বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

একটি গণধর্ষণ ও আদিবাসী আন্দোলন

প্রতিভা সরকার

আন্দোলন্ শুরু হয়েছিল এবছরে এপ্রিল মাসে । ঝাড়খন্ডের আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকায় এক অভূতপূর্ব আন্দোলন ~ পাথালগড়ি আন্দোলন । রাষ্ট্র ও সংবিধানকে অস্বীকার করার আন্দোলন ।

২০১৭ সালে বিজেপি যখন থেকে অরণ্যের ওপর আদিবাসীর অধিকারের শতাব্দী প্রাচীন আইন বদলাবার জন্য কোমর বাঁধল, কিন্তু বিরোধী দলগুলির মিলিত প্রতিবন্ধকতায় এখনই সেই আইনের কোন সংস্কার করতে পারল না , তখন থেকেই পাথালগড়ি আন্দোলনের ভাবনাচিন্তা। প্রায় একই সঙ্গে ২০০ আদিবাসী গ্রাম সামিল হয় এই বিদ্রোহে , আরও ছত্রিশ হাজার গ্রাম শীগগিরি যোগ দেবে বলে আন্দোলনকারীদের আশা ছিল ,কিন্তু তার আগেই নেমে এল অকথ্য দমনপীড়ন একটি গণধর্ষণকে কেন্দ্র করে । সেটায় বিস্তারিত যাবার আগে পাথলগড়ি নিয়ে আরও দু চার কথা ।

মুন্ডা জনজাতির মধ্যে এই প্রথা বহুল প্রচারিত যে কোন পূর্বজের মৃত্যু হলে তার সম্মানে পাথর পোঁতা হয় ভূমিগর্ভে। সম্প্রদায়ের মৃত গুরুজনদের সম্মান জানাবার এই প্রথা নতুন ভাবে ব্যবহার করল আদিবাসীরা । তারা গ্রামের সীমানায় পুঁতে দিল মস্ত মস্ত প্রস্তরখন্ড যাতে নিজেদের ভাষায় উতকীর্ণ রইল প্রাচীন বিধান । দিকু বা বহিরাগতের প্রবেশ সম্পূর্ণ বারণ হল । একমাত্র সার্বভৌম বলে স্বীকৃতি পেল গ্রামসভাগুলো । এগুলোতে খোদিত অবস্থায় শোভা পেতে লাগল ১৯৯৬ সালের পঞ্চায়েত আইনের ( Extension to Scheduled Areas ) নানা বিধান যেখানে স্বীকার করে নেওয়া হয়েছে যে গ্রামগুলি স্বয়ংসম্পূর্ণ এক একটি ইউনিট। বলা হয়েছে গ্রামসভা যা গঠিত হয় ইলেকশনে নয় , সিলেকশনে , গ্রামের ইউনিটে সেগুলোই সর্বেসর্বা।

এই নতুন আন্দোলনে আধার কার্ড ও ভোটার আইডিকে বর্জন করবার ডাক দেওয়া হল , বাইরের স্কুল কলেজ ,চাকরির প্রলোভন বর্জন করতে বলা হল আর সবচেয়ে বেশি জোর দেওয়া হল যে কথাটির ওপর তা হল আদিগন্ত জল জমিন জঙ্গলের অবিসংবাদিত মালিক ভূমিপুত্ররাই , আর কেউ এগুলির মালিকানা কখনো কেড়ে নিতে পারবে না । কোন বহিরাগত ( সরকারী কর্মচারীরাও ) গ্রামের ভেতর ঢুকলে , বাস করলে বা থেকে যাবার চেষ্টা করলে তা হবে ভীষণ অবাঞ্ছিত ।

এই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ার আগেই ঘটে গেল এক ভয়ংকর লজ্জাজনক ঘটনা । খুন্তী জেলার কোচাং গ্রাম, যা নাকি পাথালগড়ি আন্দোলনে আগেই যোগ দিয়েছিল, সেখানে একটি এনজিও এবং আর সি মিশন নামে চার্চের অধীনস্থ একটি প্রতিষ্ঠান থেকে মানুষ পাচার এবং মাইগ্রেশনের কুফল নিয়ে পথনাটিকায় ব্যস্ত ছিলেন পাঁচজন আদিবাসী মহিলা। নাটক শেষ হবার আগেই কিছু দুষ্কৃতি মোটরবাইকে এসে পুরুষ সহকর্মীদের সঙ্গে এই মহিলাদের মিশনের একটি গাড়িতে তুলে নিয়ে কয়েক কিলোমিটার দূরে একটি নির্জন জঙ্গলবেষ্টিত জায়গায় নিয়ে যায়। সেখানে পুরুষদের গাড়িতেই বেঁধে রেখে মহিলাদের উপর গণধর্ষণ চালায় ওই দুষ্কৃতিরা। নারকীয় অত্যাচার চলে এবং নিপীড়িতাদের মূত্রপান করতে বাধ্য করা হয়। তাদের ছেড়ে দেবার আগে এই হুঁশিয়ারি দেওয়া হয় যে যদি তারা কোথাও অভিযোগ করে তাহলে ভিডিওকৃত ধর্ষণের ঘটনা চারদিকে ছড়িয়ে দেওয়া হবে।

আর সি মিশন প্রাঙ্গনে যেখানে পথনাটিকাটি অনুষ্ঠিত হচ্ছিল সেখানে সিসিটিভি ফুটেজে পরিষ্কার ধরা পড়েছে মোটরবাইক বাহিত ওই নরপশুদের মুখচ্ছবি। কিন্তু পুলিশ তদন্তে নেমেই নিপীড়িতাদের নিজেদের কাস্টডিতে নিয়ে নেয়। তাদেরকে এমনকী নিজের পরিবারের লোকোদোর সঙ্গেও দেখা করতে দেওয়া হয় না উপরন্তু আর সি মিশনের যাজক ফাদার আলফোনসো এবং কয়েকজন নানকে গ্রেফতার করা হয়। ঘটনাপ্রবাহ এখানেই থেমে থাকেনি। আরক্ষা এবং সুরক্ষা বাহিনীর হাজার হাজার সদস্য অবর্ণনীয় সন্ত্রাস নামিয়ে আনে কোচাং এবং তার সন্নিহিত এলাকায়। তাদের লক্ষ্যে আছে পাথালগড়ি আন্দোলনের পরিচিত নেতা এবং সদস্যরা। সিসিটিভি ফুটেজ থাকা সত্ত্বেও এই ব্যাপক অত্যাচার বিস্ময় এবং সন্দেহের সৃষ্টি করেছে। যেহেতু মিডিয়াও তোতাপাখীর মত আউড়ে চলেছে পুলিশ এবং প্রশাসনের দেওয়া বয়ান, সত্য অনুসন্ধানের জন্য WSS (Women Against Sexual Violence And State Repression And Sexual repression) একটি কমিটি গঠন করে। এই কমিটির মধ্যে রয়েছেন বিভিন্ন রাজ্যের নারী সংগঠনের সদস্য এবং ঝাড়খন্ডের স্থানীয় অ্যাক্টিভিস্টরা। ২৮শে জুন থেকে ৩০ শে জুন এই তিনদিন ধরে তদন্ত চালান হয় খুন্তী, কোচাং, রাঁচি এবং আশেপাশের বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে। ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন তথ্যসংগ্রহ এবং তার ওপর ভিত্তি করে পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ যাচাই করাই ছিল মূল উদ্দেশ্য, কেননা প্রশাসনিক বয়ান ছাড়া ওই নারকীয় ঘটনার আর কোনও নির্ভরযোগ্য বিবরণ অলভ্য। মিডিয়াও সমান দোষী। কারণ নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন না করে তারা প্রশাসনের হয়েই প্রচার চালিয়েছিল। তদন্ত চলাকালীন ওই টিম ঘটনার সঙ্গে জড়িত অনেক ব্যক্তি ও প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলে প্রচুর তথ্য সংগ্রহ করে। পুলিশ কাস্টডিতে থাকা নিপীড়িতাদের সঙ্গে দেখা করার চেষ্টাও করে, কিন্তু, খুন্তি পুলিশ প্রশাসন তাদের সেই অনুমতি দেয়নি। জেলাশাসক ও এসপি দেখা করার অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করছেন। WSS এর তদন্তে এমন অনেক তথ্য বেরিয়ে এসেছে যা কোচাং-ঘটনার প্রশাসনিক বয়ানকে প্রশ্নের মুখে ফেলে দেবে। নীচে তাদের রিপোর্টের একটি বঙ্গানুবাদ দেওয়া হল।


১) গত উনিশে জুন ২০১৮-য় উদ্ধার করা মেয়েদের সুরক্ষা দেবার প্রতিষ্ঠান ঝাড়খন্ড আর সি মিশনের দুইজন আদিবাসী মহিলা কর্মী এবং অপর একটি এনজিওর আরও তিন মহিলা আদিবাসী কর্মী নারীপাচার এবং মাইগ্রেশনের বিরুদ্ধে প্রচার চালানোর জন্য পথনাটিকা অনুষ্ঠিত করছিলেন। খুন্তি জেলায় মোট ষোলটি নির্ধারিত অনুষ্ঠান শেষ হয়ে যাবার পরও ওই ট্রুপের সঙ্গে থাকা আর সি মিশনের সিস্টারদের এবং এনজিও-র অধিকর্তার পীড়াপিড়িতে কোচাংয়ে বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। ওই অধিকর্তার মতে দূরদূরান্তে ঘোষণা পৌঁছে যাবার কারণে ওই পথনাটিকা অনুষ্ঠিত হওয়া জরুরী ছিল।

২) ১৯ শে জুন ওই ঘটনা ঘটার পর দুটি এফআইআর হয় – একটি খুন্তি পুলিশ স্টেশনে, আর একটি খুন্তি মহিলা পুলিশ স্টেশনে। দ্বিতীয়টি হয়েছিল ২১ শে জুন। পুলিশ কিন্তু যতদূর সম্ভব ২০ তারিখই খবর পেয়ে গিয়েছিল, কারণ ওই তারিখেই পুলিশ ট্রুপের সঙ্গে থাকা দু’জন সিস্টার (নান) কে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডেকে পাঠিয়েছিল। ওইদিনই বেশী রাতে পাঁচ নির্যাতিতার মধ্য থেকে এনজিওর কর্মী দুজনকে প্রাথমিক মেডিক্যাল পরীক্ষার জন্য নিয়ে যাওয়া হয়। ২১ তারিখে পাঁচজন নির্যাতিতার মেডিকো-লিগ্যাল পরীক্ষার জন্য একটি বোর্ড গঠন করা হয়। এখনও জানা যায়নি প্রথম কার কাছ থেকে এবং ঠিক কীভাবে পুলিশ এই খবর পায়। WSS-এর তদন্তে যতটুকু জানা গেছে তাতে মনে হচ্ছে থানা এই অপরাধের খবর সরাসরি এসপির অফিস থেকে পেয়েছিল।

৩) এফআইআরে ফাদার আলফোনস্‌ এবং ‘অন্যান্য অপরিচিত ব্যক্তি/পাথালগড়ি সমর্থকদের’ অভিযুক্ত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অথচ ঘটনার ভিডিওগ্রাফিক সাক্ষ্য মজুত রয়েছে। ঘটনা ঘটে যাবার এক সপ্তাহ পরে পুলিশ ওই একই ভিডিও থেকে মাত্র একজনের ছবি প্রকাশ করে। যার ছবি তাকে স্থানীয় জনগণ এবং সাংবাদিকেরা খুব ভাল করে চেনে, সে কোনওমতেই পাথালগড়ি সমর্থক নয়, থাকেও অনেক দূর – সেরাইকেলাতে। তার নাম বাজী সামন্ত। প্রত্যেক প্রত্যক্ষদর্শী একথা জানিয়েছে যে বাইকে করে আসা চার দুষ্কৃতি ওই এলাকার বাসিন্দা নয়।

৪) পোষ্য মিডিয়াতেও এইভাবে বলা হচ্ছে যে ফাদার এলফোনস্ ইচ্ছে করলেই ঘটনাটি আটকাতে পারতেন। উপরন্তু তিনি এফআইআর করতেও দেরী করেছেন। কিন্তু বাস্তবে ফাদারের বিরুদ্ধে জামিন অযোগ্য ভয়ঙ্কর সব চার্জ দেওয়া হয়েছে। মহিলা পুলিশ থানায় ২১ শে জুন যে এফআইআর করা হয়েছে তাতে এই চার্জগুলি রয়েছে: অবৈধ আটক, ইচ্ছে করে আঘাত করা, বিবস্ত্র করানো, অপহরণ এবং ষড়যন্ত্র। এনজিওর অধিকর্তাকৃত ২১শে জুনের আরেকটি এফআইআরেও এই চার্জগুলি ছাড়াও বিষপ্রয়োগে ক্ষতি করা, হুমকি দেওয়া, সাক্ষ্যপ্রমাণ লোপাট করা ইত্যাদিও যোগ হয়েছে।

৫) ফাদার ছাড়াও এই ঘটনায় আরও দু’জনকে আটক করা হয়েছে। এই দু’জন অভিযুক্ত আরও তিন অভিযুক্তকে চিনিয়ে দিয়েছে, যারা পাথালগড়ি আন্দোলনের পুরোধা। WSS টিম যখন জিজ্ঞাসা করে এই পাঁচ অভিযুক্তকেই ওই পাঁচ নির্যাতিতার দ্বারা সনাক্ত করার কাজ সম্পূর্ণ কি না, তখন উত্তর আসে: এইসব প্রশ্নের জবাব এসপি অফিস ছাড়া আর কেউ দিতে পারবে না।

৬) ২৬শে জুন পুলিশি দাবী মতে ঘাঘরা গ্রামে পুলিশি রেইড হয় ওই তিন অভিযুক্ত পাথালগড়ি আন্দোলনের নেতাকে আটক করার জন্য। ওইদিনেই ঘাঘরা এবং প্রতিবেশী গ্রামগুলি মিলে পাথালগড়ি ইস্যু নিয়ে গ্রামসভা মিটিংয়ের আয়োজন করেছিল। এরকম কোনও নিশ্চিত খবর পাওয়া যায়নি যে ওই তিন উল্লিখিত অভিযু্ক্ত ওই মিটিংয়ে উপস্থিত ছিল। প্রথমে পুলিশ বাহিনীতে শুধু আদিবাসী সম্প্রদায়ভুক্ত সদস্যরা থাকলেও, পরে তাদের সঙ্গে আরও বাহিনী যোগ দেয়। ডিসি ও এসপির উপস্থিতিতে গ্রামসভা বানচাল করে দেবার চেষ্টা চালান হয়। পুলিশ এবং জনতায় তর্কাতর্কি বেধে যায়। এইসময়ই মহিলারা পুলিশকে তাড়া করে কাড়িয়া মুন্ডার বাড়ি অবধি নিয়ে যায় এবং সেখানে মোতায়েন তিন রক্ষীকে নিজেদের সঙ্গে নিয়ে আসে।

৭) ২৭শে জুন একহাজার আধাসামরিক বাহিনী মাত্র তিনশ অধিবাসীর ঘাঘরা গ্রাম এবং আশেপাশের আরও সাতটি গ্রাম জুড়ে ব্যাপক ধরপাকড় চালায়। এই সাতটি গ্রামের মধ্যে মাত্র ৩-৪টিতে পাথালগড়ি আন্দোলন চলছিল। যে দুটি গ্রামে পাথালগড়ি আন্দোলন সদ্য শুরু হয়েছিল সেখানে এই সুরক্ষা বাহিনী অবর্ণনীয় অত্যাচার চালায়। মারধোর, লাঠিচার্জ, টিয়ার গ্যাস, রাবার পেলেট ছোঁড়া কিছুই বাদ যায়নি, নারী-পুরুষ-শিশু কেউই রেহাই পায়নি। গ্রামবাসীদের ঘরবাড়িও তছনছ করা হয়। লাঠিচার্জে একজন মারা যায়, একটি শিশুকন্যার হাড় ভাঙ্গে এবং মহিলা সহ দেড়শো থেকে তিনশ জনকে আটক করা হয়। এই ধরপাকড়ের পরে ৮টি গ্রামের সমস্ত অধিবাসীরা ভয় এবং আতঙ্কে জঙ্গলে পালিয়ে যায়। যদিও যে রক্ষীদের অপহরণ করা হয়েছিল বলা হচ্ছে, তারা সুস্থ শরীরে ২৯শে জুন ফিরে এসেছে। কিন্তু গ্রামগুলি থেকে পুলিশি ক্যাম্প ওঠে না। সত্যানুসন্ধানী দলটিকে কিন্তু তদন্তের খাতিরেও ঘাঘরা গ্রামে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। অস্ত্রবোঝাই ভারী গাড়ি দিয়ে রাস্তা ব্লক করে রাখা হয়।

সত্যানুসন্ধানী দলের তোলা কয়েকটি প্রশ্ন:
১) পুলিশ কখন এবং কীভাবে প্রথম এই ঘটনার খবর জানতে পারে? তখনই এফআইআর না করে দু’দিন পর কেন করা হয়?
২) কেন নির্যাতিতার মধ্যে দু’জনের ২০শে জুন রাত্রেই তড়িঘড়ি ডাক্তারি পরীক্ষা হয় যেখানে পাঁচ নির্যাতিতার পুরো মেডিক্যাল পরীক্ষা হয় ২১ শে জুন?
৩) যেখানে গোটা ঘটনার ভিডিও রেকর্ডিং রয়েছে, সেখানে এফআইআর কেন করা হল ‘অজানা-অচেনা’ ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে। ভিডিও দেখে চিহ্নিত করা অভিযুক্ত বাজী সামন্তের নাম ঠিকানা জানা সত্ত্বেও কেন পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করল না? তা না করে যে দূর দূর গ্রামের সঙ্গে এই ঘটনার সংশ্রব মাত্র নেই, অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারের নামে সেখানে কেন তুলকালাম চালান হল?
৪) অপরাধী গ্রেপ্তারের নামে ঘাঘরা গ্রামসভা মিটিংয়ে অতর্কিতে হানা দিয়ে পাথালগড়ি আন্দোলনকে বিপর্যস্ত করা ছাড়া আর কী লাভ হল, যখন পুলিশ ভালমতোই জানে যে অভিযু্ক্ত সেরাইকেলার অধিবাসী?
৫) অত্যাচারিতাদের দিয়ে গ্রেপ্তার হওয়া দুই ব্যক্তিকে চিহ্নিতকরণ প্রক্রিয়ার মধ্যে পুলিশ গেল না কেন? কেনই বা যে তিন তথাকথিত অভিযুক্তের পেছনে পুলিশ পড়ে আছে তাদের চিহ্নিতকরণের জন্য নিপীড়িতাদের সাহায্য না নিয়ে পুলিশ হেফাজতে থাকা দুই সন্দেহভাজনের কথাই পুলিশ সত্য বলে ধরে নিল? যদি গ্রেপ্তার হওয়া অভিযুক্ত অথবা নিপীড়িতাদের কেউ ইউসুফ পুর্তির নাম না নিয়ে থাকে, তাহলে পুলিশ কেন তাকে এবং অন্য পাথালগড়ি নেতা-সমর্থকদের ধর্ষণে অভিযুক্ত হিসেবে মামলায় জড়িয়ে দিচ্ছে এবং মিডিয়ার কাছে তুলে ধরছে?
৬) নির্যাতিতাদের কেন এখনও পুলিশ হেফাজতে রাখা হয়েছে? কেন জাতীয় মহিলা কমিশন ছাড়া আর কারও সঙ্গে তাদের কথা বলতে দেওয়া হচ্ছে না?
৭) যে এনজিও থেকে কলাকুশলীদের দলটি এসেছিল এবং প্রথম এফআইআর-টি করা হয়েছিল তার কর্তা কে? এফআইআর দর্জ করেই সে কেন উবে গেল? সেও কী তবে পুলিশ হেফাজতে আছে?

সত্যানুসন্ধানী দলটির সিদ্ধান্ত:
১) ঝাড়খন্ডের পুলিশ ও প্রশাসন ঘটনা সম্বন্ধে এত গোপনীয়তা রক্ষা করছে কেন? ঘটনা সম্পর্কে যা তথ্য এখন বাইরে আসছে, অত্যাচারিতাদের জবানবন্দী এবং সাক্ষীদের কথা – এসবের উৎস একটাই, এসপি সাহেবের অফিস। সুরক্ষার জন্য পাঁচ নির্যাতিতাকে পুলিশ হেফাজতে রাখার অছিলায় তাদেরকে আর কারও সঙ্গে কথা বলতে দেওয়া হচ্ছে না। মিডিয়ার সঙ্গেও না, এমনকী পরিবারের সঙ্গেও না। জাতীয় মহিলা কমিশন একমাত্র ব্যতিক্রম। তারা যে সংস্থার কর্মী, তারাও প্রেস বা অন্য কারোর সঙ্গে কথা বলতে পারছে না। অন্য স্টাফেদেরও হুকুম দেওয়া হয়েছে সংস্থার সীমানার বাইরে না যেতে, কোনও ভিজিটরের সঙ্গে দেখা না করতে। অত্যাচারিতাদের পরিবারকেও পুলিশের তরফ থেকে কিছু জানান হয়নি। গোটা ঘটনায় নির্যাতিতাদের কন্ঠস্বরই অশ্রুত থেকে যাচ্ছে, যদিও ওই পাঁচজনই প্রাপ্তবয়স্ক, কেউ কেউ বিবাহিত এবং সন্তানের জননী। তাদের বা তাদের পরিবার, তাদের কোনও বন্ধু কারো কোনও বিবৃতি জনসমক্ষে আসে নি। উল্টোদিকে পুলিশি অত্যাচারের মাত্রা যত বাড়ছিল, ততোই যেন তা নিয়োজিত হচ্ছিল পাথালগড়ি আন্দোলন ও তার নেতাদের কালিমালিপ্ত করতে। এতে ক’রে ফল হল এই যে ওই গণধর্ষণ এবং ধর্ষিতাদের নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্বের দিক থেকে দ্বিতীয় স্থানে চলে গেল।
২) ঘটনা ঘটার পর থেকে নেওয়া আইনি ব্যবস্থা গোটাটাই রহস্যাবৃত। কেননা এর গোটাটাই পুলিশ ও প্রশাসনের মুখ থেকে ভেসে আসা এবং প্রশ্নাতীত নয় এইরকম একমাত্রিক কাহিনী যার কোনওরকম দ্বিতীয় নিরপেক্ষ স্বাধীন মাত্রা নেই। এইজন্য এবং সুরক্ষাবাহিনীর দমনপীড়নের জন্য খুন্তি এবং আশেপাশের এলাকাগুলি হয়ে উঠেছে সন্ত্রাসের ঘাঁটি যেখানে নিরপেক্ষ তথ্য যাচাই একেবারেই অসম্ভব।
৩) অজানা অভিযুক্তদের ধরবার নাম করে পুলিশ গণধর্ষণের ঘটনাটির সঙ্গে পাথালগড়ি আন্দোলনে যুক্ত ব্যক্তিদের জড়িয়ে দিচ্ছে এবং অত্যাচার নিপীড়ন, গ্রেপ্তার, ইত্যাদির মধ্যে তাদের ঠেলে দিচ্ছে। এটা প্রমাণ করার মত প্রচুর সাক্ষ্যপ্রমাণ রয়েছে যে বাইকবাহিত ওই চারজন কখনই স্থানীয় অধিবাসী নয়। একজনকে তো ভিডিওতে চেনাই যাচ্ছে – সরাইকেলার বাজী সামন্ত। কিন্তু এইসব প্রমাণিত অভিযুক্তদের ধরার বদলে, পুলিশ সুরক্ষা বাহিনীর সাহায্যে পাথালগড়ি নেতাদের মূল সন্দেহভাজন বলে চিহ্নিত করছে।
৪) এমনভাবে ঘুঁটি সাজানো হচ্ছে যাতে মনে হয় কোচাংয়ে মিশনের ফাদারকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে কারণ ঘটনাটিকে বাধা দিতে তিনি সচেষ্ট ছিলেন না বা ঘটনা ঘটে যাবার পর জানা সত্ত্বেও তিনি রিপোর্ট করা থেকে বিরত থেকেছেন। জাতীয় মহিলা কমিশন গোটা ঘটনাটিকেই পূর্ব পরিকল্পিত বলে আখ্যা দিয়েছে। ফাদার আলফনসোর বিরুদ্ধে যেসব চার্জ দেওয়া হয়েছে সেগুলো খুবই গুরুতর – গণধর্ষণ, গায়ের জোরে আটকে রাখা এবং ষড়যন্ত্র করা ছাড়াও আরও অনেককিছু।
৫) মিডিয়ার ভূমিকাও খুব সন্দেহজনক। স্থানীয় এবং জাতীয় স্তরের খবরের কাগজগুলি এবং টিভি চ্যানেলগুলি এই ঘটনার ভুল ব্যাখাই দিয়ে যাচ্ছে। যথেষ্ট সাক্ষ্যপ্রমাণ ছাড়াই মিডিয়া পাথালগড়ি আন্দোলনে যুক্ত ব্যক্তিদের এবং চার্চ/মিশনের ভূমিকাকে নঞর্থক বলে প্রচার করছে। ঘাঘরাতে পুলিশি ধড়পাকড়ের সময় এবং আগেও সিকিউরিটি ক্যাম্পে প্রচুর মিডিয়া উপস্থিত ছিল এবং তারা ওখান থেকেই ঘটনার পুলিশি বয়ানের সমর্থনে প্রচার শুরু করে।
৬) এইসব কারণে সত্যানুসন্ধানী দলটি নিম্নলিখিত দাবীগুলো রাখতে বাধ্য হচ্ছে:
এখনই নিরপেক্ষ তদন্তের স্বার্থে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি নিয়োগ করতে হবে যাতে থাকবেন অবসরপ্রাপ্ত বিচারক, উকিল এবং নারীর অধিকার নিয়ে কাজ করা অ্যাক্টিভিস্টরা।
তদন্ত হবে শুধুমাত্র গণধর্ষণের অভিযোগ নিয়ে নয়, তারপরের ঘটনাপ্রবাহ নিয়েও, যখন পুলিশি হানার ফলে একজনের মৃত্যু ও অনেকের গুরুতর শারীরিক ক্ষতি হয়। আমরা আরও দাবী করছি যে ঘাঘরা এবং আশেপাশের গ্রামে ক্যাম্প করে থাকা সমস্ত সুরক্ষা বাহিনীকে তুলে নিতে হবে।

গণধর্ষণের নিপীড়িতাদের নিরাপত্তার বিষয়টি খুব গুরুত্বপূ্র্ণ। তাদের নিজস্ব ইচ্ছা ও মতামতের ব্যাপারটি খেয়াল রাখা দরকার। নিজেদের সুরক্ষার জন্য পুলিশ কাস্টডি কি তাদের স্বইচ্ছায়, নাকি এটি পুলিশেরই চাপিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্ত। মনে হয় দ্বিতীয়টিই ঠিক। এইভাবে তাদের অবরুদ্ধ করে রাখা এবং খুন্তি পুলিশের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রাখা সুস্থ তদন্তের পথে বিরাট প্রতিবন্ধক।

এই টিম দাবী জানায় যেন রাজ্য সরকার ওই পাঁচ নির্যাতিতার পুলিশি কবল থেকে মুক্তি নিশ্চিত করে। তাদের ইচ্ছানুযায়ী অন্য কোনও সুরক্ষিত ব্যবস্থায় তাদের রাখা হোক। এদের কারো কারো স্বামীসন্তান আছে এবং হয়ত এরা ঘরে ফিরতে চায় কিংবা যে সংস্থায় কর্মরত সেখানেই ফিরতে চায়।

- Rinchin, Radhika and Puja
From Women Against Sexual Violence and State Repression and Sexual Repression (WSS)
www.wssnet.org
Contact: againstsexualviolence@gmail.com



110 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

কোন বিভাগের লেখাঃ বুলবুলভাজা 
শেয়ার করুন



আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন