বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

নিয়মের অতল ফাঁক - মালদহের গণি খান চৌধুরী ইনস্টিটিউট অফ ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি - পঞ্চম কিস্তি

অনমিত্র রায়

দেখতে দেখতে ২০১৮-র সেপ্টেম্বর মাস এসে পড়লো। এই লেখার শেষ কিস্তি প্রকাশিত হয়েছিল আগস্ট মাসের ১২ তারিখ এবং সেই কিস্তিতে আমরা ২০১৭ সালের ১১ই জানুয়ারীর ঘটনা অবধি নথিবদ্ধ করতে পেরেছিলাম। বস্তুত এই লেখা এতদিনে তাৎপর্য হারিয়েছে বলা চলে। লেখাটি শুরু করার মূল উদ্দেশ্য ছিল মানুষজনকে জানানো যে জিকেসিআইইটি-র ছাত্র আন্দোলন কোনো হঠাৎ করে গজিয়ে ওঠা আন্দোলন নয়। বিগত দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে এই আন্দোলন চলছে। অবশ্যই পাশাপাশি আরও একটি উদ্দেশ্য ছিল। সেটি হলো যত বেশি সম্ভব মানুষকে এই আন্দোলনের বিষয়ে অবগত করা। তো, এই দুটি উদ্দেশ্যই অল্পবিস্তর সাধিত হয়েছে বলা চলে। কারণ, প্রথমত; গত কয়েকসপ্তাহে যতজন মানুষকে কনভেনশনে, মিছিলে বা সোশ্যাল মিডিয়ায় এই আন্দোলন নিয়ে বক্তব্য রাখতে দেখেছি তাঁরা প্রায় প্রত্যেকেই এই ছাত্ররা যে কল্পনাতীত দীর্ঘসূত্রিতার শিকার সে কথা উল্লেখ করেছেন। কারো মতে আড়াই তো কারো মতানুযায়ী তিন বছর ধরে চলছে এই আন্দোলন। দ্বিতীয়ত, গত ৬ই সেপ্টেম্বরের মিছিল তথা রাজভবন অভিযানে যে পরিমান জনসমাগম হয়েছিল তার ভিত্তিতে মেনে নিতে আপত্তি নেই যে দ্বিতীয় উদ্দেশ্যটি সফল করার ক্ষেত্রে এই লেখার আর বিশেষ কোনো ভূমিকা পালন করার নেই।

আমাদের লেখার প্রথম কিস্তি প্রকাশিত হয়েছিল ২৬শে জুলাই, ২০১৮। তার ঠিক দু'দিন আগে, অর্থাৎ ২৪শে জুলাই, মেডিক্যাল কলেজ থেকে বেরিয়েছিল বিজয় মিছিল। কলকাতা জুড়ে তখন প্রবল ছাত্র আন্দোলনের হাওয়া। সেই হাওয়াতেই ভেসে বেড়াচ্ছিল মালদায় যেন কি একটা ঘটছে। কেউ বলছিলেন মালদা মেডিক্যাল কলেজ, কেউ বলছিলেন ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, কেউ পলিটেকনিক --- অর্থাৎ চরাচরে তখনও প্রবল কুয়াশা। সুখের কথা সে কুয়াশা বর্তমানে কাটিয়া গিয়াছে। অতএব লেখাটি বন্ধ করিলেই চলে, কিন্তু করা যাইতেছে না।

এই না যাওয়ারও আবার বেশ কিছু কারণ রয়েছে। প্রথমত, আন্দোলন এখনো চলছে। এখনও মেলেনি সমাধান। দ্বিতীয়ত, আমাদের ন্যারেটিভ এখনো শেষ হয়নি। ইতিহাস এসে বর্তমানে মিশলে বেশ একটা শেষের মতো শেষ হয় বটে, কিন্তু এত ঘটনা ঘটে গেছে সেই ২০১৬ থেকে আজ অবধি যে কবে যে সেইভাবে শেষ করা সম্ভব হবে এখনও ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। তৃতীয়ত, আগের কিস্তিতে কোথাওই সমাপ্তির কথা ঘোষণা করা হয়নি বা নিদেনপক্ষে সেরকম কোনো আভাসও দেওয়া হয়নি। সর্বোপরি, হয়তো কোথাও কোনো পাঠিকা বা পাঠক অপেক্ষায় রয়েছেন যে এই লেখায় জিকেসিআইইটি-র ছাত্র আন্দোলনের সামগ্রিক ইতিহাসটি তুলে ধরা হবে। পুনরায়; অত্যন্তই দুরূহ কাজ। কিছু পেপার কাটিং এবং ফেসবুক পোস্ট থেকে যতটা জানা যায় তার বাইরে কিছু ঘটে থাকলেও আমাদের পক্ষে জানা সম্ভব নয়। আর শুধুমাত্র শোনা কথার ভিত্তিতে লিখলে তাকে আর যাই হোক ডকুমেন্টেশন বলা যায় না। অতএব, এই কিস্তিতে জানিয়ে দেওয়া থাক যে এরপর আর কোনো কিস্তি নাও আসতে পারে। কারণ লেখকের জীবনে দিন মাত্র ২৪ ঘন্টার এবং তাঁর মূল উদ্দেশ্যগুলি মোটের উপর সাধিত হয়েছে বলেই তিনি মনে করছেন।

ঘটনায় আসা যাক।

৩০শে জানুয়ারি, ২০১৭, জিকেসিআইইটি-র ছাত্রছাত্রীরা পুনরায় ইনস্টিটিউট চালু করার পথ খুঁজতে পাওয়ারগ্রিড ক্যাম্পাসে একটি মিটিং এর আহ্বান রাখে। সেই মিটিং-এ সিদ্ধান্ত হয় ৬ই ফেব্রুয়ারি কথা বলতে যাওয়া হবে এনআইটি দুর্গাপুরের আধিকারিকদের সাথে। এরপর দোসরা ফেব্রুয়ারী আবারও মিটিঙে বসেছিল ছাত্ররা। তারপর ৫ই ফেব্রুয়ারী উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে প্রতিষ্ঠান খোলা সহ বিভিন্ন দাবীতে ছাত্ররা এনআইটি দুর্গাপুরে আমরণ অনশনে বসার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ৬ তারিখ থেকে। উক্ত প্রতিবেদনে ৭ই ডিসেম্বর ২০১৬-য় বিজ্ঞপ্তি জারী করে যে ইনস্টিটিউট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল সেই ঘটনারও উল্লেখ রয়েছে। উল্লেখ রয়েছে বিজ্ঞপ্তির নম্বরেরও (NITD / REGIS / ORGKCIET 619 dt 07/12/2016)। এছাড়াও জানা যাচ্ছে, ডিরেক্টর সাহেবের মতানুযায়ী প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও কর্মীরা তখনও নিরাপত্তাহীনতায় ভোগার ফলে নাকি প্রতিষ্ঠান চালু করা যাচ্ছে না। ছাত্রদের বক্তব্য অনুযায়ী, পরীক্ষা ৫ মাস পিছিয়ে গত নভেম্বরে শেষ হলেও তখনও খাতা দেখা শুরু হয়নি। ভর্তিও বন্ধ। চেয়ারম্যান অর্ধেন্দুবাবুকে ফোন করায় তিনি পদত্যাগ করেছেন বলে জানিয়েছেন। টিচার ইনচার্জ শুভাশিস দত্ত ফোন ধরেন না, ইনস্টিটিউটে আসেন না অথচ এটিএম থেকে নিয়ম করে মাইনে তুলে নেন। প্রতিবেদকের পেশ করা তথ্য অনুযায়ী তখনও অবধি জিকেসিআইইটি-র ব্যয়ের পরিমান ৩০০ কোটি টাকার কিছু বেশি।

৭ই ফেব্রুয়ারী আন্দোলনরত ছাত্ররা এসে পৌঁছয় দুর্গাপুরে। এনাইটির সামনে অবস্থান বিক্ষোভ শুরু করে ৪০ জন ছাত্র। এরপর ৯ তারিখ এনআইটি-র ডিরেক্টর মৌখিকভাবে একটি আলোচনাসভার প্রস্তাব রেখেছিলেন বলে জানা যাচ্ছে। দুর্গাপুরে অবস্থানরত ছাত্ররা সেই মর্মে তাদের সহপাঠী এবং অভিভাবকদের ওইদিন দুর্গাপুরে আসার অনুরোধ জানায়। কিন্তু এই আলোচনাসভা শেষ অবধি অনুষ্ঠিত হয়েছিল কিনা বা হয়ে থাকলেও সেখানে কি আলোচনা হয়েছিল, কোনো সিদ্ধান্তে আসা গিয়েছিলো কিনা সেসব জানা যাচ্ছে না। তবে জানা যাচ্ছে যে দুর্গাপুরের আন্দোলন নিয়ে ৩টি প্রতিবেদন প্রকাশ পেয়েছিলো ৯ থেকে ১১ তারিখের মধ্যে। তার মধ্যে একটি 'এই সময়' এবং একটি 'আনন্দবাজার পত্রিকা'-য়। আনন্দবাজারের প্রতিবেদনটিতে একটি আলোচনাসভার উল্লেখ রয়েছে, এবং বলা হয়েছে যে ওই আলোচনাসভায় সমাধানসূত্র মেলেনি। কিন্তু একথা কে না জানে যে আনন্দবাজারের কাজ মানুষকে কনফিউজ করা। এমনকি কখনোসখনো ইচ্ছা না থাকলেও। আনন্দবাজারে প্রকাশিত প্রতিবেদনটির তারিখ ফেব্রুয়ারি ১১। ১১ তারিখই আবার ছাত্রদের ফেসবুক পোস্ট অনুসারে এনআইটি-র রেজিস্ট্রারের অর্ডার অনুযায়ী ১৪ই ফেব্রুয়ারী পুনরায় ক্লাস চালু হতে চলেছে জিকেসিআইইটিতে। অর্থাৎ, মজার জায়গাটুকু বাদ দিলে, আনন্দবাজারের প্রতিবেদনটি ১০ তারিখ পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত এবং রেজিস্ট্রার-এর অর্ডারটির প্রকাশের তারিখ ১১ই ফেব্রুয়ারী (যদিও ওইদিন শনিবার ছিল)। ফেসবুকে আপলোড হওয়া ছবি দেখে আন্দাজ করা যাচ্ছে যে সম্ভবত সূর্য অস্ত গিয়ে সন্ধ্যা নামার পর এই খবরটি ছাত্রদের কাছে পৌঁছয়।প্রসঙ্গত, এই সময় অনশনের প্রভাবে শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে দুই ছাত্র, সাইন জাহেদী এবং গোপীনাথ রাজবংশী হাসপাতালে ভর্তি। পরেরদিন, অর্থাৎ ১২ই ফেব্রুয়ারী ছাত্ররা ফেসবুক পোস্টের মাধ্যমে জানায় যে নিম্নলিখিত পাঁচটি দাবী মেনে নেওয়া হয়েছে ---

১) ১৪ই ফেব্রুয়ারী ইনস্টিটিউট খুলছে
২) আগস্ট মাসের মধ্যে ২টি সেমিস্টার সম্পূর্ণ করা হবে
৩) পুরনো অপ্রকাশিত রেসাল্ট প্রকাশ করা হবে এই ফেব্রুয়ারী মাসের মধ্যেই
৪) সার্টিফিকেট কোর্সের সেকেন্ড এবং ফার্স্ট ইয়ারের ছাত্রদের অ্যাডমিশন ও রেজিস্ট্রেশন সংক্রান্ত দাবী মেনে নেওয়া হবে
৫) প্রফেসর ইনচার্জ পরিবর্তন করা হবে

পুরোনো রেজাল্টগুলি অবশেষে ১৭ই ফেব্রুয়ারী প্রকাশ করা হয়েছিল। সার্টিফিকেট, ডিপ্লোমা, এবং বিটেকের থার্ড সেমিস্টারের রেজাল্ট বেরিয়েছিল বলে জানা যাচ্ছে। কিন্তু সমস্যা মেটেনি। দোসরা মার্চ থেকে পুনরায় আন্দোলন শুরু হয় দুর্গাপুর এনাইটি-র গেটে। তেসরা মার্চ দৈনিক যুগশঙ্খ-য় প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী ইনস্টিটিউট খুললেও চালু হয়নি পঠনপাঠন। আটকে রয়েছে নতুন সেশনের ভর্তি এবং রেজিস্ট্রেশনও। কারণ জমির চরিত্র পরিবর্তন (মিউটেশন) না হওয়ার ফলে নাকি অনুমোদন মিলছে না। এই প্রতিবেদনে আবার বলা হয়েছে যে ২০১৬-র নভেম্বরে অনুষ্ঠিত হওয়া সেমিস্টারের রেজাল্ট তখনও অপ্রকাশিতই। আরো জানা যাচ্ছে যে স্থায়ী অধ্যক্ষ তখনও নিয়োগ করা হয়নি। টিচার ইনচার্জ তখনও শুভাশীষ দত্ত মহাশয়ই। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী ৬ মাস আগে জমির মিউটেশনের আবেদন করা হয়েছে। কিন্তু তখনও মিউটেশন হয়নি। নভেম্বরের পরীক্ষার রেজাল্টও নাকি আটকে রয়েছে স্টেট্ কাউন্সিলের জন্য। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে ১৭ একর জমির প্রয়োজন ছিল বিটেকের অনুমোদনের জন্য। আর জিকেসিআইইটি-র হাতে ছিল ৪০ একর জমি। কিন্তু তার গোটাটাই কৃষিজমি যা কিনা এডুকেশনাল ল্যান্ডে পরিবর্তন করা সম্ভব হয়নি তখনও। চৌঠা মার্চ 'এই সময়' পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জিকেসিআইইটি-র এক কর্তা জানাচ্ছেন যে বিদ্যুতের বিল বাকি থাকায় ইনস্টিটিউটের বিদ্যুৎ সংযোগ ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছে। কেটে দেওয়া হয়েছে জলের লাইনও। চূড়ান্ত অব্যবস্থার কথা মেনে নিয়ে তিনি জানিয়েছেন যে এনআইটি-র থেকেও তেমন সাড়া মিলছে না।

এনআইটি তে অবস্থান চলতে থাকে। এর মধ্যেই ৫ই মার্চ ছাত্রদের একটি দল মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জীর সাথে দেখা করতে কালীঘাটে ওনার বাড়িতে যায়। দেখা হয়নি। তবে ওখানে উপস্থিত আধিকারিকদের হাতে তারা স্মারকলিপি তুলে দিয়ে আসে। ছাত্রদের এই দলটি স্টেট্ কাউন্সিলেও ডেপুটেশন জমা দেয় এবং তারপর সাময়িক বিক্ষোভ প্রদর্শন করে স্টেট্ কাউন্সিলের অফিসের সামনে। ২৪শে মার্চ স্টেট্ কাউন্সিলের চিফ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ অফিসার জিকেসিআইইটি-র মেন্টর ডায়রেক্টর শ্রী অশোককুমার দে-র উদ্দেশ্যে একটি নোটিস জারি করেন। ওই নোটিসে বলা ছিল

১) একই কোর্সের সেকেন্ড ইয়ারের অ্যাডমিশন স্বাভাবিক পদ্ধতিতেই নিতে হবে। এক বা একাধিক বিষয়ে অনুত্তীর্ণ ছাত্ররাও পরীক্ষায় বসে ব্যাক ক্লিয়ার করার মাধ্যমে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পাবে।
২) সার্টিফিকেট কোর্স পাস্ করা ছাত্রছাত্রীদের উপযুক্ত বিভাগে ডিপ্লোমা কোর্সে ভর্তি নিতে হবে।
৩) সেরিকালচার টেকনোলজি এবং কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এর ছাত্ররা অন্য পাঁচটি বিভাগের কোনোটিতে ভর্তি হতে পারবে না। এই নোটিস হাতে আসা মাত্রই জিকেসিআইইটি কর্তৃপক্ষের তরফেও ভর্তির নোটিস জারি করে দেওয়া হয়।

কিন্তু সমস্যা যে সর্বতো ভাবে মিটলো একথা বলা যাবে না এখনো। কারণ ২০১৪ সাল থেকে যে এআইসিটিই অ্যাপ্রুভাল নিয়ে সমস্যা ছিল তা এখনও রয়েছে। কিন্তু এবার সমস্যা শুধুমাত্র সেরিকালচার এবং কেমিক্যাল ডিপার্টমেন্টের। ইতিমধ্যে ইনস্টিটিউটে বন্দুকধারী সিকিউরিটির ব্যবস্থা করতে সচেষ্ট হয়েছে কর্তৃপক্ষ। এই ব্যবস্থা করতে গিয়ে নাকি খরচ হয়েছে প্রায় ৬ কোটি টাকা। এদিকে আইকার্ড, ল্যাবরেটরী, পর্যাপ্ত সংখ্যক শিক্ষক বা লাইব্রেরীতে বইয়ের সংখ্যা বাড়ানো নিয়ে কথা বলতে গেলে ছাত্রদের শুনতে হচ্ছে টাকার নাকি বড়ই অভাব কর্তৃপক্ষের হাতে। আন্দোলনরত ছাত্ররা তাদের পরবর্তী কর্মসূচি নেয় দোসরা মে, ২০১৭। তারা জেলাশাসকের মাধ্যমে তাদের অবস্থার কথা মুখ্যমন্ত্রীর কাছে পৌঁছে দিতে চেয়েছিলো। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রীর মালদা সফর নিয়ে ব্যস্ত থাকায় জেলাশাসক ছাত্রদের সাথে দেখা করতে পারেননি। ফলে ছাত্ররা ডিএম অফিসের সামনে ধর্নায় বসে। কিন্তু জেলাশাসক সেদিন এতটাই ব্যস্ত ছিলেন যে সাংবাদিকরাও তাঁর বিবৃতি জোগাড় করতে পারেননি এ বিষয়ে। তবে জেলা প্রশাসনের এক শীর্ষ আধিকারিক জানান ২ তারিখই সন্ধেবেলা মালদা পৌঁছনোর কথা মুখ্যমন্ত্রীর এবং জিকেসিআইইটি নিয়ে যাতে কোনো ঝামেলা না বাধে সেদিকে তাঁরা লক্ষ্য রাখবেন। ২১শে মে ফেসবুকে প্রকাশিত জিকেসিআইইটি স্টুডেন্ট ইউনিটি-র বিবৃতি অনুযায়ী তিনদিন ধরে কারেন্ট নেই ছাত্রীদের হোস্টেলে। কর্তৃপক্ষ নাকি পরীক্ষা চলাকালীন কিছু ছাত্রীকে হোস্টেল থেকে সরিয়ে পর্যাপ্ত ব্যবস্থাবিহীন একটি ছোট বাড়িতে রাখতে চেয়েছিলো। ছাত্রীরা রাজী হয়নি। ফলে ভরা গ্রীষ্মের মধ্যে বিদ্যুৎ সংযোগ কেটে দেওয়া হয়েছে।

ওদিকে ৩০শে জুন নবনিযুক্ত বন্দুকধারী নিরাপত্তারক্ষীদের নতুন কর্মস্থলে প্রথম দিন। কিন্তু পুরোনো নিরাপত্তারক্ষীরা ওইদিন তাঁদের কাজে যোগ দিতে বাধা দেন। ইনাডু ইন্ডিয়া নামক একটি অনলাইন নিউজ পোর্টালের রিপোর্ট অনুযায়ী ৩০০ জন ছাত্রের জন্য নাকি মোট ১০৯ জন নিরাপত্তারক্ষীকে নিয়োগ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। প্রথমে ছাত্ররা কর্তৃপক্ষকে জানায় যে এই পদক্ষেপ বাঞ্ছনীয় নয়। কিন্তু কর্তৃপক্ষ যথারীতি তাদের কথায় আমল দেয়নি। এরপর ৩০শে জুন ছাত্ররা প্রধানমন্ত্রীর কাছে লিখিত অভিযোগ পাঠায় এই নিয়োগের বিরোধীতা করে। জেলা প্রশাসনের কাছে স্মারকলিপিও জমা দেয় তারা।

এই ঘটনার ঠিক একমাস পর, ৩০শে জুলাই, ২০১৭, জিকেসিআইইটি-র নতুন ডায়রেক্টর হিসেবে নিযুক্ত হন প্রফেসর পি আর আলাপতি।

এরপর কিছুদিন ইনস্টিটিউট স্বাভাবিক ভাবেই চলেছিল বলে মনে করা যায়। সেপ্টেম্বরের ১১ তারিখের আগে অবধি আর কোনো গন্ডগোলের খবর চোখে পরে না। ছাত্রদের ফেসবুক পোস্ট অনুযায়ী নতুন ডায়রেক্টর আসার পর দুর্নীতির অভিযোগে আগের পিআইসি শুভাশীষ দত্ত এবং সিকিউরিটি ইনচার্জ দেব হালদারকে তাঁদের দায়িত্ব থেকে অব্যহতি দেওয়া হয়েছিল। নিজেদের পুরোনো পদ ফিরে পেতে এই দুই ব্যক্তি প্রথমে ছাত্রদের ডায়রেক্টরের বিরুদ্ধে উস্কানোর চেষ্টা করে। তাদের উদ্দেশ্য বিফল হলে তারপর তারা উস্কানি দেয় নতুন সিকিউরিটির কাজে যোগ দেওয়া কর্মীদের। এই উস্কানির ফলেই নাকি ১১ই সেপ্টেম্বর নতুন সিকিউরিটি ইনচার্জের উপর একদল লোক তৃণমূল কংগ্রেসের পতাকা হাতে হামলা চালায়। তবে ছাত্রদের পোস্ট থেকেই আবার জানা যাচ্ছে যে জেলা প্রশাসন এবার ছাত্রদের পাশেই ছিল এবং তারা এই হামলা প্রতিহত করতে যথাযথ ভূমিকা পালন করে।
৯ই অক্টোবর, ২০১৭, জিকেসিআইইটি কর্তৃপক্ষ বিবৃতি দিয়ে এক অদ্ভুত তথ্য প্রকাশ করে। এই বিবৃতি অনুযায়ী টিচার ইনচার্জ তো পরের কথা, শ্রীমান শুভাশীষ দত্তের এমনকি প্রফেসরের সম্মান বা বেতন কোনোটাই পাওয়ার কথা নয়। অথচ ২০১৪ সাল থেকে তিনি দুটোই পেয়ে আসছিলেন। বিবৃতিতে জানানো হয় যে ২২শে সেপ্টেম্বর দিল্লির শাস্ত্রী ভবনে বসা মিটিং-এ বেরিয়ে আসা তথ্য অনুযায়ী (বোর্ড অফ গভর্নরস, জিকেসিআইইটি-র দশম মিটিং) ডাঃ এ এন খান চৌধুরী মহাশয় শ্রীমান শুভাশীষ দত্তকে প্রফেসর পদে বহাল করেছিলেন। কিন্তু এই নিয়োগ এআইসিটিই অথবা ইউজিসি অথবা এমএইচআরডি, কারুরই নিয়োগপদ্ধতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে করা হয়নি। বস্তুত ১৪ই আগস্ট, ২০১৪-র পর খান চৌধুরী সাহেব জিকেসিআইইটি-র চেয়ারম্যান ছিলেন না। ফলে এই নিয়োগকে অবৈধ ঘোষণা করে ডাঃ শুভাশীষ দত্তকে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর পদে বহাল রাখা হয়।

এরপর নভেম্বর মাসে বিটেক অ্যাফিলিয়াশনের দাবীতে একদফা বিক্ষোভ ছাড়া মার্চ, ২০১৮ অবধি জিকেসিআইইটি-তে আর কোনো বড় ধরণের গন্ডগোল ঘটেনি।

(ক্রমশ। সম্ভবত।)


<<আগের পর্ব



3 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

কোন বিভাগের লেখাঃ বুলবুলভাজা  খবর্নয়  ধারাবাহিক 
শেয়ার করুন



আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন