করেছে। কিন্তু রায়টির উচ্ছসিত উদযাপনের মাধ্যমে প্রচার হয়েছে কিছু বিভ্রান্তিকর তথ্যও। যেমন রায় ঘোষণার পর সংবাদমাধ্যমে আমরা জানলাম যে “সমকামিতা” নাকি এখন আর অপরাধ নয়। নিউ ইয়র্ক টাইমস থেকে হিন্দুস্তান টাইমস পর্যন্ত আমাদের সমস্বরে জানালো যে ভারতে “gay sex” আর বেআইনি নয়। ২০০৯ সালে যখন দিল্লি হাই কোর্টের একটি অনুরূপ রায় এই ধারাটিকে আংশিক ভাবে বাতিল করেছিল, তখনও আমরা একই কথা শুনেছিলাম – সমকামিতা অপরাধমুক্ত হল । আবার ২০১৩ সালে যখন সুপ্রিম কোর্ট আইনটিকে পুনরায় পূর্বরূপে ফিরিয়ে আনে, তখন শুনেছিলাম যে সমকাম নাকি আবার অপরাধের তালিকাভুক্ত হল । আর এবার, দ্য হিন্দুর প্রতিবেদন অনুযায়ী , রায় ঘোষণার সময় সুপ্রিম কোর্টের বাইরে সমবেত জনতার মধ্যে একজন সমকামী ছাত্রী উচ্ছসিত হয়ে বলে উঠলেন: “আমরা আর অপরাধী নই, আমরা যা আমরা তাই!”

আক্ষরিক অর্থে কিন্তু ৩৭৭ ধারায় সমকামিতা, রূপান্তরকামিতা, বিষমকামিতা, কোন কামিতারই কোন উল্লেখ নেই – এই ঔপনিবেশিক আইনে আছে কিছু তথাকথিত “প্রকৃতিবিরুদ্ধ” যৌনাচারের কথা, যার মধ্যে লিঙ্গ-যোনী ছাড়া যেকোনো যৌনসঙ্গমকেই ধরা যেতে পারে। ৩৭৭ ধারা তাই শুধু সমকামীদের বিরুদ্ধে নয়, অনেক ক্ষেত্রে কিছু বিষমকামী যৌনাচার – বিশেষত পুরুষ-নারীর মধ্যে পাযুমৈথুন বা পায়ুপথে ধর্ষণ – শায়েস্তা করার জন্যও ব্যবহার করা হয়েছে । যদিও সমকামী-রূপান্তরকামী মানুষদের ক্ষেত্রে আইনটির প্রকোপ অধিক গুরুতর, যেহেতু তারা বা আমরা এমনিতেই সমাজ ও পুলিশ-প্রশাসনের কাছে নানারকম বৈষম্য ও নির্যাতনের শিকার। বেশ কিছু ক্ষেত্রে ৩৭৭ ধারা ব্যবহার করে নিম্নবিত্ত ও দলিত প্রান্তিক লিঙ্গের মানুষদের গ্রেফতার করা হয়েছে বা তাদের ওপর পুলিশী নির্যাতন চালানো হয়েছে । মধ্যবিত্ত সমকামীদের ওপরে আইনটির প্রকোপ তুলনায় কম হলেও আইনটির নাম করে ভয় দেখানো, ব্লাকমেল করা বা হুমকি দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে , অল্প কিছু ক্ষেত্রে সরাসরি গ্রেফতারের নজিরও রয়েছে। কিন্তু প্রান্তিক লিঙ্গ ও যৌনতার আন্দোলনের সাথে যুক্ত বেশ কিছু ব্যক্তি, যেমন নিতিন মানায়াথ, রায়না রায় বা সুমি দাস, বহু বছর ধরে বলে গিয়েছেন যে ৩৭৭ ছাড়াও নানাবিধ আইনি ও বেআইনি বৈষম্য রয়েছে – যৌনতা ও লিঙ্গ-ভিত্তিক বৈষম্যের সিংহভাগই ৩৭৭ ধারার সাথে জড়িত নয়। বিশেষত মহানগরগুলির বাইরে অনেক জায়গায় সাধারণ মানুষ এবং এমনকি পুলিশও ৩৭৭ ধারার সম্পর্কে বহুদিন অবগত ছিল না, সাম্প্রতিক প্রচারের জন্য হয়ত কিছুটা জেনেছে। কোচবিহার জেলায় রূপান্তরকামী নারী ও মেয়েলি পুরুষদের সাথে কর্মরত সুমি দাসের বক্তব্য: “আমাদের এখানে তো ৩৭৭র জন্য কিছু হয় না বললেই চলে, কারণ লোকে তো বোঝেই না, ৩৭৭ খায় না মাথায় দেয়!” বরং এই ধরনের প্রত্যন্ত এলাকায় সমকামী-রূপান্তরকামীদের অপরাধিকরণ এবং তাদের বিরুদ্ধে পুলিশী ও সামাজিক নির্যাতন অন্য নানা ভাবে ঘটে থাকে।

যদিও ৩৭৭ ধারা কোনদিনই শুধুমাত্র প্রান্তিক লিঙ্গ-যৌনতার মানুষদের ওপরে লাগু ছিল না, এবং এই আইনের প্রকোপ সব অঞ্চলে সমান নয়, মিডিয়া এবং শহুরে LGBT সমাজকর্মীরা ৩৭৭ ধারাকে সমস্ত সমকামী-রূপান্তরকামী মানুষদের অপরাধিকরণের প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে, এবং শুধুমাত্র সমকামী-রূপান্তরকামীদেরই আইনের নিরিখে “অপরাধী” বলে আখ্যা দিয়েছে। যার ফলে ৩৭৭ ধারা একটি যৌনাচার সংক্রান্ত আইন থেকে যৌন-পরিচিতি ভিত্তিক বৈষম্যের প্রতীকে রুপান্তরিত হয়েছে। এবং বিশেষত উচ্চমধ্যবিত্ত সমকামীদের দৃষ্টিতে ৩৭৭ ধারা বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের একটি প্রতীকচিহ্নে পরিনত হয়ে উঠেছে। রায়ের কিছুদিন পর Governance Now বলে একটি বৈদ্যুতিন পত্রিকায় “আইনবিরোধী আর নয়” (Outlaws no longer) শীর্ষক একটি প্রতিবেদন বেরয়, যেখানে পাঁচ জন সমকামী ব্যাক্তি তাঁদের জীবনসংগ্রামের কথা বলেছেন এবং অপরাধমুক্তির পরবর্তী পর্যায় নিয়ে তাঁদের আশা-আকাঙ্খা ব্যক্ত করেছেন। যেমন একজন সঙ্গীতশিল্পী তাঁর শিক্ষাজীবন এবং কর্মজীবনে নানারকম বৈষম্যের অভিজ্ঞতা ভাগ করার পর বলছেন, “আমরা আর অপরাধী নই জেনে আমি খুশি, কিন্তু এখন আমাদের সমলিঙ্গের বিবাহ এবং সন্তান দত্তক নেওয়ার অধিকারের জন্য লড়তে হবে”। আরেকজন বলছেন, “আজ যখন আইন আর আমাদের বিরুদ্ধে নয়, এখন থেকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অধিকারের আন্দোলনের শুরু হল”।

অর্থাৎ রায়টিকে ঘিরে একটি ইতিহাস গঠন করা হয়েছে, যেখানে রায়টি একাধারে সমাপ্তি এবং সূচনার মুহূর্ত – একদিকে আইনি বৈষম্য এবং অপরাধিকরণের সমাপ্তি, অন্যদিকে বৃহত্তর সামাজিক ও রাজনৈতিক অধিকারের সূচনা। অথচ উপরোক্ত প্রতিবেদনে পাঁচজন ব্যাক্তির মধ্যে কারুর বয়ানেই কিন্তু ৩৭৭ নামক আইনটির কোন প্রকোপের উল্লেখ নেই - সবাই অপরাধমুক্তির কথা বলছেন, কিন্তু কেউই ৩৭৭র নিরিখে অপরাধী স্যবস্ত হওয়ার কথা বলেননি, অন্যান্য নানাবিধ পারিবারিক ও সামাজিক সমস্যার মুখোমুখি হওয়ার সত্বেও। মায় ৩৭৭র নামে হুমকি বা ভয় দেখানোর অভিজ্ঞতাও কারুর বয়ানে উঠে আসেনি। বরং উল্টে একজন সমকামী ছাত্রনেতা বলছেন যে একবার দক্ষিনপন্থীদের আক্রমনের শিকার হওয়ার পর দিল্লি পুলিশ তাঁকে সুরক্ষা দিয়েছিল। তাহলে দেখা যাচ্ছে যে এঁদের জন্য “অপরাধী” বা “আইনবিরোধী” (outlaw) হওয়াটা আক্ষরিক অর্থে প্রযোজ্য নয় - বরং ৩৭৭ ধারার নিরিখে “অপরাধী” হওয়াটা আসলে অন্যান্য নানাবিধ বঞ্চনা বা বিরূপ অভিজ্ঞতার প্রতীক হয়ে উঠেছে। সেই অভিজ্ঞতাগুলি নিঃসন্দেহে খারাপ, কিন্তু তার মধ্যে আইনি অবিচার বা পুলিশী নির্যাতনের বাস্তবিক ছাপ নেই। হয়ত তুলনামূলক ভাবে প্রিভিলেজ্ড বা সুবিধেভোগী সমকামী-রূপান্তরকামী ব্যক্তিদের পক্ষেই “বেআইনি” বা “অপরাধী” তকমাটাকে অন্যান্য বঞ্চনার রূপক বা প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব। যাঁদের অন্যান্য অসুবিধে থাকলেও আক্ষরিক অর্থে অপরাধের বোঝা বইতে হয়নি, তাঁরাই এখন অপরাধমুক্তির জয়গান গাইছেন!

অথচ যাঁদের জন্য অপরাধী হওয়ার তকমাটা নিছক রূপক বা প্রতীক নয়, যাঁদের জীবনে অপরাধিকরণ একটি কল্পিত সম্ভাবনা নয় বরং বাস্তব সত্য - তাঁরা এই রায়ের পর সত্যিই কতটা সুরক্ষিত হলেন? যেই শ্রেনীর প্রান্তিক যৌন বা লিঙ্গপরিচয়ের মানুষেরা পুলিশী অত্যাচার ও সামাজিক বৈষম্যের সর্বাধিক ভুক্তভোগী ছিলেন, রায়ের পর কি তাঁরা সবাই সত্যিই অপরাধীর তকমা থেকে মুক্তি পেয়েছেন? উল্টে কিছু ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে যে রায়ের পর তাঁরা যেন আরই বেশি সামাজিক ও প্রশাসনিক রোষের মুখে পড়েছেন। ১৯এ সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী দিল্লি শহরে কিন্নর বা হিজড়ে জনগোষ্ঠির যেই মানুষেরা রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে অর্থোপার্জন করেন, রায়ের দিন থেকে তাঁদের ওপর পুলিশী নির্যাতন বহুগুন বেড়ে গিয়েছে। তাঁদের একজনের বয়ানে, “আমরা কিন্নর বলে আমাদের কেউ কাজ দিতে চায় না, আমরা ভিক্ষে করে খাই। কিন্তু পুলিশ আমাদের অন্য কারুর সাথে কথা বলতে দেখলে আমাদের ওপর যৌনকর্ম বা প্রকাশ্য জায়গায় উপদ্রব সৃষ্টি করার আরোপ লাগিয়ে তাড়িয়ে দিচ্ছে বা মারধর করছে”। আরো দুজন জানান যে রায়ের দিন থেকেই পুলিশ তাঁদেরকে বিনা দোষে গ্রেফতার করছে, তুলে থানায় নিয়ে গিয়ে নির্যাতন করছে, এমনকি ধর্ষণ পর্যন্ত করেছে। তাঁদের একজন প্রশ্ন করেন, “আমাদের অস্তিত্বটাই কি অপরাধ?” এখানে উল্লেখ্য যে রায় অনুযায়ী ৩৭৭ ধারা আংশিক ভাবে বাতিল হলেও পায়ুপথে ধর্ষণের মতন সম্মতিবিহীন যৌনাচার কিন্তু এখনও সেই ধারার নিরিখে অপরাধ। কিন্তু অপরাধীর তকমাটা ধর্ষক পুলিশ নয়, ধর্ষিতা কিন্নর মানুষদের গায়েই এসে লাগছে। অর্থাৎ আইনত অপরাধী হওয়া আর সামাজিক বা প্রশাসনিক ভাবে “অপরাধী” চিহ্নিত হওয়ার মধ্যে বিস্তর ফারাক রয়েছে।

পশ্চিম বঙ্গেও সংবাদমাধ্যমের অগোচরে এই ধরনের ঘটনা ঘটে চলেছে। কিছুদিন আগে নদিয়া জেলায় বগুলার কাছে একজন কোতি বা রূপান্তরকামী ব্যাক্তিকে ওই অঞ্চলের ক্লাবের ছেলেরা মিলে মারধর করে। তাদের মধ্যে একজন তাঁকে শাসায়, “তোদের তো এখন রায় বেরিয়েছে, ভাবিস না যে তোরা সব পেয়ে গেছিস, ওই রায় আবার তুলেও নিয়েছে!” এই মিথ্যে কথা বলার পর তারা তাঁকে ধমক দিয়ে বলে, “তোকে আবার ছেলে সাজাব!” রায়ের পরবর্তী প্রকোপের শিকার দম দমের বাসিন্দা নিলাঞ্জনাও। নীলাঞ্জনা একজন হিজড়ে গোষ্ঠীভুক্ত ব্যাক্তি যিনি দিল্লি, মুম্বাই ও কলকাতা সহ বিভিন্ন জায়গায় থেকেছেন কিন্তু এই রায়ের পর তাঁর যেরকম অভিজ্ঞতা হল, তাঁকে নাকি আগে কখনো সেরকম অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হতে হয় নি। তাঁর বয়ানে: “লোকজন রাস্তায় চলা মুশকিল করছে... বলছে ৩৭৭,ছক্কা,শালা - এটা কি ঠিক?... আমার কানে এমনি হেডফোন লাগানো ছিল... ফোনে আমি আমার ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলতে বলতে আসছি... ছেলেটা সামনে দিয়ে আসছে আর বলছে, ৩৭৭, ছক্কা, শালা, বেহেন্চোদ, গুড়, মামু, ইয়ে দেখো সমাজ কা পাপ, ইয়ে দেখো, সমাজের নোংরা এগুলো... মানে বাঙালি, হিন্দি ঝাড়ছে, উল্টো-সিধে হিন্দি বলছে আর তার সঙ্গে মিশিয়ে মিশিয়ে বলছে, সমাজের পাপ এগুলো... বলতে বলতে একদম কাছে এসে দড়াম করে বিনা মতলবে ধাক্কা মারলো... মানে ওর ইচ্ছাটাই ছিল যেন ও পায়ে পা বাঁধিয়ে লড়াই করবে... ঝগড়া অশান্তি করবে... ৩৭৭ নক আউট হয়ে তো আরো বেশি গলায় যেন ফাসির ফান্দার মতন ঝুলে পড়ল সমাজের লোকজনেরা!”

অর্থাৎ নীলাঞ্জনাকে সুপ্রিম কোর্টের রায়ের আগে যত না ৩৭৭এর প্রকোপ পোহাতে হয়েছিল, রায়ের পর তার অনেক বেশি! এই ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে “৩৭৭” কথাটাই “ছক্কার” পাশাপাশি একটা অপমানসূচক গালি হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। নর্দার্ন ব্ল্যাক রোজ বা উত্তরের কালো গোলাপ নামক গোষ্ঠীভিত্তিক সংগঠনের সাথে যুক্ত আন্দোলনকর্মী আলো ঘোষালের বয়ান অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরের ৮ তারিখে অর্থাৎ রায়ের দুদিন পর ফেসবুকে একটা নতুন মিম (meme) ছড়াতে দেখা যায় যাতে লেখা ছিল: “বন্ধুকে দেওয়ার জন্য বাজারে নতুন খিস্তি: তুই ছেলে না ৩৭৭?”

রায়ের পরবর্তী সময়কালের এই ঘটনাবলী থেকে আমরা দেখছি যে ৩৭৭ ধারা এবং সংশ্লিষ্ট রায়টির প্রকোপ ঠিক আইনের আক্ষরিক অর্থ মেনে হচ্ছেনা। বরং ৩৭৭ একটি প্রতীকি রূপ নিচ্ছে এবং বিভিন্ন পরস্পরবিরোধী ভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। একদিকে, কিছু অপেক্ষাকৃত ভাবে প্রতিষ্ঠিত (উচ্চবিত্ত/মধ্যবিত্ত/স্ববর্ণ) সমকামী-রূপান্তরকামীদের ক্ষেত্রে ৩৭৭ ধারা যত না বাস্তবিক ভাবে প্রযোজ্য, তার চেয়ে বেশি সামাজিক ও আইনি অবৈধতার প্রতীক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। তারা বাস্তবে অপরাধী স্যবস্ত না হলেও ৩৭৭ ধারা বাতিল হওয়া নিয়ে অপরাধিকরণ থেকে অপরাধমুক্তির ইতিহাস রচনা করছে, যেই ইতিহাসের নায়ক-নায়িকা তারাই। কিন্তু অন্য অনেকের ক্ষেত্রে decriminalisation বা অপরাধমুক্তির গল্পটা ঠিক খাটছে না। কিছু ক্ষেত্রে, যেমন দিল্লির কিন্নরদের বেলায়, ৩৭৭ ধারা ব্যতীত অন্যান্য আইনি অভিযোগে তাদের অপরাধী স্যবস্ত করা হচ্ছে - যথা যৌনকর্ম করার অভিযোগ, বা প্রকাশ্য স্থানে উপদ্রব (public nuisance) করার অভিযোগ । বা কোনও নির্দিষ্ট আরোপ ছাড়াই তাঁদের অস্তিত্বই তাঁদের অপরাধিকরণের জন্য যথেষ্ট - কোনও ধারারই প্রয়োজন নেই, তাই তাদের জন্য ৩৭৭ থাকা বা না থাকা প্রায় সমান। আবার, অন্য ক্ষেত্রে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে ৩৭৭ ধারা আংশিকভাবে বাতিল হওয়ার পরেও সেটা ঘৃণ্য প্রান্তিকতার প্রতীক হয়ে উঠছে, “৩৭৭” মানে এখন “ছক্কার” আরেক প্রতিশব্দ - পাপ, সামাজিক নোংরামি, এমনকি যৌনরোগের প্রতীক। আমার এক ফেসবুকীয় বন্ধু শঙ্খদীপ ঘোষ Stulish নামক সাইটের মাধ্যমে একটি বেনামী মন্তব্য পেয়েছেন: “এবার কি এইড্স ছড়াবি নাকি তোরা? ৩৭৭ তো লিগাল কর দিয়া!” এই মন্তব্য অনুযায়ী ৩৭৭ নাকি বাতিল হয়নি, “লিগাল” হয়েছে। বেনামী লেখকের কল্পনায় “৩৭৭” অপরাধিকরণের আইন থেকে পরিবর্তিত হয়েছে এমন একটি আইনে যেটা নাকি সমকামী যৌনাচারের মাধ্যমে রোগ ছড়ানো কে বৈধতা দিচ্ছে। (এখানে না হয় যৌনরোগ এবং এইড্স নিয়ে মন্তব্যকারীর ভুল ধারণার কথা বাদই দিলাম!)

৩৭৭: প্রতীক হয়ে ওঠার ইতিহাস
এ তো গেল রায়ের পরের কথা। “৩৭৭” কিভাবে একটি যৌনাচার-ভিত্তিক আইন থেকে পরিচিতি-ভিত্তিক বৈষম্যের প্রতীক হয়ে উঠে নানা ভাবে প্রয়োগ হচ্ছে সেটা বুঝতে এবার একটু রায়ের পূর্ববর্তী পর্যায়ের দিকে তাকাই । ৩৭৭ ধারার বিরুদ্ধে প্রথম মামলা নব্বইয়ের দশকে রজু করা হয়, কিন্তু আইনটি প্রথম ব্যাপকভাবে চর্চার মধ্যে আসে ২০০১ সালে, যখন লক্নৌ শহরে যৌনস্বাস্থ্য নিয়ে কর্মরত ভারোসা ট্রাস্ট নামক একটি বেসরকারী সংস্থার কিছু সমকামী-রূপান্তরকামী কর্মচারীদেরকে প্রকৃতিবিরুদ্ধ যৌনাচার (৩৭৭ ধারা), অশ্লীলতা (২৯২ ধারা), ইত্যাদি বিভিন্ন অপরাধের অভিযোগ দিয়ে গ্রেফতার করা হয় । তাঁদের ওপর এ হেন অভিযোগের কারণ তাঁরা সুরক্ষিত যৌনসম্ভোগ নিয়ে সমকামী-রূপান্তরকামী মানুষদের মধ্যে সচতনতা বৃদ্ধির কাজ করছিলেন। তাঁরা জেলে নির্যাতিত হওয়ার পর জামিন পান, কেসটি চলতে থাকে। এরপর ভারোসার পৃষ্ঠপোষক সংস্থা নাজ ফাউন্ডেশন দিল্লি হাই কোর্টে ৩৭৭ ধারার বিরুদ্ধে একটি পিটিশন দাখিল করে – যদিও অভিযুক্ত চারজনের ওপর অশ্লীলতা সংক্রান্ত অন্যান্য ধারাও আরোপ করা হয়েছিল, ৩৭৭ ধারাই তাঁদের অপরাধিকরণের মূল কারণ এবং সমকামী-রূপান্তরকামীদের প্রধান শত্রু হিসেবে চিহ্নিত হয়। মামলা চলাকালীন সমকামী-রূপান্তরকামীদের সাথে কর্মরত এনজিও জগতে ৩৭৭ ধারা একটি “কালা কানুন” হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠে।

এর কয়েক বছর পর ২০০৭ সালে আমার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু ব্যারাকপুরের বাসিন্দা দিশাকে কিছু স্থানীয় গুন্ডারা শারীরিক ও যৌন হেনস্থা করে। দিশা তখন একটি বেসরকারী সংস্থায় কোতি ও হিজড়ে জনগোষ্ঠীদের যৌনস্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করত (কোতি বলতে “নারীসুলভ” কিন্তু জন্মসুত্রে “পুরুষ” চিহ্নিত ব্যক্তিদের একটি সম্মিলিত জনগোষ্ঠীকে বোঝায়, যার মধ্যে মেয়েলি পুরুষ, রূপান্তরকামী নারী ও লিঙ্গদ্বৈতের বাইরে অবস্থিত বিভিন্ন রকমের মানুষ থাকতে পারেন)। দিশা যখন পুলিশের কাছে ঘটনাটি নথিভুক্ত করাতে যায়, পুলিশ তার কথা উপেক্ষা করে এবং তাকে কোন সাহায্য করে না। দিশার বয়ানে: “তখন তো সাজতামও না এখনের মতন, কিন্তু দেখে তো বুঝতে পেরেছিল যে আমি কোতি... আমার কথা শুনে ওরা হাসছিল, মাঝখানে উঠে চলে গেল, অনেকক্ষণ পরে আবার এল... আবার জিজ্ঞেস করল, কি হয়েছিল তোমার? শেষে আমি বললাম, আপনার ঘরে যদি এমন কেউ জন্মায় তাহলেই বুঝতে পারবেন কি হয়েছিল, এখন আমি বললেও আপনি কিছু বুঝতে পারবেন না!”

এই ঘটনার এক বছর পর আমি এবং আমার কিছু পরিচিত সমাজকর্মী ও স্বেচ্ছাসেবী একসাথে মিলে ২০০৮ সালের কলকাতা প্রাইড ওয়াক বা গৌরব মিছিলের লিফলেট তৈরী করছিলাম। লিফলেটের মূল বক্তব্য ছিল ৩৭৭ ধারার জন্যে প্রান্তিক লিঙ্গ/যৌনতার মানুষদের কি ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। আমরা দিশার ঘটনাটি ৩৭৭ ধারা এবং অপরাধিকরণের কারণে পুলিশের কাছে সাহায্য না পাওয়ার নজির হিসেবে উল্লেখ করি । পরে আমার মনে প্রশ্ন জাগে যে ঘটনাটির সাথে ৩৭৭ ধারার আদৌ কোনও সম্পর্ক ছিল কি না। দিশাকে জিজ্ঞাসা করতে সে আমায় বলে, “এখানে যখন পুলিশেরা কোতিদের উত্যক্ত করে বা নির্যাতন করে, আমার তো মনে হয় না যে তারা ৩৭৭ ধারার কথা জেনে করে... ওরা এমনিই সেটা করে! আমার মনে হয় ৩৭৭র জন্য ঠুং-ঠাং (অর্থাৎ স্পর্শকাতর, ভঙ্গুর, এলিট) কোতিদের বেশি প্রবলেম হয়!”

একজন শহুরে এলিট “ঠুং-ঠাং কোতি” হিসেবে কথাটা আমায় নাড়া দেয়। যেহেতু আমাদের কাছে ৩৭৭ ধারা সবরকম পুলিশী অবিচার ও নির্যাতনের প্রতীক হয়ে উঠেছিল, আমরা খেয়ালই করিনি যে আদতে দিশার ক্ষেত্রে পুলিশ সাহায্য করেনি ঠিকই, কিন্তু ৩৭৭ ধারার কোন উল্লেখ পর্যন্ত করেনি। লিফলেটে ৩৭৭এর বিরুদ্ধে জোরালো যুক্তি খাড়া করতে গিয়ে আমরা বিভিন্ন রকমের নির্যাতনকে ৩৭৭ ধারার সাথে মিশিয়ে ফেলেছিলাম। শুধু আমাদের ক্ষেত্রে নয়, এটা আন্দোলনের মধ্যে একটি বৃহত্তর প্রবণতা হয়ে উঠেছিল – যেমন দিল্লি হাই কোর্টে যে নাজ ফাউন্ডেশনের পিটিশন দাখিল করা হয়েছিল তার মধ্যে উল্লিখিত বিভিন্ন পুলিশী নির্যাতনের কেসের মধ্যে তিনটে কেসে ৩৭৭এর কোন উল্লেখই নেই। অন্যগুলিতেও ৩৭৭ একমাত্র আরোপ ছিল না।

এই উপলব্ধির পর আমি ৩৭৭এর তাৎপর্য বিষয়ে আরও কিছু সমাজকর্মীদের প্রশ্ন করি। কোচবিহারে সুমি তার অঞ্চলে ৩৭৭ ধারার অপ্রাসঙ্গিকতার কথা উল্লেখ করে বলে, “৩৭৭ নিয়ে কিন্তু আমরাই বাড়াবাড়ি করছি... ৩৭৭ নিয়ে বেশি লাফা-লাফি করে লাভ নেই!” কলকাতাবাসী ট্রান্স আন্দোলনকর্মী রায়না রায়ের মতে এই “বাড়াবাড়ির” ফলে বরং ক্ষতি হয়েছে । রায়নার মতে, “আন্দোলন হল বলেই বেশিরভাগ মানুষ ৩৭৭ ধারার কথা জানতে পারল... ৩৭৭ ধারা তো আমরা নিজেরাই নিজেদের গায়ে মেখে নিয়েছি!” অর্থাৎ প্রচারের ফলে আইনটির বিষয়ে আরও অনেক বেশি মানুষ অবগত হয়েছে এবং তাতে নতুন সমস্যা তৈরী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

দিল্লি হাই কোর্ট ৩৭৭ ধারাকে আংশিক ভাবে বাতিল করার পর যখন ২০১৩ সালে সুপ্রিম কোর্ট আবার আইনটিকে পূর্বরূপে ফিরিয়ে আনে, তখন সংবাদমাধ্যমে প্রচার হতে থাকে যে সমকামিতা নাকি আবার অপরাধ হয়েছে। এর কিছুদিন পর ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে উত্তর বঙ্গের শিলিগুড়ি শহরে কিছু স্থানীয় যুবক মিলে একজন রূপান্তরকামী / কোতি জনগোষ্ঠির মানুষকে ধর্ষণ করে। তারা ধর্ষিতা ব্যাক্তিকে এই বলে ভয় দেখায় যে যদি সে তাদের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেয়, তাহলে তারা তার নামে পুলিশের কাছে নালিশ করবে যে সে নাকি বেআইনি যৌনক্রিয়া করে থাকে। অথচ ৩৭৭ ধারার নিরিখে এই যুবকগুলি নিজেরাই কিন্তু একজন জন্মসুত্রে পুরুষ-চিহ্নিত নারীসুলভ ব্যাক্তিকে পায়ুপথে ধর্ষণ করার অপরাধে অপরাধী। কিন্তু তাদের বক্তব্যে বোঝা যায় যে তারা নিজেদেরকে সমকামীও ভাবেনি, অপরাধীও ভাবেনি – সমলিঙ্গের মধ্যে বেআইনি যৌনক্রিয়ার আরোপ যেন শুধু প্রান্তিক লিঙ্গ পরিচয়ের ব্যক্তিটির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, মূলস্রোতের পুরুষদের ক্ষেত্রে নয়। কোচবিহার জেলাতে, যেখানে ২০১৩ সালের আগে কোনদিন ৩৭৭এর কোনো প্রকোপ দেখা যায় নি, সেখানেও ২০১৪ সালে কিছু যুবক একজন কোতিকে ধর্ষণ করে এবং তাকে ৩৭৭ ধারার নাম করে ভয় দেখায়। এই দুটি ঘটনাতেই যুবকগুলিকে ৩৭৭ বা অন্য কোনো আইনের নিরিখে কোনরকম শাস্তি পেতে হয়নি।

৩৭৭ ধারার প্রভাব বা গুরুত্ব নিয়ে এই ঘটনাগুলি থেকে আমরা কি সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারি? প্রথমত, অন্তত ২০১৩ সাল পর্যন্ত আমরা দেখছি যে ৩৭৭ ধারা অত্যন্ত অসম এবং খাপছাড়া ভাবে প্রয়োগ হচ্ছে। লক্নৌর কেসের মতন কিছু ক্ষেত্রে আইনটি ব্যবহার হলেও অন্যান্য অঞ্চলে ৩৭৭ ধারার সেরকম কোন প্রকোপ দেখা যাচ্ছে না। বরং দিশার মতন মানুষদের ৩৭৭ ধারার কোনও ভূমিকা ছাড়াই সামাজিক নির্যাতন এবং পুলিশী অনীহার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। কিন্তু এলিট আন্দোলনকারীরা অন্যান্য সমস্যাকে ৩৭৭ ধারার ছাতার তলায় এনে সেটাকে আইনি বৈষম্যের সর্বাগ্র প্রতিনিধি বানিয়ে ফেলছে, ৩৭৭ হয়ে উঠছে সমগ্র আইনি অবিচারের প্রতীক। ৩৭৭ ধারাকে এতটা গুরুত্ব দেওয়ার কারণে সেটা অনেক বেশি প্রচার পাচ্ছে, এবং সংবাদমাধ্যমে একটি ভুল ধারণা তৈরী হচ্ছে যে ৩৭৭ ধারা শুধুমাত্র সমকামিতাকে আলাদা ভাবে অপরাধ হিসেবে গণ্য করে। ফলস্বরূপ ৩৭৭ আগের থেকে অনেক বেশি বিপজ্জনক হাতিয়ারে পরিনত হচ্ছে, তার আঞ্চলিক ব্যাপ্তি এবং প্রকোপ বাড়ছে। রায়নার কথামত ৩৭৭ আমরা “নিজেরাই নিজেদের গায়ে মেখে” নিচ্ছি, বা বলা যেতে পারে যে এলিট আন্দোলনকারী এবং মিডিয়া আইনটি জনগোষ্ঠির সবার গায়ে মাখিয়ে দিচ্ছে, যার প্রকোপ গিয়ে পড়ছে তুলনায় কমজোর মানুষদের ওপর। ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস বুরোর সংখ্যাতত্ত্ব অনুযায়ী ২০১৩ সালের সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর ৩৭৭ ধারার কেসের সংখ্যা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেতে থাকে। ২০১৫ সালে হিন্দুস্তান টাইমসের একটি প্রতিবেদনে আইনজীবি আনন্দ গ্রোভার বলেন, “দিল্লি হাই কোর্টের রায়ের পরে আইনটিকে নিয়ে যে চর্চা হয়েছে সেটার জন্যে আরও অনেকে আইনটির বিষয়ে জানতে পেরেছে। সুপ্রিম কোর্টের রায় যখন আইনটিকে আবার পুনর্প্রতিষ্ঠিত করেছে, তখন অনেকে আইনটি ব্যবহার করার জন্যে উপযুক্ত সুযোগ পেয়েছে।”

কিন্তু প্রকোপ বাড়লেও ৩৭৭এর প্রয়োগগুলি কিন্তু সর্বক্ষেত্রে খোদ আইনটি মেনে হচ্ছে না, বরং অন্যান্য সামাজিক ধারণা মেনে হচ্ছে। যেমন উত্তর বঙ্গের ঘটনাগুলিতে দেখছি যে ৩৭৭ ধারাকে ভয় দেখানোর জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে, কিন্তু ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে। এবং যারা তা করছে, তারা কিন্তু নিজেরাই ৩৭৭ ধারার নিরিখে অপরাধী। সুমির মতে, “এত তীক্ষ্ন ভাবে তো সেই ছেলেগুলো ভাবেনি যে তারাও অপরাধী... মিডিয়াতে, সব জায়গায় যেটা বলছে যে সমকামিরাই শুধু অপরাধী, ওরাও সেটাই ভাবছে!” এখানে উল্লেখ্য যে বেশিরভাগ “সাধারণ” বা মূলস্রোতের মানুষই কে সমকামী, কে রূপান্তরকামী, কে উভকামী, এই পরিচয়গুলির মধ্যে কি সমাপতন বা পার্থক্য রয়েছে, সেই সমস্ত সুক্ষ প্রশ্নের ধার ধারে না – যারাই দৃশ্যত নারী-পুরুষ বিভাজন লঙ্ঘন করে তাদের গায়েই অবৈধ যৌনতার তকমা লেগে যায়। ওদিকে সেই উত্তর বঙ্গের যুবকগুলির মতন মূলস্রোতের পুরুষেরা অনেকক্ষেত্রে সমলিঙ্গের মধ্যে যৌনক্রিয়া করলেও সমকামিতার এবং অবৈধতার তকমা এড়িয়ে যেতে পারে।

অতয়েব ৩৭৭ ধারার সাথে নানারকমের সামাজিক মাল-মশলা মিশিয়ে আইনটি কার্যকরী হয়েছে। আইন থাকাকালীন কিছুক্ষেত্রে ক্ষমতাবান পুরুষেরা সমলিঙ্গের মানুষদের পায়ুপথে ধর্ষণ করলেও “অপরাধী” হিসেবে চিহ্নিত হয়নি। আর আজকে আইন আংশিক ভাবে বাতিল হওয়ার পরেও রূপান্তরকামী-কোতি-হিজড়ে মানুষদের “৩৭৭, ছক্কা, শালা” বা “ছেলে না ৩৭৭?” শুনতে হচ্ছে। অর্থাৎ অনেকক্ষেত্রেই ৩৭৭এর প্রকোপের জন্য খোদ আইনটির চেয়ে এই সামাজিক ধারণাগুলির ভূমিকা বেশি গুরুত্বপূর্ণ, যেগুলির অস্তিত্ব ভারতীয় দন্ডবিধির বাইরে, যেগুলি আইনটির আগেও ছিল এবং পরেও থাকবে। কিন্তু ৩৭৭ ঘিরে যে প্রতীকি রাজনীতি গড়ে উঠেছে সেটা আইনটিকে তার সামাজিক পরিপ্রেক্ষিতে না দেখে অধিকারহীনতার একটি বিমূর্ত প্রতীক বানিয়ে তুলেছে, যেন এই আইনটির মধ্যেই সুপ্ত রয়েছে অপরাধমুক্তি এবং অধিকারপ্রাপ্তির প্রাণভোমরা। যেমন দিশার ক্ষেত্রে আমরা, অর্থাৎ এলিট শ্রেনীর আন্দোলনকারীরা, তার ঘটনাটি আমাদের সুবিধে অনুযায়ী ৩৭৭এর খাপেই বসিয়ে নিয়েছিলাম, যেহেতু বিভিন্ন সামাজিক সমস্যার জটগুলো খোলার চেয়ে একটি প্রতীকি শত্রু চিহ্নিত করা আমাদের পক্ষে সহজ ছিল। আজ এই প্রতীকি শত্রু বিনাশের পর দেখা যাচ্ছে যে আইনটি থেকে যাদের ভয় পাওয়ার কারণ সবচেয়ে কম ছিল তাঁরাই সবচেয়ে বেশি জোরগলায় বলছেন যে তাঁরা আর অপরাধী নন, অথচ অন্য নানা ভাবে অপরাধিকরণ এবং প্রান্তিকীকরণ চলতেই থাকছে।

উপসংহার

৩৭৭ ধারা আংশিক ভাবে বাতিল করে শীর্ষ আদালতের বিচারকেরা নিঃসন্দেহে একটি সুদূরপ্রসারী এবং ভালো পদক্ষেপ নিয়েছেন। এই রায়ে এমন অনেক কিছু রয়েছে যা যৌনতা ও লিঙ্গ অধিকারের আন্দোলনগুলিতে কাজে লাগবে বা ইতিমধ্যেই লেগেছে। যেমন তেলঙ্গানা প্রদেশে “তেলঙ্গানা ইউনাকস একট” নামক একটি হিজড়ে জনগোষ্ঠী বিরোধী আইনকে হায়দেরাবাদ হাই কোর্ট খারিজ করার সময় ৩৭৭ বিষয়ক রায়টিকে দৃষ্টান্ত হিসেবে ব্যবহার করেছে। সুপ্রিম কোর্টের এই রায়টির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল যে রায়টি শুধুমাত্র চার দেওয়ালের মধ্যে ব্যাক্তিগত যৌনক্রিয়ার অধিকারেই আবদ্ধ নয়। বরং রায়টি “right to privacy” অর্থাৎ ব্যাক্তিগত পরিসরের অধিকারের মধ্যে প্রকাশ্য স্থানে নিজের যৌনতা এবং লিঙ্গপরিচয় প্রকাশ করার স্বাধীনতাকেও ধরেছে । যে কারণে রায়টি শুধুমাত্র ব্যক্তিগত যৌনসম্পর্কের অধিকারের ক্ষেত্রে নয়, শিক্ষাক্ষেত্র এবং কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য প্রতিরোধ করতেও কাজে আসবে। সেই হিসেবে ৩৭৭ ধারা ঘিরে যে প্রতীকি রাজনীতি গড়ে উঠেছিল তা অবশ্যই কিছু সাফল্য এনে দিয়েছে। কিন্তু ৩৭৭ ধারার অবসানকে যদি আমরা অপরাধমুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখি বা অধিকারপ্রাপ্তির ইতিহাসের সূচনা হিসেবে দেখি, তাহলে হয়ত ভুল করব। ৩৭৭ ধারার প্রতিকী রাজনীতি অন্যান্য অনেক সমস্যা ঢেকে দিয়েছে, আন্দোলনের অন্যান্য ইতিহাস মুছে দিয়েছে বা খাটো করে রেখেছে। Firstpostএর সাম্প্রতিক একটি প্রতিবেদনে প্রান্তিক যৌন ও লিঙ্গপরিচয়ের বিভিন্ন ব্যাক্তি ৩৭৭ ধারা নিয়ে অতিরিক্ত বাড়াবাড়ির কারণে আন্দোলনের ক্ষতির কথা বলেছেন। চেন্নাইয়ের চন্দ্র মৌলি বলেন, “এলজিবিটি অধিকারের কথা বলার সময় ৩৭৭ ধারা আমাদের অনেকটা সময় এবং শক্তি নিয়ে নিত”। হায়দেরাবাদের যতীন বলেন যে কিছুক্ষেত্রে ৩৭৭ নিয়ে মাতামাতির জন্য রূপান্তরকামী অধিকার এবং ট্রান্সজেন্ডার বিলের মতন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে অবহেলা করা হয়েছে। মনিপুরের কুমাম ডেভিডসন বলেন যে তাঁর মতন উত্তরপূর্ব ভারতের বাসিন্দাদের সেরকম ভাবে ৩৭৭ ধারার মুখোমুখি হতে হয় নি, কিন্তু অন্যান্য অঞ্চলের ভারতীয়দের কাছ থেকে প্রচুর বর্ণবিদ্বেষের সম্মুখীন হতে হয়েছে। অর্থাৎ ৩৭৭এর বাইরে বৈষম্যের এবং অপরাধিকরণের অনেক রূপ রয়েছে। পাশাপাশি মুক্তির লড়াইয়েরও অনেক ইতিহাস ও ভবিষ্যৎ রয়েছে, যেগুলো দিল্লি, এলিট আন্দোলনকর্মী, এবং শীর্ষ আদালতের চারিদিকে কেন্দ্রীভূত নয়। ৩৭৭ তো অন্তত খাতায় কলমে বাতিল হল – এবার কি আমরা এই ইতিহাসগুলি এবং লড়াইগুলিকে যোগ্য মর্যাদা দিতে শিখব?


লেখক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আইওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত সহকারী অধ্যাপক এবং গবেষক।



410 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

কোন বিভাগের লেখাঃ বুলবুলভাজা  অন্য যৌনতা 
শেয়ার করুন



আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন