বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

সুমন মান্নার কবিতা

সুমন মান্না



যেমন শীতের বেলা ফেটে যায়
আর লালচে হলুদ কুসুম তোমার আঙিনায়
গড়ান মাত্র ছায়া এসে ঢেকে যায় তাকে।

সারাদিন আয়োজনে কাটে।
পৌঁছতে পৌঁছতে হয়রানি কত!
আচমকা পাখিরা দেখ আমাদের মতো
দেখা হতে একসঙ্গে বলে ফেলে সব।

বেলা ফাটা শীতকাল। শোধবোধ যত কলরব।




অকারণে পাখি ওড়ে নাকি?

খাদ্য সম্ভাবনা হীন আকাশে অনেক মেঘ
একসঙ্গে জমা হলে দেখেছি-
একসঙ্গে প্রচুর চিল আকাশের মাঠে নামে,
গোল হয়ে ঘোরে
কেউ কেউ অনেক উঁচুতে গিয়ে ছোট হয়ে গেল
বৃষ্টি আসবে হয়ত এক্ষুণি, হাওয়া কম
তবু অনেকেই স্বচ্ছন্দে,
নেহাৎ আনাড়ি যারা তারা ডানা ঝাপটাচ্ছিল।

মাঝে মাঝে এরকম মেঘ করে এলে
অকারণে অনেকেরই একসঙ্গে ওড়াউড়ি করা ভাল।
অফিসের দিকে যেতে যেতে আচমক আকাশ দেখে
খুঁটে খাওয়া মানুষের এইসব মনে হচ্ছিল।



ফুলের দোকানে

ফুলের দোকানে বিকেলের পর থেকে
বড় দ্রুত রাত নেমে আসে,
রাস্তার ধারে বাজারের বাইরে
সন্ধের পর ফুলের গন্ধ অদৃশ্য মেঘের মতো ভাসে।

হয়ত সেদিন সত্যিকার মেঘ, সন্ধ্যার আকাশ সিঁদুর
বড় বড় ফোঁটায় চড়বড় করে শুরু হল বলে।

একে একে জুঁইমালা, বেলফুল সর্বস্ব আলো করে ফোটে
বাজারে লোকজন কম,
দুর্যোগে কে আবার ফুল কিনে ঝঞ্ঝাট বাড়ায়?
অত্যাধিক ফুলের গন্ধে বড় দ্রুত রাত নামে
আতঙ্ক বাড়ায়।



এখন সরব নয় গাছের পাতারা আর
সামান্য বর্ষায় ঝোলে ঝালে অম্বলে
দিনযাপনের পর মনে কিছু নেই তার
ঠিক কোন কথাগুলি ভেসে গেল জলে?

এখন কয়েকদিন ধরে বাসাগুলো সারাবে
পাখিরা ফের গুটি গুটি কুটোকাঠি জুড়ে
বর্ষার শেষে পিঁপড়েরা অফিসে বেরোবে
নতুন পাতারা স্কুলে এল আগমনী সুরে।

বর্ষার জলে গাছের অন্তর কেঁপে ওঠে
এখন সহজ রস শিরায় শিরায় ছমছমে
হয়ত শব্দ পায়, উচ্চারিত অদৃশ্য ঠোঁটে
শ্যাওলার কাঁথা পেতে ধরে যত জল জমে।

প্রতি বর্ষায় গাছ আয়ু থেকে বেড়েছে বয়েসে
যতখানি হারিয়েছে, তত বেশি জল ভালবাসে।



আজকের মেঘ থেকে অবশেষে বৃষ্টি পাওয়া গেল
কিছু একটা মনে করে তাকে দেওয়ালে বসাই, বলি
“এ কী রঙ্গ-রসিকতা সাত- সকালে অফিসের দিনে?”
তাই বুঝি ক্ষেপে গিয়ে আজ সারাদিন ভাসিয়েছে
যানজট নেমে এসেছিল তাই দ্রুত পথ চিনে।

তবে লাভ থাকে কিছু দিনশেষে
সামান্য খিচুড়ি ভোগ, উপশম তাপপ্রবাহ থেকে
রবীন্দ্রসংগীত শোনা হ’ল ব্যাঙ ডাকা সন্ধ্যার আবহে।

ওদিকে অনেক দূরে মেঘ পৌঁছয় নি এখন
এখন প্রখর তাপে ঘাসগুলি বাদামী হয়েছে-

ভাবি ফের হাল ধরি নড়বড়ে নৌকায়
অতিরিক্ত মেঘ টেনে টেনে
যেই শুনি জোনাকি আমাকে তার বাগানে ডেকেছে।



চারপাশে ছাতওলা ঘর, মাঝে উঠোন
বাড়িতে বিয়ে লাগলে ছাতে প্যাণ্ডেল
সারা বাড়ি মেঘলা হয়ে যায় -

সেই থেকে মেঘ করে তাহলেই মনে হয় -
মৌ-গ্রাম থেকে বড় পিসিরা এসেছে
মামারবাড়ির ওরা পলাশী থেকে
বিকেলের ট্রেনে এল।
কৃষ্ণনগর বর্ধমান শান্তিপুরের আত্নীয়রাও
কিছু পরে পৌঁছবে।

উৎসবের একদিন আগে সারা বাড়ি তোলপাড়
দুর্দান্ত রান্না করছেন নতুন ঠাকুর
আজ থেকে ভিয়েন বসল, সারারাত চলবে-

এ বৃষ্টিও টুপটাপ, ঝমঝমে ক্ষণে ক্ষণে
কতদিন পরে এসে পৌছল, দেশ গাঁ’র গল্প বলবে।



রাস্তার মাঝে গর্ত ভরা ওই সামান্য জল
জেগে থাকছে সারারাত্তির চাঁদের চেরীফল
যাবেই দেখা শুনছিল সে আজন্মকাল ধরে
শেষ অবধি জুটল শুধু মেঘের চলাচল।

কোথাও বুঝি ভুল ছিল তার বিচ্যুতি এককণা
দিন দুয়েকের জীবনকালে একটি চন্দ্রকণা
লাল হয়েছে - এর চেয়ে বেশি চোদ্দগুষ্টি কালে
আর হয়নি। তাও সে জানে কক্ষণও পাবে না।



একটা সময়ে একা দেওয়ালের তফাৎ ছিল।
সে দেওয়াল বড় হ’লে মাঝখানে ঘরবাড়ি ওঠে
অর্থাৎ রাস্তাঘাট, বাস ট্রাম যানজট,
লোকলস্কর দাবি সেলসম্যানের ভিড় এসে জোটে।

শহর ক্লান্ত হয়ে বাইরে এসে দেখে, বিকেলের দিকে
দেখে টেলিগ্রাফের তারে বসা ফিঙে। ক্রমে রাত বাড়ে।
ট্রেনলাইনের দু-পার অপার জ্যোৎস্নায় ভেসে যাওয়া
ধানক্ষেত, মাঝেমধ্যে গাড়ি চলাচল পথে
একজোড়া আলো চলে ফিরে এসে থামে লেভেল-ক্রসিঙে।

এইভাবে বেড়েই চলে তফাতেরা ক্রমশ
মাঝেমধ্যে তেষ্টায় সারারাত কাটে।
ক্যামেরার চোখ মুখ নাকে
ঝোড়ো হাওয়া লাগে, উর্দ্ধমুখ, চেরিফল চাঁদ চেয়ে চেয়ে,
মেঘেরাও সব জানে। তফাতে রেখেছে যত্নে
তোমাকে আমাকে।

১০

ওয়ান শটার

একবারে একটা কার্তুজ
একবারই নিশানা সন্ধান
কোনওমতে ভুলচুক হ’লে
পয়মাল যত মাল জান।

তাই পাপ কখনও করিনি
রাখিনি জলের গ্লাসে গ্লানি
একবারই হাতে চাঁদ পাব
দেখব লালিমা কতখানি-
কতদিন একা এক ভাবি
যশোলাভ হাজার শিরোপা
সাক্ষাৎকার দেব হেসে
ছোট মুখে বড় বড় চোপা-
দেখে বড় চোয়াল ঝুলবে
পড়শী ঈর্ষাহত যত
টিভিতে কত কি বলবে
এখন সময় সমগত।

এ পৃথিবী একটু হেসেছে
তাই শুধু মেঘ করে যায়
মহাভারতের এই দেশে
কর্ণেরও চাকা আটকায়।

১১

বোলতা

সারা গায়ে বোলতা বসে আছে সবারই
যে কোনও একটা কামড়ালেই অনিবার্য যবনিকা।
তার মধ্যেই চলা ফেরা, মাঝে মধ্যে নাচে, মাল খায়।
আয়নায় চোখ পড়লে আস্তে আস্তে একা-
মানুষ নিজেকে বোধ হয় মুক্ত করতে চায়।

ডালে ডালে পাতায় পাতায় দু-একটা পালায়
অন্য কেউ আড়াল থেকে বসে পড়ে
বোলতারা নাছোড়। মানুষও। দুপক্ষই লড়ে।

কারও কম আছে দেখে অন্যরা তার
কাছাকাছি বোলতার ঝাঁক ভেঙে দেয়
কারও বেশি থাকলে, সামান্য আহাউহু করে
বার বন্ধ হয়ে যাবে বলে দৌড়ে পালায়।

এইভাবে চলে -
মানুষ বোলতা পরিবৃত, সে যা চায় সেইমতো
বোলতা খোঁটে, নাচে, গায়, সেই কথা বলে।

১২

আমার ভীষণ ভয়
আয়ু থেকে এক একটা পাথর আস্তে আস্তে
আলগা হতে হতে বয়স হয়ে যায় -
একদিক হেলে পড়ে যেন।
ভয় করে হাওয়া দিলে, ঘুম এলে, অথবা না এলে
সেই সব জ্যোৎস্নায় তুমি আবার স্বপ্নে অনন্তক্ষণ।

খিদে পেলে ভয়, ক্ষুধামান্দ্যে ভয়,
ইচ্ছে মাফিক খেতে গিয়ে ভয় খেয়ে চলি
এগোতে ভয় পিছোতে ভয়, ভয় থেমে যেতে,
তার বেগ বাড়ে, বহরেও বেড়েছে দেখেছি
পিছু নেই। একটা দূরত্ব থেকে সে আমাকেই দেখে
হয়ত আমাকে নয়, যা আমি আঁকড়ে থাকি
তাই কেড়ে নিতে চায়। অপেক্ষা করে -
কখন আমি জলে নেমে যাব, সব পাড়ে ফেলে রেখে।

১৩

রাস্তায় দেখলাম জলের পকেট থেকে চাঁদ উঁকি মারে
এমন রাগ হল, বলেই ফেলেছি -
কীসের এত পিরীত তোদের হ্যাঁ?
কোথায় গ্রহণ দেখব বলে সারারাত জেগেছি বারান্দায়
মশা খেল, ব্যাঙ ডেকে গেল, আর এদিকে, আক্কেলহীন
মেঘের ছেঁড়া কাঁথা আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে থাকলি?
একবারও দেখতে দিলি না- আজ কোত্থাও কিছু নেই
তবু রাস্তার নোংরা জলে পড়ে আছিস মাতালের মতো
ওই ভালো, তোর মুখে কুকুরে পেচ্ছাপ করে যাক।

নির্লজ্জের মতো হাসে কিছু বলল না, বলবেই বা কি
বলার মুখ আছে কোনও? জানে ও কি ভালোবাসা মানে?
ইস্কুলে গেছে? পড়েছে প্রেমের কবিতাগুলি যা আমি
গত কয়েক প্রজন্ম ধরে লিখেই চলেছি?

যদিও নিজেরটুকুই জানি, যাকে ভালোবাসি
তার আগেপিছে চাঁদ ঢালি সসের বোতল খালি করে
লাল চাঁদ ছবি তুলে রাজকন্যার মন পেতে চাই-
তাই রাত জাগি। ওদিকে দেখেছি গ্রহণে রক্তাক্ত হলে
যার কাছে সে আশ্রয় নেয় তা বৃষ্টি হয়ে ঝরলে
তারই টানে মাটিতে পড়ে হাসে। তাকে ভালোবাসে।



48 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

কোন বিভাগের লেখাঃ বুলবুলভাজা  কাব্যি 
শেয়ার করুন


Avatar: kumu

Re: সুমন মান্নার কবিতা

বিস্ময়!!!

Avatar: কুশান

Re: সুমন মান্নার কবিতা

অসামান্য। প্রসঙ্গত, ফোনঘর থেকে ভাবনা ও ভাষায় এ কবিতাগুলি অনেকটাই ভিন্ন।


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন