বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

মহেশ লাইব্রেরী

স্বাতী মৈত্র

হিন্দি, বাংলা, ভাষাসংযোগ, ভাষা আগ্রাসন, এদেশে ছাপাখানার প্রবর্তন এবং বহুভাষিকতা। এই বিরাট বিষয়টিকে একসঙ্গে প্রকাশ করা খুবই কঠিন। এই লেখায় রয়েছে শুধু তার একটি টুকরো। বাকি হারানো টুকরোগুলিও আশা করা যাচ্ছে, এক এক করে আমরা প্রকাশ করতে পারব।


ছাপাখানার প্রথম যুগের কলকাতা শহরে ভাষার সংখ্যা নেহাত কম ছিলনা। ১৮০০ সাল ধরেই বলা যাক, কারণ কাকতালীয় ভাবে সেই বছরেই দুটো এমন ঘটনা ঘটে যার হাত ধরে বাংলা তথা ভারতবর্ষে ভাষা চর্চা ও ছাপাখানা সংস্কৃতির নতুন জোয়ার আসে।

এর মধ্যে প্রথম ঘটনা অবশ্যই কম্পানির বিলাতি কর্মচারীদের ভারতীয় ভাষা শিক্ষা দেওয়ার উদ্দেশ্যে লর্ড ওয়েলেসলি দ্বারা ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের প্রতিস্থাপনা (তখনো প্রাচ্যবাদীদের রমরমা, ম্যাকলে সায়েব তাঁর সেই বিখ্যাত মিনিট আরও ৩৫ বছর পরে লিখবেন, তারপর আসবে ১৮৩৫ সালের ইংলিশ এডুকেশন অ্যাক্ট)। খোদ ইংল্যান্ডে তখনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্য পড়ানো হয়না, কিন্তু ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের কল্যাণে আরবি, ফার্সি, সংস্কৃত, বাংলা, হিন্দি, উর্দু, ও মারাঠি ভাষা ও সাহিত্যের চর্চা শুরু হয় কলকাতা শহরের বুকেই। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের প্রেসেই প্রথম প্রকাশ হয় আরবি, বাংলা, বর্মী, ম্যান্ডারিন, হিন্দুস্তানি, কন্নড়, মারাঠি, ওড়িয়া, পাঞ্জাবী, ফার্সি, সংস্কৃত ও তেলুগু ভাষার পাঠ্যবই, ব্যাকরণের বই, এবং শব্দকোষ। যোগদান করেন মৃত্যুঞ্জয় তর্কালঙ্কার, তারিণীচরণ মিত্র, রামরাম বসু, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, ও মদনমোহন তর্কালঙ্কারের মতন পণ্ডিত ব্যক্তিরা, এবং জন গিলক্রিস্ট ও উইলিয়াম কেরির ন্যায় ভারতীয় ভাষায় পারদর্শী প্রাচ্যবিদরা। কেরানিদের নেটিভদের ভাষা শেখানোর জন্য খোলা মহাবিদ্যালয় যে শেষমেশ নেটিভ ভাষাগুলোর অবশ্যম্ভাবী জয়যাত্রার প্রথম ধাপ হয়ে দাঁড়াবে, তা কি লাট সাহেব আদৌ কল্পনা করেছিলেন?

১৮০০ সালে ঘটে যাওয়া দ্বিতীয় ঘটনাটির কেন্দ্রস্থল অবশ্য কলকাতা শহর থেকে একটু দূরে, শ্রীরামপুরে। ব্যাপ্টিস্ট মিশনারিদের দ্বারা স্থাপিত ও উইলিয়াম কেরির স্মৃতি-বিজড়িত শ্রীরামপুর মিশন প্রেস তার যাত্রা শুরু করে ১৮০০ সালের জানুয়ারি মাসে। এবং শুনতে হয়তো অবিশ্বাস্য লাগতে পারে, কিন্তু ১৮০০ থেকে ১৮৪০এর মধ্যে - অর্থাৎ মাত্র চল্লিশ বছরে - মিশন প্রেসে ৪০টি ভাষায় ২১২,০০০ পাঠযোগ্য টেক্সট ছাপানো হয়। ব্যাকরণ থেকে ভাষা রীতি, সব রকমের বই ছিল। এর মধ্যে আবার ৩০টা ভাষা ছিল নানান আধুনিক ভারতীয় ভাষা ও সংস্কৃত, ও বাকি ভাষা ছিল আরবি, ফার্সি, আর্মেনীয়, বর্মী, ম্যান্ডারিন, জাভানিজ, মালয়, ধিবেহী, সিঙ্গাপুরি, এবং থাই। শুধু কী তাই? শ্রীরামপুর মিশন প্রেসেই চার্লস উইল্কিন্স (ভগবদ গীতার ইংরেজি অনুবাদক) ও পঞ্চানন কর্মকারের হাত ধরে তৈরি হয় প্রথম বাংলা হরফ। কর্মকার সেখানেই থেমে থাকেননি - তাঁর হাত ধরে শ্রীরামপুরের টাইপ ঢালাইয়ের কর্মশালায় আরও ১৪টি ভারতীয় ভাষার হরফ তৈরি হয়।

ছাপাখানার প্রথম যুগের কলকাতা শহরে ভাষার এই আধিক্য দেখে বিনয় ধারওয়াড়কার বলেছেন, "আজকের দিনে দাঁড়িয়ে মনে হয় ১৭৬০ থেকে ১৮৩০এর মধ্যে কলকাতা অঞ্চলটিকে ইন্দো-ইউরোপীয় ও সাধারণ ভাষাতত্ত্ব চর্চার, এশিয়া মহাদেশের নানান ভাষার তালপাতা, পুঁথি ও কণ্ঠস্বরের মাধ্যম থেকে ছাপা পৃষ্ঠায় তুলে আনবার, এবং ছাপাখানা সংস্কৃতির [ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদ ও মিশনারি] মধ্যস্থতায় ইউরোপ থেকে এশিয়া যাত্রার সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে দেখা যায়।" লন্ডন নয়, প্যারিস নয়, এমনকি বেঞ্জামিন ফ্র্যাঙ্কলিনের নিজের হাতে গড়া ফিলাডেলফিয়াও নয় - কলকাতা!

ভাষার এ হেন আধিক্য আধুনিক বাংলা গদ্যের প্রথম যুগে গদ্যের উপর কতটা প্রভাব ফেলেছিল সেটা ভাষাবিদেরাই ভালো বলতে পারবেন। ভাষার এই রকমারি ভাণ্ডার সাজিয়ে বসা সম্ভব সে যুগে যে আদৌ হয়েছিল, তার কারণও বিবিধ - কলকাতার ভৌগলিক অবস্থান, কম্পানি বাহাদুরের প্রাচ্যবাদী শিক্ষানীতি, এশিয়াটিক সোসাইটি, শ্রীরামপুর মিশনের মতন কিছু প্রতিষ্ঠান, ইত্যাদি। এইগুলো নেহাতই আমাদের আলোচনার পরিসরের বাইরে। তবে এই বিশাল কর্মযজ্ঞের পুরোধা হিসেবে যেমন বিখ্যাত বহুভাষী ইউরোপীয় ইন্দোলজিস্ট, উদ্যোগী মিশনারি, ও বাঙালি পণ্ডিতরা ছিলেন, ঠিক সেইরকম ভাবেই ছিলেন অসংখ্য বাঙালি মুদ্রণ ব্যবসায়ী ও মুদ্রণ শ্রমিক। এ ছাড়াও ছিলেন বেশ কিছু অবাঙালি, ভারতের অন্যান্য প্রান্ত থেকে আগত - ছাপাখানা সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র কলকাতায় যে সব রকমের মানুষ আসবেন, তা আর আশ্চর্য কী? এই যেমন লল্লু লাল অথবা লল্লুজি, আধুনিক হিন্দি খড়ি বোলির জনক ও ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের অধ্যাপক। আগ্রা-নিবাসী গুজরাটি ব্রাহ্মণ পরিবারের সন্তান লল্লুজি বাংলায় প্রথম আসেন মুর্শিদাবাদে, নবাবের দরবারে কাজ করতে। বছর সাতেক সেখানেই থাকবার পর জন গিলক্রিস্ট তাঁকে নিয়ে আসেন ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে, যেখানে তিনি তারপরে ২৪ বছর অধ্যাপনা করেন। ১৮০৪ থেকে ১৮১০ সালের মধ্যে লেখা লল্লু লালের প্রেম সাগর (ভাগবত পুরাণের দশম খণ্ড অবলম্বনে) আধুনিক হিন্দি গদ্যর প্রথম উদাহরণগুলোর মধ্যে একটি। হিন্দুস্তানি ভাষায় ফার্সি-নির্ভরতা কমিয়ে সংস্কৃত শব্দের ব্যবহার প্রথম তাঁর লেখাতেই পাই আমরা। অথবা অধুনা উত্তর প্রদেশের মির্জাপুর থেকে আগত বাবুরাম, যিনি ১৮০৭ সালে হেনরি কোলব্রুকের সাহায্যে গড়ে তোলেন সংস্কৃত প্রেস, যা কিনা ছিল কলকাতা শহরের প্রথম ভারতীয় মালিকানায় ছাপাখানা। এই সংস্কৃত প্রেসেই প্রকাশ হয় প্রেম সাগর , এবং আরও অনেক বাংলা, হিন্দি, ও সংস্কৃত বই। বলা হয় বাবুরাম নাকি বেশ কয়েক বছরেই ব্যবসা জাঁকিয়ে বসে প্রায় চার লক্ষ টাকা উপার্জন করেন! ১৮১৫ সালে বাবুরাম সংস্কৃত প্রেস বিক্রি করেন লল্লুজিকে, যিনি সেটা ১৮২৪ সালে তাঁর অবসর নেওয়া অবধি সচল রাখেন। বহু ভাষার এই রকমারি বাজারে বাঙালিরাই বা পিছিয়ে থাকবেন কেন? ১৮২২ সালে রাজা রামমোহন রায় চালু করেন প্রথম ফার্সি সংবাদপত্র, যার নাম মিরাত অল-আখবার , আর হরিহর দত্ত চালু করেন প্রথম উর্দু সংবাদপত্র, জম-এ জাহান নামা । বাঙালিরা যে কেবল বাংলায় লেখা ও ছাপায় ব্যস্ত ছিলেন, তা নয় - তা হলে কলকাতা শহর উনিশ শতকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ছাপাখানার কেন্দ্র, রকমারি ভাষা চর্চা ও মুদ্রণের স্থল, হয়ে উঠতে পারতো না।

ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ থেকে অবসর নেওয়ার পর লল্লুজি তাঁর ছাপাখানার যন্ত্রটাকে নিয়ে যান আগ্রায়। সেটা তিনি আর তেমন চালাতে পেরেছিলেন কিনা জানা যায়নি, কারণ আগ্রায় পৌঁছনোর পর পরই তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। তবে লল্লুজি ও তাঁর ছাপাখানার হুগলী হয়ে গঙ্গাবক্ষে এই যাত্রাকে সে যুগের ছাপাখানা সংস্কৃতির প্রতীক হিসেবে দেখলে হয়তো ভুল হবেনা। আসলে হুগলী নদী ও বঙ্গোপসাগরের কিনারায় গড়ে ওঠা বন্দরনগরী কলকাতার অবস্থানটাই এরকম ছিল - সমুদ্রের ওপার থেকে যেমন প্রথম ছাপার কল আসে বাংলার মাটিতে, আসেন ইউরোপীয় ছাপাখানার কর্মীরা, ঠিক তেমন করেই আবার কলকাতা থেকে হুগলী নদীর স্রোতের সাথে সাথে ছাপাখানার প্রযুক্তি ও শ্রম ছড়িয়ে পরে লখনৌ, বেনারস, এলাহাবাদে, গড়ে ওঠে ভারতীয় ছাপাখানা সংস্কৃতির নতুন নতুন কেন্দ্র। পাটনা থেকে এককালে দেশী কাগজ যেমন সস্তায় বই ছাপবার জন্য হুগলীর বুকে করে আসে কলকাতায় - ইংরেজরা তার নাম দেয় পাটনা পেপার, ইউরোপ থেকে আসা কাগজের তুলনায় একটু নিম্ন মানের, খড়খড়ে - আবার শ্রীরামপুর ও বালির কারখানা থেকে কাগজ পৌঁছে যায় লখনৌয়ে মুন্সী নওয়াল কিশোরের ছাপাখানায়। কাশীতে গিয়ে তীর্থযাত্রা ও হাওয়া বদলের সাথে সাথে বাঙালি ব্যবসায়ীরা খুলে ফেলেন ছাপাখানাও। এই যেমন ১৮৪৮ সালে - বাবু কেদারনাথ ঘোষ আর কালী প্রসাদ বাগ-ও-বাহার প্রেস নামক একটি ছাপাখানা খোলেন, যেখানে তাঁরা প্রথমে মিরাত অল-উলুম ও তারপরে বাগ-ও-বাহার নামক দুটি পত্রিকা চালানোর চেষ্টা করেন। কাশীর মহারাজা তাঁদের ছাপাখানাকে মাঝে মাঝে বরাত দিলেও বাগ-ও-বাহার প্রেস বেশিদিন চলেনি, ১৯৫১ সালে বন্ধ হয়ে যায়। বরং তাঁদেরই সমসাময়িক, কাশীদাস মিত্র, ১৮৫১ সালে কাশী প্রেস স্থাপনা করে বিরাট সাফল্যের মুখ দেখেন। তাঁর হাত ধরেই প্রকাশ হত কাশী যাত্রা পত্রিকা, যা ছিল সে সময়ে বাংলার বাইরে একমাত্র বাংলা খবরের কাগজ। তার থেকেও বেশি সফল ছিল তাঁরই প্রকাশিত আফতাব ই হিন্দ নামক উর্দু সংবাদপত্র, সর্বপ্রথম আঞ্চলিক সংবাদপত্রগুলির মধ্যে একটি।

স্বাধীনতার সত্তর বছর পরে, নব্য উদারবাদী অর্থনীতির স্বর্ণযুগে বসে, ছাপাখানার প্রথম যুগের এই বহুভাষী সংস্কৃতি হয়তো আজকের দিনে বোঝা একটু কঠিনই। পুঁজির ভাষা ইংরেজি। ক্ষমতার ভাষাও। তার সাথে অবশ্যই রয়েছে রাষ্ট্রশক্তির প্রচ্ছন্ন মদতে হিন্দি আগ্রাসন, যার ফলস্বরূপ উত্তর ভারতের নানান হিন্দুস্তানি ভাষা এক এক করে জমি হারিয়েছে। এই প্রসঙ্গে লিখতে গিয়ে রোশন কিশোর লাইভমিন্টে একটি লেখায় বলেন, “হিন্দি, অথবা সরকারি হিন্দি … আস্তে আস্তে বিন্ধ্য পর্বতের উত্তরে অসংখ্য লোকের কথ্য ভাষাকে গ্রাস করেছে। একজন সাধারণ দিল্লীবাসীর ক্ষেত্রে সেই ভাষা হয়তো পাঞ্জাবি, হরিয়ানভি, বা উর্দু। আমি যেখান থেকে এসেছি, সেখানে এই ভাষা-আগ্রাসনের বলি হয়েছে মগধি, বা আমরা যাকে বলি মগহি। নাম শুনেই বোঝা উচিত যে এটা মগধ অঞ্চলের ভাষা, যা এককালে অশোকের মতন সম্রাটদের বিচরণ কেন্দ্র ছিল। আমার পরিবারের অল্পবয়সী ছেলেমেয়েরা, যারা দিল্লী বা অন্যান্য মেট্রো শহরে বড় হয়েছে, তারা হয়তো এই ভাষা বলতে আদৌ স্বচ্ছন্দ বোধ করেনা। কিন্তু কয়েক প্রজন্ম আগেও এটা আমার পরিবারের কথ্য ভাষা ছিল।” বাংলা ভাষাও যে এই আগ্রাসনের শিকার - ও কিশোর যাকে বলছেন ‘ডেমোগ্রাফিক এলিয়েনেশন’, তার শিকার - সেই নিয়ে সন্দেহের অবকাশ আজকে নেই। তার উত্তরে এক রকমের উগ্র ভাষা রাজনীতির চর্চা আজকাল অনেক জায়গাতেই হয়ে থাকে, যা কিনা একভাষী সংস্কৃতির আরেক রূপ মাত্র। আর বাংলার বহুভাষী আধুনিকতা, যা কিনা কলকাতা অঞ্চলকে এককালে ভাষাতত্ত্ব চর্চার ও ছাপাখানা সংস্কৃতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র করে তুলেছিল? সেটা স্মৃতিমাত্র, যদিও নস্টালজিয়ার কমতি নেই আজও।

***

চিৎপুর অঞ্চলে কাজের সূত্রে ঘোরাফেরা করতে করতেই আলাপ হয়েছিল একজন প্রকাশকের সাথে, যিনি আজকের দিনে ওই এলাকায় দুজন মাত্র প্রকাশকের একজন। তাঁর নাম মহেশ গুপ্ত, তাঁর সংস্থার নাম মহেশ লাইব্রেরী। ছোট্ট দোকানটা, বাইরে একটা হোরডিং পর্যন্ত নেই - হয়তো অনেকে গিয়ে খুঁজেও পাবেন না। মহেশবাবুর সাথে প্রথম আলাপ হওয়ার পরে উঠবো উঠবো করছি, তখন তিনি বললেন, “আমি কিন্তু বাঙালি নই। আপনি বুঝতে পেরেছেন?”

কথায় একটা টান ছিল ঠিকই, কিন্তু সেরকম টান অনেকেরই থাকে। ঝরঝরে বাংলা বলেন, বাংলা বইয়ের ব্যবসা করছেন তিন পুরুষ, তিনি যে বাঙালি নন, এটা একেবারেই বুঝতে পারিনি। স্বীকার করতে বাধ্য হলাম, বুঝতে পারিনি।

মহেশবাবু হেসে বলেছিলেন সেইবার, “আমার পদবী অগ্রওয়াল। ব্যবসার সূত্রে গুপ্ত ব্যবহার করি। আমরা মাড়ওয়ারি, মাছ-মাংস খাইনা।”

অবাক হয়েছিলাম, যদিও বইপাড়ার ইতিহাস মাথায় রাখলে সেটা হওয়ার কোন কারণ নেই। তারপরে বেশ কয়েকবার ফিরে গিয়েছিলাম তাঁর কাছে, একটা ছোট সাক্ষাৎকারও নিয়েছিলাম। পাঠকদের জন্য সেটাই তুলে রাখলাম পরবর্তী অংশে।

***

আপনি আগের দিন বলেছিলেন যে আপনার এই ব্যবসা তিন পুরুষ ধরে চলছে। তো আগের দিন যে কথাগুলো আপনি বললেন সেগুলোই আপনার মুখ থেকে এখন আরেকবার শুনবো।

মহেশ গুপ্তঃ হ্যাঁ, আমাদের ব্যবসা তিন পুরুষের। তিন পুরুষ বলতে আমার ঠাকুরদা, বাবা, আর আমি। আমার ঠাকুরদার নাম রাম স্বরূপ অগ্রওয়াল। ব্যবসার জন্য ব্যবহার করতেন রাম স্বরূপ গুপ্ত, কারণ গুপ্তটা একটু বাঙালি-বাঙালি মনে হয়, আর অগ্রওয়াল হচ্ছে নন-বেঙ্গলি। আমার বাবার নাম কৃষ্ণচন্দ্র অগ্রওয়াল, ব্যবহার করতেন কৃষ্ণচন্দ্র গুপ্ত। আমার নাম মহেশচন্দ্র অগ্রওয়াল, ব্যবহার করি মহেশচন্দ্র গুপ্ত। আমাদের বইতে প্রকাশন সংস্থার আগে দেখবেন আগে ওপরে লেখা থাকে মহেশচন্দ্র গুপ্ত, তারপর মহেশ পাবলিকেশন।

আগে আমাদের এই প্রতিষ্ঠানটা জেনারেল লাইব্রেরী নামে পরিচিত ছিল। তখন এইটা [অর্থাৎ চিৎপুরের দোকানটা] ছিল আমাদের হেড অফিস আর ক্যানিং স্ট্রীটে ছিল আমাদের ব্রাঞ্চ অফিস। তখন আমাদের ব্যবসা খুব রমরমিয়ে ভালোভাবে চলতো। আর পাশ্চাত্য কালে, আমার যত দূর মনে হয় ১৯৭১এ, আমার বাবা আর কাকার মধ্যে পার্টিশনের জন্য ওই ঝগড়াঝাটির কারণে আমাদের জেনারেল লাইব্রেরীর ব্যবসা ৯ বছর বন্ধ ছিল। তারপর যখন সব সেটেলমেন্ট হয়ে গেল, তখন আমার কাকা পেলেন ক্যানিং স্ট্রীটের অফিসটা আর আমার বাবা এই অফিসটা পেলেন। তখন এই এরিয়াতে প্রায় ২২-২৩টা বইয়ের দোকান ছিল। একটা বইয়ের মার্কেটও ছিল। সেই মার্কেটটাকে এখানে বলা হত বটতলার বইয়ের বাজার। আমার বাবা আর কাকার মধ্যে তখন ঝগড়াঝাটির মধ্যে বাবা এখানে বসতেন এবং কলেজ স্ট্রীটে নিজের একটা বুকস্ট্যান্ড তৈরি করলেন, তার নাম দিলেন রাধা পুস্তকালয়। আর আমার কাকা ক্যানিং স্ট্রীটে একটা বইয়ের দোকান খুললেন, তার নাম দিলেন রাজেন্দ্র লাইব্রেরী। আমার বাবা বসতেন এইখানে, সেই বইয়ের বাজারটা ছিল, এই কারণে। তখনকার যুগে বইয়ের মুদ্রণশিল্প যেরকম ছিল, সেই হিসেবে আমাদের বইয়ের প্রচ্ছদ বা মুদ্রায়ন করানো হত। পরবর্তী কালে আমরা তিন ভাই আমার বাবাকে গিয়ে বললাম আমাদের স্বতন্ত্র ভাবে কিছু করবার সুযোগ দিতে। তখন তিনি আমাদের তিন ভাইদের বললেন যে আমাদের ইচ্ছে মতন ওনার প্রপার্টি ভাগ চয়েস করে নিতে। তখন আমার দাদা তাঁর নিজের পছন্দের মতন আমাদের লেটার প্রিন্টিং ইউনিটটা বেছে নিলেন। আমার ভাইও নিজের পছন্দের আরেকটা ইউনিট বেছে নিলেন। আর যেটা বাকি রইল সেটা নিলাম আমি। মানে এইটা… তাই আমি এই ব্যবসাটা পাই ১৯৮১ সালে।

তখন বোধহয় লেটার প্রিন্টিং ইউনিট খুব চলতো? এখন বোধহয় চালানোটা মুশকিল, তাই না?

মহেশ গুপ্তঃ হ্যাঁ তখন তো ওটা চলতো। মুশকিল ঠিক না, এখন মার্কেটে ব্যাপারটা আরো অনেক সহজ। তখনকার দিনে এই হত, তখন তো আসলে বাজারে এত কম্পিটিশন ছিলনা। আমরা যা ছাপতাম, তাই বিক্রি হত। আর তাছাড়া আমরা মার্কেটেও প্রিন্ট করতে পাঠাতাম, কারণ আমাদের প্রিন্টিং প্রেস ছিল কিন্তু আমাদের তাও আমাদের যা ছিল তাতে আমাদের যে ছাপা হত সেসব কুলাতো না। তারপর আমার বাবা আমাকে বললেন যে জেনেরাল লাইব্রেরীটা বাবা আর কাকার [সমস্যার] মধ্যে যে ৯ বছর বন্ধ ছিল, তখন যেই স্টকগুলো বিক্রি হয়নি সেগুলোর একটা লিস্ট করে আমাকে নিতে বললেন আমার দোকানের জন্য। আর বলেছিলেন যে রাধা পুস্তকালয়ের একটা বইও তোমাকে দেবনা। তখন আমি সেই লিস্ট দেখে চয়েস করে বই নিয়ে নিলাম ওই স্টক থেকে। কিন্তু পরবর্তী কালে দেখা গেল যে বাজারে তখন ওইসব বইগুলোর দাম অ্যাপ্রিসিয়েট ছিলনা। কিন্তু তখন আর কী করা যাবে… যেই স্টকগুলো পেয়েছি সেগুলোকে তো ক্লিয়ার করতে হবে। আর রাধা পুস্তকালয়তে থাকার সময় আমার একটা লাভ হয়েছিল। অনেক বিখ্যাত নামকরা মুদ্রণশিল্পী এবং প্রচ্ছদকারদের সঙ্গে আলাপ-পরিচয় হয়েছিল আমার। আমি তাঁদের সঙ্গে আবার যোগাযোগ করলাম, তখন শৈলেন পাল, উনি মিথোলজিকালের দিকটা [দেখলেন], তারপর নারায়ন দেবনাথ, কমিক্সের জন্য বিখ্যাত, ওই ডিটেক্টিভ কমিক্স আরও অনেক রকম কিছু, আর তারপরে সত্যেন চক্রবর্তী, উনিও খুব নামকরা এবং আরও অনেক নামকরা মুদ্রণশিল্পীরা আমার সাথে কথা বললেন। তারপর আমি যার যা কাজ সেই বুঝে তাঁদেরকে দায়িত্ব দিলাম। তারপর এভাবে যখন আমার জেনেরাল লাইব্রেরীর স্টকের ওই বইগুলোর নতুন করে প্রচ্ছদ করে মুদ্র্যায়ন করিয়ে যখন বাজারে ফেললাম তখন দেখলাম যে মার্কেট নিচ্ছে ওগুলো। আর কলেজ স্ট্রীটে আমার মার্কেট চেনা ছিল। তাদের কাছেও গেলাম। তারপর আস্তে আস্তে আমার বই বাজার নিতে লাগলো। কিন্তু আমার সাপ্লাই শুধু এই লোকাল মার্কেটে। তার বাইরে আমি একটা বইও সাপ্লাই করিনি। আর একটা ব্যাপার, আমি দেখলাম যে কিছু বই আমি নিজের মতন শিল্পীদের দিয়ে নতুন করে প্রচ্ছদ এবং মুদ্র্যায়ন করিয়ে বাজারে ছাড়তে মার্কেট সেগুলো গ্রহণ করলো।

আচ্ছা…

মহেশ গুপ্তঃ এই যেমন ধরুন বইয়ের ল্যামিনেশন। সে অনেক কাল আগেকার কথা। আমার সন মনে নেই। আমার বাবা শেয়ার বাজার, মানে শেয়ারের ব্যবসার অনেক কাজ করতেন। তো তখন যখন শেয়ারের ব্যালেন্স শিট আসত বাড়িতে তখন দেখতাম ওগুলোর ওপর ল্যামিনেশন করানো আছে। এবার তখন তো জানতাম না আর ল্যামিনেশন বলে ওটাকে। আমরা বলতাম ভারনিশ। বইয়ের ওপর ভারনিশিং করা আছে। কিন্তু দেখলাম ব্যালেন্স শিটের ওপর এটা তো ঠিক ভারনিশ নয়। তখন আমি কলকাতাতে গিয়ে খোঁজ করে জানলাম যে ওটা হচ্ছে ল্যামিনেশন। সেটা আমি আমার বইয়ের উপর করতে শুরু করলাম। দেখলাম বাজার সেটা নিল। আর আমার মনে কোন পাপ নেই, আমাকে তখন যে যা জিজ্ঞেস করলো, আমি সবাইকে বলে দিলাম। আর এখন তো সব বইয়ে ল্যামিনেশন হয়।

আচ্ছা তাহলে ওটা খুব চলল?

মহেশ গুপ্তঃ এখন তো ল্যামিনেশন ছাড়া বই ভাবাই যায়না।

জেনারেল লাইব্রেরী ঠিক কবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল?

মহেশ গুপ্তঃ জেনেরাল লাইব্রেরী শুরু করেন আমার দাদু। এবার কবে সেটা, সন ঠিক আমার মনে নেই। ওই ১৯৬৬এ আমি যখন ক্লাস ইলেভেনে পড়তাম, বা হয়তো ক্লাস টেন হবে, তখন আমি এখানে এসে বসতাম। আর তার আগে এই ব্যবসা শুরু করেন আমার দাদু, বোধহয় সেই ১৯৩২ সালে শুরু করেন প্রথম। ওই মানে ডায়মন্ড লাইব্রেরীর সঙ্গেই প্রায়।

অর্থাৎ স্বাধীনতার অনেক আগে। আপনার দাদু হঠাৎ বাংলা বইয়ের ব্যবসা শুরু করেন কেন?

মহেশ গুপ্তঃ দেখুন সেটা আসলে আমরা কোনদিন জিজ্ঞেস করিনি। তবে আমার যতটা মনে হয়, আমি যা শুনেছি, আমরা আসলে আগে ইউপিতে বসবাস করতাম। ইউপির বাসিন্দা ছিলাম আমরা। তারপর আমার দাদু কলকাতাতে এসে অন্য একটা ব্যবসা শুরু করেন। আর তখন এখানে একটা বইয়ের দোকান ছিল, সাধারন পুস্তকালয় নামে। সেটা তখন ওই দোকানের লোকেরা চালাতে পারছিলেন না বলে আমার দাদু তাঁদের কাছ থেকে কিনে নিয়ে নতুন করে নাম রাখেন জেনারেল লাইব্রেরী।

আচ্ছা, আপনি বললেন যে এই জায়গাটাতে আগে আরও অনেক দোকান ছিল…

মহেশ গুপ্তঃ প্রায় ২২-২৩ খানা দোকান ছিল।

প্রায় ২২-২৩ খানা দোকান! তো সেগুলোর এখন কী হল? এখন তো সেই দোকানগুলো আর নেই… তারা কি আর চালাতে পারল না?

মহেশ গুপ্তঃ না সেগুলো এখন আর নেই তার কারণ হচ্ছে যে পরবর্তী কালে কলেজ স্ট্রীটে অনেক দোকান হয়ে গেল বইয়ের… তখন মানুষের কাছে বই পাওয়াটা আরও ইজি হয়ে গেল কলেজ স্ট্রীট থেকে কেনার জন্য, হাওড়া বা শেয়ালদার থেকে। তারপর এখানে যারা ছিল, যে সব বইয়ের দোকান ছিল, তাদের জন্য এই কারণে কম্পিটিশনটাও অনেক বেড়ে গেল। অনেকে আবার এখানে ব্যবসা বন্ধ করে দিলেন কারণ তাঁদের ব্যবসা চালানোর জন্য আর কেউ ছিলনা। অনেকে কলেজ স্ট্রীটে ট্রান্সফার হয়ে গেলেন। ক্যানিং স্ট্রীটেও অনেকে চলে গেলেন।

আপনাদেরও কি ক্যানিং স্ট্রীটের কোন দোকান আছে?

মহেশ গুপ্তঃ না, আমাদের ক্যানিং স্ট্রীটে দোকান নেই। ক্যানিং স্ট্রীটে আমাদের কাকার দোকান ছিল। কিন্তু কাকার দুই ছেলে মারা যাওয়ায় সেটা এখন তাদের স্ত্রী চালায়। ক্যানিং স্ট্রীটে আসলে অন্য রকমের বই। আবার কলেজ স্ট্রীটেও অন্য রকম।

কলেজ স্ট্রীটে পড়ার বই, গল্পের বই, এগুলো কিনতে যাই। আপনার স্টকে দেখছি ধর্মীয় বই অনেক।

মহেশ গুপ্তঃ আমার এখানে আমি রাখি অ্যাস্ট্রলজি বুকস, তারপর কুকিং বুকস, তারপর মিথোলজি বুকস রাখি। তারপর আরও কিছু টুকিটাকি বই রাখি। তবে আমি সিলেবাসের কিছু বই রাখিনা। আমার সব আউট অফ সিলেবাস বুকস, মানে পড়ার বই ছাড়া অন্য বই। তবে আমি এই ব্যবসাটা এখন করি এমনি ইচ্ছের জন্য, নিজের শরীরকে ফিট রাখতে।

***

এরপরে আরও অনেকবার কথা হয়েছে মহেশবাবুর সাথে, মুদ্রণ শিল্পের বিবর্তন আর চিৎপুরের বইপাড়া নিয়ে। লেটারপ্রেস প্রিন্টিং নিয়ে কথা বলবার সময় একটা বই উপহার পেয়েছিলাম - ছোট্ট চটি বই, পকেটে ধরে যাবে। বইটার নাম? শ্রী শ্রী লক্ষ্মীর পাঁচালি। ব্রতকথা, পাঁচালি, বাসর সঙ্গীত, রামায়ণ-মহাভারত-পুরাণ - এই বইগুলোই এককালে বটতলায় রমরম করে চলতো, মূল পাঠক ছিলেন মেয়েরা, ও স্বল্পশিক্ষিত নিম্নবিত্ত (অনেক অংশেই নিম্ন বর্ণও) পুরুষেরা। মহেশ গুপ্তর বইয়ের তালিকা দেখে মনে হয়েছিল সেটা তেমন বদলায়নি আজও - হয়তো বা কম্পোজিটরি শিক্ষার বইয়ের বদলে রাখা রয়েছে দ্রুত ইংরেজি শেখবার বই, অথবা বাংলায় জ্যোতিষের বইয়ের সাথে সাথে টাইমশ অফ ইন্ডিয়া খ্যাত বেজন দারুওয়ালার হরোস্কোপের দু-একটা চটি বইও এসে উপস্থিত হয়েছে।

১৯২৩ সালে এই কলকাতা শহরের বড়বাজার অঞ্চলেই - চিৎপুর রোড থেকে তেমন দূরে নয় - এমন একটি ছাপাখানার যাত্রা শুরু হয় যার সাথে আজকের দিনের হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তানের রাজনীতি অঙ্গাঙ্গি ভাবে জড়িত। সেই ছাপাখানার নাম গীতা প্রেস। তার প্রধান কার্যালয় আজকে উত্তর প্রদেশের গোরখপুরে হলেও বড়বাজারের ঐতিহাসিক গোবিন্দ ভবনে গীতা প্রেসের কলকাতা কার্যালয় আজও সসম্মানে বিরাজমান।

গীতা প্রেসের স্থাপনা করেন জয়দয়াল গোয়েন্দকা নামক বাঁকুড়া-নিবাসী এক ব্যবসায়ী। ব্যবসা সূত্রে গোয়েন্দকাকে বহু জায়গায় ঘুরে বেড়াতে হত, যদিও তিনি আস্তে আস্তে ব্যবসায় উৎসাহ হারাচ্ছিলেন। তাঁর মন পরে থাকতো গীতা চর্চায়, এবং শেষ পর্যন্ত তিনি ও তাঁর সমমনস্ক অনেকে কলকাতায় নানা মানুষের বাসস্থানে, তারপরে ইডেন গার্ডেনসের কাছে একটা ফাঁকা জায়গায়, এবং অবশেষে বড়বাজার অঞ্চলে একটি বাড়ি ভাড়া নিয়ে গীতা আলোচনা শুরু করলেন। এই বাড়িটির নাম দেন তাঁরা গোবিন্দ ভবন।

গোয়েন্দকার গীতার ব্যাখা ক্রমশ সে সময়ের কলকাতায় জনপ্রিয় হয়ে উঠছিল, কিন্তু তাঁরা নিজেদের পছন্দসই গীতার অনুবাদ কিছুতেই না পেয়ে শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নেন যে অনুবাদের ব্যবস্থা তাঁদেরই করতে হবে। সেই মতন বরাত দেওয়া হয় বণিক প্রেসের কাছে, ছাপা হয় অনুবাদের ১১,০০০ কপি। কিন্তু সেই অনুবাদটিও তাঁদের তেমন পছন্দ হয়নি, পছন্দ হয়নি ছাপার মানও। এরপরে তাঁরা সিদ্ধান্ত নেন যে তাঁরা নিজেরাই একটা ছাপাখানা খুলবেন। গোরখপুর নিবাসী ব্যবসায়ী ঘনশ্যামদাস জালানের প্রস্তাব অনুযায়ী জালান ও তাঁর অংশীদার, হনুমানপ্রসাদ পোদ্দার, এই প্রেস চালানোর দায়িত্ব নেন। নাম হয় গীতা প্রেস। ১৯২৩ সালের এপ্রিল মাসের মধ্যে টিপ্পনী সহ গীতার একটি হিন্দি অনুবাদ প্রস্তুত হয়ে কলকাতায় পৌঁছে যায়। হনুমানপ্রসাদ পোদ্দার এর পরে কল্যাণ পত্রিকা ও গীতা প্রেসের প্রাণপুরুষ হয়ে ওঠেন। কুড়ির দশক থেকেই পোদ্দার গো রক্ষা আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতেন। তাঁর সমর্থনে ছিলেন প্রভুদত্ত ব্রহ্মচারীর মতন প্রভাবশালী সাধুরা, বেশ কিছু সনাতন ধর্ম সংগঠন, হিন্দু মহাসভা, রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ (এবং তারপর ভারতীয় জন সঙ্ঘ), জাতীয় কংগ্রেসের কিছু গুরুত্বপূর্ণ নেতা যেমন শেঠ গোবিন্দ দাস আর জগৎ নারায়ণ লাল (ইনি আগে হিন্দু মহাসভার সদস্য ছিলেন, পরে বিহার থেকে কংগ্রেসের হয়ে ভোটেও দাঁড়ান), এ ছাড়াও আরও অনেকে।

গীতা প্রেসের ইতিহাসের সম্পূর্ণ আলোচনা নেহাতই এই লেখার পরিসরের বাইরে, আর তাঁদের ন্যায় বৃহদায়তন সর্বভারতীয় প্রতিষ্ঠানের সাথে মহেশ লাইব্রেরীর মতন একান্তভাবেই সেকেলে মুদ্রণ ব্যবসায়ীর তুলনা করাটাও নেহাতই অন্যায়, তাও রবীন্দ্র সরণি ধরে হাঁটতে হাঁটতে ওরিয়েন্টাল সেমিনারি পার করে যাওয়ার পথে মনে বার বার তুলনাটা এসেই যাচ্ছিল। হিন্দি আগ্রাসনের যুগে হয়তো জয়দয়াল গোয়েন্দকা-হনুমান প্রসাদ পোদ্দাররাই জয়ী হন, আর তার উত্তরে টোটকা হিসেবে প্রস্তুত করতে হয় আরেক রকমের বলিষ্ঠ একভাষী সংস্কৃতি।


তথ্যসুত্রঃ

1) সিঙ্গাপুর বহুভাষী দেশ, এবং আধুনিক সংবিধান অনুযায়ী সিঙ্গাপুরের চারটে সরকারি ভাষা - ইংরেজি, মালয়, ম্যান্ডারিন, এবং তামিল। এর মধ্যে মালয় ভাষাকেই সিঙ্গাপুরের রাষ্ট্রীয় ভাষা হিসেবে গণ্য করা হয়, অন্তত প্রতীকী রূপে। ইংরেজ শাসনের আগে সিঙ্গাপুরের কথ্য ভাষাকে বলা হত 'বাজার মালয়', যা মূলত মালয় ও ম্যান্ডারিন ভাষার সংমিশ্রণে তৈরি। বিনয় ধারওয়াড়কর শ্রীরামপুর মিশন প্রেসে যে 'সিঙ্গাপুরি' ভাষায় ছাপা বইয়ের কথা উল্লেখ করেছেন, সেটা এই বাজার মালয় ভাষাই কি না, সেটা খোলসা করে বলেননি। এই লেখায় 'সিঙ্গাপুরি' শব্দর ব্যবহার তাঁর লেখাকে তথ্যসূত্র ধরেই করা হয়েছে।

2) Roshan Kishore - How a Bihari Lost His Mother Tongue to Hindi

3) Ulrike Stark - An Empire of Books: The Naval Kishore Press and the Diffusion of the Printed Word in Colonial India

4) Akshaya Mukul - Gita Press and the Making of Hindu India

5) Vinay Dharwadker - “Print Culture and Literary Markets in Colonial India”, in Masten, Stallybrass, and Vickers (ed) Langauge Machines



252 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

কোন বিভাগের লেখাঃ বুলবুলভাজা 
শেয়ার করুন


Avatar: দ

Re: মহেশ লাইব্রেরী

খুব ইন্টারেস্টিং।
Avatar: dd

Re: মহেশ লাইব্রেরী

হ্যাঁ, ভেরী ইন্টেরেস্টিং।
Avatar: সৌমিত্রা

Re: মহেশ লাইব্রেরী

রুদ্ধশ্বাসে পড়লাম, আরো লিখুন প্লীজ।

Avatar: prativa

Re: মহেশ লাইব্রেরী

darun to !
Avatar: মধুবন্তী ভুঁই

Re: মহেশ লাইব্রেরী

দরকারী লেখা। তথ্যবহুল এবং চমকপ্রদ।
Avatar: সিকি

Re: মহেশ লাইব্রেরী

বাঃ।
Avatar: অরুণাভ বিশ্বাস

Re: মহেশ লাইব্রেরী

খুব ভালো লেখা। একটা কৌতূহল রয়েছে, পঞ্চানন কর্মকারের কোনো ছবির পাওয়া যায় কি?
Avatar: স্বাতী

Re: মহেশ লাইব্রেরী

না। কিছু রিপ্রেজেন্টেটিভ ছবি ব্যবহার করা হয় দেখেছি, কিন্তু সেটার সাথে তাঁর সাদৃশ্য আছে কিনা জানা নেই।
Avatar: সৌরভ শাব্দিক

Re: মহেশ লাইব্রেরী

বেশ একটা পুরোনো দিনের লেটার প্রেসের কালির গন্ধমাখা লেখা পড়লাম। বেশ তথ্যবহুল এবং টাইম-ট্রাভেলিঙের স্বাদ পাওয়া গেল।
মনে পড়ছে আমাদের পাড়ার প্রেসের সেই দিদির কথা, যিনি চিমটি দিয়ে হরফ খুঁজে বানান সাজাতেন, ডিজিট্যাল যুগ আসার পরে তিনি এখন সেই বিবর্তিত ছাপাখানার ক্যান্টিন চালান।
Avatar: সৌরভ শাব্দিক

Re: মহেশ লাইব্রেরী

বেশ একটা পুরোনো দিনের লেটার প্রেসের কালির গন্ধমাখা লেখা পড়লাম। বেশ তথ্যবহুল এবং টাইম-ট্রাভেলিঙের স্বাদ পাওয়া গেল।
মনে পড়ছে আমাদের পাড়ার প্রেসের সেই দিদির কথা, যিনি চিমটি দিয়ে হরফ খুঁজে বানান সাজাতেন, ডিজিট্যাল যুগ আসার পরে তিনি এখন সেই বিবর্তিত ছাপাখানার ক্যান্টিন চালান।
Avatar: খ

Re: মহেশ লাইব্রেরী

- লেখাটা খুব সুন্দর লেগেছে। প্রাবন্ধিক কে আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা ।
- একটা কথা মনে হচ্ছে, এমন নয় যে এই লেখাটার বেলায় এই কথাটা মনে হয়েছে ,অনেক সময়েই মনে হয়। ইন ফ্যাক্ট এবার বেশ কম মনে হল । তবু বলা দরকার। প্রতিটি মিডিয়ার ই সম্ভবত একদল নতুন অডিয়েন্স তৈরী হয় , এটা হয়তো সময়ের ব্যাপার। তারা উপস্থাপিত বিষয় গুলির যে গবেষণার ঐতিহ্য রয়েছে সেটার খবর রাখেন না, বা শেয়ার করা/আলোচনা করার প্রয়োজন আছে বলে মনে করেন না, তাই প্রতিক্রিয়া অনেক সময়েই স্রেফ শিশুদের বুক অফ নলেজ হাতে নেওয়ার মত হয়ে যায়, প্রাবন্ধিকএরাও এই আশংকায় হয়তো লোকশিক্ষার মত করেই লিখতে থাকেন। (এ মানে উদা pochur, এখানেই) অথচ ছোট / ইন্ডিপেন্ডেন্ট জার্নাল এর উচ্চতম স্তরের গবেষণায় /আলোচনায় সরাসরি অংশ গ্রহণ করার অবকাশ রয়েছে। আমি অন্তত এই মানসিকতা থেকেই পোস্ট করার চেশটা করি। আওয়াজ খেলেও :-)
- আমাদের কলোনিয়াল শহর গুলি র একটা স্বল্পালোচিত দিক হল, এর যেটা সামাজিক ডাইভারিসিটি, , সিনক্রেটিক হোক বা না হোক, সেটার বিকাশ পরম করুণাময়ের বিচিত্র লীলায় [;-)] পরাধীনতার আমলে বেশি, এবং স্বাধীনতা উত্তর নাগরিক সামাজিক বিন্যাসের ইতিহাস মূলত: একটা একরোখা মূলত বর্ন হিন্দু ভাষা সংখ্যাগুরুর জেন্ট্রিফিকেশানএর ইতিহাস। এ কথাটা পো স্ট কলোনিয়াল তাত্ত্বিকেরা সব সময়েমনে রাখেন না। বড়ো অং শের পাঠক রা তো রাখেন ই না। কলকাতায় বাঙ লা ই`মরেজি ছাড়া আর কোনো ভাষার চর্চা হয়েছে স্থানীয় মুদ্রণ সংsকৃতি তে তার ছাপ কম। চি`তপুর ছাপাখানা সংক্রান্ত গৌতম ভদ্র র 'ন্যাড়া বেলতলা ইত্যাদি' বইটির এটা একটা সমস্যা। এই প্রবন্ধ টি আগ্রহী পাঠক কে অন্য ভাষার কলকেতে চর্চার খোঁ জে উদ্বুদ্ধ করতে পারে। বেশ অনেক দিন আগে সংস্কৃত প্রকাশকের দোকান থেকে কৃশি পরাশর এর অনুবাদ খুঁজে পাওয়ার উত্তেজনা আমি ভুলতে পারি না, অথচ লভ্য কিছু না, আমরা খবর ই কত কm রাখি। স্বাধীনতা পরবর্তী হিন্দী কাগজের গতি প্রকৃতি নিয়ে কটা পবন্দ আমরা পড়েছি।
- লোকজন শরৎ`তচন্দ্রের জীবনীকার বিশনু প্রভাকর এর লেখাও লোকে পড়তে পারেন। একটা দিক খুলে যেতে বাধ্য। আমি অফ অল প্লেসেস ভাগলপুরের একটা লাইব্রেরী তে এ`নাকে পড়েছিলাম। খ

Avatar: খ

Re: মহেশ লাইব্রেরী

*অলভ্য
Avatar: pritha

Re: মহেশ লাইব্রেরী

অনেক অজানা তথ্য জানা হলো


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন